📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 সিরাতে মুস্তাকিম কী

📄 সিরাতে মুস্তাকিম কী


মুহতারাম হাজিরীন! এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসা উচিত, যেহেতু সিরাতে মুস্তাকীম ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই, অতএব সিরাতে মুস্তাকীম কোন রাস্তার নাম? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াতে সিরাতে মুস্তাকীমকে বিভিন্নভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। যেমন:

সিরাতে মুস্তাকীম মানে কুরআনের রাস্তা আল্লাহ বলেন,

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ আর নিশ্চয়ই এই পথই আমার সরল পথ; এই পথই তোমরা অনুসরণ করে চলবে। [সূরা আনআম: ১৫৩]

সিরাতে মুস্তাকীম মানে পুরষ্কারপ্রাপ্তদের রাস্তা আল্লাহ বলেন,

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ﴾ তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন। [সূরা ফাতিহা : ৭]

সিরাতে মুস্তাকীম মানে খালিস ইবাদত আল্লাহ বলেন,

وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمُ আর আমারই ইবাদত করো, এটাই সরল পথ। [সূরা ইয়াসিন : ৬১]

সিরাতে মুসতাকিম মানে নবি ও সাহাবিদের রাস্তা।

রাসুল বলেন, وَسَتَفْتَرِقُ هَذِهِ الْأُمَّةُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً، قيل: من هي يا رسول الله؟ قال: ما أنا عليه وأصحابي অচিরেই এই উম্মাহ ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ছাড়া বাকি সব জাহান্নামে যাবে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসুল, সেটি কোন দল?' রাসুল জবাবে বললেন, 'আমি এবং আমার সাহাবিগণ যে মতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি, এর উপর যারা প্রতিষ্ঠিত থাকবে।'

সিরাতে মুসতাকিমের দিকে স্বয়ং আল্লাহ মানুষকে ডাক দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ নিশ্চয় আমার রব সরল পথে রয়েছেন। [সুরা হুদ: ৫৬]

নবিজি দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (হে নবি) আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশ করেন। [সুরা শূরা: ৫২]

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সিরাতে মুসতাকিমের পথে বাধা হলো দুই প্রকারের শয়তান-মানুষ শয়তান ও জ্বিন শয়তান। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস। শয়তান আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল, فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ (হে আল্লাহ) আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব। [সুরা আরাফ: ১৬]

এ জন্য কুরআন পড়ার আগে 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' পড়ে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে হয়। আল্লাহ বলেন, فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَنِ الرَّحِيمِ সুতরাং আপনি যখন কুরআন পাঠ করবেন, তখন অভিশপ্ত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করুন। [সুরা নাহল: ৯৮]

মুহতারাম হাজিরিন!

কুরআন আল্লাহর কালাম, আর কুরআন জিবরিলের মাধ্যমে নবিজির কাছে এসে পৌঁছেছে। আমরা কি জানি জিবরিল কে? আমরা কি আন্দাজ করতে পারি জিবরিলের ক্ষমতা? জিবরিলের পরিচয় তুলে ধরে আল্লাহপাক বলেন,

عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى ذُومِرَّةٍ فَاسْتَوَى
তাকে শিক্ষা দিয়েছেন প্রচণ্ড শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন; সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল। [সুরা নাজম: ৫-৬]

إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ مُطَاعٍ ثَمَّ آمِينٍ
নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত রাসুলের আনিত বাণী। যে শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাশীল, যাকে সেখানে মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। [সুরা তাকবির: ১৯-২১]

উভয় আয়াতের সারমর্ম হলো, জিবরিল নামক কুরআনের রাওয়ি ছিলেন শক্তিশালী, সম্মানিত বার্তাবাহক, মান্যবর, বিশ্বস্ত এবং সায়্যিদুল মালাইকা। এতটুকু আলোচনায় আমরা স্মরণ রাখি, আল্লাহ থেকে নবিজি পর্যন্ত কুরআন পৌঁছানো ফেরেশতার গুণাগুণ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, নবিজি থেকে আমাদের পর্যন্ত কুরআন-হাদিস এসে পৌঁছার সূত্র তথা বর্ণনাকারীদেরও কিছু গুণাগুণ থাকতে হবে।

