📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 মুত্তাকিদের স্তর

📄 মুত্তাকিদের স্তর


আমরা এখন আলোচনা করব মুত্তাকিদের স্তর সম্পর্কে। যে গুণে গুণান্বিত হলে কুরআন হিদায়তের মাধ্যম হয়, তাকে তাকওয়া বলে। যার মাঝে তাকওয়া আছে, সে হলো মুত্তাকি। পবিত্র কুরআনে মুত্তাকিদের বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা বাকারার শুরুর দিকে আল্লাহ তাআলা বলেন, هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ এই কুরআন শুধু মুত্তাকিদের জন্যই হিদায়ত। এখন আমাদের জানতে হবে, মুত্তাকি কারা? মুত্তাকি তারাই, যাদের মধ্যে ছয়টি গুণ রয়েছে।

• মুত্তাকিদের প্রথম গুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ, যারা গাইব বা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস করে।
• দ্বিতীয় গুণ হলো, وَيُقِيمُونَ الصَّلُوةَ যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে।
• তৃতীয় গুণ হলো, وَمِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُوْنَ যারা আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে।
• চতুর্থ গুণ হলো, وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ যারা বিশ্বাস রাখে আপনার উপর যা নাজিল করেছি, সেগুলোর উপর।
• পঞ্চম গুণ হলো, وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ অর্থাৎ, আপনার পূর্ববর্তীদের উপর যা নাজিল করেছি, সেগুলোর ওপরও বিশ্বাস রাখে।
• ষষ্ঠ গুণ হলো, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ যারা পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে।

এখানে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের ছয়টি গুণের আলোচনা করেছেন। আর এই ছয়টি গুণে যারা গুণান্বিত হবে, তারা কী পুরস্কার পাবে? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ﴿أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾

তারাই হিদায়তের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই হলো চূড়ান্ত সফল। [সুরা বাকারা: ৫]

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, আল্লাহ যে মুত্তাকিদের ছয়টি গুণের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন, তাতে রোজা ও হজের আলোচনা নেই। অথচ রোজা ও হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দুটি বিষয়ে কোনো আলোচনা না করেও আল্লাহ বললেন, যারা এই ছয়টি গুণ অর্জন করবে, তারাই মুত্তাকি। তাবলিগওয়ালাদের উপর এমন প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন। কেননা, তাবলিগের ছয় উসুলের মধ্যেও রোজা, হজ ও জাকাতের কথা উল্লেখ নেই। না, এমন প্রশ্ন করা অবান্তর এবং নিজের মূর্খতার পরিচায়ক। যদি ক্ষমতা এবং সাহস থাকে, তবে তাবলিগওয়ালাদের উপর এই প্রশ্ন না করে সরাসরি আল্লাহর ব্যাপারে করুন।

আপনারা লক্ষ করলে দেখবেন যে, তাবলিগওয়ালা সবসময়ই এভাবে বলেন যে, 'কয়েকটি গুণের উপর আমল করলে দ্বীনের উপর চলা সহজ'-কিন্তু কখনো তারা এমনটা বলেন না যে, 'এই কয়েকটি গুণই হলো একমাত্র দ্বীন।' ঠিক সেভাবে এখানেও আল্লাহ তাআলা রোজা ও হজের আলোচনা না করে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, এই গুণগুলো (ছয়টি) অর্জন করতে পারলে মুত্তাকি হওয়া সহজ।

আল্লাহ যে রোজা ও হজের আলোচনা করেননি, এর জবাব হচ্ছে, এই ছয়টি গুণে সরাসরি রোজা ও হজের আলোচনা নেই ঠিক, তবে আল্লাহ যে 'ইউকিমুনাস সালাতা' বললেন, এখানেই এগুলোর আলোচনা রয়েছে। তাই এটা নিয়ে যারা অযথা জলঘোলা করে, তারা নির্বোধ, মূর্খ। সুতরাং যারা তাবলিগওয়ালাদের উপর এমন প্রশ্ন করে, তাদের প্রশ্নের জবাব আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন। উপরিউক্ত গুণগুলো যারা অর্জন করতে পারবে, দ্বীনের উপর চলা তাদের জন্য সহজ। তারাই মুত্তাকি। আর মুত্তাকি যারা, তারা জান্নাতের অধিকারী হবে।

আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের গুণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে গাইব বা অদৃশ্যের উপর ঈমানের কথা বলেছেন। গাইবের উপর ঈমান হচ্ছে ইয়াকিন বা বিশ্বাস। এখন আমাদের জানা দরকার ঈমান আর ইয়াকিনের মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে। আখেরাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা 'ইয়াকিন' শব্দ ব্যবহার করেছেন, আর অন্যগুলোর ব্যাপারে ' ইউমিনুন বা ঈমান' শব্দ ব্যবহার করলেন কেন? এটা বোঝা দরকার।

এবার আমরা আলোচনা করব ঈমানিয়াত সম্পর্কে। ঈমানে মুফাসসাল তথা আমানতু বিল্লাহি ও মালাইকাতিহি। এখানে উপরিউক্ত ছয়টি গুণের আলোচনা রয়েছে। গত আলোচনায় আমরা আল্লাহর উপর ঈমানের ব্যখ্যা করেছি। আল্লাহর উপর ঈমানের পর দ্বিতীয় বিষয় হলো, ‘ও মালাইকাতিহি’ বা ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রাখা। ফেরেশতাদের ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস হতে হবে, তারা আল্লাহর বাহিনী। তাদের সংখ্যা অগণিত। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তারা তা-ই করতে আদিষ্ট। নিজ থেকে কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই।

এই যে রমজান মাসে আমরা না খেয়ে থাকি, এটা ফেরেশতাদের গুণ। কারণ, ফেরেশতারা খাদ্যগ্রহণ থেকে পবিত্র। তাই আমরা যখন রোজা রাখি, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের লক্ষ করে বলেন, ‘আদমকে সৃষ্টির ব্যাপারে আমি যখন তোমাদের প্রশ্ন করেছিলাম, তখন তোমরা বলেছিলে, “আমরাই তো আপনার তাসবিহ পাঠ করি।” আজ দেখো, তাদেরকে আমি এমন আমল দিয়েছি, যা করার যোগ্যতা তোমাদের নেই।’ এ জন্য লাইলাতুল কদরে ফেরেশতারা হজরত জিবরিল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে দলে দলে জমিনে অবতরণ করেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

تَنَزَّلُ الْمَلئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلْمٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরিল) তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। শান্তিময় সে রাত, ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। [সুরা কাদর: ৪-৫]

শবে কদরে ফেরেশতারা রুহুল আমিন জিবরিলের নেতৃত্বে দলে দলে জমিনে অবতরণ করবে। কেন অবতরণ করবে? কারণ, ফেরেশতারা খায় না, পান করে না, এ জন্য তারা খানাপিনা ছেড়ে দিয়ে কোনো ইবাদত করতে পারে না। আর আমরা খাবার- পানি গ্রহণ করি, এরপরও আমরা আল্লাহর হুকুমে খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত রয়েছি- এ জন্য আমাদের সাথে মুসাফাহা করতে আসেন। আমাদের জন্য দুআ করতে থাকেন। এ কারণে শবে কদরে ফেরেশতারা দলে দলে অবতরণ করেন। সারা জমিন ফেরেশতাদের দ্বারা ভরপুর হয়ে যায়। ফলে জমিন সংকীর্ণ হয়ে আসে। ‘কাদর’ শব্দের এক অর্থ সংকীর্ণ হওয়া। এ জন্য লাইলাতুল কদরে যারা আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে, ফেরেশতারা তাদের জন্য দুআ করতে থাকেন।

তাহলে আমরা জানতে পারলাম, ফেরেশতাদের ব্যাপারে আমাদের ঈমান হলো, তারা গুনাহ থেকে পবিত্র, খাওয়া-পান করা থেকে মুক্ত। আল্লাহ বলেন,

لَّا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ﴾

তারা যাবতীয় গুনাহ থেকে পবিত্র এবং আল্লাহ তাদেরকে যে আদেশ করেন, তারা শুধু তা-ই পালন করেন। তবে বিশেষ কিছু দায়িত্বশীল ফেরেশতা রয়েছেন, যারা নিজ নিজ কাজ আঞ্জাম দেন। [সুরা হুজুরাত: ৬]

ঈমানের তৃতীয় শর্ত হলো, আসমানি কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস রাখা। এখানে কিতাবের মর্ম হলো ওহির উপর বিশ্বাস করা। আর ওহি কাকে বলে, এ সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যে জেনে এসেছেন। যেখানে মানুষের জ্ঞান শেষ, সেখান থেকেই ওহির সূচনা। মানুষ তার নিজের ব্যাপারে এতটুকুই জানে যে, তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু এরপর তার পুরো জীবনবৃত্তান্ত অর্থাৎ, সে কীভাবে বড় হবে, কোথায় যাবে, তার শেষ কোথায়, এসব সম্পর্কে কিছুই জানে না। তবে কে জানেন? জানেন আল্লাহ, যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।

