📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 মুত্তাকি হওয়ার সোপান

📄 মুত্তাকি হওয়ার সোপান


সম্মানিত মুসল্লিয়ানে কেরাম!

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া যে, আমরা আজকের তাফসির মাহফিলে হাজির হতে পেরেছি। আল্লাহপাক চাইলে আমাদেরকে কোনো না-কোনো কাজে ব্যস্ত রাখতে পারতেন। চাইলে অসুস্থ বানিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখতে পারতেন। তেমন কিছু হলে আমরা এই মুবারক মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পেতাম না। এ জন্য আমরা আল্লাহর রাহমতের উপর ভরসা করে বলতে পারি, যে রমজান মাস এসেছে মুসলমানকে মুত্তাকি বানানোর জন্য, সেই মাসে আল্লাহপাক আমাদেরকে তাঁর ঘরে নিয়ে এসে তাঁর কালামের আলোচনায় জড়ো করে দিয়েছেন- এর অর্থ আল্লাহ আমাদের মুত্তাকি হওয়ার সুযোগ করে দিতে চান। হে আল্লাহ, আমাদেরকে মুত্তাকি না বানিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। সকলে বলুন আমিন।

সিয়াম এসেছে আমাদেরকে মুত্তাকি বানাতে। আর আমাদের আজকের আলোচনাও হলো মুত্তাকি সম্পর্কে। ইতিপূর্বের আলোচনায় আপনাদের জানা থাকার কথা যে, মুত্তাকির স্তর হচ্ছে তিনটি: সাধারণ স্তর, ভিআইপি স্তর, ভিভিআইপি স্তর। এখন আমরা নিজেই নিজের অবস্থান বুঝে নিই যে, আমি কোন স্তরে আছি।

১. সাধারণ বা প্রথম স্তরের মুত্তাকি হচ্ছে সাধারণ ঈমানদার। সিয়াম সম্পর্কিত আয়াতে আল্লাহ যে বললেন, লাআল্লাকুম তাত্তাকুন, 'যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো', এখানে মুত্তাকি দ্বারা কী উদ্দেশ্য, গত আলোচনা স্মরণ থাকলে আপনারা সেটা বুঝতে পারবেন,

তাকওয়া ছাড়া আপনার নামাজই হবে না। এরকম নামাজি নামাজ পড়েও জাহান্নামে যাবে। কারণ, তার তাকওয়া নেই। এ জন্য তাকওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআনের সুরা মাউন, যে সুরা আপনাদের সকলেরই মুখস্থ আছে, তাতে আল্লাহ পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন, ফাওয়াইলুল্লিল মুসাল্লিন। অর্থাৎ, এমন অনেক নামাজি আছে, যাদেরকে 'ওয়াইল' নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এমনিভাবে অনেক রোজাদার আছে, যাদের রোজা কোনো কাজে আসবে না। হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,

كَمْ مِنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الظَّمَأُ

অনেক রোজাদার আছে, যারা রোজা রেখে সারা দিন শুধু উপোষই থাকল, তাদের রোজার কোনো মূল্য নেই। কেন কোনো মূল্য নেই? কারণ, তার তাকওয়া নেই। আবার অনেক আছে, যারা সারা রাত সজাগ থেকে নফল ইবাদত করল, তাহাজ্জুদ- তিলাওয়াত করল। তাদের এই রাত জাগরণ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না তাকওয়া না থাকার কারণে। রাসুল বলেন,

وَكَمْ مِنْ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ

অনেক মানুষ আছে, যারা সারা রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করল, কিন্তু তার এই রাতজাগার কোনো মূল্য নেই। এমনিভাবে হজ, জাকাত ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা করা যাবে।

ইবাদত কবুলের শর্ত

মোটকথা, তাকওয়া না থাকলে কোনো ইবাদতই কবুল হবে না। কারণ, সব ইবাদতের রুহ হলো তাকওয়া। যার মধ্যে তাকওয়া নেই, তার ইবাদত কবুল হবে না। আমাদের নামাজ-রোজার কোনো প্রয়োজন নেই আল্লাহ তাআলার। তিনি শুধু আমাদের তাকওয়া দেখেন। এ কারণে ফেরেশতারা কখনো মুত্তাকি হতে পারবে না। আপনারা কখনো কোনো বক্তার মুখে এমন আলোচনা শুনেছেন কি যে, জিবরিল আ. বড় মুত্তাকি? অথবা মিকাইল, আজরাইল, ইসরাফিল আ. মুত্তাকি? না, কখনো শুনেননি। কারণ, মুত্তাকি শুধু তারাই হবে, যাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ অর্জনের সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর এটা শুধু মানুষকেই দেওয়া হয়েছে। মুত্তাকি তারাই হয়ে থাকে, যাদের মধ্যে গুনাহ করার ক্ষমতা রয়েছে।

এ জন্য জিবরিল বা কোনো ফেরেশতা কখনো মুত্তাকি হতে পারবেন না। কারণ, তাঁদের মধ্যে এই গুণ নেই। ভালো-মন্দ বাছবিচারের সক্ষমতা তাদের নেই। আল্লাহ তাঁদের যে যে আদেশ দিয়েছেন, সেসবই শুধু পালন করতে পারবেন। ফলে তাঁদের জন্য প্রতিদানও নেই, শাস্তিও নেই। তারা জান্নাত বা জাহান্নামে যাবেন না। আর মানুষের যেহেতু পাপ- পুণ্য অর্জনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তাই মানুষ চাইলে মুত্তাকি হতে পারে, আবার ইচ্ছা করলে বাটপারও হতে পারবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মানুষকে দুভাগে ভাগ করেছেন: ১. সায়িদ, ২. সাকি। সায়িদ হলো তারা, যাদের মধ্যে তাকওয়া রয়েছে, তারা ভাগ্যবান। আর সাকি বা দুর্ভাগা হলো তারা, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেনি।

এতক্ষণের আলোচনায় আমরা তাকওয়ার মর্ম সম্পর্কে জানতে পারলাম। মন চায় গুনাহ করতে কিন্তু আল্লাহর ভয়ে করে না, এটাই তাকওয়া।

এখন আমরা যে রোজা রাখলাম, আমাদের এই রোজা তাকওয়ার কোন পর্যায়ে আছে? আমরা রোজা রাখলাম কিন্তু তাকওয়া অর্জিত হলো না, তো এই রোজার কোনো দাম নেই। এমন রোজা রাখা মানে শুধু উপবাস আর পিপাসার্ত থাকা। কিয়ামত-দিবসে তার এই রোজা কোনো কাজে আসবে না। এখন আমরা রোজা রাখলাম আল্লাহকে রাজি করার জন্য; কিন্তু সেটা যদি অর্জিত না হয়, তাহলে এমন রোজা রাখার কোনো মানে নেই। এবার নিজেরাই নিজের রোজার অবস্থা বিবেচনা করতে পারব। আমার রোজা তাকওয়ার কোন স্তরে আছে, সেটা সহজেই বুঝে নিতে পারব। আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]

পূর্ববর্তী উম্মতের উপর রোজা বড় কঠিন ছিল। পরিমাণেও বেশি ছিল। অথচ আমাদের রোজা হচ্ছে একমাস। এখানে একটা বিষয় বলে রাখি। রোজা ৩০টি নয়, কারণ, আল্লাহ ৩০ দিন বা ২৯ দিনের কথা বলেননি; বলেছেন, তোমরা এক মাস রোজা রাখো'। এখানে সংখ্যার কোনো উল্লেখ নেই। তা ছাড়া আরবি মাস সবসময় যে ৩০ দিনে হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তাও নেই। ২৯ ও ৩০ দিনেই হয়। অপরদিকে ইংরেজি মাস ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখও হয়ে থাকে। রোজার হিসাব চাঁদের উপর নির্ভরশীল। এখন যদি রোজা ২৯টি হয়, তাহলে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে ৩০টির সাওয়াব দেবেন; আর ৩০টি পূর্ণ হলে আরও ভালো। সুতরাং, ২৯ বা ৩০ দিন রোজা নয়, এক মাস তথা রমজান মাস রোজা রাখব এবং এটাই আল্লাহর নির্দেশনা।

হজরত মুসা আ.-এর উম্মতের উপর রোজা ছিল ৪০ দিন। আমাদের চেয়ে বেশি; কিন্তু পরিমাণে বেশি হলেও সাওয়াব আমাদের বেশি। অপরদিকে হজরত দাউদ আ.-এর উম্মতের উপর ছয় মাস রোজা ফরজ ছিল। দাউদ আ. একদিন রোজা রাখতেন আর একদিন রোজাহীন থাকতেন। সহিহ হাদিসে এটা বর্ণিত আছে। এভাবে একদিন রোজা আর একদিন ইফতার করলে ৬ মাস হয়। কিন্তু আল্লাহ দয়া করে এই উম্মতের জন্য বেশিও না আবার কমও না, বরং মধ্যখানে রেখেছেন। আবার লাভও বেশি দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ।

এই যে রোজা, আল্লাহপাক এটা রাখার নির্দেশ কেন দিলেন? আমরা যদি রোজা রাখি অর্থাৎ, না খেয়ে থাকি, তাতে আল্লাহর কী লাভ? এর ফল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। এবার গত কালকের আলোচনার সূত্র টেনে বলতে চাই, আমরা কোন স্তরের মুত্তাকি? প্রথম স্তরে না দ্বিতীয় স্তরে? প্রথম বা সাধারণ স্তরে আমরা সকলেই আছি। আলহামদুলিল্লাহ। কারণ, মহামহিম আল্লাহ তাআলাই আমাদের ঈমানদার বলে সম্বোধন করে বলেছেন, يٰأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا । সাধারণ স্তর হলো কুফর ছেড়ে দেওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সকলেই সাধারণ স্তরে আছি। যেহেতু আমরা কুফর করি না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বিশ্বাস করেছি। এবার আমাদেরকে ভিআইপি এবং ভিভিআইপি স্তরে কীভাবে উন্নীত করতে পারি, সেটা চেষ্টা করতে হবে।

তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তর হলো, যা করলে পাপ হয় অথবা ছেড়ে দিলে পাপ হয় এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকা। অর্থাৎ, সব কবিরা, সগিরা, শিরক ও বিদআত ছেড়ে দেওয়া। কারও কারও মতে, সামান্য ও ছোটখাটো ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেও বেঁচে থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ কর্তৃক আদেশকৃত সব বিষয় মেনে চলা এবং অপছন্দনীয় যাবতীয় বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। এখন কোনো ব্যক্তি যদি তার হাত, মুখ, নাক, কান, পা ইত্যাদি সব অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তাহলে এটাকে দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরের তাকওয়া বলা হয়। এ পর্যায়ের তাকওয়ার আবার বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং এই স্তরের তাকওয়ার উপর ভিত্তি করেই কুরআন-হাদিসে বিভিন্ন কল্যাণ ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।

এ জন্য তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ লিখেন, রোজাদার তিন প্রকার :

১. সাধারণ রোজাদার।
২. ভিআইপি রোজাদার।
৩. ভিভিআইপি রোজাদার।

সাধারণ রোজাদার হলো, যারা পেটে খাবার-পানি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। যেমনটা আমরা করে থাকি। আর এই সাধারণ রোজা রাখা ফরজ। এখন কেউ যদি তা না করে, সে ফরজ ছাড়ার কারণে গুনাহগার হবে। তাকে আল্লাহর আদালতে দাঁড়াতে হবে। কেউ যদি সাধারণভাবে এই প্রকারের রোজা রাখে, তাহলে তার রোজার ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে কিন্তু যারা মুত্তাকি, তাদেরকে এমনটা করলে চলবে না; বরং ভিআইপি রোজাদার হতে হবে। এ জন্য শুধু উপবাস থাকা নয়, বরং রোজা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তার হাত, চোখ, মুখ, কান, নাক ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে।

এখন যদি রোজা রেখেটিভির সামনে বসে টাইমপাস করা হয়, তাহলে সেটা তাকওয়া হলো না। যারা তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রেখে কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবিহ ইত্যাদি পাঠ করে, তারা হলো ভিআইপি রোজাদার। আর যারা ভিআইপি রোজাদার, আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে যখন প্রবেশ করাবেন, তখন শাহি একটি গেইট দিয়ে প্রবেশ করাবেন। বিশেষ সেই গেইটের নাম হলো রাইয়্যান। দুনিয়ায় রোজা অবস্থায় তারা যেহেতু সারা দিন পিপাসার্ত অবস্থায় দিন কাটিয়েছিল, তাই পরকালে তাদেরকে আল্লাহ তাঁর দিদার লাভ করে হৃদয়ের সব তৃষ্ণা নিবারণ করাবেন। সুবহানাল্লাহ।

