📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 কুরআনের নামসমূহ

📄 কুরআনের নামসমূহ


সম্মানিত উপস্থিতি!

আজ আমরা আলোচনা করব কুরআনের নাম কতটি ও কি কি—ইত্যাদি সম্পর্কে।

কুরআনুল কারিমের নাম ও বিশেষণের সংখ্যাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়। ইমাম জারকাশি রাহ.-এর মতে, কুরআনের গুণবাচক নামের সংখ্যা প্রায় ৯৯টি। আল্লামা সুয়ুতি রাহ. কুরআনের ৫৫টি নাম উল্লেখ করেছেন। মুফতি তাকি উসমানি দা.বা. কুরআনের নাম ৯০টির বেশি বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি কুরআনের প্রকৃত নাম পাঁচটি ছাড়া অন্যগুলোকে তার বিশেষণ হিশেবে উল্লেখ করেছেন।

ইমাম জারকাশি রাহ. বলেন, কুরআনের নাম-সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণ হলো, কুরআনের গুণবাচক নামগুলোকে মূল নামে আখ্যা দেওয়া। এর ফলে নামের সংখ্যা এত অধিক হয়েছে। অন্যথায় বিশুদ্ধ বর্ণনামতে কুরআনের নাম পাঁচটি। সেগুলো হলো,
১. কুরআন। আল্লাহ বলেছেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ

২. ফুরকান। আল্লাহ বলেছেন,

هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

৩. কিতাব। আল্লাহ বলেছেন,

ذَلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ

৪. জিকর। আল্লাহ বলেছেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحْفِظُونَ

৫. তানজিল। আল্লাহ বলেছেন,

تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَلَمِينَ

এখন কুরআন 'কুরআন' নামে প্রসিদ্ধ কেন, এ ব্যাপারে আপনাদের জানতে হবে। হাদিস শরিফে 'কিতাব' নামও এসেছে। রাসুল বলেছেন,

تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা এই দুটিকে আঁকড়ে ধরবে, ততক্ষণ তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। (যত ঝড়-সাইক্লোন বা বিপদ আসুক, তাতে তোমরা বিভ্রান্ত হবে না। আর তা হচ্ছে) আল্লাহ তাআলার কিতাব ও আল্লাহর নবির (তথা আমার) সুন্নাহ।

কেউ যদি কুরআন ও সুন্নাহকে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে, কুরআন ও সুন্নাহর রঙে রাঙাতে পারে নিজের জীবন, তাহলে মৃত্যুর পর জান্নাতই হবে তার ঠিকানা। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহপাক তখন তাকে সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দান করবেন।

কুরআনে কারিম নবিজির কাছে কীভাবে অবতীর্ণ হলো, এ সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন। কুরআন যে আল্লাহর কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছল, কার মাধ্যমে এল, সেটা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। কুরআনে কারিম যে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল-এর কাছে এসেছে, সেটা তো আমরা জানি; কিন্তু মধ্যখানে নবিজি থেকে আমাদের পর্যন্ত যে হাজার বছরের ব্যবধান, এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান পাড়ি দিয়ে আমাদের পর্যন্ত কীভাবে এসে পৌঁছল?

এর উত্তর হবে সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে। কেননা, সাহাবিগণ সরাসরি নবিজির কাছ থেকে কুরআন শুনেছেন, আমল করেছেন, হিফজ তথা সংরক্ষণ করেছেন। তার মানে আমরা কুরআন পেয়েছি সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে। তারা বিশ্বস্ততার সাথে কুরআন সংরক্ষণ করেছেন। লিখে রেখেছেন। কিতাব আকারে মলাটবন্দী করেছেন। তবেই আমরা কুরআন পেয়েছি。

সাহাবায়ে কেরামের বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত। তাদের আমানতদারী সন্দেহাতীত। আল্লাহপাক তাদের মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষণ করাবেন বলেই তাদেরকে সকল প্রকার গুনাহ-খাতা থেকে পাকসাফ করে নিয়েছেন। মানুষ হিশেবে মাঝেমধ্যে তারা গুনাহ করে ফেললেও আল্লাহপাক তাদের অন্তরে এমনভাবে গুনাহর ভয় সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যেন সাথে সাথে তারা তাওবাহ করে নেন। কারণ, আল্লাহপাক তাদের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহ সংরক্ষণের কাজ নেবেন, এ জন্য তাদেরকে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করা দরকার ছিল।

