📄 মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
শুধু ইবাদাত করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তাআলা এ বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। যেমন কুরআন বলছেঃ
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ - الذريات : ٥٦
“আমি জ্বিন এবং মানুষকে একমাত্র আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”-সূরা আয যারিয়াত : ৫৬
যত রাসূল দুনিয়ায় আগমন করেছেন এ উদ্দেশ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যই আগমন করেছেন। নূহ আলাইহিস সালাম নিজ জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন:
يقَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ : - الاعراف : ٥٩
“হে আমার জাতি। আল্লাহর বন্দেগী করো; তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।”-সূরা আল আরাফ: ৫৯
হুদ আলাইহিস সালাম, সালেহ আলাইহিস সালাম, শোয়ায়েব আলাইহিস সালাম-মোটকথা সকল নবী আলাইহিমুস সালাম তাঁদের নিজ নিজ জাতিকে এ আহবানই জানিয়েছিলেন।
কুরআন অকাট্যভাবে ঘোষণা করছে :
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ...
"আমি প্রত্যেক জাতির নিকট একজন পয়গাম্বর পাঠিয়েছি। তাঁরা মানুষের নিকট এ পয়গাম পৌঁছিয়েছে : হে মানুষেরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাগুতকে পরিহার করো।" -সূরা আন নাহল : ৩৬
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
"হে নবী! তোমার আগে আমি যেসব নবী দুনিয়ায় পাঠিয়েছি তাদের প্রতি আমি এ ওহীই নাযিল করেছিলাম। "আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। অতএব তোমরা আমার ইবাদাত করো।" -সূরা আল আম্বিয়া : ২৫
إِنَّ هَذِهِ أُمْتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً ، وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ الانبياء : ٩٢
"নিসন্দেহে তোমাদের এই উম্মাহ একই উম্মাহ, আর আমিই তোমাদের সকলের 'রব'। অতএব তোমরা আমার ইবাদাত করো।" -সূরা আল আম্বিয়া : ৯২
একথা সুস্পষ্ট হওয়া দরকার যে, এ আয়াতে "ইবাদাত করো” শুধু সাধারণ মানুষ অর্থাৎ উম্মতকে উদ্দেশ করেই বলা হয়নি। বরং এ দাওয়াতের দা'য়ী এবং পয়গামের মুবাল্লিগ আম্বিয়ায়ে কিরামও এর মধ্যে শামিল। অন্য জায়গায়ও এ সম্বন্ধে বলা হয়েছে :
يأَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
"হে রাসূলগণ! পাক পবিত্র জিনিস খাও এবং নেক আমল করো, নিসন্দেহে আমি তোমাদের আমল সম্পর্কে অবহিত।" -সূরা মু'মিনূন : ৫১
আর এক আয়াতে এ ব্যাপারটিকে আরো স্পষ্ট করে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। নবী করীম (সা)-কে উদ্দেশ করে এরশাদ হয়েছে :
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينَ الحجر : ٩٩
"(হে মুহাম্মাদ!) আপনার রবের ইবাদাত করতে থাকুন। যতক্ষণ না নিশ্চিত ব্যাপারটির (মৃত্যু) সময় এসে যাবে।” -সূরা আল হিজর: ৯৯
📄 আল্লাহর দাসত্বই মানুষের শ্রেষ্ঠতম মর্যাদা
এ ইবাদাতকে আম্বিয়া ও মালায়িকার পরম গুণাগুণ হিসেবে আল্লাহ তা'আলা প্রশংসা করে উল্লেখ করেছেন:
وَلَهُ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ ، وَمَنْ عِنْدَهُ لَايَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ يُسَبِّحُونَ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ ( الانبياء : ١٩
"আসমান ও যমীনে যা যা আছে সবই তাঁর। যেসব (ফেরেশতা) তাঁর দরবারে আছে তারা কখনো ইবাদাত থেকে মুখ ফিরায় না। না তারা ক্লান্ত হয়। রাতদিন অনবরত তার পবিত্রতা বর্ণনা করে। এতে একটু অবহেলা প্রদর্শন করে না।"-সূরা আল আম্বিয়া: ১৯-২০
إِنَّ الَّذِينَ عِنْدَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيُسَبِّحُونَهُ وَلَهُ يَسْجُدُونَ
"যারা (ফেরেশতা) তোমার রবের নিকট আছে তারা কখনো তাঁর নাফরমানী করে না। তারা তাঁর গুণগান করতে থাকে, তাঁর দরবারে সেজদায় রত থাকে।" -সূরা আল আ'রাফ: ২০৬
এর বিপরীত রয়েছে ওইসব লোক, যারা নিজেদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ করে না এবং আল্লাহর সামনে মাথা নত করার পরিবর্তে অহমিকায় নিমজ্জিত হয়। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