রাসুল ইরশাদ করেন,

لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ

রোজাদারের আনন্দ দুইটি, একটি ইফতারের সময়। কারণ, সারা দিন রোজা রেখে যখন ইফতার সামনে আসে, তখন আনন্দ লাগে। এই আনন্দ মূলত আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য। সারা দিন উপবাস থেকেছি আল্লাহর আদেশে, ইফতারও করতেছি আল্লাহর আদেশ। আর মুমিনের কাজই তো হলো আল্লাহর আদেশ মানা। সুতরাং আল্লাহর আদেশ যে মানতে পারলাম, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।

ইফতারের সময় আমরা খেজুর দিয়ে ইফতার করব। হাদিসে আছে, একবার নবিজি সাহাবিদের প্রশ্ন করলেন, 'হে সাহাবিরা, বলো তো মুমিনের প্রতীক কী? মুমিনকে আল্লাহ কোন জিনিসের সঙ্গে উপমা দিয়েছেন?' সাহাবিদের একটি অভ্যাস ছিল, নবিজি কোনো প্রশ্ন করলে তাঁরা সাধারণত জবাব দিতেন না। বরং বলতেন, 'আল্লাহু ও রাসুলুহু আ'লাম' অর্থাৎ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন। নবিজির প্রশ্নের জবাবে সাহিবগণ কোনো কিছু বলেননি, তখন নবিজি বলেন, 'মুমিনের তুলনা হলো খেজুর গাছের সঙ্গে। খেজুর গাছের সাথে মুমিনের কেন তুলনা দেওয়া হলো, হাদিসে এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। আমরা সেদিকে যাব না। তাই মুমিনকে যেহেতু খেজুর গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে, তাই মুমিনরা খেজুর দিয়েই ইফতার করবে এবং এটাই সুন্নাত। খেজুর দ্বারা ইফতার করলে স্বাস্থ্যগত অনেক উপকার রয়েছে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সাথে জড়িতরা এটা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। খেজুরের অনেক ফায়দা আবিষ্কার করেছেন।

ভিভিআইপি রোজদার হলো তারা, যারা নিজেদের অন্তরকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে যে, তাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বা আর কোনো কিছুর মুহাব্বাত থাকে না। অর্থাৎ সে তার অন্তরকে এমনভাবে হেফাজত করে, তাতে কোনো পাপ আর অবশিষ্ট থাকে না।

সাধারণ রোজাদাররা তার পেটকে হেফাজত করে, ভিআইপি রোজাদাররা তাদের শরীরের সব অঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে হেফাজত করে আর ভিভিআইপি রোজাদাররা তাদের অন্তরকেও গুনাহ থেকে হেফাজত করে। এরকম তাকওয়া অর্জন করে ভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার জন্য আল্লাহ রোজার এই বিধান আমাদের উপর ফরজ করেছেন।

এখন আজকের আলোচনা যেহেতু তাকওয়ার আলোচনা ছিল আর আমরা রোজার মাধ্যমে যেহেতু তাকওয়া অর্জন করব, এবং এই তাকওয়া কোন ধরণের তাকওয়া হবে, সেটা এখন আলোচনা করব।

তাকওয়ার তিনটি স্তর যথা: সাধারণ তাকওয়া, ভিআইপি তাকওয়া, ভিভিআইপি তাকওয়া; এই যে তাকওয়ার স্তর, এখানে আমাদেরকে প্রথমে সাধারণ তাকওয়া অর্জন করতে হবে। এরপর ভিআইপি তাকওয়া। আর এটা অর্জন করতে হলে যারা ভিআইপি তাকওয়াবান বা মুত্তাকি, তাদের দ্বারস্ত হতে হবে। এর পরের স্তর হলো ভিভিআইপি তাকওয়া। আমরা যখন দ্বিতীয় স্তর বা ভিআইপি তাকওয়ার স্তরে উন্নীত হয়ে যাব, তখন তৃতীয় স্তর বা ভিভিআইপি তাকওয়াবান যারা, তাদের দ্বারস্থ হতে হবে, তাদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে। এভাবে সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে তাকওয়ার বিভিন্ন স্তরে উন্নীত হওয়া যাবে।

মাওলানা রুমি এবং শামসুদ্দিন তাবরিজি

সান্নিধ্য বা সাহচর্যের মাধ্যমে কীভাবে তাকওয়ার উচ্চমর্যাদা অর্জিত হয়, এই আলোচনা বোঝার সুবিধার্থে হজরত জালালুদ্দিন রুমি রাহ. সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করছিলাম। মাওলানা রুমি রাহ. ভিআইপি তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন। এরপর ভিভিআইপি তাকওয়াওলা একজনের সান্নিধ্য গ্রহণের মাধ্যমে তিনিও ভিভিআইপি তাকওয়ার অধিকারী হয়ে যান।

মাওলানা রুমি রাহ. একজন যুক্তিবাদী, তর্কবিশারদ, মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুহাক্কিক আলিম ছিলেন। জাহিরি ও বাতিনি সব বিষয়ে তিনি অগাধ পান্ডিত্য রাখতেন। একবার মাওলানা রুমির কাছে অত্যন্ত সাধারণ বেশে একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি আসেন। মাওলানা রুমি এ সময় দারস দিচ্ছিলেন। আগন্তুক ওই দরবেশ ব্যক্তি রুমির কাছে আগমন করে বলেন, 'আপনি এসব কী করছেন?' ফকিরের বেশ ধরে আসা ওই ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে মাওলানা রুমি বলেন, 'তুমি এসব বুঝবে না।' মূলত ওই দরবেশকে একজন ফকির ভেবে তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি এমন জবাব দিয়েছিলেন। কেননা, তখনো আগন্তুক সম্পর্কে তাঁর কোনো জানাশোনা ছিল না।

দরবেশ ব্যক্তি মাওলানা রুমির সামনে থাকা সব কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দেন। তখন মাওলানা রুমি প্রশ্ন করেন, 'তুমি এ কী কাজ করলে?' আগন্তুক জবাব দেয়, 'আমি কী কাজ করেছি, তা তুমি বুঝবে না। যেভাবে তোমার কথা আমি বুঝিনি, তেমনি তুমিও আমার কথা বুঝনি। তুমি তো নিজেকে অনেক বড় জ্ঞানী মনে করো, মানতিক, ফালসাফায় পান্ডিত্যের দাবি করো, অথচ আমি কী করেছি, সেটা তুমি বুঝো নি।' রুমি তাঁকে বলেন, 'এত সব বোঝাবুঝির দরকার নেই। আমার কিতাবগুলো ফেরত দিন। আগন্তুক ব্যক্তি তখন পানিতে ভাসতে থাকা কিতাবগুলোতে হাত দিতেই তা সুন্দর ও ঝকঝকে হয়ে গেল!

এটা হচ্ছে কারামাত। আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হচ্ছে كرامة الاولياء حق অর্থাৎ ওলিদের কারামত সত্য। কারামাত আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকে, ওলিদের নিয়ন্ত্রণে নয়। আর মুজিজা হচ্ছে, কোনো নবি থেকে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটা। যেমন, চাঁদ দ্বিখন্ডিত করা। ওলিদের থেকে অবিশ্বাস্য কিছু প্রকাশ পেলে সেটা কারামাত। তবে কোনো বাটপার, ভন্ড বা গুনাহকারীর কাছ থেকে যদি অবিশ্বাস্য কিছু প্রকাশ পায়, তাহলে সেটা যাদু। এ পর্যায়ে আমরা মুজিজা, কারামাত ও যাদু সম্পর্কে সামান্য ধারণা পেয়ে গেলাম। যাদু হচ্ছে, শয়তানের সাহায্যে দীর্ঘ সাধনার ফল। মানুষ সাধনা করে চাইলে আকাশে উড়তে পারে। কিন্তু এগুলো শয়তানি কার্যকপাল, বিশ্বাস করা যাবে না।

এখন আমরা মূল আলোচনায় ফিরে যাই। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির একটি ঘটনা আলোচনা করছিলাম। যে দরবেশ তাঁর কাছে ফকিরের বেশে এসেছিলেন, তিনি হচ্ছেন জগদ্‌খ্যাত আলিম ও দরবেশ মাওলানা শামসুদ্দিন তাবরিজি রাহ.। তিনি যখন পানি থেকে কিতাবগুলো উঠিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন কিতাবগুলো একেবারে নতুন হয়ে গেল। অথচ সাধারণ নিয়ম হলো, পানিতে পড়লে কোনো বই বা কাগজ তার মূল রূপ হারিয়ে ফেলে। ভিজে স্যাতসেতে হয়ে যায়। কালি উঠে লেখা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখানে দেখা গেল ঠিক উল্টো।

মাওলানা রুমি রাহ. আগন্তুক দরবেশের এই কারামাত দেখে তাঁর প্রতি অভিভূত হয়ে পড়লেন। এতদিন তিনি তাঁর জাহিরি ইলমের কারণে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভুগছিলেন। এবার ওই আগন্তুকের আশ্চর্য কারামাত দেখে তিনি তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে গেলেন। আগন্তুক শামসুদ্দিন তাবরিজি রাহ.-এর জন্য তাঁর অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল। হাদিসে আছে, নবি হজরত দাউদ আ.-এর দুআ রাসুল ﷺ বর্ণনা করতেন। দাউদ আ. সবসময় এই দুআ করতেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَحُبَّ عَمَل يُبَلِّغُنِي حُبَّكَ، হে আল্লাহ, আমি আপনার মুহাব্বাত চাই এবং আপনাকে যারা মুহাব্বাত করে, তাদেরও মুহাব্বাত চাই এবং এমন আমলের তাউফিক চাই, যে আমল আপনার মুহাব্বাত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

রুমি রাহ.-এর কাছে আগত সাধারণ বেশের এই দরবেশ আল্লাহকে ভালোবেসে এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন? এ ঘটনার ফলেই তাবরিজির প্রতি রুমির ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়।

মাওলানা রুমির পরিবর্তন

এদিকে তখন আরেকটি ঘটনা ঘটে। শামসুদ্দিন তাবরিজি রাহ. পানি থেকে কিতাবগুলো তুলে মাওলানা রুমির হাতে দিয়েই তিনি জঙ্গলের দিকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তখন থেকেই মাওলানা রুমিরও সব জ্ঞান লোপ পেয়ে যায়। তিনি হাদিস পড়াতে যান, হাদিসের ইবারত মুখে আসে না। তাফসির করতে যান, কোনো কথা বের হয় না। এভাবে ইলমি কোনো কাজেই আর তিনি সফল হচ্ছিলেন না। অবস্থা যখন এমন হয়ে দাঁড়ায়, তখন তিনি নিজেকে একজন অজ্ঞ-মূর্খ মনে করতে থাকেন।

নিজের এ অবস্থা দেখে মাওলানা রুমি ভাবনায় পড়ে যান। দরবেশ পানিতে কিতাব ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতেই সেটা ফেরত পেলাম। এবার যে আমার ইলম চলে গেল, তা কীভাবে ফেরত পাব? এই ভেবে তিনি পাগলের মতো হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক শামসুদ্দিন তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। কিন্তু তাঁকে কোথায় পাবেন, কীভাবে পাবেন- কিছুই জানেন না। তিনি তো অজানার দিকে চলে গেছেন। তবে তাঁকে পেতেই হবে। এই ভাবনা থেকে মাওলানা রুমি ও দারস-তাদরিস ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেলেন। অনেক খোঁজাখুজির পর শেষ পর্যন্ত তিনি দরবেশ শামসুদ্দিন তাবরিজির সাক্ষাৎ লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে মাওলানা রুমি তাঁর মসনবি শরিফে লিখেন,

یک زمانه صحبت با اولیا : بہتر از صد سالہ طاعت بے ریا

আল্লাহর ওলির সামনে এক মুহূর্ত সময় অবস্থান করা রিয়া ছাড়া শত শত বছর নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।

তাঁর এ কথার সারমর্ম হলো, আমি তো হাদিস পড়াচ্ছিলাম, মানুষ আমাকে মুহাদ্দিস বলবে। তাফসির করছিলাম, মানুষ আমাকে মুফাসসির বলবে। আমি মানতিক পড়াচ্ছিলাম, মানুষ আমাকে যুক্তিবাদী বলবে, কিন্তু এরকম ধারণা আমার অন্তর থেকে দূর না করতে না পারলে তো এমন আমলের কোনো দাম নেই। এই ভাবনা দূর করে আমার অন্তরে উচ্চস্তরের তাকওয়া অর্জিত হতে হবে, নাহয় এসব ইলম অর্জন ও আমলের কোনো দাম থাকবে না। এটা দূর করতেই আল্লাহ তাআলা নিজ দয়াগুণে তাঁর একজন বান্দাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। মাওলানা রুমি যখন শামসুদ্দিন তাবরিজির সান্নিধ্য গ্রহণ করলেন, এরপর তাঁর কী অবস্থা হলো, অপর এক কবিতায় তিনি সেটা তুলে ধরে বলেন,

مولوی ہرگز نہ شد مولائے روم : تا غلام شمس تبریز نہ شد

জালালুদ্দিন রুমি মৌলভি থেকে মাওলানা হতে পারতেন না, যদি শামসুদ্দিন তাবরিজির সান্নিধ্য লাভ না করতেন।

সুতরাং স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে আমাদেরকে সত্যিকার আওলিয়ায়ে কেরাম ও পির-মুরশিদের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে হবে এবং প্রেম ও ভক্তির সাথে ওলি ও বুজুর্গদের খেদমত ও সুহবতে থেকে খোদার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াত দ্বারা ধন্য হতে চেষ্টা চালাতে হবে। তবেই আমাদের পার্থিব ও পরকালীন জীবন সার্থক ও সুন্দর হবে। অন্যথায় আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না।

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবাল তাঁর এক কবিতায় লেখেন,

ہر لحظہ ہے مومن کی نئی شان نئی آن : گفتار میں، کردار میں، اللہ کی برہان!

