📄 হিদায়াত লাভ করবে কারা
পবিত্র কুরআন হলো হিদায়তের মাধ্যম। এই কুরআনের মাধ্যমে মানুষ হিদায়ত লাভ করবে। আল্লাহ বলেন, 'হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্য।'
গত আলোচনাগুলোতে আপনারা হিদায়ত ও মুত্তাকি সম্পর্কে আলোচনা শুনে আসছেন। সেগুলো আপনাদের স্মরণ থাকতে হবে। আল্লাহ কুরআনে হিদায়তের কথা বলেছেন, তবে এই হিদায়ত কি সবার জন্য, নাকি শুধু মুত্তাকিদের জন্য? অবশ্যই মুত্তাকিদের জন্য। এখন প্রশ্ন জাগে যে, তাকওয়া কি এবং মুত্তাকি কারা? এ সম্পর্কে এক হাদিসে নবিজি ﷺ ইরশাদ করেন,
الاسلام على النية والايمان على القلب
ইসলাম হলো নিয়তের নাম আর ঈমান থাকে কলবে। অর্থাৎ ঈমান বা আকিদা অন্তরে থাকে, আর ইসলাম সহিহ নিয়তের মাধ্যমে আমলে প্রকাশিত হয়।
তাকওয়ার উদাহরণ হচ্ছে যেমন নামাজ। এটা শুধু মুসলমানই পড়ে, কাফিররা পড়ে না। তাই নামাজ আমল হলো বাহ্যিক আমল এবং বাহ্যিক আমলের নামই হলো ইসলাম। অপরদিকে ঈমানের সম্পর্ক হলো অন্তরের সঙ্গে। আল্লাহ বলেন,
وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيمَانِ
অর্থাৎ, তাদের অন্তর ঈমান দ্বারা প্রশান্ত। ঈমানের সম্পর্ক হলো অন্তরের সঙ্গে।
এখন প্রশ্ন জাগে, তাকওয়া কোথায় থাকে? তাকওয়ার ঠিকানা কী? উত্তরটা নবিজি এক হাদিসে দিয়ে গেছেন। বলেছেন, التقوى هاهنا তাকওয়া কোথায় থাকে, নবিজিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তাঁর বুকের দিকে ইঙ্গিত করে তাকওয়া শব্দটি তিনবার উচ্চারণ করেন। সুতরাং বোঝা গেল তাকওয়ার অবস্থান হলো অন্তর। কুরআনে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ الْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার রয়েছে অন্তর অথবা যে নিবিষ্টচিত্তে শ্রবণ করে। [সুরা কাফ: ৩৭]
অর্থাৎ, যাদের অন্তর আছে এবং অন্তর দিয়ে মনোযোগের সঙ্গে কুরআন শ্রবণ করে, এমন না যে, কুরআনও শুনল, অন্যদিকেও তার মনোযোগ নিবদ্ধ থাকল; বরং তার কলবকে শুধু কুরআনের দিকে নিবিষ্ট রাখে।
আবার কলব বা অন্তর তিন প্রকার। এক প্রকার হচ্ছে কলবে সালিম। পবিত্র কুরআনে কলবে সালিম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না। তবে যে আল্লাহর কাছে আসবে সুস্থ অন্তরে। [সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯]
মুহতারাম হাজিরিন।
এবার আমাদের জানতে হবে, আমাদের কলব বা অন্তর কেমন কলব? কোন প্রকারের মধ্যে পড়ে? আমরা যদি আমাদের কলবের অবস্থা বুঝে থাকি এবং মনে করি যে, আমার কলব বা অন্তর হচ্ছে কালবে সালিম, তাহলেই এই কুরআনের মাধ্যমে আপনার হিদায়ত লাভ হবে। মৃত কলবের মাধ্যমে নয়। কলবে মায়্যিত বা মৃত কলবের মাধ্যমে কেন হবে না, এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَسِقِينَ তিনি এর দ্বারা অনেককেই বিভ্রান্ত করেন, আবার অনেককে সৎপথে পরিচালিত করেন। বস্তুত তিনি ফাসিকদের ছাড়া আর কাউকেও বিভ্রান্ত করেন না। [সুরা বাকারা: ২৬]
সুতরাং কলব বা অন্তর যদি সালিম না হয়, তাহলে এই কুরআন আমাদের হিদায়ত দেবে না; বরং পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে। আর সাধারণ মানুষ তো খুব সহজেই দ্বীনি বিষয়ে প্রভাবিত হয় এবং দ্বীনি কোনো বিষয়ের শুদ্ধতা যাচাইয়ের যোগ্যতা যেহেতু থাকে না, ফলে তারা খুব সহজেই পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।
নেক সুরতে ধোঁকা
আমাদের সমাজে অনেক আছে, যারা কুরআন-হাদিসের কথা বলে, অথচ শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এই দ্বীনের জন্য কথা বলা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। বাহ্যিকভাবে তারা ইসলামের কথা বলে, কিন্তু অন্তরে ভিন্ন কিছু ধারণ করে। এদের বডিতেই ইসলামের অনেক নিদর্শন অনুপস্থিত থাকে আবার তারাই ইসলামের পক্ষে বড় গলায় কথা বলে। এরা মূলত পথভ্রষ্ট এবং মানুষকেও বিভ্রান্ত করে থাকে।
ফলে এদের দেখে এবং কথা শুনে আপনারাই অনেক সময় বলে ফেলেন যে, 'অমুক তো কুরআনের কথা বলে, হাদিসের কথা বলে!' এখন কথা হলো, কেউ শুধু শুধু কুরআন-হাদিসের কথা বললেই সেটা যে অন্ধবিশ্বাসে মেনে নিতে হবে, এমন নয়; বরং আপনাকে যাচাই করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম গ্রহণ করতে হবে। এই যে একটা বিষয়, এটা ভালো করে বুঝতে হবে। কেননা, কুরআন পড়ে যেমন অনেকে গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়। তাদের অনেক অনুসারীও জুটে যায়। ফলে এই কুরআনের প্রকৃত মর্ম না বোঝায় অনেকেই উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলে এবং পথভ্রষ্ট হয়। এই গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট বাহিনী সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا
তিনি এর দ্বারা অনেককেই বিভ্রান্ত করেন, আবার অনেককে সৎপথে পরিচালিত করেন। [সুরা বাকারা: ২.৬]
আর যারা গুমরাহ হয়, এদের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ আয়াতের পরের অংশেই বলেছেন,
وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفُسِقِينَ﴾
বস্তুত তিনি ফাসিকদের ছাড়া আর কাউকেও বিভ্রান্ত করেন না। [সুরা বাকারা : ২৬]
ফাসিকরাই পথভ্রষ্ট হয়। ফাসিকদের আলোচনা পরে কোনো সময় করা হবে ইনশাআল্লাহ।
বোঝা গেল শুধু কুরআন পড়লেই কেউ হিদায়ত লাভ করতে পারবে না, মুত্তাকি হতে পারবে না; বরং তাকে কুরআনের প্রকৃত মর্মও ভালো করে বুঝতে হবে। কালবে সালিম থাকতে হবে। তবেই সে হিদায়ত লাভ করতে পারবে।
আর যদি এমন কলব না থাকে, অর্থাৎ যারা এমন কলবের অধিকারী, যারা দেখতে মানুষের মতো হলেও চতুষ্পদ জন্তু থেকে আরও নিকৃষ্ট। তাদের কলব এমন কলব, যাতে আল্লাহর কোনো জিকির নেই, এমন অন্তরকে গাফিল অন্তর বলে। গাফিল অন্তর মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং মুক্তির একটাই উপায়, কালবে সালিমের অধিকারী হওয়া। আমাদের সবাইকে কলবে সালিম অর্জন করতে হবে।
উপরে যে কালবে সালিমের কথা আলোচনা করা হলো, এটার আরেক নাম হলো কলবে মুনিব। আর দ্বিতীয় প্রকারের কলব হচ্ছে কলবে মায়্যিত বা মৃত কলব। এই কলবের কথাও কুরআনে আছে। ইরশাদ হয়েছে,
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا ۖ وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
আর অবশ্যই আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষকে। তাদের রয়েছে অন্তর, তা দ্বারা তারা বুঝে না; তাদের রয়েছে চোখ, তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের রয়েছে কান, তা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল। [সুরা আরাফ : ১৭৯]
এই মৃত কলবের অধিকারী জীবিত হলেও আল্লাহর কাছে সে মৃত। কারণ, তার অন্তর মৃত। অপরদিকে যাদের কালবে সালিম রয়েছে, তারা যদি মারাও যায়, তবু তারা আল্লাহর কাছে জীবিত। আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِنْ لَا تَشْعُرُونَ
যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পার না। [সুরা বাকারা : ১৫৪]
এখন কলবকে আল্লাহ জীবিত করেন কীভাবে, অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ
যে ছিল মৃত, অতঃপর আমি তাকে জীবন দিয়েছি এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছি আলো, যার মাধ্যমে সে মানুষের মধ্যে চলে। [সুরা আনআম : ১২২]
অর্থাৎ, যার কলব আছে, আমি আল্লাহ তার কলবকে জীবিত করলাম। শুধু জীবিত না; বরং তাতে এমন নুর ফিট করে দিলাম, যে নুরের আলোয় শুধু সে চলে না; বরং এই নুরানি কলবের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশকে সে আলোকিত করে। এরপর কিয়ামতের দিন সে স্বচ্ছ অন্তরওয়ালাদের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে দলবদ্ধভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
দুই প্রকার অন্তর
মানুষের অন্তরকে দুভাগে ভাগ করা হবে। একধরনের কলব হবে মর্মরপাথরের মতো সাদা স্বচ্ছ। হজরত হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল বলেন,
لَا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ
জমিন আসমান যতদিন থাকবে, ততোদিন কোনো ফিতনা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
ফলে এমন কলবকে ফিতনায় জড়াতে পারবে না। অন্যায় কাজে লাগাতে পারবে না। এমন কলবের অধিকারী যদি একটি নেকির কাজ করে, এর পরিবের্ত একটি আলো বা নুর তৈরি হয়। এভাবে যত নেকি করবে, একটা করে তত নুর তৈরি হতে থাকবে। ফলে একসময় তার পুরো কলবটা আলোকিত হয়ে যাবে।
দুনিয়ায় আখিরাতের প্রকৃতি দেখা যায় না কিন্তু কিয়ামতের দিন দেখা যাবে। দুনিয়াতে যেমন আল্লাহকে দেখা যায় না, কিন্তু হাশরের মাঠে দেখা যাবে। তেমনি তার কলবকে সে দুনিয়াতে দেখতে পাবে না, তবে কিয়ামতের দিন অবশ্যই দেখতে পাবে। তখন সে দেখবে, অন্যদের গুনাহ তার ডানে, বামে, পিছনে, সামনে দিয়ে যাচ্ছে, তখন তার অন্তরের আলো ছড়িয়ে পড়বে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَ بِأَيْمَانِهِمْ بُشْرِيكُمُ الْيَوْمَ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
সেদিন তুমি দেখবে মুমিন নর-নারীদেরকে তাদের সামনে ও ডানপাশে তাদের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হবে। (বলা হবে) আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে, সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে। এটাই মহা সাফল্য। [সুরা হাদিদ: ১২]
দুনিয়াতে যে নেকি সে অর্জন করেছিল, কালবকে জিন্দা করে এটাকে কালবে সালিম বানিয়েছিল, একেকটা নেকি করে নুর তৈরি করেছিল এবং এর মাধ্যমে সে তার অন্তর স্বচ্ছ করেছিল, এই আলো সেদিন প্রকাশ পাবে এবং এর বিনিময়ে সে ৩০ হাজার বছরের রাস্তা পুলসিরাত এই নুরের ফোকাসে মুহূর্তেই পাড়ি দিতে সক্ষম হবে। আল্লাহ বলেন,
﴿يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ ﴾
সেদিন তুমি দেখবে মুমিন নর-নারীদেরকে তাদের সামনে ও ডানপাশে তাদের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হবে। [সুরা হাদিদ: ১২]
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে আসানির সাথে পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার তৌফিক দান করুন। সকলে বলুন, আমিন।
যারা তাদের অন্তরকে আলোকিত করেনি, তারা এই আলোকিত অন্তরওয়ালাদের দেখে বলবে, আমাদেরও কিছু নুর দাও। তখন তারা জবাবে বলবে, এখানে দেওয়ার বা লাভ করার কোনো সুযোগ নেই। নুর পেতে হলে তোমাদেরকে দুনিয়াতে যেতে হবে। সুতরাং তোমরা দুনিয়াতে যাও এবং নুর নিয়ে আসো। কেননা, দুনিয়াতে নেকি করলেই কেবল নুর লাভ হয় এবং তা জমা হয়েছিল বলে আজ হাশরের কঠিন ময়দানে কাজে আসছে। কিন্তু দুনিয়াতে তো ফিরে আসা সম্ভব নয়। ফলে জাহান্নামই তাদের জন্য অবধারিত। আল্লাহ বলেন,
﴿يَوْمَ يَقُوْلُ الْمُنْفِقُوْنَ وَالْمُنْفِقْتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُوْرٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ ﴾
সেদিন মুনাফিক নারী ও পুরুষরা মুমিনদের বলবে, তোমরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করো, আমরাও তোমাদের জ্যোতি থেকে কিছু আলো নিবো। বলা হবে পেছনে ফিরে যাও এবং আলোর খোঁজ করো। [সুরা হাদিদ: ১৩]
বোঝা গেল, শুধু কলব থাকলে হবে না, বরং জিন্দা কলব থাকতে হবে। মৃত কলব জীবিত হয়, এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে বলেন,
﴿يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ﴾
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের জীবন সঞ্চারক বস্তুর দিকে আহ্বান করেন। [সুরা আনফাল: ২৪]
হে ঈমানদারের দল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা মানো। لِّمَا يُحْيِيكُمْ যদি মানো, তবেই তোমাদের অন্তর জিন্দা হয়ে যাবে। গানবাজনা বা গুনাহের কাজ করলে অন্তর কখনো জীবিত হবে না। সুতরাং আল্লাহর হুকুম, নবিজির হুকুম যারা শুনে না, মানে না, তাদের অন্তর মৃত, আর যারা মানে তাদের অন্তর জীবিত। আর আল্লাহ যেহেতু الحي القيوم সবসময় জীবিত, সুতরাং জিন্দা কলবওয়ালা লোকেরা আল্লাহর সঙ্গেই সম্পর্ক তৈরি করে। জিন্দা কুদ্দুস আল্লাহর সঙ্গে সকল নবি-রাসুলের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক ছিল, এ জন্য তাঁরা মরার পরও জীবিত।
হায়াতুল আম্বিয়া
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো احياء الانبياء অর্থাৎ নবিগণ তাঁদের কবরে জীবিত। এটা এ কারণে যে, তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে সবসময় এবং সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক রাখতেন। মৃত্যুর পর যে জগত আছে, কবর জগত বা আলমে বারজাখ, যে জগত সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস থাকতে হবে। এই দুনিয়ার জগতে যার কলব যত জিন্দা, সেই জগতে তার মধ্যে তত বেশি জিন্দেগির একটা ফোকাস দান করেন।
আপনারা শুনেছেন, হাদিসে আছে, যারা নেককার অর্থাৎ, যারা স্বচ্ছ অন্তর নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, তারা মারা যাওয়ার পর কবরে সওয়াল-জওয়াবের পর কবর তাদের জন্য জান্নাতের বাগান হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ। এ সময় তাদের বলা হবে, نم نومة العروس অর্থাৎ বাসররাতে নববধূ বা নতুন বর যেভাবে ঘুমায়, তোমরাও সেভাবে ঘুমাও।
আপনারা বলেন তো, মানুষ যখন ঘুমায়, তখন তারা মরে যায়, না জীবিত থাকে? জীবিত থাকে। আর নেককারদের অন্তরও একধরনের জীবিতদের মতো। হাদিসে বলা হয়েছে, نم نومة العروس— তোমরা ঘুমাও, যেভাবে বাসররাতে নববধূ ঘুমায়। এখানে বলা হয়নি, তোমরা মরে যাও। ‘নাম’ বা ঘুমাও এ জন্য বলা হয়েছে যে, তারা নেক আমল বা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে তাদের অন্তর জীবিত রেখেছে। তাই যে যত বেশি সম্পর্ক রেখেছে, সে কবরে তত বেশি ফলাফল লাভ করবে। আর অন্তর সবচেয়ে বেশি জিন্দা করেছেন নবি-রাসুলগণ, ফলে তাঁরা কবরের জগতেও জীবিত থাকেন। এটা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা।
কবরে নামাজ পড়া
শুধু যে জীবিতই থাকেন তা না; বরং আল্লাহর দেওয়া বিশেষ সুযোগ নিয়ে কবরে নামাজও পড়েন। হাদিস শরিফে আছে, আল আম্বিয়াউ আহইয়াউন ফী কুবুরিহিম যুসাল্গুন। অর্থাৎ, নবিগণ তাদের কবরে জীবিত আছেন এবং নামাজও পড়ছেন।
অন্য হাদিসে আছে, মেরাজের রাতে আমাদের নবিজি মুসা আলাইহিস সালামের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন নবিজি দেখলেন মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর কবরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন। হজরত আনাস ইবনু মালিক রাজিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত নবিজির হাদিসটি হলো এমন,
مررت على موسى ليلة أسري بي عند الكثيب الأحمر، وهو قائم يصلي في قبره
আমি ইসরা (মেরাজ) রজনীতে একটি লাল টিলার পাশে মুসা আলাইহিস সালামের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন।
ছিদ্রান্বেষীরা বলবে, মুসা আলাইহিস সালাম যদি তাঁর কবরে নামাজ পড়েও থাকেন, নবিজি সেটা দেখলেন কীভাবে? জবাব হলো, নবিজি নিজের ক্ষমতায় দেখেননি। আল্লাহ দেখিয়েছেন। এটাকে বলে নবিজির মুজিজা। মুজিজা বিশ্বাস করতে হবে, এটা ঈমানের অংশ।
সুতরাং বোঝা গেল, কালবে সালিম যাদের অর্জিত হয়, কুরআন তাদের জন্য হিদায়ত হবে। আর যদি কালবে মায়্যিত বা মৃত কলব হয়, তাহলে তাদের জন্য কুরআন হিদায়ত হবে না। এরা তো চতুষ্পদ জানোয়ারের চেয়েও মন্দ।
📄 তাকওয়া এবং কালবে সালিম
আমাদের আলোচনা হচ্ছিল তাকওয়া সম্পর্কে। যেহেতু তাকওয়া কলবের মধ্যে থাকে, তাই প্রথমে আমাদের কলবের পরিচয় জানতে হবে। এরপর তাকওয়া কলবে কীভাবে, কোন জায়গায়, কতটুকু বসবে- সেটা বুঝতে হবে। সেটা বোঝার জন্য আগের আলোচনা স্মরণ রাখতে হবে।
কলব তিন প্রকার, এক প্রকার হচেছ কালবে সালিম বা স্বচ্ছ কলব। আরেক প্রকার হচ্ছে কালবে মায়্যিত বা মৃত কলব। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে, কালবে মারিজ বা অসুস্থ কলব। এ জন্য পবিত্র কুরআনের ভূমিকায় আল্লাহ তাআলা মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। একভাগ মুত্তাকি, একভাগ কাফির, আরেক ভাগ মুনাফিক। এখন আপনারাই বলুন, মুত্তাকিদের কলব কেমন কলব?
উত্তর হচ্ছে কালবে সালিম বা স্বচ্ছ কলব। আর যারা কাফির, তাদের কলব হচ্ছে কালবে মায়্যিত বা মৃত কলব। আর মুনাফিকদের কলব হচ্ছে কালবে মারিজ বা অসুস্থ কলব। এদের অবস্থা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, فِي قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ অর্থাৎ, তাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত। কেননা, মুনাফিকদের অন্তর কখনো সুস্থ থাকে, আবার কখনো অসুস্থ হয়ে যায়। এরা সুবিধাবাদী। ভয়ংকর। এ জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআনে মুনাফিকদের নিয়ে কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে তাদের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যাতে দুনিয়ার মানুষ মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। কারণ, মুনাফিকের মাধ্যমে ইসলাম ও ঈমানের যতটুকু ক্ষতি হয়, কাফিরের দ্বারা ততটুকু হয় না।
এতটুকু আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম, কলব তিন প্রকার। আর আমাদেরকে যে কলবের অধিকারী হতে হবে, সেটা হচ্ছে কালবে সালিম। এখন আমরা যাব নবিজির কাছে। হে নবি আমাদের জানিয়ে দিন, কালবে সালিম কাকে বলে? সাহাবায়ে কেরাম নবিজিকে প্রশ্ন করেন, يا رَسُولِ اللهِ أَيُّ النَّاسِ خير হে আল্লাহর নবি, শ্রেষ্ঠ মানুষ কারা?
নবিজি জবাব দেন كُل مؤمن অর্থাৎ সকল মুমিনই শ্রেষ্ঠ। তবে মুমিনের মধ্যে কিছু গুণ থাকতে হবে। যেমন, صدوق اللسان مخموم القلبِ অর্থাৎ এমন মুমিন শ্রেষ্ঠ যার মধ্যে দুটি গুণ থাকবে। প্রথমটি হচ্ছে মাখমুমুল কালব। তবে এই মাখমুমুল কলবের অর্থ কী, সেটা সাহাবিগণই প্রথমে বুঝেননি, পুনরায় নবিজিকে জিজ্ঞেস করেছেন। এ জন্য আমি শুরু থেকে বলে আসছি যে, শুধু আরবি জানা থাকলেই কুরআন বুঝে আসবে না; বরং যারা কুরআনের জ্ঞানী, তাঁদের কাছে বসতে হয়, তাঁদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হয়। তবেই কুরআনের জ্ঞান অর্জিত হবে।
দুই নম্বর গুণ হচ্ছে صدوق اللسان। অর্থাৎ মিথ্যা কথা বলতে পারবে না। মাখমুমুল কলব এবং সাদুকুল লিসানের ব্যাখ্যা আমরা পরে জানব। তার আগে চলুন কলব কীভাবে খারাপ হয়, সেটা জানি,
কলব খারাপ হয় বা অস্বচ্ছ হয় চারটি রাস্তা দিয়ে গুনাহ প্রবেশ করে। রাস্তাগুলো হলো, চোখ, কান, মুখ ও ব্রেইন বা আকল।
চোখ
নবিজি বলেছেন, কেউ যদি তার চোখ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, অর্থাৎ, চোখ দ্বারা গুনাহের কাজ করে না, তবে আল্লাহ পাক তার অন্তরে ইবাদতের স্বাদ ঢুকিয়ে দেবেন। এ জন্য আপনারা যদি নিজেদের চোখ কন্ট্রোল করতে পারেন, তাহলে নামাজ, রোজাসহ সব ইবাদতের স্বাদ পাবেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের হুকুম পালনে স্বাদ অনুভব হবে। কবি বলেন, الفت مین برابر ہے وفا ھو کہ جفا ھو : ھر چیز مین لذت ہے اگر دل مین مزا ھو অন্তরে ইবাদতের স্বাদ অনুভব হবে, যদি চোখের হেফাজত করা যায়। তবে আমরা ইবাদতে মজা পাই না, কারণ আমাদের অন্তরে সমস্যা। আজ থেকে আমরা ইনশাআল্লাহ চোখের হেফাজত করব। এই চোখ দিয়ে যদি আমরা মায়ের চেহারার দিকে তাকাই, তাহলে মাকবুল হজের সাওয়াব পাব, যদি পিতার দিকে তাকাই, মাকবুল হজের সাওয়াব পাব। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসবেন, মাকবুল সদকার সাওয়াব পাবেন, কুরআনের দিকে তাকাবেন, চোখের জ্যোতি বাড়বে, একজন মুসলমানের দিকে তাকিয়ে হাসবেন, মাকবুল সদকার সাওয়াব পাবেন। আর যদি এই চোখকে অসৎপথে কাজে লাগানো হয়, তাহলে এই চোখের গুনাহের কারণে আপনার অন্তরে ভাইরাস প্রবেশ করে কলব নষ্ট করে দেয়।
কান
এই কান দিয়ে কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে কলবে কোনো ভাইরাস প্রবেশ করবে না। কলব পরিশুদ্ধ থাকার জন্য তিলাওয়াত হলো ভ্যাকসিন। কিন্তু কানে ইয়ার ফোন দিয়ে গান শুনে শুনে ঘুমিয়ে পড়ে এবং এমতাবস্থায় যদি মারা যায়, তাহলে সে কোন অবস্থায় মারা গেল? এখন কেউ যদি গান শোনা অবস্থায় মারা যায়, তখন সে কেমন কলব নিয়ে মারা গেল? তার ঈমানি হালত কেমন হবে, সেটা বেশ ভয় জাগানিয়া। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
(أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَفِلُونَ)
তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। [সুরা আরাফ : ১৭৯]
সুতরাং স্বচ্ছ কলবের জন্য কানের হেফাজতের বিকল্প নেই। অপরদিকে আমাদের বর্তমান তরুণসমাজ হেডফোন কানে লাগিয়ে যেভাবে নানা পাপকাজে জড়িত হচ্ছে, তাতে তাদের কলব পরিচ্ছন্ন বা স্বচ্ছ হওয়ার পরিবর্তে আরও দাগ পড়ছে। এটা নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে আমরা যাদের সন্তান আছে, অভিভাবক হিশেবে আমাদের সন্তানদের এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া হেডফোন ব্যবহারে কান বা শ্রবণযন্তের যে ক্ষতি হয়, চিকিৎসাবিদ্যার আলোকেও বিষয়টি আমাদের বিবেচনা করতে হবে।
বলছিলাম কলব স্বচ্ছ না হওয়ার অন্যতম বাধা হচ্ছে কান। এই কানের হেফাজতের প্রতি আমাদের বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
মুখ
কলব স্বচ্ছ করতে হলে মুখের হেফাজত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুল বলেন, মানুষ যদি দুটি জিনিসের হেফাজত করতে পারে, তাহলে আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ তাকে সুসংবাদ দিচ্ছি, জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি তার জামিন হয়ে গেলাম। একটা হচ্ছে মুখ, আরেকটা হলো লজ্জাস্থান। কেউ যদি এ দুটি অঙ্গের যথাযথ হেফাজত করতে পারে এবং কোনো নাজায়িজ কাজে তা ব্যবহার না করে, তাহলে নবিজি বলেন, আমি তার জান্নাতের জামিন হয়ে যাব। সুবহানাল্লাহ।
সুতরাং, আমাদের অন্তরে কোনো ভাইরাস যাতে প্রবেশ না করে, এ জন্য অন্তরকে ভাইরাস থেকে মুক্ত রাখতে প্রথমে আমাদের চোখে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর কানের হেফাজতের জন্য কানে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর মুখের হেফাজতের জন্য মুখের ভ্যাকসিন দিতে হবে।
ব্রেইন বা আকল
ব্রেইনের হেফাজতের জন্য ব্রেইনেও ভ্যাকসিন দিতে হবে। আমাদের সমাজে অনেকে আছে, যারা ব্রেইন দিয়ে আঘাত করে। মেধা খাটিয়ে নানা অপকর্ম করে থাকে। পরস্পরে কীভাবে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা যায়, মনোমালিন্য তৈরি করা যায়, এ চিন্তায় হরদম মশগুল থাকে। অথচ দুজন মানুষের মধ্যে যদি পরস্পর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, আর কেউ তাদের এই দ্বন্দ্ব নিরসন করে দেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা এমন বান্দাকে আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। সুবহানাল্লাহ। এখন আপনার ঘরেই যদি কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, তাহলে যেভাবেই হোক এটা সমাধান করে দিলে কিয়ামতের দিন আপনিও আরশের ছায়ার নিচে জায়গা পাবেন। কিন্তু আমরা করি এর উল্টো। দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনের পরিবর্তে কীভাবে সেটা বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। মিথ্যা, চোগলখুরি, অপবাদ, গিবত ইত্যাদির মাধ্যমে অনেকে তার মেধা-মনন ব্যয় করে। ফলে এসবের মাধ্যমে অন্তর স্বচ্ছ হওয়ার পরিবর্তে তাতে ভাইরাস প্রবেশ করে।
সুতরাং নবিজি বলেছেন, সত্যিকার মানুষ হলো সে, যে প্রকৃত ঈমানদার। আর ইমানদারের গুণ হচ্ছে দুটি : ১. মাখমুমুল কালব। ২. সাদুকুল লিসান।
সাহাবিগণ তখন প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সাদুকুল লিসান বা মুখ দিয়ে সত্য বলার বিষয়টি তো বুঝলাম, কিন্তু মাখমুমুল কালব এটা তো বুঝিনি। তখন নবিজি বললেন... হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল -কে জিজ্ঞেস করা হলো,
أَيُّ النَّاسِ أَفْضَلُ قَالَ كُلُّ مَحْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ قَالُوا صَدُوقُ اللِّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا تَخْمُومُ الْقَلْبِ قَالَ هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لَا إِثْمَ فِيهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ
কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। তাঁরা বললেন, সত্যভাষী তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, সে হলো পূতপবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার কোনো গুনাহ নেই। কোনো শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা নেই।
সুতরাং, মাখমুমুল কালবের মর্ম হলো স্বচ্ছ অন্তর। স্বচ্ছ অন্তরের প্রথম গুণ হচ্ছে আত-তাকিয়্যু বা যার অন্তরে তাকওয়া থাকে। আন-নাকিয়্যুর অর্থাৎ যার অন্তর স্বচ্ছ থাকে। নাকিয়্যুর অর্থ কি, এ সম্পর্কে হাদিসে আছে। নাকিয়্যু বা স্বচ্ছ অন্তর মানে,
• লা গিল্লা ফি হি, যার মধ্যে কোনো ধরনের বিদ্বেষ নেই।
• ওলা গাশশা, যার অন্তরে কোনো ধোঁকাবাজি নেই।
• ওলা বাগইয়া, যার অন্তরে কোনো ধরনের উগ্রতা নেই।
• ওলা হাসাদা, যার অন্তরে কোনো হিংসা নেই।
আর এরকম অন্তর হলেই সেটা হলো কালবে সালিম। এখন আপনারা নিজেদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করে নেন। এই হাদিসে যেসব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, সেসব শব্দের অর্থ ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। এ সম্পর্কে পরে কোনো সময় আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
মোটকথা, এই কুরআন থেকে হিদায়ত লাভ করতে হলে আমাদেরকে তাকওয়া অর্জন করতে হবে। আর তাকওয়ার স্থান হচ্ছে হার্ট বা কলব। সুতরাং কলব হতে হবে স্বচ্ছ। আর স্বচ্ছ কলব হতে হলে এরকম গুণ অর্জন করতে হবে।
মুত্তাকির জন্য হিদায়তের আর দরকার কী
উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম, কুরআন মুত্তাকিদের জন্যই হিদায়ত। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, যারা মুত্তাকি, তারা তো এমনিতেই হিদায়তপ্রাপ্ত, ভালো মানুষ, স্বচ্ছ অন্তরের অধিকারী। তাদের জন্য কুরআন হিদায়ত হবে কেন? কুরআন তো তাদের জন্য হিদায়ত হবে, যারা পাপি। কিন্তু এই কুরআনেই আল্লাহ বলেছেন, হুদাল্লিল মুত্তাকিন অর্থাৎ, হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্যই। অপর আয়াতে আছে, হুদাল লিন নাস অর্থাৎ, সব মানুষের জন্য হিদায়ত।
মূল বিষয় হলো, কুরআন কার কালাম? অবশ্যই আল্লাহর কালাম। আর আল্লাহ হলেন সকল বাদশাহের বাদশাহ। সুতরাং বাদশাহ যে আদেশ করেন, তা পালন করা প্রজার উপর জরুরি। এ জন্য একটা যোগ্যতার প্রয়োজন। আর সেই যোগ্যতার নাম হলো তাকওয়া। এই যোগ্যতা অর্জনকারী কুরআনি হিদায়ত লাভ করতে পারবে।
আর কুরআনের ভাষায় মানুষের শরীরও একটা রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তার একটি রাজধানী আছে, সরকারি ও বিরোধীদল আছে, স্পিকার আছে। আমরা এটা বুঝলেও অনেকে কুরআন বুঝি না। যেমন ধরা যাক, আমাদের এই শরীর একটি রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের রাজধানী হলো কালব।
যেমন আমেরিকার রাজধানী হচ্ছে ওয়াশিংটন ডিসি; আর আমাদের শরীরের রাজধানী হচ্ছে কালব। এখন এই রাজধানীতে সরকার গঠন করা হলে বিরোধীদল হবে নাফস এবং সরকারি দল হলো রুহ। আর সংসদভবন হলো ফুওয়াদ (কলবের একটি হালত) বা যেখানে সিদ্ধান্তগুলো সংরক্ষণ করা হয়। আর স্পিকার হলো আকল বা বিবেক।
এখন আপনার শরীরের দিকেই তাকান। দেখেন কোনো দ্বন্দ্ব চলছে কি না? নফস বলে, গুনাহ করো, রুহ বলে করবে না। এই উদাহরণ আমার মনগড়া নয়; বরং নবিজি -ও এরকম বলেছেন। হাদিসটি আমরা আগেও তিলাওয়াত করেছি, নবিজি বলেন,
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ. أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ
জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হলো কলব।
কবি বলেন,
والنفس كالطفل ان تهمله شب على حب الرضاع وان تفطمه ينفطم
নফস হলো শিশুর মতো। যদি দুধপানে অবকাশ দাও, যৌবনেও দুধপান করতে চাইবে। আর যদি দুধপান করা বন্ধ করাও, তাহলে কষ্ট করে হলেও বন্ধ করবে। ঠিক তেমনিভাবে নাফসও গুনাহ করতে মজা পায়। তাকে বাধা দিলে কষ্ট পায়。
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর স্বচ্ছ রাখার তাওফিক দিন। আমিন।
📄 তাকওয়ার শর্ত
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে রমজানের মধ্যদশক, যে দশকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মাগফিরাতের ঘোষণা দেওয়া হয়, এমন সময়ে আল্লাহর ঘর মসজিদে কুরআনচর্চার এই মেহনতে বসার সুযোগ আমাদের দিয়েছেন। এ জন্য দিল থেকে বলি, আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা সবসময় ক্ষমা করতে পারেন এবং করেনও। তবে কিছু কিছু বিশেষ মুহূর্ত আছে, যে সময় আল্লাহ তাআলা অনেক মানুষকে এমনভাবে ক্ষমা করে দেন, যে কারণে অনেক পাপী মানুষও সেই ক্ষমার আওতাভুক্ত হয়ে আল্লাহর ওলি হয়ে যেতে পারে। সুবহানাল্লাহ।
রমজান মানুষকে এরকম ওলি বানানোর অফার নিয়েই আমাদের সামনে এসেছে। এ কারণে রমজান শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো, রমজান কাকে জ্বালায় এবং কে জ্বলে? এ সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেন, রমজান এসেছে মানুষের গুনাহ জ্বালিয়ে দিয়ে তাকে আল্লাহর বন্ধু বানিয়ে দিতে।
গরুর গোবর দিয়ে মানুষ জ্বালানি বানায়। এরপর সেটা দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করা হয়। অথচ গোবর নাপাক জিনিস। কিন্তু এই গোবর যখন জ্বালিয়ে ছাই করা হয়, তখন সেটা পাক হয়ে যায়। এই ছাই দিয়ে চাইলে দাঁতও মাজন করতে পারবেন, কোনো অসুবিধা নেই। ঠিক তেমনিভাবে কোনো মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন সে নাপাক হয়ে যায়। আল্লাহর সান্নিধ্যে সে তখন বিচরণ করতে পারে না। কিন্তু সে যখন তার গুনাহ থেকে তাওবা করে অর্থাৎ তার গুনাহ জ্বালিয়ে দেয়, তখন সে পাকপবিত্র হয়ে যায় এবং আল্লাহর রহমতেরও উপযুক্ত হয়ে যায়। ফলে তার মুখের মর্যাদাও বেড়ে যায়। কেননা, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকে আম্বরের চেয়েও সুগন্ধযুক্ত হয়ে যায়। এ জন্য রমজানের প্রতিটা মুহূর্তে গুনাহ মাফের বিশেষ বিশেষ অফার রয়েছে।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে সায়্যিদুল মুহাদ্দিসিন হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমাযান (রমজান) মাসে সিয়াম পালন করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
ইমান, ইহতিসাব বা গুরুত্বের সাথে যারা রমজানের রোজা রাখে, এই আশায় যে, আল্লাহ তাকে নেকি দেবেন, আল্লাহ তার জীবনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেন। সুতরাং আমরা জানতে পারলাম, রমজানের রোজা রাখলে গুনাহ মাফ হয়। তবে শর্ত হচ্ছে, ঈমানের সাথে এবং নেকির আশায় রোজা রাখতে হবে। এখন আমাদেরকে 'ইমানের সাথে এবং নেকির আশায়' কথাটির মর্ম বুঝতে হবে।
আপনি অজু করার পদ্ধতি জানেন, কীভাবে অজু করতে হয়। কিন্তু অজুভঙ্গের কারণ সম্পর্কে জানেন না। তাই আপনার পেছনের রাস্তা দিয়ে শুধু বাতাসই বের হচ্ছে! তাহলে আপনার অজু হবে? কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে অজু করতে থাকলেও আপনার অজু হবে না। আপনি ঘরে এসি লাগালেন ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য; কিন্তু ঘরের দরজা- জানালা খোলা রাখলেন! তখন এসির বাতাস আপনাকে শীতল করবে না। এটা এসির দোষে হয়েছে, নাকি এর ব্যবহারপদ্ধতি যথাযথ না মানার কারণে? এসির বাতাস খেতে হলে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হবে। তখনই এসি ব্যবহারের স্বার্থকতা খোঁজে পাওয়া যাবে।
ঠিক তেমনিভাবে রোজা রাখলে আপনার গুনাহ মাফ হবে, এটা হলো এসির মতো। আর যেসব শর্তের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন, এটা হলো দরজা-জানালার মতো। এসির ফিটিং ঠিক আছে; কিন্তু দরজা-জানালা খোলা থাকার কারণে যেভাবে ঘর ঠান্ডা হবে না, ঠিক তেমনিভাবে রোজা রাখলেন কিন্তু এই রোজা ঠিকমতো হলো না, নষ্ট করে ফেললেন। তাহলে আপনার এই রোজায় গুনাহ মাফ না হয়ে উল্টো গুনাহ হতে পারে।
আর রোজার বদলা যেহেতু আল্লাহ নিজেই দেবেন, এ জন্য অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। রমজানের এই বিশেষ মুহূর্তে যেহেতু আল্লাহ মাফ করেন, রোজা রাখলেও মাফ করেন, কিয়ামে রমজান বা তারাওয়ির নামাজ পড়লেও মাফ করেন।
অপর হাদিসে রাসুল বলেন, যে রমজানের রাতে কিয়ামে রমজান বা তারাওয়ির নামাজ পড়ল, তারও আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল বলেন,
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
মুহতারাম হাজিরিন!
উপরিউক্ত দুটি হাদিসের একটি হলো শুধু রোজার ফজিলত সম্পর্কে, পরেরটা হলো তারাবির নামাজের ফজিলত সম্পর্কে। দুটি হাদিসের মাধ্যমে আমরা এটাও বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে রমজানের দিনেও ক্ষমার অফার রয়েছে, রাতেও ক্ষমার অফার রয়েছে। আর বড় অফার তো রয়ে গেছে। সেটা হলো লাইলাতুল কদর। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে অন্য হাদিসে রাসুল বলেন,
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لُهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থাৎ, ঈমান ও সওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি কদরের রাতে নফল নামাজ পড়ল, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
ক্ষমার সাতটি শর্ত
রমজানের বড় বড় তিনটি ফজিলত সম্পর্কে আমরা জানতে পারলাম। এই তিনটির মাধ্যমে তো গুনাহ মাফ করানো যায়, কিন্তু গুনাহ মাফ করাতে গেলে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। মুফাসসিরগণ লিখেন, যেসব অফারের কারণে আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করে দেন, সেই ক্ষমাপ্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য ৭টি শর্ত রয়েছে। এখন কেউ যদি এই ৭টি শর্ত মেনে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, আল্লাহ তখন তাকে ক্ষমা করে তার গুনাহের জায়গায় নেকি দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেন।
তাওবার প্রথম শর্ত
তাওবার প্রথম শর্ত হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করা। আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوْبُوْنَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
আল্লাহ অবশ্যই সেসব লোকের তাওবাহ কবুল করবেন, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দকাজ করে এবং তাড়াতাড়ি তাওবাহ করে, এরাই তারা, যাদের তাওবা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [সুরা নিসা: ১৭]
তাওবা শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। বান্দা যখন গুনাহ করে আল্লাহ থেকে দূরে শয়তানের আশ্রয়ে চলে যায়, এরপর তাওবা করে পুনরায় আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। তবে এই ফিরে আসাটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য, একনিষ্ঠ মনে। আর কখনো এমন করবে না বলে শপথ করে। এ জন্য শুধু মুখে তাওবা করলে হবে না, বরং অন্তর দিয়েও ফিরে আসার অঙ্গীকার করতে হবে。
তাওবার দ্বিতীয় শর্ত
তাওবার দ্বিতীয় শর্ত হলো, সময়মতো তাওবাহ করা। তাওবা যেকোনো সময় করলে কবুল হবে না। আর মানুষের জীবনের দুটি সময়ে তার তাওবা কখনো গ্রহণ করেন না আল্লাহ। এ প্রসেঙ্গ আল্লাহ বলেন,
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّاتِ ۚ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْكُنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوْتُوْنَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا اليما
তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দকাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, 'আমি এখন তাওবা করছি' এবং তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা, যাদের জন্য আমরা কষ্টদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করেছি। [সুরা নিসা: ১৮]
এই দুটি সময়ের একটি হলো, সাকরাতের সময়। জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে তাওবা কবুল হয় না। নবিজি বলেন,
ان الله يقبل توبة العبد ما لم يغرغر
সাকরাতের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহপাক বান্দার তাওবা কবুল করেন।
আরেকটা হলো, কিয়ামতের পূর্বমুহূর্তে, যখন পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হবে। এ সময় তাওবা কবুল হবে না। হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, সে সময় দুনিয়ার সকল মানুষ সিজদায় পড়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন না। এখনো যেহেতু পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হয়নি এবং আমাদেরও সাকরাত শুরু হয়নি, তাই আমাদের সামনে তাওবার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য এখনই তাওবা করে আমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তানাহলে মৃত্যুর সময় আপনার উপর কিয়ামত বয়ে যাবে, সেটা থেকে রক্ষা পাবেন না। এ সম্পর্কে হাদিসে আছে,
من مات فقد قامت قيامته
'যে যখন মৃত্যুবরণ করল, তার কিয়ামত তখন থেকেই শুরু।' এই হাদিসের আলোকে আমরা বলতে পারি কিয়ামত দুই প্রকার। একটি হচ্ছে ব্যক্তিগত কিয়ামত, অন্যটি সমষ্টিগত। প্রতিটি মানুষের মৃত্যুর পরপর তার ব্যক্তিগত কিয়ামত শুরু হয়ে যায়, আর ইসরাফিল আলাইহিস সালামের সিঙ্গায় ফু দেওয়ার পর সমস্টিগত কিয়ামত বা মূল কিয়ামত তথা ময়দানে মাহশর কায়েম হবে। সারা জীবনের হিসাবের খাতা খুলে ধরা হবে। হিসাব লওয়া হবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের।
বলছিলাম, সাকরাতের সময় তাওবা কবুল হবে না। কেন কবুল হবে না, কারণ তখন তার সামনে ঈমান বিল গাইব বা আজরাইল উপস্থিত। তখন আর সেটা গাইবের উপর ঈমান রইল না। সাকরাতের সময় তার সামনে অদৃশ্যের জগত দৃশ্যমান করে দেওয়া হয়। এখন যদি সে নেককার হয়, তখন দেখতে পাবে, ফেরেশতারা রেশমের রোমাল নিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়ে এগিয়ে আসছেন। তার প্রাণ কবজ করে ইল্লিয়্যিন পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। আর যদি বান্দা বদকার হয়, তখন সে দেখতে পারে, ফেরেশতারা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে দুর্গন্ধযুক্ত চাটাই নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। একজন মৃত্যুপথযাত্রীর অবস্থাই প্রমাণ করে দেয় সে নেককার না বদকার। কঠিন এ সময়ে তাওবা করলে তাওবা কবুল হবে না। আমরা যারা এ আলোচনা শুনতেছি, আমাদের সামনে তাওবার সুযোগ রয়েছে। তাই সময় থাকতে আমরা তাওবা করে নেব।
তাওবার তৃতীয় শর্ত
তাওবার তৃতীয় শর্ত হলো, আন নাদামু বা লজ্জিত হওয়া। আল্লাহর জমিনে বিচরণ করে, আল্লাহর দেওয়া রিজিক খেয়ে আল্লাহর নাফরমানি করছি, যৌবনেও নাফরমানি করলাম, এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছি, তবু আল্লাহর নাফরমানি ছাড়লাম না, আমার অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করে স্বচ্ছ করতে পারলাম না... এরকম লজ্জাবোধ যদি কারও মধ্যে জাগ্রত হয়, আল্লাহর রাসুল বলেন, এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা সাথে সাথে ক্ষমা করে দেন। কেননা, আল্লাহ তো তার অন্তরের খবর জানেন। এ জন্য নিজে নিজে আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়া দরকার। হাদিস শরিফে আছে, যার লজ্জা নেই, সে যা ইচ্ছা তা করতে পারে। এটা হলো তাওবার তৃতীয় শর্ত।
তাওবার চতুর্থ শর্ত
তাওবার চতুর্থ শর্ত হলো 'আল ইকলা' অর্থাৎ, সে যেসব গুনাহ করেছে, প্রথমেই সেসব গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করা। এখন কেউ যদি এমনভাবে অজু করে যে, একদিকে তার পেছন দিকের রাস্তা দিয়ে বাতাস বের হচ্ছে, অপরদিকে সে অজু করেই চলছে, অর্থাৎ অজুর কাজও জারি, আবার অজুভঙের কারণও জারি, কিয়ামত পর্যন্ত এমন ব্যক্তির যেমন অজু হবে না, ঠিক তেমনিভাবে একদিকে শুধু তাওবা করেই চলছে, অপরদিকে গুনাহের কাজও চলছে, তাহলে এমন ব্যক্তির তাওবা কিয়ামত পর্যন্তও কবুল হবে্বা না। এ জন্য তাওবা কবুলের চতুর্থ শর্ত হচ্ছে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করা।
একইভাবে কেউ একদিকে গুনাহ করতে থাকল আবার সাথে সাথে তাওবাও করতে থাকল। তাহলে তো হবে না। যেমন, কেউ মদ পান করছে। মদের গ্লাশ হাতে নিয়ে একদিকে মদও খাচ্ছে আবার মুখে বলছে, হে আল্লাহ! আমার মদ খাওয়ার গুনাহ মাফ করে দিন। আমি অন্যায় করছি। এমন হলে সেটাকে তাওবাহ বলা যাবে না। গুনাহ ছেড়ে দিয়ে, মদ খাওয়া বাদ দিয়ে তারপর তাওবাহ করতে হবে।
তাওবার পঞ্চম শর্ত
পঞ্চম শর্ত হলো, আদামুল আওদা বা এরকম দৃঢ় সংকল্প করা যে, আল্লাহ, জীবনে যত গুনাহ করেছি, আর কখনো করব না। কিন্তু যদি মুখে বারবার বলতে থাকেন, হে আল্লাহ, আমি তাওবা করতেছি, আমাকে মাফ করে দাও, আর অন্তরে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার কোনো লক্ষণ থাকে না, এমন হলে চলবে না। কারণ, আল্লাহ বান্দার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে জানেন। তাই আর কখনো গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। এটা তাওবার পঞ্চম শর্ত।
তাওবার ষষ্ঠ শর্ত
ষষ্ঠ নম্বর শর্ত হলো আল্লাহর হক সম্পর্কিত। আর গুনাহ হলো দুই প্রকার, একটা আল্লাহর হক নষ্ট করা, আরেকটা বান্দার হক নষ্ট করা। আল্লাহর হক নষ্ট করা সংক্রান্ত গুনাহের তাওবার নিয়ম হলো, বেশি বেশি ইসতিগফার করা। আল্লাহর হক যদি হয় ইবাদত সংক্রান্ত, তাহলে কাজা করার সুযোগ থাকলে আগে কাজা আদায় করতে হবে। তারপরে তাওবাহ।
যেমন, কেউ নামাজ পড়ল না। নামাজ না পড়ে শুধু তাওবাহ করতে থাকল। তাহলে হবে না। নামাজের কাজা আদায় করতে থাকতে হবে এবং সাথে সাথে সময়মত নামাজ না পড়তে পারার কারণে তাওবাও করতে হবে। কেউ রমজানে রোজা না রেখে তাওবাহ করতে থাকল। হবে না। রোজার কাজা-কাফফারা আদায় করে তারপর তাওবাহ করতে হবে।
তাওবার সপ্তম শর্ত
সাত নম্বর শর্ত হলো, বান্দার হক সম্পর্কিত। অর্থাৎ, আপনি গুনাহ করলেন বান্দার হক নষ্ট করে। তবে বান্দার হকের ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে হবে না; বরং যার হক, তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। যার হক, সে যদি আপনাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আল্লাহও আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।
বান্দার হক বান্দা মাফ না করলে আল্লাহ মাফ করেন না। এখন আপনি কোনো বান্দার হক নষ্ট করলেন। তাহলে আগে তার কাছ থেকে ক্ষমা নিতে হবে। সে যদি জীবিত না থাকে, আর তার হক যদি টাকা-পয়সা সংক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে তার ওয়ারিসানের কাছে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে তারপর তাওবাহ করতে হবে।
এখানে একটি কথা ভালো করে বোঝা দরকার। বান্দার হক মানে শুধুই টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ নয়। অন্য হকও থাকতে পারে। যেমন, আপনি অন্যায়ভাবে কাউকে কষ্ট দিলেন। অথবা কারও উপর জুলুম করলেন। তাহলে এটাও তার হক নষ্ট করা হলো। এ জন্যও তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এখন যদি লোকটি মারা গিয়ে থাকে, তাহলে আপনি কীভাবে তার কাছে মাফ চাইবেন? অথবা তার পাওনা টাকা পরিশোধ করবার মতো তার কোনো ওয়ারিসান নেই। এই অবস্থায় আপনি কী করবেন?
এ ক্ষেত্রে, আপনি তার পাওনা টাকা তার জন্য আল্লাহর রাস্তায় সদকাহ করে আল্লাহর কাছে মাফ চাইবেন। আর হক যদি জুলুম বা কষ্ট দেওয়া সংক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে দোয়া করে, তার জন্য তিলাওয়াত বা অন্যান্য নফল ইবাদত করে তার জন্য ইসালে সওয়াব করবেন। তারপর আল্লাহর কাছে তাওবাহ করবেন। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহপাক আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।
এই হচ্ছে তাওবার ৭১ শর্ত। এখন এসব শর্ত ঠিকমতো পালন করে যদি কেউ তাওবা করে, হাদিস শরিফে রাসুল ইরশাদ করেন, التائب من الذنب كمن لا ذنب له
গুনাহ করে কেউ যদি তাওবা করে, তাকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে নিষ্পাপ বানিয়ে দেন যে, সে যেন কখনো কোনো গুনাহই করেনি। এখন আপনাদের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এত কঠিন শর্তে তাওবা করে আমরা কীভাবে চলব? এমন প্রশ্ন বা ধারণা আপনার অন্তরে তৈরি হলে সেটা শয়তানের ধোঁকা। শর্তগুলো কঠিন মনে হলেও এ গুলো মেনে তাওবা করে চলা যায়।
কীভাবে চলবেন? যেমন, আপনি একটি গুনাহ করলেন। সাথে সাথে তাওবা করে ফেলুন। আবার গুনাহ করলেন, আবার তাওবা করুন। আবারও গুনাহ করে ফেললেন, আবারও তাওবা করুন। এভাবে গুনাহ হয়ে গেলেই সাথে সাথে তাওবা করে নিন।
যেমন আমরা একটা কাপড় তখনই পরিধান করি, যখন সেটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। এরপর যখন ময়লা লাগে, তখন আমরা সেটাকে ধৌত করি। এরপর আবার পরিধান করি। কিন্তু কাপড় ময়লা হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা কাপড় পরিধান করা ছাড়ি না। বরং ময়লা হয়ে গেলে ধুয়ে নিই, আবারও পরিধান করি। আবারও ময়লাযুক্ত হয়, আবারও ধুয়ে পরিষ্কার করে পরিধান করি। কেননা, ময়লাযুক্ত কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে নিলেই সেটা পরিধানের যোগ্য হয়ে যায়। ঠিক তেমনিভাবে যে বান্দা গুনাহ করে, এই বান্দা আল্লাহর সান্নিধ্যের যোগ্য থাকে না; কিন্তু এই বান্দা যখন তাওবা করে, তখন সে আল্লাহর সান্নিধ্যের যোগ্য হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।
📄 তাকওয়া এবং ঈমান বিল গাইব
তাকওয়া এবং ঈমান বিল গাইব একটা আরেকটার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঈমান বিল গাইব ছাড়া তাকওয়া অর্জনের কোনো পথ নেই। ঈমান বিল গাইবের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জিত হয়। তার বাস্তব প্রমাণ রমজানের রোজা। আল্লাহপাক আমাদেরকে রমজান দিয়েছেন। রমজানকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।
রমজান তিনভাগে বিভক্ত কেন
আল্লাহ তাআলা রমজানকে তিনভাগে সাজিয়েছেন। প্রথম ভাগ বা প্রথম ১০ দিন রহমতের। আমরা যেভাবে কাপড় ধোয়ার সময় প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে কাপড়টা নরম করি, ঠিক তেমনিভাবে দীর্ঘ ১১ মাস গুনাহ করার কারণে অন্তরে যে ময়লা জমা হয়েছে, প্রথমে তা পরিষ্কার করতে হবে। এ জন্য আল্লাহ প্রথম ১০ দিন রহমতের অফার দিয়েছেন, যেন তুমি তোমার অন্তরকে কিছুটা নরম করো।
মধ্যদশক বা দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের। এই দশক হলো কাপড় কাচার ন্যায়। কাপড় প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে নরম করা হয়, এরপর সেটা কাচা হয়, যাতে কাপড়ে লেগে থাকা ময়লা ছুটে যায়। ঠিক তেমনিভাবে রমজানের প্রথম দশকে তুমি তোমার অন্তর নরম করেছ। এবার সেই অন্তরকে একটু কাচা দরকার। এ জন্য দেখা যায়, রমজানের প্রথম ১০ দিন মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা অনেক থাকে। এরপর ধীরে ধীরে কমে আসে। কমে আসে কেন? কারণ, কাচা বা কচলানোর কাজ তখন শুরু হয়। ফলে মুসল্লিসংখ্যাও হ্রাস পেতে থাকে। কারণ, শয়তান তখন আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে মানুষকে ধোঁকা দিতে থাকে। কারণ, এখন মাগফিরাতের সময়, ক্ষমা লাভের সুযোগ। সুতরাং এখন যদি তারা এদিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তো তারা ক্ষমা পেয়ে যাবে। শয়তানের বাহিনী তখন ছোট হয়ে আসবে।
এখানে আপনাদের মনে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, এতদিন আমরা শুনে আসলাম রমজান মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাহলে শয়তান বা তার বাহিনি বান্দাকে ধোঁকা দিতে আসে কেমন করে?
জবাব হলো, শয়তান আসা মানে শয়তানি ওয়াসওয়াসা আসা। শয়তান বন্দী থাকলেও ১১ মাস সে যে পরিমাণ মেহনত করে, মানুষের মনে যে পরিমাণ গুনার ভাইরাস ঢুকিয়ে রাখে, সেগুলোই রমজানে কার্যকর হয়। গাড়ির একটি টায়ারকে কিছুক্ষণ চালিয়ে তারপর ছেড়ে দিলে সেটা কি সাথে সাথে থেমে যায়?
আপনারা বলবেন, না। আরো কিছুক্ষণ চলে। আরো কিছু দূর যায়। ঠিক তেমনিভাবে শয়তান আমাদেরকে ১১ মাস কান ধরে ঘুরাতে থাকে। তারপর রমজানে ছেড়ে দিলেও ১১ মাসের স্পিডে এই একমাস আমরা ঘুরতে থাকি।
রমজানের শেষ ১০ দিন নাজাতের জন্য। এ সময় ক্ষমা লাভের নিশ্চয়তাও যেমন বেশি, তেমনি শয়তানের প্রলোভনের মাত্রাও বেশি। ফলে শেষ দশকে মানুষ ইবাদত ছেড়ে মার্কেটে শপিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর ঈদের রাতে তো মাশাআল্লাহ, সারা রাত আমরা মার্কেটগুলো সজীব ও প্রাণবন্ত করে রাখি। অথচ এ সময় আরও বেশি করে ইবাদত করার কথা ছিল। সারা রমজানে আল্লাহ যত মানুষকে ক্ষমা করেন, এই ঈদের রাতে এর চেয়েও বেশি পরিমাণ মানুষকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। সুবহানাল্লাহ। কিন্তু আফসোস, পুরস্কারপ্রাপ্তির এ সময়ে আমরা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে বাজারে বা শপিংমলে কাটিয়ে দিই। এটা শয়তানের চক্রান্ত। এখন শয়তানি চক্রান্তের বাজারে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে।
রমজান কীভাবে কাজে লাগাবেন
এখন আপনারা চিন্তা করে দেখুন, রমজান কীসের জন্য এসেছে? কুরআনে কারিমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তআলা বলেন, لعلكم تتقون অর্থাৎ, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। আয়াতে 'তাত্তাকুন' বা মুত্তাকির সারমর্ম হলো, যাতে তোমরা গুনাহ ছাড়তে পারো।
এবার দেখা যাক, রমজানুল মুবারকে আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কেমন সুন্দর ব্যবস্থা রেখেছেন। আমরা রমজানে দিনের বেলা খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকি, পানি পান করি না, জৈবিক চাহিদা ত্যাগ করি। এই যে ত্যাগ, এটার বিনিময় বা সওয়াব কে দেবেন? ফেরেশতা, না আল্লাহ? স্বয়ং আল্লাহ দেবেন। নামাজ, হজ, জাকাত ইত্যাদি ইবাদতের সাওয়াব ফেরেশতারা দেন অর্থাৎ, তাঁরা সাওয়াব লিখেন, কিন্তু রোজার সাওয়াব তাঁরা লিখেন না। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে, ফেরেশতারা খাবার কাকে বলে, পানি পান কাকে বলে, সহবাস কাকে বলে, এগুলোর জ্ঞান তাঁদের নেই। তাঁরা এসব বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ। আর যাঁরা এসব বোঝে না, তাঁরা এগুলোর প্রতিদান দেবে কীভাবে? এ কারণেই আল্লাহ নিজেই রোজার সাওয়াব দেবেন।
উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি আপনারা সহজে বুঝবেন। কেউ একজন আরবি ভাষায় বক্তব্য দিল। এখন আমরা যারা আরবি বুঝি না, তারা এই আরবি বক্তব্যের মর্ম বুঝতে পারব? না, পারব না। তবে যদি এই আরবি বক্তব্যটা কেউ রেকর্ড করে আরবি বোঝে, এমন কারও কাছে নিয়ে যায় এবং সে তাকে বুঝিয়ে দেয়, তাহলে আরবি বক্তব্যের মর্ম বুঝতে পারবে। ঠিক তেমনিভাবে আমরা কোনো ইশক বা মুহাব্বাতের কারণে খাবার ছাড়লাম, পানি পান ছাড়লাম, সহবাস ছাড়লাম, এটা কে বুঝেন? একমাত্র আল্লাহই বোঝেন। কবি বলেন,
میان عاشق و معشوق رمزیست : کراما کا تہیں را هم خبر نیست অর্থাৎ, আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয় যে, কিরামান কাতিবিন পর্যন্ত যে সম্পর্কের কথা জানেন না। এই কিরামান কাতিবিনরা এই কাজের সাওয়াব লিখতে পারবেন না। এ সম্পর্কের কথা শুধু আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ জন্য আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন তাঁর দয়ার হাতে এই কাজের সাওয়াব দান করবেন। বর্তমানে (রমজানে) আমরা এরকম একটা বিরাট ইবাদতের মধ্যে আছি। আল্লাহ আমাদের রোজাগুলো কবুল করুন, সকলেই বলি, আমিন।
এ জন্য রমজানেই আমরা আল্লাহর কাছে মাফ চাইব। কেননা, রমজানের প্রতিটা মুহূর্তই দুআ কবুলের সময়। আর ক্ষমা চাওয়ার সহজ ব্যবস্থাও আল্লাহ আমাদের জন্য করে রেখেছেন। যেমন, রোজা রাখলেই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। তারাওয়ির নামাজ পড়লে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।
এভাবে আরও সহজ একটা ক্ষমার ব্যবস্থা আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন, সেটা হচ্ছে, কেউ যদি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়ে এবং ১০০ পূরণের জন্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লাহুল মুলকু ওলাহুল হামদু ওহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির' এই তাসবিহ পড়ে, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেন, 'তার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনা পরিমাণও হয়, তবু আল্লাহ তাকে তাঁর দয়ায় ক্ষমা করে দেবেন।' সুবহানাল্লাহ।
রমজান এবং সদকা
এরকমভাবে আল্লাহর ক্ষমার আরেকটি ব্যবস্থা হচ্ছে, সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসুল বলেন,
إن الصدقة تدفع ميتة السوء، وتطفئ غضب الرب
অর্থাৎ, সদকা-খয়রাত ব্যক্তির গুনাহকে এমনভাবে নিভিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।
হাদিসে 'গুনাহ নিভিয়ে দেয়' এটা বলা হলো কেন? তাহলে গুনাহের মধ্যে আগুনের অস্তিত্ব রয়েছে? এর উত্তর হলো, 'গুনাহ নিভিয়ে দেয়' এর মর্ম হলো গুনাহ একটি আগুন। কারণ, গুনাহ হয় মূলত শয়তানের কারণে। তার ওয়াসওয়াসার কারণে। এ জন্য গুনাহের মধ্যে এক ধরণের আগুন রয়েছে। আর শয়তান হলো আগুনের তৈরি। ফলে তার কারণেই যেহেতু গুনাহ হয়, তাই গুনাহকে আগুনের সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে।
হাদিস শরিফে নবিজি আমাদেরকে দুআ শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে এমনভাবে পরিষ্কার করো, যেভাবে পানি দ্বারা ময়লা কাপড় পরিষ্কার করা হয়। ঠান্ডা পানি, বরফ ইত্যাদি জিনিস দ্বারা আমার অন্তর পরিষ্কার করো। কেননা, পানি যত ঠান্ডা হবে, আগুন তত সহজে নিভে যাবে। আর পানি যেভাবে আগুনকে নিভিয়ে দেয়, সেভাবে সদকাও গুনাহকে নিভিয়ে দেয়। সুতরাং রমজানের পবিত্র এই মুহূর্ত, যে মুহূর্তে আল্লাহর ক্ষমার বিশেষ অফার রয়েছে, সেই মুহূর্তে বেশি বেশি সদকাহ করা দরকার। আমাদের মধ্যে যে গুনাহের গরমি রয়েছে, সেই গরমিকে নিভানো দরকার। এই গরমিকে যদি আমি না নিভাই, তাহলে আমি শয়তানের দলভুক্ত হয়ে যাব। আর যদি নিভিয়ে দিই, তাহলে আমি রাহমান আল্লাহর দলভুক্ত হয়ে যাব। এ জন্য রমজানে গুনাহ মাফির বিভিন্ন অফার বা সুযোগ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। এর মধ্যে একটা হচ্ছে, দান-সদকা করা। দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ নিভিয়ে দেন, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। এ জন্য আমরা বেশি করে দান-সদকা করব। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।