"যারা আমার দাসত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং হঠকারিতায় নিমজ্জিত হয়, তারা অবশ্যই বড় লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"-সূরা আল মু'মিন: ৬০
যেহেতু আল্লাহর দাসত্ব করাই মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য, তাই এ উদ্দেশ্য পূরণ করাই আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করার উপায়। একজন মানুষের মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছার অর্থই হলো, তিনি তার কাজকর্ম দ্বারা ইবাদাতের উচ্চস্তরে পৌঁছেছেন। তাই কুরআন পাকে দেখতে পাই, আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যখন তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ স্নেহ-মমতা ও মান মর্যাদার সাথে স্মরণ করতে চান, তখন তিনি এ স্মরণের সময় 'আবদুন' শব্দের বিশেষণ দ্বারা তাদের স্মরণ করে থাকেন:
عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا الدهر : ٦
"এটা একটি প্রবাহমান ঝর্ণা হবে। তা থেকে আল্লাহর গোলামরা তৃষ্ণা নিবারণ করবে। যেখানে ইচ্ছে তারা তার শাখা-প্রশাখা বের করে নিতে পারে।"-সূরা আদ দাহর: ৬
عِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا - الفرقان : ٦٣
"রহমানের দাস হলো তারা, যারা যমিনের উপর বিনয়ের সাথে চলে।” -সূরা আল ফুরকান: ৬৩
শয়তান নিজে অভিশপ্ত হবার কথা শুনার পর আল্লাহর নিকট আরজ করেছিলো: আমি এর বদলা স্বরূপ তোমার বান্দাদেরকে মনোহারী লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে বিভ্রান্ত করবো। তখন আল্লাহর তরফ থেকে ইরশাদ হলো:
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سَلْطَنَ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغُويْنَ الحجر : ٤٢
"আমার প্রকৃত বান্দাদের উপর তোর কোনো কর্তৃত্ব নেই। তবে যারা তোর কথা শুনবে তারা গুমরাহ হয়ে যাবে।"-সূরা আল হিজর: ৪২
ফেরেশতাদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে:
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا سُبْحْنَهُ ، بَلْ عِبَادُ مُكْرَمُوْنَ ...... وَهُمْ مِنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ الانبياء : ٢٦ ، ٢٨
"আর এ কাফিররা বলছে, রহমানের সন্তান আছে। আল্লাহ এসব ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তারা (তো ফেরেশতারা) আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। ..........তারা আল্লাহর ভয়ে সদাসর্বদা কম্পিত থাকে।" -সূরা আল আম্বিয়া: ২৬, ২৮
হযরত ঈসা মসীহ আলাইহিস সালামের ব্যাপারে নবুয়াত এবং খোদায়ীত্ব দুটোই দাবী করা হয়েছিলো। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ - الزخرف : ٥٩
"সে তো একজন দাস ছাড়া আর কিছু ছিলো না। আমি তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেছি।"-সূরা আয যুখরুফ: ৫৯
বস্তুত, মুসলমানরাও শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর 'আল্লাহর বান্দাহ' হবার অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয় কিনা সে জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন:
لا تَطْرِنِي كَمَا أَطْرَتَ النَّصَارَى عِيسَى بْنِ مَرْيَمَ إِنَّمَا أَنَا عَبْدٌ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ - الحديث
"আমার প্রসংশায় বেশী বাড়াবাড়ি করো না, যেমন নাসারা জাতি ঈসা ইবনে মারইয়ামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিলো। আমি তো কেবল আল্লাহর একজন দাস। অতএব আমাকে তোমরা আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই বলো।"-আল হাদীস
কুরআন মাজীদে আল্লাহর খাস বান্দাহ ফেরেশতা ও অন্যান্য নবী আলাইহিস সালামের মতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও 'বান্দাহ' হিসেবেই সম্বোধন করা হয়েছে। মে'রাজের মতো আল্লাহর কুদরতের এত বড় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً .......... الخ - بنى اسرائيل : ١
