📄 উসমানি মাসহাফ এবং সাবআতু আহরুফ
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের এ মাসে কুরআনচর্চার মহৎ এ মজলিসে বসার তাওফিক দিয়েছেন।
গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছি কুরআনে ইরাব ও নুকতা লাগানো ও কুরআন হেফাজতের বিবরণ সম্পর্কে। কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন। কুরআনের লফজ বা শব্দ, অর্থ এবং কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য তথা এর মাধ্যমে কী আমল করতে হবে, সেটার দায়িত্বও আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন।
আল্লাহপাক আলফাজে কুরআনের হেফাজত করেছেন হাফিজ কারীদের দ্বারা, মা'আনিয়ে কুরআনের হেফাজত করেছেন মুহাদ্দিস মুফাসসিরদের মাধ্যমে, এবং আ'মালে কুরআনের হেফাজত করেছেন ফুকাহায়ে কেরাম দ্বারা।
নবিজি -এর যুগে কুরআন সংরক্ষণের পন্থা ছিল তিনটি।
১. মুখস্থ করার মাধ্যমে অর্থাৎ, সাথে সাথে মুখস্থ করে ফেলতেন।
২. লিখে রাখার মাধ্যমে। অর্থাৎ, কোনো আয়াত বা সুরা যখন নাজিল হতো, তখন নবিজি কাতিবে ওহি বা ওহি লেখক সাহাবিদের মাধ্যমে তা লিখিয়ে নিতেন।
৩. তারতিবের মাধ্যমে। তারতিব হচ্ছে, যেমন, পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম আয়াত হলো সুরা আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত; কিন্তু আমাদের কাছে যে মাসহাফ রয়েছে, তাতে এই আয়াতগুলো আসেনি। বরং সুরা বাকারার মাধ্যমে কুরআনের সূচনা হয়েছে। এর কারণ হলো, কুরআন নাজিল হয়েছে এক তারতিবে আর সাজানো বা বিন্যস্ত করা হয়েছে আরেক তারতিবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। আল্লাহর নির্দেশে নবিজি এভাবেই বিন্যস্ত করেছেন। এ জন্য নামাজে তারতিব রক্ষা করা জরুরি। কেউ যদি প্রথম রাকআতে সুরা ইখলাস পড়ে আর দ্বিতীয় রাকআতে সুরা লাহাব পড়ে, তাহলে তার নামাজ হয়ে যাবে ঠিক, কিন্তু তারতিবের খেলাফ হওয়ায় মাকরুহ হবে।
সাবআতু আহরুফ
আমরা আগেই আলোচনা করে এসেছি যে, হজরত আবু বকর রা.-এর খিলাফতকালে হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রা.-এর মাধ্যমে কুরআন একটি নুসখায় সংরক্ষণ করা হয়। এরপর উসমান রা.-এর খিলাফতকালে যখন কুরআনের বিভিন্ন পঠনরীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন তিনি এটাকে এক মাসহাফ রেখে বাকিগুলো ধ্বংস করে দেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি সেটা হলো, আমরা যে কেরাতে তিলাওয়াত করি, এটা কার অনুসরণে করি? এটা আমাদের জানতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ وَلِكُلِّ آيَةٍ مِنْهَا ظَهْرُ وَبَطْنُ
কুরআন সাতটি হরফে (সাত পদ্ধতির কেরাতে) নাযিল হয়েছে। এর প্রত্যেক আয়াতের একটি স্পষ্ট-বাহ্যিক ও একটি অস্পষ্ট-অভ্যন্তরীণ (ব্যাখ্যাসাপেক্ষ দিক) রয়েছে।
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা এই কুরআনকে সাত হরফ বা সাত অক্ষরে নাজিল করেছেন। 'সাত হরফে' নাজিল করেছেন-এর ব্যখ্যা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেন, সাত হরফ অর্থ হলো সাত কেরাত, সাত লুগাত, সাতটি বিষয়বস্তু ইত্যাদি।
কোনো কোনো মুহাদ্দিস আবার এই 'সাত হরফের' ব্যাখ্যা হিশেবে বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা এই কুরআন নাজিল করেছেন সাতটি দোজখ থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত লাভ করার জন্য। এই হলো 'সাবআতি আহরুফিন' এর মোটামুটি একটা ব্যখ্যা।
وَلِكُلِّ آيَةٍ مِنْهَا ظَهْرُ وَبَطْنُ অর্থাৎ, প্রতিটি আয়াতের আবার দুটি মর্ম রয়েছে-একটি জাহিরি বা প্রকাশ্য, অপরটি বাতিনি বা অপ্রকাশ্য। এ জন্য কুরআনে এমন আয়াতও আছে, যেটার আভিধানিক তরজমা করে যদি আপনি তাতেই স্থির হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। এ সম্পর্কে একটু পরে আলোচনা করা হবে।
পৃথিবীতে সাত এবং দশ কেরাতের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কেরাত হলো তিনটি :
১. কেরাতে আসিম রাহ.। আমরা এই কেরাতেই পড়ি এবং বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমান এই কেরাতেই পড়েন।
২. কেরাতে নাফি রাহ.।
৩. কেরাতে দুওয়াইরি।
ইন্টারনেটে সার্চ করে আপনারা অন্যান্য কেরাতের কাইফিয়াত বা সিস্টেম জানতে পারবেন। তবে ১০ কেরাতের কুরআন পড়া শুদ্ধ হলেও মাত্র তিনটি সুপ্রসিদ্ধ হওয়া এটা আল্লাহর কুদরত। কেননা, ইমাম তো অনেকেই আছেন; কিন্তু মাত্র ৪জন ইমাম সুপ্রসিদ্ধ হয়েছেন। আমরা যে কারীর কেরাত অনুসরণ করি, তিনি হলেন ইমাম আসিম ইবনু আবিন নুজুম আল কুফি।
কুফার কেরাতে কুরআন
গতকালের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম যে, কুফা হলো ইলমের রাজধানী। এর একটা প্রমাণ আজও দিচ্ছি। সারা দুনিয়ার মানুষ যাঁর কেরাত অনুসরণ করে, তাঁর জন্মও কুফায়। আবু হানিফার জন্মও কুফায়। এখন দেখা যায়, আবু হানিফাকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন; অথচ আমরা যাঁর কেরাত অনুসরণ করি, তিনিও এই কুফার অধিবাসী। এখন যদি আমরা তাঁকে না মানি, তাহলে তো আমাদের নামাজই হবে না। মোটকথা, আমরা কেরাতের অনুসরণ করি আসিমের। এর রেওয়াতকারী হলেন হাফস ইবনু সুলায়মান আল আসাদি আল কুফি। তাঁর বাড়িও কুফায়!
মজার ঘটনা হলো, আমরা যাঁর কেরাতে কুরআন পড়ি, সেই আসিমের কেরাতের বর্ণনাকারী হলেন দুজন। একজন হলেন ইমাম হাফস, অপরজন হলেন ইমাম শুবা। তবে তাঁদের দুজনের মধ্যে হাফসের বর্ণনাকে সারা পৃথিবী গ্রহণ করেছে। কেন করেছে, এ সম্পর্কে চমকপ্রদ একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি হচ্ছে-
ইমাম হাফস রাহ. কোলের শিশু থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা ইনতিকাল করেন। এরপর তাঁর মা ইমাম আসিম রাহ.-এর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৎপিতা আসিমের তত্ত্বাবধানেই লালিত পালিত হতে থাকেন হাফস। এবং এখান থেকেই তিনি পিতা আসিমের কেরাত লাভ করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন। এখন যাঁর ঘরে লালিত পালিত হলেন হাফস রাহ., তিনি তাঁর সৎপিতার কেরাত কীভাবে শিক্ষা অর্জন করেছেন, এটা বর্ণনা করে বোঝানোর মতো নয়। পিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে থেকে থেকেই তিনি এই শিক্ষা লাভ করেন। এ কারণে শুবার কেরাতের চেয়ে হাফসের কেরাত বেশি গ্রহণ করা হয়। আমরাও তাঁর কেরাতেরই অনুসরণ করি।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো যে, ইমাম হাফস, শুবা ও আসিম সকলেই কুফার অধিবাসী ছিলেন। কেননা, ইলমের দরজা হলেন আলি রা.; আর তিনি কুফায় এসেছিলেন। ফলে হাজার হাজার আলিম ও মুহাদ্দিস কুফায় জন্মগ্রহণ করেন।
আরও মজার বিষয় হলো, হাফস রাহ. থেকে বর্ণিত কেরাতের সনদ হলো এমন— ইমাম হাফস রাহ. কেরাত শিখেছেন তাঁর (সৎ) পিতা আসিম থেকে, তিনি আবু আবদুর রাহমান আস সুলামি থেকে, তিনি হজরত আলি রাজিআল্লাহু আনহু থেকে, তিনি রাসুল থেকে, রাসুল জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে, আর জিবরিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে। সুবহানাল্লাহ।
তবে অন্য এক বর্ণনায় হাফস রাহ.-এর সনদের বিবরণ হলো এমন—হাফস রাহ. কেরাত শিখেছেন জির ইবনু হুবাইশ রাহ. থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের কাছ থেকে, তিনি রাসুল থেকে, রাসুল জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে, আর জিবরিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে।
আমরা যে নামাজ পড়ি, এই নামাজ পড়ার কাইফিয়াত কীভাবে আমাদের কাছে এল, এ সম্পর্কে একটু জানা দরকার। কারণ, আমরা নামাজ পড়ি হজরত ইমাম আবু হানিফা রাহ.-এর মাজহাব অনুযায়ী। তিনি গবেষণা করেই এটা বের করেছেন। ইমামে আজম নামাজ শিখেছেন নবিজির দীর্ঘ দিনের খাদিম হজরত আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে।
আর আনাস রা. কীভাবে নামাজ পড়েন, ইমাম আবু হানিফা সেটা দেখেছেন কুফার মসজিদে। আনাস রা. দীর্ঘ সময় নবিজির একান্ত সান্নিধ্যে থাকার ফলে নবিজির খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ভালো করে জানতেন। তিনি যেহেতু নবিজির ঘরেই থাকতেন, নবিজির সেবাশশ্রুষা করতেন, সবসময় নবিজির সঙ্গে লেগে থাকতেন, তাই নবিজির চলাফেরা, ওঠাবসা, আচার-ব্যবহার, সবকিছু গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন, অন্য কোনো সাহাবি এতটা পারেননি। অপরদিকে ইমাম আবু হানিফা রাহ. আনাস রা.-কে কুফার মসজিদে সরাসরি নামাজ পড়তে দেখেছেন। তাই আবু হানিফা রাহ. নামাজ সম্পর্কে যেসব বর্ণনা আমাদের সামনে রেখে গেছেন, সেগুলোর বিবরণ ও কাইফিয়াত শুদ্ধতার কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত।
আর আনাস রা. এর নামাজ সবচেয়ে বিশুদ্ধ পন্থায় যে হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, তিনি কীভাবে নামাজ পড়ছেন, ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, সেটা নবিজি দেখেছেন। ঠিক তেমনি হাফস রাহ. যেহেতু তাঁর সৎপিতা আসিম থেকে কেরাত শিক্ষা করেছেন, তাই এতেও বিশুদ্ধতার ব্যাপারটি প্রশ্নাতীত। কারণ, অন্য কোনো উস্তাদের কাছে শিখলে হয়তো কোথাও কোনো মিসটেইক হয়ে যেত বা ছুটে যেত, কিন্তু তিনি যেহেতু ঘরেই এবং পিতার কাছ থেকে শিক্ষা করেছেন, তাই প্রতিটি বিষয়ে বারবার জানার সুযোগ পেয়েছেন। এ কারণে হাফসের কেরাত সর্বপরিচিত।
ইমামুল জারহি ওয়াত-তা'দিলের দৃষ্টিতে ইমামে আজম
গতকালের আলোচনায়ও বলেছি, আজ আবারও বলছি। কুফাকে কেন ইলমের রাজধানী বলা হয়, এ সম্পর্কে তো আমরা মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে গেলাম। আর ইমাম আজম আবু হানিফা কে ছিলেন, তাঁর সম্পর্কেও গতকাল আলোচনা করেছি। আবু হানিফা সম্পর্কে সে যুগের প্রতিতযশা আলিম ইয়াহইয়া ইবনু আদম রাহ. বলেন, 'কুফা ও বসরার মুহাদ্দিসগণ যত হাদিস বর্ণনা করেছেন, সব হাদিস গ্রহণ করেছেন আবু হানিফা রাহ।'
সে যুগের বিখ্যাত আলিম, জারাহ ও তাদিলের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু সায়িদ আল কাত্তান রাহ.। তিনি ইমাম আবুহানিফা সম্পর্কে বলেন, 'আমি কসম করে বলছি, আবু হানিফা রাহ. হলেন দ্বীনের ব্যাপারে এই উম্মতের সবচেয়ে বড় আলিম।' এটা সে যুগের সবচেয়ে বড় আলিম, হাদিসজ্ঞ ইয়াহইয়া ইবনু সায়িদ আল কাত্তান রাহ.-এর কথা। যাঁর কথায় হাদিসের মান নির্ণয় করা হতো, সেই তিনি তাঁর কথাটি দৃঢ় করতে কসম করে বলেছেন, 'ইমাম আবু হানিফা হলেন কুরআন-হাদিসের সবচেয়ে বড় আলিম। তাঁর কোনো তুলনা নেই।'
এই যে কসম বা শপথ করা, এটা কখনো নিজের কথার সমর্থনে ও দৃঢ়তার জন্য করা হয়ে থাকে। যেমন, নবিজি তাঁর সাহাবিদের ব্যাপারে সমালোচনা থেকে বিরত থাকতে 'আল্লাহ আল্লাহ ফি আসহাবি' শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন, 'আল্লাহর দোহাই, তোমরা আমার সাথিদের ব্যাপারে সমালোচনা করো না।'
আবু হানিফা হলেন তাবেয়ি। তাবেয়ি বলা হয় যাঁরা ঈমানের হালতে কোনো সাহাবিকে দেখেছেন এবং অনুস্মরণ করেছেন। আর আবু হানিফা অনেক সাহাবির সরাসরি সান্নিধ্য গ্রহণ করেছেন। এ কারণে তাঁর বর্ণিত হাদিস দুর্বল হতে পারে না। কারণ, সাহাবিগণ বিশ্বস্ত। তাঁদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নবিজিও সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই বলা যায়, আবু হানিফার বর্ণিত হাদিসগুলো সহিহ।
এখন শত বছর পরে যদি কোনো হাদিসের মান নিয়ে প্রশ্ন উত্তাপন করা হয় এবং এই তীর আবু হানিফার দিকে নিক্ষপ করা হয়, তাহলে এটা অনুচিত। এ কারণে তাঁকে দায়ী করা যাবে না। আর তিনি কীভাবে হাদিস গ্রহণ করতেন এবং কতটা সতর্কতা অবলম্বন করতেন, এ সম্পর্কে শাফিয়ি মাজহাবের প্রসিদ্ধ আলিম আল্লামা আবদুল ওয়াহহাব আশ শায়রানি তাঁর আল মিজানুল কুবরা গ্রন্থে লিখেন, 'ইমাম আবু হানিফা রাহ, নবিজির বর্ণিত কোনো হাদিস গ্রহণের ব্যাপারে এমন কঠোর শর্ত করতেন যে, তিনি যখন কোনো হাদিস গ্রহণ করতেন, তখন দেখতেন, হাদিসটি সাহাবিদের এক জামাআত বর্ণনা করেছেন কি না? এরপরই তিনি হাদিসের উপর আমল করতেন।' অর্থাৎ, একজনের কথায় তিনি হাদিস গ্রহণ করতেন না।
মাজহাব কী
এখানে আমাদের এই বিষয়টি জানা দরকার যে, ইমাম আবু হানিফা রাহ. হানাফি মাজহাবের ইমাম। তবে মাজহাব কোনো ধর্ম নয়। কেননা, মাজহাব শব্দের তিনটি অর্থ রয়েছে:
১. বিশেষ কারণে যাওয়া।
২. বিশেষ জায়গায় যাওয়া।
৩. বিশেষ সময়ে যাওয়া।