কবি ইকবালের মর্দে মুমিন নামক এক কবিতার এই শ্লোক এটি। তাতে তিনি বলতে চেয়েছেন, মুমিনের প্রত্যেক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন। কারণ, মুমিন যখন সাধারণ মুত্তাকি থাকে, তখন সে এই স্তরে থাকতে পছন্দ করে না। তখন সে আরও উন্নত স্তরের মুত্তাকি হতে চায়। যখন ভিআইপি মুত্তাকি হয়, তখন সে তাতেও সন্তুষ্ট থাকতে চায় না; বরং ভিভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার বাসনা তার মনে জেগে বসে। তখন তার কথায়, চালচলনে তাকওয়া ভেসে ওঠে। মানুষ তার মধ্যে একজন খাঁটি আল্লাহওয়ালার সকল আলামত দেখতে পায়।

আল্লাহওয়ালা চেনার উপায়

এখন কে আল্লাহওয়ালা, কে আল্লাহর ওলি, আমরা কীভাবে চিনব? এর পরিচয় দিতে গিয়ে নবিজি এক হাদিসে বলেন, ذا روؤا ذكر الله। অর্থাৎ, যার কথা শুনলে, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, সে আল্লাহর ওলি। এটাই হলো মুমিনের অবস্থা। আর মুমিন শুধু তার তাকওয়ার বা অবস্থার উন্নতি চায়। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদেরকে শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের মুত্তাকি হলে চলবে না; বরং তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হতে হবে। আর সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকি হতে হলে এমন আরও একজনের শরণাপন্ন হতে হবে।

এ মর্মে আল্লামা ইকবাল বলেন, دیم عارف نسیم صبح دم ہے : اس سے ریشہ معنی میں نم ہے

অর্থাৎ আল্লাহওয়ালাদের একেকটা শ্বাস হলো ঠান্ডা বাতাসের চেয়েও প্রশান্ত বাতাস। ফজরের নামাজের পর সকালে যে বাতাস প্রবাহিত হয় এবং আপনি তা শরীরে লাগান, সেটা অত্যন্ত উপকারী। এটা পূর্ব দিক থেকে বয়ে থাকে। এই বাতাস যেভাবে আপনার শরীরের জন্য উপকারী, তেমনি আল্লাহওয়ালাদের শ্বাস হলো তার অন্তরের জন্য উপকারী। এর মাধ্যমেই মানুষের জীবনে তাজেগি বা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসে।

অন্যত্র কবি ইকবাল বলেন, اگر کوئی شعیب آئے میسر : شبانی سے کلیمی دو قدم ہے

আল্লাহ যদি শুয়াইব আলাইহিস সালামের মতো কাউকে অভিভাবক দান করেন, যেভাবে শুয়াইব আলাইহিস সালামের কাছে মুসা আলাইহিস সালাম গিয়েছিলেন এবং তাঁর সাহচর্যেই মুসা থেকে 'মুসা কালিমুল্লাহ' হয়ে যান। বকরি রাখাল থেকে তুর পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা অর্জন করেন। এটা শুয়াইব আলাইহিস সালামের সান্নিধ্য অর্জনের ফল।

আমরা যদি শুয়াইব আলাইহিস সালামের মতো একজন দরদি অভিভাবক আল্লাহওয়ালার সন্ধান করি এবং পেয়ে যাই, তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ করি, তাহলে মুসা আলাইহিস সালাম যেভাবে বকরি রাখাল থেকে তুর পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, আমাদেরকেও এভাবে সাধারণ মুত্তাকি থেকে ভিআইপি মুত্তাকি এরপর ভিভিআইপি মুত্তাকি বানিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করবেন। আর দুনিয়া আখিরাতে সম্মানের মাপকাঠি হলো তাকওয়া। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴾

তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। [সুরা হুজুরাত : ১৩]

তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর, সুঠাম দেহের অধিকারী, অর্থ-বৈভবের মালিক, সে মুত্তাকি নয়; বরং তাকওয়ার বা মুত্তাকি হওয়ার মাপকাঠি হচ্ছে, যার অন্তর যত সুন্দর, আল্লাহকে দিয়ে যার ভয় এবং ভালোবাসা যত বেশি, সেই সবচেয়ে বড় মুত্তাকি।

এ জন্য বুখারির হাদিসে আল্লাহর রাসুল বলেন, আনা আ'লামুকুম বিল্লাহ, ওয়া আতকাকুম লিল্লাহ। আমি হলাম তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম, মুত্তাকি এবং পরহেজগার। আমরা যেন এমন তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকি হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারি, আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

এটাকে তাকওয়ায়ে খাস বা বিশেষ তাকওয়া বলা হয়। এই বিশেষ তাকওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,

﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَمَثُوبَةٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْرٌ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾

আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাদের জন্য) প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। [সুরা বাকারা: ১১৩]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَ لَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَ اتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَةٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَ الْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْتُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾

আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। [সুরা আরাফ : ৯৬]

আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে 'আমনূ' শব্দ বলে প্রথম স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আর 'ওয়াত্তাকু' বলে দ্বিতীয় স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

এই বিশেষ স্তরেও আবার আরও স্তর আছে, যেমন: আমি আমার নাক-মুখ-কানকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখলাম, এটা বাহ্যিক তাকওয়া, কিন্তু অন্তরে গুনাহ আছে, তাহলে হবে না। যদি অন্তরের কালো দাগ বা গুনাহ দূর করা যায়, তাহলেই কেবল বিশেষ স্তরের তাকওয়ার অধিকারী হওয়া সম্ভব। এ পর্যায়ে এই তাকওয়ার নাম বদলে 'ওয়ারা' হয়ে যাবে।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَةً إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُوْنَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوْا يَقْتَرِفُوْنَ আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয় যারা পাপ অর্জন করে, তাদেরকে অচিরেই প্রতিদান দেয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে। [সুরা আনআম : ১২০]

হادিসে রাসুল ইরশাদ করেন, عَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الْبِرِّ وَالإِثْمِ فَقَالَ الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ হজরত নাওয়াস ইবনু সামআন আনসারি রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসুল -কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করি। নবিজি উত্তর দিলেন, 'পুণ্য হচ্ছে সচ্চরিত্র আর পাপ হচ্ছে যা তোমার (অন্তরে) খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'

এই হাদিসে নবিজি হজরত নাওয়াস রা.-এর প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'নেকি হলো উত্তম চরিত্র। শুধু নামাজ পড়া নেকি নয়। কেউ যদি নামাজ পড়ে অন্যকে কষ্ট দেয়, তাহলে হবে না। বরং তার হাত-মুখ পা সব অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর চরিত্র হলো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাউকে কষ্ট না দেওয়া। কিন্তু আমরা করি কি, নামাজও পড়ি আবার ঘরে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করি। অথচ নবিজি যখন ঘরে যেতেন, তখন স্ত্রী আয়েশা রা.-কে চুম্বন করতেন। আপনি যদি একজন আদর্শ স্বামী হতে পারলেন না বা আদর্শ স্ত্রী হতে পারলেন না, তাহলে আপনার চরিত্র ঠিক হলো না。

আপনাকে আরও পরিশুদ্ধ হতে হবে। রাগ এলে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা এ জায়গায় অনেক পিছিয়ে। দেখা যায়, স্ত্রী যদি তরকারিতে লবণ একটু বেশি দিয়ে দেয়, তাহলে আপনি রাগ করে খাবার প্লেট ছুড়ে মারেন। এটা আদৌ সচ্চরিত্র হতে পারে না। এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন আপনি আখলাকের কোন স্তরে আছেন?

এতে বুঝা যায় যে, পূর্ণ ইসলামই প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল -এর পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকাকেই তাকওয়া বলা হয়। “বস্তুত তারাই মুত্তাকি, যাদের ঈমান ও 'আমল দুটিই পূর্ণাঙ্গ। আর ঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই ইসলাম।

তাকওয়ার তৃতীয় স্তর হচ্ছে, অন্তরকে আল্লাহ ব্যতিত যাবতীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখা। এই স্তরের তাকওয়া নবি ও ওলিগণের হয়ে থাকে। আর এটিই তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর。

কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَۛۚ فِيهِۛۚ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ

এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। [সুরা বাকারা: ২]

ইমাম গাজালি রাহ. তাকওয়ার চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন। আগে একদিন বলেছি। কথাগুলো আজ আবার স্মরণ করিয়ে দিই :

১. শরিয়তে যেসব বস্তু হারাম করা হয়েছে, আল্লাহর ভয়ে সকল বস্তু থেকে বিরত থাকা। যেমন, মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা ও সুদ খাওয়া প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা। এটি সাধারণ মুমিনের তাকওয়া। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় মুমিন।

২. হারাম বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকার পর সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতেও দূরে থাকা। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় সালেহ।

৩. সকল হারাম বস্তু ও সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকার পর আল্লাহর ভয়ে অনেক সন্দেহবিহীন হালাল বস্তুও পরিত্যাগ করা। এ শ্রেণিকে মুত্তাকি বলা হয়।

৪. উপর্যুক্ত তিন শ্রেণির তাকওয়া আয়ত্ত করার পর এমন সকল হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা, যা ইবাদতে কোনো সহায়তা করে না। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় ‘সিদ্দিক’।

জামাআতে নামাজ পড়া

যারা নিয়মিত জামাআতে নামাজ পড়বে তারা এ যুগের সবচেয়ে বড় ওলি। তাই এদের দেখে মশকারা না করে মুহাব্বাত করতে হবে। যারা জামাআতে নামাজ পড়ল, তারা বিশেষ প্রকার মুত্তাকি। এখন ভিভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার জন্য আরও কিছু গুণ অর্জন করতে হবে। যেমন ফরজ নামাজ পড়বে। সুন্নাতে মুআক্কাদা ছাড়বে না। অনেকে আছেন, যারা জুমুআর জামাত পড়েন, অথচ তার আগে ও পরের সুন্নাত পড়েন না। যদি সুন্নাত আদায় না করেন, তাহলে গুনাহগার হবেন। তাই ভিআইপি মুত্তাকির জন্য ফরজ নামাজ পড়তে হবে। ভিআইপি মুত্তাকির জন্য সুন্নাত ছাড়া যাবে না। আরও উচ্চ মর্যাদাবান মুত্তাকি হওয়ার জন্য নফল বেশি বেশি পড়তে হবে।

রমজানে বেশি নফল পড়লে বেশি সাওয়াব। এখানে ৮ রাকাত, ২০ রাকাত নিয়ে ঝগড়া কীসের? যত বেশি পড়বে তত বেশি মর্যাদা। যে যত বেশি নফল পড়বে, সে তত বেশি মর্যাদাবান হবে। নফলের মাধ্যমে বান্দা আর বান্দা থাকে না, সে তখন আল্লাহর বন্ধু হয়ে যায়। আল্লাহর বন্ধু হওয়ার জন্য তিনি আমাদের রমজান দিয়েছেন। বন্ধুত্বের কারণে এক বন্ধুর মুখের গন্ধ অপর বন্ধুর কাছে ভালো লাগে। তাই তো রমজানে রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশক আম্বরের চেয়েও প্রিয়।

