📄 ঈমানের শাখাসমূহ
হামদ ও সালাতের পর। আমাদের আলোচনা হচ্ছিল মুত্তাকিদের সম্পর্কে। এখানে আল্লাহ মুত্তাকিদের কিছু গুণের আলোচনা করেছেন। তাদের প্রথম গুণ হচ্ছে, الَّذِينَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ, না দেখে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে। আল্লাহকে দেখা যায় না, তবু তারা বিশ্বাস করে। কারণ, এই পৃথিবীতেও এমন অনেক জিনিস আছে, যা না দেখে বিশ্বাস করতে হয়। যেমন: ফুলের ঘ্রাণ। এটা দেখা যায় না, তবু বিশ্বাস করতে হয়। এমনিভাবে আপনার কপাল, যা আপনি কখনো দেখেননি, যে কপাল নিয়ে মানুষ গর্ব করে, এই কপাল দেখা যায় না। আয়না দিয়ে দেখলে এটাকে প্রকৃত অর্থে দেখা বলা যায় না; বরং সেটা হয় কপালের প্রতিচ্ছবি দেখা। আপনি মূল কপাল কখনো দেখতে পাবেন না। ঠিক তেমনি আল্লাহ যে একজন আছেন, এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। আল্লাহ দেখে বিশ্বাস করার বিষয় নয়, আল্লাহ অনুভব করার বিষয়। তেমনিভাবে আমরা যে আমাদের প্রাণ বা জান নিয়ে বেঁচে আছি, এই প্রাণ কোথায় আছে—হাতে, পায়ে বা মাথায়? আপনারা কখনো দেখেছেন? কেউ কি দেখেছে? না, কেউ দেখেনি, তবুও আমরা বিশ্বাস করি। প্রাণ যে আছে, এটা আমরা না দেখেই বিশ্বাস করি; কিন্তু প্রাণ ঠিক কোথায় আছে, এটা কোনো বিজ্ঞান এখনো বুঝতেও পারেনি, কখনো পারবেও না। এই যে না দেখে বিশ্বাস করা, এটা অন্ধ বিশ্বাস নয়; বরং এটা হচ্ছে মূল বিশ্বাস। আর মুত্তাকিদের প্রথম গুণ হচ্ছে না দেখে বিশ্বাস করা। ইমান সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছে আমাদের। আর ঈমান সম্পর্কে আলোচনা করলে কী হয়, এ জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। আমরা কুরআনচর্চার এই মজলিসে বসেছি। এটা লাভ না ক্ষতি সেটা জানব। যেহেতু ক্ষতির মধ্যে কেউ জড়াতে চায় না, তাই বুখারি শরিফের কিতাবুল ঈমান অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি হাদিস রয়েছে, যে হাদিসে হজরত মুআজ ইবনু জাবাল রা.-এর কথা ইমাম বুখারি রাহ. উল্লেখ করেছেন।
সাহাবি হজরত মুআজ ইবনু জাবাল তাঁর ছাত্র আসওয়াদ ইবনু হিলালকে লক্ষ করে বলেন, (اجلس بنا) ইজলিস বিনা-তুমি আমাদের কাছে বসো, (نؤمن ساعة) নু'মিনু সা-আতান-কিছু সময় বসে আমরা আমাদের ঈমানকে তাজা করব।
এখন সাহাবিদের যদি ঈমান তাজা করতে হয়, তাহলে আমরা কী করব? আমাদের ঈমান কি এতই মজবুত যে, সিমেন্ট দিয়ে শক্ত করে পাকা করা? না, বরং আমাদের ঈমানও তাজা করতে হবে। ঈমান নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মুআজ ইবনু জাবাল রা., যিনি হলেন সায়্যিদুল মুজতাহিদিন ও জলিলুল কদর সাহাবি। তাঁর যদি এই অনুভূতি হয়, তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
মুআজ ইবনু জাবাল রা. বলেন, তুমি আমাদের কাছে বসো, কিছু সময় বসে আমরা আমাদের ঈমানকে তাজা করব, এটা হচ্ছে শাব্দিক অর্থ। মূল কথা হচ্ছে, আমরা বসে কিছু সময় ঈমানের আলোচনা করে আমাদের ঈমান তাজা করব।
ঈমান কি বাড়ে, অথবা কমে
ঈমানের মূল হলো, ঈমান বাড়েও না, কমেও না। তবে পবিত্র কুরআনে শুধু বৃদ্ধির কথাই আছে, কমে যাওয়ার কোনো কথা নেই। আর এই বৃদ্ধির মর্ম হলো ঈমানের হাকিকতে কোনো বৃদ্ধি হয় না, তবে ঈমানের পাওয়ার বাড়ে। হাকিকতে ঈমান বাড়বে না; কারণ, ঈমানের জায়গা যেহেতু কলব আর মানুষের শরীরে কলব একটি, তাই বৃদ্ধি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই ঈমানের পাওয়ারই বাড়ে। আর কাইফিয়াতে ঈমান বৃদ্ধি যে মাধ্যমে হয়, হাদিসের পরিভাষায় এটাকে ইহসান বলা হয়। হাদিসে জিবরিলে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন। হাদিসে জিবরিলে তিনটি বিষয় অর্থাৎ ইসলাম, ঈমান, ইহসান। এই তিনটি যেহেতু ঈমানের আলোচনা, তাই এগুলো ভালো করে বুঝতে হবে।
এই তিনটি বিষয়ে জিবরিল ও নবিজির প্রশ্নোত্তরের পর নবিজি সাহাবিদের বললেন, তিনি হলেন জিবরিল, আতাকুম ইউআল্লিমুকুম দ্বিনাকুম, তিনি এসেছিলেন তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য। দ্বীনের এই তিনটি পয়েন্ট আপনারা স্মরণ রাখবেন। ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের আলোচনা পবিত্র কুরআনে এভাবে আছে, আল্লাজিনা ইউমিনুনা বিল গাইব-এখানে ঈমানের কথা এসেছে, ওয়া ইউকিমুনাস সালাতা-এখানে ইসলামের কথা, ওয়া মিম্মা রাজাকনা হুম ইউনফিকুন-এখানে ইহসানের কথা এসেছে।
নবিজি যেহেতু সবচেয়ে বড় মুফাসসির, তাই হাদিসে জিবরিলের তাফসির নবি নিজেই করেছেন। ইসলাম, ঈমান, ইহসান সম্পর্কে সাহাবিদের সম্যক ধারণা দিয়েছেন।
প্রথমে ঈমানের আলোচনা করেছেন এবং ঈমানের স্তর ও শাখা কয়টি, এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঈমানকে একটি গাছের সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
اَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَ فَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ
তুমি কি দেখ না কীভাবে আল্লাহ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন? উৎকৃষ্ট বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছের ন্যায় যার মূল সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত আর শাখা-প্রশাখা আকাশপানে বিস্তৃত। [সুরা ইবরাহিম : ২৪]
আমরা কালিমা তাইয়্যিবাহ পড়ি। আল্লাহ বলেন, এই কালিমা হলো একটি পবিত্র বৃক্ষের জড়। এখন যদি কোনো গাছের শুধু জড় থাকে, ডালপালা থাকে না, তাহলে এই গাছের তো মূল্য থাকবে না। অপরদিকে একটি গাছকে ফলবান বানাতে গেলে পরিচর্যা করতে হয়, চতুষ্পদ জন্তু ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হয়। তেমনিভাবে ঈমান ও ইসলামকে ফলদায়ক বানাতে হলে পরিশ্রম করতে হবে।
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেছেন, أَلَا إِنَّ سِلْعَةَ اللهِ غَلِةٌ ‘আল্লাহর কাছে ইসলাম ও ঈমানের অনেক দাম।’
এটার মূল্য পেতে হলে অনেক দরকষাকষি করে ইসলাম ও ঈমানের উপর জীবন পরিচালনা করতে হয়, তবেই জান্নাত লাভ করা যায়। এ জন্য শুধু মুখে আমি 'ইমানদার' বললে হবে না; বরং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতে হবে। আর ঈমানের জড় হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এখন আমরা যেহেতু ঈমানের জড় চিনতে পারলাম, এবার এর শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে জানব। ঈমানের ডালপালা, পাতাপল্লব ঠিক আছে কিনা, ঠিকমতো ঠিক সময়ে ফল এল কিনা, সেটা লক্ষ রাখতে হবে এবং এসবের হেফাজত করে তবেই জান্নাতে যেতে হবে। এ জন্য আমরা মৃত লাশ সামনে রেখে জানাজায় দাঁড়িয়ে দুআ পড়ি,
اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الاسْلامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ
হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাদের বাঁচিয়ে রাখবে, ইসলামের উপর রেখো, আর আমাদের মধ্যে যাদের মৃত্যু দেবে, ঈমানের উপর মৃত্যু দিয়ো।
এখানে জানা থাকা দরকার যে, জানাজায় চার তাকবির ফরজ। প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়তে হয়। জানাজার সানা হলো, سُبْحَنَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
হে আল্লাহ আমরা তোমার পবিত্রতার গুণগান করতেছি। তোমার নাম মঙ্গলময় এবং তোমার স্তুতি অতি শ্রেষ্ঠ, তুমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।
দ্বিতীয় তাকবিরের পর দুরুদে ইবরাহিমি পড়তে হয়। দুরুদে ইবরাহিমি আমরা সকলেই জানি এবং প্রত্যেক নামাজেও পড়ি, اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَا هِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَ اهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ تَجِيْد اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَا هِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর বংশধরগণের উপর এরূপ রহমত অবতীর্ণ করুন, যেরূপ রহমত হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বংশধরগণের উপর অবতীর্ণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসাভাজন এবং মহামহিম।
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর বংশধরগণের উপর তেমন অনুগ্রহ করুন, যেমন অনুগ্রহ ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বংশরগণের উপর করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসাভাজন এবং মহামহিম।
তৃতীয় তাকবিরের পর নিম্নোক্ত দুআ পড়তে হয়, أَلَّهُمَّ اغْفِرْ لِحِينَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَأَنْنَا نَا اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الأَسْلَامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإيمان
হে আল্লাহ, আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অপস্থিত বালক, বৃদ্ধ, পুরুষ ও স্ত্রী, সকলকে ক্ষমা করো। হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যাদেরকে তুমি জীবিত রাখ, ইসলামের উপর রেখো, আর তাদেরকে মৃত্যুমুখে পতিত করো, তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দিয়ো...।
এই দুআর শেষ দিকে এসেছে, اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الاسْلامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ
আমরা অনেকে এসব দুআর অর্থ জানি না। জানার চেষ্টা করতে হবে।
এই দুআর মর্ম হচ্ছে, দুনিয়াতে কেউ যদি ইসলামের উপর অটল থাকে, তাহলে তার মৃত্যুও হবে ঈমানের উপর। এখন যারা ইসলামের ধার ধারে না, মৃত্যুর সময় ঈমানও তাদের নসিব হবে না। এ জন্য আমাদেরকে ইসলাম ও ঈমানের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে, এর উপর অটল থাকতে হবে। আমাদের চলাফেরা, উঠাবসা, লেবাস-পোশাক, আচার-ব্যবহার, খাওয়া-দাওয়া সবকিছুতে ইসলামের নিদর্শন থাকতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের যাবতীয় বিধিবিধান যথাযথ মানতে হবে। নবিজি বলেন, تحشرون كما تموتون و تموتون كما تحيون যে অবস্থায় তোমরা মারা যাবে, সেভাবেই হাশরের ময়দানে উঠানো হবে, এবং যেভাবে জীবন জীবনযাপন করবে, সেভাবেই তোমাদের মৃত্যু ঘটানো হবে।