"অতি পূত-পবিত্র সেই সত্তা যিনি রাতের বেলায় তাঁর প্রিয় বান্দাকে নিয়ে ভ্রমণ করিয়েছেন.......।"-সূরা বনী ইসরাঈল: ১
فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى - النجم : ١٠
"অতপর তাঁর বান্দার নিকট যা ওহী করার ছিলো তা করেছেন।" -সূরা আন নাজম: ১০
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের দাওয়াত ও তাবলীগের উল্লেখ করে এরশাদ করা হয়েছে:
وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا الجن : ١٩
"আর এই যে আল্লাহর বান্দাহ যখন তাঁকে ডাকার জন্য দাঁড়ালো (নামাযে) তখন লোকেরা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হলো।"-সূরা জ্বিন: ১৯
📄 দীন এবং ইবাদাতের স্বাভাবিক সম্পর্ক
কুরআন ও হাদীস থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, গোলামী ও বন্দেগী আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মর্যাদা এবং তাঁর সৌভাগ্যের শ্রেষ্ঠ সোপান। এখানে একথাও প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, সকল শাখা প্রশাখাসহ গোটা দীনই “ইবাদাতের” মধ্যে গণ্য। সকল নবী আল্লাহর দীন শিখাবার জন্য এসেছেন। কুরআনের বেশ কয়েকটি জায়গায়ই একথার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর নবীগণ যাদের নিকটই দীনের দাওয়াত দিয়েছেন তাদেরকে فَاعْبُدُوهُ “তাঁর ইবাদাত করো” বলে সম্বোধন করেছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, “দীন” আর “ইবাদাত” শব্দ দুটো একই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দুটি পৃথক দিক। হাদীসে জিবরীলের দীর্ঘ হাদীসটি এ কথারই প্রমাণ।
হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম একজন বেদুইনের বেশে রাসূলের নিকট এসে সাহাবায়ে কেরামের সামনেই তাঁকে কতিপয় প্রশ্ন করলেন। প্রশ্ন করলেন ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইসলাম কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন : আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযান মাসের রোযা রাখা এবং সামর্থ থাকলে হজ্জ করার নামই হলো ইসলাম।
এরপর আগন্তুক জিজ্ঞেস করলেন, ঈমান কাকে বলে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন : আল্লাহর একত্ব, তাঁর ফেরেশতা, অবতীর্ণ করা কিতাব, তাঁর প্রেরিত রাসূল, মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বারের জীবন, তাকদীরের ভালো ও খারাপ দিকের উপর মন থেকে বিশ্বাস স্থাপন করার নামই “ঈমান”।
এরপর আগন্তুক প্রশ্ন করলেন: “ইহসান কাকে বলে?”
উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : “আল্লাহর ইবাদাত এমনভাবে করো যেনো তুমি তাঁকে দেখছো। আর তুমি তাঁকে না দেখলেও তিনি তো তোমাকে দেখছেন।
এসব প্রশ্ন ও উত্তরের পর হযরত জিবরাঈল আমীন আলাইহিস সালাম চলে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বললেন : فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمَكُمْ دِينَكُمْ
আগন্তুক ছিলেন জিবরীল আমীন। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের দীন শিখাতে এসেছিলেন।
লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজগুলোকে দীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মূলত এ কাজগুলোর সমষ্টির নামই “ইবাদাত”।
📄 দীন এবং ইবাদাতের অর্থ বিশ্লেষণ
এবার দেখা যাক “দীন” ও “ইবাদাতের” আভিধানিক অর্থ কি? দীনের আভিধানিক অর্থ বিনীতভাবে মাথা নত করা, নিজকে ছোট মনে করা। আরবরা বলে থাকেন : بُنْتُهُ فَدَانَ
অর্থাৎ আমি তাকে অসহায়, অনুগত, বিনয়ী ও হুকুমের অধীন বানিয়েছি। আর সে ওইরূপ হয়ে গেলো। نَبِيِّنُ لِلَّهِ وَ نَبِيِّنُ اللَّهَ