সাহাবায়ে কেরাম যে তাওবার মাধ্যমে পবিত্র ছিলেন, তারা যে মাহফুজ ও মাগফুর ছিলেন, এর প্রমাণ কুরআনে কারিমের একাধিক স্থানে বিবৃত হয়েছে। আল্লাহপাক সকল সাহাবির উপর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাজিয়াল্লাহু আনহুম। তাদের সকলের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, কুল্লাউ ওয়াদাল্লাহুল হুসনা।

আল কুরআন বিশ্বের বিস্ময়কর গ্রন্থ। এটি সর্বাধিক প্রশংসিত মহা প্রজ্ঞাময় রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নবি হজরত মুহাম্মদ -এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। বিশ্বজনীন এ গ্রন্থের আবেদন ও উপযোগিতা সব যুগে এবং সব স্থানেই কার্যকর। কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ গ্রন্থ দুই বার নাজিল হয়েছে। প্রথমবার পুরো কুরআনের আয়াত প্রথম আসমানে 'বায়তুল ইজ্জতে' এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা উপলক্ষে, যুগ-জিজ্ঞাসার জবাবে নাজিল হয়েছে।

কুদরতি নিয়মে হাজার বছর ধরে অত্যন্ত বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় এ গ্রন্থকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লিখে রাখার পাশাপাশি হাজার বছর ধরে হৃদয় থেকে হৃদয়ে একে ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুরআনের লাখো হাফিজ বা মুখস্থকারী রয়েছেন। মানবেতিহাসে আর কোনো গ্রন্থের এত হাফিজ নেই।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস

📄 কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস


যেহেতু পূর্ণ কুরআন একসঙ্গে নাজিল হয়নি; বরং কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বিশেষ প্রয়োজনীয়তা ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে, তাই রাসুল -এর যুগে শুরু থেকেই বই আকারে একে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। আসমানি গ্রন্থগুলোর মধ্যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনকে এ বিশেষত্ব দান করেছেন যে, কলম-কাগজের চেয়েও একে অগণিত হাফিজের স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করেছেন। মুসলিম শরিফে এসেছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব -কে বলেছেন,

أنزلت عليك كتابا لا يغسله الماء আমি আপনার উপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাকে পানি ধুয়ে নিতে পারবে না।

অর্থাৎ, দুনিয়ার সাধারণ গ্রন্থগুলোর অবস্থা দাঁড়ায় এমন যে, পার্থিব বিপর্যয়ের কারণে সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায়; কিন্তু কুরআনকে মানুষের অন্তরে অন্তরে এভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকবে না। তাই প্রথমদিকে লেখার চেয়ে কুরআন মুখস্থ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে রাসুল -এর জীবদ্দশায়ই সাহাবিদের একটি বড় অংশ হাফিজে কুরআন হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে,

* হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত উসমান ইবনু আফফান রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত আলি ইবনু আবি তালিব রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত তালহা রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত সাআদ রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত সালিম রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু জুবাইর রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত হাফসা বিনত ফারুক রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত উম্মু সালামা রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত উম্মু ওয়ারাকা রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত উবাই ইবনু কাআব রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত মাআজ ইবনু জাবাল রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবু দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আনাস ইবনু মালিক রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত উকবা ইবনু আমের রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবু মুসা আশআরি রাজিয়াল্লাহু আনহু এবং হজরত আবু জায়েদ রাজিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ ছিলেন হাফিজে কুরআন সাহাবি।

মূলত উল্লিখিত নামগুলো সেসব সাহাবির, যাঁদের নাম হাফিজে কুরআন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। অন্যথায় আরও অগণিত সাহাবির পুরো কুরআন মুখস্থ ছিল।

