📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 আবু বকর সংকলিত কুরআনের বৈশিষ্ট্য

📄 আবু বকর সংকলিত কুরআনের বৈশিষ্ট্য


আবু বকর সিদ্দিক রাজিআল্লাহু আনহু সংকলিত কুরআনকে পরিভাষায় 'উম্ম' বা আদি কুরআন বলা হয়। কেননা এটিই প্রথম লিখিত সুবিন্যস্ত কুরআন। এর বৈশিষ্ট্য ছিল, কপিটি রাসুল কর্তৃক বর্ণিত ধারাক্রম অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছিল। সুরা গুলো আলাদা করা ছিল, তবে সুরার ক্রমধারা নির্ধারণ করা ছিল না। কপিটি সাত হরফ বা সাত কেরাতে লেখা হয়েছিল। কুরআনের এ কপিটি হিরার হস্তাক্ষরে লেখা হয়। তাতে কেবল সেসব আয়াতই লেখা হয়েছিল, যেগুলোর তিলাওয়াত রহিত হয়নি। এই সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল একটি সুবিন্যস্ত ও গ্রন্থিত কুরআনের কপি তৈরি করা, যাতে প্রয়োজনের সময় এর দ্বারস্থ হওয়া যায়। এটি ১৩ হিজরিতে শুরু হয়ে পূর্ণ এক বছর, মতান্তরে দুই বছরে সমাপ্ত হয়। মোটকথা, কুরআন সংরক্ষণের এই কাজে মূলত ৪ জনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁরা হলেন আবু বকর, উমর, উসমান ও জায়েদ রাজিআল্লাহু আনহুম আজমাইন。

হজরত আবু বকরের সংকলিত কুরআনটি তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিল। এরপর সেটি আসে হজরত উমরের কাছে। উমরের শাহাদাতের পর তাঁর অসিয়ত মোতাবিক কুরআনের এই কপিটি রাসুল -এর স্ত্রী, উমর-কন্যা হাফসা রা.-এর কাছে চলে যায়। মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাঁর রাজত্বকালে কুরআনের এই কপিটি চাইলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানান। হাফসা রা.-এর ইনতিকালের পর মারওয়ান কপিটি হজরত ইবনু উমর রা.-এর কাছ থেকে নিয়ে যান। অতঃপর তিনি এ চিন্তা করে সেটি জ্বালিয়ে দেন যে, উসমান রা.-এর খিলাফতকালে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তুতকৃত কপির সঙ্গে এর কেরাতের পার্থক্যের কারণে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কেননা, উসমান রা. সাত কেরাতের পরিবর্তে এক কেরাত, আঞ্চলিক একাধিক ভাষার পরিবর্তে প্রমিত এক ভাষায় সে কুরআনটি সংকলন করেছেন।

ভাষার ভিন্নতা একটা বড় ব্যাপার। যেভাবে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ভাষা এবং সিলেটের ভাষা শুদ্ধ বাংলার সঙ্গে মিল নেই, তেমনি আরবি ভাষায় অঞ্চলভেদে ভাষার উচ্চারণ ও লিখিত রূপে তারতম্য রয়েছে। এ চিন্তা থেকেই উম্মাহকে কুরআনের উচ্চারণ এক কেরাতে নিয়ে আসতে উসমান রা. প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজটি আঞ্জাম দেন। এর মাধ্যমে তিনি উম্মাহকে বড় এক ফিতনা থেকে রক্ষা করেছেন। যদি তখনকার সব মাসহাফ বা পান্ডুলিপি তিনি রেখে দিতেন, তাহলে একেকজন একেক কেরাতে তিলাওয়াত করত এবং একজন অন্যজনকে ভুল আখ্যা দিত। যেহেতু সব মানুষের মেধা ও জ্ঞান সমান নয়, তাই এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হতো। ফলে মাত্র একটি পান্ডুলিপি রেখে বাকিগুলো তিনি জ্বালিয়ে দেন এবং ঘোষণা দেন যে, যদি কারও কাছে সেসব পাণ্ডুলিপির কোনোটি সংরক্ষণে থাকে, তাহলে সেটা জমা দিতে হবে অথবা জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিতে হবে। নাহয় তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।

তাঁর এমন ঘোষণার ফলে অন্যান্য মাসহাফ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে যে মাসহাফ রয়েছে, সেটা উসমান রা.-এর সেই মাসহাফ। এটাকে 'মাসহাফে উসমানি' এ জন্য বলা হয় যে, আমাদের কাছে কুরআনের বর্তমান যে পান্ডুলিপি রয়েছে, সেটা উসমান রা. লিপিবদ্ধ করেছেন। যদিও সব কেরাতই শুদ্ধ এবং সঠিক ছিল। তবে এর মধ্যে কেরাতে সাবআ বা সাত কেরাতই অধিক প্রসিদ্ধ। এ প্রঙ্গে অন্য একদিন আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

হজরত উসমান রা.-কে যদিও জামিউল কুরআন বা কুরআন সংরক্ষণকারী বলা হয়, তবে এই সংরক্ষণকাজে হজরত আবু বকর, উমর ও জায়েদ রা.-এর অবদান কম নয়। এ জন্য প্রশ্ন জাগতে পারে, উমরের প্রস্তাবে আবু বকরের নির্দেশে আর জায়েদের কাজের মাধ্যমে এই কুরআন সংরক্ষণ হলো, তাহলে শুধু উসমান রা. কীভাবে জামিউল কুরআন হলেন? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, আমরা সকলেই জানি, কাবাঘর নির্মাণ করেছেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। কিন্তু ইবরাহিম আলাইহিস সালামই কি শুধু কাবাঘর নির্মাণ করেছেন?

