📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 সাওম ও সিয়াম

📄 সাওম ও সিয়াম


সিয়াম অর্থ হচ্ছে, هو الإمساك عن الشهوات من الأكل والشرب والجماع نهارا بالنية অর্থাৎ, তিনটা জিনিসকে রোজার বডি বা দেহ বলা হয়। একটা হলো খাবার ছেড়ে দেওয়া। আরেকটা হলো পান করা ছেড়ে দেওয়া। অপরটা হলো জৈবিক চাহিদা ত্যাগ করা। আর এই ছাড়ার সময় হলো দিন, রাতে নয়। এ জন্য রোজা হলো তিনটি জিনিস থেকে বিরত থাকার নাম। আর রোজা রাখার সময় হলো দিন, রাত নয়। তা ছাড়া বছরের সব দিনেই রোজা রাখা যাবে না। যেমন: দুই ঈদ। ঈদের দিন রোজা রাখার অনুমোদন নেই। তা ছাড়া হাদিসে আছে শুধু শুক্রবারে রোজা রাখা মাকরুহ। ফরজ রোজা হচ্ছে বছরে একমাস। এ ছাড়া কেউ যদি প্রতি মাসে নিয়মিত রাখে, অর্থাৎ মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখে, অন্যান্য নফল রোজা রাখে, তার জন্য বিশাল সাওয়াব রয়েছে। উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, রোজা রাখার উপযুক্ত দিনে আমাদেরকে রোজা রাখতে হবে। এ জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে অর্থাৎ, খাবার, পানি ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে বিরত থাকতে হবে। এর মাধ্যমে রোজার বডি বা দেহ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে হবে। এখন কেউ দিনের বেলা খাবার, পানি ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে বিরত থাকল; কিন্তু রোজার নিয়ত করল না, তবে তার রোজা হবে না। কারণ, রোজার মধ্যে নিয়ত করা ফরজ। এ প্রসঙ্গে হাদিসে নবিজি ﷺ ইরশাদ করেন, تسحروا فإن في السحور بركة 'তোমরা সাহরি খাও। সাহরিতে বারাকাহ রয়েছে। সাহরি খেলেই তোমাদের নিয়ত হয়ে যাবে।' কারণ, যে নির্ধারিত সময়ে সাহরি খেল, সে তো রোজার নিয়তেই সাহরি খেল।

এখন যদি মুখেও সাহরির নিয়ত করে, তবে সেটা আরও উত্তম। তবে কেউ যদি এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকে যে, মুখে নিয়ত না করলে রোজাই হবে না, তাহলে সেটাও ঠিক নয়। কেননা, মুখের সাথে রোজার কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক হলো নিয়তের সাথে। কারণ, আল্লাহ শুধু মানুষের অন্তরের অবস্থাটাই দেখেন। সহিহ মুসলিম শরিফে রাসুল বলেন,

إِنَّ اللهَ لا يَنْظُرُ إِلَى صُورِكُمْ، وَلا إلى أَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি।

আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখে থাকেন। তাই নিয়তই রোজার জন্য মূখ্য বিষয়। মনে করুন, কেউ সারা দিন উপবাস করল; কিন্তু আজ রোজা রাখব, এমন নিয়ত যদি তার অন্তরে না থাকে, তাহলে এই রোজা হবে না। কারণ, রোজার বডি বা শরীর তৈরি করা ফরজ, আর তার রোজার বডি তৈরি হয়নি।

রোজার বডি তৈরি হয়ে গেলে এর মাধ্যমে রোজার ফরজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু রোজার রুহ তৈরি করা দরকার। আর রুহ তৈরি করতে হলে আরও কিছু চেষ্টা-সাধনা করতে হবে। যে সাধনার ফলে রোজার ফজিলত এমন হয়ে যাবে যে, রাসুল বলেন,

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِندَ اللهِ مِن رِيح المسك
যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর শপথ! সিয়াম পালনকারী ব্যাক্তির মুখের গন্ধ কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক উত্তম।

এখন আমরা রোজার রুহ কীভাবে তৈরি করব, এ সম্পর্কে জানব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]

আল্লাহ তাআলা প্রথমে كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ বলে রোজার বডি বা দেহ সম্পর্কে আলোচনা করলেন, এরপর لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ বলে রোজার রুহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

পবিত্র কুরআনে যে এক জায়গায় 'সাওম' শব্দের আলোচনা হয়েছে, ওখানেও সাওম বা রোজার রুহের আলোচনা করা হয়েছে। রোজার রুহ আবার কীভাবে হয়? আর সেই এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা 'সাওম' শব্দ কেন ব্যবহার করেছেন, এ সম্পর্কে মজার একটা ঘটনা রয়েছে। হজরত মরিয়ম আলাইহাস সালাম সম্পর্কে তো আমরা কমবেশ সবাই জানি। স্বামী ছাড়াই তাঁর ঘরে হজরত ইসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয়। এটা আল্লাহর কুদরত। হজরত আদম আলাইহিস সালামের মা-বাবা কেউ নেই। এই যে পিতা ছাড়া অথবা পিতামাতা উভয় ছাড়াই মানুষের জন্মগ্রহণ করা, এটা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ চাইলে সবকিছু করতে পারেন। আল্লাহর কাছে অসাধ্য বলতে কিছু নেই। তবে আল্লাহর স্বাভাবিক আদত বা অভ্যাস হলো, পিতামাতার মাধ্যমেই আল্লাহ সন্তান জন্ম দেওয়া।

মরিয়মের পেরেশানি

স্বামী ছাড়াই যখন হজরত মরিয়ম আলাইহিস সালাম সন্তানসম্ভবা, তখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁর উপর জিনার অপবাদ আরোপ করল। তখন আল্লাহ তাআলা হজরত মরিয়ম-এর পবিত্রতার জানান দিতে গিয়ে অভিনব একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, তুমি লোকালয় থেকে দূরে চলে যাও, সেখানে যাওয়ার পর তোমার সন্তান ভূমিষ্ট হবে। আল্লাহর নির্দেশমতো হজরত মরিয়ম লোকালয় থেকে দূরে চলে গেলেন এবং একটি মরা খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। সেখানে যাওয়ার পর আল্লাহ কুদরতিভাবে তাঁর খাবার-পানিসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেন। মরিয়ম তখন মনে মনে বলতে লাগলেন, এই অবস্থা তৈরি হবার আগেই আমি যদি মারা যেতাম, তাহলে কতই-না ভালো হতো! এখন মানুষকে আমি কী জবাব দেবো? লোকালয়ে মুখ দেখাব কেমন করে!

