📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 হিদায়াতের ব্যাখ্যা

📄 হিদায়াতের ব্যাখ্যা


আল্লাহর শুকরিয়া যে, আল্লাহ তাঁর কালামের পেছনে সময় অতিবাহিত করার সুযোগ আমাদের দিয়েছেন। হে আল্লাহ আপনার সাক্ষাৎ লাভ করার যত ব্যবস্থা রয়েছে, এরকম সব ব্যবস্থা গ্রহণের তাওফিক দিন আমাদের।

হুদাল লিল মুত্তাকিন অর্থাৎ কুরআন হলো মুত্তাকিদের হিদায়ত। আমরা হিদায়ত শব্দের আলোচনা করছিলাম। বলেছিলাম, হিদায়ত শব্দের চারটি অর্থ রয়েছে।

এক. হিদায়তে ফিতরাত। অর্থাৎ স্বভাগতভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের মাধ্যমে মানুষকে হিদায়তের নিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এটা শুধু মানুষকে নয়; বরং জানোয়ারদেরও দিয়েছেন। এটার আলোচনা পেছনে অতিবাহিত হয়েছে।

দুই. হিদায়তে নাজাত। অর্থাৎ, যে দিকনির্দেশনার মাধ্যমে একজন মানুষ সোজা জান্নাতে পৌঁছতে পারে। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ আর আমরা তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমাদের নির্দেশ অনুসারে হিদায়ত করত; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আর তারা আমাদের আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। [সুরা সাজদাহ: ২৪]

তাঁদের দায়িত্ব হলো হিদায়ত করা অর্থাৎ, জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া। এটা হলো হিদায়তে নাজাত। শুধু নাজাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নবি-রাসুলদের; নাজাত দেওয়ার দায়িত্ব নয়। কারণ, হিদায়ত একমাত্র আল্লাহর হাতে। নাজাতের পথ দেখানোর দায়িত্ব হলো নবি-রাসুলদের, জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছানো নয়; সেটা আল্লাহর হাতে। কুরআনে নবিজি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ - হে নবি, আপনি যাকে ইচ্ছা, তাকে হিদায়ত করতে পারবেন না।

অপরদিকে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ হে নবি, অবশ্যই আপনি মানুষকে সোজা পথ দেখান। [সুরা শূরা: ৫২]

উপরিউক্ত দুটি আয়াতে বাহ্যিক একটা বৈপরিত্ব লক্ষ করা যায়। এক আয়াতে বলা হয়েছে, হে নবি, আপনি সোজা পথ দেখানোর জিম্মাদার নন, আবার পরের আয়াতে বলা হয়েছে, অবশ্যই আপনি মানুষকে সোজা পথ দেখান। এই বৈপরীত্বের কারণ কি? আপনি যাকে ইচ্ছা, তাকে হিদায়ত করতে পারবেন না। এর মর্ম হলো, হিদায়ত গ্রহণ করানো বা হিদায়ত করিয়ে মানজিলে মাকসাদে অর্থাৎ জান্নাতে পৌঁছানোর দায়িত্ব আপনার নয়। এটা একমাত্র আল্লাহর হাতে।

আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে, وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ - অর্থাৎ আল্লাহ যাকে চান, তাকেই হিদায়ত দেন। [সুরা কাসাস : ৫৬]

এখন হিদায়ত যদি আল্লাহর হাতে না থাকত, তাহলে কালো সাহাবি হজরত বিলাল রাজিআল্লাহু আনহু হিদায়ত পেতেন না। বিলাল, যাঁর কুশ্রী চেহারার কারণে মানুষ তাকে কালো কাক বলে উপহাস করত আর বলত, মুহাম্মাদ এই কালো গোলামকে মুআজ্জিন বানিয়েছেন, আর কাউকে পাননি। নাউজুবিল্লাহ।

সেই বিলাল, কালো বিলালের বাহ্যিক চেহারা কালো হলেও তাঁর ভেতর বা অন্তর ছিল সাদা। যে কারণে তাঁর মর্যাদা এতই উঁচুতে পৌঁছেছিল যে, নবিজি বলেন, মেরাজ রজনীতে জান্নাতে আমি আমার বিলালের জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটার শব্দ শুনে এসেছি! সুবহানাল্লাহিল আজিম।

অন্তর সাদা হলে ফিতনা থেকে বাঁচা যায়। গতকাল এ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আপনাদের কি স্মরণ আছে? বলেছিলাম, ফিতনার অবস্থান বাজারে বা মার্কেটে নয়, বরং এর জায়গা হচ্ছে অন্তর। এ জন্য অন্তরের ফিতনা দূর করতে পারলে সফলতা পদচুম্বন করবে।

হিদায়তের মূল কথা

সুরা বাকারার শুরুতে আল্লাহ তাআলা ছয়টি পয়েন্টের আলোচনা করেছেন। প্রথমত, ঈমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের উপর ঈমান আনা। দ্বিতীয়ত, নামাজ কায়েম করা। তৃতীয়ত, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা। চতুর্থত, পূর্ববর্তী সকল নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনা। পঞ্চমত, রাসুল -এর উপর যা কিছু নাজিল হয়েছে, সবকিছুর উপর ঈমান আনা। ষষ্ঠত, আখিরাতের উপর ঈমান আনা। এই ছয়টা গুণ যারাই অর্জন করতে পারবে, তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ এরাই হলো সফলকাম।

এ ছাড়া নবিজি তাঁর হাদিসে বিষয়টিকে সংক্ষেপে এভাবে বর্ণনা করেছেন,

يا أيها الناس قولوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ تُفلحوا
হে লোকসকল! বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, সফল হয়ে যাবে।

আমাদের জানা দরকার। কুরআন বোঝা দরকার। তাহলেই সফলতা লাভ হবে। জীবন সার্থক হবে। অন্তরের কালো দূর করে সাদা-স্বচ্ছ করা যাবে। এক হাদিসে নবিজি বলেন, যত বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির করা হবে, তার অন্তরের ময়লা তত বেশি দূর হবে। হাদিসে আছে,

جددوا إيمانكم قيل: يا رسول الله وكيف نجدد إيماننا؟ قال: أكثروا من قول: لا إله إلا الله

তোমরা তোমাদের ঈমানকে পুনরায় সতেজ করো। বলা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কীভাবে আমাদের ঈমানকে পুনরায় সতেজ করব? তিনি বললেন, তোমরা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বেশি বেশি পাঠ করো।

ফিতনা যখন সৃষ্টি হয়, তখন কলবে কি শুধু একটা দাগই বসে? না, যত ফিতনা সৃষ্টি হয়, তত দাগ পড়ে। অর্থাৎ কোথাও কোনো গুনাহের আলোচনার কথা শুনলে তা অন্তরে গেঁথে নেয়। এভাবে কানে শোনে, চোখে দেখে যত গুনাহ করবে, অন্তরে তা কালো দাগ হিশেবে বসে যাবে। যে পরিমাণ গুনাহ করবে সে পরিমাণ ময়লার কালো দাগ পড়বে। আর এই কালো কেমন হবে, সেটা গতকালের আলোচনায় বলেছি। এই দাগ কয়লার চেয়ে কালো হবে। আল্লাহ হলেন দয়ালু, ফলে কয়লা ধুইলে ময়লা না গেলেও অন্তরের কালো পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রেখেছেন আল্লাহ। কিন্তু চাইলে অন্তর এমন পরিষ্কার করা যায় যে, কালো অন্তর একদম স্বচ্ছ হয়ে যাবে। তাই কেউ যদি গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করে রাখে, তখন তার অন্তর ফিতনা থেকে মুক্ত থাকে। ফলে তার অন্তর সাদা মর্মর পাথরের চেয়েও স্বচ্ছ হয়ে যায়।

এভাবে কেউ যখন গুনাহের কাজ থেকে নিজের অন্তরকে হেফাজত করতে পারে, তখন তার অন্তর এতই আলোকিত হয় যে, তখন আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তার অন্তরে থাকেন না। তখন সে জমিনে বাস করলেও তার অন্তর থাকে আরশে। জনৈক ওলি বলেন,

خيالك في عيني وذكرت في فمي : ومثواك في قلبي فأين تغيب

তোমার কুদরতি চিত্র আমার চোখে, তোমার জিকির আমার মুখে, তোমার অবস্থান আমার বুকে, তাহলে কোথায় গায়েব হবে তুমি?

একজন মানুষের যখন এমন অবস্থা হয়ে যায়, তখন তার অন্তরে শুধু আল্লাহ থাকেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো, অন্য কিছুর স্থান থাকে না। এটাই হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর হাকিকত। আপনি শুধু আগুন উচ্চারণ করলেই আপনার ঠোঁট জ্বলবে না; কিন্তু আসল আগুনে শুধু ঠোঁটই জ্বলবে না; বরং আপনার কাপড় জ্বলবে, ঘরও জ্বলবে। আগুন শব্দ আর সত্যিকার আগুন এক নয়। ফলে বাস্তবের আগুন মুখে উচ্চারণ না করলেও তার প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে বাহ্যিকভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর উচ্চারণ এবং এর অ্যাকশন ভিন্ন।

এখন যদি কারও মধ্যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অ্যাকশন তৈরি হয়ে যায়, তখন তার জীবন এমন সফল হবে যে, সে জমিনে অবস্থান করবে আর তার পায়ের আওয়াজ শোনা যাবে জান্নাতে। হজরত বিলালের কথা নিশ্চই আপনাদের মনে আছে। কুচকুচে কালো একজন হাবশি গোলাম ছিলেন বিলাল। তিনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মাধ্যমে হিদায়ত লাভ করলেন। অপরদিকে আবু জাহল ছিল কুরাইশ বংশের, কিন্তু তার ভাগ্যে হিদায়ত জুটেনি। হিদায়তের মাধ্যমে অন্তর সাদা করার কারণে বিলালের মর্যাদা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল? রাসুল বলেন, আমি যখন মিরাজে যাই, তখন আমার সমানে জুতার আওয়াজ শুনতে পাই। আমি জিবরিলকে জিজ্ঞেস করি, হে জিবরিল, জান্নাতে আবার জুতার আওয়াজ কীসের? জিবরিল জবাব দেন, হে আল্লাহর নবি, এটা আপনার বিলালের জুতার আওয়াজ। সুবহানাল্লাহ। এটাই হচ্ছে হিদায়তে নাজাত।

