📄 চূড়ান্ত সফলতা
মুত্তাকিরা হাশরের মাঠে আল্লাহর বিশেষ মেহমান হবে। সারাটা রমজান আমরা মনের বিরুদ্ধে সাধনা করি। যেমন ইফতার করার পর কিছু সময় আরাম করতে, ঘুমাতে মনে চায়; কিন্তু আপনি মনের বিরুদ্ধে গিয়ে শুধু ইশার নামাজই পড়লেন না, দীর্ঘ তারাবির নামাজেও দাঁড়িয়ে গেলেন। তো এটা হলো মনের বিরুদ্ধাচারণ। এটা জান্নাতের কাজ।
মনের বিরুদ্ধ আরেকটা কাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য ঘুম থেকে ওঠা। রমজান ছাড়া কতজন তাহাজ্জুদের জন্য উঠেন? বরং রমজান ছাড়া অন্য মাসে এই সময়ের ঘুমটা খুব আরামের ঘুম হয়। কিন্তু এই আরামের ঘুমকে হারাম করে তাহাজ্জুদের জন্য জেগে ওঠা, এটাই জান্নাতের কাজ। রাসুল বলেন, حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ অর্থাৎ, মনে চায় না, তারপরও মনের বিরুদ্ধে গিয়ে এই ধরনের কাজ করা হলো জান্নাতের কাজ।
রমজানের সকল কাজই জান্নাতের কাজ। কারণ, প্রতিটির আলোচনা করলেই দেখবেন, সবগুলোই মনের বিরুদ্ধে। মন চায় খাদ্য গ্রহণ করতে কিন্তু খাই না। মন চায় পান করতে কিন্তু পান করি না। মন চায় ঘুমাতে কিন্তু ঘুমাই না। মন চায় আরাম করতে কিন্তু আরাম করি না। শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য এভাবে মনের বিরুদ্ধাচারণ করলাম।
এবার রমজান শেষে ঈদের দিন আল্লাহর বিরুদ্ধে নাফরমানির কাজ করব কীভাবে? এটা তো খেয়েদেয়ে বমি করার নামান্তর। ঈদের পর এমন কাজ কেন করব, যাতে গুনাহ হয়? এরকম গর্হিত কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। তাহলে এই তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর তৈরি জান্নাতের অধিকারী হবেন। আর এটাই হলো ঈদের শিক্ষা।
ঈদের আরেকটা শিক্ষা হলো, আমরা যে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহের মাঠে যাই, এই নামাজটা মাঠে পড়া সুন্নাত। অবশ্য বৃষ্টি থাকলে মসজিদে পড়া সুন্নাত। কারণ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েছেন।
ঈদের জামাত; এটা হলো হাশরের মাঠের একটা নমুনা। হাশরের ময়দানে মানুষ যখন জমায়েত হবে, তখন মানুষের অবস্থা বিভিন্ন রকমের হবে। কেউ কেঁদে কেঁদে আসবে, কেউ হেসে হেসে আসবে। যেমন আমরা অনেকেই মনের দুঃখে কেঁদে কেঁদে আসি যে, গত বছর আমার বাবা ঈদের জামাআতে ছিলেন, কিন্তু এ বছর নেই। এই কান্না দেখা যায় না কিন্তু অন্তর ভারাক্রান্ত। বন্ধুর কথা মনে করেও কেউ কাঁদে যে, গত বছর বন্ধুকে নিয়ে একসাথে ঈদ করলাম, কিন্তু এ বছর বন্ধু নেই।
আবার অনেকে হাসতে হাসতে ঈদগাহে এসেছেন। তার মনে কোনো কষ্ট নেই। ঠিক এরকম অবস্থা হবে হাশরের ময়দানে। সকল মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। একদল মুত্তাকি, আরেক দল মুত্তাকি নয়। যারা মুত্তাকি, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,
يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمٰنِ وَفُدًا
মুত্তাকিদেরকে হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে বিশেষ মেহমান হিশেবে পেশ করা হবে। যে যত বেশি সম্মানী হয়, তার মেহমানেরও তেমন সম্মান হয়ে থাকে। হাশরের ময়দানে যারা মুত্তাকি, যারা দীর্ঘ একমাস তাকওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছে, এই তাকওয়া নিয়ে যদি মরতে পারে, বমির মতো যদি উদ্দ্গীরণ না করে, তবে হাশরের ময়দানে আল্লাহর মেহমান হবে। আর এটা সাধারণ মেহমান নয়, বিশেষ মেহমান। যারা গুনাহগার, তাকওয়ার উপর থাকতে পারল না, তাদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
