📄 কুরআন সংরক্ষণ
মুহতারাম হাজিরিন।
আশা করি মূল আলোচনা আপনাদের মনে আছে। হজরত উমর খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর সিদ্দিককে কুরআন সংরক্ষণের প্রস্তাব করছিলেন এবং আবু বকর সেই প্রস্তাব এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যে, যে কাজ নবি করে যাননি, সেই কাজ করা আবু বকরের পক্ষে সম্ভব না।
উপরে বর্ণিত হজরত উমরের এসব গুণ আবু বকরের অজানা ছিল না। সেই সাথে উমরের ব্যাপারে যে নবিজি বলেছিলেন, ইন্নাল্লাহা জাআলাল হাক্কা আলা লিসানে উমরা ওয়া কালবিহ-অর্থাৎ আমার উমর যা বলে সেটাও হক, যা ভাবে সেটাও হক-আবু বকর এই হাদিসটিও জানতেন। তাই উমরের প্রস্তাবে প্রথমে তিনি না করে দিলেও একপর্যায়ে তাঁর অন্তরে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে আসে। আবু বকর তখন নিজেই বলেন, 'উমরের প্রস্তাবের পর আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর খুলে দিলেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আমিও ভাবতে থাকি।' এ ঘটনার বর্ণনা সম্পর্কে সহিহ বুখারি শরিফে হজরত জায়েদ রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে。
হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রা. বলেন,
ইয়ামামার যুদ্ধের পরপরই হজরত আবু বকর রা. আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি সেখানে গিয়ে দেখি উমরও সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। আবু বকর রা. আমাকে বললেন, উমর এসে আমাকে বলেছেন, 'ইমামার যুদ্ধে কুরআনে হাফিজদের একটি বড় অংশ শহিদ হয়ে গেছেন। এভাবে যদি বিভিন্ন স্থানে কুরআনের হাফিজরা শহিদ হতে থাকেন, তাহলে আমার আশঙ্কা হয়, কুরআনের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাবে। তাই আমার অভিমত হলো, আপনি কুরআন সংকলনের ব্যবস্থা করুন।' আমি তখন তাঁকে বললাম, 'যে কাজ রাসুল করেননি, সেই কাজ আমি কীভাবে করব?' জবাবে উমর বললেন, 'আল্লাহর কসম, এ কাজ উত্তম।' এরপর উমর বারবার আমাকে একই কথা বলতে লাগলেন। একপর্যায়ে এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর খুলে দিলেন। এখন উমরের অভিমত যা, আমার অভিমতও তা।'
(হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত বলেন) এরপর হজরত আবু বকর আমাকে বললেন, 'তুমি বিচক্ষণ যুবক, তোমার ব্যাপারে আমাদের কোনো খারাপ ধারণা নেই। রাসুল -এর জীবদ্দশায় তুমি ওহি লেখার কাজ করতে। তাই তুমিই কুরআনের আয়াতগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো একত্র করো।' হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত বলেন, 'আল্লাহর কসম, তাঁরা যদি আমাকে কোনো পাহাড় আপন স্থান থেকে সরানোর আদেশ দিতেন, তাহলেও আমার কাছে এত কঠিন মনে হতো না, যতটা কঠিন মনে হয়েছে কুরআন সংকলনের দায়িত্ব পালনের নির্দেশটি।' আমি বললাম, 'আপনারা এমন কাজ কীভাবে করবেন, যা রাসুল করেননি?' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহর কসম, এ কাজে মঙ্গল রয়েছে।' এরপর আবু বকর আমাকে বারবার তা বলতে লাগলেন। একপর্যায়ে এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিলেন, যে বিষয়ে বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন আবু বকর ও উমর রাজিআল্লাহু আনহুমার।
