📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 ঈমান বিল গাইব

📄 ঈমান বিল গাইব


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পরিষ্কার ঘোষণা করেন, এই কুরআন হলো মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। হিদায়ত পেতে হলে যে মুত্তাকি হতে হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের কিছু গুণের আলোচনা করেছেন। প্রাইমারি ক্লাসের মুত্তাকি হলো তারা, যারা ঈমানদার। আর ঈমানদার কারা? ঈমানদার হলো তারা, যারা নিজেদেরকে কুফর থেকে রক্ষা করে। কুফর থেকে নিজেকে রক্ষা করলেই সে ঈমানদার হয়ে গেল। যা মুত্তাকির প্রথম নাম্বার গুণ। মুত্তাকিদের প্রথম গুণ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে। [সুরা বাকারা: ৩] আমরা আল্লাহকে দেখিনি, জান্নাত জাহান্নাম দেখিনি, হুর গিলমান দেখিনি; কিন্তু বিশ্বাস করেছি, এটাই অদৃশ্যের বিশ্বাস। আহলে কিতাব ইহুদি-নাসারারা না দেখে ঈমান আনেনি। এরা দেখে ঈমান আনতে চায়। যেমন মুসা আ.-এর উম্মতের ব্যাপারে কুরআনে এসেছে, তারা মুসা আ.-কে লক্ষ্য করে বলল,

لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً আমরা আপনার উপর ঈমান আনব না, যতক্ষণ-না আল্লাহকে সরাসরি দেখব। অথচ আমরা আল্লাহকে না দেখেই বিশ্বাস করেছি। নবিজি বলেছেন আল্লাহ আছেন, ব্যাস, আমরা আর অবিশ্বাস করি না। মেনে নিই। এ জন্য মুসা নবির উম্মতের উপর আমাদের মর্যাদা।

হজরত ইসা আলাইহিস সালামের উম্মত খ্রিষ্টানদের কী অবস্থা? এদের কথাও কুরআনে আছে। এরা বলে,

أُنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ

ইসা নবি তাদেরকে বলেছিলেন, জান্নাতে গেলে মজার মজার খাবার খেতে পারবে। তারা তখন বলল, 'শুধু বললেই হবে না, আগে দেখান।' দেখুন, এরা কেমন মানুষ ছিল! অথচ আমরা নবির কথা অকপটে বিশ্বাস করে থাকি। উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা এ কারণেই বেশি হয়েছে। কারণ, এরা না দেখে বিশ্বাস করে। আর এই গুণটাই হলো মুত্তাকির প্রথম নম্বর গুণ।

এখন আমাদের জানা দরকার ঈমান জিনিসটা কী? এই যে আমরা না দেখেই ঈমান আনি, জানা দরকার এই ঈমান জিনিসটা আসলে কী? ঈমান শব্দের ৩টা অর্থ। ১. বিশ্বাস করা। ২. ভরসা করা। ৩. মেনে নেওয়া বা আত্মসমর্পণ করা।

ঈমান শব্দের পর যদি 'ا' আসে, তখন অর্থ হবে ভরসা করা। ঈমান শব্দের পর যদি 'উ' অক্ষর আসে, তখন অর্থ হবে আত্মসমর্পণ করা। আর ঈমান শব্দের পরে যদি 'ب' অক্ষর আসে, তখন অর্থ হবে বিশ্বাস করা। যেমন, الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ এখানে 'ب' অক্ষর এসেছে। এর অর্থ বিশ্বাস করা। ঈমানদার হলো তারা, যারা গাইবের উপর বিশ্বাস রাখে তথা না দেখে বিশ্বাস করে।

সুতরাং ঈমানের আভিধানিক অর্থ হলো, বিশ্বাস করা, ভরসা করা, আত্মসমর্পণ করা। আমরা আল্লাহর উপর ঈমান আনি, মানে তাঁকে বিশ্বাস করি, তাঁর উপর ভরসা করি, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করি। আভিধানিক অর্থের সাথে মূল ঈমানেরও সংযোগ রয়েছে। আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি বলে আমরা ঈমানদার। আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করি বলে আমরা ঈমানদার। আমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি বলে আমরা ঈমানদার।

এ জন্য আল্লাহ তাআলা ঈমানদারের গুণ বর্ণনা করতে যেয়ে আরেক জায়গায় বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمُ ايْتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

মুমিন তো তারাই, যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের উপর আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। [সুরা আনফাল: ২]

অর্থাৎ, সত্যিকার মুমিন হলো তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে। ঈমানদার যখন কুরআনের আয়াত শুনে, তখন তার ঈমানের পাওয়ার বেড়ে যায়। কুরআন শুনতে তার ভালো লাগে। যদি কুরআন শুনতে ভালো না লাগে, বরং গানবাজনা শুনতে মজা লাগে; বুঝতে হবে ঈমান জিন্দা নয়, মুর্দা হয়ে গেছে।

আমরা নিজের ঈমান নিজেই পরিমাপ করে নিতে পারব। ওয়াজ নসিহত শুনতে, কুরআন তিলাওয়াত শুনতে যদি ভালো লাগে, কুরআন বলে এটা সত্যিকার ঈমানের লক্ষণ।