রমজানে বেশি বেশি নফলের মাধ্যমে আল্লাহর বন্ধু হওয়া যায়। রমজানে নফল পড়া, রমজানের বাইরে ফরজ পড়ার সমান সাওয়াব। তাই তারাবি ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত, তা নিয়ে ঝগড়ায় যাবার দরকার নেই। যত বেশি নফল পড়বেন, ততই উপকার। বেশি বেশি নফল পড়ুন।

সালাতুত তারাওয়িহ

তারাওয়ির সম্পর্কে যে হাদিস নিয়ে প্রোপাগান্ডা হয়, সে হাদিসটি আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি এখানে আট রাকাত বলেছেন। এখানে মূলত তারা হাদিস না বুঝে বিভ্রান্ত হয়েছে। কারণ হাদিসে আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাহাজ্জুদ সম্পর্কে। রাসুল তিন রাত তারাবির নামাজ জামাআতে পড়েছেন। প্রশ্নকারী সাহাবিও সে জামাআতে উপস্থিত ছিলেন। তাহলে তিনি তারাবির রাকাত সম্পর্কে জানতেন। তবে তা জানার পরেও প্রশ্ন করার কারণ কি ছিল? প্রশ্নের কারণ ছিল, তারাবির নামাজ সম্পর্কে তো জানি, তবে রাসুল তাহাজ্জুদ কয় রাকাত পড়তেন, তা জানা। এ জন্য আয়েশা রা. জবাব দিলেন রমজান ও রমজান ছাড়া নবিজি ৮ রাকাত পড়তেন। রমজান ও রমজান ছাড়া তারাওয়ি পড়া হয়, নাকি তাহাজ্জুদ পড়া হয়? আবার ২০ রাকাত পড়ার কথা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন। তাই আয়েশার হাদিস তারাওয়ির নয়, তাহাজ্জুদের।

কিন্তু এই বিভ্রান্তি এল কেন? সহিহ বুখারির একটি হাদিস এবং ইমাম বুখারিকে না চেনার কারণে সমস্যা হয়েছে। ইমাম বুখারি রাহ. এ হাদিসটি এনেছেন কিয়ামু রমজান অধ্যায়ে। দেখেন, এখানে দুটি জিনিস। এক. কিয়ামু রমজান। দুই, কিয়ামুল লাইল। কিয়ামু রমজান মানে তারাওয়ির নামাজ। মুহাদ্দিসগণ এ শিরোনামে যত হাদিস এনেছেন, এগুলো দ্বারা তারাওয়ির নামাজ উদ্দেশ্য। আরেকটি হচ্ছে, কিয়ামুল লাইল। এটি হচ্ছে তাহাজ্জুদের নামাজ। মুহাদ্দিসগণ এ শিরোনামে যত হাদিস এনেছেন, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাহাজ্জুদ।

কিন্তু ইমাম বুখারি রাহ. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস কিয়ামু রমজান বাবে এনেছেন। তাই কোনো কোনো স্কলার বলেছেন, কিয়ামে রমজান মানে তারাওয়ির নামাজ। আবার এই হাদিসটি ইমাম বুখারি রাহ. কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ অধ্যায়েও এনেছেন। তাই বুঝা যায় এটি তাহাজ্জুদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন প্রশ্ন আসে এক হাদিস তাহাজ্জুদের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার তারাওয়ির সাথে সম্পর্কিত। এই দ্বন্দ্ব নিরসন হবে কীভাবে?

এই দ্বন্দ্ব নিরসন সহিহ মুসলিমে পাওয়া যায়। ইমাম মুসলিম রাহ, ইমাম বুখারির উল্লেখযোগ্য একজন শাগরিদ ছিলেন। আয়েশার এই হাদিসকে তিনি কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে এনেছেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারি, ইমাম বুখারি রাহ. তারাওয়ির অধ্যায় হাদিস তারাওয়ি হিশেবে আনেননি; বরং তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য। কিন্তু অনেকে ইমাম বুখারিকে না বোঝার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

ইমাম বুখারি রাহ. তরজমাতুল বাব কায়িম করেছেন, একটি হাদিসের একটি শব্দের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে। রমজান শব্দটি হাদিসে উল্লেখ হওয়ার কারণে কিয়ামুর রমজানে হাদিসটি এনেছেন। তারাওয়ি হিশেবে নয়। ইমাম বুখারিকে না বোঝার কারণে জনসাধারণে বিভ্রান্ত করানোর প্রয়োজন নেই। বরং রমজানে যত বেশি নফল পড়বেন, ততই উপকার। বেশি বেশি নফল পড়ুন। আল্লাহ আমাদের মুত্তাকি হওয়ার কাজ করার তৌফিক দান করুন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 মুত্তাকিদের মর্যাদা

📄 মুত্তাকিদের মর্যাদা


আল্লাহ পাকের শুকরিয়া, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের মাসে এখানে আসার ও বসার তাওফিক দিয়েছেন। বরকতময় এই মাসটি শেষ হওয়ার পথে। আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকদিন বাকি আছে। মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ا أَيَّامًا مَّعْدُودُتٍ গণনার কয়েকদিন মাত্র। এই গণনার মাত্র কয়েকদিন দ্বারা উদ্দেশ্য দুইটি-এক. গুনে গুনে শেষ। দুই. এটি হিসাবের দিন। যেমন কেউ কারও সম্পর্কে বলল, সে তো কোনো হিসাবের মানুষ নয়। তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, লোকটির কোনো সম্মান নেই। আর যদি বলে, সে তো বেশ হিসাবের মানুষ, যেকোনো ব্যাপারে তার মতামত নেওয়া দরকার, তখন বোঝা যায় ব্যক্তির সম্মান আছে। মহান আল্লাহ রমজানের প্রত্যেকটা মুহূর্ত ও প্রতিটি দিন সম্পর্কে কুরআন মাজিদে أَيَّامًا مَّعْدُوذَتِ বলেছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা হিসাবের সময়, হিসাবের দিন। সম্মানিত হওয়ার মুহূর্ত। প্রতিটি মুহূর্তে মুমিনের মর্যাদা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায়。

রমজান মুত্তাকিদের উন্নতির একটা সিঁড়ি। এটি এসেছে মূলত মানুষকে মুত্তাকি বানানোর জন্য। আমরা ইতিপূর্বে মুত্তাকি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আপনারা জেনেছেন, মুত্তাকির বিভিন্ন স্তর আছে। এক. সাধারণ মুত্তাকি। যেমন ঈমানদার হওয়া। দুই, বিশেষ মুত্তাকি, আল্লাহর হুকুম মেনে চলা ও তাঁর নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা। এখন আপনি নিজে নিজে চিন্তা করুন, আপনি বিশেষ মুত্তাকি নাকি সাধারণ মুত্তাকি?

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে বিশেষ মুত্তাকির পরিচয় কি? বিশেষ মুত্তাকি পরিচয়ের পদ্ধতি দুটি। যেমন একটি গাছে ফল ধরল এবং এক সময় ফল পাকল। এই ফল পাকা হওয়া দুইভাবে বোঝা যায়-হয়তো ফলটির রং পরিবর্তন হবে, নয়তো তাতে একটি নতুন ঘ্রাণ আসবে। যেমন আম উপযুক্ত হওয়ার পর আমরা তার রং পরিবর্তনের মাধ্যমে বুঝি। আর কাঁঠাল পেকে গেলে আমরা তার ঘ্রাণের মাধ্যমে বুঝি। আল্লাহ বলেন, صِبْغَةَ اللهِ 'তোমরা আল্লাহর রঙে রঙিন হও।' [সুরা বাকারা: ১৩৮]

সারমর্ম হলো, আল্লাহ হুকুম ও নবির তরিকা পালন করতে নিজেকে প্রস্তুত করো।

তাই আপনি যদি ভিআইপি বা বিশেষ মুত্তাকি হন, তাহলে প্রকাশ্য আলামত দ্বারা বুঝা যাবে। আবার অনেকে আছেন বিশেষ মুত্তাকি; কিন্তু মানুষ তাদের চিনে না। তাদের সম্পর্কে রাসুল বলেন,

إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ

আল্লাহর কিছু বান্দা এমনও রয়েছেন, যদি তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে কোনো শপথ করে বসেন, তবে আল্লাহ তাদের শপথ সত্যে পরিণত করে দেন।

অর্থাৎ, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বিশেষ কিছু মুত্তাকি আছেন, যাদের মানুষ চিনে না। অথচ তাঁরা যদি আল্লাহর কাছে মুখ খুলে কিছু বলেন, সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে যায়। এটি হচ্ছে দ্বিতীয় প্রকারের বিশেষ মুত্তাকি। রঙে বুঝা যায় না, কিন্তু ঘ্রাণে বুঝা যায়।

তারিখের কিতাব সাক্ষী। বালাকোটের যুদ্ধে এক কাফির নবিজিকে গালি দিয়ে বসল।

তখন শাহ ইসমাইল শহিদ আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি বললেন, তুই আমার নবিকে গালি দিয়েছিস! আল্লাহর কসম, তোর ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করার আগ পর্যন্ত আমার মৃত্যু হবে ঘন। কথাটি তিনি বলে ফেলেছিলেন নবিজির মুহাব্বাতে। নবিকে গালি দিলে নবির প্রকৃত কোনো উম্মত স্থির থাকতে পারে না। কথাটি বলার পর পেছন থেকে এক দুশমন এসে শাহ ইসমাইল শহিদকে আঘাত করল। যার ফলে তার মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেল।

হাতে তরবারি, মাথাবিহীন শরীর নিয়ে শাহ ইসমাইল শহিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ধাওয়া দিলেন নবিজিকে গালি দেওয়া সেই দুশমনকে। লোকটি এই অবস্থা দেখে ভয়ে দৌড়ে পালাতে লাগল। শাহ ইসমাইল ছুটলেন তার পেছনে!

এটা কীভাবে সম্ভব?
মাথাবিহীন শরীর নিয়ে সামনে বাড়া?
ওই যে! লাও আকসামা আলাল্লাহি লা-আবাররা'আহ, আল্লাহর খাস বান্দারা আল্লাহর উপর ভরসা করে কোনো শপথ করে ফেললে আল্লাহ তাঁর শপথ সত্যে পরিণত করে দেন। শাহ ইসমাইল দৌড়ে গিয়ে লোকটির ঘাড়ে তরবারি চালালেন। নবির দুশমনের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে তাকে নিচে ফেলে নিজে গিয়ে পড়লেন তার বুকের উপর। এভাবেই আল্লাহর নবির দুশমনকে জাহান্নামের রাস্তা দেখিয়ে শাহাদাত বরণ করলেন ঐতিহাসিক বালাকোট যুদ্ধের বীর সেনানী শাহ ইসমাইল শহিদ রাহিমাহুল্লাহ।

দ্বিতীয় প্রকারের বিশেষ মুত্তাকি, যাদের রঙে বুঝা যায় না, কিন্তু ঘ্রাণে বুঝা যায়, এই ঘ্রাণ কেমন ঘ্রাণ? কেউ বিশেষ মুত্তাকি কি-না, কীভাবে বুঝবেন? তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ বলেন, এই ঘ্রাণ হলো, প্রত্যেক কাজে সুন্নাতের অনুসন্ধান করে চলা। যারা তাদের প্রতিটি কাজে সুন্নতের অনুস্মরণ করেন, তাদের চলনে এই ঘ্রাণ পাওয়া যায়।

কেউ ৫০ বছর নামাজ আদায় করল কিন্তু কোন তরিকায় নবির সুন্নাত রয়েছে, এটা জানল না। তাহলে বোঝা গেল এই নামাজের কোনো ঘ্রাণ নেই। তাহলে নামাজে ঘ্রাণ হবে কীভাবে? যখন কোনো ব্যক্তি নামাজ আদায় করবে, নবির সুন্নাতকে অনুসন্ধান করবে এবং সে অনুযায়ী আদায় করবে, তখন তার নামাজে ঘ্রাণ আসবে। মনে করেন, আপনারা ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত পড়েন কিন্তু এই দুই রাকাতের প্রথম রাকাত ও দ্বিতীয় রাকাতে যে কেরাত পড়া সুন্নাত, সে অনুযায়ী কেরাত পড়া সুন্নাত। যেমন প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া। এটা হলো ফজরের সুন্নতের সুন্নাত কেরাত। অন্য সুরা পড়লে অসুবিধা নেই; কিন্তু নবিজি এ দুটি সুরা বেশি বেশি পড়েছেন, আপনিও তাই পড়বেন। ফলে প্রথমত আপনি সুন্নাত পড়েছেন আবার কেরাতের সুন্নাতও আদায় হয়ে গেল।

