📄 লাইলাতুল কদর : ফজিলত ও করণীয়
রমজানের শেষ দশক আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সামনে বিশেষ বিশেষ অফার নিয়ে এসেছে। যেমন, ঈদের শেষ বাজারে দোকানদাররা অনেক পণ্য মূল দামেই বিক্রি করে ফেলে। রমজান এসেছে মানুষকে আল্লাহর ওলি বানাতে। কিন্তু আমরা কি ওলি হতে পেরেছি? রহমতের দশক গেল, মাগফিরাতের দশক গেল, আমরা কতটুকু কী অর্জন করলাম? এখন নাজাতের দশক চলছে। হে আল্লাহ, আমাদের ক্ষমা করে আপনার মাকবুল বান্দা হিশেবে গ্রহণ করে নিন। সকলে বলি আমিন।
আলোচনা চলছিল, রমজানের ফজিলত সম্পর্কে। রহমত ও মাগফিরাতের দিন শেষ। সময় সীমিত। আমাদের সামনে সুযোগ এখনো আছে। এরপরও যদি আমরা না বুঝি, তাহলে নিজেদেরই ক্ষতি করব। কারণ, বান্দার প্রতি আল্লাহর কোনো শত্রুতা নেই। বরং আল্লাহর চাওয়া হচ্ছে, বান্দাকে কীভাবে প্রিয় করা যায়। একজন সন্তানকে তার মা-বাবা যতটুকু মুহাব্বাত করে, বান্দার প্রতি আল্লাহর মুহাব্বাত এর চেয়ে ৯৯ গুণ বেশি। সুবহানাল্লাহ।
সন্তান যদি কোনো অপরাধ করে শেষে মার কাছে গিয়ে 'আম্মা' অথবা পিতার কাছে গিয়ে 'আব্বা' বলে ডাক দেয়, তখন সন্তান যত বড় অপরাধই করুক, মা-বাবা সন্তানের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে যান। আর তিনি তো আল্লাহ, আল্লাহর দয়ার কোনো শেষ নেই। বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, এরপর রহমান আল্লাহর কাছে তাওবা করে নেয়, 'আল্লাহ' বলে ডাক দেয়, তখন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। তাঁর রহমতের ভান্ডারে জোশ খেলে ওঠে। ফলে আল্লাহপাক তাকে ক্ষমা করে দেন।
লাইলাতুল কাদরের 'কদর' শব্দের একটা অর্থ হলো ভাগ্য। ভাগ্য হলো আল্লাহর ইলম। ভাগ্য কাকে বলে, এটা বুঝার আগে আমরা একটি উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন ধরা যাক, আপনি ওজনপার্ক থেকে ব্রঙ্কস যাবেন। আপনি জিপিএস (Global positioning system) চেক করে দেখলেন, সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে আধাঘণ্টা। কোথায় কোথায় জ্যাম আছে, সেটাও দেখতে পেলেন। অথচ আপনি এখনো ব্রঙ্কস পৌঁছেননি বা সেখানকার অবস্থাও স্বচক্ষে দেখেননি; কিন্তু জিপিএস আপনাকে সবকিছু জানান দিয়ে দিচ্ছে।
এই যদি হয় দুনিয়ার প্রযুক্তির ব্যবহার, তবে আল্লাহপাক তো সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী। আল্লাহর ইলমে এটা জানা আছে আপনি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন কাজ কখন কীভাবে করবেন আর কী কী করবেন। এ জন্য আমাদের কাজ হলো কাজ করে যাওয়া। জিপিএস বলেছে, আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। এখন যদি আপনি ড্রাইভ না করেন, তাহলে তো গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না। ৩০ মিনিট কেন, ৩০ বছরেও পারবেন না। এটা জিপিএসের দোষ নয়।
ঠিক তেমনিভাবে তাকদিরের ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে এবং চেষ্টা করে যেতে হবে। আল্লাহ জানেন, আমরা দুনিয়ায় কী অর্জন করব এবং কী পরিণতি লাভ করব। এটা আমরা জানি না। তবে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদেরকে ভালো ফলাফল লাভের জন্য সমূহ পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এখন কেউ যদি বলে, আমি জান্নাতি না জাহান্নামি, এটা নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। কারণ, এটা আল্লাহ জানেন। সুতরাং আল্লাহ তাঁর ইলম অনুযায়ী আমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করবেন, এখানে আমাদের কোনো হাত নেই, এবং এ জন্য কোনো আমলও করতে হবে না... এমন ভাবনা ঠিক হবে না। আল্লাহ জানেন, এটা ঠিক, তবে আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আপনি জান্নাত লাভ করতে পারেন, মুত্তাকি হতে পারেন। আপনি কীভাবে জান্নাতে যাবেন, এটার জন্য আল্লাহ অনেক পথ দেখিয়েছেন। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, অন্যান্য ইবাদত ইত্যাদি জান্নাতে যাওয়ার কাজ। আর এগুলো না করা হলো জাহান্নামের কাজ। সুতরাং আপনাকে জান্নাতে যাওয়ার কাজই করতে হবে।
এখন আপনি যদি বলেন, 'আল্লাহ ভরসা, আল্লাহ জান্নাতে দিলে জান্নাতে যাব, জাহান্নামে দিলে জাহান্নামে যাব। ভাগ্যে যেখানে আছে, সেখানেই হবে আমার আবাস।' এটা কখনো ঠিক হবে না। কারণ, এ বিষয়ে আপনি ভাগ্য বা তাকদিরের উপর বড়ই মুতমাইন; কিন্তু এমনভাবে তো কখনো বলেন না যে, 'এ মাসে কোনো কাজ করব না, ঘরে বসেই বেতন পাবো।' এখানে আপনি ঠিকই বুঝেন যে, কাজ না করলে বেতন পাবেন না। আপনি বুঝেন আপনাকে কাজ করতে হবে, এরপর বেতনের কথা ভাবতে হবে। আমরা দুনিয়ার ক্ষেত্রে ভাগ্যের ধার ধারি না, সবকিছু ফেলে কাজের পেছনে ছুটি; আর পরকালের ক্ষেত্রেই শুধু ভাগ্যের উপর ভর করে বসে থাকি। এ কেমন চরিত্র আমাদের?