এই যে জ্ঞান, যা মানুষ জানে না, তার শেষ হলো আখিরাত। কোন কাজ করলে ভালো আর কোন কাজ করলে ক্ষতি হবে, এ সম্পর্কে মানুষের যেহেতু কোনো জ্ঞান নেই, তাই এই জ্ঞান যিনি দিয়েছেন, তিনি হলেন আল্লাহ। আর যে মাধ্যমে মানুষ এসব বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে পারে, সেটা হলো ওহি। যা জানা এবং মানার মাধ্যমে জান্নাত লাভ হবে। আর এই ওহি নাজিল করা হয়েছে নবি-রাসুলদের উপর। তন্মধ্যে বড় বড় চারটি আসমানি কিতাব হলো: ১. জাবুর। জাবুর হজরত দাউদ আলাইহিস সালমের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। ২. তাওরাত। তাওরাত হজরত মুসা আলাইহিস সালমের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। ৩. ইনজিল। ইনজিল যা হজরত ঈসা আলাইহিস সালমের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। ৪. কুরআন। কুরআন শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ -এর উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে।

এগুলো হলো বড় বড় আসমানি কিতাব। এ ছাড়া ছোট ছোট আরও অনেক আসমানি কিতাব রয়েছে, যেগুলোকে সহিফা বলা হয়। এসব আসমানি কিতাবের উপর ঈমান আনা বিশ্বাস করার বিষয়টিই আল্লাহ তাআলা-

وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ ﴾

আয়াতাংশের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, সর্বশেষ কিতাব আল কুরআন। আর এই কুরআন হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং এটা শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ -এর উপর নাজিল হয়েছে, এটা বিশ্বাস করতে হবে। আরও বিশ্বাস করতে হবে, পূর্ববর্তী নবি- রাসুলদের উপর যা নাজিল হয়েছে। মোটকথা, নবি-রাসুলদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে, সবই ওহি বা কিতাব। সাথে সাথে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, আমাদের নবিজির উপর যে কুরআন নাজিল হয়েছে, এই কুরআন পূর্ববর্তী নবি- রাসুলদের উপর অবতীর্ণ সব কিতাবের কার্যকারিতা রহিত করে দিয়েছে। এটা হলো 'কুতুবিহি' শব্দের মর্ম।

এখানে খুব ভালো করে একটি বিষয় স্মরণ রাখবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে আর কারো প্রতি কোনো ওহি নাজিল হবে না। ওহির দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তা নাহলে আল্লাহ বলতেন, وَمَا أُنْزِلَ مِنْ بعدك তাই নবিজির পরে এপর্যন্ত যারাই নবুওয়াতের দাবি করেছে, উম্মত তাদেরকে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক হিশাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিয়ামত পর্যন্ত কেউ যদি নতুন করে ওহির দাবি করে এবং তার এই দাবিকে কেউ বিশ্বাস করে, তাহলে উভয়ই ভন্ড ও পথভ্রষ্ট সাব্যস্থ হবে। কিলাহুমা ফিন নার।

এরপর ঈমানের চার নম্বর শর্ত হচ্ছে, 'রুসুলিহি' বা রাসুলদের উপর বিশ্বাস করা। আল্লাহ তাআলা যত নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, তাঁদের সকলের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। কুরআনেই আল্লাহ বলেন,

لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ

অর্থাৎ, আমরা কারও মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। এটা হলো হাকিকাতে ঈমান। তাই অমুক নবিকে মানলাম, অমুক নবিকে মানলাম না, এমনটা হলে চলবে না; বরং পার্থক্য ছাড়াই সকলের উপর ঈমান আনতে হবে। তবে 'কাইফিয়াতে ঈমান'-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনের অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন,

تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ

অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী নবি-রাসুলদের মধ্যে অনেককে অনেকের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান নয়, তেমনি নবিদের মর্যাদাও সমান নয়। আর নবিদের মধ্যে মর্যাদায় সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেন মুহাম্মাদ। তবে কোন নবির মর্যাদা কতটুকু, এটা পার্থক্য করার দায়িত্ব আমাদের নয়। আমরা শুধু তাঁদের উপর ঈমান আনার ব্যাপারে আদিষ্ট। এই হলো 'রুসুলিহি' শব্দের মর্ম। তবে এটা বিশ্বাস রাখতে হবে, সর্বশেষ নবি হলেন আমাদের নবিজি , তাঁর পরে আর কোনো নতুন নবি আসবেন না। সব মানলেন, কিন্তু আমাদের নবিজি যে শেষ নবি, এটা মানলেন না, তাহলে আপনার ঈমান আনাও হলো না।

ঈমানের পাঁচ নম্বর শর্ত হচ্ছে, 'ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি' বা আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখা। এই বিশ্বাস শুধু নয়; বরং দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে।

এখানে একটি বিষয় জানা দরকার যে, কুরআনের আলোচ্যবিষয় মোট ৬টি:
১. তাওহিদ।
২. রিসালাত।
৩. আখিরাত।
৪. যারা এই তিনটি গ্রহণ করবে, সে-সকল মুমিন সম্পর্কে আলোচনা এবং তাদের পুরস্কার হিশেবে জান্নাতের আলোচনা।
৫. যারা এই তিনটি গ্রহণ করবে না অর্থাৎ, কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে আলোচনা এবং তাদের পরিণাম হিশেবে জাহান্নামের আলোচনা।
৬. তাকদিরের উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস রাখা, বিশেষ করে কুরআনের আলোচনা।

তাকদিরে বিশ্বাস রাখতে হবে

তাকদির নিয়ে আমরা আগেও আলোচনা করেছি। তাকদির হলো এমন বিষয়, যা আপনার তাকদিরে থাকবে আপনি তা-ই পাবেন। আর যা আপনার তাকদিরে নেই, তা চেষ্টা করলেও পাবেন না। যেমন: আপনার তাকদিরে যদি থাকে যে, আপনি বাংলাদেশে শিক্ষকতা করবেন, তাহলে বাংলাদেশই হবে আপনার শিক্ষকতার স্থান। যদি আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশে নির্ধারিত থাকে, তবে সেখানে গিয়েই আপনাকে শিক্ষকতা করতে হবে। এটাই হলো তাকদির। আপনার তাকদিরে যা তা পাবেনই, কেউ হিংসা করলেও কিছুই করতে পারবে মহাশয়।

তাকদিরে যদি আপনার মর্যাদার কথা লেখা থাকে, তাহলে আপনি মর্যাদা লাভ করবেনই। তবে এই মর্যাদাবৃদ্ধির কারণে আপনাকে গৌরব করা চলবে না। বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আপনি যত শুকরিয়া আদায় করবেন, আপনার মর্যাদা তত বাড়বে।

আপনি যদি মর্যাদাবান বা সম্মানী হয়ে যান, দেখবেন, তখন অনেকেই আপনাকে নিয়ে হিংসা করবে। তবে এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ, সফলতার কারণেই হিংসা করে, সমালোচনা করে। বিফল হলে কেউ কিছু বলত না। নিরবে শুধুই হাসতো। রাতে চাঁদের আলো দেখলেই কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে। এ জন্য মুত্তাকিদের গুণের আলোচনায় আল্লাহ বলেন,

وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

যারা ধৈর্যধারণ করে অর্থনৈতিক সংকটে, শারীরিক মুসিবতের সময়ও ধৈর্য ধরে এবং সত্যমিথ্যার দ্বন্দ্বের সময় সত্যের পক্ষে থাকে এবং ধৈর্য ধরে, এরা হলো সত্যবাদী। এরাই হলো মুত্তাকি।

আল্লাহ কাউকে সম্মানিত করতে চান, অথচ তাকওয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারছে না, তখন তাকে বিপদে পতিত করেন। এখন সে যদি এই বিপদের সময় ধৈর্য ধরে, তাহলে আল্লাহ তাকে মর্যাদার সেই স্তরে পৌঁছিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ। এ জন্য যখনই আমরা কোনো বিপদ-মুসিবতে পতিত হবো, তখন ধৈর্য ধরব। এমনটা বলব না যে, আমি তো সবসময় ভালো কাজই করছি, ইবাদত করছি, তাহলে আমার উপর এই বিপদ কেন? সাবধান, এভাবে বলবেন না। আল্লাহ আপনার মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। আর এতে কল্যাণ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নবিজি বলেন, আল্লাহর সত্যিকার মুমিন বান্দা যারা, আল্লাহ তাদেরকে মুসিবতের খাবার খাইয়ে থাকেন। যেভাবে একজন মা তার সন্তানকে মুহাব্বাতের সাথে দুধপান করিয়ে লালন পালন করে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহও তাঁর বান্দাদের মর্যাদার আসনে আসীন করার জন্য বিপদ-মুসিবত খাইয়ে থাকেন।