মুমিনের আরেক গুণ হলো, وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ অর্থাৎ, তারা তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে। ভরসার অর্থ কী? ভরসার অর্থ এটা নয় যে, 'আল্লাহ ভরসা' বলে বসে থাকলাম আর আপনা-আপনি খাবার ঘরে চলে আসবে। ভরসা এটার নাম নয়; বরং ভরসা হলো, কোনো জিনিসের বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করে তবেই আল্লাহর ইচ্ছার অপেক্ষায় থাকা। আপনার খানার যে প্রয়োজন আছে, সে প্রয়োজনের আয়োজন করলেন, এরপর আল্লাহর উপর ভরসা করলেন যে, খাবার তো আয়োজন করলাম, সেটা খেতে পারব কি-না- আমি জানি না। আল্লাহ খাওয়ার তৌফিক না দিলে খাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। সুতরাং খাওয়ার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করলাম।

ইফতার রেডি করে আল্লাহর উপর ভরসা করা। রেডি না করেই ভরসা করে বসে থাকার নাম তাওয়াক্কুল নয়। ভরসা হলো ইফতার তৈরি করা, সাহরি তৈরি করা। ইফতার তৈরির জন্য সময় ব্যয় করা, এটাও ইবাদত। সাহরির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা, এটাও ইবাদত। সাহরি খাওয়া নেকি, সাহরির প্রস্তুতি গ্রহণ করাও নেকি। এরকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেই তবে আল্লাহ ভরসা।

আবার একথাও ঠিক নয় যে, কিছু তৈরি করে বললেন, আজকে সাহরি খাবই খাব। এটা করা যাবে না। বরং ভরসা করতে হবে আল্লাহর উপর। কারণ, আল্লাহ ইচ্ছা না করলে খাওয়া সম্ভব নয়। হতে পারে, খাওয়ার আগেই আপনার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যাবে। আপনি বাহ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর আল্লাহর উপর ভরসা করলেন, এটাই হলো ঈমান। এই পর্যায়ের ঈমানের আরেক নাম তাওয়াক্কুল।

وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ অর্থাৎ, মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে। সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহ ভরসা। নামাজ পড়ে গর্ব করে না; বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে এটা বলা যে, হে আল্লাহ, আমার নামাজটা কবুল করে নিও। কোনো ধরনের সাদকা-খায়রাত করে গর্ব করে না, আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং বলে যে, হে আল্লাহ! আমাকে তো তুমিই তাওফিক দিয়েছ। এটাই তাওয়াক্কুল। এটা মুমিনের গুণ।

যখন সে নেকির কোনো স্লোগান শুনে, সে নেকির মধ্যে অংশগ্রহণ করে। এটা হলো সত্যিকার মুমিনের গুণ। এক মুমিন আরেক মুমিনের প্রতি দরদী হয়, এটা মুমিনের গুণ। রমজান মাস দরদ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আসে। গরিবও রোজা রাখে, ধনীও রোজা রাখে। গরিব রোজা রাখে কেন? তার ঘরে ভাত নেই, এ জন্য? তাহলে ধনী রোজা রাখে কেন? তার ঘরে তো খাবার আছে! বরং ধনীদের রোজা হলো, গরিবের না খাওয়ার যে কষ্ট, সেটা অনুধাবন করার জন্য। একজন খানা পায় না, ভূখা; খানা চেয়েছে আপনার কাছে। আপনি দিচ্ছেন না! কেন দিচ্ছেন না? আপনারও তো না খেলে কষ্ট হয়!

একদল মানুষ আছে, যাদের রোজা রাখলে কষ্ট হয়! রোজায় নাকি ধরে ফেলে! তখন যা মন চায় তাই করে। আসলে কি রোজায় ধরে? রোজা রাখলে তো আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হওয়ার কথা। কাউকে কষ্ট না দেওয়ার কথা। এই রকম প্রশিক্ষণের নামই হলো রোজা। একজন লোক না খেয়ে যে কষ্ট করছে, এ কথা শুনে তার খানার ব্যবস্থা করে দেওয়া; এটাই হলো রোজার শিক্ষা।

যাই হোক, ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ তো বুঝা হলো। আরেকটা অর্থ আছে। ঈমান শব্দের মূল অর্থ হলো নিরাপত্তা। আরবি 'আমন' শব্দ থেকে এর উৎপত্তি।

মুমিনকে মুমিন এ জন্য বলা হয়, কারণ মুমিন কুফর থেকে নিজেকে নিরাপদ রেখেছে। হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করবেন। এই হলো মুমিন। আমরা যে মুমিন, এর মর্ম হলো আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ রাখলাম কুফর থেকে, আল্লাহ পাক আমাদেরকে হাশরের ময়দানে জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দান করে জান্নাতের অধিকারী করবেন। আর তারাই হবে প্রকৃত সফলকাম। আল্লাহ বলেন, فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ

এই হলো মুমিন। যাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তারাই কামিয়াব।

আল্লাহ মুমিন, বান্দা মুমিন

জানা থাকা দরকার, আল্লাহর একটি গুণবাচক নামও মুমিন। এবার আল্লাহও মুমিন, বান্দাও মুমিন। উভয়টির মধ্যে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য জানা জরুরি। আল্লাহর সম্পর্কে ধারণা হতে হবে। আল্লাহর আসল নাম কোনটি? গুণবাচক নাম কোনটি? কোন কোন গুণবাচক নাম বান্দার জন্যও হতে পারে? আর কোন কোন গুণবাচক নাম বান্দার জন্য ব্যবহার করা হারাম, এসব জানতে হবে।