📄 ইতিকাফ ও শবে কদর
রমজানের শেষ দশকে যারা ইতিকাফ করছেন, তারা আল্লাহর মেহমান। তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। আল্লাহর মেহমানদের সম্মান করতে হবে। রমজান এসেছে মানুষকে জান্নাতি বানাতে, মুত্তাকি বানাতে। রহমতের দশক শেষ, মাগফিরাতও শেষ, এখন নাজাতের দশক চলছে। এই দশকে অনেক অফার রয়েছে। এর মধ্যে বড় একটা অফার হলো ইতিকাফ। এ জন্য যারা ইতিকাফ করেন, তারা বুজুর্গ। তাদের খেদমত করা উচিত। তাদের কাছ থেকে দুআ নেওয়া উচিত। তারা আল্লাহর মেহমান।
দুনিয়ায় কেউ যদি কারও কাছে অপরাধ করে এবং দিন শেষে অপরাধী ওই বাড়িতে চলে যায়, তখন সে অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়। ঠিক তেমনিভাবে আমরা হলাম অপরাধী। আল্লাহর কাছে অপরাধ করেছি। এখন আমরা মসজিদে অর্থাৎ আল্লাহর ঘরে এসে আশ্রয় নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। ফলে বান্দা যখন আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নেয়, তখন আল্লাহর দয়ার সাগরে উত্তালতা শুরু হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।
এ জন্য রমজানের শেষ দশকে আল্লাহ তাআলা এমন সুন্দর একটি ব্যবস্থা আমাদের জন্য রেখেছেন। ইতিকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা। আমরা যারা ইতিকাফ করছি, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমলটি শেষ করব। ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ইতিকাফের জরুরি মাসাইলগুলো শিখে নেব। কোনো কোনো কাজ করলে ইতিকাফের ক্ষতি হয়, সেগুলো জানব। ইতিকাফের সময়টা যত বেশি সম্ভব আল্লাহর ইবাদতে কাটাব। নফল নামাজ আর তিলাওয়াতে ব্যয় করার চেষ্টা করব। জরুরি কথা ছাড়া বাড়তি একটি কথাও বলব না। ইতিকাফে থাকা অন্য সাথীদের সাথে গল্প-গুজবে সময় পার করব না। একই সাথে সারাদিন বা সারা রাত ঘুমিয়েও কাটাব না। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
শেষ দশকের আরেকটা বড় অফার হচ্ছে শবে কদর। শবে কদর এতই ফজিলতপূর্ণ যে, নবিজি রমজানের প্রথম দশক এবং দ্বিতীয় দশকে শবে কদরের সন্ধান করেছেন। এরপর নবিজি সাহাবিদের সামনে ঘোষণা দেন, 'আমি রমজানের প্রথম দশকে শবে কদরের সন্ধানে ইতিকাফ করেছি কিন্তু পাইনি। এরপর দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফের মাধ্যমে সন্ধান করেছি, কিন্তু পাইনি। তবে আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন যে, শবে কদর রমজানের শেষ দশকে রয়েছে।'
শবে কদর পেলে কেমন লাভ, এ সম্পর্কে রাসুল ইরশাদ করেন, أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ سِتِّينَ إِلَى سَبْعِينَ وَأَقَلُهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ
আমার উম্মতদের বয়স হলো ষাট ও সত্তরের মাঝে। তাদের খুব কম সংখ্যকই এই সীমা অতিক্রম করতে পারবে।
এই উম্মতের গড় বয়স হলো ৬০ থেকে ৭০ বছর। এর চেয়ে বেশি দিন খুব কম মানুষেই বেঁচে থাকে। এখন কেউ যদি শবে কদরের ফজিলত লাভ করে, তাহলে এক রাতেই আল্লাহ তাকে ৮৩ বছর ৪ মাস বা প্রায় ৮৪ বছর লাগাতার ইবাদত করার সাওয়াব দান করেন। সুবহানাল্লাহ। কোনো মানুষ ৬০ বছরের জীবন লাভ করে মৃত্যুবরণ করল এবং শবে কদরও লাভ করল, তাহলে দেখা যাচ্ছে, সে তার বয়সের চেয়ে বেশি সময় শুধু ইবাদতেই কাটাল। সুবহানাল্লাহ। আর এই ফজিলত শুধু উম্মাতে মুহাম্মাদিই লাভ করেছেন, অন্য কোনো উম্মতকে আল্লাহ এই ফজিলত দেননি।
শবে কদর পাওয়ার জন্য আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত শেষ দশকের রাতগুলোতে সতর্ক থাকা চাই। শেষ দশকে আপনার ইশার নামাজের জামাআত যেন না ছুটে। ফজরের জামাতও যেন মিস না হয়। যদি ইশা ও ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করতে পারেন, তাহলে এর ফল কী? এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিম শরিফের বর্ণনায় রয়েছে, নবিজি এমন ব্যক্তির ব্যাপারে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, 'সারা রাত জেগে নফল নামাজ পড়লে যে সাওয়াব, তার জন্য সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে।' সুবহানাল্লাহ। সুতরাং এমন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই শবে কদর লাভ করতে পারবে।
📄 তাকদির বা ভাগ্য
আমরা তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। ভাগ্য পাঁচ প্রকার: তাকদিরে আজলি, তাকদিরে মিসাকি, তাকদিরে উমরি, তাকদিরে হাওলি, তাকদিরে ইয়াওমি।
প্রথম প্রকার ভাগ্য হলো 'আত তাকদিরুল আজলি'। আল্লাহ তাআলা আজলের মধ্যে প্রথমে কলম তৈরি করে তাকে আদেশ দেন, 'উকতুব' বা 'লিখো'। কলম জবাব দেয়, 'কী লিখব?' তখন আল্লাহ কলমকে বললেন, 'লিখ, কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মাখলুকের ভাগ্য সম্পর্কে লিখ।' এটাকে তাকদিরে আজলি বলে হয়।
দ্বিতীয় প্রকার হলো, 'আত তাকদিরুল মিসাকি'। রুহ জগতে আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে যখন এক জায়গায় জড়ো করে একটি কথা শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, 'আলাসতু বিরাব্বিকুম?' আমি কি তোমাদের প্রভু নই?