وَ نَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا
পিপাসার্থ অবস্থায় তাদেরকে টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন পিপাসা আরও বেড়ে যাবে। [সুরা মারইয়াম: ৮৬]
আল্লাহ আমাদের সকলকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। মূলত জাহান্নাম থেকে রক্ষার জন্যেই আল্লাহ তাআলা রমজান মাস দিয়েছেন। রমজান মাসে খাবার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহপাক খাবার বন্ধ রেখে তাকওয়ার এই প্রশিক্ষণ দিলেন কেন? খাবার গ্রহণ করলেই গুনাহের কাজ করার শক্তি মিলে। আর শয়তানেরও শক্তি জুগিয়ে দেয়। হাদিস শরিফে নবিজি বলেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدم
মানুষের শরীরের মধ্যে রক্তের সঞ্চালন যেভাবে হয়, রক্ত যেভাবে চলাচল করে, শয়তানকেও আল্লাহ এমন ক্ষমতা দিয়েছেন যে, সে-ও মানুষের রগে-রেশায় চলে। এত ক্ষমতা দিয়েছেন আল্লাহ। এই ক্ষমতাটা বেশি কাজে লাগে যখন রক্ত চলাচল বেশি হয়। খানাপিনা না থাকলে রক্ত চলাচল বেশি হবে না, তখন শয়তানের শয়তানির প্রভাবও কমে যায়। আর যখন খানাপিনা করে, তখন শরীরে শক্তি বৃদ্ধি পায়, রক্ত সঞ্চালন বেশি হয়, শয়তানও তার কু প্রভাব বেশি বিস্তার করতে পারে। তখন ব্যক্তি গুনাহ করতে উদ্যত হয়। এ জন্য আল্লাহ তাআলা পুরো একমাস হালাল খাদ্যকে হারাম করে শয়তানের চলাচল ও সঞ্চালনকে মোকাবিলা করার একটা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণটা শুধু একমাসের জন্য নয়; বরং এই একমাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরা বছর যেন পরিচালনা করতে পারি, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
আমরা সারা বছর নিজেকে পরিচালনা করব কীভাবে? রমজানের শিক্ষা তো ঈদের রাতেই বমির মতন উদ্দ্গীরণ করে ফেলি। এ থেকে হেফাজতের জন্য আলোচনার তাকরার করা হচ্ছে। একই আলোচনা বারবার করা হচ্ছে। সকলের কাছে করজোড়ে মিনতি, দয়া করে ঈদ নিয়ে কোনো তামাশা করবেন না। আমাদের ঈদ হলো ইবাদত। ঈদের দিন কোনো গুনাহের উৎসব হতে পারে না। যদি গুনাহের উৎসব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন, তবেই এটা স্বার্থক ঈদ।
لَيْسَ الْعِيدُ لِمَنْ لَبِسَ الْجَدِيدَ : إِنَّمَا الْعِيدُ لِمَنْ خَافَ الْوَعِيدَ
ভালো কাপড় পরিধান করার নাম ঈদ নয়, বরং ঈদ হলো আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করা। এটাই আসল ঈদ। لِبَاسُ التَّقْوَىٰ বা তাকওয়ার পোশাক পরিধান করা, এটাই আসল ঈদ। সুন্দর পোশাক পরিধান করে গুনাহ করলেন, এটা আসল ঈদ নয়। আসল ঈদ হলো তাকওয়ার পোশাক পরিধান করা। আসল ঈদ হলো গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করা। এ জন্য আমাদেরকে আসল ঈদের দিকেই যেতে হবে, নতুবা এই ঈদ আমাদের জন্য শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এই শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা দরকার। পরিবার পরিজনকেও রক্ষা করা দরকার। এরকম দরকারি কাজ যদি আমরা করতে পারি, তবে দুনিয়াতে যেভাবে একত্রে আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করছি, ঠিক সেভাবে আখিরাতেও আনন্দের সাথে আল্লাহর মেহমান হতে পারব।
وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا
যাদেরকে টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, আমরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন ভয়ংকর বিপদ থেকে রক্ষা করে ঈদের যে ফজিলত আছে, তা অর্জনের তাওফিক দিন।
