📄 পরকালে বিশ্বাস
ঈমানের অপরিহার্য অংশ হলো আখিরাতে বিশ্বাস। মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন এবং সে জীবনে বিশ্বাস করতে হবে। সুরা বাকারার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ 'এবং তারা আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস করে।' [সুরা বাকারা : ৩]
সেদিন জাহান্নামিরা বলবে, আখেরাতের ব্যাপারে আমাদের ধারণা ছিল না। বিশ্বাস ছিল না। তাই আমি চিন্তা করিনি। কবরে-হাশরে কী হবে, আমি ভাবিনি। আল্লাহ বলেন, وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَومِ الدِّينِ ‘(তারা বলবে) আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৬]
হাশরের দিন যখন আল্লাহ নেককারদের পুরস্কার আর বদকারদের শাস্তি দেবেন, ওই দিনের কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। দুনিয়ার পিছনে পড়ে আখিরাতকে ভুলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ বলেন, حَتَّى اَثْنَا اليَقِينُ 'অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৭]
হঠাৎ করে মৃত্যু এসে গেল। এখানে ইয়াকিন অর্থ মৃত্যু। আর মৃত্যু যখন আসবে, নির্ধারিত সময়েই আসবে। এক সেকেন্ড আগেও না, এক সেকেন্ড পরেও না। আল্লাহ বলেন, فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ ﴾
অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না। [সুরা আরাফ: ৩৪]
যখন মৃত্যু আসবে এক সেকেন্ডও হেরফের হবে না। যে মুহূর্তে যাওয়ার দরকার তখনই প্রাণ পাখি উড়ে চলে যাবে, অথচ আমার কোনো খবর নেই। আমি তো গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হওয়া আসামি। যে কোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এটা হলো ইয়াকিন। যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। মৃত্যুকে তাই ইয়াকিন বলে।
ইয়াকিন তিন প্রকার: ১. ইলমুল ইয়াকিন, ২. হাক্কুল ইয়াকিন, ৩. আইনুল ইয়াকিন। এই তিন প্রকার ইয়াকিনের কথাই কুরআনে বর্ণিত আছে। ইলমুল ইয়াকিন হলো, বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। কেবল বিশ্বাস হলে হবে না, সঙ্গে বিশুদ্ধ জ্ঞান লাগবে। আইনুল ইয়াকিন চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। যেন সে নিজ চোখে দেখছে। আর, হাক্কুল ইয়াকিন বাস্তবতার মাধ্যমে বিশ্বাস। আল্লাহ বলেন, اَلْهُكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা তেমাদের মধ্যে পেয়ে বসেছে। যতক্ষণ-না তোমরা কবরে উপনীত হও। [সুরা তাকাসুর: ১-২]
অর্থাৎ, সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় তোমরা ব্যস্ত থাকবে, আর কবরের ডাক চলে আসবে। এখন তুমি যদি এসব জিনিস পেছনে ফেলে কবরে কী নিয়ে যাওয়া যায়, হাশরের ময়দানে কী নিয়ে উঠা যায়, কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যায়, জাহান্নাম থেকে বাঁচা যায়, এগুলো নিয়ে চিন্তা করো, উপকরণ প্রস্তুত করো, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহ সুসংবাদ রেখেছেন। এরপর আল্লাহ বলেন, كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ
কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৩]
অর্থাৎ, সম্পদবৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া তোমার জন্য কখনো ঠিক হয়নি। কিন্তু এমন সম্পদ, যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয়, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ
নেককারের জন্য উত্তম মাল কতইনা ভালো! কেউ যদি নেককাজে তার সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে নেককার বানিয়ে দেন। সুতরাং সম্পদ থাকলে সেটা যদি ভালো কাজে ব্যবহারের নিয়ত থাকে, তবে সম্পদ অর্জন দোষণীয় নয়। আর যে সম্পদ তোমাকে কবর ভুলিয়ে দেয়, হাশর ভুলিয়ে দেয়, জান্নাত ভুলিয়ে দেয়, জাহান্নাম ভুলিয়ে দেয়, আল্লাহ ভুলিয়ে দেয়, নবি ভুলিয়ে দেয়, এমন সম্পদ অর্জন দোষণীয়। তবে যে সম্পদের কারণে আল্লাহর ভালোবাসা বেড়ে যায়, নবির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়, আখিরাতের সামানা তৈরি করা যায়, এটা হলো নি'মাল মাল বা উত্তম সম্পদ।
আল্লাহ বলেন, কাল্লা সাওফা তা'লামুন অর্থাৎ, যা করতেছ, তা অতিসত্বর তোমরা জানতে পারবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ধমক। হাশরের ময়দানে উপস্থিত হতেই হবে। সে দিন কয়েকটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না। আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাকে যে জীবন দিয়েছিলাম, তা কোন খাতে ব্যয় করেছ? এখন জবাব দাও। তোমার যৌবন কোন খাতে ব্যয় করেছ, জবাব দাও। তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছিলাম, তা কীভাবে অর্জন করেছ, কীভাবে ব্যয় করেছে, জবাব দাও। তোমাকে যে জ্ঞান দিয়েছিলাম, সেই জ্ঞান অনুযায়ী তুমি কতটুকু আমল করেছ, জবাব দাও। হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, কিয়ামতের দিন এই প্রশ্নসমূহের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না।
এ জন্য كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ বলে আল্লাহ একটি হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সে দিন তোমাদের খবর হবে। জানতে পারবে সব। এরপর আবারও ধমক দিয়ে আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ
তারপর কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৪] অর্থাৎ, আমি আবারও বলছি, তোমাদের এ কাজ ঠিক হয়নি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, তোমরা যা করতে। পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,
كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ
কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে। [সুরা তাকাসুর: ৫] অর্থাৎ, এটা করা কখনো ঠিক হয়নি। যদি তোমরা জানতে, ইলমুল ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞান যদি তোমরা অর্জন করতে, আল্লাহর কথা মানতে, নবির কথা বিশ্বাস করতে, তবে কখনো এমনটা করতে না। দুনিয়ার পিছে দৌড়াতে না; বরং আখিরাতের সামানা অর্জনের সচেষ্ট থাকতে। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সুতরাং এখানে তোমরা দুনিয়ার পিছনেও লাগতে পারো, আখিরাতের সামানাও অর্জন করতে পারো, এই সুযোগ রয়েছে। তবে বুদ্ধিমানের কাজ হলো আখিরাতের সামানা অর্জন করা। এক হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ. وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ
যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে স্বীয় আয়ত্তাধীন রেখেছে এবং মৃত্যুর পরের জন্য নেকির পুঁজি সংগ্রহ করেছে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত সফল ও বুদ্ধিমান। আর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে আল্লাহর প্রতি ক্ষমার আশা পোষণ করে, মূলত সে-ই অক্ষম (নির্বোধ)।
সত্যিকার বুদ্ধিমান হলো সে, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এবং এমন আমল করে, যে আমলের কারণে আখিরাতে নাজাত পায়। আল্লাহ বলেন,
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتْنِ
আর যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে, তার জন্য থাকবে দুটি জান্নাত। [সুরা আর-রাহমান: ৪৬]
সত্যিকার বুদ্ধিমানরা তাদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নফস গুনাহ করতে চায় কিন্তু আল্লাহর ভয়ে করে না। আর আল্লাহর ভয়ে যে গুনাহ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে স্পেশাল দুটি জান্নাতের মালিক বানিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ বলেন, যদি সে নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতো, অর্থাৎ, যদি বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হতো, তবে সে কখনো দুনিয়ার পিছনে ছুটত না। অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করত না; বরং হালাল পন্থায় প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনেই সে সন্তুষ্ট থাকত। আর এমন ব্যক্তি মৃত্যুর সাথে সাথেই জান্নাতে পৌঁছে যেত। পরের আয়াতে আল্লাহ আবারও ধমক দিয়ে বলেন,
لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ ۞ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ ۞ ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ
অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। আবার বলি, তোমরা তা অবশ্য অবশ্যই দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। তারপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা তাকাসুর: ৬-৮]
যারা শুধু দুনিয়া অর্জনের পেছনে হরদম মত্ত থাকতে, অবশ্যই অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। সেদিন তোমরা স্বচক্ষে জাহান্নাম দেখতে পাবে। অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে দুনিয়াতে দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
