📄 তাকওয়ার শর্ত
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে রমজানের মধ্যদশক, যে দশকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মাগফিরাতের ঘোষণা দেওয়া হয়, এমন সময়ে আল্লাহর ঘর মসজিদে কুরআনচর্চার এই মেহনতে বসার সুযোগ আমাদের দিয়েছেন। এ জন্য দিল থেকে বলি, আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা সবসময় ক্ষমা করতে পারেন এবং করেনও। তবে কিছু কিছু বিশেষ মুহূর্ত আছে, যে সময় আল্লাহ তাআলা অনেক মানুষকে এমনভাবে ক্ষমা করে দেন, যে কারণে অনেক পাপী মানুষও সেই ক্ষমার আওতাভুক্ত হয়ে আল্লাহর ওলি হয়ে যেতে পারে। সুবহানাল্লাহ।
রমজান মানুষকে এরকম ওলি বানানোর অফার নিয়েই আমাদের সামনে এসেছে। এ কারণে রমজান শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো, রমজান কাকে জ্বালায় এবং কে জ্বলে? এ সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেন, রমজান এসেছে মানুষের গুনাহ জ্বালিয়ে দিয়ে তাকে আল্লাহর বন্ধু বানিয়ে দিতে।
গরুর গোবর দিয়ে মানুষ জ্বালানি বানায়। এরপর সেটা দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করা হয়। অথচ গোবর নাপাক জিনিস। কিন্তু এই গোবর যখন জ্বালিয়ে ছাই করা হয়, তখন সেটা পাক হয়ে যায়। এই ছাই দিয়ে চাইলে দাঁতও মাজন করতে পারবেন, কোনো অসুবিধা নেই। ঠিক তেমনিভাবে কোনো মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন সে নাপাক হয়ে যায়। আল্লাহর সান্নিধ্যে সে তখন বিচরণ করতে পারে না। কিন্তু সে যখন তার গুনাহ থেকে তাওবা করে অর্থাৎ তার গুনাহ জ্বালিয়ে দেয়, তখন সে পাকপবিত্র হয়ে যায় এবং আল্লাহর রহমতেরও উপযুক্ত হয়ে যায়। ফলে তার মুখের মর্যাদাও বেড়ে যায়। কেননা, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকে আম্বরের চেয়েও সুগন্ধযুক্ত হয়ে যায়। এ জন্য রমজানের প্রতিটা মুহূর্তে গুনাহ মাফের বিশেষ বিশেষ অফার রয়েছে।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে সায়্যিদুল মুহাদ্দিসিন হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমাযান (রমজান) মাসে সিয়াম পালন করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
ইমান, ইহতিসাব বা গুরুত্বের সাথে যারা রমজানের রোজা রাখে, এই আশায় যে, আল্লাহ তাকে নেকি দেবেন, আল্লাহ তার জীবনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেন। সুতরাং আমরা জানতে পারলাম, রমজানের রোজা রাখলে গুনাহ মাফ হয়। তবে শর্ত হচ্ছে, ঈমানের সাথে এবং নেকির আশায় রোজা রাখতে হবে। এখন আমাদেরকে 'ইমানের সাথে এবং নেকির আশায়' কথাটির মর্ম বুঝতে হবে।
আপনি অজু করার পদ্ধতি জানেন, কীভাবে অজু করতে হয়। কিন্তু অজুভঙ্গের কারণ সম্পর্কে জানেন না। তাই আপনার পেছনের রাস্তা দিয়ে শুধু বাতাসই বের হচ্ছে! তাহলে আপনার অজু হবে? কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে অজু করতে থাকলেও আপনার অজু হবে না। আপনি ঘরে এসি লাগালেন ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য; কিন্তু ঘরের দরজা- জানালা খোলা রাখলেন! তখন এসির বাতাস আপনাকে শীতল করবে না। এটা এসির দোষে হয়েছে, নাকি এর ব্যবহারপদ্ধতি যথাযথ না মানার কারণে? এসির বাতাস খেতে হলে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হবে। তখনই এসি ব্যবহারের স্বার্থকতা খোঁজে পাওয়া যাবে।
ঠিক তেমনিভাবে রোজা রাখলে আপনার গুনাহ মাফ হবে, এটা হলো এসির মতো। আর যেসব শর্তের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন, এটা হলো দরজা-জানালার মতো। এসির ফিটিং ঠিক আছে; কিন্তু দরজা-জানালা খোলা থাকার কারণে যেভাবে ঘর ঠান্ডা হবে না, ঠিক তেমনিভাবে রোজা রাখলেন কিন্তু এই রোজা ঠিকমতো হলো না, নষ্ট করে ফেললেন। তাহলে আপনার এই রোজায় গুনাহ মাফ না হয়ে উল্টো গুনাহ হতে পারে।
আর রোজার বদলা যেহেতু আল্লাহ নিজেই দেবেন, এ জন্য অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। রমজানের এই বিশেষ মুহূর্তে যেহেতু আল্লাহ মাফ করেন, রোজা রাখলেও মাফ করেন, কিয়ামে রমজান বা তারাওয়ির নামাজ পড়লেও মাফ করেন।
অপর হাদিসে রাসুল বলেন, যে রমজানের রাতে কিয়ামে রমজান বা তারাওয়ির নামাজ পড়ল, তারও আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল বলেন,
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
মুহতারাম হাজিরিন!
উপরিউক্ত দুটি হাদিসের একটি হলো শুধু রোজার ফজিলত সম্পর্কে, পরেরটা হলো তারাবির নামাজের ফজিলত সম্পর্কে। দুটি হাদিসের মাধ্যমে আমরা এটাও বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে রমজানের দিনেও ক্ষমার অফার রয়েছে, রাতেও ক্ষমার অফার রয়েছে। আর বড় অফার তো রয়ে গেছে। সেটা হলো লাইলাতুল কদর। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে অন্য হাদিসে রাসুল বলেন,
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لُهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থাৎ, ঈমান ও সওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি কদরের রাতে নফল নামাজ পড়ল, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
ক্ষমার সাতটি শর্ত
রমজানের বড় বড় তিনটি ফজিলত সম্পর্কে আমরা জানতে পারলাম। এই তিনটির মাধ্যমে তো গুনাহ মাফ করানো যায়, কিন্তু গুনাহ মাফ করাতে গেলে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। মুফাসসিরগণ লিখেন, যেসব অফারের কারণে আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করে দেন, সেই ক্ষমাপ্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য ৭টি শর্ত রয়েছে। এখন কেউ যদি এই ৭টি শর্ত মেনে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, আল্লাহ তখন তাকে ক্ষমা করে তার গুনাহের জায়গায় নেকি দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেন।
তাওবার প্রথম শর্ত
তাওবার প্রথম শর্ত হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করা। আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوْبُوْنَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
আল্লাহ অবশ্যই সেসব লোকের তাওবাহ কবুল করবেন, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দকাজ করে এবং তাড়াতাড়ি তাওবাহ করে, এরাই তারা, যাদের তাওবা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [সুরা নিসা: ১৭]
তাওবা শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। বান্দা যখন গুনাহ করে আল্লাহ থেকে দূরে শয়তানের আশ্রয়ে চলে যায়, এরপর তাওবা করে পুনরায় আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। তবে এই ফিরে আসাটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য, একনিষ্ঠ মনে। আর কখনো এমন করবে না বলে শপথ করে। এ জন্য শুধু মুখে তাওবা করলে হবে না, বরং অন্তর দিয়েও ফিরে আসার অঙ্গীকার করতে হবে。
তাওবার দ্বিতীয় শর্ত
তাওবার দ্বিতীয় শর্ত হলো, সময়মতো তাওবাহ করা। তাওবা যেকোনো সময় করলে কবুল হবে না। আর মানুষের জীবনের দুটি সময়ে তার তাওবা কখনো গ্রহণ করেন না আল্লাহ। এ প্রসেঙ্গ আল্লাহ বলেন,
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّاتِ ۚ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْكُنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوْتُوْنَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا اليما
তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দকাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, 'আমি এখন তাওবা করছি' এবং তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা, যাদের জন্য আমরা কষ্টদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করেছি। [সুরা নিসা: ১৮]
এই দুটি সময়ের একটি হলো, সাকরাতের সময়। জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে তাওবা কবুল হয় না। নবিজি বলেন,
ان الله يقبل توبة العبد ما لم يغرغر
সাকরাতের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহপাক বান্দার তাওবা কবুল করেন।
আরেকটা হলো, কিয়ামতের পূর্বমুহূর্তে, যখন পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হবে। এ সময় তাওবা কবুল হবে না। হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, সে সময় দুনিয়ার সকল মানুষ সিজদায় পড়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন না। এখনো যেহেতু পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হয়নি এবং আমাদেরও সাকরাত শুরু হয়নি, তাই আমাদের সামনে তাওবার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য এখনই তাওবা করে আমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তানাহলে মৃত্যুর সময় আপনার উপর কিয়ামত বয়ে যাবে, সেটা থেকে রক্ষা পাবেন না। এ সম্পর্কে হাদিসে আছে,
من مات فقد قامت قيامته
'যে যখন মৃত্যুবরণ করল, তার কিয়ামত তখন থেকেই শুরু।' এই হাদিসের আলোকে আমরা বলতে পারি কিয়ামত দুই প্রকার। একটি হচ্ছে ব্যক্তিগত কিয়ামত, অন্যটি সমষ্টিগত। প্রতিটি মানুষের মৃত্যুর পরপর তার ব্যক্তিগত কিয়ামত শুরু হয়ে যায়, আর ইসরাফিল আলাইহিস সালামের সিঙ্গায় ফু দেওয়ার পর সমস্টিগত কিয়ামত বা মূল কিয়ামত তথা ময়দানে মাহশর কায়েম হবে। সারা জীবনের হিসাবের খাতা খুলে ধরা হবে। হিসাব লওয়া হবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের।
