📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 রেজায়ে মাওলা : দিদারে এলাহি

📄 রেজায়ে মাওলা : দিদারে এলাহি


একদিন এই সুন্দর পৃথিবী থেমে যাবে। আমরা যারা এখানে বসে একমাস তাফসিরুল কুরআন শুনলাম, সবই একদিন থেমে যাব। সমস্ত পৃথিবীর সকল মানুষ একদিন শেষ হয়ে যাবে। সাঙ্গ হবে জীবনের খেলা। অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি জমাতে হবে সবাইকে। সেই জীবনে যে ব্যক্তি আল্লাহর পাকড়াও থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারবে, সে-ই হবে প্রকৃত কামিয়াব।

আমরা আল্লাহকে দেখিনি, না দেখে বিশ্বাস করেছি। আমরা আশা করে বসে আছি, একদিন আমরা আমাদের মাবুদকে দেখব। জান্নাতিদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে লিকায়ে মাওলা। অর্থাৎ আল্লাহর সাথে মুলাকাত। আল্লাহপাক তাঁর জান্নাতি বান্দাদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করবেন। সেদিন গোলাম তার মালিককে দেখবে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে দিদারে এলাহি নসিব করুন। আমিন।

আল্লাহর সাথে দেখা করতে চাইলে তথা দিদারে এলাহি দ্বারা জীবন ধন্য করতে হলে আমাদেরকে কী করতে হবে? করণীয়টা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَ لَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهَ احَدًا

যে তার রবের সাথে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন নেক আমল করে এবং আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না বানায়। [সুরা কাহফ : ১১০]

সহজ কথায়, আল্লাহর দিদার পাওয়ার শর্ত হচ্ছে শিরকমুক্ত ঈমান এবং রিয়ামুক্ত নেক আমল। ঈমান যদি শিরকমুক্ত না হয়, তাহলে সেই ঈমানের কোনো মূল্য নেই। একইভাবে আমল যদি একমাত্র আল্লাহর রেজামন্দির উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে সেই আমলও আল্লাহপাকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

এখন যারা এই দুই শর্ত মেনে জীবন পার করবে, মৃত্যুর পর তাদের অবস্থা কী হবে, সেই ব্যাখ্যা আমরা পাই কুরআনে কারিমের আরেক আয়াতে। সুরা ইউনুসের ৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِأَيْمَانِهِمْ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهُرُ فِي جَنَّتِ النَّعِيمِ

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তাদেরকে তাদের ঈমানের মাধ্যমে তাদের পালনকর্তা হিদায়ত দান করবেন- এমন নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের প্রতি, যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত। [সুরা ইউনুস: ৯]

জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতিরা কী বলবে? সেখানে তাদের শেষ কথা কী হবে? সুরা ইউনুসের পরের আয়াত, অর্থাৎ ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,

دَعُونَهُمْ فِيهَا سُبْحْنَكَ اللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلْمٌ وَاخِرُ دَعُونَهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ ﴾

জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতিরা বলবে, হে আল্লাহ! মহাপবিত্র আপনার সত্ত্বা। তাদের অভ্যর্থনা হবে সালামের মাধ্যমে, এবং সেখানে তাদের শেষ কথা হবে আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, প্রশংসামাত্রই আল্লাহর, যিনি সকল জাহানের প্রতিপালক। [সুরা ইউনুস: ১০]

সুরা ইউনুসের ৯ নং আয়াতে উল্লিখিত يَهْدِيهِمْ শব্দটিতে হিদায়তের প্রচলিত অর্থ হলো পথ দেখানো। তবে হিদায়ত শব্দটি কখনো কখনো মনজিলে মকসুদে পৌঁছে দেওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনে মুফতি মুহাম্মাদ শফি রাহ. বলেন, আয়াতে হিদায়ত দ্বারা দ্বিতীয় অর্থ বোঝানো হয়েছে। এখানে হিদায়ত মানে মনজিলে মকসুদ বা উদ্দীষ্ট লক্ষ্য তথা জান্নাত, হিদায়তে জান্নাত বা হিদায়তে মকসুদ। মুফতি মুহাম্মাদ শফি রাহ. লিখেছেন, আয়াতে কারিমায় জান্নাতিদের স্পেশাল তিনটি অবস্থা বা আচরণের কথা বলা হয়েছে。

জান্নাতিদের প্রথম অবস্থা

জান্নাতিদের প্রথম অবস্থা হবে তাদের একটি বাক্য। জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করে প্রথমেই যে বাক্যটি উচ্চারণ করবে সেটি হলো,

دَعْوَاهُمْ فِيهَا سُبْحْنَكَ اللَّهُمَّ)

দাওয়া دعوی মানে দাবি। তবে এখানে دعوی শব্দটি তার নির্ধারিত দাবি অর্থে ব্যবহৃত হয় নি। এখানে دعوی অর্থ দুআ। সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ হবে, জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের দুআ হবে 'সুবহানাকা'। অর্থাৎ তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে থাকবে।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে, দুআ মানে তো আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া। সুবহানাকাতে তো শুধুই আল্লাহর প্রশংসা। এখানে দুআ কোথায়? তা ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার পর আর দুআ করারই-বা কী দরকার?