নবিজি সারা জীবন যে কথাগুলো বলে গেছেন, সেগুলো মূলত দুই প্রকার-এক প্রকারের নাম কুরআন, আরেক প্রকার হাদিস। নবিজি থেকে আমাদের পর্যন্ত হাদিস এসে পৌঁছার মাধ্যমকে রাওয়ি বা বর্ণনাকারী বলা হয়। রাওয়িদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু গুণাবলি থাকতে হয়। নবিজির পরে নবির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নির্দেশনা বা গাইডলাইনের আলোকে উম্মতের উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্দিসগণ হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে কী কী গুণ থাকতে হবে, সেগুলো বিস্তারিত বলে গেছেন। ইলমে হাদিসের পরিভাষায় যাকে উসুলে হাদিস বলে। উসুলে হাদিসের জ্ঞান ছাড়া কোনো হাদিসকে সহিহ বা জয়িফ সাব্যস্ত করার উপায় নেই।

আজকাল আমরা ভয়াবহ একটি ফিতনার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। উসুলে হাদিস তথা হাদিসশাস্ত্রের মূলনীতির কিছু না-জানা কতিপয় লোক সহিহ হাদিসের দোহাই দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের নিয়মিত বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে। এ জন্য এই সময়ে আপনাদেরও সহিহ হাদিসের ডেফিনেশন জানা দরকার।

সহিহ হাদিস কাকে বলে

সম্মানিত মুসল্লিয়ানে কেরাম!

এখন সহিহ হাদিসের যুগ! অনেককেই দেখবেন কথায় কথায় সহিহ হাদিস সহিহ হাদিস বলছে, অথচ জিজ্ঞেস করে দেখুন বেশির ভাগই সহিহ হাদিসের সংজ্ঞা দিতে পারবে না। হাদিস কত প্রকার এবং কোন হাদিসের হুকুম কী, কিছুই বলতে পারবে না। অথচ হাদিসের কথা বলে সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করবে। এ জন্য আপনাদের জানা দরকার সহিহ হাদিস কাকে বলে।

হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানি সহিহ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, যে বর্ণনাকারীর মধ্যে ৪টি গুণ থাকবে, তার বর্ণিত হাদিস হবে সহিহ হাদিস। আপনারা মনে করবেন না সহিহ হাদিস মানে শুদ্ধ হাদিস, আর যেটা সহিহ নয় সেটা অশুদ্ধ। সহিহ হাদিস হলো উসুলে হাদিসের একটি পরিভাষা। সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারীদের চার গুণ হলো : ১. আদালত বা বিশ্বস্ততা। ২. জবত বা সুসংরক্ষণ। ৩. গাইয়ে মুআল্লাল বা ত্রুটিমুক্ত। ৪. শাজ বা বিশ্বস্ত উর্ধ্বতন রাওয়ির অবৈপরিত্য।

বর্ণনাকারীদের গুণাগুণের ভিত্তিতে পরিভাষায় হাদিসের পাঁচটি রূপ হতে পারে। এই ফিতনার যুগে এগুলোও আপনাদের জানা দরকার, সুরা ফাতিহার মতো মুখস্থ করা দরকার। হাদিসের পাঁচটি রূপ হলো: ১. সহিহ লিজাতিহি ২. হাসান লিজাতিহি ৩. সহিহ লিগাইরিহি ৪. জয়িফ ৫. হাসান লিগাইরিহি

কোনো বর্ণনাকারীর মধ্যে উপরে উল্লিখিত চার গুণ একত্রে পাওয়া গেলে তার বর্ণিত হাদিসকে সহিহ লিজাতিহি বলা হয়। শুধু একটি গুণ তথা সংরক্ষণের গুণে একটু কমতি থাকলে সেই হাদিসকে হাসান লিজাতিহি বলা হয়। এই কমতিটি অন্যান্য সূত্র দ্বারা যদি দূর হয়ে যায়, সেই হাদিসকে ইলমে হাদিসের পরিভাষায় সহি লিগাইরিহি বলা হয়। যদি ৪ গুণ হতে কোনো একটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে তাকে হাদিসে জয়িফ বলা হয়। আর এই জয়িফ হাদিস ভিন্ন ভিন্ন সূত্র দ্বারা যদি মজবুত হয়ে যায়, তখন সেটা আর জয়িফ থাকে না, তখন তার নাম হয়ে যায় হাসান লিগাইরিহি।