মোটকথা, আমাদের জীবনাচরণ দেখে অন্য মানুষ যেন মনে করে, এই মানুষটা বড় ভালো, মুত্তাকি এবং আল্লাহওয়ালা। তার মধ্যে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ নেই। তবে লোকে আমাকে মুত্তাকি বলুক- এমন ধারণা নিজের অন্তরে স্থান দেওয়া যাবে না। না-হয় রিয়ার কারণে সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে।
নবিজি এভাবে দুআ করতেন, اللهم اجعلني في عيني صغيرا وفي أعين الناس كبيرا
হে আল্লাহ! আপনি আমাকে নিজের কাছে ছোট এবং অন্যের চোখে বড় হিশেবে প্রকাশ করো।
তাই সবকিছু হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য; কোনো মানুষকে দেখানো বা সন্তুষ্ট করার জন্য নয়। এখন কেউ যদি এভাবে জীবন ধারণ করতে পারে, তাহলে মৃত্যুর সময় তার দৌলতে ঈমান নসিব হবে। আর ঈমান নিয়ে যে মারা যাবে, সে সোজা জান্নাতে চলে যাবে। কেননা হাদিসে আছে, মুআজ ইবনু জাবাল রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন,
مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ রাসুল বলেছেন, 'যার সর্বশেষ বাক্য হবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সুবহানাল্লাহ। আমরা এই মোবারক মাহফিলে বসে ঈমান নিয়েই আলোচনা করব। ঈমান অত্যন্ত মূল্যবান এক সম্পদ। এসব মজলিসে যেহেতু ঈমানের আলোচনা হয়, এবং এর মাধ্যমে ঈমানের পাওয়ার বৃদ্ধি পায়, তাই এসব মজলিসে আমরা নিয়মিত বসার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
মানুষ তার সম্পদ বৃদ্ধির লোভ কখনো সামলাতে পারে না। আপনি আমি কি চাইব যে, আমার সম্পদ ১০০ হাজার ডলার আছে, আর লাগবে না? না; বরং আমরা চাইব, কীভাবে এই ১০০ হাজার ডলারকে ২০০ হাজার ডলারে উন্নীত করা যায়। ঈমানও সম্পদ, যে সম্পদের কারণে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করব। এখন এই সম্পদ যাতে নষ্ট না হয় এবং তাতে কোনো ভেজাল যেন ঢুকে না পড়ে, এটা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। এই সম্পদ কীভাবে আরো বেশি বাড়ানো যায়, সেদিকে খেয়াল দিতে হবে। ঈমান বাড়ানো মানে ঈমানের পাওয়ার বাড়ানো। ঈমান তাজা করা। ঈমান তাজা করতে হলে আমাদেরকে ঈমানের আলোচনা করতে হবে। উপর্যুক্ত আলোচনার পর আমরা বুঝতে পারলাম, ঈমানের জড় হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এই কালিমা আমরা বেশি বেশি করে পাঠ করব ইনশাআল্লাহ।
কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, এটাকে আমরা গাছের জড় মনে করি। এখন গাছের শুধু জড় থাকলে তো হবে না, ডালপালা-শাখাপ্রশাখাও থাকতে হবে। তবেই না একটি গাছ পূর্ণাঙ্গ হবে। মনে করুন, আপনি একটি গাছ রোপন করলেন। এবার গাছের জড় হলো কিন্তু ডালপালা ও শাখাপ্রশাখা নেই। তাহলে তো এই গাছ টিকবে না। এ জন্য গাছে জড় আসার পর তাতে ডালপালা ও শাখাপ্রশাখা কীভাবে গজানো যায়, সেটা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে। এখানে একটি হাদিস উল্লেখ করব। ইমাম মুসলিম রা. তাঁর সহিহ মুসলিমে সায়্যিদুল মুহাদ্দিসিন হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ঈমান নামক গাছের শাখাপ্রশাখা কয়টি এবং তা কীভাবে গঠন করা হবে? সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, নবিজি বলেন,
الْإِيمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعُ وَسِتُّونَ شُعبةٌ: فأفضلها قولُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وأدناها إماطة الأذى عن الطريق، والحياءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإيمانِ
ইমানের শাখা তিহাত্তর অথবা তেষট্টিরও কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে “আল্লাহ ব্যতিত ইলাহ নেই” এ কথা স্বীকার করা, আর এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জা ঈমানের বিশিষ্ট একটি শাখা।
হাদিসে যে بضع শব্দ এসেছে, এটা ৩ থেকে ৯ পর্যন্ত অর্থ দিয়ে থাকে। অর্থাৎ, ঈমানের শাখা ৭৩-এর অধিক। সুতরাং ঈমান নামক গাছে যদি ৭৩-এর অধিক শাখাপ্রশাখা থাকে, তাহলে তো গাছটি ডালপালা, পত্রপল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠার কথা। তবে শুধু ডালপালা ও শাখাপ্রশাখা থাকলেই হবে না, ফলও দরকার। আমরা ঈমানের এই গাছ থেকে ফলের আশা করে বসে আছি। ঈমান নামক এই গাছের ফল হলো আমল, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পর্দা রক্ষা করা, মিথ্যা না বলা, গিবত-শেকায়াত না করা, অন্যের ক্ষতিসাধন না করা এবং নিজেও ক্ষতির মুখোমুখি হবে, এমন সমূহ কাজ থেকে হেফাজতে থাকা ইত্যাদি। নবিজি বলেন, এসব শাখাপ্রশাখার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কেননা, গাছের মধ্যে যদি জড় না থাকে, তাহলে এই গাছ বাঁচবে না। এবং সর্বনিম্ন শাখার ব্যাপারে নবিজি বলেন,
وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
অর্থাৎ, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কোনো বস্তু সরিয়ে দেওয়া। এটা ঈমানের লক্ষণ। যেমন, আপনি কোথাও যাচ্ছেন। রাস্তায় একটি কষ্টদায়ক জিনিস দেখতে পেলেন। সেটা হতে পারে কলার খোসা অথবা অন্য কিছু। এই সামান্য একটা জিনিসেও অনেক সময় মানুষ হোঁচট খেয়ে পা ফসকে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আপনি যদি সেই বস্তুটি রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলে দেন, তাহলে এটা আপনার ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। কেননা, এর মাধ্যমে আপনার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন কষ্ট না পায়।
এই যে কাজটি আপনি করলেন, এটাতে আপনাকে কেউ বাধ্য করেনি, বরং মানুষের প্রতি দয়াপরবশ হয়েই আপনি এমনটা করেছেন। আর এটাই হলো আপনার ঈমানের লক্ষণ।
এভাবে কেউ যদি মানুষ ছাড়া কোনো পশুকেও কষ্ট পাওয়া থেকে রক্ষা করে, তাহলেও আল্লাহর দয়ার সাগরে তখন এমন উত্তাল শুরু হয়। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। তার জন্য জান্নাতের ফায়সালা করে দেন। সুবহানাল্লাহ।
এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে; রাসুল বলেন,
আমি যখন মিরাজে যাই, তখন এক মহিলাকে জাহান্নামে দেখতে পাই। অথচ এই মহিলা নিয়মিত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত, তার ইবাদত ইত্যাদি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সে তার পাড়াপ্রতিবেশীদের কষ্ট দিত, তাদের সঙ্গে মন্দ আচরণ করত, এ কারণে তাকে আমি জাহান্নামে দেখে এসেছি। তার এসব মন্দ কাজের কারণে তার সব নেক আমল বেকার হয়ে গেছে। প্রয়োজনের সময় কোনো কাজে আসেনি।
অপর এক হাদিসে আছে, নবিজি বলেন,
আমি আরও দুজন মহিলাকে দেখে এসেছি। তাদের একজন হচ্ছে বেশ্যা মহিলা। আর যারা বেশ্যাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকে, তারা বড় গুনাহগার। মানুষের দৃষ্টিতেও সে অপরাধী। তবে সে যদি এমন কোনো নেকির কাজ করে ফেলে, এবং সেটা আল্লাহর পছন্দনীয় হয়ে যায়, তাহলে চাইলে আল্লাহ তাকেও ক্ষমা করে দিতে পারেন।
তো এই বেশ্যা মহিলা একবার গোসল করতে একটি কূপের কাছে যায়। তখন কূপের পাড়ে একটি পিপাসার্ত কুকুর দেখতে পায়, যে পিপাসায় কাতর হয়ে ছটফট করছে। কারণ, কূপের পানি নিচে থাকায় কুকুরটি অনেক চেষ্টা করেও পান করতে পারছিল না। এমতাবস্থায় ওই বেশ্যা মহিলার মনে দয়ার উদ্রেক হয়। সে তখন তার কাছে থাকা চামড়ার মোজা দিয়ে কূপ থেকে পানি উঠিয়ে তৃষ্ণাতুর ওই কুকুরকে পান করায়। ফলে কুকুরটির পিপাসা নিবারণ হয়। তার এই কাজটি আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে যায়, ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। নবিজি বলেন, আমি ওই মহিলাকে জান্নাতে দেখে এসেছি।
অপর এক মহিলা, যে তার একটি গৃহপালিত বিড়ালকে খুঁটির সাথে বেঁধে রেখে কষ্ট দিত। খাবার পানি কিছুই দিত না। এভাবে একসময় বিড়ালটি ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আল্লাহর সৃষ্টি বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ায় আল্লাহ তার প্রতি নারাজ হন। আল্লাহর রাসুল বলেন, আমি ওই মহিলাকে জাহান্নামে দেখে এসেছি।
সুতরাং আমরা বোঝতে পারলাম, ঈমান অর্থ আমন বা নিরাপত্তা। আর এই নিরাপত্তা অর্জিত হয় জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যমে। এখন যার থেকে আল্লাহর সৃষ্টি নিরাপদ থাকে, এরকম অবস্থা যদি কারও অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে এটাই হলো তার ঈমান থাকার লক্ষণ। এর মাধ্যমে তার ঈমানের যে লক্ষণ প্রকাশ পেল, কুরআনের ভাষায় সেটাকে তাকওয়া বা তাজকিয়াতুন নাফস বলা হয়। আর হাদিসের পরিভাষায় বলা হয় ইহসান। সুফিশাস্ত্রের পরিভাষায় বলে তাসাওউফ।
আপনারা ঈমানের এই ৭৭টি শাখা সম্পর্কে জেনে নিজেই বোঝে নেবেন আপনার মধ্যে কয়টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে মুখের সাথে ঈমানের ৭টি শাখার সম্পর্ক রয়েছে। মুখ দ্বারা যদি এই ৭টি শাখা প্রকাশিত হয়, তাহলে বোঝা যাবে আপনি ঈমানদার; আর বিপরীত করলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে। কলবের সাথে ৩০টি এবং অন্যান্য অঙ্গের সাথে আরও ৪০টি শাখার সম্পর্ক রয়েছে। এই হচ্ছে মোট ৭৭টি শাখা। হাদিসে যেহেতু ৭৩-এর অধিক বলা হয়েছে, সুতরাং ঈমানের শাখা যে ৭৩-এর অধিক, এটাও প্রমাণিত হলো। আর তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।
সম্মানিত হাজিরিন!