হিদায়তে তাওফিক

হিদায়তের তৃতীয় প্রকার হলো হিদায়তে তাওফিক বা হিদায়তে ইআনাত। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য। এই যেমন আমরা মসজিদে এসে তাফসিরের আলোচনা শুনতেছি, এটা আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহর তাওফিক না থাকলে আমরা এখানে আসতে পারতাম না। আমাদের অনেক মুসলমান ভাই অযথা ঘুরাঘুরি করছে। তারা কুরআনের এই মাহফিলে এসে শরিক হতে পারেনি। আল্লাহপাক তাদেরকে এই তাওফিক দেননি। এর অর্থ, আল্লাহপাক তাদেরকে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে হাজির হওয়ার হিদায়ত তথা হিদায়তে ইআনাত দান করেননি।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হলো একটা দর্শনের নাম। যেমন কমিউনিজম একটা দর্শন এবং তার মূল লক্ষ্য হলো সবকিছুর মালিক হলো রাষ্ট্র, জনগণ শুধু শ্রমিক। ঠিক তেমনি আরেকটা দর্শন হলো গণতন্ত্র, যার মূলনীতি হলো সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, যেদিকে জনগণ বেশি, সেদিকটাই প্রাধান্য পায়। আর এটাই গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে সংখ্যালগিষ্টের কোনো মূল্য নেই, যদিও তারা ভালো হয়।

কমিউনিজম ও গণতন্ত্রের মতো এরকম ইসলামবিরোধী মতাদর্শের বাজারে আগুন জ্বালিয়ে দিতে মৌলিক একটা দর্শন নিয়ে এই পৃথিবীতে আগমন করেন শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ ﷺ। লা ইলাহা...হলো তাঁর আনীত এই দর্শনের মূলনীতি। আর এই মতবাদের মূলকথা হলো, ক্ষমতার উৎস জনগণও নয়, রাষ্ট্রও নয়; বরং সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ বলেন,

لَهُ مَا فِي السَّمَوتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى যা আছে আসমানসমূহ, জমিন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং যা আছে মাটির নিচে, সবই আল্লাহর। [সুরা তা-হা: ৬]

আসমান-জমিনে যা কিছু আছে, এবং মহাশূন্যে যা কিছু আছে, এবং তার গভীর তলদেশে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিক হলেন আল্লাহ তাআলা-এ কথা বিশ্বাস করতে হবে। এ জন্য ইসলামি দর্শনের মর্মকথা হলো, সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর বান্দার কাছে তার জান, মাল সবকিছু আমানত। এসবের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা।

این امانت چند روز دست است در حقیقت مالک اصلی خداست এ সমস্ত জিনিস কয়েক দিনের জন্য আমার কাছে আমানতমাত্র। মূলত সমস্ত জিনিসের সত্যিকার মালিক হলেন আল্লাহ।

এ জন্য কেউ যদি আত্মহত্যা করে, তাহলে সেটা কবিরা গুনাহ। কারণ, প্রাণের মালিক আল্লাহ। আপনাকে এই ক্ষমতা বা অধিকার দেওয়া হয়নি যে, আপনি নিজেই নিজের প্রাণ হরণ করবেন। এখন কেউ যদি বলে, প্রাণ তো আমারই, এখন আমি আত্মহত্যা করলে কী হলো? আল্লাহ বলেন, তোমার প্রাণের মালিক তুমি নও; বরং আল্লাহই এর প্রকৃত মালিক। আর তিনি তোমার কাছে এটা আমানত রেখেছেন। এ জন্য আত্মহত্যা করা হারাম। কেউ যদি আত্মহত্যা করে, জাহান্নাম ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর নেই। সুতরাং, আমাদের কাছে আল্লাহ প্রাণ আমানত রেখেছেন, সম্পদ আমানত রেখেছেন, সময় আমানত রেখেছেন, সন্তান আমানত রেখেছেন। এসবের কদর করতে হবে। এসব কিছুর মালিক হলেন আল্লাহ। এগুলোর মালিক যে আল্লাহ, এটা বিশ্বাস করার নাম হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দর্শন বা ইসলামি দর্শন।

এখন কথা হলো, সবকিছুর মালিক যখন আল্লাহ, তাহলে আমার জান মনগড়া চলবে, নাকি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী চলবে? আমার সময়, সম্পদ ও সন্তানাদি আমার ইচ্ছামতো চলবে, নাকি আল্লাহর হুকুমে চলবে? যুক্তি কী বলে?

আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর সৃষ্টি হিশেবে আমাদেরকে তাঁর বিধানমতো চলতে হবে, সবকিছু চালাতে হবে। মনগড়া চললে হবে না। এটা আল্লাহর নাফরমানি। সবকিছু আল্লাহর হুকুমমতো চালাতে হবে এবং এটাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করাই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহকে বিশ্বাস করা।

আমি শুধু লা ইলাহার জিকির করলাম কিন্তু নিজের জীবন পরিচালনায় আল্লাহকে মানলাম না, এটা তো হতে পারে না। আমি আমার জীবনের প্রতিটি কদম কীভাবে ফেলব—উচিত ছিল মালিককে জিজ্ঞেস করা। মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী চলা। কিন্তু আমরা চলি নিজের মর্জি-মাফিক! এটা তো হতে পারে না।

আমরা যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জব করি, অথবা কোনো দোকানে কাজ করি, দোকানের মালিক আমাদেরকে আওয়ার হিসাবে পে করেন। প্রতিদিন যত ঘণ্টা কাজ, তত ঘণ্টার পেমেন্ট। পারিশ্রমিক পাওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হয়, কিন্তু এই কাজও আবার নিজের খেয়াল-খুশি মতো করলে হয় না। মালিকের গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ করতে হয়। মালিক যেভাবে বলবে, তার কাজ সেভাবেই করতে হবে। এটাই নিয়ম। এটা আমরা সবাই বুঝি। খুব সহজেই বুঝে ফেলি।

এবার লক্ষ্য করুন। নিরপেক্ষভাবে আত্মবিচার করুন। মালিক আমাদের সৃষ্টি করেনি। সে আমাদের লালন-পালন করেনি। আট ঘণ্টা কাজ দিয়েছে। এই কাজের বিনিময়ে সামান্য পারিশ্রমিক দিচ্ছে। এ জন্য আমরা তার কথা মেনে চলি, অথচ যে আল্লাহ আমাদের নাই থেকে সৃষ্টি করলেন, জীবন দিলেন, লালন-পালন করলেন, সবকিছু দিলেন, তাঁর দেওয়া জীবন যদি তাঁর কথামত না চালিয়ে নিজের ইচ্ছামত চালাই, তাহলে এটা কতবড় নিমকহারামী?

মালিকের দোকানে কাজ করতে যেয়ে আমরা যদি মালিকের কথা না মানি, তাহলে মালিক আমাদেরকে আর কাজে রাখবে না। গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। সুতরাং আল্লাহর দেওয়া জীবন, আল্লাহর দেওয়া সময় যদি আল্লাহর কথায় ব্যয় না করি, উচিত তো ছিল আমাদেরকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া।

কিন্তু আল্লাপাক সেটা করেন না। আল্লাহ জানেন তিনি বের করে দিলে যাওয়ার আর জায়গাই থাকে না। কুরআন বলছে,

يُمَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَوَاتِ وَ الْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَنٍ

হে মানব এবং জিন জাতি! তোমাদের ক্ষমতা থাকলে আমার জমিন আসমানের বাইরে চলে যাও। বেরিয়ে যাও। আমার সালতানাতের বাইরে যেতে তো পারবে না। তাহলে তোমরা আমার কোন কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে? [সুরা আর রাহমান: ৩৩]

আমি যদি জীবনের প্রতিটি বাঁকে আল্লাহকে না মানি, তাহলে তো আমি লা ইলাহার দর্শনে বিশ্বাসী থাকলাম না। ফলে বান্দা হিশেবে আমি সফলও হব না। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা সব তন্ত্রমন্ত্র ছেড়ে দাও আর قولوا لا إله إِلَّا اللهُ تُفْلِحُوا বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাহলে দুনিয়া-আখিরাতে তোমরা সফল হতে পারবে, অন্যথায় নয়।

আমাদের অন্তরের মধ্যে অসংখ্য ফিতনা রয়েছে। এসব থেকে অন্তর মুক্ত করতে হবে। আর ফিতনার সূচনা হয় জ্ঞানের (!) মাধ্যমে। এবার আমরা ফিতনা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব। যেহেতু আমরা ফিতনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি, তাই প্রথমে আমাদের জানতে হবে, ফিতনা বলতে কী বোঝায়? এর পরিণতি কী?