অর্থাৎ “আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি এবং আমাদেরকে তাঁর সমীপে সমর্পণ করি।” অতএব “আল্লাহর দীন” অর্থ তাঁর আনুগত্য ও বন্দেগী করা। তাঁর সামনে বিনয় প্রকাশ করা এবং মাথা নত করা। “ইবাদাত” এর আভিধানিক অর্থই দীনের অর্থের কাছাকাছি। ইবাদাত শব্দের অর্থ নিজেকে ছোট জানা এবং পরিপূর্ণ আনুগত্য করা। যে পথ বেশী বেশী চলাচলের কারণে পথচারীদের পদচারণায় দলিত মথিত হয়ে পরিষ্কার ও সমতল হয়ে যায় সে পথকে আরববাসীরা طريق معبد (অর্থাৎ চলাচলের সহজ পথ) বলে। কিন্তু শরীআতের পরিভাষায় ইবাদাতের অর্থ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিজেকে ছোট জানা ও মাথানত করার সাথে সাথে এতে গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধের সংমিশ্রণ আছে। অর্থাৎ শরীআতের পরিভাষায় আল্লাহর দরবারে চরম বিনয় ও তাঁর জন্যে পরিপূর্ণ ভালোবাসা—এ উভয়ের সমষ্টির নামই হলো 'ইবাদাত'। এ দিক দিয়েই আরবী ভাষায় টিম (তায়াম) শব্দ (বান্দা) অর্থে ব্যবহৃত হয়। ভালোবাসার শেষ স্তরের নাম। এর প্রথম স্তরকে দ্বিতীয় স্তরকে তৃতীয় স্তরকে চতুর্থ স্তরকে বলা হয়। এ কারনেই ‘মুতিম’ ওই ব্যক্তিকে বলা হয় যে প্রিয়তমের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তার পরিপূর্ণ অধীন ও গোলাম হয়ে যায়। এ ‘মুতিম’ ও ‘তায়াম’ শব্দাবলী অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর এর তাৎপর্য হলো, ইবাদাতের মধ্যে মহব্বতের বরং পূর্ণ প্রেমের অর্থ নিহিত আছে। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি অপর কোনো ব্যক্তির সামনে মাথা নত করে কিন্তু মহব্বত ও ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষ কিংবা খারাপ মন নিয়ে নত করে অথবা কাউকে ভালোবাসে বটে, কিন্তু তার সাথে বিনয়ের আচরণ করে না, তাহলে এ অবস্থায় তাকে বা বলা যাবে না : যেমন কখনো কখনো পিতা পুত্রের সাথে অথবা বন্ধুর সাথে এরূপ ব্যবহার করে।
‘ইবাদাত’ শব্দের এ ব্যাখ্যা সামনে রাখলে এ সত্য ও নিগূঢ় রহস্য নিজ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শরীআত আল্লাহর ইবাদাতের ব্যাপারে আমাদেরকে যে হুকুম দিয়েছে এবং যে জিনিসকে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করেছে, তার হক ততোক্ষণ পর্যন্ত আদায় হয় না যতোক্ষণ এর মধ্যে এ দুটো জিনিসের (বিনয় ও ভালোবাসা) সমন্বয় না ঘটবে। সেই সাথে আল্লাহকে দুনিয়ার সকল জিনিসের চেয়ে বেশী ভালোবাসতে ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বরং সত্য কথা তো হলো পরিপূর্ণ ভালোবাসা এবং পরিপূর্ণ বিনয় ও শ্রদ্ধা পাবার অধিকার তো একমাত্র আল্লাহরই। অনুরূপ ভালোবাসা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্য নাজায়েয। এভাবে এ ধরনের বিনয় ও ভালোবাসার প্রদর্শন বাতিল ও নাজায়েয গণ্য হবে যা আল্লাহর ফরমানের বাইরে আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করা হবে। আল্লাহ বলেছেন :
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبُّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ - توية : ٢٤
"হে নবী! বলো : যদি তোমাদের মাতাপিতা, তোমাদের সন্তান সন্ততি, তোমাদের ভাই-বোন, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়- স্বজন, ওই সম্পদ যা তোমরা উপার্জন করেছো, ওই ব্যবসা যার মন্দা হবার তোমরা ভয় করো, আর ওই বাড়ী ঘর যা তোমরা খুবই পসন্দ করো, যদি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করা থেকে তোমাদের নিকট বেশী প্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর চূড়ান্ত হুকুম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।"-সূরা আত তাওবা : ২৪
এ আয়াত থেকে জানা গেলো প্রকৃত ভালোবাসা পাবার অধিকার আল্লাহ সোবহানাহু তাআলার। নবীকে ভালোবাসাও আল্লাহর আনুগত্যের শর্তে অন্তর্ভুক্ত। শরীআতের দৃষ্টিতে সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসা জরুরী। যেমন জরুরী তাঁর শর্তহীন আনুগত্য এবং সন্তুষ্টিলাভের আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ এরশাদ করেছেন :
وَاللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَنْ يُرْضُوهُ - التوبة : ٦٢
"আল্লাহ আর আল্লাহর রাসূলেরই সর্বাধিক অধিকার রয়েছে, তারা তাঁদের সন্তুষ্ট করবে।"-সূরা আত তাওবা : ৬২
এভাবে হুকুম ও নির্দেশ দেবার মালিক দু'জনই। যেমন এরশাদ হচ্ছে :
وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا آتْهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ لا - التوبة : ٥٩