না, এ কাজে আরও অনেকে জড়িত ছিলেন। তবে দুনিয়াবাসী ইবরাহিম-এর কথাই জানে। অথচ সর্বপ্রথম এর নির্মাণ করেছেন ফেরেশতাগণ। এটা মূলত নিয়তেরই ফল। এ জন্য আল্লাহ পাকের খাস দয়া পাবার জন্য সব কাজে প্রথমে আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে হবে।

নবিজি বলেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ নিয়তের উপর সব কাজ নির্ভরশীল।

রাসুল আরও বলেন,
لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشُّرْبِ শুধু খাবার খাওয়া ও পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম নয়।

অন্য বর্ণনায় রাসুল সা. ইরশাদ করেন, রোজা ঢাল স্বরূপ, তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন অশ্লীল কাজ না করে, হইচই না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে কেউ যদি ঝগড়া করতে আসে, তাহলে সে যেন বলে, 'ইন্নি সাইম' বা 'আমি তো রোজাদার'।

হজরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন, রোজা রেখে গালাগাল করো না, কেউ যদি তোমাকে গালি দেয়, তাহলে তুমি বলো, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।

আরেক বর্ণনায় রাসুল সা. ইরশাদ করেন, অনেক রোজাদার এমন আছে, যার রোজা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া কোনো ফায়দা হয় না।

এ জন্য আমাদেরকে সঠিক সহিহ নিয়ত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় রোজা রাখতে হবে।

এতক্ষণের আলোচনার মাধ্যমে আমরা কুরআন সংরক্ষণ ও সংকলন সম্পর্কে জানতে পারলাম। এ ছাড়া এই কুরআন কীভাবে বিশুদ্ধ সূত্রে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সেটাও জানতে পারলাম। আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে হজরত জিবরিল আ., হজরত জিবরিল আ. থেকে রাসুল , আর রাসুল থেকে এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হজরাত সাহাবায়ে কেরাম রা. লাভ করেছেন। আর সাহাবিগণ হলেন কুরআনের মাধ্যমে প্রকৃত হিদায়ত লাভকারী। তাঁরা হলেন সত্যের মাপকাঠি।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 সাহাবীগণ সত্যের মাপকাঠি

📄 সাহাবীগণ সত্যের মাপকাঠি


ইমানের ব্যাপারে সাহাবিগণ হলেন সত্যের মাপকাঠি। সাহাবিদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا তোমরা যদি তাদের মতো (অর্থাৎ সাহাবিদের মতো) ঈমান আনতে পারো, তাহলে হিদায়ত পেয়ে যাবে। [সুরা বাকারা: ১৩৭]

তাহলে বোঝা গেল, ঈমানের ক্ষেত্রে সাহাবিদের ঈমান হলো আসল-নকল যাচাইয়ের মাপকাঠি। এখন যাদের ঈমান সাহাবিদের ঈমানের সাথে মিলবে, তারাই সঠিক ঈমানদার; আর যাদের ঈমান সাহাবার ঈমানের সাথে মিলবে না, তারা কোনো অবস্থাতেই সঠিক ঈমানদার হতে পারে না।

এ ছাড়া সাহাবিগণ আমলের ব্যাপারেও মাপকাঠি ছিলেন। এর দলিল হচ্ছে, কুরআন বলেছে,

وَالسّٰبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের আনুগত্য করেছে, আল্লাহ সে-সকল লোকের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। [সুরা তাওবা : ১০০]

যাদের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট, নিঃসন্দেহে তাদের আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। সুতরাং তাদের আমলই অন্যদের জন্য আমলের মাপকাঠি হতে পারে।

কুরআন যেহেতু সাহাবিদের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাই এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কেননা, কোনো হাদিস আমাদের পর্যন্ত সঠিক সনদে পৌঁছার ক্ষেত্রে বলা হয় অমুক অমুক থেকে, তিনি অমুক থেকে, তিনি অমুক সাহাবি থেকে; আর সাহাবি রাসুল থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কুরআনের ক্ষেত্রে এমনটা নেই। কুরআনের বর্ণনাসূত্র হচ্ছে, আল্লাহ>জিবরিল>রাসুল>> সাহাবিগণ। সাহাবিদের থেকেই আমরা কুরআন পেয়েছি। সাহাবিদের সত্যতা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা এই কুরআন থেকে প্রকৃত হিদায়তলাভকারী। এ ছাড়া তাঁদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অনেক আয়াত নাজিল করেছেন। যেমন:

رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ তারা আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট আর আল্লাহও তাদের উপর সন্তুষ্ট। [সুরা তাওবা: ১০০]

أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ তারাই হলো প্রকৃত সফল। [সুরা বাকারা: ৫]

أُولَئِكَ هُمُ الصُّدِقُونَ তারাই হলো প্রকৃত সত্যবাদী। [সুরা হুজুরাত : ১৫]

أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ তারাই হলো প্রকৃত মুত্তাকি। [সুরা জুমার: ৩৩]

সুতরাং, নিজের ঈমান ও আমল সঠিক কি না, এটা যাচাই করার একমাত্র মাধ্যম হলো নিজের ঈমান ও আমলকে সাহাবিদের ঈমান ও আমলের সাথে যাচাই করে দেখা। যদি তাঁদের সাথে মিলে, তাহলে ঠিকাছে; না মিললে বুঝতে হবে নিজের ঈমান ও আমলে ঝামেলা আছে। আর ঝামেলাযুক্ত ঈমান নিয়ে পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছা কঠিন।

কুরআন এবং তাওয়াতুর

উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তান সাহাবায়ে কেরাম আলাইহিম রিজওয়ানের মাধ্যমে কুরআনে কারিম তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তাওয়াতুর মানে প্রতিটি যুগে বর্ণনার ধারাবাহিকতা। সাধারণত তাওয়াতুর দুই প্রকার:

১. তাওয়াতুরে লফজি বা শাব্দিক ধারাবাহাকিকতা।
২. তাওয়াতুরে মা'নবি বা ভাবগত ধারাবাহিকতা।

তবে মুহাদ্দিসিনে কেরাম ব্যাপক গবেষণার পর তাওয়াতুরকে ৪ ভাগে বিভক্ত করেছেন। খাতামুল মুহাদ্দিসিন আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লিখেছেন, তাওয়াতুর ৪ প্রকার:

১. তাওয়াতুরে ইসনাদি। যেমন নবিজির ফরমান, من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা কথা বলবে (অর্থাৎ হাদিসের নামে এমন কথা বলবে, যে কথা আমি বলিনি), সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে ঠিক করে রাখে।

২. তাওয়াতুরে তবকাতি। যেমন কুরআনে কারিমের বর্ণনার ধারাবাহিকতা।

৩. তাওয়াতুরে নকল ওয়াল আমল ওয়াত তাওয়ারুস। যেমন কালিমা-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

৪. তাওয়াতুরে কদরে মুশতারাক। যেমন নবিজির মুজিজাসমূহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিয়ত পরিশুদ্ধ করার, কুরআন বোঝার, কুরআনচর্চা ও এর প্রকৃত মর্ম অনুধাবন তাওফিক দিন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 কুরআন কেন ফুরকান

📄 কুরআন কেন ফুরকান


মুহতারাম হাজিরিনে কেরাম।

কুরআন কীভাবে নাজিল হয়েছে এবং আমাদের পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছেছে, এ সম্পর্কে গতকাল আলোচনা করেছি। আজ আমরা কুরআনের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং কুরআনের পরিচয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

কুরআন শব্দটি মাসদার, আর মাসদারের দুইটি অর্থ থাকে। একটা হলো ফায়িলের অর্থ, আরেকটা মাফউলের। কুরআন শব্দটি যেহেতু মাসনাদ, তাই এর দুটি অর্থ। এই দুটি অর্থের দিক দিয়ে কুরআনকে কুরআন বলা হয়। এভাবে বললে বুঝতে সুবিধা হবে।

এককথায়, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হিদায়তের জন্য জিবরিল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াতের দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে যে কিতাব নাজিল হয়েছে, তার সমষ্টি হলো আল কুরআন।

কুরআন শব্দটি যদি قَرْنُ (মিলিত থাকা) থেকে আসে, তাহলে قرْءان শব্দের অর্থ হলো পরিপূর্ণভাবে মিলিত ও সংযুক্ত। যেহেতু কুরআন মাজিদের আয়াত, অর্থ ও বিষয়বস্তুর মাঝে পরিপূর্ণ মিল রয়েছে, তাই এর নাম الْقُرْآنُ ।

কুরআন কাকে কার সাথে মিলায় এবং কী কারণে তাকে কুরআন বলা হয়, এ সম্পর্কে তাফসিরের কিতাবে মুফাসসিরগণ লেখেন, আল্লাহ তাআলা যত আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন, সব কিতাবের ইলম বা সারনির্যাস এই কুরআনে রয়েছে। এ জন্য কুরআনকে কুরআন বলা হয়। কারণ, কুরআন অর্থ মিলানো, জমা করা, একত্র করা।

কুরআন কী মিলিত করে? জাবুর, তাওরাত, ইনজিলসহ আসমানি কিতাবসমূহে যত ইলম রয়েছে, সবই কুরআনে আছে। এ জন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ যদি কুরআন খতম করে, তাহলে যত আসমানি কিতাব রয়েছে, আল্লাহপাক তার এই খতমের বিনিময়ে সব আসমানি কিতাব খতমের সাওয়াব দেবেন। সুবহানাল্লাহ।

এ জন্য কুরআন অর্থ মিলিতকারী, একত্রিতকারী। কেননা, কুরআন সব ইলমকে একত্রিত করেছে। রয়িসুল মুফাসসিরিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাজিআল্লাহু আনহু বলেন,

جميع العلم في القرآن ولكن تقاصر عنه افهام الرجال
সমস্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার হলো আল-কুরআন; কিন্তু জ্ঞানীরা তা সম্পূর্ণ বুঝতে অক্ষম।

কুরআন কার সঙ্গে কাকে মিলিয়ে দেয়, এ সম্পর্কে মুফাসসিরগণ তাফসিরের কিতাবে লেখেন, কুরআন বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। ফলে এই কুরআন আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে মাধ্যম হয়ে বান্দাকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেবে, এবং জান্নাতেও মর্যাদা উন্নত হবে কুরআনের মানদণ্ডে। জান্নাতিদের লক্ষ করে বলা হবে,

اقرأ وارتق ورتل كما كنت ترتل في الدنيا فإن منزلتك عند آخر آية كنت تقرأها
কুরআন পড়ো, যেভাবে দুনিয়ায় থাকতে তাজবিদসহ কুরআন পড়তে এবং জান্নাতের উচ্চমর্যাদায় আরোহণ করো। তোমার তিলাওয়াত যেখানে উঠে শেষ হবে, সেখানেই হবে তোমার স্থান।

কুরআন শব্দের অর্থ হলো একত্রিতকারী। কুরআন বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলানোর জন্য আসল। শয়তান মানুষকে আল্লাহ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। শয়তান চায় মানুষকে আল্লাহ থেকে বিরত রাখতে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআন নাজিল করেছেন, যাতে মানুষ এই কুরআনের মাধ্যমে শয়তানকে লাথি মেরে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে। এ জন্য কুরআন তিলাওয়াতের শুরুতে শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা করে পড়তে হয়,

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

কুরআন পড়তে হলে প্রথমে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে কেন আশ্রয় চাইতে হয়? কারণ, কুরআন হচ্ছে বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলানোর মাধ্যম। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। সুতরাং প্রথমে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বিসমিল্লাহ পড়তে হয়। আশ্চর্যজনকভাবে এই বিসমিল্লাহ-এর 'বা' শব্দের অর্থও মিলানো।

প্রত্যেক কাজ শুরুর সময় রাসুল ﷺ বিসমিল্লাহ পড়ে (আল্লাহর নাম নিয়ে) শুরু করার কথা বলেছেন। তবে সব কাজ শুরুর আগে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ অর্থাৎ, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেননি। কিন্তু কুরআন তিলাওয়াতের আগে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন। এ সম্পর্কে কুরআনেই আল্লাহ বলেন,

فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَنِ الرَّحِيمِ
সুতরাং যখন তুমি কুরআন পড়বে, তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও। [সুরা নাহল: ৯৮]

কুরআনের এ বক্তব্য থেকে জানা যায়, শয়তান সব কাজেই বান্দাকে কুমন্ত্রণা দেয়। তবে কুরআন পড়ার সময় শয়তান সবচেয়ে বেশি কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। কুরআনের কথা যেন মানুষ বুঝতে না পারে, সে জন্য শয়তান সব রকম চেষ্টা চালায়। কেননা, মুসলমানরা কুরআন থেকে দূরে থাকলে শয়তান বেশি খুশি হয়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআন পড়ার সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেছেন। তাই আমাদের জন্য উচিত হলো, কুরআন জানা ও বোঝার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করা।

জীবনের গাইডলাইন

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম, কুরআনকে কুরআন এ জন্য বলা হয় যে, কুরআন বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। আর আমাদের জীবন পরিচালনায় একটা দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। আপনি যখন একটা মোবাইল কিনবেন, তখন সেটার সাথে একটা ব্যবহারবিধি থাকে, তাতে আপনি মোবাইল কীভাবে চালাবেন সেটা জানতে পারেন। তেমনিভাবে আপনি একটা গাড়ি কিনলেও সেটার সঙ্গে একটা নির্দেশনা থাকবে। নিয়ম মেনেই আপনি গাড়িটি চালাবেন। নিজের মতো করে চালালে হবে না; বরং গাইডলাইন মেনে চালাতে হবে, নাহয় বিপদ হতে পারে। তেমনিভাবে আপনার জীবন পরিচালনায়ও কুরআনকে জীবনবিধান হিশেবে গ্রহণ করতে হবে। হালাল-হারাম মেনে চলতে হবে। আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হবে, নাহয় আপনি সফল হতে পারবেন না। আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারবেন না। আর যদি মেনে চলেন, তাহলে সোজা জান্নাতে চলে যাবেন।

ধরুন, আপনি দেশের কোনো আইন অমান্য করলেন। বর্তমান প্রযুক্তির এ যুগে আপনি কিন্তু অপরাধ থেকে চাইলেও নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না, ধরা খাবেনই। এমনকি ঘরেও আপনার এই রিপোর্ট পৌঁছে যাবে। জরিমানা করা হবে। আপনি কখন কোথায় কী করেছেন, সব আপনার সামনে তুলে ধরা হয়। তো বিজ্ঞান যদি এসব করতে পারে, তাহলে আল্লাহ তো সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী, তিনি কী এসব পারবেন না? সুতরাং আল্লাহর পাকড়াও বড় কঠিন এবং কঠোর, রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হ্যাঁ, আপনি যদি তাঁর হুকুমমতো সব মেনে চলেন, তাহলে আপনি প্রকৃত মুমিন। আমরা যে এই আলোচনা শুনছি, আল্লাহ কি এসব দেখছেন না? অবশ্যই দেখছেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পঠিত কিতাব 'কুরআন'

এবার অন্য শব্দ নিয়ে আলোচনা করব। কুরআন শব্দটি যদি قراءة কিংবা قُرْآنُ থেকে উৎপন্ন হয়, তাহলে قُرْآنُ শব্দের অর্থ হয় অধিক পঠিত। কুরআনকে সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পাঠ করা হয়। কুরআনের যত হাফিজ আছে, অন্য কোনো বই বা কিতাবের এত হাফিজ নেই। এ জন্য বহুল পঠিত হিশেবে কুরআনকে কুরআন বলা হয়।

এ জন্য মক্কার কাফিররা বলাবলি করত,

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ
আর কাফিররা বলে, 'তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শুনো না; বরং এর আবৃত্তির কালে শোরগোল সৃষ্টি করো, যেন তোমরা জয়ী হতে পারো।' [সুরা হামীম সিজদা : ২৬]

নবিজি যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, মক্কার কাফির-মুশরিকরা তখন চ্যাঁচামেচি করত, তালি বাজাত, শিস দিত এবং চিৎকার করে কথা বলত, যাতে উপস্থিত জনগণের কানে কুরআনের আওয়াজ না পৌঁছে এবং তাদের অন্তর কুরআনের লালিত্যময় ভাষা ও তার চমৎকারিত্বে যেন প্রভাবিত না হয়ে পড়ে। এই ছিল কাফিরদের মনস্কামনা।

তাই আমরা বেশি বেশি কুরআন পড়ব এবং শুনব। কারণ, কুরআন শুনলেও লাভ, পড়লেও লাভ, কুরআনকে মুহাব্বাত করলেও লাভ।

কুরআনের সূচনা হয়েছে সুরা বাকারার প্রথম আয়াত—আলিফ-লাম-মীম দ্বারা। আর সুরা বাকারা থেকেই কুরআনের সূচনা হয়েছে এবং সুরা ফাতিহা হচ্ছে ভূমিকা। ফাতিহায় পুরো কুরআনের সারমর্ম তুলে ধরা হয়েছে।

আলিফ-লাম-মীমের অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, এর অর্থ যদি কেউ না জানে, তাহলে এটা নাজিল করার মানে কী? এই যে প্রশ্ন, এটা মূলত আকলের মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে আকলের পরিবর্তে আল্লাহর নির্দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। বলা যায়, এটা একটা পরীক্ষা। আমাদের ঈমানের পরীক্ষা। আকল বা বিবেকের চাহিদামতো চললে হবে না। আকলের চাহিদামতো চললে সেটা লালবাতি আর আল্লাহর বিধানমতো চললে সেটা হবে সবুজবাতি। সুতরাং আমাদেরকে সবুজবাতির অন্বেষণ করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা সারা দুনিয়ায় যত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, সবই মানুষের কল্যাণের জন্য। এ জন্য আপনাকে দুটি জিনিস মেনে চলতে হবে, তখন আপনি জান্নাতের অধিকারী হতে পারবেন। যেমন:

১. সৃষ্টি থেকে আল্লাহর বাতলানো পদ্ধতিতে ফায়দা হাসিল করা।
২. আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি সতর্ক খেয়াল রাখা। হাদিসে রাসুল বলেছেন, الدنيا خلقت لكم দুনিয়া তোমাদের ফায়দার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

তবে ফায়দা সেভাবে অর্জন করতে হবে, যেভাবে অর্জন করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। এ জন্য দরকার ইলম। আর এই জ্ঞান অর্জিত হয় তিনভাবে। একটা হলো, পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। একজন আওয়াজ দিল। সেই আওয়াজ মিষ্টি না কর্কশ, সেটা কান দিয়েই শ্রবণ করতে হয়, নাক দিয়ে নয়। কানের মাধ্যমেই সে বুঝতে পারছে এটা মানুষের আওয়াজ; অন্য কোনো প্রাণীর নয়। কান না থাকলে সে এটা বুঝতে পারবে না। এই আওয়াজ বোঝার জন্যই আল্লাহ তাকে কান দিয়েছেন। ফলে সে বুঝতে পারে, কোনটা কার আওয়াজ। বুঝতে পারে তার সন্তানের আওয়াজ, স্ত্রীর আওয়াজ, পিতার আওয়াজ, মায়ের আওয়াজ, বোনের আওয়াজ ইত্যাদি।

এই যে আওয়াজের জ্ঞান অর্জিত হলো, এটা কানের মাধ্যমেই। মানুষ যখন এটা বুঝতে পারে, তখন সে পাত্র অনুযায়ী ভিন্ন ধাঁচে কথা বলে। স্ত্রীর সঙ্গে একরকম, বোনের সাথে একরকম আর পিতার সাথে আরেক রকম কথা বলে।

আল্লাহ মানুষকে নাক দিয়েছেন সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ অনুভব করার জন্য। (এ জন্য আপনারা রমজানে বেশি করে আতর ব্যবহার করবেন।) এর মাধ্যমে সে বুঝতে পারে, কোনটা দুর্গন্ধ আর কোনটা সুগন্ধ। এমনিভাবে চোখ দ্বারা মানুষ কোনটা সাদা আর কালো বুঝতে পারে। আরেকটি হচ্ছে জিহ্বা, এটার মাধ্যমে তিতা না মিষ্টি সেটার জ্ঞান অর্জিত হয়। আরেকটি হচ্ছে ত্বক বা হাত। এটার মাধ্যমে ঠান্ডা-গরম বোঝা যায়।

এই হলো পঞ্চইন্দ্রিয়। এর বাইরে আরেকটা ইন্দ্রিয় আছে সেটা দেখতে পাওয়া যায় না, ধরাও যায় না। এটা বুঝতে হলে দরকার আকল বা জ্ঞানের। যেমন, আপনি একটা ছোট ছেলেকে দেখলেন। এখন আপনার মাথায় আসবে, এই ছেলের নিশ্চয় একজন মা-বাবা আছে। এই যে জ্ঞান, এটা পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি; বরং আক্কলের মাধ্যমে বোঝা গেছে。

এবার আকলের পাঠও শেষ। এর বাইরে আরেকটা জিনিস রয়েছে, যেখানে আকলও বিকল। সেখানে আকলের দরজা বন্ধ। আর যেখানে আকলের দরজা বন্ধ, সেখানেই ওহীর শুরু। সুতরাং আলিফ-লাম-মীম এটা বুঝতে হলে ওহীর দরকার। আলিফ-লাম- মীম এটা হলো ওহি এবং আল্লাহর কালাম, এটা মানতে হবে। প্রজ্ঞার চাহিদাও এটাই। এখন কেউ যদি এটা না মানে, তাহলে সে বোকা। কারণ মানার নাম কামিয়াবি, জানার নাম নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআনের ইলম জানা ও মানার তাওফিক দান করুন। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 আলিফ-লাম-মীম

📄 আলিফ-লাম-মীম


এবার আমরা আলিফ-লাম-মীম সম্পর্কে একটু আলোচনা করব। সূরা বাকারা শুরু হয়েছে আলিফ-লাম-মীম দ্বারা। ال-ম -এ হরফগুলোকে কুরআনের পরিভাষায় হুরুফে মুকাত্তাআত বলা হয়। মুকাত্তাআত মানে আলাদা আলাদা। যেহেতু এই হরফগুলোকে আলাদা আলাদা পড়তে হয়, এ জন্য এগুলোর নাম হুরুফে মুকাত্তাআত। ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে চলুন একটি হাদিস শুনি,

عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ : الَّمٌ حَرْفٌ وَلَكِنْ : أَلِفُ حَرْفٌ وَلَامُ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ

হাদিসের তরজমা এবং ব্যাখ্যা আমরা পরে জানব, তার আগে কিছু কথা বলা দরকার। কুরআনে কারিমের ২৯টি সুরার শুরুতে এ ধরনের হুরুফে মুকাত্তাআত ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সংখ্যা ১৪টি, যেগুলো একত্র করলে রূপটা দাঁড়ায় এমন- نص حکیم له سر قاطع। মানে হলো, প্রাজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে অকাট্য বাণী, যাতে তাঁর কোনো গোপন ভেদ রয়েছে। মূলত, এগুলো কতগুলো বিচ্ছিন্ন বর্ণ দ্বারা গঠিত এক-একটা বাক্য, যথা الم - حم - المص। এগুলোর প্রতিটাকে পৃথক পৃথকভাবে সাকিন করে পড়া হয়ে থাকে। তবে এগুলোর অর্থ এবং এসব আয়াত বর্ণনার রহস্য সম্পর্কে মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ কয়েকটি অভিমত নিচে তুলে ধরা হলো :

১. এগুলোর কোনো অর্থ নেই। কেবল আরবি বর্ণমালার হুরুফ হিশেবে পরিচিত।

২. এগুলোর অর্থ আছে কিনা, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা এগুলোর অর্থ সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমরা শুধু তিলাওয়াত করব।

৩. এগুলোর নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে, কারণ কুরআনের কোনো বিষয় বা কোনো আয়াত বা শব্দ অর্থহীনভাবে নাজিল হয়নি। তবে এগুলোর অর্থ শুধু আল্লাহই জানেন। আমরা শুধু এতটুকু বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর কুরআনের কোনো অংশ অনর্থক নাজিল করেননি।

৪. এগুলো মুতাশাবিহাত বা অস্পষ্ট বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। এ হিশেবে অধিকাংশ সাহাবি, তাবেয়ি এবং আলিমের মত হচ্ছে, হুরুফে মুকাত্তাআতগুলো এমন রহস্যপূর্ণ যে, এগুলোর প্রকৃত মর্ম ও মাহাত্ম্য একমাত্র আল্লাহ জানেন; কিন্তু মুতাশাবিহাত আয়াতসমূহের প্রকৃত অর্থ আল্লাহর কাছে থাকলেও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলিমগণ এগুলো থেকে হিদায়াত গ্রহণের জন্য এগুলোর বিভিন্ন অর্থ করেছেন। আবার অনেক মুফাসসির এগুলোকে সংশ্লিষ্ট সুরার নাম বলে অভিহিত করেছেন।

এভাবে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। তবে আমরা শুধু জেনে রাখব যে, এগুলো আল্লাহর কালাম এবং এর উপর বিশ্বাস রাখব।

মোটকথা, এসব শব্দ দ্বারা আমরা বিভিন্ন অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে হিদায়াত লাভ করতে পারি, যদিও এর মধ্যকার কোন অর্থ আল্লাহ তাআলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা জানি না। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআন থেকে হিদায়াত লাভ করা এ শব্দগুলোর অর্থ বোঝার উপর নির্ভরশীল নয়। অথবা এ হরফগুলোর অর্থ না বুঝলে যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমনটাও নয়। তাই এর অর্থ নিয়ে ব্যাকুল হয়ে অনুসন্ধান করার কোনো প্রয়োজন নেই।

তবে। এগুলোকে 'হুরুফে মুকাত্তাআত' (বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা) বলা হয়। এখানে 'আলিফ' একটি অক্ষর, 'লাম' একটি অক্ষর এবং 'মীম' একটি অক্ষর। প্রত্যেক অক্ষরে একটি করে নেকি হয়। আর একটি নেকির প্রতিদান ১০টি করে পাওয়া যায়। এ হিশেবে শব্দে ৩০টি নেকি লাভ হয়।