আমাদের সমাজটা এমন যে, মানুষ এখন সবকিছুতেই উল্টো বুঝে। বস্তুত জ্ঞান বলতে মানুষ যে জিনিস বোঝে থাকে, সেটা আসলে জ্ঞানই নয়; বরং সেটা দুনিয়ায় বিচরণের একটা মাধ্যম মাত্র। আর এটাই হলো ফিতনার প্রথম ধাপ। রাসুল বলেন, আল ইলমু সালাসাতুন অর্থাৎ, ইলম বা জ্ঞান তিনটি।

১. কুরআনের জ্ঞান।
২. সুন্নাহর জ্ঞান। ৩. ইলমে ফারায়েজের জ্ঞান।

এই তিনটি ইলম বা জ্ঞান হলো সত্যিকার ইলম। এবার বুঝে নিন, বর্তমানে কুরআন- সুন্নাহর ইলমের দাম ও মান কতটুকু? এখন তো এসব ইলমের কোনো মূল্য নেই। জাগতিক জ্ঞানই মূল্যবান। অথচ এটা দুনিয়ার ইলম। এটা দুনিয়ায় চলার মাধ্যম। আসল ইলম হলো তা, যে ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া-আখিরাতে সফলতা পাওয়া যায়। প্রকৃত মালিক আল্লাহকে চিনা যায়। আর যে জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহকে চেনা যায় না, শুধু পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধি ও যশখ্যাতি কুড়ানো যায়, সেটা আদৌ কোনো জ্ঞানই নয়। আফসোস, আজ আমরা এই পার্থিব জ্ঞানের পেছনেই সময় ব্যয় করছি, সব মনোযোগ নিবদ্ধ করে রেখেছি। আর প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। আমরা স্বীকার করি, পার্থিব জ্ঞানেরও দরকার রয়েছে, তবে সেটা পরকালীন বা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন বিসর্জন দিয়ে নয়।

এখন যদি এমন জ্ঞান অর্জন করে এবং এর পেছনেই জীবনের সব মনোযোগ নিবন্ধ করে দেয়, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের কোনো ধার ধারে না, তাহলে সে হাইব্রিড জ্ঞানী। আল্লাহর কাছে এমন জ্ঞানীর কোনো মূল্য নেই। এবার কেউ যদি এভাবে পার্থিব জ্ঞান অর্জন করতে করতে আল্লাহকেই অস্বীকার করে বসে, তার মেধা-মনন আল্লাহর নির্দেশবিরোধী হয়, তাহলে সে জ্ঞানী নাকি পাপী? অবশ্যই জ্ঞানপাপী।

এমন দুনিয়ামুখি জ্ঞান অর্জনের পেছনেই বর্তমানে পুরো দুনিয়া। এর ফলে প্রথম যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটা হলো ইসলামি সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সভ্যতা-সংস্কৃতিতে প্রভাব রয়েছে। সমাজের সর্বত্র এটার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে। কালচার বা সংস্কৃতির প্রভাব ভালো হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। ভালোর একটা উদাহরণ হচ্ছে, যেমন কেউ যদি এই আল আমান মসজিদের পাশে জমি ক্রয় করতে চায়, তাহলে জিজ্ঞেস করবে, 'এই জমির আশেপাশে কোনো মসজিদ আছে কি না?' যদি বলা হয়, আছে, তাহলে সে বলবে, আমি ২০ হাজার ডলার বেশি দিয়ে হলেও এই জমি ক্রয় করতে চাই। এটাই হচ্ছে ইসলামি কালচার বা সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত। এর প্রভাব সমাজের সর্বত্র পড়ে থাকে。

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

বর্তমানে কালচার বা সংস্কৃতির নামে যা চলে, তার সঙ্গে ইসলামের কোনো নামগন্ধও নেই। আর এই সংস্কৃতির পরিবর্তনই মূলত ফিতনার সূচনা ঘটায়। এটাকে ফিতনার ফাউন্ডেশন বলা চলে। যে জ্ঞান দ্বারা মানুষ বুঝবে যে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, এমন চর্চা বর্তমানে কম। আর এমন জ্ঞানের চর্চা না থাকায় সভ্যতা একেবারে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে আমাদের বাচ্চাদের উপর।

আগের যুগের লোকেরা তো পুঁথি পাঠ করেই কেঁদে ফেলত, কারণ এর প্রভাব ছিল। এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। এটা সংস্কৃতির প্রভাব। আবার এমনও ছিল যে, প্রতিদিন ফজরের পর মহল্লার ঘরে ঘরে সুরা ইয়াসিনের তিলাওয়াতের সুরগুঞ্জন শোনা যেত। এখন আর তেমন কুরআনচর্চার পরিবেশ দেখতে পাওয়া যায় না। এক হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,

زينوا بيوتكم بالقرآن أو بالصلاة তোমাদের ঘরকে তিলাওয়াত ও নামাজ দ্বারা সুন্দর করো।

এই হাদিসের মর্ম কি শুধু কুরআন ঘরে লটকিয়ে রাখা? বরং এর মর্ম হচ্ছে, তোমরা ঘরে কুরআন তিলাওয়াত করো, নামাজে অথবা নামাজের বাইরে। এর মাধ্যমে কুরআনের ব্যাপক চর্চা হবে। আর এটা হচ্ছে ইসলামি কালচার বা সংস্কৃতি।

আগে মানুষ খড়ম পরিধান করত। দেখা যেত, খড়ম পায়ে দিয়ে মানুষ মুরব্বিদের সামনে যেত না। এখন তো ইয়াং ছেলেমেয়েরা মোবাইলে উচ্চ আওয়াজে গান ছেড়ে রাস্তায় চলাফেরা করে। এমনকি মুরব্বিদের সম্মানের প্রতি কোনো খেয়াল তো দূরের কথা, উল্টো অনেক সময় বেআদবিও করে। ধাক্কা মারে। তাচ্ছিল্যের সুরে এরকমও বলে যে, তোমরা মুরব্বি মানুষ, ঘরেই থাকবে, রাস্তাঘাটে কেন বেরিয়েছ? এটা হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাব।

এখন তো ছোটদেরই আগে সালাম দেওয়া লাগে। ছোটরা বড়দের চেয়ে বেশি বোঝে। তারা হচ্ছে ইয়াং জেনারেশন! কেন এমন হয়? কারণ, কালচার বা সংস্কৃতি বদলে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম এমন কালচার বা সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তাতে শুধু ময়লা আর ময়লা।

আগের যুগের বা আমাদের মুরব্বিদের কালচার ছিল ভিন্ন, স্বচ্ছ, ধবধবে মর্মর পাথরের মতো। ফলে সে সময়ের অবস্থা আর এখনকার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন রাস্তাঘাট কাঁচা থাকলেও মানুষের মন ছিল পাকা, পরিষ্কার। ছিল না এখনকার মতো এত অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর নোংরামি। এখন সংস্কৃতির পরিবর্তনের ফলে আমাদের সামাজিক রীতিনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানের বিয়েশাদির অবস্থা লক্ষ করুন। কী থেকে কী পরিবর্তন এসেছে বিয়েশাদির ক্ষেত্রে। বর্তমানে তো পাঞ্জাবি, টুপি, পাগড়ি পরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার মতো পরিবেশই আর নাই। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা সব গ্রাস করে ফেলেছে।

প্রজন্মের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবুন

বিষয়টি আপনারা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। আপনারা মসজিদ-মাদরাসা বানাচ্ছেন। এতেই কি আপনার দায়িত্ব শেষ? না; বরং তারা যে কালচার বদলে ফেলতেছে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কী আশা করা যেতে পারে? এখন তো বিশ্বময় নোংরা সংস্কৃতির সয়লাব। তাই আমাদের ভাবতে হবে, সচেতন হতে হবে, উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। নাহয় পরবর্তী প্রজন্ম থেকে ভালো কিছুর আশা করা যাবে না।

বিয়ের মাধ্যমে যুগলজীবন শুরু হয় এবং মানুষের বংশধারা বহমান থাকে। সেই বিয়ে থেকে আমরা আশা করতাম সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রাহ., মহাবীর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা., ইমাম বুখারি রাহ. ইমাম আবু হানিফা রাহ.-এর মতো জগদ্‌খ্যাত মনীষা জন্ম নেবে, শায়খে কৌড়িয়া, শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী, আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী, শায়খে চকরিয়া ও শায়খে গহরপুরী-এর মতো আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ জন্ম নেবেন, এমন আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। কারণ, যে বিয়ের শুরুই হয় গুনাহের কাজের মাধ্যমে, সে বিয়ে থেকে নেকির আশা করা যায় না। এটা এমন এক ফিতনা, যা আমরা নিজেরাই অর্জন করেছি। আর আপনারা ফিতনা খুঁজে পান না; অথচ আমরা নিজেরাই ফিতনার কারণ।

যে বিয়ের শুরু হয় গুনাহ দ্বারা, এই বিয়ে থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান কখনো মা-বাবার অনুগত হয় না। বরং অবাধ্যই হবে। আর আল্লাহর বিধান হলো, এমন সন্তান দ্বারা মা- বাবাকে শাসানো হবে। কৈ মাছের তেল দিয়ে যেমন কৈ ভাজি করা হয়, তেমনি তোমার সন্তান দিয়েই توমাকেও শাসানো হবে। ফলে যে বিয়েতে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি থাকে, সে বিয়ে থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান মা-বাবার অবাধ্য হয়। কেননা, মূলেই যে সমস্যা। বর্তমানে এমনও দেখা যায় যে, হিন্দু-মুসলিম-উভয় ধর্মের বিয়েতে একই রীতি অনুসরণ করা হয়। কেন এমনটা করা হয়। এরকম করার কি শরয়ি কোনো অনুমোদন রয়েছে? এ জন্য এসব রীতি-রেওয়াজ বা অনুষ্ঠান পালনে আমাদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।

আপনারা তো দ্বীনদার, তাবলিগওয়ালা, তাফসির শ্রবণকারী। এই আপনাদেরই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোন অবস্থা হবে? আমরা কী নিয়ে কবরে যাব?