আল্লাহর জাতি বা আসল নাম আল্লাহ। আল্লাহ বললে জিহ্বা উপরের দিকে উঠে। আল্লাহর মর্যাদা সকলের উপরে। এই আল্লাহ শব্দের উচ্চারণে 'খাড়া যবর' আছে। মনে করুন, আপনি যদি ব্যাংকে ৩ হাজার ডলার তুলতে যান, তখন ৩ হাজার লিখে 'মাত্র' লিখতে হয়। মাত্র না লিখলে আরও সংযোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য বাংলায় 'মাত্র', ইংরেজিতে 'Only' লিখতে হয়। এই শব্দ না লিখলে ৩ হাজারের সাথে আরও সংযোগ করার আশঙ্কা থেকে যায়। ঠিক তেমনি আল্লাহ শব্দের মাঝে খাড়া যবর দিয়ে বুঝানো হলো, আল্লাহ এক; আর কেউ তার শরিক নেই। আল্লাহ নামের সাথেও কেউ শরিক নেই। কেউ কি শুনেছেন, দুনিয়াতে কেউ কারও নাম 'আল্লাহ' রেখেছে? যত নষ্টই হোক না কেন, কেউ আল্লাহ নাম রাখে না। এটা একমাত্র আল্লাহর জন্য।

নাম রাখায় সতর্কতা

আল্লাহর অনেক গুণবাচক নাম আছে। এর মধ্যে একটা হলো 'আল মুমিন'। তবে আল্লাহর গুণবাচক এমন কিছু নাম আছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই, বান্দার জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন 'রাহমান' আল্লাহর একটা নাম আছে। এটা একমাত্র আল্লাহর জন্য। কারও নাম 'আব্দুর রাহমান' হলে তাকে আব্দুর রাহমানই ডাকতে হবে। শুধু 'রাহমান' ডাকা ঠিক হবে না।

ঠিক তেমনি আল্লাহর আরেকটি গুণবাচক নাম 'আল আহাদ'। এখন কারও নাম যদি 'আব্দুল আহাদ' হয়, তবে 'আব্দুল আহাদ'ই ডাকতে হবে। 'আহাদ' ডাকলে হবে না। আল্লাহর আরেকটা নাম আছে 'আস সামাদ'। কারও নাম যদি 'আব্দুস সামাদ' হয়, তবে 'আব্দুস সামাদ'ই ডাকতে হবে। শুধু 'সামাদ' ডাকলে হবে না। এরকম ডাকলে ভুল হবে।

আমাদের অনেক ভাই তার সন্তানের নাম রাখেন রাব্বি! রাব্বি মানে হলো আমার রব। আপনাদের জানামতে রব কে? আপনার আমার রব হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। এখন আপনি আপনার সন্তানের নাম রেখে ফেললেন রাব্বি। প্রতিদিন তাকে ২০বার নাম ধরে ডাক দেন। তাহলে আপনি তাকে কী বলে ডাকছেন? আপনি বলছেন, ও রাব্বি! মানে ও আমার রব! সে কি আপনার রব? মডার্ন হতে হতে আমরা কোথায় চলে যাচ্ছি, খেয়াল আছে?

কেউ কেউ অবশ্য ছেলের নাম রাখেন ফজলে রাব্বি। ফজলে রাব্বি নাম রাখা যায়। ফজলে রাব্বি মানে আমার রবের ফজল বা আল্লাহর দয়া। তবে এভাবে নাম রাখলে তাকে ফুল নাম ধরে ডাক দিতে হবে। ফজলে রাব্বি ডাকতে হবে, খালি রাব্বি নয়।

আর আল্লাহর কিছু গুণবাচক নাম এমন আছে, যা আল্লাহর জন্যও গুণবাচক নাম, বান্দার জন্যও গুণবাচক নাম হতে পারে। যেমন, 'রাহিম' বা দয়ালু। আল্লাহ যেমন দয়ালু, মানুষও দয়ালু হতে পারে। পবিত্র কুরআনে নবিজিকে 'রাহিম' বলা হয়েছে। 'রাউফুর রাহিম'। এখানে নবিজির দুটি গুণবাচক নাম 'রাহিম' ও 'রাউফ' বলা হয়েছে, যা আল্লাহর জন্যও ব্যবহৃত হয়, বান্দার জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই রকমেরই একটা গুণবাচক নাম হলো 'আল মুমিন'। এটা আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারে। তবে আল্লাহ ও বান্দার ক্ষেত্রে মুমিন শব্দ ব্যবহারের ভিন্ন ভিন্ন ব্যখ্যা রয়েছে।

এটা বুঝার জন্য আরবি ব্যাকরণের জ্ঞান থাকা জরুরি। যেমন, 'ঈমান' শব্দটা 'বাবে ইফআল'-এর মাসদার। আর বাবে ইফআলের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে মুমিন শব্দের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুফাসসিরিনে কেরাম। আল ঈমান শব্দের অর্থ হলো, নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু এটি বাবে ইফআলের মাসদার হওয়ার কারণে তার দুটি অর্থ হতে পারে। বাবে ইফআলের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো, 'বুলুগে মাখাজ' বা গ্রহণ করা, এবং 'ইতায়ে মাখাজ' বা দান করা।

