📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 মাসহাফে উসমানি

📄 মাসহাফে উসমানি


মুহতারাম হাজিরিন!

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি কুরআন নাজিলের মাস রমজানে আমাদেরকে এই কুরআনের সাথেই সম্পৃক্ত থাকার জন্য কবুল করেছেন। আল্লাহ যেন কুরআনের এই মজলিসে বসাকে কবুল করে এটাকে নাজাতের উসিলা বানিয়ে দেন। আমিন।

গতকাল আমরা আলোচনা করেছি, এই কুরআন আমাদের পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছল এবং তৎকালে এই কুরআন কীভাবে সংরক্ষণ ও সংকলন করা হয়, এ সম্পর্কে। গত আলোচনার সারসংক্ষেপ আজ আবার একটু স্মরণ করিয়ে দিই। তা নাহলে আজকের আলোচনা বুঝতে কষ্ট হবে।

জামিউল কুরআন হজরত উসমান রা. প্রবর্তিত মাসহাফে কোনো ইরাব ছিল না। ইরাব হলো প্রত্যেক শব্দের শেষ অক্ষরে কোন হরকত বসবে, এটা সনাক্ত করা। যেমন: - এখানে কিতাব শব্দের 'বা' অক্ষরে জবর, জের না পেশ হবে, মাসহাফে উসমানিতে সেটা উল্লেখ ছিল না। ذلِكَ الْكِتٰبُ

হজরত উসমান রা.-এর যুগ পর্যন্ত সাহাবিরা ইরাব ছাড়াই কুরআন পাঠ করতেন। তাঁদের প্রায় সকলেই আরবিভাষী ছিলেন বরে ইরাব ছাড়া পড়তে তাঁদের কোনো অসুবিধা হতো না। আর এই ইরাব কে বসিয়েছেন, সেটা আপনাদের স্মরণ আছে? গতকালের আলোচনায় বলেছি।

কুরআনে ইরাব লাগিয়েছেন হজরত আলি রা.-এর ছাত্র আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি রাহ.। আমিরে মুআবিয়া রা.-এর নির্দেশে কুফার গভর্নর জিয়াদ ইবনু আবিহির পরামর্শে তিনি ৩০ জনের একটি কমিটির মাধ্যমে এই কাজ আঞ্জাম দেন। আবুল আসওয়াদ দুয়ালি কাজটি করেন এভাবে যে, তিনি তাঁর সঙ্গীদের বলেন, 'আমি যখন কোনো অংশ পড়ব, তখন যদি আমার ঠোঁট ফুলে ওঠে, তখন তোমরা তাতে ফাতহা বা জবর দেবে।'

তবে সে যুগে ফাতাহ বা জবরের চিহ্ন এখনকার মতো ছিল না। শুধু একটা ফোটা বা বিন্দু দিয়েই জাম্মাহ, ফাতহা, কাসরা ইত্যাদি বোঝানো হতো। উপরে বিন্দু দিলে সেটা ফাতহা, নিচে দিলে কাসরা আর অক্ষরের সোজা উপরে বিন্দু দিলে সেটা জাম্মাহ।

এরপর বললেন, 'আমি পড়ার সময় যখন ঠোঁট নিচু করব, তখন তোমরা তাতে কাসরা বা জের দেবে।' তখন অক্ষরের একটা বিন্দু বা ডটচিহ্ন দিলেই সেটা কাসরা বা জের হিশেবে ধরে নেওয়া হতো।

এরপর বললেন, 'পড়ার সময় যখন আমি আমার উভয় ঠোঁট মিলাবো, তখন তোমরা তাতে জাম্মাহ বা পেশ দেবে।' তখন অক্ষরের সোজা উপরে একটা বিন্দু বা ডটচিহ্নই ছিল জাম্মাহর আলামত। প্রথমে বিন্দুচিহ্নের মাধ্যমে কুরআনে ইরাব লাগানোর সূচনা হয়। তখনো কুরআনে নুকতা লাগেনি অর্থাৎ, আলিফ থেকে ইয়া পর্যন্ত প্রতিটি হরফই ছিল নুকতাবিহীন।

নুকতার ইতিহাস

আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ আঞ্জাম দেওয়া হয়। অনারবি লোকেরা নুকতা না থাকার কারণে কুরআন পড়তে সমস্যায় পড়তেন। 'বা'-কে 'তা' এবং 'তা'-কে 'বা' পড়তেন। 'হা' এর জায়গায় 'খা', 'জিম' উচ্চারণ করতেন। ফলে এই জটিলতা নিরসনে এগিয়ে আসেন মারওয়ান। তিনি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফকে দায়িত্ব দেন, তিনি যেন কুরআনে নুকতা লাগানোর ব্যবস্থা করেন।

হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ প্রথমে কুফার গভর্নর ছিলেন, পরে ইরাকের গভর্নর হন। মারওয়ানের নির্দেশ পেয়ে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ নুকতা লাগানোর কাজটি সম্পাদনের দায়িত্ব দেন আরও দুজন আলিমের কাঁধে। তাঁরা হলেন নাসর ইবনু আসিম আল-লাইসি ও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামুর রাহ.। তাঁরা দুজন আবার হজরত আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি রাহ.-এর ছাত্র ছিলেন। এভাবে শিক্ষক আবুল আসওয়াদ কুরআনে ইরাব লাগানোর কাজ আঞ্জাম দেন; আর তার ছাত্র নাসর ইবনু আসিম ও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামুর নুকতা লাগানোর কাজ আঞ্জাম দেন।

ঠিক তেমনি ইলমও এভাবে ধারা পরম্পরায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। যেমন, আমি কুরআন-হাদিসের কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করেছি আমার উস্তাদের কাছ থেকে, তিনি তাঁর উস্তাদের কাছ থেকে। এভাবে তালিম-তাআল্লুমের ধারাপরিক্রমা নবিজি পর্যন্ত পৌঁছেছে।

নবিজি বলেন,
انما العلم بالتعلم
সত্যিকার ইলম হলো উস্তাদ-ছাত্রের নিসবতের মাধ্যমে অর্জিত ইলম।

এখানে একটা জিনিস আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, কুরআন বোঝার অধিকার সবার রয়েছে। কেননা, এটা হলো দ্বীন। যেমন দ্বীন সম্পর্কে জানা ও বোঝার অধিকার সবার রয়েছে; কিন্তু বোঝানোর দায়িত্ব সবার নয়। আর বাকশক্তি দিয়ে চাইলেও মনগড়া কিছু বলা ঠিক নয়। কেননা, কুরআন অন্যকে বোঝাতে হলে প্রথমে আপনাকে ১৫টি ইলমের জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং এসব জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। শুধু কয়েকটি আয়াত মুখস্থ করে অথবা কিছু আয়াতের তরজমা ও ব্যখ্যা মুখস্থ করে তাফসির শুরু করে দিলে কেউ আল্লামা, মুফাসসির হয়ে যায় না। কুরআন বোঝার দায়িত্ব সবার হলেও বোঝানোর দায়িত্ব সবার নয়। তাই কেউ যদি এমন করে, তাহলে সে নিজেই তো বিভ্রান্তিতে পড়বে, সাথে আরও অনেককে বিভ্রান্তিতে ফেলবে। তাই ইলমহীন এসব নামধারী আলিম, আল্লামা, মুফাসসির ও মুফতি তথা ইসলামি স্কলারদের থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সার্টিফিকেট অর্জন করা যায়। পরে এই সার্টিফিকেট দিয়ে নিজ পরিচয় এবং কর্মগুণে সে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিয়ার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ইত্যাদি হয়। যারা এসব বিষয়ে পারদর্শী হয়, তারা যেসব বইপত্র পড়ে, সেগুলো তো মার্কেট বা লাইব্রেরিতে কিনতে পাওয়া যায়। লাইব্রেরি থেকে বই কিনে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং শিক্ষকের মাধ্যমেই তারা এসব জ্ঞান অর্জন করে। এরপর নিজ মেধা ও যোগ্যতাবলে তারা সার্টিফিকেট লাভ করে। এখন কেউ যদি লাইব্রেরি থেকে এসব বই কিনে নিজে নিজেই পড়ে সবকিছু আত্মস্থ করে ফেলে এবং নিজেকে মহাজ্ঞানী বা মহাপণ্ডিত ভাবতে থাকে, তাতে কি সে সার্টিফিকেট বা সনদ লাভ করতে পারবে? অথবা, তার যোগ্যতা কোনো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মেনে নেবে? না, অবশ্যই না।

এভাবে নিজে নিজে পড়ে সে যদি এমন যোগ্যতাও অর্জন করে ফেলে, যারা বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকদের অধীনে যে জ্ঞান লাভ করবে, সে যদি এরচেয়েও বেশি নিজে নিজেই অর্জন করে নেয়, তবু তাকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেনে নেবে না। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা এবং সনদ তার নেই। তো দুনিয়ার ক্ষেত্রে এই যদি হয় রীতি, তাহলে দ্বীনের ব্যাপারে এমন ব্যক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে? নিজে নিজে কয়েকটি বিষয়ে পড়াশোনা করে কেউ যদি নিজেকে মহা পণ্ডিত বা জ্ঞানী ভাবতে থাকে, এমন ব্যক্তি দ্বীনের প্রকৃত দায়ি হতে পারে না। কুরআন-হাদিস সম্পর্কে মানুষকে বোঝানোর দায়িত্ব তার নয়। এমন ব্যক্তি দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর।

তাই কুরআন-হাদিস বা দ্বীনের জ্ঞান সম্পর্কে মানুষকে বোঝাতে হলে আপনাকে বেশ কয়েকটি বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে। কুরআন বোঝানোর ক্ষেত্রে ১৫টি বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং সার্টিফিকেটও থাকতে হবে। এখন কারও যদি প্রাতিষ্ঠানিক সনদ থাকে, যাতে প্রমাণ হয় সে সত্যিই এই বিষয়ে অভিজ্ঞ, তাহলে সে কুরআন বোঝানোর দায়িত্ব নিতে পারে। তার কাছ থেকে আপনারাও কুরআনের জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। মনে রাখতে হবে কুরআন বোঝা সবার জন্য জরুরি; কিন্তু বোঝানো সবার দায়িত্ব নয়। এ জন্য কুরআন বোঝাতে হলে ১৫টি ইলম বা জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। এগুলো হলো:

১. ইলমে কেরাত ২. ইলমে সরফ ৩. ইলমে নাহু ৪. ইলমে মা'আনি ৫. ইলমে বাদি ৬. ইলমে লুগাত ৭. ইলমে বায়ান ৮. ইলমে আরুজ ৯. ইলমে রুসমে খত ১০. ইলমে আদব ১১. ইলমে মানতিক ১২. ইলমে কারজুশ শা'র ১৩. ইলমে ইশতিকাক ১৪. ইলমে উসুলে ফিকহ ১৫. উসুলে তাফসির।

এখন কারও মধ্যে এসব ইলম বা জ্ঞানের সমাহার যদি না থাকে, তা সে তো পথভ্রষ্ট হবেই, সাথে আরও অনেককে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে। এদের থেকে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