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার। আমরা যে তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করছি, এটা মূলত একটা ড্রয়িং। যেমন, আপনি একটি বাড়ি বানাবেন। এটার জন্য ইঞ্জিয়ারের কাছে গেলে সে একটি ড্রয়িং করে দেবে। এই ড্রয়িংয়ের মাধ্যমেই বোঝা যাবে, বাড়ির কোথায় কতটুকু মাল-সামানা লাগবে। ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্যও একটা ড্রয়িং। এর মাধ্যমে আমরা কীভাবে জান্নাতে যাব, এর বিবরণ জানা যায়। তবে ইঞ্জিয়ারের কাছ থেকে ড্রয়িং করিয়ে যদি বসে থাকেন, তবে বাড়ি তৈরি হবে না। বরং তার ফর্মুলা অনুযায়ী আপনাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্যও একটা ড্রয়িং, এটার উপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যাবে, এটার উপর আমল করতে হবে।
তাকদিরুল মিসাকি বা আল্লাহ যখন সকল সৃষ্টির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, 'আলাসতু বিরাব্বিকুম?' আমি কি তোমাদের প্রভু নই? আমরা সকলেই সেদিন হ্যাঁ বলেছি। আমরা বলেছি, অবশ্যই আপনি আমাদের রব। মাওলানা ইদ্রিস কান্দলভি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্বনন্দিত সিরাতে মুস্তাফায় লিখেছেন, আল্লাহ সেদিন আলাসতু বিরাব্বিকুম বলার পর সর্বপ্রথম জবাব দিয়েছিল রূহে মুহাম্মাদি, তারপর তামাম আম্বিয়ায়ে কেরামের আরওয়াহ, তারপর পৃথিবীর সকল মানুষ।
সেদিন আমরা রব স্বীকার করে এসেছি। এখন আমাদের জানতে হবে রব কে? রব হলেন তিনি, যিনি আমাদের সব প্রয়োজনের আয়োজনকারী। ওই যে ভাগ্যের একটা ড্রয়িং করা হয়েছে, এখন সেটা বাস্তবায়ন তথা আপনি কীভাবে জান্নাতে যেতে পারবেন এবং কী করতে হবে, কী কী উপকরণ লাগবে, সেদিন আল্লাহ সকলকে সেটাই জানিয়ে দিয়েছেন।
তৃতীয় প্রকার হলো, আত তাকদিরুল উমরি। সহিহ বুখারি শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, 'একটা সন্তান যখন মায়ের গর্ভে যায়, তখন সেটা একটা রক্তপিন্ড থাকে। এভাবে ৪০ দিন থাকে। এর পরের ৪০ দিন গোশতের একটা টুকরো থাকে। এভাবে তিনটি ৪০ পার হওয়ার পর রুহ আসে। এ সময় আল্লাহ ফেরেশতা পাঠান। ফেরেশতারা এই রুহের ব্যাপারে ৪টি বিষয় লিখেন, সে কত দিন বাঁচবে, কী পরিমাণ রিজিক লাভ করবে, কী আমল করবে? এরপর তারা আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করেন, 'এখন কী লিখব? সফল নাকি বিফল? সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা?' তখন আল্লাহ জানিয়ে দেন, সে সফল বা ভাগ্যবান হবে। তখন সেটাই লিখে দেওয়া হয়। এভাবে দুর্ভাগা বললে দুর্ভাগাই লিখা হবে। এটাই হলো জীবন সম্পর্কিত তাকদির।
চতুর্থ প্রকার তাকদির হলো 'আত তাকদিরুল হাওলি'। এটা বার্ষিক বাজেটের মতো। যেভাবে বার্ষিক বাজেটে আগামী একবছরের আয়ব্যয়ের রূপরেখা তৈরি করা হয়, তাকদিরে হাওলি ঠিক তেমনি তাকদির। এখানে কদর বলতে তাকদিরে হাওলি উদ্দেশ্য।
কদরের একটা অর্থ হচ্ছে ভাগ্য। সুতরাং এ পর্যায়ে আমরা সেটা নিয়েই আলোচনা করব। রুহজগতে আল্লাহ আমাদের ভাগ্য লিখে রেখেছেন, যা সংসদ বা পার্লামেন্টে আইন পাশের মতো। যেমন, সংসদের কোনো বিষয়ের আইন পাশ হলে সেটা সরাসরি বাস্তবায়িত হয় না; বরং তা বাস্তাবায়নের কার্যক্ষেত্র ধাপ ও পর্যায়ক্রম রয়েছে। ধরা যাক, সংসদের শিক্ষাবিষয়ক একটি আইন বা প্রস্তাব পাশ হলো। প্রস্তাবটি পাশ হওয়ার পর বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয়ে আসে। শিক্ষামন্ত্রণালয় আইনটি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠায়। এভাবে একপর্যায়ে কাজটি সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরক্রমে সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবটি আইন আকারে আসে।
ঠিক তেমনিভাবে রুহজগতে আল্লাহ তাআলা আমাদের ভাগ্য লিখে রেখেছেন। তবে সেটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, এটা প্রতি বছর শবে কদরে নির্ধারণ করা হয়। এটার জন্য বিভিন্ন ফেরেশতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই শবে কদরে ফেরেশতারা দলে দলে জমিনে আসেন। তখন জমিনের বাসিন্দা যারা মুত্তাকি, ইবাদতগুজার, নিষ্পাপ ফেরেশতাদের আগমনে তাদের অন্তরেও একটা প্রশান্তি অনুভূত হয়। হজরত আয়েশা রা.-এর হাদিসেও বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে।