আপনারা তিনটি জিনিস স্মরণ রাখবেন: ১. ইতিকাদ। এটা হলো জড়। ইতিকাদ ঠিক না থাকলে আমলে কাজ হবে না। ২. আমল। নির্ভেজাল ইতিকাদের সাথে সুন্নাহপদ্ধতিতে নেক আমলও লাগবে। ৩. আখলাক। ইলমে আখলাকই হলো ইলমে তাসাওউফ ও ইলমে ইহসান। এই তিনটি জিনিস যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সব মাটি। আর ইতিকাদ ঠিক করতে হলে প্রথমে ঈমানে মুজমালের কথাগুলো বিশ্বাস করতে হবে। এটা তো আমাদের সকলেরই জানা আছে। আমাদের সন্তানদেরও এটা মুখস্থ করাতে হবে। সেটা হলো,
اٰمَنْتُ بِاللهِ كَمَا هُوَ بِاَسْمَائِهِ وَصِفَاتِهِ وَقَبِلْتُ جَمِيعَ أَحْكَامِهِ وَأَرْكَانِه
আল্লাহ তায়ালার সুন্দর নাম ও তাঁর যাবতীয় গুণাবলির উপর ঈমান আনলাম এবং তাঁর যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ মেনে নিলাম।
এখানে আমানতু বিল্লাহ অর্থ আল্লাহর উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা। এই বিশ্বাস আবার তিন প্রকার এবং এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে মানুষও আবার তিন প্রকার:
১. একধরনের বিশ্বাস হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দৃঢ় বিশ্বাসের ঈমান হয়ে ইয়াকিনের রূপধারণ করে। আল্লাহ বলেন, ওবিল আখিরাতি হুম ইউকিনুন। অর্থাৎ, তার মধ্যে সন্দেহ-সংশয়হীন দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়। এরাই হলো সত্যিকার মুমিন।
২. আরেক ধরনের বিশ্বাস হচ্ছে শুধু মৌখিক বিশ্বাস। ইসলাম, নবি, রাসুল, কুরআন ইত্যাদি সবই বিশ্বাস করে, তবে সেটা শুধু মুখে। বর্তমানে আমাদের অনেক তথাকথিত শিক্ষিতসমাজ, এমনকি ইহুদি, খ্রিষ্টানরা পর্যন্ত এটা মানে। এমনকি তাদের লেখায় তারা এটা প্রমাণ করেছেন। যেমন: তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০০ জন মনীষীর জীবনীতে প্রথমে আমাদের নবিজি সম্পর্কে আলোচনা করেছে। এ ছাড়া তাদের অনেক লেখা, বক্তৃতা ও গবেষণায়ও তারা সেটা প্রমাণ দিয়ে থাকে। তারা এটা বিশ্বাস করে যে, মুহাম্মাদ সঠিক, কিন্তু মানে না। স্বীকৃতি দেয় না। এরা হলো কাফির।
৩. আরেক প্রকার হচ্ছে মুনাফিক। এরা মুখে বলে আমরা মুসলমান; কিন্তু সন্দেহ পোষণ করে। এদের ভেতরে ঈমান থাকে না। এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ
জাহান্নামের এদের অবস্থান হবে কাফিরদের চেয়েও ভয়াবহ। [সুরা নিসা: ১৪৫] অর্থাৎ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে এদের নিক্ষেপ করা হবে। কারণ, কাফিররা তো পরিষ্কারভাবেই ঈমান আনেনি; অস্বীকার করেছে। আর মুনাফিকরা মুখে ঈমানের ঘোষণা দিয়ে কিন্তু অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেনি। ফলে তারা আল্লাহ ও তাঁর নবি-এর ব্যাপারে, আল্লাহ ও নবির বিধানের ব্যাপারে মানুষকে সন্দেহে নিপতিত করেছে।
এ জন্য তারা কাফিরদের চেয়েও খতরনাক। তাই মুনাফিকদের এই অবস্থান আল্লাহর ক্রোধকে আরও তরান্বিত করে। এ জন্য মুনাফিকদের জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ, এরা না মুমিন, না কাফির; বরং মুনাফিক। এদের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর বিধান সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। ইসলাম, ঈমান ও শরিয়ত নিয়ে তারা তাদের অন্তরে ক্ষোভ লালন করে। আমাদের কারও অন্তরে যদি এমন রোগ থেকে থাকে, তাহলে এখনই তাওবা করে অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হবে। নেফাকি দূর করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক ঈমানদার হিশেবে কবুল করুন, সকলে বলি আমিন।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল, সঠিক ঈমানদার হচ্ছে সে, যার ঈমানে বা অন্তরে কোনো সন্দেহ নেই। আর যার অন্তরে সন্দেহ রয়েছে, সে হলো মুনাফিক। আর যে অস্বীকার করে, সে হলো কাফির। সামনে এই তিন প্রকারের আলোচনা আসবে। প্রথমে মুমিন বা ঈমানদারের আলোচনা, পরে কাফিরের আলোচনা এবং শেষে মুনাফিক সম্পর্কে আলোচনা। আর কুরআনের বিষয়বস্তুও এটা। তবে এটাও জানা থাকা দরকার যে, কুরআনের মূল বিষয়বস্তু হলো ছয়টা :
১. তাওহিদ ২. রিসালাত ৩. আখিরাত ৪. যারা তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতকে সঠিকভাবে বিশ্বাস করবে, তাদের পুরস্কারের আলোচনা ৫. যারা বিশ্বাস করবে না, তাদের তিরস্কারের আলোচনা ৬. কুরআন সম্পর্কিত আলোচনা।
এই ছয়টি আলোচনার বাইরে কুরআনে অন্য বিষয়ের আলোচনা নেই। এই বিষয়গুলোর আলোচনায় পুরো কুরআন ভরপুর। আপনি কুরআনের যে কোনো আয়াত নিয়ে আলোচনা করুন, তাতে তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের আলোচনা পাবেন। যারা এই তিনটি সঠিকভাবে বিশ্বাস করবে, তাদের আলোচনা মুমিন, তাদের পুরস্কারের আলোচনা জান্নাত, যারা মানবে না, তাদের আলোচনা কাফির বা মুনাফিক, তাদের তিরস্কারের আলোচনা জাহান্নাম। আর কুরআনের আলোচনা। কুরআনে এর বাইরে কোনো আলোচনা নেই। যেকোনো আলোচনা ঘুরেফিরে এই ছয়টিরই একটি।
ইসলাম সহনশীলতার ধর্ম
এখানে আরেকটি বিষয় জানা থাকা দরকার যে, কুরআনে চারজন নবির আলোচনা সবচেয়ে বেশি—হজরত আদম আলাইহিস সালাম, হজরত মুহাম্মাদ , হজরত ইসা আলাইহিস সালাম, হজরত মুসা আলাইহিস সালাম। এই চারজন নবির আলোচনা সবচেয়ে বেশি কেন, কারণ, আদম আলাইহিস সালাম আমাদের আদি পিতা। এ ছাড়া আদম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এমন অনেক আলোচনা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারি, এ জন্য তাঁর আলোচনা বেশি।
রাসুল -এর আলোচনা বেশি হওয়ার কারণ হলো, রাসুল -কে যদি আমরা না মানি, তাহলে আমরা ঈমানদারই হতে পারব না। ঈসা আলাইহিস সালামের আলোচনা বেশি থাকার কারণ হলো, ঈসা আলাইহিস সালামের উম্মত অর্থাৎ, নাসারা বা খ্রিষ্টান যারা, এরা রাসুল-এর যুগেও ছিল। কুরআনে ঈসা আলাইহিস সালামের আলোচনা বেশি করার মাধ্যমে খ্রিষ্টানদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা এবং উৎসাহ দেওয়ার জন্য ইসার আলোচনা বেশি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এটা বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল যে, তোমরা যে নবিকে বিশ্বাস করো, সেই নবির আলোচনা কুরআনেও রয়েছে। সুতরাং তোমরা কুরআন বিশ্বাস করো। আর মুসা আলাইহিস সালামের আলোচনা এ জন্য বেশি করা হয়েছে, তাঁর উম্মত ইহুদি বা আহলে কিতাব বনি ইসরাইল যারা, তারা নবিজির যুগেও ছিল। এদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের নবির আলোচনা কুরআনে বেশি করা হয়েছে।
আচ্ছা, আপনারা বলেন তো, কোনো খ্রিষ্টান বা ইহুদি কি তাদের সন্তানের নাম কখনো মুহাম্মাদ রেখেছে? না, রাখেনি। এ হিশেবে মুসলমানরা অত্যন্ত উদার। মুসলমানরা তাদের অনেক সন্তানের নাম মুসা, ঈসা রেখেছে।
সুতরাং বোঝা গেল, ইহুদি-খ্রিষ্টানরা কখনো উদার নয়, বরং আমরাই হচ্ছি উদার। তাদের নবির নামে আমরা আমাদের সন্তানের নাম রাখি। ইসলাম উদার এক ধর্ম। তাই আমাদের মধ্যে যখন উদারতা, শান্তি ইত্যাদি পরিস্ফুটিত হবে, আমাদের শরীরে যখন সত্যিকার ইসলামের লক্ষণ প্রকাশ পাবে, তখন মানুষ এমনিতেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে। ফলে ইসলামের সুশীতল বাণী ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বে শান্তির বাতাস প্রবাহিত হবে। নিজেও প্রশান্ত হবো। কেননা, ঈমান অর্থ শুধু নিজে শান্তি পাওয়া নয়; বরং নিজে নিরাপত্তা লাভ করা এবং অন্যকেও নিরাপত্তা দেওয়া। এটাই প্রকৃত ঈমান। আর এমন ঈমান অর্জন করতে হলে ঈমানের চর্চা দরকার।
আত-তাওহিদ
ইমানের সঙ্গে সম্পর্ক হলো কলবের। আমানতু বিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম। আল্লাহর উপর ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে তিনটি জিনিসের উপর ঈমান বা বিশ্বাস রাখা। অন্যকথায়, তাওহিদকে আমরা তিনভাগে বিভক্ত করতে পারি। অর্থাৎ, তাওহিদ তিন ধরনের হয়ে থাকে।
আত-তাওহিদ বিল উলুহিয়্যাহ
এক নম্বর হচ্ছে আত-তাওহিদ বিল উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ। সুরা ফাতিহার ৪ নম্বর আয়াতে এটাই বলা হয়েছে, ইয়্যাকা না'বুদু—অর্থাৎ, ইবাদত শুধু আপনার জন্যই। ইবাদতের একমাত্র যোগ্য হলেন আল্লাহ, এটার উপর বিশ্বাস করার নামই হলো তাওহিদ বিল উলুহিয়্যাত।
তাওহিদ বির রুবুবিয়্যাহ
দুই নম্বর হচ্ছে আত তাওহিদ বির রুবুবিয়্যাহ। আল্লাহই একমাত্র রব। আমার ইজ্জত-সম্মান, লাঞ্ছনা-অপমান, রিজিক, আমার প্রয়োজনের আয়োজনকারী সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা, এটা বিশ্বাস করা। এখন যদি কেউ এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, চাকরি করি বলেই তো আমার রিজিক আসে, আমার পিতা বা সন্তান আমাকে খাওয়ায়, তাহলে তার ঈমানে ভেজাল প্রবেশ করেছে। না, আমরা এভাবে বলতে পারি না; বরং আমার রিজিকদাতা হলেন আল্লাহ। আমার সব প্রয়োজনের আয়োজনকারী হলেন আল্লাহ এবং এটাই বিশ্বাস করতে হবে। এই বিশ্বাসের উপর যদি আপনি দৃঢ় থাকেন এবং এই বিশ্বাস নিয়েই মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে কবরে যখন প্রশ্ন করা হবে, মার-রাব্বুকা বা তোমার রব কে, তখন জবাব হবে রাব্বিআল্লাহ অর্থাৎ আমার রব হলেন আল্লাহ। এমন জবাব যারা দিতে পারবে, তারাই প্রকৃত সফল এবং তাদের জন্য কবর তখন জান্নাতের বাগান হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ।
এখন যদি আমরা দুনিয়াতে বলি, আমি তো ব্যবসা করেই চলি, চাকরি করি বলেই বেঁচে আছি, রাজনীতি করছি বলেই এখনো বেঁচে আছি—এমন লোকদের ব্যাপারে কবরে যখন প্রশ্ন করা হবে, তোকে কে লালন পালন করেছে, তখন জবাবে বলবে, লা আদরি—আমি জানি না। কেননা, দুনিয়ার জীবনে সে কখনো আল্লাহকে প্রভু হিশেবে মানেনি, তাই কবরজগতের প্রথম প্রশ্নেই সে আটকে যাবে। কবরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যাতে আমরা সহজে দিতে পারি, এ জন্য সব বিষয়ে একমাত্র আল্লাহকে প্রভু হিশেবে অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে হবে। এটা হলো তাওহিদ বির রুবুবিয়্যাহ বা ঈমানের দ্বিতীয় স্তর।
আত-তাওহিদ ফিল আসমায়ি ওয়াস সিফাত
তৃতীয় নম্বর হলো, আত-তাওহিদ ফিল আসমায়ি ওয়াস সিফাত। অর্থাৎ, আল্লাহর জাতি ও সিফাতি যেসব নাম আছে, এগুলোর ব্যাপারে ঈমান আনতে হবে। আর কোন কোন নাম শুধু আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য, বান্দার জন্য নয়, এগুলোর ব্যাপারে ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি।