সঠিক তাফসিরের ঠিকানা

তাফসির প্রধানত দুই প্রকার—তাফসির বিল মা’সুর বা দালিলিক পরম্পরায় বর্ণিত তাফসির। তাফসির বির-রায় হলো যুক্তি বা নিজস্ব রায়ের আলোকে তাফসির। তাফসির বিল মা’সুর চার প্রকার :

ক. তাফসির বিল কুরআন বিল কুরআন বা কুরআনের এক আয়াত দ্বারা অন্য আয়াতের তাফসির।
খ. তাফসিরুল কুরআন বিস সুন্নাহ বা হাদিস দ্বারা কুরআনের তাফসির।
গ. তাফসিরুল কুরআন বি-আকওয়ালিস সাহাবা বা সাহাবিদের অভিমত দ্বারা কুরআনের তাফসির।
ঘ. তাফসিরুল কুরআন বি-আকওয়ালিত তাবেয়িন বা তাবেয়িদের অভিমত দ্বারা কুরআনের তাফসির।

এই চার প্রকারের আলোকে তাফসির করেছেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুফাসসিরিনে কেরাম। এমন কিছু তাফসিরগ্রন্থের নাম হচ্ছে তাফসির ইবনু জারির তাবারি, তাফসির ইবনু কাসির, তাফসির আদ-দুররুল মানসুর ইত্যাদি।

তাফসির বির-রায় আবার দুই প্রকার : তাফসির বির-রায় মাহমুদ বা প্রসংশনীয় তাফসির। তাফসির বির রায় মাজমুম বা নিন্দনীয় এবং গর্হিত তাফসির।

তাফসির বির রায় মাহমুদের কয়েকটি শর্ত হচ্ছে:
১. তাফসিরের মূলনীতির আলোকে হতে হবে।
২. সঠিক দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে।
৩. ইজমায়ে উম্মতের খেলাফ কিছু বলা যাবে না।
৪. সাহাবায়ে কেরামের মানহাজের খেলাফ হতে পারবে না。
৫. কাওয়াইদে আরবির অনুস্মরণে হতে হবে।

এই পাঁচ শর্তের আলোকে লিখিত অনেক তাফসিরও উম্মতের আলিমগণ গ্রহণ করেছেন। এমন কিছু তাফসিরগ্রন্থ হলো-তাফসিরে কাবির, তাফসিরে রুহুল মাআনি ইত্যাদি।

এই পাঁচ শর্তের বিপরীত শুধু নিজের মনগড়া অহেতুক যুক্তির দোহাই দিয়ে তাফসির করলে সেটাই হলো তাফসির বির-রায় মাজমুম বা গর্হিত তাফসির। যেমন স্যার সৈয়দ আহমদের তাফসির, গোলাম আহমদ পারভেজের তাফসির, কাদিয়ানিদের তাফসির ইত্যাদি।

আমরা আলোচনা করছিলাম, কুরআনে নুকতা লাগানোর বিষয় নিয়ে। খলিফা ওয়ালিদ ইবনু মারওয়ানের নির্দেশে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তৎকালের বড় দুই আলিম নাসর ইবনু আসিম আল-লাইসি ও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামুর রাহ.-এর মাধ্যমে কুরআনে নুকতা লাগানোর ব্যবস্থা করেন। হাজ্জাজ সরাসরি লাগাননি, তবে এই কাজের জন্য তার নামই প্রসিদ্ধ হয়ে যায়।

হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ

হাজ্জাজ ছিলেন একজন জালিম বা অত্যাচারী শাসক। তিনি ১ লাখ ২০ হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছেন। তাঁর মাথায় সবসময় খুনের নেশা কাজ করত। তবে কুরআনের মহান এক খিদমাতের কারণে আল্লাহ হয়তো তাঁকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।

হাজ্জাজ যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন সে তাঁর মায়ের দুধ পান করছিল না। সাধারণত, জন্মের পরই শিশুরা মায়ের দুধ পান করে। তবে ব্যতিক্রমও যে হয় না, এমন নয়। সন্তান জন্মের পর শিশুর কানে যদি আজান দেওয়া হয় না, তাহলে এই শিশুর উপর শয়তান বদ আসর করে। ফলে একধরনের রোগ সৃষ্টি হয়। এ জন্য ইসলামের বিধান হলো, সন্তান ভূমিষ্টের পর তার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দিতে হয়। ফলে শয়তান দূরে থাকে, সন্তান অনুগত হয়।

সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, জন্মের পর ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দিতে হয়। এর মাধ্যমে একটি শিশুকে প্রথমেই এই ম্যাসেজটি দেওয়া হয় যে, তোমার নামাজের আজান ও ইকামত দিয়ে দেওয়া হলো। নামাজটাই শুধু বাকি। নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করো। সময় বেশি নাই। এ জন্যই জানাজার নামাজের জন্য আজান ইকামত লাগে না। কারণ, আজান ইকামত জন্মের পরেই দিয়ে রাখা হয়েছে।

হাজ্জাজ জন্মের পর যখন দুধপান করছিল না, তখন তাঁর মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। শয়তান তখন সুযোগ পেয়ে গেল। শয়তান তার মায়ের কাছে এসে বলল, যদি তুমি একটি কালো বকরি জবাই করে এর রক্ত দিয়ে তোমার সন্তানকে গোসল করাতে পারো, তাহলে সে দুধপান করবে। এটা যে শয়তানের কাজ, এর প্রমাণ হলো রক্ত হারাম; আর হারাম বা অপবিত্র বস্তু দিয়ে চিকিৎসার কথা শুধু তারাই বলতে পারে, যারা ভন্ড। এ জন্য ভন্ডদের থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। এরা শয়তানের প্ররোচনায় কাজ করে। সবসময় কুরআন তিলাওয়াত করুন। কুরআনই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান।

আমরা যে সুরার তাফসির করছি, এটা হচ্ছে সুরা বাকারা। নবিজির হাদিসে এর অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এখানে আমি মাত্র একটি ফজিলত উল্লেখ করছি—যে ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, সে ঘরে জাদুর প্রভাব থাকে না। শয়তান আসর করতে পারে না। কারও ঘরে যদি জাদুর প্রাদুর্ভাব থাকে, তাহলে এখন থেকেই ঘরে জোরে জোরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করুন, ইনশাআল্লাহ জাদুর প্রভাব নষ্ট হয়ে যাবে।

এটা হচ্ছে এই সুরার সামগ্রিক একটা ফজিলত। এই সুরার প্রতিটি আয়াতের আলাদ আলাদা ফজিলত রয়েছে। যেমন, কেউ যদি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করে বুকে ফুঁক দেয়, তাহলে নবিজি বলেন, এমন ব্যক্তি মরতে দেরি হবে কিন্তু জান্নাতে প্রবেশ করতে দেরি হবে না। সুবহানাল্লাহ।

তাহনিক করানো

আলোচনা করছিলাম জন্মের পর হাজ্জাজের দুধপান না করার বিষয়ে। তখন শয়তান তার মাকে এসে কুমন্ত্রণা দেয় যে, 'তুমি তোমার শিশুকে কালো বকরির রক্ত দিয়ে গোসল করাও, মুখে লাগাও। দেখবে, সন্তান দুধপান করবে।' হাজ্জাজের মা তা-ই করলেন। অথচ রাসুল -এর তরিকা ছিল, যখন কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করত, প্রথমে তাকে তাহনিক করাতেন। খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কিছু চিবিয়ে শিশুর মুখে দিতেন। ফলে নবিজির মুখের বরকতময় লালা সেই সন্তানের মুখে লাগত।

এভাবে আপনারাও আপনার শিশুসন্তানকে জন্মের পরই কোনো আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের মুখের লালাযুক্ত কোনো মিষ্টান্নজাতীয় খাবার খাওয়াবেন। এর মাধ্যমে যে ফায়দা হয়, সেটা হলো সন্তান কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। অবাধ্য হবে না। তাহনিক করানো নবিজির সুন্নাত। নবিজি তাঁর আদুরে নাতি হাসান ও হুসাইন রা.-কে এভাবেই তাহনিক করিয়েছেন। এমনকি যত শিশুকে জন্মের পর নবিজির কাছে নিয়ে আসা হতো, তিনি তাদের তাহনিক করাতেন।

উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা সুন্নাত সম্পর্কে জানতে পারলাম। আজকাল আমাদের কাছে অনেকেই সন্তানের জন্য দুআ চাইতে আসেন। এসে বলেন, হুজুর! আমার সন্তানের জন্য একটু দুআ করুন। মোটেও কথা শুনে না। বাজে ছেলেমেয়েদের সাথে ঘুরাঘুরি করে...। সন্তান জন্মের পর নবিজির সুন্নতের উপর আমল করে কোনো বুজুর্গ বা আল্লাহওয়ালা আলিমের কাছে নিয়ে যাবেন না, তাহনিক করাবেন না। সেই সন্তান লাইনে থাকবে কেমন করে?

কথা বলছিলাম হাজ্জাজ প্রসঙ্গে। জন্মের পর হাজ্জাজের মা তার মুখে নাপাক রক্ত দিয়েছিলেন। ফলে তার মাথায় সবসময় রক্তের নেশা কিলবিল করত। তার মা যদি তার মুখে প্রথমে ভালো কিছু দিতেন, তবে তার থেকে ভালো কিছুর আশা করা যেত। এই রক্তের নেশা তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, সে মানুষহত্যা ছাড়া সকালের নাস্তা করত না।

মা হলেন সন্তানের প্রথম শিক্ষক

হাজ্জাজের নষ্ট হওয়ার পেছনে তার মায়ের ভূমিকাও কম ছিল না। বলা হয় একজন মা হলেন সন্তানের প্রথম শিক্ষক। একজন মায়ের তরবিয়তেই সন্তান বেড়ে উঠতে থাকে। সেই মা যদি জন্মের পরেই সন্তানকে নাফরমানিতে অভ্যস্ত করে তুলতে থাকেন, সন্তান তো নষ্ট হবেই। আজকাল আমাদের অনেক মা তাদের সন্তানকে খাওয়ানোর সময় সামনে টেলিভিশন ছেড়ে দিয়ে সেখানে কার্টুন ছবি লাগিয়ে দেন আর বলেন, কার্টুন না দেখালে বাচ্চা খেতে চায় না। আফসোস! সেই মা যদি সন্তানকে কুরআন তেলাওয়াত শোনানোয় অভ্যস্ত করতেন! ছোট্ট বাচ্চা কিন্তু কার্টুন দেখানোর কথা মাকে বলেনি, কারণ, সে কথাই বলতে পারে না। মা-ই নিজের ইচ্ছায় তাকে এদিকে মায়িল করেছেন। তিনি চাইলে কুরআন শোনানোও শুরু করতে পারতেন।