মোটকথা, দুটি বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, একটা হলো ইলমে ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস করতে হবে। অপরটি আইনুল ইয়াকিন বা চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে। অর্থাৎ, সে চাক্ষুষভাবে জান্নাত-জাহান্নাম দেখবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়াতে কীভাবে দেখবে? হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, একজন মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার সামনে জান্নাত-জাহান্নাম পেশ করা হয়। সে যদি জান্নাতি হয়, তবে জান্নাত দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে, আর জাহান্নামি হলে জাহান্নাম দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে। এসময় তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তোমার নামে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, জাহান্নামও বরাদ্ধ ছিল। দুনিয়ার সকল মানুষের নামেই একটা জান্নাত এবং একটা জাহান্নাম রয়েছে। আবু জাহলের নামেও জান্নাতও আছে, জাহান্নামও আছে। ঠিক তমনিভাবে আবু বকরের নামেও জান্নাত এবং জাহান্নাম রয়েছে। কিন্তু আবু জাহল জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নামই বেছে নিয়েছে। আর আবু বকর জাহান্নামের পরিবর্তে জান্নাত। তো এখন তার নামে যে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, সেটা কোথায় যাবে বা কে পাবে? এর উত্তর হলো, তার বরাদ্ধে থাকা জান্নাত তখন মুমিনকে বোনাস হিশেবে দিয়ে দেওয়া হবে।
এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, জাহান্নামিদের নামে বরাদ্ধ থাকা জান্নাত বোনাস হিশেবে জান্নাতিদের দান করা হবে। আর জান্নাতিদের নামে বরাদ্ধে থাকা জাহান্নাম তখন ওই জাহান্নামিদের দিয়ে দেওয়া হবে। এটা বোঝাতেই আল্লাহ 'জান্নাতান' বা দুটি জান্নাতের কথা বলেছেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বান্দার সামনে জান্নাত-জাহান্নামের পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরা হবে।
এখন যারা জান্নাতি, তাদের জান্নাত দেখতে পাওয়া- এই দেখা দুনিয়ার দেখা নয়, সেটা অন্যরকম দেখা। ফেরেশতারা তখন রেশমের রুমাল, জান্নাতি খুশবু ইত্যাদি নিয়ে আগমন করেন, তখন সে এসব দেখে হাসতে থাকে। আর জাহান্নামিরা মৃত্যুকালে জাহান্নাম দেখতে থাকে আর ভয় পেতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ (বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]
এ জন্য মৃত্যুপথযাত্রী জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে পায় কিন্তু তার নিকটে থাকার পরও আমরা দেখতে পাই না। দুনিয়ার চোখ-কান দিয়ে তা দেখা এবং শোনা যায় না। যেভাবে আপনার সাথে ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছে যে, তাকে কুকুর দৌড়াচ্ছে। তাই পেরেশান হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু আপনি পাশে থাকার পরও এটা দেখতে পাননি। ঠিক তেমনিই হবে সাকারাতের সময়ের অবস্থা। এ জন্য সাকরাতের সময় যারা আপনজন, তারাই তার পাশে থাকবে। সেসময় অযথা কান্নাকাটি চিল্লাচিল্লি করা ঠিক নয়। কেননা, এর মাধ্যমে সে কষ্ট পায়。
সাকরাতের সময় আমাদের করণীয় কি, এ সম্পর্কে রাসুল ﷺ বলেন, لَقَّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ তোমরা মৃত্যুর দুয়ারে থাকা ব্যক্তির কানের কাছে গিয়ে কালিমা পাঠ করো। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ভুল করে থাকি। কালিমার পড়ার জন্য চাপ দিই। বলাতে চেষ্টা করি। না, এটা ঠিক নয়; বরং তার কানের কাছে শুধু কালিমা পড়তে থাকবেন। এখন সে যদি একবার কালিমা পড়ে নেয়, তবে আর বলবেন না। এবং এ অবস্থায়ই যদি সে মারা যায়, নবিজি ﷺ বলেন, এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। নবিজি ﷺ বলেন, من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة যার সর্বশেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতি। এ জন্য সাকরাতের ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কার কখন কীভাবে মৃত্যু হবে, আল্লাহই ভালো জানেন। হে আল্লাহ, সাকরাতের সময় আমাদের শাস্তি দিয়ো না। ঈমানের সাথে আমাদের মৃত্যু নসিব করো। আমিন।
📄 শবে কদরের দুআ
আমরা আবারও আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের পবিত্র এ মাসে তাঁরই কালাম কুরআনচর্চায় নিয়োজিত রেখেছেন। আবারও বলি, আলহামদুলিল্লাহ। ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি যে, এই কুরআনের মাধ্যমে শুধু তারাই হিদায়ত লাভ করবে, যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। আর তাকওয়া এমন একটি ভূষণ, যা পরিধান করে আল্লাহর সামনে যাওয়া যায়। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেন,
لِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম পোশাক। সুরা আরাফ: ২৬]
আজ ২৬ রমজান দিবাগত রাত। মানে ২৭ এর রাত। এ রাতকে আমরা আমাদের ধারণামতে শবে কদর মনে করে থাকি। তবে এই তারিখই যে কদরের রাত, এমনটা নিশ্চিত নয়; বরং সম্ভাবনা আছে। কেননা, আল্লাহর রাসুল রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর তালাশ করতে বলেছেন। এ হিশেবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখেও শবে কদর হতে পারে। এ জন্য শুধু ২৭-এর রাতকে নির্দিষ্ট না করে সব বিজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ الْفِ شَهْرٍ লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। [সুরা কাদর: ৩]
আমি প্রথমে একটি আয়াত তিলাওয়াত করেছি, যাতে তাকওয়ার পোশাকের কথা বলা হয়েছে। আয়াতটি হচ্ছে, লিবাসুত তাকওয়া, জালিকা খাইর। অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়ার পোশাক পরিধান করতে বলেছেন। কেননা, এটি উত্তম পোশাক। জালিকা খাইর বলে এটাই বোঝানো হয়েছে। আর এই তাকওয়ার পোশাক, যা পরিধান করে বান্দা সহজেই আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।
আল্লাহ যে তাকওয়ার পোশাকের কথা বলেছেন, এটার অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে, আমরা সাধারণত বিভিন্ন পোশাক পরিধান করে থাকি। ঠান্ডা বা শীত থেকে রক্ষা পেতে গরম উলের কাপড় বা মোটা কাপড় অথবা জ্যাকেট পরি। তেমনি গরম থেকে বাঁচতে হালকা-পাতলা পোশাক পরি। আবার যখন কাজ করি, তখন একধরনের পোশাক পরি এবং ইবাদত-বন্দেগি বা মসজিদে নামাজ পড়ার সময় ভিন্ন পোশাক পরি। সফরের সময় আলাদা পোশাক পরি। এটা মূলত স্থান-কাল-পাত্রভেদে আমরা পরিধান করে থাকি। আমাদের নবিজি তিন ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। একটা শুধু ঘরে অবস্থানের সময়, আরেকটা জুমুআর দিন, আরেক ধরণের পোশাক পরতেন মেহমান বা অতিথির সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।
আমরা যেমন কাজের সময় একধরনের পোশাক পরি, আবার নামাজের সময় অন্য পোশাক পরি। কাজের পোশাক পরে মসজিদে যাই না, আবার নামাজের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরে কাজ করি না। তেমনি গরমের সময় ঠান্ডার পোশাক আর ঠান্ডার সময় গরমের পোশাক পরি না; বরং যখন যেটা মানানসই, সেটাই পরিধান করি।
তো আমাদেরকে আল্লাহর সামনে যেতে হলেও একটা পোশাক বা ইউনিফর্ম পরতে হবে। আর সেটা হচ্ছে তাকওয়ার পোশাক। আপনি যদি জান্নাতে যেতে চান, অবশ্যই আপনাকে তাকওয়ার ইউনিফর্ম পরিধান করতে হবে। লিবাসুত তাকওয়া বলে কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেটাই বলেছেন।
আল্লাহর সামনে যেতে হলে—যেতে হলে মানে—যেতে তো হবেই, আমাদেরকে তাকওয়ার পোশাক পরতে হবে। হাশরের ময়দানে সকলকে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। যেখানে বাহ্যিক পোশাকের কোনো দাম থাকবে না; বরং তাকওয়া নামক পোশাকের মাধ্যমেই আমাদেরকে জান্নাতের অধিকারী হতে হবে। এ জন্য দুনিয়াতেও অনেক বড় বড় মুত্তাকি-পরহেজগারকে আল্লাহ তাআলা তাকওয়ার পোশাক পরিধান করিয়ে থাকেন।
সুতরাং বোঝা গেল, আপনার কাছে যদি তাকওয়ার পোশাক থাকে, তাহলে দুনিয়ার পোশাকের কোনো প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার মানুষ যদি আপনাকে উলঙ্গও করে দেয়, তবু আল্লাহর কাছে আপনার দাম কমবে না। দুনিয়াতে এভাবে কেউ কাউকে উলঙ্গ করেছে, এমন নজির আপনাদের জানা আছে কি? মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, তখন তাঁর শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। কিন্তু এরপরও তাঁর সম্মান কমেনি; বরং আল্লাহ তাঁর সম্মান আরও বাড়িয়ে ঘোষণা দেন,
﴿مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَتْكُمُ الْمُسْلِمِينَ﴾
এটাই তোমাদের পিতা ইবরাহিমের দ্বীন, আল্লাহ তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম। [সুরা হজ: ৭৮]
নমরুদের লোকেরা নবি ইবরাহিমের শরীরের পোশাক খুলে ফেললেও তাঁর তাকওয়ার পোশাক খুলতে পারেনি। কিয়ামতের ময়দানে সকল মানুষকে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। তবে আল্লাহ সর্বপ্রথম দুজন মানুষকে পোশাক পরিয়ে কবর থেকে উঠাবেন। যে দুজনকে বিশেষভাবে সম্মানিত করবেন, তাদের একজন হলেন আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অন্যজন হবেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম।
এখন প্রশ্ন হলো, তাকওয়ার পোশাক আপনি কোথায় পরবেন? এ প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, নবিজি-কে প্রশ্ন করা হলো, 'তাকওয়া কোথায়, তখন নবিজি উত্তর দিলেন, 'এখানে এখানে এখানে (এটা বলে তিনি তাঁর বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন)।
আপনারা পোশাক পরেন কেন? উত্তরে বলবেন, ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য। এই উদাহরণ আমেরিকা হিশেবে দেওয়া। ঠিক তেমনি আপনাকেও তাকওয়ার এমন পোশাক পরতে হবে, যাতে আপনার অন্তরে গুনার আঁচড় না পড়ে। এ জন্য আল্লাহ বলেন, তাকওয়ার পোশাক পরিধান করো, এটাই উত্তম পোশাক। তোমরা যেভাবে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে উপযুক্ত পোশাক পরো, সেভাবে অন্তরকে গুনাহের কাজ থেকে রক্ষা করতে তাকওয়ার পোশাক পরো। আয়াতে আল্লাহ 'উত্তম' শব্দ বলে যে উত্তম বুঝিয়েছেন, সেটা অবশ্যই আমাদের অর্জন করতে হবে। লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ﴾
