📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 রোজার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ কেন দেবেন

📄 রোজার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ কেন দেবেন


আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে রমজানের রোজাগুলো রাখার সুযোগ দিয়েছেন এবং রমজানের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা রমজানের শেষ পর্যায়ে আছি। এখন আমাদের করণীয় হলো, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যে, তিনি তাওফিক দিয়েছেন বলেই আমরা রোজাগুলো রাখতে পেরেছি। দ্বিতীয় করণীয় হলো, গত হওয়া রোজাগুলো নিয়ে অনুশোচনা করা যে, আমাদের রোজা, তারাওয়িহ ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আমলগুলো কবুল হয়েছে কি-না, সেটার জন্য নিজেকে প্রশ্ন করা এবং এটা স্বীকার করা যে, ‘হে আল্লাহ, আপনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছিলেন, সেভাবে করতে পারিনি। যেভাবে আপনাকে জানার কথা ছিল, সেভাবে জানতে পারিনি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এসব ভাঙাচোরা ইবাদতগুলো কবুল করে নিন এবং আমাদের ক্ষমা করে দিন।’ আর বেশি বেশি ইসতিগফার পাঠ করতে থাকা।

এখানে তাহাজ্জুদ সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা দরকার। তাহাজ্জুদ অত্যন্ত পুণ্যময় একটি ইবাদত। যারা আল্লাহওয়ালা, তাহাজ্জুদগোজার, তারা সারা রাত ইবাদতের মধ্যে কাটিয়ে দেন। এরপর শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। পবিত্র কুরআনে তাদের গুণাবলি আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত। [সুরা জারিয়াত: ১৮] অর্থাৎ, এরা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। কেঁদেকেটে বলে, ‘ওগো আল্লাহ, আমি যে ইবাদত করলাম, জানি না কবুল হয়েছে কি-না। আর আপনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন, সেভাবে করতে পারিনি। হে আল্লাহ, নিজ দয়াগুণে আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

এ জন্য বেশি বেশি ইসতিগফার করতে হবে। নিজের আমলের পর্যালোচনা করতে হবে। কেন পর্যালোচনা করব? কারণ, রমজানে দুটি বিশেষ আমল রয়েছে: একটি হলো রোজা, অপরটি হলো তারাবিহ। এখন আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর রোজা কেন ফরজ করলেন এবং নবিজি আল্লাহর নির্দেশে তারাবির নামাজকে সুন্নাত হিশেবে কেন সাব্যস্ত করলেন? এটা জানতে হবে।

রোজা কেন রাখতে হবে—এর বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘যাতে তোমরা মুত্তাকি হয়ে জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারো।’ আর মুত্তাকিদের জন্যই আল্লাহ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন। যে আল্লাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে, সে অবশ্যই মুত্তাকি। এ জন্য আল্লাহর ফরজ বিধান রোজা রেখে মুত্তাকি হয়ে নিজেকে জান্নাতের উপযোগী করার জন্য আল্লাহ আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন। সুবহানাল্লাহ। এবার আমরা لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর অর্থ সম্পর্কে আলোচনা করব।

لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর অর্থ হলো, যাতে তোমরা বাঁচতে পারো। তবে কি থেকে বাঁচতে পারো, এটার উল্লেখ না থাকলেও এর ব্যাখ্যা হলো, তোমরা দুনিয়ায় যদি একটা জিনিস থেকে বাঁচো, তবে পরকালে আল্লাহও তোমাদের একটা জিনিস থেকে রক্ষা করবেন। এ জন্য মুফাসসিরগণ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর তাফসিরে লিখেছেন, الْعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ من المعاصی অর্থাৎ, দুনিয়াতে যদি তোমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারো, তবে আল্লাহ পরকালে তোমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। সুতরাং বোঝা গেল, রোজা ফরজ করা হয়েছে মানুষকে জান্নাতের উপযুক্ত বানাতে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন,

فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ

অর্থাৎ, যাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, তারাই মহা সফল। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৫]

হাদিস শরিফে রাসুলে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত তাসলিম বলেছেন,

من صام يوما في سبيل الله باعد الله وجهه عن النار سبعين خريفا

যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি নফল রোজা রাখে, তবে আল্লাহ তাআলা সেই নফল রোজাদারকে জাহান্নামের রাস্তা থেকে ৭০ বছরের দূরত্বে রাখেন। সুবহানাল্লাহ। তো নফল রোজার যদি এত ফজিলত হয়, তাহলে ফরজ রোজার ফজিলত কেমন হবে, ভেবে দেখা দরকার।

অন্য এক হাদিসে আছে, রাসুল বলেন,

من صام يوما في سبيل الله في غير رمضان بعد من النار مائة عام

রোজাদার ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন জাহান্নাম থেকে ১০০ বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন। উপর্যুক্ত দুটি হাদিসের মর্ম হলো, আল্লাহ রোজাদারকে জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে রাখবেন। অর্থাৎ, জাহান্নামকে সরিয়ে দেবেন। এ জন্য হাদিসে আছে, রাসুল একটি দুআ করতেন,

اللهم باعد بيني وبين خطاياي كما باعدت بين المشرق والمغرب হে আল্লাহ, আমার ও গুনাহের মধ্যখানে এমন নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও, যেভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে রেখেছ। আমাদেরকেও এই দুআ বেশি বেশি করে করতে হবে। যে নবির কোনো গুনাহ নাই, সেই নবি যদি এভাবে জাহান্নাম থেকে পানাহ চান, তাহলে আমাদের মতো গুনাহগারদের কতোবেশি পানাহ চাওয়া দরকার।

কীভাবে গুনাহ থেকে বাঁচা যায়

আল্লাহ তাআলা রমজানের রোজা ফরজ করেছেন, যাতে আমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারি। এবার দেখা যাক, গুনাহ থেকে কীভাবে বেঁচে থাকব। আমরা রমজানে দিনের বেলা কিছুই খাই না, তা যত হালাল এবং উন্নতই হোক না কেন। এমন কি জমজমের পানি অথবা আজওয়া খেজুর হলেও।

এই যে খাই না, এটা কার আদেশে? অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশে।

রমজানে দিনের বেলা কিছু খেতে আল্লাহ নিষেধ দিয়েছেন, তাই আমরা খাই না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর এই আদেশ পালন করল, রমজানের পুরো একমাস এই ট্রেনিং নিল, সে এটা করেছে একমাত্র আল্লাহর জন্যই। ফলে এমন ব্যক্তির অন্তরে যদি রোজার রুহ ঢুকে যায়, তাহলে সে কখনো গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে পারে না। আর আল্লাহর নিষেধ থেকে বেঁচে থাকাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার নামই তাকওয়া। এটাই হলো রোজার মূল ম্যাসেজ এবং রোজা ফরজ হওয়ার কারণ।

বান্দা আল্লাহর হুকুমে হালাল খাবার ত্যাগ করেছে, এ জন্য আল্লাহ তাআলা নিজেই রোজাদারের রোজার বদলা দেবেন। আপনাদের স্মরণ থাকার কথা, রমজানের শুরুর দিকে আমরা আলোচনা করে এসেছি রোজার প্রতিদান আল্লাহপাক স্বয়ং দেবেন। এব্যাপারে একটি হাদিসও উল্লেখ করেছিলাম, হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, الصوم ﻟﻲ وَأَنَا أَجْزِي ﺑﻪ ‘রোজা হলো আমার জন্য, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো।’ সুবহানাল্লাহ!

রোজা আল্লাহর জন্য, নামাজ কার

রোজা একমাত্র আল্লাহর জন্য। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে নামাজ কার জন্য? আমরা জানি, নামাজও আল্লাহর জন্য; কিন্তু আল্লাহ তাআলা রোজার ব্যাপারে যেভাবে ‘আমার জন্য’ বলেছেন, নামাজের ব্যাপারে কিন্তু এভাবে বলেননি। অথচ কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿ قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ ﴾

বলো, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব। [সুরা আনআম : ১৬২]

আমার নামাজ, আমার রোজা, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছুই শুধু আল্লাহর জন্য। কিন্তু এরপরেও রোজার ব্যাপারে আলাদাভাবে কেন ‘রোজা আমার জন্য’ বললেন? এর উত্তর হলো, সব ইবাদতই আমরা আল্লাহর জন্য করি। নামাজ পড়ি আল্লাহর জন্য। এখন যদি আমার এই নামাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য হয়, তাহলে তো নামাজই হবে না। কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿ أَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِى ﴾

আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো। [সুরা তাহা : ১৪]

অর্থাৎ, হে বান্দা, আমাকে স্মরণ করার জন্যই তুমি নামাজ আদায় করো, অন্য কাউকে দেখানোর জন্য নয়। এমনিভাবে হজও আমরা আল্লাহর জন্যই করি। কুরআনে আছে,

﴿ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَ مَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعُلَمِينَ ﴾

আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর যে কেউ কুফরি করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন। [সুরা আলে ইমরান: ৯৭]

এরপরেও রোজার ব্যাপারে আলাদাভাবে কেন ‘রোজা আমার জন্য’ বললেন? এর রহস্য উদ্‌ঘাটনে হাদিসবেত্তাগণ বলেন, আমরা যে নামাজ পড়ি, এটা নিশ্চিত আল্লাহর জন্য ইবাদত। কেউ যখন নামাজ পড়ে, তখন অন্যজন তার এই নামাজ দেখতে পায়। আর ফরজ নামাজ সকলে একসাথে মিলে জামাআতে আদায় করে। ফলে একে অন্যকে দেখা হয়ে যায়। এ জন্য নামাজ কোনো গোপন আমল নয়। মানুষ আপনাকে দেখে সহজে বুজে নেওয়া যায় যে, আপনি নামাজি। সুতরাং নামাজ যদিও একমাত্র আল্লাহর জন্য, তবে মানুষের চোখেও আপনি নামাজি হয়ে যান।

এমনিভাবে জাকাত একটি ফরজ ইবাদত এবং এটা প্রকাশ্যে আদায় করা সুন্নাত। যেভাবে আমরা প্রকাশ্যে জামাআতে নামাজ পড়ি, ঠিক সেভাবে জাকাতও একটি প্রকাশ্য আমল। জাকাত আমরা প্রকাশ্যে দেব। এতে অন্যরা উৎসাহিত হবে। তবে এমন যেন না হয় যে, জাকাতের নাম দিয়ে কিছু কাপড় দিলেন এবং জাকাত গ্রহীতাদের লম্বা সারি দাঁড় করালেন। বরং জাকাতদাতা তার সব সম্পদের হিসাব করে প্রকৃত হকদারদের মধ্যে জাকাত পৌঁছে দেবে।

তবে জাকাত দেওয়ার সময় 'এটা জাকাতের মাল' এভাবে বলার দরকার নেই। গিফট, হাদিয়া বা উপঢৌকন ইত্যাদি শব্দেও বলা যেতে পারে। এটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি বিষয়। কেউ যদি জাকাতের নিয়ত ছাড়াই অনেক সম্পদ বিলিয়ে দেয়, তবে তার জাকাত আদায় হবে না। এটা সদকা হয়ে যাবে। এ ছাড়া যে জাকাত গ্রহণের হকদার নয়, তাকে জাকাত দিলে আদায় হবে না। আপনার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যদি কেউ কেউ হকদার থাকেন, তবে তাকেই জাকাত দেন। কিন্তু আপনার পিতা, দাদা এভাবে উপরের স্তরের কাউকে দিতে পারবেন না। এমনিভাবে আপনার নিচের স্তর তথা ছেলেমেয়েকে জাকাত দিতে পারবেন না।

আপনি যে জাকাত দিলেন, এটা আর কেউ না জানলেও আপনি এবং যে জাকাত গ্রহণ করছে, সে তো জানে। এ জন্য জাকাত প্রকাশ্যে দেওয়া সুন্নত। এতে অন্যরা উৎসাহিত হয়। তা ছাড়া মানুষের সমালোচনা থেকেও মুক্ত থাকা যায়। মানুষ যাতে আপনার ব্যাপারে এই ধারণা করতে না পারে যে, এই ব্যক্তি জাকাত দেওয়ার উপযুক্ত হয়েও জাকাত দিচ্ছে না। সুতরাং নামাজের মতো জাকাতের ইবাদতও আল্লাহ জানেন এবং মানুষও জানে।