এখন আমরা যে মুমিন, এর অর্থ হলো, নিরাপত্তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহর দেওয়া নিরাপত্তা গ্রহণ করার মানে কী? মানে হলো আল্লাহর নাফরমানি না করা। তখন আল্লাহ নিরাপত্তা দান করবেন। যদি কেউ নাফরমান অবস্থায় মারা যায়, তবে আল্লাহ তাকে নিরাপত্তা দান করবেন না। আমরা যে মুমিন, সেটা বুলুগে মাখাজ থেকে। অর্থাৎ নিরাপত্তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহর উপর ঈমান আনার কারণে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়ে জান্নাত দান করবেন।

আর আল্লাহ যে মুমিন, তার অর্থ হলো নিরাপত্তা দান করা। 'ইতায়ে মাখাজ' অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করলেন, আর আমরা তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহ যদি নিরাপত্তা দান না করেন, তবে আমরা নিরাপদ হতে পারব না। এই মর্মে আল্লাহ হলেন মুমিন। এই হলো, আল ঈমান শব্দের দুটি অর্থ।

আল্লাহর আরও কিছু গুণবাচক নাম আছে, যেগুলোর বিপরীতটাও আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হয়। যেমন, আল্লাহর গুণবাচক নাম আছে, 'আল মুয়িজু' বা সম্মানদাতা। তার বিপরীত 'আল মুজিল্লু' বা অপদস্থকারী। আরেকটি নাম হলো, 'রাফে', তার বিপরীত হলো ‘খাফিজ’। এভাবে বিপরীতার্থক অনেকগুলো গুণবাচক নাম আল্লাহর জন্য রয়েছে।

আরও কিছু কিছু গুণবাচক নাম এমন আছে, যেগুলোর বিপরীত নাম আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হয় না। যেমন আল্লাহর নাম ‘আল আলিম’ বা সর্বজ্ঞ। তার বিপরীত হচ্ছে ‘জাহিল’। এটা আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হয় না।

আবার কিছু কিছু গুণবাচক নাম আছে আল্লাহর জন্যও ব্যবহার হয়, বান্দার জন্য ব্যাবহার হয়। তবে এটা আল্লাহর জন্য প্রশংসনীয় হলেও বান্দার ক্ষেত্রে নিন্দনীয়। যেমন, আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আল মুতাকাব্বির বা অহংকারী’। এটা আল্লাহর জন্য প্রশংসনীয় হলেও বান্দার জন্য নিন্দনীয়। আল্লাহর আরেক নাম ‘জাব্বার’। এটা আল্লাহর সাথে ব্যবহৃত হলে প্রশংসনীয়, কিন্তু বান্দার ক্ষেত্রে নিন্দনীয়।

এতক্ষণ আল্লাহর জাত ও সিফাতের বর্ণনা এ জন্য দেওয়া হয়েছে যে, এগুলো ঈমানের বিস্তারিত বিবরণে আসবে। এসব আলোচনা স্মরণ রাখলে ঈমানের বিস্তারিত আলোচনা বুঝা সহজ হবে। যদি ঈমান কোন জিনিস, সেটা বুঝে না আসে, যদি জানতে না পারি ঈমান কোন জিনিসে যায় আসে, তবে এই ঈমান নিয়ে হাশরের মাঠে নাজাত পাওয়া যাবে না। এ জন্য ঈমান কোনটা, কীভাবে নষ্ট হয়; এসব জানা জরুরি। এসব জেনে সত্যিকার ঈমানের দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

না দেখে বিশ্বাস

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ যারা ঈমান আনে গাইবের উপর। গাইব অর্থ, যা দেখা যায় না, যা আমাদের পঞ্চইন্দ্রীয় দ্বারা অনুভূত হয় না। এসব আমরা না দেখে বিশ্বাস করেছি। আল্লাহ, জান্নাত জাহান্নাম না দেখে এরকম বিষয়াদি নবির কথায় বিশ্বাস করে মেনে নেওয়ার নাম ঈমান।

আল্লামা মাহমুদ আলুসি বাগদাদি রাহ. তাঁর লিখিত তাফসিরগ্রন্থ রুহুল মাআনির মধ্যে ঈমান নিয়ে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ঈমানের আভিধানিক অর্থ হলো, না দেখেই কারও উপর ভরসা করে কোনো বিষয় বিশ্বাস করে নেওয়া। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা আছে। সুতরাং নবিজি বলেছেন জান্নাত জাহান্নাম আছে, নবিজি বলেছেন, কবরের আজাব আছে, এটাই শেষকথা। বিশ্বাস করতে হবে। কেউ যদি বলে, কই! জান্নাত-জাহান্নাম তো দেখলাম না! কোনোদিন তো কবরের আজাব দেখলাম না, তবে সে ঈমানদার হতে পারেনি। নবিজি বলেছেন জান্নাত জাহান্নাম আছে, আর আপনি বিশ্বাস করলেন; এটার নামই ঈমান。