কদরের এ রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এখন আল্লাহর ভাষায় এই উত্তমের ব্যাখ্যা কী, সেটা আমাদের জানতে হবে। আমরা তো ২৭ তারিখে নির্ধারিত করে ফেলেছি। সেটা না করে যদি আমরা রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে শবে কদর সন্ধান করি, তাহলে নিশ্চিতভাবে কদরের বরকত আমাদের অর্জিত হয়ে যাবে। আর যদি কেউ তার জীবনে মাত্র একটি কদরও পেয়ে যায়, তাহলে প্রায় ৮৪ বছর একনাগাড়ে ইবাদত করে সে যে মর্যাদা লাভ করতে পারতো, মাত্র একরাতেই তা পেয়ে যাবে।
কদরের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। কদরের অর্থ সম্মান। আমরা যেমন শব্দটি ব্যবহার করি যে, অমুকের বাড়িতে গিয়েছিলাম কিন্তু তারা কোনো কদর করেনি। এটা সিলেটী একটা বাগধারা। এখন কেউ যদি বাস্তবেই লাইলাতুল কদরের সন্ধান করে এবং তা লাভ করতে পারে, তাহলে তার জীবন সফল। হাজার মাস ইবাদত করে সাওয়াব লাভ করতে পারত না, সেটা মাত্র এক রাতেই সে লাভ করে ফেলবে।
আম্মাজান হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি একবার নবিজির কাছে জানতে চান, 'আল্লাহর রাসুল, আমি যদি শবে কদর পেয়ে যাই, তাহলে কোন দুআ পড়ব?' নবিজি তখন বললেন, 'তুমি যদি শবে কদর পেয়ে যাও, তাহলে এই দুআ করবে, اللَّهمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ، فَاعْفُ عَنِّي
হে আল্লাহ, আপনি মার্জনাকারী। আপনি মার্জনা করা পছন্দ করেন। অতএব আপনি আমাকে মার্জনা করুন।
শবে কদরের কিছু বাহ্যিক আলামত রয়েছে। যে রাত শবে কদর, সেই রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকবে, বেশি ঠান্ডাও হবে না, গরমও হবে না। যে রাত শবে কদর, সেই রাত অন্যান্য রাতের চেয়ে ইবাদতের প্রতি বেশি আগ্রহ তৈরি হবে। শরীর-মনেও একটা ভালোলাগা কাজ করবে। কেননা, শবে কদর যেদিন দিবাগত রাতে হবে, সে রাতে আসমান থেকে রহমতের ফেরেশতারা দলে দলে পৃথিবীতে আগমন করতে থাকেন। ফলে পুণ্যবানদের পদভারে জমিনের বাসিন্দারাও অন্যরকম একটা প্রশান্তি অনুভব করে। এ হচ্ছে বাহ্যিক আলামত।
নবিজি কর্তৃক আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকাকে শিখিয়ে দেওয়া শবে কদরের দুআ, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফউয়া, ফা'ফু আন্নি- এই দুআ শুধু আরবিতে করতে হবে, এমন নয়। বরং যেকোনো ভাষায় অর্থাৎ আপনার মাতৃভাষায়ও করতে পারেন। ভাষা হচ্ছে আল্লাহর দান। আর সারা পৃথিবীতে ভাষার বিচিত্র ব্যবহার রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে সাড়ে চার হাজারেরও অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। বলা হয়, প্রতি ১৬-১৯ মাইল পর পর ভাষার তারতম্য রয়েছে। এ জন্য, এক দেশের গালি অন্য দেশের বুলি।
আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন— শব্দের প্রায় পাঁচটি অর্থ রয়েছে। কুরআনের আয়াত দিয়েই উদাহরণ দিচ্ছি।
১. আফুউউন শব্দের অর্থ মিটানো বা মুছে দেয়া। মানে গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া। আল্লাহ হচ্ছেন গুনাহ মোছনকারী। যেহেতু সুরা বাকারার তাফসির চলছে, এ সুরার একেবারে শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَنَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ
আর আপনি আমাদের মার্জনা করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন, আর আমাদের উপর দয়া করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব আপনি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। [সুরা বাকারা: ২৮৬]
সুনানুত তিরমিজির এক বর্ণনায় রয়েছে, মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে কালো একটি দাগ পড়ে। আর মানুষ তখনই গুনাহ করে, যখন তার মধ্যে তাকওয়ার পোশাক থাকে না। লাকড়ি দিয়ে রান্নার ফলে পাতিলের তলা যেমন কালচে হয়, ঠিক তেমনি গুনাহের কারণেও মানুষের অন্তর কালো হয়। তাই তাকওয়া না থাকার কারণে আমাদের অন্তর যখন কালো হয়ে যায়, তখন এটা দূর করতে হলে নবিজির শেখানো দুআ পাঠের বিকল্প নেই।
আফুউউন শব্দের আরেক অর্থ অতিরিক্ত। যিনি অতিরিক্ত দেনেওয়ালা। অর্থাৎ, বেশি করে বোনাস দেন যিনি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ইয়াসআলুনাকা মাজা ইউনফিকুন অর্থাৎ, হে রাসুল! আপনাকে তারা প্রশ্ন করে, আমরা কী খরচ করব? আমরা কি সদকা, ফিতরা, যাকাত ইত্যাদি বেশি করে খরচ করব? এর উত্তর আয়াতের পরের অংশেই রয়েছে, কুলিল আফওয়া। হে নবি, আপনি বলে দিন, তারা যেন অতিরিক্ত জিনিস খরচ করে। যাকাত যে দিচ্ছে, এটা হচ্ছে ফরজ কাজ। আর জাকাত দিলেই শেষ হয়ে যায় না। কেননা, এটা গরিবের প্রতি আপনার অনুগ্রহ নয়; বরং আপনার প্রতি গরিবের অনুগ্রহ।
আপনি জাকাত দিয়ে গরিবকে দয়া করেননি, বরং সে আপনার জাকাত গ্রহণ করে আপনার উপর দয়া করেছে। কারণ, জাকাত খাওয়া তার জন্য ফরজ নয়, এটা তার অপারগতা, কিন্তু জাকাত আদায় করা আপনার জন্য ফরজ। সে জাকাত গ্রহণ না করলে গুনাহগার হবে না, কিন্তু আপনি জাকাত আদায় করার ক্ষেত্র না পেলে জাকাত না দেওয়ার কারণে জাহান্নামি হবেন।
আপনি মসজিদে নামাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন এবং পথিমধ্যে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এখন কেউ একজন আপনাকে ধরে তুলল এবং হাতে ধরে মসজিদে নিয়ে গেল। এই যে আপনার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, এই নামাজ তো ফরজ ইবাদত। এই যে একজন আপনাকে সহায্য করল, এটা হচ্ছে ইহসান। আপনাকে সে অতিরিক্ত কিছু দিল। আপনার হাত ধরে আপনাকে মসজিদে পৌঁছে দেওয়া লোকটির দায়িত্ব ছিল না। আফুউউন শব্দের অর্থ অতিরিক্ত। যিনি অতিরিক্ত দেন, আর তা দেবেন আমাদের চাওয়ার মাধ্যমে। এ জন্য আল্লাহর রাসুল এই দুআ পড়তে বলেছেন।
আফুউউন এর আরেক অর্থ হচ্ছে দান করা। ইন্নামা আনা কাসিমুন ওয়াল্লাহু ইউতি। নবিজি বলেন, দাতা হলেন আল্লাহ, আর আমি হলাম বণ্টনকারী। এ জন্য আমাদের যে কোনো প্রয়োজনে আমরা আল্লাহর কাছে চাইব। যেমন আল্লাহর কাছে রিজিক চাওয়া। সহিহ বুখারিতে আছে, আল্লাহ মানুষকে ডেকে ডেকে বলেন, 'কে আছ চাইবে, আমি তাকে রিজিক দেবো।
আফুউউন এর অন্য অর্থ হচ্ছে ক্ষমা। অর্থাৎ ক্ষমা করে দেওয়া, যাতে কোনো শাস্তি থাকে না। কেউ কোনো ভুল করলে তাকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া। অনেকে দেখা যায়, শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা তো করে দেয়, তবে এমন কিছু কথা বলে, যা শাস্তি থেকেও বড় হয়ে যায়। কলিজায় আঘাত লাগে। যেমন কেউ বলল, তুই আমার সাথে যা করেছিস, তাতে উচিত ছিল থাপড়ে তোর সব দাঁত ফেলে দেওয়া। কিন্তু যা, আমি তোকে ক্ষমা করে দিলাম। এটা আফুউউন নয়। আর যারা এমন করে না, অর্থাৎ কেউ অপরাধ করলে উল্টো তাকে সরি বলে, যেখানে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, এরপরও সে তা করে না, এমন ব্যক্তির ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ফামান আফা ওয়াসলাহা ফা-আজরুহু আলাল্লাহ। যে কাউকে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করে দেয়, কোনো ফেরেশতা তাকে পুরস্কার দেবেন না; বরং কিয়ামতের দিন তার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ দেবেন। যে দিন সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে,
لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
আজ রাজত্ব কার? এক প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর। [সুরা মুমিন: ১৬]
শবে কদরের রাতে বেশি করে اللَّهِمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ، فَاعْفُ عَنِّي এই দুআ পড়া এবং কান্নাকাটি করে দুআ করা উচিত। হে আল্লাহ, আমি অনেক পাপ করেছি, অপরাধ করেছি, আমাকে আপনি ক্ষমা করে দিন।
এ জন্য শবে কদর তথা পুরো রমজানেই আল্লাহর কাছে পাপমোচনের জন্য তাওবা এবং প্রয়োজনীয় বিষয় চাওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতসহ নফল ইবাদত বেশি করে করতে হবে। এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। তাই এ মাসে কুরআন তিলাওয়াতে অফুরান সাওয়াব রয়েছে। এ ছাড়া অতীতের কাজা নামাজ বা উমরি কাজা আদায় করা জরুরি। কারণ, এটা আল্লাহর কাছে আপনার ঋণগ্রস্থতা। যদি কাজা নামাজ আদায় না করেন, তাহলে পরকালে আটকে যাবেন। যেভাবে কোনো মানুষের কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নিলে সেটা সময়মতো পরিশোধ করা কর্তব্য, ঠিক তেমনি ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা ফরজ। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الصَّلوةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَبًا مَّوْقُوْتًا
নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। [সুরা নিসা: ১০৩]
এ ছাড়া বান্দার কাছে যেভাবে ঋণগ্রস্থ হলে তা সময়মতো আদায় করতে হয়, তেমনি আল্লাহর কাছে যে আপনি ঋণগ্রস্থ, সেটাও আপনাকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ জন্য ফজরের সময় ফজরের কাজা নামাজ, জুহরে জুহরের কাজা নামাজ, এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের কাজা নামাজ পড়বেন। প্রতিটি নামাজের সময় প্রতিদিন কিছু কিছু করে অতীতের কাজা নামাজ পড়বেন।
অনেকে বলেন, কাজা নামাজ বলে কিছু নেই। কথাটি সঠিক নয়। কেউ যদি তার জীবদ্দশায় কাজা নামাজ আদায় করার সুযোগ না পেয়ে মারা যায়, তাহলে তার ওয়ারিসানের উচিত হলো মৃতের কাজা নামাজগুলো হিসাব করে করে কাফফারা আদায় করা। এক ওয়াক্ত নামাজের কাফফারা একটি ফিতরার সমমূল্য। প্রতিদিন ৬ ওয়াক্ত নামাজ হিসাব করে ফিতরা দিতে হবে। ফজর, জুহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও বিতর।
এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করা দরকার। সহিহ বুখারিতে আছে, একবার এক নারী নবিজির কাছে এসে জানতে চান, আল্লাহর রাসুল, আমার বাবা অত্যন্ত অসুস্থ, হাঁটাচলার সামর্থ নেই; কিন্তু হজ করার নিয়ত করেছিলেন, এখন আমি কি তার পক্ষে হজ করতে পারি? তখন নবিজি তাকে জবাব দেন, যদি তোমার পিতা কারও কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নেন, তাহলে সেটা কি তুমি তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে পারবে? মহিলা বললেন, হ্যাঁ। তখন নবিজি বলেন, তাহলে হজও করা যাবে। এই হাদিস থেকেই ফুকাহায়ে কেরাম সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মৃতের পক্ষ থেকে হজ করলে সেই হজ যদি আদায় হয়, তাহলে তার পক্ষ থেকে নামাজের কাফফারা দিলে সেটা কেন আদায় হবে না। অবশ্যই হবে。
উমরি কাজা আদায়ের একটা পদ্ধতিঃ প্রথম ফজরের কাজা নামাজ দিয়ে শুরু করবেন। এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের নিয়ত করবেন। এখন কারও যদি ২০ বছরের নামাজ কাজা থাকে আর সে এই কাজা নামাজ শুরুর কয়েকদিন পরে মারা যায়, তাহলে হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সে তার নিয়তের কারণে ২০ বছর কাজা নামাজ পড়ে ফেলার সাওয়াব পাবে।
তেমনিভাবে কেউ যদি ২০ বছর কুফরির উপর থাকার নিয়ত করে, আর এই নিয়তের কয়েকদিন পরেই মারা যায়, তাহলে সে জাহান্নামে যাবে তার নিয়তের কারণে। কেননা, হজরত সাহল ইবনু সায়িদ আস-সায়িদি থেকে বর্ণিত হাদিস,
نِيَّةُ الْمُؤْمِنِ خَيْرٌ مِّنْ عَمَلِهِ ، وَعَمَلُ الْمُنَافِقِ خَيْرٌ مِّنْ نِيَّتِهِ ، وَكُلُّ يعمل على نيته ، فإذا عمل المؤمن عملا ، ثار في قلبه نور
মুমিনের নিয়ত অনেক সময় আমলের চেয়েও শ্রেয়। মুনাফিকের নিয়ত আমল থেকেও মারাত্মক। প্রত্যেকের আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। মুমিন যখন কোনো আমল করে, তখন সেটা তার কলবের মধ্যে নূর হিসাবে উদ্ভাসিত হয়।
কারণ, মুমিনের নিয়ত অনেক সময় আমলের চেয়েও শ্রেয়। কারণ, নিয়তে কোনো রিয়া বা লোক দেখানোর ব্যাপার থাকে না, কিন্তু আমলে রিয়া থাকতে পারে। আর রিয়াযুক্ত কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
কিয়ামতের দিন প্রথমেই নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নফল নামাজের কোনো হিসাব নেওয়া হবে না। ফরজের আগে যে সময় পাওয়া যায়, তাতে চাইলে ২-৪ রাকাত উমরি কাজা আদায় করা সম্ভব। বান্দার ফরজ নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। এখন যদি বান্দার ফরজ নামাজে ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই নফল নামাজ আছে কিনা, সেটা দেখা হবে। যদি থাকে, তাহলে সেটা দিয়েই তার ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। তার মানে এই নয় যে, আপনি কাজা নামাজগুলো আর আদায় করবেন না। কাজা নামাজগুলো আদায় করা ফরজ, যেমনভাবে কাজা রোজাগুলো আদায় করা ফরজ।
📄 রোজার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ কেন দেবেন
আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে রমজানের রোজাগুলো রাখার সুযোগ দিয়েছেন এবং রমজানের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা রমজানের শেষ পর্যায়ে আছি। এখন আমাদের করণীয় হলো, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যে, তিনি তাওফিক দিয়েছেন বলেই আমরা রোজাগুলো রাখতে পেরেছি। দ্বিতীয় করণীয় হলো, গত হওয়া রোজাগুলো নিয়ে অনুশোচনা করা যে, আমাদের রোজা, তারাওয়িহ ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আমলগুলো কবুল হয়েছে কি-না, সেটার জন্য নিজেকে প্রশ্ন করা এবং এটা স্বীকার করা যে, ‘হে আল্লাহ, আপনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছিলেন, সেভাবে করতে পারিনি। যেভাবে আপনাকে জানার কথা ছিল, সেভাবে জানতে পারিনি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এসব ভাঙাচোরা ইবাদতগুলো কবুল করে নিন এবং আমাদের ক্ষমা করে দিন।’ আর বেশি বেশি ইসতিগফার পাঠ করতে থাকা।
এখানে তাহাজ্জুদ সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা দরকার। তাহাজ্জুদ অত্যন্ত পুণ্যময় একটি ইবাদত। যারা আল্লাহওয়ালা, তাহাজ্জুদগোজার, তারা সারা রাত ইবাদতের মধ্যে কাটিয়ে দেন। এরপর শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। পবিত্র কুরআনে তাদের গুণাবলি আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত। [সুরা জারিয়াত: ১৮] অর্থাৎ, এরা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। কেঁদেকেটে বলে, ‘ওগো আল্লাহ, আমি যে ইবাদত করলাম, জানি না কবুল হয়েছে কি-না। আর আপনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন, সেভাবে করতে পারিনি। হে আল্লাহ, নিজ দয়াগুণে আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
এ জন্য বেশি বেশি ইসতিগফার করতে হবে। নিজের আমলের পর্যালোচনা করতে হবে। কেন পর্যালোচনা করব? কারণ, রমজানে দুটি বিশেষ আমল রয়েছে: একটি হলো রোজা, অপরটি হলো তারাবিহ। এখন আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর রোজা কেন ফরজ করলেন এবং নবিজি আল্লাহর নির্দেশে তারাবির নামাজকে সুন্নাত হিশেবে কেন সাব্যস্ত করলেন? এটা জানতে হবে।
রোজা কেন রাখতে হবে—এর বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘যাতে তোমরা মুত্তাকি হয়ে জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারো।’ আর মুত্তাকিদের জন্যই আল্লাহ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন। যে আল্লাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে, সে অবশ্যই মুত্তাকি। এ জন্য আল্লাহর ফরজ বিধান রোজা রেখে মুত্তাকি হয়ে নিজেকে জান্নাতের উপযোগী করার জন্য আল্লাহ আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন। সুবহানাল্লাহ। এবার আমরা لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর অর্থ সম্পর্কে আলোচনা করব।
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর অর্থ হলো, যাতে তোমরা বাঁচতে পারো। তবে কি থেকে বাঁচতে পারো, এটার উল্লেখ না থাকলেও এর ব্যাখ্যা হলো, তোমরা দুনিয়ায় যদি একটা জিনিস থেকে বাঁচো, তবে পরকালে আল্লাহও তোমাদের একটা জিনিস থেকে রক্ষা করবেন। এ জন্য মুফাসসিরগণ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর তাফসিরে লিখেছেন, الْعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ من المعاصی অর্থাৎ, দুনিয়াতে যদি তোমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারো, তবে আল্লাহ পরকালে তোমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। সুতরাং বোঝা গেল, রোজা ফরজ করা হয়েছে মানুষকে জান্নাতের উপযুক্ত বানাতে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন,
فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ
অর্থাৎ, যাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, তারাই মহা সফল। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৫]
হাদিস শরিফে রাসুলে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত তাসলিম বলেছেন,
من صام يوما في سبيل الله باعد الله وجهه عن النار سبعين خريفا
যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি নফল রোজা রাখে, তবে আল্লাহ তাআলা সেই নফল রোজাদারকে জাহান্নামের রাস্তা থেকে ৭০ বছরের দূরত্বে রাখেন। সুবহানাল্লাহ। তো নফল রোজার যদি এত ফজিলত হয়, তাহলে ফরজ রোজার ফজিলত কেমন হবে, ভেবে দেখা দরকার।
অন্য এক হাদিসে আছে, রাসুল বলেন,
من صام يوما في سبيل الله في غير رمضان بعد من النار مائة عام
রোজাদার ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন জাহান্নাম থেকে ১০০ বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন। উপর্যুক্ত দুটি হাদিসের মর্ম হলো, আল্লাহ রোজাদারকে জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে রাখবেন। অর্থাৎ, জাহান্নামকে সরিয়ে দেবেন। এ জন্য হাদিসে আছে, রাসুল একটি দুআ করতেন,
اللهم باعد بيني وبين خطاياي كما باعدت بين المشرق والمغرب হে আল্লাহ, আমার ও গুনাহের মধ্যখানে এমন নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও, যেভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে রেখেছ। আমাদেরকেও এই দুআ বেশি বেশি করে করতে হবে। যে নবির কোনো গুনাহ নাই, সেই নবি যদি এভাবে জাহান্নাম থেকে পানাহ চান, তাহলে আমাদের মতো গুনাহগারদের কতোবেশি পানাহ চাওয়া দরকার।
কীভাবে গুনাহ থেকে বাঁচা যায়
আল্লাহ তাআলা রমজানের রোজা ফরজ করেছেন, যাতে আমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারি। এবার দেখা যাক, গুনাহ থেকে কীভাবে বেঁচে থাকব। আমরা রমজানে দিনের বেলা কিছুই খাই না, তা যত হালাল এবং উন্নতই হোক না কেন। এমন কি জমজমের পানি অথবা আজওয়া খেজুর হলেও।
এই যে খাই না, এটা কার আদেশে? অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশে।
রমজানে দিনের বেলা কিছু খেতে আল্লাহ নিষেধ দিয়েছেন, তাই আমরা খাই না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর এই আদেশ পালন করল, রমজানের পুরো একমাস এই ট্রেনিং নিল, সে এটা করেছে একমাত্র আল্লাহর জন্যই। ফলে এমন ব্যক্তির অন্তরে যদি রোজার রুহ ঢুকে যায়, তাহলে সে কখনো গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে পারে না। আর আল্লাহর নিষেধ থেকে বেঁচে থাকাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার নামই তাকওয়া। এটাই হলো রোজার মূল ম্যাসেজ এবং রোজা ফরজ হওয়ার কারণ।
বান্দা আল্লাহর হুকুমে হালাল খাবার ত্যাগ করেছে, এ জন্য আল্লাহ তাআলা নিজেই রোজাদারের রোজার বদলা দেবেন। আপনাদের স্মরণ থাকার কথা, রমজানের শুরুর দিকে আমরা আলোচনা করে এসেছি রোজার প্রতিদান আল্লাহপাক স্বয়ং দেবেন। এব্যাপারে একটি হাদিসও উল্লেখ করেছিলাম, হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, الصوم ﻟﻲ وَأَنَا أَجْزِي ﺑﻪ ‘রোজা হলো আমার জন্য, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো।’ সুবহানাল্লাহ!