এবার আসুন হজের আলোচনায়। হজ কার জন্য করা হয়? অবশ্যই আল্লাহর জন্য। এ ছাড়া হজ প্রকাশ্যে আদায়যোগ্য ইবাদত। এটা গোপন করার কিছু নেই। হজ আমরা আদায় করি আল্লাহর জন্য। তাঁকে খুশি করার জন্য। তবে হজে আমরা ইহরামের যে পোশাক পরি, এটা কোন ধরণের পোশাক? সাদা না কালো? অবশ্যই সাদা। আর এই পোশাকের সাথে কাফনের কাপড়ের একটা সাদৃশ্য রয়েছে। কাফনের কাপড়ও সাদা, ইহরামের কাপড়ও সাদা। এই যে আমরা হজের জন্য নির্দিষ্ট একটা কাপড় পরিধান করি, এর মাধ্যমে অন্যরা বুঝে নেয় যে, আমরা হজ করছি। সুতরাং বোঝা গেল, নামাজ ও জাকাতের মতো হজ ইবাদতও মানুষ জেনে যায়। ফলে মানুষ আমাদেরকে 'নামাজি', 'জাকাতদাতা' ও 'হজ আদায়কারী' হিশেবে পরিচয় করে ফেলে।

কিন্তু রোজা হলো ভিন্ন। যে রোজা রাখে, তার ব্যাপারে এটা জানার সুযোগ নেই। এখন কেউ যদি সাহরি খায়, ইফতারও করে এবং মধ্যখানে কিছু খেয়ে ফেলে, তাহলে মানুষ সেটা বুঝতে পারবে না। আর যারা আল্লাহর বিধান মেনে দিনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু খায় না, এটা তো একমাত্র আল্লাহর ভয়ের কারণে। এ জন্যই আল্লাহ বলেছেন, রোজা হলো আমার জন্য, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো। সুবহানাল্লাহ।

ইহসান এবং নৈকট্য

এভাবে অন্তরে একমাত্র আল্লাহর ভয় রেখে ইবাদত করার নাম ইহসান। আর ইহসান হলো এমন এক গুণ, যে গুণের মাধ্যমে ইবাদত সুন্দর হয়। এখন ইবাদত যদি সুন্দর না হয়, তাহলে এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে না। দুনিয়াতে যেমন আমরা সবসময় ভালো, উন্নত ও মানসম্পন্ন জিনিস খুঁজি, ভালো কোয়ালিটির জিনিস না পেলে সেটা ক্রয় করি না, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহও ইবাদত সুন্দর না হলে সেটা গ্রহণ করেন না। এ জন্য আমরা আমাদের ইবাদত সুন্দর করার চেষ্টা করব। আর এটাই হলো ইহসান।

এই ইহসানের দিকেই ইঙ্গিত করে একবার রাসুলে কারিম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ما الإحسان يا رسول الله؟ ‘আল্লাহর রাসুল, ইহসানের মর্ম কি?' তখন রাসুল জবাবে বললেন, أن تعبد الله كأنك تراه ، فإن لم تكن تراه فإنه يراك ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। তুমি যদি এভাবে ইবাদত করতে না পারো, তাহলে অন্তত এভাবে করো যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'

এমনভাবে ইবাদত করার নাম হলো ইহসান। আর আমরা যে আল্লাহকে না দেখে ইবাদত করি, এ জন্য আল্লাহ তাআলা হাশরের ময়দানে তাঁর দিদার লাভ করিয়ে আমাদের কলিজা ঠান্ডা করে দেবেন। সুবহানাল্লাহ। অর্থাৎ, জান্নাতি যারা, তারা আল্লাহকে দেখতে পাবে।

দিদারে এলাহি

হাদিস শরিফে নবিজি ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন বান্দা আল্লাহকে এত সহজ ও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবে, যেভাবে দুনিয়াতে চন্দ্রকে দেখেছে। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে তাঁর দর্শন লাভ করিয়ে আমাদের কলিজা ঠান্ডা করেন। আমিন।

এই দুনিয়াতে চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। তবে অন্তরচক্ষু দিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখা যেতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ

(বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]

অর্থাৎ, পরকালে চোখের পাওয়ার ভিন্ন এবং অনেক শক্তিশালী হবে। তো আমরা আলোচনা করছিলাম ইহসান সম্পর্কে। ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, এটা না হলে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন, এমনভাবে ইবাদত করো। আর আল্লাহ যে আমাদের দেখতেছেন, এটা আমরা সকলেই বিশ্বাস করি। যদি বিশ্বাস না থাকত, রোজা রাখার দরকার ছিল না।

এখন আপনি রমজানে দিনের বেলা প্রকাশ্যে অথবা গোপনেও কিছু ভক্ষণ করেন না, পান করেন না, এটা কার ভয়ে করেন না? অবশ্যই আল্লাহর ভয়ে। এই যে ভয়, এটা হলো ইহসানের গুণ। আর বান্দার ইবাদতে যখন এরকম গুণ তৈরি হয়, তখন আল্লাহর কাছে তার এই ইবাদতের মর্যাদাও বেড়ে যায়। এ জন্য রমজানে একটা নফল ইবাদত করলে একটা ফরজ ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়, আর একটা ফরজ আদায় করলে ৭০টি ফরজের সাওয়াব পাওয়া যায়। এর কারণ হলো, তখন বান্দার মধ্যে ইহসান ও ইখলাসের গুণ একত্রিত হয়ে যায়। নবিজি বলেন, من تقرب بخصلة من الخير، كان كمن أدى فريضة فيما سواه

যে ব্যক্তি রমজানে আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য একটি নফল আদায় করবে, সে যেন রমজান ছাড়া অন্যমাসে একটি ফরজ আদায় করল।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্দরভাবে ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 সত্যিকার সফল কারা

📄 সত্যিকার সফল কারা


রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানুল কারিম আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছে। আরও একবছর বেঁচে থাকলে আবারও রমজান পাব, কিন্তু জীবনের তো কোনো গ্যারান্টি নাই। এবারের এই রমজান আমাদের কারও জন্য জীবনের শেষ রমজান কিনা- কেউ জানি না। আল্লাহপাক আমাদের জীবনে বারবার রমজান শরিফ ফিরিয়ে দিন। সকলে বলুন আমিন।

মুহতারাম হাজিরিন।

ওহির দরজা খোলা না বন্ধ? অবশ্যই বন্ধ। আমাদের নবি শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের মাধ্যমে ওহি অবতরণের ধারা কিয়ামত পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন যদি কেউ বলে, 'আমার কাছে ওহি বা প্রত্যাদেশ এসেছে' তাহলে সে মিথ্যুক, ভন্ড। এদের হত্যা করা ওয়াজিব। তবে এই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। সরকার এই আইন বাস্তবায়ন করবে।

যেহেতু নবি ছাড়া কারও উপর ওহি আসে না, আর নবুওয়াতের দরজাও চিরতরের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং এখন কেউ এমন দাবি করলে সে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার এবং ভন্ড। নবিজির ইনতিকালের পর থেকে এ পর্যন্ত এরকম বেশ কয়েকজন ভন্ড ও মিথ্যা নবির আবির্ভাব হয়েছিল। উম্মাহ তাদের মিথ্যুক বলে প্রত্যাখান করেছে।

ওহির দরজা যে বন্ধ, এটা বিশ্বাস করতে হবে। এই বিশ্বাস করার নামই ঈমান। ওহির দরজা যদি খোলা থাকত, তাহলে আল্লাহ তাআলা শুধু কুরআনের আয়াতে وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ বলতেন না; বরং وَمَا أُنْزِلَ مِنْ بَعْدِكَ ও বলতেন। এখন কেউ যদি এটা বিশ্বাস না করে, তাহলে সে দাজ্জাল। কারণ, আল্লাহ বা'দিকা না বলে শুধু কাবলিকা বলেছেন। অর্থাৎ এই ওহি, যা আপনার পূর্ববর্তী অনেক নবি-রাসুলের উপর নাজিল করা হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, ওহির দরজা একেবারে বন্ধ। আর যারা মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস লালন করে যে, ওহির দরজা বন্ধ, তারা হলো মুত্তাকি।

বিশ্বাসের স্তর

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন, ওয়াবিল আখিরাতি হুম ইউকিনুন, আর যারা পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে।

আয়াতে গুরুত্বের সঙ্গে কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে। আর বিশ্বাসের স্থর হচ্ছে তিনটি। বিষয়টি আগেও আলোচনা করা হয়েছে। এপর্যায়ে আবারও স্মরণ করিয়ে দিই। কথাগুলো বারবার আলোচনা করলে আপনাদের মুখস্থ হয়ে যাবে। এগুলো সবার মুখস্থ রাখা দরকার:

১. ইলমুল ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে বিশ্বাস করা।
২. আইনুল ইয়াকিন বা দেখার মাধ্যমে বিশ্বাস করা।
৩. হাক্কুল ইয়াকিন বা বাস্তবতার ভিত্তিতে বিশ্বাস করা。

উক্ত তিন প্রকার ইয়াকিনের উদাহরণ হলো, যেমন আমরা কুরআন সুন্নাহের আলোকে অকাট্যভাবে জানতে পেরেছি যে, জান্নাত ও জাহান্নাম এ দুটি বস্তু বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহপাক তার নেককার বান্দাদের জন্য প্রতিদান স্বরূপ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং বদকার বান্দাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছেন। কুরআন ও সুন্নার সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমে মুসলমানদের অন্তরে উক্ত বিষয়গুলোর সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহাতীতভাবে যে বিশ্বাস অর্জিত হয়, তাকে ইলমুল ইয়াকিন বলা হয়।

হাশরের ময়দানে যখন জান্নাতকে মুত্তাকিদের নিকটবর্তী করা হবে, এবং পথভ্রষ্ট পাপীদের জন্য যখন জাহান্নামকে প্রকাশিত করা হবে, প্রত্যেকেই যখন স্বচক্ষে দেখতে পাবে। তখন জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে তাদের যে বিশ্বাস অর্জিত হবে তা হলো আইনুল ইয়াকিন।

অতঃপর জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং জাহান্নামিরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন জান্নাতিদের জান্নাত সম্পর্কে এবং জাহান্নামিদের জাহান্নাম সম্পর্কে যে বিশ্বাস অর্জিত হবে, সেটি হলো হাক্কুল ইয়াকিন।

এই তিন প্রকারের ইয়াকিনের ব্যাখ্যা কুরআনে কারিমে উল্লেখ আছে। সুরা তাকাসুরে ইলমুল ইয়াকিন ও আইনুল ইয়াকিনের কথা বলা হয়েছে, আপনাদের স্মরণ থাকার কথা। আল্লাহ বলেন,

كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ لَتَرَوُنَ الْجَحِيمَ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ

কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে। অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। আবার বলি, তোমরা তা অবশ্য অবশ্যই দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে।। সুরা তাকাসুর: ৫-৭]

সুরা ওয়াকিয়ার ৯৫ নং আয়াতে হাক্কুল ইয়াকিনের উল্লেখ পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, إِنَّ هَذَا لَهُوَ حَقُّ الْيَقِينِ

নিশ্চয় এটি অবধারিত সত্য। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯৫]

জাহান্নামিরা যখন জাহান্নামে যাবে এবং জান্নাতিরা জান্নাতে যাবে, তখন কী অবস্থা হবে, সেটা সহজেই অনুমেয়। আমরা এখানে শুধু জান্নাতিদের জান্নাতে প্রবেশের পর তাদের অবস্থা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব। কেননা, জান্নাতে প্রবেশ করতে পারাই দুনিয়া-আখিরাতের সফলতা। হে আল্লাহ, আমাদেরকে জান্নাতের অধিবাসী হিশেবে কবুল করে নাও। আমিন।