বলছিলাম, সাকরাতের সময় তাওবা কবুল হবে না। কেন কবুল হবে না, কারণ তখন তার সামনে ঈমান বিল গাইব বা আজরাইল উপস্থিত। তখন আর সেটা গাইবের উপর ঈমান রইল না। সাকরাতের সময় তার সামনে অদৃশ্যের জগত দৃশ্যমান করে দেওয়া হয়। এখন যদি সে নেককার হয়, তখন দেখতে পাবে, ফেরেশতারা রেশমের রোমাল নিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়ে এগিয়ে আসছেন। তার প্রাণ কবজ করে ইল্লিয়্যিন পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। আর যদি বান্দা বদকার হয়, তখন সে দেখতে পারে, ফেরেশতারা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে দুর্গন্ধযুক্ত চাটাই নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। একজন মৃত্যুপথযাত্রীর অবস্থাই প্রমাণ করে দেয় সে নেককার না বদকার। কঠিন এ সময়ে তাওবা করলে তাওবা কবুল হবে না। আমরা যারা এ আলোচনা শুনতেছি, আমাদের সামনে তাওবার সুযোগ রয়েছে। তাই সময় থাকতে আমরা তাওবা করে নেব।
তাওবার তৃতীয় শর্ত
তাওবার তৃতীয় শর্ত হলো, আন নাদামু বা লজ্জিত হওয়া। আল্লাহর জমিনে বিচরণ করে, আল্লাহর দেওয়া রিজিক খেয়ে আল্লাহর নাফরমানি করছি, যৌবনেও নাফরমানি করলাম, এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছি, তবু আল্লাহর নাফরমানি ছাড়লাম না, আমার অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করে স্বচ্ছ করতে পারলাম না... এরকম লজ্জাবোধ যদি কারও মধ্যে জাগ্রত হয়, আল্লাহর রাসুল বলেন, এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা সাথে সাথে ক্ষমা করে দেন। কেননা, আল্লাহ তো তার অন্তরের খবর জানেন। এ জন্য নিজে নিজে আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়া দরকার। হাদিস শরিফে আছে, যার লজ্জা নেই, সে যা ইচ্ছা তা করতে পারে। এটা হলো তাওবার তৃতীয় শর্ত।
তাওবার চতুর্থ শর্ত
তাওবার চতুর্থ শর্ত হলো 'আল ইকলা' অর্থাৎ, সে যেসব গুনাহ করেছে, প্রথমেই সেসব গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করা। এখন কেউ যদি এমনভাবে অজু করে যে, একদিকে তার পেছন দিকের রাস্তা দিয়ে বাতাস বের হচ্ছে, অপরদিকে সে অজু করেই চলছে, অর্থাৎ অজুর কাজও জারি, আবার অজুভঙের কারণও জারি, কিয়ামত পর্যন্ত এমন ব্যক্তির যেমন অজু হবে না, ঠিক তেমনিভাবে একদিকে শুধু তাওবা করেই চলছে, অপরদিকে গুনাহের কাজও চলছে, তাহলে এমন ব্যক্তির তাওবা কিয়ামত পর্যন্তও কবুল হবে্বা না। এ জন্য তাওবা কবুলের চতুর্থ শর্ত হচ্ছে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করা।
একইভাবে কেউ একদিকে গুনাহ করতে থাকল আবার সাথে সাথে তাওবাও করতে থাকল। তাহলে তো হবে না। যেমন, কেউ মদ পান করছে। মদের গ্লাশ হাতে নিয়ে একদিকে মদও খাচ্ছে আবার মুখে বলছে, হে আল্লাহ! আমার মদ খাওয়ার গুনাহ মাফ করে দিন। আমি অন্যায় করছি। এমন হলে সেটাকে তাওবাহ বলা যাবে না। গুনাহ ছেড়ে দিয়ে, মদ খাওয়া বাদ দিয়ে তারপর তাওবাহ করতে হবে।
তাওবার পঞ্চম শর্ত
পঞ্চম শর্ত হলো, আদামুল আওদা বা এরকম দৃঢ় সংকল্প করা যে, আল্লাহ, জীবনে যত গুনাহ করেছি, আর কখনো করব না। কিন্তু যদি মুখে বারবার বলতে থাকেন, হে আল্লাহ, আমি তাওবা করতেছি, আমাকে মাফ করে দাও, আর অন্তরে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার কোনো লক্ষণ থাকে না, এমন হলে চলবে না। কারণ, আল্লাহ বান্দার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে জানেন। তাই আর কখনো গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। এটা তাওবার পঞ্চম শর্ত।
তাওবার ষষ্ঠ শর্ত
ষষ্ঠ নম্বর শর্ত হলো আল্লাহর হক সম্পর্কিত। আর গুনাহ হলো দুই প্রকার, একটা আল্লাহর হক নষ্ট করা, আরেকটা বান্দার হক নষ্ট করা। আল্লাহর হক নষ্ট করা সংক্রান্ত গুনাহের তাওবার নিয়ম হলো, বেশি বেশি ইসতিগফার করা। আল্লাহর হক যদি হয় ইবাদত সংক্রান্ত, তাহলে কাজা করার সুযোগ থাকলে আগে কাজা আদায় করতে হবে। তারপরে তাওবাহ।
যেমন, কেউ নামাজ পড়ল না। নামাজ না পড়ে শুধু তাওবাহ করতে থাকল। তাহলে হবে না। নামাজের কাজা আদায় করতে থাকতে হবে এবং সাথে সাথে সময়মত নামাজ না পড়তে পারার কারণে তাওবাও করতে হবে। কেউ রমজানে রোজা না রেখে তাওবাহ করতে থাকল। হবে না। রোজার কাজা-কাফফারা আদায় করে তারপর তাওবাহ করতে হবে।
তাওবার সপ্তম শর্ত
সাত নম্বর শর্ত হলো, বান্দার হক সম্পর্কিত। অর্থাৎ, আপনি গুনাহ করলেন বান্দার হক নষ্ট করে। তবে বান্দার হকের ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে হবে না; বরং যার হক, তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। যার হক, সে যদি আপনাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আল্লাহও আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।
বান্দার হক বান্দা মাফ না করলে আল্লাহ মাফ করেন না। এখন আপনি কোনো বান্দার হক নষ্ট করলেন। তাহলে আগে তার কাছ থেকে ক্ষমা নিতে হবে। সে যদি জীবিত না থাকে, আর তার হক যদি টাকা-পয়সা সংক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে তার ওয়ারিসানের কাছে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে তারপর তাওবাহ করতে হবে।
এখানে একটি কথা ভালো করে বোঝা দরকার। বান্দার হক মানে শুধুই টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ নয়। অন্য হকও থাকতে পারে। যেমন, আপনি অন্যায়ভাবে কাউকে কষ্ট দিলেন। অথবা কারও উপর জুলুম করলেন। তাহলে এটাও তার হক নষ্ট করা হলো। এ জন্যও তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এখন যদি লোকটি মারা গিয়ে থাকে, তাহলে আপনি কীভাবে তার কাছে মাফ চাইবেন? অথবা তার পাওনা টাকা পরিশোধ করবার মতো তার কোনো ওয়ারিসান নেই। এই অবস্থায় আপনি কী করবেন?
এ ক্ষেত্রে, আপনি তার পাওনা টাকা তার জন্য আল্লাহর রাস্তায় সদকাহ করে আল্লাহর কাছে মাফ চাইবেন। আর হক যদি জুলুম বা কষ্ট দেওয়া সংক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে দোয়া করে, তার জন্য তিলাওয়াত বা অন্যান্য নফল ইবাদত করে তার জন্য ইসালে সওয়াব করবেন। তারপর আল্লাহর কাছে তাওবাহ করবেন। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহপাক আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।
এই হচ্ছে তাওবার ৭১ শর্ত। এখন এসব শর্ত ঠিকমতো পালন করে যদি কেউ তাওবা করে, হাদিস শরিফে রাসুল ইরশাদ করেন, التائب من الذنب كمن لا ذنب له
গুনাহ করে কেউ যদি তাওবা করে, তাকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে নিষ্পাপ বানিয়ে দেন যে, সে যেন কখনো কোনো গুনাহই করেনি। এখন আপনাদের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এত কঠিন শর্তে তাওবা করে আমরা কীভাবে চলব? এমন প্রশ্ন বা ধারণা আপনার অন্তরে তৈরি হলে সেটা শয়তানের ধোঁকা। শর্তগুলো কঠিন মনে হলেও এ গুলো মেনে তাওবা করে চলা যায়।
কীভাবে চলবেন? যেমন, আপনি একটি গুনাহ করলেন। সাথে সাথে তাওবা করে ফেলুন। আবার গুনাহ করলেন, আবার তাওবা করুন। আবারও গুনাহ করে ফেললেন, আবারও তাওবা করুন। এভাবে গুনাহ হয়ে গেলেই সাথে সাথে তাওবা করে নিন।
যেমন আমরা একটা কাপড় তখনই পরিধান করি, যখন সেটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। এরপর যখন ময়লা লাগে, তখন আমরা সেটাকে ধৌত করি। এরপর আবার পরিধান করি। কিন্তু কাপড় ময়লা হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা কাপড় পরিধান করা ছাড়ি না। বরং ময়লা হয়ে গেলে ধুয়ে নিই, আবারও পরিধান করি। আবারও ময়লাযুক্ত হয়, আবারও ধুয়ে পরিষ্কার করে পরিধান করি। কেননা, ময়লাযুক্ত কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে নিলেই সেটা পরিধানের যোগ্য হয়ে যায়। ঠিক তেমনিভাবে যে বান্দা গুনাহ করে, এই বান্দা আল্লাহর সান্নিধ্যের যোগ্য থাকে না; কিন্তু এই বান্দা যখন তাওবা করে, তখন সে আল্লাহর সান্নিধ্যের যোগ্য হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।
📄 তাকওয়া এবং ঈমান বিল গাইব
তাকওয়া এবং ঈমান বিল গাইব একটা আরেকটার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঈমান বিল গাইব ছাড়া তাকওয়া অর্জনের কোনো পথ নেই। ঈমান বিল গাইবের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জিত হয়। তার বাস্তব প্রমাণ রমজানের রোজা। আল্লাহপাক আমাদেরকে রমজান দিয়েছেন। রমজানকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
রমজান তিনভাগে বিভক্ত কেন
আল্লাহ তাআলা রমজানকে তিনভাগে সাজিয়েছেন। প্রথম ভাগ বা প্রথম ১০ দিন রহমতের। আমরা যেভাবে কাপড় ধোয়ার সময় প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে কাপড়টা নরম করি, ঠিক তেমনিভাবে দীর্ঘ ১১ মাস গুনাহ করার কারণে অন্তরে যে ময়লা জমা হয়েছে, প্রথমে তা পরিষ্কার করতে হবে। এ জন্য আল্লাহ প্রথম ১০ দিন রহমতের অফার দিয়েছেন, যেন তুমি তোমার অন্তরকে কিছুটা নরম করো।
মধ্যদশক বা দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের। এই দশক হলো কাপড় কাচার ন্যায়। কাপড় প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে নরম করা হয়, এরপর সেটা কাচা হয়, যাতে কাপড়ে লেগে থাকা ময়লা ছুটে যায়। ঠিক তেমনিভাবে রমজানের প্রথম দশকে তুমি তোমার অন্তর নরম করেছ। এবার সেই অন্তরকে একটু কাচা দরকার। এ জন্য দেখা যায়, রমজানের প্রথম ১০ দিন মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা অনেক থাকে। এরপর ধীরে ধীরে কমে আসে। কমে আসে কেন? কারণ, কাচা বা কচলানোর কাজ তখন শুরু হয়। ফলে মুসল্লিসংখ্যাও হ্রাস পেতে থাকে। কারণ, শয়তান তখন আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে মানুষকে ধোঁকা দিতে থাকে। কারণ, এখন মাগফিরাতের সময়, ক্ষমা লাভের সুযোগ। সুতরাং এখন যদি তারা এদিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তো তারা ক্ষমা পেয়ে যাবে। শয়তানের বাহিনী তখন ছোট হয়ে আসবে।
এখানে আপনাদের মনে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, এতদিন আমরা শুনে আসলাম রমজান মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাহলে শয়তান বা তার বাহিনি বান্দাকে ধোঁকা দিতে আসে কেমন করে?