আল্লাহ এ জন্য পথও বলে দিয়েছেন যে, মুসলমানের ইবাদত শেষ নয়, বরং মরণ পর্যন্ত মুসলমানকে ইবাদত চালিয়ে যেতে হবে। রমজানের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা চমৎকার অফার রয়েছে। অফারটি হলো কেউ যদি শাওয়াল মাসে ৬টি নফল রোজা রাখতে পারে, তবে তার আমলনামায় সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব লিখে দেওয়া হবে। সুবহানাল্লাহ। সারা বছর রোজা রাখলে যে সওয়াব, মাত্র ৬টা রোজা রাখলেই এই সওয়াবের একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। নবিজি বলেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِنًا مِنْ شَوَّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ
রোজা অবস্থায় তাকওয়া অর্জন হয়। আর তাকওয়া হলো শয়তানের বিরুদ্ধে একটি বুলেট। এ জন্য আমরা এই ৬টি রোজা রাখার চেষ্টা করব। এগুলো লাগাতারও রাখা যায়, আবার একটা একটা করেও রাখা যায়। এই সুযোগ দিয়েছেন আল্লাহ। অন্যান্য কাজা রোজা থাকলে এগুলো শাওয়ালের পরেও রাখতে পারবে; কিন্তু ৬ রোজার ফজিলত শাওয়ালের জন্যই নির্ধারিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই ফজিলত অর্জন করেই তবেই মৃত্যুবরণ করার তাওফিক দিন। আমিন।
সকল জিনিসেরই আসল বের হবার সাথে সাথেই নকল বের হয়ে যায়, ভালো জিনিস সৃষ্টি হলেই এর মধ্যে ভাইরাস ঢুকে যায়। সুতরাং, এ রকমের ভাইরাসমুক্ত ইবাদত যদি আমরা করতে পারি, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে একজন খাঁটি বান্দা হিসেবে দাঁড়াতে পারব। আর খাঁটি বান্দা হয়ে যেতে পারলেই জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে। আল্লাহ বলেন,
فَادْخُلِي فِي عِبْدِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
তোমরা আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও; আর আমার তৈরি জান্নাতে প্রবেশ করো। [সুরা ফাজর: ২৯-৩০]
হে আল্লাহ, আমাদেরকে এরকম সঠিক বান্দা না বানিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। আমিন।
বছরে দুটি ঈদ আসে আমাদের সামনে। একটি রমজানুল মোবারকের শেষে, অপরটি জিলহজের ১০ তারিখে। তবে এই ঈদ পেয়ে আমরা ঈদে আকবর বা বড় ঈদের কথা ভুলব না। যেদিন আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, ওটাই আসল ঈদ। যেদিন আপনাকে লক্ষ করে বলা হবে, أَدْخُلُوْهَا بِسَلْمٍ أُمِنِينَ 'নিরাপত্তার সাথে জান্নাতে প্রবেশ করো।' এটা হলো আসল ঈদ। এ জন্য নবিজি রমজানে ইফতারের সময় মানুষের কী আনন্দ হয়, এটা বর্ণনা করে বলেন,
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ
রোজাদারের আনন্দ দুটি : একটি ইফতারের সময়। কারণ, ইফতার আল্লাহর হুকুমে আমরা খাই, এখানে খাওয়ার আনন্দ। আল্লাহর হুকুম পালনের আনন্দ। ইফতার তো আল্লাহর হুকুম পালনের জন্যই করা হয়। ঠিক তেমনিভাবে ঈদের দিন আমরা কিছু না কিছু খাই। নবিজি ঈদের দিন বেজোড়সংখ্যক খেজুর খেতেন। এর মর্ম হলো, আল্লাহর হুকুম মানাই আসল আনন্দ। রোজাদারের দ্বিতীয় আনন্দ হলো, যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হবে। কাদের সাক্ষাৎ হবে? যারা আল্লাহর মেহমান হবে। কারা মেহমান হবে? যারা মুত্তাকি, পরহেজগার। আর বিশেষ মেহমান যারা হবে, আল্লাহর সাথেই তাদের সাক্ষাৎ হবে। রোজাদার রোজা রেখে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ মেহমান হবে। আর তখন বিশেষ মেহমান হিশেবে সাক্ষাৎলাভের আনন্দ উদযাপন করবে।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে আনন্দের সাথে তাঁর সাক্ষাতলাভের মাধ্যম হিশেবে কবুল করুন। আমিন。