জান্নাতের স্বরূপ

জান্নাত আরবি শব্দ। অর্থ হলো উদ্যান। পবিত্র কুরআনে জান্নাত বোঝাতে মোট আটটি শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে: ১. জান্নাতুল ফিরদাউস। ২. জান্নাতুন নায়িম। ৩. জান্নাতুল মাওয়া। ৪. জান্নাতুল আদন। ৫. দারুস সালাম। ৬. দারুল খুলদ। ৭. দারুল মাকাম। ৮. ইল্লিয়িন।

আগেই বলা হয়েছে, জান্নাত হলো মূলত একটি উদ্যান। তবে কুরআন-হাদিস অনুযায়ী জান্নাত একটি না অসংখ্য, তা পরিষ্কার নয়। কুরআনে একাধিক জায়গায় এমনও বলা হয়েছে যে, 'জান্নাতিদের প্রত্যেককে একটি করে উদ্যানের মালিক করা হবে। আর প্রতিটি উদ্যানে থাকবে এক বা একাধিক প্রাসাদ।' অর্থাৎ, অসংখ্য উদ্যান আছে জান্নাতে এমনও হতে পারে। জান্নাতে প্রাপ্য উদ্যানের সংখ্যা নির্ধারিত করা না থাকলেও বলা হয়েছে, 'প্রাসাদের সংখ্যা নির্ধারিত হবে জান্নাতিদের সাওয়াব বা নেকি অনুযায়ী।'

শাদ্দাদের বেহেশত

শাদ্দাদ ছিল একজন জালিম শাসক। সে ছিল খোদাদ্রোহি। বিশাল ধন-সম্পদের মালিক ছিল। সমসাময়িক নবি তাকে ঈমানের দাওয়াত দেওয়ার পর সে বলল, ঈমান আনলে কী মিলবে? নবি বললেন, আল্লাহর উপর ঈমান আনলে মৃত্যুর পর আল্লাহপাক জান্নাত দান করবেন। সে বলল, জান্নাতে কী আছে? নবি জান্নাতের একটা বর্ণনা দেওয়ার পর সে বলল, এমন জান্নাত তো আমি দুনিয়াতেই বানাতে পারি।

শুরু হলো জান্নাত বানানোর কাজ। তিনশ বছরে তৈরি হলো শাদ্দাদের বেহেশত। জান্নাত তৈরি হয়ে যাবার পর সে তার সেনা-সামন্ত নিয়ে গেল জান্নাত দেখতে। জান্নাতের গেইটে যেতেই মালাকুল মাউত সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানেই তার মৃত্যু হলো।

শাদ্দাদের বেহেশত নিয়ে এমন গল্প বাজারে আছে। আপনারাও নিশ্চই শুনেছেন। কেউ কেউ তো এভাবেও বলে থাকে যে, আসলে আল্লাহর জান্নাত ছিল সাতটি। শাদ্দাদের জান্নাত ধ্বংস করে আল্লাহপাক নিয়ে যান। তারপর আল্লাহর জান্নাতের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটি। নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক।

শাদ্দাদের বেহেশত বানানোর এই কাহিনি একেবারেই কাল্পনিক ও অবাস্তব। ইমাম ইবনু কাসির, আল্লামা ইবনু খালদুনসহ অনেকেই এটিকে ইসরাইলি বর্ণনা হিশাবে সাব্যস্থ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এর কোনো দালিলিক ভিত্তি নাই। (তাফসির ইবনু কাসির, ৪/৮০২-৮০৩, মুকাদ্দামাহ ইবনু খালদুন ১/৯৭।

জান্নাতের নাজারা

জান্নাতের মহলগুলো হবে জাঁকজমকপূর্ণ। শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সুখময় জীবন লাভ করবেন জান্নাতিরা। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে। তবে হাদিস অনুযায়ী এসব মহল বা প্রাসাদের ক্ষেত্রেও শ্রেণিভেদ থাকবে। যেমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতি, আর তাঁরা নবি-রাসুলগণ। দ্বিতীয় স্তরে থাকবেন মুত্তাকিগণ।

জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে, এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿فَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ﴾

অতএব সে যদি (আল্লাহর) নৈকট্য প্রাপ্তদের একজন হয়। [সুরা ওয়াকিয়া : ৮৮]

আচ্ছা বলুন তো, আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী কীভাবে হওয়া যাবে? বা আল্লাহর নৈকট্য কীভাবে অর্জিত হবে? গুনাহ করলে না গুনাহ ছাড়লে? অবশ্যই গুনাহ ছাড়লে। আর গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা বা ছাড়ার নামই হচ্ছে তাকওয়া। এ জন্য তাকওয়ার প্রথম শর্ত হলো গুনাহমুক্ত জীবন গঠন করা।

সুতরাং বোঝা গেল, যারা গুনাহ পরিত্যাগ করেন, তারা মুত্তাকি; আর মুত্তাকিগণই আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকেন। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে মুত্তাকিরা যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে বিচরণ করবে, জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা কী স্বাদ অনুভব করবে, বুঝতে পারছেন?

পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿فَرَوْحٌ وَرَيْحَانٌ وَ جَنَّتُ نَعِيمٍ﴾

তবে তার জন্য থাকবে বিশ্রাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখময় জান্নাত। [সুরা ওয়াকিয়া : ৮৯]

অর্থাৎ, জান্নাতে শুধু আনন্দ আর আনন্দ; সেখানে দুঃখ-বিষাদ বলতে কিছুই নেই। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿وَ أَمَّا إِنْ كَانَ مِنْ أَصْحُبِ الْيَمِينِ﴾

আর যদি সে ডানপন্থিদের একজন হয়। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯০]

অর্থাৎ, তাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। আর যাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, তারা হবে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত জান্নাতি। আর যারা দ্বিতীয় স্তরের জান্নাতি হবে, তারাও অফুরাণ নিয়ামত ভোগ করবে। আল্লাহ বলেন,

﴿فَسَلَمُ لَكَ مِنْ أَصْحُبِ الْيَمِينِ﴾

তাকে বলা হবে, তোমাকে সালাম যেহেতু তুমি ডান দিকের একজন। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯১]

এমন জান্নাতিরাও যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদেরও সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে প্রবেশ করানো হবে। আমাদের সমাজেও এর প্রচলন রয়েছে। যেমন, কোনো অনুষ্ঠান বা মাহফিলে যখন প্রধান অতিথি বা সম্মানী ব্যক্তি আগমন করেন, তখন তাকে বিভিন্ন স্লোগান, আহলান-সাহলান দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।

মুমিনের সর্বশেষ আবাস

জান্নাত মুমিনের সর্বশেষ আবাসস্থল। মর্যাদা অনুযায়ী মুমিন ব্যক্তি জান্নাতের অধিকারী হবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সব জান্নাতির জন্যই সমভাবে বিশেষ কিছু জিনিস প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা সব জান্নাতি লাভ করবেন। হজরত আবু সায়িদ খুদরি ও আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবিজি বলেন,

জান্নাতিরা (সবাই) যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে; তখন একজন ঘোষণাকারী (সব জান্নাতিদের প্রাপ্তি সম্পর্কে) ঘোষণা করবে, 'তোমাদের জন্য এখন অনন্ত জীবন; তোমরা আর কখনো মরবে না। তোমাদের জন্য এখন চির সুস্বাস্থ্য; তোমরা আর কখনো অসুস্থ হবে না। তোমাদের জন্য এখন চির যৌবন; তোমরা আর কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমাদের জন্য এখন চির সুখ ও পরমানন্দ; তোমরা আর কখনো দুঃখ-কষ্ট পাবে না।' নবিজি বলেন, জান্নাতে প্রবেশকারী লোক অত্যন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দে থাকবে; কোনো দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। সে অনন্তকাল জান্নাতে অবস্থান করবে আর কখনো সে মৃত্যুবরণ করবে না। কখনো তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে না এবং তার যৌবনকালও শেষ হবে না। জান্নাতিরা হবে অনন্তযৌবনা।'

জাহান্নামিদের অবস্থা

অপরদিকে যারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, তারা চিরকালীন কষ্ট ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হবে। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন ফেরেশতারা তাদের হাকিয়ে হাকিয়ে নিয়ে যাবেন। সেখানে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।

এ ছাড়া জাহান্নামিদের ভয়াবহ পরিণতির কথা কুরআনের অসংখ্য আয়াত এবং নবিজির অসংখ্য হাদিসে বিবৃত হয়েছে। মর্যাদা অনুযায়ী জান্নাতিদের যেমন শ্রেণিভেদ রয়েছে, তেমনি জাহান্নামিদেরও শ্রেণিভেদ রয়েছে। পাপ অনুযায়ী তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।

জাহান্নামিদের ভয়বহ শাস্তির কথা পরের কোনো আলোচনায় আসবে, ইনশাআল্লাহ। আপাতত আমরা এটা জেনে রাখি যে, জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। আল্লাহর করুণা ছাড়া আমাদের রক্ষা পাওয়ার কোনো পথ নেই। তিনি যদি নিজ দয়াগুণে আমাদের ক্ষমা করে না দেন, তাহলে আমরা বড় বিপদে পড়ে যাব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন, আমিন।

জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায়

জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদেরকে প্রথমে মুমিন হতে হবে। এরপর তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকি হতে হবে। আর মুত্তাকি হতে হলে আপনাকে-আমাকে সহনশীল হতে হবে। ধৈর্যধারণ করতে হবে। বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন, কেউ যদি একটি বরই গাছে পাথর ছুড়ে মারে, তাহলে বিনিময়ে বরই গাছ কি শুধু পাতা ঝরায়, না বরইও সাথে পড়ে? এটা উৎকৃষ্ট একটি উপমা।

আপনি যদি বরই গাছে পাথর ছুড়ে মারেন, তাহলে পাথরের সঙ্গে অনেকগুলো বরইও পড়বে। এমন হবে না যে, আপনি একটি মাত্র পাথর মারলেন আর বিনিময়ে আরও ১০টি পাথর চলে আসবে। এই উপমা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

পাথরের ঢিল খেয়ে বরই গাছ প্রতিদানস্বরূপ দিয়েছে ফল, ঠিক তেমনি আমাদেরও এমন হতে হবে। কেউ আপনার উপর পাথর নিক্ষেপ করলে আপনি তাকে ফল অথবা ফুল দিয়ে বরণ করে নিন। যেমনটা বরই গাছ করে থাকে। উল্টো পাথর নিক্ষেপ করতে যাবেন না। অর্থাৎ, কেউ আপনাকে আঘাত করলে আপনি আঘাতের বিনিময়ে আঘাত দেবেন না; বরং আঘাতের বদলে ফুল বিছিয়ে দিন। কেননা, নবিজি ﷺ-এর অন্যতম এক গুণ ছিল,

صِلْ مَنْ قَطَعَكَ وَأَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ وَاعْفُ عَمِّنْ ظَلَمَكَ

মোটকথা, দুর্ব্যবহারের জবাব কখনো দুর্বব্যহারের মাধ্যমে দেওয়া যাবে না। বরই গাছ আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে। এটা থেকে আমাদের শিখতে হবে। কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে।

এখন যদি গাছকে প্রশ্ন করা হয়, 'তাহলে তোকে জাহান্নামের লাকড়ি বানানো হয় কেন?' গাছ তখন জবাব দেবে, 'আমার চরিত্র হচ্ছে সুবিধাবাদ। যেখানেই আমার সুবিধা, সেখানেই আমার আবাস।' বলা হলো, 'সুবিধাবাদী কীভাবে?' গাছ জবাব দেয়, 'বাতাসের দিকে লক্ষ্য করো। যখন বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন গাছের ডালপালা বাতাসের অনুকূলে না ঝোঁকে প্রতিকূলে ঝোঁকে, কখনো উত্তরমুখি হয় না। ঠিক একই কারণে আমার স্বভাবও এমন। তুমি বরং আমার দোষ না দেখে গুণগুলো দেখতে পারো।'