অনুরূপভাবে মিসওয়াক করা একটি সুন্নাত। পাশাপাশি এটি গাছের ডাল হওয়া আরেকটি সুন্নাত। এক সুন্নাতের ভেতর আরও সুন্নাত থাকে। তাই এসব সুন্নাত যখন আপনি অনুসন্ধান করবেন, সে অনুযায়ী নামাজ পড়বেন, তখন আপনার ভেতরে ঘ্রাণ আসবে। ফলে আপনার নামাজেও ঘ্রাণ আসবে। এমনিভাবে রোজা রাখলে নবিজি কীভাবে রোজা রাখতেন, সাহরি খেলে নবিজি কীভাবে সাহরি খেতেন—এরকম খোঁজাখুঁজি করার মনমানসিকতা যখন আপনার ভেতরে তৈরি হবে, তখন আপনার নামাজে, আপনার আমলে ঘ্রাণ আসতে শুরু করবে। আপনি নিজেও সেটা টের পাবেন। এমনিভাবে কথাবার্তা, চলাফেরা প্রত্যেক জিনিসে সুন্নাত অনুসরণ করে চলার যদি মনমানসিকতা তৈরি হয়ে যায়, বুঝা যাবে আপনি বিশেষ মুত্তাকি এবং আপনার ভেতরে একটি ঘ্রাণ চলে এসেছে।

তাকওয়া ছাড়া আমাদের বাঁচার কোনো উপায় নেই। হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়ার মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া। আল্লাহপাক বলেন,

وَإِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَكُمْ

তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। [সুরা হুজুরাত: ১৩]

আপনার অন্তরের খবর আমি জানি না। আমার অন্তরের খবর আপনি জানেন না। এটা আল্লাহ ও বান্দার ব্যাপার। এখন আপনার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। ভালো করে স্মরণ রাখবেন! অন্তরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পবিত্র করা ফরজ। কুরআনের ভাষায় যাকে তাজকিয়াতুন নাফস বলা হয়। এটি ফরজে আইন। প্রত্যেককে তার অন্তর পরিষ্কার করতে হবে। কেউ যদি অন্তর পরিষ্কার না করে ময়লাযুক্ত অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে যায়, তার নাজাত মিলবে না। এ জন্য অন্তরকে পরিষ্কার করা ফরজ।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে কীভাবে অন্তরকে পরিষ্কার করবে? জবাব হলো, আমরা ওজুর সময় শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করি। হাত মুখ ধুই। কিন্তু অন্তরকে পাক- পবিত্র কীভাবে করব? আল্লাহ বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى যে তার নিজেকে পবিত্র করল, সেই সফলকাম হল। [সুরা আ'লা: ১৪] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّهَا সে-ই সফল হয়েছে, যে নিজেকে পবিত্র করেছে। আর সে-ই ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে। [সুরা শামস : ৯-১০]

এখন শরীর পবিত্র করার পদ্ধতি কী? শরীরকে পবিত্র করা যায় অজুর মাধ্যমে। কেউ অজু করলে তাহলে তার পুরো শরীর পবিত্র হয়ে গেল।

এখনে একটি কথা মনে রাখি। ইসলাম যুক্তি দিয়ে চলে না। ইসলাম চলে কুরআন সুন্নার দলিল দ্বারা। মনে করেন কারো বায়ু বের হল। তাহলে এই বায়ু বের হওয়ার কারণে পবিত্র হতে আমরা হাত-পা ধুই। এখন যদি কেউ যুক্তি দেয়, বায়ু বের হলো এক অঙ্গ দিয়ে, অন্য অঙ্গ ধৌত করতে হবে কেন? এমন যুক্তি উদ্ভট যুক্তি।

তাহলে কি ইসলাম একটি অযৌক্তিক ধর্ম? না, মোটেও না। ইসলামের প্রতিটি কাজেই যুক্তি আছে। কেউ কাউকে বন্দুক দিয়ে গুলি করে হত্যা করল। এবার বিচারে ফাঁসি হবে কার? বন্দুকের, নাকি বন্দুক যে চালিয়েছে- তার? আপনি বলবেন অবশ্যই বন্দুকধারীর। যে বন্দুক চালিয়েছে, তার। গুলিকে তো আর ফাঁসি দেয়া হবে না। কারণ বন্দুকধারী এটি চালিয়েছে। বায়ু বের হয় খাবারের জন্য। আর এই খাবারের জন্য হাতমুখ ব্যবহার করা হয়। তাই যেন হাত ও মুখের কারণে বাতাস বের হলো। সুতরাং হাতমুখ ধুতে হবে।

জাহিরি নাপাকি পরিষ্কারের পদ্ধতি হলো মুখ ধৌত করা। মাথা মাসেহ করা। কিন্তু অন্তর কীভাবে পবিত্র করবেন? কী থেকে পবিত্র করবেন? প্রথমত অন্তর নাপাক হওয়ার কারণ হলো, অন্তরে হিংসা-অহংকার থাকা। যার অন্তরে হিংসা ও অহংকার থাকে, তার অন্তর নাপাক।

আপনারা আগেও শুনেছেন। তাকওয়ার সম্পর্ক হলো আল্লাহর সঙ্গে। আপনি বিশেষ তাকওয়া অর্জন করলেন। এটি আল্লাহর হক। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই বিশেষ তাকওয়ার জন্য আরও দুটি বান্দার হক মেনে চলতে হবে:

১. আপনার অন্তরকে হিংসা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আপনার অন্তর যেন কারও প্রতি হিংসা পোষণ না করে।
২. মানুষের কল্যাণ কামনা করা। হয়তো আপনি সুযোগ পেলে কারও উপকার করলেন অথবা উপকার করতে পারলেন না। কিন্তু তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

কেউ যখন এই মন মানসিকতা থেকে আল্লাহকে ভয় করে, রাসুলের তরিকায় চলে, সে হলো বিশেষ শ্রেণির মুত্তাকি। আবার কোনো ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম ও নবির তরিকা মতো চলে, আবার অন্তরে অন্যকে দিয়ে হিংসা পোষণ করে, অথবা অন্যের জন্য ক্ষতি মনে পুষে রাখে। তাহলে এই অন্তর অপবিত্র। এই অন্তরকে পবিত্র করা ফরজ। এরকম অন্তর পবিত্র না করে কেউ যদি মারা যায়, তাহলে সে তো জান্নাত পাবে না বরং জাহান্নামে যাবে। আল্লাহ বলেন,

‏يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে। [সুরা [শুআরা: ৮৮-৮৯

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, এমন অন্তর কীভাবে তৈরি করব? উত্তর হচ্ছে, কেউ যদি নিজে নিজে এমন অন্তর তৈরি করতে পারে, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আর যদি নিজে নিজে এমন অন্তর তৈরি করা সম্ভব না হয়, তাহলে এরকম পরিষ্কার অন্তরওয়ালাদের কাছে যেতে হবে। তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে। এটা তার জন্য জরুরি। এভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে সাধারণ মুত্তাকি থেকে বিশেষ মুত্তাকি হয়ে, অতঃপর বিশেষ বিশেষ মুত্তাকি হওয়া যায়। তখন তার অন্তরের অবস্থা কেমন হয়? কবি বলেন,

هر تمنا دل سے رخصت ہو گئی : اب تو آجا اب تو خلوت ہو گئی ایک تم سے کیا محبت ہو گئی : ساری دنیا سے عداوت ہو گئی

অর্থাৎ, তখন তার অন্তরে আর কোনো আফসোস থাকবে না। আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। সে বলবে আমার সবকিছু দেখা হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ, আমি কেবল আপনাকে দেখতে চাই। লোকটির অন্তরে কোনো গাফিলতি নেই, কেবল তার অন্তরে আল্লাহর স্মরণ বিদ্যমান।

شفاء القلوب لقاء المحبوب অর্থাৎ, যে অন্তরে আল্লাহর স্মরণ সবসময় বিদ্যমান থাকে, এমন অন্তর আমাদেরকে তৈরি করতে হবে। এমন অন্তর তাকওয়ার জন্য উপযোগী।

আপনারা পূর্বের আলোচনায় মুত্তাকির পরিচয় সম্পর্কে জেনেছেন। সহজ করে আমরা বলতে পারি, যার অন্তরে গুনাহ নেই, সেই মুত্তাকি। মুত্তাকির আবার বিভিন্ন স্তর আছে। এমন স্তর আছে, যেখানে মুত্তাকির অন্তরে কবিরা গুনাহ নেই। আবার এমনও আছে, যেখানে মুত্তাকির অন্তরে সগিরা গুনাহ নেই। আবার এমনও মুত্তাকি আছেন, যাদের অন্তরে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। আবার কোনো কোনো মুত্তাকি এমনও আছেন, যারা জায়িজ-নাজায়িজ, উত্তম-অনুত্তমও মেনে চলেন। সবসময় তিনি উত্তম কাজ করেন। অনুত্তম কাজ করেন না। এই মর্মে হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন,

إِنَّ الْحَلالَ بَيِّنُ وَإِنَّ الْحَرامَ بَيِّنُ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرُ مِنَ النَّاسِ

অবশ্যই হালাল বিবৃত ও স্পষ্ট এবং হারাম বিবৃত ও স্পষ্ট, আর উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দিহান বস্তু; যা অনেকেই জানে না।

হালাল ও হারাম পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি স্থান আছে সন্দেহের, যা সবাই বোঝে না। অথবা যা বুঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এই সন্দেহ নিরসনের জন্য জিজ্ঞাসার জায়গাটি মহান আল্লাহ কুরআনে বলে দিয়েছেন,

فَسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ ﴾

তোমরা কোনো বিষয় না জানলে বিজ্ঞদের কাছে তা জিজ্ঞেস করো। [সুরা আম্বিয়া: ৭]

জুন্নুন মিসরি
কীভাবে কার কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে, এ ব্যাপারে জুন্নুন মিসরি রাহ. দুটি পদ্ধতি বলে দিয়েছেন। পদ্ধতি জানার আগে আমরা জুন্নুন মিসরি সম্পর্কে একটু জেনে নিই।

জুন্নুন একজন বড় আল্লাহর অলি ছিলেন। কাশফুল মাহজুব নামক কিতাবে উল্লেখ আছে, জুন্নুন মিসরি রাহ. যখন মারা যান, তখন আল্লাহর কুদরতে একটি কারামত প্রকাশ পেল। তাঁর কপালে ভেসে ওঠল- 'হাবিবুল্লাহ মা-তা ফি হুব্বিল্লাহ' অর্থাৎ, তিনি আল্লাহর বন্ধু। আল্লাহর প্রেমে মারা গেছেন।

তাঁর জানাজার সময় অত্যন্ত গরমের দিন ছিল। আকাশে ছিল উত্তপ্ত সূর্য। কিন্তু তাঁকেসহ উপস্থিত মুসল্লিদের এক ঝাঁক পাখি এসে মাথার উপরে ছায়া দিতে শুরু করল। এটি কারামাতুল আউলিয়া। তিনি আল্লাহর বন্ধু ছিলেন। আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার পথ জানতেন। তিনি বলে গিয়েছেন, তোমরা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে চাইলে তিনটি কাজ করবে।

এক. আলিমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। উলামা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمُوا বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, কেবল তারাই আল্লাহকে ভয় করে। [সুরা ফাতির : ২৮]

মুহাব্বাত ও সম্মান দিয়ে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন উলামায়ে কেরাম। মুত্তাকি হওয়ার পথ সম্পর্কে জুন্নুন রাহ. বলেন, তোমরা নিজেদের মূর্খ মনে করে উলামাদের কাছে যাও; ভুল ধরার জন্য নয়। ভুল ধরার জন্য সর্বপ্রথম প্রশ্ন করেছিল শয়তান। তাই এটি শয়তানের কাজ। আল্লাহ তাকে সিজদা করতে বললেন। সে যুক্তি দেখাল, আমি আগুনের তৈরি, আর আদম মাটির তৈরি। তাই আমাকেই সিজদা করা উচিত। ইবনু সিরিন রাহ. বলেন,

إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِينٌ فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ নিশ্চয়ই এই (সনদের) ইলম হচ্ছে দ্বীন। অতএব তোমরা লক্ষ্য রাখবে যে, তোমাদের দ্বীন কার থেকে গ্রহণ করছো।