আর বর্ণিত ৫ প্রকার হাদিসই সহিহ তথা শুদ্ধ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য। কেউ যদি এগুলো অস্বীকার করে, তাহলে সেটা হবে তথাকথিত সহিহ হাদিসের ব্যানারে বাকি ৪ প্রকার সহিহ হাদিসের আওতায় থাকা লক্ষ লক্ষ হাদিস অস্বীকার করা। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 নজুলে কুরআন

📄 নজুলে কুরআন


মুহতারাম হাজিরিনে কেরাম!

কুরআনের এই তাফসির মাহফিলে আমরা ধারাবাহিকভাবে বসার ও শুনার সুযোগ পেয়েছি। এ জন্য সবাই মন থেকে বলি—আলহামদুলিল্লাহ।

কুরআন অনাদিকাল থেকে লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহপাক বলেন,

بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظ
বরং এটা কুরআন, যা লাওহে মাহফুজে বা সংরক্ষিত ফলকে সংরক্ষিত রয়েছে। [সুরা বুরুজ: ২১-২২]

লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বাইতুল ইজ্জাহ নামক স্থানে রমজানের শবে কদরে নাজিল হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ إِنَّا أَنزَلْتُهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
অতঃপর প্রয়োজনানুপাতে অল্প অল্প করে ২৩ বছরে নবিজির উপর পূর্ণ কুরআন নাজিল হয়। তবে এর শুরুটাও ছিল লাইলাতুল কদরে। আল্লাহপাক সরাসরি লাওহে মাহফুজ থেকে নবিজির উপর কুরআন নাজিল না করে বাইতুল ইজ্জায় কেন নাজিল করলেন, তার রহস্য হলো:

১. কুরআনে কারিম অতি সম্মানিত, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেষ্ঠ একটি কিতাব, সেটা বোঝানোর জন্য।

২. কুরআনে কারিম সর্বপ্রকার সংশয় ও সন্দেহ থেকে বহু ঊর্ধ্বে, এটা বোঝানোর জন্য।

কুরআন তিন জায়গায় সংরক্ষিত রয়েছে—মানুষের কলবে, লাওহে মাহফুজে এবং বাইতুল ইজ্জাতে। সুতরাং এই পবিত্র কুরআনের সাথে যে সম্পর্ক রাখবে, সে হবে সম্মানিত, শ্রেষ্ঠ এবং সর্বপ্রকার শয়তানি চক্রান্ত থেকে সংরক্ষিত।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ!

একটু ভাবুন। কুরআন সর্বপ্রথম আকাশের যে জায়গায় নাজিল হলো, তা হলো সংরক্ষিত ফলক। তারপর যে জায়গায় নাজিল হলো, তা হলো সম্মানের ঘর। যার মাধ্যমে নাজিল হলো, তিনি হলেন সম্মানিত ফেরেশতা। যার উপর নাজিল হলো তিনি হলেন সম্মানিত রাসুল, শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবি মুহাম্মাদে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যে মাসে নাজিল হলো, সে মাস হলো সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ মাস পবিত্র রমজান। যে রাতে নাজিল হলো, সে রাত হলো শ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদর। দুনিয়ার যে স্থানে নাজিল হলো, তা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও বরকতপূর্ণ জায়গা মক্কা শরিফ। যাদের হিদায়তের জন্য নাজিল হলো, তারা হলেন শ্রেষ্ঠ উম্মত, উম্মতে মুহাম্মাদি।

এতটুকু আলোচনায় আপনারা বুঝতে পারলেন কুরআনের সাথে যার যেভাবে সম্পর্ক লেগেছে, সে সেভাবে সম্মানিত হয়েছে। আমরা রমজানের এই পবিত্র মুহূর্তে কুরআনচর্চার মাধ্যমে কুরআনের সাথে সম্পর্ক জুড়েছি। আল্লাহ যেন আমাদের কবুল করেন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 কুরআনের নামসমূহ

📄 কুরআনের নামসমূহ


সম্মানিত উপস্থিতি!

আজ আমরা আলোচনা করব কুরআনের নাম কতটি ও কি কি—ইত্যাদি সম্পর্কে।

কুরআনুল কারিমের নাম ও বিশেষণের সংখ্যাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়। ইমাম জারকাশি রাহ.-এর মতে, কুরআনের গুণবাচক নামের সংখ্যা প্রায় ৯৯টি। আল্লামা সুয়ুতি রাহ. কুরআনের ৫৫টি নাম উল্লেখ করেছেন। মুফতি তাকি উসমানি দা.বা. কুরআনের নাম ৯০টির বেশি বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি কুরআনের প্রকৃত নাম পাঁচটি ছাড়া অন্যগুলোকে তার বিশেষণ হিশেবে উল্লেখ করেছেন।

ইমাম জারকাশি রাহ. বলেন, কুরআনের নাম-সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণ হলো, কুরআনের গুণবাচক নামগুলোকে মূল নামে আখ্যা দেওয়া। এর ফলে নামের সংখ্যা এত অধিক হয়েছে। অন্যথায় বিশুদ্ধ বর্ণনামতে কুরআনের নাম পাঁচটি। সেগুলো হলো,
১. কুরআন। আল্লাহ বলেছেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ

২. ফুরকান। আল্লাহ বলেছেন,

هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

৩. কিতাব। আল্লাহ বলেছেন,

ذَلِكَ الْكِتَبُ لَا رَيْبَ فِيهِ

৪. জিকর। আল্লাহ বলেছেন,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحْفِظُونَ

৫. তানজিল। আল্লাহ বলেছেন,

تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَلَمِينَ

এখন কুরআন 'কুরআন' নামে প্রসিদ্ধ কেন, এ ব্যাপারে আপনাদের জানতে হবে। হাদিস শরিফে 'কিতাব' নামও এসেছে। রাসুল বলেছেন,

تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা এই দুটিকে আঁকড়ে ধরবে, ততক্ষণ তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। (যত ঝড়-সাইক্লোন বা বিপদ আসুক, তাতে তোমরা বিভ্রান্ত হবে না। আর তা হচ্ছে) আল্লাহ তাআলার কিতাব ও আল্লাহর নবির (তথা আমার) সুন্নাহ।

কেউ যদি কুরআন ও সুন্নাহকে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে, কুরআন ও সুন্নাহর রঙে রাঙাতে পারে নিজের জীবন, তাহলে মৃত্যুর পর জান্নাতই হবে তার ঠিকানা। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহপাক তখন তাকে সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দান করবেন।

কুরআনে কারিম নবিজির কাছে কীভাবে অবতীর্ণ হলো, এ সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন। কুরআন যে আল্লাহর কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছল, কার মাধ্যমে এল, সেটা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। কুরআনে কারিম যে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল-এর কাছে এসেছে, সেটা তো আমরা জানি; কিন্তু মধ্যখানে নবিজি থেকে আমাদের পর্যন্ত যে হাজার বছরের ব্যবধান, এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান পাড়ি দিয়ে আমাদের পর্যন্ত কীভাবে এসে পৌঁছল?

এর উত্তর হবে সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে। কেননা, সাহাবিগণ সরাসরি নবিজির কাছ থেকে কুরআন শুনেছেন, আমল করেছেন, হিফজ তথা সংরক্ষণ করেছেন। তার মানে আমরা কুরআন পেয়েছি সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে। তারা বিশ্বস্ততার সাথে কুরআন সংরক্ষণ করেছেন। লিখে রেখেছেন। কিতাব আকারে মলাটবন্দী করেছেন। তবেই আমরা কুরআন পেয়েছি。

সাহাবায়ে কেরামের বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত। তাদের আমানতদারী সন্দেহাতীত। আল্লাহপাক তাদের মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষণ করাবেন বলেই তাদেরকে সকল প্রকার গুনাহ-খাতা থেকে পাকসাফ করে নিয়েছেন। মানুষ হিশেবে মাঝেমধ্যে তারা গুনাহ করে ফেললেও আল্লাহপাক তাদের অন্তরে এমনভাবে গুনাহর ভয় সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যেন সাথে সাথে তারা তাওবাহ করে নেন। কারণ, আল্লাহপাক তাদের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহ সংরক্ষণের কাজ নেবেন, এ জন্য তাদেরকে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করা দরকার ছিল।