রোজা আল্লাহর জন্য, নামাজ কার
রোজা একমাত্র আল্লাহর জন্য। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে নামাজ কার জন্য? আমরা জানি, নামাজও আল্লাহর জন্য; কিন্তু আল্লাহ তাআলা রোজার ব্যাপারে যেভাবে ‘আমার জন্য’ বলেছেন, নামাজের ব্যাপারে কিন্তু এভাবে বলেননি। অথচ কুরআনে আল্লাহ বলেন,
﴿ قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ ﴾
বলো, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব। [সুরা আনআম : ১৬২]
আমার নামাজ, আমার রোজা, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছুই শুধু আল্লাহর জন্য। কিন্তু এরপরেও রোজার ব্যাপারে আলাদাভাবে কেন ‘রোজা আমার জন্য’ বললেন? এর উত্তর হলো, সব ইবাদতই আমরা আল্লাহর জন্য করি। নামাজ পড়ি আল্লাহর জন্য। এখন যদি আমার এই নামাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য হয়, তাহলে তো নামাজই হবে না। কুরআনে আল্লাহ বলেন,
﴿ أَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِى ﴾
আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো। [সুরা তাহা : ১৪]
অর্থাৎ, হে বান্দা, আমাকে স্মরণ করার জন্যই তুমি নামাজ আদায় করো, অন্য কাউকে দেখানোর জন্য নয়। এমনিভাবে হজও আমরা আল্লাহর জন্যই করি। কুরআনে আছে,
﴿ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَ مَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعُلَمِينَ ﴾
আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর যে কেউ কুফরি করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন। [সুরা আলে ইমরান: ৯৭]
এরপরেও রোজার ব্যাপারে আলাদাভাবে কেন ‘রোজা আমার জন্য’ বললেন? এর রহস্য উদ্ঘাটনে হাদিসবেত্তাগণ বলেন, আমরা যে নামাজ পড়ি, এটা নিশ্চিত আল্লাহর জন্য ইবাদত। কেউ যখন নামাজ পড়ে, তখন অন্যজন তার এই নামাজ দেখতে পায়। আর ফরজ নামাজ সকলে একসাথে মিলে জামাআতে আদায় করে। ফলে একে অন্যকে দেখা হয়ে যায়। এ জন্য নামাজ কোনো গোপন আমল নয়। মানুষ আপনাকে দেখে সহজে বুজে নেওয়া যায় যে, আপনি নামাজি। সুতরাং নামাজ যদিও একমাত্র আল্লাহর জন্য, তবে মানুষের চোখেও আপনি নামাজি হয়ে যান।
এমনিভাবে জাকাত একটি ফরজ ইবাদত এবং এটা প্রকাশ্যে আদায় করা সুন্নাত। যেভাবে আমরা প্রকাশ্যে জামাআতে নামাজ পড়ি, ঠিক সেভাবে জাকাতও একটি প্রকাশ্য আমল। জাকাত আমরা প্রকাশ্যে দেব। এতে অন্যরা উৎসাহিত হবে। তবে এমন যেন না হয় যে, জাকাতের নাম দিয়ে কিছু কাপড় দিলেন এবং জাকাত গ্রহীতাদের লম্বা সারি দাঁড় করালেন। বরং জাকাতদাতা তার সব সম্পদের হিসাব করে প্রকৃত হকদারদের মধ্যে জাকাত পৌঁছে দেবে।
তবে জাকাত দেওয়ার সময় 'এটা জাকাতের মাল' এভাবে বলার দরকার নেই। গিফট, হাদিয়া বা উপঢৌকন ইত্যাদি শব্দেও বলা যেতে পারে। এটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি বিষয়। কেউ যদি জাকাতের নিয়ত ছাড়াই অনেক সম্পদ বিলিয়ে দেয়, তবে তার জাকাত আদায় হবে না। এটা সদকা হয়ে যাবে। এ ছাড়া যে জাকাত গ্রহণের হকদার নয়, তাকে জাকাত দিলে আদায় হবে না। আপনার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যদি কেউ কেউ হকদার থাকেন, তবে তাকেই জাকাত দেন। কিন্তু আপনার পিতা, দাদা এভাবে উপরের স্তরের কাউকে দিতে পারবেন না। এমনিভাবে আপনার নিচের স্তর তথা ছেলেমেয়েকে জাকাত দিতে পারবেন না।
আপনি যে জাকাত দিলেন, এটা আর কেউ না জানলেও আপনি এবং যে জাকাত গ্রহণ করছে, সে তো জানে। এ জন্য জাকাত প্রকাশ্যে দেওয়া সুন্নত। এতে অন্যরা উৎসাহিত হয়। তা ছাড়া মানুষের সমালোচনা থেকেও মুক্ত থাকা যায়। মানুষ যাতে আপনার ব্যাপারে এই ধারণা করতে না পারে যে, এই ব্যক্তি জাকাত দেওয়ার উপযুক্ত হয়েও জাকাত দিচ্ছে না। সুতরাং নামাজের মতো জাকাতের ইবাদতও আল্লাহ জানেন এবং মানুষও জানে।
এবার আসুন হজের আলোচনায়। হজ কার জন্য করা হয়? অবশ্যই আল্লাহর জন্য। এ ছাড়া হজ প্রকাশ্যে আদায়যোগ্য ইবাদত। এটা গোপন করার কিছু নেই। হজ আমরা আদায় করি আল্লাহর জন্য। তাঁকে খুশি করার জন্য। তবে হজে আমরা ইহরামের যে পোশাক পরি, এটা কোন ধরণের পোশাক? সাদা না কালো? অবশ্যই সাদা। আর এই পোশাকের সাথে কাফনের কাপড়ের একটা সাদৃশ্য রয়েছে। কাফনের কাপড়ও সাদা, ইহরামের কাপড়ও সাদা। এই যে আমরা হজের জন্য নির্দিষ্ট একটা কাপড় পরিধান করি, এর মাধ্যমে অন্যরা বুঝে নেয় যে, আমরা হজ করছি। সুতরাং বোঝা গেল, নামাজ ও জাকাতের মতো হজ ইবাদতও মানুষ জেনে যায়। ফলে মানুষ আমাদেরকে 'নামাজি', 'জাকাতদাতা' ও 'হজ আদায়কারী' হিশেবে পরিচয় করে ফেলে।
কিন্তু রোজা হলো ভিন্ন। যে রোজা রাখে, তার ব্যাপারে এটা জানার সুযোগ নেই। এখন কেউ যদি সাহরি খায়, ইফতারও করে এবং মধ্যখানে কিছু খেয়ে ফেলে, তাহলে মানুষ সেটা বুঝতে পারবে না। আর যারা আল্লাহর বিধান মেনে দিনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু খায় না, এটা তো একমাত্র আল্লাহর ভয়ের কারণে। এ জন্যই আল্লাহ বলেছেন, রোজা হলো আমার জন্য, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো। সুবহানাল্লাহ।
ইহসান এবং নৈকট্য
এভাবে অন্তরে একমাত্র আল্লাহর ভয় রেখে ইবাদত করার নাম ইহসান। আর ইহসান হলো এমন এক গুণ, যে গুণের মাধ্যমে ইবাদত সুন্দর হয়। এখন ইবাদত যদি সুন্দর না হয়, তাহলে এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে না। দুনিয়াতে যেমন আমরা সবসময় ভালো, উন্নত ও মানসম্পন্ন জিনিস খুঁজি, ভালো কোয়ালিটির জিনিস না পেলে সেটা ক্রয় করি না, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহও ইবাদত সুন্দর না হলে সেটা গ্রহণ করেন না। এ জন্য আমরা আমাদের ইবাদত সুন্দর করার চেষ্টা করব। আর এটাই হলো ইহসান।
এই ইহসানের দিকেই ইঙ্গিত করে একবার রাসুলে কারিম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ما الإحسان يا رسول الله؟ ‘আল্লাহর রাসুল, ইহসানের মর্ম কি?' তখন রাসুল জবাবে বললেন, أن تعبد الله كأنك تراه ، فإن لم تكن تراه فإنه يراك ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। তুমি যদি এভাবে ইবাদত করতে না পারো, তাহলে অন্তত এভাবে করো যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
এমনভাবে ইবাদত করার নাম হলো ইহসান। আর আমরা যে আল্লাহকে না দেখে ইবাদত করি, এ জন্য আল্লাহ তাআলা হাশরের ময়দানে তাঁর দিদার লাভ করিয়ে আমাদের কলিজা ঠান্ডা করে দেবেন। সুবহানাল্লাহ। অর্থাৎ, জান্নাতি যারা, তারা আল্লাহকে দেখতে পাবে।
দিদারে এলাহি
হাদিস শরিফে নবিজি ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন বান্দা আল্লাহকে এত সহজ ও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবে, যেভাবে দুনিয়াতে চন্দ্রকে দেখেছে। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে তাঁর দর্শন লাভ করিয়ে আমাদের কলিজা ঠান্ডা করেন। আমিন।
এই দুনিয়াতে চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। তবে অন্তরচক্ষু দিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখা যেতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ
(বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]
অর্থাৎ, পরকালে চোখের পাওয়ার ভিন্ন এবং অনেক শক্তিশালী হবে। তো আমরা আলোচনা করছিলাম ইহসান সম্পর্কে। ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, এটা না হলে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন, এমনভাবে ইবাদত করো। আর আল্লাহ যে আমাদের দেখতেছেন, এটা আমরা সকলেই বিশ্বাস করি। যদি বিশ্বাস না থাকত, রোজা রাখার দরকার ছিল না।
এখন আপনি রমজানে দিনের বেলা প্রকাশ্যে অথবা গোপনেও কিছু ভক্ষণ করেন না, পান করেন না, এটা কার ভয়ে করেন না? অবশ্যই আল্লাহর ভয়ে। এই যে ভয়, এটা হলো ইহসানের গুণ। আর বান্দার ইবাদতে যখন এরকম গুণ তৈরি হয়, তখন আল্লাহর কাছে তার এই ইবাদতের মর্যাদাও বেড়ে যায়। এ জন্য রমজানে একটা নফল ইবাদত করলে একটা ফরজ ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়, আর একটা ফরজ আদায় করলে ৭০টি ফরজের সাওয়াব পাওয়া যায়। এর কারণ হলো, তখন বান্দার মধ্যে ইহসান ও ইখলাসের গুণ একত্রিত হয়ে যায়। নবিজি বলেন, من تقرب بخصلة من الخير، كان كمن أدى فريضة فيما سواه
যে ব্যক্তি রমজানে আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য একটি নফল আদায় করবে, সে যেন রমজান ছাড়া অন্যমাসে একটি ফরজ আদায় করল।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্দরভাবে ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।
📄 সত্যিকার সফল কারা
রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানুল কারিম আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছে। আরও একবছর বেঁচে থাকলে আবারও রমজান পাব, কিন্তু জীবনের তো কোনো গ্যারান্টি নাই। এবারের এই রমজান আমাদের কারও জন্য জীবনের শেষ রমজান কিনা- কেউ জানি না। আল্লাহপাক আমাদের জীবনে বারবার রমজান শরিফ ফিরিয়ে দিন। সকলে বলুন আমিন।
মুহতারাম হাজিরিন।