بر زبان تسبیح و در دل گاو و خر : این چنین تسبیح را کی دارد اثر

জবানে আল্লাহর তসবিহ, আর অন্তরে দুনিয়া! এমন তসবির কোনো আসর নাই। এর কোনো প্রভাব নাই।

এখন কেউ যদি এসব বিষয় নিয়ে ভাবে, অন্তরে এসব বিষয়ে দরদ তৈরি হয়, তাহলে সেটাই হলো কালিমা বা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর আগুন। যে আগুন সব গুনাহ মুছে দেবে। তবে শুধু মুখেই যদি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ করে আর মনে মনে ভাবে, একটা ছেলে বা নাতির বিয়েতে এক-আধটু রংতামাশা হবে, ঢোল-তবলা বাজবে, এ আর এমন কি! এটা সামান্য একটু বিনোদন মাত্র। এতে তো ইসলাম চলে যাবে না। শুধু মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে একা একা বিয়ে পড়ালে তো আমার প্রেস্টিজ বলে আর কিছু থাকবে না। তখন সমাজ কী বলবে, আর আমি কোন মুখে সমাজে বিচরণ করব? এই যদি আপনার ভাবনা, কামনা আর চাওয়া, তাহলে আপনার জন্য আফসোস, শত আফসোস।

আপনি সামাজিক প্রেস্টিজ রক্ষা করতে গিয়ে নিজে গুনাহে লিপ্ত হচ্ছেন, সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি নষ্ট করছেন। আর মুআমালাত বা লেনদেনের কথা নাই বা বললাম। অনর্থক বিপুল অর্থ খরচ করা হয় এসব অনুষ্ঠানে। সহজ এবং গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় পালন করতে গিয়ে মানুষ অনেক বাড়াবাড়ির আশ্রয় নিয়ে ফেলে। ফলে বিষয় টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সরিষার তেলেই যেন ভূত চেপেছে। যে তেল দিয়ে ভূত তাড়ানোর কথা ছিল। এ জন্য প্রেস্টিজ সামাজিকতা রক্ষার নামে আমরা এমন অনেক কাজ করি, যা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। বরং উল্টো গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ি। এর মাধ্যমে মানুষের ইসলামি জ্ঞান, লেনদেন, মুআমালাত, মুআশারাত, ইসলামি কৃষ্টিকালচার নষ্ট হচ্ছে। আমাদের এসব গর্হিত কাজ দেখে দেখে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও এসব শিখছে। ফলে সমাজটা ক্রমেই অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

আপনি বিয়ে করবেন অথবা আপনার সন্তানকে বিয়ে করাবেন। তো আল্লাহ যেভাবে বলেছেন, নবিজি কীভাবে বলেছেন এবং করেছেন, সেটা দেখতে হবে। আমাদেরও সেভাবে করতে হবে। এভাবে সব বিষয়ে আল্লাহ তাঁর রাসুলের আদেশ-নিষেধ সমর্থন করা, পালন করা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর হাকিকত। এই হাকিকত নিয়ে যদি কেউ মারা যায়, তাহলে সোজা জান্নাতে চলে যাবে। হে আল্লাহ, লা ইলাহার শিক্ষাকে আমাদের জীবন, সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করে সুন্দর জীবন, সুন্দর সমাজ, আদর্শ রাষ্ট্র আমাদের না দেখিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 হিদায়াতের গাইডলাইন

📄 হিদায়াতের গাইডলাইন


সমস্ত প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাদেরকে দ্বীনের কথা বলা এবং শোনার জন্য একত্রিত করেছেন। সবাই দিল থেকে বলি, আলহামদুলিল্লাহ।

কুরআন হলো হিদায়তের কিতাব। হিদায়ত শব্দের অর্থ হলো সঠিক রাস্তা দেখানো। এ জন্য আল্লাহ তাআলা মানুষকে সঠিক রাস্তা দেখানোর জন্য কুরআন নাজিল করেছেন। আর একমাত্র সঠিক রাস্তা হলো জান্নাতের রাস্তা, আল্লাহর সন্তুষ্টির রাস্তা।

কুরআন মাজিদ হিদায়তের কিতাব, এটা মনে রাখলেই অনেক সংশয়, অনেক সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। নতুবা শয়তান বিভিন্ন সন্দেহ অন্তরে ঢুকিয়ে দেবে। যেমন কুরআনের প্রথম সুরা হলো সুরা বাকারা। এটা সবচেয়ে বড় সুরা। আয়াত সংখ্যা ২৮৬, রুকু সংখ্যা ৪০টি। বাকারার শাব্দিক অর্থ গরু বা গাভী। এই যে সুরার নাম বাকারা রাখলেন, এটাতেও হিদায়ত রয়েছে, যা বাকারার কাহিনি থেকে পাওয়া যায়।

কুরআন হিদায়তের কিতাব। সুতরাং তাতে হিদায়তেরই আলোচনা করা হবে। যেখানে যে কথা বলার প্রয়োজন, সেখানে সে কথাই বলা হবে। আর যিনি এই হিদায়তের কথা শুনাবেন, তাকে আল্লাহর কাছে চেয়ে আসতে হবে- 'আল্লাহ, তুমি তাওফিক না দিলে আমার তো কোনো সামর্থ্য নেই যে, মানুষকে হিদায়ত করব। সুতরাং প্রথমে আমাকে হিদায়ত করেন। এরপর আমার মুখ দিয়ে এমন কথা বের করে দিন, যে কথায় মানুষেরও হিদায়ত হয়।'

হিদায়তের নিয়তে যারা মজলিসে বসে আলোচনা শুনে, আল্লাহ তাদেরও হিদায়ত দান করেন। কুরআন হলো হিদায়ত। এই হিদায়ত আমরা কীভাবে লাভ করব, এর আলোচনা চলছে।

আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি হিদায়তের চারটি অর্থ রয়েছে, যথা :
১. স্বভাবগত হিদায়ত। আল্লাহ সবাইকে এই হিদায়ত দিয়েছেন।
২. হিদায়তে নাজাত। কীভাবে চললে আমি নাজাত পাব, এই হিদায়ত।
৩. হিদায়তে তাওফিক। আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন তাওফিক দেওয়া হয়, তখন বান্দা হিদায়ত পায়। এমনিতেই কেউ হিদায়তপ্রাপ্ত হয় না। বৃষ্টির পানি যেভাবে কচুপাতা ভেজাতে পারে না, ঠিক একইভাবে হিদায়তের কথা হবে। বৃষ্টির মতো হিদায়ত বর্ষিত হবে কিন্তু সবাই ভিজতে পারবে না। তবে আল্লাহ যাকে হিদায়তের তাওফিক দেবেন সে-ই হিদায়ত পাবে। এটা হলো হিদায়তে তাওফিক। এবার চতুর্থ প্রকারের হিদায়তের কথা জানব।

হিদায়তে জান্নাত

হিদায়তে জান্নাতের অপর নাম হিদায়তে মাকসুদ। হিদায়তে জান্নাত হলো সেই হিদায়ত, যে হিদায়তের মাধ্যমে বান্দা জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿سَيَهْدِيْهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ ﴾

অচিরেই তিনি তাদেরকে হিদায়ত দেবেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন। [সুরা মুহাম্মাদ: ৫]

অর্থাৎ, আমি তাদেরকে হিদায়ত করব, আমি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করব আর আমি আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাব। এটা হলো হিদায়তে জান্নাত। সুতরাং বুঝা গেল এই কুরআন হিদায়তের কিতাব। যার মাধ্যমে আমরা জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে যাব। হিদায়তের কোনো শেষ নেই। এ জন্য নামাজে প্রত্যেক রাকআতে পড়তে হয়,

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ

হে আল্লাহ! আমাদেরকে সিরাতে মুসতাকিমের পথে পরিচালিত করুন। সিরাতে মুসতাকিম হলো জান্নাতের পথ। মানুষের মৃত্যুর আগে ঈমান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ জন্য হিদায়ত শুধু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নয়; জান্নাত পর্যন্ত। জান্নাত পর্যন্ত হিদায়ত পাওয়ার জন্য আমরা নামাজে পড়ি - اِهْدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ। হে আল্লাহ! আমাদেরকে সহজ-সরল পথ দেখান। এখন সঠিক পথে আছি আগামীতে হয়তো গুমরাহ হয়ে যেতে পারি। এ জন্য এই দুআ সবসময় করতে হয়, যাতে আল্লাহ মৃত্যুর পরও হিদায়ত দেন; জান্নাতের পথ দেখান।

আর আল্লাহপ্রদত্ত হিদায়ত পেয়ে যখন জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা বলবে,

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدينَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَ لَوْلَا أَنْ هَدينَا اللَّهُ

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে এ পথ দেখিয়েছেন। আমরা কিছুতেই পথ পেতাম না যদি না আল্লাহ আমাদের পথ দেখাতেন। [সুরা [আরাফ: ৪৩

আল্লাহ আপনি আমাকে এই জান্নাত পর্যন্ত হিদায়ত করলেন, এর জন্য আপনার প্রশংসা। আপনি যদি হিদায়ত না দিতেন, তাহলে আমার মতো মানুষের জান্নাত লাভ করা সম্ভব হতো না। এটাই হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর প্রকৃত মর্ম। এই মর্ম দ্বারা বোঝা যায়, আমরা কোনো কিছুর মালিক নই। সবই আল্লাহর আমানত।

মানুষ কীসের নাম

মানুষ হলো দুই জিনিসের নাম— একটা বডি, আরেকটা রুহ। এ দুটোই আল্লাহর দেওয়া আমানত। তেমনি আকল, কলব, নফস এবং সদর— এগুলোও আল্লাহ দিয়েছেন। সবই আমানত। কলবের অনেকগুলো নাম রয়েছে। তার অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন নাম হয়। এই আমানতের খেয়ানত করলে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। আর এই আমানতগুলো হুবহু ফিরিয়ে দেওয়ার নামই হলো তাকওয়া। যেভাবে আল্লাহ দিয়েছেন, সেভাবেই ফিরিয়ে দিতে হবে। মানুষের বডি বা শরীরও আল্লাহ তাআলা বানিয়েছেন। কিন্তু বডি বানানোর সাথে সাথেই এটি সম্মানের যোগ্য হয়নি; বরং এটাকে আরও অসম্মানিত করা হয়েছে।