অতঃপর আমি কুরআনের আয়াত অনুসন্ধান করতে লাগলাম। কুরআনের আয়াতগুলো খেজুরের ডাল, পাথরের তখতি এবং মানুষের হৃদয় থেকে খুঁজে খুঁজে আমি একত্র করলাম। সুরা তাওবার শেষ আয়াত আবু খুজাইমা আনসারি রা.-এর কাছে পেলাম, অন্যদের কাছে (লিখিতভাবে) তা আমি পাইনি।' তবে নিঃসন্দেহে সে আয়াতটি হাফিজ সাহাবিদের মুখস্থ ছিল এবং সেটি 'মুতাওয়াতির' বর্ণনা দ্বারাও কুরআনের আয়াত হওয়া প্রমাণিত।
এভাবে হজরত উমরের প্রস্তাবে ও আবু বকর রা.-এর মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কুরআন সংরক্ষণ করা হয় এবং আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে।
📄 কুরআন সংকলন-পদ্ধতি
হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রা. নিজে কুরআনের হাফিজ হওয়া সত্ত্বেও এককভাবে কুরআন সংকলনের গুরুদায়িত্বটি আঞ্জাম দেননি; বরং তিনি চারটি পদ্ধতিতে কুরআন সংকলন করার কাজ শুরু করলেন :
১. কোনো আয়াত পাওয়া গেলে প্রথমে তা নিজের হিফজ ও মুখস্থের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন।
২. হজরত উমরও হাফিজ ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনিও আবু বকর রা.-এর নির্দেশে হজরত জায়েদকে সহযোগিতা করতেন।
৩. কোনো আয়াত ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করা হতো না, যতক্ষণ-না দুজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দিতেন যে, এ আয়াত রাসুল -এর সামনে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে অথবা সেগুলো রাসুল -এর মৃত্যুর আগে তাঁর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুরা তাওবার শেষ আয়াতটি যখন কেবল হজরত খুজাইমা রা.-এর কাছে পাওয়া গেল, তখন এ সূত্রে সেটিকে গ্রহণ করা হয় যে, জীবদ্দশায় রাসুল হজরত খুজাইমার একার সাক্ষ্যকে দুজনের সাক্ষ্যের সমতুল্য ঘোষণা করে গেছেন।
ঘটনাটি ছিল এমন, একবার নবিজি এক ইহুদির কাছ থেকে কিছু টাকা হাওলাত নিয়েছিলেন। টাকাগুলো যথাসময়ে ফেরতও দিয়েছিলেন। তারপর সেই ইহুদি আবার এসে টাকা চাইল। সে বলল, আপনি যে আমার টাকা ফেরত দিয়েছেন, প্রমাণ কী? সাক্ষী কই? ইহুদি নবির উপর ঈমান না আনলেও, কালিমা না পড়লেও সে জানত নবি মিথ্যা সাক্ষী দাঁড় করাবেন না। এখন নবিজির কাছে তো সাক্ষী নেই।
কথা চলছে; ঠিক সেই মুহূর্তে হজরত খুজাইমা রাজিআল্লাহু আনহু সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন ঘটনা কী? নবিজি বললেন, আমি তার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার এনেছিলাম। তার টাকা আমি ফেরতও দিয়ে দিয়েছি। এখন সে বলছে, আমি যে তার টাকা ফেরত দিয়েছি, সেটার সাক্ষী উপস্থাপন করতে, অথবা আবারও টাকা দিতে। হজরত খুজাইমা ইহুদিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি সাক্ষী দিচ্ছি নবিজি তোর টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছেন। এখন যা, ভাগ।
খুজাইমা সাক্ষী দেওয়ার পর ইহুদি সেখান থেকে পালালো। সে চলে যাওয়ার পর নবিজি বললেন, খুজাইমা! এটা তুমি কী করলে? তুমি কীভাবে সাক্ষী দিলে? আমি টাকা ফেরত দেওয়ার সময় তুমি তো উপস্থিত ছিলে না। তাহলে কেমন করে সাক্ষী দিলে?