এসব চিন্তা যখন তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তখন একপর্যায়ে তিনি ওই মৃত খেজুর গাছের নিচে বসে পড়েন এবং তাঁর প্রসবব্যথা শুরু হয়ে যায়। একপর্যায় হজরত ইসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন।

এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার, মহিলারা যখনসন্তান জন্ম দেন, তখন তাদের শরীরে তিনটি জিনিসের অভাব দেখা দেয়। একটা হলো ভিটামিনের অভাব, ক্যালসিয়ামের অভাব আর রক্তশূন্যতা। সন্তান জন্মলাভের পর মরিয়ম-এর শরীরে এই তিনটি অভাব দেখা দিল। এখন এই অভাব কীভাবে দূর হবে? একে তো তিনি মহিলা, তার উপর লোকালয় থেকে দূরে অবস্থান করছেন। এগুলো কাটিয়ে ওঠার মতো উপকরণ তিনি কোথায় পাবেন? কিন্তু আল্লাহ তো আছেন। প্রেসক্রিপশনের সাথে সাথে মেডিসিনেরও ব্যবস্থা করে দিলেন। আল্লাহ বললেন,

وَ هُزِئَ إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسْقِطَ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا
(হে মরিয়ম) তুমি এই মরা খেজুর গাছের ডালে ধরে নাড়া দাও। তাহলে আল্লাহর হুকুমে তাজা খেজুর তোমার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। [সুরা মারইয়াম : ২৫]

সুবহানাল্লাহ। এ কারণে খেজুরের ফজিলত অনেক বেশি। এই খেজুরের মধ্যে ভিটামিনের অভাব, ক্যালসিয়ামের অভাব, রক্তশূন্যতা দূর করার সব উপকরণ রয়েছে। এ জন্য নবিজি সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় খেজুর দিয়ে ইফতার করতে বলেছেন। খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নাত।

মরা গাছ, তাজা ফল

এখানে মরা খেজুর গাছ থেকে তাজা ফল দেওয়ার একটা সূক্ষ্ম রহস্য আছে সেটা হলো, মরিয়ম আলাইহাস সালাম তখন চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না, সমাজে কী করে মুখ দেখাবেন। মরিয়মের এসব ভাবনা তো আল্লাহ জানেনই, সুতরাং তাঁর চিন্তা দূর করে তাঁকে সান্ত্বনা দিতেই এই মরা খেজুর গাছ থেকে তাজা খেজুর তাঁর মুখ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে এটাই বুঝাতে চাইলেন, যে আল্লাহ মরা খেজুর গাছ থেকে তাজা ফল দিতে পারেন, তোমার প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিতে পারেন, সেই আল্লাহ তোমার পেরেশানি দূর করারও ব্যবস্থা করে দেবেন। চিন্তার কোনো কারণ নাই। সুবহানাল্লাহ।

এরপর আল্লাহ তাআলা মরিয়মকে উদ্দেশ করে বলেন,

فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرِّي عَيْنًا
হে মরিয়ম, তুমি খেজুর খাও এবং পানি পান করো আর তোমার সন্তানকে দেখে তোমার চক্ষু শীতল করো। [সুরা মারইয়াম: ২৬] আল্লাহ খেজুর দেওয়ার পাশাপাশি মরিয়মের পাশে একটি পানির নহরও জারি করে দিলেন। এ কারণে ইফতারের সময় সম্ভব হলে খেজুর ও জমজমের পানি দিয়ে ইফতার করা উচিত। আল্লাহু আকবার।

মায়েদের যখন প্রসবব্যথা শুরু হয়, তখন কী কষ্টই-না হয় তাদের। কিন্তু যখন সন্তান জন্ম নেয় এবং মা তার সন্তানকে বুকে তুলে নিয়ে দুধ পান করান, তখন সব কষ্ট নিমিষেই দূর হয়ে যায়। এ জন্য মা মা-ই। মায়ের মর্যাদা আলাদা।

মা শব্দটি ছোট্ট অতি কিন্তু শোনো ভাই তার চেয়ে মধুর শব্দ ত্রিভূবনে নাই।

মরিয়ম আলাইহাস সালাম এবার ভাবতে থাকেন, প্রসবব্যথা দূর হলো, সন্তানেরও জন্ম হলো, শরীরের ভিটামিনের ঘাটতিও পূরণ হলো; কিন্তু এখন এই সন্তান নিয়ে আমি কীভাবে কী করব? মানুষ নানা প্রশ্ন করবে, আমি কী জবাব দেবো? আল্লাহ তখন তার এই ভাবনারও সমাধান করে দিলেন। আল্লাহ বললেন,

فَإِمَّا تَرَينَ مِنَ الْبَشَرِ أَحَدًا فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمٰنِ صَوْمًا
কোনো মানুষ যদি তোমাকে তোমার সন্তানের ব্যাপারে প্রশ্ন করে, তখন তুমি বলবে, 'আমি রোজাদার।' [সুরা মারইয়াম : ২৬]

পানাহারের পরও রোজা

এখানে আল্লাহ প্রথমে বলেছেন, 'খাও, পান করো'। এরপর বলেছেন, 'বলো, আমি রোজাদার।' এ রোজার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রোজার রুহ; বডি নয়। কারণ, রোজার জন্য খানাপিনা ছাড়তে হয় আর মরিয়মকে আল্লাহ খানাপিনা করতে বলার পর বলেছেন, বলো আমি রোজাদার। মরিয়মের রোজা ছিল সাওমুল লিসান, মানে ইমসাক আনিল কালাম বা কথাবার্তা ছাড়ার নিয়ত করা।

এ জন্য হাদিস শরিফে রাসুল বলেন,
من لم يدع قول الزور والعمل به، فليس لله حاجة بأن يدع طعامه وشرابه
যে ব্যক্তি রোজার বডি তৈরি করল কিন্তু মিথ্যা বলা ত্যাগ করল না, মিথ্যা আমল ছাড়ল না, সে খাবার, পনি ছাড়ল, কিন্তু তার এই রোজা কোনো কাজে আসবে না। সারা দিন সে শুধু উপবাসই করল। এ জন্য রোজার রুহ তৈরি করার জন্য বেশি করে নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা, নিজে পড়তে না পারলে অন্যের পড়া শুনা, জিকির করা দরকার। এসব কাজেই সময় ব্যয় করা উচিত। অযথা সময় ব্যয় করলে রোজার রুহ তৈরি হবে না। আর যারা রোজার রুহ তৈরি করতে পারবে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,

الصَّوْمُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ রোজা আমার জন্য, আর আমি আল্লাহ তার এই রোজার প্রতিদান দেবো। অন্য হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُحْسِنُ إِلى جَارِهِ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ واليوم الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، ومَنْ كانَ يُؤْمِنُ بالله واليوم الآخرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتُ অর্থাৎ, যারা বাস্তবিক অর্থেই আল্লাহর উপর ঈমান আনে, আল্লাহর রাসুলের উপর ঈমান আনে, তারা যেন মুখ দিয়ে ভালো কথা উচ্চারণ করে। আর সবচেয়ে ভালো বা শ্রেষ্ঠ কথা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এ জন্য হাদিস শরিফে রাসুল বলেছেন, রোজা রেখেছ, বডি তৈরি করেছ, এখন এই রোজার মধ্যে রুহ তৈরির জন্য তোমরা বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ো।

রোজা যেমন কাউকে দেখানো যায় না, ঠিক তেমনি আপনি রোজাদার না রোজাদার নন, সেটা কেউ বুঝতে পারে না, এটা হলো ইখলাস। তেমনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এমন আমল, যা পড়লেও কেউ বুঝতে পারে না। কেননা, আপনি যখন মনে মনে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়বেন, জিকির করবেন, তখন আপনার ঠোঁটও নড়বে না। আপনারা পরীক্ষা করে দেখুন, ঠোঁট নড়ে কি না? তাই আপনি কী পড়ছেন, সেটা কেউ জানতে বা বুঝতে পারে না, তাই এটার মধ্যে ইখলাস রয়েছে।

সায়্যিদুল ইসতিগফার

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির দ্রুত পড়া যায়। কিন্তু অন্যান্য তাসবিহ বা জিকির পাঠের সময় এভাবে পারবেন না; বরং ঠোঁট নড়বে। এ জন্য রাসুল বলেছেন, তোমরা বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ো। এ জন্য আমরা বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির করব। অন্যান্য তাসবিহগুলোও নিয়মিত পড়ব। সায়্যিদুল ইসতিগফার পাঠ করব। মুখস্থ না থাকলে মুখস্থ করে নেব। সায়্যিদুল ইসতিগফার হলো,

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنا عَبْدُكَ ، وَأَنا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ ما اسْتَطَعْتُ أَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلا أَنْتَ

এ ছাড়া আরও দুটি জিনিস আল্লাহর কাছে বেশি করে চাইতে হবে। একটা হলো, জান্নাত চাওয়া, অপরটি হলো জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া। এগুলো হলো ভালোকাজ। তবে এ ছাড়া আরও অনেক ভালোকাজ রয়েছে, সেগুলোও করতে হবে।

রোজা এবং বকবক করা

রমজান মাসে দিনে খাওয়া, পান করা ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে যে আমরা বিরত থাকি, এটা হলো রোজার বডি। এখন এই রোজার মধ্যে রুহ তৈরি করতে হলে আপনাকে মুখ কন্ট্রোল করতে হবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার মুখকে চাইলে ভালোকাজে ব্যবহার করুন, নাহয় বন্ধ রাখুন। মন্দকাজে ব্যবহার করবেন না। যেভাবে হজরত মরিয়মকে আল্লাহ তাআলা মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিলেন।

তিনি যখন একটি প্রশ্নের জবাব দেবেন, তখন আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হবে। এভাবে প্রশ্ন করা হতে থাকবে আর তিনি উত্তর দিতে থাকবেন। ফলে বিষয়টি জটিল হয়ে যাবে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'তোমাকে যখন তোমার সন্তানের ব্যাপারে প্রশ্ন করবে, তখন তুমি বলবে, 'আমি রোজাদার।' আর তখনকার রোজার পদ্ধতি ছিল উম্মতে মুহাম্মাদির রোজা থেকে ভিন্ন। এ জন্য আমরাও রোজা রেখে অযথা কথাবার্তা পরিহার করব। এ জন্য সহিহ বুখারির এক হাদিসে রয়েছে, রাসুল ﷺ বলেছেন, 'শুধু খাওয়া, পান করা ও জৈবিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকার নাম রোজা নয়; বরং অযথা কথাবার্তা বলা থেকেও বিরত থাকতে হবে।' আর এটাই হলো রোজার রুহ।

রোজা রেখে ভালো কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। অযথা কথাবার্তা ত্যাগ করতে হবে। সম্ভব হলে ভালো কথা বলো, আর যদি ভালো কথা বলার মতো পরিবেশ না থাকে, অন্তত মন্দ কথা বলো না। বরং তোমার মুখ বন্ধ রাখো। তখন অযথা কথা বলার পরিবর্তে তোমার এই মুখ বন্ধ রাখার কারণে আল্লাহ তোমাকে সেই সাওয়াব দেবেন, ভালো কথা বললে যে সাওয়াব পেতে। এ জন্য হাদিসে আছে, মসজিদে এসে যদি কেউ কোনো আমল করে, তিলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবিহ ইত্যাদি আমল করে, তাহলে তো ভালো। আর যদি কোনো আমল না করে শুধু নীরবে বসে থাকে, অযথা গল্পগুজবে লিপ্ত না হয়, চুপ থাকে এবং মনে মনে বলে, আমি আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান করছি, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, তো এমন ব্যক্তির সম্পর্কে হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তির আমলনামায় ৭০ রাকাত নফল নামাজের সাওয়াব লিখে দেন। সুবহানাল্লাহ।

কয়েকটি জিনিস পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের রোজার বডি তৈরি করলাম। এখন সমস্ত গুনাহ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রোজার রুহ তৈরি করতে হবে। আমাদের মুখ, কান, চোখ ও কলবের রোজা আছে। এসব রোজাও রাখতে হবে। যেমন, মুখের রোজা হলো ভালো কথা বলা, ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া, মন্দ কথা পরিহার করা। কানের রোজা হলো অশ্লীল কথাবার্তা না শোনা, শুনতে প্রতিহত করা অথবা ঘৃণা প্রকাশ করা। চোখের রোজা হলো ভালো জিনিস দেখা, মন্দ বা অশ্লীল জিনিস দেখা থেকে নিজের চোখকে হেফাজত করা, আর কলবের রোজা হলো, তাতে একমাত্র আল্লাহকে স্থান দেওয়া, অন্য কাউকে স্থান না দেওয়া।

এই সবকিছুর মাধ্যমে যার রোজার রুহ তৈরি হয়ে যায়, তার সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেন, 'এমন রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকে আম্বরের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়।' সুবহানাল্লাহ।

আর এই যে রমজান মাস, এ মাসে আমরা বেশি করে দান-সদকা করব। কেননা, রমজানে দান করলে প্রতিদানও বেশি পাওয়া যায়। হাদিসে রাসুল বলেন, السخى حبيب الله অর্থাৎ, যারা দান-সদকা করে, তারা আল্লাহর বন্ধু। এ জন্য নবিজি রমজানুল মুবারকে বেশি বেশি সদকা করতেন। মুসনাদু আহমাদের এক হাদিসে রয়েছে, 'নবিজির কাছে যা চাওয়া হতো, নবিজি তা দিতেন।' সুতরাং নবিজি রমজানুল মুবারকে এই আমল করতেন, তাই আমরাও রমজানে বেশি করে সদকা করব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 জীবন্ত মুজিজা

📄 জীবন্ত মুজিজা


পবিত্র কুরআন যে আল্লাহর কালাম, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ-সংশয় নেই। তবে কুরআন ব্যবহৃত তিনটি শব্দের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়। কুরআনে কারিমের যে তিনটি শব্দ নিয়ে কাফিররা প্রশ্ন তুলে এবং বলে, কুরআন আল্লাহর কালাম না কালাম নয়, এটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সেই শব্দ তিনটি হলো,

* হুজওয়া (هزوا)
* উজাব (عجاب)
* কুব্বার (كبار)

তারা বলে, কুরআন আল্লাহর কালাম নয়। কারণ, কুরআনে হুজওয়া, উজাব ও কুব্বার শব্দ এসেছে। এগুলো সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ একটি কিতাবের শব্দ হতে পারে না।

নবিজি হলেন মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক এবং কুরআন হলো তাঁর সবচেয়ে বড় মুজিজা, তাই এই কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত হেফাজত বা সংরক্ষিত থাকবে। এই কুরআন, যাতে নবিজির মুজিজার হেফাজত রয়েছে, সেখানে নবিজির নবুওয়াতও হেফাজতে থাকবে। কারণ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পরে আর কোনো নবি নেই। নেই মানে নতুন কোনো নবি পৃথিবীতে আসবেন না।

হজরত মুসা আলাইহিস সালামের মুজিজা ছিল হাতের লাঠি সাপ হয়ে যেত, আজ মুসা নেই, তাঁর মুজিজাও নেই। ইসা আলাইহিস সালামের মুজিজা ছিল, তাঁর আহবানে আল্লাহর হুকুমে মুর্দা জিন্দা হয়ে কবর থেকে উঠে দাঁড়াত। তিনি নেই তাঁর মুজিজাও নেই। দাউদ আলাইহিস সালামের হাতের স্পর্শে লোহা গলে যেত। এটি ছিল তাঁর মুজিজা। তিনি নেই তাঁর মুজিজাও নেই। কিন্তু আমাদের নবিজির জীবন্ত মুজিজা হলো কুরআন। এটা শ্রেষ্ঠ মুজিজা। কিয়ামত পর্যন্ত এই কুরআন থাকবে। যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত নবিজি ﷺ-এর নবুওয়াত বহাল থাকবে, তাই কুরআন নামক এই মুজিজার হেফাজত করার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহপাক নিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ। নবিজির পরে আর কোনো নতুন নবি আসবেন না।

শিরক বিদআতের বেমারে রুগ্ন পৃথিবীর চিকিতসার জন্য প্রতি যুগে, প্রতি শতকে আল্লাহপাক চিকিৎসক পাঠিয়েছেন; যাঁদেরকে নবি-রাসুল বলা হয়। খোদাদ্রোহিতার এই রোগ কিয়ামত আগ পর্যন্তই থাকবে-তওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত; কিন্তু নতুন করে আর নবি আসবেন না। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হলেন শেষ নবি। তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ ডাক্তার, তাঁর পরে আর কোনো ডাক্তারের প্রয়োজন নেই。

এখন প্রশ্ন হতে পারে নবিজি শ্রেষ্ঠ ডাক্তার, এটা বুঝলাম কিন্তু নবি পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর পৃথিবী যখন নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হবে, তখন কী হবে? কীভাবে হবে চিকিৎসা?

জবাবটা নবি নিজেই দিয়ে গেছেন। বলেছেন, আমি চলে যাওয়ার পর উম্মতের উলামা ফুকাহা বদ্বীনির চিকিৎসা করবেন। আল উলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। উলামায়ে কেরাম নবিগণের ওয়ারিস হয়ে থাকেন।

কুরআনের উচ্চাঙ্গতা

কাফিররা কুরআনের তিনটি শব্দ হুজওয়া, উজাব ও কুব্বার ব্যাপারে অভিযোগ করলে হজরত উমর মুসলমানদের পক্ষে হজরত আলিকে মুনাজারার জন্য নির্বাচন করলেন। আর কাফিররা তাদের পক্ষে বড় এক সাহিত্যিককে নির্ধারণ করল, যে লোক বয়সের ভারে একেবারে ন্যুজ। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না। কাফিররা তাকেই তাদের মুনাজির হিশেবে নির্ধারণ করে।

মুনাজারা বা বিতর্কের স্থানে উভয় পক্ষ যখন জড়ো হলেন, তখন মুসলিমদের পক্ষ থেকে হজরত আলি রা. বললেন, আপনাদের পক্ষ থেকে যে আমার সাথে মুনাজারা করবে, তাকে আমি একবার দেখতে চাই। যেহেতু তিনি আমার সাথে মুনাজারা করবেন, তাই আমি তাকে ভালো করে দেখতে চাই। আপনাদের মুনাজির একটু দাঁড়ান তো!

কাফিরপক্ষের ওই বৃদ্ধ সাহিত্যিক মুনাজির তখন কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আবার বসে যায়। আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু পুনরায় তাকে দাঁড়াতে বললেন। বয়স্ক পণ্ডিত ভাবল, আলি হয়ত তাকে দেখতে পাননি, তাই দ্বিতীয়বার দাঁড়াতে বলছেন! সে আবারও উঠে দাঁড়াল এবং নিজের পরিচয় দিয়ে বসে পড়ল।

লোকটি বসে যাওয়ার পর হজরত আলি আবারও তাকে উঠে দাঁড়াতে বললে সংগত কারণেই বৃদ্ধ মুনাজির তখন রাগে কটমট করতে করতে দাঁড়িয়ে বলল, 'হাজা শাইয়ুন উজাব, আনা রাজুলুন কুব্বার, আতাত্তাখিজুনি হুজুয়া।'

বৃদ্ধ যখন এই কথাগুলো বলছিল, হজরত আলি তখন মুচকি হাসছিলেন। কারণ, তার মুখ থেকে এমন তিনটি কথা বেরিয়ে আসে, যে তিনটি শব্দের শুদ্ধতা নিয়ে তাদের প্রশ্ন ছিল এবং কুরআনে থাকা এই শব্দগুলো ভুল প্রমাণের জন্যই আজকের এই মুনাজারার আয়োজন!

বৃদ্ধ লোকটির কথার মানে হলো, 'এটা তো আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি একজন বৃদ্ধ লোক হওয়া সত্ত্বেও আমাকে এক-দুবার নয়, তিনবার দাঁড় করানো হলো! এটা কেমন কথা? তুমি কি নিয়ে ঠাট্টা করছেন?'

বৃদ্ধ লোকটি তার কথা শেষ করতেই মুসলিমপক্ষে বিজয়ধ্বনি শুরু হয়ে গেল। কারণ, কাফিররা যাকে তাদের মুনাজির হিশেবে নিয়ে এসেছিল, সে বড় একজন সাহিত্যিক ছিল। কোনো শব্দের শুদ্ধতা যাচাইয়ে সাহিত্যিকদের মতামত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ হলেন সকল সাহিত্যিকের সাহিত্যিক, তাঁর চেয়ে বড় কোনো সাহিত্যিক নেই। সুতরাং আল্লাহ কুরআনে যেসব শব্দ ব্যবহার করেছেন, এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। মুনাজারা অনুষ্ঠানে স্বয়ং কাফিরপক্ষের মুনাজিরই অনিচ্ছাবশত এসব শব্দের শুদ্ধতার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হতে হলো।

বৃদ্ধের এসব শব্দ উচ্চারণের পর তাই আর কোনো বিতর্কের প্রয়োজন পড়েনি। আলি রা. তখন কাফিরদের উদ্দেশ করে বলেন, 'আপনাদের মুনাজির যিনি, তিনিই এসব শব্দ ব্যবহার করেছেন। এগুলো যদি অশুদ্ধ হয়, তবে তিনি এগুলো ব্যবহার করলেন কেন? মুনাজারায় কাফিররা অত্যন্ত লজ্জিতভাবে পরাজিত হলো এবং প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটিত হলো।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 জালিকাল কিতাব

📄 জালিকাল কিতাব


জালিকাল কিতাব মানে এটি এমন কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘জালিকা’ শব্দটি দূরবর্তী কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কুরআন তো আমাদের নিকটবর্তী। আর নিকটবর্তী কিছু বোঝাতে সাধারণত ‘হা-জা’ বলা হয়। তাহলে তো জালিকাল কিতাব না বলে ‘হা-জাল কিতাব’ বলা উচিত ছিল?

এ মুহূর্তে আপনাদের জানা দরকার, এ প্রশ্নের দুটি উত্তর :

১. হা-জা না বলে জালিকা বলা হয়েছে কুরআনের সম্মানার্থে।

২. মূল কুরআন যা লাওহে মাহফুজ ও বাইতুল ইজ্জাতে সংরক্ষিত, জালিকা বলা হয়েছে তার প্রতি ইঙ্গিত করে। লাওহে মাহফুজ ও বাইতুল ইজ্জাহ আমাদের থেকে অনেক দূরে।

আল কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কিতাব, অর্থাৎ পবিত্র কুরআনে কারিম, যা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাজিল হয়েছে।

লা রাইবা ফী মানে যাতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ, কুরআনে কারিম এমন এক কিতাব, যাতে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। রাইব মানে সন্দেহ। সন্দেহের অনেক ধাপ আছে। সন্দেহের অনেক স্তর আছে। তাই রাইব শব্দের মর্ম বুঝতে হলে আমাদেরকে আরও চারটি শব্দের অর্থ জানতে হবে। সেগুলো হলো,

• শক (شك) • জন (ظن) • ওহম (وهم) • ইয়াকিন (يقين)

কোনো বিষয়ের দুটি দিক সমান হলে তাকে شک বা সন্দেহ বলা হয়। যেমন, যদি এমন হতো যে, কুরআন একটি বিষয় এবং কুরআনের দুটি দিক রয়েছে— কুরআন আল্লাহর কালাম এবং কুরআন আল্লাহর কালাম নয়। যদি এমন হতো, তাহলে এখানে شک শব্দটি ব্যবহার করা যেত। বলা যেত, ذلك الكتاب لا شك فيه

দুটি বিষয়ের কোনো একটি দিক যদি গালিব বা অগ্রাধিকারী হয়, তখন সেটাকে ظن বা প্রবল ধারণা বলে। যদি কোনো দিক মাগলুব বা অনগ্রাধিকারী হয়, সেটাকে বলে وهم বা নিছক ধারণা। আর যদি কোনো বিষয়ের কোনো দিক দিয়েই কোনো ধরনের সন্দেহ না থাকে, যেটাকে يقين বা দৃঢ় বিশ্বাস বলা হয়। আর যদি সামান্য সন্দেহ থাকে, যেটাকে বলে সন্দেহের জন্য সন্দেহ করা, তখন সেটাকে বলে ريب

সুতরাং, لا ريب فيه এর মর্ম হবে, কুরআন সন্দেহের বস্তু নয়। কেউ যদি সন্দেহ করে, সেটা হবে তার নিজের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ। এখানে কুরআনের কোনো দোষ নাই। কুরআন আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত জান্নাতি জীবন যাপনের আদর্শ গাইডলাইন, সন্দেহাতীত কিতাব। আল্লাহ বলেন, تَنْزِيلُ مِنْ رَّبِّ الْعَلَمِينَ
এই কুরআন রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত।

নবিজি ﷺ বলেন, دع ما يريبك إلى ما لا يريبك সন্দেহযুক্ত জিনিস পরিহার করো এবং সন্দেহমুক্ত জিনিস গ্রহণ করো।

এ জন্য কুরআন বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কুরআন বলেছে, وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِّثْلِهِ﴾
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাকো, তবে তোমরা তার মতো একটি সুরা নিয়ে আসো। [সুরা বাকারা: ২৩]

চ্যালেঞ্জের সারমর্ম হলো, আল্লাহ বলেন, তোমরা যদি কুরআনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে থাকো, তোমরা যদি মনেকরো কুরআন সত্যি সত্যি আল্লাহ তার নবির কাছে নাজিল করেছেন, নাকি মুহাম্মাদ নিজে তৈরি করে ফেলেছেন, তাহলে কুরআনের ছোট্ট সুরার মতো একটি সুরা তৈরি করে দেখাও তো!

প্রিয় মুসল্লিয়ানে কেরাম!

একটু মনযোগ দিয়ে কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। আল্লাহপাক وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ বলেছেন, وَإِذَا كُنتُمْ فِي رَيْبٍ বলেননি। কারণ, إِن আসে সন্দেহ বোঝাতে, আর إِذَا আসে নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে। যেহেতু কুরআনে নিশ্চিতভাবেই কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, যারা সন্দেহ করেছে, সেটা জাস্ট সন্দেহ করার জন্য সন্দেহ করা। এ জন্য আল্লাহ إِذَا كُنتُمْ না বলে إِن كُنتُم বলেছেন।

এ জন্যই কুরআনের শুরুতে আল্লাহপাক চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করেন, ذلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ

এই কিতাব তথা কুরআনে ভুলভ্রান্তি থাকবে তো দূরের কথা, কোনো ধরনের সন্দেহেরই অবকাশ নাই। এই ঘোষণাতেই বোঝা যায় কুরআন নিঃসন্দেহে আল্লাহর কালাম। কারণ, মানুষ মানুষের ব্যাপারে এভাবে চ্যালেঞ্জ করে না। আপনারা অবশ্যই জানেন, পৃথিবীর কোনো লেখক যখন কোনো বই লিখেন, তখন তিনি তার বইয়ের ভূমিকায় কখনো এমন চ্যালেঞ্জ করেন না। তিনি বলেন না, 'আমার এই বইটি ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে'; বরং উল্টোটাই বলেন। তিনি লিখেন, 'আমার এই বই ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়। কারও নজরে ভুল ধরা পড়লে দয়া করে আমাকে জানাবেন, আমরা পরবর্তী সংস্করণে শুধরে নেব।'

আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে কুরআন থেকে হিদায়ত গ্রহণের তৌফিক দান করুন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 হিদায়াত কাকে বলে

📄 হিদায়াত কাকে বলে


এখন আমরা হিদায়ত সম্পর্কে আলোচনা করব। কুরআনে আল্লাহ বলেন, হুদাল লিল মুত্তাকিন-হিদায়ত শুধু মুত্তাকিদের জন্য। হিদায়ত শব্দের চারটি অর্থ রয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতেও হিদায়তের মোট চারটি অর্থ পাওয়া যায়। এগুলো বুঝতে পারলে হিদায়ত সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ হবে, ইনশাআল্লাহ।

হিদায়ত চার প্রকার : হিদায়তে ফিতরাত, হিদায়তে নাজাত, হিদায়তে তাওফিক ও হিদায়তে মাকসুদ। এবার আমরা হিদায়তের প্রকারগুলো নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

হিদায়তে ফিতরাত

হিদায়তে ফিতরাত মানে স্বভাগতভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের মাধ্যমে মানুষকে হিদায়তের নিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এটা শুধু মানুষকে নয়; বরং জানোয়ারদেরও দিয়েছেন। এটাকে হিদায়তে জরুরত বা স্বভাবগত হিদায়ত বা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও বলা হয়।

এই হিদায়ত আল্লাহ তাআলা মানুষকে তো দিয়েছেনই, প্রত্যেক সৃষ্টিকেই দিয়েছেন। যেমন, একটা হাঁসের বাচ্চা ডিম থেকে ফুটার পরই হাঁটতে পারে, সাঁতার কাটতে পারে। খাবার খেতে পারে। এই যে জ্ঞান বা হিদায়ত, এটা আল্লাহর দান। যার যেটা দরকার, আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে তাকে সেটা দান করেন।

কিন্তু মানবশিশুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। মানবশিশু জন্মের পর কিছুই করতে পারে না। হাঁটতে গেলে অন্তত ২-৩ বছর সময় লাগে। সাঁতার শিখতে ৮-৯ বছর লাগে। মানবশিশু জন্মের পরই নিজের হাতে খাবার খেতে পারে না; তার মুখে তুলে খাওয়াতে হয়। এখানে দেখা গেল, আল্লাহ মানুষকে দুর্বল হিশেবে ভূমিষ্ট করান। তবে এই দুর্বল মানুষই যদি আল্লাহর হুকুমমতো তার জীবন পরিচলনা করে, আল্লাহ তাকে ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি মর্যাদা দান করেন। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَخُلِقَ الْإِنْسَانُ ضَعِيفًا

আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে। [সুরা নিসা: ২৮]

এই হিদায়ত প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى

মুসা বললেন, আমাদের রব তিনি, যিনি সকল বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর সঠিক পথ নির্দেশ করেছেন। [সুরা তাহা : ৫০]

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّى وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَى

তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো, যিনি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সুসম করেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন এবং পথ প্রদর্শন করেছেন। [সুরা আলা: ১-২]

আয়াতে 'ফাহাদা' শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এই হিদায়ত যা প্রত্যেক সৃষ্টিকে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, যে হিদায়তের মাধ্যমে কোন জিনিসে লাভ আর কোন জিনিসে ক্ষতি, এটা বোঝার ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়েছে। এটা হলো হিদায়তে জরুরত। এই হিদায়ত সবার জন্য প্রযোজ্য, মুসলিম, কাফির, জীবজন্তু সবাইকে দিয়েছেন।

প্রত্যেকেই তারা তাদের মায়ের গুরুত্ব বোঝে। পেটে যে ক্ষুধা তৈরি হয় এবং খাওয়ার পর ক্ষুধা নিবারণ হয়, এটা শুধু মুসলমানই বোঝে না; বরং সকলেই বোঝে। এটাও একটা হিদায়ত। এটাকে স্বাভাবিক বা জরুরি হিদায়ত বলে। আর হিদায়তে জরুরত এটা সকলের জন্য। এই হিদায়ত একটা মোরগকেও দেওয়া হয়েছে। যেমন একটা মুরগিকে আপনি কয়েকটি ডিম দিয়ে কুঁচে বসালেন। মুরগি ডিমকে তা দেয়, একপর্যায়ে যখন ডিম থেকে বাচ্চার ফুটার সময় হয়, তখন মুরগির এই অনুভব হয় যে, ডিম ফুটো করে দিতে হবে। কারণ, ডিমে যদি ছিদ্র করা না হয়, তাহলে ভেতরের বাচ্চা দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে। এই যে জ্ঞান, ডিমের নির্দিষ্ট জায়গায় ছিদ্র করে বাচ্চার শ্বাসপ্রশ্বাসের রাস্তা করে দেওয়া এটা কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিয়ার, শিক্ষক বা কেউ শিখিয়ে দেয়নি; বরং আল্লাহই তাকে এমন হিদায়ত দিয়েছেন।

এমনিভাবে একটা বিড়াল যখন বাচ্চা প্রসব করে, তখন সে তার সুবিধামতো নিরাপদ জায়গায়ই বাচ্চা জন্ম দেয় এবং এমনভাবে লালনপালন করে, যাতে বাচ্চাদের কোনো কষ্ট না হয়। এই যে বাচ্চা লালনপালনের জ্ঞান, প্রসবের সময় নিরাপদ জায়গা খোঁজার চেষ্টা, এই হিদায়ত কে দিয়েছেন? অবশ্যই আল্লাহ দিয়েছেন। এ জন্য এটাকে হিদায়তে জরুরত বলে।

হিদায়তে নাজাত

হিদায়তে নাজাত হলো, যে হিদায়তের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে জান্নাতে যাওয়া যায়। এই হিদায়ত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِأَيْتِنَا يُوقِنُونَ

আর আমি তাদের থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশমতো সৎপথপ্রদর্শন করত, যতদিন তারা ধৈর্য অবলম্বন করেছিল আর আমার আয়াতসমূহের উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল। [সুরা সাজদাহ : ২৪] অর্থাৎ, আমি আল্লাহ পূর্ববর্তী জাতির মধ্যে দ্বীনি নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁদের মনোনীত করেছি, যাতে করে তাঁরা আমার হুকুমে মানুষকে দ্বীনের পথে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, তোমরা দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করো, দ্বীনের পথে এসো। এখন যে এই আদেশ মেনে দ্বীনের পথে চলবে, এর মাধ্যমে যে হিদায়ত লাভ করবে, এই হিদায়ত তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবিজি বলেন,

كَانَت بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ، كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيُّ خَلَفَهُ نَبِي

বনি ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতেন নবিগণ। যখনই তাদের কোনো নবি ইনতিকাল করতেন, তখন অন্য নবি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন।

আর এমন হিদায়ত লাভ করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ অন্তরের। অন্তর সস্বচ্ছ হয় কিভাবে, এ সম্পর্কে ধারাণা দিতে আমি সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসটি পড়েছি। হজরত হুজাইফা বিন ইয়ামান রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসটি হচ্ছে, تُعْرَضُ الفِتَنُ عَلَى القُلُوبِ كَعَرْضِ الحصيرِ عُودًا عُودًا মানুষের অন্তরে ফিতনা এমনভাবে আবর্তিত হবে, যেভাবে চাটাই বুননের সময় একটার পর একটা বেত লাগানো হয়।

এখানে একটা কথা বলা জরুরি মনে করছি। আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। কথাটি হলো, এটা ফিতনার যুগ; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জামানা বা যুগের মধ্যে ফিতনা নয়; বরং ফিতনা হলো নিজের মধ্যে। জামানার মধ্যে যদি ফিতনা থাকত, তাহলে ফিতনা কোথায় কোথায় পাওয়া যায়, এর একটা ঠিকানা বা মার্কেট থাকা দরকার ছিল; কিন্তু এমন তো নয়। তাই ফিতনার স্থান হলো অন্তর। নবিজির হাদিসের মাধ্যমেও এটা স্পষ্ট যে, ফিতনা নাজিল হয় মানুষের অন্তরে। পরে এখান থেকেই এর বিস্তার ঘটে। এবার আপনারা নিজেই বুঝতে পারবেন, আপনি ফিতনার যুগে আছেন, নাকি নিজেই ফিতনা বয়ে বেড়াচ্ছেন!

আপনি ফিতনার মধ্যে আছেন কিনা, সেটা যাচাই করে নিন। যদি ফিতনার মধ্যে আবর্তিত থাকেন, তাহলে এখনই নিজেকে শুধরে নিন। ফিতনামুক্ত জীবন গড়তে সচেষ্ট হোন। কেননা, এ অবস্থায় যদি মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

এখন যারা বলে বেড়ায় যে, মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে, মূলত সে সবচেয়ে বড় নষ্ট। নিজের খবর নেই, মানুষকে নিয়ে পেরেশানি! আমরা এমন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। এমন লোকের ব্যাপারে নবিজি বলেন, من قال هلك الناس فهو أهلكهم

রয়িসুল মুহাদ্দিসিন হজরত আবু হুরায়রাহ রাজিআল্লাহু আনহু থেকে মারফুআন বর্ণিত; যারা বলে মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে, সে-ই বড় নষ্ট।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مِّنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ * إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ ﴾ হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর তোমাদের নিজদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাকো, তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। তখন তিনি তোমরা যা আমল করতে তা তোমাদের জানিয়ে দেবেন। [সুরা মায়েদা: ১০৫]

বর্তমান যুগটাই এমন যে, নিজের ঈমান-আমলের চিন্তা সবার আগে করা দরকার। নিজের এসব বিষয়ে চিন্তা না করে শুধু অন্যের দিকে যারা নজর দেয়, এদের সম্পর্কে রাসুল বলেন, এরাই সবচেয়ে বড় নষ্ট। এদের নিজেদের ঈমান-আমল আগে ঠিক করা দরকার।

হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামানকে নবিজির গুপ্তভেদের অধিকারী বলা হতো। ফিতনা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি হাদিস তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন, تُعْرَضُ الفِتَنُ عَلَى القُلُوبِ كَعَرْضِ الحَصِيرِ عُودًا عُودًا

অর্থাৎ, মানুষের অন্তরে ফিতনা এমনভাবে আবর্তিত হবে, যেভাবে চাটাই বুননের সময় একটার পর একটা বেত লাগানো হয়। ঠিক তেমনিভাবে আখেরি জামানায় মানুষের অন্তরেও এভাবে ফিতনা গেঁথে যাবে। কান দিয়ে একটা ফিতনার কথা শুনবে, চোখ দিয়ে দেখবে। এভাবে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তার অন্তরে ফিতনা জোড়া লাগতে থাকবে। তখন তার অন্তর বা কলবের অবস্থা কেমন হবে, এ সম্পর্কে রাসুল বলেন, 'যে কলব বা অন্তর ফিতনাসম্পর্কিত জিনিসগুলো সহজেই মেনে নেয়, যেমন কোনো গুনাহের কাজ করলে আনন্দ পায়, বা গুনাহের কাজ দেখলে আনন্দ অনুভব করে। এমন কলবে তখন একটি কালো দাগ বসে যায়। এভাবে যতটা গুনাহের কাজ দেখবে বা করবে, ততটা কালো দাগ তার অন্তরে গেঁথে যাবে।

অন্য হাদিসে রাসুল বলেন, أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ

প্রতিটি মানুষের শরীরে গোশতের একটি টুকরা রয়েছে। এই গোশতের টুকরা যতক্ষণ ভালো থাকে, পুরো শরীর ভালো থাকে, আর যখন এটি নষ্ট হয়ে যায়, তখন পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। সাবধান! এই মাংসের টুকরার নাম হচ্ছে কলব।

মানুষের শরীরে যেসব অঙ্গ রয়েছে, ধারাবাহিক গুনাহের কাজের মাধ্যমে ফিতনায় জড়িত হতে থাকলে তার হাত, পা, মুখ, জিহ্বা ইত্যাদি সব অঙ্গ খারাপ হয়ে যাবে। কেন খারাপ হবে? কারণ, তখন তার অন্তর খারাপ হয়ে যাবে। আর অন্তর হলো পুরো শরীরের রাজধানী। এখন কলব নামক রাজধানীতেই যদি সমস্যা দেখা দেয়, তখন শরীর নামক রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোতেই সমস্যা তৈরি হয়ে যাবে। ফলে অন্তর যদি খারাপ হয়, তাহলে মুখের ভাষা খারাপ হবে, চোখের দেখা খারাপ হবে, হাত মন্দ কাজে ব্যয় হবে। এ কারণে সব ফিতনা নাজিল হয় অন্তরে।