মোটকথা, আল্লাহর উপর ঈমান আনার মর্ম হলো, একমাত্র আল্লাহর উপর বিশ্বাস করা, আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া, আমার প্রয়োজনের আয়োজনকারী হিশেবে একমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করা, আল্লাহর জাতি ও সিফাতি নামের ব্যাপারে বিশ্বাস করা, এই হলো ঈমানের মর্ম।
এরপর, ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনা। আমানতু বিল্লাহি ও মালাইকাতিহি। ফেরেশতাদের উপর ঈমানের মর্ম হলো, তারা আল্লাহর মাখলুক বা সৃষ্টি, এটা বিশ্বাস করতে হবে। ফেরেশতা বলতে কিছু নেই কারণ, তাদের দেখা যায় না, এ জন্য তাদের বিশ্বাস করা যাবে না- এটা বলা যাবে না। বরং না দেখেও তাদের বিশ্বাস করতে হবে। কারণ, ফেরেশতারা হলেন আল্লাহর বাহিনী। কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ
আল্লাহর এই বাহিনীর সংখ্যা কত, এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। এত বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা। এ সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেন, وعن أبي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رسولُ الله : إِنِّي أَرى ما لا تَرَوْنَ، أَطَّتِ السَّمَاءُ، وحُقَّ لَهَا أَنْ تَئِطَّ، مَا فِيهَا مَوْضِعُ أَرْبَعِ أَصَابِعَ إِلَّا وَمَلَكُ وَاضِعٌ جَبْهَتَهُ ساجدا الله تعالى، والله لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا، وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا، وَمَا تَلَذَّذْتُم بِالنِّسَاءِ عَلَى الْفُرُشِ، وَلَخَرَجْتُمْ إِلَى الصُّعُدَاتِ تَجْأَرُونِ إلى الله تَعَالَى
হজরত আবু জার রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি যা দেখি তোমরা তা দেখ না। আমি যা শুনি তোমরা তা শুনো না। আকাশ তো ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে আর এই শব্দ করার সে যোগ্য। সেখানে চার আঙুল জায়গাও এমন নেই যেখানে কোনো ফেরেশতা কপাল রেখে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করছে না। আল্লাহর কসম, আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তবে অবশ্যই তোমরা কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে। বিছানায় কোনো নারীর আস্বাদ নিতে না। তোমরা অবশ্যই মাঠে-ময়দানে চলে যেতে এবং আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করতে থাকতে।
আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখ না, আমি যা শুনি, তোমরা তা শোন না। আসমানে কটকট শব্দ শুরু হয়ে গেছে। এর মানে কি? যেমন নতুন কোনো খাট বা পালংকে যদি একসঙ্গে বেশ কয়েকজন উঠেন, তাহলে যেভাবে কটকট করে একটা শব্দ হয়, তেমনিভাবে আসমানেও এরকম কটকট শব্দ শুরু হয়ে গেছে। কেন এমন শব্দ হয়? আল্লাহর রাসুল বলেন, আসমানে চার অঙ্গুলি পরিমাণ জায়গাও খালি নেই। সবখানে ফেরেশতারা সিজদায় পড়ে শুধু আহাজারি করছেন। এ জন্য আসমানে কটকট শব্দ হয়। এই যে ফেরেশতারা সিজদায় পড়ে আহাজারি করছেন, ইসতিগফার করছেন, এটা কার জন্য? এটা তাদের জন্য, যারা দুনিয়ায় বসে ইসতিগফার করে। কারণ, ফেরেশতাদের কোনো গুনাহ নেই, তারা নিষ্পাপ।
ইসতিগফারের মর্ম
এখানে ইসতিগফারের আরেকটা মর্ম জানা থাকা আবশ্যক যে, শুধু গুনাহ থাকলে ইসতিগফার করতে হয়- ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। ইসতিগফার করা দরকার মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য, অন্যের ফায়দার জন্য। যারা দুনিয়াতে ইসতিগফার করে, তাদের ইসতিগফার যেন কবুল হয়, তাই ফেরেশতারা তাদের ইসতিগফার কবুলের জন্য, আর যাদের ইসতিগফার কবুল হয়েছে, তাদের আরও মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য তারা এভাবে ইসতিগফার করেন।
নবিজি দৈনিক ১০০ বার ইসতিগফার করতেন। তাঁর গুনাহ ছিল বলে ইসতিগফার করতেন? না, নবিজি ইস্তেগফার করতেন তাঁর উম্মতের জন্য অথবা মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য। আমরা অনেকে না বুঝে অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। এটা আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে। ফেরেশতারা ইসতিগফার করতেন দুনিয়ায় যারা ইসতিগফার করে, তাদের জন্য, আর নবিজি ইসতিগফার করতেন তাঁর উম্মতের জন্য এবং নিজের মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য আমাদের জানা থাকতে হবে। এখন যদি কেউ এটা মনে করে যে, তাহলে ফেরেশতারা কী জন্য ইসতিগফার করেন? Ashakari এর উত্তর এখন আপনাদের জানা আছে।
ইসতিগফার শব্দটি আরবি গুফরুন থেকে এসেছে। অর্থ হলো, ঢেকে রাখা। আর মানুষ দুটি জিনিস ঢেকে রাখে। একটা হলো ভালো জিনিস। খাবার যদি ভালো হয়, তাহলে মানুষ সেটা উদোম না রেখে ঢেকে রাখে। আরেকটা হলো, দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য ঢেকে রাখা। যেমন: পায়খানার ট্যাংকি। এটাকে ঢেকে রাখা হয় দুর্গন্ধ যাতে না ছড়ায়, এ জন্য। উভয়টাই ঢেকে রাখা, তবে উপলক্ষ ভিন্ন।
ঠিক তেমনিভাবে আমরা যে ইসতিগফার করি, এটার উদ্দেশ্য হলো, হে আল্লাহ আমাদের গুনাহের দুর্গন্ধ ঢেকে রাখুন। আর নবি ও ফেরেশতাগণ যে ইসতিগফার করেন, এর মর্ম হলো, হে আল্লাহ, আমাদের যে আপনি ক্ষমা করে দিয়েছেন, এটাকে আরও যথাযথভাবে ঢেকে রাখুন। তাঁদের ইসতিগফারের মর্ম হলো, তাদের ইসতিগফারের সুগন্ধ সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করে রাখা।
এখন কথা হলো, ফেরেশতাদের সংখ্যা অগণন। তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। ফেরেশতাদের সংখ্যা অনেক, এটা বিশ্বাস করা। এ ছাড়া ফেরেশতারা যে নুরের তৈরি, এটা বিশ্বাস করা। সহিহ মুসলিমে হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন,
خلقت الملائكة من النور، وخلق الجان من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ফেরেশতাদের জ্যোতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে অগ্নিশিখা থেকে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই বস্তু থেকে, যা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। [অর্থাৎ মাটি থেকে]।
আল্লাহর রাসুল বলেন, ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নুর দিয়ে। ফেরেশতার সংজ্ঞা হল,
جسم نوراني يتشكل بأشكال مختلفة
অর্থাৎ, তারা নুরের তৈরি, তারা বিভিন্ন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। তারা মানুষের সামনে কখনো আপনার মতো মানুষের রূপ ধারণ করে আসবে, কখনো অন্য কোনো রূপে। বদরযুদ্ধের সময় মুসলমানদের সাহায্য করতে যেসব ফেরেশতা আগমন করেছিলেন, তাদের অনেকে এখনো জমিনের বিভিন্ন জায়গায় রয়ে গেছেন। এখনো বিভিন্ন জায়গায় তারা মানুষকে সাহায্য করেন। জিসমুন নুরানিয়্যুন ইয়াতাশাক্কালু বিআশকালিম মুখতালিফাহ। অপরদিকে জিন্নাত হলো, ধোঁয়াবিহীন খাঁটি আগুনের তৈরি। নবিজি হাদিসে বলেন, ওখুলিকাল জান্নু মীম মারিজিম মিন নার।
আর আমরা, মানে মানুষ হলাম মাটির তৈরি। এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের রেওয়ায়াত- وخُلق آدم مما وُصف لكم আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার বর্ণনা আল্লাহ দিয়েছেন- وخلق آدم من تراب অর্থাৎ, আদমকে মাটি থেকে তৈরি করা হয়েছে।
উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম ফেরেশতারা নুরের সৃষ্টি, এটা বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ। তাদের সংখ্যা অগণিত, এটাও বিশ্বাস করতে হবে। আর তাদের মধ্যে কিছু কিছু ফেরেশতাকে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এটা আল্লাহ আমাদের বিভিন্নভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন: জিবরিল আলাইহিস সালামকে ওহির দায়িত্ব, মিকাইল আলাইহিস সালামকে বৃষ্টির দায়িত্ব, ইসরাফিল আলাইহিস সালামকে শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার দায়িত্ব আর মালাকুল মাউত বা আজরাইল আলাইহিস সালামকে মানুষের জান কবজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা বিশ্বাস করতে হবে।
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে নবিজির দেওয়া শিক্ষা অনুযায়ী ঈমানের যাবতীয় হক আদায় করে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
📄 মুত্তাকিদের স্তর
আমরা এখন আলোচনা করব মুত্তাকিদের স্তর সম্পর্কে। যে গুণে গুণান্বিত হলে কুরআন হিদায়তের মাধ্যম হয়, তাকে তাকওয়া বলে। যার মাঝে তাকওয়া আছে, সে হলো মুত্তাকি। পবিত্র কুরআনে মুত্তাকিদের বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা বাকারার শুরুর দিকে আল্লাহ তাআলা বলেন, هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ এই কুরআন শুধু মুত্তাকিদের জন্যই হিদায়ত। এখন আমাদের জানতে হবে, মুত্তাকি কারা? মুত্তাকি তারাই, যাদের মধ্যে ছয়টি গুণ রয়েছে।
• মুত্তাকিদের প্রথম গুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ, যারা গাইব বা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস করে।
• দ্বিতীয় গুণ হলো, وَيُقِيمُونَ الصَّلُوةَ যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে।
• তৃতীয় গুণ হলো, وَمِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُوْنَ যারা আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে।
• চতুর্থ গুণ হলো, وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ যারা বিশ্বাস রাখে আপনার উপর যা নাজিল করেছি, সেগুলোর উপর।
• পঞ্চম গুণ হলো, وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ অর্থাৎ, আপনার পূর্ববর্তীদের উপর যা নাজিল করেছি, সেগুলোর ওপরও বিশ্বাস রাখে।
• ষষ্ঠ গুণ হলো, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ যারা পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে।
এখানে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের ছয়টি গুণের আলোচনা করেছেন। আর এই ছয়টি গুণে যারা গুণান্বিত হবে, তারা কী পুরস্কার পাবে? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ﴿أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾
তারাই হিদায়তের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই হলো চূড়ান্ত সফল। [সুরা বাকারা: ৫]