হজরত খুজাইমা বললেন, ওগো আল্লাহর নবি! আল্লাহকে দেখি নাই। আপনি বলেছেন আল্লাহ আছেন, বিশ্বাস করেছি। কবর-হাশর-পুলসিরাত দেখি নাই। আপনি বলেছেন আছে, বিশ্বাস করেছি। জান্নাত-জাহান্নাম দেখি নাই। আপনি বলেছেন আছে, বিশ্বাস করেছি। আর সামান্য কয়েকটা টাকা, আপনি বলছেন দিয়ে দিয়েছেন, এ কথা বিশ্বাস করার জন্য আমাকে উপস্থিত থাকতে হবে কেন? আপনি বলেছেন, এটাই আমার সাক্ষী দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
নবিজি খুশি হলেন। খুশি হয়ে ঘোষণা করলেন, ইসলামে দুজন সাক্ষী লাগে, তবে আজ আমি ঘোষণা করছি, বাকি সবার বেলায় দুইজন হলে দুই সাক্ষী, আর আমার খুজাইমা একাই দুই সাক্ষীর সমান হবে। কোনো ব্যাপারে অন্য কেউ সাক্ষী দিলে দুইজন মিলে দিতে হবে; কিন্তু খুজাইমা সাক্ষী দিলে খুজাইমার একার সাক্ষীই যথেষ্ট হবে।
৪. অবশেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে আয়াতগুলোর সমষ্টিকে বিভিন্ন সাহাবির ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত কুরআনের পান্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হতো। এভাবে কঠিন এই শর্তগুলো মেনে কুরআন সংরক্ষণের কাজ আঞ্জাম দেওয়া হয়।
📄 আবু বকর সংকলিত কুরআনের বৈশিষ্ট্য
আবু বকর সিদ্দিক রাজিআল্লাহু আনহু সংকলিত কুরআনকে পরিভাষায় 'উম্ম' বা আদি কুরআন বলা হয়। কেননা এটিই প্রথম লিখিত সুবিন্যস্ত কুরআন। এর বৈশিষ্ট্য ছিল, কপিটি রাসুল কর্তৃক বর্ণিত ধারাক্রম অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছিল। সুরা গুলো আলাদা করা ছিল, তবে সুরার ক্রমধারা নির্ধারণ করা ছিল না। কপিটি সাত হরফ বা সাত কেরাতে লেখা হয়েছিল। কুরআনের এ কপিটি হিরার হস্তাক্ষরে লেখা হয়। তাতে কেবল সেসব আয়াতই লেখা হয়েছিল, যেগুলোর তিলাওয়াত রহিত হয়নি। এই সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল একটি সুবিন্যস্ত ও গ্রন্থিত কুরআনের কপি তৈরি করা, যাতে প্রয়োজনের সময় এর দ্বারস্থ হওয়া যায়। এটি ১৩ হিজরিতে শুরু হয়ে পূর্ণ এক বছর, মতান্তরে দুই বছরে সমাপ্ত হয়। মোটকথা, কুরআন সংরক্ষণের এই কাজে মূলত ৪ জনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁরা হলেন আবু বকর, উমর, উসমান ও জায়েদ রাজিআল্লাহু আনহুম আজমাইন。
হজরত আবু বকরের সংকলিত কুরআনটি তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিল। এরপর সেটি আসে হজরত উমরের কাছে। উমরের শাহাদাতের পর তাঁর অসিয়ত মোতাবিক কুরআনের এই কপিটি রাসুল -এর স্ত্রী, উমর-কন্যা হাফসা রা.-এর কাছে চলে যায়। মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাঁর রাজত্বকালে কুরআনের এই কপিটি চাইলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানান। হাফসা রা.-এর ইনতিকালের পর মারওয়ান কপিটি হজরত ইবনু উমর রা.-এর কাছ থেকে নিয়ে যান। অতঃপর তিনি এ চিন্তা করে সেটি জ্বালিয়ে দেন যে, উসমান রা.-এর খিলাফতকালে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তুতকৃত কপির সঙ্গে এর কেরাতের পার্থক্যের কারণে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কেননা, উসমান রা. সাত কেরাতের পরিবর্তে এক কেরাত, আঞ্চলিক একাধিক ভাষার পরিবর্তে প্রমিত এক ভাষায় সে কুরআনটি সংকলন করেছেন।
ভাষার ভিন্নতা একটা বড় ব্যাপার। যেভাবে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ভাষা এবং সিলেটের ভাষা শুদ্ধ বাংলার সঙ্গে মিল নেই, তেমনি আরবি ভাষায় অঞ্চলভেদে ভাষার উচ্চারণ ও লিখিত রূপে তারতম্য রয়েছে। এ চিন্তা থেকেই উম্মাহকে কুরআনের উচ্চারণ এক কেরাতে নিয়ে আসতে উসমান রা. প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজটি আঞ্জাম দেন। এর মাধ্যমে তিনি উম্মাহকে বড় এক ফিতনা থেকে রক্ষা করেছেন। যদি তখনকার সব মাসহাফ বা পান্ডুলিপি তিনি রেখে দিতেন, তাহলে একেকজন একেক কেরাতে তিলাওয়াত করত এবং একজন অন্যজনকে ভুল আখ্যা দিত। যেহেতু সব মানুষের মেধা ও জ্ঞান সমান নয়, তাই এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হতো। ফলে মাত্র একটি পান্ডুলিপি রেখে বাকিগুলো তিনি জ্বালিয়ে দেন এবং ঘোষণা দেন যে, যদি কারও কাছে সেসব পাণ্ডুলিপির কোনোটি সংরক্ষণে থাকে, তাহলে সেটা জমা দিতে হবে অথবা জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিতে হবে। নাহয় তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
তাঁর এমন ঘোষণার ফলে অন্যান্য মাসহাফ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে যে মাসহাফ রয়েছে, সেটা উসমান রা.-এর সেই মাসহাফ। এটাকে 'মাসহাফে উসমানি' এ জন্য বলা হয় যে, আমাদের কাছে কুরআনের বর্তমান যে পান্ডুলিপি রয়েছে, সেটা উসমান রা. লিপিবদ্ধ করেছেন। যদিও সব কেরাতই শুদ্ধ এবং সঠিক ছিল। তবে এর মধ্যে কেরাতে সাবআ বা সাত কেরাতই অধিক প্রসিদ্ধ। এ প্রঙ্গে অন্য একদিন আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
হজরত উসমান রা.-কে যদিও জামিউল কুরআন বা কুরআন সংরক্ষণকারী বলা হয়, তবে এই সংরক্ষণকাজে হজরত আবু বকর, উমর ও জায়েদ রা.-এর অবদান কম নয়। এ জন্য প্রশ্ন জাগতে পারে, উমরের প্রস্তাবে আবু বকরের নির্দেশে আর জায়েদের কাজের মাধ্যমে এই কুরআন সংরক্ষণ হলো, তাহলে শুধু উসমান রা. কীভাবে জামিউল কুরআন হলেন? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, আমরা সকলেই জানি, কাবাঘর নির্মাণ করেছেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। কিন্তু ইবরাহিম আলাইহিস সালামই কি শুধু কাবাঘর নির্মাণ করেছেন?
না, এ কাজে আরও অনেকে জড়িত ছিলেন। তবে দুনিয়াবাসী ইবরাহিম-এর কথাই জানে। অথচ সর্বপ্রথম এর নির্মাণ করেছেন ফেরেশতাগণ। এটা মূলত নিয়তেরই ফল। এ জন্য আল্লাহ পাকের খাস দয়া পাবার জন্য সব কাজে প্রথমে আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে হবে।
নবিজি বলেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ নিয়তের উপর সব কাজ নির্ভরশীল।
রাসুল আরও বলেন,
لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشُّرْبِ শুধু খাবার খাওয়া ও পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম নয়।
অন্য বর্ণনায় রাসুল সা. ইরশাদ করেন, রোজা ঢাল স্বরূপ, তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন অশ্লীল কাজ না করে, হইচই না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে কেউ যদি ঝগড়া করতে আসে, তাহলে সে যেন বলে, 'ইন্নি সাইম' বা 'আমি তো রোজাদার'।
হজরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন, রোজা রেখে গালাগাল করো না, কেউ যদি তোমাকে গালি দেয়, তাহলে তুমি বলো, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।
আরেক বর্ণনায় রাসুল সা. ইরশাদ করেন, অনেক রোজাদার এমন আছে, যার রোজা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া কোনো ফায়দা হয় না।
এ জন্য আমাদেরকে সঠিক সহিহ নিয়ত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় রোজা রাখতে হবে।
এতক্ষণের আলোচনার মাধ্যমে আমরা কুরআন সংরক্ষণ ও সংকলন সম্পর্কে জানতে পারলাম। এ ছাড়া এই কুরআন কীভাবে বিশুদ্ধ সূত্রে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সেটাও জানতে পারলাম। আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে হজরত জিবরিল আ., হজরত জিবরিল আ. থেকে রাসুল , আর রাসুল থেকে এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হজরাত সাহাবায়ে কেরাম রা. লাভ করেছেন। আর সাহাবিগণ হলেন কুরআনের মাধ্যমে প্রকৃত হিদায়ত লাভকারী। তাঁরা হলেন সত্যের মাপকাঠি।
📄 সাহাবীগণ সত্যের মাপকাঠি
ইমানের ব্যাপারে সাহাবিগণ হলেন সত্যের মাপকাঠি। সাহাবিদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا তোমরা যদি তাদের মতো (অর্থাৎ সাহাবিদের মতো) ঈমান আনতে পারো, তাহলে হিদায়ত পেয়ে যাবে। [সুরা বাকারা: ১৩৭]