এখন কথা হলো, যারা সুবিধাবাদী, মিথ্যুক, তারা জাহান্নামে যাবে। সেখানে তাদেরকে ফুটন্ত গরম পানীয় দ্বারা আপ্যায়ন করানো হবে। ফলে তার পেটে থাকা নাড়িভূড়িসহ সবকিছু জ্বলেপুড়ে নিচের দিকে বেরিয়ে আসবে। এটা এমন ধ্রুব সত্য যে, জাহান্নামে যাওয়ার পরই জাহান্নামিরা তা চর্মচক্ষে তা প্রত্যক্ষ করতে পারবে। আল্লাহ বলেন,

إِنَّ هَذَا لَهُوَ حَقُّ الْيَقِينِ

নিশ্চয় এটি অবধারিত সত্য। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯৫]

সুতরাং জাহান্নাম যে সত্য, এটা বিশ্বাস করতে হবে এবং জাহান্নামের যাওয়ার যেসব উপায়-উপকরণ রয়েছে, সেসব থেকে বিরত থাকতে হবে। যারা জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন, أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ 'তারাই হলো সফল।' আর যারা মুফলিহুন বা সফল, তাদের চূড়ান্ত সফলতা লাভ হয় জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে।

এখন কথা হলো, কারা সফল আর কারা বিফল, তাদের প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা এ সুরা য় দুই যুবকের ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তাদের একজন হলো সফল আরেকজন হলো বিফল। এবং প্রসঙ্গক্রমে এসব আলোচনা করতে গিয়ে একটি গাভীর ঘটনা আলোচিত হয়েছে এ সুরায়। এ জন্য এ সুরাকে বাকারা নামে নামকরণ করা হয়েছে।

নেক সন্তান চাইলে

নেক সন্তান চাইলে বাবা-মাকে নেক হতে হবে। বাবা-মা পরহেজগার না হলে সন্তান কখনও নেক হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।

হজরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে একজন বুজুর্গ বা নেককার ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হন। সন্তানহীন পৃথিবী তাঁর কাছে ভালো লাগছিল না। ফলে তিনি আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে একটি সন্তান লাভের জন্য দুআ করতে থাকেন। আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করেন এবং তাঁকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। এখন স্ত্রীসহ তাঁর পরিবারের সদস্য ৩জন। সন্তান পেয়ে ওই বুজুর্গ ব্যক্তি বেজায় খুশি; আল্লাহ তাঁকে এই বৃদ্ধ বয়সে একজন সন্তান দিয়েছেন।

সন্তান জন্মের কিছুদিন পর ওই বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুর ডাক এসে যায়। মৃত্যুর আগে তিনি যখন বার্ধক্যের কারণে শয্যাশায়ী, বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখন তাঁর খেয়াল হলো, আমি তো মারা যাব কিন্তু এই দুধের শিশু এবং তার মাকে কার কাছে রেখে যাব? এ ছাড়া তাদের তো আমি উপায়-উপকরণহীন ছেড়ে যাচ্ছি। একটিমাত্র গরুর বাছুর ছাড়া আর কোনো সম্পদই যে আমার নেই। তিনি এটা ভেবে আরও পেরেশান হয়ে যাচ্ছিলেন যে, আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটির বিনিময়ে তিনি একটি সন্তান লাভ করেছেন। এখন সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ দেখার আগেই তাঁকে চলে যেতে হবে! এই পৃথিবী থাকার জায়গা না। কেউ থাকতে পারব না। কবি বলেন, موت کاس کل ناس شارب : قبر بیت کل ناس داخل

মউত এমন এক শরবত, যা সবাইকে পান করতে হবে। কবর এমন একটি ঘর, যেখানে সবাইকে প্রবেশ করতে হবে।

সুতরাং তিনি বাছুরটি সঙ্গে নিয়ে গভীর জঙ্গলে চলে গেলেন এবং একটি পাহাড়ের পাশে গিয়ে উপনীত হলেন। সেখানে পাহাড়কে লক্ষ্য করে আল্লাহর কাছে দরাজকণ্ঠে দুআ করতে লাগলেন, 'ওগো আল্লাহ, অনেক কান্নাকাটির বিনিময়ে তুমি আমাকে একটি সন্তান দিয়েছো। এখন দুধের এই শিশুর ভবিষ্যৎ কী হবে? তবে আমি নিরাশ নই হে আল্লাহ। সন্তান ও তার মাকে তোমার জিম্মায় রেখে যাচ্ছি। সাথে এই বাছুরটিও। আমার সন্তান যখন বড় হবে, তখন বাছুরটি আপনি তার কাছে পৌঁছে দিয়েন।'

নেককার ওই ব্যক্তির দুআ আল্লাহ কবুল করলেন। তখন গায়েবি আওয়াজ এল, 'হে আমার বন্ধু, তোর চিন্তার কোনো কারণ নেই। তুমি তোমার এই বাছুরটিকে এই পাহাড়েই রেখে যাও। সে-ই এটার দেখাশোনা করবে। এরপর সময় হলে সেটি তোমার সন্তানের কাছে পৌঁছিয়ে দেবে।' প্রবাদ আছে, من له المولى فله الكل 'যার রব, তার সব।'

কিছুদিন পর ওই বুজুর্গ লোকটি মারা যান। এরপর থেকে অভাবের সংসারে মা-ছেলে দিনাতিপাত করতে থাকেন। দুধের এই শিশু একসময় বড় হয়ে যুবক বয়সে উপনীত হয়। অভাবের সংসারে একটু আশার আলো হয়ে ফুটে ওঠে। প্রতিদিন জঙ্গলে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে।

নেককার যুবক

কথায় আছে না, যেমন পিতা তেমন পুত্র। الولد سرلاییه অর্থাৎ সন্তান পিতার স্বার্থক ভাষ্যকার। পিতা যেমন নেককার ছিলেন, ছেলেও পিতার যোগ্য উত্তরসুরি হয়ে ওঠে। কথায় আছে, 'বাপে বেটা গাছে গুটা, মায়ে ঝি গাইয়ে ঘি।'

এ ছাড়া তার মাতৃভক্তিও ছিল প্রবাদতুল্য। সে সবসময় মায়ের সেবাযত্ন করত। মায়ের কথা মানত। মা-ভক্ত, অনুগত ও খেদমতগুজার ছেলেটি সারাদিন কাঠ সংগ্রহ করত। এরপর সেই কাঠ বিক্রি করে যে অর্থ পেত, সেই অর্থ সে তিন ভাগে ভাগ করত। এক অংশ দান-সদকা করত, এক অংশ নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করত এবং এক অংশ তার মায়ের হাতে তুলে দিত। এটা ছিল তার দিনের রুটিন। এভাবে সে রাতকেও তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাত, একভাগ ঘুমাত এবং এক ভাগ তার মায়ের সেবা করত।

প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! আমি আপনাদেরকে বিশেষভাবে বলব, আপনারা আপনাদের পিতামাতার জন্য প্রতিদিন কিছু সময় অবশ্যই দিন। ৫-১০ মিনিট করে হলেও। মায়ের জন্য, বাবার জন্য এভাবে কিছু সময় দিন। তাদের হাতে আপনার উপার্জনের কিছু টাকা ধরিয়ে দিন। দেখবেন, তারা কতটা খুশি হন। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে আমরা এই আমল করতে চেষ্টা করব।

বর্তমান যুগে তো আমরা মোবাইল-ফেসবুকের পেছনে অযথা সময় নষ্ট করছি। রাতের পর রাত ব্যয় করছি; অথচ মা-বাবার খেদমতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। এ ব্যাপারে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছেন আমাদের ইমামে আজম আবু হানিফা রাহ.। তিনি একাধারে ৪০ বছর ইশার ওজু দিয়ে ফজরের নামাজ পড়েছেন। এটা আপনার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, তবে বর্তমান প্রযুক্তির এ যুগে প্রযুক্তি দিয়েই যদি উদাহরণ দিই, সহজেই বুঝতে পারবেন।

বর্তমানে একটা ছেলে মোবাইল-ফেসবুকটিপে কখন ফজর যে হয়, টেরই পায় না। এই অবস্থা চোখের সামনে দেখার পর ইমাম আবু হানিফা ইশার পর নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর এশকে কীভাবে ফজর পর্যন্ত নফল নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন, এটা বুঝা অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমরা নিজেরা এবং আমাদের সন্তানদের এসব ডিভাইসের অপব্যবহার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

বলছিলাম মুসা আলাইহিস সালামের যুগের এক বুজুর্গের সন্তান সম্পর্কে। সে যখন মাতৃভক্তিতে অনন্য হয়ে ওঠে, তখন একদিন মায়ের সেবা করার সময় তার মাকে বলে, 'মা, এভাবে আর কত দিন? আমাদের অভাব কি শেষ হবে না? এ ছাড়া আমার অনেক প্রয়োজনও তো সামনে রয়েছে।'

অনুগত ছেলের এমন কথায় মা খুশি হন। এই তো সেই সময়, যা তার পিতা মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। সময় এসেছে, সেই অসিয়তের কথা তাকে বলার। তিনি ছেলেকে বলেন, 'বাবা, তোর পিতা মৃত্যুর আগে আমাকে একটি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। আমাদের একটি বাছুর ছিল, সেটা তোকে খোঁজে নিয়ে আসতে হবে।'

আপাতত এখানে আমরা পুণ্যবান ওই ছেলে ও মায়ের ঘটনাটি স্থগিত রাখি। এবার আলোচনা করব যে যুবক বিফল হয়েছিল, তার ঘটনা। তখন বাকি আলোচনা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে।

বদকার যুবক

দ্বিতীয়জন হচ্ছে বিফল যুবক, সে-ও মুসা আলাইহিস সালামের যুগের। পবিত্র কুরআনের সুরা বাকার ৬৮ নম্বর আয়াতে এই যুবকের ঘটনা আলোচিত হয়েছে। ঘটনাটি হচ্ছে, বনি ইসরাইলের এই যুবক একজন বখাটে ও লোভী ছিল। তার চাচা ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি। সহায়-সম্পদ ছিল প্রচুর। তবে তার একমাত্র মেয়ে ছাড়া কোনো ছেলেসন্তান ছিল না। বখাটে ছেলেটি তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এ জন্য সে তার চাচাতো বোনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। নানা ভাবে ওই মেয়েকে উত্যেক্ত করতে থাকে। একপর্যায়ে সে চাচার কাছে তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়।

চাচা তার আবেদনে সাড়া দেননি। কেননা, সে যে বখাটে, অকর্মা, এটা তিনি ভালো করেই জানেন। তিনি সাফ না করে দেন যে, তার কাছে তিনি তার মেয়েকে বিয়ে দেবেন না। বখাটে ছেলেরা সবসময় এমনই হয়। এরা প্রেমে ব্যর্থ হলে নানা অসদুপায় অবলম্বন করে। অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। হারিয়ে ফেলে হিতাহিত জ্ঞান।

এ ছাড়া তার উদ্দেশ্য ছিল, চাচাতো বোনকে বিয়ে করে চাচার সব সম্পদের মালিক হওয়া। সে ছিল একজন লোভী প্রেমিক। আমাদের বর্তমান সমাজেও এমন চিত্র দেখা যায়। তবে সম্পদের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে গৌণ থাকে। এরা শুধু তার প্রিয়তমাকে পেতে চায়। এই যে প্রেম, এটা এক পক্ষে হয় না, উভয় পক্ষের সম্মতি লাগে।

