📄 আত্মিক পরিশুদ্ধি
পবিত্র কুরআন আল্লাহর কালাম। আর আল্লাহ শুধু মালিক কিংবা বাদশাহ নন; তিনি সকল মালিকের মালিক, সকল বাদশাহর বাদশাহ। এ জন্য কুরআন যে আল্লাহর শাহি ফরমান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং কুরআন বোঝে অথবা না বোঝে সর্বাবস্থায় আল্লাহর কালাম কুরআনকে মানতে হবে।
এখন আমাদের একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, কুরআনের সুরা গুলো দুই ভাগে বিভক্ত। এ জন্য দেখবেন, কুরআনের কিছু সুরা মাক্কি, আর কিছু সুরা মাদানি। তবে এর মর্ম এটা নয় যে, যেসব সুরা মক্কায় নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাক্কি, আর যেসব সুরা মদিনায় নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাদানি। বরং যেসব সুরা হিজরতের পূর্বে নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাক্কি; আর যেসব সুরা হিজরতের পরে নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাদানি। অনেক সুরা এমনও আছে, যেগুলো হিজরতের পর মক্কায় নাজিল হয়েছে, কিন্তু এরপরও সেটা মাদানি। এর মর্ম হলো, মাদানি সুরা গুলোর মধ্যে ইসলামি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার রূপরেখা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কেননা, নবিজি মদিনায় হিজরত করে যাওয়ার পর সেখানে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রীয় ফরমান ও বিধিনিষেধ জারি করেছেন।
এখানে একটি বিষয় বুঝে রাখা দরকার যে, একটি রাষ্ট্র পরিচালানা করতে গেলে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। এভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে চুরি-ডাকাতির শাস্তির বিধান যেমন দরকার, তেমনি রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্যও কিছু আইন বা বিধান থাকা দরকার। আর নবিজি যেহেতু মদিনায় একটি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, সুতরাং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যতকিছু দরকার, সবকিছুর বিধান এই কুরআনে আছে। এখন সে রাষ্ট্র পরিচালনার এসব বিধান যে বোঝে না সে বলে, কুরআনে হাত কাটার বিধান এল কেন, এটা এভাবে এল কেন, সেটা সেভাবে কেন? এরকম বিকৃত মানসিকতার অন্তর যাদের, তাদের হিদায়ত লাভ হবে না। এ জন্য প্রথমে আপনাকে অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হবে। এমন অন্তর তৈরি করতে হবে, যে অন্তর দ্বীনের সবকিছু মানতে রাজি। কেননা, জানার নাম কামিয়াবি নয়; বরং মানার নাম কামিয়াবি। যদি জানার নাম কামিয়াবি হতো, তাহলে তো ইহুদিরাই নবিজি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানত। কীভাবে জানত? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
الَّذِينَ آتَيْنُهُمُ الْكِتَبَ يَعْرِفُوْنَهُ كَمَا يَعْرِفُوْنَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ﴾
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদের। আর নিশ্চয় তাদের মধ্য থেকে একটি দল জেনেবুঝেই সত্যকে অবশ্যই গোপন করে। [সুরা বাকারা: ১৪৬]
অর্থাৎ, তারা তাদের সন্তানের ব্যাপারে যতটুকু জানত, এরচেয়েও বেশি নবিজি -এর সত্যতা সম্পর্কে জানত। কিন্তু তারা কি নবিজিকে মেনেছে? না, মানেনি। এ জন্য তারা লানতপ্রাপ্ত, লাঞ্ছিত ও অপদস্ত। এ কারণে এই পৃথিবীতে ইহুদিরা অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। আল্লাহ বলেন,
ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوْ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُوْنَ بِأَيْتِ اللَّهِ وَ يَقْتُلُونَ النَّبِيِّنَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَ كَانُوا يَعْتَدُونَ
তাদের উপর লাঞ্ছনা ও দরিদ্রতা নিপতিত হলো এবং তারা আল্লাহর কোপে পতিত হলো এ কারণে যে, নিশ্চয়ই তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহে অবিশ্বাস করত এবং অন্যায়ভাবে নবিগণকে হত্যা করত; এবং এ কারণেও যে, তারা অবাধ্যাচরণ করেছিল ও তারা সীমা অতিক্রম করেছিল। [সুরা বাকারা: ৬১]
এ জন্যই বলা হয় শুধু জানার নাম কামিয়াবি নয়; বরং মানার নামই কামিয়াবি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মানার মতো অন্তর করে দিন।
পবিত্র কুরআন তাদের জন্য হিদায়ত, যাদের অন্তরে তাকওয়া আছে। তাকওয়া না থাকলে হিদায়তও লাভ হবে না। গতকাল আমরা আলোচনা করছিলাম, তাকওয়া কোথায় পাওয়া যায় এবং কীভাবে অর্জন করা যাবে, এ সম্পর্কে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَكُونُوا۟ مَعَ ٱلصَّٰدِقِينَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। আর এই তাকওয়া অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহওয়ালাদের কাছে যাও। [সুরা তাওবা: ১১৯]
এখন আল্লাহওয়ালা বা সাদিকিন কারা? নবিজির হাদিসে রয়েছে, এরা হলেন যাদের কালবে সালিম বা স্বচ্ছ অন্তর রয়েছে। আর কালবে সালিম বা স্বচ্ছ অন্তর হলো, যে অন্তর সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পরিশুদ্ধ। অর্থাৎ, যার অন্তরে কোনো গুনাহ নেই। গুনাহের কাজ করলেও সাথে সাথে তাওবা করে নেয়। আর নবিজি ﷺ বলেন, গুনাহ হচ্ছে, যে কাজ করলে একটা খটকা কাজ করে। এ ছাড়া এমন কাজ করা, যা সমাজে প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে। স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে, সন্তান, পিতামাতা, শিক্ষক-ছাত্রের কাছে যে কাজ প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে। এটাই হলো গুনাহের কাজ।
আর নেকি কাকে বলে, এ সম্পর্কে জানার আগে একটি হাদিস জেনে নিই। হজরত আবু হুরায়রা রা. একবার নবিজিকে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি অনেক সময় ইবাদতে লিপ্ত থাকি। বিশেষত তাহাজ্জুদের নামাজে মগ্ন থাকি। এ অবস্থায় মানুষ আমাকে দেখে ফেলে। মানুষ যে আমাকে এ অবস্থায় দেখে ফেলে, এ জন্য আমার অন্তরে কিছুটা আনন্দ অনুভব হয়। এখন এই যে আমার মনে আনন্দ এল, এটার কারণে কি আমার নেকির কোনো ক্ষতি হবে? রাসুল ﷺ বলেন, 'না', এ কারণে তোমার নেকিতে কোনো সমস্যা বা ক্ষতি হবে না। এটা হলো তোমার দুনিয়ার সুসংবাদ। মানুষের সামনে তুমি যে ভালো, এটা প্রকাশ পাওয়া হলো দুনিয়ার সুসংবাদ; আর আখিরাতের সুসংবাদ হলো, আল্লাহ তোমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবেন।'
আর যে দুনিয়ার মানুষের সমাজে চলে কিন্তু মানুষ তাকে ঘৃণা করে, তবে এটা প্রকাশ্যে বলে না ভয়ে অথবা ফিতনার আশঙ্কায়। তুমি এমনভাবে চলো, মানুষ যাতে তোমাকে ভালো পায়। আল্লাহর কাছেও ভালো হতে পারো। এভাবে যদি চলতে পারো, তবে অন্তরে কোনো পেরেশানি থাকবে না। আর পেরেশানি যদি না থাকে, তবে এটা হলো নেককাজের লক্ষণ; আর পেরেশানি থাকা হলো গুনাহের লক্ষণ। এরকম অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে।
অন্তর পরিশুদ্ধ করার উপায়
প্রথমত: অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকতে পারবে না। মনের মাঝে হিংসা বিদ্বেষ থাকলে সেই মন অপবিত্র। অপবিত্র মন কখনও শান্ত থাকে না।
দ্বিতীয়ত: অন্তরে কোনো গুনাহ থাকতে পারবে না। আর গুনাহ যদি হয়ে যায়, তবে সাথে সাথে তাওবা করে নেয়।
তৃতীয়ত: অন্তরে ধোঁকা-প্রতারণা থাকবে না। এই যে রমজান মাস, তাকওয়ার এই মাসে আমরা কত রকম ধোঁকার আশ্রয় নিই। অথচ এ মাসে বা সারা বছরই এসব থেকে মুক্ত থাকার কথা ছিল। আর আমরা অপেক্ষায় থাকি, কখন রোজা আসবে, কোনো উপলক্ষ আসবে। যেমন, রমজান এলেই আমরা জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিই। অথচ রাসুল বলেছেন, مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا অর্থাৎ, যে ধোঁকাবাজি করে, সে আমার দলভুক্ত নয়। খ্রিষ্টধর্মে বড় কোনো উপলক্ষে তারা জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেয় আর আমরা রমজান-ঈদ এলেই দাম বাড়িয়ে দিই। এ জন্য সঠিকভাবে কুরআনের হিদায়ত লাভ করতে হলে ধোঁকাবাজি পরিহার করতে হবে।
চতুর্থ নম্বর হলো: والبغي বা জুলুম করে না। অর্থাৎ, তার অন্তরে জুলুম নেই। সে কাউকে জুলুম-অত্যাচার করে না। কষ্ট দেয় না। কারণ, ইসলাম কষ্টের ধর্ম নয়। ইসলাম কাউকে কষ্ট দেয় না। হাদিস শরিফে রাসুল বলেছেন, لا ضرر ولا ضرار في الاسلام অর্থাৎ, কাউকে কষ্ট দেওয়া বা কষ্ট পাওয়ার মতো কোনো কাজ ইসলামে নাই।
পঞ্চম বিষয় হলো: ওলা হাসাদা বা হিংসা-বিদ্বেষ নেই। কারণ, হিংসা অনেক বড় রোগ। এটা মানুষকে ধ্বংস করে ছাড়ে। এ জন্য আমাদেরকে হিংসা থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটকথা, যার অন্তর এসব থেকে মুক্ত থাকবে, সে তাকওয়াবান। আর এরকম অন্তরওয়ালা বা মুত্তাকির কাছে যদি কেউ যায়, তাহলে তার অন্তর প্রভাবিত হবে। সেও তাকওয়া অর্জন করতে পারবে। রাসুল আতরওয়ালার সাথে এটার উদাহরণ দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো আতরওয়ালার কাছে যায়, তাহলে সে এমনিতেই আতরের ঘ্রাণ লাভ করবে। এ জন্য নিয়তের কোনো দরকার হবে না। ঠিক তেমনিভাবে যারা আল্লাহওয়ালা, তাদের কাছে গেলেও তাদের একটা প্রভাব তোমার উপর পড়বে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُوْنُوْا مَعَ الصَّدِقِيْنَ﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। আর এই তাকওয়া অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহওয়ালাদের কাছে যাও। [সুরা তাওবা: ১১৯]
অথচ আমরা করি কি? আমরা যাদের কাছ থেকে তাকওয়া অর্জন করব, উল্টো তাদের সমালোচনায় জড়িয়ে পড়ি। এখন যাদের কাছ থেকে আমাদের তাকওয়া অর্জন করার কথা, সেখানে না গিয়ে উল্টো আমরা তাদের বিরোধিতায় লিপ্ত হই। তাহলে আমরা তাকওয়া অর্জন করব কীভাবে?
একটি উদাহরণ দিই। আঙুর হচ্ছে ভিটামিনযুক্ত একটি ফল। এই ভিটামিনযুক্ত ফল থেকে উপকার লাভ করতে হলে দুটি জিনিস বা শক্তি দরকার। একটি হলো, রুচি থাকতে হবে, দ্বিতীয়ত আঙুর খেতে হলে হাতে ধরে খাওয়ার মতো শক্তি থাকতে হবে। এখন একজনের রুচি আছে এবং তার সামনে একটি পাত্রে কিছু আঙুর রেখে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হলো। তাহলে আঙুর সামনে থাকার পরও সে খেতে পারবে না। কারণ, তার হাত বাঁধা। অথচ তার রুচির কোনো অভাব ছিল না। অভাব হলো শক্তির। সুতরাং আঙুর সামনে থাকার পরও সে এখান থেকে ফায়েদা লাভ করতে পারছে না। এমনিভাবে একজনের শক্তি আছে, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তার রুচি নেই। ফলে সে-ও এই আঙুর থেকে ফায়েদা লাভ করতে পারবে না। এ জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রুচি এবং শক্তির সমন্বয়ে তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। [সুরা তাওবা: ১১৯]
আয়াতে 'আমানুত্তাকুল্লাহ' বলে রুচির কথাই বুঝিয়েছেন। তবে শুধু রুচি হলেই চলবে না; বরং কুরআনের হিদায়ত পেতে হলে আরও অনেক কাজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে রাসুল বলেন,
المرء على دين خليله فلينظر أحدكم من يخالل
অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষ তার বন্ধু যেভাবে চলে, সেভাবে চলতে চায়। এখন তোমরা কাকে বন্ধু নির্বাচন করবে, সেটা তোমাদের ব্যাপার। কেননা, সৎসঙ্গে সর্গবাস, আর অসৎসঙ্গে সর্বনাশ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। কবি বলেন,
عن المرء لا تسأل وسل عن قرينه : فيه دليل عنه بالطبع تهتدي ولا بدع في وفق الطباع إذا اقتدت : فكل قرين بالمقارن يقتدي وران تصحب قوماً فصاحب خيارهم : لتصبح في ثوب الكمالات مرتدي وجانب قرين السوء يا صاح صحبة : ولا تصحب الأردى فتردى مع الردي
কবি বলতে চেয়েছেন, তুমি জিজ্ঞেস করো না, 'সে কেমন?' বরং তুমি দেখ, সে কার সঙ্গে চলাফেরা করে। যদি ভালো মানুষের সাথে চলে, তাহলে বুঝে নেবে সে ভালো। আর যদি মন্দ প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করে, তাহলে বুঝে নেবে, সে মন্দ। সুতরাং মানুষের ব্যাপারে সংশ্রবের একটা প্রভাব রয়েছে। এ জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে রুচি তৈরি করো। তবে শুধু রুচি থাকলেই হিদায়তের উপর চলতে পারবে না। কেননা, তোমার তো হাত-পা সব বেঁধে রাখা। এ জন্য যাদের হাত-পা খোলা অর্থাৎ, সিরাতে মুসতাকিমের উপর চলে, তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করো। কেননা, তোমার তো হাত-পা'র বাঁধন থেকে মুক্ত হতে হলে সঠিক পথে যারা রয়েছে, তাদের কাছে যেতে হবে। এর মাধ্যমেই তুমি কুরআনের হিদায়ত লাভ করতে পারবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন,
وَاهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। [সুরা ফাতিহা : ৬]
এরপর যারা হিদায়তের রাস্তার উপর চলে হিদায়তপ্রাপ্ত হলো, তাদের কথাও আল্লাহ উল্লেখ করে বলেছেন, 'সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম'। অর্থাৎ, যারা হিদায়তের রাস্তার উপর চলে পুরস্কৃত হয়েছে। যাতে হিদায়ত লাভের রুচি এবং শক্তি উভয়টাই অর্জিত হয়। ফলে হিদায়তের রাস্তার উপর চলা তোমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। এবং তোমরা মুত্তাকি হতে পারবে।
এখন আসুন, তাকওয়ার অর্থ সম্পর্কে একটু আলোচনা করি। তাকওয়া শব্দটি الاتقاء মাসদার থেকে এসেছে। আবার اتقاء শব্দটির ব্যুৎপত্তি হয়েছে وقية, থেকে। এরপর وقاية শব্দটি এসেছে এ থেকে। এর মূল অর্থ হলো, নিজেকে রক্ষা করা। কোন কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা? যে কাজ করলে পরকালের ক্ষতি হয়, এমন কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার সহজ অর্থ। এখন যদি আখিরাতে ক্ষতি হবে; এমন কাজ থেকে নিজেকে বিরত না রাখে, তাহলে সে কবরে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। হাশরের ময়দানে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পুলসিরাতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এভাবে সে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে সর্বশেষ ক্ষতির আখড়া জাহান্নামে পতিত হবে। আর যদি সে পরকালের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, তাহলে মৃত্যুর পর সব ঘাঁটিতেই সে নিরাপদ থাকবে এবং সহজে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তবে আমরা যে তাকওয়ার অর্থ গ্রহণ করি 'ভয় করা', এটা হচ্ছে তাকওয়ার রূপক অর্থ। কারণ, কোনো জিনিস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে সেই জিনিস সম্পর্কে নিজের অন্তরে ভয় আসতে হবে। যেমন, আমরা করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করে থাকি। কেন করি? সহজ কথায় মৃত্যুর ভয়ে! এখন কারও অন্তরে যদি মৃত্যুর ভয় না থাকে, তাহলে সে করোনার ভ্যাকসিন নেবে না। ঠিক তেমনিভাবে তাকওয়া শব্দের অর্থ হলো গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এখন গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে সে, যে কবরের আজাবকে ভয় করবে, জাহান্নামের আগুনকে ভয় করবে, কিয়ামতের কঠিন ময়দানকে ভয় করবে। এখন যাদের অন্তরে ভয় নেই, তারা গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে না। এ হিশেবে আমরা তাকওয়ার অর্থ 'ভয় করা' গ্রহণ করি।