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, আল্লাহ যে মুত্তাকিদের ছয়টি গুণের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন, তাতে রোজা ও হজের আলোচনা নেই। অথচ রোজা ও হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দুটি বিষয়ে কোনো আলোচনা না করেও আল্লাহ বললেন, যারা এই ছয়টি গুণ অর্জন করবে, তারাই মুত্তাকি। তাবলিগওয়ালাদের উপর এমন প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন। কেননা, তাবলিগের ছয় উসুলের মধ্যেও রোজা, হজ ও জাকাতের কথা উল্লেখ নেই। না, এমন প্রশ্ন করা অবান্তর এবং নিজের মূর্খতার পরিচায়ক। যদি ক্ষমতা এবং সাহস থাকে, তবে তাবলিগওয়ালাদের উপর এই প্রশ্ন না করে সরাসরি আল্লাহর ব্যাপারে করুন।
আপনারা লক্ষ করলে দেখবেন যে, তাবলিগওয়ালা সবসময়ই এভাবে বলেন যে, 'কয়েকটি গুণের উপর আমল করলে দ্বীনের উপর চলা সহজ'-কিন্তু কখনো তারা এমনটা বলেন না যে, 'এই কয়েকটি গুণই হলো একমাত্র দ্বীন।' ঠিক সেভাবে এখানেও আল্লাহ তাআলা রোজা ও হজের আলোচনা না করে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, এই গুণগুলো (ছয়টি) অর্জন করতে পারলে মুত্তাকি হওয়া সহজ।
আল্লাহ যে রোজা ও হজের আলোচনা করেননি, এর জবাব হচ্ছে, এই ছয়টি গুণে সরাসরি রোজা ও হজের আলোচনা নেই ঠিক, তবে আল্লাহ যে 'ইউকিমুনাস সালাতা' বললেন, এখানেই এগুলোর আলোচনা রয়েছে। তাই এটা নিয়ে যারা অযথা জলঘোলা করে, তারা নির্বোধ, মূর্খ। সুতরাং যারা তাবলিগওয়ালাদের উপর এমন প্রশ্ন করে, তাদের প্রশ্নের জবাব আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন। উপরিউক্ত গুণগুলো যারা অর্জন করতে পারবে, দ্বীনের উপর চলা তাদের জন্য সহজ। তারাই মুত্তাকি। আর মুত্তাকি যারা, তারা জান্নাতের অধিকারী হবে।
আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের গুণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে গাইব বা অদৃশ্যের উপর ঈমানের কথা বলেছেন। গাইবের উপর ঈমান হচ্ছে ইয়াকিন বা বিশ্বাস। এখন আমাদের জানা দরকার ঈমান আর ইয়াকিনের মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে। আখেরাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা 'ইয়াকিন' শব্দ ব্যবহার করেছেন, আর অন্যগুলোর ব্যাপারে ' ইউমিনুন বা ঈমান' শব্দ ব্যবহার করলেন কেন? এটা বোঝা দরকার।
এবার আমরা আলোচনা করব ঈমানিয়াত সম্পর্কে। ঈমানে মুফাসসাল তথা আমানতু বিল্লাহি ও মালাইকাতিহি। এখানে উপরিউক্ত ছয়টি গুণের আলোচনা রয়েছে। গত আলোচনায় আমরা আল্লাহর উপর ঈমানের ব্যখ্যা করেছি। আল্লাহর উপর ঈমানের পর দ্বিতীয় বিষয় হলো, ‘ও মালাইকাতিহি’ বা ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রাখা। ফেরেশতাদের ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস হতে হবে, তারা আল্লাহর বাহিনী। তাদের সংখ্যা অগণিত। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তারা তা-ই করতে আদিষ্ট। নিজ থেকে কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই।
এই যে রমজান মাসে আমরা না খেয়ে থাকি, এটা ফেরেশতাদের গুণ। কারণ, ফেরেশতারা খাদ্যগ্রহণ থেকে পবিত্র। তাই আমরা যখন রোজা রাখি, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের লক্ষ করে বলেন, ‘আদমকে সৃষ্টির ব্যাপারে আমি যখন তোমাদের প্রশ্ন করেছিলাম, তখন তোমরা বলেছিলে, “আমরাই তো আপনার তাসবিহ পাঠ করি।” আজ দেখো, তাদেরকে আমি এমন আমল দিয়েছি, যা করার যোগ্যতা তোমাদের নেই।’ এ জন্য লাইলাতুল কদরে ফেরেশতারা হজরত জিবরিল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে দলে দলে জমিনে অবতরণ করেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
تَنَزَّلُ الْمَلئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلْمٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরিল) তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। শান্তিময় সে রাত, ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। [সুরা কাদর: ৪-৫]
শবে কদরে ফেরেশতারা রুহুল আমিন জিবরিলের নেতৃত্বে দলে দলে জমিনে অবতরণ করবে। কেন অবতরণ করবে? কারণ, ফেরেশতারা খায় না, পান করে না, এ জন্য তারা খানাপিনা ছেড়ে দিয়ে কোনো ইবাদত করতে পারে না। আর আমরা খাবার- পানি গ্রহণ করি, এরপরও আমরা আল্লাহর হুকুমে খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত রয়েছি- এ জন্য আমাদের সাথে মুসাফাহা করতে আসেন। আমাদের জন্য দুআ করতে থাকেন। এ কারণে শবে কদরে ফেরেশতারা দলে দলে অবতরণ করেন। সারা জমিন ফেরেশতাদের দ্বারা ভরপুর হয়ে যায়। ফলে জমিন সংকীর্ণ হয়ে আসে। ‘কাদর’ শব্দের এক অর্থ সংকীর্ণ হওয়া। এ জন্য লাইলাতুল কদরে যারা আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে, ফেরেশতারা তাদের জন্য দুআ করতে থাকেন।
তাহলে আমরা জানতে পারলাম, ফেরেশতাদের ব্যাপারে আমাদের ঈমান হলো, তারা গুনাহ থেকে পবিত্র, খাওয়া-পান করা থেকে মুক্ত। আল্লাহ বলেন,
لَّا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ﴾
তারা যাবতীয় গুনাহ থেকে পবিত্র এবং আল্লাহ তাদেরকে যে আদেশ করেন, তারা শুধু তা-ই পালন করেন। তবে বিশেষ কিছু দায়িত্বশীল ফেরেশতা রয়েছেন, যারা নিজ নিজ কাজ আঞ্জাম দেন। [সুরা হুজুরাত: ৬]
ঈমানের তৃতীয় শর্ত হলো, আসমানি কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস রাখা। এখানে কিতাবের মর্ম হলো ওহির উপর বিশ্বাস করা। আর ওহি কাকে বলে, এ সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যে জেনে এসেছেন। যেখানে মানুষের জ্ঞান শেষ, সেখান থেকেই ওহির সূচনা। মানুষ তার নিজের ব্যাপারে এতটুকুই জানে যে, তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু এরপর তার পুরো জীবনবৃত্তান্ত অর্থাৎ, সে কীভাবে বড় হবে, কোথায় যাবে, তার শেষ কোথায়, এসব সম্পর্কে কিছুই জানে না। তবে কে জানেন? জানেন আল্লাহ, যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
এই যে জ্ঞান, যা মানুষ জানে না, তার শেষ হলো আখিরাত। কোন কাজ করলে ভালো আর কোন কাজ করলে ক্ষতি হবে, এ সম্পর্কে মানুষের যেহেতু কোনো জ্ঞান নেই, তাই এই জ্ঞান যিনি দিয়েছেন, তিনি হলেন আল্লাহ। আর যে মাধ্যমে মানুষ এসব বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে পারে, সেটা হলো ওহি। যা জানা এবং মানার মাধ্যমে জান্নাত লাভ হবে। আর এই ওহি নাজিল করা হয়েছে নবি-রাসুলদের উপর। তন্মধ্যে বড় বড় চারটি আসমানি কিতাব হলো: ১. জাবুর। জাবুর হজরত দাউদ আলাইহিস সালমের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। ২. তাওরাত। তাওরাত হজরত মুসা আলাইহিস সালমের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। ৩. ইনজিল। ইনজিল যা হজরত ঈসা আলাইহিস সালমের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। ৪. কুরআন। কুরআন শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ -এর উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে।
এগুলো হলো বড় বড় আসমানি কিতাব। এ ছাড়া ছোট ছোট আরও অনেক আসমানি কিতাব রয়েছে, যেগুলোকে সহিফা বলা হয়। এসব আসমানি কিতাবের উপর ঈমান আনা বিশ্বাস করার বিষয়টিই আল্লাহ তাআলা-
وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ ﴾
আয়াতাংশের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, সর্বশেষ কিতাব আল কুরআন। আর এই কুরআন হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং এটা শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ -এর উপর নাজিল হয়েছে, এটা বিশ্বাস করতে হবে। আরও বিশ্বাস করতে হবে, পূর্ববর্তী নবি- রাসুলদের উপর যা নাজিল হয়েছে। মোটকথা, নবি-রাসুলদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে, সবই ওহি বা কিতাব। সাথে সাথে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, আমাদের নবিজির উপর যে কুরআন নাজিল হয়েছে, এই কুরআন পূর্ববর্তী নবি- রাসুলদের উপর অবতীর্ণ সব কিতাবের কার্যকারিতা রহিত করে দিয়েছে। এটা হলো 'কুতুবিহি' শব্দের মর্ম।
এখানে খুব ভালো করে একটি বিষয় স্মরণ রাখবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে আর কারো প্রতি কোনো ওহি নাজিল হবে না। ওহির দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তা নাহলে আল্লাহ বলতেন, وَمَا أُنْزِلَ مِنْ بعدك তাই নবিজির পরে এপর্যন্ত যারাই নবুওয়াতের দাবি করেছে, উম্মত তাদেরকে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক হিশাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিয়ামত পর্যন্ত কেউ যদি নতুন করে ওহির দাবি করে এবং তার এই দাবিকে কেউ বিশ্বাস করে, তাহলে উভয়ই ভন্ড ও পথভ্রষ্ট সাব্যস্থ হবে। কিলাহুমা ফিন নার।
এরপর ঈমানের চার নম্বর শর্ত হচ্ছে, 'রুসুলিহি' বা রাসুলদের উপর বিশ্বাস করা। আল্লাহ তাআলা যত নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, তাঁদের সকলের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। কুরআনেই আল্লাহ বলেন,
لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ
অর্থাৎ, আমরা কারও মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। এটা হলো হাকিকাতে ঈমান। তাই অমুক নবিকে মানলাম, অমুক নবিকে মানলাম না, এমনটা হলে চলবে না; বরং পার্থক্য ছাড়াই সকলের উপর ঈমান আনতে হবে। তবে 'কাইফিয়াতে ঈমান'-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনের অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী নবি-রাসুলদের মধ্যে অনেককে অনেকের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান নয়, তেমনি নবিদের মর্যাদাও সমান নয়। আর নবিদের মধ্যে মর্যাদায় সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেন মুহাম্মাদ। তবে কোন নবির মর্যাদা কতটুকু, এটা পার্থক্য করার দায়িত্ব আমাদের নয়। আমরা শুধু তাঁদের উপর ঈমান আনার ব্যাপারে আদিষ্ট। এই হলো 'রুসুলিহি' শব্দের মর্ম। তবে এটা বিশ্বাস রাখতে হবে, সর্বশেষ নবি হলেন আমাদের নবিজি , তাঁর পরে আর কোনো নতুন নবি আসবেন না। সব মানলেন, কিন্তু আমাদের নবিজি যে শেষ নবি, এটা মানলেন না, তাহলে আপনার ঈমান আনাও হলো না।
ঈমানের পাঁচ নম্বর শর্ত হচ্ছে, 'ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি' বা আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখা। এই বিশ্বাস শুধু নয়; বরং দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে।