📄 রেজায়ে মাওলা : দিদারে এলাহি
একদিন এই সুন্দর পৃথিবী থেমে যাবে। আমরা যারা এখানে বসে একমাস তাফসিরুল কুরআন শুনলাম, সবই একদিন থেমে যাব। সমস্ত পৃথিবীর সকল মানুষ একদিন শেষ হয়ে যাবে। সাঙ্গ হবে জীবনের খেলা। অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি জমাতে হবে সবাইকে। সেই জীবনে যে ব্যক্তি আল্লাহর পাকড়াও থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারবে, সে-ই হবে প্রকৃত কামিয়াব।
আমরা আল্লাহকে দেখিনি, না দেখে বিশ্বাস করেছি। আমরা আশা করে বসে আছি, একদিন আমরা আমাদের মাবুদকে দেখব। জান্নাতিদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে লিকায়ে মাওলা। অর্থাৎ আল্লাহর সাথে মুলাকাত। আল্লাহপাক তাঁর জান্নাতি বান্দাদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করবেন। সেদিন গোলাম তার মালিককে দেখবে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে দিদারে এলাহি নসিব করুন। আমিন।
আল্লাহর সাথে দেখা করতে চাইলে তথা দিদারে এলাহি দ্বারা জীবন ধন্য করতে হলে আমাদেরকে কী করতে হবে? করণীয়টা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَ لَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهَ احَدًا
যে তার রবের সাথে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন নেক আমল করে এবং আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না বানায়। [সুরা কাহফ : ১১০]
সহজ কথায়, আল্লাহর দিদার পাওয়ার শর্ত হচ্ছে শিরকমুক্ত ঈমান এবং রিয়ামুক্ত নেক আমল। ঈমান যদি শিরকমুক্ত না হয়, তাহলে সেই ঈমানের কোনো মূল্য নেই। একইভাবে আমল যদি একমাত্র আল্লাহর রেজামন্দির উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে সেই আমলও আল্লাহপাকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
এখন যারা এই দুই শর্ত মেনে জীবন পার করবে, মৃত্যুর পর তাদের অবস্থা কী হবে, সেই ব্যাখ্যা আমরা পাই কুরআনে কারিমের আরেক আয়াতে। সুরা ইউনুসের ৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِأَيْمَانِهِمْ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهُرُ فِي جَنَّتِ النَّعِيمِ
যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তাদেরকে তাদের ঈমানের মাধ্যমে তাদের পালনকর্তা হিদায়ত দান করবেন- এমন নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের প্রতি, যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত। [সুরা ইউনুস: ৯]
জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতিরা কী বলবে? সেখানে তাদের শেষ কথা কী হবে? সুরা ইউনুসের পরের আয়াত, অর্থাৎ ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
دَعُونَهُمْ فِيهَا سُبْحْنَكَ اللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلْمٌ وَاخِرُ دَعُونَهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ ﴾
জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতিরা বলবে, হে আল্লাহ! মহাপবিত্র আপনার সত্ত্বা। তাদের অভ্যর্থনা হবে সালামের মাধ্যমে, এবং সেখানে তাদের শেষ কথা হবে আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, প্রশংসামাত্রই আল্লাহর, যিনি সকল জাহানের প্রতিপালক। [সুরা ইউনুস: ১০]