কেউ যদি রাষ্ট্রীয় বিধান মানে না, তাহলে সে রাষ্ট্রদ্রোহী। আর রাষ্ট্রীয় এসব বিধান তারাই মানবে, যাদের অন্তরে ভয় আছে। রাষ্ট্রীয় বিধান অমান্য করলে জেলে যেতে হবে। শাস্তি ভোগ করতে হবে। এখন কারও অন্তরে যদি রাষ্ট্রীয় বিধান লঙ্গনের পরিণতি সম্পর্কে ভয় না থাকে, তাহলে সে যেকোনো সময় অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারবে। আর যার অন্তরে এই ভয় থাকবে যে, রাষ্ট্রীয় কোনো বিধান অমান্য করলে তাকে জেলে যেতে হবে, তাহলে সে কখনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করবে না। ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ যে বিধিবিধান দিয়েছেন, এগুলো যদি না মানে, তাহলে জাহান্নামে যেতে হবে- এই ভয় থাকলে আর গুনাহ করবে না। তখন গুনাহ করতে মন চাইলেও তার মধ্যে জাহান্নামের ভয় কাজ করবে।
আল্লাহ ছাড় দেন, ছেড়ে দেন না
এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা দরকার মনে করছি। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, যারা আল্লাহর বিধান অমান্য করে, সর্বদা গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকে, এদের অধিকাংশই তো দুনিয়ায় সুখ-সমৃদ্ধির সাথে বাস করে। এমন হয় কেন? অথচ যারা ঈমানদার, তাকওয়াবান, এদের অধিকাংশই অনেক কষ্টে দিন যাপন করে। এই প্রশ্নের জবাব হলো, যেমন ধরা যাক, কোনো মানুষ রাষ্ট্রের একটি বিধান বা হুকুম অমান্য করেছে। এই অপরাধে তাকে জেলে দেওয়া হয়েছে। এই যে জেলে বন্দি থাকা, এটা কিন্তু শাস্তি। তবে এরপরও অপরাধীকে রাষ্ট্র তার দায়িত্বে খাবার ও বাসস্থান ইত্যাদি দিয়ে থাকে। অসুস্থ হলে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। দেখা যায়, অনেক গরিব মানুষের চেয়েও কারাগারের বন্দিরা ভালো খাবার খায়। ভালো বাসস্থান পায়। উন্নত চিকিৎসা পায়।
ঠিক তেমনিভাবে দুনিয়ায় যারা আল্লাহর বিধান মানে না, এদেরকে আল্লাহ ছাড় দেন। ভালো এবং বেশি রিজিক দেন। দুনিয়ার আদালতে যখন কোনো আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়, তখন মৃত্যুদণ্ডের সময় আসামির কাছে জানতে চাওয়া হয়, সে কী খেতে চায়? বা তার কোনো চাহিদা আছে কি না? তখন রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে তার চাহিদা পূরণ করা হয়। ভালো খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও তার ফাঁসির আদেশ কি স্থগিত হয়ে যায়? না, বরং এ ক্ষেত্রে কোনো করুণা করা হয় না। এটা হলো দুনিয়ার নিয়ম। তেমনিভাবে আল্লাহর বিধান অমান্যকারীকে আল্লাহ মুহলত দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। তিনি যখন ধরবেন, ধরার মতোই ধরবেন। তাঁর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধরা খেতেই হবে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ بَطْشَ رَبِّكَ لَشَدِيدٌ নিশ্চয় আপনার রবের পাকড়াও বড়ই কঠিন। [সুরা বুরুজ: ১২]
আল্লাহর পাকড়াও বড় শক্ত। দুনিয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় ফাঁসির আসামিকেও বিভিন্ন জনের সুপারিশে করুণা দেখিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু আল্লাহ যখন ধরবেন, তখন কোনো সুপারিশ, অভিযোগ-অনুযোগ চলবে না। এসব তখন কোনো কাজেই আসবে না। কেননা, مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ আল্লাহ হলেন বিচারদিবসের মালিক। সকল বিচারকের বিচারক। সুতরাং যারা আল্লাহর নাফরমানি করে দুনিয়ার এই জীবনে বাহ্যিক সুখ-সমৃদ্ধির সঙ্গে বাস করে, তোমরা এদের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত, প্রতারিত হয়ো না। ধোঁকা খেয়ো না। বরং তোমরা যে আল্লাহর নাফরমানি করোনি, তাঁর বিধিবিধান মেনে চলেছ, এ জন্য সেই শুভ মুহূর্তের অপেক্ষা করো, যখন জান্নাত তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওই দিনের অপেক্ষা করো, জান্নাতের হুর-গিলমান তোমাকে সংবর্ধনা জানাবে। তুমি তোমার দুনিয়ার এই জীবন সেভাবেই গঠন করো। এটাই হলো তাকওয়া।
তাকওয়ার স্বরূপ
হজরত উমর রা.-এর খিলাফতকালে একবার তাঁর মজলিসে শুরায় তাকওয়া শব্দের অর্থ সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। তখন অনেকে অনেকভাবে এটার ব্যখ্যা করতে থাকেন। তবে সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাটি দিয়েছিলেন হজরত উবাই ইবনু কাআব রা.। তিনি কি ব্যখ্যা দিয়েছিলেন, এটা জানার আগে নবিজির একটি হাদিস আপনাদের স্মরণ রাখতে হবে। হাদিসটি হচ্ছে,
كن في الدنيا كأنك غريب أو عابر سبيل রাসুল ﷺ বলেছেন, দুনিয়ায় তুমি তোমার জীবনটাকে এমনভাবে ধারণ করো, যে তুমি মুসাফির। মাত্র কয়েকদিনের জন্য এসেছ। আমরা যেমন কোথাও সফরে গেলে ঘরের সব সামানা নিয়ে যাই না; বরং প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু সামানা নিয়ে যাই, ঠিক তেমনিভাবে এই দুনিয়ায় আমরা হলাম মুসাফির। যতটুকু দরকার, ততটুকুই আমরা অর্জন করব। অযথা দুনিয়ার পিছনে পড়ে পরকাল ধ্বংস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাসুল ﷺ হাদিসে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন।
কোনো পথিক প্রচণ্ড গরমে রাস্তার কোথাও একটি গাছের নিচে আশ্রয় নিল। সেখানে প্রশান্তকর হিমেল হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিবেশটা এমন যে, পথের সব ক্লান্তি মুহূর্তেই সে ভুলে গেল। এখন ভালো পরিবেশ দেখে কি ওই পথিক ব্যক্তি সেখানে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়বে? না, সে তখন এটাকে পিছনে রেখে তার মূল গন্তব্যের দিকে রওনা দেবে। এ জন্য দুনিয়াও হলো আমাদের ঠিক এমন। এখানে আমরা সাময়িক অবস্থানের জন্য এসেছি। তাই দুনিয়ার আরাম ও চাকচিক্য স্থায়ী নয়; বরং আমাদেরকে পরকালের স্থায়ী আরামের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ জন্য দুনিয়ার লোভে পড়া বা ধোঁকা খাওয়া ঠিক হবে না। আর দুনিয়া হলো পরকালের স্থায়ী সুখ-শান্তি লাভের রাস্তা। সুতরাং সেই স্থায়ী সুখ- শান্তির জন্য সতর্কভাবে রাস্তা চলতে হবে, যাতে গন্তব্যে পৌঁছা যায়।
হজরত উবাই ইবনু কাআব রা. তাকওয়ার যে ব্যখ্যা দিয়েছিলেন সেটা হলো, দুনিয়া হলো একটা কাঁটাযুক্ত বাগানের মতো। এখন কাঁটাযুক্ত রাস্তা দিয়ে কাউকে যেতে হলে অত্যন্ত সতর্কভাবে পথ চলতে হবে। এ জন্য দুনিয়া হলো আখিরাতের রাস্তা এবং এই রাস্তা কাঁটাযুক্ত। আর এই কাঁটা হলো গুনাহের কাঁটা। সারা দুনিয়া গুনাহের কাঁটায় ভরপুর। সুতরাং কাঁটাযুক্ত এই দুনিয়ায় চলতে হলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে, যাতে আমরা কাঁটায় বিদ্ধ না হই এবং নিরাপদে দুনিয়ার এই সফর সমাপ্ত করে মানজিলে মাকসাদ তথা জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। আর এটাই হচ্ছে তাকওয়ার মর্ম।
দুনিয়ার জীবনে অনেক মুমিন চরম অর্থকষ্টে জীবন কাটান, অথচ কাফির মুশরিক ও নাফরমানরা আরাম-আয়েশে দিন কাটায়! কেন এমন হয়, সেটার আরেকটি সহজ ব্যাখ্যা দিই। এই ব্যাখ্যাটি আপনারা সহজে বুঝে ফেলবেন। আর ব্যাখ্যাটি আমার নিজের ব্যাখ্যা নয়। এটি নবিজির ব্যাখ্যা। নবিয়ে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত তাসলিম বলেছেন, আদ দুনিয়া সিজনুল মুমিন, ওয়া জান্নাতুল কাফির। দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কয়েদখানা আর কাফিরের জন্য জান্নাত। সুতরাং কাফিররা তাদের ক্ষণিকের জান্নাতে একটু আরাম আয়েশ করবে; অবাক হওয়ার কী আছে?
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।
📄 তাকওয়ার ব্যাখ্যা
তাকওয়া কাকে বলে, এই প্রশ্নের চমৎকার জবাব আমরা দেখতে পাই সহিহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত নবিজির হাদিসে। হজরত নাউয়াস ইবনু সামআন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নেকি এবং গুনাহ সম্পর্কে নবিজিকে জিজ্ঞেস করা হলো। নবিজি বললেন,
البر: حُسْنُ الخُلُقِ، والإثمُ: مَا حاكَ في نَفْسِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلَعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
নেকি হচ্ছে সচ্চরিত্র আর গুনাহ হচ্ছে যা তোমার অন্তরে খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'
নেক কাজ করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, তথা হালাল-হারাম মেনে চলার মাধ্যমে তাকওয়ার শুরু। আর পরিপূর্ণ তাকওয়া হলো সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকেও দূরে থাকা। হজরত নুমান ইবনু বশির রাজিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
إِنَّ الْخَلَالَ بَيِّن، والحَرَامَ بَيِّنٌ، وبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ، وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الحرام، كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى، يُوشِكُ أَنْ يَقَعَ فِيهِ، أَلَا وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمّى، أَلَا وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ،
হাদিসটির সারমর্ম হলো, হালাল-হারাম সুস্পষ্ট। তবে হালাল-হারামের মধ্যখানে কিছু আছে সন্দেহযুক্ত। অধিকাংশ মানুষই সেটা জানে না। যেব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার থেকেও দূরে থাকল, সে তার দ্বীন ও সংবেদনশীলতাকে রক্ষা করল। আর যে সন্দেহযুক্তে পতিত হলো, সে হারামে পতিত হল। নবিজি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন একজন রাখাল যখন পশু চরায়, তখন সে তার সীমানার দিকে নজর রাখে- যেন সীমা পার হয়ে পশুগুলো অন্যের সীমানায় ঢুকে না যায়। নবিজি বলেন, প্রত্যেক রাজার একটি রাজত্বসীমা আছে। সাবধান! আল্লাহর রাজত্বসীমা হলো হারামের সীমানা।
আজ আমরা আলোচনা করব তাকওয়া বিষয়ে। আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। আর ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা শুধু বাহ্যিকভাবে কয়েকটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করে না; বরং একনিষ্ঠ ইবাদত বা আল্লাহর নিমিত্তে হওয়ার জন্য চাই একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতা, যা বান্দা ক্রমাগতভাবে করতে থাকলে অর্জন করে মহা মূল্যবান নিয়ামত, যাকে ইসলামি শরিয়তে 'তাকওয়া' নামে আখ্যায়িত করা হয়। আর তাকওয়া হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
هُدًى لِلْمُتَّقِينَ হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্যই। [সুরা বাকারা: ২] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (জান্নাত) মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। [সুরা আলে ইমরান : ১৩৩] এ জন্য মুত্তাকি হওয়া বা তাকওয়া অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে মুত্তাকি বানিয়ে দিন। মুত্তাকি হিশেবে আমাদের মৃত্যু দিন। সকলেই বলুন 'আমিন'।
তাকওয়া কী
তাকওয়া সম্পর্কে গত পর্বে আলোচনা হয়েছে। আজকের আলোচনা বুঝবার জন্য গত আলোচনার সার সংক্ষেপ একটু তুলে ধরি। তাকওয়া আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ নিজেকে রক্ষা করা। অর্থাৎ, গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, পরহেজ করা, বেঁচে থাকা ইত্যাদি। তবে তাকওয়া শব্দের অর্থ আমরা ভয় করাও বুঝে থাকি। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করা। ভয় করা কেন বলা হলো, এ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের প্রথমে এটা বুঝতে হবে যে, কোনো কিছু থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে এই কাজ করলে লাভ বা ক্ষতি কী হবে, সেটা জানা। শুধু লাভের দিকে লক্ষ করলে হবে না; বরং ক্ষতির দিকটাও দেখতে হবে। এরপরই কাজটি করবেন কি-না, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। নাহয় নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। এ কারনেই তাকওয়া শব্দের অর্থ ‘ভয় করা’ বলা হয়। পরবর্তী আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে এটা ভালো করে আত্মস্ত করতে হবে।
তাকওয়া অর্থ ভয় করা। শব্দটি আরবি خوف থেকেও এসে থাকে। তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয় এবং খাওফ শব্দের অর্থও ভয়। তবে দুটি শব্দের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। খাওফুন শব্দের অর্থ এক ধরণের ভয় আর তাকওয়া শব্দের অর্থ আরেক ধরণের ভয়। এখানে ভয় বলতে কোন ধরণের ভয় বুঝানো হয়েছে, সেটাই আমাদের জানতে হবে। তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয়। কেউ কাউকে দুই কারণে ভয় করে।
১. যাকে ভয় করবে, তাকে মুহাব্বাত বা ভালোবাসার কারণে ভয় করে। যেমন, আল্লাহকে ভয় করা।
২. কারো ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য ভয় করবে। যেমন: সাপের ভয়। এটা সম্মান বা ভালোবাসার ভয় নয়; বরং তার ক্ষতি থেকে বাঁচার ভয়। সূক্ষ্ম এই পার্থক্যটি আমাদের জানা থাকতে হবে। আল্লাহকে ভয় করা হয় সম্মান ও ভালোবাসার কারণে।
আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে পিতামাতা ও শিক্ষক বা মুরব্বিদের ভয়। এটা ভালোবাসা ও সম্মানের ভয়। মোটকথা, যে ভয়ে সম্মান ও মুহাব্বাতের সম্পর্ক রয়েছে, তাকে আভিধানিক অর্থে তাকওয়া বলা হয়।
পরিভাষায় তাকওয়া হলো, একমাত্র আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। যার মধ্যে তাকওয়া থাকে, তাকে মুক্তাকি বলা হয়। সৎ গুণাবলির মধ্যে তাকওয়া হচ্ছে অন্যতম। আর যার মধ্যে তাকওয়া থাকে, সে পার্থিব জীবনের লোভে কোনো খারাপ কাজ করবে না; সে পরকালীন জীবনের কল্যাণের কাজে সবসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। আল্লাহ বলেন,
إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ﴾
তার বন্ধুগণ তো শুধু মুত্তাকিগণ। [সুরা আনফাল : ৩৪]
তাকওয়া হলো, জীবনের প্রতিটি কাজকর্মের অগ্র-পশ্চাতে, দিবা-নিশিতে আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগরুক রাখা। আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগরুক রেখে আমলের প্রতিটি স্তর পার হতে পারলেই কেউ তাকওয়া অবলম্বনকারী মুমিন মুত্তাকি হতে পারবে। মুত্তাকিদের আল্লাহর ওলি হিশেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ জন্য ওলি তারাই, যারা মুত্তাকি হয়ে থাকেন। মূলত, তাকওয়া হচ্ছে অন্তরের একটা অবস্থা, যার অন্তর যত উন্নত ও পরিশুদ্ধ হবে, সে তত তাকওয়াবান বা আল্লাহর ওলি হিশেবে সমাদৃত হবে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় ওলি শব্দের প্রায় ২০-২১টি অর্থ রয়েছে। সবগুলো আলোচনার সুযোগ নেই, তবে আমরা একটা নিয়ে আলোচনা করব।
ওলি কাকে বলে
ওলি শব্দের এক অর্থ হচ্ছে, কুরব বা নিকটবর্তী হওয়া। কারণ, ওলিরা আল্লাহর নিকটবর্তী থাকেন। তবে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার দুটি ব্যখ্যা রয়েছে। কুরআনের একটা আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, সারা দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর নিকটবর্তী বা ওলি। এমনকি সব সৃষ্টিই তাঁর নিকটবর্তী। আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা-ও আমি জানি। আর আমি তার গলার ধমনী হতেও অধিক নিকটবর্তী। [সুরা কাফ : ১৬]