এ কারণে আমরা সর্বাবস্থায় তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখব। ভালোমন্দ যা-ই ঘটুক, সবই তাকদিরের ফায়সালা। এ জন্য কোনো মানুষকে অযথা দোষ দিয়ে লাভ নেই। এভাবে আমাদেরকে তাকদিরের উপর ঈমান আনতে হবে।

আমরা আলোচনা করছিলাম, ঈমানিয়াত সম্পর্কে। আল্লাহর উপর ঈমান আনা, ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রাখা, আসামানি কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস রাখা, রাসুলদের উপর বিশ্বাস রাখা, কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখা, তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখা, এগুলো সম্পর্কে আমরা মোটামুটি একটা আলোচনা করলাম। এর পরের বিষয় হলো, মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়া সম্পর্কে।

ঈমানের ৭ নম্বর শর্ত হলো والبعث بعد الموت বা মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাস রাখা। এখানে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আগে যেহেতু واليوم الآخر বলা হয়েছে, তাহলে এখন আবার والبعث بعد الموت বলার মানে কি? এর উত্তর হলো, আখিরাতের দিনের অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ আমাদের জানা নেই। কবরের জগত, পুলসিরাত, হাশর, মিজান ইত্যাদি। সুতরাং সেসব সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে এবং ঈমান আনতে হবে। কেননা, আখিরাতের উপর যার বিশ্বাস থাকবে, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করতে ভয় করবে। আর যদি বিশ্বাস না করে, তাহলে অবাধ্যতা করতে তার কোনো ভয় থাকবে না। এ জন্য আল্লাহ তাআলা আখিরাতের ভয় ও পুনরুজ্জীবিত হওয়া সম্পর্কে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

ঈমান ইসলাম ও ইহসানের সমষ্টিক নাম সত্যিকারের দ্বীন। ঈমান, ইসলাম ও ইহসান; এই তিন প্রকারের আলোচনা বুঝতে পারলেই পুরো বিষয়টি বোঝা সহজ হয়ে যাবে। সুরা বাকারায়ই আল্লাহ তাআলা এই তিনটির বিশদ আলোচনা করেছেন الَّذِيْنَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ বলে ঈমান বিল গায়িব বা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে। আর وَيُقِيمُوْنَ الصَّلُوةَ বলে ইসলামের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর وَمِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ বলে ইহসানের কথা বোঝানো হয়েছে। আর وَيُقِيمُوْنَ الصَّلُوةَ যে বলা হয়েছে, তাতে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের সবটাই নামাজের মধ্যে ঢুকে গেছে। এ জন্য আলাদাভাবে রোজা ও হজের আলোচনা করা হয়নি। কথাগুলো আমরা আগেও আলোচনা করে এসেছি। আপনাদের কি মনে আছে? আজ আবার বলি।

রোজা ও হজের কথা কীভাবে নামাজের মধ্যে চলে এসেছে- দেখা যাক। একজন মানুষ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে এই নামাজে দাঁড়ানোর কারণে নামাজের সাওয়াব পাবে। কিন্তু নামাজে দাঁড়ানোর পর কেউ কিছু খেতে পারবে? পান করতে পারবে? না, পারবে না। সুতরাং সে যেহেতু নামাজে দাঁড়িয়ে কিছু ভক্ষণ করল না, পান করল না, এটাও তো একধরনের রোজা। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে রোজার সাওয়াব দেবেন। এখন আমরা কালিমা, নামাজ, রোজা পেয়েছি। এমনিভাবে নামাজের মধ্যেই হজ ও জাকাতের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে নামাজের ভেতরেই এই পাঁচটি বিষয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রথম তিনটির প্রমাণ তো পেয়েছি, এবার হজ-জাকাতের সওয়াব কীভাবে পাওয়া যায়, এটা দেখব।

হাদিস শরিফে রাসুল ﷺ বলেন, কেউ যখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে নামাজে দাঁড়ায়, তখন এই নির্জীব কাপড়ও আল্লাহর জিকির করতে থাকে। এবং ওই ব্যক্তির নামাজেও খুশুখুজু আসে। সুবহানাল্লাহ। আমাদের সমাজে অনেককে দেখা যায়, শরীরের সব কাপড়ই দামি এবং পরিষ্কার, কিন্তু নামাজের সময় এদের মাথায় ছেড়া- ময়লা টুপি। এমনটা করা ঠিক নয়। আল্লাহর শাহি দরবারে যখন দাঁড়াব, তখন শাহি পোশাক পরেই দাঁড়াব।

পোশাক সুন্দর-পরিপাটি হলে নামাজেও একাগ্রতা আসে। আপনারা পরীক্ষা করে দেখবেন, ময়লা কাপড়ে নামাজ পড়লে মনের অবস্থা কেমন থাকে; আর সুন্দর পোশাক পরে নামাজ পড়লে কেমন হয়। আর পোশাক যেহেতু জিকির করে, তাই শরীরে পোশাকের পারিমাণ বেশি হলে জিকিরের পরিমাণও বাড়বে। এ জন্য আমরা সবসময় টুপি পরে নামাজ পড়ব। সম্ভব হলে পাগড়িও পরিধান করব।

নবিজি কখনো টুপি ছাড়া ফরজ নামাজ পড়েননি। এমনিভাবে কোনো সাহাবি টুপি ছাড়া নামাজ পড়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া সুন্দর কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়ার কারণে আল্লাহ মাকবুল সদকার সাওয়াব দেবেন। সুতরাং নামাজের মধ্যে জাকাতের সাওয়াবও পাওয়া গেল।

বাকি রইল শুধু হজের বিষয়। নামাজে কীভাবে হজের সাওয়াব রয়েছে, এ প্রসঙ্গে মুফাসসিরগণ তাফসিরের কিতাবে লিখেন, আমরা যখন নামাজে দাঁড়াই, তখন কিবলামুখি হয়ে দাঁড়াই। আর মুসলমানদের কিবলা হলো কাবা শরিফ এবং হজও করা হয় এই কাবায়। সুতরাং নামাজে দাঁড়ালে আল্লাহ তাঁর দয়ায় বান্দাকে হজের সাওয়াবও দেবেন। এ জন্য এগুলোর আলাদা আলোচনার দরকার ছিল না।

এর পরের বিষয় হলো, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা। وَمِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ বলে আল্লাহ তাআলা এটাই বুঝিয়েছেন যে, মুমিন হলো তারা, যারা আল্লাহর দেওয়া সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে। এই ব্যয় করার আলোচনা করে আল্লাহ তাআলা ইহসানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেমন, কারও অনেক সম্পদ রয়েছে, আর তার কাছে যদি কিছু চাওয়া হয় এবং সে না দেয়, তবে সে কৃপণ। এই যে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও না দেওয়া, এটা তার অন্তরের কারণে। তার অন্তরে কৃপণতা রয়েছে।

যারা সদকা-খয়রাত করে, তাদের অন্তরের হালতও ভালো থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা وَمِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ বলে এমন একটা গুণ অর্জন করতে বলেছেন, যে গুণ অর্জন করলে তার অন্তরে দয়ার উদ্রেক হয়, কারো প্রতি দয়া করতে পারে, এবং এমন গুণ, যার দ্বারা নামাজ সুন্দর হয়, ঈমান সুন্দর হয়। এমনটা গুণ যখন কেউ অর্জন করবে, তখন সেগুলো হলো ইহসান। এগুলোই হলো মূল দ্বীন। এরপর ইহসানের মধ্যে যখন উন্নতি ঘটবে, তখন সেটা একপর্যায়ে ইয়াকিনের রূপধারণ করে।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 মুত্তাকিদের বিশেষ গুণ

📄 মুত্তাকিদের বিশেষ গুণ


আমাদের আলোচনা চলছিল পরকালের উপর বিশ্বাস সম্পর্কে। আল্লাহপাক বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ মুত্তাকিরা আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে। তবে এই বিশ্বাস হতে হবে দৃঢ়। এমন দৃঢ় যে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। অস্বীকার করলেই আপনার ঈমান চলে যাবে। যেভাবে '১' সংখ্যাটি '২' সংখ্যা থেকে ছোট এবং '২' সংখ্যাটি '১' সংখ্যা থেকে বড়, এতে যেমন কারও কোনো সন্দেহ নেই; বরং সারা দুনিয়াবাসী এটার উপর একমত, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ এক এবং সত্য। এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। যেভাবে নবিজি বলেছেন, আল্লাহ এক, এটাও সত্য। জান্নাত-জাহান্নাম আছে, এটাও সত্য। আখিরাতও সত্য। আমরা যে মৃত্যুবরণ করব, এটাও সত্য। সুতরাং এসব সত্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস করে ঈমান আনলাম। তবে কেউ যদি এই 'মানা'র পাশাপাশি 'না-মানা'র ব্যাপারটিও অন্তরে ধারণ করে, তাহলে হবে না।