এখন আপনার অন্তর কেমন, সেটা নিজে নিজেই যাচাই করে নেবেন। আপনার চোখ রয়েছে, এই চোখ দিয়ে যদি গুনাহের কাজ দেখতে ভালো লাগে, তবে আপনার অন্তরে ফিতনা রয়েছে। গুনাহের কাজ শুনতে ভালো লাগে, তাহলে আপনার অন্তরে ফিতনা রয়েছে। হাত দিয়ে গুনাহের কাজ করতে ভালো লাগে, তবে আপনার অন্তরে ফিতনা রয়েছে। আর স্বচ্ছ অন্তর ছাড়া জান্নাতে যাওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন, يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ )

যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন উপকারে আসবে না। কেবল (সাফল্য লাভ করবে) সে, যে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর নিকট আসবে। [সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯]

এটা হলো হিদায়তে নাজাত। এখন কেউ যদি কোনো গুনাহের কাজ দেখে, কিন্তু সে তাতে লিপ্ত হয়নি এবং পছন্দও করেনি; কান দিয়ে শুনতে পেয়েছে, তবে তার অন্তর সেটা গ্রহণ করেনি বরং ঘৃণা প্রকাশ করেছে, তাহলে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুল বলেন, তার অন্তরে সাদা দাগ বসিয়ে দেওয়া হবে। তার অন্তর হবে স্বচ্ছ।

ফিতনার ঠিকানা

নবিজি আরও বলেন, শেষ জামানায় মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। তবে এই বিভক্তি মুসলিমদের মধ্যেই হবে, কাফির আর মুসলিম নয়। একভাগ হবে ঈমানদার, যাদের অন্তর হবে স্বচ্ছ, তাতে কোনো নেফাক থাকবে না। আর অপরভাগ হবে মুনাফিক, যাদের অন্তরে ঈমানের লেশমাত্র নেই, তবে নেফাকের আখড়া থাকবে। তখন খলিফা মাহদির আভির্ভাব হবে। যারা খাঁটি ঈমানদার, তারা খলিফা মাহদির অনুসরণ করবে। এদের মাধ্যমেই পুরো বিশ্বে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়বে। এরাই হবে দুনিয়া আখিরাতে সফল। আর যারা মুনাফিক, তারা ইহুদিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।

মোটকথা, ফিতনা মার্কেটে পাওয়ার বস্তু নয়; বরং ফিতনা নিজের মধ্যে আছে কিনা, সেটা দেখতে হবে। কারণ, ফিতনার আশ্রয়স্থল হলো কলব বা অন্তর। এ সম্পর্কে রাসুল বলেন, মানুষের অন্তর দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। কোনো কোনো মানুষের অন্তর হবে সাদা মর্মর পাথরের মতো স্বচ্ছ। চতুর্পার্শ্বে ফিতনার সময় এদের কোনো ক্ষতি হবে না। আর এ ধরনের অন্তর যাদের হবে, কিয়ামত পর্যন্ত ফিতনা তাদের অন্তরে কোনো ক্ষতি পৌঁছাতে পারবে না। যেমন, ওয়াটার প্রুফ থাকলে ভেতরে পানি পৌঁছতে পারে না, তেমনি চারপাশে ফিতনার সয়লাব থাকলেও স্বচ্ছ অন্তরের কারণে তাকে ফিতনা গ্রাস করতে পারবে না।

আর যাদের অন্তর কালো থাকবে, তাদের সম্পর্কে রাসুল বলেন,

لا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا، ولا يُنْكِرُ مُنْكَرًا، إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِن هَواهُ.

অর্থাৎ, এদের অন্তরের অবস্থা হবে কালো ছাইয়ের মতো। এদের তুলনা হলো কয়লার মতো। কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না, ঠিক তেমনি এদের অন্তরও কখনো পরিচ্ছন্ন হবে না। কারণ, এদের অন্তরে মোহর মারা। আল্লাহ বলেন,

خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

আল্লাহ তাদের অন্তরকরণ এবং তাদের কানসমুহ বন্ধ করে দিয়েছেন। আর তাদের চোখসমুহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সুরা বাকারা: ৭]

আর যাদের অন্তর স্বচ্ছ, তাদের তুলনা হলো সাদা কাপড়ের ন্যায়। কেননা, সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে সেটা খুব সহজেই নজরে ভাসে। এ জন্য স্বচ্ছ অন্তরওয়ালা কেউ যদি কোনো গুনাহ করে ফেলে, তখন সাথে সাথে তাওবাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। আর যে সাথে সাথে ক্ষমা চায়, তার সম্পর্কে রাসুল বলেন,

التائب مِنْ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ

যে গুনাহ থেকে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে এমনভাবে নিষ্পাপ করে দেন, যেন সে গুনাহই করেনি, কিন্তু এই বোঝ বা বোধ তখনই অর্জিত হবে, যদি তার অন্তর সাদা-স্বচ্ছ হয়। আর অন্তর যদি হয় কালো, তবে তার এই বোঝ তো অর্জিত হবেই না; বরং গুনাহের কাজটি তখন তার আরও ভালো লাগবে। কারণ, তার অন্তর যে কালো।

এখন যাদের অন্তরে কালো দাগ রয়েছে, তারা কুরআন পড়তে বা শুনতে ভালো লাগে না, কুরআন তাফসিরের মজলিসে বসতে ভালো লাগে না, বেশি বেশি নামাজ পড়তে, রোজা রাখতে ভালো লাগে না; বরং বাজে আড্ডা-ইয়ার্কি, আমোদ-ফুর্তি, গানবাজনা ইত্যাদি তার ভালো লাগে, তাহলে এদের অন্তর নষ্ট।

হাদিসে নবিজি বলেন, এদের অন্তর কালো, তার উপর উল্টো! যেমন—আপনি যদি একটি গ্লাস ঠিকমতো ধরে তাতে পানি ঢালেন, তাহলে সহজেই গ্লাস পানিতে ভরে উঠবে। আর যদি গ্লাস উল্টো করে ধরেন, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত পানি ঢাললেও গ্লাসে একফোটা পানিও ভরবে না। ঠিক তেমনি যাদের অন্তর কালো, এদের যতই বোঝানো হোক, তারা বোঝবে না। বোঝার চেষ্টাও করবে না। এমন অন্তর নিয়ে যদি মারা যায়, তাহলে সে গুমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়ে মারা যাবে। নাউজুবিল্লাহ।

এদের সম্পর্কে রাসুল বলেন, 'এরা ভালোমন্দ কিছুই বোঝে না; বরং তার মনে যেটা চায়, সেটাই বোঝে।' এমন ফিতনাওয়ালা অন্তর নিয়ে হিদায়ত পাওয়া যাবে না। এ জন্য আমরা আমাদের অন্তর স্বচ্ছ রাখতে চেষ্টা করব। নেফাক থেকে বেঁচে থাকব। আল্লাহ আমাদেরকে স্বচ্ছ অন্তর নিয়ে মৃত্যু দান করেন, আমিন।

আজ আমরা হিদায়তের প্রথম দুটি আলোচনা করলাম। আগামীকাল বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা করবার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px