এ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, 'আমি মানুষের শাহ রগের চেয়েও নিকটবর্তী।' মানুষের যখন শাহ রগ কাটা হয়, তখন সে মৃতদেহ হয়ে যায়। এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহর নিকটবর্তী হলে যেহেতু ওলি হওয়া যায়। তাই আয়াতে 'শাহ রগের চেয়েও নিকটবর্তী' বলার মাধ্যমে আমরা সকলেই আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া প্রমাণিত হয়। এটা হচ্ছে, আভিধানিক অর্থে; আর সাধারণভাবে যে ওলি হওয়ার কারণে সে মুত্তাকি হবে, যার জন্য আল্লাহ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, সেটা হলো কুরব বা মুহাব্বাতের মাধ্যমে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ﴾
যারা প্রকৃত ঈমানদার, তারা আল্লাহকে বেশি মুহাব্বাত করে। [সুরা বাকারা : ১৬৫]
সুতরাং প্রমাণিত হলো, যারা ওলি, তারা আল্লাহকে অধিকতর ভয় করে। আর যারা মুত্তাকি, তারা আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। আর এটা হয় মুহাব্বাতের মাধ্যমে। আপনি আল্লাহকে এমন মুহাব্বাত করলেই ওলি হয়ে যাবেন。
কীভাবে ওলি হওয়া যায়
এখন আপনাদের চমৎকার একটা কথা বলব। মনযোগ দিয়ে শুনবেন। আমি এখন আপনাদেরকে ওলি হওয়ার টেকনিক শেখাব। এই টেকনিক কাজে লাগাতে পারলে আমি ও আপনি- আমরা সবাই আল্লাহর ওলি হয়ে যেতে পারব- ইনশাআল্লাহ। মুফাসসিরিণে কেরাম তাফসিরের কিতাবে লিখেছেন, ওলি হওয়ার সহজ ফর্মুলা হচ্ছে মাত্র তিনটি কাজ করা এবং একটি কাজ ছেড়ে দেওয়া। অর্থাৎ, তিনটি কাজ করলে এবং একটি কাজ ছেড়ে দিতে পারলে আল্লাহর ওলির দফতরে নাম লেখা হয়ে যায়। করণীয় তিন কাজ হলো,
১. ফরজ বিধানগুলো পালন করা।
২. ওয়াজিবগুলো পালন করা।
৩. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাগুলো পালন করা।
আর বর্জনীয় একমাত্র কাজটি হচ্ছে 'হারাম'।
অর্থাৎ, কেউ যথাযথভাবে ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ পালন করলে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকতে পারলে সে আল্লাহর ওলি। বাকি কোন ওলির র্যাংক কতো উপরে যাবে, সেটা নির্ভর করবে নফল ইবাদতের উপর। যিনি যতো বেশি নাওয়াফিলের ইহতেমাম করবেন, তিনি ততো উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন হবেন। পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে প্রিয় ওলি হচ্ছেন নবিজি। যত মুত্তাকি ও পরহেজগার রয়েছেন, সকলের নেতা হলেন নবিজি। মোটকথা, আল্লাহর জন্য যার মুহাব্বাত যত বেশি, সে আল্লাহর তত নিকটবর্তী। এ হিশেবে আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ছিল নবিজি -এর। আল্লাহ বলেন, ﴿ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ، فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى﴾
তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি। ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। [সুরা নাজম: ৮-৯]
কবি কত চমৎকার বলেছেন, يا صاحب الجمال و يا سيد البشر ﷺ : من وجهك المنير لقد نور القمر لا يمكن الثناء كما كان حقه : بعد از خدا بزرگ توئی قصہ مختصر
হে সৌন্দর্যের অধিকারী! হে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। আপনার আলোকিত চেহারার আলোকে চন্দ্র আলোকিত হয়েছে। আপনার যথোপযুক্ত প্রশংসা করা সম্ভব নয়। এককথায় আল্লাহর পরে আপনি শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী।
আল্লাহর কাছে নবিজির মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। সকল সৃষ্টির চেয়ে তাঁর অবস্থান সবার শীর্ষে। উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, তাকওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে শুধু ভয় করা নয়; বরং মুহাব্বাতসহ ভয় করা। সম্মানের সঙ্গে ভয় করা। আর যে ব্যক্তি মুহাব্বাতের মাধ্যমে ভয় করতে করতে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তার অন্তরে অবশ্যই আল্লাহর সম্মান থাকবে। এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَ مَنْ يُعَلِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই। [সুরা হজ: ৩২]
আল্লাহ এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব জিনিস রয়েছে, সেগুলোকে যারা সম্মান করে, তারা আল্লাহর ওলি এবং এই সম্মান করাটাই তাকওয়ার লক্ষণ। কেননা, তাকওয়া তার অন্তরে আছে বলেই সে এই সম্মান প্রদর্শন করে। যেমন: মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর, আর এই ঘরের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক রয়েছে, সুতরাং যারা মসজিদকে সম্মান করে তারা আল্লাহকেই সম্মান করে। এমনিভাবে আজান। এটা আল্লাহর বিধান। মুআজ্জিন যে আজান দেন, এই আজান শুনে যে সম্মান করে, আজানের শব্দ বলে, এটাও আল্লাহর ভালোবাসার কারণেই করা হয়। সম্মানের কারণে করা হয়। মোটকথা, ওলি হতে হলে তাকওয়ার বিকল্প নেই। বোঝা গেল যে, ওলি হতে হলে আগে তাকওয়া অর্জন করতে হবে। আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে।
আল্লাহর আলামতসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আন্তরিক আল্লাহভীতির লক্ষণ। যার অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি রয়েছে, সে-ই এগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারবে। এ সম্মান প্রদর্শন হৃদয় অভ্যন্তরের তাকওয়ার ফল এবং মানুষের মনে যে কিছু না-কিছু আল্লাহর ভয় আছে তা এরই চিহ্ন। তাই কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অমর্যাদা করলে এটা এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তার মনে আল্লাহর ভয় নেই।
এতে বোঝা গেল যে, মানুষের অন্তরের সাথেই তাকওয়ার সম্পর্ক। অন্তরে আল্লাহভীতি থাকলে তার প্রতিক্রিয়া সব কাজকর্মে পরিলক্ষিত হয়। এ জন্য রাসুল ﷺ বলেছেন, “তাকওয়া এখানে” আর এটা বলে তিনি বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন। [মুসলিম : ২৫৬৪] আপাতদৃষ্টিতে এটা একটা সাধারণ উপদেশ। আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত সকল মর্যাদাশালী জিনিসের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য এ কথা বলা হয়েছে।
তাকওয়ার স্তর
তাকওয়ার অনেক স্তর রয়েছে। কাজি নাসিরুদ্দিন বায়জাবি রাহ. (মৃত্যু: ৬৮৫ হিজরি) তাঁর তাফসিরে বায়জাবিতে লিখেন, তাকওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে: ১. প্রাথমিক। ২. মাধ্যমিক। ৩. উচ্চাঙ্গের স্তর।
এখন আমরা কে কোন স্তরে আছি, সেটা নিজেই বিবেচনা করে নিতে পারি। অন্য বর্ণনায় মুহাদ্দিসগণ তাকওয়ার ৭টি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে আমরা বায়জাবির সূত্রে তিনটি স্তরের কথাই আলোচনা করব।
প্রথম স্তর
তাকওয়ার তিনটি স্তরের প্রথমটি হচ্ছে, কুফর ও শিরক থেকে মুক্ত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা। এই অর্থে একজন সাধারণ মুসলমানকেও মুত্তাকি বলা যাবে। এমনকি তার থেকে কোনো গুনাহ প্রকাশ পেলেও। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এই অর্থে তাকওয়া শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন: وَالْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَى
আর তাদের জন্য তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ-বাণী অপরিহার্য (রূপে পালনীয়) করে দিলেন। [সুরা ফাতাহ : ২৬]
আয়াতে 'কালিমায়ে তাকওয়া' বলে তাকওয়া অবলম্বনকারী কালিমা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তাওহিদ ও রিসালতের কালিমা। এই কালিমাই তাকওয়ার ভিত্তি। এ জন্য এটাকে কালিমায়ে তাকওয়া বলা হয়েছে।
কালিমায়ে তাকওয়া বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ ব্যাপারে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এর দ্বারা কালিমায়ে তাওহিদ বা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বোঝানো হয়েছে। এখন যদি কোনো অমুসলিম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ পাঠ করে, তাহলে সেও ঈমানদার হয়ে গেল। এটা হলো তাকওয়ার প্রাথমিক স্তর বা সাধারণ তাকওয়া।
দ্বিতীয় স্তর
তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, যা করলে পাপ হয় অথবা ছেড়ে দিলে পাপ হয় এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকা। কারও কারও মতে, সামান্য ও ছোটখাটো ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেও বেঁচে থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ কর্তৃক আদেশকৃত সব বিষয় মেনে চলা এবং অপছন্দনীয় যাবতীয় বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। এখন কোনো ব্যক্তি যদি তার হাত, মুখ, নাক, কান, পা ইত্যাদি সব অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তাহলে এটাকে দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরের তাকওয়া বলা হয়। এ পর্যায়ের তাকওয়ার আবার বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং এই স্তরের তাকওয়ার উপর ভিত্তি করেই কুরআন-হাদিসে বিভিন্ন কল্যাণ ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। এটাকে তাকওয়ায়ে খাস বা বিশেষ তাকওয়া বলা হয়। এই বিশেষ তাকওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,
وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَمَثُوبَةٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْرٌ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾
আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাদের জন্য) প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। [সুরা বাকারা: ১০৩]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَ لَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَ اتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَةٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَ الْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْتُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। [সুরা আরাফ: ৯৬]
আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে 'آمَنُوا' শব্দ বলে প্রথম স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আর 'وَاتَّقُوا' বলে দ্বিতীয় স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এই বিশেষ স্তরেও আবার আরও স্তর আছে, যেমন: আমি আমার নাক-মুখ-কানকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখলাম, এটা বাহ্যিক তাকওয়া, কিন্তু অন্তরে গুনাহ আছে, তাহলে হবে না। তবে সে যদি তার অন্তরের এই কালো দাগ বা গুনাহ দূর করতে পারে, তাহলে সে বিশেষ স্তরের তাকওয়ার অধিকারী হবে। এ পর্যায়ে এই তাকওয়ার নাম বদলে 'ওয়ারা' হয়ে যাবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُوْنَ আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয় যারা পাপ অর্জন করে, তাদেরকে অচিরেই প্রতিদান দেয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে। [সুরা আনআম : ১২০]
হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন, عَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ وَهِ عَنِ الْبِرِّ والإِثْمِ فَقَالَ الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
হজরত নাওয়াস ইবনু সামআন আনসারি রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসুল-কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করি। নবিজি উত্তর দিলেন, 'পুণ্য হচ্ছে সচ্চরিত্র আর পাপ হচ্ছে যা তোমার (অন্তরে) খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'
এই হাদিসে নবিজি হজরত নাওয়াস রা.-এর প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'নেকি হলো উত্তম চরিত্র। শুধু নামাজ পড়া নেকি নয়। কেউ যদি নামাজ পড়ে অন্যকে কষ্ট দেয়, তাহলে হবে না। বরং তার হাত-মুখ পা সব অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর চরিত্র হলো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাউকে কষ্ট না দেওয়া। কিন্তু আমরা করি কি, নামাজও পড়ি আবার ঘরে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করি। অথচ নবিজি যখন ঘরে যেতেন, তখন স্ত্রী আয়েশা রা.-কে চুম্বন করতেন। আপনি যদি একজন আদর্শ স্বামী হতে পারলেন না বা আদর্শ স্ত্রী হতে পারলেন না, তাহলে আপনার চরিত্র ঠিক হলো না। আপনাকে আরও পরিশুদ্ধ হতে হবে। রাগ এলে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা এ জায়গায় অনেক পিছিয়ে। দেখা যায়, স্ত্রী যদি তরকারিতে লবণ একটু বেশি দিয়ে দেয়, তাহলে আপনি রাগ করে খাবার প্লেট ছুড়ে মারেন। এটা আদৌ সচ্চরিত্র হতে পারে না।
আখলাক বা চরিত্রেরও তিনটি স্তর রয়েছে। আপনার সাথে যদি কেউ খারাপ আচরণ করে, এর প্রতিক্রিয়ায় আপনি কোন কাজ করেন, সেটা থেকেই আপনার আখলাক বা চরিত্রেরও বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যাবে।
চরিত্রের প্রথম ধাপ
খারাপের জবাব খারাপ দিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ, আপনার সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে আপনিও তার সাথে খারাপ আচরণ করা। কুরআনে কারিম বলছে, জাজাউ সাইয়িআতিন সাইয়িআতুন মিসলুহা। বুরায়ির বদলা হলো সমপরিমাণ বুরায়ি। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে বদলাটা যেন সমান সমান হয়। একসূতা বেশি হলে সেটা জুলুম হয়ে যাবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ ﴾
যারা তোমাদের উপর জবরদস্তি করেছে, তোমরাও তাদের উপর জবরদস্তি কর- যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। [সুরা বাকারা: ১৯৪]
বোঝা গেল, কেউ আপনাকে আঘাত করলে বা আপনার উপর জবরদস্তি করলে সেটার সমপরিমাণ জবাব দেওয়া তথা বদলা লওয়ার অধিকার আপনার আছে। তবে, এটা অনেক কঠিন। যেমন কেউ আপনাকে একটি চড় মেরেছে। ইসলামি শরিয়তে তাকে তার সমপরিমাণ চড় ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সে যতো জুরে মেরেছে, আপনাকে ঠিক ততোটা জুরেই মারতে হবে। এখন সমস্যা হলো চড়ের পরিমাণ মাপার তো কোনো যন্ত্র নাই। তাহলে আপনি কি করে সমপরিমাণ চড়টা মারবেন? আর বেশি জোরে হলে তো জায়েজ হবে না।
চরিত্রের দ্বিতীয় ধাপ
আখলাকের দ্বিতীয় স্তর হলো, কেউ আপনার সাথে খারাপ আচরণ করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। অর্থাৎ, আপনার সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে আপনি তার সাথে খারাপ আচরণ না করে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। যেমন বদলা লওয়ার আয়াতেরই পরের অংশে আল্লাহ বলেন,
فَمَنْ عَفَا وَ أَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾
যে ক্ষমা করে দিল এবং সমঝোতা করে ফেলল, আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান রয়েছে। [সুরা শূরা: ৪০]
এটা হলো চরিত্রের দ্বিতীয় স্তর। অন্যকথায়, এটিকে উত্তম চরিত্র বলা হয়। একজন মুসলমানের চরিত্র হবে উত্তম চরিত্র। নবিজি বলেন, বুয়িসতু লি-উতাম্মিমা মাকারিমাল আখলাক, আমি সর্বোত্তম চরিত্রের রোলমডেল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি
চরিত্রের তৃতীয় ধাপ
আখলাকের তৃতীয় স্তর হলো কেউ আপনার সাথে খারাপ আচরণ করলে তাকে মাফ করে দিয়ে তার জন্য দুআ করা। বরং তার সাথে আরো বেশি ভালো ব্যবহার করা। যে শিক্ষাটি আমরা পাই নবিজি থেকে। তিনি বলেছেন, صل من قطعك واعف عن من ظلمك واحسن الى من أساء اليك
যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে নাও। যে তোমার সাথে জুলুম করল তুমি তাকে মাফ করে দাও। যে তোমার সাথে দুঃব্যবহার করল, তুমি তার সাথে ইহসান করো।
এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন, আপনি কোন স্তরে আছেন, প্রথম, মধ্যম না উচ্চস্তরে? যদি প্রথম স্তরে থাকেন, তাহলে আপনার চরিত্র গতানুগতিক। যদি দ্বিতীয় স্তরে থাকেন, তাহলে আপনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। আর যদি তৃতীয় স্তরে থেকে থাকেন, তাহলে আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আর আপনি যদি চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করতে পারেন, তাহলে আপনিই প্রকৃতপক্ষে নবিজির প্রকৃত উম্মত দাবি করতে পারেন, কারণ, এটাই ছিল আপনার নবির চরিত্র। আপনার নবি আঘাতের জবাব আঘাত দিয়ে দিতেন না, তাকে মাফ করে দিতেন। শুধু মাফ করেই থেমে থাকতেন না, তার কল্যাণ কামনা করে দুআও করতেন। যার সার্টিফিকেট দিয়ে আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ হে নবি, নিশ্চই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। [সুরা কলম: ৪]
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সর্বোত্তম চরিত্র তথা নবিওয়ালা চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাউফিক দান করুন।
পূর্ণ ইসলামই প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল -এর পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকাকেই তাকওয়া বলা হয়। বস্তুত তারাই মুত্তাকি, যাদের ঈমান ও আমল দুটিই পূর্ণাঙ্গ। আর ঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই ইসলাম।
তাকওয়ার তৃতীয় স্তর
তাকওয়ার তৃতীয় স্তর হচ্ছে, অন্তরকে আল্লাহ ব্যতিত যাবতীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখা। এই স্তরের তাকওয়া নবি ও ওলিগণের হয়ে থাকে। আর এটিই তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ذلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ ﴾
এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। [সুরা বাকারা: ২]
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি রাহ. তাকওয়ার চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন:
১. শরিয়তে যেসব বস্তু হারাম করা হয়েছে, আল্লাহর ভয়ে সেসব বস্তু থেকে বিরত থাকা। যেমন, মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা ও সুদ খাওয়া প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা। এটি সাধারণ মুমিনের তাকওয়া। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় মুমিন।
২. হারাম বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকার পর সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতেও দূরে থাকা। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় সালেহ।
৩. সকল হারাম বস্তু ও সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকার পর আল্লাহর ভয়ে অনেক সন্দেহবিহীন হালাল বস্তুও পরিত্যাগ করে, এ শ্রেণিকে মুত্তাকি বলা হয়।
৪. উপর্যুক্ত তিন শ্রেণির তাকওয়া আয়ত্ত করার পর এমন সকল হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা, যা ইবাদতে কোনো সহায়তা করে না। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় 'সিদ্দিক'।
আমাদের সামাজিক জীবন দর্শনে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। তাকওয়ার পোশাকে যারা আচ্ছাদিত, তাদের মাধ্যমে কোনো রকম অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে পারে না। অশ্লীলতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, সুদ, ঘুষ, সম্পদ লুটপাট, কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাবসহ হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর অধিকার) ও হাক্কুল ইবাদ (মানুষের প্রতি মানুষের ও সৃষ্টিজগতের প্রতি মানুষের যাবতীয় দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহ) পালনে উদাসীন থাকা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থেকে মুত্তাকির জীবন যাপন করে। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশ ও জাতির উন্নয়নে গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে অবদান রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে।
তাকওয়া বা আন্তরিকতাবিহীন কোন কাজই সফলতা বয়ে আনে না। যেকোনো কাজের প্রাণ হলো তাকওয়া। বিশেষ করে ইবাদত হিশেবে যা কিছু করা হয়, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য তাকওয়া একান্ত প্রয়োজন।
মূলত তাকওয়ার গুণ অর্জনের জন্যই ইসলামের যাবতীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ জন্য যে মানুষ যত বেশি তাকওয়ার অধিকারী হবে, সে জাগতিক জীবনে সমাজে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য হবে এবং পরকালে আল্লাহর কাছে বেশি সম্মনিত হবে।
তবে কে কত বেশি মুত্তাকি, এটা নিয়ে আত্মপ্রশংসার কোনো সুযোগ নেই। কেননা আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন, কে কত বেশি মুত্তাকি। আর যারা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে পারেন, তারা আল্লাহর ভালোবাসা লাভে ধন্য হন।
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রাহ. বলেছেন, 'মুত্তাকির মর্যাদা বর্ণনায় যদি “হুদাল লিল মুত্তাকিন” (পবিত্র কুরআন মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক) আয়াতাংশটি ছাড়া আর কোনো আয়াত না-ও থাকত, তবু তাদের মর্যাদা বর্ণনায় এটিই যথেষ্ট ছিল। কারণ, তাঁর মতে পবিত্র কুরআন মুত্তাকিদের জন্য পথ প্রদর্শক।
সুতরাং তাকওয়া ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণ নয়। আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়টির মহত্ব ও গুরুত্ব বুঝানোর জন্য সুরা নিসার প্রথম আয়াতটি শুরু হয়েছে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে এবং শেষও করা হয়েছে তাকওয়ার মাধ্যমে পরস্পরিক লেনদেন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে। সুতরাং মানুষের উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা। মোটকথা, সকল প্রকার অনিষ্ট কাজ থেকে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে বাঁচানোর অন্য নামই হলো তাকওয়া।
তাকওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে অনেক সুস্পষ্ট করে বয়ান করা হয়েছে। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদেরকে শরিয়তের পরিভাষায় বলা হয় মুত্তাকি। মুত্তাকিদের পরিচয় প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَمِمَّا رَزَقْنُهُمْ يُنْفِقُونَ ) وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
যারা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান রাখে, নামাজ আদায় করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা আপনার উপর যা নাজিল করা হয়েছে (কুরআন) এবং আপনার আগে যা নাজিল করা হয়েছে (আসমানি কিতাব) তার প্রতি ঈমান রাখে, আর তারা আখিরাতের প্রতি ইয়াকিন রাখে। [সুরা বাকারা: ৩-৪]
তাকওয়া দৃশ্যমান কোনো বস্তু নয়। এটা মূলত মানুষের অভ্যন্তরীণ গুণবিশেষ। তাকওয়া যেহেতু অন্তরে থাকে, তাই রাসুল ﷺ অন্তর পরিষ্কার করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মনে রেখো, নিশ্চয়ই মানুষের শরীরে একটি গোশতের টুকরো আছে, যা ঠিক থাকলে সমস্ত দেহই ঠিক থাকে। আর তার বিকৃতি ঘটলে সমস্ত দেহেরই বিকৃতি ঘটে। সে গোশতের টুকরাটি হলো 'অন্তর।' এব্যাপারে আমরা ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
তাকওয়ার উপকারিতা
তাকওয়া অবলম্বনকারীকে আল্লাহ এমন রিজিক দান করেন, যে কেউ তাকওয়া সম্বলিত সুন্দর চরিত্র নির্মাণ করতে পারলে তার রিজিকের কোনো অভাব হয় না। আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقُهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ যে তাকওয়া অবলম্বন করল, আল্লাহপাক তারজন্য রাস্তা খুলে দেন, এবং এমন পদ্ধতিতে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন যে, লা ইয়াহতাসিব, সে ক্যালকুলেশন করেও হিসাব মিলাতে পারে না।
এ ছাড়া তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহর নাজাত মিলে, আমল কবুল হয়। তাকওয়া অবলম্বনকারী বান্দার কোনো ভয় থাকে না। তার কাজ আল্লাহ সহজ করে দেন। তাকওয়া অবলম্বনকারী বান্দার জন্য জমিন ও আসমানের বরকতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এমন বান্দার অন্তরে সত্য-মিথ্যা বোঝা ও পার্থক্য করার বিবেক সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া কিয়ামতের দিন তাকে বড় পুরস্কার দেওয়া হবে।
মোটকথা, তাকওয়ার সীমা অনেক বিস্তৃত। এটি মানুষের জীবনকে এমন এক সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করে, যা সব ধরনের ভীতি, লোভ-লালসা, প্ররোচণা, প্রতারণা, প্রলোভন, পদস্খলন থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের তাওফিক দিন। আমিন।
📄 মুত্তাকিদের শ্রেণিবিন্যাস
আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে এমন এক দ্বীনি মজলিসে বসার তাওফিক দিয়েছেন, যে মজলিস হলো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মজলিস। যে মজলিসে কুরআন-হাদিসের আলোচনা হয়, যে মজলিসে বসলে কুরআনের মাধ্যমে হিদায়ত লাভ হয়।
আমরা মূল আলোচনায় চলে যাই। আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারার প্রথম দিকে বলেন, الم ذَلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ আলিফ-লাম-মীম। অর্থাৎ, এটা এমন এক কিতাব, যাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মুত্তাকিদের জন্য (এই কুরআন) হিদায়তস্বরূপ।
هُدًى لِلْمُتَّقِينَ অর্থাৎ, যে হিদায়ত মুত্তাকিদের জন্য উপকারী বা ফায়দাজনক। এখানে লিল মুত্তাকিনের 'লাম' সবব বা কারণ বোঝানোর জন্য এসেছে। এর মানে হলো لفائدة المتقين অর্থাৎ, এই হিদায়ত মুত্তাকিদের জন্য উপকারী, তবে সকলের জন্য নয়। কেননা, উপকার সকলে লাভ করতে পারে না।
গত পর্বে আমরা আলোচনা করছিলাম, তাকওয়ার স্তর তিনটি। তার মানে মুত্তাকি তিন প্রকার। তিন প্রকার মুত্তাকিকে আমরা এভাবেও অভিহিত করতে পারি,
১. সাধারণ মুত্তাকি। ২. ভিআইপি মুত্তাকি। ৩. ভিভিআইপি মুত্তাকি।
প্রথম স্তরের মুত্তাকি বা সাধারণ মুত্তাকি হলো, যে নিজেকে কুফর, শিরক থেকে হেফাজত রাখে। আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের ঘোষণা করে। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, এটা বিশ্বাস করে।
পূর্বের আলোচনা আপনাদের স্মরণ আছে? মুত্তাকি শব্দের অর্থ শুধু ভয় করা, না সম্মান ও মুহাব্বাতের সাথে ভয় করা? অবশ্যই সম্মান ও মুহাব্বাতের সাথে ভয় করা।
এখন একজন ঈমান আনলেই সে মুত্তাকির প্রাথমিক স্তরে উন্নীত হলো। এর মাধ্যমে সে তাকওয়ার প্রথম ক্লাসে ভর্তি হলো। সুতরাং এই মুহাব্বাতের মাধ্যমেই সে মূর্তিপূজা, কুফর-শিরক ছেড়ে আল্লাহকে বিশ্বাস করল। এটা হলো মুত্তাকির সাধারণ স্তর। আবার সাধারণ স্তরের মুত্তাকি যারা, তাদের তাকওয়ার ভিত্তিতে এই স্তরেরও প্রমোশন হয়ে থাকে। অর্থাৎ, সে আল্লাহকে যত বেশি ভালোবাসবে, সম্মান করবে, তার স্তরও তত বেশি বাড়বে।
মুহতারাম হাজিরিন! গত আলোচনায় আপনারা জানতে পেরেছেন, আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি মুহাব্বাত করতেন রাসুল। এ জন্য কেউ যদি মুত্তাকির স্তরে উন্নতি করতে চায়, তাহলে তাকে এই উন্নতি লাভের সমূহ শিক্ষা ও পন্থা রাসুল -এর কাছ থেকে অর্জন করতে হবে। কেননা, আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি মুহাব্বাত করতেন রাসুল। এ জন্য আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে নবিজিকে বেশি করে ভালোবাসতে হবে।
এক হাদিসে রাসুল বলেন, لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من ولده ووالده والناس أجمعين
তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ-না আমি তার কাছে তার সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই। এরপরই সে মুত্তাকির প্রথম ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে।
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সকলেই ঈমানদার। তবে আমাদের কার কতটুকু ঈমান আছে, সেটাও জানা দরকার। কেননা, প্রত্যেক জিনিস মাপার একটা যন্ত্র বা পাল্লা আছে, ঈমান মাপার যন্ত্রও আছে। এ সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেন, ঈমান মাপার পাল্লা হলো নবিজির মুহাব্বাত। নবিজিকে নিয়ে যার অন্তরে মুহাব্বাত যত বেশি, তার ঈমানও তত বেশি। সুবহানাল্লাহ। আর নবিজির মুহাব্বাতের মাধ্যমে তাকওয়া বা মুত্তাকিদের স্তরেরও প্রমোশন হয়।
প্রাথমিক স্তরের মুত্তাকি তারা, যারা দুনিয়ার এ জগতে আল্লাহকে মুহাব্বাত করে, কুফর-শিরক ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাদেরকে আখিরাতের চিরস্থায়ী আজাব থেকে রক্ষা করবেন। সুবহানাল্লাহ।
মুত্তাকি শব্দের একটা অর্থ হলো রক্ষা করা। এ জন্য দুনিয়ার এ জগতে যদি তুমি নিজেকে কুফর-শিরক থেকে রক্ষা করতে পারো, তাহলে হাশরের ময়দানে আল্লাহ তোমাকে চিরস্থায়ী আজাব থেকে রক্ষা করবেন। যদি ঈমান নিয়ে মরতে পার, তাহলে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবেন না। এটা সাধারণ বা প্রাথমিক স্তরের মুত্তাকির পরিণতি বা তাকওয়ার ফল।
মুত্তাকির প্রমোশন
এখন প্রাথমিক স্তরের মুত্তাকি যদি তার উন্নতি না ঘটায়, এক জায়গায় জমে থাকে, তাহলে হবে না। যেমন, কোনো ছাত্র প্রাথমিক ক্লাসে ভর্তি হলো। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষা সে যদি লাভ না করে, তাহলে প্রাথমিক স্তরে সে যত ভালো ফলাফলই করুক, অফিসের পিয়ন বা ফাইল টানা ছাড়া সেটা তার কোনো কাজে আসবে না। কিন্তু সে যদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করত, তখন ফাইল টানার জন্য লোক নিয়োগ করা লাগত। তখন সে বসে বসে আদেশ দিত। প্রাথমিক স্থরের ছাত্রের জন্য উচ্চ স্থরের ছাত্রের ভুল ধরা যেমন ঠিক নয়, এমনিভাবে মুত্তাকিদের প্রাথমিক ক্লাসের ছাত্র হয়ে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্যতাসম্পন্ন মুত্তাকির ভুল ধরেন, এটা আপনার জন্য মানায় না। এটা বেআদবি। প্রথম শ্রেণির মুত্তাকি হয়ে কীভাবে উচ্চস্তরের মুত্তাকির ভুল ধরবে? সমস্যা এখান থেকেই শুরু হয়। সাবধান, এমন কাজ কেউ করবেন না। এটা ঠিক নয়। দুনিয়ার আদালতেও এটার বিচার হওয়া জরুরি, নাহয় আল্লাহর আদালতে কেউ ছাড় পাবেন না। রাসুল বলেন,
أَلا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مسؤولُ عَنْ رَعِيَّتِهِ
প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
এ জন্য অন্যের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা বা নাক গলানো থেকে বিরত থাকতে হবে, নাহয় কিয়ামতের দিন এটারও জবাব দিতে হবে।
প্রাথমিক ক্লাসের মুত্তাকি যারা, তারা যদি উন্নতি করতে চায়, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মুহাব্বাত বৃদ্ধি করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের যাবতীয় হুকুম মেনে চলতে হবে। অন্যথায় বিভ্রান্ত হবেন। গাড়ির ব্রেক যদি না থাকে, তাহলে গাড়ি যত সুন্দরই হোক, দুর্ঘটনা ঘটবে। এখন যদি ড্রাইভার বলে, গাড়ির সবকিছু ঠিক আছে, শুধু ব্রেক নেই, আপনি কি সেই গাড়িতে উঠবেন?