রক্তখেকো হাজ্জাজ

একবার হাজ্জাজ তার প্রিয় শিকার অর্থাৎ, হত্যাযোগ্য কোনো মানুষ খোঁজে পাচ্ছিল না। তখন সে মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পায় একব্যক্তি ঘুমিয়ে আছে। তার মাথায় তখন রক্তনেশা কাজ করছে। সে মসজিদের কোণে ঘুমিয়ে থাকা ওই ব্যক্তিকে হত্যা করত উদ্যত হয়। এ সময় ওই ঘুমন্ত ব্যক্তি জেগে ওঠে এবং হাজ্জাজকে উদ্দেশ্য করে বলে, اتق الله يا عبد الله 'হে আল্লাহর বান্দা, আল্লাহকে ভয় করো।' ওই ব্যক্তির মুখে اتق الله অর্থাৎ, 'আল্লাহকে ভয় করো' এ কথা শুনে হাজ্জাজ থেমে যায়। তবে তার মাথা গরম, রক্তপাত ছাড়া যে সে নাস্তাই করতে পারে না। কারণ, এটাই সে তার প্রাত্যহিক নিয়ম বানিয়ে ফেলেছিল।

কিছুক্ষণ পর মসজিদের অবস্থান করা ওই ব্যক্তিকে সে বলে, 'তুমি আল্লাহর ঘরে আছ, এটা ঠিক আছে তবে মসজিদ কি ঘুমানোর জায়গা? মসজিদ আল্লাহর ইবাদতের ঘর, ঘুমানোর জন্য নয়।' এ কথা বলে হাজ্জাজ ওই নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলে।

আলিমদের হয়রানি

এমনি অত্যাচারী, রক্তখেকো শাসক ছিল হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ। সে শুধু সাধারণ মানুষকে হত্যা করে নিবৃত থাকেনি; বরং অনেক সাহাবি, তাবেয়িকেও হত্যা করেছে। একবার একজন আলিমকে তার কাছে ডেকে এনে বলল, 'হুজুর, এদিকে আসেন! হুজুর কাছে আসার পর বলল, আচ্ছা! আপনি যে আলিম, এর প্রমাণ কি? আপনি যদি সত্যিকার আলিম হয়ে থাকেন, তাহলে বলেন, غرفة শব্দটি কতভাবে পড়া যায়?

ওই আলিম হঠাৎ এমন প্রশ্নে থমকে যান। আর আলিম হলেই যে সবার সব জানা হয়ে যাবে, এমনও তো নয়। তাই ওই আলিম তাৎক্ষণিক জবাব দিতে পারেননি। তখন হাজ্জাজ তাঁকে বলে, আগামী তিন দিনের মধ্যে যদি এর উত্তর দিতে না পারেন, তবে তোমার গর্দান কেটে ফেলব। উল্লেখ্য, হাজ্জাজ উঁচু মাপের একজন সাহিত্যিকও ছিল।

ওই আলিম তখন চিন্তায় পড়ে যান, উত্তর যে তাঁর জানা নেই। তিনি শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যান। কারণ, গ্রামে বিশুদ্ধ আরবি ভাষার চর্চা হতো। আর শহরে বিভিন্ন এলাকার মানুষের বসবাসের ফলে ভাষার মধ্যে অনেক পরিবর্তন চলে আসে। এ জন্যই তো আমাদের নবিজি ﷺ-এর জন্মের পর দুধ মা হজরত হালিমা সাদিয়া রা.-এর কাছে গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, নবিজি যাতে গ্রামের বিশুদ্ধ আরবি শিখতে পারেন। এটা তখনকার আরবের সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর এটা একটা রীতিও ছিল। ওই আলিম যখন গ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন পথিমধ্যে এক রাখালকে দেখতে পান। রাখাল তখন আনমনে গেয়ে চলছিল একটি গান বা কবিতা। এর একটা পঙ্ক্তি হচ্ছে,

ربما تكره النفوس من الأمر له غرفة كحل العقال

কবিতার মর্ম হলো, মানুষ অনেক সময় তার অপছন্দনীয় অবস্থায় উপনীত হয়, কিন্তু পরে একসময় আল্লাহ তার এই অপছন্দনীয় অবস্থা দূর করে এমন অবস্থানে নিয়ে যান, যেখানে আনন্দের কোনো সীমা নেই। كحل العقال মানে হলো কোনো উটকে যখন বেঁধে রাখা হয়, তখন সে বেশ কষ্টে থাকে। এরপর যখন তার বাঁধন খুলে দেওয়া হয়, তখন তার আনন্দের সীমা থাকে না। মানুষ যখন দুঃখ-কষ্ট থেকে পার পায়, তখন বাঁধনমুক্ত উটের আনন্দের চেয়েও বেশি আনন্দ পায়। এ জন্য দুনিয়ার মসিবত স্থায়ী নয়। দুঃখ-কষ্টের পর সুখ আসবেই।

কবিতা আবৃত্তি শোনে রাখালের কাছে ওই আলিম জানতে চান, কবিতায় তুমি যে غرفة শব্দ ব্যবহার করেছ, এটা কয়ভাবে পড়া যায়? রাখাল জবাব দেয়, 'তিনভাবে পড়া যায় : غرفة غرفة غرفة অর্থাৎ, 'গাইন' অক্ষরে জবর, জের, পেশ তিনটাই শুদ্ধ। আপনি এটা জানেন না?' আলিম জবাব দেন, জানি না বলেই তো তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি। আর সবাই যে সব বিষয়ের জ্ঞান রাখবে, এমন তো নয়।'

রিক্সা ড্রাইভার যেমন বিমান চালাতে পারবে না, এর জন্য পাইলট আছে। একজন শিক্ষক যে সব বিষয়ে পরদর্শী হবেন, এটা কখনো সম্ভব নয়। তাই একজন আলিম যে সবকিছুর জ্ঞান রাখবেন, এমন ধারণা করবেন না আপনারা। একজন উট রাখালের কাছে একজন আলিমকেও শিখতে হলো।

আবু হানিফা এবং একজন মুচি

ইমামে আজম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ ছোটখাটো অনেক বিষয় সাধারণ মানুষ থেকেও শেখার চেষ্টা করতেন। ইমাম সাহেব একবার মজলিসে বসে আছেন। হঠাৎ একজন মুচি এলে তাকে দেখেআেবু হানিফা তার সম্মানে দাঁড়িয়ে যান। লোকটি চলে যাওয়ার পর উপস্থিত উলামায়ে কেরাম বললেন, হজরত, একজন মুচিকে এভাবে দাঁড়িয়ে সম্মান করলেন, ব্যাপারটি বুঝলাম না। ইমাম সাহেব বললেন, লোকটিকে আমি আমার উস্তাদের কাতারে গণ্য করি।

ইমামের জবাব শুনে অবাক হলেন সবাই। একজন মুচি, সে কিনা জামানার শ্রেষ্ঠ ফকিহ ইমামে আজমের উস্তাদ! তারা বললেন, সে আপনার উস্তাদ হলো কী করে? আপনি তার কাছে কোন কিতাব পড়েছিলেন?

ইমাম সাহেব বললেন, কোনো কিতাব পড়িনি। আমি তার কাছ থেকে একটি তথ্য শিখেছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না, তার কাছ থেকে জেনেছি। জিজ্ঞেস করা হলো, কী তথ্য? তিনি বললেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কুকুর কোন সময় বালিগ হয়? অর্থাৎ একটি কুকুর বালিগ হয়েছে কিনা, এটা জানার কি কোনো উপায় আছে? সে আমাকে জানাল, আছে, যখন দেখবেন কুকুর দাঁড়িয়ে এক পা উঠিয়ে প্রশ্রাব করছে, তখন বুঝবেন সে বালিগ হয়ে গেছে। যে-সকল মুসলমান ভাই দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করেন, তারা মানুষ হয়ে কার কালচার ফলো করছেন, ভেবে দেখা দরকার।

আলিম তখন রাখালকে প্রশ্ন করেন, 'এই মুহূর্তে তুমি এই কবিতা আবৃত্তি করলে কেন?' রাখাল জবাব দেয়, 'এর কারণও আপনি জানেন না? আপনি তো দেখি দুনিয়ার কোনো খবরই রাখেন না! আমি এই কবিতা আবৃত্তি করেছি, এর কারণ হলো, এইমাত্র আমার কাছে সংবাদ এসেছে, হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ মারা গেছে! তাই আনন্দিত হয়ে আমি এটা আবৃত্তি করেছি।' তখন ওই আলিম বলেন, 'হাজ্জাজের মৃত্যুর খবরে আমি বেশি আনন্দিত হবো, না غرفة শব্দটি পড়ার নিয়ম জেনেছি বলে বেশি আনন্দিত হবো, বুঝতে পারছিলাম না।

কুরআনে হরকত

কুরআনে কারিমে হরকত সংযোজন-সংক্রান্ত কিছু আলোচনা আমরা আগেও একদিন করেছি। আজ আরেকটু যোগ করি।

কুরআনে ইরাব এবং নুকতা সংযোজন করা হলো, তবে কোনটা নুকতা আর কোনটা ইরাব, সেটা নির্ণয়ে সমস্যা থেকে যায়। কারণ, উভয়টাতে বিন্দুচিহ্ন (.) বা ডট দেওয়া হতো। পরে পরিচয় নির্ণয়ের জন্য ইরাবের ক্ষেত্রে বিন্দুচিহ্নে লাল কালি ব্যবহার করা হতো; আর নুকতার ক্ষেত্রে কালো কালি ব্যবহার করা হতো।

ইরাব ও নুকতা সংযোজনের পরও কাজ হয়নি। অনারবি বা আজমি যারা, তাদের জন্য কুরআন পড়তে অসুবিধা হতো। এবার প্রতিটি অক্ষরের উপর হরকত লাগানোর প্রয়োজন দেখা দিল। শেষপর্যন্ত হরকতও সংযুক্ত করা হলো এবং হরকত সংযোজনের এই কাজ আঞ্জাম দিলেন খলিল ইবনু আহমাদ আন-নাহবি। তিনি ওমানে জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞানার্জনের জন্য বসরা ও কুফায় সফর করেছেন। আর বসরা ও কুফা ছিল ইলমের মারকাজ বা রাজধানী। এটা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।

ইমাম বুখারি রাহ. অনারবি ছিলেন; কিন্তু হাদিসের খেদমতে তাঁর অবদান অনন্য। কালজয়ী বিশুদ্ধ ও মাকবুল হাদিসগ্রন্থ সহিহ বুখারি শরিফ তাঁরই রচনা। মূলত আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাঁর মাধ্যমে দ্বীনের খেদমত করান। এখানে আরবি-অনারবির কোনো শর্ত নেই। কুফা ও বসরা কেন ইলমের মারকাজ হলো, এ সম্পর্কে আমি একটি হাদিস পাঠ করেছি। হাদিসে নবিজি ﷺ তাঁর ইলমকে একটি ঘরের সঙ্গে উপমা দিয়ে বলেন,

أنا مدينة العلم و أبو بكر أساسها وعمر حيطانها وعثمان سقفها وعلي بابها

অর্থাৎ, আমি হলাম ইলমের শহর। আবু বকর হলেন মূল ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন। উমর হলেন দেয়াল। আর উসমান হলেন ছাদ। ইলমের শহর নামক ঘর তৈরি শেষ, এখন ঘরে প্রবেশ করতে দরকার দরজা। নবিজি ﷺ বলেন, আলি হলেন দরজা। অর্থাৎ, ইলম নামক ঘরের ভিত্তি হলেন আবু বকর, উমর হলেন দেয়াল, উসমান হলেন ছাদ আর আলি হলেন দরজা।

কুফা ছিল ইলমের নগরী

এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি কথা জেনে রাখি। অনেকেই আমাদের বলেন, তোমরা তাকলিদই যখন করবে, তাহলে মক্কার ইমামের করতে পারতে। ইমাম মালিক তো মদিনার ইমাম ছিলেন। তার তাকলিদ করতে পারতে। সেটা না করে কুফার ইমাম আবু হানিফার কাছে চলে গেলে কেন?