এখন শুরুতে আমি যে হাদিস পড়েছি, সেই হাদিসের মর্ম সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। হাদিসটি হচ্ছে,

عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ : المْ حَرْفٌ وَلَكِنْ : أَلِفُ حَرْفٌ وَلَامُ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজিদ)-এর একটি হরফ পাঠ করবে, তার একটি নেকি হবে। আর একটি নেকি ১০টি নেকির সমান হয়। আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ। (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকির সংখ্যা হবে ৩০।)

হাদিসে এ শব্দ এসেছে। এর মানে হলো বিরাট সাওয়াব। কেননা, আল্লাহ যেটা দেবেন, সেটা বিরাট মূল্যবান। উদাহরণত, আপনাকে যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোনো পুরস্কার দেয়, তখন আপনি নিজেকে যেমন অনেক গর্বিত মনে করে থাকেন। তেমনি আল্লাহ যদি কাউকে কোনো পুরস্কার বা সাওয়াব দেন, সেটার ক্ষেত্রে তো আমাদের গর্বের শেষ থাকার কথা নয়। কারণ, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না। আর আল্লাহ প্রতিটি অক্ষরে শুধু একটি নেকি দেবেন না; বরং এটাকে বৃদ্ধি করে ১০টি দেবেন। আর তা-ও এভাবে যে, আমরা যে আলিফ-লাম-মীম উচ্চারণ করি, এতে তিনটি অক্ষর রয়েছে। এর মাধ্যমে ৩০টি নেকি অর্জিত হবে। রাসুল বলেন, 'আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি বর্ণ; বরং আলিফ একটি বর্ণ, লাম একটি বর্ণ এবং মীম একটি বর্ণ। (অর্থাৎ, তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত 'আলিফ-লাম-মীম, যার নেকির সংখ্যা হবে ৩০।)'

এখন যারা এই প্রশ্ন উত্তাপন করে যে,। এটার তো কোনো অর্থ জানা যায় না, তাহলে আল্লাহ এটা নাজিল করলেন কেন? এর উত্তর হলো, এটা যে আল্লাহর কালাম এর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এটাকে হিদায়তের উপলক্ষ বানাতে হবে। এর অর্থ জানার পেছনে অযথা মেধা ব্যয় না করে বরং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করতে হবে। আর এটাই তাকওয়ার লক্ষণ।

আরেক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আমরা যখনই শব্দটি উচ্চারণ করব, সাথে সাথে আমাদের আমলনামায় ৯০টি নেকি জমা হয়ে যাবে। ৯০ নেকির ব্যাখ্যা হচ্ছে এমন,
• আলিফ (ألف) বানান করে লিখলে তিনটি হরফ লাগে আলিফ, লাম, ফা।
• লাম (لام) বানান করলে লাম, আলিফ, মীম।
• মীম (ميم) বানান মীম, ইয়া, মীম।

সুতরাং আলিফ-লাম-মীম-এর তিনটি হরফকে বানান করে লিখলে ৯টি হরফ আসে। ৯ কে ১০ দিয়ে গুণ দিলে ৯০ হয়।

সুতরাং আল্লাহ এমনিতেই নাজিল করেননি; বরং এটা পড়লেই সাওয়াব লাভ হয়। এ ছাড়া ছোট ছোট বাচ্চারা যখন কথা বলতে শিখে—আব্বা, আম্মা, চাচা ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করে—তখন সে জানে না, এসব শব্দের বানান কীভাবে গঠন করতে হয় বা এগুলোর অর্থ কী? শিশুরা যখন এসব জানে না, তাই বলে কি তাদের এসব শব্দের সম্বোধন বেকার? তাদের ডাকে আমরা সাড়া দিই না? অবশ্যই দেই। কেননা, সে শিশু।

আর শিশু যখন বড় হবে, মোটামুটি জ্ঞান লাভের যোগ্যতা অর্জন করবে, তখন তাকে অবশ্যই কোনো শিক্ষকের শরণাপন্ন হতে হবে। এটাই দুনিয়ার রীতি। তখন সে প্রতিটি অক্ষরকে পৃথক পৃথক উচ্চারণ করতে শিখে— যেমন: অ, আ, A, B, C, আলিফ, বা, তা, সা ইত্যাদি। তখন মানুষ বোঝে সে এগুলো কোনো শিক্ষক থেকে শিখেছে।

ঠিক তেমনি আমাদের নবিজি কুরআন পেয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরিল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে। তবে এই পৃথিবীতে কোনো মানুষ নবিজির শিক্ষক হতে পারেননি। তাঁর শিক্ষক স্বয়ং আল্লাহপাক। তিনিই তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাই আমাদের এটা মানতেই হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে। কেননা, এটা নবিজির নবুওয়াতেরও অন্যতম প্রমাণ। সুতরাং বোঝা গেল, বা কুরআনের যত জায়গায় এমন শব্দ রয়েছে, এগুলো অনর্থক নাজিল করা হয়নি। এটা হলো নবুওয়াতের দলিল। কারণ, এভাবে হরফ আলাদা আলাদাভাবে উচ্চারণ করা শিক্ষক ছাড়া একার পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ নবিজি উচ্চারণ করেছেন, আলিফ-লাম-মীম। তাহলে তাঁর শিক্ষক কে? এর উত্তর হলো, তাঁর শিক্ষক হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। আর আল্লাহ যাঁর শিক্ষক হন, তিনি হন নবি।

