📄 কুরআন কেন ফুরকান
মুহতারাম হাজিরিনে কেরাম।
কুরআন কীভাবে নাজিল হয়েছে এবং আমাদের পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছেছে, এ সম্পর্কে গতকাল আলোচনা করেছি। আজ আমরা কুরআনের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং কুরআনের পরিচয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
কুরআন শব্দটি মাসদার, আর মাসদারের দুইটি অর্থ থাকে। একটা হলো ফায়িলের অর্থ, আরেকটা মাফউলের। কুরআন শব্দটি যেহেতু মাসনাদ, তাই এর দুটি অর্থ। এই দুটি অর্থের দিক দিয়ে কুরআনকে কুরআন বলা হয়। এভাবে বললে বুঝতে সুবিধা হবে।
এককথায়, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হিদায়তের জন্য জিবরিল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াতের দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে যে কিতাব নাজিল হয়েছে, তার সমষ্টি হলো আল কুরআন।
কুরআন শব্দটি যদি قَرْنُ (মিলিত থাকা) থেকে আসে, তাহলে قرْءان শব্দের অর্থ হলো পরিপূর্ণভাবে মিলিত ও সংযুক্ত। যেহেতু কুরআন মাজিদের আয়াত, অর্থ ও বিষয়বস্তুর মাঝে পরিপূর্ণ মিল রয়েছে, তাই এর নাম الْقُرْآنُ ।
কুরআন কাকে কার সাথে মিলায় এবং কী কারণে তাকে কুরআন বলা হয়, এ সম্পর্কে তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ লেখেন, আল্লাহ তাআলা যত আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন, সব কিতাবের ইলম বা সারনির্যাস এই কুরআনে রয়েছে। এ জন্য কুরআনকে কুরআন বলা হয়। কারণ, কুরআন অর্থ মিলানো, জমা করা, একত্র করা।
কুরআন কী মিলিত করে? জাবুর, তাওরাত, ইনজিলসহ আসমানি কিতাবসমূহে যত ইলম রয়েছে, সবই কুরআনে আছে। এ জন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ যদি কুরআন খতম করে, তাহলে যত আসমানি কিতাব রয়েছে, আল্লাহপাক তার এই খতমের বিনিময়ে সব আসমানি কিতাব খতমের সাওয়াব দেবেন। সুবহানাল্লাহ।
এ জন্য কুরআন অর্থ মিলিতকারী, একত্রিতকারী। কেননা, কুরআন সব ইলমকে একত্রিত করেছে। রয়িসুল মুফাসসিরিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাজিআল্লাহু আনহু বলেন,
جميع العلم في القرآن ولكن تقاصر عنه افهام الرجال
সমস্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার হলো আল-কুরআন; কিন্তু জ্ঞানীরা তা সম্পূর্ণ বুঝতে অক্ষম।
কুরআন কার সঙ্গে কাকে মিলিয়ে দেয়, এ সম্পর্কে মুফাসসিরগণ তাফসিরের কিতাবে লেখেন, কুরআন বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। ফলে এই কুরআন আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে মাধ্যম হয়ে বান্দাকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেবে, এবং জান্নাতেও মর্যাদা উন্নত হবে কুরআনের মানদণ্ডে। জান্নাতিদের লক্ষ করে বলা হবে,
اقرأ وارتق ورتل كما كنت ترتل في الدنيا فإن منزلتك عند آخر آية كنت تقرأها
কুরআন পড়ো, যেভাবে দুনিয়ায় থাকতে তাজবিদসহ কুরআন পড়তে এবং জান্নাতের উচ্চমর্যাদায় আরোহণ করো। তোমার তিলাওয়াত যেখানে উঠে শেষ হবে, সেখানেই হবে তোমার স্থান।
কুরআন শব্দের অর্থ হলো একত্রিতকারী। কুরআন বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলানোর জন্য আসল। শয়তান মানুষকে আল্লাহ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। শয়তান চায় মানুষকে আল্লাহ থেকে বিরত রাখতে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআন নাজিল করেছেন, যাতে মানুষ এই কুরআনের মাধ্যমে শয়তানকে লাথি মেরে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে। এ জন্য কুরআন তিলাওয়াতের শুরুতে শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা করে পড়তে হয়,
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।
কুরআন পড়তে হলে প্রথমে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে কেন আশ্রয় চাইতে হয়? কারণ, কুরআন হচ্ছে বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলানোর মাধ্যম। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। সুতরাং প্রথমে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বিসমিল্লাহ পড়তে হয়। আশ্চর্যজনকভাবে এই বিসমিল্লাহ-এর 'বা' শব্দের অর্থও মিলানো।
প্রত্যেক কাজ শুরুর সময় রাসুল ﷺ বিসমিল্লাহ পড়ে (আল্লাহর নাম নিয়ে) শুরু করার কথা বলেছেন। তবে সব কাজ শুরুর আগে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ অর্থাৎ, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেননি। কিন্তু কুরআন তিলাওয়াতের আগে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন। এ সম্পর্কে কুরআনেই আল্লাহ বলেন,
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَنِ الرَّحِيمِ
সুতরাং যখন তুমি কুরআন পড়বে, তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও। [সুরা নাহল: ৯৮]
কুরআনের এ বক্তব্য থেকে জানা যায়, শয়তান সব কাজেই বান্দাকে কুমন্ত্রণা দেয়। তবে কুরআন পড়ার সময় শয়তান সবচেয়ে বেশি কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। কুরআনের কথা যেন মানুষ বুঝতে না পারে, সে জন্য শয়তান সব রকম চেষ্টা চালায়। কেননা, মুসলমানরা কুরআন থেকে দূরে থাকলে শয়তান বেশি খুশি হয়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআন পড়ার সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেছেন। তাই আমাদের জন্য উচিত হলো, কুরআন জানা ও বোঝার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করা।
জীবনের গাইডলাইন
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম, কুরআনকে কুরআন এ জন্য বলা হয় যে, কুরআন বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। আর আমাদের জীবন পরিচালনায় একটা দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। আপনি যখন একটা মোবাইল কিনবেন, তখন সেটার সাথে একটা ব্যবহারবিধি থাকে, তাতে আপনি মোবাইল কীভাবে চালাবেন সেটা জানতে পারেন। তেমনিভাবে আপনি একটা গাড়ি কিনলেও সেটার সঙ্গে একটা নির্দেশনা থাকবে। নিয়ম মেনেই আপনি গাড়িটি চালাবেন। নিজের মতো করে চালালে হবে না; বরং গাইডলাইন মেনে চালাতে হবে, নাহয় বিপদ হতে পারে। তেমনিভাবে আপনার জীবন পরিচালনায়ও কুরআনকে জীবনবিধান হিশেবে গ্রহণ করতে হবে। হালাল-হারাম মেনে চলতে হবে। আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হবে, নাহয় আপনি সফল হতে পারবেন না। আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারবেন না। আর যদি মেনে চলেন, তাহলে সোজা জান্নাতে চলে যাবেন।
ধরুন, আপনি দেশের কোনো আইন অমান্য করলেন। বর্তমান প্রযুক্তির এ যুগে আপনি কিন্তু অপরাধ থেকে চাইলেও নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না, ধরা খাবেনই। এমনকি ঘরেও আপনার এই রিপোর্ট পৌঁছে যাবে। জরিমানা করা হবে। আপনি কখন কোথায় কী করেছেন, সব আপনার সামনে তুলে ধরা হয়। তো বিজ্ঞান যদি এসব করতে পারে, তাহলে আল্লাহ তো সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী, তিনি কী এসব পারবেন না? সুতরাং আল্লাহর পাকড়াও বড় কঠিন এবং কঠোর, রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হ্যাঁ, আপনি যদি তাঁর হুকুমমতো সব মেনে চলেন, তাহলে আপনি প্রকৃত মুমিন। আমরা যে এই আলোচনা শুনছি, আল্লাহ কি এসব দেখছেন না? অবশ্যই দেখছেন।
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পঠিত কিতাব 'কুরআন'
এবার অন্য শব্দ নিয়ে আলোচনা করব। কুরআন শব্দটি যদি قراءة কিংবা قُرْآنُ থেকে উৎপন্ন হয়, তাহলে قُرْآنُ শব্দের অর্থ হয় অধিক পঠিত। কুরআনকে সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পাঠ করা হয়। কুরআনের যত হাফিজ আছে, অন্য কোনো বই বা কিতাবের এত হাফিজ নেই। এ জন্য বহুল পঠিত হিশেবে কুরআনকে কুরআন বলা হয়।
এ জন্য মক্কার কাফিররা বলাবলি করত,
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ
আর কাফিররা বলে, 'তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শুনো না; বরং এর আবৃত্তির কালে শোরগোল সৃষ্টি করো, যেন তোমরা জয়ী হতে পারো।' [সুরা হামীম সিজদা : ২৬]
নবিজি যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, মক্কার কাফির-মুশরিকরা তখন চ্যাঁচামেচি করত, তালি বাজাত, শিস দিত এবং চিৎকার করে কথা বলত, যাতে উপস্থিত জনগণের কানে কুরআনের আওয়াজ না পৌঁছে এবং তাদের অন্তর কুরআনের লালিত্যময় ভাষা ও তার চমৎকারিত্বে যেন প্রভাবিত না হয়ে পড়ে। এই ছিল কাফিরদের মনস্কামনা।
তাই আমরা বেশি বেশি কুরআন পড়ব এবং শুনব। কারণ, কুরআন শুনলেও লাভ, পড়লেও লাভ, কুরআনকে মুহাব্বাত করলেও লাভ।
কুরআনের সূচনা হয়েছে সুরা বাকারার প্রথম আয়াত—আলিফ-লাম-মীম দ্বারা। আর সুরা বাকারা থেকেই কুরআনের সূচনা হয়েছে এবং সুরা ফাতিহা হচ্ছে ভূমিকা। ফাতিহায় পুরো কুরআনের সারমর্ম তুলে ধরা হয়েছে।
আলিফ-লাম-মীমের অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, এর অর্থ যদি কেউ না জানে, তাহলে এটা নাজিল করার মানে কী? এই যে প্রশ্ন, এটা মূলত আকলের মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে আকলের পরিবর্তে আল্লাহর নির্দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। বলা যায়, এটা একটা পরীক্ষা। আমাদের ঈমানের পরীক্ষা। আকল বা বিবেকের চাহিদামতো চললে হবে না। আকলের চাহিদামতো চললে সেটা লালবাতি আর আল্লাহর বিধানমতো চললে সেটা হবে সবুজবাতি। সুতরাং আমাদেরকে সবুজবাতির অন্বেষণ করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা সারা দুনিয়ায় যত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, সবই মানুষের কল্যাণের জন্য। এ জন্য আপনাকে দুটি জিনিস মেনে চলতে হবে, তখন আপনি জান্নাতের অধিকারী হতে পারবেন। যেমন:
১. সৃষ্টি থেকে আল্লাহর বাতলানো পদ্ধতিতে ফায়দা হাসিল করা।
২. আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি সতর্ক খেয়াল রাখা। হাদিসে রাসুল বলেছেন, الدنيا خلقت لكم দুনিয়া তোমাদের ফায়দার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
তবে ফায়দা সেভাবে অর্জন করতে হবে, যেভাবে অর্জন করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। এ জন্য দরকার ইলম। আর এই জ্ঞান অর্জিত হয় তিনভাবে। একটা হলো, পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। একজন আওয়াজ দিল। সেই আওয়াজ মিষ্টি না কর্কশ, সেটা কান দিয়েই শ্রবণ করতে হয়, নাক দিয়ে নয়। কানের মাধ্যমেই সে বুঝতে পারছে এটা মানুষের আওয়াজ; অন্য কোনো প্রাণীর নয়। কান না থাকলে সে এটা বুঝতে পারবে না। এই আওয়াজ বোঝার জন্যই আল্লাহ তাকে কান দিয়েছেন। ফলে সে বুঝতে পারে, কোনটা কার আওয়াজ। বুঝতে পারে তার সন্তানের আওয়াজ, স্ত্রীর আওয়াজ, পিতার আওয়াজ, মায়ের আওয়াজ, বোনের আওয়াজ ইত্যাদি।
এই যে আওয়াজের জ্ঞান অর্জিত হলো, এটা কানের মাধ্যমেই। মানুষ যখন এটা বুঝতে পারে, তখন সে পাত্র অনুযায়ী ভিন্ন ধাঁচে কথা বলে। স্ত্রীর সঙ্গে একরকম, বোনের সাথে একরকম আর পিতার সাথে আরেক রকম কথা বলে।
আল্লাহ মানুষকে নাক দিয়েছেন সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ অনুভব করার জন্য। (এ জন্য আপনারা রমজানে বেশি করে আতর ব্যবহার করবেন।) এর মাধ্যমে সে বুঝতে পারে, কোনটা দুর্গন্ধ আর কোনটা সুগন্ধ। এমনিভাবে চোখ দ্বারা মানুষ কোনটা সাদা আর কালো বুঝতে পারে। আরেকটি হচ্ছে জিহ্বা, এটার মাধ্যমে তিতা না মিষ্টি সেটার জ্ঞান অর্জিত হয়। আরেকটি হচ্ছে ত্বক বা হাত। এটার মাধ্যমে ঠান্ডা-গরম বোঝা যায়।
এই হলো পঞ্চইন্দ্রিয়। এর বাইরে আরেকটা ইন্দ্রিয় আছে সেটা দেখতে পাওয়া যায় না, ধরাও যায় না। এটা বুঝতে হলে দরকার আকল বা জ্ঞানের। যেমন, আপনি একটা ছোট ছেলেকে দেখলেন। এখন আপনার মাথায় আসবে, এই ছেলের নিশ্চয় একজন মা-বাবা আছে। এই যে জ্ঞান, এটা পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি; বরং আক্কলের মাধ্যমে বোঝা গেছে。
এবার আকলের পাঠও শেষ। এর বাইরে আরেকটা জিনিস রয়েছে, যেখানে আকলও বিকল। সেখানে আকলের দরজা বন্ধ। আর যেখানে আকলের দরজা বন্ধ, সেখানেই ওহীর শুরু। সুতরাং আলিফ-লাম-মীম এটা বুঝতে হলে ওহীর দরকার। আলিফ-লাম- মীম এটা হলো ওহি এবং আল্লাহর কালাম, এটা মানতে হবে। প্রজ্ঞার চাহিদাও এটাই। এখন কেউ যদি এটা না মানে, তাহলে সে বোকা। কারণ মানার নাম কামিয়াবি, জানার নাম নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআনের ইলম জানা ও মানার তাওফিক দান করুন। আমিন।
📄 আলিফ-লাম-মীম
এবার আমরা আলিফ-লাম-মীম সম্পর্কে একটু আলোচনা করব। সূরা বাকারা শুরু হয়েছে আলিফ-লাম-মীম দ্বারা। ال-ম -এ হরফগুলোকে কুরআনের পরিভাষায় হুরুফে মুকাত্তাআত বলা হয়। মুকাত্তাআত মানে আলাদা আলাদা। যেহেতু এই হরফগুলোকে আলাদা আলাদা পড়তে হয়, এ জন্য এগুলোর নাম হুরুফে মুকাত্তাআত। ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে চলুন একটি হাদিস শুনি,
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ : الَّمٌ حَرْفٌ وَلَكِنْ : أَلِفُ حَرْفٌ وَلَامُ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
হাদিসের তরজমা এবং ব্যাখ্যা আমরা পরে জানব, তার আগে কিছু কথা বলা দরকার। কুরআনে কারিমের ২৯টি সুরার শুরুতে এ ধরনের হুরুফে মুকাত্তাআত ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সংখ্যা ১৪টি, যেগুলো একত্র করলে রূপটা দাঁড়ায় এমন- نص حکیم له سر قاطع। মানে হলো, প্রাজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে অকাট্য বাণী, যাতে তাঁর কোনো গোপন ভেদ রয়েছে। মূলত, এগুলো কতগুলো বিচ্ছিন্ন বর্ণ দ্বারা গঠিত এক-একটা বাক্য, যথা الم - حم - المص। এগুলোর প্রতিটাকে পৃথক পৃথকভাবে সাকিন করে পড়া হয়ে থাকে। তবে এগুলোর অর্থ এবং এসব আয়াত বর্ণনার রহস্য সম্পর্কে মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ কয়েকটি অভিমত নিচে তুলে ধরা হলো :
১. এগুলোর কোনো অর্থ নেই। কেবল আরবি বর্ণমালার হুরুফ হিশেবে পরিচিত।
২. এগুলোর অর্থ আছে কিনা, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা এগুলোর অর্থ সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমরা শুধু তিলাওয়াত করব।
৩. এগুলোর নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে, কারণ কুরআনের কোনো বিষয় বা কোনো আয়াত বা শব্দ অর্থহীনভাবে নাজিল হয়নি। তবে এগুলোর অর্থ শুধু আল্লাহই জানেন। আমরা শুধু এতটুকু বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর কুরআনের কোনো অংশ অনর্থক নাজিল করেননি।
৪. এগুলো মুতাশাবিহাত বা অস্পষ্ট বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। এ হিশেবে অধিকাংশ সাহাবি, তাবেয়ি এবং আলিমের মত হচ্ছে, হুরুফে মুকাত্তাআতগুলো এমন রহস্যপূর্ণ যে, এগুলোর প্রকৃত মর্ম ও মাহাত্ম্য একমাত্র আল্লাহ জানেন; কিন্তু মুতাশাবিহাত আয়াতসমূহের প্রকৃত অর্থ আল্লাহর কাছে থাকলেও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলিমগণ এগুলো থেকে হিদায়াত গ্রহণের জন্য এগুলোর বিভিন্ন অর্থ করেছেন। আবার অনেক মুফাসসির এগুলোকে সংশ্লিষ্ট সুরার নাম বলে অভিহিত করেছেন।
এভাবে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। তবে আমরা শুধু জেনে রাখব যে, এগুলো আল্লাহর কালাম এবং এর উপর বিশ্বাস রাখব।
মোটকথা, এসব শব্দ দ্বারা আমরা বিভিন্ন অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে হিদায়াত লাভ করতে পারি, যদিও এর মধ্যকার কোন অর্থ আল্লাহ তাআলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা জানি না। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআন থেকে হিদায়াত লাভ করা এ শব্দগুলোর অর্থ বোঝার উপর নির্ভরশীল নয়। অথবা এ হরফগুলোর অর্থ না বুঝলে যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমনটাও নয়। তাই এর অর্থ নিয়ে ব্যাকুল হয়ে অনুসন্ধান করার কোনো প্রয়োজন নেই।
তবে। এগুলোকে 'হুরুফে মুকাত্তাআত' (বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা) বলা হয়। এখানে 'আলিফ' একটি অক্ষর, 'লাম' একটি অক্ষর এবং 'মীম' একটি অক্ষর। প্রত্যেক অক্ষরে একটি করে নেকি হয়। আর একটি নেকির প্রতিদান ১০টি করে পাওয়া যায়। এ হিশেবে শব্দে ৩০টি নেকি লাভ হয়।
এখন শুরুতে আমি যে হাদিস পড়েছি, সেই হাদিসের মর্ম সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। হাদিসটি হচ্ছে,
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ : المْ حَرْفٌ وَلَكِنْ : أَلِفُ حَرْفٌ وَلَامُ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজিদ)-এর একটি হরফ পাঠ করবে, তার একটি নেকি হবে। আর একটি নেকি ১০টি নেকির সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ। (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকির সংখ্যা হবে ৩০।)
হাদিসে এ শব্দ এসেছে। এর মানে হলো বিরাট সাওয়াব। কেননা, আল্লাহ যেটা দেবেন, সেটা বিরাট মূল্যবান। উদাহরণত, আপনাকে যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোনো পুরস্কার দেয়, তখন আপনি নিজেকে যেমন অনেক গর্বিত মনে করে থাকেন। তেমনি আল্লাহ যদি কাউকে কোনো পুরস্কার বা সাওয়াব দেন, সেটার ক্ষেত্রে তো আমাদের গর্বের শেষ থাকার কথা নয়। কারণ, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না। আর আল্লাহ প্রতিটি অক্ষরে শুধু একটি নেকি দেবেন না; বরং এটাকে বৃদ্ধি করে ১০টি দেবেন। আর তা-ও এভাবে যে, আমরা যে আলিফ-লাম-মীম উচ্চারণ করি, এতে তিনটি অক্ষর রয়েছে। এর মাধ্যমে ৩০টি নেকি অর্জিত হবে। রাসুল বলেন, 'আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ। (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকির সংখ্যা হবে ৩০।)'
এখন যারা এই প্রশ্ন উত্তাপন করে যে,। এটার তো কোনো অর্থ জানা যায় না, তাহলে আল্লাহ এটা নাজিল করলেন কেন? এর উত্তর হলো, এটা যে আল্লাহর কালাম এর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এটাকে হিদায়তের উপলক্ষ বানাতে হবে। এর অর্থ জানার পেছনে অযথা মেধা ব্যয় না করে বরং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করতে হবে। আর এটাই তাকওয়ার লক্ষণ।
আরেক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আমরা যখনই শব্দটি উচ্চারণ করব, সাথে সাথে আমাদের আমলনামায় ৯০টি নেকি জমা হয়ে যাবে। ৯০ নেকির ব্যাখ্যা হচ্ছে এমন,
• আলিফ (ألف) বানান করে লিখলে তিনটি হরফ লাগে আলিফ, লাম, ফা।
• লাম (لام) বানান করলে লাম, আলিফ, মীম।
• মীম (ميم) বানান মীম, ইয়া, মীম।
সুতরাং আলিফ-লাম-মীম-এর তিনটি হরফকে বানান করে লিখলে ৯টি হরফ আসে। ৯ কে ১০ দিয়ে গুণ দিলে ৯০ হয়।
সুতরাং আল্লাহ এমনিতেই নাজিল করেননি; বরং এটা পড়লেই সাওয়াব লাভ হয়। এ ছাড়া ছোট ছোট বাচ্চারা যখন কথা বলতে শিখে—আব্বা, আম্মা, চাচা ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করে—তখন সে জানে না, এসব শব্দের বানান কীভাবে গঠন করতে হয় বা এগুলোর অর্থ কী? শিশুরা যখন এসব জানে না, তাই বলে কি তাদের এসব শব্দের সম্বোধন বেকার? তাদের ডাকে আমরা সাড়া দিই না? অবশ্যই দেই। কেননা, সে শিশু।
আর শিশু যখন বড় হবে, মোটামুটি জ্ঞান লাভের যোগ্যতা অর্জন করবে, তখন তাকে অবশ্যই কোনো শিক্ষকের শরণাপন্ন হতে হবে। এটাই দুনিয়ার রীতি। তখন সে প্রতিটি অক্ষরকে পৃথক পৃথক উচ্চারণ করতে শিখে— যেমন: অ, আ, A, B, C, আলিফ, বা, তা, সা ইত্যাদি। তখন মানুষ বোঝে সে এগুলো কোনো শিক্ষক থেকে শিখেছে।
ঠিক তেমনি আমাদের নবিজি কুরআন পেয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরিল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে। তবে এই পৃথিবীতে কোনো মানুষ নবিজির শিক্ষক হতে পারেননি। তাঁর শিক্ষক স্বয়ং আল্লাহপাক। তিনিই তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাই আমাদের এটা মানতেই হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে। কেননা, এটা নবিজির নবুওয়াতেরও অন্যতম প্রমাণ। সুতরাং বোঝা গেল, বা কুরআনের যত জায়গায় এমন শব্দ রয়েছে, এগুলো অনর্থক নাজিল করা হয়নি। এটা হলো নবুওয়াতের দলিল। কারণ, এভাবে হরফ আলাদা আলাদাভাবে উচ্চারণ করা শিক্ষক ছাড়া একার পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ নবিজি উচ্চারণ করেছেন, আলিফ-লাম-মীম। তাহলে তাঁর শিক্ষক কে? এর উত্তর হলো, তাঁর শিক্ষক হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। আর আল্লাহ যাঁর শিক্ষক হন, তিনি হন নবি।
নবিগণের জন্য দুনিয়াতে যে কোনো শিক্ষক ছিলেন না, সেটার পক্ষে অনেক দলিল আছে। আমি আপনাদেরকে আপনাদের শোনা এবং পরিচিত একটি হাদিস শুনাই। আল মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইনের বর্ণনা। আল্লাহপাক আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর আদম যখন আল্লাহর নিষেধ ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেললেন এবং জান্নাত থেকে বাইরে আসতে হলো, তখন তিনি তাঁর সেই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে মাফ চাইতে থাকলেন। আদম আলাইহিস সালামের এক দুআ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে,
﴿رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرُ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ﴾
হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার নফসের উপর অত্যাচার করেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা এবং রহম না করেন, তাহলে অবশ্যই আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। [সুরা আরাফ: ২৩]
অন্য আরেকটি দুআ, যেটা বর্ণিত হয়েছে আল মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইনে, সেখানে বর্ণনাটি হলো এমন,
আদম আলাইহিস সালাম বললেন, হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের ওয়াসিলায় আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহ বললেন, আদম! তুমি মুহাম্মাদকে জানো কেমন করে? আমি তো তাকে এখনো (দুনিয়াতে) সৃষ্টিই করলাম না। আদম বললেন, হে আল্লাহ! আপনি যখন আমাকে সৃষ্টি করে আমার ভেতর আপনার পক্ষ থেকে রুহ দান করলেন, তখন আমি তাকালাম আপনার আরশের দিকে। তখন আমি আপনার আরশের খুঁটিতে লেখা দেখলাম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
আমাদের আলোচ্য পয়েন্ট হলো, আদম আলাইহিস সালাম তাঁকে সৃষ্টির পরপরই আরশের লেখা পড়ে ফেললেন কেমন করে? তিনি কি কোনো স্কুল বা মাদরাসায় ভর্তি হয়েছিলেন? বোঝা গেল, নবিগণ সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহর কুদরতে শিক্ষিত হয়েই পৃথিবিতে আসেন। তাই হুরুফে মুকাত্তাআত নবুওয়াতের দলিল হিশেবে প্রমাণিত হয়। নবিজি বলেন,
انما بعثت معلما علمني ربي
আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, । এর অর্থ কেউ জানেননি কেন? জবাব হলো, দরকার ছিল না। সাহাবিগণ নবিজির কাছে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারেননি কেন? উত্তর হলো, দরকার ছিল না। তবে এটা যে আল্লাহর কালাম, এ কথা বিশ্বাস করতে হবে এবং মানতে হবে। তবে। এর প্রকৃত অর্থ কেউ না জানলেও অনেকে এটার মর্ম জানার চেষ্টা করেছেন। যদিও এটা নিশ্চয়তার সঙ্গে নয়; বরং একটা ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাঁরা এমনটা করেছেন।
অনেকে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসের সূত্রে বলেছেন, ৷ এটা একটা সাংকেতিক চিহ্ন। যেমন, জিপিএস একটা সাংকেতিক চিহ্ন, একটা জিনিসের সংক্ষিপ্ত রূপ। জিপিএস বললেই আমরা বুঝে ফেলি বিষয়টা কী? অথচ আমাদের অনেকেই এটার পূর্ণরূপ জানি না, বা জানার দরকারও মনে করি না। জিপিএস মানে যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, এ কথা না জানার কারণে জিপিএস ফলো করে রাস্তা চলাচলে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না।
ঠিক তেমনি। একটি সাংকেতিক চিহ্ন। কেউ কেউ এটার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, ১-এর আলিফ দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন আল্লাহ, 'লাম' দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন লুতফ বা জিবরিল আলাইহিস সালাম; আর 'মীম' দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ । অর্থাৎ, এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরিলের মাধ্যমে মুহাম্মাদ-এর উপর নাজিল হয়েছে।
তবে কেউ কেউ বলেন, ১-এর প্রথম অক্ষর হলো 'আলিফ'। আর সুরা ফাতিহায় । امْدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ অর্থাৎ আমরা আল্লাহর কাছে সোজা জান্নাতে যাওয়ার দুআ করেছি। এ জন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেন, 'আমরা যেভাবে মুখে সোজা জান্নাতে যাওয়ার কথা বলি, ঠিক তেমনি আমাদের জীবনকেও আলিফের মতো সোজা বানাতে হবে।'
এখানে সাপকে আমরা উদাহরণ হিশেবে নিতে পারি। সাপ কখনো সোজা চলে না। এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ; কিন্তু এই সাপ যখন গর্তে প্রবেশ করে, তখন তাকে বাধ্য হয়ে সোজা হয়ে ঢুকতে হয়। এ জন্য আমরা যখন দুনিয়াতে এসেছি, তখন আমাদের মধ্যেও অনেক বক্রতা রয়েছে, অসংখ্য বাঁকা রাস্তা আমাদের সামনে রয়েছে। এসব বাঁকা রাস্তা থেকে আমরা নিজেকে কীভাবে রক্ষা করব এবং সোজা রাস্তার সন্ধান কীভাবে লাভ করব, নবিজি তাঁর সারাটি জীবনই এই সোজা পথের সন্ধান আমাদের দিয়ে গেছেন। এখন যারাই সোজা পথ অবলম্বন করবে, তারাই হলো চূড়ান্ত সফল।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সিরাতে মুসতাকিমের উপর অটল-অবিচল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
📄 কুরআন শুদ্ধভাবে পড়া ফরজ আইন
কুরআন শুদ্ধভাবে পড়া ফরজে আইন। এটা শুধু আমি পড়লে হবে না বরং সকলকে পড়তে হবে। কারণ, এটা ফরজে আইন। এ জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা শিখতে হবে। চেষ্টা করতে হবে। যদি আপনি কুরআন পড়া না শিখেন, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন। আপনি যদি কুরআন পড়া না জানেন, তাহলে আপনার নামাজ হবে না; অথচ প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ পড়তে হয়। আর যদি কুরআন তিলাওয়াত করতে না পারেন, তাহলে আপনার বড় ইবাদত নামাজই হবে না। ফলে নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি ফরজ তরক করলে যেমন গুনাহ হবে, কুরআন শিক্ষা না করলেও তেমন গুনাহ হবে। এ জন্য তিলাওয়াত যদি করতে না পারি, তাহলে যে পড়তে জানে, তার কাছে গিয়ে অন্তত নামাজে পড়ার মতো সুরা-কেরাত শিক্ষা করব। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, কুরআন শিক্ষা করা ফরজ। পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণীই হচ্ছে, ٱقْرَأْ بِٱسْمِ رَبِّكَ ٱلَّذِى خَلَقَ
পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। [সুরা আলাক: ১]
এখানে ইকরা অর্থ পড়ো। এ আয়াতের মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলিমকে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন তোমরা জানার জন্য, বোঝার জন্য এবং সঠিকটা মেনে চলার জন্য পড়ালেখা করো, অধ্যয়ন করো। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ করে দিয়েছেন। আর এটার বাস্তব নির্দেশ দিয়েছেন রাসুল ﷺ।
হজরত আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল সা. বলেছেন,
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ।
জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি কুরআন শিক্ষা করাও প্রত্যেক মুসলমানের উপর আল্লাহ ফরজ। এ সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে; তিনি বলেন, تعلّموا الفرائض والقرآن وعلموا الناس ، فإِنِّي مقبوض তোমরা কুরআন ও ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) শিক্ষা করো এবং মানুষকে শিক্ষা দাও। কেননা আমাকে উঠিয়ে নেওয়া হবে।
এ জন্য আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, আমরা কুরআন ও ইলমে ফারায়েজ (উত্তারাধিকার আইন) শিক্ষা করব এবং এর আলোকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র পরিচালনা করব। মোটকথা, কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআনের অর্থ ও মর্ম জানা-বোঝার চেষ্টা করা পৃথিবীর সকল কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজ। কারণ, এই কুরআনে মানুষের জীবন পরিচালনার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে হিদায়তের সঠিক পথ।
বস্তুত কুরআন তিলাওয়াতের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অফুরন্ত সাওয়াব রেখে দিয়েছেন। কুরআন বুঝে তিলাওয়াত করলেও যেমন সাওয়াব রয়েছে, তেমনি না বুঝে তিলাওয়াত করলেও সাওয়াব রয়েছে। শুধু শুনলেও সাওয়াব রয়েছে। এমনকি কেউ যদি শুধু কুরআনের পাতা উল্টায় আর কেঁদেকেটে বলে, এটা আমার মুনিবের কালাম আমার রবের কালাম, তবু আল্লাহ তাকে সাওয়াব দেবেন। এ ছাড়া কুরআন দেখে দেখে পড়লে চোখের জ্যোতিও বাড়ে।
এক সাহাবি নবিজির কাছে গিয়ে চোখের সমস্যার কথা জানালেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি চোখে ঠিকমত দেখতে পাই না। নবিজি বললেন, ادم النظر في المصحف অর্থাৎ, 'তুমি সর্বদা দেখে দেখে কুরআন পড়ো, সমস্যা দূর হয়ে যাবে।' বস্তুত কুরআন বিরাট মর্যাদাশীল এক কিতাবের নাম।
কুরআনের পারিভাষিক সংজ্ঞা
এতক্ষণ আমরা কুরআনের আভিধানিক অর্থ সম্পর্কে আলোচনা করলাম এবং কুরআনের বিভিন্ন অর্থ সম্পর্কে জানতে পারলাম। যেমন: কুরআন অর্থ জমাকারী, একত্রিতকারী, অধিক পঠিত ইত্যাদি। এবার পারিভাষিক অর্থ সম্পর্কে আরেকটু আলোকপাত করব।
তাফসিরে কুরতুবিতে আল্লামা কুরতুবি রাহ. কুরআনের পারিভাষিক সংজ্ঞায় লেখেন,
القرآن هو كلام الله المنزل على الرسول ﷺ المكتوب في المصاحف ، المنقول عنه نقلاً متواتراً بلا شبهة.
অর্থাৎ, আল কুরআন হলো আল্লাহর কালাম। আল মুনাজ্জালু আলার রাসুল বা যেটা রাসুলের উপর নাজিল হয়েছে। আল মাকতুবু ফিল মাসাহিফ, (আমাদের কাছে যে কুরআন রয়েছে, এটাকেই মাসহাফ বলে) পান্ডুলিপিতে লিখিত, আল মানকুলু আনহু নাকলান মুতাওয়াতিরান বেলা শুবহাতিন বা রাসুল ﷺ থেকে আমাদের পর্যন্ত যা নিঃসন্দেহে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ, নবিজির কাছ থেকে আমাদের পর্যন্ত কোনো সন্দেহ ছাড়াই যে কুরআন পৌঁছেছে, এর উপর ঈমান আনতে হবে। আর এটা হলো কুরআনের প্রথম আদব বা হক। এ ছাড়া সব আসমানি কিতাবের উপর সামষ্টিকভাবে ঈমান আনতে হবে।
কুরআন নাজিলের পর পূর্ববর্তী আসমানি সব কিতাবের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে। যেমন: একটা ওষুধের গায়ে মেয়াদ লেখা থাকে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এটা সেবন করা যায় না। তেমনিভাবে আগের সব আসমানি কিতাবের কার্যকারিতা কুরআন শেষ করে দিয়েছে। এখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত শুধু কুরআনই বাকি থাকবে। এর উপর যে ঈমান আনবে না, সে মুসলমান হতে পারবে না। তাই কুরআনের উপর ঈমান না আনলে বা অস্বীকার করলে সে কাফির হয়ে যাবে।
ইবাদতের শর্ত হচ্ছে নিয়তের পরিশুদ্ধতা। আর নিয়ত হচ্ছে অন্তরের কাজ। আরবিতে এটাকে ফে'লুল কালব বলে। আর নিয়ত অন্তর দিয়ে করলেও চলে, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখেও নিয়ত করতে হয়, নাহয় তার আমল কবুল হবে না। যেমন হজ। কেউ যদি হজের নিয়ত লাব্বাইকা ... মুখে না পড়ে, তাহলে তার হজই আদায় হবে না। এ ছাড়া রোজার নিয়ত ইত্যাদি মুখ দিয়ে উচ্চারণ না করলেও চলবে। তবে কেউ যদি মুখে উচ্চারণকে জরুরি মনে করে, তবে সেটা বিদআত হবে। কেননা, অতিরঞ্জন কোনো কিছুতেই ভালো নয়।
আল্লাহ আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করার তাওফিক দিন। খালিস নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত ও ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।
📄 মাসহাফে উসমানি
মুহতারাম হাজিরিন!
গত আলোচনাগুলোতে কুরআনের পরিচয়, কুরআন শব্দের বিভিন্ন অর্থ, শাব্দিক সংজ্ঞা ও কুরআন সংকলনের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ আমরা মাসহাফে উসমানি সম্পর্কে আলোচনা করব।
ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি, কুরআনে কারিমের একটি হরফ উচ্চারণ করলে ১০টি নেকি পাওয়া যায়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. সূত্রে বর্ণিত তিরমিজি শরিফের এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفاً مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ : الَم حَرفٌ وَلَكِنْ : أَلِفُ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজিদ)-এর একটি বর্ণ পাঠ করবে, তার একটি নেকি হবে। আর একটি নেকি ১০টি নেকির সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ। (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকির সংখ্যা হবে ৩০টি।)
সিদ্দিকায়ে কায়েনাত আম্মাজান আয়শা সিদ্দিকা রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الماهر بالقرآن مع السفرة الكرام البررة، والذي يقرأ القرآن، ويتتعتع فيه، وهو عليه شاق، له أجران
কুরআন অধ্যয়নে পারদর্শী ব্যক্তি মর্যাদাবান লিপিকার ফেরেশতাগণের সাথী হবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন অধ্যয়ন করে এবং যে এতে আটকে যায় এবং কুরআন তেলাওয়াত যার জন্য কষ্টদায়ক হয়, তার জন্য দুটি পুরস্কার।
মুহতারাম হাজিরিন!
আলহামদুলিল্লাহ, আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আপনারা বোঝার চেষ্টা করছেন। নানা প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। আপনারা প্রশ্ন করেছেন যে, এটা তো হুবহু মাসহাফে উসমানি নয়। হ্যাঁ, আপনাদের প্রশ্ন ঠিক আছে। আমাদের কাছে কুরআনের যে নুসখা রয়েছে, এটা হুবহু মাসহাফে উসমানি নয়। আমাদের বর্তমান নুসখার সাথে মাসহাফে উসমানিতে কিছু পরিবর্তন রয়েছে। মাসহাফে উসমানিতে তিনটি জিনিস ছিল না-যা পরে যুক্ত করা হয়েছে- যেটা আমাদের হাতে থাকা মাসহাফে আছে। তবে মাসহাফে উসমানির মূল নুসখা এখনো তুরস্ক ও তাশখন্দে রয়েছে।
মাসহাফ শব্দের অর্থ 'পান্ডুলিপি' বা ‘লিখিত বস্তু’। শব্দটি আরবি 'সহিফা' থেকে উদ্গত। 'সহিফা' শব্দটি পবিত্র কুরআনের 'সু্যুফ' শব্দ থেকে নিসৃত, যা কুরআনে ৮ বার উল্লেখ হয়েছে। যেমন, সুরা আলার ১৯নং আয়াতে )صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَ مُوسَى( অর্থাৎ, 'যা ইবরাহিম ও মুসার কিতাবেও আছে'।
হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা. প্রথমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা কুরআনের আয়াতগুলোকে সন্নিবেশ করে একটি পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি বা মাসহাফ তৈরি করান, যাকে মাসহাফে সিদ্দিকি বলা হয়। আর তখন থেকেই 'মাসহাফ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
উসমানি মাসহাফ কাকে বলে
তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রা.-এর আমলে সাহাবিগণ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। ফলে তাঁরা একেকজন একেক পদ্ধতিতে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকেন। তাঁদের একেকজন একেক নিয়মে কুরআন তিলাওয়াতের প্রচারণা শুরু করেন, যার ফলে কুরআনপাঠের সঠিক নিয়ম নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সেই সাথে আঞ্চলিক উচ্চারণের সাথে মিশে বিভিন্ন শব্দের উচ্চারণে পার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়। তা ছাড়া মুনাফিকরা তখন কুরআনের নামে মিথ্যা আয়াত কুরআনের সাথে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অবস্থাদৃষ্টে হজরত উসমান রা. মূল কুরআন সংরক্ষণের তাগিদ অনুভব করেন। একপর্যায়ে তিনি অহি লেখক ও হাফিজ সাহাবিদের নিয়ে মূল কুরআনের একটি অনুলিপি তৈরি করেন এবং আগের সব পান্ডুলিপি (মাসহাফ) পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।
উসমান রা. কর্তৃক সংকলিত এই অনুলিপিকেই 'মাসহাফে উসমানি' বলা হয়। তবে মাসহাফে উসমানি হুবহু থাকেনি; বরং বিভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের তাগিদে পরে তাতে আরও তিনটি বিষয় যুক্ত করা হয়, যা উসমান রা.-এর সংকলিত মাসহাফে ছিল না। সেই তিনটি জিনিস হচ্ছে,
১. মাসহাফে উসমানিতে জের, জবর ও পেশ ছিল না।
২. ইরাব ছিল না। ইরাব হলো শব্দের শেষ অক্ষরের হরকত।
৩. নুকতা ছিল না।
'বা'র নিচে এক নুকতা ছিল না, তেমনি 'তা'র উপরে দুই নুকতা ছিল না। তবে এগুলো না থাকলেও কুরআন পড়তে তাঁদের অসুবিধা হতো না। কারণ, তাঁরা ছিলেন আরবি। আমরা বাঙালিরা যেভাবে বাংলা পড়তে কোনো সমস্যা হয় না। ঠিক তেমনিভাবে আরবরা কোন অক্ষরে জবর হবে, পেশ হবে, কোনটা 'বা' আর কোনটা 'তা', এটা তারা চিনতে পারতেন।
এখন এই তিনটি জিনিস কে বা কারা লাগিয়েছেন, সেটা আমাদের জানতে হবে। বর্তমানে সৌদি আরবের কিং ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স থেকে যে দুটি মাসহাফ প্রিন্ট করা হয়, তা 'মদিনা মাসহাফ' ও 'মাজেদি মাসহাফ' নামে পরিচিত। তবে উভয়টিই 'মাসহাফে উসমানি'র কিছু পরিবর্তিত সংস্করণ। পার্থক্য বলতে শুধু দুই মাসহাফে দুটি ভিন্ন ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে এবং হামজা ও মদগুলোকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের ভারত উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত হলো তাজ কোম্পানির ছাপা কুরআন। অনেকে আছেন, যারা তাজ কোম্পানির ছাপা কুরআন পড়তে পারেন, কিন্তু সৌদি আরবি নুসখা পড়তে পারেন না।
কুরআনে জের-জবর
জবর, জের, পেশ বা হরকত না থাকা, ইরাব ও নুকতা না থাকার কারণে অনারবি যারা, তারা কুরআন পড়তে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হন। খুলাফায়ে রাশেদার যুগ থেকে ইসলামের প্রচার-প্রসার বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছিল। ইসলামের ছায়াতলে আরব- অনারবের অসংখ্য মানুষ আশ্রিত হচ্ছিল। ফলে অনারবিদের জন্য জের-জবর-পেশহীন কুরআন পড়তে সমস্যা হচ্ছিল। অনেক সময় তাদের তিলাওয়াতে অর্থবিকৃতিও ঘটে যেত। এটা লক্ষ করে আমিরে মুআবিয়া রা. কুরআনকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হন এবং কুফার গভর্নর জিয়াদ ইবনু আবিহিকে ডেকে এনে বলেন, 'আরবিরা তো কুরআন পড়তে পারে, কোনো সমস্যা হয় না; কিন্তু আজমি বা অনারবি যারা, তারা যাতে শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারে, অর্থগত কোনো বিকৃতির সম্ভাবনা না থাকে, এর একটা বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করো।'
আমিরে মুআবিয়া রাজিআল্লাহু আনহুর নির্দেশ পেয়ে জিয়াদ ইবনু আবিহি এ মহান দায়িত্ব আদায়ের অনুরোধ করেন তৎকালের বড় আলিম আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি রাহ.-কে। প্রথমে তিনি এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান, যেমনটা কুরআনের সংকলনের ক্ষেত্রে হজরত আবু বকর রা. করেছিলেন। তবে জিয়াদ অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং কুশলী গভর্নর ছিলেন। এ পর্যায়ে আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালিকে রাজি করাতে তিনি একটি কৌশল অবলম্বন করেন। কৌশলটি হচ্ছে, আবুল আসওয়াদ যে রাস্তা দিয়ে সবসময় যাতায়াত করতেন, সেই রাস্তা দিয়ে অনেক আরবি এবং আজমি মানুষও যাতায়াত করত। জিয়াদ এদের এক লোককে ডেকে এনে বললেন, 'তুমি যখন এ রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করবে এবং আবুল আসওয়াদকে দেখবে, তখন এমনভাবে কুরআন তিলাওয়াত করবে, যাতে অর্থবিকৃতি হয়।' জিয়াদের কথামতো লোকটি তা-ই করে। সে কুরআনের এমন একটি আয়াত পড়ে, যাতে 'রাসুলুহু' এর স্থলে 'রাসুলিহি' উচ্চারণ করে। আয়াতটির শুদ্ধ উচ্চারণ 'রাসুলুহু'র সঠিক অর্থ হলো-যারা শিরক করে, তাদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অসন্তুষ্ট। আর ভুল উচ্চারণ 'রাসুলিহি'র অর্থ হলো এমন-যারা শিরক করে, তাদের প্রতি এবং রাসুলের প্রতিও আল্লাহ অসন্তুষ্ট। আয়াতটি হলো,
﴿اَنَّ اللهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ﴾
আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি যেহেতু একজন আলিম ছিলেন, আর প্রকৃত আলিম কুরআনের এমন বিকৃত তিলাওয়াত সহ্য করতে পারেন না, তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, হজরত মুআবিয়ার নির্দেশে জিয়াদ তাঁকে যে পরামর্শ দিয়েছেন, সেটা করতেই হবে।
অতঃপর আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি উম্মাহর দরদে বাধ্য হয়ে কাজ করতে রাজি হন। তিনি বুঝতে পারেন তার একার পক্ষে এই মহৎ কাজটি আঞ্জাম দেওয়া কঠিন! তাই তিনি তাঁর চাহিদামতো ৩০ জনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিতে জিয়াদকে অনুরোধ করেন। আবুল আসওয়াদের পরামর্শে জিয়াদ তা-ই করে দেন।
আবুল আসওয়াদ আদদুয়ালি তাঁর টিমের সাথে বসে পরামর্শ করে প্রতিটা শব্দের শেষ অক্ষরে কোন ইরাব বসবে, কোথায় জের হবে আর কোথায় পেশ, সেটা নির্ধারণ করেন। এভাবে হজরত আমিরে মুআবিয়ার নির্দেশে আর জিয়াদ ইবনু আবিহির পরামর্শে হজরত আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালির মাধ্যমে সর্বপ্রথম কুরআনে ইরাব যুক্ত করা হয়।
মুআবিয়া কেন আমির মুআবিয়া
হজরত মুআবিয়া রা. সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা দরকার। আমিরে মুআবিয়া কে ছিলেন, সাহাবিদের মধ্যে তাঁর অবস্থান কোথায় ছিল, এটা আমাদের জানা দরকার। হজরত মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর নামের শুরুতে 'আমির' শব্দটি এ জন্য যুক্ত করা হয়েছে যে, এক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে যে সমুদ্রপথের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবে, আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছি।' ইতিহাস সাক্ষী, দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে কনস্টান্টিনোপলের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের আমির বা নেতা ছিলেন হজরত মুআবিয়া রা.। এদিকে লক্ষ করেই 'আমির' শব্দটি তাঁর নামের অংশ হয়ে যায়।
সুনানু বায়হাকি এবং দালায়িলুন নাবুওয়াহ কিতাবে বর্ণিত আছে, একবার নবিজি মুআবিয়া রা.-কে সম্বোধন করে বলেন,
يا معاوية ان وليت امرا فاتق الله و اعدل
হে মুআবিয়া, তোমাকে যখন কোনো কাজের বা জায়গার আমির বানানো হবে, তখন তুমি তাকওয়ার মাধ্যমে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো।
মুআবিয়া রা. বলেন, তখন থেকে আমি মনে মনে ভাবতেছিলাম, নবির কথা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে, আমাকে আমির বানানো হবে। পরে সত্যিই আমাকে আমির বানানো হলো।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন,
الذي يقرأُ القرآن وهو ماهر به مع السَّفَرَةِ الكِرَامِ البَرَةِ، والذي يقرأ القرآن ويَتَتَعْتَعُ فيه وهو عليه شَاقُ لَهُ أَجْرَانِ
কুরআনের (শুদ্ধভাবে পাঠকারী ও পানির মতো হেফাজতকারী পাকা) হাফিজ মহা সম্মানিত পুণ্যবান লিপিকারদের (ফেরেশতা) সঙ্গী হবে। আর যে ব্যক্তি (পাকা হিফজ না থাকার কারণে) কুরআন পাঠে 'ওঁ-ওঁ' করে এবং পড়তে কষ্টবোধ করে, তার জন্য রয়েছে দুটি সাওয়াব। (একটি তিলাওয়াতের, দ্বিতীয়টি কষ্টের ফলে।)
উপরিউক্ত হাদিস থেকে বোঝা গেল, যারা কুরআনের ব্যাপারে মাহির বা বিজ্ঞ, তাদের হাশর হবে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গে।
উল্লেখ্য, কুরআন নিয়ে মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত। একদল হচ্ছেন তারা, যারা কুরআনের ভালো জ্ঞান রাখেন অর্থাৎ ভালো আলিম। আরেক দল হলো, যারা কুরআন পড়তে ও বুঝতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। তৃতীয় দল হচ্ছে, যারা কুরআনের ব্যাপারে একেবারে বিমুখ। জানারও চেষ্টা করে না। এই তিন প্রকারের মধ্যে প্রথম দুই প্রকার অর্থাৎ, যারা কুরআনের ব্যাপারে বিজ্ঞ এবং যারা চেষ্টা করে, তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে। কিয়ামতের দিন রাসুল নিজেই তাদের জন্য সুপারিশ করবেন। আর যারা কুরআনের জ্ঞান অর্জন করেনি, তাদের ব্যাপারে দুঃসংবাদ। কিয়ামতের কঠিন দিনে যেখানে নবিজির কাছে জান্নাতে যাওয়ার জন্য সুপারিশ চাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো তিনিই এদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে নালিশ করবেন। বোঝা গেল, যারা কুরআন সম্পর্কে বিজ্ঞ, তাদের হাশর হবে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গে। আর যারা কুরআন পড়তে ও বুঝতে চেষ্টা করে, এতে যদিও তাদের কষ্ট হয়, তবু তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে।
যারা কুরআনের ধারেকাছেও যায় না, তাদের সম্পর্কে নবিজি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে নালিশ করবেন। অপরদিকে কুরআনের ব্যাপারে বিমুখ কপালপোড়ার দল সম্পর্কে খোদ কুরআন যে ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেছে, সেটা হলো এমন,
﴿وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَ نَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أَعْلَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْلَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ ايْتُنَا فَنَسِيْتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى﴾
আর যে আমার কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংক্ষীর্ণ করে দেওয়া হবে, আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাবো। সে তখন বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন কেন, আমার তো চক্ষু ছিল। আল্লাহ বলবেন, যেমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে! (অর্থাৎ আয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে) তেমনিভাবে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হবে। [সুরা তা-হা: ১২৪-১২৬]
এখন আমরা যারা কুরআন বোঝার নিয়তে কুরআনচর্চার এসব মাহফিলে বসি, এতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, কাজকাম পেছনে ফেলেই আমরা কুরআন শেখার চেষ্টা করছি, এ জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উত্তম বিনিময় দেবেন।