এখানে একটি বিষয় জানা দরকার যে, কুরআনের আলোচ্যবিষয় মোট ৬টি:
১. তাওহিদ।
২. রিসালাত।
৩. আখিরাত।
৪. যারা এই তিনটি গ্রহণ করবে, সে-সকল মুমিন সম্পর্কে আলোচনা এবং তাদের পুরস্কার হিশেবে জান্নাতের আলোচনা।
৫. যারা এই তিনটি গ্রহণ করবে না অর্থাৎ, কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে আলোচনা এবং তাদের পরিণাম হিশেবে জাহান্নামের আলোচনা।
৬. তাকদিরের উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস রাখা, বিশেষ করে কুরআনের আলোচনা।
তাকদিরে বিশ্বাস রাখতে হবে
তাকদির নিয়ে আমরা আগেও আলোচনা করেছি। তাকদির হলো এমন বিষয়, যা আপনার তাকদিরে থাকবে আপনি তা-ই পাবেন। আর যা আপনার তাকদিরে নেই, তা চেষ্টা করলেও পাবেন না। যেমন: আপনার তাকদিরে যদি থাকে যে, আপনি বাংলাদেশে শিক্ষকতা করবেন, তাহলে বাংলাদেশই হবে আপনার শিক্ষকতার স্থান। যদি আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশে নির্ধারিত থাকে, তবে সেখানে গিয়েই আপনাকে শিক্ষকতা করতে হবে। এটাই হলো তাকদির। আপনার তাকদিরে যা তা পাবেনই, কেউ হিংসা করলেও কিছুই করতে পারবে মহাশয়।
তাকদিরে যদি আপনার মর্যাদার কথা লেখা থাকে, তাহলে আপনি মর্যাদা লাভ করবেনই। তবে এই মর্যাদাবৃদ্ধির কারণে আপনাকে গৌরব করা চলবে না। বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আপনি যত শুকরিয়া আদায় করবেন, আপনার মর্যাদা তত বাড়বে।
আপনি যদি মর্যাদাবান বা সম্মানী হয়ে যান, দেখবেন, তখন অনেকেই আপনাকে নিয়ে হিংসা করবে। তবে এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ, সফলতার কারণেই হিংসা করে, সমালোচনা করে। বিফল হলে কেউ কিছু বলত না। নিরবে শুধুই হাসতো। রাতে চাঁদের আলো দেখলেই কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে। এ জন্য মুত্তাকিদের গুণের আলোচনায় আল্লাহ বলেন,
وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যারা ধৈর্যধারণ করে অর্থনৈতিক সংকটে, শারীরিক মুসিবতের সময়ও ধৈর্য ধরে এবং সত্যমিথ্যার দ্বন্দ্বের সময় সত্যের পক্ষে থাকে এবং ধৈর্য ধরে, এরা হলো সত্যবাদী। এরাই হলো মুত্তাকি।
আল্লাহ কাউকে সম্মানিত করতে চান, অথচ তাকওয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারছে না, তখন তাকে বিপদে পতিত করেন। এখন সে যদি এই বিপদের সময় ধৈর্য ধরে, তাহলে আল্লাহ তাকে মর্যাদার সেই স্তরে পৌঁছিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ। এ জন্য যখনই আমরা কোনো বিপদ-মুসিবতে পতিত হবো, তখন ধৈর্য ধরব। এমনটা বলব না যে, আমি তো সবসময় ভালো কাজই করছি, ইবাদত করছি, তাহলে আমার উপর এই বিপদ কেন? সাবধান, এভাবে বলবেন না। আল্লাহ আপনার মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। আর এতে কল্যাণ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে নবিজি বলেন, আল্লাহর সত্যিকার মুমিন বান্দা যারা, আল্লাহ তাদেরকে মুসিবতের খাবার খাইয়ে থাকেন। যেভাবে একজন মা তার সন্তানকে মুহাব্বাতের সাথে দুধপান করিয়ে লালন পালন করে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহও তাঁর বান্দাদের মর্যাদার আসনে আসীন করার জন্য বিপদ-মুসিবত খাইয়ে থাকেন।
এ কারণে আমরা সর্বাবস্থায় তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখব। ভালোমন্দ যা-ই ঘটুক, সবই তাকদিরের ফায়সালা। এ জন্য কোনো মানুষকে অযথা দোষ দিয়ে লাভ নেই। এভাবে আমাদেরকে তাকদিরের উপর ঈমান আনতে হবে।
আমরা আলোচনা করছিলাম, ঈমানিয়াত সম্পর্কে। আল্লাহর উপর ঈমান আনা, ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস রাখা, আসামানি কিতাবসমূহের উপর বিশ্বাস রাখা, রাসুলদের উপর বিশ্বাস রাখা, কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখা, তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখা, এগুলো সম্পর্কে আমরা মোটামুটি একটা আলোচনা করলাম। এর পরের বিষয় হলো, মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়া সম্পর্কে।
ঈমানের ৭ নম্বর শর্ত হলো والبعث بعد الموت বা মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাস রাখা। এখানে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আগে যেহেতু واليوم الآخر বলা হয়েছে, তাহলে এখন আবার والبعث بعد الموت বলার মানে কি? এর উত্তর হলো, আখিরাতের দিনের অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ আমাদের জানা নেই। কবরের জগত, পুলসিরাত, হাশর, মিজান ইত্যাদি। সুতরাং সেসব সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে এবং ঈমান আনতে হবে। কেননা, আখিরাতের উপর যার বিশ্বাস থাকবে, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করতে ভয় করবে। আর যদি বিশ্বাস না করে, তাহলে অবাধ্যতা করতে তার কোনো ভয় থাকবে না। এ জন্য আল্লাহ তাআলা আখিরাতের ভয় ও পুনরুজ্জীবিত হওয়া সম্পর্কে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঈমান ইসলাম ও ইহসানের সমষ্টিক নাম সত্যিকারের দ্বীন। ঈমান, ইসলাম ও ইহসান; এই তিন প্রকারের আলোচনা বুঝতে পারলেই পুরো বিষয়টি বোঝা সহজ হয়ে যাবে। সুরা বাকারায়ই আল্লাহ তাআলা এই তিনটির বিশদ আলোচনা করেছেন الَّذِيْنَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ বলে ঈমান বিল গায়িব বা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে। আর وَيُقِيمُوْنَ الصَّلُوةَ বলে ইসলামের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর وَمِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ বলে ইহসানের কথা বোঝানো হয়েছে। আর وَيُقِيمُوْنَ الصَّلُوةَ যে বলা হয়েছে, তাতে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের সবটাই নামাজের মধ্যে ঢুকে গেছে। এ জন্য আলাদাভাবে রোজা ও হজের আলোচনা করা হয়নি। কথাগুলো আমরা আগেও আলোচনা করে এসেছি। আপনাদের কি মনে আছে? আজ আবার বলি।
রোজা ও হজের কথা কীভাবে নামাজের মধ্যে চলে এসেছে- দেখা যাক। একজন মানুষ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে এই নামাজে দাঁড়ানোর কারণে নামাজের সাওয়াব পাবে। কিন্তু নামাজে দাঁড়ানোর পর কেউ কিছু খেতে পারবে? পান করতে পারবে? না, পারবে না। সুতরাং সে যেহেতু নামাজে দাঁড়িয়ে কিছু ভক্ষণ করল না, পান করল না, এটাও তো একধরনের রোজা। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে রোজার সাওয়াব দেবেন। এখন আমরা কালিমা, নামাজ, রোজা পেয়েছি। এমনিভাবে নামাজের মধ্যেই হজ ও জাকাতের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে নামাজের ভেতরেই এই পাঁচটি বিষয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রথম তিনটির প্রমাণ তো পেয়েছি, এবার হজ-জাকাতের সওয়াব কীভাবে পাওয়া যায়, এটা দেখব।
হাদিস শরিফে রাসুল ﷺ বলেন, কেউ যখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে নামাজে দাঁড়ায়, তখন এই নির্জীব কাপড়ও আল্লাহর জিকির করতে থাকে। এবং ওই ব্যক্তির নামাজেও খুশুখুজু আসে। সুবহানাল্লাহ। আমাদের সমাজে অনেককে দেখা যায়, শরীরের সব কাপড়ই দামি এবং পরিষ্কার, কিন্তু নামাজের সময় এদের মাথায় ছেড়া- ময়লা টুপি। এমনটা করা ঠিক নয়। আল্লাহর শাহি দরবারে যখন দাঁড়াব, তখন শাহি পোশাক পরেই দাঁড়াব।
পোশাক সুন্দর-পরিপাটি হলে নামাজেও একাগ্রতা আসে। আপনারা পরীক্ষা করে দেখবেন, ময়লা কাপড়ে নামাজ পড়লে মনের অবস্থা কেমন থাকে; আর সুন্দর পোশাক পরে নামাজ পড়লে কেমন হয়। আর পোশাক যেহেতু জিকির করে, তাই শরীরে পোশাকের পারিমাণ বেশি হলে জিকিরের পরিমাণও বাড়বে। এ জন্য আমরা সবসময় টুপি পরে নামাজ পড়ব। সম্ভব হলে পাগড়িও পরিধান করব।
নবিজি কখনো টুপি ছাড়া ফরজ নামাজ পড়েননি। এমনিভাবে কোনো সাহাবি টুপি ছাড়া নামাজ পড়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া সুন্দর কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়ার কারণে আল্লাহ মাকবুল সদকার সাওয়াব দেবেন। সুতরাং নামাজের মধ্যে জাকাতের সাওয়াবও পাওয়া গেল।
বাকি রইল শুধু হজের বিষয়। নামাজে কীভাবে হজের সাওয়াব রয়েছে, এ প্রসঙ্গে মুফাসসিরগণ তাফসিরের কিতাবে লিখেন, আমরা যখন নামাজে দাঁড়াই, তখন কিবলামুখি হয়ে দাঁড়াই। আর মুসলমানদের কিবলা হলো কাবা শরিফ এবং হজও করা হয় এই কাবায়। সুতরাং নামাজে দাঁড়ালে আল্লাহ তাঁর দয়ায় বান্দাকে হজের সাওয়াবও দেবেন। এ জন্য এগুলোর আলাদা আলোচনার দরকার ছিল না।
এর পরের বিষয় হলো, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা। وَمِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ বলে আল্লাহ তাআলা এটাই বুঝিয়েছেন যে, মুমিন হলো তারা, যারা আল্লাহর দেওয়া সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে। এই ব্যয় করার আলোচনা করে আল্লাহ তাআলা ইহসানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেমন, কারও অনেক সম্পদ রয়েছে, আর তার কাছে যদি কিছু চাওয়া হয় এবং সে না দেয়, তবে সে কৃপণ। এই যে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও না দেওয়া, এটা তার অন্তরের কারণে। তার অন্তরে কৃপণতা রয়েছে।
যারা সদকা-খয়রাত করে, তাদের অন্তরের হালতও ভালো থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা وَمِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ বলে এমন একটা গুণ অর্জন করতে বলেছেন, যে গুণ অর্জন করলে তার অন্তরে দয়ার উদ্রেক হয়, কারো প্রতি দয়া করতে পারে, এবং এমন গুণ, যার দ্বারা নামাজ সুন্দর হয়, ঈমান সুন্দর হয়। এমনটা গুণ যখন কেউ অর্জন করবে, তখন সেগুলো হলো ইহসান। এগুলোই হলো মূল দ্বীন। এরপর ইহসানের মধ্যে যখন উন্নতি ঘটবে, তখন সেটা একপর্যায়ে ইয়াকিনের রূপধারণ করে।
📄 মুত্তাকিদের বিশেষ গুণ
আমাদের আলোচনা চলছিল পরকালের উপর বিশ্বাস সম্পর্কে। আল্লাহপাক বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ মুত্তাকিরা আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে। তবে এই বিশ্বাস হতে হবে দৃঢ়। এমন দৃঢ় যে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। অস্বীকার করলেই আপনার ঈমান চলে যাবে। যেভাবে '১' সংখ্যাটি '২' সংখ্যা থেকে ছোট এবং '২' সংখ্যাটি '১' সংখ্যা থেকে বড়, এতে যেমন কারও কোনো সন্দেহ নেই; বরং সারা দুনিয়াবাসী এটার উপর একমত, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ এক এবং সত্য। এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। যেভাবে নবিজি বলেছেন, আল্লাহ এক, এটাও সত্য। জান্নাত-জাহান্নাম আছে, এটাও সত্য। আখিরাতও সত্য। আমরা যে মৃত্যুবরণ করব, এটাও সত্য। সুতরাং এসব সত্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস করে ঈমান আনলাম। তবে কেউ যদি এই 'মানা'র পাশাপাশি 'না-মানা'র ব্যাপারটিও অন্তরে ধারণ করে, তাহলে হবে না।