বিরে মাউনার যুদ্ধে ৭০ জন কারী সাহাবির শহিদ হওয়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। হাফিজ সাহাবিদের সংখ্যা এত বেশি যে, ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় সমসংখ্যক হাফিজ, আরেক বর্ণনামতে ৫০০, অন্য বর্ণনামতে ৭০০ কারী ও হাফিজ সাহাবি শহিদ হন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 রাসূলের যুগে কুরআন সংরক্ষণ

📄 রাসূলের যুগে কুরআন সংরক্ষণ


দুনিয়াজুড়ে খ্যাত আরবদের বিস্ময়কর স্মৃতির উপর ভর করে কুরআন সংরক্ষণের পাশাপাশি রাসুল ﷺ লিখিতভাবে এর সংকলন, সংরক্ষণ ও একত্রীকরণের ব্যবস্থা করে গেছেন। ওহির ইলম লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি ৪০ জন 'কাতিবে ওহি' বা ওহি লেখক নিযুক্ত করেছিলেন। সে সময় কাগজ ছাড়াও পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, বাঁশের টুকরা, গাছের পাতা এবং চতুষ্পদ জন্তুর হাড্ডির উপর কুরআন লিখে রাখা হতো। এভাবে বিক্ষিপ্তভাবে কুরআন সংরক্ষণ করা হতো। এ জন্য কুরআনের একটি নাম হলো কিতাব, অর্থাৎ লিখিত বস্তু।

বর্তমানে কাগজে বা পাণ্ডুলিপি আকারে আমাদের সামনে যে কুরআন রয়েছে, তখন সেভাবে ছিল না; বরং বিক্ষিপ্তভাবে সংরক্ষিত ছিল। রাসুল ﷺ-এর সময়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে এভাবেই কুরআনের একটি কপি প্রস্তুত হয়, যদিও তা পুস্তিকারূপে ও গ্রন্থিত আকারে ছিল না। এ ছাড়া সাহাবায়ে কেরামের কারও কারও কাছে ব্যক্তিগতভাবে কুরআনের সম্পূর্ণ অথবা আংশিক কপি বিদ্যমান ছিল। যেমনটা বুখারি শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনু উমর রা. বলেন,

রাসুল ﷺ কুরআন নিয়ে (অর্থাৎ কুরআনের কপি নিয়ে) শত্রুদের ভূখণ্ডে সফর করতে নিষেধ করেছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় কুরআন শরিফ তিন পদ্ধতিতে সংরক্ষিত ছিল:

ক. হিফজের মাধ্যমে।
খ. লিখিত আকারে।
গ. তারতিবের মাধ্যমে।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন 📄 কুরআন সংকলন

📄 কুরআন সংকলন


খলিফাতুল মুসলিমিন সায়্যিদুনা আবু বকর সিদ্দিক রাজিআল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে এক যুদ্ধে অনেক হাফিজ সাহাবি শাহাদতবরণ করেন। ফলে এভাবে হাফিজ সাহাবিদের শাহাদত কুরআন সংরক্ষণের ব্যাপারে সাহাবিদের ভাবিয়ে তুলে। কেননা, তখন পর্যন্ত কুরআন কোনো সুবিন্যস্ত আকারে লিপিবদ্ধ ছিল না। হাফিজ সাহাবিদের শহিদ হওয়ার ঘটনায় হজরত উমর অত্যন্ত চিন্তিত হন—এভাবে যদি হাফিজ সাহাবিগণ শহিদ হতে থাকেন, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত পরবর্তী উম্মতের কাছে এই কুরআন কীভাবে পৌঁছবে? তাই তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সুবিন্যস্ত আকারে কুরআন সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রস্তাব করেন। তিনি খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত আবু বকর সিদ্দিকের কাছে কুরআন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে আবেদন জানান। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক উমরের প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তার কথা ছিল, 'যে কাজ স্বয়ং রাসুল করে যাননি, সেই কাজ আমি কীভাবে করি?' তাই তিনি উমরের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে দেন।

মানাকিবে উমর

এ পর্যায়ে হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাজিআল্লাহু আনহু সম্পর্কে আপনাদের একটা ধারণা থাকা দরকার যে, কে এই উমর? সহিহ বুখারি শরিফে হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,