"যদি এসব লোক আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যে জিনিস তাদের দিয়েছেন তার উপর রাজী থাকতো।"-সূরা আত তাওবা : ৫৯
মনে রাখতে হবে, ইবাদাত ও ইবাদাতের আনুসঙ্গিক বিষয়গুলোর যেমন তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা ইত্যাদিরও হকদার শুধু আল্লাহই। আল্লাহর রাসূলও কোনো অবস্থাতেই এসব বিষয়ের সাথে শরীক নন। কুরআনে এরশাদ হয়েছে :
قُلْ يَاهْلَ الْكِتٰبِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ ، فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ( ال عمران : ٦٤
"(হে নবী!) বলো : হে আহলে কিতাব ! আসো আমরা এমন একটি কথায় একমত হই যা আমাদের আর তোমাদের মধ্যে সমান। অর্থাৎ আমরা শুধু এক আল্লাহর ইবাদাত করবো, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না। আমাদের কেউ আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কাউকে ‘রব’ বানাবো না। তারপরও যদি তারা তোমার কথা না মানে তাহলে তাদেরকে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থেকো আমরা মুসলমান।" -সূরা আলে ইমরান : ৬৪
এখন উভয় ধারণার একটি পূর্ণাঙ্গ আয়াত শুনুন :
وَلَوْأَنَّهُمْ رَضُوا مَا أَتُهُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ ، وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ سَيُؤْتِينَا اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُوْلُهُ : إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُونَ ( التوبة : ٥٩
"কতো ভালো হতো যদি এসব লোক সন্তুষ্ট থাকতো ওই জিনিসের উপর যা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল তাদেরকে দান করেছেন। আর যদি বলতো আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর তিনি অচিরেই আমাদেরকে আরো অনুগ্রহ দান করবেন এবং তাঁর রাসূলও। আমরা আল্লাহর দিকেরই অনুরাগী।"-সূরা আত তাওবা : ৫৯
কুরআনের এ আয়াত থেকে দুটো কথাই প্রমাণিত হলো। এখানেও আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ নিষেধের মালিক বলে প্রমাণিত হয়েছে:
وَمَا أَتْكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ ، وَمَا نَهْكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا الحشر : 7
“যে কথার হুকুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন তা গ্রহণ করো আর যা তিনি নিষেধ করেছেন তার থেকে বিরত থাকো।"-সূরা আল হাশর ৭
এ আয়াতেও এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান, অর্থাৎ আল্লাহই যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য সব কাজ সম্পন্নকারী। এ সত্যটিকেও একের অধিক আয়াতে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যেমন :
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ال عمران : ۱۷۳
"আর যাদের নিকট লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের বিরুদ্ধে বিরাট সেনাবাহিনী সমবেত হয়েছে তাদেরকে ভয় করো। একথা শুনে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেলো। উত্তরে তারা বললো, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনিই সর্বোত্তম কর্মকর্তা।"-সূরা আলে ইমরান : ১৭৩
يأَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللهُ - الانفال : ٦٤
"হে নবী! আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"-সূরা আল আনফালঃ ৬৪
الَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ - الزمر : ٣٦
"আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?"-সূরা আয যুমার: ৩৬
এখন আমি عبد ও عبادة এ দুটো শব্দের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করবো। عبد (আবদুন) শব্দটির দুটো অর্থ। প্রথম অর্থ হলো مُعَبُدُ আর দ্বিতীয় অর্থ হলো معبد - عابد অর্থাৎ, আল্লাহর ফায়সালার অনুগত ও বাধ্যগত গোলাম। যারা আল্লাহর হুকুমের সামনে জন্মগতভাবেই মাথানত। আর আল্লাহ সোবহানাহু তা'আলা তার অবস্থা ও অবস্থানকে যেভাবে খুশী গড়ে তুলেন ও ভেঙ্গে ফেলেন বা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেন।