📄 জীবন্ত মুজিজা
পবিত্র কুরআন যে আল্লাহর কালাম, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ-সংশয় নেই। তবে কুরআন ব্যবহৃত তিনটি শব্দের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়। কুরআনে কারিমের যে তিনটি শব্দ নিয়ে কাফিররা প্রশ্ন তুলে এবং বলে, কুরআন আল্লাহর কালাম না কালাম নয়, এটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সেই শব্দ তিনটি হলো,
* হুজওয়া (هزوا)
* উজাব (عجاب)
* কুব্বার (كبار)
তারা বলে, কুরআন আল্লাহর কালাম নয়। কারণ, কুরআনে হুজওয়া, উজাব ও কুব্বার শব্দ এসেছে। এগুলো সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ একটি কিতাবের শব্দ হতে পারে না।
নবিজি হলেন মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক এবং কুরআন হলো তাঁর সবচেয়ে বড় মুজিজা, তাই এই কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত হেফাজত বা সংরক্ষিত থাকবে। এই কুরআন, যাতে নবিজির মুজিজার হেফাজত রয়েছে, সেখানে নবিজির নবুওয়াতও হেফাজতে থাকবে। কারণ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পরে আর কোনো নবি নেই। নেই মানে নতুন কোনো নবি পৃথিবীতে আসবেন না।
হজরত মুসা আলাইহিস সালামের মুজিজা ছিল হাতের লাঠি সাপ হয়ে যেত, আজ মুসা নেই, তাঁর মুজিজাও নেই। ইসা আলাইহিস সালামের মুজিজা ছিল, তাঁর আহবানে আল্লাহর হুকুমে মুর্দা জিন্দা হয়ে কবর থেকে উঠে দাঁড়াত। তিনি নেই তাঁর মুজিজাও নেই। দাউদ আলাইহিস সালামের হাতের স্পর্শে লোহা গলে যেত। এটি ছিল তাঁর মুজিজা। তিনি নেই তাঁর মুজিজাও নেই। কিন্তু আমাদের নবিজির জীবন্ত মুজিজা হলো কুরআন। এটা শ্রেষ্ঠ মুজিজা। কিয়ামত পর্যন্ত এই কুরআন থাকবে। যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত নবিজি ﷺ-এর নবুওয়াত বহাল থাকবে, তাই কুরআন নামক এই মুজিজার হেফাজত করার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহপাক নিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ। নবিজির পরে আর কোনো নতুন নবি আসবেন না।
শিরক বিদআতের বেমারে রুগ্ন পৃথিবীর চিকিতসার জন্য প্রতি যুগে, প্রতি শতকে আল্লাহপাক চিকিৎসক পাঠিয়েছেন; যাঁদেরকে নবি-রাসুল বলা হয়। খোদাদ্রোহিতার এই রোগ কিয়ামত আগ পর্যন্তই থাকবে-তওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত; কিন্তু নতুন করে আর নবি আসবেন না। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হলেন শেষ নবি। তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ ডাক্তার, তাঁর পরে আর কোনো ডাক্তারের প্রয়োজন নেই。
এখন প্রশ্ন হতে পারে নবিজি শ্রেষ্ঠ ডাক্তার, এটা বুঝলাম কিন্তু নবি পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর পৃথিবী যখন নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হবে, তখন কী হবে? কীভাবে হবে চিকিৎসা?
জবাবটা নবি নিজেই দিয়ে গেছেন। বলেছেন, আমি চলে যাওয়ার পর উম্মতের উলামা ফুকাহা বদ্বীনির চিকিৎসা করবেন। আল উলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। উলামায়ে কেরাম নবিগণের ওয়ারিস হয়ে থাকেন।
কুরআনের উচ্চাঙ্গতা
কাফিররা কুরআনের তিনটি শব্দ হুজওয়া, উজাব ও কুব্বার ব্যাপারে অভিযোগ করলে হজরত উমর মুসলমানদের পক্ষে হজরত আলিকে মুনাজারার জন্য নির্বাচন করলেন। আর কাফিররা তাদের পক্ষে বড় এক সাহিত্যিককে নির্ধারণ করল, যে লোক বয়সের ভারে একেবারে ন্যুজ। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না। কাফিররা তাকেই তাদের মুনাজির হিশেবে নির্ধারণ করে।
মুনাজারা বা বিতর্কের স্থানে উভয় পক্ষ যখন জড়ো হলেন, তখন মুসলিমদের পক্ষ থেকে হজরত আলি রা. বললেন, আপনাদের পক্ষ থেকে যে আমার সাথে মুনাজারা করবে, তাকে আমি একবার দেখতে চাই। যেহেতু তিনি আমার সাথে মুনাজারা করবেন, তাই আমি তাকে ভালো করে দেখতে চাই। আপনাদের মুনাজির একটু দাঁড়ান তো!
কাফিরপক্ষের ওই বৃদ্ধ সাহিত্যিক মুনাজির তখন কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আবার বসে যায়। আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু পুনরায় তাকে দাঁড়াতে বললেন। বয়স্ক পণ্ডিত ভাবল, আলি হয়ত তাকে দেখতে পাননি, তাই দ্বিতীয়বার দাঁড়াতে বলছেন! সে আবারও উঠে দাঁড়াল এবং নিজের পরিচয় দিয়ে বসে পড়ল।
লোকটি বসে যাওয়ার পর হজরত আলি আবারও তাকে উঠে দাঁড়াতে বললে সংগত কারণেই বৃদ্ধ মুনাজির তখন রাগে কটমট করতে করতে দাঁড়িয়ে বলল, 'হাজা শাইয়ুন উজাব, আনা রাজুলুন কুব্বার, আতাত্তাখিজুনি হুজুয়া।'
বৃদ্ধ যখন এই কথাগুলো বলছিল, হজরত আলি তখন মুচকি হাসছিলেন। কারণ, তার মুখ থেকে এমন তিনটি কথা বেরিয়ে আসে, যে তিনটি শব্দের শুদ্ধতা নিয়ে তাদের প্রশ্ন ছিল এবং কুরআনে থাকা এই শব্দগুলো ভুল প্রমাণের জন্যই আজকের এই মুনাজারার আয়োজন!
বৃদ্ধ লোকটির কথার মানে হলো, 'এটা তো আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি একজন বৃদ্ধ লোক হওয়া সত্ত্বেও আমাকে এক-দুবার নয়, তিনবার দাঁড় করানো হলো! এটা কেমন কথা? তুমি কি নিয়ে ঠাট্টা করছেন?'
বৃদ্ধ লোকটি তার কথা শেষ করতেই মুসলিমপক্ষে বিজয়ধ্বনি শুরু হয়ে গেল। কারণ, কাফিররা যাকে তাদের মুনাজির হিশেবে নিয়ে এসেছিল, সে বড় একজন সাহিত্যিক ছিল। কোনো শব্দের শুদ্ধতা যাচাইয়ে সাহিত্যিকদের মতামত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ হলেন সকল সাহিত্যিকের সাহিত্যিক, তাঁর চেয়ে বড় কোনো সাহিত্যিক নেই। সুতরাং আল্লাহ কুরআনে যেসব শব্দ ব্যবহার করেছেন, এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। মুনাজারা অনুষ্ঠানে স্বয়ং কাফিরপক্ষের মুনাজিরই অনিচ্ছাবশত এসব শব্দের শুদ্ধতার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হতে হলো।
বৃদ্ধের এসব শব্দ উচ্চারণের পর তাই আর কোনো বিতর্কের প্রয়োজন পড়েনি। আলি রা. তখন কাফিরদের উদ্দেশ করে বলেন, 'আপনাদের মুনাজির যিনি, তিনিই এসব শব্দ ব্যবহার করেছেন। এগুলো যদি অশুদ্ধ হয়, তবে তিনি এগুলো ব্যবহার করলেন কেন? মুনাজারায় কাফিররা অত্যন্ত লজ্জিতভাবে পরাজিত হলো এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হলো।
📄 জালিকাল কিতাব
জালিকাল কিতাব মানে এটি এমন কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘জালিকা’ শব্দটি দূরবর্তী কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কুরআন তো আমাদের নিকটবর্তী। আর নিকটবর্তী কিছু বোঝাতে সাধারণত ‘হা-জা’ বলা হয়। তাহলে তো জালিকাল কিতাব না বলে ‘হা-জাল কিতাব’ বলা উচিত ছিল?
এ মুহূর্তে আপনাদের জানা দরকার, এ প্রশ্নের দুটি উত্তর :
১. হা-জা না বলে জালিকা বলা হয়েছে কুরআনের সম্মানার্থে।
২. মূল কুরআন যা লাওহে মাহফুজ ও বাইতুল ইজ্জাতে সংরক্ষিত, জালিকা বলা হয়েছে তার প্রতি ইঙ্গিত করে। লাওহে মাহফুজ ও বাইতুল ইজ্জাহ আমাদের থেকে অনেক দূরে।
আল কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কিতাব, অর্থাৎ পবিত্র কুরআনে কারিম, যা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাজিল হয়েছে।
লা রাইবা ফী মানে যাতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ, কুরআনে কারিম এমন এক কিতাব, যাতে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। রাইব মানে সন্দেহ। সন্দেহের অনেক ধাপ আছে। সন্দেহের অনেক স্তর আছে। তাই রাইব শব্দের মর্ম বুঝতে হলে আমাদেরকে আরও চারটি শব্দের অর্থ জানতে হবে। সেগুলো হলো,
• শক (شك) • জন (ظن) • ওহম (وهم) • ইয়াকিন (يقين)
কোনো বিষয়ের দুটি দিক সমান হলে তাকে شک বা সন্দেহ বলা হয়। যেমন, যদি এমন হতো যে, কুরআন একটি বিষয় এবং কুরআনের দুটি দিক রয়েছে— কুরআন আল্লাহর কালাম এবং কুরআন আল্লাহর কালাম নয়। যদি এমন হতো, তাহলে এখানে شک শব্দটি ব্যবহার করা যেত। বলা যেত, ذلك الكتاب لا شك فيه
দুটি বিষয়ের কোনো একটি দিক যদি গালিব বা অগ্রাধিকারী হয়, তখন সেটাকে ظن বা প্রবল ধারণা বলে। যদি কোনো দিক মাগলুব বা অনগ্রাধিকারী হয়, সেটাকে বলে وهم বা নিছক ধারণা। আর যদি কোনো বিষয়ের কোনো দিক দিয়েই কোনো ধরনের সন্দেহ না থাকে, যেটাকে يقين বা দৃঢ় বিশ্বাস বলা হয়। আর যদি সামান্য সন্দেহ থাকে, যেটাকে বলে সন্দেহের জন্য সন্দেহ করা, তখন সেটাকে বলে ريب
সুতরাং, لا ريب فيه এর মর্ম হবে, কুরআন সন্দেহের বস্তু নয়। কেউ যদি সন্দেহ করে, সেটা হবে তার নিজের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ। এখানে কুরআনের কোনো দোষ নাই। কুরআন আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত জান্নাতি জীবন যাপনের আদর্শ গাইডলাইন, সন্দেহাতীত কিতাব। আল্লাহ বলেন, تَنْزِيلُ مِنْ رَّبِّ الْعَلَمِينَ
এই কুরআন রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত।
নবিজি ﷺ বলেন, دع ما يريبك إلى ما لا يريبك সন্দেহযুক্ত জিনিস পরিহার করো এবং সন্দেহমুক্ত জিনিস গ্রহণ করো।
এ জন্য কুরআন বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কুরআন বলেছে, وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِّثْلِهِ﴾
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাকো, তবে তোমরা তার মতো একটি সুরা নিয়ে আসো। [সুরা বাকারা: ২৩]
চ্যালেঞ্জের সারমর্ম হলো, আল্লাহ বলেন, তোমরা যদি কুরআনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে থাকো, তোমরা যদি মনেকরো কুরআন সত্যি সত্যি আল্লাহ তার নবির কাছে নাজিল করেছেন, নাকি মুহাম্মাদ নিজে তৈরি করে ফেলেছেন, তাহলে কুরআনের ছোট্ট সুরার মতো একটি সুরা তৈরি করে দেখাও তো!
প্রিয় মুসল্লিয়ানে কেরাম!
একটু মনযোগ দিয়ে কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। আল্লাহপাক وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ বলেছেন, وَإِذَا كُنتُمْ فِي رَيْبٍ বলেননি। কারণ, إِن আসে সন্দেহ বোঝাতে, আর إِذَا আসে নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে। যেহেতু কুরআনে নিশ্চিতভাবেই কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, যারা সন্দেহ করেছে, সেটা জাস্ট সন্দেহ করার জন্য সন্দেহ করা। এ জন্য আল্লাহ إِذَا كُنتُمْ না বলে إِن كُنتُم বলেছেন।
এ জন্যই কুরআনের শুরুতে আল্লাহপাক চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করেন, ذلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
এই কিতাব তথা কুরআনে ভুলভ্রান্তি থাকবে তো দূরের কথা, কোনো ধরনের সন্দেহেরই অবকাশ নাই। এই ঘোষণাতেই বোঝা যায় কুরআন নিঃসন্দেহে আল্লাহর কালাম। কারণ, মানুষ মানুষের ব্যাপারে এভাবে চ্যালেঞ্জ করে না। আপনারা অবশ্যই জানেন, পৃথিবীর কোনো লেখক যখন কোনো বই লিখেন, তখন তিনি তার বইয়ের ভূমিকায় কখনো এমন চ্যালেঞ্জ করেন না। তিনি বলেন না, 'আমার এই বইটি ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে'; বরং উল্টোটাই বলেন। তিনি লিখেন, 'আমার এই বই ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়। কারও নজরে ভুল ধরা পড়লে দয়া করে আমাকে জানাবেন, আমরা পরবর্তী সংস্করণে শুধরে নেব।'
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে কুরআন থেকে হিদায়ত গ্রহণের তৌফিক দান করুন। আমিন।
📄 হিদায়াত কাকে বলে
এখন আমরা হিদায়ত সম্পর্কে আলোচনা করব। কুরআনে আল্লাহ বলেন, হুদাল লিল মুত্তাকিন-হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্য। হিদায়ত শব্দের চারটি অর্থ রয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতেও হিদায়তের মোট চারটি অর্থ পাওয়া যায়। এগুলো বুঝতে পারলে হিদায়ত সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ হবে, ইনশাআল্লাহ।
হিদায়ত চার প্রকার : হিদায়তে ফিতরাত, হিদায়তে নাজাত, হিদায়তে তাওফিক ও হিদায়তে মাকসুদ। এবার আমরা হিদায়তের প্রকারগুলো নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
হিদায়তে ফিতরাত
হিদায়তে ফিতরাত মানে স্বভাগতভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের মাধ্যমে মানুষকে হিদায়তের নিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এটা শুধু মানুষকে নয়; বরং জানোয়ারদেরও দিয়েছেন। এটাকে হিদায়তে জরুরত বা স্বভাবগত হিদায়ত বা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও বলা হয়।
এই হিদায়ত আল্লাহ তাআলা মানুষকে তো দিয়েছেনই, প্রত্যেক সৃষ্টিকেই দিয়েছেন। যেমন, একটা হাঁসের বাচ্চা ডিম থেকে ফুটার পরই হাঁটতে পারে, সাঁতার কাটতে পারে। খাবার খেতে পারে। এই যে জ্ঞান বা হিদায়ত, এটা আল্লাহর দান। যার যেটা দরকার, আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে তাকে সেটা দান করেন।
কিন্তু মানবশিশুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। মানবশিশু জন্মের পর কিছুই করতে পারে না। হাঁটতে গেলে অন্তত ২-৩ বছর সময় লাগে। সাঁতার শিখতে ৮-৯ বছর লাগে। মানবশিশু জন্মের পরই নিজের হাতে খাবার খেতে পারে না; তার মুখে তুলে খাওয়াতে হয়। এখানে দেখা গেল, আল্লাহ মানুষকে দুর্বল হিশেবে ভূমিষ্ট করান। তবে এই দুর্বল মানুষই যদি আল্লাহর হুকুমমতো তার জীবন পরিচলনা করে, আল্লাহ তাকে ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি মর্যাদা দান করেন। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَخُلِقَ الْإِنْسَانُ ضَعِيفًا
আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে। [সুরা নিসা: ২৮]
এই হিদায়ত প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى
মুসা বললেন, আমাদের রব তিনি, যিনি সকল বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর সঠিক পথ নির্দেশ করেছেন। [সুরা তাহা : ৫০]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّى وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَى
তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো, যিনি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সুসম করেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন এবং পথ প্রদর্শন করেছেন। [সুরা আলা: ১-২]
আয়াতে 'ফাহাদা' শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এই হিদায়ত যা প্রত্যেক সৃষ্টিকে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, যে হিদায়তের মাধ্যমে কোন জিনিসে লাভ আর কোন জিনিসে ক্ষতি, এটা বোঝার ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়েছে। এটা হলো হিদায়তে জরুরত। এই হিদায়ত সবার জন্য প্রযোজ্য, মুসলিম, কাফির, জীবজন্তু সবাইকে দিয়েছেন।
প্রত্যেকেই তারা তাদের মায়ের গুরুত্ব বোঝে। পেটে যে ক্ষুধা তৈরি হয় এবং খাওয়ার পর ক্ষুধা নিবারণ হয়, এটা শুধু মুসলমানই বোঝে না; বরং সকলেই বোঝে। এটাও একটা হিদায়ত। এটাকে স্বাভাবিক বা জরুরি হিদায়ত বলে। আর হিদায়তে জরুরত এটা সকলের জন্য। এই হিদায়ত একটা মোরগকেও দেওয়া হয়েছে। যেমন একটা মুরগিকে আপনি কয়েকটি ডিম দিয়ে কুঁচে বসালেন। মুরগি ডিমকে তা দেয়, একপর্যায়ে যখন ডিম থেকে বাচ্চার ফুটার সময় হয়, তখন মুরগির এই অনুভব হয় যে, ডিম ফুটো করে দিতে হবে। কারণ, ডিমে যদি ছিদ্র করা না হয়, তাহলে ভেতরের বাচ্চা দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে। এই যে জ্ঞান, ডিমের নির্দিষ্ট জায়গায় ছিদ্র করে বাচ্চার শ্বাসপ্রশ্বাসের রাস্তা করে দেওয়া এটা কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিয়ার, শিক্ষক বা কেউ শিখিয়ে দেয়নি; বরং আল্লাহই তাকে এমন হিদায়ত দিয়েছেন।
এমনিভাবে একটা বিড়াল যখন বাচ্চা প্রসব করে, তখন সে তার সুবিধামতো নিরাপদ জায়গায়ই বাচ্চা জন্ম দেয় এবং এমনভাবে লালনপালন করে, যাতে বাচ্চাদের কোনো কষ্ট না হয়। এই যে বাচ্চা লালনপালনের জ্ঞান, প্রসবের সময় নিরাপদ জায়গা খোঁজার চেষ্টা, এই হিদায়ত কে দিয়েছেন? অবশ্যই আল্লাহ দিয়েছেন। এ জন্য এটাকে হিদায়তে জরুরত বলে।
হিদায়তে নাজাত
হিদায়তে নাজাত হলো, যে হিদায়তের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে জান্নাতে যাওয়া যায়। এই হিদায়ত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِأَيْتِنَا يُوقِنُونَ
আর আমি তাদের থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশমতো সৎপথপ্রদর্শন করত, যতদিন তারা ধৈর্য অবলম্বন করেছিল আর আমার আয়াতসমূহের উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল। [সুরা সাজদাহ : ২৪] অর্থাৎ, আমি আল্লাহ পূর্ববর্তী জাতির মধ্যে দ্বীনি নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁদের মনোনীত করেছি, যাতে করে তাঁরা আমার হুকুমে মানুষকে দ্বীনের পথে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, তোমরা দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করো, দ্বীনের পথে এসো। এখন যে এই আদেশ মেনে দ্বীনের পথে চলবে, এর মাধ্যমে যে হিদায়ত লাভ করবে, এই হিদায়ত তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবিজি বলেন,
كَانَت بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ، كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيُّ خَلَفَهُ نَبِي
বনি ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতেন নবিগণ। যখনই তাদের কোনো নবি ইনতিকাল করতেন, তখন অন্য নবি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন।
আর এমন হিদায়ত লাভ করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ অন্তরের। অন্তর সস্বচ্ছ হয় কিভাবে, এ সম্পর্কে ধারাণা দিতে আমি সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসটি পড়েছি। হজরত হুজাইফা বিন ইয়ামান রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসটি হচ্ছে, تُعْرَضُ الفِتَنُ عَلَى القُلُوبِ كَعَرْضِ الحصيرِ عُودًا عُودًا মানুষের অন্তরে ফিতনা এমনভাবে আবর্তিত হবে, যেভাবে চাটাই বুননের সময় একটার পর একটা বেত লাগানো হয়।
এখানে একটা কথা বলা জরুরি মনে করছি। আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। কথাটি হলো, এটা ফিতনার যুগ; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জামানা বা যুগের মধ্যে ফিতনা নয়; বরং ফিতনা হলো নিজের মধ্যে। জামানার মধ্যে যদি ফিতনা থাকত, তাহলে ফিতনা কোথায় কোথায় পাওয়া যায়, এর একটা ঠিকানা বা মার্কেট থাকা দরকার ছিল; কিন্তু এমন তো নয়। তাই ফিতনার স্থান হলো অন্তর। নবিজির হাদিসের মাধ্যমেও এটা স্পষ্ট যে, ফিতনা নাজিল হয় মানুষের অন্তরে। পরে এখান থেকেই এর বিস্তার ঘটে। এবার আপনারা নিজেই বুঝতে পারবেন, আপনি ফিতনার যুগে আছেন, নাকি নিজেই ফিতনা বয়ে বেড়াচ্ছেন!
আপনি ফিতনার মধ্যে আছেন কিনা, সেটা যাচাই করে নিন। যদি ফিতনার মধ্যে আবর্তিত থাকেন, তাহলে এখনই নিজেকে শুধরে নিন। ফিতনামুক্ত জীবন গড়তে সচেষ্ট হোন। কেননা, এ অবস্থায় যদি মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে বাঁচার কোনো উপায় নেই।
এখন যারা বলে বেড়ায় যে, মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে, মূলত সে সবচেয়ে বড় নষ্ট। নিজের খবর নেই, মানুষকে নিয়ে পেরেশানি! আমরা এমন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। এমন লোকের ব্যাপারে নবিজি বলেন, من قال هلك الناس فهو أهلكهم
রয়িসুল মুহাদ্দিসিন হজরত আবু হুরায়রাহ রাজিআল্লাহু আনহু থেকে মারফুআন বর্ণিত; যারা বলে মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে, সে-ই বড় নষ্ট।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مِّنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ * إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ ﴾ হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর তোমাদের নিজদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাকো, তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। তখন তিনি তোমরা যা আমল করতে তা তোমাদের জানিয়ে দেবেন। [সুরা মায়েদা: ১০৫]
বর্তমান যুগটাই এমন যে, নিজের ঈমান-আমলের চিন্তা সবার আগে করা দরকার। নিজের এসব বিষয়ে চিন্তা না করে শুধু অন্যের দিকে যারা নজর দেয়, এদের সম্পর্কে রাসুল বলেন, এরাই সবচেয়ে বড় নষ্ট। এদের নিজেদের ঈমান-আমল আগে ঠিক করা দরকার।
হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামানকে নবিজির গুপ্তভেদের অধিকারী বলা হতো। ফিতনা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি হাদিস তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন, تُعْرَضُ الفِتَنُ عَلَى القُلُوبِ كَعَرْضِ الحَصِيرِ عُودًا عُودًا
অর্থাৎ, মানুষের অন্তরে ফিতনা এমনভাবে আবর্তিত হবে, যেভাবে চাটাই বুননের সময় একটার পর একটা বেত লাগানো হয়। ঠিক তেমনিভাবে আখেরি জামানায় মানুষের অন্তরেও এভাবে ফিতনা গেঁথে যাবে। কান দিয়ে একটা ফিতনার কথা শুনবে, চোখ দিয়ে দেখবে। এভাবে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তার অন্তরে ফিতনা জোড়া লাগতে থাকবে। তখন তার অন্তর বা কলবের অবস্থা কেমন হবে, এ সম্পর্কে রাসুল বলেন, 'যে কলব বা অন্তর ফিতনাসম্পর্কিত জিনিসগুলো সহজেই মেনে নেয়, যেমন কোনো গুনাহের কাজ করলে আনন্দ পায়, বা গুনাহের কাজ দেখলে আনন্দ অনুভব করে। এমন কলবে তখন একটি কালো দাগ বসে যায়। এভাবে যতটা গুনাহের কাজ দেখবে বা করবে, ততটা কালো দাগ তার অন্তরে গেঁথে যাবে।
অন্য হাদিসে রাসুল বলেন, أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ
প্রতিটি মানুষের শরীরে গোশতের একটি টুকরা রয়েছে। এই গোশতের টুকরা যতক্ষণ ভালো থাকে, পুরো শরীর ভালো থাকে, আর যখন এটি নষ্ট হয়ে যায়, তখন পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। সাবধান! এই মাংসের টুকরার নাম হচ্ছে কলব।
মানুষের শরীরে যেসব অঙ্গ রয়েছে, ধারাবাহিক গুনাহের কাজের মাধ্যমে ফিতনায় জড়িত হতে থাকলে তার হাত, পা, মুখ, জিহ্বা ইত্যাদি সব অঙ্গ খারাপ হয়ে যাবে। কেন খারাপ হবে? কারণ, তখন তার অন্তর খারাপ হয়ে যাবে। আর অন্তর হলো পুরো শরীরের রাজধানী। এখন কলব নামক রাজধানীতেই যদি সমস্যা দেখা দেয়, তখন শরীর নামক রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোতেই সমস্যা তৈরি হয়ে যাবে। ফলে অন্তর যদি খারাপ হয়, তাহলে মুখের ভাষা খারাপ হবে, চোখের দেখা খারাপ হবে, হাত মন্দ কাজে ব্যয় হবে। এ কারণে সব ফিতনা নাজিল হয় অন্তরে।
এখন আপনার অন্তর কেমন, সেটা নিজে নিজেই যাচাই করে নেবেন। আপনার চোখ রয়েছে, এই চোখ দিয়ে যদি গুনাহের কাজ দেখতে ভালো লাগে, তবে আপনার অন্তরে ফিতনা রয়েছে। গুনাহের কাজ শুনতে ভালো লাগে, তাহলে আপনার অন্তরে ফিতনা রয়েছে। হাত দিয়ে গুনাহের কাজ করতে ভালো লাগে, তবে আপনার অন্তরে ফিতনা রয়েছে। আর স্বচ্ছ অন্তর ছাড়া জান্নাতে যাওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন, يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ )
যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন উপকারে আসবে না। কেবল (সাফল্য লাভ করবে) সে, যে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর নিকট আসবে। [সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯]
এটা হলো হিদায়তে নাজাত। এখন কেউ যদি কোনো গুনাহের কাজ দেখে, কিন্তু সে তাতে লিপ্ত হয়নি এবং পছন্দও করেনি; কান দিয়ে শুনতে পেয়েছে, তবে তার অন্তর সেটা গ্রহণ করেনি বরং ঘৃণা প্রকাশ করেছে, তাহলে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুল বলেন, তার অন্তরে সাদা দাগ বসিয়ে দেওয়া হবে। তার অন্তর হবে স্বচ্ছ।
ফিতনার ঠিকানা
নবিজি আরও বলেন, শেষ জামানায় মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। তবে এই বিভক্তি মুসলিমদের মধ্যেই হবে, কাফির আর মুসলিম নয়। একভাগ হবে ঈমানদার, যাদের অন্তর হবে স্বচ্ছ, তাতে কোনো নেফাক থাকবে না। আর অপরভাগ হবে মুনাফিক, যাদের অন্তরে ঈমানের লেশমাত্র নেই, তবে নেফাকের আখড়া থাকবে। তখন খলিফা মাহদির আভির্ভাব হবে। যারা খাঁটি ঈমানদার, তারা খলিফা মাহদির অনুসরণ করবে। এদের মাধ্যমেই পুরো বিশ্বে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়বে। এরাই হবে দুনিয়া আখিরাতে সফল। আর যারা মুনাফিক, তারা ইহুদিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।
মোটকথা, ফিতনা মার্কেটে পাওয়ার বস্তু নয়; বরং ফিতনা নিজের মধ্যে আছে কিনা, সেটা দেখতে হবে। কারণ, ফিতনার আশ্রয়স্থল হলো কলব বা অন্তর। এ সম্পর্কে রাসুল বলেন, মানুষের অন্তর দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। কোনো কোনো মানুষের অন্তর হবে সাদা মর্মর পাথরের মতো স্বচ্ছ। চতুর্পার্শ্বে ফিতনার সময় এদের কোনো ক্ষতি হবে না। আর এ ধরনের অন্তর যাদের হবে, কিয়ামত পর্যন্ত ফিতনা তাদের অন্তরে কোনো ক্ষতি পৌঁছাতে পারবে না। যেমন, ওয়াটার প্রুফ থাকলে ভেতরে পানি পৌঁছতে পারে না, তেমনি চারপাশে ফিতনার সয়লাব থাকলেও স্বচ্ছ অন্তরের কারণে তাকে ফিতনা গ্রাস করতে পারবে না।
আর যাদের অন্তর কালো থাকবে, তাদের সম্পর্কে রাসুল বলেন,
لا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا، ولا يُنْكِرُ مُنْكَرًا، إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِن هَواهُ.
অর্থাৎ, এদের অন্তরের অবস্থা হবে কালো ছাইয়ের মতো। এদের তুলনা হলো কয়লার মতো। কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না, ঠিক তেমনি এদের অন্তরও কখনো পরিচ্ছন্ন হবে না। কারণ, এদের অন্তরে মোহর মারা। আল্লাহ বলেন,
خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
আল্লাহ তাদের অন্তরকরণ এবং তাদের কানসমুহ বন্ধ করে দিয়েছেন। আর তাদের চোখসমুহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সুরা বাকারা: ৭]
আর যাদের অন্তর স্বচ্ছ, তাদের তুলনা হলো সাদা কাপড়ের ন্যায়। কেননা, সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে সেটা খুব সহজেই নজরে ভাসে। এ জন্য স্বচ্ছ অন্তরওয়ালা কেউ যদি কোনো গুনাহ করে ফেলে, তখন সাথে সাথে তাওবাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। আর যে সাথে সাথে ক্ষমা চায়, তার সম্পর্কে রাসুল বলেন,
التائب مِنْ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
যে গুনাহ থেকে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে এমনভাবে নিষ্পাপ করে দেন, যেন সে গুনাহই করেনি, কিন্তু এই বোঝ বা বোধ তখনই অর্জিত হবে, যদি তার অন্তর সাদা-স্বচ্ছ হয়। আর অন্তর যদি হয় কালো, তবে তার এই বোঝ তো অর্জিত হবেই না; বরং গুনাহের কাজটি তখন তার আরও ভালো লাগবে। কারণ, তার অন্তর যে কালো।
এখন যাদের অন্তরে কালো দাগ রয়েছে, তারা কুরআন পড়তে বা শুনতে ভালো লাগে না, কুরআন তাফসিরের মজলিসে বসতে ভালো লাগে না, বেশি বেশি নামাজ পড়তে, রোজা রাখতে ভালো লাগে না; বরং বাজে আড্ডা-ইয়ার্কি, আমোদ-ফুর্তি, গানবাজনা ইত্যাদি তার ভালো লাগে, তাহলে এদের অন্তর নষ্ট।
হাদিসে নবিজি বলেন, এদের অন্তর কালো, তার উপর উল্টো! যেমন—আপনি যদি একটি গ্লাস ঠিকমতো ধরে তাতে পানি ঢালেন, তাহলে সহজেই গ্লাস পানিতে ভরে উঠবে। আর যদি গ্লাস উল্টো করে ধরেন, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত পানি ঢাললেও গ্লাসে একফোটা পানিও ভরবে না। ঠিক তেমনি যাদের অন্তর কালো, এদের যতই বোঝানো হোক, তারা বোঝবে না। বোঝার চেষ্টাও করবে না। এমন অন্তর নিয়ে যদি মারা যায়, তাহলে সে গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়ে মারা যাবে। নাউজুবিল্লাহ।
এদের সম্পর্কে রাসুল বলেন, 'এরা ভালোমন্দ কিছুই বোঝে না; বরং তার মনে যেটা চায়, সেটাই বোঝে।' এমন ফিতনাওয়ালা অন্তর নিয়ে হিদায়ত পাওয়া যাবে না। এ জন্য আমরা আমাদের অন্তর স্বচ্ছ রাখতে চেষ্টা করব। নেফাক থেকে বেঁচে থাকব। আল্লাহ আমাদেরকে স্বচ্ছ অন্তর নিয়ে মৃত্যু দান করেন, আমিন।
আজ আমরা হিদায়তের প্রথম দুটি আলোচনা করলাম। আগামীকাল বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা করবার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
📄 হিদায়াতের ব্যাখ্যা
আল্লাহর শুকরিয়া যে, আল্লাহ তাঁর কালামের পেছনে সময় অতিবাহিত করার সুযোগ আমাদের দিয়েছেন। হে আল্লাহ আপনার সাক্ষাৎ লাভ করার যত ব্যবস্থা রয়েছে, এরকম সব ব্যবস্থা গ্রহণের তাওফিক দিন আমাদের।
হুদাল লিল মুত্তাকিন অর্থাৎ কুরআন হলো মুত্তাকিদের হিদায়ত। আমরা হিদায়ত শব্দের আলোচনা করছিলাম। বলেছিলাম, হিদায়ত শব্দের চারটি অর্থ রয়েছে।
এক. হিদায়তে ফিতরাত। অর্থাৎ স্বভাগতভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের মাধ্যমে মানুষকে হিদায়তের নিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এটা শুধু মানুষকে নয়; বরং জানোয়ারদেরও দিয়েছেন। এটার আলোচনা পেছনে অতিবাহিত হয়েছে।
দুই. হিদায়তে নাজাত। অর্থাৎ, যে দিকনির্দেশনার মাধ্যমে একজন মানুষ সোজা জান্নাতে পৌঁছতে পারে। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ আর আমরা তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমাদের নির্দেশ অনুসারে হিদায়ত করত; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আর তারা আমাদের আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। [সুরা সাজদাহ: ২৪]
তাঁদের দায়িত্ব হলো হিদায়ত করা অর্থাৎ, জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া। এটা হলো হিদায়তে নাজাত। শুধু নাজাতের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নবি-রাসুলদের; নাজাত দেওয়ার দায়িত্ব নয়। কারণ, হিদায়ত একমাত্র আল্লাহর হাতে। নাজাতের পথ দেখানোর দায়িত্ব হলো নবি-রাসুলদের, জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছানো নয়; সেটা আল্লাহর হাতে। কুরআনে নবিজি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ - হে নবি, আপনি যাকে ইচ্ছা, তাকে হিদায়ত করতে পারবেন না।
অপরদিকে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ হে নবি, অবশ্যই আপনি মানুষকে সোজা পথ দেখান। [সুরা শূরা: ৫২]
উপরিউক্ত দুটি আয়াতে বাহ্যিক একটা বৈপরিত্ব লক্ষ করা যায়। এক আয়াতে বলা হয়েছে, হে নবি, আপনি সোজা পথ দেখানোর জিম্মাদার নন, আবার পরের আয়াতে বলা হয়েছে, অবশ্যই আপনি মানুষকে সোজা পথ দেখান। এই বৈপরীত্বের কারণ কি? আপনি যাকে ইচ্ছা, তাকে হিদায়ত করতে পারবেন না। এর মর্ম হলো, হিদায়ত গ্রহণ করানো বা হিদায়ত করিয়ে মানজিলে মাকসাদে অর্থাৎ জান্নাতে পৌঁছানোর দায়িত্ব আপনার নয়। এটা একমাত্র আল্লাহর হাতে।
আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে, وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ - অর্থাৎ আল্লাহ যাকে চান, তাকেই হিদায়ত দেন। [সুরা কাসাস : ৫৬]
এখন হিদায়ত যদি আল্লাহর হাতে না থাকত, তাহলে কালো সাহাবি হজরত বিলাল রাজিআল্লাহু আনহু হিদায়ত পেতেন না। বিলাল, যাঁর কুশ্রী চেহারার কারণে মানুষ তাকে কালো কাক বলে উপহাস করত আর বলত, মুহাম্মাদ এই কালো গোলামকে মুআজ্জিন বানিয়েছেন, আর কাউকে পাননি। নাউজুবিল্লাহ।
সেই বিলাল, কালো বিলালের বাহ্যিক চেহারা কালো হলেও তাঁর ভেতর বা অন্তর ছিল সাদা। যে কারণে তাঁর মর্যাদা এতই উঁচুতে পৌঁছেছিল যে, নবিজি বলেন, মেরাজ রজনীতে জান্নাতে আমি আমার বিলালের জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটার শব্দ শুনে এসেছি! সুবহানাল্লাহিল আজিম।
অন্তর সাদা হলে ফিতনা থেকে বাঁচা যায়। গতকাল এ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আপনাদের কি স্মরণ আছে? বলেছিলাম, ফিতনার অবস্থান বাজারে বা মার্কেটে নয়, বরং এর জায়গা হচ্ছে অন্তর। এ জন্য অন্তরের ফিতনা দূর করতে পারলে সফলতা পদচুম্বন করবে।
হিদায়তের মূল কথা
সুরা বাকারার শুরুতে আল্লাহ তাআলা ছয়টি পয়েন্টের আলোচনা করেছেন। প্রথমত, ঈমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের উপর ঈমান আনা। দ্বিতীয়ত, নামাজ কায়েম করা। তৃতীয়ত, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা। চতুর্থত, পূর্ববর্তী সকল নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনা। পঞ্চমত, রাসুল -এর উপর যা কিছু নাজিল হয়েছে, সবকিছুর উপর ঈমান আনা। ষষ্ঠত, আখিরাতের উপর ঈমান আনা। এই ছয়টা গুণ যারাই অর্জন করতে পারবে, তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ এরাই হলো সফলকাম।
এ ছাড়া নবিজি তাঁর হাদিসে বিষয়টিকে সংক্ষেপে এভাবে বর্ণনা করেছেন,
يا أيها الناس قولوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ تُفلحوا
হে লোকসকল! বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, সফল হয়ে যাবে।
আমাদের জানা দরকার। কুরআন বোঝা দরকার। তাহলেই সফলতা লাভ হবে। জীবন সার্থক হবে। অন্তরের কালো দূর করে সাদা-স্বচ্ছ করা যাবে। এক হাদিসে নবিজি বলেন, যত বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির করা হবে, তার অন্তরের ময়লা তত বেশি দূর হবে। হাদিসে আছে,
جددوا إيمانكم قيل: يا رسول الله وكيف نجدد إيماننا؟ قال: أكثروا من قول: لا إله إلا الله
তোমরা তোমাদের ঈমানকে পুনরায় সতেজ করো। বলা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কীভাবে আমাদের ঈমানকে পুনরায় সতেজ করব? তিনি বললেন, তোমরা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বেশি বেশি পাঠ করো।
ফিতনা যখন সৃষ্টি হয়, তখন কলবে কি শুধু একটা দাগই বসে? না, যত ফিতনা সৃষ্টি হয়, তত দাগ পড়ে। অর্থাৎ কোথাও কোনো গুনাহের আলোচনার কথা শুনলে তা অন্তরে গেঁথে নেয়। এভাবে কানে শোনে, চোখে দেখে যত গুনাহ করবে, অন্তরে তা কালো দাগ হিশেবে বসে যাবে। যে পরিমাণ গুনাহ করবে সে পরিমাণ ময়লার কালো দাগ পড়বে। আর এই কালো কেমন হবে, সেটা গতকালের আলোচনায় বলেছি। এই দাগ কয়লার চেয়ে কালো হবে। আল্লাহ হলেন দয়ালু, ফলে কয়লা ধুইলে ময়লা না গেলেও অন্তরের কালো পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রেখেছেন আল্লাহ। কিন্তু চাইলে অন্তর এমন পরিষ্কার করা যায় যে, কালো অন্তর একদম স্বচ্ছ হয়ে যাবে। তাই কেউ যদি গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করে রাখে, তখন তার অন্তর ফিতনা থেকে মুক্ত থাকে। ফলে তার অন্তর সাদা মর্মর পাথরের চেয়েও স্বচ্ছ হয়ে যায়।
এভাবে কেউ যখন গুনাহের কাজ থেকে নিজের অন্তরকে হেফাজত করতে পারে, তখন তার অন্তর এতই আলোকিত হয় যে, তখন আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তার অন্তরে থাকেন না। তখন সে জমিনে বাস করলেও তার অন্তর থাকে আরশে। জনৈক ওলি বলেন,
خيالك في عيني وذكرت في فمي : ومثواك في قلبي فأين تغيب
তোমার কুদরতি চিত্র আমার চোখে, তোমার জিকির আমার মুখে, তোমার অবস্থান আমার বুকে, তাহলে কোথায় গায়েব হবে তুমি?