জবাব হলো, শয়তান আসা মানে শয়তানি ওয়াসওয়াসা আসা। শয়তান বন্দী থাকলেও ১১ মাস সে যে পরিমাণ মেহনত করে, মানুষের মনে যে পরিমাণ গুনার ভাইরাস ঢুকিয়ে রাখে, সেগুলোই রমজানে কার্যকর হয়। গাড়ির একটি টায়ারকে কিছুক্ষণ চালিয়ে তারপর ছেড়ে দিলে সেটা কি সাথে সাথে থেমে যায়?
আপনারা বলবেন, না। আরো কিছুক্ষণ চলে। আরো কিছু দূর যায়। ঠিক তেমনিভাবে শয়তান আমাদেরকে ১১ মাস কান ধরে ঘুরাতে থাকে। তারপর রমজানে ছেড়ে দিলেও ১১ মাসের স্পিডে এই একমাস আমরা ঘুরতে থাকি।
রমজানের শেষ ১০ দিন নাজাতের জন্য। এ সময় ক্ষমা লাভের নিশ্চয়তাও যেমন বেশি, তেমনি শয়তানের প্রলোভনের মাত্রাও বেশি। ফলে শেষ দশকে মানুষ ইবাদত ছেড়ে মার্কেটে শপিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর ঈদের রাতে তো মাশাআল্লাহ, সারা রাত আমরা মার্কেটগুলো সজীব ও প্রাণবন্ত করে রাখি। অথচ এ সময় আরও বেশি করে ইবাদত করার কথা ছিল। সারা রমজানে আল্লাহ যত মানুষকে ক্ষমা করেন, এই ঈদের রাতে এর চেয়েও বেশি পরিমাণ মানুষকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। সুবহানাল্লাহ। কিন্তু আফসোস, পুরস্কারপ্রাপ্তির এ সময়ে আমরা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে বাজারে বা শপিংমলে কাটিয়ে দিই। এটা শয়তানের চক্রান্ত। এখন শয়তানি চক্রান্তের বাজারে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে।
রমজান কীভাবে কাজে লাগাবেন
এখন আপনারা চিন্তা করে দেখুন, রমজান কীসের জন্য এসেছে? কুরআনে কারিমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তআলা বলেন, لعلكم تتقون অর্থাৎ, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। আয়াতে 'তাত্তাকুন' বা মুত্তাকির সারমর্ম হলো, যাতে তোমরা গুনাহ ছাড়তে পারো।
এবার দেখা যাক, রমজানুল মুবারকে আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কেমন সুন্দর ব্যবস্থা রেখেছেন। আমরা রমজানে দিনের বেলা খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকি, পানি পান করি না, জৈবিক চাহিদা ত্যাগ করি। এই যে ত্যাগ, এটার বিনিময় বা সওয়াব কে দেবেন? ফেরেশতা, না আল্লাহ? স্বয়ং আল্লাহ দেবেন। নামাজ, হজ, জাকাত ইত্যাদি ইবাদতের সাওয়াব ফেরেশতারা দেন অর্থাৎ, তাঁরা সাওয়াব লিখেন, কিন্তু রোজার সাওয়াব তাঁরা লিখেন না। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে, ফেরেশতারা খাবার কাকে বলে, পানি পান কাকে বলে, সহবাস কাকে বলে, এগুলোর জ্ঞান তাঁদের নেই। তাঁরা এসব বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ। আর যাঁরা এসব বোঝে না, তাঁরা এগুলোর প্রতিদান দেবে কীভাবে? এ কারণেই আল্লাহ নিজেই রোজার সাওয়াব দেবেন।
উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি আপনারা সহজে বুঝবেন। কেউ একজন আরবি ভাষায় বক্তব্য দিল। এখন আমরা যারা আরবি বুঝি না, তারা এই আরবি বক্তব্যের মর্ম বুঝতে পারব? না, পারব না। তবে যদি এই আরবি বক্তব্যটা কেউ রেকর্ড করে আরবি বোঝে, এমন কারও কাছে নিয়ে যায় এবং সে তাকে বুঝিয়ে দেয়, তাহলে আরবি বক্তব্যের মর্ম বুঝতে পারবে। ঠিক তেমনিভাবে আমরা কোনো ইশক বা মুহাব্বাতের কারণে খাবার ছাড়লাম, পানি পান ছাড়লাম, সহবাস ছাড়লাম, এটা কে বুঝেন? একমাত্র আল্লাহই বোঝেন। কবি বলেন,
میان عاشق و معشوق رمزیست : کراما کا تہیں را هم خبر نیست অর্থাৎ, আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয় যে, কিরামান কাতিবিন পর্যন্ত যে সম্পর্কের কথা জানেন না। এই কিরামান কাতিবিনরা এই কাজের সাওয়াব লিখতে পারবেন না। এ সম্পর্কের কথা শুধু আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ জন্য আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন তাঁর দয়ার হাতে এই কাজের সাওয়াব দান করবেন। বর্তমানে (রমজানে) আমরা এরকম একটা বিরাট ইবাদতের মধ্যে আছি। আল্লাহ আমাদের রোজাগুলো কবুল করুন, সকলেই বলি, আমিন।
এ জন্য রমজানেই আমরা আল্লাহর কাছে মাফ চাইব। কেননা, রমজানের প্রতিটা মুহূর্তই দুআ কবুলের সময়। আর ক্ষমা চাওয়ার সহজ ব্যবস্থাও আল্লাহ আমাদের জন্য করে রেখেছেন। যেমন, রোজা রাখলেই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। তারাওয়ির নামাজ পড়লে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।
এভাবে আরও সহজ একটা ক্ষমার ব্যবস্থা আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন, সেটা হচ্ছে, কেউ যদি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়ে এবং ১০০ পূরণের জন্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লাহুল মুলকু ওলাহুল হামদু ওহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির' এই তাসবিহ পড়ে, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেন, 'তার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনা পরিমাণও হয়, তবু আল্লাহ তাকে তাঁর দয়ায় ক্ষমা করে দেবেন।' সুবহানাল্লাহ।
রমজান এবং সদকা
এরকমভাবে আল্লাহর ক্ষমার আরেকটি ব্যবস্থা হচ্ছে, সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসুল বলেন,
إن الصدقة تدفع ميتة السوء، وتطفئ غضب الرب
অর্থাৎ, সদকা-খয়রাত ব্যক্তির গুনাহকে এমনভাবে নিভিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।
হাদিসে 'গুনাহ নিভিয়ে দেয়' এটা বলা হলো কেন? তাহলে গুনাহের মধ্যে আগুনের অস্তিত্ব রয়েছে? এর উত্তর হলো, 'গুনাহ নিভিয়ে দেয়' এর মর্ম হলো গুনাহ একটি আগুন। কারণ, গুনাহ হয় মূলত শয়তানের কারণে। তার ওয়াসওয়াসার কারণে। এ জন্য গুনাহের মধ্যে এক ধরণের আগুন রয়েছে। আর শয়তান হলো আগুনের তৈরি। ফলে তার কারণেই যেহেতু গুনাহ হয়, তাই গুনাহকে আগুনের সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে।
হাদিস শরিফে নবিজি আমাদেরকে দুআ শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে এমনভাবে পরিষ্কার করো, যেভাবে পানি দ্বারা ময়লা কাপড় পরিষ্কার করা হয়। ঠান্ডা পানি, বরফ ইত্যাদি জিনিস দ্বারা আমার অন্তর পরিষ্কার করো। কেননা, পানি যত ঠান্ডা হবে, আগুন তত সহজে নিভে যাবে। আর পানি যেভাবে আগুনকে নিভিয়ে দেয়, সেভাবে সদকাও গুনাহকে নিভিয়ে দেয়। সুতরাং রমজানের পবিত্র এই মুহূর্ত, যে মুহূর্তে আল্লাহর ক্ষমার বিশেষ অফার রয়েছে, সেই মুহূর্তে বেশি বেশি সদকাহ করা দরকার। আমাদের মধ্যে যে গুনাহের গরমি রয়েছে, সেই গরমিকে নিভানো দরকার। এই গরমিকে যদি আমি না নিভাই, তাহলে আমি শয়তানের দলভুক্ত হয়ে যাব। আর যদি নিভিয়ে দিই, তাহলে আমি রাহমান আল্লাহর দলভুক্ত হয়ে যাব। এ জন্য রমজানে গুনাহ মাফির বিভিন্ন অফার বা সুযোগ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। এর মধ্যে একটা হচ্ছে, দান-সদকা করা। দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ নিভিয়ে দেন, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। এ জন্য আমরা বেশি করে দান-সদকা করব। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
📄 আত্মিক পরিশুদ্ধি
পবিত্র কুরআন আল্লাহর কালাম। আর আল্লাহ শুধু মালিক কিংবা বাদশাহ নন; তিনি সকল মালিকের মালিক, সকল বাদশাহর বাদশাহ। এ জন্য কুরআন যে আল্লাহর শাহি ফরমান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং কুরআন বোঝে অথবা না বোঝে সর্বাবস্থায় আল্লাহর কালাম কুরআনকে মানতে হবে।
এখন আমাদের একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, কুরআনের সুরা গুলো দুই ভাগে বিভক্ত। এ জন্য দেখবেন, কুরআনের কিছু সুরা মাক্কি, আর কিছু সুরা মাদানি। তবে এর মর্ম এটা নয় যে, যেসব সুরা মক্কায় নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাক্কি, আর যেসব সুরা মদিনায় নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাদানি। বরং যেসব সুরা হিজরতের পূর্বে নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাক্কি; আর যেসব সুরা হিজরতের পরে নাজিল হয়েছে, সেগুলো মাদানি। অনেক সুরা এমনও আছে, যেগুলো হিজরতের পর মক্কায় নাজিল হয়েছে, কিন্তু এরপরও সেটা মাদানি। এর মর্ম হলো, মাদানি সুরা গুলোর মধ্যে ইসলামি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার রূপরেখা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কেননা, নবিজি মদিনায় হিজরত করে যাওয়ার পর সেখানে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রীয় ফরমান ও বিধিনিষেধ জারি করেছেন।
এখানে একটি বিষয় বুঝে রাখা দরকার যে, একটি রাষ্ট্র পরিচালানা করতে গেলে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। এভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে চুরি-ডাকাতির শাস্তির বিধান যেমন দরকার, তেমনি রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্যও কিছু আইন বা বিধান থাকা দরকার। আর নবিজি যেহেতু মদিনায় একটি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, সুতরাং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যতকিছু দরকার, সবকিছুর বিধান এই কুরআনে আছে। এখন সে রাষ্ট্র পরিচালনার এসব বিধান যে বোঝে না সে বলে, কুরআনে হাত কাটার বিধান এল কেন, এটা এভাবে এল কেন, সেটা সেভাবে কেন? এরকম বিকৃত মানসিকতার অন্তর যাদের, তাদের হিদায়ত লাভ হবে না। এ জন্য প্রথমে আপনাকে অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হবে। এমন অন্তর তৈরি করতে হবে, যে অন্তর দ্বীনের সবকিছু মানতে রাজি। কেননা, জানার নাম কামিয়াবি নয়; বরং মানার নাম কামিয়াবি। যদি জানার নাম কামিয়াবি হতো, তাহলে তো ইহুদিরাই নবিজি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানত। কীভাবে জানত? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
الَّذِينَ آتَيْنُهُمُ الْكِتَبَ يَعْرِفُوْنَهُ كَمَا يَعْرِفُوْنَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ﴾
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদের। আর নিশ্চয় তাদের মধ্য থেকে একটি দল জেনেবুঝেই সত্যকে অবশ্যই গোপন করে। [সুরা বাকারা: ১৪৬]
অর্থাৎ, তারা তাদের সন্তানের ব্যাপারে যতটুকু জানত, এরচেয়েও বেশি নবিজি -এর সত্যতা সম্পর্কে জানত। কিন্তু তারা কি নবিজিকে মেনেছে? না, মানেনি। এ জন্য তারা লানতপ্রাপ্ত, লাঞ্ছিত ও অপদস্ত। এ কারণে এই পৃথিবীতে ইহুদিরা অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। আল্লাহ বলেন,
ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوْ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُوْنَ بِأَيْتِ اللَّهِ وَ يَقْتُلُونَ النَّبِيِّنَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَ كَانُوا يَعْتَدُونَ
তাদের উপর লাঞ্ছনা ও দরিদ্রতা নিপতিত হলো এবং তারা আল্লাহর কোপে পতিত হলো এ কারণে যে, নিশ্চয়ই তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহে অবিশ্বাস করত এবং অন্যায়ভাবে নবিগণকে হত্যা করত; এবং এ কারণেও যে, তারা অবাধ্যাচরণ করেছিল ও তারা সীমা অতিক্রম করেছিল। [সুরা বাকারা: ৬১]
এ জন্যই বলা হয় শুধু জানার নাম কামিয়াবি নয়; বরং মানার নামই কামিয়াবি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মানার মতো অন্তর করে দিন।
পবিত্র কুরআন তাদের জন্য হিদায়ত, যাদের অন্তরে তাকওয়া আছে। তাকওয়া না থাকলে হিদায়তও লাভ হবে না। গতকাল আমরা আলোচনা করছিলাম, তাকওয়া কোথায় পাওয়া যায় এবং কীভাবে অর্জন করা যাবে, এ সম্পর্কে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَكُونُوا۟ مَعَ ٱلصَّٰدِقِينَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। আর এই তাকওয়া অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহওয়ালাদের কাছে যাও। [সুরা তাওবা: ১১৯]
এখন আল্লাহওয়ালা বা সাদিকিন কারা? নবিজির হাদিসে রয়েছে, এরা হলেন যাদের কালবে সালিম বা স্বচ্ছ অন্তর রয়েছে। আর কালবে সালিম বা স্বচ্ছ অন্তর হলো, যে অন্তর সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পরিশুদ্ধ। অর্থাৎ, যার অন্তরে কোনো গুনাহ নেই। গুনাহের কাজ করলেও সাথে সাথে তাওবা করে নেয়। আর নবিজি ﷺ বলেন, গুনাহ হচ্ছে, যে কাজ করলে একটা খটকা কাজ করে। এ ছাড়া এমন কাজ করা, যা সমাজে প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে। স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে, সন্তান, পিতামাতা, শিক্ষক-ছাত্রের কাছে যে কাজ প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে। এটাই হলো গুনাহের কাজ।
আর নেকি কাকে বলে, এ সম্পর্কে জানার আগে একটি হাদিস জেনে নিই। হজরত আবু হুরায়রা রা. একবার নবিজিকে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি অনেক সময় ইবাদতে লিপ্ত থাকি। বিশেষত তাহাজ্জুদের নামাজে মগ্ন থাকি। এ অবস্থায় মানুষ আমাকে দেখে ফেলে। মানুষ যে আমাকে এ অবস্থায় দেখে ফেলে, এ জন্য আমার অন্তরে কিছুটা আনন্দ অনুভব হয়। এখন এই যে আমার মনে আনন্দ এল, এটার কারণে কি আমার নেকির কোনো ক্ষতি হবে? রাসুল ﷺ বলেন, 'না', এ কারণে তোমার নেকিতে কোনো সমস্যা বা ক্ষতি হবে না। এটা হলো তোমার দুনিয়ার সুসংবাদ। মানুষের সামনে তুমি যে ভালো, এটা প্রকাশ পাওয়া হলো দুনিয়ার সুসংবাদ; আর আখিরাতের সুসংবাদ হলো, আল্লাহ তোমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবেন।'
আর যে দুনিয়ার মানুষের সমাজে চলে কিন্তু মানুষ তাকে ঘৃণা করে, তবে এটা প্রকাশ্যে বলে না ভয়ে অথবা ফিতনার আশঙ্কায়। তুমি এমনভাবে চলো, মানুষ যাতে তোমাকে ভালো পায়। আল্লাহর কাছেও ভালো হতে পারো। এভাবে যদি চলতে পারো, তবে অন্তরে কোনো পেরেশানি থাকবে না। আর পেরেশানি যদি না থাকে, তবে এটা হলো নেককাজের লক্ষণ; আর পেরেশানি থাকা হলো গুনাহের লক্ষণ। এরকম অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে।
অন্তর পরিশুদ্ধ করার উপায়
প্রথমত: অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকতে পারবে না। মনের মাঝে হিংসা বিদ্বেষ থাকলে সেই মন অপবিত্র। অপবিত্র মন কখনও শান্ত থাকে না।
দ্বিতীয়ত: অন্তরে কোনো গুনাহ থাকতে পারবে না। আর গুনাহ যদি হয়ে যায়, তবে সাথে সাথে তাওবা করে নেয়।
তৃতীয়ত: অন্তরে ধোঁকা-প্রতারণা থাকবে না। এই যে রমজান মাস, তাকওয়ার এই মাসে আমরা কত রকম ধোঁকার আশ্রয় নিই। অথচ এ মাসে বা সারা বছরই এসব থেকে মুক্ত থাকার কথা ছিল। আর আমরা অপেক্ষায় থাকি, কখন রোজা আসবে, কোনো উপলক্ষ আসবে। যেমন, রমজান এলেই আমরা জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিই। অথচ রাসুল বলেছেন, مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا অর্থাৎ, যে ধোঁকাবাজি করে, সে আমার দলভুক্ত নয়। খ্রিষ্টধর্মে বড় কোনো উপলক্ষে তারা জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেয় আর আমরা রমজান-ঈদ এলেই দাম বাড়িয়ে দিই। এ জন্য সঠিকভাবে কুরআনের হিদায়ত লাভ করতে হলে ধোঁকাবাজি পরিহার করতে হবে।
চতুর্থ নম্বর হলো: والبغي বা জুলুম করে না। অর্থাৎ, তার অন্তরে জুলুম নেই। সে কাউকে জুলুম-অত্যাচার করে না। কষ্ট দেয় না। কারণ, ইসলাম কষ্টের ধর্ম নয়। ইসলাম কাউকে কষ্ট দেয় না। হাদিস শরিফে রাসুল বলেছেন, لا ضرر ولا ضرار في الاسلام অর্থাৎ, কাউকে কষ্ট দেওয়া বা কষ্ট পাওয়ার মতো কোনো কাজ ইসলামে নাই।
পঞ্চম বিষয় হলো: ওলা হাসাদা বা হিংসা-বিদ্বেষ নেই। কারণ, হিংসা অনেক বড় রোগ। এটা মানুষকে ধ্বংস করে ছাড়ে। এ জন্য আমাদেরকে হিংসা থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটকথা, যার অন্তর এসব থেকে মুক্ত থাকবে, সে তাকওয়াবান। আর এরকম অন্তরওয়ালা বা মুত্তাকির কাছে যদি কেউ যায়, তাহলে তার অন্তর প্রভাবিত হবে। সেও তাকওয়া অর্জন করতে পারবে। রাসুল আতরওয়ালার সাথে এটার উদাহরণ দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো আতরওয়ালার কাছে যায়, তাহলে সে এমনিতেই আতরের ঘ্রাণ লাভ করবে। এ জন্য নিয়তের কোনো দরকার হবে না। ঠিক তেমনিভাবে যারা আল্লাহওয়ালা, তাদের কাছে গেলেও তাদের একটা প্রভাব তোমার উপর পড়বে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُوْنُوْا مَعَ الصَّدِقِيْنَ﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। আর এই তাকওয়া অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহওয়ালাদের কাছে যাও। [সুরা তাওবা: ১১৯]
অথচ আমরা করি কি? আমরা যাদের কাছ থেকে তাকওয়া অর্জন করব, উল্টো তাদের সমালোচনায় জড়িয়ে পড়ি। এখন যাদের কাছ থেকে আমাদের তাকওয়া অর্জন করার কথা, সেখানে না গিয়ে উল্টো আমরা তাদের বিরোধিতায় লিপ্ত হই। তাহলে আমরা তাকওয়া অর্জন করব কীভাবে?
একটি উদাহরণ দিই। আঙুর হচ্ছে ভিটামিনযুক্ত একটি ফল। এই ভিটামিনযুক্ত ফল থেকে উপকার লাভ করতে হলে দুটি জিনিস বা শক্তি দরকার। একটি হলো, রুচি থাকতে হবে, দ্বিতীয়ত আঙুর খেতে হলে হাতে ধরে খাওয়ার মতো শক্তি থাকতে হবে। এখন একজনের রুচি আছে এবং তার সামনে একটি পাত্রে কিছু আঙুর রেখে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হলো। তাহলে আঙুর সামনে থাকার পরও সে খেতে পারবে না। কারণ, তার হাত বাঁধা। অথচ তার রুচির কোনো অভাব ছিল না। অভাব হলো শক্তির। সুতরাং আঙুর সামনে থাকার পরও সে এখান থেকে ফায়েদা লাভ করতে পারছে না। এমনিভাবে একজনের শক্তি আছে, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তার রুচি নেই। ফলে সে-ও এই আঙুর থেকে ফায়েদা লাভ করতে পারবে না। এ জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রুচি এবং শক্তির সমন্বয়ে তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। [সুরা তাওবা: ১১৯]
আয়াতে 'আমানুত্তাকুল্লাহ' বলে রুচির কথাই বুঝিয়েছেন। তবে শুধু রুচি হলেই চলবে না; বরং কুরআনের হিদায়ত পেতে হলে আরও অনেক কাজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে রাসুল বলেন,
المرء على دين خليله فلينظر أحدكم من يخالل
অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষ তার বন্ধু যেভাবে চলে, সেভাবে চলতে চায়। এখন তোমরা কাকে বন্ধু নির্বাচন করবে, সেটা তোমাদের ব্যাপার। কেননা, সৎসঙ্গে সর্গবাস, আর অসৎসঙ্গে সর্বনাশ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। কবি বলেন,
عن المرء لا تسأل وسل عن قرينه : فيه دليل عنه بالطبع تهتدي ولا بدع في وفق الطباع إذا اقتدت : فكل قرين بالمقارن يقتدي وران تصحب قوماً فصاحب خيارهم : لتصبح في ثوب الكمالات مرتدي وجانب قرين السوء يا صاح صحبة : ولا تصحب الأردى فتردى مع الردي
কবি বলতে চেয়েছেন, তুমি জিজ্ঞেস করো না, 'সে কেমন?' বরং তুমি দেখ, সে কার সঙ্গে চলাফেরা করে। যদি ভালো মানুষের সাথে চলে, তাহলে বুঝে নেবে সে ভালো। আর যদি মন্দ প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করে, তাহলে বুঝে নেবে, সে মন্দ। সুতরাং মানুষের ব্যাপারে সংশ্রবের একটা প্রভাব রয়েছে। এ জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে রুচি তৈরি করো। তবে শুধু রুচি থাকলেই হিদায়তের উপর চলতে পারবে না। কেননা, তোমার তো হাত-পা সব বেঁধে রাখা। এ জন্য যাদের হাত-পা খোলা অর্থাৎ, সিরাতে মুসতাকিমের উপর চলে, তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করো। কেননা, তোমার তো হাত-পা'র বাঁধন থেকে মুক্ত হতে হলে সঠিক পথে যারা রয়েছে, তাদের কাছে যেতে হবে। এর মাধ্যমেই তুমি কুরআনের হিদায়ত লাভ করতে পারবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন,
وَاهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। [সুরা ফাতিহা : ৬]
এরপর যারা হিদায়তের রাস্তার উপর চলে হিদায়তপ্রাপ্ত হলো, তাদের কথাও আল্লাহ উল্লেখ করে বলেছেন, 'সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম'। অর্থাৎ, যারা হিদায়তের রাস্তার উপর চলে পুরস্কৃত হয়েছে। যাতে হিদায়ত লাভের রুচি এবং শক্তি উভয়টাই অর্জিত হয়। ফলে হিদায়তের রাস্তার উপর চলা তোমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। এবং তোমরা মুত্তাকি হতে পারবে।
এখন আসুন, তাকওয়ার অর্থ সম্পর্কে একটু আলোচনা করি। তাকওয়া শব্দটি الاتقاء মাসদার থেকে এসেছে। আবার اتقاء শব্দটির ব্যুৎপত্তি হয়েছে وقية, থেকে। এরপর وقاية শব্দটি এসেছে এ থেকে। এর মূল অর্থ হলো, নিজেকে রক্ষা করা। কোন কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা? যে কাজ করলে পরকালের ক্ষতি হয়, এমন কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার সহজ অর্থ। এখন যদি আখিরাতে ক্ষতি হবে; এমন কাজ থেকে নিজেকে বিরত না রাখে, তাহলে সে কবরে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। হাশরের ময়দানে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পুলসিরাতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এভাবে সে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে সর্বশেষ ক্ষতির আখড়া জাহান্নামে পতিত হবে। আর যদি সে পরকালের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, তাহলে মৃত্যুর পর সব ঘাঁটিতেই সে নিরাপদ থাকবে এবং সহজে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তবে আমরা যে তাকওয়ার অর্থ গ্রহণ করি 'ভয় করা', এটা হচ্ছে তাকওয়ার রূপক অর্থ। কারণ, কোনো জিনিস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে সেই জিনিস সম্পর্কে নিজের অন্তরে ভয় আসতে হবে। যেমন, আমরা করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করে থাকি। কেন করি? সহজ কথায় মৃত্যুর ভয়ে! এখন কারও অন্তরে যদি মৃত্যুর ভয় না থাকে, তাহলে সে করোনার ভ্যাকসিন নেবে না। ঠিক তেমনিভাবে তাকওয়া শব্দের অর্থ হলো গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এখন গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে সে, যে কবরের আজাবকে ভয় করবে, জাহান্নামের আগুনকে ভয় করবে, কিয়ামতের কঠিন ময়দানকে ভয় করবে। এখন যাদের অন্তরে ভয় নেই, তারা গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে না। এ হিশেবে আমরা তাকওয়ার অর্থ 'ভয় করা' গ্রহণ করি।
কেউ যদি রাষ্ট্রীয় বিধান মানে না, তাহলে সে রাষ্ট্রদ্রোহী। আর রাষ্ট্রীয় এসব বিধান তারাই মানবে, যাদের অন্তরে ভয় আছে। রাষ্ট্রীয় বিধান অমান্য করলে জেলে যেতে হবে। শাস্তি ভোগ করতে হবে। এখন কারও অন্তরে যদি রাষ্ট্রীয় বিধান লঙ্গনের পরিণতি সম্পর্কে ভয় না থাকে, তাহলে সে যেকোনো সময় অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারবে। আর যার অন্তরে এই ভয় থাকবে যে, রাষ্ট্রীয় কোনো বিধান অমান্য করলে তাকে জেলে যেতে হবে, তাহলে সে কখনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করবে না। ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ যে বিধিবিধান দিয়েছেন, এগুলো যদি না মানে, তাহলে জাহান্নামে যেতে হবে- এই ভয় থাকলে আর গুনাহ করবে না। তখন গুনাহ করতে মন চাইলেও তার মধ্যে জাহান্নামের ভয় কাজ করবে।
আল্লাহ ছাড় দেন, ছেড়ে দেন না
এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা দরকার মনে করছি। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, যারা আল্লাহর বিধান অমান্য করে, সর্বদা গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকে, এদের অধিকাংশই তো দুনিয়ায় সুখ-সমৃদ্ধির সাথে বাস করে। এমন হয় কেন? অথচ যারা ঈমানদার, তাকওয়াবান, এদের অধিকাংশই অনেক কষ্টে দিন যাপন করে। এই প্রশ্নের জবাব হলো, যেমন ধরা যাক, কোনো মানুষ রাষ্ট্রের একটি বিধান বা হুকুম অমান্য করেছে। এই অপরাধে তাকে জেলে দেওয়া হয়েছে। এই যে জেলে বন্দি থাকা, এটা কিন্তু শাস্তি। তবে এরপরও অপরাধীকে রাষ্ট্র তার দায়িত্বে খাবার ও বাসস্থান ইত্যাদি দিয়ে থাকে। অসুস্থ হলে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। দেখা যায়, অনেক গরিব মানুষের চেয়েও কারাগারের বন্দিরা ভালো খাবার খায়। ভালো বাসস্থান পায়। উন্নত চিকিৎসা পায়।
ঠিক তেমনিভাবে দুনিয়ায় যারা আল্লাহর বিধান মানে না, এদেরকে আল্লাহ ছাড় দেন। ভালো এবং বেশি রিজিক দেন। দুনিয়ার আদালতে যখন কোনো আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়, তখন মৃত্যুদণ্ডের সময় আসামির কাছে জানতে চাওয়া হয়, সে কী খেতে চায়? বা তার কোনো চাহিদা আছে কি না? তখন রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে তার চাহিদা পূরণ করা হয়। ভালো খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও তার ফাঁসির আদেশ কি স্থগিত হয়ে যায়? না, বরং এ ক্ষেত্রে কোনো করুণা করা হয় না। এটা হলো দুনিয়ার নিয়ম। তেমনিভাবে আল্লাহর বিধান অমান্যকারীকে আল্লাহ মুহলত দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। তিনি যখন ধরবেন, ধরার মতোই ধরবেন। তাঁর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধরা খেতেই হবে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ بَطْشَ رَبِّكَ لَشَدِيدٌ নিশ্চয় আপনার রবের পাকড়াও বড়ই কঠিন। [সুরা বুরুজ: ১২]
আল্লাহর পাকড়াও বড় শক্ত। দুনিয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় ফাঁসির আসামিকেও বিভিন্ন জনের সুপারিশে করুণা দেখিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু আল্লাহ যখন ধরবেন, তখন কোনো সুপারিশ, অভিযোগ-অনুযোগ চলবে না। এসব তখন কোনো কাজেই আসবে না। কেননা, مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ আল্লাহ হলেন বিচারদিবসের মালিক। সকল বিচারকের বিচারক। সুতরাং যারা আল্লাহর নাফরমানি করে দুনিয়ার এই জীবনে বাহ্যিক সুখ-সমৃদ্ধির সঙ্গে বাস করে, তোমরা এদের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত, প্রতারিত হয়ো না। ধোঁকা খেয়ো না। বরং তোমরা যে আল্লাহর নাফরমানি করোনি, তাঁর বিধিবিধান মেনে চলেছ, এ জন্য সেই শুভ মুহূর্তের অপেক্ষা করো, যখন জান্নাত তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওই দিনের অপেক্ষা করো, জান্নাতের হুর-গিলমান তোমাকে সংবর্ধনা জানাবে। তুমি তোমার দুনিয়ার এই জীবন সেভাবেই গঠন করো। এটাই হলো তাকওয়া।
তাকওয়ার স্বরূপ
হজরত উমর রা.-এর খিলাফতকালে একবার তাঁর মজলিসে শুরায় তাকওয়া শব্দের অর্থ সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। তখন অনেকে অনেকভাবে এটার ব্যখ্যা করতে থাকেন। তবে সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যাটি দিয়েছিলেন হজরত উবাই ইবনু কাআব রা.। তিনি কি ব্যখ্যা দিয়েছিলেন, এটা জানার আগে নবিজির একটি হাদিস আপনাদের স্মরণ রাখতে হবে। হাদিসটি হচ্ছে,
كن في الدنيا كأنك غريب أو عابر سبيل রাসুল ﷺ বলেছেন, দুনিয়ায় তুমি তোমার জীবনটাকে এমনভাবে ধারণ করো, যে তুমি মুসাফির। মাত্র কয়েকদিনের জন্য এসেছ। আমরা যেমন কোথাও সফরে গেলে ঘরের সব সামানা নিয়ে যাই না; বরং প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু সামানা নিয়ে যাই, ঠিক তেমনিভাবে এই দুনিয়ায় আমরা হলাম মুসাফির। যতটুকু দরকার, ততটুকুই আমরা অর্জন করব। অযথা দুনিয়ার পিছনে পড়ে পরকাল ধ্বংস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাসুল ﷺ হাদিসে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন।
কোনো পথিক প্রচণ্ড গরমে রাস্তার কোথাও একটি গাছের নিচে আশ্রয় নিল। সেখানে প্রশান্তকর হিমেল হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিবেশটা এমন যে, পথের সব ক্লান্তি মুহূর্তেই সে ভুলে গেল। এখন ভালো পরিবেশ দেখে কি ওই পথিক ব্যক্তি সেখানে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়বে? না, সে তখন এটাকে পিছনে রেখে তার মূল গন্তব্যের দিকে রওনা দেবে। এ জন্য দুনিয়াও হলো আমাদের ঠিক এমন। এখানে আমরা সাময়িক অবস্থানের জন্য এসেছি। তাই দুনিয়ার আরাম ও চাকচিক্য স্থায়ী নয়; বরং আমাদেরকে পরকালের স্থায়ী আরামের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ জন্য দুনিয়ার লোভে পড়া বা ধোঁকা খাওয়া ঠিক হবে না। আর দুনিয়া হলো পরকালের স্থায়ী সুখ-শান্তি লাভের রাস্তা। সুতরাং সেই স্থায়ী সুখ- শান্তির জন্য সতর্কভাবে রাস্তা চলতে হবে, যাতে গন্তব্যে পৌঁছা যায়।
হজরত উবাই ইবনু কাআব রা. তাকওয়ার যে ব্যখ্যা দিয়েছিলেন সেটা হলো, দুনিয়া হলো একটা কাঁটাযুক্ত বাগানের মতো। এখন কাঁটাযুক্ত রাস্তা দিয়ে কাউকে যেতে হলে অত্যন্ত সতর্কভাবে পথ চলতে হবে। এ জন্য দুনিয়া হলো আখিরাতের রাস্তা এবং এই রাস্তা কাঁটাযুক্ত। আর এই কাঁটা হলো গুনাহের কাঁটা। সারা দুনিয়া গুনাহের কাঁটায় ভরপুর। সুতরাং কাঁটাযুক্ত এই দুনিয়ায় চলতে হলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে, যাতে আমরা কাঁটায় বিদ্ধ না হই এবং নিরাপদে দুনিয়ার এই সফর সমাপ্ত করে মানজিলে মাকসাদ তথা জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। আর এটাই হচ্ছে তাকওয়ার মর্ম।
দুনিয়ার জীবনে অনেক মুমিন চরম অর্থকষ্টে জীবন কাটান, অথচ কাফির মুশরিক ও নাফরমানরা আরাম-আয়েশে দিন কাটায়! কেন এমন হয়, সেটার আরেকটি সহজ ব্যাখ্যা দিই। এই ব্যাখ্যাটি আপনারা সহজে বুঝে ফেলবেন। আর ব্যাখ্যাটি আমার নিজের ব্যাখ্যা নয়। এটি নবিজির ব্যাখ্যা। নবিয়ে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত তাসলিম বলেছেন, আদ দুনিয়া সিজনুল মুমিন, ওয়া জান্নাতুল কাফির। দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কয়েদখানা আর কাফিরের জন্য জান্নাত। সুতরাং কাফিররা তাদের ক্ষণিকের জান্নাতে একটু আরাম আয়েশ করবে; অবাক হওয়ার কী আছে?
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।
📄 তাকওয়ার ব্যাখ্যা
তাকওয়া কাকে বলে, এই প্রশ্নের চমৎকার জবাব আমরা দেখতে পাই সহিহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত নবিজির হাদিসে। হজরত নাউয়াস ইবনু সামআন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নেকি এবং গুনাহ সম্পর্কে নবিজিকে জিজ্ঞেস করা হলো। নবিজি বললেন,
البر: حُسْنُ الخُلُقِ، والإثمُ: مَا حاكَ في نَفْسِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلَعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
নেকি হচ্ছে সচ্চরিত্র আর গুনাহ হচ্ছে যা তোমার অন্তরে খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'
নেক কাজ করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, তথা হালাল-হারাম মেনে চলার মাধ্যমে তাকওয়ার শুরু। আর পরিপূর্ণ তাকওয়া হলো সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকেও দূরে থাকা। হজরত নুমান ইবনু বশির রাজিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
إِنَّ الْخَلَالَ بَيِّن، والحَرَامَ بَيِّنٌ، وبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ، وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الحرام، كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى، يُوشِكُ أَنْ يَقَعَ فِيهِ، أَلَا وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمّى، أَلَا وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ،
হাদিসটির সারমর্ম হলো, হালাল-হারাম সুস্পষ্ট। তবে হালাল-হারামের মধ্যখানে কিছু আছে সন্দেহযুক্ত। অধিকাংশ মানুষই সেটা জানে না। যেব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার থেকেও দূরে থাকল, সে তার দ্বীন ও সংবেদনশীলতাকে রক্ষা করল। আর যে সন্দেহযুক্তে পতিত হলো, সে হারামে পতিত হল। নবিজি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন একজন রাখাল যখন পশু চরায়, তখন সে তার সীমানার দিকে নজর রাখে- যেন সীমা পার হয়ে পশুগুলো অন্যের সীমানায় ঢুকে না যায়। নবিজি বলেন, প্রত্যেক রাজার একটি রাজত্বসীমা আছে। সাবধান! আল্লাহর রাজত্বসীমা হলো হারামের সীমানা।
আজ আমরা আলোচনা করব তাকওয়া বিষয়ে। আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। আর ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা শুধু বাহ্যিকভাবে কয়েকটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করে না; বরং একনিষ্ঠ ইবাদত বা আল্লাহর নিমিত্তে হওয়ার জন্য চাই একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতা, যা বান্দা ক্রমাগতভাবে করতে থাকলে অর্জন করে মহা মূল্যবান নিয়ামত, যাকে ইসলামি শরিয়তে 'তাকওয়া' নামে আখ্যায়িত করা হয়। আর তাকওয়া হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
هُدًى لِلْمُتَّقِينَ হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্যই। [সুরা বাকারা: ২] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (জান্নাত) মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। [সুরা আলে ইমরান : ১৩৩] এ জন্য মুত্তাকি হওয়া বা তাকওয়া অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে মুত্তাকি বানিয়ে দিন। মুত্তাকি হিশেবে আমাদের মৃত্যু দিন। সকলেই বলুন 'আমিন'।
তাকওয়া কী
তাকওয়া সম্পর্কে গত পর্বে আলোচনা হয়েছে। আজকের আলোচনা বুঝবার জন্য গত আলোচনার সার সংক্ষেপ একটু তুলে ধরি। তাকওয়া আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ নিজেকে রক্ষা করা। অর্থাৎ, গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, পরহেজ করা, বেঁচে থাকা ইত্যাদি। তবে তাকওয়া শব্দের অর্থ আমরা ভয় করাও বুঝে থাকি। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করা। ভয় করা কেন বলা হলো, এ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের প্রথমে এটা বুঝতে হবে যে, কোনো কিছু থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে এই কাজ করলে লাভ বা ক্ষতি কী হবে, সেটা জানা। শুধু লাভের দিকে লক্ষ করলে হবে না; বরং ক্ষতির দিকটাও দেখতে হবে। এরপরই কাজটি করবেন কি-না, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। নাহয় নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। এ কারনেই তাকওয়া শব্দের অর্থ ‘ভয় করা’ বলা হয়। পরবর্তী আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে এটা ভালো করে আত্মস্ত করতে হবে।
তাকওয়া অর্থ ভয় করা। শব্দটি আরবি خوف থেকেও এসে থাকে। তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয় এবং খাওফ শব্দের অর্থও ভয়। তবে দুটি শব্দের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। খাওফুন শব্দের অর্থ এক ধরণের ভয় আর তাকওয়া শব্দের অর্থ আরেক ধরণের ভয়। এখানে ভয় বলতে কোন ধরণের ভয় বুঝানো হয়েছে, সেটাই আমাদের জানতে হবে। তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয়। কেউ কাউকে দুই কারণে ভয় করে।
১. যাকে ভয় করবে, তাকে মুহাব্বাত বা ভালোবাসার কারণে ভয় করে। যেমন, আল্লাহকে ভয় করা।
২. কারো ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য ভয় করবে। যেমন: সাপের ভয়। এটা সম্মান বা ভালোবাসার ভয় নয়; বরং তার ক্ষতি থেকে বাঁচার ভয়। সূক্ষ্ম এই পার্থক্যটি আমাদের জানা থাকতে হবে। আল্লাহকে ভয় করা হয় সম্মান ও ভালোবাসার কারণে।
আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে পিতামাতা ও শিক্ষক বা মুরব্বিদের ভয়। এটা ভালোবাসা ও সম্মানের ভয়। মোটকথা, যে ভয়ে সম্মান ও মুহাব্বাতের সম্পর্ক রয়েছে, তাকে আভিধানিক অর্থে তাকওয়া বলা হয়।
পরিভাষায় তাকওয়া হলো, একমাত্র আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। যার মধ্যে তাকওয়া থাকে, তাকে মুক্তাকি বলা হয়। সৎ গুণাবলির মধ্যে তাকওয়া হচ্ছে অন্যতম। আর যার মধ্যে তাকওয়া থাকে, সে পার্থিব জীবনের লোভে কোনো খারাপ কাজ করবে না; সে পরকালীন জীবনের কল্যাণের কাজে সবসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। আল্লাহ বলেন,
إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ﴾
তার বন্ধুগণ তো শুধু মুত্তাকিগণ। [সুরা আনফাল : ৩৪]
তাকওয়া হলো, জীবনের প্রতিটি কাজকর্মের অগ্র-পশ্চাতে, দিবা-নিশিতে আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগরুক রাখা। আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগরুক রেখে আমলের প্রতিটি স্তর পার হতে পারলেই কেউ তাকওয়া অবলম্বনকারী মুমিন মুত্তাকি হতে পারবে। মুত্তাকিদের আল্লাহর ওলি হিশেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ জন্য ওলি তারাই, যারা মুত্তাকি হয়ে থাকেন। মূলত, তাকওয়া হচ্ছে অন্তরের একটা অবস্থা, যার অন্তর যত উন্নত ও পরিশুদ্ধ হবে, সে তত তাকওয়াবান বা আল্লাহর ওলি হিশেবে সমাদৃত হবে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় ওলি শব্দের প্রায় ২০-২১টি অর্থ রয়েছে। সবগুলো আলোচনার সুযোগ নেই, তবে আমরা একটা নিয়ে আলোচনা করব।
ওলি কাকে বলে
ওলি শব্দের এক অর্থ হচ্ছে, কুরব বা নিকটবর্তী হওয়া। কারণ, ওলিরা আল্লাহর নিকটবর্তী থাকেন। তবে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার দুটি ব্যখ্যা রয়েছে। কুরআনের একটা আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, সারা দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর নিকটবর্তী বা ওলি। এমনকি সব সৃষ্টিই তাঁর নিকটবর্তী। আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা-ও আমি জানি। আর আমি তার গলার ধমনী হতেও অধিক নিকটবর্তী। [সুরা কাফ : ১৬]
এ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, 'আমি মানুষের শাহ রগের চেয়েও নিকটবর্তী।' মানুষের যখন শাহ রগ কাটা হয়, তখন সে মৃতদেহ হয়ে যায়। এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহর নিকটবর্তী হলে যেহেতু ওলি হওয়া যায়। তাই আয়াতে 'শাহ রগের চেয়েও নিকটবর্তী' বলার মাধ্যমে আমরা সকলেই আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া প্রমাণিত হয়। এটা হচ্ছে, আভিধানিক অর্থে; আর সাধারণভাবে যে ওলি হওয়ার কারণে সে মুত্তাকি হবে, যার জন্য আল্লাহ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, সেটা হলো কুরব বা মুহাব্বাতের মাধ্যমে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ﴾
যারা প্রকৃত ঈমানদার, তারা আল্লাহকে বেশি মুহাব্বাত করে। [সুরা বাকারা : ১৬৫]
সুতরাং প্রমাণিত হলো, যারা ওলি, তারা আল্লাহকে অধিকতর ভয় করে। আর যারা মুত্তাকি, তারা আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। আর এটা হয় মুহাব্বাতের মাধ্যমে। আপনি আল্লাহকে এমন মুহাব্বাত করলেই ওলি হয়ে যাবেন。
কীভাবে ওলি হওয়া যায়
এখন আপনাদের চমৎকার একটা কথা বলব। মনযোগ দিয়ে শুনবেন। আমি এখন আপনাদেরকে ওলি হওয়ার টেকনিক শেখাব। এই টেকনিক কাজে লাগাতে পারলে আমি ও আপনি- আমরা সবাই আল্লাহর ওলি হয়ে যেতে পারব- ইনশাআল্লাহ। মুফাসসিরিণে কেরাম তাফসিরের কিতাবে লিখেছেন, ওলি হওয়ার সহজ ফর্মুলা হচ্ছে মাত্র তিনটি কাজ করা এবং একটি কাজ ছেড়ে দেওয়া। অর্থাৎ, তিনটি কাজ করলে এবং একটি কাজ ছেড়ে দিতে পারলে আল্লাহর ওলির দফতরে নাম লেখা হয়ে যায়। করণীয় তিন কাজ হলো,
১. ফরজ বিধানগুলো পালন করা।
২. ওয়াজিবগুলো পালন করা।
৩. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাগুলো পালন করা।
আর বর্জনীয় একমাত্র কাজটি হচ্ছে 'হারাম'।
অর্থাৎ, কেউ যথাযথভাবে ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ পালন করলে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকতে পারলে সে আল্লাহর ওলি। বাকি কোন ওলির র্যাংক কতো উপরে যাবে, সেটা নির্ভর করবে নফল ইবাদতের উপর। যিনি যতো বেশি নাওয়াফিলের ইহতেমাম করবেন, তিনি ততো উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন হবেন। পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে প্রিয় ওলি হচ্ছেন নবিজি। যত মুত্তাকি ও পরহেজগার রয়েছেন, সকলের নেতা হলেন নবিজি। মোটকথা, আল্লাহর জন্য যার মুহাব্বাত যত বেশি, সে আল্লাহর তত নিকটবর্তী। এ হিশেবে আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ছিল নবিজি -এর। আল্লাহ বলেন, ﴿ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى ، فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى﴾
তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি। ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। [সুরা নাজম: ৮-৯]
কবি কত চমৎকার বলেছেন, يا صاحب الجمال و يا سيد البشر ﷺ : من وجهك المنير لقد نور القمر لا يمكن الثناء كما كان حقه : بعد از خدا بزرگ توئی قصہ مختصر