বান্দা কখন কী করবে, তার কী প্রয়োজন বা কোথায় কোন সাহায্যের দরকার, সে ক্ষেত্রে বান্দাকে সাহায্য করার জন্য ফেরেশতারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ জন্য আমরা গুরুত্বের সঙ্গে শবে কদরের সন্ধান করব এবং বরকত লাভের চেষ্টা করব। আমরা দুআ করব, আল্লাহ যেন আমার ব্যাপারে ভালো ফায়সালা করে দেন। আর এটাই হলো 'আত তাকদিরুল হাওলি। অর্থাৎ, বান্দা আগামী এক বছর কী করবে, কীভাবে চলবে, সেটা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তাকদিরের পঞ্চম প্রকার হলো, আত তাকদিরুল ইয়াওমি। অর্থাৎ, প্রতিদিনের তাকদির বা ভাগ্য। কোন মুহূর্তে আপনি কী করবেন, কোথায় যাবেন, সেটার ব্যবস্থা করেন আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শবে কদরের ফজিলত অর্জন করা এবং তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাসী থাকার তাওফিক দিন।
📄 ঈমানের শর্ত ও প্রকারভেদ
সম্মানিত মুসল্লিয়ানে কেরাম।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে দয়া করে ঈমানের দৌলত দান করেছেন। আমরা যে জন্মসূত্রে ঈমান পেয়েছি, এটা আল্লাহর খাস দয়া। চিন্তা করে দেখুন, আপনি আপনার জন্মের পূর্বে এমন কোনো নেক কাজ করেননি যে, যে কারণে আপনাকে ঈমানদার মায়ের গর্ভে জন্ম দেওয়া উচিত ছিল! যারা অমুসলিম বাবা-মা'র ঘরে জন্মেছে, তারাও তাদের জন্মের আগে এমন কোনো গুনাহ করেনি যে, যে গুনাহর কারণে তাদের জন্ম কাফির মায়ের গর্ভে। এখন বিনা মেহনতে এবং অটোমেটিক পাওয়া ঈমানকে আমরা যদি মূল্যায়ন করতে না পারি, পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে না পারি, তাহলে আমাদের চেয়ে কপালপোড়া জাতি আর কে থাকবে!
পরিপূর্ণ ঈমানের জন্য শর্ত তিনটি : তাসদিক, তাসলিম ও তাজিম। এই তিনটি একসাথে বিদ্যমান হতে হবে। কোনো একটি না হলে ঈমান পরিপূর্ণ হয় না। খাজা আবু তালিবের মধ্যে দুটি ছিল। তাসদিক ছিল, তাজিম ছিল, শুধু তাসলিম ছিল না। নবি চেয়েছেন অন্য শর্তটা যেন তিনি মেনে নেন। নবি তার তাসলিম তথা মেনে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার মৃত্যুর সময় কানে কানে গিয়ে বলেছেন, চাচা আমার সঙ্গে একবার মাত্র বলেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে আমি আপনার ঈমানের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াব। মুহাদ্দিসগণ লিখেন, আবু তালিব কালিমা পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়েও গিয়েছিলেন; কিন্তু আবু জাহল বাঁধা দেয়। সে কারণে মৃত্যুর সময় আবু তালিবের কালিমা পড়া হয়নি। কিন্তু নবি চেষ্টা করেছেন। কারণ তার মধ্যে দুটি শর্ত বিদ্যমান ছিল।
মনে করুন, কোনো দেশে যেতে হলে আপনাকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ব্যাংক একাউন্ট করতে গেলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। ঠিক ঈমানদার হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত আবশ্যক। বিশ্বাস করা। মেনে নেওয়া। সম্মান করা। এই তিন শর্ত যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে পরিপূর্ণ ঈমানদার। তিন শর্তের কোনো একটি না পাওয়া গেলে সে নামদারী ঈমানদার। মনে রাখবেন, যেভাবে সুন্দর আলি নাম রাখলেই যেমন সুন্দর হয় না, তেমনি ঈমান আলি নাম রাখলেও ঈমানদার হওয়া যায় না।
আবু তালিবের মধ্যে দুটি শর্ত ছিল, তার আরেকটি শর্তের জন্য নবিজি চেষ্টা করেছেন কিন্তু সফল হননি। তাই আবু তালিব জান্নাতে যাবেন না। জাহান্নামই হবে তার আবাস। তবে রাসুলের প্রতি তার যে অবদান, ভালোবাসা ও ভক্তি ছিল, এ জন্য রাসুল বলেছেন, জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি পাবেন আবু তালিব। এই শাস্তি হলো তাকে আগুনের একজোড়া জুতা পরানো হবে। এই জুতার কারণে তার মাথার মগজের বলখ উঠবে। মগজ উতরাতে থাকবে। এটি হলো জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তি। তাহলে জাহান্নামের সর্বোচ্চ শাস্তি কেমন হবে, এটা আমাদের চিন্তা করা দরকার। জাহান্নাম থেকে আমাদের বাঁচা প্রয়োজন।