لَقَدْ كَانَ فِيمَا قَبْلَكُمْ مِنَ الأُمَمِ نَاسٌ مُحَدَّثُوْنَ، فَإِنْ يَكُ فِي أُمَّتِي أَحَدٌ فَإِنَّهُ عُمَرُ
তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির মধ্যে অনেক 'মুহাদ্দাস' লোক ছিলেন। যদি আমার উম্মতের মধ্যে কেউ 'মুহাদ্দাস' থাকে, তাহলে সে হলো উমর।

হাদিসটি ইমাম মুসলিম রাহ.-ও আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। উভয় গ্রন্থের বর্ণনায় আছে, ইবনু ওহাব বলেন, 'মুহাদ্দাস' হলেন তাঁরা, যাঁদের মনে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) ইলহাম (ভালো-মন্দের জ্ঞান প্রক্ষেপ) করা হয়। উমর হলেন মুহাদ্দাস। মুহাদ্দাস আরবি শব্দ। এর অর্থ মুলহাম। মুলহাম হলেন আল্লাহ তাআলার নির্বাচিত কিছু বান্দা, যাঁদের অন্তরে সবসময় সত্য কথাটি পরিস্ফুটিত করে দেন।

মোটকথা, উমরের অন্তরে যে এই ভাবনা উদয় হলো, এটা স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছিল। এ ছাড়া উমরের ব্যাপারে এমন অনেক বিষয় আছে, তিনি প্রস্তাব করেছেন; তাঁর প্রস্তাবের স্বপক্ষে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়ে গেছে। সুবহানাল্লাহ।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর সম্পর্কে রাসুল বলেছেন, 'আমার পরে কেউ যদি নবি হতো, তাহলে উমরকে আল্লাহ সে সম্মান দিতেন।'

অন্য হাদিসে রাসুল বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন প্রথম যে বান্দার হিসাব তার ডান হাতে দেওয়া হবে সে হচ্ছে উমর।' এ কথা শুনে সাহাবিরা বললেন, 'হে আল্লাহর নবি! আবু বকর সম্পর্কে তো কিছু বললেন না।' তখন রাসুল বলেন, 'ততক্ষণে আবু বকর জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়তে থাকবে।'

হজরত উমর রাজিআল্লাহু আনহুর প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা এত বেশি ছিল যে, কখনো কখনো উমরের একক সিদ্ধান্তের আলোকে আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করে দিয়েছেন। হাফিজ জালালুদ্দিন সুয়ুতি রাহ. বলেন, কুরআনের অন্তত ২১টি আয়াত আল্লাহ তাআলা উমরের সিদ্ধান্তের অনুকূলে নাজিল করেছেন।

শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহ. বলেছেন, স্বয়ং নবিজি এক মত দিয়েছেন আর উমর দিয়েছেন ভিন্নমত, এমতাবস্থায় আল্লাহ উমরের মতের পক্ষে কুরআনে আয়াত নাজিল করেছেন। কুরআনের এমন আয়াতের সংখ্যা ১১টিরও বেশি। এমন পাঁচটি আয়াত সম্পর্কে জেনে নিই:

বদরের যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে

বদরযুদ্ধে কাফের বন্দীদের ব্যাপারে রাসুল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত দুই সাথী আবু বকর এবং উমরের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। উমর বললেন, তাদের হত্যা করে ফেলা হোক। আবু বকর বললেন, এ মুহূর্তে আমাদের অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের থেকে মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেওয়া ভালো। রাসুল বলেন, আমিও তা-ই মনে করি।

রাসুল তখন আবু বকরের পরামর্শমতো অর্থের বিনিময়ে কাফিরদের মুক্ত করে দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করে উমরের পরামর্শকে যৌক্তিক সাব্যস্ত করে ইরশাদ ফরমান,

تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا * وَاللهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ لَوْلَا كِتُبٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾
তোমরা চাও পার্থিব সম্পত্তি আর আল্লাহ চান পরকালীন কল্যাণ। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ববিধান থাকলে তোমরা যে মুক্তিপণ গ্রহণ করেছে, সে জন্য বড় আজাব এসে পৌঁছাত। [সুরা আনফাল : ৬৭-৬৮]

মুনাফিক সরদারের জানাজা প্রসঙ্গে

মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই মারা গেলে রাসুল তার জানাজা পড়ার জন্য দাঁড়ালেন। উমর বললেন, 'হে নবি! আপনি মুনাফিকদের জানাজা পড়াবেন এটা আমার কাছে ভালো লাগছে না।' রাসুল বললেন, 'আল্লাহ তো আমাকে মুনাফিকের জানাজা পড়াতে নিষেধ করেননি।' রহমতের নবি মুনাফিক সরদারের জানাজা পড়ানো শেষ করেছেন, আল্লাহপাক সাথে সাথেই আয়াত নাজিল করে বললেন,

وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ وَمَا تُوْا وَهُمْ فَسِقُوْنَ﴾
আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জানাজার নামাজ পড়বেন না এবং তার কবরের পাশেও দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসিক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। [সুরা তাওবা: ৮৪]

আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদ

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে যখন একদল মুনাফিক জিনার অপবাদ আরোপ করল, তখন রাসুল মানসিকভাবে একটু ভেঙে পড়লেন। তিনি এ বিষয়ে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। এ ব্যাপারে তাদের মতামত চাইলেন। তখন অনেকেই বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য স্ত্রীর কি অভাব আছে? আপনি চাইলে কোন মুসলমান তার কন্যাকে আপনার সাথে বিয়ে দিয়ে নিজেকে ধন্য করতে চাইবে না? তাহলে চারিত্রিক দিক দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ একজন নারীকে নিয়ে আপনার সংসার করার দরকার কী? তা ছাড়া প্রচারিত সংবাদটির সত্যতাও তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বিশ্বনবি তখন তাকালেন উমরের দিকে। 'উমর! তুমি কী বলো? এব্যাপারে তোমার মতামত কী?' উমর বললেন...। উমরের কথাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরি :

-উমর বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আয়েশার সাথে আপনার বিয়ের কথাবার্তা কোথায় ফাইনাল হয়েছিল?
-নবিজি বললেন, আসমানে।
-কে ফাইনাল করেছিলেন?
-আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
-তাহলে ব্যাপারটি নিয়ে আমরা খামাখা টেনশন করছি কেন? পুরো ব্যাপারটি কেন আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিচ্ছি না? আমরা কেন আল্লাহর ফায়সালার জন্য অপেক্ষা করছি না। আর আমাকে যদি আমার নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশ করার হুকুম করেন, তাহলে আমার কথা খুবই পরিষ্কার, আল্লাহপাক তার নবির জন্য প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্রের কোনো নারীকে স্ত্রী হিশেবে মনোনীত করবেন, এ কথা আমি উমর বিশ্বাস করি না।

নবিজি বিব্রত। এ বিষয়ে সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু আবু বকর সিদ্দিকের পরামর্শ পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে আবু বকরের সাথে পরামর্শও করতে পারছেন না। তিনি আয়েশার বাবা। বাবার সাথে মেয়ের নামে ছড়ানো বদনাম নিয়ে কীভাবে কথা বলা যায়! নবিজি বিব্রত। কী করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।

সায়্যিদুনা ফারুকে আজমের অনুভূতির জয় হলো। আল্লাহপাক আয়াত নাজিল করে জানিয়ে দিলেন সিদ্দিকায়ে কায়েনাত সিদ্দিকা বিনতে সিদ্দিক আম্মাজান আয়েশার বিরুদ্ধে রটানো অপবাদের কোনো ভিত্তি নেই। আয়েশার নামে ছড়ানো বদনাম সম্পূর্ণ মিথ্যা। এর কোনো সত্যতা নেই। ইরশাদ হলো,

لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنْتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَ قَالُوا هَذَا انك مُّبِينٌ
এ অপবাদ শোনার পর বিশ্বাসী নরনারীরা কেন নিজেদের ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করেনি? কেন তারা বলতে পারল না যে, 'এ তো নিছক মিথ্যা।' [সুরা নূর: ১২]