এই 'যাওয়া'র মানে কি? যেমন, কেউ যদি আত্মপ্রশান্তি বা অবকাশ যাপনের জন্য কোনো গাছের নিচে বা কোথাও বেড়াতে যায়, আভিধানিক অর্থের দিক দিয়ে এটাও মাজহাব। যেহেতু একটা বিশেষ কারণে বা শারীরিক প্রশান্তির জন্য যাওয়া। এটা হয় বিশেষ কারণে, বিশেষ জায়গায় এবং বিশেষ সময়ে। তাই এটা মাজহাব। আর রুহানি প্রশান্তির জন্য কোথাও যাওয়াকেও মাজহাব বলা হয়। যেমন, অনেক হাদিসের বর্ণনা ও মর্ম ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এক হাদিসে এমন বলা হয়েছে, তো আরেক হাদিসে অন্যভাবে বলা হয়েছে। এতে করে আমরা সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তি ও পেরেশানিতে পড়ে যাই। তাই এটা থেকে মুক্তি পেতে, রুহের সান্ত্বনার জন্য আমরা বিশেষ একটা মত গ্রহণ করি। আমরা যখন কোনো মাসআলা নিয়ে ঝামেলায় পড়ি, তখন আলিমের কাছে জিজ্ঞেস করে এর সমাধান জেনে নিই। এটাও একটা মাজহাব। মোটকথা, শারীরিক ও আত্মিক প্রশান্তির জন্য কোনো এক মতকে প্রধান্য দিতে গিয়ে একজনকে মানার নামই হলো মাজহাব। আর এই মাজহাবের প্রবর্তন হয়েছে নবিজি ﷺ-এর সুন্নাত বাস্তবায়নের জন্য।
এতটুকু আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, পবিত্র কুরআন সংকলন, সংরক্ষণ, ইরাব ও নুকতা লাগানোর এই ধারাক্রম আমাদের পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে পৌঁছেছে। যাঁদের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত কুরআন পৌঁছেছে, আমাদের উচিত হলো তাঁদের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। তাঁদের দরজা বুলন্দির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা। তাদের জন্য আল্লাহর শেখানো দুআ করা,
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَ لِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
হে আল্লাহ! আমাদেরকে এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভাইদের মাফ করে দাও। ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।
📄 কুরআন বোঝা এবং বোঝানো
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদেরকে কুরআনের এই মজলিসে বসার এবং কথা শোনার তাওফিক দিয়েছেন। আমরা যে এতক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করলাম এবং শুনলাম, হাদিস পড়লাম ও শুনলাম, জিকির, তাসবিহ ইত্যাদি পাঠ করলাম, এতে অসংখ্য সাওয়াব রয়েছে। কুরআন পড়লে যেমন সাওয়াব, শুনলেও তেমন সাওয়াব। এমনিভাবে হাদিস পড়া এবং শোনার মধ্যেও সাওয়াব রয়েছে। রাসুল বলেন,
نضر الله امرءا سمع مقالتي যারা নবির হাদিস শ্রবণ করল, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া-আখিরাতে সুখী করবেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
فَوَقُهُمُ اللَّهُ شَرَّ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَلَقْهُمْ نَضْرَةً وَ سُرُورًا অতঃপর, আল্লাহ তাদেরেকে সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দিবেন সজিবতা ও আনন্দ। [সুরা দাহর: ১১] আখিরাতে তারা কেমন সুখী হবে, এ সম্পর্কে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
يَوْمَ تَبْيَضُ وُجُوهٌ وَ تَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ﴾ সেদিন কিছু মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে, যাদের মুখ কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে), 'তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরি করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ করো, যেহেতু তোমরা কুফরি করতে। [সুরা আলে ইমরান: ১০৬]
এ জন্য আমাদেরকে হাদিস পড়া ও শোনার অভ্যাস করতে হবে। এটা অত্যন্ত ফজিলতের কাজ। এ ছাড়া আমরা যে তাসবিহ ইত্যাদি পড়লাম, এতেও প্রচুর সাওয়াব রয়েছে। এগুলোর সাওয়াব আমাদের আমলনামায় জমা হবে, যা কিয়ামতের দিন কাজে আসবে।
দুনিয়াতে মানুষ যেমন ব্যাংকে টাকা জমা রাখে, যাতে বিপদের সময় কাজে লাগে, এমনিভাবে আমরা সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি দুআ-তাসবিহ পাঠ করে মূলত সাওয়াব সঞ্চয় করে রাখলাম। এ সম্পর্কে নবিজি ইরশাদ করেন, এগুলো হলো الباقيات الصالحات বা এমন নেক কাজ, যা স্থায়ী হয় এবং কিয়ামতের দিন এগুলো কাজে লাগবে। এভাবে আমরা যে দুরুদ পাঠ করলাম, এতেও প্রচুর সাওয়াব রয়েছে। এগুলোর প্রতিটা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় পৃথক পৃথক আলোচনা করা যাবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ যেন আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দেন, আমিন।
হাদিস শরিফে ইসতিগফার পাঠকারীর জন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। রাসুল বলেন,
طوبى لمن وجد في صحيفته استغفارًا كثيرًا
অর্থাৎ, সে-সকল মানুষের জন্য সুসংবাদ, যারা সবসময় ইসতিগফার পাঠ করে। এ জন্য আমরা সবসময় ইসতিগফার পাঠ করব। ইসতিগফার এমন এক আমল, যা সবসময় পাঠ করা যায়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
এবার আমরা মূল আলোচনায় চলে যাই। হাদিসে নবিজি ইরশাদ করেন,
خيركم من تعلم القرآن وعلمه তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়।
তিন প্রকার আয়াত
আজকের আলোচনা বুঝতে হলে প্রথমে ছোট্ট একটি বিষয় বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে, আমরা যে কুরআন তিলাওয়াত করি, এই কুরআনের আয়াতসমূহ তিনভাগে বিভক্ত।
১. প্রথম প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক এবং পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায়। এগুলোকে মুহকামাত বলা হয়। এগুলোর উপর আমল করেই জান্নাতের পথ বেছে নেওয়ার জন্য আমরা আদিষ্ট।
২. দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর কেবল আভিধানিক অর্থ বোঝা যায়, পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায় না-যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ এখানে 'ইয়াদুল্লাহ' শব্দের শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, 'আল্লার হাত' অথচ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার কোনো আকৃতি নেই। তাহলে কীভাবে আল্লাহ তাআলার হাত হতে পারে? ঠিক তদ্রুপ আরও এমন অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলোর মর্মার্থ উদ্ঘাটন করতে গেলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হবে। তাই এসব আয়াত যেরকম রয়েছে, সেরকমই আমরা বিশ্বাস করি।
৩. তৃতীয় প্রকারের আয়াতগুলো এমন, যেগুলোর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কোনোটাই বোঝা যায় না। যেমন ১-এর মতো বিভিন্ন সুরার শুরুতে যে হুরুফে মুকাত্তাআত রয়েছে, এগুলোর কোনো অর্থ আজও কেউ বের করতে পারেনি। এগুলো আল্লাহ তাআলা এভাবেই রেখে দিয়েছেন এটা বুঝানোর জন্য যে, মানুষ সব বিষয়ের জ্ঞান রাখে না। মানুষের ক্ষমতা একটি পর্যায়ে এসে সম্পূর্ণ অক্ষম।
তাহলে আমরা বুঝলাম যে, কুরআনের আয়াত তিন প্রকার। একপ্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক এবং পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায়। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক অর্থ বোঝা যায় কিন্তু পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায় না। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কোনোটাই বোঝা যায় না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব হুরুফে মুকাত্তাআত রয়েছে সেগুলো তিলাওয়াত করলে সাওয়াব হবে, নাকি হবে না? জবাব হচ্ছে, অবশ্যই সাওয়াব হবে। এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
অর্থ না বুঝে কুরআন পড়া
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা মনে করেন অর্থ বোঝা ছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করলে তাতে কোনো সাওয়াব হবে না। অথচ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী বোঝা যায়, কুরআনের প্রতিটি হরফ তিলাওয়াত করার মাধ্যমেই বান্দা ১০টি করে নেকি পায়। যেমন, হজরত ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ইরশাদ করেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفاً مِنْ كِتاب الله فَلَهُ حَسَنَة، والحَسَنَة بِعَشْرِ أَمْثَالِها، لا أقول : ألم حَرفٌ، ولكِنْ أَلِفُ حَرْفٌ، وَلَامٌ حَرْفٌ، وَمِيمٌ حَرْفٌ
কেউ যদি কুরআনের একটি হরফ তিলাওয়াত করে, তাহলে তাকে ১০টি নেকি দেওয়া হয়। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম তিলাওয়াত করার মাধ্যমে ১০টি নেকি পাবে বরং 'আলিফ' একটি হরফ, 'লাম' একটি হরফ, এবং 'মীম' একটি হরফ। (সুতরাং, আলিফ-লাম-মীম বলার মাধ্যমে তিন দশে ৩০টি নেকি পাবে।
এখানে রাসুল ﷺ অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করার কথা বলেননি। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা যখন হাফিজ হয়, তখন তারা এর কোনো মর্ম অনুধাবন করে না। তাই বলে কি তাদের তিলাওয়াতে কোনো সাওয়াব হবে না? অবশ্যই হবে। কারণ, কুরআনই একমাত্র কিতাব, যেটা বুঝে পড়লেও সাওয়াব, না বুঝে পড়লেও সাওয়াব।
হুফফাজুল কুরআন
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদির প্রতি বিশেষ একটি নিয়ামত হচ্ছে কিতাবুল্লাহ। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এই উম্মতের লক্ষ-কোটি মানুষ কুরআনের হাফিজ হচ্ছেন। কিন্তু অন্যান্য নবি-রাসুলদের বিষয় ভিন্ন। মুফাসসিরিনে কেরাম লিখেন, পূর্ববর্তী রাসুলদের উপর যেসব কিতাব নাজিল করেছেন, তা কেবল ওই নবি-রাসুলের উপর পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। উম্মতের জন্য পড়া জরুরি ছিল না। এমনকি পূর্ববর্তী কোনো নবির উম্মত তাদের আসমানি কিতাব মুখস্থও করতে পারত না। যদি কেউ কষ্ট করে মুখস্থ করেও ফেলত, তবে তাকেও আল্লাহ নবুওয়াত দিয়ে দিতেন। সুবহানাল্লাহ।
হজরত ইউশা ইবনু নুন মুসা আলাইহিস সালামের খাদিম ছিলেন। মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে থাকতে থাকতে তিনি তাওরাত কিতাব মুখস্থ করে নেন। এভাবে হজরত উজাইর আলাইহিস সালামও তাওরাতের তিলাওয়াত শুনতে শুনতে তাওরাত মুখস্থ করে ফেলেন। ফলে আল্লাহ তাঁদেরকেও নবুওয়াতের মর্যাদা দান করেন। এটা হচ্ছে সুহবত বা সাহচর্যের ফল। বিভিন্ন বুজুর্গের সান্নিধ্য গ্রহণের মাধ্যমে অনেকেই যেমন ভালো মানুষ হয়ে যায় এবং সাথে থাকার বরকতে অনেক কিছু শিখে ফেলে। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে আমরাও আল্লাহওয়ালা বুজুর্গদের সান্নিধ্য গ্রহণে সচেষ্ট হবো।
কিন্তু কুরআনের ব্যাপারটা ভিন্ন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে কুরআন পড়তেন, আমাদেরকেও এভাবেই কুরআন তিলাওয়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুধু অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমন নয়; বরং কুরআন নাজিলের শুরুলগ্ন থেকেই আল্লাহ তাআলা এটার হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন। হেফাজতের একটি বিশেষ পন্থা হলো উম্মতে মুহাম্মদি কুরআন মুখস্থ করবে এবং সেটা তারা তাদের বুকে লালন করবে। আর এ জন্যই মুখস্থ করার ব্যাপারটা আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। হাফিজে কুরআনের পিতামাতার মাথায় আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন সম্মানের মুকুট পরাবেন। তাই আমরা আমাদের সন্তানদের হাফিজ বানাব। আলিম বানাব। দ্বীন শিক্ষা দেবো। অন্তত জীবন চলার মতো জরুরি দ্বীন শিক্ষা দেবো। নাহয় কিয়ামতের দিন আমরা রক্ষা পাব না। এই সন্তান কিয়ামতের দিন আমার শাস্তির কারণ হবে।
সাতদিনে হাফিজ
এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা জরুরি। হজরত ইমাম আজম আবু হানিফা রাহ.-এর দারসে প্রচুর ছাত্র আসত। তবে যে কেউ চাইলে তাঁর দারসে অংশ নিতে পারত না। এ জন্য কিছু শর্ত ছিল। প্রথম শর্ত হচ্ছে, কুরআনের হাফিজ হতে হবে। কারণ, শরিয়তের চার দলিলের মধ্যে প্রথমটাই হচ্ছে কুরআন। এরপর সুন্নাহ, এরপর ইজমা, এরপর কিয়াস।
ইমাম আবু হানিফার কাছে একজন ছাত্র এলেন ভর্তি হতে। তিনি হলেন হজরত ইমাম মুহাম্মাদ আশ শায়বানি রাহ.। তিনি আবু হানিফাকে অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন তাঁর দারসে বসার সুযোগ দেন। তখন ইমাম আবু হানিফা তাঁকে প্রশ্ন করেন, 'তুমি কি কুরআনের হাফিজ?' তিনি বললেন, 'না'। তখন আবু হানিফা রাহ. মুহাম্মাদ রাহ.-কে বললেন, 'তোমাকে প্রথমে কুরআন হিফজ করতে হবে, নাহয় আমার এখানে ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।' মুহাম্মাদ রাহ. ব্যথিত মনে ইমাম আবু হানিফার দরবার থেকে ফিরে যান।
তাজকিরাতুল হুফফাজ গ্রন্থে রয়েছে, ইমাম আবু হানিফার দরবার থেকে চলে যাওয়ার পর ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. মাত্র ৭দিনে পুরো কুরআন মুখস্থ করে নেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, মাত্র ৩ দিনে তিনি কুরআন হিফজ করেন। সুবহানাল্লাহ।
বস্তুত, আল্লাহ কুরআন মুখস্থ করা অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ
আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব কোনো উপদেশগ্রহণকারী আছে কি? [সুরা কামার: ১৭]
তবে এর মর্ম বোঝা এত সহজ নয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনের অপর আয়াতে রয়েছে, إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। [সুরা মুজ্জাম্মিল : ৫]
এখন কথা হচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা যে কুরআন হিফজ করে তারা তো কুরআনের অর্থ জানে না, কুরআনের মর্মবাণী তারা অনুধাবন করতে পারে না, তারা কি তবে সওয়াব পাবে না? অবশ্যই তারা সাওয়াব পাবে। শুধু সাওয়াবই হবে এমন নয়; বরং রাসুলুল্লাহ কুরআনের হাফিজের ব্যাপারে অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ যখন ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে, ঠিক তখনই হাফিজে কুরআনের পিতামাতার মাথায় আল্লাহ তাআলা নুরের একটি তাজ পরিয়ে দেবেন। তখন সকলেই তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَتَعَلَّمَهُ وَعَمِلَ بِهِ أُلْبِسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تَاجًا مِنْ نُورٍ ضَوْءُهُ مِثْلُ ضَوْءِ الشَّمْسِ، وَيُكْسَى وَالِدَيْهِ حُلَّتَانِ لَا يَقُومُ بِهِمَا الدُّنْيَا فَيَقُولَانِ: بِمَا كُسِينَا ؟ فَيُقَالُ: بِأَخْذِ وَلَدِكُمَا الْقُرْآنَ
যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে, কুরআনের ইলম অর্জন করবে এবং সে অনুযায়ী আমল করবে, কিয়ামতের দিন তাঁর পিতামাতাকে নূরের মুকুট পরানো হবে। যার আলো হবে সূর্যের আলোর মতো। আর তাঁর পিতামাতাকে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান দুটি পোশাক পরানো হবে। তারা বলবে, কীসের জন্য আমাদের এসব পোশাক পরানো হচ্ছে? (তাদের) বলা হবে, তোমাদের সন্তান কুরআন গ্রহণ করেছে, এ জন্য তোমাদেরকে এভাবে সম্মানিত করা হচ্ছে।
যদি হাফিজে কুরআনের পিতামাতার এত সম্মান হয়, তাহলে স্বয়ং হাফিজে কুরআনের সম্মান কতটা হতে পারে? আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা কুরআনের তালিমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। এ জন্য যারা তাদের সন্তানদের কুরআনের তালিম থেকে দূরে রাখবে, তাদের ব্যাপারে অনেক হুমকি রয়েছে। হাশরের ময়দানের যখন কুরআন না শেখার জন্য কোনো মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন সে বলবে, ‘হে আল্লাহ, কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি, কুরআনের তালিমের প্রতি আমি আগ্রহী ছিলাম; কিন্তু আমার পিতামাতা আমাকে কুরআন তালিমের কোনো সুযোগ দেননি। সুতরাং আমাকে জাহান্নামে দেওয়ার আগে আমার পিতামাতাকে জাহান্নামে দিতে হবে।’
তাহলে বুঝুন, যারা কুরআন তালিমের ব্যাপারে তাদের সন্তানদের নিয়ে সচেষ্ট থাকেন, তাদের ব্যাপারে যেভাবে ফজিলত রয়েছে, তেমনিভাবে যারা কুরআন তালিমের ব্যাপারে দায়িত্বহীন, তাদের ব্যাপারেও হুমকি রয়েছে।
আমরা জেনারেল শিক্ষার বিরুদ্ধে নই। মুসলমানের সন্তান ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, এটা মুসলমানদের জন্য গৌরবের; কিন্তু এসব হবে কুরআন তালিমের পরে। কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে যখন কুরআনের শিক্ষা থাকবে, তখন আশা করা যায়, কোনো ভ্রান্তি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তাই প্রথমে কুরআনের শিক্ষা, এরপর দুনিয়াবি সকল শিক্ষাই যথোপযুক্ত কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।
কুরআন শিক্ষার ব্যাপারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, আভিধানিক অর্থ বুঝে কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। কুরআনের জ্ঞান অর্জন করার জন্য অবশ্যই একজন শিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষক ছাড়া শুধু আভিধানিক অর্থ জেনেই কুরআনের শিক্ষা অর্জন করতে গেলে ভ্রান্তিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে রাসুল-কে শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাসুল-এর কাছ থেকে কুরআনের শিক্ষা নিয়েছেন। এরপর সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে তাবেয়িগণ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এরকম কুরআন নাজিলের শুরু লগ্ন থেকেই শিক্ষক-ছাত্রের সিলসিলা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। শিক্ষক-ছাত্রের এই নিসবত কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে।
সাদা সুতা কালো সুতা
সহিহ বুখারি শরিফে ইমাম বুখারি রাহ. একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যে ঘটনার মাধ্যমে আমরা অনুধাবন করতে পারব যে, কেবল আভিধানিক অর্থ জেনেই কুরআনের মর্মার্থ বোঝা সম্ভব নয়। তিনি যে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন, সেটা মোটামুটি এরকম যে, আল্লাহ তাআলার ইরশাদ হচ্ছে,
فَالُنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ
অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান করো। আর আহার করো ও পান করো, যতক্ষণ-না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। [সুরা বাকারা : ১৮৭]
আল খাইতুল আবইয়াদ-এর মাধ্যমে 'সুবহে সাদিক' এবং আল খাইতুল আসওয়াদ- এর মাধ্যমে 'সুবহে কাজিব' উদ্দেশ্য ছিল। হজরত আদি ইবনু হাতিম রা. কুরআনের এই আয়াতের আভিধানিক অর্থ জেনেই এর মর্মার্থ না বোঝে বড় একটি গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেন। তিনি একটি সাদা সুতা এবং একটি কালো সুতা তাঁর বিছানার নিচে রেখে খাওয়া এবং পান করা চালু রাখলেন। অতঃপর যখন বিষয়টি তাঁর বুঝে আসছিল না, তখন তিনি রাসুল -এর কাছে গেলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, 'এখানে আল্লাহ তাআলা আল খাইতুল আবইয়াদের মাধ্যমে সাদা সুতা নয়; বরং সুবহে সাদিক বুঝিয়েছেন এবং আল খাইতুল আসওয়াদের মাধ্যমে কালো সুতা নয়; বরং সুবহে কাজিব উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
সুতরাং বোঝা গেল যে, কেবল আভিধানিক অর্থের মাধ্যমেই কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার একজন শিক্ষক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন ভালো করে বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।
📄 রোজার রুহ
আল্লাহর সন্তুষ্ঠিলাভের জন্য আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর অনেক বিধান দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো রোজা। রোজা একটি ফরজ ইবাদত। রোজার ফরজিয়াত সম্পর্কে যে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে সেটি হচ্ছে,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]
আয়াতে আল্লাহ তাআলা يَأْيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا বা 'হে ঈমানদারগণ' বলে সম্বোধন করেছেন। আপনি যদি আপনার সন্তানকে 'হে আমার সন্তান, হে আমার আদরের দুলাল' এভাবে ডাক দেন, তাহলে আপনার সন্তান খুশি হবে, না বেজার হবে? অবশ্যই খুশি হবে। আর আপনি যদি 'এই অমুক' বলে ডাক দেন, তখন এই সম্বোধনে মায়া-মমতা অনেকটা কম থাকে। তা ছাড়া সন্তানকে যদি তার নাম ধরে না ডেকে 'হে আমার সন্তান' এভাবে ডাক দেন, দেখবেন সে অনেক খুশি হবে। এ কারণে আয়াতে আল্লাহ তাআলা 'হে ঈমানদারগণ' বলে সম্বোধন করেছেন।
কুতিবা আলাইকুমুস সিয়াম অর্থাৎ, আমি আল্লাহ তোমাদের উপর রোজা ফরজ করেছি। এখানে 'কুতিবা' শব্দের অর্থ 'ফুরিজা' বা ফরজ করেছি। আর 'কিতাবুন' শব্দের অনেক অর্থ রয়েছে। একটা অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় বিধান। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيْهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَ الْأَنْفَ بِالْأَلْفِ وَ الْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَ السِّنَّ بِالسِّنِّ وَ الْجُرُوحَ قِصَاصُ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ ﴾
আমি তাদের জন্য তাতে বিধান দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, আর দাঁতের বদলে দাঁত, আর জখমের বদলে অনুরূপ জখম। কেউ ক্ষমা করে দিলে তাতে তারই পাপ মোচন হবে। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই জালিম। [সুরা মায়েদা : ৪৫]
'কাতাবা' শব্দের আরেক অর্থ হলো রহম বা দয়া করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর লিখে নিয়েছেন দয়া। [সুরা আনআম: ৫৪]
সুতরাং کُتِبَ عَلَيْكُمُ الصَّيَامُ-এর মর্ম হলো, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর যে রোজা ফরজ করেছেন, এটা আল্লাহ তাআলার অনেক বড় দয়া বা অনুগ্রহ।
সিয়াম ও সাওম আরবি শব্দ। আর রোজা ফারসি শব্দ। বাংলায়ও রোজা বলা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, আরবিতে যেহেতু 'সিয়াম' ও 'সাওম' উভয় শব্দের অর্থই রোজা, তাহলে আল্লাহ তাআলা كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ বললেন কেন? সাওম বলেননি কেন? অথচ পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় সাওম শব্দের ব্যবহার রয়েছে। তা ছাড়া 'সিয়াম' ও 'সাওম' উভয় শব্দের অর্থ যেহেতু এক, তাহলে كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ এখানে 'সাওম' না বলে 'সিয়াম' বললেন কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানতে হবে। কুরআনের মাত্র এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা 'সাওম' এবং সাত জায়গায় 'সিয়াম' শব্দ উল্লেখ করেছেন। অর্থে ভিন্নতা না থাকার পরও আল্লাহ কেন উভয় শব্দ ব্যবহার করলেন, এর রহস্য জানতে পারলে আমরা বুঝতে পারব, আল্লাহ কেন রোজা ফরজ করেছেন। এই রহস্য বোঝার জন্য আমাদেরকে কিছু বিষয় স্মরণ রাখতে হবে। যেমন:
কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ, যার পেটে খাবার নেই, এটা তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কেননা, পেটে খাবার থাকলে মুখ ও চেহারার সতেজতাই প্রমাণ করে যে, সে ক্ষুধার্ত নয়। এটা খাবারের প্রতিক্রিয়া। তেমনিভাবে তেতুঁল ও জলপাইয়ের নাম শুনলেই মানুষের জিবে পানি চলে আসে। এই যে নাম উচ্চারণ করলেই জিবে পানি চলে আসা, এটা জলপাই বা তেঁতুলের টকের প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে বোঝা গেল, প্রতিটি জিনিসেরই দুটি বিষয় রয়েছে, একটা হলো বস্তু, আর একটা তার অ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া। ঠিক তেমনিভাবে রোজারও একটা দেহ বা বডি আছে এবং একটা অ্যাকশনও রয়েছে। এখন যে রোজাদারের রোজার অ্যাকশন নেই, তার রোজার কোনো দাম নেই। যেমন, খাবার খেয়ে যদি পেট ভরে না, খাবার নামক বডির অ্যাকশন না থাকে, এই খাবারের যেমন কোনো দাম নেই, তেমনি রোজা রাখার পর এই রোজা নামক বডিতে যদি কোনো অ্যাকশন না থাকে, তাহলে এমন রোজারও কোনো মূল্য নেই।
কথাটি এভাবেও বলা যায়, প্রতিটি জিনিসের একটি বডি বা দেহ এবং একটা রুহ থাকে। আর এই বডি বা দেহের সম্পর্ক যখন রুহের সাথে তৈরি হয়, তখন এর একটা আছর বা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এভাবে রোজারও একটা বডি এবং রুহ আছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ‘সাওম’ না বলে ‘সিয়াম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন কেন, এ সম্পর্কে তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ লিখেন, রোজারও একটা বডি রয়েছে, একটা রুহও রয়েছে। রোজার বডিকে বলা হয় সিয়াম। এটা যখন বডির মধ্যে ফিট হয়ে যাবে, তখন এটাকে বলা হয় সাওম। অর্থাৎ রুহকে বলা হয় সাওম।
আর বডিতে রুহ এমনিতেই চলে আসে না; বরং চেষ্টা করতে হয়। চেষ্টা করলেই রুহ কার্যকর হয়। যেভাবে শুধু খাবার খেলেই ক্ষুধা দূর হয় না; বরং ক্ষুধা যাতে দূর হয়, সে পন্থা আপনাকে অবলম্বন করতে হবে। এভাবে শুধু রোজা রাখলেই হবে না; বরং রোজার যে রুহ আছে, সেটা কার্যকর করতে হবে। আর রোজার রুহ কার্যকর করতে হলে আপনাকে কিছু কষ্ট করতে হবে, আর এই কষ্টটা বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাআলা ‘সিয়াম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। এরপর আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]
মোটকথা, রোজার রুহ হলো যাতে তুমি মুত্তাকি হতে পারো। যাতে তোমার মধ্যে একটা কাইফিয়াত বা একটা হালত তৈরি হয় এবং তুমি মুত্তাকি হতে পারো। যেভাবে খাবার খেলে চেহারার মধ্যে একটা লাবণ্য সৃষ্টি হয়, তেমনি তোমার রোজার মাধ্যমেও যেন তোমার শরীরে তাকওয়ার একটা লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাহলে তা হলো সার্থক রোজা। এ জন্য সিয়াম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিসে 'সাওম' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে; অথচ কুরআনের আয়াতে আল্লাহ তাআলা সিয়াম শব্দ ব্যবহার করেছেন।
হাদিসে কুদসিতে রোজার ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, الصوم لي وأنا أجزي به
রোজা আমার জন্য, তাই আমিই তার বিনিময়।
এই যে রোজার ফলাফল, এটা সিয়ামের নয়, সাওমের। এবার আমরা সিয়ামের অর্থ সম্পর্কে জানব।
📄 সাওম ও সিয়াম
সিয়াম অর্থ হচ্ছে, هو الإمساك عن الشهوات من الأكل والشرب والجماع نهارا بالنية অর্থাৎ, তিনটা জিনিসকে রোজার বডি বা দেহ বলা হয়। একটা হলো খাবার ছেড়ে দেওয়া। আরেকটা হলো পান করা ছেড়ে দেওয়া। অপরটা হলো জৈবিক চাহিদা ত্যাগ করা। আর এই ছাড়ার সময় হলো দিন, রাতে নয়। এ জন্য রোজা হলো তিনটি জিনিস থেকে বিরত থাকার নাম। আর রোজা রাখার সময় হলো দিন, রাত নয়। তা ছাড়া বছরের সব দিনেই রোজা রাখা যাবে না। যেমন: দুই ঈদ। ঈদের দিন রোজা রাখার অনুমোদন নেই। তা ছাড়া হাদিসে আছে শুধু শুক্রবারে রোজা রাখা মাকরুহ। ফরজ রোজা হচ্ছে বছরে একমাস। এ ছাড়া কেউ যদি প্রতি মাসে নিয়মিত রাখে, অর্থাৎ মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখে, অন্যান্য নফল রোজা রাখে, তার জন্য বিশাল সাওয়াব রয়েছে। উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, রোজা রাখার উপযুক্ত দিনে আমাদেরকে রোজা রাখতে হবে। এ জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে অর্থাৎ, খাবার, পানি ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে বিরত থাকতে হবে। এর মাধ্যমে রোজার বডি বা দেহ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে হবে। এখন কেউ দিনের বেলা খাবার, পানি ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে বিরত থাকল; কিন্তু রোজার নিয়ত করল না, তবে তার রোজা হবে না। কারণ, রোজার মধ্যে নিয়ত করা ফরজ। এ প্রসঙ্গে হাদিসে নবিজি ﷺ ইরশাদ করেন, تسحروا فإن في السحور بركة 'তোমরা সাহরি খাও। সাহরিতে বারাকাহ রয়েছে। সাহরি খেলেই তোমাদের নিয়ত হয়ে যাবে।' কারণ, যে নির্ধারিত সময়ে সাহরি খেল, সে তো রোজার নিয়তেই সাহরি খেল।
এখন যদি মুখেও সাহরির নিয়ত করে, তবে সেটা আরও উত্তম। তবে কেউ যদি এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকে যে, মুখে নিয়ত না করলে রোজাই হবে না, তাহলে সেটাও ঠিক নয়। কেননা, মুখের সাথে রোজার কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক হলো নিয়তের সাথে। কারণ, আল্লাহ শুধু মানুষের অন্তরের অবস্থাটাই দেখেন। সহিহ মুসলিম শরিফে রাসুল বলেন,
إِنَّ اللهَ لا يَنْظُرُ إِلَى صُورِكُمْ، وَلا إلى أَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি।
আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখে থাকেন। তাই নিয়তই রোজার জন্য মূখ্য বিষয়। মনে করুন, কেউ সারা দিন উপবাস করল; কিন্তু আজ রোজা রাখব, এমন নিয়ত যদি তার অন্তরে না থাকে, তাহলে এই রোজা হবে না। কারণ, রোজার বডি বা শরীর তৈরি করা ফরজ, আর তার রোজার বডি তৈরি হয়নি।
রোজার বডি তৈরি হয়ে গেলে এর মাধ্যমে রোজার ফরজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু রোজার রুহ তৈরি করা দরকার। আর রুহ তৈরি করতে হলে আরও কিছু চেষ্টা-সাধনা করতে হবে। যে সাধনার ফলে রোজার ফজিলত এমন হয়ে যাবে যে, রাসুল বলেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِندَ اللهِ مِن رِيح المسك
যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর শপথ! সিয়াম পালনকারী ব্যাক্তির মুখের গন্ধ কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক উত্তম।
এখন আমরা রোজার রুহ কীভাবে তৈরি করব, এ সম্পর্কে জানব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]
আল্লাহ তাআলা প্রথমে كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ বলে রোজার বডি বা দেহ সম্পর্কে আলোচনা করলেন, এরপর لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ বলে রোজার রুহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
পবিত্র কুরআনে যে এক জায়গায় 'সাওম' শব্দের আলোচনা হয়েছে, ওখানেও সাওম বা রোজার রুহের আলোচনা করা হয়েছে। রোজার রুহ আবার কীভাবে হয়? আর সেই এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা 'সাওম' শব্দ কেন ব্যবহার করেছেন, এ সম্পর্কে মজার একটা ঘটনা রয়েছে। হজরত মরিয়ম আলাইহাস সালাম সম্পর্কে তো আমরা কমবেশ সবাই জানি। স্বামী ছাড়াই তাঁর ঘরে হজরত ইসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয়। এটা আল্লাহর কুদরত। হজরত আদম আলাইহিস সালামের মা-বাবা কেউ নেই। এই যে পিতা ছাড়া অথবা পিতামাতা উভয় ছাড়াই মানুষের জন্মগ্রহণ করা, এটা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ চাইলে সবকিছু করতে পারেন। আল্লাহর কাছে অসাধ্য বলতে কিছু নেই। তবে আল্লাহর স্বাভাবিক আদত বা অভ্যাস হলো, পিতামাতার মাধ্যমেই আল্লাহ সন্তান জন্ম দেওয়া।
মরিয়মের পেরেশানি
স্বামী ছাড়াই যখন হজরত মরিয়ম আলাইহিস সালাম সন্তানসম্ভবা, তখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁর উপর জিনার অপবাদ আরোপ করল। তখন আল্লাহ তাআলা হজরত মরিয়ম-এর পবিত্রতার জানান দিতে গিয়ে অভিনব একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, তুমি লোকালয় থেকে দূরে চলে যাও, সেখানে যাওয়ার পর তোমার সন্তান ভূমিষ্ট হবে। আল্লাহর নির্দেশমতো হজরত মরিয়ম লোকালয় থেকে দূরে চলে গেলেন এবং একটি মরা খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। সেখানে যাওয়ার পর আল্লাহ কুদরতিভাবে তাঁর খাবার-পানিসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেন। মরিয়ম তখন মনে মনে বলতে লাগলেন, এই অবস্থা তৈরি হবার আগেই আমি যদি মারা যেতাম, তাহলে কতই-না ভালো হতো! এখন মানুষকে আমি কী জবাব দেবো? লোকালয়ে মুখ দেখাব কেমন করে!
এসব চিন্তা যখন তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তখন একপর্যায়ে তিনি ওই মৃত খেজুর গাছের নিচে বসে পড়েন এবং তাঁর প্রসবব্যথা শুরু হয়ে যায়। একপর্যায় হজরত ইসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন।
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার, মহিলারা যখনসন্তান জন্ম দেন, তখন তাদের শরীরে তিনটি জিনিসের অভাব দেখা দেয়। একটা হলো ভিটামিনের অভাব, ক্যালসিয়ামের অভাব আর রক্তশূন্যতা। সন্তান জন্মলাভের পর মরিয়ম-এর শরীরে এই তিনটি অভাব দেখা দিল। এখন এই অভাব কীভাবে দূর হবে? একে তো তিনি মহিলা, তার উপর লোকালয় থেকে দূরে অবস্থান করছেন। এগুলো কাটিয়ে ওঠার মতো উপকরণ তিনি কোথায় পাবেন? কিন্তু আল্লাহ তো আছেন। প্রেসক্রিপশনের সাথে সাথে মেডিসিনেরও ব্যবস্থা করে দিলেন। আল্লাহ বললেন,
وَ هُزِئَ إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسْقِطَ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا
(হে মরিয়ম) তুমি এই মরা খেজুর গাছের ডালে ধরে নাড়া দাও। তাহলে আল্লাহর হুকুমে তাজা খেজুর তোমার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। [সুরা মারইয়াম : ২৫]
সুবহানাল্লাহ। এ কারণে খেজুরের ফজিলত অনেক বেশি। এই খেজুরের মধ্যে ভিটামিনের অভাব, ক্যালসিয়ামের অভাব, রক্তশূন্যতা দূর করার সব উপকরণ রয়েছে। এ জন্য নবিজি সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় খেজুর দিয়ে ইফতার করতে বলেছেন। খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নাত।
মরা গাছ, তাজা ফল
এখানে মরা খেজুর গাছ থেকে তাজা ফল দেওয়ার একটা সূক্ষ্ম রহস্য আছে সেটা হলো, মরিয়ম আলাইহাস সালাম তখন চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না, সমাজে কী করে মুখ দেখাবেন। মরিয়মের এসব ভাবনা তো আল্লাহ জানেনই, সুতরাং তাঁর চিন্তা দূর করে তাঁকে সান্ত্বনা দিতেই এই মরা খেজুর গাছ থেকে তাজা খেজুর তাঁর মুখ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে এটাই বুঝাতে চাইলেন, যে আল্লাহ মরা খেজুর গাছ থেকে তাজা ফল দিতে পারেন, তোমার প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিতে পারেন, সেই আল্লাহ তোমার পেরেশানি দূর করারও ব্যবস্থা করে দেবেন। চিন্তার কোনো কারণ নাই। সুবহানাল্লাহ।
এরপর আল্লাহ তাআলা মরিয়মকে উদ্দেশ করে বলেন,
فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرِّي عَيْنًا
হে মরিয়ম, তুমি খেজুর খাও এবং পানি পান করো আর তোমার সন্তানকে দেখে তোমার চক্ষু শীতল করো। [সুরা মারইয়াম: ২৬] আল্লাহ খেজুর দেওয়ার পাশাপাশি মরিয়মের পাশে একটি পানির নহরও জারি করে দিলেন। এ কারণে ইফতারের সময় সম্ভব হলে খেজুর ও জমজমের পানি দিয়ে ইফতার করা উচিত। আল্লাহু আকবার।
মায়েদের যখন প্রসবব্যথা শুরু হয়, তখন কী কষ্টই-না হয় তাদের। কিন্তু যখন সন্তান জন্ম নেয় এবং মা তার সন্তানকে বুকে তুলে নিয়ে দুধ পান করান, তখন সব কষ্ট নিমিষেই দূর হয়ে যায়। এ জন্য মা মা-ই। মায়ের মর্যাদা আলাদা।
মা শব্দটি ছোট্ট অতি কিন্তু শোনো ভাই তার চেয়ে মধুর শব্দ ত্রিভূবনে নাই।
মরিয়ম আলাইহাস সালাম এবার ভাবতে থাকেন, প্রসবব্যথা দূর হলো, সন্তানেরও জন্ম হলো, শরীরের ভিটামিনের ঘাটতিও পূরণ হলো; কিন্তু এখন এই সন্তান নিয়ে আমি কীভাবে কী করব? মানুষ নানা প্রশ্ন করবে, আমি কী জবাব দেবো? আল্লাহ তখন তার এই ভাবনারও সমাধান করে দিলেন। আল্লাহ বললেন,
فَإِمَّا تَرَينَ مِنَ الْبَشَرِ أَحَدًا فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمٰنِ صَوْمًا
কোনো মানুষ যদি তোমাকে তোমার সন্তানের ব্যাপারে প্রশ্ন করে, তখন তুমি বলবে, 'আমি রোজাদার।' [সুরা মারইয়াম : ২৬]
পানাহারের পরও রোজা
এখানে আল্লাহ প্রথমে বলেছেন, 'খাও, পান করো'। এরপর বলেছেন, 'বলো, আমি রোজাদার।' এ রোজার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রোজার রুহ; বডি নয়। কারণ, রোজার জন্য খানাপিনা ছাড়তে হয় আর মরিয়মকে আল্লাহ খানাপিনা করতে বলার পর বলেছেন, বলো আমি রোজাদার। মরিয়মের রোজা ছিল সাওমুল লিসান, মানে ইমসাক আনিল কালাম বা কথাবার্তা ছাড়ার নিয়ত করা।
এ জন্য হাদিস শরিফে রাসুল বলেন,
من لم يدع قول الزور والعمل به، فليس لله حاجة بأن يدع طعامه وشرابه