ঈমানের যত সংজ্ঞা আছে, তার মুল কথা হচ্ছে এ রকম,

التَصْدِيقُ بِمَا جَاءَ بِه النبي إعتمادًا على أنه نبي علي التسليم والتعظيم تفصيلاً في التفصيل إجمالاً في الاجمال

নবিজি যেসব বিষয় নিয়ে এসেছেন, সেগুলো নবিজির বর্ণনা হিশেবে বিনা বাক্যব্যয়ে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে ব্যাখ্যা সম্বলিত বিষয়াদী ব্যাখ্যা সহকারে এবং ব্যাখ্যাহীন বিষয়াদি ব্যাখ্যাহীনভাবেই বিশ্বাস করে নেওয়ার নাম ঈমান।

আরো সহজে বললে, তিনটি বিষয়ের সমন্বিত নাম ঈমান। বিশ্বাস করা, মেনে নেওয়া এবং মুহাব্বাতের সাথে সম্মান করা। এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ যা বলেছেন, এগুলো মানার নামই ঈমান। এবার বলুন, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে কী কী নিয়ে এসেছেন? আল্লাহর কথা বলেছেন কী না? ফেরেশতা, আসমানি কিতাবাদি, আল্লাহর প্রেরিত রাসুলগণ, পরকাল, তাকদিরের ভালোমন্দ সব আল্লাহর পক্ষ থেকে, পুনরুত্থান সম্পর্কে বলেছেন কী না? মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর উপর ভরসা করে এসব না দেখা বিষয় বিশ্বাস করার নামই ঈমান।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রকৃত ঈমানের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 লাইলাতুল কদর : ফজিলত ও করণীয়

📄 লাইলাতুল কদর : ফজিলত ও করণীয়


রমজানের শেষ দশক আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সামনে বিশেষ বিশেষ অফার নিয়ে এসেছে। যেমন, ঈদের শেষ বাজারে দোকানদাররা অনেক পণ্য মূল দামেই বিক্রি করে ফেলে। রমজান এসেছে মানুষকে আল্লাহর ওলি বানাতে। কিন্তু আমরা কি ওলি হতে পেরেছি? রহমতের দশক গেল, মাগফিরাতের দশক গেল, আমরা কতটুকু কী অর্জন করলাম? এখন নাজাতের দশক চলছে। হে আল্লাহ, আমাদের ক্ষমা করে আপনার মাকবুল বান্দা হিশেবে গ্রহণ করে নিন। সকলে বলি আমিন।

আলোচনা চলছিল, রমজানের ফজিলত সম্পর্কে। রহমত ও মাগফিরাতের দিন শেষ। সময় সীমিত। আমাদের সামনে সুযোগ এখনো আছে। এরপরও যদি আমরা না বুঝি, তাহলে নিজেদেরই ক্ষতি করব। কারণ, বান্দার প্রতি আল্লাহর কোনো শত্রুতা নেই। বরং আল্লাহর চাওয়া হচ্ছে, বান্দাকে কীভাবে প্রিয় করা যায়। একজন সন্তানকে তার মা-বাবা যতটুকু মুহাব্বাত করে, বান্দার প্রতি আল্লাহর মুহাব্বাত এর চেয়ে ৯৯ গুণ বেশি। সুবহানাল্লাহ।

সন্তান যদি কোনো অপরাধ করে শেষে মার কাছে গিয়ে 'আম্মা' অথবা পিতার কাছে গিয়ে 'আব্বা' বলে ডাক দেয়, তখন সন্তান যত বড় অপরাধই করুক, মা-বাবা সন্তানের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে যান। আর তিনি তো আল্লাহ, আল্লাহর দয়ার কোনো শেষ নেই। বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, এরপর রহমান আল্লাহর কাছে তাওবা করে নেয়, 'আল্লাহ' বলে ডাক দেয়, তখন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। তাঁর রহমতের ভান্ডারে জোশ খেলে ওঠে। ফলে আল্লাহপাক তাকে ক্ষমা করে দেন।

লাইলাতুল কাদরের 'কদর' শব্দের একটা অর্থ হলো ভাগ্য। ভাগ্য হলো আল্লাহর ইলম। ভাগ্য কাকে বলে, এটা বুঝার আগে আমরা একটি উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন ধরা যাক, আপনি ওজনপার্ক থেকে ব্রঙ্কস যাবেন। আপনি জিপিএস (Global positioning system) চেক করে দেখলেন, সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে আধাঘণ্টা। কোথায় কোথায় জ্যাম আছে, সেটাও দেখতে পেলেন। অথচ আপনি এখনো ব্রঙ্কস পৌঁছেননি বা সেখানকার অবস্থাও স্বচক্ষে দেখেননি; কিন্তু জিপিএস আপনাকে সবকিছু জানান দিয়ে দিচ্ছে।

এই যদি হয় দুনিয়ার প্রযুক্তির ব্যবহার, তবে আল্লাহপাক তো সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী। আল্লাহর ইলমে এটা জানা আছে আপনি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন কাজ কখন কীভাবে করবেন আর কী কী করবেন। এ জন্য আমাদের কাজ হলো কাজ করে যাওয়া। জিপিএস বলেছে, আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। এখন যদি আপনি ড্রাইভ না করেন, তাহলে তো গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না। ৩০ মিনিট কেন, ৩০ বছরেও পারবেন না। এটা জিপিএসের দোষ নয়।