জবাব হলো, জান্নাতিরা জান্নাতে তাঁদের আরাম-আয়েশের যাবতীয় বিষয় বিনা প্রার্থনায় পেতে থাকবে। কিছুই চাইতে হবে না। তবু তাদের জবান দিয়ে 'সুবহানাকা' বাক্য উচ্চারিত হবে; আর এটা হবে তাদের স্বভাবজাত। এই দুআ কিছু চাওয়া বা ইবাদত অর্থে নয়; বরং জান্নাতিরা সুবহানাকা বলবে সুবহানাকার স্বাদ অনুভব করতে।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ পাক বলেন, যে বান্দা দুনিয়াতে আল্লাহর গুণকীর্তনে নিয়োজিত থাকে, এমনকি নিজের প্রয়োজনীয় প্রার্থনা করার কথাও মনে থাকে না, আল্লাহ বলেন আমি আমার সেই বান্দাকে প্রার্থনাকারী অপেক্ষা উত্তম বস্তু দান করব। বিনা প্রার্থনায় তার যাবতীয় কাজ পূর্ণ করে দেব। এই যদি হয় দুনিয়ায় থাকা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অবস্থা, তাহলে জান্নাতিদের অবস্থা কেমন হবে, সেটা তো চিন্তাই করা যায় না।

তাফসিরে রুহুল মাআনি ও তাফসিরে কুরতুবিতে ইমাম ইবনু জারির ও ইবনু মানজারের রেফারেন্সে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, জান্নাতিদের যখন কোনো কিছুর প্রয়োজন বা বাসনা হবে, তখন তারা বলবে, সুবহানাকাল্লাহুম্মা। সাথে সাথে ফেরেশতাগণ তাদের চাহিদাকৃত বস্তু সামনে এনে হাজির করবেন।

জান্নাতিদের দ্বিতীয় অবস্থা

মুফতি মুহাম্মাদ শফি রাহিমাহুল্লাহ তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনে জান্নাতিদের দ্বিতীয় অবস্থা তুলে ধরে বলেন,

تَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلَامٌ

প্রচলিত অর্থে সালামের মাধ্যমে কাউকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। আমরা যেমন বাড়িতে মেহমান এলে আমরা প্রথমে সালাম করি। সালামের মাধ্যমে মেহমানকে স্বাগত জানাই।

ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অথবা ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে জান্নাতিদের সালামের মাধ্যমে জান্নাতে অভ্যর্থনা জানানো হবে।

এই সালাম স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেও হতে পারে, আবার ফেরেশতাদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। আবার জান্নাতিরা একে অন্যকেও সালামের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানাতে পারে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারার দলিল, সুরা ইয়াসিনের এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿سَلَمٌ قَوْلًا مِّنْ رَّبِّ رَّحِيمٍ﴾

মহামহিম আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম জানানো হবে। [সুরা ইয়াসিন: ৫৮]

আবার ফেরেশতাদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। যেমন সুরা রা'দ-এর ২৩ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

﴿وَالْمَلَئِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِّنْ كُلِّ بَابٍ سَلَمٌ عَلَيْكُمْ﴾

ফেরেশতাগণ প্রতিটি দরজা দিয়ে 'সালামুন আলাইকুম' বলতে বলতে জান্নাতিদের কাছে আসতে থাকবেন। আর একে অপরকে সালাম জানানোর দলিল উল্লিখিত আয়াত।

জান্নাতিদের তৃতীয় অবস্থা

জান্নাতিদের তৃতীয় অবস্থা আয়াতের পরের অংশে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

﴿وَاخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ﴾

জান্নাতিদের সর্বশেষ দুআ হবে আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

মুফতি শফি রাহিমাহুল্লাহ ইমামুত তাসাওউফ হজরত শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, জান্নাতে পৌঁছার পর সাধারণ জান্নাতি মারিফতের এমন স্তর লাভ করবে, দুনিয়ার জীবনে উলামায়ে কেরামের যে স্তর হয়ে থাকে। আলেমগণ অবস্থান করবেন সেই স্তরে, দুনিয়ার জীবনে নবিগণের অবস্থান যেখানে ছিল। নবিগণ অবস্থান করবেন সেই স্তরে, দুনিয়ার জীবনে ইমামুল আম্বিয়া যে স্তরে ছিলেন। আর আমাদের নবি, নবিয়ে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত-তাসলিমের অবস্থান হবে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে।

আল্লামা মাহমুদ আলুসি বাগদাদি রাহ. বলেন, তিন আয়াতের ক্রমবিন্যাস দাঁড়ায় এমন-জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করে যখন বলবে, 'সুবহানাকাল্লাহুম্মা', তখন জবাবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের সালাম জানানো হবে। তখন তারা বলবে...।

জান্নাতিদের শেষ কথাটি দ্বারা আমরাও আমাদের কথা শেষ করতে চাই। সেদিন জান্নাতিদের শেষ কথা হবে, কুরআনের ভাষায়-

﴿وَاخِرُ دَعُونَهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ ﴾

দীর্ঘ একমাস কুরআন থেকে আলোচনা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ক্ষমা চাই। আমার কোনো কথায় কোনো ভাই মনে আঘাত পেয়ে থাকলে আপনাদের কাছেও ক্ষমা চাই। আল্লাহপাক আমাদের জীবনে বারবার রমজান ফিরিয়ে দিন। আমিন।

سُبْحَنَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَ سَلْمٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ

সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, লা ইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক। জিন্দেগি বাকি, তো মুলাকাত বাকি। ওয়াস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px