বখাটে ছেলেটি তার চাচার কাছ থেকে প্রত্যাখাত হয়ে একটি দুর্ভিসন্ধি করে। সে তার চাচাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। চাচাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে পারলে পথ পরিষ্কার। পরিকল্পনামতো এক রাতে সে তার চাচাকে হত্যা করে এবং তার লাশ নিয়ে গ্রামের অন্য একজনের বাড়ির সামনে ফেলে আসে। পরের দিন ভাতিজা চাচার খুনের দাবিদার হয়ে ওঠে এবং লাশ সামনে নিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। তার কান্না দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, সে-ই প্রকৃত খুনি। উল্টো সে তখন ওই বাড়ির লোকদের হত্যাকারী হিশেবে সাব্যস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা জরুরি মনে করছি। আমাদের মধ্যে এমন অনেক আছেন, যারা মিছেমিছি কান্নার ভান ধরতে পারেন। যদিও এমন কান্নার কোনো মূল্য নেই। আগেকার সময়ে আরবসমাজে তো লোকেরা তাদের পরিবারের কারও মৃত্যুতে কান্নার জন্য ভাড়ায় লোক নিয়োগ করে আনতো। অথচ এই কান্না যদি হয় আল্লাহর জন্য, কেউ যদি আল্লাহর জন্য কান্না করে মাছির ডানার সমপরিমাণ চোখের জল গড়ায়, তাহলে আল্লাহ তার এই চোখের পানিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। এ জন্য আমরা আল্লাহকে পেতে বেশি বেশি কান্না করব। কেঁদেকেটে আল্লাহর কাছে চাইব। দুই যুবকের ঘটনার বাকি অংশ আমরা আগামীকাল আলোচনা করব- ইনশাআল্লাহ।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 প্রকৃত সাফল্য ও ব্যর্থতা

📄 প্রকৃত সাফল্য ও ব্যর্থতা


আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের এ মাসে এমন এক মহতি মাহফিলে আজও বসার তাওফিক দিয়েছেন। যে মাহফিলে কুরআন-হাদিসের আলোচনা হয়, তাকওয়ার আলোচনা হয়, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা হয়। এ জন্য সকলেই বলি, আলহামদুলিল্লাহ।

গতদিনের আলোচনা ছিল মুত্তাকিদের গুণ সম্পর্কে। আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনার পর বলেন, أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ 'যারা মুত্তাকি, তারাই সফল।' আয়াতে যে مُفْلِحُوْنَ শব্দ এসেছে, এটার এক অর্থ হলো باقون। বাকুন কারা? أُولَئِكَ هُمُ الْباقون অর্থাৎ, তারাই সফল, যারা বাকি থাকবে চিরস্থায়ী জান্নাতে। এ ছাড়া অন্য সকলেই ধ্বংস হয়ে যাবে। ফালাহ শব্দের অর্থ বাকি, স্থায়ী থাকা। তার প্রমাণ হাদিস শরিফে পাওয়া যায়। এক হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহরি খাওয়াকে ফালাহ বলেছেন। মুহাদ্দিসিনে কেরাম লিখেছেন, যেহেতু সাহরি খেলে রোজা রাখতে শক্তি পাওয়া যায়, তাই নবিজি সাহরিকে ফালাহ বলেছেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি করেননি; বরং বিশেষ এক উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। উদ্দেশ্য কী, এ মর্মে আল্লাহ বলেন,

﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾ আমি মানুষ ও জিন জাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সুরা জারিয়াত: ৫৬]

এ জন্য ইবাদত হতে হবে আল্লাহর নির্দেশমতো; নিজের ইচ্ছামতো নয়। তাই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে ইবাদত করলে সফল হওয়া যাবে; আর ঠিকমতো না মানলে বিফল হতে হবে। ইবাদত বা গোলামি করবেন ঠিক কিন্তু সঠিক নিয়মে না করার কারণে সেই ইবাদত কোনো কাজে আসবে না। যেমন: একজন ছাত্র কলেজে ভর্তি হলো এবং কলেজেও যাওয়া-আসা করে। তবে ক্লাসে শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। কলেজের আইন-কানুনের প্রতিও যত্নবান নয়। এরপর পরীক্ষার সময় হলে পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করেনি। তবে বাড়িতে বসে নিজের মতো লেখাপড়া চালিয়ে যায়। এদিকে কলেজে যখন পরীক্ষার ফলাফল বের হবে, তখন এমন ছাত্র রিজাল্টশিটে উত্তীর্ণদের তালিকায় কি তার নাম দেখতে পাবে? পাবে না। কারণ, সে তো পরীক্ষাই দেয়নি। যদিও সে পড়েছে, তবে বাড়িতে, একা একা, নিজের মতো করে। কিন্তু তার এই পড়া তখন কোনো কাজে আসবে না। সে বিফলই থাকবে।

এখন কেউ যদি কলেজে ভর্তি হয়ে ঠিকমতো লেখাপড়া করে, শিক্ষকের কথা মেনে চলে, কলেজের আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, পরীক্ষায় অংশ নেয়, পাশাপাশি সময়েরও মূল্যায়ন করে, তবে অবশ্যই সে সফল হবে। এটা চেষ্টা, আন্তরিকতা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিজের উপর আত্মবিশ্বাস থাকার কারণে। এমন ছাত্র যদি নিয়ত করে সে বিজ্ঞানী হবে, প্রকৌশলী হবে, তবে তার পক্ষে সেটা সম্ভব। এভাবে যা হতে চাইবে, চেষ্টা করলে তার পক্ষে সেটা হওয়া সম্ভব। কারণ, সে মেহনতি, পরিশ্রমী, উদ্যমী, আত্মবিশ্বাসী একজন ছাত্র। আল্লাহও তাকে সাহায্য করবেন।

আর তার মধ্যে যদি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে, চেষ্টা-পরিশ্রমের মানসিকতা না থাকে, তবে তার পক্ষে কিছুই হওয়া সম্ভব নয়। আরবি একটা প্রবাদ আছে, من جد وجد অর্থাৎ, যে চেষ্টা করে, সে পায়। এটা হলো দুনিয়ার ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। আখিরাতের ক্ষেত্রেও যদি কেউ আল্লাহর সব আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে পারে, তাহলে সফল, আর যে মানবে না, সে বিফল।

সফল যুবক, ব্যর্থ যুবক

গতকাল আমাদের আলোচনা ছিল বনি ইসরাইলের দুজন যুবক-প্রসঙ্গে, যাদের একজন সফল আর একজন বিফল হয়েছিল। আপনাদের কি মনে আছে? সফল যুবক ছিল একজন আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের একমাত্র সন্তান। শিশু অবস্থায় যার পিতা ইনতিকাল করেছিলেন। এরপর মায়ের আদর-স্নেহেই সে লালিত-পালিত হয়। জীবনের পরতে পরতে সে তার মায়ের কথা মেনে চলেছে। মায়ের সেবা করেছে। আল্লাহ তাআলার ইবাদত করেছে। ফলে আল্লাহ তাকে একজন সফল যুবক হিশেবে দুনিয়াবাসীর সামনে দৃষ্টান্ত হিশেবে তুলে ধরেছেন।

আর যে যুবক ব্যর্থ হয়েছিল, সে লোভের বশবর্তী হয়ে, যৌবনের তাড়নায়, আল্লাহর ভয় না থাকায় অসৎ পথে পা বাড়িয়েছিল। সম্পদের লোভ এবং চাচাতো বোনকে কাছে পাওয়ার জন্য সে তার আপন চাচাকে হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। শুধু কি তাই! হত্যার পর উল্টো সে চাচা হত্যার কিসাস দাবি করে বসে। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। অন্যকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। যদিও হত্যাকাণ্ডটি সে-ই ঘটিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দুই এলাকার মানুষের মধ্যে হত্যাকারী কে, এটা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ফলে তারা সমাধানের জন্য নবি মুসা আলাইহিস সালামের কাছে যায়। মুসা আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে ঘটনার আদ্যোপান্ত খুলে বলে।

সবকিছু শুনে মুসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে বলেন, 'আমি আল্লাহর কাছ থেকে জেনে তোমাদের জানাব।' মুসা ছিলেন কালিমুল্লাহ। আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলতেন। তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর কওমের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সমাধান জানতে চাইলেন। আর আল্লাহ তো ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জানেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনেই বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِةٍ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً

আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামকে বললেন, 'তুমি তাদের বলো, আল্লাহর নির্দেশে তোমরা একটি গাভী জবাই করো। তোমাদের সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবে।

বনি ইসরাইলরা যদি মুসা আলাইহিস সালামের এই কথা মেনে নিত, তবে পরে তারা যে বিপদে পড়েছিল, সেই বিপদে পড়তে হতো না। বলতে গেলে বিপদ তারা নিজেরাই ডেকে এনেছিল। তারা তখন নবির কথা না মেনে উল্টো তার সাথে তামাশা শুরু করে দিল। বলল, 'আমরা জানতে চাইলাম কী, আর তুমি বললে কী? আমরা হত্যাকারীর সন্ধান চাচ্ছি, আর তুমি আমাদের গাভী জবাইয়ের কথা বলছো! তুমি কি আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করছ?'

তখন মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'আমি তো আমার পক্ষ থেকে কিছু বলিনি। আল্লাহ আমাকে যা বলেছেন, তা-ই তোমাদের বলেছি। আমি আমার মনগড়া কিছু বলিনি। আল্লাহ আমাকে যা জানিয়েছেন, তা-ই তোমাদের জানিয়েছি। কিন্তু তারা তখন বলতে লাগল, মুসা, তুমি আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করছ? আমাদের সমাজেও এমন অনেক মানুষ রয়েছে। আলেম-উলামা কিছু বললে তারা সেটা নিয়ে ঠাট্টা শুরু করে। আল্লাহ তাদের সুমতি দিন।

বনি ইসরাইল যদি এভাবে তর্কবিতর্কে লিপ্ত না হয়ে যেকোনো গাভী জবাই করে নিত, তাহলে তাদের কাজটি অত্যন্ত সহজেই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু তারা বেশি বুদ্ধি খাটিয়েছে, ফলে বিপদও বেড়েছে তাদের। তখন মুসা আলাইহিস সালাম তাদের জবাবে বললেন,

قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَهِدِينَ এমন অজ্ঞ-মূর্খ লোকদের থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি। [সুরা বাকারা: ৬৭]

এ জন্য কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। এ কারণেই মুসা আলাইহিস সালাম তাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহর কাছে মূর্খদের হাসিঠাট্টা আর তামাশা থেকে আশ্রয় চেয়েছেন। আর যে হাসিখুশিতে শিক্ষণীয় কিছু থাকে খন, সেটা অনর্থক এবং মূর্খদের কাজ। তামাশা বৈ কিছু নয়। এ জন্য জ্ঞানী ব্যক্তিরা সবসময় ঠাট্টা-তামাশা থেকে দূরে থাকেন। এসব কাজ নিজেরাও করেন না এবং কাউকে করতে দেখলেও কাছে যান না।

আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের মধ্যে অনেক বক্তা রয়েছেন, যারা ওয়াজের মাহফিলকে হাসির মাহফিল বানিয়ে ফেলেন। বয়ানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু হাসি আর হাসি। কিন্তু এমন করা হয় কেন? হাসি-তামাশা করার অন্য কোনো জায়গা নেই? কুরআন-হাদিসের মাহফিলে অনর্থক এত হাসিখুশি হবে কেন? কুরআন হলো হিদায়ত। তাই কুরআনের আলোচনার মাধ্যমে মানুষ হিদায়ত পাবে, বিনোদন নয়। কুরআন-হাদিসের মাহফিলে এমন আলোচনা হবে, যা দ্বারা মানুষ হিদায়তের প্রতি আগ্রহী হয়।

অধিক প্রশ্ন ভালো নয়

অযথা প্রশ্ন করা একটি বাজে অভ্যাস। এটি আল্লাহপাকও পছন্দ করেন না। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবুহুরায়রা থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহপাক তিনটি জিনিষ পছন্দ করেন, এবং তিনটি জিনিষ অপছন্দ করেন বা রাগান্বিত হন। আল্লাহর তিন পছন্দ হলো: ১. শিরকমুক্ত ইবাদত। ২. আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে ধরে রাখা এবং ৩. ইসলামি নেতৃত্ব ও কর্তৃপক্ষকে মান্য করা।

আর যে তিনটি কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেগুলো হলো: ১. অযথা ও অনর্থক কথাবলা। ২. অধিক প্রশ্ন করা। ৩. সম্পদ নষ্ট করা।

ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন, তিন উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা যায়। অর্থাৎ, প্রশ্ন করার তিন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একটি হলো, জানার জন্য প্রশ্ন করা। একটি হলো জানানোর জন্য প্রশ্ন করা। আরেকটি হলো কাউকে অপমান করার জন্য প্রশ্ন করা। প্রশ্ন যদি জানার জন্য করা হয়, তাহলে সেটা ভালো কাজ। যদি জানানোর জন্য হয়, অর্থাৎ, আমি যাকে প্রশ্ন করছি, সে যখন এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না, তখন আমি জবাব দেব। সবাই জানবে, আমিও জানি। এই নিয়তে প্রশ্ন করা মুতাকাব্বিরের লক্ষণ। তকব্বুরি করা হারাম। আর যদি প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য হয় কাউকে ছোট করা, বা পরীক্ষা করা, যাকে প্রশ্ন করছি সে জানে কিনা- যাচাই করা, অথবা না জানলে সে লজ্জিত হবে- উদ্দেশ্য তাকে লজ্জা দেওয়া, তাহলে এটাও হারাম।

অহেতুক প্রশ্ন

বনি ইসরাইল অহেতুক প্রশ্ন করেই ফেঁসেছিল। বিপদ ডেকে এনেছিল। মুসা আলাইহিস সালাম যখন তাদেরকে বললেন, তোমরা একটি গাভী জবাই করো, তখন তারা উল্টাপাল্টা নানা প্রশ্ন করতে থাকল। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, যত প্রশ্ন করবেন, তত বিপদে পড়বেন। এ জন্য যা জানেন, তার উপরই আমল করেন। যা জানেন না, তা বিজ্ঞ বা আহলে ইলম কাউকে জিজ্ঞেস করেন। আল্লাহ বলেন,

﴿فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾ সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমরা না জানো। [সুরা নাহল: ৪৩] বনি ইসরাইল মুসা আলাইহিস সালামকে অতিরিক্ত প্রশ্ন করে বিপদে পড়েছিল। তারা বলল,

﴿قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنُ لَنَا مَا هِيَ﴾ 'মুসা! আপনি আপনার প্রভুকে বলুন, তিনি যেন আমাদের জানিয়ে দেন গাভীটি কী কী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে।' এখানে তারা বলেছে, 'আপনি আপনার প্রভুর কাছে জিজ্ঞেস করুন'। অথচ, আল্লাহ তাদেরও প্রভু। তখন মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব দিলেন,

۞ قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةً لَّا فَارِضٌ وَلَا بِكْرُ عَوَانُ بَيْنَ ذَلِكَ ۖ فَافْعَلُوا مَا تُؤْمَرُونَ

আল্লাহ বলেছেন, গাভীটি হবে এমন, যা বৃদ্ধও নয় আবার বাচ্চাও নয়; বরং যুবক হবে। আর যেভাবে বলা হয়েছে, তোমরা সেভাবে কাজটা করে নাও।

এখন আলোচনা করা যাক আল্লাহ কেন বৃদ্ধও নয়, বাচ্চাও নয়; বরং যুবক গাভীর শর্তারোপ করলেন, এ প্রসঙ্গে। এর রহস্য হচ্ছে, বৃদ্ধকালে মানুষের শরীরে শক্তি থাকে না। তখন সে অক্ষম হয়ে যায়। তাই এসময় যদি কেউ আল্লাহর কাছে বলে, হে আল্লাহ, আমি আর কখনো জিনা করব না, আমাকে ক্ষমা করে দিন, তখন তার এই তাওবার কোনো মূল্য নেই। কারণ, জিনা করার মতো শক্তিই তো তখন তার শরীরে নেই। জিনা করার সময় হলো যৌবনকাল। তখন মানুষের শরীরে শক্তি থাকে। তাই যুবক বয়সে যদি কেউ জিনা থেকে বিরত থাকে, তবে সেটাই প্রকৃত কাজ।

অপরদিকে 'বাচ্চাও হবে না' বলে এ কথাই বুঝিয়েছেন যে, শিশুবয়সে মানুষ ইবাদতেরই মুকাল্লাফ হয় না। এ সময় কাউকে পূর্ণশক্তির মানুষ হিশেবে বিবেচনা করা হয় না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা এ দুয়ের মধ্যবর্তী অর্থাৎ 'যুবক' গাভী জবাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আর যেকোনো প্রাণির সৌন্দর্য তার যৌবনেই ফুটে ওঠে। এ সময় তার দেহ থাকে সুঠাম, সুন্দর এবং নিখুঁত। এ জন্য যৌবনবয়সের ইবাদতের মর্যাদা আল্লাহর কাছে বেশি। এক হাদিসে নবিজি যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়ার নিচে স্থান পাবে- বলে জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো শাব্বুন নাশা'আ ফি ইবাদতিল্লাহ। অর্থাৎ যেই যুবক, যে তার যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে।

এবার তারা মুসা আলাইহিস সালামকে প্রশ্ন করে বলে,

قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنُ لَنَا مَا لَوْنُهَا আপনি আপনার প্রভুকে বলুন, সেই গাভীর রং কেমন হবে? তখন মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জানিয়ে দিলেন,

۞ قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةُ صَفْرَاءُ فَاقِعٌ لَوْنُهَا تَسُرُّ النَّاظِرِينَ আল্লাহ বলেছেন, সেই গাভীর রং হতে হবে ঘন হলুদ। যার সৌন্দর্য দেখে দর্শকরা আনন্দিত হয়। যেন গাভীটি যারাই দেখে, তারাই তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়।

এবার তারা নড়েচড়ে বসল। এতক্ষণে তাদের চেতনা ফিরে এসেছে। তারা তখন পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, এই রঙের গাভী আমরা কোথায় পাব? আমরা যতই প্রশ্ন করছি, তত বিপদে পড়ছি। আর প্রশ্ন করা যাবে না। তবে কিছুক্ষণ পরেই তারা আবার মুসার কাছে জানতে চায়,

قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنُ لَنَا مَا هِيَ إِنَّ الْبَقَرَ تَشْبَهَ عَلَيْنَا

হে মুসা! আপনি আপনার প্রভুকে জিজ্ঞেস করুন, এই গাভীটা আসলে কেমন হবে? নিশ্চয় এই গাভী আমাদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করে দিচ্ছে। এই যে বিপদ তারা টেনে এনেছে, এখন কী করবে? কালো রংয়ের গরুর তো অভাব নেই, সাদা রঙেরও প্রচুর আছে, কিন্তু হলুদ রঙের তো কোনো গরু দেখা যায় না। এখন এই কালারের গরু তারা কোথায় খুঁজে পাবে? এ পর্যায়ে তারা কিছুটা নমনীয় হয় এবং বলে,

وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَمُهْتَدُونَ ﴾

নিশ্চয় আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই গাভী পেয়ে যাব, যদি আল্লাহ চান। বিপদে পড়ে এবার তারা অন্তত 'ইনশাআল্লাহ' শব্দটা বলেছে। সাপ যেমন গর্তে প্রবেশের সময় সোজা হয়ে প্রবেশ করে, তাদের দশাও ঠিক তেমন হয়েছিল। ফলে আল্লাহও তাদের প্রতি কিছুটা দয়ালু হন। আল্লাহ তখন জানিয়ে দেন,

قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ لَّا ذَلُولٌ تُثِيرُ الْأَرْضَ وَلَا تَسْقِي الْحَرْثَ

আল্লাহর হুকুমে মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, সেটি এমন গাভী হবে, যেটি না ক্ষেতের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, আর না সেচের কাজে। অর্থাৎ, কোনো ধরণের স্পট থাকবে না তাতে। এমন সুন্দর সুঠামদেহি একটি গাভী, যে আল্লাহ কুদরতিভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এরপর আল্লাহ বনি ইসরাইলের জন্য কাজটি আরও সহজ করে দিয়ে বলেন,

مُسَلَّمَةٌ لَّا شِيَةَ فِيهَا

অর্থাৎ, যেটি হবে নিষ্কলুষ, তাতে কোনো আঁচড় থাকবে না। আর এমন গাভী সাধারণত জঙ্গলেই বাস করে। মানুষের অধিকারে থাকে না। কারণ, মানুষের হাতে থাকলে সেটা দ্বারা অনেক কাজকাম উদ্ধার করা হয়, ফলে তাতে কাজের ছাপ পড়ে যায়। এসব বর্ণনার পর তারা বলল,

قَالُوا انَ جِئْتَ بِالْحَقِّ

অর্থাৎ, হে মুসা! এবার আপনি সঠিক বর্ণনা দিয়েছেন। আর আমরাও সঠিক একটা দিকনির্দেশনা পেয়েছি। এখন আমরা এমনই একটা গাভী খুঁজব, যেটিকে ক্ষেতের কাজে ব্যবহার করা হয়নি এবং সেঁচের কাজেও লাগানো হয়নি।

মুসা আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় তেমন একটি গাভীর সন্ধানে পেরেশান হয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। তারা এদিক-ওদিক, এ-বাজার ও-বাজার করে সব জায়াগায় খুঁজেও ব্যর্থ। কোথাও এই কোয়ালিটির গরু পাওয়া যাচ্ছে না। আর এদিকে মায়ের অনুগত সেই শিশু এখন অনেক বড় হয়েছে। বয়স এবং বোঝের তাড়নায় তার অনেক জিনিসের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এখন। অর্থের জরুরত সামনে এসেছে; কিন্তু সে পরিমাণ অর্থ তার কাছে নেই। তা ছাড়া সে কাজ করে প্রতিদিন যা পায়, তাতে মা-ছেলের সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। সে তার মায়ের সাথে বর্তমান অবস্থা নিয়ে পরামর্শ করতে লাগল। মা তখন ছেলেকে বলেন, 'বাবা শোন! পাহাড়ের ভেতর তোর একটা গাভী আছে। গাভীটিকে তোর বাবা তোর জন্য আল্লাহর হাওলা করে রেখে গিয়েছিলেন। আশাকরি এটা বিক্রি করলে তোর সব চাওয়া পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু গাভীটি তোর হাতে আসতে হলে অবশ্যই আমার কথা মানতে হবে। আমি যেভাবে যা বলব, ঠিক সেভাবেই কাজ করতে হবে।'

ছেলে মায়ের কাছে জানতে চাইল, 'কীভাবে কী করতে হবে?' মা তখন ছেলেকে শিখিয়ে দিলেন, 'তুমি পাহাড়ের কাছে গিয়ে বলবে,

يَا رَبَّ إِبْرَاهِيمَ، يَا رَبَّ إِسْحَاقَ، يَا رَبَّ يَعْقُوبَ

'হে ইবরাহিম, ইয়াকুব ও ইসহাকের রব! আপনার কাছে আমার পিতা যে আমানতটি রেখেছিলেন, সেটা আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।' এর বাইরে আর কিছু বলবে না। তখন জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা গাভী বেরিয়ে আসবে। তবে গাভীটি যে তোমার, এটার প্রমাণ হিশেবে তুমি প্রত্যক্ষ করবে, গাভীটির তখন জবান খুলে যাবে এবং কথা বলবে। তবে গাভী যদি তোমাকে কোনো আদেশ করে, তবে তুমি সেটা মানবে না। কথাটি যেন মনে থাকে।'

মায়ের কথামতো ছেলে পাহাড়ের কাছে গিয়ে আওয়াজ দিলে একটি মোটাতাজা গাভী জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। গাভীটির জবানও তখন খুলে গেল। সে তখন যুবককে লক্ষ্য করে বলে, 'হে নেক সন্তান! তুমি কেন হেঁটে চলছ? আমার কাঁধে চড়ে বসো, আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে পৌঁছিয়ে দেবো।' কিন্তু যুবক গাভীর আদেশ মানল না। তার মা তাকে বলে দিয়েছেন গাভী কোনো আদেশ করলে সে যেন সেটা না মানে।

গাভীটি তখন ওই যুবককে লক্ষ্য করে বলে, 'যুবক! তুমি যদি তোমার মায়ের কথা অমান্য করে আমার কথামতো আমার কাঁধে চড়তে, তাহলে তুমি আমাকে হারিয়ে ফেলতে। যেহেতু তুমি এমনটা করোনি, সুতরাং এখন থেকে আমি তোমার কথা মেনে চলব। এখন তোমার মর্যাদা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তুমি যদি কোনো পাহাড়কে সরে যেতে বলো, তাহলে আল্লাহর কুদরতে পাহাড়ও সরে যেতে বাধ্য হবে। সুবহানাল্লাহ।