এখন কেউ এগুলো মানলো। যখন বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, আমি আল্লাহ মানি, নবি মানি, ইসলাম মানি, এ মুহূর্তে জান বাঁচানো ফরজ। বিপদ কেটে গেলে আবার আগের নাফরমানির জায়গায় চলে যায়। এটা কখনো দৃঢ় বিশ্বাস হতে পারে না। এটা সুবিধাবাদি বিশ্বাস। এ জন্য আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে ঈমান আনতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে।

মৃত্যু নিয়ে দুনিয়ার মানুষ সকলেই একমত যে, মৃত্যু একটি সত্য বিষয়। প্রাণিমাত্রই মৃত্যুবরণ করবে। ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলিম সকলেই এটা বিশ্বাস করে এবং অন্তর থেকেই এটা বিশ্বাস করে থাকে। এই যে একটা বিশ্বাস, আখিরাতের ব্যাপারেও এমন বিশ্বাস থাকতে হবে। আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাসের প্রমাণ রাখতে হবে বেশি বেশি সিজদাহ করার মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন,

فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ﴾

হে নবি, আপনি আপনার প্রভুর তাসবিহ পড়ুন এবং বেশি বেশি সিজদা করুন। এ জন্য আমরা বেশি বেশি সিজদা করব। নফল নামাজে একাকী দীর্ঘ সময় সিজদায় ব্যয় করব। সিজদা করলে আপনার শারীরিক অনেক ফায়েদা হবে। আপনি যখন দীর্ঘ সময় নিয়ে সিজদা করবেন, তখন আপনার শরীরের রক্তসঞ্চালন বেড়ে যাবে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে আপনার মাথা হালকা হবে। প্রেশার কন্ট্রোলে থাকবে। এ ছাড়া সিজদা হলো আল্লাহর সঙ্গে নৈকট্য লাভ এবং সম্পর্ক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এক হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مَعَ الله وهو ساجد

সুতরাং সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। হাদিস শরিফে রাসুল ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মাধ্যম হলো তাকওয়া। আর তাকওয়া হলো গুনাহের বিপরীত। এ জন্য যে গুনাহ করে, সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, আর গুনাহ থেকে দূরে থাকলে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। এভাবে বান্দা তাকওয়া অর্জন করে একপর্যায়ে ইয়াকিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পর বান্দার ঈমান বা বিশ্বাসের যে অবস্থা হয়, সেই বিশ্বাসকে ইয়াকিন বলা হয়। এ জন্য মৃত্যুকেও ইয়াকিন বলা হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলে,

وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ

ইয়াকিন আসার আগ পর্যন্ত তুমি তোমার প্রভুর ইবাদত করতে থাকো। এখানে ইয়াকিন মানে মৃত্যু।

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা বলে, 'ইয়াকিন হয়ে গেলে আর ইবাদত করা লাগে না।' এ কথা যারা বলে, তারা হলো ভন্ড, বাটপার। এরা কুরআনের তাফসিরের অপব্যখা করে। এদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

জাহান্নামে যাওয়ার কারণ

বান্দা যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে তার জাহান্নামে যাওয়ার মূল কারণগুলো কী হবে? জাহান্নামিরা যখন জাহান্নামে চলে যাবে, তখন জান্নাতিরা এদের লক্ষ করে বলবে, 'মা সালাকাকুম ফী সাকার?' কোন জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কয়েকটি কারণ বলবে। তারা বলবে, لَمْ نَكُ مِنَ لْمُصَلِّينَ

আমরা নামাজি ছিলাম না, অর্থাৎ দুনিয়ায় থাকতে আমরা নামাজ আদায় করতাম না। এরপর وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ আমরা মিসকিন-অভাবীদের খাবার দিতাম না। وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ আমরা সমালোচকদের সঙ্গে সমালোচনা করতাম। রটনাকারীদের সঙ্গে রটনা করতাম।

এক ধরনের মানুষ আছে এমন, অন্যের বিরুদ্ধে কিছু না বললে যেন তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। সারাদিন কারো না কারো সমালোচনা করতে থাকাই তাদের কাজ। অন্যের দোষত্রুটি আর মন্দচর্চা না করলে তারা শান্তি পায় না। অথচ, অসাক্ষাতে কারো দোষচর্চা করাকে গিবত বলে। গিবত একটি জঘন্য কবিরা গুনাহ। নবিজি বলেছেন, গিবত করা মানে নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য ব্যাপার!

তারা যখন কারো গিবত করে, যখন অন্যের সমালোচনা করে, আর তাদের বলাহয়, ভাই! বাদ দিন, লোকটি সামনে নেই। আর কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষচর্চা করলে গিবত হয়, তখন তারা বলে, আমি এই কথাগুলো তার সামনেও বলতে পারব। তারা ভাবে, যেকথা সামনে বলা যাবে, সেটা অসাক্ষাতে বললে বুঝি গিবত হয় না। অথচ, এটাই গিবত।

এখানে অনেকেই একটি বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তারা ভাবেন, কারো বিরুদ্ধে অহেতুক সমালোচনা করলে, তথা মিথ্যা বদনাম করলে সেটা গিবত হয়। সত্য সমালোচনায় গিবত হয় না। অথচ, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারো মধ্যে যদি আসলেই কোনো দোষ থাকে, তাহলে সেই দোষ তার অনুপস্থিতিতে করাকেই গিবত বলাহয়। আর সেই দোষ যদি তার মাঝে না থাকে, তাহলে সেটা হলো তুহমত। তুহমতও কবিরা গুনাহ।

জাহান্নামিরা সেদিন বলবে, আমার অবস্থা এমন ছিল, আমি আমার জীবনের সৌন্দর্যের ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলাম না, বরং অন্যের চিন্তায় আমার জীবনকে নষ্ট করেছি। সময় নষ্ট করেছি। হায়! তখন অন্যের চিন্তা না করে যদি নিজের চিন্তা করতাম, তাহলে আমার জীবন সুন্দর করতে পারতাম। তখন আমি আমার জীবনকে সুন্দর করার পিছনে কাটাইনি। পুরো জীবন অন্যের পিছনে পড়ে কাটিয়েছি।

সমাজে কিন্তু এমন মানুষ অনেক। আমাদের এমন স্বভাব থাকলে দূর করতে হবে। এই স্বভাব জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আপনারা মৌমাছি হন; কিন্তু মাছি হবেন না। মাছি কেবল দুর্গন্ধ বসে। যেখানে দুর্গন্ধ সেখানে তার জায়গা। ঠিক তেমনিভাবে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা কেবল অন্যের দোষ খুঁজে। এমন খোঁজাখুঁজি করবেন না। আল্লাহ দোষত্রুটি গোপন করে রেখেছেন, আপনি খুঁজবেন কেন? আপনাকে খুঁজতে বলেছে কে? এটা কি আপনার দায়িত্ব? আপনি আপনার নিজেকে সংশোধনের ব্যবস্থা করুন। কবি বলেন,

فسوف ترى إذا انكشف الغبار : أفرس تحت رجلك ام حمار যখন তোমার অন্তরচক্ষু খুলে যাবে, তখন জানতে পারবে তুমি ঘোড়ার উপর সওয়ার, নাকি গাধার উপর সওয়ার।

এ জন্য সাবধান! অন্যের চিন্তা নয়। গিবত করা ও গিবত শোনা সমপর্যায়ের গুনাহ। সুতরাং, আমরা গিবত তো করবই না, কেউ কারো গিবত করলে আমি সেটা শুনবও না। পারলে তাকে নিবৃত্ত করব, নাহয় সেখান থেকে সরে আসব।

আপনারা মাছি হবেন না, মৌমাছি হোন। মৌমাছি কেবল ফুলে বসে। পারলে মানুষের গুণগান আলোচনা করুন। আর গুণ আলোচনা না করতে পারলে দোষ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। মানুষের দোষচর্চা মারাত্মক অপরাধ। এই অপরাধে অনেকে জাহান্নামে যাবে।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 পরকালে বিশ্বাস