নবিগণের জন্য দুনিয়াতে যে কোনো শিক্ষক ছিলেন না, সেটার পক্ষে অনেক দলিল আছে। আমি আপনাদেরকে আপনাদের শোনা এবং পরিচিত একটি হাদিস শুনাই। আল মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইনের বর্ণনা। আল্লাহপাক আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর আদম যখন আল্লাহর নিষেধ ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেললেন এবং জান্নাত থেকে বাইরে আসতে হলো, তখন তিনি তাঁর সেই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে মাফ চাইতে থাকলেন। আদম আলাইহিস সালামের এক দুআ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে,

﴿رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرُ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ﴾
হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার নফসের উপর অত্যাচার করেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা এবং রহম না করেন, তাহলে অবশ্যই আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। [সুরা আরাফ: ২৩]

অন্য আরেকটি দুআ, যেটা বর্ণিত হয়েছে আল মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইনে, সেখানে বর্ণনাটি হলো এমন,
আদম আলাইহিস সালাম বললেন, হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের ওয়াসিলায় আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহ বললেন, আদম! তুমি মুহাম্মাদকে জানো কেমন করে? আমি তো তাকে এখনো (দুনিয়াতে) সৃষ্টিই করলাম না। আদম বললেন, হে আল্লাহ! আপনি যখন আমাকে সৃষ্টি করে আমার ভেতর আপনার পক্ষ থেকে রুহ দান করলেন, তখন আমি তাকালাম আপনার আরশের দিকে। তখন আমি আপনার আরশের খুঁটিতে লেখা দেখলাম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

আমাদের আলোচ্য পয়েন্ট হলো, আদম আলাইহিস সালাম তাঁকে সৃষ্টির পরপরই আরশের লেখা পড়ে ফেললেন কেমন করে? তিনি কি কোনো স্কুল বা মাদরাসায় ভর্তি হয়েছিলেন? বোঝা গেল, নবিগণ সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহর কুদরতে শিক্ষিত হয়েই পৃথিবিতে আসেন। তাই হুরুফে মুকাত্তাআত নবুওয়াতের দলিল হিশেবে প্রমাণিত হয়। নবিজি বলেন,

انما بعثت معلما علمني ربي
আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, । এর অর্থ কেউ জানেননি কেন? জবাব হলো, দরকার ছিল না। সাহাবিগণ নবিজির কাছে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারেননি কেন? উত্তর হলো, দরকার ছিল না। তবে এটা যে আল্লাহর কালাম, এ কথা বিশ্বাস করতে হবে এবং মানতে হবে। তবে। এর প্রকৃত অর্থ কেউ না জানলেও অনেকে এটার মর্ম জানার চেষ্টা করেছেন। যদিও এটা নিশ্চয়তার সঙ্গে নয়; বরং একটা ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাঁরা এমনটা করেছেন।

অনেকে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসের সূত্রে বলেছেন, ৷ এটা একটা সাংকেতিক চিহ্ন। যেমন, জিপিএস একটা সাংকেতিক চিহ্ন, একটা জিনিসের সংক্ষিপ্ত রূপ। জিপিএস বললেই আমরা বুঝে ফেলি বিষয়টা কী? অথচ আমাদের অনেকেই এটার পূর্ণরূপ জানি না, বা জানার দরকারও মনে করি না। জিপিএস মানে যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, এ কথা না জানার কারণে জিপিএস ফলো করে রাস্তা চলাচলে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না।

ঠিক তেমনি। একটি সাংকেতিক চিহ্ন। কেউ কেউ এটার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, ১-এর আলিফ দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন আল্লাহ, 'লাম' দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন লুতফ বা জিবরিল আলাইহিস সালাম; আর 'মীম' দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ । অর্থাৎ, এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরিলের মাধ্যমে মুহাম্মাদ-এর উপর নাজিল হয়েছে।

তবে কেউ কেউ বলেন, ১-এর প্রথম অক্ষর হলো 'আলিফ'। আর সুরা ফাতিহায় । امْدِنَا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ অর্থাৎ আমরা আল্লাহর কাছে সোজা জান্নাতে যাওয়ার দুআ করেছি। এ জন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেন, 'আমরা যেভাবে মুখে সোজা জান্নাতে যাওয়ার কথা বলি, ঠিক তেমনি আমাদের জীবনকেও আলিফের মতো সোজা বানাতে হবে।'

এখানে সাপকে আমরা উদাহরণ হিশেবে নিতে পারি। সাপ কখনো সোজা চলে না। এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ; কিন্তু এই সাপ যখন গর্তে প্রবেশ করে, তখন তাকে বাধ্য হয়ে সোজা হয়ে ঢুকতে হয়। এ জন্য আমরা যখন দুনিয়াতে এসেছি, তখন আমাদের মধ্যেও অনেক বক্রতা রয়েছে, অসংখ্য বাঁকা রাস্তা আমাদের সামনে রয়েছে। এসব বাঁকা রাস্তা থেকে আমরা নিজেকে কীভাবে রক্ষা করব এবং সোজা রাস্তার সন্ধান কীভাবে লাভ করব, নবিজি তাঁর সারাটি জীবনই এই সোজা পথের সন্ধান আমাদের দিয়ে গেছেন। এখন যারাই সোজা পথ অবলম্বন করবে, তারাই হলো চূড়ান্ত সফল।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সিরাতে মুসতাকিমের উপর অটল-অবিচল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px