📄 ইতিকাফ ও শবে কদর
রমজানের শেষ দশকে যারা ইতিকাফ করছেন, তারা আল্লাহর মেহমান। তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। আল্লাহর মেহমানদের সম্মান করতে হবে। রমজান এসেছে মানুষকে জান্নাতি বানাতে, মুত্তাকি বানাতে। রহমতের দশক শেষ, মাগফিরাতও শেষ, এখন নাজাতের দশক চলছে। এই দশকে অনেক অফার রয়েছে। এর মধ্যে বড় একটা অফার হলো ইতিকাফ। এ জন্য যারা ইতিকাফ করেন, তারা বুজুর্গ। তাদের খেদমত করা উচিত। তাদের কাছ থেকে দুআ নেওয়া উচিত। তারা আল্লাহর মেহমান।
দুনিয়ায় কেউ যদি কারও কাছে অপরাধ করে এবং দিন শেষে অপরাধী ওই বাড়িতে চলে যায়, তখন সে অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়। ঠিক তেমনিভাবে আমরা হলাম অপরাধী। আল্লাহর কাছে অপরাধ করেছি। এখন আমরা মসজিদে অর্থাৎ আল্লাহর ঘরে এসে আশ্রয় নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। ফলে বান্দা যখন আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নেয়, তখন আল্লাহর দয়ার সাগরে উত্তালতা শুরু হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।
এ জন্য রমজানের শেষ দশকে আল্লাহ তাআলা এমন সুন্দর একটি ব্যবস্থা আমাদের জন্য রেখেছেন। ইতিকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা। আমরা যারা ইতিকাফ করছি, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমলটি শেষ করব। ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ইতিকাফের জরুরি মাসাইলগুলো শিখে নেব। কোনো কোনো কাজ করলে ইতিকাফের ক্ষতি হয়, সেগুলো জানব। ইতিকাফের সময়টা যত বেশি সম্ভব আল্লাহর ইবাদতে কাটাব। নফল নামাজ আর তিলাওয়াতে ব্যয় করার চেষ্টা করব। জরুরি কথা ছাড়া বাড়তি একটি কথাও বলব না। ইতিকাফে থাকা অন্য সাথীদের সাথে গল্প-গুজবে সময় পার করব না। একই সাথে সারাদিন বা সারা রাত ঘুমিয়েও কাটাব না। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
শেষ দশকের আরেকটা বড় অফার হচ্ছে শবে কদর। শবে কদর এতই ফজিলতপূর্ণ যে, নবিজি রমজানের প্রথম দশক এবং দ্বিতীয় দশকে শবে কদরের সন্ধান করেছেন। এরপর নবিজি সাহাবিদের সামনে ঘোষণা দেন, 'আমি রমজানের প্রথম দশকে শবে কদরের সন্ধানে ইতিকাফ করেছি কিন্তু পাইনি। এরপর দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফের মাধ্যমে সন্ধান করেছি, কিন্তু পাইনি। তবে আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন যে, শবে কদর রমজানের শেষ দশকে রয়েছে।'
শবে কদর পেলে কেমন লাভ, এ সম্পর্কে রাসুল ইরশাদ করেন, أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ سِتِّينَ إِلَى سَبْعِينَ وَأَقَلُهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ
আমার উম্মতদের বয়স হলো ষাট ও সত্তরের মাঝে। তাদের খুব কম সংখ্যকই এই সীমা অতিক্রম করতে পারবে।
এই উম্মতের গড় বয়স হলো ৬০ থেকে ৭০ বছর। এর চেয়ে বেশি দিন খুব কম মানুষেই বেঁচে থাকে। এখন কেউ যদি শবে কদরের ফজিলত লাভ করে, তাহলে এক রাতেই আল্লাহ তাকে ৮৩ বছর ৪ মাস বা প্রায় ৮৪ বছর লাগাতার ইবাদত করার সাওয়াব দান করেন। সুবহানাল্লাহ। কোনো মানুষ ৬০ বছরের জীবন লাভ করে মৃত্যুবরণ করল এবং শবে কদরও লাভ করল, তাহলে দেখা যাচ্ছে, সে তার বয়সের চেয়ে বেশি সময় শুধু ইবাদতেই কাটাল। সুবহানাল্লাহ। আর এই ফজিলত শুধু উম্মাতে মুহাম্মাদিই লাভ করেছেন, অন্য কোনো উম্মতকে আল্লাহ এই ফজিলত দেননি।
শবে কদর পাওয়ার জন্য আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত শেষ দশকের রাতগুলোতে সতর্ক থাকা চাই। শেষ দশকে আপনার ইশার নামাজের জামাআত যেন না ছুটে। ফজরের জামাতও যেন মিস না হয়। যদি ইশা ও ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করতে পারেন, তাহলে এর ফল কী? এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিম শরিফের বর্ণনায় রয়েছে, নবিজি এমন ব্যক্তির ব্যাপারে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, 'সারা রাত জেগে নফল নামাজ পড়লে যে সাওয়াব, তার জন্য সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে।' সুবহানাল্লাহ। সুতরাং এমন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই শবে কদর লাভ করতে পারবে।
📄 তাকদির বা ভাগ্য
আমরা তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। ভাগ্য পাঁচ প্রকার: তাকদিরে আজলি, তাকদিরে মিসাকি, তাকদিরে উমরি, তাকদিরে হাওলি, তাকদিরে ইয়াওমি।
প্রথম প্রকার ভাগ্য হলো 'আত তাকদিরুল আজলি'। আল্লাহ তাআলা আজলের মধ্যে প্রথমে কলম তৈরি করে তাকে আদেশ দেন, 'উকতুব' বা 'লিখো'। কলম জবাব দেয়, 'কী লিখব?' তখন আল্লাহ কলমকে বললেন, 'লিখ, কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মাখলুকের ভাগ্য সম্পর্কে লিখ।' এটাকে তাকদিরে আজলি বলে হয়।
দ্বিতীয় প্রকার হলো, 'আত তাকদিরুল মিসাকি'। রুহ জগতে আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে যখন এক জায়গায় জড়ো করে একটি কথা শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, 'আলাসতু বিরাব্বিকুম?' আমি কি তোমাদের প্রভু নই?
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার। আমরা যে তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করছি, এটা মূলত একটা ড্রয়িং। যেমন, আপনি একটি বাড়ি বানাবেন। এটার জন্য ইঞ্জিয়ারের কাছে গেলে সে একটি ড্রয়িং করে দেবে। এই ড্রয়িংয়ের মাধ্যমেই বোঝা যাবে, বাড়ির কোথায় কতটুকু মাল-সামানা লাগবে। ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্যও একটা ড্রয়িং। এর মাধ্যমে আমরা কীভাবে জান্নাতে যাব, এর বিবরণ জানা যায়। তবে ইঞ্জিয়ারের কাছ থেকে ড্রয়িং করিয়ে যদি বসে থাকেন, তবে বাড়ি তৈরি হবে না। বরং তার ফর্মুলা অনুযায়ী আপনাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্যও একটা ড্রয়িং, এটার উপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যাবে, এটার উপর আমল করতে হবে।
তাকদিরুল মিসাকি বা আল্লাহ যখন সকল সৃষ্টির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, 'আলাসতু বিরাব্বিকুম?' আমি কি তোমাদের প্রভু নই? আমরা সকলেই সেদিন হ্যাঁ বলেছি। আমরা বলেছি, অবশ্যই আপনি আমাদের রব। মাওলানা ইদ্রিস কান্দলভি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্বনন্দিত সিরাতে মুস্তাফায় লিখেছেন, আল্লাহ সেদিন আলাসতু বিরাব্বিকুম বলার পর সর্বপ্রথম জবাব দিয়েছিল রূহে মুহাম্মাদি, তারপর তামাম আম্বিয়ায়ে কেরামের আরওয়াহ, তারপর পৃথিবীর সকল মানুষ।
সেদিন আমরা রব স্বীকার করে এসেছি। এখন আমাদের জানতে হবে রব কে? রব হলেন তিনি, যিনি আমাদের সব প্রয়োজনের আয়োজনকারী। ওই যে ভাগ্যের একটা ড্রয়িং করা হয়েছে, এখন সেটা বাস্তবায়ন তথা আপনি কীভাবে জান্নাতে যেতে পারবেন এবং কী করতে হবে, কী কী উপকরণ লাগবে, সেদিন আল্লাহ সকলকে সেটাই জানিয়ে দিয়েছেন।
তৃতীয় প্রকার হলো, আত তাকদিরুল উমরি। সহিহ বুখারি শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, 'একটা সন্তান যখন মায়ের গর্ভে যায়, তখন সেটা একটা রক্তপিন্ড থাকে। এভাবে ৪০ দিন থাকে। এর পরের ৪০ দিন গোশতের একটা টুকরো থাকে। এভাবে তিনটি ৪০ পার হওয়ার পর রুহ আসে। এ সময় আল্লাহ ফেরেশতা পাঠান। ফেরেশতারা এই রুহের ব্যাপারে ৪টি বিষয় লিখেন, সে কত দিন বাঁচবে, কী পরিমাণ রিজিক লাভ করবে, কী আমল করবে? এরপর তারা আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করেন, 'এখন কী লিখব? সফল নাকি বিফল? সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা?' তখন আল্লাহ জানিয়ে দেন, সে সফল বা ভাগ্যবান হবে। তখন সেটাই লিখে দেওয়া হয়। এভাবে দুর্ভাগা বললে দুর্ভাগাই লিখা হবে। এটাই হলো জীবন সম্পর্কিত তাকদির।
চতুর্থ প্রকার তাকদির হলো 'আত তাকদিরুল হাওলি'। এটা বার্ষিক বাজেটের মতো। যেভাবে বার্ষিক বাজেটে আগামী একবছরের আয়ব্যয়ের রূপরেখা তৈরি করা হয়, তাকদিরে হাওলি ঠিক তেমনি তাকদির। এখানে কদর বলতে তাকদিরে হাওলি উদ্দেশ্য।