একজন মানুষের যখন এমন অবস্থা হয়ে যায়, তখন তার অন্তরে শুধু আল্লাহ থাকেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো, অন্য কিছুর স্থান থাকে না। এটাই হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর হাকিকত। আপনি শুধু আগুন উচ্চারণ করলেই আপনার ঠোঁট জ্বলবে না; কিন্তু আসল আগুনে শুধু ঠোঁটই জ্বলবে না; বরং আপনার কাপড় জ্বলবে, ঘরও জ্বলবে। আগুন শব্দ আর সত্যিকার আগুন এক নয়। ফলে বাস্তবের আগুন মুখে উচ্চারণ না করলেও তার প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে বাহ্যিকভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর উচ্চারণ এবং এর অ্যাকশন ভিন্ন।
এখন যদি কারও মধ্যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অ্যাকশন তৈরি হয়ে যায়, তখন তার জীবন এমন সফল হবে যে, সে জমিনে অবস্থান করবে আর তার পায়ের আওয়াজ শোনা যাবে জান্নাতে। হজরত বিলালের কথা নিশ্চই আপনাদের মনে আছে। কুচকুচে কালো একজন হাবশি গোলাম ছিলেন বিলাল। তিনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মাধ্যমে হিদায়ত লাভ করলেন। অপরদিকে আবু জাহল ছিল কুরাইশ বংশের, কিন্তু তার ভাগ্যে হিদায়ত জুটেনি। হিদায়তের মাধ্যমে অন্তর সাদা করার কারণে বিলালের মর্যাদা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল? রাসুল বলেন, আমি যখন মিরাজে যাই, তখন আমার সমানে জুতার আওয়াজ শুনতে পাই। আমি জিবরিলকে জিজ্ঞেস করি, হে জিবরিল, জান্নাতে আবার জুতার আওয়াজ কীসের? জিবরিল জবাব দেন, হে আল্লাহর নবি, এটা আপনার বিলালের জুতার আওয়াজ। সুবহানাল্লাহ। এটাই হচ্ছে হিদায়তে নাজাত।
হিদায়তে তাওফিক
হিদায়তের তৃতীয় প্রকার হলো হিদায়তে তাওফিক বা হিদায়তে ইআনাত। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য। এই যেমন আমরা মসজিদে এসে তাফসিরের আলোচনা শুনতেছি, এটা আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহর তাওফিক না থাকলে আমরা এখানে আসতে পারতাম না। আমাদের অনেক মুসলমান ভাই অযথা ঘুরাঘুরি করছে। তারা কুরআনের এই মাহফিলে এসে শরিক হতে পারেনি। আল্লাহপাক তাদেরকে এই তাওফিক দেননি। এর অর্থ, আল্লাহপাক তাদেরকে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে হাজির হওয়ার হিদায়ত তথা হিদায়তে ইআনাত দান করেননি।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হলো একটা দর্শনের নাম। যেমন কমিউনিজম একটা দর্শন এবং তার মূল লক্ষ্য হলো সবকিছুর মালিক হলো রাষ্ট্র, জনগণ শুধু শ্রমিক। ঠিক তেমনি আরেকটা দর্শন হলো গণতন্ত্র, যার মূলনীতি হলো সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, যেদিকে জনগণ বেশি, সেদিকটাই প্রাধান্য পায়। আর এটাই গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে সংখ্যালগিষ্টের কোনো মূল্য নেই, যদিও তারা ভালো হয়।
কমিউনিজম ও গণতন্ত্রের মতো এরকম ইসলামবিরোধী মতাদর্শের বাজারে আগুন জ্বালিয়ে দিতে মৌলিক একটা দর্শন নিয়ে এই পৃথিবীতে আগমন করেন শেষ নবি হজরত মুহাম্মাদ ﷺ। লা ইলাহা...হলো তাঁর আনীত এই দর্শনের মূলনীতি। আর এই মতবাদের মূলকথা হলো, ক্ষমতার উৎস জনগণও নয়, রাষ্ট্রও নয়; বরং সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ বলেন,
لَهُ مَا فِي السَّمَوتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى যা আছে আসমানসমূহ, জমিন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং যা আছে মাটির নিচে, সবই আল্লাহর। [সুরা তা-হা: ৬]
আসমান-জমিনে যা কিছু আছে, এবং মহাশূন্যে যা কিছু আছে, এবং তার গভীর তলদেশে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিক হলেন আল্লাহ তাআলা-এ কথা বিশ্বাস করতে হবে। এ জন্য ইসলামি দর্শনের মর্মকথা হলো, সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর বান্দার কাছে তার জান, মাল সবকিছু আমানত। এসবের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা।
این امانت چند روز دست است در حقیقت مالک اصلی خداست এ সমস্ত জিনিস কয়েক দিনের জন্য আমার কাছে আমানতমাত্র। মূলত সমস্ত জিনিসের সত্যিকার মালিক হলেন আল্লাহ।
এ জন্য কেউ যদি আত্মহত্যা করে, তাহলে সেটা কবিরা গুনাহ। কারণ, প্রাণের মালিক আল্লাহ। আপনাকে এই ক্ষমতা বা অধিকার দেওয়া হয়নি যে, আপনি নিজেই নিজের প্রাণ হরণ করবেন। এখন কেউ যদি বলে, প্রাণ তো আমারই, এখন আমি আত্মহত্যা করলে কী হলো? আল্লাহ বলেন, তোমার প্রাণের মালিক তুমি নও; বরং আল্লাহই এর প্রকৃত মালিক। আর তিনি তোমার কাছে এটা আমানত রেখেছেন। এ জন্য আত্মহত্যা করা হারাম। কেউ যদি আত্মহত্যা করে, জাহান্নাম ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর নেই। সুতরাং, আমাদের কাছে আল্লাহ প্রাণ আমানত রেখেছেন, সম্পদ আমানত রেখেছেন, সময় আমানত রেখেছেন, সন্তান আমানত রেখেছেন। এসবের কদর করতে হবে। এসব কিছুর মালিক হলেন আল্লাহ। এগুলোর মালিক যে আল্লাহ, এটা বিশ্বাস করার নাম হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দর্শন বা ইসলামি দর্শন।
এখন কথা হলো, সবকিছুর মালিক যখন আল্লাহ, তাহলে আমার জান মনগড়া চলবে, নাকি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী চলবে? আমার সময়, সম্পদ ও সন্তানাদি আমার ইচ্ছামতো চলবে, নাকি আল্লাহর হুকুমে চলবে? যুক্তি কী বলে?
আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর সৃষ্টি হিশেবে আমাদেরকে তাঁর বিধানমতো চলতে হবে, সবকিছু চালাতে হবে। মনগড়া চললে হবে না। এটা আল্লাহর নাফরমানি। সবকিছু আল্লাহর হুকুমমতো চালাতে হবে এবং এটাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করাই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহকে বিশ্বাস করা।
আমি শুধু লা ইলাহার জিকির করলাম কিন্তু নিজের জীবন পরিচালনায় আল্লাহকে মানলাম না, এটা তো হতে পারে না। আমি আমার জীবনের প্রতিটি কদম কীভাবে ফেলব—উচিত ছিল মালিককে জিজ্ঞেস করা। মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী চলা। কিন্তু আমরা চলি নিজের মর্জি-মাফিক! এটা তো হতে পারে না।
আমরা যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জব করি, অথবা কোনো দোকানে কাজ করি, দোকানের মালিক আমাদেরকে আওয়ার হিসাবে পে করেন। প্রতিদিন যত ঘণ্টা কাজ, তত ঘণ্টার পেমেন্ট। পারিশ্রমিক পাওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হয়, কিন্তু এই কাজও আবার নিজের খেয়াল-খুশি মতো করলে হয় না। মালিকের গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ করতে হয়। মালিক যেভাবে বলবে, তার কাজ সেভাবেই করতে হবে। এটাই নিয়ম। এটা আমরা সবাই বুঝি। খুব সহজেই বুঝে ফেলি।
এবার লক্ষ্য করুন। নিরপেক্ষভাবে আত্মবিচার করুন। মালিক আমাদের সৃষ্টি করেনি। সে আমাদের লালন-পালন করেনি। আট ঘণ্টা কাজ দিয়েছে। এই কাজের বিনিময়ে সামান্য পারিশ্রমিক দিচ্ছে। এ জন্য আমরা তার কথা মেনে চলি, অথচ যে আল্লাহ আমাদের নাই থেকে সৃষ্টি করলেন, জীবন দিলেন, লালন-পালন করলেন, সবকিছু দিলেন, তাঁর দেওয়া জীবন যদি তাঁর কথামত না চালিয়ে নিজের ইচ্ছামত চালাই, তাহলে এটা কতবড় নিমকহারামী?
মালিকের দোকানে কাজ করতে যেয়ে আমরা যদি মালিকের কথা না মানি, তাহলে মালিক আমাদেরকে আর কাজে রাখবে না। গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। সুতরাং আল্লাহর দেওয়া জীবন, আল্লাহর দেওয়া সময় যদি আল্লাহর কথায় ব্যয় না করি, উচিত তো ছিল আমাদেরকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া।
কিন্তু আল্লাপাক সেটা করেন না। আল্লাহ জানেন তিনি বের করে দিলে যাওয়ার আর জায়গাই থাকে না। কুরআন বলছে,
يُمَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَوَاتِ وَ الْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَنٍ
হে মানব এবং জিন জাতি! তোমাদের ক্ষমতা থাকলে আমার জমিন আসমানের বাইরে চলে যাও। বেরিয়ে যাও। আমার সালতানাতের বাইরে যেতে তো পারবে না। তাহলে তোমরা আমার কোন কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে? [সুরা আর রাহমান: ৩৩]
আমি যদি জীবনের প্রতিটি বাঁকে আল্লাহকে না মানি, তাহলে তো আমি লা ইলাহার দর্শনে বিশ্বাসী থাকলাম না। ফলে বান্দা হিশেবে আমি সফলও হব না। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা সব তন্ত্রমন্ত্র ছেড়ে দাও আর قولوا لا إله إِلَّا اللهُ تُفْلِحُوا বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাহলে দুনিয়া-আখিরাতে তোমরা সফল হতে পারবে, অন্যথায় নয়।
আমাদের অন্তরের মধ্যে অসংখ্য ফিতনা রয়েছে। এসব থেকে অন্তর মুক্ত করতে হবে। আর ফিতনার সূচনা হয় জ্ঞানের (!) মাধ্যমে। এবার আমরা ফিতনা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব। যেহেতু আমরা ফিতনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি, তাই প্রথমে আমাদের জানতে হবে, ফিতনা বলতে কী বোঝায়? এর পরিণতি কী?
আমাদের সমাজটা এমন যে, মানুষ এখন সবকিছুতেই উল্টো বুঝে। বস্তুত জ্ঞান বলতে মানুষ যে জিনিস বোঝে থাকে, সেটা আসলে জ্ঞানই নয়; বরং সেটা দুনিয়ায় বিচরণের একটা মাধ্যম মাত্র। আর এটাই হলো ফিতনার প্রথম ধাপ। রাসুল বলেন, আল ইলমু সালাসাতুন অর্থাৎ, ইলম বা জ্ঞান তিনটি।
১. কুরআনের জ্ঞান।
২. সুন্নাহর জ্ঞান। ৩. ইলমে ফারায়েজের জ্ঞান।
এই তিনটি ইলম বা জ্ঞান হলো সত্যিকার ইলম। এবার বুঝে নিন, বর্তমানে কুরআন- সুন্নাহর ইলমের দাম ও মান কতটুকু? এখন তো এসব ইলমের কোনো মূল্য নেই। জাগতিক জ্ঞানই মূল্যবান। অথচ এটা দুনিয়ার ইলম। এটা দুনিয়ায় চলার মাধ্যম। আসল ইলম হলো তা, যে ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া-আখিরাতে সফলতা পাওয়া যায়। প্রকৃত মালিক আল্লাহকে চিনা যায়। আর যে জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহকে চেনা যায় না, শুধু পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধি ও যশখ্যাতি কুড়ানো যায়, সেটা আদৌ কোনো জ্ঞানই নয়। আফসোস, আজ আমরা এই পার্থিব জ্ঞানের পেছনেই সময় ব্যয় করছি, সব মনোযোগ নিবদ্ধ করে রেখেছি। আর প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। আমরা স্বীকার করি, পার্থিব জ্ঞানেরও দরকার রয়েছে, তবে সেটা পরকালীন বা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন বিসর্জন দিয়ে নয়।
এখন যদি এমন জ্ঞান অর্জন করে এবং এর পেছনেই জীবনের সব মনোযোগ নিবন্ধ করে দেয়, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের কোনো ধার ধারে না, তাহলে সে হাইব্রিড জ্ঞানী। আল্লাহর কাছে এমন জ্ঞানীর কোনো মূল্য নেই। এবার কেউ যদি এভাবে পার্থিব জ্ঞান অর্জন করতে করতে আল্লাহকেই অস্বীকার করে বসে, তার মেধা-মনন আল্লাহর নির্দেশবিরোধী হয়, তাহলে সে জ্ঞানী নাকি পাপী? অবশ্যই জ্ঞানপাপী।
এমন দুনিয়ামুখি জ্ঞান অর্জনের পেছনেই বর্তমানে পুরো দুনিয়া। এর ফলে প্রথম যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটা হলো ইসলামি সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সভ্যতা-সংস্কৃতিতে প্রভাব রয়েছে। সমাজের সর্বত্র এটার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে। কালচার বা সংস্কৃতির প্রভাব ভালো হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। ভালোর একটা উদাহরণ হচ্ছে, যেমন কেউ যদি এই আল আমান মসজিদের পাশে জমি ক্রয় করতে চায়, তাহলে জিজ্ঞেস করবে, 'এই জমির আশেপাশে কোনো মসজিদ আছে কি না?' যদি বলা হয়, আছে, তাহলে সে বলবে, আমি ২০ হাজার ডলার বেশি দিয়ে হলেও এই জমি ক্রয় করতে চাই। এটাই হচ্ছে ইসলামি কালচার বা সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত। এর প্রভাব সমাজের সর্বত্র পড়ে থাকে。
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
বর্তমানে কালচার বা সংস্কৃতির নামে যা চলে, তার সঙ্গে ইসলামের কোনো নামগন্ধও নেই। আর এই সংস্কৃতির পরিবর্তনই মূলত ফিতনার সূচনা ঘটায়। এটাকে ফিতনার ফাউন্ডেশন বলা চলে। যে জ্ঞান দ্বারা মানুষ বুঝবে যে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, এমন চর্চা বর্তমানে কম। আর এমন জ্ঞানের চর্চা না থাকায় সভ্যতা একেবারে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে আমাদের বাচ্চাদের উপর।
আগের যুগের লোকেরা তো পুঁথি পাঠ করেই কেঁদে ফেলত, কারণ এর প্রভাব ছিল। এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। এটা সংস্কৃতির প্রভাব। আবার এমনও ছিল যে, প্রতিদিন ফজরের পর মহল্লার ঘরে ঘরে সুরা ইয়াসিনের তিলাওয়াতের সুরগুঞ্জন শোনা যেত। এখন আর তেমন কুরআনচর্চার পরিবেশ দেখতে পাওয়া যায় না। এক হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,
زينوا بيوتكم بالقرآن أو بالصلاة তোমাদের ঘরকে তিলাওয়াত ও নামাজ দ্বারা সুন্দর করো।