ঠিক তেমনিভাবে তাকদিরের ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে এবং চেষ্টা করে যেতে হবে। আল্লাহ জানেন, আমরা দুনিয়ায় কী অর্জন করব এবং কী পরিণতি লাভ করব। এটা আমরা জানি না। তবে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদেরকে ভালো ফলাফল লাভের জন্য সমূহ পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এখন কেউ যদি বলে, আমি জান্নাতি না জাহান্নামি, এটা নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। কারণ, এটা আল্লাহ জানেন। সুতরাং আল্লাহ তাঁর ইলম অনুযায়ী আমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করবেন, এখানে আমাদের কোনো হাত নেই, এবং এ জন্য কোনো আমলও করতে হবে না... এমন ভাবনা ঠিক হবে না। আল্লাহ জানেন, এটা ঠিক, তবে আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আপনি জান্নাত লাভ করতে পারেন, মুত্তাকি হতে পারেন। আপনি কীভাবে জান্নাতে যাবেন, এটার জন্য আল্লাহ অনেক পথ দেখিয়েছেন। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, অন্যান্য ইবাদত ইত্যাদি জান্নাতে যাওয়ার কাজ। আর এগুলো না করা হলো জাহান্নামের কাজ। সুতরাং আপনাকে জান্নাতে যাওয়ার কাজই করতে হবে।

এখন আপনি যদি বলেন, 'আল্লাহ ভরসা, আল্লাহ জান্নাতে দিলে জান্নাতে যাব, জাহান্নামে দিলে জাহান্নামে যাব। ভাগ্যে যেখানে আছে, সেখানেই হবে আমার আবাস।' এটা কখনো ঠিক হবে না। কারণ, এ বিষয়ে আপনি ভাগ্য বা তাকদিরের উপর বড়ই মুতমাইন; কিন্তু এমনভাবে তো কখনো বলেন না যে, 'এ মাসে কোনো কাজ করব না, ঘরে বসেই বেতন পাবো।' এখানে আপনি ঠিকই বুঝেন যে, কাজ না করলে বেতন পাবেন না। আপনি বুঝেন আপনাকে কাজ করতে হবে, এরপর বেতনের কথা ভাবতে হবে। আমরা দুনিয়ার ক্ষেত্রে ভাগ্যের ধার ধারি না, সবকিছু ফেলে কাজের পেছনে ছুটি; আর পরকালের ক্ষেত্রেই শুধু ভাগ্যের উপর ভর করে বসে থাকি। এ কেমন চরিত্র আমাদের?

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 ইতিকাফ ও শবে কদর

📄 ইতিকাফ ও শবে কদর


রমজানের শেষ দশকে যারা ইতিকাফ করছেন, তারা আল্লাহর মেহমান। তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। আল্লাহর মেহমানদের সম্মান করতে হবে। রমজান এসেছে মানুষকে জান্নাতি বানাতে, মুত্তাকি বানাতে। রহমতের দশক শেষ, মাগফিরাতও শেষ, এখন নাজাতের দশক চলছে। এই দশকে অনেক অফার রয়েছে। এর মধ্যে বড় একটা অফার হলো ইতিকাফ। এ জন্য যারা ইতিকাফ করেন, তারা বুজুর্গ। তাদের খেদমত করা উচিত। তাদের কাছ থেকে দুআ নেওয়া উচিত। তারা আল্লাহর মেহমান।

দুনিয়ায় কেউ যদি কারও কাছে অপরাধ করে এবং দিন শেষে অপরাধী ওই বাড়িতে চলে যায়, তখন সে অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়। ঠিক তেমনিভাবে আমরা হলাম অপরাধী। আল্লাহর কাছে অপরাধ করেছি। এখন আমরা মসজিদে অর্থাৎ আল্লাহর ঘরে এসে আশ্রয় নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। ফলে বান্দা যখন আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নেয়, তখন আল্লাহর দয়ার সাগরে উত্তালতা শুরু হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।

এ জন্য রমজানের শেষ দশকে আল্লাহ তাআলা এমন সুন্দর একটি ব্যবস্থা আমাদের জন্য রেখেছেন। ইতিকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা। আমরা যারা ইতিকাফ করছি, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমলটি শেষ করব। ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ইতিকাফের জরুরি মাসাইলগুলো শিখে নেব। কোনো কোনো কাজ করলে ইতিকাফের ক্ষতি হয়, সেগুলো জানব। ইতিকাফের সময়টা যত বেশি সম্ভব আল্লাহর ইবাদতে কাটাব। নফল নামাজ আর তিলাওয়াতে ব্যয় করার চেষ্টা করব। জরুরি কথা ছাড়া বাড়তি একটি কথাও বলব না। ইতিকাফে থাকা অন্য সাথীদের সাথে গল্প-গুজবে সময় পার করব না। একই সাথে সারাদিন বা সারা রাত ঘুমিয়েও কাটাব না। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