কদরের একটা অর্থ হচ্ছে ভাগ্য। সুতরাং এ পর্যায়ে আমরা সেটা নিয়েই আলোচনা করব। রুহজগতে আল্লাহ আমাদের ভাগ্য লিখে রেখেছেন, যা সংসদ বা পার্লামেন্টে আইন পাশের মতো। যেমন, সংসদের কোনো বিষয়ের আইন পাশ হলে সেটা সরাসরি বাস্তবায়িত হয় না; বরং তা বাস্তাবায়নের কার্যক্ষেত্র ধাপ ও পর্যায়ক্রম রয়েছে। ধরা যাক, সংসদের শিক্ষাবিষয়ক একটি আইন বা প্রস্তাব পাশ হলো। প্রস্তাবটি পাশ হওয়ার পর বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয়ে আসে। শিক্ষামন্ত্রণালয় আইনটি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠায়। এভাবে একপর্যায়ে কাজটি সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরক্রমে সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবটি আইন আকারে আসে।
ঠিক তেমনিভাবে রুহজগতে আল্লাহ তাআলা আমাদের ভাগ্য লিখে রেখেছেন। তবে সেটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, এটা প্রতি বছর শবে কদরে নির্ধারণ করা হয়। এটার জন্য বিভিন্ন ফেরেশতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই শবে কদরে ফেরেশতারা দলে দলে জমিনে আসেন। তখন জমিনের বাসিন্দা যারা মুত্তাকি, ইবাদতগুজার, নিষ্পাপ ফেরেশতাদের আগমনে তাদের অন্তরেও একটা প্রশান্তি অনুভূত হয়। হজরত আয়েশা রা.-এর হাদিসেও বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে।
বান্দা কখন কী করবে, তার কী প্রয়োজন বা কোথায় কোন সাহায্যের দরকার, সে ক্ষেত্রে বান্দাকে সাহায্য করার জন্য ফেরেশতারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ জন্য আমরা গুরুত্বের সঙ্গে শবে কদরের সন্ধান করব এবং বরকত লাভের চেষ্টা করব। আমরা দুআ করব, আল্লাহ যেন আমার ব্যাপারে ভালো ফায়সালা করে দেন। আর এটাই হলো 'আত তাকদিরুল হাওলি। অর্থাৎ, বান্দা আগামী এক বছর কী করবে, কীভাবে চলবে, সেটা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তাকদিরের পঞ্চম প্রকার হলো, আত তাকদিরুল ইয়াওমি। অর্থাৎ, প্রতিদিনের তাকদির বা ভাগ্য। কোন মুহূর্তে আপনি কী করবেন, কোথায় যাবেন, সেটার ব্যবস্থা করেন আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শবে কদরের ফজিলত অর্জন করা এবং তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাসী থাকার তাওফিক দিন।
📄 ঈমানের শর্ত ও প্রকারভেদ
সম্মানিত মুসল্লিয়ানে কেরাম।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে দয়া করে ঈমানের দৌলত দান করেছেন। আমরা যে জন্মসূত্রে ঈমান পেয়েছি, এটা আল্লাহর খাস দয়া। চিন্তা করে দেখুন, আপনি আপনার জন্মের পূর্বে এমন কোনো নেক কাজ করেননি যে, যে কারণে আপনাকে ঈমানদার মায়ের গর্ভে জন্ম দেওয়া উচিত ছিল! যারা অমুসলিম বাবা-মা'র ঘরে জন্মেছে, তারাও তাদের জন্মের আগে এমন কোনো গুনাহ করেনি যে, যে গুনাহর কারণে তাদের জন্ম কাফির মায়ের গর্ভে। এখন বিনা মেহনতে এবং অটোমেটিক পাওয়া ঈমানকে আমরা যদি মূল্যায়ন করতে না পারি, পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে না পারি, তাহলে আমাদের চেয়ে কপালপোড়া জাতি আর কে থাকবে!
পরিপূর্ণ ঈমানের জন্য শর্ত তিনটি : তাসদিক, তাসলিম ও তাজিম। এই তিনটি একসাথে বিদ্যমান হতে হবে। কোনো একটি না হলে ঈমান পরিপূর্ণ হয় না। খাজা আবু তালিবের মধ্যে দুটি ছিল। তাসদিক ছিল, তাজিম ছিল, শুধু তাসলিম ছিল না। নবি চেয়েছেন অন্য শর্তটা যেন তিনি মেনে নেন। নবি তার তাসলিম তথা মেনে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার মৃত্যুর সময় কানে কানে গিয়ে বলেছেন, চাচা আমার সঙ্গে একবার মাত্র বলেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে আমি আপনার ঈমানের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াব। মুহাদ্দিসগণ লিখেন, আবু তালিব কালিমা পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়েও গিয়েছিলেন; কিন্তু আবু জাহল বাঁধা দেয়। সে কারণে মৃত্যুর সময় আবু তালিবের কালিমা পড়া হয়নি। কিন্তু নবি চেষ্টা করেছেন। কারণ তার মধ্যে দুটি শর্ত বিদ্যমান ছিল।
মনে করুন, কোনো দেশে যেতে হলে আপনাকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ব্যাংক একাউন্ট করতে গেলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। ঠিক ঈমানদার হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত আবশ্যক। বিশ্বাস করা। মেনে নেওয়া। সম্মান করা। এই তিন শর্ত যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে পরিপূর্ণ ঈমানদার। তিন শর্তের কোনো একটি না পাওয়া গেলে সে নামদারী ঈমানদার। মনে রাখবেন, যেভাবে সুন্দর আলি নাম রাখলেই যেমন সুন্দর হয় না, তেমনি ঈমান আলি নাম রাখলেও ঈমানদার হওয়া যায় না।
আবু তালিবের মধ্যে দুটি শর্ত ছিল, তার আরেকটি শর্তের জন্য নবিজি চেষ্টা করেছেন কিন্তু সফল হননি। তাই আবু তালিব জান্নাতে যাবেন না। জাহান্নামই হবে তার আবাস। তবে রাসুলের প্রতি তার যে অবদান, ভালোবাসা ও ভক্তি ছিল, এ জন্য রাসুল বলেছেন, জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি পাবেন আবু তালিব। এই শাস্তি হলো তাকে আগুনের একজোড়া জুতা পরানো হবে। এই জুতার কারণে তার মাথার মগজের বলখ উঠবে। মগজ উতরাতে থাকবে। এটি হলো জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি। তাহলে জাহান্নামের সর্বোচ্চ শাস্তি কেমন হবে, এটা আমাদের চিন্তা করা দরকার। জাহান্নাম থেকে আমাদের বাঁচা প্রয়োজন।
রমজান মাস, জাহান্নাম থেকে বাঁচার মাস। সবাই বেশি বেশি এই দুআ পড়ব, আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার। হে আল্লাহ জাহান্নামের আগুন থেকে আমাকে বাঁচান।
আবু তালিব এর মধ্যে দুটি শর্ত পাওয়া যাওয়ার পরেও তিনি ঈমানদার হতে পারেননি। আমাদের চিন্তা করার প্রয়োজন, আমাদের মধ্যে কয়টি শর্ত বিদ্যমান আছে! আবু জাহলের মধ্যেও একটি শর্ত বিদ্যমান ছিল। সে মনেপ্রাণে রাসুলকে বিশ্বাস করত। তার বিশ্বাস এমন ছিল যে, রাসুল যখন তাহাজ্জুদে তিলাওয়াত করতেন, সে তখন গোপনে তিলাওয়াত শুনতে যেত।
একবার তারা নিয়ম করল, কেউ নবির তিলাওয়াত শুনতে যেতে পারবে না। আবু জাহল ভাবল, আইন করার কারণে কেউ আসবে না। তাই আমি একা চলে যাই। তার অন্যান্য সঙ্গীরা ভাবল হয়তো আর কেউ আসবে না, তাহলে আমি চলে যাই। কিন্তু সকালে দেখা গেল, আইনপ্রণেতারাই সবার আগে উপস্থিত। তারা একে অপরকে দেখে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার! নিয়ম করা হলো কেউ আসবে না, কিন্তু তুমি এলে কেন? অপরজন বলল, আমি ভাবছি অন্য কেউ আর আসবে না, তাই আমি একা তিলাওয়াত শুনতে এসেছি, কিন্তু তুমি এলে কেন? সে বলল, আমিও তো তাই ভেবেছি। দেখা গেল, সবার একই অবস্থা।
এবার তারা পরস্পর প্রশ্ন করল, এখানে তাহলে মূল কাহিনি কি? কাহিনি হচ্ছে, নবি সত্য। আর সত্য নবিকে মানলে তাকে নেতৃত্বের চেয়ার ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের আর নেতৃত্ব থাকবে না। তাই সত্য নবিকে মানা যাবে না। আবু জাহল নবিকে সত্য বলে বিশ্বাস করত।
অনুরূপ ইহুদিরাও বিশ্বাস করত নবি সত্য। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
الَّذِيْنَ اٰتَيْنُهُمُ الْكِتٰبَ يَعْرِفُوْنَهٗ كَمَا يَعْرِفُوْنَ اَبْنَآءَهُمُ الَّذِيْنَ خَسِرُوْۤا اَنْفُسَهُمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُوْنَ
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা রাসুলকে এমনভাবে জানে ও চিনে, যেরূপ তারা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের জানে ও চিনে; কিন্তু যারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে তারা ঈমান আনবে না। [সুরা [আনআম: ২০
অর্থাৎ ইহুদিরা নবিকে এমনভাবে চিনতো, যেভাবে তাদের সন্তানদের চিনতো। কিন্তু বাকি দুটি শর্ত তাদের মধ্যে ছিল না। তারা নবিজিকে মানত না এবং ভক্তিশ্রদ্ধাও করত না। এতটুকু আলোচনা থেকে আপনারা বুঝলেন, ঈমানদার কাকে বলে? যাদের মধ্যে তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে অর্থাৎ বিশ্বাস, ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং মান্য করা। এগুলোই হলো সত্যিকার ঈমানদারের আলামত।
মাশাআল্লাহ! আমাদের মধ্যে এ তিনটি শর্ত আছে। আমরা নবির কথা মান্য করি। তাঁর প্রতি আমাদের ভক্তি আছে। আমরা হয়তো আমল কম করি; কিন্তু মুহাম্মাদের প্রশ্নে আমাদের ইশক সর্বোচ্চ। আগুনে পুড়ানো কিছুকে ছাই মনে হতে পারে। কিন্তু এই ছাইকে ফুঁ দিলে নিচ থেকে আগুন বের হয়। আমরা বদ আমল করি। আমাদের আমলে কমতি আছে; কিন্তু নবিজির প্রশ্নে আমাদের ঈমানের বাতি আর বারুদ জ্বলতে থাকে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন,