তাহলে বোঝা গেল, ঈমানের ক্ষেত্রে সাহাবিদের ঈমান হলো আসল-নকল যাচাইয়ের মাপকাঠি। এখন যাদের ঈমান সাহাবিদের ঈমানের সাথে মিলবে, তারাই সঠিক ঈমানদার; আর যাদের ঈমান সাহাবার ঈমানের সাথে মিলবে না, তারা কোনো অবস্থাতেই সঠিক ঈমানদার হতে পারে না।
এ ছাড়া সাহাবিগণ আমলের ব্যাপারেও মাপকাঠি ছিলেন। এর দলিল হচ্ছে, কুরআন বলেছে,
وَالسّٰبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের আনুগত্য করেছে, আল্লাহ সে-সকল লোকের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। [সুরা তাওবা : ১০০]
যাদের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট, নিঃসন্দেহে তাদের আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। সুতরাং তাদের আমলই অন্যদের জন্য আমলের মাপকাঠি হতে পারে।
কুরআন যেহেতু সাহাবিদের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাই এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কেননা, কোনো হাদিস আমাদের পর্যন্ত সঠিক সনদে পৌঁছার ক্ষেত্রে বলা হয় অমুক অমুক থেকে, তিনি অমুক থেকে, তিনি অমুক সাহাবি থেকে; আর সাহাবি রাসুল থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কুরআনের ক্ষেত্রে এমনটা নেই। কুরআনের বর্ণনাসূত্র হচ্ছে, আল্লাহ>জিবরিল>রাসুল>> সাহাবিগণ। সাহাবিদের থেকেই আমরা কুরআন পেয়েছি। সাহাবিদের সত্যতা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা এই কুরআন থেকে প্রকৃত হিদায়তলাভকারী। এ ছাড়া তাঁদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অনেক আয়াত নাজিল করেছেন। যেমন:
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ তারা আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট আর আল্লাহও তাদের উপর সন্তুষ্ট। [সুরা তাওবা: ১০০]
أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ তারাই হলো প্রকৃত সফল। [সুরা বাকারা: ৫]
أُولَئِكَ هُمُ الصُّدِقُونَ তারাই হলো প্রকৃত সত্যবাদী। [সুরা হুজুরাত : ১৫]
أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ তারাই হলো প্রকৃত মুত্তাকি। [সুরা জুমার: ৩৩]
সুতরাং, নিজের ঈমান ও আমল সঠিক কি না, এটা যাচাই করার একমাত্র মাধ্যম হলো নিজের ঈমান ও আমলকে সাহাবিদের ঈমান ও আমলের সাথে যাচাই করে দেখা। যদি তাঁদের সাথে মিলে, তাহলে ঠিকাছে; না মিললে বুঝতে হবে নিজের ঈমান ও আমলে ঝামেলা আছে। আর ঝামেলাযুক্ত ঈমান নিয়ে পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছা কঠিন।
কুরআন এবং তাওয়াতুর
উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তান সাহাবায়ে কেরাম আলাইহিম রিজওয়ানের মাধ্যমে কুরআনে কারিম তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তাওয়াতুর মানে প্রতিটি যুগে বর্ণনার ধারাবাহিকতা। সাধারণত তাওয়াতুর দুই প্রকার:
১. তাওয়াতুরে লফজি বা শাব্দিক ধারাবাহাকিকতা।
২. তাওয়াতুরে মা'নবি বা ভাবগত ধারাবাহিকতা।
তবে মুহাদ্দিসিনে কেরাম ব্যাপক গবেষণার পর তাওয়াতুরকে ৪ ভাগে বিভক্ত করেছেন। খাতামুল মুহাদ্দিসিন আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লিখেছেন, তাওয়াতুর ৪ প্রকার:
১. তাওয়াতুরে ইসনাদি। যেমন নবিজির ফরমান, من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা কথা বলবে (অর্থাৎ হাদিসের নামে এমন কথা বলবে, যে কথা আমি বলিনি), সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে ঠিক করে রাখে।
২. তাওয়াতুরে তবকাতি। যেমন কুরআনে কারিমের বর্ণনার ধারাবাহিকতা।
৩. তাওয়াতুরে নকল ওয়াল আমল ওয়াত তাওয়ারুস। যেমন কালিমা-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
৪. তাওয়াতুরে কদরে মুশতারাক। যেমন নবিজির মুজিজাসমূহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিয়ত পরিশুদ্ধ করার, কুরআন বোঝার, কুরআনচর্চা ও এর প্রকৃত মর্ম অনুধাবন তাওফিক দিন। আমিন।