ওহির দরজা খোলা না বন্ধ? অবশ্যই বন্ধ। আমাদের নবি শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের মাধ্যমে ওহি অবতরণের ধারা কিয়ামত পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন যদি কেউ বলে, 'আমার কাছে ওহি বা প্রত্যাদেশ এসেছে' তাহলে সে মিথ্যুক, ভন্ড। এদের হত্যা করা ওয়াজিব। তবে এই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। সরকার এই আইন বাস্তবায়ন করবে।
যেহেতু নবি ছাড়া কারও উপর ওহি আসে না, আর নবুওয়াতের দরজাও চিরতরের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং এখন কেউ এমন দাবি করলে সে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার এবং ভন্ড। নবিজির ইনতিকালের পর থেকে এ পর্যন্ত এরকম বেশ কয়েকজন ভন্ড ও মিথ্যা নবির আবির্ভাব হয়েছিল। উম্মাহ তাদের মিথ্যুক বলে প্রত্যাখান করেছে।
ওহির দরজা যে বন্ধ, এটা বিশ্বাস করতে হবে। এই বিশ্বাস করার নামই ঈমান। ওহির দরজা যদি খোলা থাকত, তাহলে আল্লাহ তাআলা শুধু কুরআনের আয়াতে وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ বলতেন না; বরং وَمَا أُنْزِلَ مِنْ بَعْدِكَ ও বলতেন। এখন কেউ যদি এটা বিশ্বাস না করে, তাহলে সে দাজ্জাল। কারণ, আল্লাহ বা'দিকা না বলে শুধু কাবলিকা বলেছেন। অর্থাৎ এই ওহি, যা আপনার পূর্ববর্তী অনেক নবি-রাসুলের উপর নাজিল করা হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, ওহির দরজা একেবারে বন্ধ। আর যারা মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস লালন করে যে, ওহির দরজা বন্ধ, তারা হলো মুত্তাকি।
বিশ্বাসের স্তর
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন, ওয়াবিল আখিরাতি হুম ইউকিনুন, আর যারা পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে।
আয়াতে গুরুত্বের সঙ্গে কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে। আর বিশ্বাসের স্থর হচ্ছে তিনটি। বিষয়টি আগেও আলোচনা করা হয়েছে। এপর্যায়ে আবারও স্মরণ করিয়ে দিই। কথাগুলো বারবার আলোচনা করলে আপনাদের মুখস্থ হয়ে যাবে। এগুলো সবার মুখস্থ রাখা দরকার:
১. ইলমুল ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে বিশ্বাস করা।
২. আইনুল ইয়াকিন বা দেখার মাধ্যমে বিশ্বাস করা।
৩. হাক্কুল ইয়াকিন বা বাস্তবতার ভিত্তিতে বিশ্বাস করা。
উক্ত তিন প্রকার ইয়াকিনের উদাহরণ হলো, যেমন আমরা কুরআন সুন্নাহের আলোকে অকাট্যভাবে জানতে পেরেছি যে, জান্নাত ও জাহান্নাম এ দুটি বস্তু বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহপাক তার নেককার বান্দাদের জন্য প্রতিদান স্বরূপ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং বদকার বান্দাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছেন। কুরআন ও সুন্নার সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমে মুসলমানদের অন্তরে উক্ত বিষয়গুলোর সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহাতীতভাবে যে বিশ্বাস অর্জিত হয়, তাকে ইলমুল ইয়াকিন বলা হয়।
হাশরের ময়দানে যখন জান্নাতকে মুত্তাকিদের নিকটবর্তী করা হবে, এবং পথভ্রষ্ট পাপীদের জন্য যখন জাহান্নামকে প্রকাশিত করা হবে, প্রত্যেকেই যখন স্বচক্ষে দেখতে পাবে। তখন জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে তাদের যে বিশ্বাস অর্জিত হবে তা হলো আইনুল ইয়াকিন।
অতঃপর জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং জাহান্নামিরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন জান্নাতিদের জান্নাত সম্পর্কে এবং জাহান্নামিদের জাহান্নাম সম্পর্কে যে বিশ্বাস অর্জিত হবে, সেটি হলো হাক্কুল ইয়াকিন।
এই তিন প্রকারের ইয়াকিনের ব্যাখ্যা কুরআনে কারিমে উল্লেখ আছে। সুরা তাকাসুরে ইলমুল ইয়াকিন ও আইনুল ইয়াকিনের কথা বলা হয়েছে, আপনাদের স্মরণ থাকার কথা। আল্লাহ বলেন,
كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ لَتَرَوُنَ الْجَحِيمَ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ
কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে। অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। আবার বলি, তোমরা তা অবশ্য অবশ্যই দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে।। সুরা তাকাসুর: ৫-৭]
সুরা ওয়াকিয়ার ৯৫ নং আয়াতে হাক্কুল ইয়াকিনের উল্লেখ পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, إِنَّ هَذَا لَهُوَ حَقُّ الْيَقِينِ
নিশ্চয় এটি অবধারিত সত্য। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯৫]
জাহান্নামিরা যখন জাহান্নামে যাবে এবং জান্নাতিরা জান্নাতে যাবে, তখন কী অবস্থা হবে, সেটা সহজেই অনুমেয়। আমরা এখানে শুধু জান্নাতিদের জান্নাতে প্রবেশের পর তাদের অবস্থা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব। কেননা, জান্নাতে প্রবেশ করতে পারাই দুনিয়া-আখিরাতের সফলতা। হে আল্লাহ, আমাদেরকে জান্নাতের অধিবাসী হিশেবে কবুল করে নাও। আমিন।
জান্নাতের স্বরূপ
জান্নাত আরবি শব্দ। অর্থ হলো উদ্যান। পবিত্র কুরআনে জান্নাত বোঝাতে মোট আটটি শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে: ১. জান্নাতুল ফিরদাউস। ২. জান্নাতুন নায়িম। ৩. জান্নাতুল মাওয়া। ৪. জান্নাতুল আদন। ৫. দারুস সালাম। ৬. দারুল খুলদ। ৭. দারুল মাকাম। ৮. ইল্লিয়িন।
আগেই বলা হয়েছে, জান্নাত হলো মূলত একটি উদ্যান। তবে কুরআন-হাদিস অনুযায়ী জান্নাত একটি না অসংখ্য, তা পরিষ্কার নয়। কুরআনে একাধিক জায়গায় এমনও বলা হয়েছে যে, 'জান্নাতিদের প্রত্যেককে একটি করে উদ্যানের মালিক করা হবে। আর প্রতিটি উদ্যানে থাকবে এক বা একাধিক প্রাসাদ।' অর্থাৎ, অসংখ্য উদ্যান আছে জান্নাতে এমনও হতে পারে। জান্নাতে প্রাপ্য উদ্যানের সংখ্যা নির্ধারিত করা না থাকলেও বলা হয়েছে, 'প্রাসাদের সংখ্যা নির্ধারিত হবে জান্নাতিদের সাওয়াব বা নেকি অনুযায়ী।'
শাদ্দাদের বেহেশত
শাদ্দাদ ছিল একজন জালিম শাসক। সে ছিল খোদাদ্রোহি। বিশাল ধন-সম্পদের মালিক ছিল। সমসাময়িক নবি তাকে ঈমানের দাওয়াত দেওয়ার পর সে বলল, ঈমান আনলে কী মিলবে? নবি বললেন, আল্লাহর উপর ঈমান আনলে মৃত্যুর পর আল্লাহপাক জান্নাত দান করবেন। সে বলল, জান্নাতে কী আছে? নবি জান্নাতের একটা বর্ণনা দেওয়ার পর সে বলল, এমন জান্নাত তো আমি দুনিয়াতেই বানাতে পারি।
শুরু হলো জান্নাত বানানোর কাজ। তিনশ বছরে তৈরি হলো শাদ্দাদের বেহেশত। জান্নাত তৈরি হয়ে যাবার পর সে তার সেনা-সামন্ত নিয়ে গেল জান্নাত দেখতে। জান্নাতের গেইটে যেতেই মালাকুল মাউত সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানেই তার মৃত্যু হলো।
শাদ্দাদের বেহেশত নিয়ে এমন গল্প বাজারে আছে। আপনারাও নিশ্চই শুনেছেন। কেউ কেউ তো এভাবেও বলে থাকে যে, আসলে আল্লাহর জান্নাত ছিল সাতটি। শাদ্দাদের জান্নাত ধ্বংস করে আল্লাহপাক নিয়ে যান। তারপর আল্লাহর জান্নাতের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটি। নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক।
শাদ্দাদের বেহেশত বানানোর এই কাহিনি একেবারেই কাল্পনিক ও অবাস্তব। ইমাম ইবনু কাসির, আল্লামা ইবনু খালদুনসহ অনেকেই এটিকে ইসরাইলি বর্ণনা হিশাবে সাব্যস্থ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এর কোনো দালিলিক ভিত্তি নাই। (তাফসির ইবনু কাসির, ৪/৮০২-৮০৩, মুকাদ্দামাহ ইবনু খালদুন ১/৯৭।
জান্নাতের নাজারা
জান্নাতের মহলগুলো হবে জাঁকজমকপূর্ণ। শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সুখময় জীবন লাভ করবেন জান্নাতিরা। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে। তবে হাদিস অনুযায়ী এসব মহল বা প্রাসাদের ক্ষেত্রেও শ্রেণিভেদ থাকবে। যেমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতি, আর তাঁরা নবি-রাসুলগণ। দ্বিতীয় স্তরে থাকবেন মুত্তাকিগণ।
জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে, এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
﴿فَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ﴾
অতএব সে যদি (আল্লাহর) নৈকট্য প্রাপ্তদের একজন হয়। [সুরা ওয়াকিয়া : ৮৮]
আচ্ছা বলুন তো, আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী কীভাবে হওয়া যাবে? বা আল্লাহর নৈকট্য কীভাবে অর্জিত হবে? গুনাহ করলে না গুনাহ ছাড়লে? অবশ্যই গুনাহ ছাড়লে। আর গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা বা ছাড়ার নামই হচ্ছে তাকওয়া। এ জন্য তাকওয়ার প্রথম শর্ত হলো গুনাহমুক্ত জীবন গঠন করা।
সুতরাং বোঝা গেল, যারা গুনাহ পরিত্যাগ করেন, তারা মুত্তাকি; আর মুত্তাকিগণই আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকেন। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে মুত্তাকিরা যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে বিচরণ করবে, জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা কী স্বাদ অনুভব করবে, বুঝতে পারছেন?
পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿فَرَوْحٌ وَرَيْحَانٌ وَ جَنَّتُ نَعِيمٍ﴾
তবে তার জন্য থাকবে বিশ্রাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখময় জান্নাত। [সুরা ওয়াকিয়া : ৮৯]
অর্থাৎ, জান্নাতে শুধু আনন্দ আর আনন্দ; সেখানে দুঃখ-বিষাদ বলতে কিছুই নেই। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿وَ أَمَّا إِنْ كَانَ مِنْ أَصْحُبِ الْيَمِينِ﴾
আর যদি সে ডানপন্থিদের একজন হয়। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯০]
অর্থাৎ, তাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। আর যাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, তারা হবে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত জান্নাতি। আর যারা দ্বিতীয় স্তরের জান্নাতি হবে, তারাও অফুরাণ নিয়ামত ভোগ করবে। আল্লাহ বলেন,
﴿فَسَلَمُ لَكَ مِنْ أَصْحُبِ الْيَمِينِ﴾
তাকে বলা হবে, তোমাকে সালাম যেহেতু তুমি ডান দিকের একজন। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯১]
এমন জান্নাতিরাও যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদেরও সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে প্রবেশ করানো হবে। আমাদের সমাজেও এর প্রচলন রয়েছে। যেমন, কোনো অনুষ্ঠান বা মাহফিলে যখন প্রধান অতিথি বা সম্মানী ব্যক্তি আগমন করেন, তখন তাকে বিভিন্ন স্লোগান, আহলান-সাহলান দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।
মুমিনের সর্বশেষ আবাস
জান্নাত মুমিনের সর্বশেষ আবাসস্থল। মর্যাদা অনুযায়ী মুমিন ব্যক্তি জান্নাতের অধিকারী হবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সব জান্নাতির জন্যই সমভাবে বিশেষ কিছু জিনিস প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা সব জান্নাতি লাভ করবেন। হজরত আবু সায়িদ খুদরি ও আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবিজি বলেন,
জান্নাতিরা (সবাই) যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে; তখন একজন ঘোষণাকারী (সব জান্নাতিদের প্রাপ্তি সম্পর্কে) ঘোষণা করবে, 'তোমাদের জন্য এখন অনন্ত জীবন; তোমরা আর কখনো মরবে না। তোমাদের জন্য এখন চির সুস্বাস্থ্য; তোমরা আর কখনো অসুস্থ হবে না। তোমাদের জন্য এখন চির যৌবন; তোমরা আর কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমাদের জন্য এখন চির সুখ ও পরমানন্দ; তোমরা আর কখনো দুঃখ-কষ্ট পাবে না।' নবিজি বলেন, জান্নাতে প্রবেশকারী লোক অত্যন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দে থাকবে; কোনো দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। সে অনন্তকাল জান্নাতে অবস্থান করবে আর কখনো সে মৃত্যুবরণ করবে না। কখনো তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে না এবং তার যৌবনকালও শেষ হবে না। জান্নাতিরা হবে অনন্তযৌবনা।'
জাহান্নামিদের অবস্থা
অপরদিকে যারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, তারা চিরকালীন কষ্ট ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হবে। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন ফেরেশতারা তাদের হাকিয়ে হাকিয়ে নিয়ে যাবেন। সেখানে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।
এ ছাড়া জাহান্নামিদের ভয়াবহ পরিণতির কথা কুরআনের অসংখ্য আয়াত এবং নবিজির অসংখ্য হাদিসে বিবৃত হয়েছে। মর্যাদা অনুযায়ী জান্নাতিদের যেমন শ্রেণিভেদ রয়েছে, তেমনি জাহান্নামিদেরও শ্রেণিভেদ রয়েছে। পাপ অনুযায়ী তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।
জাহান্নামিদের ভয়বহ শাস্তির কথা পরের কোনো আলোচনায় আসবে, ইনশাআল্লাহ। আপাতত আমরা এটা জেনে রাখি যে, জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। আল্লাহর করুণা ছাড়া আমাদের রক্ষা পাওয়ার কোনো পথ নেই। তিনি যদি নিজ দয়াগুণে আমাদের ক্ষমা করে না দেন, তাহলে আমরা বড় বিপদে পড়ে যাব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন, আমিন।
জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায়
জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদেরকে প্রথমে মুমিন হতে হবে। এরপর তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকি হতে হবে। আর মুত্তাকি হতে হলে আপনাকে-আমাকে সহনশীল হতে হবে। ধৈর্যধারণ করতে হবে। বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন, কেউ যদি একটি বরই গাছে পাথর ছুড়ে মারে, তাহলে বিনিময়ে বরই গাছ কি শুধু পাতা ঝরায়, না বরইও সাথে পড়ে? এটা উৎকৃষ্ট একটি উপমা।
আপনি যদি বরই গাছে পাথর ছুড়ে মারেন, তাহলে পাথরের সঙ্গে অনেকগুলো বরইও পড়বে। এমন হবে না যে, আপনি একটি মাত্র পাথর মারলেন আর বিনিময়ে আরও ১০টি পাথর চলে আসবে। এই উপমা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।
পাথরের ঢিল খেয়ে বরই গাছ প্রতিদানস্বরূপ দিয়েছে ফল, ঠিক তেমনি আমাদেরও এমন হতে হবে। কেউ আপনার উপর পাথর নিক্ষেপ করলে আপনি তাকে ফল অথবা ফুল দিয়ে বরণ করে নিন। যেমনটা বরই গাছ করে থাকে। উল্টো পাথর নিক্ষেপ করতে যাবেন না। অর্থাৎ, কেউ আপনাকে আঘাত করলে আপনি আঘাতের বিনিময়ে আঘাত দেবেন না; বরং আঘাতের বদলে ফুল বিছিয়ে দিন। কেননা, নবিজি ﷺ-এর অন্যতম এক গুণ ছিল,
صِلْ مَنْ قَطَعَكَ وَأَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ وَاعْفُ عَمِّنْ ظَلَمَكَ
মোটকথা, দুর্ব্যবহারের জবাব কখনো দুর্বব্যহারের মাধ্যমে দেওয়া যাবে না। বরই গাছ আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে। এটা থেকে আমাদের শিখতে হবে। কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে।
এখন যদি গাছকে প্রশ্ন করা হয়, 'তাহলে তোকে জাহান্নামের লাকড়ি বানানো হয় কেন?' গাছ তখন জবাব দেবে, 'আমার চরিত্র হচ্ছে সুবিধাবাদ। যেখানেই আমার সুবিধা, সেখানেই আমার আবাস।' বলা হলো, 'সুবিধাবাদী কীভাবে?' গাছ জবাব দেয়, 'বাতাসের দিকে লক্ষ্য করো। যখন বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন গাছের ডালপালা বাতাসের অনুকূলে না ঝোঁকে প্রতিকূলে ঝোঁকে, কখনো উত্তরমুখি হয় না। ঠিক একই কারণে আমার স্বভাবও এমন। তুমি বরং আমার দোষ না দেখে গুণগুলো দেখতে পারো।'
এখন কথা হলো, যারা সুবিধাবাদী, মিথ্যুক, তারা জাহান্নামে যাবে। সেখানে তাদেরকে ফুটন্ত গরম পানীয় দ্বারা আপ্যায়ন করানো হবে। ফলে তার পেটে থাকা নাড়িভূড়িসহ সবকিছু জ্বলেপুড়ে নিচের দিকে বেরিয়ে আসবে। এটা এমন ধ্রুব সত্য যে, জাহান্নামে যাওয়ার পরই জাহান্নামিরা তা চর্মচক্ষে তা প্রত্যক্ষ করতে পারবে। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ هَذَا لَهُوَ حَقُّ الْيَقِينِ
নিশ্চয় এটি অবধারিত সত্য। [সুরা ওয়াকিয়া: ৯৫]
সুতরাং জাহান্নাম যে সত্য, এটা বিশ্বাস করতে হবে এবং জাহান্নামের যাওয়ার যেসব উপায়-উপকরণ রয়েছে, সেসব থেকে বিরত থাকতে হবে। যারা জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন, أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ 'তারাই হলো সফল।' আর যারা মুফলিহুন বা সফল, তাদের চূড়ান্ত সফলতা লাভ হয় জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে।
এখন কথা হলো, কারা সফল আর কারা বিফল, তাদের প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা এ সুরা য় দুই যুবকের ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। তাদের একজন হলো সফল আরেকজন হলো বিফল। এবং প্রসঙ্গক্রমে এসব আলোচনা করতে গিয়ে একটি গাভীর ঘটনা আলোচিত হয়েছে এ সুরায়। এ জন্য এ সুরাকে বাকারা নামে নামকরণ করা হয়েছে।
নেক সন্তান চাইলে
নেক সন্তান চাইলে বাবা-মাকে নেক হতে হবে। বাবা-মা পরহেজগার না হলে সন্তান কখনও নেক হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।
হজরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে একজন বুজুর্গ বা নেককার ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হন। সন্তানহীন পৃথিবী তাঁর কাছে ভালো লাগছিল না। ফলে তিনি আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে একটি সন্তান লাভের জন্য দুআ করতে থাকেন। আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করেন এবং তাঁকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। এখন স্ত্রীসহ তাঁর পরিবারের সদস্য ৩জন। সন্তান পেয়ে ওই বুজুর্গ ব্যক্তি বেজায় খুশি; আল্লাহ তাঁকে এই বৃদ্ধ বয়সে একজন সন্তান দিয়েছেন।