রাসুলের অপমানে যদি কাঁদে না তোর মন
মুসলিম নয় মুনাফিক তুই রাসুলের দুশমন।
এক হাদিসে রাসুল পরিষ্কার বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ সত্যিকার মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তরে আমার প্রতি ভালোবাসা তার মা-বাবা, সন্তানসন্ততি এবং দুনিয়ার সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি হবে। সুতরাং, নবিজির প্রতি ভালোবাসা যদি তোমার অন্তরে না থাকে, যত বড় মুমিন হও এটা পরিপূর্ণ ঈমান নয়।
শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিয়ে নবির কথাগুলো বিশ্বাস করতে হবে। এটা হলো ঈমান। এ জন্য সত্যিকারের ইসলামিক স্কলার, যেমন আল্লামা ইবনু তাইমিয়া, আল্লামা ইবনু কাইয়িম এবং তাঁদের মতো এমন যারা আছেন তারা বলেন, ঈমান হলো তিন প্রকার। অর্থাৎ ঈমানদার তিন ধরনের। আরও একটু সহজ করে বলি।
আমাদের সিলেটের গৌরব মাওলানা মুশাহিদ বায়মপুরী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি তার লিখিত সত্যের আলো গ্রন্থে এ ব্যাপারে লিখেছেন। বায়মপুরী রাহ. সম্পর্কে আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন। তাঁর উসতাদ সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানি রাহ. তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, 'সে যদি বাংলাদেশি না হয়ে ভারতীয় হতো, তাহলে দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিসের মসনদ তিনি অলংকৃত করতো।' তাঁর সম্পর্কে তাঁর উসতাদের এমন উক্তি। আর উসতাদও কিন্তু সাধারণ কেউ নন। দীর্ঘ ১৮ বছর রাসুলের রাওজায়ে আতহারের সামনে বসে হাদিসের দারস প্রদানকারী সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রাহ.। যিনি সায়্যিদ আসআদ মাদানি রাহ.-এর পিতা। যে আসআদ মাদানি আপনাদের এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির উপাধী ছিল শায়খুল আরবে ওয়াল আজম। আরবের মানুষ তাঁর ছাত্র, আজমের মানুষও তাঁর ছাত্র। তাঁর ছাত্র ছিলেন আমাদের মুশাহিদ বায়মপুরী। বায়মপুরী লিখিত কিতাব সত্যের আলো। এই কিতাবে তিনি লিখেন, ঈমান তিন প্রকার : ১. তাকলিদি ঈমান, ২. ইসতেদলালি ঈমান, ৩. তাহকিকি ঈমান।
তাকলিদি ঈমান মানে জন্মসূত্রে ঈমানদার। যদি কেউ ঈমানদার হয় জন্মসূত্রে। তার পিতা মুসলিম ছিলেন বলে সেও মুসলিম। ইসতেদলালি, অর্থাৎ কেউ কেবল জন্মসূত্রে ঈমানদার নয় বরং ঈমানের আনুষাঙ্গিক সকল বিষয় সে জানে এবং ভালোভাবে আমল করে। আর তাহকিকি ঈমান হলো, ইসলাম সম্পর্কে জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যে প্রোপাগান্ডা হয়, এগুলোর বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে চলা।
মুশাহিদ বায়মপুরী রাহ. বলেন, কেউ যদি কেবল তাকলিদি ঈমানদার হয়, তার ঈমানকে ইসতেদলালি বা তাহকিকিতে নিয়ে না যায়, তাহলে ঈমানের উপর কোনো মুসিবত এলে সে অটল থাকতে পারবে না। বাতাস এলে মোমবাতিতে যেভাবে আগুন থাকে না, বাতি নিভে যায়, ঠিক তেমনি ফিতনার বাতাসে তাকলিদি ঈমানদারের ঈমানের বাতিও নিভে যাবে।
বর্তমানে ফিতনার জোয়ার চলছে। এ অবস্থায় তাকলিদি ঈমানে আমাদের প্রজন্মকেটিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এ জন্য এমন তাফসির মাহফিল ও ইসলাহি মজলিসের আয়োজন করা এবং ইসলামের আলোচনায় বসে ঈমানকে বোঝা জরুরি। নয়তো ঝড় এলে ঈমান নিয়েটিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি, শুধু নিজে আসলে হবে না, বাচ্চাকাচ্চাকেও সাথে করে নিয়ে আসতে হবে। নিজে জাহান্নাম থেকে বাঁচবেন আর কলিজার টুকরা সন্তানদের জাহান্নাম থেকে বাঁচাবেন না, এটা কেমন কথা! আল্লাহ বলেছেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
হে ঈমানদারগণ! নিজে জাহান্নাম থেকে বাঁচো, স্ত্রী-সন্তান-পরিজনকেও জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। [সুরা তাহরিম: ৬]
বাচ্চাদের জন্য ইংলিশ স্পিকারের ব্যবস্থা করতে পারলে তো ভালোই। সবসময় সেটা সম্ভব না হলে বাংলা বয়ানের মাহফিলেই তাদের নিয়ে আসুন। আপনি এবং আপনার স্ত্রী ঘরে বাচ্চাদের সাথে তো বাংলাতেই কথা বলেন। তারা তো ঠিকই বুঝে। আপনাদের সাথে বাংলাতে কথাও বলে। তাহলে মসজিদে এসে বাংলা বয়ান বুঝবে না কেন? আর যদি সবকথা না-ও বুঝে, তবুও নিয়ে আসুন। পাশে বসান। কুরআন-হাদিসের বয়ানের আসর আছে। বয়ানের একটা তাসির আছে। মাহফিলে নাজিল হতে থাকা রহমতের বর্ষণে সেও প্লাবিত হবে। আর তাহলে বাচ্চাদের দ্বীনের লাইনে পরিচালনা করা সহজ হবে।
তাকলিদি ঈমানের অবস্থা হলো কচুপাতার পানি। যখন ঈমান ও ইসলামের উপর কোনো বাতাস আসবে, তখন সে ফাতওয়া দিয়ে বসবে, জান বাঁচানো ফরজ। ঈমানের খবর থাকবে না। কিন্তু ইসতিদলালি ঈমানদারগণ তখন বলবে, জান বাঁচানোর আগে ঈমান বাঁচানো ফরজ। ঈমান না বাঁচলে জান বাঁচিয়ে লাভ কী? যারা ঈমান সম্পর্কে জানে, রাসুল ও সাহাবিদের সম্পর্কে জানে, জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে জানে, তারা তখন বলবে, মরতে যখন হবেই, তাহলে ঈমানের জন্যই মরবো। ফলে তারা ঈমানের উপর অটল থাকবে। এটাই ইসতিদলালি ঈমান। আল্লাহ বলেন,
قُلْ هُذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحْنَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
নবি আপনি বলে দিন, এটা আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বোঝেসুঝে দাওয়াত দেই, আমি ও আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র, আমি মুশরিকদের মধ্য হতে নই। [সুরা ইউসুফ: ১০৮]
মাওলানা মুশাহিদ বায়মপুরী এটার তুলনা করেছেন চাঁদের আলোর সঙ্গে। রাতে চাঁদের আলো দেখা যায়। আকাশে যদি মেঘ থাকে, তখন মাঝে মাঝে চাঁদকে মেঘে ঢেকে ফেলে। চাঁদকে তখন দেখা যায় না। কিন্তু যখন অন্ধকার সরে যায়, তখন ঠিকই চাঁদকে দেখা যায়। অনুরূপ ইসতিদলালি ঈমান। ফিতনা যখন আসে, তখন অন্ধকার হয়। আবার ফিতনা চলে গেলে আগের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়।
ফিতনা মূলত কলবে আসে। কলব দুই প্রকার। একটি কালো, আরেকটি হচ্ছে স্বচ্ছ। কালোটি কেবল কালো জিনিস চিনে। অনুরূপভাবে ঈমানদার দুই প্রকার। এক ধরণের ঈমানদার হলেন স্বচ্ছ ঈমানদার। আরেক ধরণের হলো স্বচ্ছ মুনাফিক। মুনাফিকরা দাজ্জালের দলে অংশগ্রহণ করবে। সত্যিকারের ঈমানদারগণ খলিফা মাহদির সঙ্গী হয়ে সারা দুনিয়ায় কালিমার পতাকা উড্ডীন করবেন। আপনাদের সন্তানদের কেবল তাকলিদি ঈমানদার হলে হবে না। কারণ এটি তো মোমবাতির মতো; বরং ইসতিদলালি ঈমান দরকার।
ইসতিদলালি ঈমান হলো চাঁদের আলোর মতো। মেঘে ঢেকে ফেলা হয়তো সাময়িক। তার মধ্যে অন্ধকার আসবে কিন্তু আবরণ সরে গেলে আবার আলোকিত হয়ে যাবে। কবি বলেন,
মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে;
হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে।
সবসময় অন্ধকার থাকে না। সূর্য উদয় হয় কোনো না কোনো সময়ে। রাত যত গভীর হয়, ভোর ততোই কাছে আসতে থাকে। আপনি যদি মসিবতে ধৈর্য্য ধরেন, আল্লাহ আপনার অন্তরে হিদায়াতের আলো জ্বালিয়ে দেবেন। এটাই হলো ইসতিদলালি ঈমান। আরেকটি হলো তাহকিকি ঈমান। এটা জানার মধ্যে কেবল সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলামের ব্যাপারে কোনো বেঈমান যদি আঙুল তুলে, তাহলে সেটি নামানোর শক্তি রাখে এবং দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারে, সেই ঈমানি জজবাও থাকে। তাহকিকি ঈমান সূর্যের আলোর মতো। সূর্যের আলো সবসময় থাকে। বৃষ্টি হলেও দুনিয়া অন্ধকার হয় না। ঠিক তেমনি তাহকিকি ঈমানের সামনে যত ফিতনাই আসুক, তাকে গ্রাস করতে পারে না। হাদিসের ভাষায়,
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُوْدًا عُوْدًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ وَالْآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًا كَالْكُوزِ مُجَنِّيًا لَا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ
হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, মানুষের হৃদয়ে চাটাইয়ের পাতা (বা ছিলকার) মতো একটির পর একটি ফিতনা প্রবেশ করবে। সুতরাং যে হৃদয়ে সে ফিতনা সঞ্চারিত হবে সে হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে যাবে এবং যে হৃদয় তার নিন্দা ও প্রতিবাদ করবে, সে হৃদয়ে একটি সাদা দাগ অঙ্কিত হবে। পরিশেষে (সকল মানুষের) হৃদয়গুলো দুই শ্রেণির হৃদয়ে পরিণত হবে। প্রথম শ্রেণির হৃদয় হবে মসৃণ পাথরের ন্যায় সাদা; এমন হৃদয় আকাশ-পৃথিবী অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত কোনো ফিতনা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর দ্বিতীয় শ্রেণির হৃদয় হবে উপুড় করা কলসির মতো ছাই রঙের; এমন হৃদয় তার সঞ্চারিত ধারণা ছাড়া কোনো ভালোকে ভালো বলে জানবে না এবং মন্দকে মন্দ মনে করবে না।
সুতরাং ঈমানের আলোচনা থেকে আপনারা নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিন এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি করে দুআ করুন, যেন সঠিক ঈমান ছাড়া আমাদের মৃত্যু না হয়।
হাদিসে জিবরিল
আপনাদের হয়তো মনে আছে, রাসুলের কাছে এক ব্যক্তি এসেছিলেন। তার গায়ে ছিল ধবধবে সাদা কাপড়। মাথায় চিকচিকে কালো চুল। সাহাবিদের মধ্যে কেউ তাকে চিনতেন না। সবাই উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সে ব্যক্তি রাসুলের কাছে এসে আদবের সাথে হাঁটুর সঙ্গে হাঁটু লাগিয়ে তাশাহ্হুদে মতো বসলেন। কিন্তু প্রশ্ন করলেন, একটু অন্যভাবে। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'হে মুহাম্মাদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলেন। হাদিসটি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুল বললেন, ইসলাম হলো পাঁচটি জিনিসের নাম:
১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাক্ষ্য দেওয়া।
২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
৩. জাকাত দেওয়া।
8. রমজানের রোজা রাখা।
৫. সামর্থ্য থাকলে হজ আদায় করা।
এই পাঁচটি জিনিসের নাম হলো ইসলাম। রাসুলের উত্তর শুনে ওই ব্যক্তি বললেন, আপনি সত্য বলেছেন। সাহাবিগণ ভাবলেন, লোকটি যখন সত্যায়িত করছে, তাতে বোঝা যায় উত্তরও তার জানা আছে। উত্তর যদি জানাই থাকে, তাহলে আবার প্রশ্ন করছে কেন? উমর রা. বলেন, আমরা তার কথায় আশ্চর্য হলাম। তিনি প্রশ্ন করেন আবার সত্যায়িতও করেন। কিন্তু আমরা কিছু বললাম না। রাসুলের উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম।
তিনি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। ঈমান কাকে বলে? রাসুল বললেন, ঈমান হলো আল্লাহকে বিশ্বাস করা, রাসুল -কে বিশ্বাস করা, তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাস করা। (সহজ কথায় ঈমানে মুফাসসাল।) আগন্তুক জবাবে বলল, আপনি সত্য বলেছেন।
আগন্তুক এবার তৃতীয় প্রশ্ন করল, হে মুহাম্মাদ! বলেন, ইহসান কাকে বলে? রাসুল বললেন, ইহসান হলো, একটি গুণের নাম। তোমার মধ্যে এমন গুণ থাকা, তোমার ভেতরে এমন অবস্থা সৃষ্টি হওয়া, যার কারণে তুমি এমন মন-মানসিকতায় ইবাদত করবে যেন আল্লাহকে দেখছো। এমন অবস্থা যদি না হয়, তাহলে অন্তত এমনভাবে ইবাদত করবে, যেন আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। এই মন নিয়ে কেউ যখন নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, ব্যবসা করে, তাহলে কেমন হবে একটু চিন্তা করুন।
আগন্তক যে তিনটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, এগুলোই হলো দ্বীনের মূল বিষয়। উমর বলেন, নবিজি পরে আমাকে বলেছিলেন, হে উমর! প্রশ্নকর্তাকে কি তুমি চেন? উমর বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তখন রাসুল বললেন, তিনি হচ্ছেন জিবরিল। মানুষের সুরতে তিনি প্রশ্ন করতে এসেছেন। কারণ অনেক প্রশ্ন তোমরা ভয় পেয়ে করো না। প্রশ্ন না করলে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা যায় না।
এক হাদিসে আল্লাহর নবি বলেন, انما شفاء العى السوال মূর্খতার চিকিৎসা হলো প্রশ্ন করা। অন্য হাদিসে নবিজি বলেন, ِّلسُّؤَالِ نِصْفُ الْعِلْمِ। জানার উদ্দেশ্যে ভালো প্রশ্ন করা জ্ঞানের অর্ধেক। আর উত্তর জানলে তার পূর্ণ জ্ঞান অর্জন হয়ে যায়। সাহাবিগণ নবিজিকে কোনো প্রশ্ন করতেন না। কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো, দ্বীনের একটি পরিপূর্ণ চিত্র সাহাবিদের সামনে পেশ করা। এ জন্য জিবরিলকে মানুষের সুরত দিয়ে রাসুলের দরবারে পাঠালেন। যেন তার প্রশ্নের জবাব দেন। এর মাধ্যমে দ্বীনের পরিপূর্ণ একটি সুরত সাহাবিদের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল।
দ্বীন হলো ইসলাম ও ঈমানের নাম। ইসলাম বাহ্যিক জিনিস। আর ঈমান হলো ভেতরের। এখন বাহির ও ভেতরকে সুন্দর করতে হলে একটি গুণের দরকার। এই গুণটি হলো ইহসান। কুরআনের ভাষায় যাকে তাজকিয়াতুন নাফস বলে। সুফিদের ভাষায় বলে তাসাওউফ। এগুলো হলো নাম। কাজ হলো, আপনার মধ্যে এমন গুণ থাকা, যার মাধ্যমে ঈমান সুন্দর হয়। সুন্দর ঈমান ও ইসলাম ছাড়া আল্লাহ কিছু গ্রহণ করেন না। আপনি সুন্দর কাপড় পড়তে পারেন, ভালো খাবার খান, আপনি ভালো ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। তাই ভাল ঈমান এবং ভাল আমল ছাড়া আল্লাহর কাছে কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য হয় না।
ইহসানের গুণে নামাজ, রোজা, হজ সুন্দর ও সঠিক হয়। এমন গুণ অর্জন করতে পারলে আর এমন সুন্দর ঈমান নিয়ে মারা যেতে পারলে সরাসরি জান্নাতী। সামনে আমরা আরও বিস্তারিত আলোচনা করব। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে ঈমান ইসলাম ও ইহসানের রঙ্গে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন, আমিন।
📄 ঈমানের শাখাসমূহ
হামদ ও সালাতের পর। আমাদের আলোচনা হচ্ছিল মুত্তাকিদের সম্পর্কে। এখানে আল্লাহ মুত্তাকিদের কিছু গুণের আলোচনা করেছেন। তাদের প্রথম গুণ হচ্ছে, الَّذِينَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ, না দেখে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে। আল্লাহকে দেখা যায় না, তবু তারা বিশ্বাস করে। কারণ, এই পৃথিবীতেও এমন অনেক জিনিস আছে, যা না দেখে বিশ্বাস করতে হয়। যেমন: ফুলের ঘ্রাণ। এটা দেখা যায় না, তবু বিশ্বাস করতে হয়। এমনিভাবে আপনার কপাল, যা আপনি কখনো দেখেননি, যে কপাল নিয়ে মানুষ গর্ব করে, এই কপাল দেখা যায় না। আয়না দিয়ে দেখলে এটাকে প্রকৃত অর্থে দেখা বলা যায় না; বরং সেটা হয় কপালের প্রতিচ্ছবি দেখা। আপনি মূল কপাল কখনো দেখতে পাবেন না। ঠিক তেমনি আল্লাহ যে একজন আছেন, এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। আল্লাহ দেখে বিশ্বাস করার বিষয় নয়, আল্লাহ অনুভব করার বিষয়। তেমনিভাবে আমরা যে আমাদের প্রাণ বা জান নিয়ে বেঁচে আছি, এই প্রাণ কোথায় আছে—হাতে, পায়ে বা মাথায়? আপনারা কখনো দেখেছেন? কেউ কি দেখেছে? না, কেউ দেখেনি, তবুও আমরা বিশ্বাস করি। প্রাণ যে আছে, এটা আমরা না দেখেই বিশ্বাস করি; কিন্তু প্রাণ ঠিক কোথায় আছে, এটা কোনো বিজ্ঞান এখনো বুঝতেও পারেনি, কখনো পারবেও না। এই যে না দেখে বিশ্বাস করা, এটা অন্ধ বিশ্বাস নয়; বরং এটা হচ্ছে মূল বিশ্বাস। আর মুত্তাকিদের প্রথম গুণ হচ্ছে না দেখে বিশ্বাস করা। ইমান সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছে আমাদের। আর ঈমান সম্পর্কে আলোচনা করলে কী হয়, এ জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। আমরা কুরআনচর্চার এই মজলিসে বসেছি। এটা লাভ না ক্ষতি সেটা জানব। যেহেতু ক্ষতির মধ্যে কেউ জড়াতে চায় না, তাই বুখারি শরিফের কিতাবুল ঈমান অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি হাদিস রয়েছে, যে হাদিসে হজরত মুআজ ইবনু জাবাল রা.-এর কথা ইমাম বুখারি রাহ. উল্লেখ করেছেন।
সাহাবি হজরত মুআজ ইবনু জাবাল তাঁর ছাত্র আসওয়াদ ইবনু হিলালকে লক্ষ করে বলেন, (اجلس بنا) ইজলিস বিনা-তুমি আমাদের কাছে বসো, (نؤمن ساعة) নু'মিনু সা-আতান-কিছু সময় বসে আমরা আমাদের ঈমানকে তাজা করব।
এখন সাহাবিদের যদি ঈমান তাজা করতে হয়, তাহলে আমরা কী করব? আমাদের ঈমান কি এতই মজবুত যে, সিমেন্ট দিয়ে শক্ত করে পাকা করা? না, বরং আমাদের ঈমানও তাজা করতে হবে। ঈমান নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মুআজ ইবনু জাবাল রা., যিনি হলেন সায়্যিদুল মুজতাহিদিন ও জলিলুল কদর সাহাবি। তাঁর যদি এই অনুভূতি হয়, তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