এক হাদিসের মর্মে বোঝা যায়, এই বডি বানিয়ে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের কোণায় ৪০ বছর ফেলে রেখেছিলেন। আদম আলাইহিস সালামের বডি জান্নাতের কোণায় দীর্ঘ ৪০ বছর রাখা ছিল। শয়তান একদিন আদমের বডি দেখে তার ভেতরে ঘুরাঘুরি করল। ভাবল, এই রাজ্যে আমি ছাড়া অন্য একজন কে হতে পারে। এ তো আমার মতোই। হয়তো আমার কোনো শত্রু হবে। এরপর সে শত্রু হিশেবে আদমের উপর থুতু নিক্ষেপ করল। এই থুতু আদমের নাভির উপর পড়ল। আল্লাহ তখন জিবরিলকে ডাক দিয়ে বলেন, ‘জিবরিল, এই বডির কোনো দাম যে আমার কাছে নেই, এর জন্য আমি শয়তানকে দিয়ে থুতু নিক্ষেপ করালাম। যেহেতু আমি আল্লাহ এই বডি বানিয়েছি আর শয়তান যেখানে থুতু ফেলেছে, সেখানের মাটি সরিয়ে দাও।' এরপর থেকেই প্রত্যেক আদম সন্তানের নাভি কাটাতে হয়।

আল্লাহর কাছে বডির কোনো দাম নেই। কিন্তু যখন আল্লাহ রুহ ফুৎকার করলেন, তখন সেটা দামি হয়ে গেল। ফেরেশতাদের সিজদার যোগ্য হয়ে গেল। আল্লাহ বলেন,

﴿فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَجِدِينَ ﴾

এরপর যখন তাকে ঠিকঠাক করে নেব এবং তাতে আমার রুহ থেকে ফুঁক দেবো, তখন তোমরা তার সামনে সিজদায় পড়ে যেয়ো। [সুরা আল হিজর : ২৯]

সুতরাং মানুষ সম্মানিত হয়েছে বডির মাধ্যমে নয়; বরং রুহের মাধ্যমে। আর এই রুহেরই বিভিন্ন প্রকার হলো-কলব, নফস, ফুয়াদ ও আকল। এই রুহ কোন প্রকার খাদ্যের মাধ্যমে তাজা থাকবে; জান্নাতের উপযোগী হবে, এর হিদায়তের জন্য হলো পবিত্র কুরআন।

রুহ এবং নফস

রুহের একটি প্রকার হলো নফস। এই নফস আবার তিন ধরনের। একটা নফসে আম্মারা। আম্মারা শব্দের অর্থ হলো, যা মন্দের দিকে বেশি বেশি হুকুম করে। বেশি বেশি ফাহিশা বা অশ্লীল কাজ করতে মন চায়। তখন তাকে খারাপ থেকে বিরত রাখতে সাময়িক কষ্ট হবে। যদি ওই সাময়িক কষ্ট সহ্য করে মনের উল্টোটা করা হয়, তখন সেই অন্তর প্রমোশন পেয়ে নফসে লাওয়ামা হয়ে যায়। লাওয়ামা মানে নিন্দাকারী অন্তর। নামাজ না পড়লে সে নিন্দা করবে। রোজা না রাখলে নিন্দা করবে। আর নামাজ- রোজা আদায় করলেও নিন্দা করবে। কেন ভালোভাবে আদায় করা হলো না! এভাবে নফসকে শাসাতে শাসাতে নফসটা একসময় এমন হয়ে যাবে, পবিত্র কুরআনের ভাষায় যাকে বলা হয় নফসে মুতমায়িন্নাহ বা প্রশান্ত আত্মা। আর ওই প্রশান্ত আত্মা নিয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করলে সোজা জান্নাতের অধিকারী হয়ে যাবে।

সাকরাতের কঠিন মূহূর্তে যখন জান বের হতে কষ্ট হবে। আহা, সাকরাতুল মাওত অনেক কষ্টের। নেককার বদকার- কষ্ট সকলেরই হবে। তবে আল্লাহর দয়ায় নফসে মুতমায়িন্নার অধিকারী বান্দারা সেই কষ্ট বুঝতেই পারবে না। কারণ, তাদের সামনে জান্নাতের নাজ ও নিয়ামত তুলে ধরা হবে। আসছি সেই আলোচনায়, একটু পরে।

এ সম্পর্কে নবিজি বলেন,

إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ সাকরাত ছাড়া কোনো মৃত্যু নেই।

কত কষ্টের এই সাকরাত! একটা জীবন্ত ছাগলের চামড়া তুললে যত কষ্ট হয়, মৃত্যুর আগমূহুর্তে সাকরাতের সময়ও এমন কষ্ট হয়। এ জন্য নবিজি নিজেও দুআ করেছেন, অন্যকেও শিক্ষা দিয়েছেন এভাবে,

اللهم انى اعوذ بك من سكرات الموت و من غمرات الموت হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সাকারাত এবং মৃত্যুকষ্ট থেকে পানা চাই।

এমন কষ্টের মূহূর্তে যদি কেউ প্রশান্ত আত্মা অর্থাৎ, নফসে মুতমায়িন্না নিয়ে হাজির হয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর কষ্ট লাঘব করে গায়েবিভাবে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, يَايَتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبْدِي وَادْخُلِي جَنَّتِي

হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে আয় তর রবের দিকে- (এই অবস্থায় ফিরে আয় যে,) তুইও রাজি, তর রবও রাজি। আমার (প্রিয়) বান্দাদের মধ্যে শামিল হো, আর আমার জান্নাতে প্রবেশ কর। [সুরা ফাজর: ২৭-৩০]

এটা হলো হিদায়তে মাকসুদ। যে হিদায়তের মাধ্যমে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছা যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিদায়তে জান্নাত দান করুন। আমিন!

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 হিদায়াত লাভ করবে কারা

📄 হিদায়াত লাভ করবে কারা


পবিত্র কুরআন হলো হিদায়তের মাধ্যম। এই কুরআনের মাধ্যমে মানুষ হিদায়ত লাভ করবে। আল্লাহ বলেন, 'হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্য।'

গত আলোচনাগুলোতে আপনারা হিদায়ত ও মুত্তাকি সম্পর্কে আলোচনা শুনে আসছেন। সেগুলো আপনাদের স্মরণ থাকতে হবে। আল্লাহ কুরআনে হিদায়তের কথা বলেছেন, তবে এই হিদায়ত কি সবার জন্য, নাকি শুধু মুত্তাকিদের জন্য? অবশ্যই মুত্তাকিদের জন্য। এখন প্রশ্ন জাগে যে, তাকওয়া কি এবং মুত্তাকি কারা? এ সম্পর্কে এক হাদিসে নবিজি ﷺ ইরশাদ করেন,

الاسلام على النية والايمان على القلب

ইসলাম হলো নিয়তের নাম আর ঈমান থাকে কলবে। অর্থাৎ ঈমান বা আকিদা অন্তরে থাকে, আর ইসলাম সহিহ নিয়তের মাধ্যমে আমলে প্রকাশিত হয়।

তাকওয়ার উদাহরণ হচ্ছে যেমন নামাজ। এটা শুধু মুসলমানই পড়ে, কাফিররা পড়ে না। তাই নামাজ আমল হলো বাহ্যিক আমল এবং বাহ্যিক আমলের নামই হলো ইসলাম। অপরদিকে ঈমানের সম্পর্ক হলো অন্তরের সঙ্গে। আল্লাহ বলেন,

وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيمَانِ

অর্থাৎ, তাদের অন্তর ঈমান দ্বারা প্রশান্ত। ঈমানের সম্পর্ক হলো অন্তরের সঙ্গে।

এখন প্রশ্ন জাগে, তাকওয়া কোথায় থাকে? তাকওয়ার ঠিকানা কী? উত্তরটা নবিজি এক হাদিসে দিয়ে গেছেন। বলেছেন, التقوى هاهنا তাকওয়া কোথায় থাকে, নবিজিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তাঁর বুকের দিকে ইঙ্গিত করে তাকওয়া শব্দটি তিনবার উচ্চারণ করেন। সুতরাং বোঝা গেল তাকওয়ার অবস্থান হলো অন্তর। কুরআনে আল্লাহ বলেন,

إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ الْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার রয়েছে অন্তর অথবা যে নিবিষ্টচিত্তে শ্রবণ করে। [সুরা কাফ: ৩৭]

অর্থাৎ, যাদের অন্তর আছে এবং অন্তর দিয়ে মনোযোগের সঙ্গে কুরআন শ্রবণ করে, এমন না যে, কুরআনও শুনল, অন্যদিকেও তার মনোযোগ নিবদ্ধ থাকল; বরং তার কলবকে শুধু কুরআনের দিকে নিবিষ্ট রাখে।

আবার কলব বা অন্তর তিন প্রকার। এক প্রকার হচ্ছে কলবে সালিম। পবিত্র কুরআনে কলবে সালিম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না। তবে যে আল্লাহর কাছে আসবে সুস্থ অন্তরে। [সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯]

মুহতারাম হাজিরিন।

এবার আমাদের জানতে হবে, আমাদের কলব বা অন্তর কেমন কলব? কোন প্রকারের মধ্যে পড়ে? আমরা যদি আমাদের কলবের অবস্থা বুঝে থাকি এবং মনে করি যে, আমার কলব বা অন্তর হচ্ছে কালবে সালিম, তাহলেই এই কুরআনের মাধ্যমে আপনার হিদায়ত লাভ হবে। মৃত কলবের মাধ্যমে নয়। কলবে মায়্যিত বা মৃত কলবের মাধ্যমে কেন হবে না, এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَسِقِينَ তিনি এর দ্বারা অনেককেই বিভ্রান্ত করেন, আবার অনেককে সৎপথে পরিচালিত করেন। বস্তুত তিনি ফাসিকদের ছাড়া আর কাউকেও বিভ্রান্ত করেন না। [সুরা বাকারা: ২৬]

সুতরাং কলব বা অন্তর যদি সালিম না হয়, তাহলে এই কুরআন আমাদের হিদায়ত দেবে না; বরং পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে। আর সাধারণ মানুষ তো খুব সহজেই দ্বীনি বিষয়ে প্রভাবিত হয় এবং দ্বীনি কোনো বিষয়ের শুদ্ধতা যাচাইয়ের যোগ্যতা যেহেতু থাকে না, ফলে তারা খুব সহজেই পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।