এটা হচ্ছে মা-বাবার খেদমতের ফলাফল। পিতামাতার সেবা করলে আল্লাহ এমন মর্যাদা দান করেন। এ জন্য আমরা আমাদের পিতামাতার খেদমতের ব্যাপারে আরও আন্তরিক হবো। এ ছাড়া পিতামাতার সেবা করলে নেক সন্তান হওয়া যায়, ফলে জগদ্বাসী নেক মানুষের সেবা করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এখন আপনি আপনার মালিক আল্লাহর গোলাম হয়ে যান, দেখবেন সবকিছুকে আল্লাহ আপনার অনুগত বানিয়ে দেবেন।

যুবক গাভীটি নিয়ে তার মায়ের কাছে এল। তার যেহেতু অনেক কিছুর প্রয়োজন, আর এসব প্রয়োজন পূরণ করতে হলে তাকে গাভী বিক্রি করতে হবে। এ জন্য যুবক তার মায়ের কথামতো গাভীটি নিয়ে বাজারে গেল। মা তাকে বলে দিলেন, বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর গাভীটি তিন দিরহাম মূল্যে বিক্রি করবে। এরচেয়ে কমেও না, বেশিও না। তিন দিরহাম ফিক্সড প্রাইজ। তবে যদি তিন দিরহামে বিক্রি না হয়, বরং তিন দিরহামের কম বা বেশি দাম উঠে, তাহলে অবশ্যই আমার সাথে পরামর্শ করবে।

যুবক তার মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর গাভীটি দেখতে মানুষের ভীড় জমে গেল। কেননা, ইতিপূর্বে তারা ঘন হলুদ রঙের এত সুন্দর হৃষ্টপুষ্ট কোনো গাভী দেখেনি। আর না দেখারই কথা, কারণ দুনিয়ার জমিনের এরকম গাভী মাত্র একটাই। বস্তুত এটা আল্লাহর কারিশমা। উপস্থিত লোকজন তখন গাভীর মালিককে না জানিয়ে তারা নিজেরাই এর নিলাম হাঁকাতে শুরু করল। নিলামে গাভীর মূল্য এত বেশি ছিল যে, গাভীর মালিক ওই যুবক অবাক হয়ে যাচ্ছিল। তখন তার মায়ের কথা স্মরণ হল। মা বলেছেন তিন দিরহামের কম বা বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না। তাই আকাশ ছোঁয়া দাম উঠার পরও গাভীটিকে বিক্রি না করে মায়ের নির্দেশমতো গাভীটিকে সে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসল।

মাকে ঘটনা খুলে বলার পর এবার মা তাকে বলে দিলেন, 'যাও, যদি দশ দিরহাম দাম পাও, তাহলে বিক্রি করবে। এর চেয়ে কম-বেশি করতে হলে আমার সঙ্গে পরামর্শ করবে।'

মায়ের পরামর্শমতো পরের দিন গাভীটি নিয়ে আবারও বাজারে যাচ্ছিল ওই যুবক। তখন পথিমধ্যেই কয়েকজন ক্রেতা তাকে ঘিরে ধরল। যত টাকাই লাগুক, গাভীটি তারা কিনতে চায়। একজন থেকে অন্যজন বেশি দাম হাঁকাচ্ছে। দশ দিরহাম তো কি, হাজার দিরহাম ছাড়িয়ে চলছে দাম পাল্টা দামের নিলাম। যুবক তখন ভাবনায় পড়ে গেল। সে ভাবল, বাজারে যাওয়ার আগেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বাজারে গেলে না জানি কী হবে? অথচ মা বলে দিয়েছেন দশ দিরহামেই বিক্রি করতে হবে। এক পয়সা বেশিও না, কমও না।

ছেলেটি তখন গাভী নিয়ে রাস্তা থেকেই বাড়িতে ফেরত চলে আসল এবং মায়ের কাছে এসে সব খুলে বলল। ছেলের কথা শুনে মা বুঝে ফেলেন, রাস্তায় যারা ক্রেতা সেজে দরদাম করেছেন, এরা মানুষ নন, ফেরেশতা। তখন তিনি ছেলেকে বলেন, 'বেটা, রাস্তায় তুমি যাদের সাক্ষাত পেয়েছ, এরা ফেরেশতা। মানুষের রূপধারণ করে এসেছেন। তুমি আবারও গাভীটি নিয়ে বাজারের দিকে যাও। পথিমধ্যে যদি আবারও সেই ক্রেতাদের সাক্ষাৎ পাও আর তারা আবারও দামদর করেন, তবে তুমি বলবে, 'এটার মূল্য আমি জানি না। আপনারাই এর মূল্য নির্ধারণ করুন।'

ছেলেটি তার গাভী নিয়ে আবারও বের হলো এবং রাস্তায় আবার সেই ক্রেতাদের সাথে সাক্ষাৎ হল। সে বলল, 'আমি আপনাদের চিনে ফেলেছি। মা আমাকে বলেছেন, আপনারা মানুষ নন, আপনারা আল্লাহর ফেরেশতা। তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন, এটার দাম যেন আপনারাই নির্ধারণ করে দেন।

তখন ক্রেতারূপি ফেরেশতারা বলেন, 'যুবক, ৩ দিরহাম আর ১০ দিরহাম এটা তো মূল্যই না। এরচেয়ে হাজারগুণ বেশি মূল্য তুমি পাবে। শুনো, বনি ইসরাইলের মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে। এরা তোমার এই গাভীটি খুঁজছে। অন্য কোনো গাভী দিয়ে তাদের হবে না। তোমার গাভী ছাড়া তাদের চলবেও না। সুতরাং তারা যখন তোমার কাছে এটা দাম চাইবে, তখন তুমি বলবে, এটার মূল্য হলো এটার ওজনের দশ গুণ বেশি পরিমাণে স্বর্ণ। (আল্লামা ইবনু কাসির রাহ. বলেন, গাভীর চামড়ায় যে পরিমাণ স্বর্ণ জায়গা হবে, ততটুকুই হলো এর মূল্য। তবে অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ওজনের ১০ গুণ বেশি স্বর্ণ।)

এদিকে বনি ইসরাইল এই গাভীটিই খুঁজে ফিরছিল। এটা ক্রয় করা ছাড়া তাদের কোনো উপায়ও ছিল না। মূল্য যতই হোক, এটা তাদের কিনতেই হবে। সুতরাং তারা বিশাল মূল্য দিয়ে স্বর্ণদামে গাভীটি কিনে নেয়।

এভাবে আল্লাহ তাআলা ওই নেককার যুবকের প্রয়োজনের পূরণের ব্যবস্থা করে দিলেন। সুবহানাল্লাহ। আর এই যে মর্যাদা লাভ করল যুবক, এটা তার মায়ের সেবা ও আনুগত্যের মাধ্যমে। অথচ তার জায়গায় যদি আমরা হতাম, তাহলে কী করতাম? মায়ের কথা পরে ভেবে দেখা যাবে বলে প্রথমবারেই গাভিটি বিক্রি করে দিতাম। গাভীর কথামতো তার কাঁধে চড়ে বসতাম। মায়ের বারবার বলায় বিরক্তবোধ করতাম। কিন্তু ছেলেটি অক্ষরে অক্ষরে তার মায়ের কথা মেনেছে। এ জন্য সে সফল হয়েছে।

আর ওই যে স্বার্থান্বেষি দুনিয়ালোভী যুবক, যে লোভের বশবর্তী হয়ে তার আপন চাচাকে হত্যা করেছিল, সে দুনিয়া-আখিরাতে ধ্বংস হল। বনি ইসরাইলের লোকেরা গাভীটি কিনে নিয়ে মুসা আলাইহিস সালামের কথামত জবাই করল। পবিত্র কুরআনে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন,

فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا يَفْعَلُونَ

গাভী জবাই করার পর হজরত মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'গাভীর জিহ্বা দিয়ে ওই মৃত লাশের উপর হালকা আঘাত করো, তাহলে লাশটি জীবিত হয়ে যাবে।' মুসা আলাইহিস সালামের কথামতো তারা গাভীর জিহ্বা দিয়ে মৃত লাশের উপর আঘাত করতেই লাশটি জীবিত হয়ে ওঠল। জীবন্ত লাশকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তোমাকে কে হত্যা করেছে?' জীবিত হওয়া লাশ তখন জবাব দিল, 'আমার ভাতিজা।' এ কথা বলেই সে আবারও লাশ হয়ে গেল। ফলে বেরিয়ে এল হত্যার প্রকৃত রহস্য। যে ভাতিজা সম্পদের লোভে চাচাকে হত্যা করে উল্টো নিজেই এর কিসাস দাবি করছিল, অন্যকে ফাঁসাতে চেষ্টা করছিল, এখন সেটা হিতে বিপরীত হলো। চাচা হত্যার দায়ে তাকেও হত্যা করা হলো। সে হলো ব্যর্থ যুবক। সে না দুনিয়া অর্জন করতে পারল, আর না আখিরাত; উভয়টাই ধ্বংস হলো তার। আল্লাহ বলেন,

خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ

বস্তুত, আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারায় গাভী এবং এই দুই যুবকের ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমরা যেন ওই সফল-নেককার যুবকের মতো হতে পারি। আর ব্যর্থ যুবক থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংশোধন করতে পারি। আমাদের মধ্যে যে পশুর আত্মা রয়েছে, সেটা কুরবানি করে অনুগতশীল আত্মা তৈরি করতে পারি।

সাধকশ্রেণি বলেন, একজন মানুষের মধ্যে পাঁচ ধরনের আত্মা থাকে: ১. মানবাত্মা, ২. পরমাত্মা, ৩. পশুরাত্ম, ৪. হিংস্র আত্মা, ৫. ফেরেশতার আত্মা। যখন যে আত্মা মানুষটির মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে, তখন তার স্বভাব ও আচরণও তেমন হয়ে উঠে।

মানুষের মধ্যে মানবাত্মা ও পরমাত্মা সক্রিয় হলে সেইলোক মানবিক হয়ে উঠে। ভাল- মন্দ যাচাই করে। হালাল-হারাম মেনে চলে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেই পরিচালিত করে তার জীবন। হঠাৎ কোনো গুনাহ করে ফেললে সাথে সাথে তাওবাহ করে ফেলে। তাওবাহ করার আগ পর্যন্ত মনে শান্তি পায় না。

পশুরাত্মা বা হিংস্র আত্মা সক্রিয় হলে লোকটি তখন আর মানুষ থাকে না, হিংস্র পশুর মতো আচরণ শুরু করে। আর ফেরেশতার আত্মা সক্রিয় হলে সে আর গুনাহ করে না। গুনাহের প্রতি তার আর কোনো আকর্ষণই থাকে না। তখন লোকটি প্রথম শ্রেণির মুত্তাকিতে পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মুত্তাকি হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 চূড়ান্ত সফলতা

📄 চূড়ান্ত সফলতা


মুত্তাকিরা হাশরের মাঠে আল্লাহর বিশেষ মেহমান হবে। সারাটা রমজান আমরা মনের বিরুদ্ধে সাধনা করি। যেমন ইফতার করার পর কিছু সময় আরাম করতে, ঘুমাতে মনে চায়; কিন্তু আপনি মনের বিরুদ্ধে গিয়ে শুধু ইশার নামাজই পড়লেন না, দীর্ঘ তারাবির নামাজেও দাঁড়িয়ে গেলেন। তো এটা হলো মনের বিরুদ্ধাচারণ। এটা জান্নাতের কাজ।

মনের বিরুদ্ধ আরেকটা কাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য ঘুম থেকে ওঠা। রমজান ছাড়া কতজন তাহাজ্জুদের জন্য উঠেন? বরং রমজান ছাড়া অন্য মাসে এই সময়ের ঘুমটা খুব আরামের ঘুম হয়। কিন্তু এই আরামের ঘুমকে হারাম করে তাহাজ্জুদের জন্য জেগে ওঠা, এটাই জান্নাতের কাজ। রাসুল বলেন, حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ অর্থাৎ, মনে চায় না, তারপরও মনের বিরুদ্ধে গিয়ে এই ধরনের কাজ করা হলো জান্নাতের কাজ।