মুআজ ইবনু জাবাল রা. বলেন, তুমি আমাদের কাছে বসো, কিছু সময় বসে আমরা আমাদের ঈমানকে তাজা করব, এটা হচ্ছে শাব্দিক অর্থ। মূল কথা হচ্ছে, আমরা বসে কিছু সময় ঈমানের আলোচনা করে আমাদের ঈমান তাজা করব।
ঈমান কি বাড়ে, অথবা কমে
ঈমানের মূল হলো, ঈমান বাড়েও না, কমেও না। তবে পবিত্র কুরআনে শুধু বৃদ্ধির কথাই আছে, কমে যাওয়ার কোনো কথা নেই। আর এই বৃদ্ধির মর্ম হলো ঈমানের হাকিকতে কোনো বৃদ্ধি হয় না, তবে ঈমানের পাওয়ার বাড়ে। হাকিকতে ঈমান বাড়বে না; কারণ, ঈমানের জায়গা যেহেতু কলব আর মানুষের শরীরে কলব একটি, তাই বৃদ্ধি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই ঈমানের পাওয়ারই বাড়ে। আর কাইফিয়াতে ঈমান বৃদ্ধি যে মাধ্যমে হয়, হাদিসের পরিভাষায় এটাকে ইহসান বলা হয়। হাদিসে জিবরিলে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন। হাদিসে জিবরিলে তিনটি বিষয় অর্থাৎ ইসলাম, ঈমান, ইহসান। এই তিনটি যেহেতু ঈমানের আলোচনা, তাই এগুলো ভালো করে বুঝতে হবে।
এই তিনটি বিষয়ে জিবরিল ও নবিজির প্রশ্নোত্তরের পর নবিজি সাহাবিদের বললেন, তিনি হলেন জিবরিল, আতাকুম ইউআল্লিমুকুম দ্বিনাকুম, তিনি এসেছিলেন তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য। দ্বীনের এই তিনটি পয়েন্ট আপনারা স্মরণ রাখবেন। ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের আলোচনা পবিত্র কুরআনে এভাবে আছে, আল্লাজিনা ইউমিনুনা বিল গাইব-এখানে ঈমানের কথা এসেছে, ওয়া ইউকিমুনাস সালাতা-এখানে ইসলামের কথা, ওয়া মিম্মা রাজাকনা হুম ইউনফিকুন-এখানে ইহসানের কথা এসেছে।
নবিজি যেহেতু সবচেয়ে বড় মুফাসসির, তাই হাদিসে জিবরিলের তাফসির নবি নিজেই করেছেন। ইসলাম, ঈমান, ইহসান সম্পর্কে সাহাবিদের সম্যক ধারণা দিয়েছেন।
প্রথমে ঈমানের আলোচনা করেছেন এবং ঈমানের স্তর ও শাখা কয়টি, এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঈমানকে একটি গাছের সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
اَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَ فَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ
তুমি কি দেখ না কীভাবে আল্লাহ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন? উৎকৃষ্ট বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছের ন্যায় যার মূল সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত আর শাখা-প্রশাখা আকাশপানে বিস্তৃত। [সুরা ইবরাহিম : ২৪]
আমরা কালিমা তাইয়্যিবাহ পড়ি। আল্লাহ বলেন, এই কালিমা হলো একটি পবিত্র বৃক্ষের জড়। এখন যদি কোনো গাছের শুধু জড় থাকে, ডালপালা থাকে না, তাহলে এই গাছের তো মূল্য থাকবে না। অপরদিকে একটি গাছকে ফলবান বানাতে গেলে পরিচর্যা করতে হয়, চতুষ্পদ জন্তু ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হয়। তেমনিভাবে ঈমান ও ইসলামকে ফলদায়ক বানাতে হলে পরিশ্রম করতে হবে।
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেছেন, أَلَا إِنَّ سِلْعَةَ اللهِ غَلِةٌ ‘আল্লাহর কাছে ইসলাম ও ঈমানের অনেক দাম।’
এটার মূল্য পেতে হলে অনেক দরকষাকষি করে ইসলাম ও ঈমানের উপর জীবন পরিচালনা করতে হয়, তবেই জান্নাত লাভ করা যায়। এ জন্য শুধু মুখে আমি 'ইমানদার' বললে হবে না; বরং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতে হবে। আর ঈমানের জড় হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এখন আমরা যেহেতু ঈমানের জড় চিনতে পারলাম, এবার এর শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে জানব। ঈমানের ডালপালা, পাতাপল্লব ঠিক আছে কিনা, ঠিকমতো ঠিক সময়ে ফল এল কিনা, সেটা লক্ষ রাখতে হবে এবং এসবের হেফাজত করে তবেই জান্নাতে যেতে হবে। এ জন্য আমরা মৃত লাশ সামনে রেখে জানাজায় দাঁড়িয়ে দুআ পড়ি,
اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الاسْلامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ
হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাদের বাঁচিয়ে রাখবে, ইসলামের উপর রেখো, আর আমাদের মধ্যে যাদের মৃত্যু দেবে, ঈমানের উপর মৃত্যু দিয়ো।
এখানে জানা থাকা দরকার যে, জানাজায় চার তাকবির ফরজ। প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়তে হয়। জানাজার সানা হলো, سُبْحَنَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
হে আল্লাহ আমরা তোমার পবিত্রতার গুণগান করতেছি। তোমার নাম মঙ্গলময় এবং তোমার স্তুতি অতি শ্রেষ্ঠ, তুমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।
দ্বিতীয় তাকবিরের পর দুরুদে ইবরাহিমি পড়তে হয়। দুরুদে ইবরাহিমি আমরা সকলেই জানি এবং প্রত্যেক নামাজেও পড়ি, اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَا هِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَ اهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ تَجِيْد اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَا هِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর বংশধরগণের উপর এরূপ রহমত অবতীর্ণ করুন, যেরূপ রহমত হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বংশধরগণের উপর অবতীর্ণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসাভাজন এবং মহামহিম।
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর বংশধরগণের উপর তেমন অনুগ্রহ করুন, যেমন অনুগ্রহ ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বংশরগণের উপর করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসাভাজন এবং মহামহিম।
তৃতীয় তাকবিরের পর নিম্নোক্ত দুআ পড়তে হয়, أَلَّهُمَّ اغْفِرْ لِحِينَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَأَنْنَا نَا اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الأَسْلَامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإيمان
হে আল্লাহ, আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অপস্থিত বালক, বৃদ্ধ, পুরুষ ও স্ত্রী, সকলকে ক্ষমা করো। হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে যাদেরকে তুমি জীবিত রাখ, ইসলামের উপর রেখো, আর তাদেরকে মৃত্যুমুখে পতিত করো, তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দিয়ো...।
এই দুআর শেষ দিকে এসেছে, اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الاسْلامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ
আমরা অনেকে এসব দুআর অর্থ জানি না। জানার চেষ্টা করতে হবে।
এই দুআর মর্ম হচ্ছে, দুনিয়াতে কেউ যদি ইসলামের উপর অটল থাকে, তাহলে তার মৃত্যুও হবে ঈমানের উপর। এখন যারা ইসলামের ধার ধারে না, মৃত্যুর সময় ঈমানও তাদের নসিব হবে না। এ জন্য আমাদেরকে ইসলাম ও ঈমানের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে, এর উপর অটল থাকতে হবে। আমাদের চলাফেরা, উঠাবসা, লেবাস-পোশাক, আচার-ব্যবহার, খাওয়া-দাওয়া সবকিছুতে ইসলামের নিদর্শন থাকতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের যাবতীয় বিধিবিধান যথাযথ মানতে হবে। নবিজি বলেন, تحشرون كما تموتون و تموتون كما تحيون যে অবস্থায় তোমরা মারা যাবে, সেভাবেই হাশরের ময়দানে উঠানো হবে, এবং যেভাবে জীবন জীবনযাপন করবে, সেভাবেই তোমাদের মৃত্যু ঘটানো হবে।
মোটকথা, আমাদের জীবনাচরণ দেখে অন্য মানুষ যেন মনে করে, এই মানুষটা বড় ভালো, মুত্তাকি এবং আল্লাহওয়ালা। তার মধ্যে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ নেই। তবে লোকে আমাকে মুত্তাকি বলুক- এমন ধারণা নিজের অন্তরে স্থান দেওয়া যাবে না। না-হয় রিয়ার কারণে সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে।
নবিজি এভাবে দুআ করতেন, اللهم اجعلني في عيني صغيرا وفي أعين الناس كبيرا
হে আল্লাহ! আপনি আমাকে নিজের কাছে ছোট এবং অন্যের চোখে বড় হিশেবে প্রকাশ করো।
তাই সবকিছু হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য; কোনো মানুষকে দেখানো বা সন্তুষ্ট করার জন্য নয়। এখন কেউ যদি এভাবে জীবন ধারণ করতে পারে, তাহলে মৃত্যুর সময় তার দৌলতে ঈমান নসিব হবে। আর ঈমান নিয়ে যে মারা যাবে, সে সোজা জান্নাতে চলে যাবে। কেননা হাদিসে আছে, মুআজ ইবনু জাবাল রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন,
مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ রাসুল বলেছেন, 'যার সর্বশেষ বাক্য হবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সুবহানাল্লাহ। আমরা এই মোবারক মাহফিলে বসে ঈমান নিয়েই আলোচনা করব। ঈমান অত্যন্ত মূল্যবান এক সম্পদ। এসব মজলিসে যেহেতু ঈমানের আলোচনা হয়, এবং এর মাধ্যমে ঈমানের পাওয়ার বৃদ্ধি পায়, তাই এসব মজলিসে আমরা নিয়মিত বসার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
মানুষ তার সম্পদ বৃদ্ধির লোভ কখনো সামলাতে পারে না। আপনি আমি কি চাইব যে, আমার সম্পদ ১০০ হাজার ডলার আছে, আর লাগবে না? না; বরং আমরা চাইব, কীভাবে এই ১০০ হাজার ডলারকে ২০০ হাজার ডলারে উন্নীত করা যায়। ঈমানও সম্পদ, যে সম্পদের কারণে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করব। এখন এই সম্পদ যাতে নষ্ট না হয় এবং তাতে কোনো ভেজাল যেন ঢুকে না পড়ে, এটা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। এই সম্পদ কীভাবে আরো বেশি বাড়ানো যায়, সেদিকে খেয়াল দিতে হবে। ঈমান বাড়ানো মানে ঈমানের পাওয়ার বাড়ানো। ঈমান তাজা করা। ঈমান তাজা করতে হলে আমাদেরকে ঈমানের আলোচনা করতে হবে। উপর্যুক্ত আলোচনার পর আমরা বুঝতে পারলাম, ঈমানের জড় হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এই কালিমা আমরা বেশি বেশি করে পাঠ করব ইনশাআল্লাহ।
কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, এটাকে আমরা গাছের জড় মনে করি। এখন গাছের শুধু জড় থাকলে তো হবে না, ডালপালা-শাখাপ্রশাখাও থাকতে হবে। তবেই না একটি গাছ পূর্ণাঙ্গ হবে। মনে করুন, আপনি একটি গাছ রোপন করলেন। এবার গাছের জড় হলো কিন্তু ডালপালা ও শাখাপ্রশাখা নেই। তাহলে তো এই গাছ টিকবে না। এ জন্য গাছে জড় আসার পর তাতে ডালপালা ও শাখাপ্রশাখা কীভাবে গজানো যায়, সেটা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে। এখানে একটি হাদিস উল্লেখ করব। ইমাম মুসলিম রা. তাঁর সহিহ মুসলিমে সায়্যিদুল মুহাদ্দিসিন হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ঈমান নামক গাছের শাখাপ্রশাখা কয়টি এবং তা কীভাবে গঠন করা হবে? সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, নবিজি বলেন,
الْإِيمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعُ وَسِتُّونَ شُعبةٌ: فأفضلها قولُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وأدناها إماطة الأذى عن الطريق، والحياءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإيمانِ
ইমানের শাখা তিহাত্তর অথবা তেষট্টিরও কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে “আল্লাহ ব্যতিত ইলাহ নেই” এ কথা স্বীকার করা, আর এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জা ঈমানের বিশিষ্ট একটি শাখা।
হাদিসে যে بضع শব্দ এসেছে, এটা ৩ থেকে ৯ পর্যন্ত অর্থ দিয়ে থাকে। অর্থাৎ, ঈমানের শাখা ৭৩-এর অধিক। সুতরাং ঈমান নামক গাছে যদি ৭৩-এর অধিক শাখাপ্রশাখা থাকে, তাহলে তো গাছটি ডালপালা, পত্রপল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠার কথা। তবে শুধু ডালপালা ও শাখাপ্রশাখা থাকলেই হবে না, ফলও দরকার। আমরা ঈমানের এই গাছ থেকে ফলের আশা করে বসে আছি। ঈমান নামক এই গাছের ফল হলো আমল, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পর্দা রক্ষা করা, মিথ্যা না বলা, গিবত-শেকায়াত না করা, অন্যের ক্ষতিসাধন না করা এবং নিজেও ক্ষতির মুখোমুখি হবে, এমন সমূহ কাজ থেকে হেফাজতে থাকা ইত্যাদি। নবিজি বলেন, এসব শাখাপ্রশাখার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কেননা, গাছের মধ্যে যদি জড় না থাকে, তাহলে এই গাছ বাঁচবে না। এবং সর্বনিম্ন শাখার ব্যাপারে নবিজি বলেন,
وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
অর্থাৎ, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কোনো বস্তু সরিয়ে দেওয়া। এটা ঈমানের লক্ষণ। যেমন, আপনি কোথাও যাচ্ছেন। রাস্তায় একটি কষ্টদায়ক জিনিস দেখতে পেলেন। সেটা হতে পারে কলার খোসা অথবা অন্য কিছু। এই সামান্য একটা জিনিসেও অনেক সময় মানুষ হোঁচট খেয়ে পা ফসকে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আপনি যদি সেই বস্তুটি রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলে দেন, তাহলে এটা আপনার ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। কেননা, এর মাধ্যমে আপনার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন কষ্ট না পায়।
এই যে কাজটি আপনি করলেন, এটাতে আপনাকে কেউ বাধ্য করেনি, বরং মানুষের প্রতি দয়াপরবশ হয়েই আপনি এমনটা করেছেন। আর এটাই হলো আপনার ঈমানের লক্ষণ।
এভাবে কেউ যদি মানুষ ছাড়া কোনো পশুকেও কষ্ট পাওয়া থেকে রক্ষা করে, তাহলেও আল্লাহর দয়ার সাগরে তখন এমন উত্তাল শুরু হয়। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। তার জন্য জান্নাতের ফায়সালা করে দেন। সুবহানাল্লাহ।
এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে; রাসুল বলেন,
আমি যখন মিরাজে যাই, তখন এক মহিলাকে জাহান্নামে দেখতে পাই। অথচ এই মহিলা নিয়মিত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত, তার ইবাদত ইত্যাদি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সে তার পাড়াপ্রতিবেশীদের কষ্ট দিত, তাদের সঙ্গে মন্দ আচরণ করত, এ কারণে তাকে আমি জাহান্নামে দেখে এসেছি। তার এসব মন্দ কাজের কারণে তার সব নেক আমল বেকার হয়ে গেছে। প্রয়োজনের সময় কোনো কাজে আসেনি।
অপর এক হাদিসে আছে, নবিজি বলেন,
আমি আরও দুজন মহিলাকে দেখে এসেছি। তাদের একজন হচ্ছে বেশ্যা মহিলা। আর যারা বেশ্যাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকে, তারা বড় গুনাহগার। মানুষের দৃষ্টিতেও সে অপরাধী। তবে সে যদি এমন কোনো নেকির কাজ করে ফেলে, এবং সেটা আল্লাহর পছন্দনীয় হয়ে যায়, তাহলে চাইলে আল্লাহ তাকেও ক্ষমা করে দিতে পারেন।
তো এই বেশ্যা মহিলা একবার গোসল করতে একটি কূপের কাছে যায়। তখন কূপের পাড়ে একটি পিপাসার্ত কুকুর দেখতে পায়, যে পিপাসায় কাতর হয়ে ছটফট করছে। কারণ, কূপের পানি নিচে থাকায় কুকুরটি অনেক চেষ্টা করেও পান করতে পারছিল না। এমতাবস্থায় ওই বেশ্যা মহিলার মনে দয়ার উদ্রেক হয়। সে তখন তার কাছে থাকা চামড়ার মোজা দিয়ে কূপ থেকে পানি উঠিয়ে তৃষ্ণাতুর ওই কুকুরকে পান করায়। ফলে কুকুরটির পিপাসা নিবারণ হয়। তার এই কাজটি আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে যায়, ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। নবিজি বলেন, আমি ওই মহিলাকে জান্নাতে দেখে এসেছি।
অপর এক মহিলা, যে তার একটি গৃহপালিত বিড়ালকে খুঁটির সাথে বেঁধে রেখে কষ্ট দিত। খাবার পানি কিছুই দিত না। এভাবে একসময় বিড়ালটি ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আল্লাহর সৃষ্টি বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ায় আল্লাহ তার প্রতি নারাজ হন। আল্লাহর রাসুল বলেন, আমি ওই মহিলাকে জাহান্নামে দেখে এসেছি।
সুতরাং আমরা বোঝতে পারলাম, ঈমান অর্থ আমন বা নিরাপত্তা। আর এই নিরাপত্তা অর্জিত হয় জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যমে। এখন যার থেকে আল্লাহর সৃষ্টি নিরাপদ থাকে, এরকম অবস্থা যদি কারও অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে এটাই হলো তার ঈমান থাকার লক্ষণ। এর মাধ্যমে তার ঈমানের যে লক্ষণ প্রকাশ পেল, কুরআনের ভাষায় সেটাকে তাকওয়া বা তাজকিয়াতুন নাফস বলা হয়। আর হাদিসের পরিভাষায় বলা হয় ইহসান। সুফিশাস্ত্রের পরিভাষায় বলে তাসাওউফ।
আপনারা ঈমানের এই ৭৭টি শাখা সম্পর্কে জেনে নিজেই বোঝে নেবেন আপনার মধ্যে কয়টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে মুখের সাথে ঈমানের ৭টি শাখার সম্পর্ক রয়েছে। মুখ দ্বারা যদি এই ৭টি শাখা প্রকাশিত হয়, তাহলে বোঝা যাবে আপনি ঈমানদার; আর বিপরীত করলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে। কলবের সাথে ৩০টি এবং অন্যান্য অঙ্গের সাথে আরও ৪০টি শাখার সম্পর্ক রয়েছে। এই হচ্ছে মোট ৭৭টি শাখা। হাদিসে যেহেতু ৭৩-এর অধিক বলা হয়েছে, সুতরাং ঈমানের শাখা যে ৭৩-এর অধিক, এটাও প্রমাণিত হলো। আর তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।
সম্মানিত হাজিরিন!