শেষ দশকের আরেকটা বড় অফার হচ্ছে শবে কদর। শবে কদর এতই ফজিলতপূর্ণ যে, নবিজি রমজানের প্রথম দশক এবং দ্বিতীয় দশকে শবে কদরের সন্ধান করেছেন। এরপর নবিজি সাহাবিদের সামনে ঘোষণা দেন, 'আমি রমজানের প্রথম দশকে শবে কদরের সন্ধানে ইতিকাফ করেছি কিন্তু পাইনি। এরপর দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফের মাধ্যমে সন্ধান করেছি, কিন্তু পাইনি। তবে আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন যে, শবে কদর রমজানের শেষ দশকে রয়েছে।'

শবে কদর পেলে কেমন লাভ, এ সম্পর্কে রাসুল ইরশাদ করেন, أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ سِتِّينَ إِلَى سَبْعِينَ وَأَقَلُهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ

আমার উম্মতদের বয়স হলো ষাট ও সত্তরের মাঝে। তাদের খুব কম সংখ্যকই এই সীমা অতিক্রম করতে পারবে।

এই উম্মতের গড় বয়স হলো ৬০ থেকে ৭০ বছর। এর চেয়ে বেশি দিন খুব কম মানুষেই বেঁচে থাকে। এখন কেউ যদি শবে কদরের ফজিলত লাভ করে, তাহলে এক রাতেই আল্লাহ তাকে ৮৩ বছর ৪ মাস বা প্রায় ৮৪ বছর লাগাতার ইবাদত করার সাওয়াব দান করেন। সুবহানাল্লাহ। কোনো মানুষ ৬০ বছরের জীবন লাভ করে মৃত্যুবরণ করল এবং শবে কদরও লাভ করল, তাহলে দেখা যাচ্ছে, সে তার বয়সের চেয়ে বেশি সময় শুধু ইবাদতেই কাটাল। সুবহানাল্লাহ। আর এই ফজিলত শুধু উম্মাতে মুহাম্মাদিই লাভ করেছেন, অন্য কোনো উম্মতকে আল্লাহ এই ফজিলত দেননি।

শবে কদর পাওয়ার জন্য আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত শেষ দশকের রাতগুলোতে সতর্ক থাকা চাই। শেষ দশকে আপনার ইশার নামাজের জামাআত যেন না ছুটে। ফজরের জামাতও যেন মিস না হয়। যদি ইশা ও ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করতে পারেন, তাহলে এর ফল কী? এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিম শরিফের বর্ণনায় রয়েছে, নবিজি এমন ব্যক্তির ব্যাপারে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, 'সারা রাত জেগে নফল নামাজ পড়লে যে সাওয়াব, তার জন্য সে পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে।' সুবহানাল্লাহ। সুতরাং এমন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই শবে কদর লাভ করতে পারবে।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 তাকদির বা ভাগ্য

📄 তাকদির বা ভাগ্য


আমরা তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। ভাগ্য পাঁচ প্রকার: তাকদিরে আজলি, তাকদিরে মিসাকি, তাকদিরে উমরি, তাকদিরে হাওলি, তাকদিরে ইয়াওমি।

প্রথম প্রকার ভাগ্য হলো 'আত তাকদিরুল আজলি'। আল্লাহ তাআলা আজলের মধ্যে প্রথমে কলম তৈরি করে তাকে আদেশ দেন, 'উকতুব' বা 'লিখো'। কলম জবাব দেয়, 'কী লিখব?' তখন আল্লাহ কলমকে বললেন, 'লিখ, কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মাখলুকের ভাগ্য সম্পর্কে লিখ।' এটাকে তাকদিরে আজলি বলে হয়।

দ্বিতীয় প্রকার হলো, 'আত তাকদিরুল মিসাকি'। রুহ জগতে আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে যখন এক জায়গায় জড়ো করে একটি কথা শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, 'আলাসতু বিরাব্বিকুম?' আমি কি তোমাদের প্রভু নই?

এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার। আমরা যে তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করছি, এটা মূলত একটা ড্রয়িং। যেমন, আপনি একটি বাড়ি বানাবেন। এটার জন্য ইঞ্জিয়ারের কাছে গেলে সে একটি ড্রয়িং করে দেবে। এই ড্রয়িংয়ের মাধ্যমেই বোঝা যাবে, বাড়ির কোথায় কতটুকু মাল-সামানা লাগবে। ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্যও একটা ড্রয়িং। এর মাধ্যমে আমরা কীভাবে জান্নাতে যাব, এর বিবরণ জানা যায়। তবে ইঞ্জিয়ারের কাছ থেকে ড্রয়িং করিয়ে যদি বসে থাকেন, তবে বাড়ি তৈরি হবে না। বরং তার ফর্মুলা অনুযায়ী আপনাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ঠিক তেমনিভাবে ভাগ্যও একটা ড্রয়িং, এটার উপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যাবে, এটার উপর আমল করতে হবে।

তাকদিরুল মিসাকি বা আল্লাহ যখন সকল সৃষ্টির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, 'আলাসতু বিরাব্বিকুম?' আমি কি তোমাদের প্রভু নই? আমরা সকলেই সেদিন হ্যাঁ বলেছি। আমরা বলেছি, অবশ্যই আপনি আমাদের রব। মাওলানা ইদ্রিস কান্দলভি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্বনন্দিত সিরাতে মুস্তাফায় লিখেছেন, আল্লাহ সেদিন আলাসতু বিরাব্বিকুম বলার পর সর্বপ্রথম জবাব দিয়েছিল রূহে মুহাম্মাদি, তারপর তামাম আম্বিয়ায়ে কেরামের আরওয়াহ, তারপর পৃথিবীর সকল মানুষ।