📄 পরকালে বিশ্বাস


ঈমানের অপরিহার্য অংশ হলো আখিরাতে বিশ্বাস। মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন এবং সে জীবনে বিশ্বাস করতে হবে। সুরা বাকারার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ 'এবং তারা আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস করে।' [সুরা বাকারা : ৩]

সেদিন জাহান্নামিরা বলবে, আখেরাতের ব্যাপারে আমাদের ধারণা ছিল না। বিশ্বাস ছিল না। তাই আমি চিন্তা করিনি। কবরে-হাশরে কী হবে, আমি ভাবিনি। আল্লাহ বলেন, وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَومِ الدِّينِ ‘(তারা বলবে) আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৬]

হাশরের দিন যখন আল্লাহ নেককারদের পুরস্কার আর বদকারদের শাস্তি দেবেন, ওই দিনের কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। দুনিয়ার পিছনে পড়ে আখিরাতকে ভুলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ বলেন, حَتَّى اَثْنَا اليَقِينُ 'অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৭]

হঠাৎ করে মৃত্যু এসে গেল। এখানে ইয়াকিন অর্থ মৃত্যু। আর মৃত্যু যখন আসবে, নির্ধারিত সময়েই আসবে। এক সেকেন্ড আগেও না, এক সেকেন্ড পরেও না। আল্লাহ বলেন, فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ ﴾

অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না। [সুরা আরাফ: ৩৪]

যখন মৃত্যু আসবে এক সেকেন্ডও হেরফের হবে না। যে মুহূর্তে যাওয়ার দরকার তখনই প্রাণ পাখি উড়ে চলে যাবে, অথচ আমার কোনো খবর নেই। আমি তো গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হওয়া আসামি। যে কোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এটা হলো ইয়াকিন। যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। মৃত্যুকে তাই ইয়াকিন বলে।

ইয়াকিন তিন প্রকার: ১. ইলমুল ইয়াকিন, ২. হাক্কুল ইয়াকিন, ৩. আইনুল ইয়াকিন। এই তিন প্রকার ইয়াকিনের কথাই কুরআনে বর্ণিত আছে। ইলমুল ইয়াকিন হলো, বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। কেবল বিশ্বাস হলে হবে না, সঙ্গে বিশুদ্ধ জ্ঞান লাগবে। আইনুল ইয়াকিন চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। যেন সে নিজ চোখে দেখছে। আর, হাক্কুল ইয়াকিন বাস্তবতার মাধ্যমে বিশ্বাস। আল্লাহ বলেন, اَلْهُكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ

সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা তেমাদের মধ্যে পেয়ে বসেছে। যতক্ষণ-না তোমরা কবরে উপনীত হও। [সুরা তাকাসুর: ১-২]

অর্থাৎ, সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় তোমরা ব্যস্ত থাকবে, আর কবরের ডাক চলে আসবে। এখন তুমি যদি এসব জিনিস পেছনে ফেলে কবরে কী নিয়ে যাওয়া যায়, হাশরের ময়দানে কী নিয়ে উঠা যায়, কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যায়, জাহান্নাম থেকে বাঁচা যায়, এগুলো নিয়ে চিন্তা করো, উপকরণ প্রস্তুত করো, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহ সুসংবাদ রেখেছেন। এরপর আল্লাহ বলেন, كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ

কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৩]

অর্থাৎ, সম্পদবৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া তোমার জন্য কখনো ঠিক হয়নি। কিন্তু এমন সম্পদ, যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয়, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ

নেককারের জন্য উত্তম মাল কতইনা ভালো! কেউ যদি নেককাজে তার সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে নেককার বানিয়ে দেন। সুতরাং সম্পদ থাকলে সেটা যদি ভালো কাজে ব্যবহারের নিয়ত থাকে, তবে সম্পদ অর্জন দোষণীয় নয়। আর যে সম্পদ তোমাকে কবর ভুলিয়ে দেয়, হাশর ভুলিয়ে দেয়, জান্নাত ভুলিয়ে দেয়, জাহান্নাম ভুলিয়ে দেয়, আল্লাহ ভুলিয়ে দেয়, নবি ভুলিয়ে দেয়, এমন সম্পদ অর্জন দোষণীয়। তবে যে সম্পদের কারণে আল্লাহর ভালোবাসা বেড়ে যায়, নবির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়, আখিরাতের সামানা তৈরি করা যায়, এটা হলো নি'মাল মাল বা উত্তম সম্পদ।

আল্লাহ বলেন, কাল্লা সাওফা তা'লামুন অর্থাৎ, যা করতেছ, তা অতিসত্বর তোমরা জানতে পারবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ধমক। হাশরের ময়দানে উপস্থিত হতেই হবে। সে দিন কয়েকটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না। আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাকে যে জীবন দিয়েছিলাম, তা কোন খাতে ব্যয় করেছ? এখন জবাব দাও। তোমার যৌবন কোন খাতে ব্যয় করেছ, জবাব দাও। তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছিলাম, তা কীভাবে অর্জন করেছ, কীভাবে ব্যয় করেছে, জবাব দাও। তোমাকে যে জ্ঞান দিয়েছিলাম, সেই জ্ঞান অনুযায়ী তুমি কতটুকু আমল করেছ, জবাব দাও। হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, কিয়ামতের দিন এই প্রশ্নসমূহের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না।

এ জন্য كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ বলে আল্লাহ একটি হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সে দিন তোমাদের খবর হবে। জানতে পারবে সব। এরপর আবারও ধমক দিয়ে আল্লাহ বলেন,

ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ

তারপর কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৪] অর্থাৎ, আমি আবারও বলছি, তোমাদের এ কাজ ঠিক হয়নি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, তোমরা যা করতে। পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,

كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ

কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে। [সুরা তাকাসুর: ৫] অর্থাৎ, এটা করা কখনো ঠিক হয়নি। যদি তোমরা জানতে, ইলমুল ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞান যদি তোমরা অর্জন করতে, আল্লাহর কথা মানতে, নবির কথা বিশ্বাস করতে, তবে কখনো এমনটা করতে না। দুনিয়ার পিছে দৌড়াতে না; বরং আখিরাতের সামানা অর্জনের সচেষ্ট থাকতে। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সুতরাং এখানে তোমরা দুনিয়ার পিছনেও লাগতে পারো, আখিরাতের সামানাও অর্জন করতে পারো, এই সুযোগ রয়েছে। তবে বুদ্ধিমানের কাজ হলো আখিরাতের সামানা অর্জন করা। এক হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,

الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ. وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ

যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে স্বীয় আয়ত্তাধীন রেখেছে এবং মৃত্যুর পরের জন্য নেকির পুঁজি সংগ্রহ করেছে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত সফল ও বুদ্ধিমান। আর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে আল্লাহর প্রতি ক্ষমার আশা পোষণ করে, মূলত সে-ই অক্ষম (নির্বোধ)।

সত্যিকার বুদ্ধিমান হলো সে, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এবং এমন আমল করে, যে আমলের কারণে আখিরাতে নাজাত পায়। আল্লাহ বলেন,

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتْنِ

আর যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে, তার জন্য থাকবে দুটি জান্নাত। [সুরা আর-রাহমান: ৪৬]

সত্যিকার বুদ্ধিমানরা তাদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নফস গুনাহ করতে চায় কিন্তু আল্লাহর ভয়ে করে না। আর আল্লাহর ভয়ে যে গুনাহ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে স্পেশাল দুটি জান্নাতের মালিক বানিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ বলেন, যদি সে নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতো, অর্থাৎ, যদি বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হতো, তবে সে কখনো দুনিয়ার পিছনে ছুটত না। অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করত না; বরং হালাল পন্থায় প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনেই সে সন্তুষ্ট থাকত। আর এমন ব্যক্তি মৃত্যুর সাথে সাথেই জান্নাতে পৌঁছে যেত। পরের আয়াতে আল্লাহ আবারও ধমক দিয়ে বলেন,

لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ ۞ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ ۞ ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ

অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। আবার বলি, তোমরা তা অবশ্য অবশ্যই দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। তারপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা তাকাসুর: ৬-৮]

যারা শুধু দুনিয়া অর্জনের পেছনে হরদম মত্ত থাকতে, অবশ্যই অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। সেদিন তোমরা স্বচক্ষে জাহান্নাম দেখতে পাবে। অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে দুনিয়াতে দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।

মোটকথা, দুটি বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, একটা হলো ইলমে ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস করতে হবে। অপরটি আইনুল ইয়াকিন বা চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে। অর্থাৎ, সে চাক্ষুষভাবে জান্নাত-জাহান্নাম দেখবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়াতে কীভাবে দেখবে? হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, একজন মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার সামনে জান্নাত-জাহান্নাম পেশ করা হয়। সে যদি জান্নাতি হয়, তবে জান্নাত দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে, আর জাহান্নামি হলে জাহান্নাম দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে। এসময় তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তোমার নামে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, জাহান্নামও বরাদ্ধ ছিল। দুনিয়ার সকল মানুষের নামেই একটা জান্নাত এবং একটা জাহান্নাম রয়েছে। আবু জাহলের নামেও জান্নাতও আছে, জাহান্নামও আছে। ঠিক তমনিভাবে আবু বকরের নামেও জান্নাত এবং জাহান্নাম রয়েছে। কিন্তু আবু জাহল জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নামই বেছে নিয়েছে। আর আবু বকর জাহান্নামের পরিবর্তে জান্নাত। তো এখন তার নামে যে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, সেটা কোথায় যাবে বা কে পাবে? এর উত্তর হলো, তার বরাদ্ধে থাকা জান্নাত তখন মুমিনকে বোনাস হিশেবে দিয়ে দেওয়া হবে।

এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, জাহান্নামিদের নামে বরাদ্ধ থাকা জান্নাত বোনাস হিশেবে জান্নাতিদের দান করা হবে। আর জান্নাতিদের নামে বরাদ্ধে থাকা জাহান্নাম তখন ওই জাহান্নামিদের দিয়ে দেওয়া হবে। এটা বোঝাতেই আল্লাহ 'জান্নাতান' বা দুটি জান্নাতের কথা বলেছেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বান্দার সামনে জান্নাত-জাহান্নামের পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরা হবে।

এখন যারা জান্নাতি, তাদের জান্নাত দেখতে পাওয়া- এই দেখা দুনিয়ার দেখা নয়, সেটা অন্যরকম দেখা। ফেরেশতারা তখন রেশমের রুমাল, জান্নাতি খুশবু ইত্যাদি নিয়ে আগমন করেন, তখন সে এসব দেখে হাসতে থাকে। আর জাহান্নামিরা মৃত্যুকালে জাহান্নাম দেখতে থাকে আর ভয় পেতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ (বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]

এ জন্য মৃত্যুপথযাত্রী জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে পায় কিন্তু তার নিকটে থাকার পরও আমরা দেখতে পাই না। দুনিয়ার চোখ-কান দিয়ে তা দেখা এবং শোনা যায় না। যেভাবে আপনার সাথে ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছে যে, তাকে কুকুর দৌড়াচ্ছে। তাই পেরেশান হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু আপনি পাশে থাকার পরও এটা দেখতে পাননি। ঠিক তেমনিই হবে সাকারাতের সময়ের অবস্থা। এ জন্য সাকরাতের সময় যারা আপনজন, তারাই তার পাশে থাকবে। সেসময় অযথা কান্নাকাটি চিল্লাচিল্লি করা ঠিক নয়। কেননা, এর মাধ্যমে সে কষ্ট পায়。

সাকরাতের সময় আমাদের করণীয় কি, এ সম্পর্কে রাসুল ﷺ বলেন, لَقَّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ তোমরা মৃত্যুর দুয়ারে থাকা ব্যক্তির কানের কাছে গিয়ে কালিমা পাঠ করো। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ভুল করে থাকি। কালিমার পড়ার জন্য চাপ দিই। বলাতে চেষ্টা করি। না, এটা ঠিক নয়; বরং তার কানের কাছে শুধু কালিমা পড়তে থাকবেন। এখন সে যদি একবার কালিমা পড়ে নেয়, তবে আর বলবেন না। এবং এ অবস্থায়ই যদি সে মারা যায়, নবিজি ﷺ বলেন, এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। নবিজি ﷺ বলেন, من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة যার সর্বশেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতি। এ জন্য সাকরাতের ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কার কখন কীভাবে মৃত্যু হবে, আল্লাহই ভালো জানেন। হে আল্লাহ, সাকরাতের সময় আমাদের শাস্তি দিয়ো না। ঈমানের সাথে আমাদের মৃত্যু নসিব করো। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 শবে কদরের দুআ

📄 শবে কদরের দুআ


আমরা আবারও আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের পবিত্র এ মাসে তাঁরই কালাম কুরআনচর্চায় নিয়োজিত রেখেছেন। আবারও বলি, আলহামদুলিল্লাহ। ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি যে, এই কুরআনের মাধ্যমে শুধু তারাই হিদায়ত লাভ করবে, যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। আর তাকওয়া এমন একটি ভূষণ, যা পরিধান করে আল্লাহর সামনে যাওয়া যায়। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেন,

لِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম পোশাক। সুরা আরাফ: ২৬]

আজ ২৬ রমজান দিবাগত রাত। মানে ২৭ এর রাত। এ রাতকে আমরা আমাদের ধারণামতে শবে কদর মনে করে থাকি। তবে এই তারিখই যে কদরের রাত, এমনটা নিশ্চিত নয়; বরং সম্ভাবনা আছে। কেননা, আল্লাহর রাসুল রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর তালাশ করতে বলেছেন। এ হিশেবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখেও শবে কদর হতে পারে। এ জন্য শুধু ২৭-এর রাতকে নির্দিষ্ট না করে সব বিজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ الْفِ شَهْرٍ লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। [সুরা কাদর: ৩]

আমি প্রথমে একটি আয়াত তিলাওয়াত করেছি, যাতে তাকওয়ার পোশাকের কথা বলা হয়েছে। আয়াতটি হচ্ছে, লিবাসুত তাকওয়া, জালিকা খাইর। অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়ার পোশাক পরিধান করতে বলেছেন। কেননা, এটি উত্তম পোশাক। জালিকা খাইর বলে এটাই বোঝানো হয়েছে। আর এই তাকওয়ার পোশাক, যা পরিধান করে বান্দা সহজেই আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।

আল্লাহ যে তাকওয়ার পোশাকের কথা বলেছেন, এটার অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে, আমরা সাধারণত বিভিন্ন পোশাক পরিধান করে থাকি। ঠান্ডা বা শীত থেকে রক্ষা পেতে গরম উলের কাপড় বা মোটা কাপড় অথবা জ্যাকেট পরি। তেমনি গরম থেকে বাঁচতে হালকা-পাতলা পোশাক পরি। আবার যখন কাজ করি, তখন একধরনের পোশাক পরি এবং ইবাদত-বন্দেগি বা মসজিদে নামাজ পড়ার সময় ভিন্ন পোশাক পরি। সফরের সময় আলাদা পোশাক পরি। এটা মূলত স্থান-কাল-পাত্রভেদে আমরা পরিধান করে থাকি। আমাদের নবিজি তিন ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। একটা শুধু ঘরে অবস্থানের সময়, আরেকটা জুমুআর দিন, আরেক ধরণের পোশাক পরতেন মেহমান বা অতিথির সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।

আমরা যেমন কাজের সময় একধরনের পোশাক পরি, আবার নামাজের সময় অন্য পোশাক পরি। কাজের পোশাক পরে মসজিদে যাই না, আবার নামাজের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরে কাজ করি না। তেমনি গরমের সময় ঠান্ডার পোশাক আর ঠান্ডার সময় গরমের পোশাক পরি না; বরং যখন যেটা মানানসই, সেটাই পরিধান করি।

তো আমাদেরকে আল্লাহর সামনে যেতে হলেও একটা পোশাক বা ইউনিফর্ম পরতে হবে। আর সেটা হচ্ছে তাকওয়ার পোশাক। আপনি যদি জান্নাতে যেতে চান, অবশ্যই আপনাকে তাকওয়ার ইউনিফর্ম পরিধান করতে হবে। লিবাসুত তাকওয়া বলে কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেটাই বলেছেন।

আল্লাহর সামনে যেতে হলে—যেতে হলে মানে—যেতে তো হবেই, আমাদেরকে তাকওয়ার পোশাক পরতে হবে। হাশরের ময়দানে সকলকে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। যেখানে বাহ্যিক পোশাকের কোনো দাম থাকবে না; বরং তাকওয়া নামক পোশাকের মাধ্যমেই আমাদেরকে জান্নাতের অধিকারী হতে হবে। এ জন্য দুনিয়াতেও অনেক বড় বড় মুত্তাকি-পরহেজগারকে আল্লাহ তাআলা তাকওয়ার পোশাক পরিধান করিয়ে থাকেন।

সুতরাং বোঝা গেল, আপনার কাছে যদি তাকওয়ার পোশাক থাকে, তাহলে দুনিয়ার পোশাকের কোনো প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার মানুষ যদি আপনাকে উলঙ্গও করে দেয়, তবু আল্লাহর কাছে আপনার দাম কমবে না। দুনিয়াতে এভাবে কেউ কাউকে উলঙ্গ করেছে, এমন নজির আপনাদের জানা আছে কি? মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, তখন তাঁর শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। কিন্তু এরপরও তাঁর সম্মান কমেনি; বরং আল্লাহ তাঁর সম্মান আরও বাড়িয়ে ঘোষণা দেন,