আপনারা দুআ-দুরুদ বেশি করে পাঠ করুন। কী বলেন, কাজ হবে? জীবনের নিরাপত্তা পাবেন? ব্রেক যদি ঠিক না থাকে, তাহলে অজু-গোসল, দুআ-দুরুদ পড়লেও গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না। ব্রেক ফেইল গাড়ি দিয়ে যেভাবে গন্তব্যে পৌঁছা যায় না, ঠিক তেমনি মুখে শুধু মুহাব্বাতের বুলি আওড়িয়েও লাভ হবে না। এই মর্মে ইমাম শাফিয়ি রাহ. চমৎকার একটি কবিতা আবৃত্তি করেছেন,
لَوْ كَانَ حُبُّكَ صَادِقاً لأَطَعْتَهُ : إِنَّ الْمُحِبِّ لِمَنْ يُحِبُّ مُطِيعُ
কবিতার মর্ম হলো, তুমি শুধু আল্লাহ রাসুলের মুহাব্বাতের বুলি আওড়াও, অথচ শুধু মুখে মুহাব্বাত প্রকাশের নাম মুহাব্বাত নয়; বরং কাজে প্রমাণ করার নাম মুহাব্বাত। আল্লাহর নাফরমানি করো, রাসুলের পথ ও মতের উল্টো চলো; আর মুখে বলো আমি আল্লাহ ও রাসুলের আশিক। এটা আশিক নয়, অসুখ। কেননা, তুমি যদি সত্যিই আল্লাহ ও রাসুলকে মুহাব্বাত করতে, তবে আল্লাহর হুকুমমতো চলতে, রাসুলের পথ ও মত অনুযায়ী চলতে। আর যে যাকে মুহাব্বাত করে বা ভালোবাসে, সে তাকে দিল থেকে মানে। আল্লাহ ও রাসুলকে সত্যিকার অর্থে কীভাবে মানতে হবে, এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّدِقِينَ
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। [সুরা তাওবা: ১১৯]
অর্থাৎ, যারা মানে, তাদের কাছে যাও। আর প্রকৃত সত্যবাদী হলো তারা, যারা মুখে যা বলে, কথা ও কাজে তা পরিণত করে দেখায়। কেননা, প্রকৃত সত্যবাদীদের সংশ্রব গ্রহণ করলে, তাঁদের সাথে মিশলে তোমার মধ্যেও মানার একটা স্পৃহা তৈরি হবে। তখন তুমি আল্লাহ ও রাসুলের বিধিবিধান মানতে পারবে।
এতক্ষণের আলোচনায় আমরা জানতে পারলাম মুত্তাকির স্তর তিনটি: ১. প্রাথমিক বা সাধারণ স্তর, ২. মাধ্যমিক বা ভিআইপি স্তর, ৩. ভিভিআইপি বা উচ্চস্তর। এখন এই তিনটি স্তরের মধ্যে যারা দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরের মুত্তাকি, তারা বেশি বিপদে থাকে। কীভাবে বিপদে থাকে, এটা বুঝতে হবে।
আমাদের সমাজে যেমন তিন শ্রেণির মানুষ বাস করে। কিছু মানুষ ধনী, কিছু মানুষ মধ্যবিত্ত, আর কিছু মানুষ গরিব। এই তিনটি শ্রেণির মধ্যে যারা ধনী, তাদের কোনো অসুবিধা নেই। তারা আনন্দ-ফুর্তিতে বা সুখেই থাকে। আর যারা গরিব, তাদেরও কোনো অসুবিধা নেই। এরা যেকোনো জায়গায় হাত বাড়াতে পারে। যেহেতু তারা গরিব। গরিবদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
আর প্রার্থীকে ভর্ৎসনা করবেন না। [সুরা জুহা: ১০]
যে তোমার কাছে কিছু চায়, তুমি তাকে ধমক দিয়ো না। তাকে ফিরিয়ে দিয়ো না। বরং তোমার সামর্থ্য থাকলে তাকে কিছু দিয়ে দাও। এটা অত্যন্ত মহৎ একটি গুণ। কেননা, 'উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।' আপনি যখন কাউকে কিছু দেবেন, তখন আপনার হাত উপরে থাকবে। আপনি যদি সায়িলকে কিছু দিয়ে আপনার হাত উপরে রাখেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আপনাকে জান্নাতের উঁচু স্তরে রাখবেন। সুবহানাল্লাহ। নবিজি বলেন,
الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
এ জন্য যারা গরিব, তাদের কোনো সমস্যা নেই। যেখানে ইচ্ছা সেখানে হাত পাততে পারে। সমস্যা হলো মধ্যবিত্তের। এরা কারও কাছে চাইতেও পারে না লোকলজ্জার ভয়ে। আবার কাউকে দেওয়ার মতো অবস্থাও নেই। এমনকি অনেক সময় দিন যাপনে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হয়। এ জন্যই মধ্যবিত্ত যারা, তারা বিপদে আছে। ঠিক তেমনিভাবে যারা প্রাথমিক স্তরের মুত্তাকি, তাদের অবস্থা একরকম আর যারা প্রাথমিক স্তর থেকে উন্নীত হয়ে মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছে, এরপর উচ্চস্তরে পৌঁছার চেষ্টা করে, তখন সে বেশি বিপদে থাকে। ঠিক মধ্যবিত্তের মতো। আর মাধ্যমিক স্তরের মুত্তাকি হলো তারা, যারা আল্লাহর হুকুম মানে, আল্লাহর নিষেধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে।
মানতে হলে মানতে হবে
আল্লাহর হুকুম মানতে হলে নবিজির তরিকা মানতে হবে। নবিজির তরিকা মানতে হলে সাহাবায়ে কেরামের কথা মানতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের কথা মানতে হলে তাবেয়িনদের কথা মানতে হবে। এই ধারাবাহিকতা ফলো করতে হবে। নিজের খেয়াল- খুশি মতো করলে হবে না।
আপনি আল্লাহর হুকুম মানবেন নিজের ইচ্ছামতো? হবে না; বরং নবিজির তরিকামতো মানতে হবে। মনগড়া কোনো ইসলাম নেই, দ্বীন নেই। তাই নবিজির তরিকার মধ্যে যা নেই, এমন কোনো কাজ যদি কেউ করে আর বলে, এটা নবির তারিকা, আমি এটা মানলাম, এটা আল্লাহর হুকুম, তাই এটাকে মানলাম, এটা আল্লাহর নিষেধ, তাই এটা থেকে বাঁচলাম, এভাবে মনগড়া কিছু যদি সংযোজন-বিয়োজন করে, তবে সে তার তাকওয়ার মধ্যে ভাইরাস ঢুকিয়ে দিল।
মুফাসসিরগণ লিখেন, বড় ভাইরাস বা ফিতনা দুইটি। একটি হলো فتنة الشك ال 'সন্দেহবাতিকতা।' অর্থাৎ, দ্বীনের কোনো বিধানের মধ্যে একটা সন্দেহ তৈরি করা। আর সন্দেহ সৃষ্টিকারী এরকম একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এরা হলো শয়তানের বাহিনী। এরা সবসময় মানুষের অন্তরে সন্দেহ দানা বাঁধাতে তৎপর থাকে। আপনি নামাজ পড়ছেন, এরা এসে বলবে, 'আপনার নামাজ হয়নি।' অথচ আপনার নামাজ ঠিকই আছে। তবে এভাবে বলে আপনাকে সন্দেহে ফেলে দেবে। এমনিভাবে কোনো মাসাআলায় আপনাকে এমন সন্দেহে ফেলে দেবে যে, আপনি ভেবে বসবেন, এত দিন তাহলে আমি ভুলের মধ্যে ছিলাম!
ইমাম সাহেব জামাআতে নামাজে রুকুতে গেলেন। আপনারা দাঁড়িয়ে থাকবেন, নাকি রুকুতে যাবেন? অবশ্যই রুকুতে যাবেন। কিন্তু যদি বলেন, 'আমরা প্রতিদিন এভাবে ইমাম সাহেবের কথামতো রুকু করতে পারব না, আজ দাঁড়িয়ে থাকব', তাহলে আপনার নামাজ হবে? হবে না। এখন ইমাম সাহেব রুকুতে গেলেন আর আপনি দাঁড়িয়ে বিলম্ব করছেন, ইমাম সাহেব সিজদায়, আর আপনি তখন বসে বসে তাসবিহ পড়ছেন, তাহলে আপনার নামাজ হবে না। এরকম যদি কোনো মসজিদে চলতে থাকে, তাহলে মসজিদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। নামাজের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটবে। এই বিশৃঙ্খলা কেন হবে? বিশৃঙ্খলা হবে ইমাম না মানার কারণে, নিজে নিজে পণ্ডিতি করার কারণে। দ্বীনের ব্যাপারেও কাউকে না কাউকে মানতেই হবে। নাহলে আপনি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যাবেন। পদে পদে বিভ্রান্ত হবেন। তাই দ্বীনের ব্যাপারে বিজ্ঞ কারও দ্বারস্থ হোন। তাঁদের সান্নিধ্য গ্রহণ করুন। তাঁদের কথা মেনে চলুন। তখন আপনার তাকওয়ার উন্নতি হবে। যেমন, আপনি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলে আপনার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বিজ্ঞ শিক্ষক যিনি, তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করুন। যোগ্যতা আরও বাড়িয়ে নিন। তখন আপনি উন্নতি করতে পারবেন। এখন কেউ যদি প্রাইভেটভাবে কিছু করতে চায়, সেটা করতে পারে, তবে মূলধারা ছেড়ে নয়। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে কিছু করে উন্নতি করা যায় না। এ জন্য দরকার প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট। আর এটা ব্যক্তিগতভাবে অর্জিত হয় না। এ জন্য উন্নতি করতে হলে মূলধারার সাথে যুক্ত থাকতে হবে। এই মূলধারা বা টাওয়ার ছাড়া যাবে না। কারণ, টাওয়ার ছাড়লে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিভ্রান্ত হয়ে পড়বেন।
ফিতনাতুশ শাহওয়াত
মাধ্যমিক বা ভিআইপি স্তরের মুত্তাকি হলো সে, যে আল্লাহর হুকুম মেনে চলে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে। তবে এই ভিআইপি মুত্তাকি যারা, তারা দুটি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। একটা ভাইরাস হলো ফিতনাতুশ শাক বা সন্দেহবাতিকতা। অপরটি হলো, ফিতনাতুশ শাহওয়াত বা অপব্যাখ্যার ভাইরাস। তখন তার মনে যেটা চায়, সেটাই করে। কাউকে মানতে বা মেনে নিতে চায় না। যাঁদের অনুসরণে ১৪ শত বছর ধরে চলে আসা দ্বীনের কোনো বিধান সম্পর্কে হুটহাট বলে ফেলা যে, 'এটা সঠিক নয় বা এটা ব্যাখ্যা এভাবে হবে অথবা এত দিন এটা ভুলভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে'। এমন চিন্তা বা মনোভাবকে 'ফিতনাতুশ শাহওয়াত' বলে।
এই যে দুটি ফিতনা বা ভাইরাস, এ দুটি থেকে যদি মাধ্যমিক স্তরের মুত্তাকিরা নিজেদের হেফাজত করতে পারে, তাহলে সে ভিভিআইপি বা উচ্চস্তরের মুত্তাকি হিশেবে পরিগনিত হবে। আর ভিভিআইপি বা উচ্চস্তরের মুত্তাকি তারাই হয়, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কোনো বিধান পালনের ক্ষেত্রে শুদ্ধতার কষ্টিপাথরে বিষয়টির মান যাচাই করে। যেমন: আল্লাহর হুকুম মানতে গিয়ে সে অনুসন্ধান করবে, হুকুমটি নবিজির তরিকায় আছে কি-না। এখন হুকুমটি পালন করল নবিজির সুন্নাত তরিকায়। ফলে সুন্নাতপদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সে বিদআত থেকে মুক্ত থাকল। আর আল্লাহকে মুহাব্বাত করতে হলে নবিজির তরিকা অনুসরণ করতে হবে। এভাবেই তাকওয়ার স্তরের উন্নতি করতে হয়।
কুরআনে কারিমে আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা আলে ইমরান: ৩১]
অর্থাৎ, হে নবি, বলে দিন, কেউ যদি আমি আল্লাহকে মুহাব্বাত করতে চায়, তবে সে যেন আপনাকে অনুসরণ করে। কারণ, আল্লাহকে সরাসরি পাওয়া যাবে না। আপনার অনুসরণ করলেই আমি আল্লাহ তাকে বন্ধু হিশেবে গ্রহণ করে নেব। এ জন্য তাকওয়ার ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে হলে আল্লাহর প্রতি এবং রাসুল-এর মুহাব্বাতের মাত্রা বাড়াতে হবে। তবে আল্লাহকে 'খালিক' বা সৃষ্টিকর্তা হিশেবে সবচেয়ে বেশি মুহাব্বাত করতে হবে। আর আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে নবিজিকে বেশি মুহাব্বাত করতে হবে।
আল্লাহ ও রাসুল-এর প্রতি মুহাব্বাতের অবস্থা ঠিক রেখে কেউ যদি মুত্তাকির দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হতে চায়, তবে কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে হেফাজত রাখতে হবে। কেননা, কেউ যখন আল্লাহর হুকুম মানল, কুফর ও শিরক থেকে নিজেকে রক্ষা করল, তখন সে প্রাথমিক স্তরের মুত্তাকি হলো। এরপর সে নিজেকে কবিরা গুনাহ থেকে রক্ষা করল, সুন্নাত গ্রহণ করল, তখন সে দ্বিতীয় স্তরের মুত্তাকি হয়ে গেল। এরপর কেউ যখন নিজেকে আল্লাহর জন্য ওয়াকফ করে দেয় অর্থাৎ, দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে রক্ষা করে নেয়, তখন সে উচ্চস্তরের মুত্তাকি হয়ে গেল।
দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরের মুত্তাকি হচ্ছে তারা, যারা কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে হেফাজত করে, সুন্নাত মেনে চলে, বিদআত পরিত্যাগ করে। এখানে কবিরা গুনাহ সম্পর্কে সামান্য ধারণা দেওয়া যাক। কবিরা হচ্ছে এমন গুনাহ, কেউ যদি একটা কবিরা গুনাহ করে এবং তাওবা না করা অবস্থায় মারা যায়, তাহলে এই একটা কবিরা গুনাহই তার জাহান্নামে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। নাউজুবিল্লাহ।
এ পর্যায়ের কোনো মুত্তাকি যদি কবিরা গুনাহ করে ফেলে, তখন সাথে সাথে তাওবা করে নেবে। তাওবার যে ৭টি শর্ত আছে, এগুলো মেনে যদি সে তাওবাহ করে, তাহলে এমন হয়ে গেল যে, সে যেন কোনো গুনাহই করেনি। আর যদি তার দ্বারা সগিরা গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে সাথে সাথে কোনো নেক কাজ করে নেবে। কেননা, নেক আমলের দ্বারা সগিরা গুনাহ মাফ হয়ে যায়। হাদিসে আছে, কেউ যদি বিসমিল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি বলে অজু শুরু করে, তাহলে এই অজু অবস্থায় সে যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ তার আমলনামায় সাওয়াব লেখা হতে থাকে। এখন হাত দ্বারা অজু শুরু করলেন, হাদিসে আছে, হাতের মাধ্যমে যেসব গুনাহ হয়েছে, হাত ধোয়ার সময় অজুর পানির সাথে তা মাফ হয়ে যায়। এভাবে অজুর অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় সেসব অঙ্গ দ্বারা যেসব গুনাহ হয়েছে, সেগুলো অজুর পানির সাথে পরিষ্কার হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।
সহিহ মুসলিম শরিফে আছে, কেউ যদি অজু অবস্থায় মারা যায়, তাহলে আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন। সুবহানাল্লাহ। এ জন্য আমরা সবসময় অজুর হালতে থাকার চেষ্টা করব। অজু হলো মুমিনের হাতিয়ার। অজু অবস্থায় থাকলে শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
সুতরাং মাধ্যমিক স্তরের মুত্তাকি যখন কবিরা গুনাহ ছেড়ে দেয়, এমনকি সগিরা গুনাহও, অথবা সগিরা গুনাহ কখনো হয়ে গেলে সাথে সাথে নেক আমলের মাধ্যমে সেটার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়, এভাবে যখন সে তার জীবন পরিচালনা করতে থাকে, একপর্যায়ে আল্লাহর দয়ায় তার অবস্থান এতটাই বেড়ে যায় যে, তার তাকওয়া উচ্চস্তরের তাকওয়া হয়ে যায়। এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে আল্লাহ বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [সুরা আলে ইমরান: ১০২]
আমাদের সমাজে এমন অনেক আছে, পুলিশ, র্যাব, ডিবি, সেনাবাহিনীর ভয়ে যাদের প্রস্রাব ছুটে যাওয়ার উপক্রম হয়। অথচ এদের চেয়ে বড় হলেন আল্লাহ। আল্লাহকেই যথাযথভাবে ভয় করা উচিত। এখন কোনো বান্দা যদি এ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সে ভিভিআইপি মুত্তাকির স্তরে পৌঁছে যায়। সে তখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের যাবতীয় বিধিনিষেধ ঠিকমতো পালন করে এবং অন্তরের কলুষতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। এই স্তরের মুত্তাকি ব্যক্তি শুধু গুনাহ ছাড়ে না; বরং তার অন্তরে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে স্থান দেয় না। তার অন্তরে আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টির স্থান নেই।
خيالك في عيني وذكرك في فمي : ومثواك في قلبي فأين تغيب
এখন তার অন্তরে শুধু আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া তাতে অন্য কিছুর স্থান নেই।
এ পর্যায়ে এসে সে তার নিজের অস্তিত্বকে ভুলে যায়। সে তখন আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বোঝে না। এটা হলো সবচেয়ে উঁচু স্তরের তাকওয়া। এমন মুত্তাকির সুহবত বা সান্নিধ্যে যদি কোনো মানুষ যায়, তখন এমন মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণের কারণে আল্লাহ সান্নিধ্য গ্রহণকারীর অন্তরেও তাকওয়া সৃষ্টি করে দেন। সুবহানাল্লাহ।
সুহবতে সালিহিন
এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা রয়েছে। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রাহ. একজন উঁচুমাপের মুত্তাকি ছিলেন। শরিয়ত ও মারিফাতের জ্ঞানে অগাধ পাণ্ডিত্য রাখতেন। তাঁর অমর কীর্তি বিখ্যাত মসনবি শরিফ। গ্রন্থটি সারা বিশ্বে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত হয়। এটাকে ইলমে মারিফাতের গুরুত্বপূর্ণ কিতাব হিশেবে গণ্য করা হয়।
ঘটনাটি পরে বিস্তারিত বর্ণনা করা হবে। এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরছি। একবার মাওলানা রুমি হাদিসের দারস দিচ্ছিলেন। তখন সাধারণ বেশভূষার অধিকারী একজন দরবেশ এসে রুমির সামনে থেকে সব কিতাব পুকুরে ফেলে দেন। আকষ্মিক এ ঘটনায় মাওলানা রুমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। আগন্তুক দরবেশের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় তাঁর। একপর্যায়ে দরবেশ মাওলানা রুমিকে বলেন, 'তুমি কী চাও?'