নেক সুরতে ধোঁকা

আমাদের সমাজে অনেক আছে, যারা কুরআন-হাদিসের কথা বলে, অথচ শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এই দ্বীনের জন্য কথা বলা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। বাহ্যিকভাবে তারা ইসলামের কথা বলে, কিন্তু অন্তরে ভিন্ন কিছু ধারণ করে। এদের বডিতেই ইসলামের অনেক নিদর্শন অনুপস্থিত থাকে আবার তারাই ইসলামের পক্ষে বড় গলায় কথা বলে। এরা মূলত পথভ্রষ্ট এবং মানুষকেও বিভ্রান্ত করে থাকে।

ফলে এদের দেখে এবং কথা শুনে আপনারাই অনেক সময় বলে ফেলেন যে, 'অমুক তো কুরআনের কথা বলে, হাদিসের কথা বলে!' এখন কথা হলো, কেউ শুধু শুধু কুরআন-হাদিসের কথা বললেই সেটা যে অন্ধবিশ্বাসে মেনে নিতে হবে, এমন নয়; বরং আপনাকে যাচাই করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম গ্রহণ করতে হবে। এই যে একটা বিষয়, এটা ভালো করে বুঝতে হবে। কেননা, কুরআন পড়ে যেমন অনেকে গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়। তাদের অনেক অনুসারীও জুটে যায়। ফলে এই কুরআনের প্রকৃত মর্ম না বোঝায় অনেকেই উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলে এবং পথভ্রষ্ট হয়। এই গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট বাহিনী সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا

তিনি এর দ্বারা অনেককেই বিভ্রান্ত করেন, আবার অনেককে সৎপথে পরিচালিত করেন। [সুরা বাকারা: ২.৬]

আর যারা গুমরাহ হয়, এদের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ আয়াতের পরের অংশেই বলেছেন,

وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفُسِقِينَ﴾

বস্তুত তিনি ফাসিকদের ছাড়া আর কাউকেও বিভ্রান্ত করেন না। [সুরা বাকারা : ২৬]

ফাসিকরাই পথভ্রষ্ট হয়। ফাসিকদের আলোচনা পরে কোনো সময় করা হবে ইনশাআল্লাহ।

বোঝা গেল শুধু কুরআন পড়লেই কেউ হিদায়ত লাভ করতে পারবে না, মুত্তাকি হতে পারবে না; বরং তাকে কুরআনের প্রকৃত মর্মও ভালো করে বুঝতে হবে। কালবে সালিম থাকতে হবে। তবেই সে হিদায়ত লাভ করতে পারবে।

আর যদি এমন কলব না থাকে, অর্থাৎ যারা এমন কলবের অধিকারী, যারা দেখতে মানুষের মতো হলেও চতুষ্পদ জন্তু থেকে আরও নিকৃষ্ট। তাদের কলব এমন কলব, যাতে আল্লাহর কোনো জিকির নেই, এমন অন্তরকে গাফিল অন্তর বলে। গাফিল অন্তর মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং মুক্তির একটাই উপায়, কালবে সালিমের অধিকারী হওয়া। আমাদের সবাইকে কলবে সালিম অর্জন করতে হবে।

উপরে যে কালবে সালিমের কথা আলোচনা করা হলো, এটার আরেক নাম হলো কলবে মুনিব। আর দ্বিতীয় প্রকারের কলব হচ্ছে কলবে মায়্যিত বা মৃত কলব। এই কলবের কথাও কুরআনে আছে। ইরশাদ হয়েছে,

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا ۖ وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ

আর অবশ্যই আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষকে। তাদের রয়েছে অন্তর, তা দ্বারা তারা বুঝে না; তাদের রয়েছে চোখ, তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের রয়েছে কান, তা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল। [সুরা আরাফ : ১৭৯]

এই মৃত কলবের অধিকারী জীবিত হলেও আল্লাহর কাছে সে মৃত। কারণ, তার অন্তর মৃত। অপরদিকে যাদের কালবে সালিম রয়েছে, তারা যদি মারাও যায়, তবু তারা আল্লাহর কাছে জীবিত। আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِنْ لَا تَشْعُرُونَ

যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পার না। [সুরা বাকারা : ১৫৪]

এখন কলবকে আল্লাহ জীবিত করেন কীভাবে, অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ

যে ছিল মৃত, অতঃপর আমি তাকে জীবন দিয়েছি এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছি আলো, যার মাধ্যমে সে মানুষের মধ্যে চলে। [সুরা আনআম : ১২২]

অর্থাৎ, যার কলব আছে, আমি আল্লাহ তার কলবকে জীবিত করলাম। শুধু জীবিত না; বরং তাতে এমন নুর ফিট করে দিলাম, যে নুরের আলোয় শুধু সে চলে না; বরং এই নুরানি কলবের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশকে সে আলোকিত করে। এরপর কিয়ামতের দিন সে স্বচ্ছ অন্তরওয়ালাদের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে দলবদ্ধভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

দুই প্রকার অন্তর

মানুষের অন্তরকে দুভাগে ভাগ করা হবে। একধরনের কলব হবে মর্মরপাথরের মতো সাদা স্বচ্ছ। হজরত হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল বলেন,

لَا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ

জমিন আসমান যতদিন থাকবে, ততোদিন কোনো ফিতনা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

ফলে এমন কলবকে ফিতনায় জড়াতে পারবে না। অন্যায় কাজে লাগাতে পারবে না। এমন কলবের অধিকারী যদি একটি নেকির কাজ করে, এর পরিবের্ত একটি আলো বা নুর তৈরি হয়। এভাবে যত নেকি করবে, একটা করে তত নুর তৈরি হতে থাকবে। ফলে একসময় তার পুরো কলবটা আলোকিত হয়ে যাবে।

দুনিয়ায় আখিরাতের প্রকৃতি দেখা যায় না কিন্তু কিয়ামতের দিন দেখা যাবে। দুনিয়াতে যেমন আল্লাহকে দেখা যায় না, কিন্তু হাশরের মাঠে দেখা যাবে। তেমনি তার কলবকে সে দুনিয়াতে দেখতে পাবে না, তবে কিয়ামতের দিন অবশ্যই দেখতে পাবে। তখন সে দেখবে, অন্যদের গুনাহ তার ডানে, বামে, পিছনে, সামনে দিয়ে যাচ্ছে, তখন তার অন্তরের আলো ছড়িয়ে পড়বে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَ بِأَيْمَانِهِمْ بُشْرِيكُمُ الْيَوْمَ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

সেদিন তুমি দেখবে মুমিন নর-নারীদেরকে তাদের সামনে ও ডানপাশে তাদের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হবে। (বলা হবে) আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে, সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে। এটাই মহা সাফল্য। [সুরা হাদিদ: ১২]

দুনিয়াতে যে নেকি সে অর্জন করেছিল, কালবকে জিন্দা করে এটাকে কালবে সালিম বানিয়েছিল, একেকটা নেকি করে নুর তৈরি করেছিল এবং এর মাধ্যমে সে তার অন্তর স্বচ্ছ করেছিল, এই আলো সেদিন প্রকাশ পাবে এবং এর বিনিময়ে সে ৩০ হাজার বছরের রাস্তা পুলসিরাত এই নুরের ফোকাসে মুহূর্তেই পাড়ি দিতে সক্ষম হবে। আল্লাহ বলেন,

﴿يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ ﴾

সেদিন তুমি দেখবে মুমিন নর-নারীদেরকে তাদের সামনে ও ডানপাশে তাদের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হবে। [সুরা হাদিদ: ১২]

আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে আসানির সাথে পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার তৌফিক দান করুন। সকলে বলুন, আমিন।

যারা তাদের অন্তরকে আলোকিত করেনি, তারা এই আলোকিত অন্তরওয়ালাদের দেখে বলবে, আমাদেরও কিছু নুর দাও। তখন তারা জবাবে বলবে, এখানে দেওয়ার বা লাভ করার কোনো সুযোগ নেই। নুর পেতে হলে তোমাদেরকে দুনিয়াতে যেতে হবে। সুতরাং তোমরা দুনিয়াতে যাও এবং নুর নিয়ে আসো। কেননা, দুনিয়াতে নেকি করলেই কেবল নুর লাভ হয় এবং তা জমা হয়েছিল বলে আজ হাশরের কঠিন ময়দানে কাজে আসছে। কিন্তু দুনিয়াতে তো ফিরে আসা সম্ভব নয়। ফলে জাহান্নামই তাদের জন্য অবধারিত। আল্লাহ বলেন,

﴿يَوْمَ يَقُوْلُ الْمُنْفِقُوْنَ وَالْمُنْفِقْتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُوْرٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ ﴾

সেদিন মুনাফিক নারী ও পুরুষরা মুমিনদের বলবে, তোমরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করো, আমরাও তোমাদের জ্যোতি থেকে কিছু আলো নিবো। বলা হবে পেছনে ফিরে যাও এবং আলোর খোঁজ করো। [সুরা হাদিদ: ১৩]

বোঝা গেল, শুধু কলব থাকলে হবে না, বরং জিন্দা কলব থাকতে হবে। মৃত কলব জীবিত হয়, এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে বলেন,

﴿يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের জীবন সঞ্চারক বস্তুর দিকে আহ্বান করেন। [সুরা আনফাল: ২৪]

হে ঈমানদারের দল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা মানো। لِّمَا يُحْيِيكُمْ যদি মানো, তবেই তোমাদের অন্তর জিন্দা হয়ে যাবে। গানবাজনা বা গুনাহের কাজ করলে অন্তর কখনো জীবিত হবে না। সুতরাং আল্লাহর হুকুম, নবিজির হুকুম যারা শুনে না, মানে না, তাদের অন্তর মৃত, আর যারা মানে তাদের অন্তর জীবিত। আর আল্লাহ যেহেতু الحي القيوم সবসময় জীবিত, সুতরাং জিন্দা কলবওয়ালা লোকেরা আল্লাহর সঙ্গেই সম্পর্ক তৈরি করে। জিন্দা কুদ্দুস আল্লাহর সঙ্গে সকল নবি-রাসুলের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক ছিল, এ জন্য তাঁরা মরার পরও জীবিত।