﴿مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَتْكُمُ الْمُسْلِمِينَ﴾

এটাই তোমাদের পিতা ইবরাহিমের দ্বীন, আল্লাহ তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম। [সুরা হজ: ৭৮]

নমরুদের লোকেরা নবি ইবরাহিমের শরীরের পোশাক খুলে ফেললেও তাঁর তাকওয়ার পোশাক খুলতে পারেনি। কিয়ামতের ময়দানে সকল মানুষকে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। তবে আল্লাহ সর্বপ্রথম দুজন মানুষকে পোশাক পরিয়ে কবর থেকে উঠাবেন। যে দুজনকে বিশেষভাবে সম্মানিত করবেন, তাদের একজন হলেন আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অন্যজন হবেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম।

এখন প্রশ্ন হলো, তাকওয়ার পোশাক আপনি কোথায় পরবেন? এ প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, নবিজি-কে প্রশ্ন করা হলো, 'তাকওয়া কোথায়, তখন নবিজি উত্তর দিলেন, 'এখানে এখানে এখানে (এটা বলে তিনি তাঁর বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন)।

আপনারা পোশাক পরেন কেন? উত্তরে বলবেন, ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য। এই উদাহরণ আমেরিকা হিশেবে দেওয়া। ঠিক তেমনি আপনাকেও তাকওয়ার এমন পোশাক পরতে হবে, যাতে আপনার অন্তরে গুনার আঁচড় না পড়ে। এ জন্য আল্লাহ বলেন, তাকওয়ার পোশাক পরিধান করো, এটাই উত্তম পোশাক। তোমরা যেভাবে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে উপযুক্ত পোশাক পরো, সেভাবে অন্তরকে গুনাহের কাজ থেকে রক্ষা করতে তাকওয়ার পোশাক পরো। আয়াতে আল্লাহ 'উত্তম' শব্দ বলে যে উত্তম বুঝিয়েছেন, সেটা অবশ্যই আমাদের অর্জন করতে হবে। লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ﴾

কদরের এ রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এখন আল্লাহর ভাষায় এই উত্তমের ব্যাখ্যা কী, সেটা আমাদের জানতে হবে। আমরা তো ২৭ তারিখে নির্ধারিত করে ফেলেছি। সেটা না করে যদি আমরা রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে শবে কদর সন্ধান করি, তাহলে নিশ্চিতভাবে কদরের বরকত আমাদের অর্জিত হয়ে যাবে। আর যদি কেউ তার জীবনে মাত্র একটি কদরও পেয়ে যায়, তাহলে প্রায় ৮৪ বছর একনাগাড়ে ইবাদত করে সে যে মর্যাদা লাভ করতে পারতো, মাত্র একরাতেই তা পেয়ে যাবে।

কদরের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। কদরের অর্থ সম্মান। আমরা যেমন শব্দটি ব্যবহার করি যে, অমুকের বাড়িতে গিয়েছিলাম কিন্তু তারা কোনো কদর করেনি। এটা সিলেটী একটা বাগধারা। এখন কেউ যদি বাস্তবেই লাইলাতুল কদরের সন্ধান করে এবং তা লাভ করতে পারে, তাহলে তার জীবন সফল। হাজার মাস ইবাদত করে সাওয়াব লাভ করতে পারত না, সেটা মাত্র এক রাতেই সে লাভ করে ফেলবে।

আম্মাজান হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি একবার নবিজির কাছে জানতে চান, 'আল্লাহর রাসুল, আমি যদি শবে কদর পেয়ে যাই, তাহলে কোন দুআ পড়ব?' নবিজি তখন বললেন, 'তুমি যদি শবে কদর পেয়ে যাও, তাহলে এই দুআ করবে, اللَّهمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ، فَاعْفُ عَنِّي

হে আল্লাহ, আপনি মার্জনাকারী। আপনি মার্জনা করা পছন্দ করেন। অতএব আপনি আমাকে মার্জনা করুন।

শবে কদরের কিছু বাহ্যিক আলামত রয়েছে। যে রাত শবে কদর, সেই রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকবে, বেশি ঠান্ডাও হবে না, গরমও হবে না। যে রাত শবে কদর, সেই রাত অন্যান্য রাতের চেয়ে ইবাদতের প্রতি বেশি আগ্রহ তৈরি হবে। শরীর-মনেও একটা ভালোলাগা কাজ করবে। কেননা, শবে কদর যেদিন দিবাগত রাতে হবে, সে রাতে আসমান থেকে রহমতের ফেরেশতারা দলে দলে পৃথিবীতে আগমন করতে থাকেন। ফলে পুণ্যবানদের পদভারে জমিনের বাসিন্দারাও অন্যরকম একটা প্রশান্তি অনুভব করে। এ হচ্ছে বাহ্যিক আলামত।

নবিজি কর্তৃক আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকাকে শিখিয়ে দেওয়া শবে কদরের দুআ, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফউয়া, ফা'ফু আন্নি- এই দুআ শুধু আরবিতে করতে হবে, এমন নয়। বরং যেকোনো ভাষায় অর্থাৎ আপনার মাতৃভাষায়ও করতে পারেন। ভাষা হচ্ছে আল্লাহর দান। আর সারা পৃথিবীতে ভাষার বিচিত্র ব্যবহার রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে সাড়ে চার হাজারেরও অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। বলা হয়, প্রতি ১৬-১৯ মাইল পর পর ভাষার তারতম্য রয়েছে। এ জন্য, এক দেশের গালি অন্য দেশের বুলি।

আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন— শব্দের প্রায় পাঁচটি অর্থ রয়েছে। কুরআনের আয়াত দিয়েই উদাহরণ দিচ্ছি।

১. আফুউউন শব্দের অর্থ মিটানো বা মুছে দেয়া। মানে গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া। আল্লাহ হচ্ছেন গুনাহ মোছনকারী। যেহেতু সুরা বাকারার তাফসির চলছে, এ সুরার একেবারে শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন,

وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَنَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ

আর আপনি আমাদের মার্জনা করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন, আর আমাদের উপর দয়া করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব আপনি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। [সুরা বাকারা: ২৮৬]

সুনানুত তিরমিজির এক বর্ণনায় রয়েছে, মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে কালো একটি দাগ পড়ে। আর মানুষ তখনই গুনাহ করে, যখন তার মধ্যে তাকওয়ার পোশাক থাকে না। লাকড়ি দিয়ে রান্নার ফলে পাতিলের তলা যেমন কালচে হয়, ঠিক তেমনি গুনাহের কারণেও মানুষের অন্তর কালো হয়। তাই তাকওয়া না থাকার কারণে আমাদের অন্তর যখন কালো হয়ে যায়, তখন এটা দূর করতে হলে নবিজির শেখানো দুআ পাঠের বিকল্প নেই।

আফুউউন শব্দের আরেক অর্থ অতিরিক্ত। যিনি অতিরিক্ত দেনেওয়ালা। অর্থাৎ, বেশি করে বোনাস দেন যিনি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ইয়াসআলুনাকা মাজা ইউনফিকুন অর্থাৎ, হে রাসুল! আপনাকে তারা প্রশ্ন করে, আমরা কী খরচ করব? আমরা কি সদকা, ফিতরা, যাকাত ইত্যাদি বেশি করে খরচ করব? এর উত্তর আয়াতের পরের অংশেই রয়েছে, কুলিল আফওয়া। হে নবি, আপনি বলে দিন, তারা যেন অতিরিক্ত জিনিস খরচ করে। যাকাত যে দিচ্ছে, এটা হচ্ছে ফরজ কাজ। আর জাকাত দিলেই শেষ হয়ে যায় না। কেননা, এটা গরিবের প্রতি আপনার অনুগ্রহ নয়; বরং আপনার প্রতি গরিবের অনুগ্রহ।

আপনি জাকাত দিয়ে গরিবকে দয়া করেননি, বরং সে আপনার জাকাত গ্রহণ করে আপনার উপর দয়া করেছে। কারণ, জাকাত খাওয়া তার জন্য ফরজ নয়, এটা তার অপারগতা, কিন্তু জাকাত আদায় করা আপনার জন্য ফরজ। সে জাকাত গ্রহণ না করলে গুনাহগার হবে না, কিন্তু আপনি জাকাত আদায় করার ক্ষেত্র না পেলে জাকাত না দেওয়ার কারণে জাহান্নামি হবেন।