রমজান মাস, জাহান্নাম থেকে বাঁচার মাস। সবাই বেশি বেশি এই দুআ পড়ব, আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার। হে আল্লাহ জাহান্নামের আগুন থেকে আমাকে বাঁচান।
আবু তালিব এর মধ্যে দুটি শর্ত পাওয়া যাওয়ার পরেও তিনি ঈমানদার হতে পারেননি। আমাদের চিন্তা করার প্রয়োজন, আমাদের মধ্যে কয়টি শর্ত বিদ্যমান আছে! আবু জাহলের মধ্যেও একটি শর্ত বিদ্যমান ছিল। সে মনেপ্রাণে রাসুলকে বিশ্বাস করত। তার বিশ্বাস এমন ছিল যে, রাসুল যখন তাহাজ্জুদে তিলাওয়াত করতেন, সে তখন গোপনে তিলাওয়াত শুনতে যেত।
একবার তারা নিয়ম করল, কেউ নবির তিলাওয়াত শুনতে যেতে পারবে না। আবু জাহল ভাবল, আইন করার কারণে কেউ আসবে না। তাই আমি একা চলে যাই। তার অন্যান্য সঙ্গীরা ভাবল হয়তো আর কেউ আসবে না, তাহলে আমি চলে যাই। কিন্তু সকালে দেখা গেল, আইনপ্রণেতারাই সবার আগে উপস্থিত। তারা একে অপরকে দেখে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার! নিয়ম করা হলো কেউ আসবে না, কিন্তু তুমি এলে কেন? অপরজন বলল, আমি ভাবছি অন্য কেউ আর আসবে না, তাই আমি একা তিলাওয়াত শুনতে এসেছি, কিন্তু তুমি এলে কেন? সে বলল, আমিও তো তাই ভেবেছি। দেখা গেল, সবার একই অবস্থা।
এবার তারা পরস্পর প্রশ্ন করল, এখানে তাহলে মূল কাহিনি কি? কাহিনি হচ্ছে, নবি সত্য। আর সত্য নবিকে মানলে তাকে নেতৃত্বের চেয়ার ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের আর নেতৃত্ব থাকবে না। তাই সত্য নবিকে মানা যাবে না। আবু জাহল নবিকে সত্য বলে বিশ্বাস করত।
অনুরূপ ইহুদিরাও বিশ্বাস করত নবি সত্য। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
الَّذِيْنَ اٰتَيْنُهُمُ الْكِتٰبَ يَعْرِفُوْنَهٗ كَمَا يَعْرِفُوْنَ اَبْنَآءَهُمُ الَّذِيْنَ خَسِرُوْۤا اَنْفُسَهُمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُوْنَ
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা রাসুলকে এমনভাবে জানে ও চিনে, যেরূপ তারা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের জানে ও চিনে; কিন্তু যারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে তারা ঈমান আনবে না। [সুরা [আনআম: ২০
অর্থাৎ ইহুদিরা নবিকে এমনভাবে চিনতো, যেভাবে তাদের সন্তানদের চিনতো। কিন্তু বাকি দুটি শর্ত তাদের মধ্যে ছিল না। তারা নবিজিকে মানত না এবং ভক্তিশ্রদ্ধাও করত না। এতটুকু আলোচনা থেকে আপনারা বুঝলেন, ঈমানদার কাকে বলে? যাদের মধ্যে তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে অর্থাৎ বিশ্বাস, ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং মান্য করা। এগুলোই হলো সত্যিকার ঈমানদারের আলামত।
মাশাআল্লাহ! আমাদের মধ্যে এ তিনটি শর্ত আছে। আমরা নবির কথা মান্য করি। তাঁর প্রতি আমাদের ভক্তি আছে। আমরা হয়তো আমল কম করি; কিন্তু মুহাম্মাদের প্রশ্নে আমাদের ইশক সর্বোচ্চ। আগুনে পুড়ানো কিছুকে ছাই মনে হতে পারে। কিন্তু এই ছাইকে ফুঁ দিলে নিচ থেকে আগুন বের হয়। আমরা বদ আমল করি। আমাদের আমলে কমতি আছে; কিন্তু নবিজির প্রশ্নে আমাদের ঈমানের বাতি আর বারুদ জ্বলতে থাকে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন,
রাসুলের অপমানে যদি কাঁদে না তোর মন
মুসলিম নয় মুনাফিক তুই রাসুলের দুশমন।
এক হাদিসে রাসুল পরিষ্কার বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ সত্যিকার মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তরে আমার প্রতি ভালোবাসা তার মা-বাবা, সন্তানসন্ততি এবং দুনিয়ার সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি হবে। সুতরাং, নবিজির প্রতি ভালোবাসা যদি তোমার অন্তরে না থাকে, যত বড় মুমিন হও এটা পরিপূর্ণ ঈমান নয়।
শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিয়ে নবির কথাগুলো বিশ্বাস করতে হবে। এটা হলো ঈমান। এ জন্য সত্যিকারের ইসলামিক স্কলার, যেমন আল্লামা ইবনু তাইমিয়া, আল্লামা ইবনু কাইয়িম এবং তাঁদের মতো এমন যারা আছেন তারা বলেন, ঈমান হলো তিন প্রকার। অর্থাৎ ঈমানদার তিন ধরনের। আরও একটু সহজ করে বলি।