এখন কেউ এগুলো মানলো। যখন বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, আমি আল্লাহ মানি, নবি মানি, ইসলাম মানি, এ মুহূর্তে জান বাঁচানো ফরজ। বিপদ কেটে গেলে আবার আগের নাফরমানির জায়গায় চলে যায়। এটা কখনো দৃঢ় বিশ্বাস হতে পারে না। এটা সুবিধাবাদি বিশ্বাস। এ জন্য আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে ঈমান আনতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে।
মৃত্যু নিয়ে দুনিয়ার মানুষ সকলেই একমত যে, মৃত্যু একটি সত্য বিষয়। প্রাণিমাত্রই মৃত্যুবরণ করবে। ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলিম সকলেই এটা বিশ্বাস করে এবং অন্তর থেকেই এটা বিশ্বাস করে থাকে। এই যে একটা বিশ্বাস, আখিরাতের ব্যাপারেও এমন বিশ্বাস থাকতে হবে। আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাসের প্রমাণ রাখতে হবে বেশি বেশি সিজদাহ করার মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন,
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ﴾
হে নবি, আপনি আপনার প্রভুর তাসবিহ পড়ুন এবং বেশি বেশি সিজদা করুন। এ জন্য আমরা বেশি বেশি সিজদা করব। নফল নামাজে একাকী দীর্ঘ সময় সিজদায় ব্যয় করব। সিজদা করলে আপনার শারীরিক অনেক ফায়েদা হবে। আপনি যখন দীর্ঘ সময় নিয়ে সিজদা করবেন, তখন আপনার শরীরের রক্তসঞ্চালন বেড়ে যাবে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে আপনার মাথা হালকা হবে। প্রেশার কন্ট্রোলে থাকবে। এ ছাড়া সিজদা হলো আল্লাহর সঙ্গে নৈকট্য লাভ এবং সম্পর্ক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এক হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مَعَ الله وهو ساجد
সুতরাং সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। হাদিস শরিফে রাসুল ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মাধ্যম হলো তাকওয়া। আর তাকওয়া হলো গুনাহের বিপরীত। এ জন্য যে গুনাহ করে, সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, আর গুনাহ থেকে দূরে থাকলে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। এভাবে বান্দা তাকওয়া অর্জন করে একপর্যায়ে ইয়াকিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পর বান্দার ঈমান বা বিশ্বাসের যে অবস্থা হয়, সেই বিশ্বাসকে ইয়াকিন বলা হয়। এ জন্য মৃত্যুকেও ইয়াকিন বলা হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলে,
وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
ইয়াকিন আসার আগ পর্যন্ত তুমি তোমার প্রভুর ইবাদত করতে থাকো। এখানে ইয়াকিন মানে মৃত্যু।
আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা বলে, 'ইয়াকিন হয়ে গেলে আর ইবাদত করা লাগে না।' এ কথা যারা বলে, তারা হলো ভন্ড, বাটপার। এরা কুরআনের তাফসিরের অপব্যখা করে। এদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
জাহান্নামে যাওয়ার কারণ
বান্দা যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে তার জাহান্নামে যাওয়ার মূল কারণগুলো কী হবে? জাহান্নামিরা যখন জাহান্নামে চলে যাবে, তখন জান্নাতিরা এদের লক্ষ করে বলবে, 'মা সালাকাকুম ফী সাকার?' কোন জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কয়েকটি কারণ বলবে। তারা বলবে, لَمْ نَكُ مِنَ لْمُصَلِّينَ
আমরা নামাজি ছিলাম না, অর্থাৎ দুনিয়ায় থাকতে আমরা নামাজ আদায় করতাম না। এরপর وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ আমরা মিসকিন-অভাবীদের খাবার দিতাম না। وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ আমরা সমালোচকদের সঙ্গে সমালোচনা করতাম। রটনাকারীদের সঙ্গে রটনা করতাম।
এক ধরনের মানুষ আছে এমন, অন্যের বিরুদ্ধে কিছু না বললে যেন তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। সারাদিন কারো না কারো সমালোচনা করতে থাকাই তাদের কাজ। অন্যের দোষত্রুটি আর মন্দচর্চা না করলে তারা শান্তি পায় না। অথচ, অসাক্ষাতে কারো দোষচর্চা করাকে গিবত বলে। গিবত একটি জঘন্য কবিরা গুনাহ। নবিজি বলেছেন, গিবত করা মানে নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য ব্যাপার!
তারা যখন কারো গিবত করে, যখন অন্যের সমালোচনা করে, আর তাদের বলাহয়, ভাই! বাদ দিন, লোকটি সামনে নেই। আর কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষচর্চা করলে গিবত হয়, তখন তারা বলে, আমি এই কথাগুলো তার সামনেও বলতে পারব। তারা ভাবে, যেকথা সামনে বলা যাবে, সেটা অসাক্ষাতে বললে বুঝি গিবত হয় না। অথচ, এটাই গিবত।
এখানে অনেকেই একটি বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তারা ভাবেন, কারো বিরুদ্ধে অহেতুক সমালোচনা করলে, তথা মিথ্যা বদনাম করলে সেটা গিবত হয়। সত্য সমালোচনায় গিবত হয় না। অথচ, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারো মধ্যে যদি আসলেই কোনো দোষ থাকে, তাহলে সেই দোষ তার অনুপস্থিতিতে করাকেই গিবত বলাহয়। আর সেই দোষ যদি তার মাঝে না থাকে, তাহলে সেটা হলো তুহমত। তুহমতও কবিরা গুনাহ।
জাহান্নামিরা সেদিন বলবে, আমার অবস্থা এমন ছিল, আমি আমার জীবনের সৌন্দর্যের ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলাম না, বরং অন্যের চিন্তায় আমার জীবনকে নষ্ট করেছি। সময় নষ্ট করেছি। হায়! তখন অন্যের চিন্তা না করে যদি নিজের চিন্তা করতাম, তাহলে আমার জীবন সুন্দর করতে পারতাম। তখন আমি আমার জীবনকে সুন্দর করার পিছনে কাটাইনি। পুরো জীবন অন্যের পিছনে পড়ে কাটিয়েছি।
সমাজে কিন্তু এমন মানুষ অনেক। আমাদের এমন স্বভাব থাকলে দূর করতে হবে। এই স্বভাব জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আপনারা মৌমাছি হন; কিন্তু মাছি হবেন না। মাছি কেবল দুর্গন্ধ বসে। যেখানে দুর্গন্ধ সেখানে তার জায়গা। ঠিক তেমনিভাবে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা কেবল অন্যের দোষ খুঁজে। এমন খোঁজাখুঁজি করবেন না। আল্লাহ দোষত্রুটি গোপন করে রেখেছেন, আপনি খুঁজবেন কেন? আপনাকে খুঁজতে বলেছে কে? এটা কি আপনার দায়িত্ব? আপনি আপনার নিজেকে সংশোধনের ব্যবস্থা করুন। কবি বলেন,
فسوف ترى إذا انكشف الغبار : أفرس تحت رجلك ام حمار যখন তোমার অন্তরচক্ষু খুলে যাবে, তখন জানতে পারবে তুমি ঘোড়ার উপর সওয়ার, নাকি গাধার উপর সওয়ার।
এ জন্য সাবধান! অন্যের চিন্তা নয়। গিবত করা ও গিবত শোনা সমপর্যায়ের গুনাহ। সুতরাং, আমরা গিবত তো করবই না, কেউ কারো গিবত করলে আমি সেটা শুনবও না। পারলে তাকে নিবৃত্ত করব, নাহয় সেখান থেকে সরে আসব।
আপনারা মাছি হবেন না, মৌমাছি হোন। মৌমাছি কেবল ফুলে বসে। পারলে মানুষের গুণগান আলোচনা করুন। আর গুণ আলোচনা না করতে পারলে দোষ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। মানুষের দোষচর্চা মারাত্মক অপরাধ। এই অপরাধে অনেকে জাহান্নামে যাবে।
📄 পরকালে বিশ্বাস
ঈমানের অপরিহার্য অংশ হলো আখিরাতে বিশ্বাস। মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন এবং সে জীবনে বিশ্বাস করতে হবে। সুরা বাকারার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ 'এবং তারা আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস করে।' [সুরা বাকারা : ৩]
সেদিন জাহান্নামিরা বলবে, আখেরাতের ব্যাপারে আমাদের ধারণা ছিল না। বিশ্বাস ছিল না। তাই আমি চিন্তা করিনি। কবরে-হাশরে কী হবে, আমি ভাবিনি। আল্লাহ বলেন, وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَومِ الدِّينِ ‘(তারা বলবে) আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৬]
হাশরের দিন যখন আল্লাহ নেককারদের পুরস্কার আর বদকারদের শাস্তি দেবেন, ওই দিনের কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। দুনিয়ার পিছনে পড়ে আখিরাতকে ভুলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ বলেন, حَتَّى اَثْنَا اليَقِينُ 'অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৭]
হঠাৎ করে মৃত্যু এসে গেল। এখানে ইয়াকিন অর্থ মৃত্যু। আর মৃত্যু যখন আসবে, নির্ধারিত সময়েই আসবে। এক সেকেন্ড আগেও না, এক সেকেন্ড পরেও না। আল্লাহ বলেন, فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ ﴾
অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না। [সুরা আরাফ: ৩৪]
যখন মৃত্যু আসবে এক সেকেন্ডও হেরফের হবে না। যে মুহূর্তে যাওয়ার দরকার তখনই প্রাণ পাখি উড়ে চলে যাবে, অথচ আমার কোনো খবর নেই। আমি তো গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হওয়া আসামি। যে কোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এটা হলো ইয়াকিন। যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। মৃত্যুকে তাই ইয়াকিন বলে।
ইয়াকিন তিন প্রকার: ১. ইলমুল ইয়াকিন, ২. হাক্কুল ইয়াকিন, ৩. আইনুল ইয়াকিন। এই তিন প্রকার ইয়াকিনের কথাই কুরআনে বর্ণিত আছে। ইলমুল ইয়াকিন হলো, বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। কেবল বিশ্বাস হলে হবে না, সঙ্গে বিশুদ্ধ জ্ঞান লাগবে। আইনুল ইয়াকিন চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। যেন সে নিজ চোখে দেখছে। আর, হাক্কুল ইয়াকিন বাস্তবতার মাধ্যমে বিশ্বাস। আল্লাহ বলেন, اَلْهُكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা তেমাদের মধ্যে পেয়ে বসেছে। যতক্ষণ-না তোমরা কবরে উপনীত হও। [সুরা তাকাসুর: ১-২]
অর্থাৎ, সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় তোমরা ব্যস্ত থাকবে, আর কবরের ডাক চলে আসবে। এখন তুমি যদি এসব জিনিস পেছনে ফেলে কবরে কী নিয়ে যাওয়া যায়, হাশরের ময়দানে কী নিয়ে উঠা যায়, কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যায়, জাহান্নাম থেকে বাঁচা যায়, এগুলো নিয়ে চিন্তা করো, উপকরণ প্রস্তুত করো, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহ সুসংবাদ রেখেছেন। এরপর আল্লাহ বলেন, كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ
কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৩]
অর্থাৎ, সম্পদবৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া তোমার জন্য কখনো ঠিক হয়নি। কিন্তু এমন সম্পদ, যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয়, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ
নেককারের জন্য উত্তম মাল কতইনা ভালো! কেউ যদি নেককাজে তার সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে নেককার বানিয়ে দেন। সুতরাং সম্পদ থাকলে সেটা যদি ভালো কাজে ব্যবহারের নিয়ত থাকে, তবে সম্পদ অর্জন দোষণীয় নয়। আর যে সম্পদ তোমাকে কবর ভুলিয়ে দেয়, হাশর ভুলিয়ে দেয়, জান্নাত ভুলিয়ে দেয়, জাহান্নাম ভুলিয়ে দেয়, আল্লাহ ভুলিয়ে দেয়, নবি ভুলিয়ে দেয়, এমন সম্পদ অর্জন দোষণীয়। তবে যে সম্পদের কারণে আল্লাহর ভালোবাসা বেড়ে যায়, নবির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়, আখিরাতের সামানা তৈরি করা যায়, এটা হলো নি'মাল মাল বা উত্তম সম্পদ।
আল্লাহ বলেন, কাল্লা সাওফা তা'লামুন অর্থাৎ, যা করতেছ, তা অতিসত্বর তোমরা জানতে পারবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ধমক। হাশরের ময়দানে উপস্থিত হতেই হবে। সে দিন কয়েকটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না। আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাকে যে জীবন দিয়েছিলাম, তা কোন খাতে ব্যয় করেছ? এখন জবাব দাও। তোমার যৌবন কোন খাতে ব্যয় করেছ, জবাব দাও। তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছিলাম, তা কীভাবে অর্জন করেছ, কীভাবে ব্যয় করেছে, জবাব দাও। তোমাকে যে জ্ঞান দিয়েছিলাম, সেই জ্ঞান অনুযায়ী তুমি কতটুকু আমল করেছ, জবাব দাও। হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, কিয়ামতের দিন এই প্রশ্নসমূহের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না।
এ জন্য كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ বলে আল্লাহ একটি হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সে দিন তোমাদের খবর হবে। জানতে পারবে সব। এরপর আবারও ধমক দিয়ে আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ
তারপর কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৪] অর্থাৎ, আমি আবারও বলছি, তোমাদের এ কাজ ঠিক হয়নি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, তোমরা যা করতে। পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,
كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ
কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে। [সুরা তাকাসুর: ৫] অর্থাৎ, এটা করা কখনো ঠিক হয়নি। যদি তোমরা জানতে, ইলমুল ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞান যদি তোমরা অর্জন করতে, আল্লাহর কথা মানতে, নবির কথা বিশ্বাস করতে, তবে কখনো এমনটা করতে না। দুনিয়ার পিছে দৌড়াতে না; বরং আখিরাতের সামানা অর্জনের সচেষ্ট থাকতে। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সুতরাং এখানে তোমরা দুনিয়ার পিছনেও লাগতে পারো, আখিরাতের সামানাও অর্জন করতে পারো, এই সুযোগ রয়েছে। তবে বুদ্ধিমানের কাজ হলো আখিরাতের সামানা অর্জন করা। এক হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ. وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ
যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে স্বীয় আয়ত্তাধীন রেখেছে এবং মৃত্যুর পরের জন্য নেকির পুঁজি সংগ্রহ করেছে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত সফল ও বুদ্ধিমান। আর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে আল্লাহর প্রতি ক্ষমার আশা পোষণ করে, মূলত সে-ই অক্ষম (নির্বোধ)।
সত্যিকার বুদ্ধিমান হলো সে, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এবং এমন আমল করে, যে আমলের কারণে আখিরাতে নাজাত পায়। আল্লাহ বলেন,
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتْنِ
আর যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে, তার জন্য থাকবে দুটি জান্নাত। [সুরা আর-রাহমান: ৪৬]
সত্যিকার বুদ্ধিমানরা তাদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নফস গুনাহ করতে চায় কিন্তু আল্লাহর ভয়ে করে না। আর আল্লাহর ভয়ে যে গুনাহ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে স্পেশাল দুটি জান্নাতের মালিক বানিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ বলেন, যদি সে নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতো, অর্থাৎ, যদি বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হতো, তবে সে কখনো দুনিয়ার পিছনে ছুটত না। অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করত না; বরং হালাল পন্থায় প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনেই সে সন্তুষ্ট থাকত। আর এমন ব্যক্তি মৃত্যুর সাথে সাথেই জান্নাতে পৌঁছে যেত। পরের আয়াতে আল্লাহ আবারও ধমক দিয়ে বলেন,
لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ ۞ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ ۞ ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ
অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। আবার বলি, তোমরা তা অবশ্য অবশ্যই দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। তারপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা তাকাসুর: ৬-৮]
যারা শুধু দুনিয়া অর্জনের পেছনে হরদম মত্ত থাকতে, অবশ্যই অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। সেদিন তোমরা স্বচক্ষে জাহান্নাম দেখতে পাবে। অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে দুনিয়াতে দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
মোটকথা, দুটি বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, একটা হলো ইলমে ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস করতে হবে। অপরটি আইনুল ইয়াকিন বা চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে। অর্থাৎ, সে চাক্ষুষভাবে জান্নাত-জাহান্নাম দেখবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়াতে কীভাবে দেখবে? হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, একজন মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার সামনে জান্নাত-জাহান্নাম পেশ করা হয়। সে যদি জান্নাতি হয়, তবে জান্নাত দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে, আর জাহান্নামি হলে জাহান্নাম দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে। এসময় তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তোমার নামে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, জাহান্নামও বরাদ্ধ ছিল। দুনিয়ার সকল মানুষের নামেই একটা জান্নাত এবং একটা জাহান্নাম রয়েছে। আবু জাহলের নামেও জান্নাতও আছে, জাহান্নামও আছে। ঠিক তমনিভাবে আবু বকরের নামেও জান্নাত এবং জাহান্নাম রয়েছে। কিন্তু আবু জাহল জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নামই বেছে নিয়েছে। আর আবু বকর জাহান্নামের পরিবর্তে জান্নাত। তো এখন তার নামে যে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, সেটা কোথায় যাবে বা কে পাবে? এর উত্তর হলো, তার বরাদ্ধে থাকা জান্নাত তখন মুমিনকে বোনাস হিশেবে দিয়ে দেওয়া হবে।
এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, জাহান্নামিদের নামে বরাদ্ধ থাকা জান্নাত বোনাস হিশেবে জান্নাতিদের দান করা হবে। আর জান্নাতিদের নামে বরাদ্ধে থাকা জাহান্নাম তখন ওই জাহান্নামিদের দিয়ে দেওয়া হবে। এটা বোঝাতেই আল্লাহ 'জান্নাতান' বা দুটি জান্নাতের কথা বলেছেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বান্দার সামনে জান্নাত-জাহান্নামের পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরা হবে।
এখন যারা জান্নাতি, তাদের জান্নাত দেখতে পাওয়া- এই দেখা দুনিয়ার দেখা নয়, সেটা অন্যরকম দেখা। ফেরেশতারা তখন রেশমের রুমাল, জান্নাতি খুশবু ইত্যাদি নিয়ে আগমন করেন, তখন সে এসব দেখে হাসতে থাকে। আর জাহান্নামিরা মৃত্যুকালে জাহান্নাম দেখতে থাকে আর ভয় পেতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ (বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]
এ জন্য মৃত্যুপথযাত্রী জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে পায় কিন্তু তার নিকটে থাকার পরও আমরা দেখতে পাই না। দুনিয়ার চোখ-কান দিয়ে তা দেখা এবং শোনা যায় না। যেভাবে আপনার সাথে ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছে যে, তাকে কুকুর দৌড়াচ্ছে। তাই পেরেশান হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু আপনি পাশে থাকার পরও এটা দেখতে পাননি। ঠিক তেমনিই হবে সাকারাতের সময়ের অবস্থা। এ জন্য সাকরাতের সময় যারা আপনজন, তারাই তার পাশে থাকবে। সেসময় অযথা কান্নাকাটি চিল্লাচিল্লি করা ঠিক নয়। কেননা, এর মাধ্যমে সে কষ্ট পায়。
সাকরাতের সময় আমাদের করণীয় কি, এ সম্পর্কে রাসুল ﷺ বলেন, لَقَّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ তোমরা মৃত্যুর দুয়ারে থাকা ব্যক্তির কানের কাছে গিয়ে কালিমা পাঠ করো। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ভুল করে থাকি। কালিমার পড়ার জন্য চাপ দিই। বলাতে চেষ্টা করি। না, এটা ঠিক নয়; বরং তার কানের কাছে শুধু কালিমা পড়তে থাকবেন। এখন সে যদি একবার কালিমা পড়ে নেয়, তবে আর বলবেন না। এবং এ অবস্থায়ই যদি সে মারা যায়, নবিজি ﷺ বলেন, এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। নবিজি ﷺ বলেন, من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة যার সর্বশেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতি। এ জন্য সাকরাতের ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কার কখন কীভাবে মৃত্যু হবে, আল্লাহই ভালো জানেন। হে আল্লাহ, সাকরাতের সময় আমাদের শাস্তি দিয়ো না। ঈমানের সাথে আমাদের মৃত্যু নসিব করো। আমিন।