জবাব হলো, মদিনার ইলমের দরজা কুফায় ছিল। হজরত আলির দারুল খিলাফত ছিল কুফায়। আর নবিজির ভাষ্যমতে আলি ছিলেন ইলমের দরজা। এ জন্য আমরা ইলম অর্জনের জন্য কুফার ইমামের শরণাপন্ন হয়েছি। আর এটা সামাজিক ভদ্রতার মধ্যেও পড়ে। ভালো মানুষ কখনো ঘরের ছাদ ফেড়ে বা জানালা দিয়ে প্রবেশ করে না। দরজা দিয়েই ঘরে ঢুকে। আর আল্লাহ বলেছেন, ওয়া'তুল বুয়ুতা মিন আবওয়াবিহা—ঘরে যখন ঢুকবে, তখন দরজা দিয়েই ঢুকো।

সম্মানিত হাজিরিন।

এবার পূর্ববর্তী আলোচনা যদি আপনাদের স্মরণ থাকে, তাহলে আপনারা সহজেই বুঝতে পারবেন বিষয়টি। কুরআনে ইরাব লাগিয়েছেন যিনি, তিনি হলেন আলি রা.-এর ছাত্র আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি রাহ.। আর নুকতা লাগিয়েছেন তাঁরই ছাত্র নাসর ইবনু আসিম আল-লাইসি ও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামুর রাহ.। এই ধারাবাহিকতায় আমাদের কাছে কুরআন এসেছে। ইলম এসেছে।

হাদিসে বর্ণিত ইলমের দরজাখ্যাত হজরত আলি রা. যখন খলিফাতুল মুসলিমিন হন, তখন মুসলিম জাহানের রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন। নবিজি ﷺ ও প্রথম তিন খলিফার সময়ে রাজধানী ছিল মদিনা। এরপর আলি রা. মদিনার পরিবর্তে কুফাকে রাজধানী নির্ধারণ করেন। ফলে ইলমের রৌশনিও কুফায় চলে গেল। এখন কেউ মদিনার ইলমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই কুফায় যেতে হবে। কুফা ছাড়া মদিনার ইলমে প্রবেশ করা যাবে না। এ জন্য পরবর্তীকালে পৃথিবীখ্যাত বড় বড় আলিম ও মুহাদ্দিস কুফায় জন্মগ্রহণ করেন।

এ প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ.-এর ছাত্র ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহ. তাঁর ই'লামুল মু'কিয়িন নামক কিতাবে লেখেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের ছাত্র প্রসিদ্ধ তাবেয়ি হজরত মাসরুক রাহ. বলেন, 'আমি রাসুল ﷺ-এর শিখিয়ে দেওয়া ইলম অর্জন করেছি সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে। তবে আমি সকল সাহাবির সম্মিলিত ইলম পেয়েছি ছয়জন সাহাবির মধ্যে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা সকল সাহাবির ইলম এই ছয়জনের মধ্যে জমা করে দিয়েছেন। তাঁদের ইলমে গভীরতা ছিল। তাঁরা হলেন,

১. হজরত উমর রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
২. হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
৩. হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
৪. হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
৫. হজরত আবুদ দারদা রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
৬. হজরত উবাই ইবনু কাব রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।

ইমাম মাসরুক রাহ. বলেন, 'আল্লাহ তাআলা এই ছয়জনের ইলমকে আবার হজরত আলি ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের মধ্যে জমা করে দিয়েছিলেন।' সুবহানাল্লাহ।

এবার সকল সাহাবির সম্মিলিত ইলম যেহেতু মাত্র দুজনের মধ্যে এসে গেল এবং তাঁরা উভয়ে কুফায় এসে গেলেন, তখন তাঁদের থেকে শিক্ষা লাভ করে কুফায় হাজার হাজার আলিম ও মুহাদ্দিস তৈরি হন। এই যে হাজার হাজার আলিম ও মুহাদ্দিস তৈরি হলেন, তাঁদের সম্মিলিত ইলম অর্জন করেন ইমামে আজম আবু হানিফা রাহ.। তিনি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম হচ্ছে নুমান ইবনু সাবিত। তিনি আমাদের মাজহাব তথা মাজহাবে হানাফির ইমাম।

ইমামে আজম সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের অভিমত

মদিনা থেকে কুফায় যখন সব ইলম এসে গেল, হাজার হাজার মুহাদ্দিস তৈরি হয়ে গেলেন, তখন তাঁদের থেকে সামগ্রিক বিবেচনায় যাবতীয় ইলম লাভ করেন ইমাম আজম আবু হানিফা রাহ.। এটা আমার কথা নয়; বরং তৎকালের বড় আলিম ইয়াহইয়া ইবনু আদম রাহ.-এর কথা এবং সকলেই এটা মেনে নিয়েছেন। তিনি ইমাম আবু হানিফার ইলমের গভীরতার স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন, 'কুফায় যত আলিম ও মুহাদ্দিস এসেছিলেন, ইমাম আবু হানিফা নুমান ইবনু সাবিত রাহ. সকল আলিমের ইলম গ্রহণ করেছেন, সকল মুহাদ্দিসের হাদিস তিনি আয়ত্ব ও আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন।'

মুহাদ্দিসে কবির ইমাম নজর ইবনু মুহাম্মাদ মারওয়াজি রাহ. বলেন, 'আমি আবু হানিফা থেকে বেশি হাদিসপ্রেমি কাউকে দেখিনি।'

হাফিজুল হাদিস ইসরাইল ইবনু ইউনুস রাহ. বলেন, 'নুমান কতই-না ভালো লোক! ফিকহ-সংক্রান্ত প্রতিটি হাদিস তার মুখস্থ ছিল।'

এখন যারা বলে, 'আবু হানিফা হাদিস জানেন না', এদের অজ্ঞতা নিয়ে আমাদের বড় করুণা হয়। কারণ, যে জায়গায় ইলম ও হাদিসের মারকাজ, সেখানেই আবু হানিফার জন্ম।

আবু হানিফা ও হিফজে হাদিস

ইমাম সাহেব তার একমাত্র ছেলে হজরত হাম্মাদকে যে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন, সেখানে একটি অসিয়ত ছিল এমন, 'বাবা হাম্মাদ! তোমাকে জীবনঘনিষ্ট পাঁচটি হাদিস বিশেষভাবে আলাদা করে দিয়ে গেলাম। জীবনে চলার পথে হাদিসগুলো অবশ্যই মনে রেখে চলবে। হাদিসগুলোকে আমার কাছে থাকা ৫ লক্ষ হাদিস থেকে বাছাই করে তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি।' এরপরও যারা বলে, আবু হানিফা হানিফা হাদিস জানতেন না, তারা কত বড় মূর্খ, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এরাই মুসলিমদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করতে চায়, এরা হলো আস্তিনের কালসাপ। এদের থেকে আমরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখব, ইনশআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক দ্বীন বোঝা ও বিশুদ্ধভাবে আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।

পাঁচটি হাদিস

ইমাম সাহেব তাঁর ছেলে হাম্মাদকে যে পাঁচটি হাদিস বিশেষভাবে বাছাই করে দিয়ে গিয়েছিলেন, জীবনগড়ার সেই হাদিসগুলো হলো:

১. সচ্চরিত্র, উত্তম ব্যবহার এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে বেহুদা কাজ থেকে বাঁচানোর গাইডলাইন সম্বলিত হাদিস, مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক কাজকর্ম ত্যাগ করা।

২. ইবাদতকে সহিহ-শুদ্ধ করা এবং ইবাদতের সাওয়াবপ্রাপ্তির জন্য ইখলাসে নিয়তের অপরিহার্যতা-সংক্রান্ত হাদিস, إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ নিশ্চয়ই আমলসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।

৩. আল্লাহর হক আদায় করার পর, হালাল হারাম মেনে চলার পর সন্দেহযুক্ত খাদ্য, বস্তু বা বিষয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে তাকওয়া অর্জনের গাইডলাইন সংবলিত হাদিস, إِنَّ الخَلَالَ بَيِّن، والحَرَامَ بَيِّنٌ، وبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ، وعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ في الحرام، নিশ্চই হালাল-হারাম সুস্পষ্ট। তবে হালাল-হারামের মধ্যখানে কিছু আছে সন্দেহযুক্ত। অধিকাংশ মানুষই সেটা জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার থেকেও দূরে থাকল, সে তার দীন ও সংবেদনশীলতাকে রক্ষা করল। আর যে সন্দেহযুক্তে পতিত হলো, সে হারামে পতিত হলো।

৪. সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব তথা হুকুকুল ইবাদ-সংক্রান্ত হাদিস, لا يكون المؤمن مؤمنا حتى يرضى لأخيه ما يرضى لنفسه মুমিন ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, সেটা তার অন্য ভাইয়ের জন্য পছন্দ করবে।

৫. এক মুসলমানের সাথে অন্য মুসলমানের আচরণ কেমন হবে, সে সম্পর্কে নবিজির মহামূল্যবান হাদিস,
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
প্রকৃত মুসলিম হলো সে, যার জবান ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 উসমানি মাসহাফ এবং সাবআতু আহরুফ

📄 উসমানি মাসহাফ এবং সাবআতু আহরুফ


আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের এ মাসে কুরআনচর্চার মহৎ এ মজলিসে বসার তাওফিক দিয়েছেন।

গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছি কুরআনে ইরাব ও নুকতা লাগানো ও কুরআন হেফাজতের বিবরণ সম্পর্কে। কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন। কুরআনের লফজ বা শব্দ, অর্থ এবং কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য তথা এর মাধ্যমে কী আমল করতে হবে, সেটার দায়িত্বও আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন।

আল্লাহপাক আলফাজে কুরআনের হেফাজত করেছেন হাফিজ কারীদের দ্বারা, মা'আনিয়ে কুরআনের হেফাজত করেছেন মুহাদ্দিস মুফাসসিরদের মাধ্যমে, এবং আ'মালে কুরআনের হেফাজত করেছেন ফুকাহায়ে কেরাম দ্বারা।

নবিজি -এর যুগে কুরআন সংরক্ষণের পন্থা ছিল তিনটি।

১. মুখস্থ করার মাধ্যমে অর্থাৎ, সাথে সাথে মুখস্থ করে ফেলতেন।
২. লিখে রাখার মাধ্যমে। অর্থাৎ, কোনো আয়াত বা সুরা যখন নাজিল হতো, তখন নবিজি কাতিবে ওহি বা ওহি লেখক সাহাবিদের মাধ্যমে তা লিখিয়ে নিতেন।
৩. তারতিবের মাধ্যমে। তারতিব হচ্ছে, যেমন, পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম আয়াত হলো সুরা আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত; কিন্তু আমাদের কাছে যে মাসহাফ রয়েছে, তাতে এই আয়াতগুলো আসেনি। বরং সুরা বাকারার মাধ্যমে কুরআনের সূচনা হয়েছে। এর কারণ হলো, কুরআন নাজিল হয়েছে এক তারতিবে আর সাজানো বা বিন্যস্ত করা হয়েছে আরেক তারতিবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। আল্লাহর নির্দেশে নবিজি এভাবেই বিন্যস্ত করেছেন। এ জন্য নামাজে তারতিব রক্ষা করা জরুরি। কেউ যদি প্রথম রাকআতে সুরা ইখলাস পড়ে আর দ্বিতীয় রাকআতে সুরা লাহাব পড়ে, তাহলে তার নামাজ হয়ে যাবে ঠিক, কিন্তু তারতিবের খেলাফ হওয়ায় মাকরুহ হবে।

সাবআতু আহরুফ

আমরা আগেই আলোচনা করে এসেছি যে, হজরত আবু বকর রা.-এর খিলাফতকালে হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রা.-এর মাধ্যমে কুরআন একটি নুসখায় সংরক্ষণ করা হয়। এরপর উসমান রা.-এর খিলাফতকালে যখন কুরআনের বিভিন্ন পঠনরীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন তিনি এটাকে এক মাসহাফ রেখে বাকিগুলো ধ্বংস করে দেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি সেটা হলো, আমরা যে কেরাতে তিলাওয়াত করি, এটা কার অনুসরণে করি? এটা আমাদের জানতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,

أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ وَلِكُلِّ آيَةٍ مِنْهَا ظَهْرُ وَبَطْنُ

কুরআন সাতটি হরফে (সাত পদ্ধতির কেরাতে) নাযিল হয়েছে। এর প্রত্যেক আয়াতের একটি স্পষ্ট-বাহ্যিক ও একটি অস্পষ্ট-অভ্যন্তরীণ (ব্যাখ্যাসাপেক্ষ দিক) রয়েছে।

অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা এই কুরআনকে সাত হরফ বা সাত অক্ষরে নাজিল করেছেন। 'সাত হরফে' নাজিল করেছেন-এর ব্যখ্যা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেন, সাত হরফ অর্থ হলো সাত কেরাত, সাত লুগাত, সাতটি বিষয়বস্তু ইত্যাদি।

কোনো কোনো মুহাদ্দিস আবার এই 'সাত হরফের' ব্যাখ্যা হিশেবে বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা এই কুরআন নাজিল করেছেন সাতটি দোজখ থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত লাভ করার জন্য। এই হলো 'সাবআতি আহরুফিন' এর মোটামুটি একটা ব্যখ্যা।

وَلِكُلِّ آيَةٍ مِنْهَا ظَهْرُ وَبَطْنُ অর্থাৎ, প্রতিটি আয়াতের আবার দুটি মর্ম রয়েছে-একটি জাহিরি বা প্রকাশ্য, অপরটি বাতিনি বা অপ্রকাশ্য। এ জন্য কুরআনে এমন আয়াতও আছে, যেটার আভিধানিক তরজমা করে যদি আপনি তাতেই স্থির হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। এ সম্পর্কে একটু পরে আলোচনা করা হবে।

পৃথিবীতে সাত এবং দশ কেরাতের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কেরাত হলো তিনটি :
১. কেরাতে আসিম রাহ.। আমরা এই কেরাতেই পড়ি এবং বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমান এই কেরাতেই পড়েন।
২. কেরাতে নাফি রাহ.।
৩. কেরাতে দুওয়াইরি।

ইন্টারনেটে সার্চ করে আপনারা অন্যান্য কেরাতের কাইফিয়াত বা সিস্টেম জানতে পারবেন। তবে ১০ কেরাতের কুরআন পড়া শুদ্ধ হলেও মাত্র তিনটি সুপ্রসিদ্ধ হওয়া এটা আল্লাহর কুদরত। কেননা, ইমাম তো অনেকেই আছেন; কিন্তু মাত্র ৪জন ইমাম সুপ্রসিদ্ধ হয়েছেন। আমরা যে কারীর কেরাত অনুসরণ করি, তিনি হলেন ইমাম আসিম ইবনু আবিন নুজুম আল কুফি।

কুফার কেরাতে কুরআন

গতকালের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম যে, কুফা হলো ইলমের রাজধানী। এর একটা প্রমাণ আজও দিচ্ছি। সারা দুনিয়ার মানুষ যাঁর কেরাত অনুসরণ করে, তাঁর জন্মও কুফায়। আবু হানিফার জন্মও কুফায়। এখন দেখা যায়, আবু হানিফাকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন; অথচ আমরা যাঁর কেরাত অনুসরণ করি, তিনিও এই কুফার অধিবাসী। এখন যদি আমরা তাঁকে না মানি, তাহলে তো আমাদের নামাজই হবে না। মোটকথা, আমরা কেরাতের অনুসরণ করি আসিমের। এর রেওয়াতকারী হলেন হাফস ইবনু সুলায়মান আল আসাদি আল কুফি। তাঁর বাড়িও কুফায়!

মজার ঘটনা হলো, আমরা যাঁর কেরাতে কুরআন পড়ি, সেই আসিমের কেরাতের বর্ণনাকারী হলেন দুজন। একজন হলেন ইমাম হাফস, অপরজন হলেন ইমাম শুবা। তবে তাঁদের দুজনের মধ্যে হাফসের বর্ণনাকে সারা পৃথিবী গ্রহণ করেছে। কেন করেছে, এ সম্পর্কে চমকপ্রদ একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি হচ্ছে-

ইমাম হাফস রাহ. কোলের শিশু থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা ইনতিকাল করেন। এরপর তাঁর মা ইমাম আসিম রাহ.-এর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। সৎপিতা আসিমের তত্ত্বাবধানেই লালিত পালিত হতে থাকেন হাফস। এবং এখান থেকেই তিনি পিতা আসিমের কেরাত লাভ করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন। এখন যাঁর ঘরে লালিত পালিত হলেন হাফস রাহ., তিনি তাঁর সৎপিতার কেরাত কীভাবে শিক্ষা অর্জন করেছেন, এটা বর্ণনা করে বোঝানোর মতো নয়। পিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে থেকে থেকেই তিনি এই শিক্ষা লাভ করেন। এ কারণে শুবার কেরাতের চেয়ে হাফসের কেরাত বেশি গ্রহণ করা হয়। আমরাও তাঁর কেরাতেরই অনুসরণ করি।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো যে, ইমাম হাফস, শুবা ও আসিম সকলেই কুফার অধিবাসী ছিলেন। কেননা, ইলমের দরজা হলেন আলি রা.; আর তিনি কুফায় এসেছিলেন। ফলে হাজার হাজার আলিম ও মুহাদ্দিস কুফায় জন্মগ্রহণ করেন।

আরও মজার বিষয় হলো, হাফস রাহ. থেকে বর্ণিত কেরাতের সনদ হলো এমন— ইমাম হাফস রাহ. কেরাত শিখেছেন তাঁর (সৎ) পিতা আসিম থেকে, তিনি আবু আবদুর রাহমান আস সুলামি থেকে, তিনি হজরত আলি রাজিআল্লাহু আনহু থেকে, তিনি রাসুল থেকে, রাসুল জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে, আর জিবরিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে। সুবহানাল্লাহ।

তবে অন্য এক বর্ণনায় হাফস রাহ.-এর সনদের বিবরণ হলো এমন—হাফস রাহ. কেরাত শিখেছেন জির ইবনু হুবাইশ রাহ. থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের কাছ থেকে, তিনি রাসুল থেকে, রাসুল জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে, আর জিবরিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে।

আমরা যে নামাজ পড়ি, এই নামাজ পড়ার কাইফিয়াত কীভাবে আমাদের কাছে এল, এ সম্পর্কে একটু জানা দরকার। কারণ, আমরা নামাজ পড়ি হজরত ইমাম আবু হানিফা রাহ.-এর মাজহাব অনুযায়ী। তিনি গবেষণা করেই এটা বের করেছেন। ইমামে আজম নামাজ শিখেছেন নবিজির দীর্ঘ দিনের খাদিম হজরত আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে।

আর আনাস রা. কীভাবে নামাজ পড়েন, ইমাম আবু হানিফা সেটা দেখেছেন কুফার মসজিদে। আনাস রা. দীর্ঘ সময় নবিজির একান্ত সান্নিধ্যে থাকার ফলে নবিজির খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ভালো করে জানতেন। তিনি যেহেতু নবিজির ঘরেই থাকতেন, নবিজির সেবাশশ্রুষা করতেন, সবসময় নবিজির সঙ্গে লেগে থাকতেন, তাই নবিজির চলাফেরা, ওঠাবসা, আচার-ব্যবহার, সবকিছু গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন, অন্য কোনো সাহাবি এতটা পারেননি। অপরদিকে ইমাম আবু হানিফা রাহ. আনাস রা.-কে কুফার মসজিদে সরাসরি নামাজ পড়তে দেখেছেন। তাই আবু হানিফা রাহ. নামাজ সম্পর্কে যেসব বর্ণনা আমাদের সামনে রেখে গেছেন, সেগুলোর বিবরণ ও কাইফিয়াত শুদ্ধতার কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত।

আর আনাস রা. এর নামাজ সবচেয়ে বিশুদ্ধ পন্থায় যে হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, তিনি কীভাবে নামাজ পড়ছেন, ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, সেটা নবিজি দেখেছেন। ঠিক তেমনি হাফস রাহ. যেহেতু তাঁর সৎপিতা আসিম থেকে কেরাত শিক্ষা করেছেন, তাই এতেও বিশুদ্ধতার ব্যাপারটি প্রশ্নাতীত। কারণ, অন্য কোনো উস্তাদের কাছে শিখলে হয়তো কোথাও কোনো মিসটেইক হয়ে যেত বা ছুটে যেত, কিন্তু তিনি যেহেতু ঘরেই এবং পিতার কাছ থেকে শিক্ষা করেছেন, তাই প্রতিটি বিষয়ে বারবার জানার সুযোগ পেয়েছেন। এ কারণে হাফসের কেরাত সর্বপরিচিত।

ইমামুল জারহি ওয়াত-তা'দিলের দৃষ্টিতে ইমামে আজম

গতকালের আলোচনায়ও বলেছি, আজ আবারও বলছি। কুফাকে কেন ইলমের রাজধানী বলা হয়, এ সম্পর্কে তো আমরা মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে গেলাম। আর ইমাম আজম আবু হানিফা কে ছিলেন, তাঁর সম্পর্কেও গতকাল আলোচনা করেছি। আবু হানিফা সম্পর্কে সে যুগের প্রতিতযশা আলিম ইয়াহইয়া ইবনু আদম রাহ. বলেন, 'কুফা ও বসরার মুহাদ্দিসগণ যত হাদিস বর্ণনা করেছেন, সব হাদিস গ্রহণ করেছেন আবু হানিফা রাহ।'

সে যুগের বিখ্যাত আলিম, জারাহ ও তাদিলের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু সায়িদ আল কাত্তান রাহ.। তিনি ইমাম আবুহানিফা সম্পর্কে বলেন, 'আমি কসম করে বলছি, আবু হানিফা রাহ. হলেন দ্বীনের ব্যাপারে এই উম্মতের সবচেয়ে বড় আলিম।' এটা সে যুগের সবচেয়ে বড় আলিম, হাদিসজ্ঞ ইয়াহইয়া ইবনু সায়িদ আল কাত্তান রাহ.-এর কথা। যাঁর কথায় হাদিসের মান নির্ণয় করা হতো, সেই তিনি তাঁর কথাটি দৃঢ় করতে কসম করে বলেছেন, 'ইমাম আবু হানিফা হলেন কুরআন-হাদিসের সবচেয়ে বড় আলিম। তাঁর কোনো তুলনা নেই।'

এই যে কসম বা শপথ করা, এটা কখনো নিজের কথার সমর্থনে ও দৃঢ়তার জন্য করা হয়ে থাকে। যেমন, নবিজি তাঁর সাহাবিদের ব্যাপারে সমালোচনা থেকে বিরত থাকতে 'আল্লাহ আল্লাহ ফি আসহাবি' শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন, 'আল্লাহর দোহাই, তোমরা আমার সাথিদের ব্যাপারে সমালোচনা করো না।'

আবু হানিফা হলেন তাবেয়ি। তাবেয়ি বলা হয় যাঁরা ঈমানের হালতে কোনো সাহাবিকে দেখেছেন এবং অনুস্মরণ করেছেন। আর আবু হানিফা অনেক সাহাবির সরাসরি সান্নিধ্য গ্রহণ করেছেন। এ কারণে তাঁর বর্ণিত হাদিস দুর্বল হতে পারে না। কারণ, সাহাবিগণ বিশ্বস্ত। তাঁদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নবিজিও সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই বলা যায়, আবু হানিফার বর্ণিত হাদিসগুলো সহিহ।

এখন শত বছর পরে যদি কোনো হাদিসের মান নিয়ে প্রশ্ন উত্তাপন করা হয় এবং এই তীর আবু হানিফার দিকে নিক্ষপ করা হয়, তাহলে এটা অনুচিত। এ কারণে তাঁকে দায়ী করা যাবে না। আর তিনি কীভাবে হাদিস গ্রহণ করতেন এবং কতটা সতর্কতা অবলম্বন করতেন, এ সম্পর্কে শাফিয়ি মাজহাবের প্রসিদ্ধ আলিম আল্লামা আবদুল ওয়াহহাব আশ শায়রানি তাঁর আল মিজানুল কুবরা গ্রন্থে লিখেন, 'ইমাম আবু হানিফা রাহ, নবিজির বর্ণিত কোনো হাদিস গ্রহণের ব্যাপারে এমন কঠোর শর্ত করতেন যে, তিনি যখন কোনো হাদিস গ্রহণ করতেন, তখন দেখতেন, হাদিসটি সাহাবিদের এক জামাআত বর্ণনা করেছেন কি না? এরপরই তিনি হাদিসের উপর আমল করতেন।' অর্থাৎ, একজনের কথায় তিনি হাদিস গ্রহণ করতেন না।

মাজহাব কী

এখানে আমাদের এই বিষয়টি জানা দরকার যে, ইমাম আবু হানিফা রাহ. হানাফি মাজহাবের ইমাম। তবে মাজহাব কোনো ধর্ম নয়। কেননা, মাজহাব শব্দের তিনটি অর্থ রয়েছে:
১. বিশেষ কারণে যাওয়া।
২. বিশেষ জায়গায় যাওয়া।
৩. বিশেষ সময়ে যাওয়া।

এই 'যাওয়া'র মানে কি? যেমন, কেউ যদি আত্মপ্রশান্তি বা অবকাশ যাপনের জন্য কোনো গাছের নিচে বা কোথাও বেড়াতে যায়, আভিধানিক অর্থের দিক দিয়ে এটাও মাজহাব। যেহেতু একটা বিশেষ কারণে বা শারীরিক প্রশান্তির জন্য যাওয়া। এটা হয় বিশেষ কারণে, বিশেষ জায়গায় এবং বিশেষ সময়ে। তাই এটা মাজহাব। আর রুহানি প্রশান্তির জন্য কোথাও যাওয়াকেও মাজহাব বলা হয়। যেমন, অনেক হাদিসের বর্ণনা ও মর্ম ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এক হাদিসে এমন বলা হয়েছে, তো আরেক হাদিসে অন্যভাবে বলা হয়েছে। এতে করে আমরা সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তি ও পেরেশানিতে পড়ে যাই। তাই এটা থেকে মুক্তি পেতে, রুহের সান্ত্বনার জন্য আমরা বিশেষ একটা মত গ্রহণ করি। আমরা যখন কোনো মাসআলা নিয়ে ঝামেলায় পড়ি, তখন আলিমের কাছে জিজ্ঞেস করে এর সমাধান জেনে নিই। এটাও একটা মাজহাব। মোটকথা, শারীরিক ও আত্মিক প্রশান্তির জন্য কোনো এক মতকে প্রধান্য দিতে গিয়ে একজনকে মানার নামই হলো মাজহাব। আর এই মাজহাবের প্রবর্তন হয়েছে নবিজি ﷺ-এর সুন্নাত বাস্তবায়নের জন্য।

এতটুকু আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, পবিত্র কুরআন সংকলন, সংরক্ষণ, ইরাব ও নুকতা লাগানোর এই ধারাক্রম আমাদের পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে পৌঁছেছে। যাঁদের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত কুরআন পৌঁছেছে, আমাদের উচিত হলো তাঁদের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। তাঁদের দরজা বুলন্দির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা। তাদের জন্য আল্লাহর শেখানো দুআ করা,

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَ لِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

হে আল্লাহ! আমাদেরকে এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভাইদের মাফ করে দাও। ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 কুরআন বোঝা এবং বোঝানো

📄 কুরআন বোঝা এবং বোঝানো


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদেরকে কুরআনের এই মজলিসে বসার এবং কথা শোনার তাওফিক দিয়েছেন। আমরা যে এতক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করলাম এবং শুনলাম, হাদিস পড়লাম ও শুনলাম, জিকির, তাসবিহ ইত্যাদি পাঠ করলাম, এতে অসংখ্য সাওয়াব রয়েছে। কুরআন পড়লে যেমন সাওয়াব, শুনলেও তেমন সাওয়াব। এমনিভাবে হাদিস পড়া এবং শোনার মধ্যেও সাওয়াব রয়েছে। রাসুল বলেন,

نضر الله امرءا سمع مقالتي যারা নবির হাদিস শ্রবণ করল, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া-আখিরাতে সুখী করবেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

فَوَقُهُمُ اللَّهُ شَرَّ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَلَقْهُمْ نَضْرَةً وَ سُرُورًا অতঃপর, আল্লাহ তাদেরেকে সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দিবেন সজিবতা ও আনন্দ। [সুরা দাহর: ১১] আখিরাতে তারা কেমন সুখী হবে, এ সম্পর্কে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

يَوْمَ تَبْيَضُ وُجُوهٌ وَ تَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ﴾ সেদিন কিছু মুখ উজ্জ্বল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে, যাদের মুখ কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে), 'তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরি করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ করো, যেহেতু তোমরা কুফরি করতে। [সুরা আলে ইমরান: ১০৬]

এ জন্য আমাদেরকে হাদিস পড়া ও শোনার অভ্যাস করতে হবে। এটা অত্যন্ত ফজিলতের কাজ। এ ছাড়া আমরা যে তাসবিহ ইত্যাদি পড়লাম, এতেও প্রচুর সাওয়াব রয়েছে। এগুলোর সাওয়াব আমাদের আমলনামায় জমা হবে, যা কিয়ামতের দিন কাজে আসবে।

দুনিয়াতে মানুষ যেমন ব্যাংকে টাকা জমা রাখে, যাতে বিপদের সময় কাজে লাগে, এমনিভাবে আমরা সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি দুআ-তাসবিহ পাঠ করে মূলত সাওয়াব সঞ্চয় করে রাখলাম। এ সম্পর্কে নবিজি ইরশাদ করেন, এগুলো হলো الباقيات الصالحات বা এমন নেক কাজ, যা স্থায়ী হয় এবং কিয়ামতের দিন এগুলো কাজে লাগবে। এভাবে আমরা যে দুরুদ পাঠ করলাম, এতেও প্রচুর সাওয়াব রয়েছে। এগুলোর প্রতিটা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় পৃথক পৃথক আলোচনা করা যাবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ যেন আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দেন, আমিন।

হাদিস শরিফে ইসতিগফার পাঠকারীর জন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। রাসুল বলেন,

طوبى لمن وجد في صحيفته استغفارًا كثيرًا
অর্থাৎ, সে-সকল মানুষের জন্য সুসংবাদ, যারা সবসময় ইসতিগফার পাঠ করে। এ জন্য আমরা সবসময় ইসতিগফার পাঠ করব। ইসতিগফার এমন এক আমল, যা সবসময় পাঠ করা যায়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

এবার আমরা মূল আলোচনায় চলে যাই। হাদিসে নবিজি ইরশাদ করেন,

خيركم من تعلم القرآن وعلمه তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়।

তিন প্রকার আয়াত

আজকের আলোচনা বুঝতে হলে প্রথমে ছোট্ট একটি বিষয় বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে, আমরা যে কুরআন তিলাওয়াত করি, এই কুরআনের আয়াতসমূহ তিনভাগে বিভক্ত।

১. প্রথম প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক এবং পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায়। এগুলোকে মুহকামাত বলা হয়। এগুলোর উপর আমল করেই জান্নাতের পথ বেছে নেওয়ার জন্য আমরা আদিষ্ট।

২. দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর কেবল আভিধানিক অর্থ বোঝা যায়, পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায় না-যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ এখানে 'ইয়াদুল্লাহ' শব্দের শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, 'আল্লার হাত' অথচ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার কোনো আকৃতি নেই। তাহলে কীভাবে আল্লাহ তাআলার হাত হতে পারে? ঠিক তদ্রুপ আরও এমন অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলোর মর্মার্থ উদ্‌ঘাটন করতে গেলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হবে। তাই এসব আয়াত যেরকম রয়েছে, সেরকমই আমরা বিশ্বাস করি।