এই হাদিসের মর্ম কি শুধু কুরআন ঘরে লটকিয়ে রাখা? বরং এর মর্ম হচ্ছে, তোমরা ঘরে কুরআন তিলাওয়াত করো, নামাজে অথবা নামাজের বাইরে। এর মাধ্যমে কুরআনের ব্যাপক চর্চা হবে। আর এটা হচ্ছে ইসলামি কালচার বা সংস্কৃতি।
আগে মানুষ খড়ম পরিধান করত। দেখা যেত, খড়ম পায়ে দিয়ে মানুষ মুরব্বিদের সামনে যেত না। এখন তো ইয়াং ছেলেমেয়েরা মোবাইলে উচ্চ আওয়াজে গান ছেড়ে রাস্তায় চলাফেরা করে। এমনকি মুরব্বিদের সম্মানের প্রতি কোনো খেয়াল তো দূরের কথা, উল্টো অনেক সময় বেআদবিও করে। ধাক্কা মারে। তাচ্ছিল্যের সুরে এরকমও বলে যে, তোমরা মুরব্বি মানুষ, ঘরেই থাকবে, রাস্তাঘাটে কেন বেরিয়েছ? এটা হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাব।
এখন তো ছোটদেরই আগে সালাম দেওয়া লাগে। ছোটরা বড়দের চেয়ে বেশি বোঝে। তারা হচ্ছে ইয়াং জেনারেশন! কেন এমন হয়? কারণ, কালচার বা সংস্কৃতি বদলে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম এমন কালচার বা সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তাতে শুধু ময়লা আর ময়লা।
আগের যুগের বা আমাদের মুরব্বিদের কালচার ছিল ভিন্ন, স্বচ্ছ, ধবধবে মর্মর পাথরের মতো। ফলে সে সময়ের অবস্থা আর এখনকার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন রাস্তাঘাট কাঁচা থাকলেও মানুষের মন ছিল পাকা, পরিষ্কার। ছিল না এখনকার মতো এত অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর নোংরামি। এখন সংস্কৃতির পরিবর্তনের ফলে আমাদের সামাজিক রীতিনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানের বিয়েশাদির অবস্থা লক্ষ করুন। কী থেকে কী পরিবর্তন এসেছে বিয়েশাদির ক্ষেত্রে। বর্তমানে তো পাঞ্জাবি, টুপি, পাগড়ি পরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার মতো পরিবেশই আর নাই। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা সব গ্রাস করে ফেলেছে।
প্রজন্মের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবুন
বিষয়টি আপনারা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। আপনারা মসজিদ-মাদরাসা বানাচ্ছেন। এতেই কি আপনার দায়িত্ব শেষ? না; বরং তারা যে কালচার বদলে ফেলতেছে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কী আশা করা যেতে পারে? এখন তো বিশ্বময় নোংরা সংস্কৃতির সয়লাব। তাই আমাদের ভাবতে হবে, সচেতন হতে হবে, উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। নাহয় পরবর্তী প্রজন্ম থেকে ভালো কিছুর আশা করা যাবে না।
বিয়ের মাধ্যমে যুগলজীবন শুরু হয় এবং মানুষের বংশধারা বহমান থাকে। সেই বিয়ে থেকে আমরা আশা করতাম সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রাহ., মহাবীর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা., ইমাম বুখারি রাহ. ইমাম আবু হানিফা রাহ.-এর মতো জগদ্খ্যাত মনীষা জন্ম নেবে, শায়খে কৌড়িয়া, শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী, আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী, শায়খে চকরিয়া ও শায়খে গহরপুরী-এর মতো আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ জন্ম নেবেন, এমন আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। কারণ, যে বিয়ের শুরুই হয় গুনাহের কাজের মাধ্যমে, সে বিয়ে থেকে নেকির আশা করা যায় না। এটা এমন এক ফিতনা, যা আমরা নিজেরাই অর্জন করেছি। আর আপনারা ফিতনা খুঁজে পান না; অথচ আমরা নিজেরাই ফিতনার কারণ।
যে বিয়ের শুরু হয় গুনাহ দ্বারা, এই বিয়ে থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান কখনো মা-বাবার অনুগত হয় না। বরং অবাধ্যই হবে। আর আল্লাহর বিধান হলো, এমন সন্তান দ্বারা মা- বাবাকে শাসানো হবে। কৈ মাছের তেল দিয়ে যেমন কৈ ভাজি করা হয়, তেমনি তোমার সন্তান দিয়েই توমাকেও শাসানো হবে। ফলে যে বিয়েতে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি থাকে, সে বিয়ে থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান মা-বাবার অবাধ্য হয়। কেননা, মূলেই যে সমস্যা। বর্তমানে এমনও দেখা যায় যে, হিন্দু-মুসলিম-উভয় ধর্মের বিয়েতে একই রীতি অনুসরণ করা হয়। কেন এমনটা করা হয়। এরকম করার কি শরয়ি কোনো অনুমোদন রয়েছে? এ জন্য এসব রীতি-রেওয়াজ বা অনুষ্ঠান পালনে আমাদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।
আপনারা তো দ্বীনদার, তাবলিগওয়ালা, তাফসির শ্রবণকারী। এই আপনাদেরই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোন অবস্থা হবে? আমরা কী নিয়ে কবরে যাব?
بر زبان تسبیح و در دل گاو و خر : این چنین تسبیح را کی دارد اثر
জবানে আল্লাহর তসবিহ, আর অন্তরে দুনিয়া! এমন তসবির কোনো আসর নাই। এর কোনো প্রভাব নাই।
এখন কেউ যদি এসব বিষয় নিয়ে ভাবে, অন্তরে এসব বিষয়ে দরদ তৈরি হয়, তাহলে সেটাই হলো কালিমা বা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর আগুন। যে আগুন সব গুনাহ মুছে দেবে। তবে শুধু মুখেই যদি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ করে আর মনে মনে ভাবে, একটা ছেলে বা নাতির বিয়েতে এক-আধটু রংতামাশা হবে, ঢোল-তবলা বাজবে, এ আর এমন কি! এটা সামান্য একটু বিনোদন মাত্র। এতে তো ইসলাম চলে যাবে না। শুধু মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে একা একা বিয়ে পড়ালে তো আমার প্রেস্টিজ বলে আর কিছু থাকবে না। তখন সমাজ কী বলবে, আর আমি কোন মুখে সমাজে বিচরণ করব? এই যদি আপনার ভাবনা, কামনা আর চাওয়া, তাহলে আপনার জন্য আফসোস, শত আফসোস।
আপনি সামাজিক প্রেস্টিজ রক্ষা করতে গিয়ে নিজে গুনাহে লিপ্ত হচ্ছেন, সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি নষ্ট করছেন। আর মুআমালাত বা লেনদেনের কথা নাই বা বললাম। অনর্থক বিপুল অর্থ খরচ করা হয় এসব অনুষ্ঠানে। সহজ এবং গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় পালন করতে গিয়ে মানুষ অনেক বাড়াবাড়ির আশ্রয় নিয়ে ফেলে। ফলে বিষয় টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সরিষার তেলেই যেন ভূত চেপেছে। যে তেল দিয়ে ভূত তাড়ানোর কথা ছিল। এ জন্য প্রেস্টিজ সামাজিকতা রক্ষার নামে আমরা এমন অনেক কাজ করি, যা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। বরং উল্টো গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ি। এর মাধ্যমে মানুষের ইসলামি জ্ঞান, লেনদেন, মুআমালাত, মুআশারাত, ইসলামি কৃষ্টিকালচার নষ্ট হচ্ছে। আমাদের এসব গর্হিত কাজ দেখে দেখে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও এসব শিখছে। ফলে সমাজটা ক্রমেই অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আপনি বিয়ে করবেন অথবা আপনার সন্তানকে বিয়ে করাবেন। তো আল্লাহ যেভাবে বলেছেন, নবিজি কীভাবে বলেছেন এবং করেছেন, সেটা দেখতে হবে। আমাদেরও সেভাবে করতে হবে। এভাবে সব বিষয়ে আল্লাহ তাঁর রাসুলের আদেশ-নিষেধ সমর্থন করা, পালন করা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর হাকিকত। এই হাকিকত নিয়ে যদি কেউ মারা যায়, তাহলে সোজা জান্নাতে চলে যাবে। হে আল্লাহ, লা ইলাহার শিক্ষাকে আমাদের জীবন, সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করে সুন্দর জীবন, সুন্দর সমাজ, আদর্শ রাষ্ট্র আমাদের না দেখিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। আমিন।