হে সৌন্দর্যের অধিকারী! হে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। আপনার আলোকিত চেহারার আলোকে চন্দ্র আলোকিত হয়েছে। আপনার যথোপযুক্ত প্রশংসা করা সম্ভব নয়। এককথায় আল্লাহর পরে আপনি শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী।
আল্লাহর কাছে নবিজির মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। সকল সৃষ্টির চেয়ে তাঁর অবস্থান সবার শীর্ষে। উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, তাকওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে শুধু ভয় করা নয়; বরং মুহাব্বাতসহ ভয় করা। সম্মানের সঙ্গে ভয় করা। আর যে ব্যক্তি মুহাব্বাতের মাধ্যমে ভয় করতে করতে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তার অন্তরে অবশ্যই আল্লাহর সম্মান থাকবে। এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَ مَنْ يُعَلِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই। [সুরা হজ: ৩২]
আল্লাহ এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব জিনিস রয়েছে, সেগুলোকে যারা সম্মান করে, তারা আল্লাহর ওলি এবং এই সম্মান করাটাই তাকওয়ার লক্ষণ। কেননা, তাকওয়া তার অন্তরে আছে বলেই সে এই সম্মান প্রদর্শন করে। যেমন: মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর, আর এই ঘরের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক রয়েছে, সুতরাং যারা মসজিদকে সম্মান করে তারা আল্লাহকেই সম্মান করে। এমনিভাবে আজান। এটা আল্লাহর বিধান। মুআজ্জিন যে আজান দেন, এই আজান শুনে যে সম্মান করে, আজানের শব্দ বলে, এটাও আল্লাহর ভালোবাসার কারণেই করা হয়। সম্মানের কারণে করা হয়। মোটকথা, ওলি হতে হলে তাকওয়ার বিকল্প নেই। বোঝা গেল যে, ওলি হতে হলে আগে তাকওয়া অর্জন করতে হবে। আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে।
আল্লাহর আলামতসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আন্তরিক আল্লাহভীতির লক্ষণ। যার অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি রয়েছে, সে-ই এগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারবে। এ সম্মান প্রদর্শন হৃদয় অভ্যন্তরের তাকওয়ার ফল এবং মানুষের মনে যে কিছু না-কিছু আল্লাহর ভয় আছে তা এরই চিহ্ন। তাই কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অমর্যাদা করলে এটা এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তার মনে আল্লাহর ভয় নেই।
এতে বোঝা গেল যে, মানুষের অন্তরের সাথেই তাকওয়ার সম্পর্ক। অন্তরে আল্লাহভীতি থাকলে তার প্রতিক্রিয়া সব কাজকর্মে পরিলক্ষিত হয়। এ জন্য রাসুল ﷺ বলেছেন, “তাকওয়া এখানে” আর এটা বলে তিনি বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন। [মুসলিম : ২৫৬৪] আপাতদৃষ্টিতে এটা একটা সাধারণ উপদেশ। আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত সকল মর্যাদাশালী জিনিসের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য এ কথা বলা হয়েছে।
তাকওয়ার স্তর
তাকওয়ার অনেক স্তর রয়েছে। কাজি নাসিরুদ্দিন বায়জাবি রাহ. (মৃত্যু: ৬৮৫ হিজরি) তাঁর তাফসিরে বায়জাবিতে লিখেন, তাকওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে: ১. প্রাথমিক। ২. মাধ্যমিক। ৩. উচ্চাঙ্গের স্তর।
এখন আমরা কে কোন স্তরে আছি, সেটা নিজেই বিবেচনা করে নিতে পারি। অন্য বর্ণনায় মুহাদ্দিসগণ তাকওয়ার ৭টি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে আমরা বায়জাবির সূত্রে তিনটি স্তরের কথাই আলোচনা করব।
প্রথম স্তর
তাকওয়ার তিনটি স্তরের প্রথমটি হচ্ছে, কুফর ও শিরক থেকে মুক্ত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা। এই অর্থে একজন সাধারণ মুসলমানকেও মুত্তাকি বলা যাবে। এমনকি তার থেকে কোনো গুনাহ প্রকাশ পেলেও। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এই অর্থে তাকওয়া শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন: وَالْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَى
আর তাদের জন্য তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ-বাণী অপরিহার্য (রূপে পালনীয়) করে দিলেন। [সুরা ফাতাহ : ২৬]
আয়াতে 'কালিমায়ে তাকওয়া' বলে তাকওয়া অবলম্বনকারী কালিমা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তাওহিদ ও রিসালতের কালিমা। এই কালিমাই তাকওয়ার ভিত্তি। এ জন্য এটাকে কালিমায়ে তাকওয়া বলা হয়েছে।
কালিমায়ে তাকওয়া বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ ব্যাপারে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এর দ্বারা কালিমায়ে তাওহিদ বা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বোঝানো হয়েছে। এখন যদি কোনো অমুসলিম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ পাঠ করে, তাহলে সেও ঈমানদার হয়ে গেল। এটা হলো তাকওয়ার প্রাথমিক স্তর বা সাধারণ তাকওয়া।
দ্বিতীয় স্তর
তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, যা করলে পাপ হয় অথবা ছেড়ে দিলে পাপ হয় এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকা। কারও কারও মতে, সামান্য ও ছোটখাটো ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেও বেঁচে থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ কর্তৃক আদেশকৃত সব বিষয় মেনে চলা এবং অপছন্দনীয় যাবতীয় বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। এখন কোনো ব্যক্তি যদি তার হাত, মুখ, নাক, কান, পা ইত্যাদি সব অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তাহলে এটাকে দ্বিতীয় বা মাধ্যমিক স্তরের তাকওয়া বলা হয়। এ পর্যায়ের তাকওয়ার আবার বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং এই স্তরের তাকওয়ার উপর ভিত্তি করেই কুরআন-হাদিসে বিভিন্ন কল্যাণ ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। এটাকে তাকওয়ায়ে খাস বা বিশেষ তাকওয়া বলা হয়। এই বিশেষ তাকওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,
وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَمَثُوبَةٌ مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ خَيْرٌ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾
আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাদের জন্য) প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। [সুরা বাকারা: ১০৩]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَ لَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَ اتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَةٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَ الْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْتُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। [সুরা আরাফ: ৯৬]
আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে 'آمَنُوا' শব্দ বলে প্রথম স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, আর 'وَاتَّقُوا' বলে দ্বিতীয় স্তরের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
এই বিশেষ স্তরেও আবার আরও স্তর আছে, যেমন: আমি আমার নাক-মুখ-কানকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখলাম, এটা বাহ্যিক তাকওয়া, কিন্তু অন্তরে গুনাহ আছে, তাহলে হবে না। তবে সে যদি তার অন্তরের এই কালো দাগ বা গুনাহ দূর করতে পারে, তাহলে সে বিশেষ স্তরের তাকওয়ার অধিকারী হবে। এ পর্যায়ে এই তাকওয়ার নাম বদলে 'ওয়ারা' হয়ে যাবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُوْنَ আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয় যারা পাপ অর্জন করে, তাদেরকে অচিরেই প্রতিদান দেয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে। [সুরা আনআম : ১২০]
হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন, عَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سَمْعَانَ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ وَهِ عَنِ الْبِرِّ والإِثْمِ فَقَالَ الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
হজরত নাওয়াস ইবনু সামআন আনসারি রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসুল-কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করি। নবিজি উত্তর দিলেন, 'পুণ্য হচ্ছে সচ্চরিত্র আর পাপ হচ্ছে যা তোমার (অন্তরে) খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকে তা জানুক তা তুমি অপছন্দ করো।'
এই হাদিসে নবিজি হজরত নাওয়াস রা.-এর প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'নেকি হলো উত্তম চরিত্র। শুধু নামাজ পড়া নেকি নয়। কেউ যদি নামাজ পড়ে অন্যকে কষ্ট দেয়, তাহলে হবে না। বরং তার হাত-মুখ পা সব অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর চরিত্র হলো কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাউকে কষ্ট না দেওয়া। কিন্তু আমরা করি কি, নামাজও পড়ি আবার ঘরে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করি। অথচ নবিজি যখন ঘরে যেতেন, তখন স্ত্রী আয়েশা রা.-কে চুম্বন করতেন। আপনি যদি একজন আদর্শ স্বামী হতে পারলেন না বা আদর্শ স্ত্রী হতে পারলেন না, তাহলে আপনার চরিত্র ঠিক হলো না। আপনাকে আরও পরিশুদ্ধ হতে হবে। রাগ এলে ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা এ জায়গায় অনেক পিছিয়ে। দেখা যায়, স্ত্রী যদি তরকারিতে লবণ একটু বেশি দিয়ে দেয়, তাহলে আপনি রাগ করে খাবার প্লেট ছুড়ে মারেন। এটা আদৌ সচ্চরিত্র হতে পারে না।
আখলাক বা চরিত্রেরও তিনটি স্তর রয়েছে। আপনার সাথে যদি কেউ খারাপ আচরণ করে, এর প্রতিক্রিয়ায় আপনি কোন কাজ করেন, সেটা থেকেই আপনার আখলাক বা চরিত্রেরও বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যাবে।
চরিত্রের প্রথম ধাপ
খারাপের জবাব খারাপ দিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ, আপনার সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে আপনিও তার সাথে খারাপ আচরণ করা। কুরআনে কারিম বলছে, জাজাউ সাইয়িআতিন সাইয়িআতুন মিসলুহা। বুরায়ির বদলা হলো সমপরিমাণ বুরায়ি। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে বদলাটা যেন সমান সমান হয়। একসূতা বেশি হলে সেটা জুলুম হয়ে যাবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ ﴾
যারা তোমাদের উপর জবরদস্তি করেছে, তোমরাও তাদের উপর জবরদস্তি কর- যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। [সুরা বাকারা: ১৯৪]