৩. তৃতীয় প্রকারের আয়াতগুলো এমন, যেগুলোর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কোনোটাই বোঝা যায় না। যেমন ১-এর মতো বিভিন্ন সুরার শুরুতে যে হুরুফে মুকাত্তাআত রয়েছে, এগুলোর কোনো অর্থ আজও কেউ বের করতে পারেনি। এগুলো আল্লাহ তাআলা এভাবেই রেখে দিয়েছেন এটা বুঝানোর জন্য যে, মানুষ সব বিষয়ের জ্ঞান রাখে না। মানুষের ক্ষমতা একটি পর্যায়ে এসে সম্পূর্ণ অক্ষম।

তাহলে আমরা বুঝলাম যে, কুরআনের আয়াত তিন প্রকার। একপ্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক এবং পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায়। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক অর্থ বোঝা যায় কিন্তু পারিভাষিক অর্থ বোঝা যায় না। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে, যেগুলোর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কোনোটাই বোঝা যায় না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব হুরুফে মুকাত্তাআত রয়েছে সেগুলো তিলাওয়াত করলে সাওয়াব হবে, নাকি হবে না? জবাব হচ্ছে, অবশ্যই সাওয়াব হবে। এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।

অর্থ না বুঝে কুরআন পড়া

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা মনে করেন অর্থ বোঝা ছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করলে তাতে কোনো সাওয়াব হবে না। অথচ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী বোঝা যায়, কুরআনের প্রতিটি হরফ তিলাওয়াত করার মাধ্যমেই বান্দা ১০টি করে নেকি পায়। যেমন, হজরত ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ইরশাদ করেন,

مَنْ قَرَأَ حَرْفاً مِنْ كِتاب الله فَلَهُ حَسَنَة، والحَسَنَة بِعَشْرِ أَمْثَالِها، لا أقول : ألم حَرفٌ، ولكِنْ أَلِفُ حَرْفٌ، وَلَامٌ حَرْفٌ، وَمِيمٌ حَرْفٌ

কেউ যদি কুরআনের একটি হরফ তিলাওয়াত করে, তাহলে তাকে ১০টি নেকি দেওয়া হয়। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম তিলাওয়াত করার মাধ্যমে ১০টি নেকি পাবে বরং 'আলিফ' একটি হরফ, 'লাম' একটি হরফ, এবং 'মীম' একটি হরফ। (সুতরাং, আলিফ-লাম-মীম বলার মাধ্যমে তিন দশে ৩০টি নেকি পাবে।

এখানে রাসুল ﷺ অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করার কথা বলেননি। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা যখন হাফিজ হয়, তখন তারা এর কোনো মর্ম অনুধাবন করে না। তাই বলে কি তাদের তিলাওয়াতে কোনো সাওয়াব হবে না? অবশ্যই হবে। কারণ, কুরআনই একমাত্র কিতাব, যেটা বুঝে পড়লেও সাওয়াব, না বুঝে পড়লেও সাওয়াব।

হুফফাজুল কুরআন

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদির প্রতি বিশেষ একটি নিয়ামত হচ্ছে কিতাবুল্লাহ। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এই উম্মতের লক্ষ-কোটি মানুষ কুরআনের হাফিজ হচ্ছেন। কিন্তু অন্যান্য নবি-রাসুলদের বিষয় ভিন্ন। মুফাসসিরিনে কেরাম লিখেন, পূর্ববর্তী রাসুলদের উপর যেসব কিতাব নাজিল করেছেন, তা কেবল ওই নবি-রাসুলের উপর পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। উম্মতের জন্য পড়া জরুরি ছিল না। এমনকি পূর্ববর্তী কোনো নবির উম্মত তাদের আসমানি কিতাব মুখস্থও করতে পারত না। যদি কেউ কষ্ট করে মুখস্থ করেও ফেলত, তবে তাকেও আল্লাহ নবুওয়াত দিয়ে দিতেন। সুবহানাল্লাহ।

হজরত ইউশা ইবনু নুন মুসা আলাইহিস সালামের খাদিম ছিলেন। মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে থাকতে থাকতে তিনি তাওরাত কিতাব মুখস্থ করে নেন। এভাবে হজরত উজাইর আলাইহিস সালামও তাওরাতের তিলাওয়াত শুনতে শুনতে তাওরাত মুখস্থ করে ফেলেন। ফলে আল্লাহ তাঁদেরকেও নবুওয়াতের মর্যাদা দান করেন। এটা হচ্ছে সুহবত বা সাহচর্যের ফল। বিভিন্ন বুজুর্গের সান্নিধ্য গ্রহণের মাধ্যমে অনেকেই যেমন ভালো মানুষ হয়ে যায় এবং সাথে থাকার বরকতে অনেক কিছু শিখে ফেলে। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে আমরাও আল্লাহওয়ালা বুজুর্গদের সান্নিধ্য গ্রহণে সচেষ্ট হবো।

কিন্তু কুরআনের ব্যাপারটা ভিন্ন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে কুরআন পড়তেন, আমাদেরকেও এভাবেই কুরআন তিলাওয়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুধু অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমন নয়; বরং কুরআন নাজিলের শুরুলগ্ন থেকেই আল্লাহ তাআলা এটার হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন। হেফাজতের একটি বিশেষ পন্থা হলো উম্মতে মুহাম্মদি কুরআন মুখস্থ করবে এবং সেটা তারা তাদের বুকে লালন করবে। আর এ জন্যই মুখস্থ করার ব্যাপারটা আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। হাফিজে কুরআনের পিতামাতার মাথায় আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন সম্মানের মুকুট পরাবেন। তাই আমরা আমাদের সন্তানদের হাফিজ বানাব। আলিম বানাব। দ্বীন শিক্ষা দেবো। অন্তত জীবন চলার মতো জরুরি দ্বীন শিক্ষা দেবো। নাহয় কিয়ামতের দিন আমরা রক্ষা পাব না। এই সন্তান কিয়ামতের দিন আমার শাস্তির কারণ হবে।

সাতদিনে হাফিজ

এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা জরুরি। হজরত ইমাম আজম আবু হানিফা রাহ.-এর দারসে প্রচুর ছাত্র আসত। তবে যে কেউ চাইলে তাঁর দারসে অংশ নিতে পারত না। এ জন্য কিছু শর্ত ছিল। প্রথম শর্ত হচ্ছে, কুরআনের হাফিজ হতে হবে। কারণ, শরিয়তের চার দলিলের মধ্যে প্রথমটাই হচ্ছে কুরআন। এরপর সুন্নাহ, এরপর ইজমা, এরপর কিয়াস।

ইমাম আবু হানিফার কাছে একজন ছাত্র এলেন ভর্তি হতে। তিনি হলেন হজরত ইমাম মুহাম্মাদ আশ শায়বানি রাহ.। তিনি আবু হানিফাকে অনুরোধ করেন, তাঁকে যেন তাঁর দারসে বসার সুযোগ দেন। তখন ইমাম আবু হানিফা তাঁকে প্রশ্ন করেন, 'তুমি কি কুরআনের হাফিজ?' তিনি বললেন, 'না'। তখন আবু হানিফা রাহ. মুহাম্মাদ রাহ.-কে বললেন, 'তোমাকে প্রথমে কুরআন হিফজ করতে হবে, নাহয় আমার এখানে ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।' মুহাম্মাদ রাহ. ব্যথিত মনে ইমাম আবু হানিফার দরবার থেকে ফিরে যান।

তাজকিরাতুল হুফফাজ গ্রন্থে রয়েছে, ইমাম আবু হানিফার দরবার থেকে চলে যাওয়ার পর ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. মাত্র ৭দিনে পুরো কুরআন মুখস্থ করে নেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, মাত্র ৩ দিনে তিনি কুরআন হিফজ করেন। সুবহানাল্লাহ।

বস্তুত, আল্লাহ কুরআন মুখস্থ করা অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ
আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব কোনো উপদেশগ্রহণকারী আছে কি? [সুরা কামার: ১৭]

তবে এর মর্ম বোঝা এত সহজ নয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনের অপর আয়াতে রয়েছে, إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। [সুরা মুজ্জাম্মিল : ৫]

এখন কথা হচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা যে কুরআন হিফজ করে তারা তো কুরআনের অর্থ জানে না, কুরআনের মর্মবাণী তারা অনুধাবন করতে পারে না, তারা কি তবে সওয়াব পাবে না? অবশ্যই তারা সাওয়াব পাবে। শুধু সাওয়াবই হবে এমন নয়; বরং রাসুলুল্লাহ কুরআনের হাফিজের ব্যাপারে অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ যখন ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে, ঠিক তখনই হাফিজে কুরআনের পিতামাতার মাথায় আল্লাহ তাআলা নুরের একটি তাজ পরিয়ে দেবেন। তখন সকলেই তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَتَعَلَّمَهُ وَعَمِلَ بِهِ أُلْبِسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تَاجًا مِنْ نُورٍ ضَوْءُهُ مِثْلُ ضَوْءِ الشَّمْسِ، وَيُكْسَى وَالِدَيْهِ حُلَّتَانِ لَا يَقُومُ بِهِمَا الدُّنْيَا فَيَقُولَانِ: بِمَا كُسِينَا ؟ فَيُقَالُ: بِأَخْذِ وَلَدِكُمَا الْقُرْآنَ

যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে, কুরআনের ইলম অর্জন করবে এবং সে অনুযায়ী আমল করবে, কিয়ামতের দিন তাঁর পিতামাতাকে নূরের মুকুট পরানো হবে। যার আলো হবে সূর্যের আলোর মতো। আর তাঁর পিতামাতাকে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান দুটি পোশাক পরানো হবে। তারা বলবে, কীসের জন্য আমাদের এসব পোশাক পরানো হচ্ছে? (তাদের) বলা হবে, তোমাদের সন্তান কুরআন গ্রহণ করেছে, এ জন্য তোমাদেরকে এভাবে সম্মানিত করা হচ্ছে।

যদি হাফিজে কুরআনের পিতামাতার এত সম্মান হয়, তাহলে স্বয়ং হাফিজে কুরআনের সম্মান কতটা হতে পারে? আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা কুরআনের তালিমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। এ জন্য যারা তাদের সন্তানদের কুরআনের তালিম থেকে দূরে রাখবে, তাদের ব্যাপারে অনেক হুমকি রয়েছে। হাশরের ময়দানের যখন কুরআন না শেখার জন্য কোনো মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন সে বলবে, ‘হে আল্লাহ, কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি, কুরআনের তালিমের প্রতি আমি আগ্রহী ছিলাম; কিন্তু আমার পিতামাতা আমাকে কুরআন তালিমের কোনো সুযোগ দেননি। সুতরাং আমাকে জাহান্নামে দেওয়ার আগে আমার পিতামাতাকে জাহান্নামে দিতে হবে।’