সন্তান জন্মের কিছুদিন পর ওই বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুর ডাক এসে যায়। মৃত্যুর আগে তিনি যখন বার্ধক্যের কারণে শয্যাশায়ী, বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখন তাঁর খেয়াল হলো, আমি তো মারা যাব কিন্তু এই দুধের শিশু এবং তার মাকে কার কাছে রেখে যাব? এ ছাড়া তাদের তো আমি উপায়-উপকরণহীন ছেড়ে যাচ্ছি। একটিমাত্র গরুর বাছুর ছাড়া আর কোনো সম্পদই যে আমার নেই। তিনি এটা ভেবে আরও পেরেশান হয়ে যাচ্ছিলেন যে, আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটির বিনিময়ে তিনি একটি সন্তান লাভ করেছেন। এখন সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ দেখার আগেই তাঁকে চলে যেতে হবে! এই পৃথিবী থাকার জায়গা না। কেউ থাকতে পারব না। কবি বলেন, موت کاس کل ناس شارب : قبر بیت کل ناس داخل
মউত এমন এক শরবত, যা সবাইকে পান করতে হবে। কবর এমন একটি ঘর, যেখানে সবাইকে প্রবেশ করতে হবে।
সুতরাং তিনি বাছুরটি সঙ্গে নিয়ে গভীর জঙ্গলে চলে গেলেন এবং একটি পাহাড়ের পাশে গিয়ে উপনীত হলেন। সেখানে পাহাড়কে লক্ষ্য করে আল্লাহর কাছে দরাজকণ্ঠে দুআ করতে লাগলেন, 'ওগো আল্লাহ, অনেক কান্নাকাটির বিনিময়ে তুমি আমাকে একটি সন্তান দিয়েছো। এখন দুধের এই শিশুর ভবিষ্যৎ কী হবে? তবে আমি নিরাশ নই হে আল্লাহ। সন্তান ও তার মাকে তোমার জিম্মায় রেখে যাচ্ছি। সাথে এই বাছুরটিও। আমার সন্তান যখন বড় হবে, তখন বাছুরটি আপনি তার কাছে পৌঁছে দিয়েন।'
নেককার ওই ব্যক্তির দুআ আল্লাহ কবুল করলেন। তখন গায়েবি আওয়াজ এল, 'হে আমার বন্ধু, তোর চিন্তার কোনো কারণ নেই। তুমি তোমার এই বাছুরটিকে এই পাহাড়েই রেখে যাও। সে-ই এটার দেখাশোনা করবে। এরপর সময় হলে সেটি তোমার সন্তানের কাছে পৌঁছিয়ে দেবে।' প্রবাদ আছে, من له المولى فله الكل 'যার রব, তার সব।'
কিছুদিন পর ওই বুজুর্গ লোকটি মারা যান। এরপর থেকে অভাবের সংসারে মা-ছেলে দিনাতিপাত করতে থাকেন। দুধের এই শিশু একসময় বড় হয়ে যুবক বয়সে উপনীত হয়। অভাবের সংসারে একটু আশার আলো হয়ে ফুটে ওঠে। প্রতিদিন জঙ্গলে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে।
নেককার যুবক
কথায় আছে না, যেমন পিতা তেমন পুত্র। الولد سرلاییه অর্থাৎ সন্তান পিতার স্বার্থক ভাষ্যকার। পিতা যেমন নেককার ছিলেন, ছেলেও পিতার যোগ্য উত্তরসুরি হয়ে ওঠে। কথায় আছে, 'বাপে বেটা গাছে গুটা, মায়ে ঝি গাইয়ে ঘি।'
এ ছাড়া তার মাতৃভক্তিও ছিল প্রবাদতুল্য। সে সবসময় মায়ের সেবাযত্ন করত। মায়ের কথা মানত। মা-ভক্ত, অনুগত ও খেদমতগুজার ছেলেটি সারাদিন কাঠ সংগ্রহ করত। এরপর সেই কাঠ বিক্রি করে যে অর্থ পেত, সেই অর্থ সে তিন ভাগে ভাগ করত। এক অংশ দান-সদকা করত, এক অংশ নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করত এবং এক অংশ তার মায়ের হাতে তুলে দিত। এটা ছিল তার দিনের রুটিন। এভাবে সে রাতকেও তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাত, একভাগ ঘুমাত এবং এক ভাগ তার মায়ের সেবা করত।
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! আমি আপনাদেরকে বিশেষভাবে বলব, আপনারা আপনাদের পিতামাতার জন্য প্রতিদিন কিছু সময় অবশ্যই দিন। ৫-১০ মিনিট করে হলেও। মায়ের জন্য, বাবার জন্য এভাবে কিছু সময় দিন। তাদের হাতে আপনার উপার্জনের কিছু টাকা ধরিয়ে দিন। দেখবেন, তারা কতটা খুশি হন। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে আমরা এই আমল করতে চেষ্টা করব।
বর্তমান যুগে তো আমরা মোবাইল-ফেসবুকের পেছনে অযথা সময় নষ্ট করছি। রাতের পর রাত ব্যয় করছি; অথচ মা-বাবার খেদমতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। এ ব্যাপারে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছেন আমাদের ইমামে আজম আবু হানিফা রাহ.। তিনি একাধারে ৪০ বছর ইশার ওজু দিয়ে ফজরের নামাজ পড়েছেন। এটা আপনার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, তবে বর্তমান প্রযুক্তির এ যুগে প্রযুক্তি দিয়েই যদি উদাহরণ দিই, সহজেই বুঝতে পারবেন।
বর্তমানে একটা ছেলে মোবাইল-ফেসবুকটিপে কখন ফজর যে হয়, টেরই পায় না। এই অবস্থা চোখের সামনে দেখার পর ইমাম আবু হানিফা ইশার পর নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর এশকে কীভাবে ফজর পর্যন্ত নফল নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন, এটা বুঝা অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমরা নিজেরা এবং আমাদের সন্তানদের এসব ডিভাইসের অপব্যবহার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
বলছিলাম মুসা আলাইহিস সালামের যুগের এক বুজুর্গের সন্তান সম্পর্কে। সে যখন মাতৃভক্তিতে অনন্য হয়ে ওঠে, তখন একদিন মায়ের সেবা করার সময় তার মাকে বলে, 'মা, এভাবে আর কত দিন? আমাদের অভাব কি শেষ হবে না? এ ছাড়া আমার অনেক প্রয়োজনও তো সামনে রয়েছে।'
অনুগত ছেলের এমন কথায় মা খুশি হন। এই তো সেই সময়, যা তার পিতা মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। সময় এসেছে, সেই অসিয়তের কথা তাকে বলার। তিনি ছেলেকে বলেন, 'বাবা, তোর পিতা মৃত্যুর আগে আমাকে একটি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। আমাদের একটি বাছুর ছিল, সেটা তোকে খোঁজে নিয়ে আসতে হবে।'
আপাতত এখানে আমরা পুণ্যবান ওই ছেলে ও মায়ের ঘটনাটি স্থগিত রাখি। এবার আলোচনা করব যে যুবক বিফল হয়েছিল, তার ঘটনা। তখন বাকি আলোচনা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে।
বদকার যুবক
দ্বিতীয়জন হচ্ছে বিফল যুবক, সে-ও মুসা আলাইহিস সালামের যুগের। পবিত্র কুরআনের সুরা বাকার ৬৮ নম্বর আয়াতে এই যুবকের ঘটনা আলোচিত হয়েছে। ঘটনাটি হচ্ছে, বনি ইসরাইলের এই যুবক একজন বখাটে ও লোভী ছিল। তার চাচা ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি। সহায়-সম্পদ ছিল প্রচুর। তবে তার একমাত্র মেয়ে ছাড়া কোনো ছেলেসন্তান ছিল না। বখাটে ছেলেটি তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এ জন্য সে তার চাচাতো বোনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। নানা ভাবে ওই মেয়েকে উত্যেক্ত করতে থাকে। একপর্যায়ে সে চাচার কাছে তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়।
চাচা তার আবেদনে সাড়া দেননি। কেননা, সে যে বখাটে, অকর্মা, এটা তিনি ভালো করেই জানেন। তিনি সাফ না করে দেন যে, তার কাছে তিনি তার মেয়েকে বিয়ে দেবেন না। বখাটে ছেলেরা সবসময় এমনই হয়। এরা প্রেমে ব্যর্থ হলে নানা অসদুপায় অবলম্বন করে। অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। হারিয়ে ফেলে হিতাহিত জ্ঞান।
এ ছাড়া তার উদ্দেশ্য ছিল, চাচাতো বোনকে বিয়ে করে চাচার সব সম্পদের মালিক হওয়া। সে ছিল একজন লোভী প্রেমিক। আমাদের বর্তমান সমাজেও এমন চিত্র দেখা যায়। তবে সম্পদের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে গৌণ থাকে। এরা শুধু তার প্রিয়তমাকে পেতে চায়। এই যে প্রেম, এটা এক পক্ষে হয় না, উভয় পক্ষের সম্মতি লাগে।
বখাটে ছেলেটি তার চাচার কাছ থেকে প্রত্যাখাত হয়ে একটি দুর্ভিসন্ধি করে। সে তার চাচাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। চাচাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে পারলে পথ পরিষ্কার। পরিকল্পনামতো এক রাতে সে তার চাচাকে হত্যা করে এবং তার লাশ নিয়ে গ্রামের অন্য একজনের বাড়ির সামনে ফেলে আসে। পরের দিন ভাতিজা চাচার খুনের দাবিদার হয়ে ওঠে এবং লাশ সামনে নিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। তার কান্না দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, সে-ই প্রকৃত খুনি। উল্টো সে তখন ওই বাড়ির লোকদের হত্যাকারী হিশেবে সাব্যস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা জরুরি মনে করছি। আমাদের মধ্যে এমন অনেক আছেন, যারা মিছেমিছি কান্নার ভান ধরতে পারেন। যদিও এমন কান্নার কোনো মূল্য নেই। আগেকার সময়ে আরবসমাজে তো লোকেরা তাদের পরিবারের কারও মৃত্যুতে কান্নার জন্য ভাড়ায় লোক নিয়োগ করে আনতো। অথচ এই কান্না যদি হয় আল্লাহর জন্য, কেউ যদি আল্লাহর জন্য কান্না করে মাছির ডানার সমপরিমাণ চোখের জল গড়ায়, তাহলে আল্লাহ তার এই চোখের পানিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। এ জন্য আমরা আল্লাহকে পেতে বেশি বেশি কান্না করব। কেঁদেকেটে আল্লাহর কাছে চাইব। দুই যুবকের ঘটনার বাকি অংশ আমরা আগামীকাল আলোচনা করব- ইনশাআল্লাহ।