আপনারা তিনটি জিনিস স্মরণ রাখবেন: ১. ইতিকাদ। এটা হলো জড়। ইতিকাদ ঠিক না থাকলে আমলে কাজ হবে না। ২. আমল। নির্ভেজাল ইতিকাদের সাথে সুন্নাহপদ্ধতিতে নেক আমলও লাগবে। ৩. আখলাক। ইলমে আখলাকই হলো ইলমে তাসাওউফ ও ইলমে ইহসান। এই তিনটি জিনিস যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সব মাটি। আর ইতিকাদ ঠিক করতে হলে প্রথমে ঈমানে মুজমালের কথাগুলো বিশ্বাস করতে হবে। এটা তো আমাদের সকলেরই জানা আছে। আমাদের সন্তানদেরও এটা মুখস্থ করাতে হবে। সেটা হলো,
اٰمَنْتُ بِاللهِ كَمَا هُوَ بِاَسْمَائِهِ وَصِفَاتِهِ وَقَبِلْتُ جَمِيعَ أَحْكَامِهِ وَأَرْكَانِه
আল্লাহ তায়ালার সুন্দর নাম ও তাঁর যাবতীয় গুণাবলির উপর ঈমান আনলাম এবং তাঁর যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ মেনে নিলাম।
এখানে আমানতু বিল্লাহ অর্থ আল্লাহর উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা। এই বিশ্বাস আবার তিন প্রকার এবং এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে মানুষও আবার তিন প্রকার:
১. একধরনের বিশ্বাস হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দৃঢ় বিশ্বাসের ঈমান হয়ে ইয়াকিনের রূপধারণ করে। আল্লাহ বলেন, ওবিল আখিরাতি হুম ইউকিনুন। অর্থাৎ, তার মধ্যে সন্দেহ-সংশয়হীন দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়। এরাই হলো সত্যিকার মুমিন।
২. আরেক ধরনের বিশ্বাস হচ্ছে শুধু মৌখিক বিশ্বাস। ইসলাম, নবি, রাসুল, কুরআন ইত্যাদি সবই বিশ্বাস করে, তবে সেটা শুধু মুখে। বর্তমানে আমাদের অনেক তথাকথিত শিক্ষিতসমাজ, এমনকি ইহুদি, খ্রিষ্টানরা পর্যন্ত এটা মানে। এমনকি তাদের লেখায় তারা এটা প্রমাণ করেছেন। যেমন: তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০০ জন মনীষীর জীবনীতে প্রথমে আমাদের নবিজি সম্পর্কে আলোচনা করেছে। এ ছাড়া তাদের অনেক লেখা, বক্তৃতা ও গবেষণায়ও তারা সেটা প্রমাণ দিয়ে থাকে। তারা এটা বিশ্বাস করে যে, মুহাম্মাদ সঠিক, কিন্তু মানে না। স্বীকৃতি দেয় না। এরা হলো কাফির।
৩. আরেক প্রকার হচ্ছে মুনাফিক। এরা মুখে বলে আমরা মুসলমান; কিন্তু সন্দেহ পোষণ করে। এদের ভেতরে ঈমান থাকে না। এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ
জাহান্নামের এদের অবস্থান হবে কাফিরদের চেয়েও ভয়াবহ। [সুরা নিসা: ১৪৫] অর্থাৎ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে এদের নিক্ষেপ করা হবে। কারণ, কাফিররা তো পরিষ্কারভাবেই ঈমান আনেনি; অস্বীকার করেছে। আর মুনাফিকরা মুখে ঈমানের ঘোষণা দিয়ে কিন্তু অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেনি। ফলে তারা আল্লাহ ও তাঁর নবি-এর ব্যাপারে, আল্লাহ ও নবির বিধানের ব্যাপারে মানুষকে সন্দেহে নিপতিত করেছে।
এ জন্য তারা কাফিরদের চেয়েও খতরনাক। তাই মুনাফিকদের এই অবস্থান আল্লাহর ক্রোধকে আরও তরান্বিত করে। এ জন্য মুনাফিকদের জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ, এরা না মুমিন, না কাফির; বরং মুনাফিক। এদের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর বিধান সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। ইসলাম, ঈমান ও শরিয়ত নিয়ে তারা তাদের অন্তরে ক্ষোভ লালন করে। আমাদের কারও অন্তরে যদি এমন রোগ থেকে থাকে, তাহলে এখনই তাওবা করে অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হবে। নেফাকি দূর করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক ঈমানদার হিশেবে কবুল করুন, সকলে বলি আমিন।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল, সঠিক ঈমানদার হচ্ছে সে, যার ঈমানে বা অন্তরে কোনো সন্দেহ নেই। আর যার অন্তরে সন্দেহ রয়েছে, সে হলো মুনাফিক। আর যে অস্বীকার করে, সে হলো কাফির। সামনে এই তিন প্রকারের আলোচনা আসবে। প্রথমে মুমিন বা ঈমানদারের আলোচনা, পরে কাফিরের আলোচনা এবং শেষে মুনাফিক সম্পর্কে আলোচনা। আর কুরআনের বিষয়বস্তুও এটা। তবে এটাও জানা থাকা দরকার যে, কুরআনের মূল বিষয়বস্তু হলো ছয়টা :
১. তাওহিদ ২. রিসালাত ৩. আখিরাত ৪. যারা তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতকে সঠিকভাবে বিশ্বাস করবে, তাদের পুরস্কারের আলোচনা ৫. যারা বিশ্বাস করবে না, তাদের তিরস্কারের আলোচনা ৬. কুরআন সম্পর্কিত আলোচনা।
এই ছয়টি আলোচনার বাইরে কুরআনে অন্য বিষয়ের আলোচনা নেই। এই বিষয়গুলোর আলোচনায় পুরো কুরআন ভরপুর। আপনি কুরআনের যে কোনো আয়াত নিয়ে আলোচনা করুন, তাতে তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের আলোচনা পাবেন। যারা এই তিনটি সঠিকভাবে বিশ্বাস করবে, তাদের আলোচনা মুমিন, তাদের পুরস্কারের আলোচনা জান্নাত, যারা মানবে না, তাদের আলোচনা কাফির বা মুনাফিক, তাদের তিরস্কারের আলোচনা জাহান্নাম। আর কুরআনের আলোচনা। কুরআনে এর বাইরে কোনো আলোচনা নেই। যেকোনো আলোচনা ঘুরেফিরে এই ছয়টিরই একটি।
ইসলাম সহনশীলতার ধর্ম
এখানে আরেকটি বিষয় জানা থাকা দরকার যে, কুরআনে চারজন নবির আলোচনা সবচেয়ে বেশি—হজরত আদম আলাইহিস সালাম, হজরত মুহাম্মাদ , হজরত ইসা আলাইহিস সালাম, হজরত মুসা আলাইহিস সালাম। এই চারজন নবির আলোচনা সবচেয়ে বেশি কেন, কারণ, আদম আলাইহিস সালাম আমাদের আদি পিতা। এ ছাড়া আদম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এমন অনেক আলোচনা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারি, এ জন্য তাঁর আলোচনা বেশি।
রাসুল -এর আলোচনা বেশি হওয়ার কারণ হলো, রাসুল -কে যদি আমরা না মানি, তাহলে আমরা ঈমানদারই হতে পারব না। ঈসা আলাইহিস সালামের আলোচনা বেশি থাকার কারণ হলো, ঈসা আলাইহিস সালামের উম্মত অর্থাৎ, নাসারা বা খ্রিষ্টান যারা, এরা রাসুল-এর যুগেও ছিল। কুরআনে ঈসা আলাইহিস সালামের আলোচনা বেশি করার মাধ্যমে খ্রিষ্টানদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা এবং উৎসাহ দেওয়ার জন্য ইসার আলোচনা বেশি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এটা বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল যে, তোমরা যে নবিকে বিশ্বাস করো, সেই নবির আলোচনা কুরআনেও রয়েছে। সুতরাং তোমরা কুরআন বিশ্বাস করো। আর মুসা আলাইহিস সালামের আলোচনা এ জন্য বেশি করা হয়েছে, তাঁর উম্মত ইহুদি বা আহলে কিতাব বনি ইসরাইল যারা, তারা নবিজির যুগেও ছিল। এদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের নবির আলোচনা কুরআনে বেশি করা হয়েছে।
আচ্ছা, আপনারা বলেন তো, কোনো খ্রিষ্টান বা ইহুদি কি তাদের সন্তানের নাম কখনো মুহাম্মাদ রেখেছে? না, রাখেনি। এ হিশেবে মুসলমানরা অত্যন্ত উদার। মুসলমানরা তাদের অনেক সন্তানের নাম মুসা, ঈসা রেখেছে।
সুতরাং বোঝা গেল, ইহুদি-খ্রিষ্টানরা কখনো উদার নয়, বরং আমরাই হচ্ছি উদার। তাদের নবির নামে আমরা আমাদের সন্তানের নাম রাখি। ইসলাম উদার এক ধর্ম। তাই আমাদের মধ্যে যখন উদারতা, শান্তি ইত্যাদি পরিস্ফুটিত হবে, আমাদের শরীরে যখন সত্যিকার ইসলামের লক্ষণ প্রকাশ পাবে, তখন মানুষ এমনিতেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে। ফলে ইসলামের সুশীতল বাণী ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বে শান্তির বাতাস প্রবাহিত হবে। নিজেও প্রশান্ত হবো। কেননা, ঈমান অর্থ শুধু নিজে শান্তি পাওয়া নয়; বরং নিজে নিরাপত্তা লাভ করা এবং অন্যকেও নিরাপত্তা দেওয়া। এটাই প্রকৃত ঈমান। আর এমন ঈমান অর্জন করতে হলে ঈমানের চর্চা দরকার।
আত-তাওহিদ
ইমানের সঙ্গে সম্পর্ক হলো কলবের। আমানতু বিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম। আল্লাহর উপর ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে তিনটি জিনিসের উপর ঈমান বা বিশ্বাস রাখা। অন্যকথায়, তাওহিদকে আমরা তিনভাগে বিভক্ত করতে পারি। অর্থাৎ, তাওহিদ তিন ধরনের হয়ে থাকে।
আত-তাওহিদ বিল উলুহিয়্যাহ
এক নম্বর হচ্ছে আত-তাওহিদ বিল উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ। সুরা ফাতিহার ৪ নম্বর আয়াতে এটাই বলা হয়েছে, ইয়্যাকা না'বুদু—অর্থাৎ, ইবাদত শুধু আপনার জন্যই। ইবাদতের একমাত্র যোগ্য হলেন আল্লাহ, এটার উপর বিশ্বাস করার নামই হলো তাওহিদ বিল উলুহিয়্যাত।
তাওহিদ বির রুবুবিয়্যাহ
দুই নম্বর হচ্ছে আত তাওহিদ বির রুবুবিয়্যাহ। আল্লাহই একমাত্র রব। আমার ইজ্জত-সম্মান, লাঞ্ছনা-অপমান, রিজিক, আমার প্রয়োজনের আয়োজনকারী সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা, এটা বিশ্বাস করা। এখন যদি কেউ এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, চাকরি করি বলেই তো আমার রিজিক আসে, আমার পিতা বা সন্তান আমাকে খাওয়ায়, তাহলে তার ঈমানে ভেজাল প্রবেশ করেছে। না, আমরা এভাবে বলতে পারি না; বরং আমার রিজিকদাতা হলেন আল্লাহ। আমার সব প্রয়োজনের আয়োজনকারী হলেন আল্লাহ এবং এটাই বিশ্বাস করতে হবে। এই বিশ্বাসের উপর যদি আপনি দৃঢ় থাকেন এবং এই বিশ্বাস নিয়েই মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে কবরে যখন প্রশ্ন করা হবে, মার-রাব্বুকা বা তোমার রব কে, তখন জবাব হবে রাব্বিআল্লাহ অর্থাৎ আমার রব হলেন আল্লাহ। এমন জবাব যারা দিতে পারবে, তারাই প্রকৃত সফল এবং তাদের জন্য কবর তখন জান্নাতের বাগান হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ।