হায়াতুল আম্বিয়া

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো احياء الانبياء অর্থাৎ নবিগণ তাঁদের কবরে জীবিত। এটা এ কারণে যে, তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে সবসময় এবং সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক রাখতেন। মৃত্যুর পর যে জগত আছে, কবর জগত বা আলমে বারজাখ, যে জগত সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস থাকতে হবে। এই দুনিয়ার জগতে যার কলব যত জিন্দা, সেই জগতে তার মধ্যে তত বেশি জিন্দেগির একটা ফোকাস দান করেন।

আপনারা শুনেছেন, হাদিসে আছে, যারা নেককার অর্থাৎ, যারা স্বচ্ছ অন্তর নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, তারা মারা যাওয়ার পর কবরে সওয়াল-জওয়াবের পর কবর তাদের জন্য জান্নাতের বাগান হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ। এ সময় তাদের বলা হবে, نم نومة العروس অর্থাৎ বাসররাতে নববধূ বা নতুন বর যেভাবে ঘুমায়, তোমরাও সেভাবে ঘুমাও।

আপনারা বলেন তো, মানুষ যখন ঘুমায়, তখন তারা মরে যায়, না জীবিত থাকে? জীবিত থাকে। আর নেককারদের অন্তরও একধরনের জীবিতদের মতো। হাদিসে বলা হয়েছে, نم نومة العروس— তোমরা ঘুমাও, যেভাবে বাসররাতে নববধূ ঘুমায়। এখানে বলা হয়নি, তোমরা মরে যাও। ‘নাম’ বা ঘুমাও এ জন্য বলা হয়েছে যে, তারা নেক আমল বা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে তাদের অন্তর জীবিত রেখেছে। তাই যে যত বেশি সম্পর্ক রেখেছে, সে কবরে তত বেশি ফলাফল লাভ করবে। আর অন্তর সবচেয়ে বেশি জিন্দা করেছেন নবি-রাসুলগণ, ফলে তাঁরা কবরের জগতেও জীবিত থাকেন। এটা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা।

কবরে নামাজ পড়া

শুধু যে জীবিতই থাকেন তা না; বরং আল্লাহর দেওয়া বিশেষ সুযোগ নিয়ে কবরে নামাজও পড়েন। হাদিস শরিফে আছে, আল আম্বিয়াউ আহইয়াউন ফী কুবুরিহিম যুসাল্গুন। অর্থাৎ, নবিগণ তাদের কবরে জীবিত আছেন এবং নামাজও পড়ছেন।

অন্য হাদিসে আছে, মেরাজের রাতে আমাদের নবিজি মুসা আলাইহিস সালামের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন নবিজি দেখলেন মুসা আলাইহিস সালাম তাঁর কবরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন। হজরত আনাস ইবনু মালিক রাজিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত নবিজির হাদিসটি হলো এমন,

مررت على موسى ليلة أسري بي عند الكثيب الأحمر، وهو قائم يصلي في قبره

আমি ইসরা (মেরাজ) রজনীতে একটি লাল টিলার পাশে মুসা আলাইহিস সালামের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন।

ছিদ্রান্বেষীরা বলবে, মুসা আলাইহিস সালাম যদি তাঁর কবরে নামাজ পড়েও থাকেন, নবিজি সেটা দেখলেন কীভাবে? জবাব হলো, নবিজি নিজের ক্ষমতায় দেখেননি। আল্লাহ দেখিয়েছেন। এটাকে বলে নবিজির মুজিজা। মুজিজা বিশ্বাস করতে হবে, এটা ঈমানের অংশ।

সুতরাং বোঝা গেল, কালবে সালিম যাদের অর্জিত হয়, কুরআন তাদের জন্য হিদায়ত হবে। আর যদি কালবে মায়্যিত বা মৃত কলব হয়, তাহলে তাদের জন্য কুরআন হিদায়ত হবে না। এরা তো চতুষ্পদ জানোয়ারের চেয়েও মন্দ।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 তাকওয়া এবং কালবে সালিম

📄 তাকওয়া এবং কালবে সালিম


আমাদের আলোচনা হচ্ছিল তাকওয়া সম্পর্কে। যেহেতু তাকওয়া কলবের মধ্যে থাকে, তাই প্রথমে আমাদের কলবের পরিচয় জানতে হবে। এরপর তাকওয়া কলবে কীভাবে, কোন জায়গায়, কতটুকু বসবে- সেটা বুঝতে হবে। সেটা বোঝার জন্য আগের আলোচনা স্মরণ রাখতে হবে।

কলব তিন প্রকার, এক প্রকার হচেছ কালবে সালিম বা স্বচ্ছ কলব। আরেক প্রকার হচ্ছে কালবে মায়্যিত বা মৃত কলব। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে, কালবে মারিজ বা অসুস্থ কলব। এ জন্য পবিত্র কুরআনের ভূমিকায় আল্লাহ তাআলা মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। একভাগ মুত্তাকি, একভাগ কাফির, আরেক ভাগ মুনাফিক। এখন আপনারাই বলুন, মুত্তাকিদের কলব কেমন কলব?

উত্তর হচ্ছে কালবে সালিম বা স্বচ্ছ কলব। আর যারা কাফির, তাদের কলব হচ্ছে কালবে মায়্যিত বা মৃত কলব। আর মুনাফিকদের কলব হচ্ছে কালবে মারিজ বা অসুস্থ কলব। এদের অবস্থা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, فِي قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ অর্থাৎ, তাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত। কেননা, মুনাফিকদের অন্তর কখনো সুস্থ থাকে, আবার কখনো অসুস্থ হয়ে যায়। এরা সুবিধাবাদী। ভয়ংকর। এ জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআনে মুনাফিকদের নিয়ে কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে তাদের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যাতে দুনিয়ার মানুষ মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। কারণ, মুনাফিকের মাধ্যমে ইসলাম ও ঈমানের যতটুকু ক্ষতি হয়, কাফিরের দ্বারা ততটুকু হয় না।

এতটুকু আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম, কলব তিন প্রকার। আর আমাদেরকে যে কলবের অধিকারী হতে হবে, সেটা হচ্ছে কালবে সালিম। এখন আমরা যাব নবিজির কাছে। হে নবি আমাদের জানিয়ে দিন, কালবে সালিম কাকে বলে? সাহাবায়ে কেরাম নবিজিকে প্রশ্ন করেন, يا رَسُولِ اللهِ أَيُّ النَّاسِ خير হে আল্লাহর নবি, শ্রেষ্ঠ মানুষ কারা?

নবিজি জবাব দেন كُل مؤمن অর্থাৎ সকল মুমিনই শ্রেষ্ঠ। তবে মুমিনের মধ্যে কিছু গুণ থাকতে হবে। যেমন, صدوق اللسان مخموم القلبِ অর্থাৎ এমন মুমিন শ্রেষ্ঠ যার মধ্যে দুটি গুণ থাকবে। প্রথমটি হচ্ছে মাখমুমুল কালব। তবে এই মাখমুমুল কলবের অর্থ কী, সেটা সাহাবিগণই প্রথমে বুঝেননি, পুনরায় নবিজিকে জিজ্ঞেস করেছেন। এ জন্য আমি শুরু থেকে বলে আসছি যে, শুধু আরবি জানা থাকলেই কুরআন বুঝে আসবে না; বরং যারা কুরআনের জ্ঞানী, তাঁদের কাছে বসতে হয়, তাঁদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হয়। তবেই কুরআনের জ্ঞান অর্জিত হবে।

দুই নম্বর গুণ হচ্ছে صدوق اللسان। অর্থাৎ মিথ্যা কথা বলতে পারবে না। মাখমুমুল কলব এবং সাদুকুল লিসানের ব্যাখ্যা আমরা পরে জানব। তার আগে চলুন কলব কীভাবে খারাপ হয়, সেটা জানি,

কলব খারাপ হয় বা অস্বচ্ছ হয় চারটি রাস্তা দিয়ে গুনাহ প্রবেশ করে। রাস্তাগুলো হলো, চোখ, কান, মুখ ও ব্রেইন বা আকল।

চোখ

নবিজি বলেছেন, কেউ যদি তার চোখ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, অর্থাৎ, চোখ দ্বারা গুনাহের কাজ করে না, তবে আল্লাহ পাক তার অন্তরে ইবাদতের স্বাদ ঢুকিয়ে দেবেন। এ জন্য আপনারা যদি নিজেদের চোখ কন্ট্রোল করতে পারেন, তাহলে নামাজ, রোজাসহ সব ইবাদতের স্বাদ পাবেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের হুকুম পালনে স্বাদ অনুভব হবে। কবি বলেন, الفت مین برابر ہے وفا ھو کہ جفا ھو : ھر چیز مین لذت ہے اگر دل مین مزا ھو অন্তরে ইবাদতের স্বাদ অনুভব হবে, যদি চোখের হেফাজত করা যায়। তবে আমরা ইবাদতে মজা পাই না, কারণ আমাদের অন্তরে সমস্যা। আজ থেকে আমরা ইনশাআল্লাহ চোখের হেফাজত করব। এই চোখ দিয়ে যদি আমরা মায়ের চেহারার দিকে তাকাই, তাহলে মাকবুল হজের সাওয়াব পাব, যদি পিতার দিকে তাকাই, মাকবুল হজের সাওয়াব পাব। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসবেন, মাকবুল সদকার সাওয়াব পাবেন, কুরআনের দিকে তাকাবেন, চোখের জ্যোতি বাড়বে, একজন মুসলমানের দিকে তাকিয়ে হাসবেন, মাকবুল সদকার সাওয়াব পাবেন। আর যদি এই চোখকে অসৎপথে কাজে লাগানো হয়, তাহলে এই চোখের গুনাহের কারণে আপনার অন্তরে ভাইরাস প্রবেশ করে কলব নষ্ট করে দেয়।