কুরআন-হাদিসের ইলম হচ্ছে দ্বীন। তাই কার থেকে দ্বীন নিবে লক্ষ্য করো। এখানে 'মান' হরফ উল্লেখ করা হয়েছে। 'মান' বিবেকবান মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। 'মা' হরফ অন্যভাবে ব্যবহার হয়। সুতরাং 'মান' উল্লেখ দ্বারা বুঝা যায়, বিবেকবান মানুষ থেকে ইলম অর্জন করতে হবে। 'মা'-এর ক্ষেত্রে বিবেকবান হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। ইন্টারনেট-ফেইসবুকের বিবেক নেই। তাই এতে সত্যিকারের ইলম অর্জন হবে না। আলিম থেকে ইলম অর্জন করলে শয়তান বিভ্রান্ত করতে পারবে না।

দুই. আলিমদের কাছে মুহাব্বাতের মাধ্যমে যাও। ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার জন্য নয়। আলিমদের নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করলে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কম্পন শুরু হয়ে যায়।

তিন. আলিমদের সাথে সাক্ষাত করাকে ইবাদত মনে করবে।

জুন্নুন রাহ. বলেন, আলিমদের সঙ্গে ভালোবাসার মাধ্যমে সম্পর্ক রাখ। রাসুল দুআ করতেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ

হে আল্লাহ, আমি আপনার মুহাব্বাত চাই এবং আপনাকে যারা মুহাব্বাত করে, তাদেরও মুহাব্বাত চাই।

অর্থাৎ, আমি আপনার ভালোবাসা চাই এবং আপনাকে যারা ভালোবাসে, তাদের মুহাব্বাত চাই। যারা রোজা রাখেন, নামাজ পড়েন, তারা মূলত আল্লাহর মুহাব্বাত করেন। এ যুগের বিশেষ প্রকার মুত্তাকি হলেন, যারা পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ আদায় করেন। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

তবে ১৮টি উজরের (দ্র. নুরুল ইজাহ) কোনো এক উজরের কারণে যদি জামাত তরক হয়ে যায়, আর ব্যক্তি একা একা নামাজ পড়ে নেয়, তাহলে সে জামাআতের সাওয়াব পাবে। আপনারা যদি এশার নামাজ জামাআতে পড়েন, আবার ফজরের নামাজ জামাআতে পড়েন, তাহলে শবে কদরের ফজিলত ছুটবে না। কারণ সহিহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, যে ইশার নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করে ঘুমিয়ে পড়ে, আবার ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়ে, তাহলে সারা রাত জেগে ইবাদত করার সওয়াব পাবে। আমরা জামাআতের সঙ্গে নামাজ পড়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

যারা নিয়মিত জামাআতে নামাজ পড়বে তারা এ যুগের সবচেয়ে বড় ওলি। তাই এদের দেখে মশকারা না করে মুহাব্বাত করতে হবে। যারা জামাআতে নামাজ পড়ল, তারা বিশেষ প্রকার মুত্তাকি। এখন ভিভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার জন্য আরও কিছু গুণ অর্জন করতে হবে। যেমন ফরজ নামাজ পড়বে। সুন্নাতে মুআক্কাদা ছাড়বে না। অনেকে আছেন, যারা জুমুআর জামাত পড়েন, অথচ তার আগে ও পরের সুন্নাত পড়েন না। যদি সুন্নাত আদায় না করেন, তাহলে গুনাহগার হবেন। তাই ভিআইপি মুত্তাকির জন্য ফরজ নামাজ পড়তে হবে। ভিআইপি মুত্তাকির জন্য সুন্নাত ছাড়া যাবে না। আরও উচ্চ মর্যাদাবান মুত্তাকি হওয়ার জন্য নফল বেশি বেশি পড়তে হবে।

রমজানে বেশি নফল পড়লে বেশি সাওয়াব। এখানে ৮ রাকাত, ২০ রাকাত নিয়ে ঝগড়া কীসের? যত বেশি পড়বে তত বেশি মর্যাদা। যে যত বেশি নফল পড়বে, সে তত বেশি মর্যাদাবান হবে। নফলের মাধ্যমে বান্দা আর বান্দা থাকে না, সে তখন আল্লাহর বন্ধু হয়ে যায়। আল্লাহর বন্ধু হওয়ার জন্য তিনি আমাদের রমজান দিয়েছেন। বন্ধুত্বের কারণে এক বন্ধুর মুখের গন্ধ অপর বন্ধুর কাছে ভালো লাগে। তাই তো রমজানে রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশক আম্বরের চেয়েও প্রিয়।

রমজানে বেশি বেশি নফলের মাধ্যমে আল্লাহর বন্ধু হওয়া যায়। রমজানে নফল পড়া, রমজানের বাইরে ফরজ পড়ার সমান সাওয়াব। তাই তারাবি ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত, তা নিয়ে ঝগড়ায় যাবার দরকার নেই। যত বেশি নফল পড়বেন, ততই উপকার। বেশি বেশি নফল পড়ুন।

সালাতুত তারাওয়িহ

তারাওয়ির সম্পর্কে যে হাদিস নিয়ে প্রোপাগান্ডা হয়, সে হাদিসটি আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি এখানে আট রাকাত বলেছেন। এখানে মূলত তারা হাদিস না বুঝে বিভ্রান্ত হয়েছে। কারণ হাদিসে আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাহাজ্জুদ সম্পর্কে। রাসুল তিন রাত তারাবির নামাজ জামাআতে পড়েছেন। প্রশ্নকারী সাহাবিও সে জামাআতে উপস্থিত ছিলেন। তাহলে তিনি তারাবির রাকাত সম্পর্কে জানতেন। তবে তা জানার পরেও প্রশ্ন করার কারণ কি ছিল? প্রশ্নের কারণ ছিল, তারাবির নামাজ সম্পর্কে তো জানি, তবে রাসুল তাহাজ্জুদ কয় রাকাত পড়তেন, তা জানা। এ জন্য আয়েশা রা. জবাব দিলেন রমজান ও রমজান ছাড়া নবিজি ৮ রাকাত পড়তেন। রমজান ও রমজান ছাড়া তারাওয়ি পড়া হয়, নাকি তাহাজ্জুদ পড়া হয়? আবার ২০ রাকাত পড়ার কথা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন। তাই আয়েশার হাদিস তারাওয়ির নয়, তাহাজ্জুদের।

কিন্তু এই বিভ্রান্তি এল কেন? সহিহ বুখারির একটি হাদিস এবং ইমাম বুখারিকে না চেনার কারণে সমস্যা হয়েছে। ইমাম বুখারি রাহ. এ হাদিসটি এনেছেন কিয়ামু রমজান অধ্যায়ে। দেখেন, এখানে দুটি জিনিস। এক. কিয়ামু রমজান। দুই, কিয়ামুল লাইল। কিয়ামু রমজান মানে তারাওয়ির নামাজ। মুহাদ্দিসগণ এ শিরোনামে যত হাদিস এনেছেন, এগুলো দ্বারা তারাওয়ির নামাজ উদ্দেশ্য। আরেকটি হচ্ছে, কিয়ামুল লাইল। এটি হচ্ছে তাহাজ্জুদের নামাজ। মুহাদ্দিসগণ এ শিরোনামে যত হাদিস এনেছেন, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাহাজ্জুদ।

কিন্তু ইমাম বুখারি রাহ. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস কিয়ামু রমজান বাবে এনেছেন। তাই কোনো কোনো স্কলার বলেছেন, কিয়ামে রমজান মানে তারাওয়ির নামাজ। আবার এই হাদিসটি ইমাম বুখারি রাহ. কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ অধ্যায়েও এনেছেন। তাই বুঝা যায় এটি তাহাজ্জুদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন প্রশ্ন আসে এক হাদিস তাহাজ্জুদের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার তারাওয়ির সাথে সম্পর্কিত। এই দ্বন্দ্ব নিরসন হবে কীভাবে?

এই দ্বন্দ্ব নিরসন সহিহ মুসলিমে পাওয়া যায়। ইমাম মুসলিম রাহ, ইমাম বুখারির উল্লেখযোগ্য একজন শাগরিদ ছিলেন। আয়েশার এই হাদিসকে তিনি কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে এনেছেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারি, ইমাম বুখারি রাহ. তারাওয়ির অধ্যায় হাদিস তারাওয়ি হিশেবে আনেননি; বরং তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য। কিন্তু অনেকে ইমাম বুখারিকে না বোঝার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

ইমাম বুখারি রাহ. তরজমাতুল বাব কায়িম করেছেন, একটি হাদিসের একটি শব্দের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে। রমজান শব্দটি হাদিসে উল্লেখ হওয়ার কারণে কিয়ামুর রমজানে হাদিসটি এনেছেন। তারাওয়ি হিশেবে নয়। ইমাম বুখারিকে না বোঝার কারণে জনসাধারণে বিভ্রান্ত করানোর প্রয়োজন নেই। বরং রমজানে যত বেশি নফল পড়বেন, ততই উপকার। বেশি বেশি নফল পড়ুন। আল্লাহ আমাদের মুত্তাকি হওয়ার কাজ করার তৌফিক দান করুন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 ঈমান বিল গাইব

📄 ঈমান বিল গাইব


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পরিষ্কার ঘোষণা করেন, এই কুরআন হলো মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। হিদায়ত পেতে হলে যে মুত্তাকি হতে হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের কিছু গুণের আলোচনা করেছেন। প্রাইমারি ক্লাসের মুত্তাকি হলো তারা, যারা ঈমানদার। আর ঈমানদার কারা? ঈমানদার হলো তারা, যারা নিজেদেরকে কুফর থেকে রক্ষা করে। কুফর থেকে নিজেকে রক্ষা করলেই সে ঈমানদার হয়ে গেল। যা মুত্তাকির প্রথম নাম্বার গুণ। মুত্তাকিদের প্রথম গুণ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে। [সুরা বাকারা: ৩] আমরা আল্লাহকে দেখিনি, জান্নাত জাহান্নাম দেখিনি, হুর গিলমান দেখিনি; কিন্তু বিশ্বাস করেছি, এটাই অদৃশ্যের বিশ্বাস। আহলে কিতাব ইহুদি-নাসারারা না দেখে ঈমান আনেনি। এরা দেখে ঈমান আনতে চায়। যেমন মুসা আ.-এর উম্মতের ব্যাপারে কুরআনে এসেছে, তারা মুসা আ.-কে লক্ষ্য করে বলল,

لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً আমরা আপনার উপর ঈমান আনব না, যতক্ষণ-না আল্লাহকে সরাসরি দেখব। অথচ আমরা আল্লাহকে না দেখেই বিশ্বাস করেছি। নবিজি বলেছেন আল্লাহ আছেন, ব্যাস, আমরা আর অবিশ্বাস করি না। মেনে নিই। এ জন্য মুসা নবির উম্মতের উপর আমাদের মর্যাদা।

হজরত ইসা আলাইহিস সালামের উম্মত খ্রিষ্টানদের কী অবস্থা? এদের কথাও কুরআনে আছে। এরা বলে,

أُنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ

ইসা নবি তাদেরকে বলেছিলেন, জান্নাতে গেলে মজার মজার খাবার খেতে পারবে। তারা তখন বলল, 'শুধু বললেই হবে না, আগে দেখান।' দেখুন, এরা কেমন মানুষ ছিল! অথচ আমরা নবির কথা অকপটে বিশ্বাস করে থাকি। উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা এ কারণেই বেশি হয়েছে। কারণ, এরা না দেখে বিশ্বাস করে। আর এই গুণটাই হলো মুত্তাকির প্রথম নম্বর গুণ।

এখন আমাদের জানা দরকার ঈমান জিনিসটা কী? এই যে আমরা না দেখেই ঈমান আনি, জানা দরকার এই ঈমান জিনিসটা আসলে কী? ঈমান শব্দের ৩টা অর্থ। ১. বিশ্বাস করা। ২. ভরসা করা। ৩. মেনে নেওয়া বা আত্মসমর্পণ করা।

ঈমান শব্দের পর যদি 'ا' আসে, তখন অর্থ হবে ভরসা করা। ঈমান শব্দের পর যদি 'উ' অক্ষর আসে, তখন অর্থ হবে আত্মসমর্পণ করা। আর ঈমান শব্দের পরে যদি 'ب' অক্ষর আসে, তখন অর্থ হবে বিশ্বাস করা। যেমন, الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ এখানে 'ب' অক্ষর এসেছে। এর অর্থ বিশ্বাস করা। ঈমানদার হলো তারা, যারা গাইবের উপর বিশ্বাস রাখে তথা না দেখে বিশ্বাস করে।