বোঝা গেল, কেউ আপনাকে আঘাত করলে বা আপনার উপর জবরদস্তি করলে সেটার সমপরিমাণ জবাব দেওয়া তথা বদলা লওয়ার অধিকার আপনার আছে। তবে, এটা অনেক কঠিন। যেমন কেউ আপনাকে একটি চড় মেরেছে। ইসলামি শরিয়তে তাকে তার সমপরিমাণ চড় ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সে যতো জুরে মেরেছে, আপনাকে ঠিক ততোটা জুরেই মারতে হবে। এখন সমস্যা হলো চড়ের পরিমাণ মাপার তো কোনো যন্ত্র নাই। তাহলে আপনি কি করে সমপরিমাণ চড়টা মারবেন? আর বেশি জোরে হলে তো জায়েজ হবে না।
চরিত্রের দ্বিতীয় ধাপ
আখলাকের দ্বিতীয় স্তর হলো, কেউ আপনার সাথে খারাপ আচরণ করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। অর্থাৎ, আপনার সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে আপনি তার সাথে খারাপ আচরণ না করে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। যেমন বদলা লওয়ার আয়াতেরই পরের অংশে আল্লাহ বলেন,
فَمَنْ عَفَا وَ أَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾
যে ক্ষমা করে দিল এবং সমঝোতা করে ফেলল, আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান রয়েছে। [সুরা শূরা: ৪০]
এটা হলো চরিত্রের দ্বিতীয় স্তর। অন্যকথায়, এটিকে উত্তম চরিত্র বলা হয়। একজন মুসলমানের চরিত্র হবে উত্তম চরিত্র। নবিজি বলেন, বুয়িসতু লি-উতাম্মিমা মাকারিমাল আখলাক, আমি সর্বোত্তম চরিত্রের রোলমডেল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি
চরিত্রের তৃতীয় ধাপ
আখলাকের তৃতীয় স্তর হলো কেউ আপনার সাথে খারাপ আচরণ করলে তাকে মাফ করে দিয়ে তার জন্য দুআ করা। বরং তার সাথে আরো বেশি ভালো ব্যবহার করা। যে শিক্ষাটি আমরা পাই নবিজি থেকে। তিনি বলেছেন, صل من قطعك واعف عن من ظلمك واحسن الى من أساء اليك
যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে নাও। যে তোমার সাথে জুলুম করল তুমি তাকে মাফ করে দাও। যে তোমার সাথে দুঃব্যবহার করল, তুমি তার সাথে ইহসান করো।
এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন, আপনি কোন স্তরে আছেন, প্রথম, মধ্যম না উচ্চস্তরে? যদি প্রথম স্তরে থাকেন, তাহলে আপনার চরিত্র গতানুগতিক। যদি দ্বিতীয় স্তরে থাকেন, তাহলে আপনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। আর যদি তৃতীয় স্তরে থেকে থাকেন, তাহলে আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আর আপনি যদি চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করতে পারেন, তাহলে আপনিই প্রকৃতপক্ষে নবিজির প্রকৃত উম্মত দাবি করতে পারেন, কারণ, এটাই ছিল আপনার নবির চরিত্র। আপনার নবি আঘাতের জবাব আঘাত দিয়ে দিতেন না, তাকে মাফ করে দিতেন। শুধু মাফ করেই থেমে থাকতেন না, তার কল্যাণ কামনা করে দুআও করতেন। যার সার্টিফিকেট দিয়ে আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ হে নবি, নিশ্চই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। [সুরা কলম: ৪]
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সর্বোত্তম চরিত্র তথা নবিওয়ালা চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাউফিক দান করুন।
পূর্ণ ইসলামই প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল -এর পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকাকেই তাকওয়া বলা হয়। বস্তুত তারাই মুত্তাকি, যাদের ঈমান ও আমল দুটিই পূর্ণাঙ্গ। আর ঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই ইসলাম।
তাকওয়ার তৃতীয় স্তর
তাকওয়ার তৃতীয় স্তর হচ্ছে, অন্তরকে আল্লাহ ব্যতিত যাবতীয় বিষয় থেকে মুক্ত রাখা। এই স্তরের তাকওয়া নবি ও ওলিগণের হয়ে থাকে। আর এটিই তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তর। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ذلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ ﴾
এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়ত। [সুরা বাকারা: ২]
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি রাহ. তাকওয়ার চারটি স্তর বর্ণনা করেছেন:
১. শরিয়তে যেসব বস্তু হারাম করা হয়েছে, আল্লাহর ভয়ে সেসব বস্তু থেকে বিরত থাকা। যেমন, মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়াখেলা ও সুদ খাওয়া প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা। এটি সাধারণ মুমিনের তাকওয়া। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় মুমিন।
২. হারাম বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকার পর সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতেও দূরে থাকা। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় সালেহ।
৩. সকল হারাম বস্তু ও সন্দেহযুক্ত হালাল বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকার পর আল্লাহর ভয়ে অনেক সন্দেহবিহীন হালাল বস্তুও পরিত্যাগ করে, এ শ্রেণিকে মুত্তাকি বলা হয়।
৪. উপর্যুক্ত তিন শ্রেণির তাকওয়া আয়ত্ত করার পর এমন সকল হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা, যা ইবাদতে কোনো সহায়তা করে না। এ শ্রেণির মুত্তাকিকে বলা হয় 'সিদ্দিক'।
আমাদের সামাজিক জীবন দর্শনে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। তাকওয়ার পোশাকে যারা আচ্ছাদিত, তাদের মাধ্যমে কোনো রকম অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে পারে না। অশ্লীলতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, সুদ, ঘুষ, সম্পদ লুটপাট, কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাবসহ হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর অধিকার) ও হাক্কুল ইবাদ (মানুষের প্রতি মানুষের ও সৃষ্টিজগতের প্রতি মানুষের যাবতীয় দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহ) পালনে উদাসীন থাকা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থেকে মুত্তাকির জীবন যাপন করে। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশ ও জাতির উন্নয়নে গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে অবদান রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে।
তাকওয়া বা আন্তরিকতাবিহীন কোন কাজই সফলতা বয়ে আনে না। যেকোনো কাজের প্রাণ হলো তাকওয়া। বিশেষ করে ইবাদত হিশেবে যা কিছু করা হয়, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য তাকওয়া একান্ত প্রয়োজন।
মূলত তাকওয়ার গুণ অর্জনের জন্যই ইসলামের যাবতীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ জন্য যে মানুষ যত বেশি তাকওয়ার অধিকারী হবে, সে জাগতিক জীবনে সমাজে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য হবে এবং পরকালে আল্লাহর কাছে বেশি সম্মনিত হবে।
তবে কে কত বেশি মুত্তাকি, এটা নিয়ে আত্মপ্রশংসার কোনো সুযোগ নেই। কেননা আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন, কে কত বেশি মুত্তাকি। আর যারা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে পারেন, তারা আল্লাহর ভালোবাসা লাভে ধন্য হন।
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রাহ. বলেছেন, 'মুত্তাকির মর্যাদা বর্ণনায় যদি “হুদাল লিল মুত্তাকিন” (পবিত্র কুরআন মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক) আয়াতাংশটি ছাড়া আর কোনো আয়াত না-ও থাকত, তবু তাদের মর্যাদা বর্ণনায় এটিই যথেষ্ট ছিল। কারণ, তাঁর মতে পবিত্র কুরআন মুত্তাকিদের জন্য পথ প্রদর্শক।
সুতরাং তাকওয়া ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণ নয়। আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়টির মহত্ব ও গুরুত্ব বুঝানোর জন্য সুরা নিসার প্রথম আয়াতটি শুরু হয়েছে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে এবং শেষও করা হয়েছে তাকওয়ার মাধ্যমে পরস্পরিক লেনদেন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে। সুতরাং মানুষের উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা। মোটকথা, সকল প্রকার অনিষ্ট কাজ থেকে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে বাঁচানোর অন্য নামই হলো তাকওয়া।
তাকওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে অনেক সুস্পষ্ট করে বয়ান করা হয়েছে। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদেরকে শরিয়তের পরিভাষায় বলা হয় মুত্তাকি। মুত্তাকিদের পরিচয় প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَمِمَّا رَزَقْنُهُمْ يُنْفِقُونَ ) وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
যারা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান রাখে, নামাজ আদায় করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা আপনার উপর যা নাজিল করা হয়েছে (কুরআন) এবং আপনার আগে যা নাজিল করা হয়েছে (আসমানি কিতাব) তার প্রতি ঈমান রাখে, আর তারা আখিরাতের প্রতি ইয়াকিন রাখে। [সুরা বাকারা: ৩-৪]
তাকওয়া দৃশ্যমান কোনো বস্তু নয়। এটা মূলত মানুষের অভ্যন্তরীণ গুণবিশেষ। তাকওয়া যেহেতু অন্তরে থাকে, তাই রাসুল ﷺ অন্তর পরিষ্কার করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মনে রেখো, নিশ্চয়ই মানুষের শরীরে একটি গোশতের টুকরো আছে, যা ঠিক থাকলে সমস্ত দেহই ঠিক থাকে। আর তার বিকৃতি ঘটলে সমস্ত দেহেরই বিকৃতি ঘটে। সে গোশতের টুকরাটি হলো 'অন্তর।' এব্যাপারে আমরা ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
তাকওয়ার উপকারিতা
তাকওয়া অবলম্বনকারীকে আল্লাহ এমন রিজিক দান করেন, যে কেউ তাকওয়া সম্বলিত সুন্দর চরিত্র নির্মাণ করতে পারলে তার রিজিকের কোনো অভাব হয় না। আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقُهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ যে তাকওয়া অবলম্বন করল, আল্লাহপাক তারজন্য রাস্তা খুলে দেন, এবং এমন পদ্ধতিতে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন যে, লা ইয়াহতাসিব, সে ক্যালকুলেশন করেও হিসাব মিলাতে পারে না।
এ ছাড়া তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহর নাজাত মিলে, আমল কবুল হয়। তাকওয়া অবলম্বনকারী বান্দার কোনো ভয় থাকে না। তার কাজ আল্লাহ সহজ করে দেন। তাকওয়া অবলম্বনকারী বান্দার জন্য জমিন ও আসমানের বরকতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এমন বান্দার অন্তরে সত্য-মিথ্যা বোঝা ও পার্থক্য করার বিবেক সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া কিয়ামতের দিন তাকে বড় পুরস্কার দেওয়া হবে।
মোটকথা, তাকওয়ার সীমা অনেক বিস্তৃত। এটি মানুষের জীবনকে এমন এক সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করে, যা সব ধরনের ভীতি, লোভ-লালসা, প্ররোচণা, প্রতারণা, প্রলোভন, পদস্খলন থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের তাওফিক দিন। আমিন।