আমাদের সিলেটের গৌরব মাওলানা মুশাহিদ বায়মপুরী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি তার লিখিত সত্যের আলো গ্রন্থে এ ব্যাপারে লিখেছেন। বায়মপুরী রাহ. সম্পর্কে আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন। তাঁর উসতাদ সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানি রাহ. তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, 'সে যদি বাংলাদেশি না হয়ে ভারতীয় হতো, তাহলে দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিসের মসনদ তিনি অলংকৃত করতো।' তাঁর সম্পর্কে তাঁর উসতাদের এমন উক্তি। আর উসতাদও কিন্তু সাধারণ কেউ নন। দীর্ঘ ১৮ বছর রাসুলের রাওজায়ে আতহারের সামনে বসে হাদিসের দারস প্রদানকারী সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রাহ.। যিনি সায়্যিদ আসআদ মাদানি রাহ.-এর পিতা। যে আসআদ মাদানি আপনাদের এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির উপাধী ছিল শায়খুল আরবে ওয়াল আজম। আরবের মানুষ তাঁর ছাত্র, আজমের মানুষও তাঁর ছাত্র। তাঁর ছাত্র ছিলেন আমাদের মুশাহিদ বায়মপুরী। বায়মপুরী লিখিত কিতাব সত্যের আলো। এই কিতাবে তিনি লিখেন, ঈমান তিন প্রকার : ১. তাকলিদি ঈমান, ২. ইসতেদলালি ঈমান, ৩. তাহকিকি ঈমান।
তাকলিদি ঈমান মানে জন্মসূত্রে ঈমানদার। যদি কেউ ঈমানদার হয় জন্মসূত্রে। তার পিতা মুসলিম ছিলেন বলে সেও মুসলিম। ইসতেদলালি, অর্থাৎ কেউ কেবল জন্মসূত্রে ঈমানদার নয় বরং ঈমানের আনুষাঙ্গিক সকল বিষয় সে জানে এবং ভালোভাবে আমল করে। আর তাহকিকি ঈমান হলো, ইসলাম সম্পর্কে জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যে প্রোপাগান্ডা হয়, এগুলোর বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে চলা।
মুশাহিদ বায়মপুরী রাহ. বলেন, কেউ যদি কেবল তাকলিদি ঈমানদার হয়, তার ঈমানকে ইসতেদলালি বা তাহকিকিতে নিয়ে না যায়, তাহলে ঈমানের উপর কোনো মুসিবত এলে সে অটল থাকতে পারবে না। বাতাস এলে মোমবাতিতে যেভাবে আগুন থাকে না, বাতি নিভে যায়, ঠিক তেমনি ফিতনার বাতাসে তাকলিদি ঈমানদারের ঈমানের বাতিও নিভে যাবে।
বর্তমানে ফিতনার জোয়ার চলছে। এ অবস্থায় তাকলিদি ঈমানে আমাদের প্রজন্মকেটিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এ জন্য এমন তাফসির মাহফিল ও ইসলাহি মজলিসের আয়োজন করা এবং ইসলামের আলোচনায় বসে ঈমানকে বোঝা জরুরি। নয়তো ঝড় এলে ঈমান নিয়েটিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি, শুধু নিজে আসলে হবে না, বাচ্চাকাচ্চাকেও সাথে করে নিয়ে আসতে হবে। নিজে জাহান্নাম থেকে বাঁচবেন আর কলিজার টুকরা সন্তানদের জাহান্নাম থেকে বাঁচাবেন না, এটা কেমন কথা! আল্লাহ বলেছেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
হে ঈমানদারগণ! নিজে জাহান্নাম থেকে বাঁচো, স্ত্রী-সন্তান-পরিজনকেও জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। [সুরা তাহরিম: ৬]
বাচ্চাদের জন্য ইংলিশ স্পিকারের ব্যবস্থা করতে পারলে তো ভালোই। সবসময় সেটা সম্ভব না হলে বাংলা বয়ানের মাহফিলেই তাদের নিয়ে আসুন। আপনি এবং আপনার স্ত্রী ঘরে বাচ্চাদের সাথে তো বাংলাতেই কথা বলেন। তারা তো ঠিকই বুঝে। আপনাদের সাথে বাংলাতে কথাও বলে। তাহলে মসজিদে এসে বাংলা বয়ান বুঝবে না কেন? আর যদি সবকথা না-ও বুঝে, তবুও নিয়ে আসুন। পাশে বসান। কুরআন-হাদিসের বয়ানের আসর আছে। বয়ানের একটা তাসির আছে। মাহফিলে নাজিল হতে থাকা রহমতের বর্ষণে সেও প্লাবিত হবে। আর তাহলে বাচ্চাদের দ্বীনের লাইনে পরিচালনা করা সহজ হবে।
তাকলিদি ঈমানের অবস্থা হলো কচুপাতার পানি। যখন ঈমান ও ইসলামের উপর কোনো বাতাস আসবে, তখন সে ফাতওয়া দিয়ে বসবে, জান বাঁচানো ফরজ। ঈমানের খবর থাকবে না। কিন্তু ইসতিদলালি ঈমানদারগণ তখন বলবে, জান বাঁচানোর আগে ঈমান বাঁচানো ফরজ। ঈমান না বাঁচলে জান বাঁচিয়ে লাভ কী? যারা ঈমান সম্পর্কে জানে, রাসুল ও সাহাবিদের সম্পর্কে জানে, জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে জানে, তারা তখন বলবে, মরতে যখন হবেই, তাহলে ঈমানের জন্যই মরবো। ফলে তারা ঈমানের উপর অটল থাকবে। এটাই ইসতিদলালি ঈমান। আল্লাহ বলেন,
قُلْ هُذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحْنَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