সুতরাং ঈমানের আভিধানিক অর্থ হলো, বিশ্বাস করা, ভরসা করা, আত্মসমর্পণ করা। আমরা আল্লাহর উপর ঈমান আনি, মানে তাঁকে বিশ্বাস করি, তাঁর উপর ভরসা করি, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করি। আভিধানিক অর্থের সাথে মূল ঈমানেরও সংযোগ রয়েছে। আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি বলে আমরা ঈমানদার। আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করি বলে আমরা ঈমানদার। আমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি বলে আমরা ঈমানদার।

এ জন্য আল্লাহ তাআলা ঈমানদারের গুণ বর্ণনা করতে যেয়ে আরেক জায়গায় বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمُ ايْتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

মুমিন তো তারাই, যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের উপর আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। [সুরা আনফাল: ২]

অর্থাৎ, সত্যিকার মুমিন হলো তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে। ঈমানদার যখন কুরআনের আয়াত শুনে, তখন তার ঈমানের পাওয়ার বেড়ে যায়। কুরআন শুনতে তার ভালো লাগে। যদি কুরআন শুনতে ভালো না লাগে, বরং গানবাজনা শুনতে মজা লাগে; বুঝতে হবে ঈমান জিন্দা নয়, মুর্দা হয়ে গেছে।

আমরা নিজের ঈমান নিজেই পরিমাপ করে নিতে পারব। ওয়াজ নসিহত শুনতে, কুরআন তিলাওয়াত শুনতে যদি ভালো লাগে, কুরআন বলে এটা সত্যিকার ঈমানের লক্ষণ।

মুমিনের আরেক গুণ হলো, وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ অর্থাৎ, তারা তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে। ভরসার অর্থ কী? ভরসার অর্থ এটা নয় যে, 'আল্লাহ ভরসা' বলে বসে থাকলাম আর আপনা-আপনি খাবার ঘরে চলে আসবে। ভরসা এটার নাম নয়; বরং ভরসা হলো, কোনো জিনিসের বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করে তবেই আল্লাহর ইচ্ছার অপেক্ষায় থাকা। আপনার খানার যে প্রয়োজন আছে, সে প্রয়োজনের আয়োজন করলেন, এরপর আল্লাহর উপর ভরসা করলেন যে, খাবার তো আয়োজন করলাম, সেটা খেতে পারব কি-না- আমি জানি না। আল্লাহ খাওয়ার তৌফিক না দিলে খাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। সুতরাং খাওয়ার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করলাম।

ইফতার রেডি করে আল্লাহর উপর ভরসা করা। রেডি না করেই ভরসা করে বসে থাকার নাম তাওয়াক্কুল নয়। ভরসা হলো ইফতার তৈরি করা, সাহরি তৈরি করা। ইফতার তৈরির জন্য সময় ব্যয় করা, এটাও ইবাদত। সাহরির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা, এটাও ইবাদত। সাহরি খাওয়া নেকি, সাহরির প্রস্তুতি গ্রহণ করাও নেকি। এরকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেই তবে আল্লাহ ভরসা।

আবার একথাও ঠিক নয় যে, কিছু তৈরি করে বললেন, আজকে সাহরি খাবই খাব। এটা করা যাবে না। বরং ভরসা করতে হবে আল্লাহর উপর। কারণ, আল্লাহ ইচ্ছা না করলে খাওয়া সম্ভব নয়। হতে পারে, খাওয়ার আগেই আপনার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যাবে। আপনি বাহ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর আল্লাহর উপর ভরসা করলেন, এটাই হলো ঈমান। এই পর্যায়ের ঈমানের আরেক নাম তাওয়াক্কুল।

وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ অর্থাৎ, মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে। সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহ ভরসা। নামাজ পড়ে গর্ব করে না; বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে এটা বলা যে, হে আল্লাহ, আমার নামাজটা কবুল করে নিও। কোনো ধরনের সাদকা-খায়রাত করে গর্ব করে না, আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং বলে যে, হে আল্লাহ! আমাকে তো তুমিই তাওফিক দিয়েছ। এটাই তাওয়াক্কুল। এটা মুমিনের গুণ।

যখন সে নেকির কোনো স্লোগান শুনে, সে নেকির মধ্যে অংশগ্রহণ করে। এটা হলো সত্যিকার মুমিনের গুণ। এক মুমিন আরেক মুমিনের প্রতি দরদী হয়, এটা মুমিনের গুণ। রমজান মাস দরদ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আসে। গরিবও রোজা রাখে, ধনীও রোজা রাখে। গরিব রোজা রাখে কেন? তার ঘরে ভাত নেই, এ জন্য? তাহলে ধনী রোজা রাখে কেন? তার ঘরে তো খাবার আছে! বরং ধনীদের রোজা হলো, গরিবের না খাওয়ার যে কষ্ট, সেটা অনুধাবন করার জন্য। একজন খানা পায় না, ভূখা; খানা চেয়েছে আপনার কাছে। আপনি দিচ্ছেন না! কেন দিচ্ছেন না? আপনারও তো না খেলে কষ্ট হয়!

একদল মানুষ আছে, যাদের রোজা রাখলে কষ্ট হয়! রোজায় নাকি ধরে ফেলে! তখন যা মন চায় তাই করে। আসলে কি রোজায় ধরে? রোজা রাখলে তো আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হওয়ার কথা। কাউকে কষ্ট না দেওয়ার কথা। এই রকম প্রশিক্ষণের নামই হলো রোজা। একজন লোক না খেয়ে যে কষ্ট করছে, এ কথা শুনে তার খানার ব্যবস্থা করে দেওয়া; এটাই হলো রোজার শিক্ষা।

যাই হোক, ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ তো বুঝা হলো। আরেকটা অর্থ আছে। ঈমান শব্দের মূল অর্থ হলো নিরাপত্তা। আরবি 'আমন' শব্দ থেকে এর উৎপত্তি।

মুমিনকে মুমিন এ জন্য বলা হয়, কারণ মুমিন কুফর থেকে নিজেকে নিরাপদ রেখেছে। হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করবেন। এই হলো মুমিন। আমরা যে মুমিন, এর মর্ম হলো আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ রাখলাম কুফর থেকে, আল্লাহ পাক আমাদেরকে হাশরের ময়দানে জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দান করে জান্নাতের অধিকারী করবেন। আর তারাই হবে প্রকৃত সফলকাম। আল্লাহ বলেন, فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ

এই হলো মুমিন। যাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তারাই কামিয়াব।

আল্লাহ মুমিন, বান্দা মুমিন

জানা থাকা দরকার, আল্লাহর একটি গুণবাচক নামও মুমিন। এবার আল্লাহও মুমিন, বান্দাও মুমিন। উভয়টির মধ্যে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য জানা জরুরি। আল্লাহর সম্পর্কে ধারণা হতে হবে। আল্লাহর আসল নাম কোনটি? গুণবাচক নাম কোনটি? কোন কোন গুণবাচক নাম বান্দার জন্যও হতে পারে? আর কোন কোন গুণবাচক নাম বান্দার জন্য ব্যবহার করা হারাম, এসব জানতে হবে।

আল্লাহর জাতি বা আসল নাম আল্লাহ। আল্লাহ বললে জিহ্বা উপরের দিকে উঠে। আল্লাহর মর্যাদা সকলের উপরে। এই আল্লাহ শব্দের উচ্চারণে 'খাড়া যবর' আছে। মনে করুন, আপনি যদি ব্যাংকে ৩ হাজার ডলার তুলতে যান, তখন ৩ হাজার লিখে 'মাত্র' লিখতে হয়। মাত্র না লিখলে আরও সংযোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য বাংলায় 'মাত্র', ইংরেজিতে 'Only' লিখতে হয়। এই শব্দ না লিখলে ৩ হাজারের সাথে আরও সংযোগ করার আশঙ্কা থেকে যায়। ঠিক তেমনি আল্লাহ শব্দের মাঝে খাড়া যবর দিয়ে বুঝানো হলো, আল্লাহ এক; আর কেউ তার শরিক নেই। আল্লাহ নামের সাথেও কেউ শরিক নেই। কেউ কি শুনেছেন, দুনিয়াতে কেউ কারও নাম 'আল্লাহ' রেখেছে? যত নষ্টই হোক না কেন, কেউ আল্লাহ নাম রাখে না। এটা একমাত্র আল্লাহর জন্য।

নাম রাখায় সতর্কতা

আল্লাহর অনেক গুণবাচক নাম আছে। এর মধ্যে একটা হলো 'আল মুমিন'। তবে আল্লাহর গুণবাচক এমন কিছু নাম আছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই, বান্দার জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন 'রাহমান' আল্লাহর একটা নাম আছে। এটা একমাত্র আল্লাহর জন্য। কারও নাম 'আব্দুর রাহমান' হলে তাকে আব্দুর রাহমানই ডাকতে হবে। শুধু 'রাহমান' ডাকা ঠিক হবে না।

ঠিক তেমনি আল্লাহর আরেকটি গুণবাচক নাম 'আল আহাদ'। এখন কারও নাম যদি 'আব্দুল আহাদ' হয়, তবে 'আব্দুল আহাদ'ই ডাকতে হবে। 'আহাদ' ডাকলে হবে না। আল্লাহর আরেকটা নাম আছে 'আস সামাদ'। কারও নাম যদি 'আব্দুস সামাদ' হয়, তবে 'আব্দুস সামাদ'ই ডাকতে হবে। শুধু 'সামাদ' ডাকলে হবে না। এরকম ডাকলে ভুল হবে।

আমাদের অনেক ভাই তার সন্তানের নাম রাখেন রাব্বি! রাব্বি মানে হলো আমার রব। আপনাদের জানামতে রব কে? আপনার আমার রব হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। এখন আপনি আপনার সন্তানের নাম রেখে ফেললেন রাব্বি। প্রতিদিন তাকে ২০বার নাম ধরে ডাক দেন। তাহলে আপনি তাকে কী বলে ডাকছেন? আপনি বলছেন, ও রাব্বি! মানে ও আমার রব! সে কি আপনার রব? মডার্ন হতে হতে আমরা কোথায় চলে যাচ্ছি, খেয়াল আছে?

কেউ কেউ অবশ্য ছেলের নাম রাখেন ফজলে রাব্বি। ফজলে রাব্বি নাম রাখা যায়। ফজলে রাব্বি মানে আমার রবের ফজল বা আল্লাহর দয়া। তবে এভাবে নাম রাখলে তাকে ফুল নাম ধরে ডাক দিতে হবে। ফজলে রাব্বি ডাকতে হবে, খালি রাব্বি নয়।

আর আল্লাহর কিছু গুণবাচক নাম এমন আছে, যা আল্লাহর জন্যও গুণবাচক নাম, বান্দার জন্যও গুণবাচক নাম হতে পারে। যেমন, 'রাহিম' বা দয়ালু। আল্লাহ যেমন দয়ালু, মানুষও দয়ালু হতে পারে। পবিত্র কুরআনে নবিজিকে 'রাহিম' বলা হয়েছে। 'রাউফুর রাহিম'। এখানে নবিজির দুটি গুণবাচক নাম 'রাহিম' ও 'রাউফ' বলা হয়েছে, যা আল্লাহর জন্যও ব্যবহৃত হয়, বান্দার জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই রকমেরই একটা গুণবাচক নাম হলো 'আল মুমিন'। এটা আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারে। তবে আল্লাহ ও বান্দার ক্ষেত্রে মুমিন শব্দ ব্যবহারের ভিন্ন ভিন্ন ব্যখ্যা রয়েছে।

এটা বুঝার জন্য আরবি ব্যাকরণের জ্ঞান থাকা জরুরি। যেমন, 'ঈমান' শব্দটা 'বাবে ইফআল'-এর মাসদার। আর বাবে ইফআলের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে মুমিন শব্দের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুফাসসিরিনে কেরাম। আল ঈমান শব্দের অর্থ হলো, নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু এটি বাবে ইফআলের মাসদার হওয়ার কারণে তার দুটি অর্থ হতে পারে। বাবে ইফআলের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো, 'বুলুগে মাখাজ' বা গ্রহণ করা, এবং 'ইতায়ে মাখাজ' বা দান করা।