তাহলে বুঝুন, যারা কুরআন তালিমের ব্যাপারে তাদের সন্তানদের নিয়ে সচেষ্ট থাকেন, তাদের ব্যাপারে যেভাবে ফজিলত রয়েছে, তেমনিভাবে যারা কুরআন তালিমের ব্যাপারে দায়িত্বহীন, তাদের ব্যাপারেও হুমকি রয়েছে।

আমরা জেনারেল শিক্ষার বিরুদ্ধে নই। মুসলমানের সন্তান ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, এটা মুসলমানদের জন্য গৌরবের; কিন্তু এসব হবে কুরআন তালিমের পরে। কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে যখন কুরআনের শিক্ষা থাকবে, তখন আশা করা যায়, কোনো ভ্রান্তি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তাই প্রথমে কুরআনের শিক্ষা, এরপর দুনিয়াবি সকল শিক্ষাই যথোপযুক্ত কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।

কুরআন শিক্ষার ব্যাপারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, আভিধানিক অর্থ বুঝে কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। কুরআনের জ্ঞান অর্জন করার জন্য অবশ্যই একজন শিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষক ছাড়া শুধু আভিধানিক অর্থ জেনেই কুরআনের শিক্ষা অর্জন করতে গেলে ভ্রান্তিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে রাসুল-কে শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাসুল-এর কাছ থেকে কুরআনের শিক্ষা নিয়েছেন। এরপর সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে তাবেয়িগণ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এরকম কুরআন নাজিলের শুরু লগ্ন থেকেই শিক্ষক-ছাত্রের সিলসিলা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। শিক্ষক-ছাত্রের এই নিসবত কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে।

সাদা সুতা কালো সুতা

সহিহ বুখারি শরিফে ইমাম বুখারি রাহ. একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যে ঘটনার মাধ্যমে আমরা অনুধাবন করতে পারব যে, কেবল আভিধানিক অর্থ জেনেই কুরআনের মর্মার্থ বোঝা সম্ভব নয়। তিনি যে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন, সেটা মোটামুটি এরকম যে, আল্লাহ তাআলার ইরশাদ হচ্ছে,

فَالُنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ

অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান করো। আর আহার করো ও পান করো, যতক্ষণ-না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। [সুরা বাকারা : ১৮৭]

আল খাইতুল আবইয়াদ-এর মাধ্যমে 'সুবহে সাদিক' এবং আল খাইতুল আসওয়াদ- এর মাধ্যমে 'সুবহে কাজিব' উদ্দেশ্য ছিল। হজরত আদি ইবনু হাতিম রা. কুরআনের এই আয়াতের আভিধানিক অর্থ জেনেই এর মর্মার্থ না বোঝে বড় একটি গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেন। তিনি একটি সাদা সুতা এবং একটি কালো সুতা তাঁর বিছানার নিচে রেখে খাওয়া এবং পান করা চালু রাখলেন। অতঃপর যখন বিষয়টি তাঁর বুঝে আসছিল না, তখন তিনি রাসুল -এর কাছে গেলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, 'এখানে আল্লাহ তাআলা আল খাইতুল আবইয়াদের মাধ্যমে সাদা সুতা নয়; বরং সুবহে সাদিক বুঝিয়েছেন এবং আল খাইতুল আসওয়াদের মাধ্যমে কালো সুতা নয়; বরং সুবহে কাজিব উদ্দেশ্য নিয়েছেন।

সুতরাং বোঝা গেল যে, কেবল আভিধানিক অর্থের মাধ্যমেই কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার একজন শিক্ষক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন ভালো করে বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 রোজার রুহ

📄 রোজার রুহ


আল্লাহর সন্তুষ্ঠিলাভের জন্য আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর অনেক বিধান দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো রোজা। রোজা একটি ফরজ ইবাদত। রোজার ফরজিয়াত সম্পর্কে যে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে সেটি হচ্ছে,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]

আয়াতে আল্লাহ তাআলা يَأْيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا বা 'হে ঈমানদারগণ' বলে সম্বোধন করেছেন। আপনি যদি আপনার সন্তানকে 'হে আমার সন্তান, হে আমার আদরের দুলাল' এভাবে ডাক দেন, তাহলে আপনার সন্তান খুশি হবে, না বেজার হবে? অবশ্যই খুশি হবে। আর আপনি যদি 'এই অমুক' বলে ডাক দেন, তখন এই সম্বোধনে মায়া-মমতা অনেকটা কম থাকে। তা ছাড়া সন্তানকে যদি তার নাম ধরে না ডেকে 'হে আমার সন্তান' এভাবে ডাক দেন, দেখবেন সে অনেক খুশি হবে। এ কারণে আয়াতে আল্লাহ তাআলা 'হে ঈমানদারগণ' বলে সম্বোধন করেছেন।

কুতিবা আলাইকুমুস সিয়াম অর্থাৎ, আমি আল্লাহ তোমাদের উপর রোজা ফরজ করেছি। এখানে 'কুতিবা' শব্দের অর্থ 'ফুরিজা' বা ফরজ করেছি। আর 'কিতাবুন' শব্দের অনেক অর্থ রয়েছে। একটা অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় বিধান। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيْهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَ الْأَنْفَ بِالْأَلْفِ وَ الْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَ السِّنَّ بِالسِّنِّ وَ الْجُرُوحَ قِصَاصُ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ ﴾
আমি তাদের জন্য তাতে বিধান দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, আর দাঁতের বদলে দাঁত, আর জখমের বদলে অনুরূপ জখম। কেউ ক্ষমা করে দিলে তাতে তারই পাপ মোচন হবে। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই জালিম। [সুরা মায়েদা : ৪৫]

'কাতাবা' শব্দের আরেক অর্থ হলো রহম বা দয়া করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর লিখে নিয়েছেন দয়া। [সুরা আনআম: ৫৪]

সুতরাং کُتِبَ عَلَيْكُمُ الصَّيَامُ-এর মর্ম হলো, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর যে রোজা ফরজ করেছেন, এটা আল্লাহ তাআলার অনেক বড় দয়া বা অনুগ্রহ।

সিয়াম ও সাওম আরবি শব্দ। আর রোজা ফারসি শব্দ। বাংলায়ও রোজা বলা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, আরবিতে যেহেতু 'সিয়াম' ও 'সাওম' উভয় শব্দের অর্থই রোজা, তাহলে আল্লাহ তাআলা كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ বললেন কেন? সাওম বলেননি কেন? অথচ পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় সাওম শব্দের ব্যবহার রয়েছে। তা ছাড়া 'সিয়াম' ও 'সাওম' উভয় শব্দের অর্থ যেহেতু এক, তাহলে كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ এখানে 'সাওম' না বলে 'সিয়াম' বললেন কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানতে হবে। কুরআনের মাত্র এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা 'সাওম' এবং সাত জায়গায় 'সিয়াম' শব্দ উল্লেখ করেছেন। অর্থে ভিন্নতা না থাকার পরও আল্লাহ কেন উভয় শব্দ ব্যবহার করলেন, এর রহস্য জানতে পারলে আমরা বুঝতে পারব, আল্লাহ কেন রোজা ফরজ করেছেন। এই রহস্য বোঝার জন্য আমাদেরকে কিছু বিষয় স্মরণ রাখতে হবে। যেমন:

কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ, যার পেটে খাবার নেই, এটা তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কেননা, পেটে খাবার থাকলে মুখ ও চেহারার সতেজতাই প্রমাণ করে যে, সে ক্ষুধার্ত নয়। এটা খাবারের প্রতিক্রিয়া। তেমনিভাবে তেতুঁল ও জলপাইয়ের নাম শুনলেই মানুষের জিবে পানি চলে আসে। এই যে নাম উচ্চারণ করলেই জিবে পানি চলে আসা, এটা জলপাই বা তেঁতুলের টকের প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে বোঝা গেল, প্রতিটি জিনিসেরই দুটি বিষয় রয়েছে, একটা হলো বস্তু, আর একটা তার অ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া। ঠিক তেমনিভাবে রোজারও একটা দেহ বা বডি আছে এবং একটা অ্যাকশনও রয়েছে। এখন যে রোজাদারের রোজার অ্যাকশন নেই, তার রোজার কোনো দাম নেই। যেমন, খাবার খেয়ে যদি পেট ভরে না, খাবার নামক বডির অ্যাকশন না থাকে, এই খাবারের যেমন কোনো দাম নেই, তেমনি রোজা রাখার পর এই রোজা নামক বডিতে যদি কোনো অ্যাকশন না থাকে, তাহলে এমন রোজারও কোনো মূল্য নেই।

কথাটি এভাবেও বলা যায়, প্রতিটি জিনিসের একটি বডি বা দেহ এবং একটা রুহ থাকে। আর এই বডি বা দেহের সম্পর্ক যখন রুহের সাথে তৈরি হয়, তখন এর একটা আছর বা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এভাবে রোজারও একটা বডি এবং রুহ আছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ‘সাওম’ না বলে ‘সিয়াম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন কেন, এ সম্পর্কে তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ লিখেন, রোজারও একটা বডি রয়েছে, একটা রুহও রয়েছে। রোজার বডিকে বলা হয় সিয়াম। এটা যখন বডির মধ্যে ফিট হয়ে যাবে, তখন এটাকে বলা হয় সাওম। অর্থাৎ রুহকে বলা হয় সাওম।

আর বডিতে রুহ এমনিতেই চলে আসে না; বরং চেষ্টা করতে হয়। চেষ্টা করলেই রুহ কার্যকর হয়। যেভাবে শুধু খাবার খেলেই ক্ষুধা দূর হয় না; বরং ক্ষুধা যাতে দূর হয়, সে পন্থা আপনাকে অবলম্বন করতে হবে। এভাবে শুধু রোজা রাখলেই হবে না; বরং রোজার যে রুহ আছে, সেটা কার্যকর করতে হবে। আর রোজার রুহ কার্যকর করতে হলে আপনাকে কিছু কষ্ট করতে হবে, আর এই কষ্টটা বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাআলা ‘সিয়াম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। এরপর আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]

মোটকথা, রোজার রুহ হলো যাতে তুমি মুত্তাকি হতে পারো। যাতে তোমার মধ্যে একটা কাইফিয়াত বা একটা হালত তৈরি হয় এবং তুমি মুত্তাকি হতে পারো। যেভাবে খাবার খেলে চেহারার মধ্যে একটা লাবণ্য সৃষ্টি হয়, তেমনি তোমার রোজার মাধ্যমেও যেন তোমার শরীরে তাকওয়ার একটা লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাহলে তা হলো সার্থক রোজা। এ জন্য সিয়াম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিসে 'সাওম' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে; অথচ কুরআনের আয়াতে আল্লাহ তাআলা সিয়াম শব্দ ব্যবহার করেছেন।

হাদিসে কুদসিতে রোজার ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, الصوم لي وأنا أجزي به
রোজা আমার জন্য, তাই আমিই তার বিনিময়।

এই যে রোজার ফলাফল, এটা সিয়ামের নয়, সাওমের। এবার আমরা সিয়ামের অর্থ সম্পর্কে জানব।

ফন্ট সাইজ
15px
17px