রমজানের সকল কাজই জান্নাতের কাজ। কারণ, প্রতিটির আলোচনা করলেই দেখবেন, সবগুলোই মনের বিরুদ্ধে। মন চায় খাদ্য গ্রহণ করতে কিন্তু খাই না। মন চায় পান করতে কিন্তু পান করি না। মন চায় ঘুমাতে কিন্তু ঘুমাই না। মন চায় আরাম করতে কিন্তু আরাম করি না। শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য এভাবে মনের বিরুদ্ধাচারণ করলাম।

এবার রমজান শেষে ঈদের দিন আল্লাহর বিরুদ্ধে নাফরমানির কাজ করব কীভাবে? এটা তো খেয়েদেয়ে বমি করার নামান্তর। ঈদের পর এমন কাজ কেন করব, যাতে গুনাহ হয়? এরকম গর্হিত কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। তাহলে এই তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর তৈরি জান্নাতের অধিকারী হবেন। আর এটাই হলো ঈদের শিক্ষা।

ঈদের আরেকটা শিক্ষা হলো, আমরা যে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহের মাঠে যাই, এই নামাজটা মাঠে পড়া সুন্নাত। অবশ্য বৃষ্টি থাকলে মসজিদে পড়া সুন্নাত। কারণ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েছেন।

ঈদের জামাত; এটা হলো হাশরের মাঠের একটা নমুনা। হাশরের ময়দানে মানুষ যখন জমায়েত হবে, তখন মানুষের অবস্থা বিভিন্ন রকমের হবে। কেউ কেঁদে কেঁদে আসবে, কেউ হেসে হেসে আসবে। যেমন আমরা অনেকেই মনের দুঃখে কেঁদে কেঁদে আসি যে, গত বছর আমার বাবা ঈদের জামাআতে ছিলেন, কিন্তু এ বছর নেই। এই কান্না দেখা যায় না কিন্তু অন্তর ভারাক্রান্ত। বন্ধুর কথা মনে করেও কেউ কাঁদে যে, গত বছর বন্ধুকে নিয়ে একসাথে ঈদ করলাম, কিন্তু এ বছর বন্ধু নেই।

আবার অনেকে হাসতে হাসতে ঈদগাহে এসেছেন। তার মনে কোনো কষ্ট নেই। ঠিক এরকম অবস্থা হবে হাশরের ময়দানে। সকল মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। একদল মুত্তাকি, আরেক দল মুত্তাকি নয়। যারা মুত্তাকি, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,

يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمٰنِ وَفُدًا

মুত্তাকিদেরকে হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে বিশেষ মেহমান হিশেবে পেশ করা হবে। যে যত বেশি সম্মানী হয়, তার মেহমানেরও তেমন সম্মান হয়ে থাকে। হাশরের ময়দানে যারা মুত্তাকি, যারা দীর্ঘ একমাস তাকওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছে, এই তাকওয়া নিয়ে যদি মরতে পারে, বমির মতো যদি উদ্‌দ্গীরণ না করে, তবে হাশরের ময়দানে আল্লাহর মেহমান হবে। আর এটা সাধারণ মেহমান নয়, বিশেষ মেহমান। যারা গুনাহগার, তাকওয়ার উপর থাকতে পারল না, তাদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

وَ نَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا

পিপাসার্থ অবস্থায় তাদেরকে টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন পিপাসা আরও বেড়ে যাবে। [সুরা মারইয়াম: ৮৬]

আল্লাহ আমাদের সকলকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। মূলত জাহান্নাম থেকে রক্ষার জন্যেই আল্লাহ তাআলা রমজান মাস দিয়েছেন। রমজান মাসে খাবার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহপাক খাবার বন্ধ রেখে তাকওয়ার এই প্রশিক্ষণ দিলেন কেন? খাবার গ্রহণ করলেই গুনাহের কাজ করার শক্তি মিলে। আর শয়তানেরও শক্তি জুগিয়ে দেয়। হাদিস শরিফে নবিজি বলেন,

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدم

মানুষের শরীরের মধ্যে রক্তের সঞ্চালন যেভাবে হয়, রক্ত যেভাবে চলাচল করে, শয়তানকেও আল্লাহ এমন ক্ষমতা দিয়েছেন যে, সে-ও মানুষের রগে-রেশায় চলে। এত ক্ষমতা দিয়েছেন আল্লাহ। এই ক্ষমতাটা বেশি কাজে লাগে যখন রক্ত চলাচল বেশি হয়। খানাপিনা না থাকলে রক্ত চলাচল বেশি হবে না, তখন শয়তানের শয়তানির প্রভাবও কমে যায়। আর যখন খানাপিনা করে, তখন শরীরে শক্তি বৃদ্ধি পায়, রক্ত সঞ্চালন বেশি হয়, শয়তানও তার কু প্রভাব বেশি বিস্তার করতে পারে। তখন ব্যক্তি গুনাহ করতে উদ্যত হয়। এ জন্য আল্লাহ তাআলা পুরো একমাস হালাল খাদ্যকে হারাম করে শয়তানের চলাচল ও সঞ্চালনকে মোকাবিলা করার একটা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণটা শুধু একমাসের জন্য নয়; বরং এই একমাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরা বছর যেন পরিচালনা করতে পারি, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

আমরা সারা বছর নিজেকে পরিচালনা করব কীভাবে? রমজানের শিক্ষা তো ঈদের রাতেই বমির মতন উদ্‌দ্গীরণ করে ফেলি। এ থেকে হেফাজতের জন্য আলোচনার তাকরার করা হচ্ছে। একই আলোচনা বারবার করা হচ্ছে। সকলের কাছে করজোড়ে মিনতি, দয়া করে ঈদ নিয়ে কোনো তামাশা করবেন না। আমাদের ঈদ হলো ইবাদত। ঈদের দিন কোনো গুনাহের উৎসব হতে পারে না। যদি গুনাহের উৎসব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন, তবেই এটা স্বার্থক ঈদ।

لَيْسَ الْعِيدُ لِمَنْ لَبِسَ الْجَدِيدَ : إِنَّمَا الْعِيدُ لِمَنْ خَافَ الْوَعِيدَ

ভালো কাপড় পরিধান করার নাম ঈদ নয়, বরং ঈদ হলো আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করা। এটাই আসল ঈদ। لِبَاسُ التَّقْوَىٰ বা তাকওয়ার পোশাক পরিধান করা, এটাই আসল ঈদ। সুন্দর পোশাক পরিধান করে গুনাহ করলেন, এটা আসল ঈদ নয়। আসল ঈদ হলো তাকওয়ার পোশাক পরিধান করা। আসল ঈদ হলো গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করা। এ জন্য আমাদেরকে আসল ঈদের দিকেই যেতে হবে, নতুবা এই ঈদ আমাদের জন্য শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এই শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা দরকার। পরিবার পরিজনকেও রক্ষা করা দরকার। এরকম দরকারি কাজ যদি আমরা করতে পারি, তবে দুনিয়াতে যেভাবে একত্রে আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করছি, ঠিক সেভাবে আখিরাতেও আনন্দের সাথে আল্লাহর মেহমান হতে পারব।

وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا

যাদেরকে টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, আমরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন ভয়ংকর বিপদ থেকে রক্ষা করে ঈদের যে ফজিলত আছে, তা অর্জনের তাওফিক দিন।

আল্লাহ এ জন্য পথও বলে দিয়েছেন যে, মুসলমানের ইবাদত শেষ নয়, বরং মরণ পর্যন্ত মুসলমানকে ইবাদত চালিয়ে যেতে হবে। রমজানের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা চমৎকার অফার রয়েছে। অফারটি হলো কেউ যদি শাওয়াল মাসে ৬টি নফল রোজা রাখতে পারে, তবে তার আমলনামায় সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব লিখে দেওয়া হবে। সুবহানাল্লাহ। সারা বছর রোজা রাখলে যে সওয়াব, মাত্র ৬টা রোজা রাখলেই এই সওয়াবের একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। নবিজি বলেন,

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِنًا مِنْ شَوَّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ

রোজা অবস্থায় তাকওয়া অর্জন হয়। আর তাকওয়া হলো শয়তানের বিরুদ্ধে একটি বুলেট। এ জন্য আমরা এই ৬টি রোজা রাখার চেষ্টা করব। এগুলো লাগাতারও রাখা যায়, আবার একটা একটা করেও রাখা যায়। এই সুযোগ দিয়েছেন আল্লাহ। অন্যান্য কাজা রোজা থাকলে এগুলো শাওয়ালের পরেও রাখতে পারবে; কিন্তু ৬ রোজার ফজিলত শাওয়ালের জন্যই নির্ধারিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই ফজিলত অর্জন করেই তবেই মৃত্যুবরণ করার তাওফিক দিন। আমিন।

সকল জিনিসেরই আসল বের হবার সাথে সাথেই নকল বের হয়ে যায়, ভালো জিনিস সৃষ্টি হলেই এর মধ্যে ভাইরাস ঢুকে যায়। সুতরাং, এ রকমের ভাইরাসমুক্ত ইবাদত যদি আমরা করতে পারি, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে একজন খাঁটি বান্দা হিসেবে দাঁড়াতে পারব। আর খাঁটি বান্দা হয়ে যেতে পারলেই জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে। আল্লাহ বলেন,

فَادْخُلِي فِي عِبْدِي وَادْخُلِي جَنَّتِي

তোমরা আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও; আর আমার তৈরি জান্নাতে প্রবেশ করো। [সুরা ফাজর: ২৯-৩০]

হে আল্লাহ, আমাদেরকে এরকম সঠিক বান্দা না বানিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। আমিন।

বছরে দুটি ঈদ আসে আমাদের সামনে। একটি রমজানুল মোবারকের শেষে, অপরটি জিলহজের ১০ তারিখে। তবে এই ঈদ পেয়ে আমরা ঈদে আকবর বা বড় ঈদের কথা ভুলব না। যেদিন আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, ওটাই আসল ঈদ। যেদিন আপনাকে লক্ষ করে বলা হবে, أَدْخُلُوْهَا بِسَلْمٍ أُمِنِينَ 'নিরাপত্তার সাথে জান্নাতে প্রবেশ করো।' এটা হলো আসল ঈদ। এ জন্য নবিজি রমজানে ইফতারের সময় মানুষের কী আনন্দ হয়, এটা বর্ণনা করে বলেন,

لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ

রোজাদারের আনন্দ দুটি : একটি ইফতারের সময়। কারণ, ইফতার আল্লাহর হুকুমে আমরা খাই, এখানে খাওয়ার আনন্দ। আল্লাহর হুকুম পালনের আনন্দ। ইফতার তো আল্লাহর হুকুম পালনের জন্যই করা হয়। ঠিক তেমনিভাবে ঈদের দিন আমরা কিছু না কিছু খাই। নবিজি ঈদের দিন বেজোড়সংখ্যক খেজুর খেতেন। এর মর্ম হলো, আল্লাহর হুকুম মানাই আসল আনন্দ। রোজাদারের দ্বিতীয় আনন্দ হলো, যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হবে। কাদের সাক্ষাৎ হবে? যারা আল্লাহর মেহমান হবে। কারা মেহমান হবে? যারা মুত্তাকি, পরহেজগার। আর বিশেষ মেহমান যারা হবে, আল্লাহর সাথেই তাদের সাক্ষাৎ হবে। রোজাদার রোজা রেখে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ মেহমান হবে। আর তখন বিশেষ মেহমান হিশেবে সাক্ষাৎলাভের আনন্দ উদযাপন করবে।

আল্লাহ পাক আমাদেরকে আনন্দের সাথে তাঁর সাক্ষাতলাভের মাধ্যম হিশেবে কবুল করুন। আমিন。

ফন্ট সাইজ
15px
17px