যে ব্যক্তি রোজার বডি তৈরি করল কিন্তু মিথ্যা বলা ত্যাগ করল না, মিথ্যা আমল ছাড়ল না, সে খাবার, পনি ছাড়ল, কিন্তু তার এই রোজা কোনো কাজে আসবে না। সারা দিন সে শুধু উপবাসই করল। এ জন্য রোজার রুহ তৈরি করার জন্য বেশি করে নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা, নিজে পড়তে না পারলে অন্যের পড়া শুনা, জিকির করা দরকার। এসব কাজেই সময় ব্যয় করা উচিত। অযথা সময় ব্যয় করলে রোজার রুহ তৈরি হবে না। আর যারা রোজার রুহ তৈরি করতে পারবে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
الصَّوْمُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ রোজা আমার জন্য, আর আমি আল্লাহ তার এই রোজার প্রতিদান দেবো। অন্য হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُحْسِنُ إِلى جَارِهِ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ واليوم الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، ومَنْ كانَ يُؤْمِنُ بالله واليوم الآخرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتُ অর্থাৎ, যারা বাস্তবিক অর্থেই আল্লাহর উপর ঈমান আনে, আল্লাহর রাসুলের উপর ঈমান আনে, তারা যেন মুখ দিয়ে ভালো কথা উচ্চারণ করে। আর সবচেয়ে ভালো বা শ্রেষ্ঠ কথা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এ জন্য হাদিস শরিফে রাসুল বলেছেন, রোজা রেখেছ, বডি তৈরি করেছ, এখন এই রোজার মধ্যে রুহ তৈরির জন্য তোমরা বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ো।
রোজা যেমন কাউকে দেখানো যায় না, ঠিক তেমনি আপনি রোজাদার না রোজাদার নন, সেটা কেউ বুঝতে পারে না, এটা হলো ইখলাস। তেমনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এমন আমল, যা পড়লেও কেউ বুঝতে পারে না। কেননা, আপনি যখন মনে মনে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়বেন, জিকির করবেন, তখন আপনার ঠোঁটও নড়বে না। আপনারা পরীক্ষা করে দেখুন, ঠোঁট নড়ে কি না? তাই আপনি কী পড়ছেন, সেটা কেউ জানতে বা বুঝতে পারে না, তাই এটার মধ্যে ইখলাস রয়েছে।
সায়্যিদুল ইসতিগফার
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির দ্রুত পড়া যায়। কিন্তু অন্যান্য তাসবিহ বা জিকির পাঠের সময় এভাবে পারবেন না; বরং ঠোঁট নড়বে। এ জন্য রাসুল বলেছেন, তোমরা বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ো। এ জন্য আমরা বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির করব। অন্যান্য তাসবিহগুলোও নিয়মিত পড়ব। সায়্যিদুল ইসতিগফার পাঠ করব। মুখস্থ না থাকলে মুখস্থ করে নেব। সায়্যিদুল ইসতিগফার হলো,
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنا عَبْدُكَ ، وَأَنا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ ما اسْتَطَعْتُ أَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلا أَنْتَ
এ ছাড়া আরও দুটি জিনিস আল্লাহর কাছে বেশি করে চাইতে হবে। একটা হলো, জান্নাত চাওয়া, অপরটি হলো জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া। এগুলো হলো ভালোকাজ। তবে এ ছাড়া আরও অনেক ভালোকাজ রয়েছে, সেগুলোও করতে হবে।
রোজা এবং বকবক করা
রমজান মাসে দিনে খাওয়া, পান করা ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে যে আমরা বিরত থাকি, এটা হলো রোজার বডি। এখন এই রোজার মধ্যে রুহ তৈরি করতে হলে আপনাকে মুখ কন্ট্রোল করতে হবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার মুখকে চাইলে ভালোকাজে ব্যবহার করুন, নাহয় বন্ধ রাখুন। মন্দকাজে ব্যবহার করবেন না। যেভাবে হজরত মরিয়মকে আল্লাহ তাআলা মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিলেন।
তিনি যখন একটি প্রশ্নের জবাব দেবেন, তখন আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হবে। এভাবে প্রশ্ন করা হতে থাকবে আর তিনি উত্তর দিতে থাকবেন। ফলে বিষয়টি জটিল হয়ে যাবে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'তোমাকে যখন তোমার সন্তানের ব্যাপারে প্রশ্ন করবে, তখন তুমি বলবে, 'আমি রোজাদার।' আর তখনকার রোজার পদ্ধতি ছিল উম্মতে মুহাম্মাদির রোজা থেকে ভিন্ন। এ জন্য আমরাও রোজা রেখে অযথা কথাবার্তা পরিহার করব। এ জন্য সহিহ বুখারির এক হাদিসে রয়েছে, রাসুল ﷺ বলেছেন, 'শুধু খাওয়া, পান করা ও জৈবিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকার নাম রোজা নয়; বরং অযথা কথাবার্তা বলা থেকেও বিরত থাকতে হবে।' আর এটাই হলো রোজার রুহ।
রোজা রেখে ভালো কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। অযথা কথাবার্তা ত্যাগ করতে হবে। সম্ভব হলে ভালো কথা বলো, আর যদি ভালো কথা বলার মতো পরিবেশ না থাকে, অন্তত মন্দ কথা বলো না। বরং তোমার মুখ বন্ধ রাখো। তখন অযথা কথা বলার পরিবর্তে তোমার এই মুখ বন্ধ রাখার কারণে আল্লাহ তোমাকে সেই সাওয়াব দেবেন, ভালো কথা বললে যে সাওয়াব পেতে। এ জন্য হাদিসে আছে, মসজিদে এসে যদি কেউ কোনো আমল করে, তিলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবিহ ইত্যাদি আমল করে, তাহলে তো ভালো। আর যদি কোনো আমল না করে শুধু নীরবে বসে থাকে, অযথা গল্পগুজবে লিপ্ত না হয়, চুপ থাকে এবং মনে মনে বলে, আমি আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান করছি, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, তো এমন ব্যক্তির সম্পর্কে হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তির আমলনামায় ৭০ রাকাত নফল নামাজের সাওয়াব লিখে দেন। সুবহানাল্লাহ।
কয়েকটি জিনিস পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের রোজার বডি তৈরি করলাম। এখন সমস্ত গুনাহ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রোজার রুহ তৈরি করতে হবে। আমাদের মুখ, কান, চোখ ও কলবের রোজা আছে। এসব রোজাও রাখতে হবে। যেমন, মুখের রোজা হলো ভালো কথা বলা, ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া, মন্দ কথা পরিহার করা। কানের রোজা হলো অশ্লীল কথাবার্তা না শোনা, শুনতে প্রতিহত করা অথবা ঘৃণা প্রকাশ করা। চোখের রোজা হলো ভালো জিনিস দেখা, মন্দ বা অশ্লীল জিনিস দেখা থেকে নিজের চোখকে হেফাজত করা, আর কলবের রোজা হলো, তাতে একমাত্র আল্লাহকে স্থান দেওয়া, অন্য কাউকে স্থান না দেওয়া।
এই সবকিছুর মাধ্যমে যার রোজার রুহ তৈরি হয়ে যায়, তার সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল বলেন, 'এমন রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকে আম্বরের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়।' সুবহানাল্লাহ।
আর এই যে রমজান মাস, এ মাসে আমরা বেশি করে দান-সদকা করব। কেননা, রমজানে দান করলে প্রতিদানও বেশি পাওয়া যায়। হাদিসে রাসুল বলেন, السخى حبيب الله অর্থাৎ, যারা দান-সদকা করে, তারা আল্লাহর বন্ধু। এ জন্য নবিজি রমজানুল মুবারকে বেশি বেশি সদকা করতেন। মুসনাদু আহমাদের এক হাদিসে রয়েছে, 'নবিজির কাছে যা চাওয়া হতো, নবিজি তা দিতেন।' সুতরাং নবিজি রমজানুল মুবারকে এই আমল করতেন, তাই আমরাও রমজানে বেশি করে সদকা করব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।