সেদিন আমরা রব স্বীকার করে এসেছি। এখন আমাদের জানতে হবে রব কে? রব হলেন তিনি, যিনি আমাদের সব প্রয়োজনের আয়োজনকারী। ওই যে ভাগ্যের একটা ড্রয়িং করা হয়েছে, এখন সেটা বাস্তবায়ন তথা আপনি কীভাবে জান্নাতে যেতে পারবেন এবং কী করতে হবে, কী কী উপকরণ লাগবে, সেদিন আল্লাহ সকলকে সেটাই জানিয়ে দিয়েছেন।

তৃতীয় প্রকার হলো, আত তাকদিরুল উমরি। সহিহ বুখারি শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন, 'একটা সন্তান যখন মায়ের গর্ভে যায়, তখন সেটা একটা রক্তপিন্ড থাকে। এভাবে ৪০ দিন থাকে। এর পরের ৪০ দিন গোশতের একটা টুকরো থাকে। এভাবে তিনটি ৪০ পার হওয়ার পর রুহ আসে। এ সময় আল্লাহ ফেরেশতা পাঠান। ফেরেশতারা এই রুহের ব্যাপারে ৪টি বিষয় লিখেন, সে কত দিন বাঁচবে, কী পরিমাণ রিজিক লাভ করবে, কী আমল করবে? এরপর তারা আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করেন, 'এখন কী লিখব? সফল নাকি বিফল? সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা?' তখন আল্লাহ জানিয়ে দেন, সে সফল বা ভাগ্যবান হবে। তখন সেটাই লিখে দেওয়া হয়। এভাবে দুর্ভাগা বললে দুর্ভাগাই লিখা হবে। এটাই হলো জীবন সম্পর্কিত তাকদির।

চতুর্থ প্রকার তাকদির হলো 'আত তাকদিরুল হাওলি'। এটা বার্ষিক বাজেটের মতো। যেভাবে বার্ষিক বাজেটে আগামী একবছরের আয়ব্যয়ের রূপরেখা তৈরি করা হয়, তাকদিরে হাওলি ঠিক তেমনি তাকদির। এখানে কদর বলতে তাকদিরে হাওলি উদ্দেশ্য।

কদরের একটা অর্থ হচ্ছে ভাগ্য। সুতরাং এ পর্যায়ে আমরা সেটা নিয়েই আলোচনা করব। রুহজগতে আল্লাহ আমাদের ভাগ্য লিখে রেখেছেন, যা সংসদ বা পার্লামেন্টে আইন পাশের মতো। যেমন, সংসদের কোনো বিষয়ের আইন পাশ হলে সেটা সরাসরি বাস্তবায়িত হয় না; বরং তা বাস্তাবায়নের কার্যক্ষেত্র ধাপ ও পর্যায়ক্রম রয়েছে। ধরা যাক, সংসদের শিক্ষাবিষয়ক একটি আইন বা প্রস্তাব পাশ হলো। প্রস্তাবটি পাশ হওয়ার পর বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয়ে আসে। শিক্ষামন্ত্রণালয় আইনটি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠায়। এভাবে একপর্যায়ে কাজটি সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরক্রমে সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবটি আইন আকারে আসে।

ঠিক তেমনিভাবে রুহজগতে আল্লাহ তাআলা আমাদের ভাগ্য লিখে রেখেছেন। তবে সেটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, এটা প্রতি বছর শবে কদরে নির্ধারণ করা হয়। এটার জন্য বিভিন্ন ফেরেশতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই শবে কদরে ফেরেশতারা দলে দলে জমিনে আসেন। তখন জমিনের বাসিন্দা যারা মুত্তাকি, ইবাদতগুজার, নিষ্পাপ ফেরেশতাদের আগমনে তাদের অন্তরেও একটা প্রশান্তি অনুভূত হয়। হজরত আয়েশা রা.-এর হাদিসেও বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে।

বান্দা কখন কী করবে, তার কী প্রয়োজন বা কোথায় কোন সাহায্যের দরকার, সে ক্ষেত্রে বান্দাকে সাহায্য করার জন্য ফেরেশতারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ জন্য আমরা গুরুত্বের সঙ্গে শবে কদরের সন্ধান করব এবং বরকত লাভের চেষ্টা করব। আমরা দুআ করব, আল্লাহ যেন আমার ব্যাপারে ভালো ফায়সালা করে দেন। আর এটাই হলো 'আত তাকদিরুল হাওলি। অর্থাৎ, বান্দা আগামী এক বছর কী করবে, কীভাবে চলবে, সেটা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তাকদিরের পঞ্চম প্রকার হলো, আত তাকদিরুল ইয়াওমি। অর্থাৎ, প্রতিদিনের তাকদির বা ভাগ্য। কোন মুহূর্তে আপনি কী করবেন, কোথায় যাবেন, সেটার ব্যবস্থা করেন আল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শবে কদরের ফজিলত অর্জন করা এবং তাকদিরের উপর দৃঢ় বিশ্বাসী থাকার তাওফিক দিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00