রুমি জবাব দেন, 'আমি আমার কিতাব চাই'।
দরবেশ তখন পানিতে ফেলে দেওয়া কিতাবগুলো এমন অবস্থায় রুমির হাতে তুলে দেন যে, কিতাবগুলো শুকনো ও একেবারে নতুন দেখাচ্ছিল। আশ্চর্য এ ঘটনার পরেই দরবেশ গায়েব হয়ে যান। মাওলানা রুমি তখন নিজেকে ভাবনার জগতে হারিয়ে ফেলেন। এখান থেকেই তাঁর তাসাওউফপ্রেমের সূত্রপাত।
পানিতে কাগজের কিতাব ফেলে দেওয়ার পর সেগুলো একেবারে ঝকঝকে শুকনো ও নতুন হয়ে যাওয়া, এটা হলো মারিফাত। অন্যভাবে বলা যায়, এটা কারামাত। আর ওলিদের কারামাত সত্য হয়ে থাকে। এই যে ঘটনা আমরা জানলাম, এটা তাকওয়ার কারণেই সংগঠিত হয়েছে। কেউ যখন তাকওয়া অর্জনের রাস্তায় নেমে যায়, তখন এটার স্তর অনুযায়ী তাঁর অনেক নামও হয়ে থাকে। প্রথমে তার নাম হয় 'সালিক', এরপর হয় 'আরিফ', এরপর তার নাম হয় 'ওয়াসিল'। এ ছাড়া আরও অনেক নাম রয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এগুলো আছে।
মুকাররাব ও মুজতাবা
তাকওয়ার লাইনে মেহনতের মাধ্যমে কিছু লোক আল্লাহর ওলিদের কাতারে চলে যান। তখন কেউ হন 'মুকাররাব', কেউ হন 'মুজতাবা'। মুকাররাব মানে আল্লাহর খুবই কারিব বা নিকটবর্তী, আর মুজতাবা মানে আল্লাহর বাছাইকৃত বিশেষ বান্দাদের একজন।
হজরত মালিক ইবনু দিনার রাহ. ছিলেন 'মুজতাবা' পর্যায়ের একজন ওলি। তাঁর সম্পর্কে প্রসিদ্ধ আছে যে, একটা সময় তিনি ছিলেন বখাটে। মদপান করে ঘুরে বেড়াতেন। একবার তিনি মদ্যপ অবস্থায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে একটি কাগজের টুকরো দেখতে পান, যাতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লেখা রয়েছে। পরিত্যক্ত কাগজে আল্লাহর নাম দেখে মালিক ইবনু দিনার রাহ.-এর মনে আল্লাহর ভালোবাসা জেগে ওঠে। কাগজটি তিনি অত্যন্ত সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিলেন।
ব্যস, এই সামান্য ভালোবাসা, আল্লাহর নামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারটিই মালিক ইবনু দিনারের হিদায়তের জরিয়া হয়ে গেল। গাইব থেকে আওয়াজ এলো, 'হে মালিক ইবনু দিনার! তুমি হারাম মদ পান করেছ। তোমার চোখেমুখে নাপাকি ছড়িয়ে আছে। এ ছাড়া সবসময় তুমি নানা পাপকাজে জড়িত থাকো। এতকিছুর পরও আমি আল্লাহর প্রতি তোমার এত সম্মান, এত ভালোবাসা? শুনে রাখো, আমার নাম লেখা একটি কাগজকে এত সম্মান করার কারণে আমি আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে গুনাহের অন্ধকার মুছে দিলাম। এর পরিবর্তে তোমার অন্তর আমার মারিফাতের নুর দ্বারা আলোকিত করে দিলাম। মদ্যপ মালিক ইবনু দিনার হয়ে উঠলেন বিশিষ্ট বুজুর্গ হজরত মালিক ইবনু দিনার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। সুবহানাল্লাহ। এই পর্যায়ের মুত্তাকিদেরকে 'মুজতাবা' বা আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা বলা হয়।
এ জন্য আমাদের অন্তরেও আল্লাহর আজমত ও ভালোবাসা থাকতে হবে। আল্লাহই ভালো জানেন, তিনি কখন কাকে কীভাবে হিদায়ত দেবেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।
এটাকে তাকওয়ায়ে খাস বা বিশেষ তাকওয়া বলা হয়। এই বিশেষ তাকওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَمَثُوبَةٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْرٌ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾
আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাদের জন্য) প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। [সুরা বাকারা: ১১৩]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَ لَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَ اتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَةٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَ الْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْتُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। [সুরা আরাফ : ৯৬]
আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে 'আমনূ' শব্দ বলে প্রথম স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আর 'ওয়াত্তাকু' বলে দ্বিতীয় স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এই বিশেষ স্তরেও আবার আরও স্তর আছে, যেমন: আমি আমার নাক-মুখ-কানকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখলাম, এটা বাহ্যিক তাকওয়া, কিন্তু অন্তরে গুনাহ আছে, তাহলে হবে না। যদি অন্তরের কালো দাগ বা গুনাহ দূর করা যায়, তাহলেই কেবল বিশেষ স্তরের তাকওয়ার অধিকারী হওয়া সম্ভব। এ পর্যায়ে এই তাকওয়ার নাম বদলে 'ওয়ারা' হয়ে যাবে。
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَةً إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُوْنَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوْا يَقْتَرِفُوْنَ আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয় যারা পাপ অর্জন করে, তাদেরকে অচিরেই প্রতিদান দেয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে। [সুরা আনআম : ১২০]
হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন, عَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الْبِرِّ وَالإِثْمِ فَقَالَ الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ হজরত নাওয়াস ইবনু সামআন আনসারি রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসুল -কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করি। নবিজি উত্তর দিলেন, 'পুণ্য হচ্ছে সচ্চরিত্র আর পাপ হচ্ছে যা তোমার (অন্তরে) খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'
এই হাদিসে নবিজি হজরত নাওয়াস রা.-এর প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'নেকি হলো উত্তম চরিত্র। শুধু নামাজ পড়া নেকি নয়। কেউ যদি নামাজ পড়ে অন্যকে কষ্ট দেয়, তাহলে হবে না। বরং তার হাত-মুখ পা সব অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর চরিত্র হলো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাউকে কষ্ট না দেওয়া। কিন্তু আমরা করি কি, নামাজও পড়ি আবার ঘরে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করি। অথচ নবিজি যখন ঘরে যেতেন, তখন স্ত্রী আয়েশা রা.-কে চুম্বন করতেন। আপনি যদি একজন আদর্শ স্বামী হতে পারলেন না বা আদর্শ স্ত্রী হতে পারলেন না, তাহলে আপনার চরিত্র ঠিক হলো না।
আপনাকে আরও পরিশুদ্ধ হতে হবে। রাগ এলে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা এ জায়গায় অনেক পিছিয়ে। দেখা যায়, স্ত্রী যদি তরকারিতে লবণ একটু বেশি দিয়ে দেয়, তাহলে আপনি রাগ করে খাবার প্লেট ছুড়ে মারেন। এটা আদৌ সচ্চরিত্র হতে পারে না। এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন আপনি আখলাকের কোন স্তরে আছেন?
এতে বুঝা যায় যে, পূর্ণ ইসলামই প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল -এর পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকাকেই তাকওয়া বলা হয়। “বস্তুত তারাই মুত্তাকি, যাদের ঈমান ও 'আমল দুটিই পূর্ণাঙ্গ। আর ঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই ইসলাম।
তাকওয়ার তৃতীয় স্তর হচ্ছে, অন্তরকে আল্লাহ ব্যতিত যাবতীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখা। এই স্তরের তাকওয়া নবি ও ওলিগণের হয়ে থাকে। আর এটিই তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَۛۚ فِيهِۛۚ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। [সুরা বাকারা: ২]
ইমাম গাজালি রাহ. তাকওয়ার চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন। আগে একদিন বলেছি। কথাগুলো আজ আবার স্মরণ করিয়ে দিই :
১. শরিয়তে যেসব বস্তু হারাম করা হয়েছে, আল্লাহর ভয়ে সকল বস্তু থেকে বিরত থাকা। যেমন, মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা ও সুদ খাওয়া প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা। এটি সাধারণ মুমিনের তাকওয়া। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় মুমিন।
২. হারাম বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকার পর সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতেও দূরে থাকা। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় সালেহ।
৩. সকল হারাম বস্তু ও সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকার পর আল্লাহর ভয়ে অনেক সন্দেহবিহীন হালাল বস্তুও পরিত্যাগ করা। এ শ্রেণিকে মুত্তাকি বলা হয়।
৪. উপর্যুক্ত তিন শ্রেণির তাকওয়া আয়ত্ত করার পর এমন সকল হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা, যা ইবাদতে কোনো সহায়তা করে না। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় ‘সিদ্দিক’।
📄 মুত্তাকি হওয়ার সোপান
সম্মানিত মুসল্লিয়ানে কেরাম!
আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া যে, আমরা আজকের তাফসির মাহফিলে হাজির হতে পেরেছি। আল্লাহপাক চাইলে আমাদেরকে কোনো না-কোনো কাজে ব্যস্ত রাখতে পারতেন। চাইলে অসুস্থ বানিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখতে পারতেন। তেমন কিছু হলে আমরা এই মুবারক মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পেতাম না। এ জন্য আমরা আল্লাহর রাহমতের উপর ভরসা করে বলতে পারি, যে রমজান মাস এসেছে মুসলমানকে মুত্তাকি বানানোর জন্য, সেই মাসে আল্লাহপাক আমাদেরকে তাঁর ঘরে নিয়ে এসে তাঁর কালামের আলোচনায় জড়ো করে দিয়েছেন- এর অর্থ আল্লাহ আমাদের মুত্তাকি হওয়ার সুযোগ করে দিতে চান। হে আল্লাহ, আমাদেরকে মুত্তাকি না বানিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। সকলে বলুন আমিন।
সিয়াম এসেছে আমাদেরকে মুত্তাকি বানাতে। আর আমাদের আজকের আলোচনাও হলো মুত্তাকি সম্পর্কে। ইতিপূর্বের আলোচনায় আপনাদের জানা থাকার কথা যে, মুত্তাকির স্তর হচ্ছে তিনটি: সাধারণ স্তর, ভিআইপি স্তর, ভিভিআইপি স্তর। এখন আমরা নিজেই নিজের অবস্থান বুঝে নিই যে, আমি কোন স্তরে আছি।
১. সাধারণ বা প্রথম স্তরের মুত্তাকি হচ্ছে সাধারণ ঈমানদার। সিয়াম সম্পর্কিত আয়াতে আল্লাহ যে বললেন, লাআল্লাকুম তাত্তাকুন, 'যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো', এখানে মুত্তাকি দ্বারা কী উদ্দেশ্য, গত আলোচনা স্মরণ থাকলে আপনারা সেটা বুঝতে পারবেন,
তাকওয়া ছাড়া আপনার নামাজই হবে না। এরকম নামাজি নামাজ পড়েও জাহান্নামে যাবে। কারণ, তার তাকওয়া নেই। এ জন্য তাকওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআনের সুরা মাউন, যে সুরা আপনাদের সকলেরই মুখস্থ আছে, তাতে আল্লাহ পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন, ফাওয়াইলুল্লিল মুসাল্লিন। অর্থাৎ, এমন অনেক নামাজি আছে, যাদেরকে 'ওয়াইল' নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এমনিভাবে অনেক রোজাদার আছে, যাদের রোজা কোনো কাজে আসবে না। হাদিসে আছে, হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,
كَمْ مِنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الظَّمَأُ
অনেক রোজাদার আছে, যারা রোজা রেখে সারা দিন শুধু উপোষই থাকল, তাদের রোজার কোনো মূল্য নেই। কেন কোনো মূল্য নেই? কারণ, তার তাকওয়া নেই। আবার অনেক আছে, যারা সারা রাত সজাগ থেকে নফল ইবাদত করল, তাহাজ্জুদ- তিলাওয়াত করল। তাদের এই রাত জাগরণ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না তাকওয়া না থাকার কারণে। রাসুল বলেন,
وَكَمْ مِنْ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ
অনেক মানুষ আছে, যারা সারা রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করল, কিন্তু তার এই রাতজাগার কোনো মূল্য নেই। এমনিভাবে হজ, জাকাত ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা করা যাবে।
ইবাদত কবুলের শর্ত
মোটকথা, তাকওয়া না থাকলে কোনো ইবাদতই কবুল হবে না। কারণ, সব ইবাদতের রুহ হলো তাকওয়া। যার মধ্যে তাকওয়া নেই, তার ইবাদত কবুল হবে না। আমাদের নামাজ-রোজার কোনো প্রয়োজন নেই আল্লাহ তাআলার। তিনি শুধু আমাদের তাকওয়া দেখেন। এ কারণে ফেরেশতারা কখনো মুত্তাকি হতে পারবে না। আপনারা কখনো কোনো বক্তার মুখে এমন আলোচনা শুনেছেন কি যে, জিবরিল আ. বড় মুত্তাকি? অথবা মিকাইল, আজরাইল, ইসরাফিল আ. মুত্তাকি? না, কখনো শুনেননি। কারণ, মুত্তাকি শুধু তারাই হবে, যাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ অর্জনের সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর এটা শুধু মানুষকেই দেওয়া হয়েছে। মুত্তাকি তারাই হয়ে থাকে, যাদের মধ্যে গুনাহ করার ক্ষমতা রয়েছে।
এ জন্য জিবরিল বা কোনো ফেরেশতা কখনো মুত্তাকি হতে পারবেন না। কারণ, তাঁদের মধ্যে এই গুণ নেই। ভালো-মন্দ বাছবিচারের সক্ষমতা তাদের নেই। আল্লাহ তাঁদের যে যে আদেশ দিয়েছেন, সেসবই শুধু পালন করতে পারবেন। ফলে তাঁদের জন্য প্রতিদানও নেই, শাস্তিও নেই। তারা জান্নাত বা জাহান্নামে যাবেন না। আর মানুষের যেহেতু পাপ- পুণ্য অর্জনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তাই মানুষ চাইলে মুত্তাকি হতে পারে, আবার ইচ্ছা করলে বাটপারও হতে পারবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মানুষকে দুভাগে ভাগ করেছেন: ১. সায়িদ, ২. সাকি। সায়িদ হলো তারা, যাদের মধ্যে তাকওয়া রয়েছে, তারা ভাগ্যবান। আর সাকি বা দুর্ভাগা হলো তারা, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেনি।
এতক্ষণের আলোচনায় আমরা তাকওয়ার মর্ম সম্পর্কে জানতে পারলাম। মন চায় গুনাহ করতে কিন্তু আল্লাহর ভয়ে করে না, এটাই তাকওয়া।
এখন আমরা যে রোজা রাখলাম, আমাদের এই রোজা তাকওয়ার কোন পর্যায়ে আছে? আমরা রোজা রাখলাম কিন্তু তাকওয়া অর্জিত হলো না, তো এই রোজার কোনো দাম নেই। এমন রোজা রাখা মানে শুধু উপবাস আর পিপাসার্ত থাকা। কিয়ামত-দিবসে তার এই রোজা কোনো কাজে আসবে না। এখন আমরা রোজা রাখলাম আল্লাহকে রাজি করার জন্য; কিন্তু সেটা যদি অর্জিত না হয়, তাহলে এমন রোজা রাখার কোনো মানে নেই। এবার নিজেরাই নিজের রোজার অবস্থা বিবেচনা করতে পারব। আমার রোজা তাকওয়ার কোন স্তরে আছে, সেটা সহজেই বুঝে নিতে পারব। আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]
পূর্ববর্তী উম্মতের উপর রোজা বড় কঠিন ছিল। পরিমাণেও বেশি ছিল। অথচ আমাদের রোজা হচ্ছে একমাস। এখানে একটা বিষয় বলে রাখি। রোজা ৩০টি নয়, কারণ, আল্লাহ ৩০ দিন বা ২৯ দিনের কথা বলেননি; বলেছেন, তোমরা এক মাস রোজা রাখো'। এখানে সংখ্যার কোনো উল্লেখ নেই। তা ছাড়া আরবি মাস সবসময় যে ৩০ দিনে হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তাও নেই। ২৯ ও ৩০ দিনেই হয়। অপরদিকে ইংরেজি মাস ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখও হয়ে থাকে। রোজার হিসাব চাঁদের উপর নির্ভরশীল। এখন যদি রোজা ২৯টি হয়, তাহলে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে ৩০টির সাওয়াব দেবেন; আর ৩০টি পূর্ণ হলে আরও ভালো। সুতরাং, ২৯ বা ৩০ দিন রোজা নয়, এক মাস তথা রমজান মাস রোজা রাখব এবং এটাই আল্লাহর নির্দেশনা।