আপনি মসজিদে নামাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন এবং পথিমধ্যে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এখন কেউ একজন আপনাকে ধরে তুলল এবং হাতে ধরে মসজিদে নিয়ে গেল। এই যে আপনার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, এই নামাজ তো ফরজ ইবাদত। এই যে একজন আপনাকে সহায্য করল, এটা হচ্ছে ইহসান। আপনাকে সে অতিরিক্ত কিছু দিল। আপনার হাত ধরে আপনাকে মসজিদে পৌঁছে দেওয়া লোকটির দায়িত্ব ছিল না। আফুউউন শব্দের অর্থ অতিরিক্ত। যিনি অতিরিক্ত দেন, আর তা দেবেন আমাদের চাওয়ার মাধ্যমে। এ জন্য আল্লাহর রাসুল এই দুআ পড়তে বলেছেন।

আফুউউন এর আরেক অর্থ হচ্ছে দান করা। ইন্নামা আনা কাসিমুন ওয়াল্লাহু ইউতি। নবিজি বলেন, দাতা হলেন আল্লাহ, আর আমি হলাম বণ্টনকারী। এ জন্য আমাদের যে কোনো প্রয়োজনে আমরা আল্লাহর কাছে চাইব। যেমন আল্লাহর কাছে রিজিক চাওয়া। সহিহ বুখারিতে আছে, আল্লাহ মানুষকে ডেকে ডেকে বলেন, 'কে আছ চাইবে, আমি তাকে রিজিক দেবো।

আফুউউন এর অন্য অর্থ হচ্ছে ক্ষমা। অর্থাৎ ক্ষমা করে দেওয়া, যাতে কোনো শাস্তি থাকে না। কেউ কোনো ভুল করলে তাকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া। অনেকে দেখা যায়, শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা তো করে দেয়, তবে এমন কিছু কথা বলে, যা শাস্তি থেকেও বড় হয়ে যায়। কলিজায় আঘাত লাগে। যেমন কেউ বলল, তুই আমার সাথে যা করেছিস, তাতে উচিত ছিল থাপড়ে তোর সব দাঁত ফেলে দেওয়া। কিন্তু যা, আমি তোকে ক্ষমা করে দিলাম। এটা আফুউউন নয়। আর যারা এমন করে না, অর্থাৎ কেউ অপরাধ করলে উল্টো তাকে সরি বলে, যেখানে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, এরপরও সে তা করে না, এমন ব্যক্তির ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ফামান আফা ওয়াসলাহা ফা-আজরুহু আলাল্লাহ। যে কাউকে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করে দেয়, কোনো ফেরেশতা তাকে পুরস্কার দেবেন না; বরং কিয়ামতের দিন তার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ দেবেন। যে দিন সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে,

لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ

আজ রাজত্ব কার? এক প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর। [সুরা মুমিন: ১৬]

শবে কদরের রাতে বেশি করে اللَّهِمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ، فَاعْفُ عَنِّي এই দুআ পড়া এবং কান্নাকাটি করে দুআ করা উচিত। হে আল্লাহ, আমি অনেক পাপ করেছি, অপরাধ করেছি, আমাকে আপনি ক্ষমা করে দিন।

এ জন্য শবে কদর তথা পুরো রমজানেই আল্লাহর কাছে পাপমোচনের জন্য তাওবা এবং প্রয়োজনীয় বিষয় চাওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতসহ নফল ইবাদত বেশি করে করতে হবে। এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। তাই এ মাসে কুরআন তিলাওয়াতে অফুরান সাওয়াব রয়েছে। এ ছাড়া অতীতের কাজা নামাজ বা উমরি কাজা আদায় করা জরুরি। কারণ, এটা আল্লাহর কাছে আপনার ঋণগ্রস্থতা। যদি কাজা নামাজ আদায় না করেন, তাহলে পরকালে আটকে যাবেন। যেভাবে কোনো মানুষের কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নিলে সেটা সময়মতো পরিশোধ করা কর্তব্য, ঠিক তেমনি ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা ফরজ। আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الصَّلوةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَبًا مَّوْقُوْتًا

নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। [সুরা নিসা: ১০৩]

এ ছাড়া বান্দার কাছে যেভাবে ঋণগ্রস্থ হলে তা সময়মতো আদায় করতে হয়, তেমনি আল্লাহর কাছে যে আপনি ঋণগ্রস্থ, সেটাও আপনাকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ জন্য ফজরের সময় ফজরের কাজা নামাজ, জুহরে জুহরের কাজা নামাজ, এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের কাজা নামাজ পড়বেন। প্রতিটি নামাজের সময় প্রতিদিন কিছু কিছু করে অতীতের কাজা নামাজ পড়বেন।

অনেকে বলেন, কাজা নামাজ বলে কিছু নেই। কথাটি সঠিক নয়। কেউ যদি তার জীবদ্দশায় কাজা নামাজ আদায় করার সুযোগ না পেয়ে মারা যায়, তাহলে তার ওয়ারিসানের উচিত হলো মৃতের কাজা নামাজগুলো হিসাব করে করে কাফফারা আদায় করা। এক ওয়াক্ত নামাজের কাফফারা একটি ফিতরার সমমূল্য। প্রতিদিন ৬ ওয়াক্ত নামাজ হিসাব করে ফিতরা দিতে হবে। ফজর, জুহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও বিতর।

এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করা দরকার। সহিহ বুখারিতে আছে, একবার এক নারী নবিজির কাছে এসে জানতে চান, আল্লাহর রাসুল, আমার বাবা অত্যন্ত অসুস্থ, হাঁটাচলার সামর্থ নেই; কিন্তু হজ করার নিয়ত করেছিলেন, এখন আমি কি তার পক্ষে হজ করতে পারি? তখন নবিজি তাকে জবাব দেন, যদি তোমার পিতা কারও কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নেন, তাহলে সেটা কি তুমি তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে পারবে? মহিলা বললেন, হ্যাঁ। তখন নবিজি বলেন, তাহলে হজও করা যাবে। এই হাদিস থেকেই ফুকাহায়ে কেরাম সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মৃতের পক্ষ থেকে হজ করলে সেই হজ যদি আদায় হয়, তাহলে তার পক্ষ থেকে নামাজের কাফফারা দিলে সেটা কেন আদায় হবে না। অবশ্যই হবে。

উমরি কাজা আদায়ের একটা পদ্ধতিঃ প্রথম ফজরের কাজা নামাজ দিয়ে শুরু করবেন। এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের নিয়ত করবেন। এখন কারও যদি ২০ বছরের নামাজ কাজা থাকে আর সে এই কাজা নামাজ শুরুর কয়েকদিন পরে মারা যায়, তাহলে হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সে তার নিয়তের কারণে ২০ বছর কাজা নামাজ পড়ে ফেলার সাওয়াব পাবে।

তেমনিভাবে কেউ যদি ২০ বছর কুফরির উপর থাকার নিয়ত করে, আর এই নিয়তের কয়েকদিন পরেই মারা যায়, তাহলে সে জাহান্নামে যাবে তার নিয়তের কারণে। কেননা, হজরত সাহল ইবনু সায়িদ আস-সায়িদি থেকে বর্ণিত হাদিস,

نِيَّةُ الْمُؤْمِنِ خَيْرٌ مِّنْ عَمَلِهِ ، وَعَمَلُ الْمُنَافِقِ خَيْرٌ مِّنْ نِيَّتِهِ ، وَكُلُّ يعمل على نيته ، فإذا عمل المؤمن عملا ، ثار في قلبه نور

মুমিনের নিয়ত অনেক সময় আমলের চেয়েও শ্রেয়। মুনাফিকের নিয়ত আমল থেকেও মারাত্মক। প্রত্যেকের আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। মুমিন যখন কোনো আমল করে, তখন সেটা তার কলবের মধ্যে নূর হিসাবে উদ্ভাসিত হয়।

কারণ, মুমিনের নিয়ত অনেক সময় আমলের চেয়েও শ্রেয়। কারণ, নিয়তে কোনো রিয়া বা লোক দেখানোর ব্যাপার থাকে না, কিন্তু আমলে রিয়া থাকতে পারে। আর রিয়াযুক্ত কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

কিয়ামতের দিন প্রথমেই নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নফল নামাজের কোনো হিসাব নেওয়া হবে না। ফরজের আগে যে সময় পাওয়া যায়, তাতে চাইলে ২-৪ রাকাত উমরি কাজা আদায় করা সম্ভব। বান্দার ফরজ নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। এখন যদি বান্দার ফরজ নামাজে ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই নফল নামাজ আছে কিনা, সেটা দেখা হবে। যদি থাকে, তাহলে সেটা দিয়েই তার ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। তার মানে এই নয় যে, আপনি কাজা নামাজগুলো আর আদায় করবেন না। কাজা নামাজগুলো আদায় করা ফরজ, যেমনভাবে কাজা রোজাগুলো আদায় করা ফরজ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px