কান

এই কান দিয়ে কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে কলবে কোনো ভাইরাস প্রবেশ করবে না। কলব পরিশুদ্ধ থাকার জন্য তিলাওয়াত হলো ভ্যাকসিন। কিন্তু কানে ইয়ার ফোন দিয়ে গান শুনে শুনে ঘুমিয়ে পড়ে এবং এমতাবস্থায় যদি মারা যায়, তাহলে সে কোন অবস্থায় মারা গেল? এখন কেউ যদি গান শোনা অবস্থায় মারা যায়, তখন সে কেমন কলব নিয়ে মারা গেল? তার ঈমানি হালত কেমন হবে, সেটা বেশ ভয় জাগানিয়া। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

(أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَفِلُونَ)

তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। [সুরা আরাফ : ১৭৯]

সুতরাং স্বচ্ছ কলবের জন্য কানের হেফাজতের বিকল্প নেই। অপরদিকে আমাদের বর্তমান তরুণসমাজ হেডফোন কানে লাগিয়ে যেভাবে নানা পাপকাজে জড়িত হচ্ছে, তাতে তাদের কলব পরিচ্ছন্ন বা স্বচ্ছ হওয়ার পরিবর্তে আরও দাগ পড়ছে। এটা নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে আমরা যাদের সন্তান আছে, অভিভাবক হিশেবে আমাদের সন্তানদের এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া হেডফোন ব্যবহারে কান বা শ্রবণযন্তের যে ক্ষতি হয়, চিকিৎসাবিদ্যার আলোকেও বিষয়টি আমাদের বিবেচনা করতে হবে।

বলছিলাম কলব স্বচ্ছ না হওয়ার অন্যতম বাধা হচ্ছে কান। এই কানের হেফাজতের প্রতি আমাদের বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

মুখ

কলব স্বচ্ছ করতে হলে মুখের হেফাজত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুল বলেন, মানুষ যদি দুটি জিনিসের হেফাজত করতে পারে, তাহলে আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ তাকে সুসংবাদ দিচ্ছি, জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি তার জামিন হয়ে গেলাম। একটা হচ্ছে মুখ, আরেকটা হলো লজ্জাস্থান। কেউ যদি এ দুটি অঙ্গের যথাযথ হেফাজত করতে পারে এবং কোনো নাজায়িজ কাজে তা ব্যবহার না করে, তাহলে নবিজি বলেন, আমি তার জান্নাতের জামিন হয়ে যাব। সুবহানাল্লাহ।

সুতরাং, আমাদের অন্তরে কোনো ভাইরাস যাতে প্রবেশ না করে, এ জন্য অন্তরকে ভাইরাস থেকে মুক্ত রাখতে প্রথমে আমাদের চোখে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর কানের হেফাজতের জন্য কানে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর মুখের হেফাজতের জন্য মুখের ভ্যাকসিন দিতে হবে।

ব্রেইন বা আকল

ব্রেইনের হেফাজতের জন্য ব্রেইনেও ভ্যাকসিন দিতে হবে। আমাদের সমাজে অনেকে আছে, যারা ব্রেইন দিয়ে আঘাত করে। মেধা খাটিয়ে নানা অপকর্ম করে থাকে। পরস্পরে কীভাবে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা যায়, মনোমালিন্য তৈরি করা যায়, এ চিন্তায় হরদম মশগুল থাকে। অথচ দুজন মানুষের মধ্যে যদি পরস্পর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, আর কেউ তাদের এই দ্বন্দ্ব নিরসন করে দেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা এমন বান্দাকে আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। সুবহানাল্লাহ। এখন আপনার ঘরেই যদি কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, তাহলে যেভাবেই হোক এটা সমাধান করে দিলে কিয়ামতের দিন আপনিও আরশের ছায়ার নিচে জায়গা পাবেন। কিন্তু আমরা করি এর উল্টো। দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনের পরিবর্তে কীভাবে সেটা বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। মিথ্যা, চোগলখুরি, অপবাদ, গিবত ইত্যাদির মাধ্যমে অনেকে তার মেধা-মনন ব্যয় করে। ফলে এসবের মাধ্যমে অন্তর স্বচ্ছ হওয়ার পরিবর্তে তাতে ভাইরাস প্রবেশ করে।

সুতরাং নবিজি বলেছেন, সত্যিকার মানুষ হলো সে, যে প্রকৃত ঈমানদার। আর ইমানদারের গুণ হচ্ছে দুটি : ১. মাখমুমুল কালব। ২. সাদুকুল লিসান।

সাহাবিগণ তখন প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সাদুকুল লিসান বা মুখ দিয়ে সত্য বলার বিষয়টি তো বুঝলাম, কিন্তু মাখমুমুল কালব এটা তো বুঝিনি। তখন নবিজি বললেন... হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল -কে জিজ্ঞেস করা হলো,

أَيُّ النَّاسِ أَفْضَلُ قَالَ كُلُّ مَحْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ قَالُوا صَدُوقُ اللِّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا تَخْمُومُ الْقَلْبِ قَالَ هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لَا إِثْمَ فِيهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ

কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। তাঁরা বললেন, সত্যভাষী তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, সে হলো পূতপবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার কোনো গুনাহ নেই। কোনো শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা নেই।

সুতরাং, মাখমুমুল কালবের মর্ম হলো স্বচ্ছ অন্তর। স্বচ্ছ অন্তরের প্রথম গুণ হচ্ছে আত-তাকিয়্যু বা যার অন্তরে তাকওয়া থাকে। আন-নাকিয়্যুর অর্থাৎ যার অন্তর স্বচ্ছ থাকে। নাকিয়্যুর অর্থ কি, এ সম্পর্কে হাদিসে আছে। নাকিয়্যু বা স্বচ্ছ অন্তর মানে,
• লা গিল্লা ফি হি, যার মধ্যে কোনো ধরনের বিদ্বেষ নেই।
• ওলা গাশশা, যার অন্তরে কোনো ধোঁকাবাজি নেই।
• ওলা বাগইয়া, যার অন্তরে কোনো ধরনের উগ্রতা নেই।
• ওলা হাসাদা, যার অন্তরে কোনো হিংসা নেই।

আর এরকম অন্তর হলেই সেটা হলো কালবে সালিম। এখন আপনারা নিজেদের অন্তরের অবস্থা যাচাই করে নেন। এই হাদিসে যেসব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, সেসব শব্দের অর্থ ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। এ সম্পর্কে পরে কোনো সময় আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

মোটকথা, এই কুরআন থেকে হিদায়ত লাভ করতে হলে আমাদেরকে তাকওয়া অর্জন করতে হবে। আর তাকওয়ার স্থান হচ্ছে হার্ট বা কলব। সুতরাং কলব হতে হবে স্বচ্ছ। আর স্বচ্ছ কলব হতে হলে এরকম গুণ অর্জন করতে হবে।

মুত্তাকির জন্য হিদায়তের আর দরকার কী

উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম, কুরআন মুত্তাকিদের জন্যই হিদায়ত। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, যারা মুত্তাকি, তারা তো এমনিতেই হিদায়তপ্রাপ্ত, ভালো মানুষ, স্বচ্ছ অন্তরের অধিকারী। তাদের জন্য কুরআন হিদায়ত হবে কেন? কুরআন তো তাদের জন্য হিদায়ত হবে, যারা পাপি। কিন্তু এই কুরআনেই আল্লাহ বলেছেন, হুদাল্লিল মুত্তাকিন অর্থাৎ, হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্যই। অপর আয়াতে আছে, হুদাল লিন নাস অর্থাৎ, সব মানুষের জন্য হিদায়ত।

মূল বিষয় হলো, কুরআন কার কালাম? অবশ্যই আল্লাহর কালাম। আর আল্লাহ হলেন সকল বাদশাহের বাদশাহ। সুতরাং বাদশাহ যে আদেশ করেন, তা পালন করা প্রজার উপর জরুরি। এ জন্য একটা যোগ্যতার প্রয়োজন। আর সেই যোগ্যতার নাম হলো তাকওয়া। এই যোগ্যতা অর্জনকারী কুরআনি হিদায়ত লাভ করতে পারবে।

আর কুরআনের ভাষায় মানুষের শরীরও একটা রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তার একটি রাজধানী আছে, সরকারি ও বিরোধীদল আছে, স্পিকার আছে। আমরা এটা বুঝলেও অনেকে কুরআন বুঝি না। যেমন ধরা যাক, আমাদের এই শরীর একটি রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের রাজধানী হলো কালব।

যেমন আমেরিকার রাজধানী হচ্ছে ওয়াশিংটন ডিসি; আর আমাদের শরীরের রাজধানী হচ্ছে কালব। এখন এই রাজধানীতে সরকার গঠন করা হলে বিরোধীদল হবে নাফস এবং সরকারি দল হলো রুহ। আর সংসদভবন হলো ফুওয়াদ (কলবের একটি হালত) বা যেখানে সিদ্ধান্তগুলো সংরক্ষণ করা হয়। আর স্পিকার হলো আকল বা বিবেক।

এখন আপনার শরীরের দিকেই তাকান। দেখেন কোনো দ্বন্দ্ব চলছে কি না? নফস বলে, গুনাহ করো, রুহ বলে করবে না। এই উদাহরণ আমার মনগড়া নয়; বরং নবিজি -ও এরকম বলেছেন। হাদিসটি আমরা আগেও তিলাওয়াত করেছি, নবিজি বলেন,

أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ. أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ

জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হলো কলব।

কবি বলেন,
والنفس كالطفل ان تهمله شب على حب الرضاع وان تفطمه ينفطم

নফস হলো শিশুর মতো। যদি দুধপানে অবকাশ দাও, যৌবনেও দুধপান করতে চাইবে। আর যদি দুধপান করা বন্ধ করাও, তাহলে কষ্ট করে হলেও বন্ধ করবে। ঠিক তেমনিভাবে নাফসও গুনাহ করতে মজা পায়। তাকে বাধা দিলে কষ্ট পায়。

আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর স্বচ্ছ রাখার তাওফিক দিন। আমিন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px