এখন আমরা যে মুমিন, এর অর্থ হলো, নিরাপত্তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহর দেওয়া নিরাপত্তা গ্রহণ করার মানে কী? মানে হলো আল্লাহর নাফরমানি না করা। তখন আল্লাহ নিরাপত্তা দান করবেন। যদি কেউ নাফরমান অবস্থায় মারা যায়, তবে আল্লাহ তাকে নিরাপত্তা দান করবেন না। আমরা যে মুমিন, সেটা বুলুগে মাখাজ থেকে। অর্থাৎ নিরাপত্তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহর উপর ঈমান আনার কারণে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়ে জান্নাত দান করবেন।

আর আল্লাহ যে মুমিন, তার অর্থ হলো নিরাপত্তা দান করা। 'ইতায়ে মাখাজ' অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করলেন, আর আমরা তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহ যদি নিরাপত্তা দান না করেন, তবে আমরা নিরাপদ হতে পারব না। এই মর্মে আল্লাহ হলেন মুমিন। এই হলো, আল ঈমান শব্দের দুটি অর্থ।

আল্লাহর আরও কিছু গুণবাচক নাম আছে, যেগুলোর বিপরীতটাও আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হয়। যেমন, আল্লাহর গুণবাচক নাম আছে, 'আল মুয়িজু' বা সম্মানদাতা। তার বিপরীত 'আল মুজিল্লু' বা অপদস্থকারী। আরেকটি নাম হলো, 'রাফে', তার বিপরীত হলো ‘খাফিজ’। এভাবে বিপরীতার্থক অনেকগুলো গুণবাচক নাম আল্লাহর জন্য রয়েছে।

আরও কিছু কিছু গুণবাচক নাম এমন আছে, যেগুলোর বিপরীত নাম আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হয় না। যেমন আল্লাহর নাম ‘আল আলিম’ বা সর্বজ্ঞ। তার বিপরীত হচ্ছে ‘জাহিল’। এটা আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হয় না।

আবার কিছু কিছু গুণবাচক নাম আছে আল্লাহর জন্যও ব্যবহার হয়, বান্দার জন্য ব্যাবহার হয়। তবে এটা আল্লাহর জন্য প্রশংসনীয় হলেও বান্দার ক্ষেত্রে নিন্দনীয়। যেমন, আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আল মুতাকাব্বির বা অহংকারী’। এটা আল্লাহর জন্য প্রশংসনীয় হলেও বান্দার জন্য নিন্দনীয়। আল্লাহর আরেক নাম ‘জাব্বার’। এটা আল্লাহর সাথে ব্যবহৃত হলে প্রশংসনীয়, কিন্তু বান্দার ক্ষেত্রে নিন্দনীয়।

এতক্ষণ আল্লাহর জাত ও সিফাতের বর্ণনা এ জন্য দেওয়া হয়েছে যে, এগুলো ঈমানের বিস্তারিত বিবরণে আসবে। এসব আলোচনা স্মরণ রাখলে ঈমানের বিস্তারিত আলোচনা বুঝা সহজ হবে। যদি ঈমান কোন জিনিস, সেটা বুঝে না আসে, যদি জানতে না পারি ঈমান কোন জিনিসে যায় আসে, তবে এই ঈমান নিয়ে হাশরের মাঠে নাজাত পাওয়া যাবে না। এ জন্য ঈমান কোনটা, কীভাবে নষ্ট হয়; এসব জানা জরুরি। এসব জেনে সত্যিকার ঈমানের দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

না দেখে বিশ্বাস

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ অর্থাৎ যারা ঈমান আনে গাইবের উপর। গাইব অর্থ, যা দেখা যায় না, যা আমাদের পঞ্চইন্দ্রীয় দ্বারা অনুভূত হয় না। এসব আমরা না দেখে বিশ্বাস করেছি। আল্লাহ, জান্নাত জাহান্নাম না দেখে এরকম বিষয়াদি নবির কথায় বিশ্বাস করে মেনে নেওয়ার নাম ঈমান।

আল্লামা মাহমুদ আলুসি বাগদাদি রাহ. তাঁর লিখিত তাফসিরগ্রন্থ রুহুল মাআনির মধ্যে ঈমান নিয়ে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ঈমানের আভিধানিক অর্থ হলো, না দেখেই কারও উপর ভরসা করে কোনো বিষয় বিশ্বাস করে নেওয়া। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা আছে। সুতরাং নবিজি বলেছেন জান্নাত জাহান্নাম আছে, নবিজি বলেছেন, কবরের আজাব আছে, এটাই শেষকথা। বিশ্বাস করতে হবে। কেউ যদি বলে, কই! জান্নাত-জাহান্নাম তো দেখলাম না! কোনোদিন তো কবরের আজাব দেখলাম না, তবে সে ঈমানদার হতে পারেনি। নবিজি বলেছেন জান্নাত জাহান্নাম আছে, আর আপনি বিশ্বাস করলেন; এটার নামই ঈমান。

ঈমানের যত সংজ্ঞা আছে, তার মুল কথা হচ্ছে এ রকম,

التَصْدِيقُ بِمَا جَاءَ بِه النبي إعتمادًا على أنه نبي علي التسليم والتعظيم تفصيلاً في التفصيل إجمالاً في الاجمال

নবিজি যেসব বিষয় নিয়ে এসেছেন, সেগুলো নবিজির বর্ণনা হিশেবে বিনা বাক্যব্যয়ে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে ব্যাখ্যা সম্বলিত বিষয়াদী ব্যাখ্যা সহকারে এবং ব্যাখ্যাহীন বিষয়াদি ব্যাখ্যাহীনভাবেই বিশ্বাস করে নেওয়ার নাম ঈমান।

আরো সহজে বললে, তিনটি বিষয়ের সমন্বিত নাম ঈমান। বিশ্বাস করা, মেনে নেওয়া এবং মুহাব্বাতের সাথে সম্মান করা। এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ যা বলেছেন, এগুলো মানার নামই ঈমান। এবার বলুন, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে কী কী নিয়ে এসেছেন? আল্লাহর কথা বলেছেন কী না? ফেরেশতা, আসমানি কিতাবাদি, আল্লাহর প্রেরিত রাসুলগণ, পরকাল, তাকদিরের ভালোমন্দ সব আল্লাহর পক্ষ থেকে, পুনরুত্থান সম্পর্কে বলেছেন কী না? মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর উপর ভরসা করে এসব না দেখা বিষয় বিশ্বাস করার নামই ঈমান।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রকৃত ঈমানের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 লাইলাতুল কদর : ফজিলত ও করণীয়

📄 লাইলাতুল কদর : ফজিলত ও করণীয়


রমজানের শেষ দশক আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সামনে বিশেষ বিশেষ অফার নিয়ে এসেছে। যেমন, ঈদের শেষ বাজারে দোকানদাররা অনেক পণ্য মূল দামেই বিক্রি করে ফেলে। রমজান এসেছে মানুষকে আল্লাহর ওলি বানাতে। কিন্তু আমরা কি ওলি হতে পেরেছি? রহমতের দশক গেল, মাগফিরাতের দশক গেল, আমরা কতটুকু কী অর্জন করলাম? এখন নাজাতের দশক চলছে। হে আল্লাহ, আমাদের ক্ষমা করে আপনার মাকবুল বান্দা হিশেবে গ্রহণ করে নিন। সকলে বলি আমিন।

আলোচনা চলছিল, রমজানের ফজিলত সম্পর্কে। রহমত ও মাগফিরাতের দিন শেষ। সময় সীমিত। আমাদের সামনে সুযোগ এখনো আছে। এরপরও যদি আমরা না বুঝি, তাহলে নিজেদেরই ক্ষতি করব। কারণ, বান্দার প্রতি আল্লাহর কোনো শত্রুতা নেই। বরং আল্লাহর চাওয়া হচ্ছে, বান্দাকে কীভাবে প্রিয় করা যায়। একজন সন্তানকে তার মা-বাবা যতটুকু মুহাব্বাত করে, বান্দার প্রতি আল্লাহর মুহাব্বাত এর চেয়ে ৯৯ গুণ বেশি। সুবহানাল্লাহ।

সন্তান যদি কোনো অপরাধ করে শেষে মার কাছে গিয়ে 'আম্মা' অথবা পিতার কাছে গিয়ে 'আব্বা' বলে ডাক দেয়, তখন সন্তান যত বড় অপরাধই করুক, মা-বাবা সন্তানের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে যান। আর তিনি তো আল্লাহ, আল্লাহর দয়ার কোনো শেষ নেই। বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, এরপর রহমান আল্লাহর কাছে তাওবা করে নেয়, 'আল্লাহ' বলে ডাক দেয়, তখন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। তাঁর রহমতের ভান্ডারে জোশ খেলে ওঠে। ফলে আল্লাহপাক তাকে ক্ষমা করে দেন।

লাইলাতুল কাদরের 'কদর' শব্দের একটা অর্থ হলো ভাগ্য। ভাগ্য হলো আল্লাহর ইলম। ভাগ্য কাকে বলে, এটা বুঝার আগে আমরা একটি উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন ধরা যাক, আপনি ওজনপার্ক থেকে ব্রঙ্কস যাবেন। আপনি জিপিএস (Global positioning system) চেক করে দেখলেন, সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে আধাঘণ্টা। কোথায় কোথায় জ্যাম আছে, সেটাও দেখতে পেলেন। অথচ আপনি এখনো ব্রঙ্কস পৌঁছেননি বা সেখানকার অবস্থাও স্বচক্ষে দেখেননি; কিন্তু জিপিএস আপনাকে সবকিছু জানান দিয়ে দিচ্ছে।

এই যদি হয় দুনিয়ার প্রযুক্তির ব্যবহার, তবে আল্লাহপাক তো সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী। আল্লাহর ইলমে এটা জানা আছে আপনি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন কাজ কখন কীভাবে করবেন আর কী কী করবেন। এ জন্য আমাদের কাজ হলো কাজ করে যাওয়া। জিপিএস বলেছে, আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। এখন যদি আপনি ড্রাইভ না করেন, তাহলে তো গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না। ৩০ মিনিট কেন, ৩০ বছরেও পারবেন না। এটা জিপিএসের দোষ নয়।

ঠিক তেমনিভাবে তাকদিরের ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে এবং চেষ্টা করে যেতে হবে। আল্লাহ জানেন, আমরা দুনিয়ায় কী অর্জন করব এবং কী পরিণতি লাভ করব। এটা আমরা জানি না। তবে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদেরকে ভালো ফলাফল লাভের জন্য সমূহ পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এখন কেউ যদি বলে, আমি জান্নাতি না জাহান্নামি, এটা নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। কারণ, এটা আল্লাহ জানেন। সুতরাং আল্লাহ তাঁর ইলম অনুযায়ী আমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করবেন, এখানে আমাদের কোনো হাত নেই, এবং এ জন্য কোনো আমলও করতে হবে না... এমন ভাবনা ঠিক হবে না। আল্লাহ জানেন, এটা ঠিক, তবে আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আপনি জান্নাত লাভ করতে পারেন, মুত্তাকি হতে পারেন। আপনি কীভাবে জান্নাতে যাবেন, এটার জন্য আল্লাহ অনেক পথ দেখিয়েছেন। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, অন্যান্য ইবাদত ইত্যাদি জান্নাতে যাওয়ার কাজ। আর এগুলো না করা হলো জাহান্নামের কাজ। সুতরাং আপনাকে জান্নাতে যাওয়ার কাজই করতে হবে।

এখন আপনি যদি বলেন, 'আল্লাহ ভরসা, আল্লাহ জান্নাতে দিলে জান্নাতে যাব, জাহান্নামে দিলে জাহান্নামে যাব। ভাগ্যে যেখানে আছে, সেখানেই হবে আমার আবাস।' এটা কখনো ঠিক হবে না। কারণ, এ বিষয়ে আপনি ভাগ্য বা তাকদিরের উপর বড়ই মুতমাইন; কিন্তু এমনভাবে তো কখনো বলেন না যে, 'এ মাসে কোনো কাজ করব না, ঘরে বসেই বেতন পাবো।' এখানে আপনি ঠিকই বুঝেন যে, কাজ না করলে বেতন পাবেন না। আপনি বুঝেন আপনাকে কাজ করতে হবে, এরপর বেতনের কথা ভাবতে হবে। আমরা দুনিয়ার ক্ষেত্রে ভাগ্যের ধার ধারি না, সবকিছু ফেলে কাজের পেছনে ছুটি; আর পরকালের ক্ষেত্রেই শুধু ভাগ্যের উপর ভর করে বসে থাকি। এ কেমন চরিত্র আমাদের?

ফন্ট সাইজ
15px
17px