এখন যদি আমরা দুনিয়াতে বলি, আমি তো ব্যবসা করেই চলি, চাকরি করি বলেই বেঁচে আছি, রাজনীতি করছি বলেই এখনো বেঁচে আছি—এমন লোকদের ব্যাপারে কবরে যখন প্রশ্ন করা হবে, তোকে কে লালন পালন করেছে, তখন জবাবে বলবে, লা আদরি—আমি জানি না। কেননা, দুনিয়ার জীবনে সে কখনো আল্লাহকে প্রভু হিশেবে মানেনি, তাই কবরজগতের প্রথম প্রশ্নেই সে আটকে যাবে। কবরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যাতে আমরা সহজে দিতে পারি, এ জন্য সব বিষয়ে একমাত্র আল্লাহকে প্রভু হিশেবে অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে হবে। এটা হলো তাওহিদ বির রুবুবিয়্যাহ বা ঈমানের দ্বিতীয় স্তর।
আত-তাওহিদ ফিল আসমায়ি ওয়াস সিফাত
তৃতীয় নম্বর হলো, আত-তাওহিদ ফিল আসমায়ি ওয়াস সিফাত। অর্থাৎ, আল্লাহর জাতি ও সিফাতি যেসব নাম আছে, এগুলোর ব্যাপারে ঈমান আনতে হবে। আর কোন কোন নাম শুধু আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য, বান্দার জন্য নয়, এগুলোর ব্যাপারে ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি।
মোটকথা, আল্লাহর উপর ঈমান আনার মর্ম হলো, একমাত্র আল্লাহর উপর বিশ্বাস করা, আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া, আমার প্রয়োজনের আয়োজনকারী হিশেবে একমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করা, আল্লাহর জাতি ও সিফাতি নামের ব্যাপারে বিশ্বাস করা, এই হলো ঈমানের মর্ম।
এরপর, ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনা। আমানতু বিল্লাহি ও মালাইকাতিহি। ফেরেশতাদের উপর ঈমানের মর্ম হলো, তারা আল্লাহর মাখলুক বা সৃষ্টি, এটা বিশ্বাস করতে হবে। ফেরেশতা বলতে কিছু নেই কারণ, তাদের দেখা যায় না, এ জন্য তাদের বিশ্বাস করা যাবে না- এটা বলা যাবে না। বরং না দেখেও তাদের বিশ্বাস করতে হবে। কারণ, ফেরেশতারা হলেন আল্লাহর বাহিনী। কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ
আল্লাহর এই বাহিনীর সংখ্যা কত, এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। এত বিপুল সংখ্যক ফেরেশতা। এ সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেন, وعن أبي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رسولُ الله : إِنِّي أَرى ما لا تَرَوْنَ، أَطَّتِ السَّمَاءُ، وحُقَّ لَهَا أَنْ تَئِطَّ، مَا فِيهَا مَوْضِعُ أَرْبَعِ أَصَابِعَ إِلَّا وَمَلَكُ وَاضِعٌ جَبْهَتَهُ ساجدا الله تعالى، والله لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا، وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا، وَمَا تَلَذَّذْتُم بِالنِّسَاءِ عَلَى الْفُرُشِ، وَلَخَرَجْتُمْ إِلَى الصُّعُدَاتِ تَجْأَرُونِ إلى الله تَعَالَى
হজরত আবু জার রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি যা দেখি তোমরা তা দেখ না। আমি যা শুনি তোমরা তা শুনো না। আকাশ তো ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে আর এই শব্দ করার সে যোগ্য। সেখানে চার আঙুল জায়গাও এমন নেই যেখানে কোনো ফেরেশতা কপাল রেখে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করছে না। আল্লাহর কসম, আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তবে অবশ্যই তোমরা কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে। বিছানায় কোনো নারীর আস্বাদ নিতে না। তোমরা অবশ্যই মাঠে-ময়দানে চলে যেতে এবং আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করতে থাকতে।
আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখ না, আমি যা শুনি, তোমরা তা শোন না। আসমানে কটকট শব্দ শুরু হয়ে গেছে। এর মানে কি? যেমন নতুন কোনো খাট বা পালংকে যদি একসঙ্গে বেশ কয়েকজন উঠেন, তাহলে যেভাবে কটকট করে একটা শব্দ হয়, তেমনিভাবে আসমানেও এরকম কটকট শব্দ শুরু হয়ে গেছে। কেন এমন শব্দ হয়? আল্লাহর রাসুল বলেন, আসমানে চার অঙ্গুলি পরিমাণ জায়গাও খালি নেই। সবখানে ফেরেশতারা সিজদায় পড়ে শুধু আহাজারি করছেন। এ জন্য আসমানে কটকট শব্দ হয়। এই যে ফেরেশতারা সিজদায় পড়ে আহাজারি করছেন, ইসতিগফার করছেন, এটা কার জন্য? এটা তাদের জন্য, যারা দুনিয়ায় বসে ইসতিগফার করে। কারণ, ফেরেশতাদের কোনো গুনাহ নেই, তারা নিষ্পাপ।
ইসতিগফারের মর্ম
এখানে ইসতিগফারের আরেকটা মর্ম জানা থাকা আবশ্যক যে, শুধু গুনাহ থাকলে ইসতিগফার করতে হয়- ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। ইসতিগফার করা দরকার মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য, অন্যের ফায়দার জন্য। যারা দুনিয়াতে ইসতিগফার করে, তাদের ইসতিগফার যেন কবুল হয়, তাই ফেরেশতারা তাদের ইসতিগফার কবুলের জন্য, আর যাদের ইসতিগফার কবুল হয়েছে, তাদের আরও মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য তারা এভাবে ইসতিগফার করেন।
নবিজি দৈনিক ১০০ বার ইসতিগফার করতেন। তাঁর গুনাহ ছিল বলে ইসতিগফার করতেন? না, নবিজি ইস্তেগফার করতেন তাঁর উম্মতের জন্য অথবা মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য। আমরা অনেকে না বুঝে অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। এটা আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে। ফেরেশতারা ইসতিগফার করতেন দুনিয়ায় যারা ইসতিগফার করে, তাদের জন্য, আর নবিজি ইসতিগফার করতেন তাঁর উম্মতের জন্য এবং নিজের মর্যাদাবৃদ্ধির জন্য। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য আমাদের জানা থাকতে হবে। এখন যদি কেউ এটা মনে করে যে, তাহলে ফেরেশতারা কী জন্য ইসতিগফার করেন? Ashakari এর উত্তর এখন আপনাদের জানা আছে।
ইসতিগফার শব্দটি আরবি গুফরুন থেকে এসেছে। অর্থ হলো, ঢেকে রাখা। আর মানুষ দুটি জিনিস ঢেকে রাখে। একটা হলো ভালো জিনিস। খাবার যদি ভালো হয়, তাহলে মানুষ সেটা উদোম না রেখে ঢেকে রাখে। আরেকটা হলো, দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য ঢেকে রাখা। যেমন: পায়খানার ট্যাংকি। এটাকে ঢেকে রাখা হয় দুর্গন্ধ যাতে না ছড়ায়, এ জন্য। উভয়টাই ঢেকে রাখা, তবে উপলক্ষ ভিন্ন।
ঠিক তেমনিভাবে আমরা যে ইসতিগফার করি, এটার উদ্দেশ্য হলো, হে আল্লাহ আমাদের গুনাহের দুর্গন্ধ ঢেকে রাখুন। আর নবি ও ফেরেশতাগণ যে ইসতিগফার করেন, এর মর্ম হলো, হে আল্লাহ, আমাদের যে আপনি ক্ষমা করে দিয়েছেন, এটাকে আরও যথাযথভাবে ঢেকে রাখুন। তাঁদের ইসতিগফারের মর্ম হলো, তাদের ইসতিগফারের সুগন্ধ সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করে রাখা।
এখন কথা হলো, ফেরেশতাদের সংখ্যা অগণন। তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। ফেরেশতাদের সংখ্যা অনেক, এটা বিশ্বাস করা। এ ছাড়া ফেরেশতারা যে নুরের তৈরি, এটা বিশ্বাস করা। সহিহ মুসলিমে হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন,
خلقت الملائكة من النور، وخلق الجان من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ফেরেশতাদের জ্যোতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে অগ্নিশিখা থেকে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই বস্তু থেকে, যা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। [অর্থাৎ মাটি থেকে]।
আল্লাহর রাসুল বলেন, ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নুর দিয়ে। ফেরেশতার সংজ্ঞা হল,
جسم نوراني يتشكل بأشكال مختلفة
অর্থাৎ, তারা নুরের তৈরি, তারা বিভিন্ন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। তারা মানুষের সামনে কখনো আপনার মতো মানুষের রূপ ধারণ করে আসবে, কখনো অন্য কোনো রূপে। বদরযুদ্ধের সময় মুসলমানদের সাহায্য করতে যেসব ফেরেশতা আগমন করেছিলেন, তাদের অনেকে এখনো জমিনের বিভিন্ন জায়গায় রয়ে গেছেন। এখনো বিভিন্ন জায়গায় তারা মানুষকে সাহায্য করেন। জিসমুন নুরানিয়্যুন ইয়াতাশাক্কালু বিআশকালিম মুখতালিফাহ। অপরদিকে জিন্নাত হলো, ধোঁয়াবিহীন খাঁটি আগুনের তৈরি। নবিজি হাদিসে বলেন, ওখুলিকাল জান্নু মীম মারিজিম মিন নার।
আর আমরা, মানে মানুষ হলাম মাটির তৈরি। এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের রেওয়ায়াত- وخُلق آدم مما وُصف لكم আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার বর্ণনা আল্লাহ দিয়েছেন- وخلق آدم من تراب অর্থাৎ, আদমকে মাটি থেকে তৈরি করা হয়েছে।
উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম ফেরেশতারা নুরের সৃষ্টি, এটা বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ। তাদের সংখ্যা অগণিত, এটাও বিশ্বাস করতে হবে। আর তাদের মধ্যে কিছু কিছু ফেরেশতাকে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এটা আল্লাহ আমাদের বিভিন্নভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন: জিবরিল আলাইহিস সালামকে ওহির দায়িত্ব, মিকাইল আলাইহিস সালামকে বৃষ্টির দায়িত্ব, ইসরাফিল আলাইহিস সালামকে শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার দায়িত্ব আর মালাকুল মাউত বা আজরাইল আলাইহিস সালামকে মানুষের জান কবজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা বিশ্বাস করতে হবে।
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে নবিজির দেওয়া শিক্ষা অনুযায়ী ঈমানের যাবতীয় হক আদায় করে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।