হজরত মুসা আ.-এর উম্মতের উপর রোজা ছিল ৪০ দিন। আমাদের চেয়ে বেশি; কিন্তু পরিমাণে বেশি হলেও সাওয়াব আমাদের বেশি। অপরদিকে হজরত দাউদ আ.-এর উম্মতের উপর ছয় মাস রোজা ফরজ ছিল। দাউদ আ. একদিন রোজা রাখতেন আর একদিন রোজাহীন থাকতেন। সহিহ হাদিসে এটা বর্ণিত আছে। এভাবে একদিন রোজা আর একদিন ইফতার করলে ৬ মাস হয়। কিন্তু আল্লাহ দয়া করে এই উম্মতের জন্য বেশিও না আবার কমও না, বরং মধ্যখানে রেখেছেন। আবার লাভও বেশি দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ।
এই যে রোজা, আল্লাহপাক এটা রাখার নির্দেশ কেন দিলেন? আমরা যদি রোজা রাখি অর্থাৎ, না খেয়ে থাকি, তাতে আল্লাহর কী লাভ? এর ফল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। এবার গত কালকের আলোচনার সূত্র টেনে বলতে চাই, আমরা কোন স্তরের মুত্তাকি? প্রথম স্তরে না দ্বিতীয় স্তরে? প্রথম বা সাধারণ স্তরে আমরা সকলেই আছি। আলহামদুলিল্লাহ। কারণ, মহামহিম আল্লাহ তাআলাই আমাদের ঈমানদার বলে সম্বোধন করে বলেছেন, يٰأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا । সাধারণ স্তর হলো কুফর ছেড়ে দেওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সকলেই সাধারণ স্তরে আছি। যেহেতু আমরা কুফর করি না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বিশ্বাস করেছি। এবার আমাদেরকে ভিআইপি এবং ভিভিআইপি স্তরে কীভাবে উন্নীত করতে পারি, সেটা চেষ্টা করতে হবে।
তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তর হলো, যা করলে পাপ হয় অথবা ছেড়ে দিলে পাপ হয় এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকা। অর্থাৎ, সব কবিরা, সগিরা, শিরক ও বিদআত ছেড়ে দেওয়া। কারও কারও মতে, সামান্য ও ছোটখাটো ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেও বেঁচে থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ কর্তৃক আদেশকৃত সব বিষয় মেনে চলা এবং অপছন্দনীয় যাবতীয় বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। এখন কোনো ব্যক্তি যদি তার হাত, মুখ, নাক, কান, পা ইত্যাদি সব অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তাহলে এটাকে দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরের তাকওয়া বলা হয়। এ পর্যায়ের তাকওয়ার আবার বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং এই স্তরের তাকওয়ার উপর ভিত্তি করেই কুরআন-হাদিসে বিভিন্ন কল্যাণ ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।
এ জন্য তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ লিখেন, রোজাদার তিন প্রকার :
১. সাধারণ রোজাদার।
২. ভিআইপি রোজাদার।
৩. ভিভিআইপি রোজাদার।
সাধারণ রোজাদার হলো, যারা পেটে খাবার-পানি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। যেমনটা আমরা করে থাকি। আর এই সাধারণ রোজা রাখা ফরজ। এখন কেউ যদি তা না করে, সে ফরজ ছাড়ার কারণে গুনাহগার হবে। তাকে আল্লাহর আদালতে দাঁড়াতে হবে। কেউ যদি সাধারণভাবে এই প্রকারের রোজা রাখে, তাহলে তার রোজার ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে কিন্তু যারা মুত্তাকি, তাদেরকে এমনটা করলে চলবে না; বরং ভিআইপি রোজাদার হতে হবে। এ জন্য শুধু উপবাস থাকা নয়, বরং রোজা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তার হাত, চোখ, মুখ, কান, নাক ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে।
এখন যদি রোজা রেখেটিভির সামনে বসে টাইমপাস করা হয়, তাহলে সেটা তাকওয়া হলো না। যারা তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রেখে কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবিহ ইত্যাদি পাঠ করে, তারা হলো ভিআইপি রোজাদার। আর যারা ভিআইপি রোজাদার, আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে যখন প্রবেশ করাবেন, তখন শাহি একটি গেইট দিয়ে প্রবেশ করাবেন। বিশেষ সেই গেইটের নাম হলো রাইয়্যান। দুনিয়ায় রোজা অবস্থায় তারা যেহেতু সারা দিন পিপাসার্ত অবস্থায় দিন কাটিয়েছিল, তাই পরকালে তাদেরকে আল্লাহ তাঁর দিদার লাভ করে হৃদয়ের সব তৃষ্ণা নিবারণ করাবেন। সুবহানাল্লাহ।
রাসুল ইরশাদ করেন,
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ
রোজাদারের আনন্দ দুইটি, একটি ইফতারের সময়। কারণ, সারা দিন রোজা রেখে যখন ইফতার সামনে আসে, তখন আনন্দ লাগে। এই আনন্দ মূলত আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য। সারা দিন উপবাস থেকেছি আল্লাহর আদেশে, ইফতারও করতেছি আল্লাহর আদেশ। আর মুমিনের কাজই তো হলো আল্লাহর আদেশ মানা। সুতরাং আল্লাহর আদেশ যে মানতে পারলাম, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।
ইফতারের সময় আমরা খেজুর দিয়ে ইফতার করব। হাদিসে আছে, একবার নবিজি সাহাবিদের প্রশ্ন করলেন, 'হে সাহাবিরা, বলো তো মুমিনের প্রতীক কী? মুমিনকে আল্লাহ কোন জিনিসের সঙ্গে উপমা দিয়েছেন?' সাহাবিদের একটি অভ্যাস ছিল, নবিজি কোনো প্রশ্ন করলে তাঁরা সাধারণত জবাব দিতেন না। বরং বলতেন, 'আল্লাহু ও রাসুলুহু আ'লাম' অর্থাৎ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন। নবিজির প্রশ্নের জবাবে সাহিবগণ কোনো কিছু বলেননি, তখন নবিজি বলেন, 'মুমিনের তুলনা হলো খেজুর গাছের সঙ্গে। খেজুর গাছের সাথে মুমিনের কেন তুলনা দেওয়া হলো, হাদিসে এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। আমরা সেদিকে যাব না। তাই মুমিনকে যেহেতু খেজুর গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে, তাই মুমিনরা খেজুর দিয়েই ইফতার করবে এবং এটাই সুন্নাত। খেজুর দ্বারা ইফতার করলে স্বাস্থ্যগত অনেক উপকার রয়েছে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সাথে জড়িতরা এটা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। খেজুরের অনেক ফায়দা আবিষ্কার করেছেন।
ভিভিআইপি রোজদার হলো তারা, যারা নিজেদের অন্তরকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে যে, তাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বা আর কোনো কিছুর মুহাব্বাত থাকে না। অর্থাৎ সে তার অন্তরকে এমনভাবে হেফাজত করে, তাতে কোনো পাপ আর অবশিষ্ট থাকে না।
সাধারণ রোজাদাররা তার পেটকে হেফাজত করে, ভিআইপি রোজাদাররা তাদের শরীরের সব অঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে হেফাজত করে আর ভিভিআইপি রোজাদাররা তাদের অন্তরকেও গুনাহ থেকে হেফাজত করে। এরকম তাকওয়া অর্জন করে ভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার জন্য আল্লাহ রোজার এই বিধান আমাদের উপর ফরজ করেছেন।
এখন আজকের আলোচনা যেহেতু তাকওয়ার আলোচনা ছিল আর আমরা রোজার মাধ্যমে যেহেতু তাকওয়া অর্জন করব, এবং এই তাকওয়া কোন ধরণের তাকওয়া হবে, সেটা এখন আলোচনা করব।
তাকওয়ার তিনটি স্তর যথা: সাধারণ তাকওয়া, ভিআইপি তাকওয়া, ভিভিআইপি তাকওয়া; এই যে তাকওয়ার স্তর, এখানে আমাদেরকে প্রথমে সাধারণ তাকওয়া অর্জন করতে হবে। এরপর ভিআইপি তাকওয়া। আর এটা অর্জন করতে হলে যারা ভিআইপি তাকওয়াবান বা মুত্তাকি, তাদের দ্বারস্ত হতে হবে। এর পরের স্তর হলো ভিভিআইপি তাকওয়া। আমরা যখন দ্বিতীয় স্তর বা ভিআইপি তাকওয়ার স্তরে উন্নীত হয়ে যাব, তখন তৃতীয় স্তর বা ভিভিআইপি তাকওয়াবান যারা, তাদের দ্বারস্থ হতে হবে, তাদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে। এভাবে সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে তাকওয়ার বিভিন্ন স্তরে উন্নীত হওয়া যাবে।
মাওলানা রুমি এবং শামসুদ্দিন তাবরিজি
সান্নিধ্য বা সাহচর্যের মাধ্যমে কীভাবে তাকওয়ার উচ্চমর্যাদা অর্জিত হয়, এই আলোচনা বোঝার সুবিধার্থে হজরত জালালুদ্দিন রুমি রাহ. সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করছিলাম। মাওলানা রুমি রাহ. ভিআইপি তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন। এরপর ভিভিআইপি তাকওয়াওলা একজনের সান্নিধ্য গ্রহণের মাধ্যমে তিনিও ভিভিআইপি তাকওয়ার অধিকারী হয়ে যান।
মাওলানা রুমি রাহ. একজন যুক্তিবাদী, তর্কবিশারদ, মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুহাক্কিক আলিম ছিলেন। জাহিরি ও বাতিনি সব বিষয়ে তিনি অগাধ পান্ডিত্য রাখতেন। একবার মাওলানা রুমির কাছে অত্যন্ত সাধারণ বেশে একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি আসেন। মাওলানা রুমি এ সময় দারস দিচ্ছিলেন। আগন্তুক ওই দরবেশ ব্যক্তি রুমির কাছে আগমন করে বলেন, 'আপনি এসব কী করছেন?' ফকিরের বেশ ধরে আসা ওই ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে মাওলানা রুমি বলেন, 'তুমি এসব বুঝবে না।' মূলত ওই দরবেশকে একজন ফকির ভেবে তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি এমন জবাব দিয়েছিলেন। কেননা, তখনো আগন্তুক সম্পর্কে তাঁর কোনো জানাশোনা ছিল না।
দরবেশ ব্যক্তি মাওলানা রুমির সামনে থাকা সব কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দেন। তখন মাওলানা রুমি প্রশ্ন করেন, 'তুমি এ কী কাজ করলে?' আগন্তুক জবাব দেয়, 'আমি কী কাজ করেছি, তা তুমি বুঝবে না। যেভাবে তোমার কথা আমি বুঝিনি, তেমনি তুমিও আমার কথা বুঝনি। তুমি তো নিজেকে অনেক বড় জ্ঞানী মনে করো, মানতিক, ফালসাফায় পান্ডিত্যের দাবি করো, অথচ আমি কী করেছি, সেটা তুমি বুঝো নি।' রুমি তাঁকে বলেন, 'এত সব বোঝাবুঝির দরকার নেই। আমার কিতাবগুলো ফেরত দিন। আগন্তুক ব্যক্তি তখন পানিতে ভাসতে থাকা কিতাবগুলোতে হাত দিতেই তা সুন্দর ও ঝকঝকে হয়ে গেল!
এটা হচ্ছে কারামাত। আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হচ্ছে كرامة الاولياء حق অর্থাৎ ওলিদের কারামত সত্য। কারামাত আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকে, ওলিদের নিয়ন্ত্রণে নয়। আর মুজিজা হচ্ছে, কোনো নবি থেকে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটা। যেমন, চাঁদ দ্বিখন্ডিত করা। ওলিদের থেকে অবিশ্বাস্য কিছু প্রকাশ পেলে সেটা কারামাত। তবে কোনো বাটপার, ভন্ড বা গুনাহকারীর কাছ থেকে যদি অবিশ্বাস্য কিছু প্রকাশ পায়, তাহলে সেটা যাদু। এ পর্যায়ে আমরা মুজিজা, কারামাত ও যাদু সম্পর্কে সামান্য ধারণা পেয়ে গেলাম। যাদু হচ্ছে, শয়তানের সাহায্যে দীর্ঘ সাধনার ফল। মানুষ সাধনা করে চাইলে আকাশে উড়তে পারে। কিন্তু এগুলো শয়তানি কার্যকপাল, বিশ্বাস করা যাবে না।
এখন আমরা মূল আলোচনায় ফিরে যাই। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির একটি ঘটনা আলোচনা করছিলাম। যে দরবেশ তাঁর কাছে ফকিরের বেশে এসেছিলেন, তিনি হচ্ছেন জগদ্খ্যাত আলিম ও দরবেশ মাওলানা শামসুদ্দিন তাবরিজি রাহ.। তিনি যখন পানি থেকে কিতাবগুলো উঠিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন কিতাবগুলো একেবারে নতুন হয়ে গেল। অথচ সাধারণ নিয়ম হলো, পানিতে পড়লে কোনো বই বা কাগজ তার মূল রূপ হারিয়ে ফেলে। ভিজে স্যাতসেতে হয়ে যায়। কালি উঠে লেখা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখানে দেখা গেল ঠিক উল্টো।
মাওলানা রুমি রাহ. আগন্তুক দরবেশের এই কারামাত দেখে তাঁর প্রতি অভিভূত হয়ে পড়লেন। এতদিন তিনি তাঁর জাহিরি ইলমের কারণে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভুগছিলেন। এবার ওই আগন্তুকের আশ্চর্য কারামাত দেখে তিনি তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে গেলেন। আগন্তুক শামসুদ্দিন তাবরিজি রাহ.-এর জন্য তাঁর অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল। হাদিসে আছে, নবি হজরত দাউদ আ.-এর দুআ রাসুল ﷺ বর্ণনা করতেন। দাউদ আ. সবসময় এই দুআ করতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَحُبَّ عَمَل يُبَلِّغُنِي حُبَّكَ، হে আল্লাহ, আমি আপনার মুহাব্বাত চাই এবং আপনাকে যারা মুহাব্বাত করে, তাদেরও মুহাব্বাত চাই এবং এমন আমলের তাউফিক চাই, যে আমল আপনার মুহাব্বাত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
রুমি রাহ.-এর কাছে আগত সাধারণ বেশের এই দরবেশ আল্লাহকে ভালোবেসে এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন? এ ঘটনার ফলেই তাবরিজির প্রতি রুমির ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়।
মাওলানা রুমির পরিবর্তন
এদিকে তখন আরেকটি ঘটনা ঘটে। শামসুদ্দিন তাবরিজি রাহ. পানি থেকে কিতাবগুলো তুলে মাওলানা রুমির হাতে দিয়েই তিনি জঙ্গলের দিকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তখন থেকেই মাওলানা রুমিরও সব জ্ঞান লোপ পেয়ে যায়। তিনি হাদিস পড়াতে যান, হাদিসের ইবারত মুখে আসে না। তাফসির করতে যান, কোনো কথা বের হয় না। এভাবে ইলমি কোনো কাজেই আর তিনি সফল হচ্ছিলেন না। অবস্থা যখন এমন হয়ে দাঁড়ায়, তখন তিনি নিজেকে একজন অজ্ঞ-মূর্খ মনে করতে থাকেন।
নিজের এ অবস্থা দেখে মাওলানা রুমি ভাবনায় পড়ে যান। দরবেশ পানিতে কিতাব ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতেই সেটা ফেরত পেলাম। এবার যে আমার ইলম চলে গেল, তা কীভাবে ফেরত পাব? এই ভেবে তিনি পাগলের মতো হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক শামসুদ্দিন তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। কিন্তু তাঁকে কোথায় পাবেন, কীভাবে পাবেন- কিছুই জানেন না। তিনি তো অজানার দিকে চলে গেছেন। তবে তাঁকে পেতেই হবে। এই ভাবনা থেকে মাওলানা রুমি ও দারস-তাদরিস ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেলেন। অনেক খোঁজাখুজির পর শেষ পর্যন্ত তিনি দরবেশ শামসুদ্দিন তাবরিজির সাক্ষাৎ লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে মাওলানা রুমি তাঁর মসনবি শরিফে লিখেন,
یک زمانه صحبت با اولیا : بہتر از صد سالہ طاعت بے ریا
আল্লাহর ওলির সামনে এক মুহূর্ত সময় অবস্থান করা রিয়া ছাড়া শত শত বছর নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।
তাঁর এ কথার সারমর্ম হলো, আমি তো হাদিস পড়াচ্ছিলাম, মানুষ আমাকে মুহাদ্দিস বলবে। তাফসির করছিলাম, মানুষ আমাকে মুফাসসির বলবে। আমি মানতিক পড়াচ্ছিলাম, মানুষ আমাকে যুক্তিবাদী বলবে, কিন্তু এরকম ধারণা আমার অন্তর থেকে দূর না করতে না পারলে তো এমন আমলের কোনো দাম নেই। এই ভাবনা দূর করে আমার অন্তরে উচ্চস্তরের তাকওয়া অর্জিত হতে হবে, নাহয় এসব ইলম অর্জন ও আমলের কোনো দাম থাকবে না। এটা দূর করতেই আল্লাহ তাআলা নিজ দয়াগুণে তাঁর একজন বান্দাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। মাওলানা রুমি যখন শামসুদ্দিন তাবরিজির সান্নিধ্য গ্রহণ করলেন, এরপর তাঁর কী অবস্থা হলো, অপর এক কবিতায় তিনি সেটা তুলে ধরে বলেন,
مولوی ہرگز نہ شد مولائے روم : تا غلام شمس تبریز نہ شد
জালালুদ্দিন রুমি মৌলভি থেকে মাওলানা হতে পারতেন না, যদি শামসুদ্দিন তাবরিজির সান্নিধ্য লাভ না করতেন।
সুতরাং স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে আমাদেরকে সত্যিকার আওলিয়ায়ে কেরাম ও পির-মুরশিদের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে হবে এবং প্রেম ও ভক্তির সাথে ওলি ও বুজুর্গদের খেদমত ও সুহবতে থেকে খোদার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াত দ্বারা ধন্য হতে চেষ্টা চালাতে হবে। তবেই আমাদের পার্থিব ও পরকালীন জীবন সার্থক ও সুন্দর হবে। অন্যথায় আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবাল তাঁর এক কবিতায় লেখেন,
ہر لحظہ ہے مومن کی نئی شان نئی آن : گفتار میں، کردار میں، اللہ کی برہان!