নবি আপনি বলে দিন, এটা আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বোঝেসুঝে দাওয়াত দেই, আমি ও আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র, আমি মুশরিকদের মধ্য হতে নই। [সুরা ইউসুফ: ১০৮]
মাওলানা মুশাহিদ বায়মপুরী এটার তুলনা করেছেন চাঁদের আলোর সঙ্গে। রাতে চাঁদের আলো দেখা যায়। আকাশে যদি মেঘ থাকে, তখন মাঝে মাঝে চাঁদকে মেঘে ঢেকে ফেলে। চাঁদকে তখন দেখা যায় না। কিন্তু যখন অন্ধকার সরে যায়, তখন ঠিকই চাঁদকে দেখা যায়। অনুরূপ ইসতিদলালি ঈমান। ফিতনা যখন আসে, তখন অন্ধকার হয়। আবার ফিতনা চলে গেলে আগের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়।
ফিতনা মূলত কলবে আসে। কলব দুই প্রকার। একটি কালো, আরেকটি হচ্ছে স্বচ্ছ। কালোটি কেবল কালো জিনিস চিনে। অনুরূপভাবে ঈমানদার দুই প্রকার। এক ধরণের ঈমানদার হলেন স্বচ্ছ ঈমানদার। আরেক ধরণের হলো স্বচ্ছ মুনাফিক। মুনাফিকরা দাজ্জালের দলে অংশগ্রহণ করবে। সত্যিকারের ঈমানদারগণ খলিফা মাহদির সঙ্গী হয়ে সারা দুনিয়ায় কালিমার পতাকা উড্ডীন করবেন। আপনাদের সন্তানদের কেবল তাকলিদি ঈমানদার হলে হবে না। কারণ এটি তো মোমবাতির মতো; বরং ইসতিদলালি ঈমান দরকার।
ইসতিদলালি ঈমান হলো চাঁদের আলোর মতো। মেঘে ঢেকে ফেলা হয়তো সাময়িক। তার মধ্যে অন্ধকার আসবে কিন্তু আবরণ সরে গেলে আবার আলোকিত হয়ে যাবে। কবি বলেন,
মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে;
হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে।
সবসময় অন্ধকার থাকে না। সূর্য উদয় হয় কোনো না কোনো সময়ে। রাত যত গভীর হয়, ভোর ততোই কাছে আসতে থাকে। আপনি যদি মসিবতে ধৈর্য্য ধরেন, আল্লাহ আপনার অন্তরে হিদায়াতের আলো জ্বালিয়ে দেবেন। এটাই হলো ইসতিদলালি ঈমান। আরেকটি হলো তাহকিকি ঈমান। এটা জানার মধ্যে কেবল সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলামের ব্যাপারে কোনো বেঈমান যদি আঙুল তুলে, তাহলে সেটি নামানোর শক্তি রাখে এবং দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারে, সেই ঈমানি জজবাও থাকে। তাহকিকি ঈমান সূর্যের আলোর মতো। সূর্যের আলো সবসময় থাকে। বৃষ্টি হলেও দুনিয়া অন্ধকার হয় না। ঠিক তেমনি তাহকিকি ঈমানের সামনে যত ফিতনাই আসুক, তাকে গ্রাস করতে পারে না। হাদিসের ভাষায়,
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُوْدًا عُوْدًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ وَالْآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًا كَالْكُوزِ مُجَنِّيًا لَا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ
হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, মানুষের হৃদয়ে চাটাইয়ের পাতা (বা ছিলকার) মতো একটির পর একটি ফিতনা প্রবেশ করবে। সুতরাং যে হৃদয়ে সে ফিতনা সঞ্চারিত হবে সে হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে যাবে এবং যে হৃদয় তার নিন্দা ও প্রতিবাদ করবে, সে হৃদয়ে একটি সাদা দাগ অঙ্কিত হবে। পরিশেষে (সকল মানুষের) হৃদয়গুলো দুই শ্রেণির হৃদয়ে পরিণত হবে। প্রথম শ্রেণির হৃদয় হবে মসৃণ পাথরের ন্যায় সাদা; এমন হৃদয় আকাশ-পৃথিবী অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত কোনো ফিতনা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর দ্বিতীয় শ্রেণির হৃদয় হবে উপুড় করা কলসির মতো ছাই রঙের; এমন হৃদয় তার সঞ্চারিত ধারণা ছাড়া কোনো ভালোকে ভালো বলে জানবে না এবং মন্দকে মন্দ মনে করবে না।
সুতরাং ঈমানের আলোচনা থেকে আপনারা নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিন এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি করে দুআ করুন, যেন সঠিক ঈমান ছাড়া আমাদের মৃত্যু না হয়।
হাদিসে জিবরিল
আপনাদের হয়তো মনে আছে, রাসুলের কাছে এক ব্যক্তি এসেছিলেন। তার গায়ে ছিল ধবধবে সাদা কাপড়। মাথায় চিকচিকে কালো চুল। সাহাবিদের মধ্যে কেউ তাকে চিনতেন না। সবাই উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সে ব্যক্তি রাসুলের কাছে এসে আদবের সাথে হাঁটুর সঙ্গে হাঁটু লাগিয়ে তাশাহ্হুদে মতো বসলেন। কিন্তু প্রশ্ন করলেন, একটু অন্যভাবে। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'হে মুহাম্মাদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলেন। হাদিসটি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুল বললেন, ইসলাম হলো পাঁচটি জিনিসের নাম:
১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাক্ষ্য দেওয়া।
২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
৩. জাকাত দেওয়া।
8. রমজানের রোজা রাখা।
৫. সামর্থ্য থাকলে হজ আদায় করা।
এই পাঁচটি জিনিসের নাম হলো ইসলাম। রাসুলের উত্তর শুনে ওই ব্যক্তি বললেন, আপনি সত্য বলেছেন। সাহাবিগণ ভাবলেন, লোকটি যখন সত্যায়িত করছে, তাতে বোঝা যায় উত্তরও তার জানা আছে। উত্তর যদি জানাই থাকে, তাহলে আবার প্রশ্ন করছে কেন? উমর রা. বলেন, আমরা তার কথায় আশ্চর্য হলাম। তিনি প্রশ্ন করেন আবার সত্যায়িতও করেন। কিন্তু আমরা কিছু বললাম না। রাসুলের উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম।
তিনি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। ঈমান কাকে বলে? রাসুল বললেন, ঈমান হলো আল্লাহকে বিশ্বাস করা, রাসুল -কে বিশ্বাস করা, তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাস করা। (সহজ কথায় ঈমানে মুফাসসাল।) আগন্তুক জবাবে বলল, আপনি সত্য বলেছেন।
আগন্তুক এবার তৃতীয় প্রশ্ন করল, হে মুহাম্মাদ! বলেন, ইহসান কাকে বলে? রাসুল বললেন, ইহসান হলো, একটি গুণের নাম। তোমার মধ্যে এমন গুণ থাকা, তোমার ভেতরে এমন অবস্থা সৃষ্টি হওয়া, যার কারণে তুমি এমন মন-মানসিকতায় ইবাদত করবে যেন আল্লাহকে দেখছো। এমন অবস্থা যদি না হয়, তাহলে অন্তত এমনভাবে ইবাদত করবে, যেন আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। এই মন নিয়ে কেউ যখন নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, ব্যবসা করে, তাহলে কেমন হবে একটু চিন্তা করুন।
আগন্তক যে তিনটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, এগুলোই হলো দ্বীনের মূল বিষয়। উমর বলেন, নবিজি পরে আমাকে বলেছিলেন, হে উমর! প্রশ্নকর্তাকে কি তুমি চেন? উমর বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তখন রাসুল বললেন, তিনি হচ্ছেন জিবরিল। মানুষের সুরতে তিনি প্রশ্ন করতে এসেছেন। কারণ অনেক প্রশ্ন তোমরা ভয় পেয়ে করো না। প্রশ্ন না করলে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা যায় না।
এক হাদিসে আল্লাহর নবি বলেন, انما شفاء العى السوال মূর্খতার চিকিৎসা হলো প্রশ্ন করা। অন্য হাদিসে নবিজি বলেন, ِّلسُّؤَالِ نِصْفُ الْعِلْمِ। জানার উদ্দেশ্যে ভালো প্রশ্ন করা জ্ঞানের অর্ধেক। আর উত্তর জানলে তার পূর্ণ জ্ঞান অর্জন হয়ে যায়। সাহাবিগণ নবিজিকে কোনো প্রশ্ন করতেন না। কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো, দ্বীনের একটি পরিপূর্ণ চিত্র সাহাবিদের সামনে পেশ করা। এ জন্য জিবরিলকে মানুষের সুরত দিয়ে রাসুলের দরবারে পাঠালেন। যেন তার প্রশ্নের জবাব দেন। এর মাধ্যমে দ্বীনের পরিপূর্ণ একটি সুরত সাহাবিদের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল।
দ্বীন হলো ইসলাম ও ঈমানের নাম। ইসলাম বাহ্যিক জিনিস। আর ঈমান হলো ভেতরের। এখন বাহির ও ভেতরকে সুন্দর করতে হলে একটি গুণের দরকার। এই গুণটি হলো ইহসান। কুরআনের ভাষায় যাকে তাজকিয়াতুন নাফস বলে। সুফিদের ভাষায় বলে তাসাওউফ। এগুলো হলো নাম। কাজ হলো, আপনার মধ্যে এমন গুণ থাকা, যার মাধ্যমে ঈমান সুন্দর হয়। সুন্দর ঈমান ও ইসলাম ছাড়া আল্লাহ কিছু গ্রহণ করেন না। আপনি সুন্দর কাপড় পড়তে পারেন, ভালো খাবার খান, আপনি ভালো ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। তাই ভাল ঈমান এবং ভাল আমল ছাড়া আল্লাহর কাছে কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য হয় না।
ইহসানের গুণে নামাজ, রোজা, হজ সুন্দর ও সঠিক হয়। এমন গুণ অর্জন করতে পারলে আর এমন সুন্দর ঈমান নিয়ে মারা যেতে পারলে সরাসরি জান্নাতী। সামনে আমরা আরও বিস্তারিত আলোচনা করব। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে ঈমান ইসলাম ও ইহসানের রঙ্গে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন, আমিন।