সুরা ইউনুসের ৯ নং আয়াতে উল্লিখিত يَهْدِيهِمْ শব্দটিতে হিদায়তের প্রচলিত অর্থ হলো পথ দেখানো। তবে হিদায়ত শব্দটি কখনো কখনো মনজিলে মকসুদে পৌঁছে দেওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনে মুফতি মুহাম্মাদ শফি রাহ. বলেন, আয়াতে হিদায়ত দ্বারা দ্বিতীয় অর্থ বোঝানো হয়েছে। এখানে হিদায়ত মানে মনজিলে মকসুদ বা উদ্দীষ্ট লক্ষ্য তথা জান্নাত, হিদায়তে জান্নাত বা হিদায়তে মকসুদ। মুফতি মুহাম্মাদ শফি রাহ. লিখেছেন, আয়াতে কারিমায় জান্নাতিদের স্পেশাল তিনটি অবস্থা বা আচরণের কথা বলা হয়েছে。
জান্নাতিদের প্রথম অবস্থা
জান্নাতিদের প্রথম অবস্থা হবে তাদের একটি বাক্য। জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করে প্রথমেই যে বাক্যটি উচ্চারণ করবে সেটি হলো,
دَعْوَاهُمْ فِيهَا سُبْحْنَكَ اللَّهُمَّ)
দাওয়া دعوی মানে দাবি। তবে এখানে دعوی শব্দটি তার নির্ধারিত দাবি অর্থে ব্যবহৃত হয় নি। এখানে دعوی অর্থ দুআ। সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ হবে, জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের দুআ হবে 'সুবহানাকা'। অর্থাৎ তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে থাকবে।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে, দুআ মানে তো আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া। সুবহানাকাতে তো শুধুই আল্লাহর প্রশংসা। এখানে দুআ কোথায়? তা ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার পর আর দুআ করারই-বা কী দরকার?
জবাব হলো, জান্নাতিরা জান্নাতে তাঁদের আরাম-আয়েশের যাবতীয় বিষয় বিনা প্রার্থনায় পেতে থাকবে। কিছুই চাইতে হবে না। তবু তাদের জবান দিয়ে 'সুবহানাকা' বাক্য উচ্চারিত হবে; আর এটা হবে তাদের স্বভাবজাত। এই দুআ কিছু চাওয়া বা ইবাদত অর্থে নয়; বরং জান্নাতিরা সুবহানাকা বলবে সুবহানাকার স্বাদ অনুভব করতে।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ পাক বলেন, যে বান্দা দুনিয়াতে আল্লাহর গুণকীর্তনে নিয়োজিত থাকে, এমনকি নিজের প্রয়োজনীয় প্রার্থনা করার কথাও মনে থাকে না, আল্লাহ বলেন আমি আমার সেই বান্দাকে প্রার্থনাকারী অপেক্ষা উত্তম বস্তু দান করব। বিনা প্রার্থনায় তার যাবতীয় কাজ পূর্ণ করে দেব। এই যদি হয় দুনিয়ায় থাকা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অবস্থা, তাহলে জান্নাতিদের অবস্থা কেমন হবে, সেটা তো চিন্তাই করা যায় না।
তাফসিরে রুহুল মাআনি ও তাফসিরে কুরতুবিতে ইমাম ইবনু জারির ও ইবনু মানজারের রেফারেন্সে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, জান্নাতিদের যখন কোনো কিছুর প্রয়োজন বা বাসনা হবে, তখন তারা বলবে, সুবহানাকাল্লাহুম্মা। সাথে সাথে ফেরেশতাগণ তাদের চাহিদাকৃত বস্তু সামনে এনে হাজির করবেন।
জান্নাতিদের দ্বিতীয় অবস্থা
মুফতি মুহাম্মাদ শফি রাহিমাহুল্লাহ তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনে জান্নাতিদের দ্বিতীয় অবস্থা তুলে ধরে বলেন,
تَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلَامٌ
প্রচলিত অর্থে সালামের মাধ্যমে কাউকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। আমরা যেমন বাড়িতে মেহমান এলে আমরা প্রথমে সালাম করি। সালামের মাধ্যমে মেহমানকে স্বাগত জানাই।
ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অথবা ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে জান্নাতিদের সালামের মাধ্যমে জান্নাতে অভ্যর্থনা জানানো হবে।
এই সালাম স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেও হতে পারে, আবার ফেরেশতাদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। আবার জান্নাতিরা একে অন্যকেও সালামের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানাতে পারে।
আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারার দলিল, সুরা ইয়াসিনের এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿سَلَمٌ قَوْلًا مِّنْ رَّبِّ رَّحِيمٍ﴾
মহামহিম আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম জানানো হবে। [সুরা ইয়াসিন: ৫৮]
আবার ফেরেশতাদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। যেমন সুরা রা'দ-এর ২৩ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
﴿وَالْمَلَئِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِّنْ كُلِّ بَابٍ سَلَمٌ عَلَيْكُمْ﴾
ফেরেশতাগণ প্রতিটি দরজা দিয়ে 'সালামুন আলাইকুম' বলতে বলতে জান্নাতিদের কাছে আসতে থাকবেন। আর একে অপরকে সালাম জানানোর দলিল উল্লিখিত আয়াত।
জান্নাতিদের তৃতীয় অবস্থা
জান্নাতিদের তৃতীয় অবস্থা আয়াতের পরের অংশে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
﴿وَاخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ﴾
জান্নাতিদের সর্বশেষ দুআ হবে আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
মুফতি শফি রাহিমাহুল্লাহ ইমামুত তাসাওউফ হজরত শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, জান্নাতে পৌঁছার পর সাধারণ জান্নাতি মারিফতের এমন স্তর লাভ করবে, দুনিয়ার জীবনে উলামায়ে কেরামের যে স্তর হয়ে থাকে। আলেমগণ অবস্থান করবেন সেই স্তরে, দুনিয়ার জীবনে নবিগণের অবস্থান যেখানে ছিল। নবিগণ অবস্থান করবেন সেই স্তরে, দুনিয়ার জীবনে ইমামুল আম্বিয়া যে স্তরে ছিলেন। আর আমাদের নবি, নবিয়ে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত-তাসলিমের অবস্থান হবে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে।
আল্লামা মাহমুদ আলুসি বাগদাদি রাহ. বলেন, তিন আয়াতের ক্রমবিন্যাস দাঁড়ায় এমন-জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করে যখন বলবে, 'সুবহানাকাল্লাহুম্মা', তখন জবাবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের সালাম জানানো হবে। তখন তারা বলবে...।
জান্নাতিদের শেষ কথাটি দ্বারা আমরাও আমাদের কথা শেষ করতে চাই। সেদিন জান্নাতিদের শেষ কথা হবে, কুরআনের ভাষায়-
﴿وَاخِرُ دَعُونَهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ ﴾
দীর্ঘ একমাস কুরআন থেকে আলোচনা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ক্ষমা চাই। আমার কোনো কথায় কোনো ভাই মনে আঘাত পেয়ে থাকলে আপনাদের কাছেও ক্ষমা চাই। আল্লাহপাক আমাদের জীবনে বারবার রমজান ফিরিয়ে দিন। আমিন।
سُبْحَنَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَ سَلْمٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ
সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, লা ইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক। জিন্দেগি বাকি, তো মুলাকাত বাকি। ওয়াস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।