কবি ইকবালের মর্দে মুমিন নামক এক কবিতার এই শ্লোক এটি। তাতে তিনি বলতে চেয়েছেন, মুমিনের প্রত্যেক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন। কারণ, মুমিন যখন সাধারণ মুত্তাকি থাকে, তখন সে এই স্তরে থাকতে পছন্দ করে না। তখন সে আরও উন্নত স্তরের মুত্তাকি হতে চায়। যখন ভিআইপি মুত্তাকি হয়, তখন সে তাতেও সন্তুষ্ট থাকতে চায় না; বরং ভিভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার বাসনা তার মনে জেগে বসে। তখন তার কথায়, চালচলনে তাকওয়া ভেসে ওঠে। মানুষ তার মধ্যে একজন খাঁটি আল্লাহওয়ালার সকল আলামত দেখতে পায়।
আল্লাহওয়ালা চেনার উপায়
এখন কে আল্লাহওয়ালা, কে আল্লাহর ওলি, আমরা কীভাবে চিনব? এর পরিচয় দিতে গিয়ে নবিজি এক হাদিসে বলেন, ذا روؤا ذكر الله। অর্থাৎ, যার কথা শুনলে, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, সে আল্লাহর ওলি। এটাই হলো মুমিনের অবস্থা। আর মুমিন শুধু তার তাকওয়ার বা অবস্থার উন্নতি চায়। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদেরকে শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের মুত্তাকি হলে চলবে না; বরং তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হতে হবে। আর সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকি হতে হলে এমন আরও একজনের শরণাপন্ন হতে হবে।
এ মর্মে আল্লামা ইকবাল বলেন, دیم عارف نسیم صبح دم ہے : اس سے ریشہ معنی میں نم ہے
অর্থাৎ আল্লাহওয়ালাদের একেকটা শ্বাস হলো ঠান্ডা বাতাসের চেয়েও প্রশান্ত বাতাস। ফজরের নামাজের পর সকালে যে বাতাস প্রবাহিত হয় এবং আপনি তা শরীরে লাগান, সেটা অত্যন্ত উপকারী। এটা পূর্ব দিক থেকে বয়ে থাকে। এই বাতাস যেভাবে আপনার শরীরের জন্য উপকারী, তেমনি আল্লাহওয়ালাদের শ্বাস হলো তার অন্তরের জন্য উপকারী। এর মাধ্যমেই মানুষের জীবনে তাজেগি বা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসে।
অন্যত্র কবি ইকবাল বলেন, اگر کوئی شعیب آئے میسر : شبانی سے کلیمی دو قدم ہے
আল্লাহ যদি শুয়াইব আলাইহিস সালামের মতো কাউকে অভিভাবক দান করেন, যেভাবে শুয়াইব আলাইহিস সালামের কাছে মুসা আলাইহিস সালাম গিয়েছিলেন এবং তাঁর সাহচর্যেই মুসা থেকে 'মুসা কালিমুল্লাহ' হয়ে যান। বকরি রাখাল থেকে তুর পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা অর্জন করেন। এটা শুয়াইব আলাইহিস সালামের সান্নিধ্য অর্জনের ফল।
আমরা যদি শুয়াইব আলাইহিস সালামের মতো একজন দরদি অভিভাবক আল্লাহওয়ালার সন্ধান করি এবং পেয়ে যাই, তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ করি, তাহলে মুসা আলাইহিস সালাম যেভাবে বকরি রাখাল থেকে তুর পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, আমাদেরকেও এভাবে সাধারণ মুত্তাকি থেকে ভিআইপি মুত্তাকি এরপর ভিভিআইপি মুত্তাকি বানিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করবেন। আর দুনিয়া আখিরাতে সম্মানের মাপকাঠি হলো তাকওয়া। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴾
তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। [সুরা হুজুরাত : ১৩]
তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর, সুঠাম দেহের অধিকারী, অর্থ-বৈভবের মালিক, সে মুত্তাকি নয়; বরং তাকওয়ার বা মুত্তাকি হওয়ার মাপকাঠি হচ্ছে, যার অন্তর যত সুন্দর, আল্লাহকে দিয়ে যার ভয় এবং ভালোবাসা যত বেশি, সেই সবচেয়ে বড় মুত্তাকি।
এ জন্য বুখারির হাদিসে আল্লাহর রাসুল বলেন, আনা আ'লামুকুম বিল্লাহ, ওয়া আতকাকুম লিল্লাহ। আমি হলাম তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম, মুত্তাকি এবং পরহেজগার। আমরা যেন এমন তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকি হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারি, আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
এটাকে তাকওয়ায়ে খাস বা বিশেষ তাকওয়া বলা হয়। এই বিশেষ তাকওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَمَثُوبَةٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْرٌ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾
আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাদের জন্য) প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। [সুরা বাকারা: ১১৩]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَ لَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَ اتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَةٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَ الْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْتُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। [সুরা আরাফ : ৯৬]
আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে 'আমনূ' শব্দ বলে প্রথম স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আর 'ওয়াত্তাকু' বলে দ্বিতীয় স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এই বিশেষ স্তরেও আবার আরও স্তর আছে, যেমন: আমি আমার নাক-মুখ-কানকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখলাম, এটা বাহ্যিক তাকওয়া, কিন্তু অন্তরে গুনাহ আছে, তাহলে হবে না। যদি অন্তরের কালো দাগ বা গুনাহ দূর করা যায়, তাহলেই কেবল বিশেষ স্তরের তাকওয়ার অধিকারী হওয়া সম্ভব। এ পর্যায়ে এই তাকওয়ার নাম বদলে 'ওয়ারা' হয়ে যাবে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَةً إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُوْنَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوْا يَقْتَرِفُوْنَ আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয় যারা পাপ অর্জন করে, তাদেরকে অচিরেই প্রতিদান দেয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে। [সুরা আনআম : ১২০]
হادিসে রাসুল ইরশাদ করেন, عَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الْبِرِّ وَالإِثْمِ فَقَالَ الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ হজরত নাওয়াস ইবনু সামআন আনসারি রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসুল -কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করি। নবিজি উত্তর দিলেন, 'পুণ্য হচ্ছে সচ্চরিত্র আর পাপ হচ্ছে যা তোমার (অন্তরে) খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'
এই হাদিসে নবিজি হজরত নাওয়াস রা.-এর প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'নেকি হলো উত্তম চরিত্র। শুধু নামাজ পড়া নেকি নয়। কেউ যদি নামাজ পড়ে অন্যকে কষ্ট দেয়, তাহলে হবে না। বরং তার হাত-মুখ পা সব অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর চরিত্র হলো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাউকে কষ্ট না দেওয়া। কিন্তু আমরা করি কি, নামাজও পড়ি আবার ঘরে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করি। অথচ নবিজি যখন ঘরে যেতেন, তখন স্ত্রী আয়েশা রা.-কে চুম্বন করতেন। আপনি যদি একজন আদর্শ স্বামী হতে পারলেন না বা আদর্শ স্ত্রী হতে পারলেন না, তাহলে আপনার চরিত্র ঠিক হলো না。
আপনাকে আরও পরিশুদ্ধ হতে হবে। রাগ এলে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা এ জায়গায় অনেক পিছিয়ে। দেখা যায়, স্ত্রী যদি তরকারিতে লবণ একটু বেশি দিয়ে দেয়, তাহলে আপনি রাগ করে খাবার প্লেট ছুড়ে মারেন। এটা আদৌ সচ্চরিত্র হতে পারে না। এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন আপনি আখলাকের কোন স্তরে আছেন?
এতে বুঝা যায় যে, পূর্ণ ইসলামই প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল -এর পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকাকেই তাকওয়া বলা হয়। “বস্তুত তারাই মুত্তাকি, যাদের ঈমান ও 'আমল দুটিই পূর্ণাঙ্গ। আর ঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই ইসলাম।
তাকওয়ার তৃতীয় স্তর হচ্ছে, অন্তরকে আল্লাহ ব্যতিত যাবতীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখা। এই স্তরের তাকওয়া নবি ও ওলিগণের হয়ে থাকে। আর এটিই তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর。
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَۛۚ فِيهِۛۚ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। [সুরা বাকারা: ২]
ইমাম গাজালি রাহ. তাকওয়ার চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন। আগে একদিন বলেছি। কথাগুলো আজ আবার স্মরণ করিয়ে দিই :
১. শরিয়তে যেসব বস্তু হারাম করা হয়েছে, আল্লাহর ভয়ে সকল বস্তু থেকে বিরত থাকা। যেমন, মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা ও সুদ খাওয়া প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা। এটি সাধারণ মুমিনের তাকওয়া। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় মুমিন।
২. হারাম বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকার পর সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতেও দূরে থাকা। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় সালেহ।
৩. সকল হারাম বস্তু ও সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকার পর আল্লাহর ভয়ে অনেক সন্দেহবিহীন হালাল বস্তুও পরিত্যাগ করা। এ শ্রেণিকে মুত্তাকি বলা হয়।
৪. উপর্যুক্ত তিন শ্রেণির তাকওয়া আয়ত্ত করার পর এমন সকল হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা, যা ইবাদতে কোনো সহায়তা করে না। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় ‘সিদ্দিক’।
জামাআতে নামাজ পড়া
যারা নিয়মিত জামাআতে নামাজ পড়বে তারা এ যুগের সবচেয়ে বড় ওলি। তাই এদের দেখে মশকারা না করে মুহাব্বাত করতে হবে। যারা জামাআতে নামাজ পড়ল, তারা বিশেষ প্রকার মুত্তাকি। এখন ভিভিআইপি মুত্তাকি হওয়ার জন্য আরও কিছু গুণ অর্জন করতে হবে। যেমন ফরজ নামাজ পড়বে। সুন্নাতে মুআক্কাদা ছাড়বে না। অনেকে আছেন, যারা জুমুআর জামাত পড়েন, অথচ তার আগে ও পরের সুন্নাত পড়েন না। যদি সুন্নাত আদায় না করেন, তাহলে গুনাহগার হবেন। তাই ভিআইপি মুত্তাকির জন্য ফরজ নামাজ পড়তে হবে। ভিআইপি মুত্তাকির জন্য সুন্নাত ছাড়া যাবে না। আরও উচ্চ মর্যাদাবান মুত্তাকি হওয়ার জন্য নফল বেশি বেশি পড়তে হবে।
রমজানে বেশি নফল পড়লে বেশি সাওয়াব। এখানে ৮ রাকাত, ২০ রাকাত নিয়ে ঝগড়া কীসের? যত বেশি পড়বে তত বেশি মর্যাদা। যে যত বেশি নফল পড়বে, সে তত বেশি মর্যাদাবান হবে। নফলের মাধ্যমে বান্দা আর বান্দা থাকে না, সে তখন আল্লাহর বন্ধু হয়ে যায়। আল্লাহর বন্ধু হওয়ার জন্য তিনি আমাদের রমজান দিয়েছেন। বন্ধুত্বের কারণে এক বন্ধুর মুখের গন্ধ অপর বন্ধুর কাছে ভালো লাগে। তাই তো রমজানে রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশক আম্বরের চেয়েও প্রিয়।
রমজানে বেশি বেশি নফলের মাধ্যমে আল্লাহর বন্ধু হওয়া যায়। রমজানে নফল পড়া, রমজানের বাইরে ফরজ পড়ার সমান সাওয়াব। তাই তারাবি ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত, তা নিয়ে ঝগড়ায় যাবার দরকার নেই। যত বেশি নফল পড়বেন, ততই উপকার। বেশি বেশি নফল পড়ুন।
সালাতুত তারাওয়িহ
তারাওয়ির সম্পর্কে যে হাদিস নিয়ে প্রোপাগান্ডা হয়, সে হাদিসটি আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি এখানে আট রাকাত বলেছেন। এখানে মূলত তারা হাদিস না বুঝে বিভ্রান্ত হয়েছে। কারণ হাদিসে আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাহাজ্জুদ সম্পর্কে। রাসুল তিন রাত তারাবির নামাজ জামাআতে পড়েছেন। প্রশ্নকারী সাহাবিও সে জামাআতে উপস্থিত ছিলেন। তাহলে তিনি তারাবির রাকাত সম্পর্কে জানতেন। তবে তা জানার পরেও প্রশ্ন করার কারণ কি ছিল? প্রশ্নের কারণ ছিল, তারাবির নামাজ সম্পর্কে তো জানি, তবে রাসুল তাহাজ্জুদ কয় রাকাত পড়তেন, তা জানা। এ জন্য আয়েশা রা. জবাব দিলেন রমজান ও রমজান ছাড়া নবিজি ৮ রাকাত পড়তেন। রমজান ও রমজান ছাড়া তারাওয়ি পড়া হয়, নাকি তাহাজ্জুদ পড়া হয়? আবার ২০ রাকাত পড়ার কথা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন। তাই আয়েশার হাদিস তারাওয়ির নয়, তাহাজ্জুদের।
কিন্তু এই বিভ্রান্তি এল কেন? সহিহ বুখারির একটি হাদিস এবং ইমাম বুখারিকে না চেনার কারণে সমস্যা হয়েছে। ইমাম বুখারি রাহ. এ হাদিসটি এনেছেন কিয়ামু রমজান অধ্যায়ে। দেখেন, এখানে দুটি জিনিস। এক. কিয়ামু রমজান। দুই, কিয়ামুল লাইল। কিয়ামু রমজান মানে তারাওয়ির নামাজ। মুহাদ্দিসগণ এ শিরোনামে যত হাদিস এনেছেন, এগুলো দ্বারা তারাওয়ির নামাজ উদ্দেশ্য। আরেকটি হচ্ছে, কিয়ামুল লাইল। এটি হচ্ছে তাহাজ্জুদের নামাজ। মুহাদ্দিসগণ এ শিরোনামে যত হাদিস এনেছেন, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাহাজ্জুদ।
কিন্তু ইমাম বুখারি রাহ. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস কিয়ামু রমজান বাবে এনেছেন। তাই কোনো কোনো স্কলার বলেছেন, কিয়ামে রমজান মানে তারাওয়ির নামাজ। আবার এই হাদিসটি ইমাম বুখারি রাহ. কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ অধ্যায়েও এনেছেন। তাই বুঝা যায় এটি তাহাজ্জুদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন প্রশ্ন আসে এক হাদিস তাহাজ্জুদের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার তারাওয়ির সাথে সম্পর্কিত। এই দ্বন্দ্ব নিরসন হবে কীভাবে?
এই দ্বন্দ্ব নিরসন সহিহ মুসলিমে পাওয়া যায়। ইমাম মুসলিম রাহ, ইমাম বুখারির উল্লেখযোগ্য একজন শাগরিদ ছিলেন। আয়েশার এই হাদিসকে তিনি কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে এনেছেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারি, ইমাম বুখারি রাহ. তারাওয়ির অধ্যায় হাদিস তারাওয়ি হিশেবে আনেননি; বরং তাহাজ্জুদ উদ্দেশ্য। কিন্তু অনেকে ইমাম বুখারিকে না বোঝার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
ইমাম বুখারি রাহ. তরজমাতুল বাব কায়িম করেছেন, একটি হাদিসের একটি শব্দের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে। রমজান শব্দটি হাদিসে উল্লেখ হওয়ার কারণে কিয়ামুর রমজানে হাদিসটি এনেছেন। তারাওয়ি হিশেবে নয়। ইমাম বুখারিকে না বোঝার কারণে জনসাধারণে বিভ্রান্ত করানোর প্রয়োজন নেই। বরং রমজানে যত বেশি নফল পড়বেন, ততই উপকার। বেশি বেশি নফল পড়ুন। আল্লাহ আমাদের মুত্তাকি হওয়ার কাজ করার তৌফিক দান করুন।