আম্মা আয়েশার চারিত্রিক সচ্ছতার সার্টিফিকেট প্রদান করে নাজিলকৃত আয়াতসমূহের শেষ দিকে গিয়ে আল্লাহ বলেন, এটি শুধু একটি বদনামই নয়, জঘন্য একটি অপবাদও- বুহতানুন আজিম। আল্লাহ বলেন,

وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَّا يَكُونُ لَنَا أَنْ تَتَكَلَّمَ بِهَذَا * سُبْحْنَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ
তোমরা যখন এই কথাগুলো শুনলে, তখন কেন বললে না যে, এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের উচিত নয়, আল্লাহ মহান ও পবিত্র, এটা তো মহাগুরুতর অপবাদ। [সুরা নূর: ১৬]

রাসুল-এর স্ত্রীদের প্রসঙ্গে

একবার প্রসঙ্গক্রমে হজরত উমর রাসুল-এর স্ত্রীদের বললেন, আপনারা যদি রাসুলকে কষ্ট দেন, তাহলে রাসুল আপনাদের সবাইকে তালাক দিয়ে দেবেন। এটা ছিল রাসুলের প্রতি উমরের ভালোবাসার নিদর্শন। নবিজি ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে বাইরে অনেক কষ্ট করে ঘরে ফিরেন। তখন স্ত্রীগণ যদি নবির সাথে এমন কোনো আচরণ করেন, যাতে নবির কষ্ট হয়, তাহলে সেটা মোটেও ভালো হবে না। উমরের এই কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার এতই পছন্দ হলো যে, আল্লাহপাক আয়াত নাজিল করে জানালেন, আমার উমর যা বলেছে, তা-ই ঠিক। নবির স্ত্রীগণকে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ বললেন, খবরদার! আমার নবির মনে কষ্ট লাগে, এমন কোনো কাজ তোমরা করো না। তাহলে তোমাদের কপালেই খারাবি আসবে। আমার নবি তোমাদের তালাক দিয়ে বিদায় করে দিলে আমি তার জন্য তোমাদের চেয়ে আরও ভালো স্ত্রীর ব্যবস্থা করে দিতে পারব। কুরআনের ভাষায়,

عَسَى رَبُّةً إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبْدِلَةٌ أَزْوَاجًا خَيْرًا
নবি যদি তোমাদের সকলকে তালাক দেন, তবে তার রব সম্ভবত তোমাদের স্থলে তাকে দেবেন তোমাদের চেয়ে উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। [সুরা তাহরিম : ৫]

মাকামে ইবরাহিম

উমরের ইচ্ছা ছিল মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিশেবে নির্দিষ্ট করা হোক। নবিজির সাথে বাইতুল্লাহ ঘুরছিলেন উমর। নবিজি তাকে মাকামে ইবরাহিম দেখালেন। এটা সেই জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নিজ সন্তান ইসমাইলকে নিয়ে বাইতুল্লাহ মেরামত করেছিলেন। স্থানটির উমরকে আপ্লুত করে ফেলল। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়ে ফেলতে পারি না?

নবিজি বললেন, দেখো উমর, আমি শরিয়ত বানাই না, প্রচার করি। শরিয়ত আসে আল্লাহর কাছ থেকে। আমি আল্লাহর দেওয়া বিধিবিধানগুলোই তোমাদের মধ্যে প্রচার করি। আল্লাহপাক আমাকে এখানে অর্থাৎ, মাকামে ইবরাহিমে নামাজ পড়ার কোনো নির্দেশ দেননি। তাহলে আমি তোমাকে কেমন করে এই অনুমতি দিতে পারি?

নবিজির জবাব শুনে উমরের মন একটু খারাপ হলেও আর কিছু বললেন না। নবির কথার পরে আর কোনো কথা চলে না। আল্লাহ তাআলা তখন আয়াত নাজিল করলেন। উমরের ইচ্ছাকে আল্লাহ কুরআনের আয়াত বানিয়ে নবিজির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ইরশাদ হলো,

وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى আর তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান হিশেবে গ্রহণ করো। [সুরা বাকারা: ১২৫]

আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে 'মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবি'র দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম আলাইহিম রিজওয়ানের নকশে কদমে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px