সাহাবায়ে কেরাম যে তাওবার মাধ্যমে পবিত্র ছিলেন, তারা যে মাহফুজ ও মাগফুর ছিলেন, এর প্রমাণ কুরআনে কারিমের একাধিক স্থানে বিবৃত হয়েছে। আল্লাহপাক সকল সাহাবির উপর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাজিয়াল্লাহু আনহুম। তাদের সকলের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, কুল্লাউ ওয়াদাল্লাহুল হুসনা।

আল কুরআন বিশ্বের বিস্ময়কর গ্রন্থ। এটি সর্বাধিক প্রশংসিত মহা প্রজ্ঞাময় রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নবি হজরত মুহাম্মদ -এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। বিশ্বজনীন এ গ্রন্থের আবেদন ও উপযোগিতা সব যুগে এবং সব স্থানেই কার্যকর। কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ গ্রন্থ দুই বার নাজিল হয়েছে। প্রথমবার পুরো কুরআনের আয়াত প্রথম আসমানে 'বায়তুল ইজ্জতে' এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা উপলক্ষে, যুগ-জিজ্ঞাসার জবাবে নাজিল হয়েছে।

কুদরতি নিয়মে হাজার বছর ধরে অত্যন্ত বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় এ গ্রন্থকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লিখে রাখার পাশাপাশি হাজার বছর ধরে হৃদয় থেকে হৃদয়ে একে ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুরআনের লাখো হাফিজ বা মুখস্থকারী রয়েছেন। মানবেতিহাসে আর কোনো গ্রন্থের এত হাফিজ নেই।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস

📄 কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস


যেহেতু পূর্ণ কুরআন একসঙ্গে নাজিল হয়নি; বরং কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বিশেষ প্রয়োজনীয়তা ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে, তাই রাসুল -এর যুগে শুরু থেকেই বই আকারে একে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। আসমানি গ্রন্থগুলোর মধ্যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনকে এ বিশেষত্ব দান করেছেন যে, কলম-কাগজের চেয়েও একে অগণিত হাফিজের স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করেছেন। মুসলিম শরিফে এসেছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব -কে বলেছেন,

أنزلت عليك كتابا لا يغسله الماء আমি আপনার উপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাকে পানি ধুয়ে নিতে পারবে না।

অর্থাৎ, দুনিয়ার সাধারণ গ্রন্থগুলোর অবস্থা দাঁড়ায় এমন যে, পার্থিব বিপর্যয়ের কারণে সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায়; কিন্তু কুরআনকে মানুষের অন্তরে অন্তরে এভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকবে না। তাই প্রথমদিকে লেখার চেয়ে কুরআন মুখস্থ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে রাসুল -এর জীবদ্দশায়ই সাহাবিদের একটি বড় অংশ হাফিজে কুরআন হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে,

* হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত উসমান ইবনু আফফান রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত আলি ইবনু আবি তালিব রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত তালহা রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত সাআদ রাজিআল্লাহু আনহু।
* হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত সালিম রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবু হুরায়রা রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু জুবাইর রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত হাফসা বিনত ফারুক রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত উম্মু সালামা রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত উম্মু ওয়ারাকা রাজিয়াল্লাহু আনহা।
* হজরত উবাই ইবনু কাআব রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত মাআজ ইবনু জাবাল রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবু দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আনাস ইবনু মালিক রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত উকবা ইবনু আমের রাজিয়াল্লাহু আনহু।
* হজরত আবু মুসা আশআরি রাজিয়াল্লাহু আনহু এবং হজরত আবু জায়েদ রাজিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ ছিলেন হাফিজে কুরআন সাহাবি।

মূলত উল্লিখিত নামগুলো সেসব সাহাবির, যাঁদের নাম হাফিজে কুরআন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। অন্যথায় আরও অগণিত সাহাবির পুরো কুরআন মুখস্থ ছিল।

বিরে মাউনার যুদ্ধে ৭০ জন কারী সাহাবির শহিদ হওয়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। হাফিজ সাহাবিদের সংখ্যা এত বেশি যে, ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় সমসংখ্যক হাফিজ, আরেক বর্ণনামতে ৫০০, অন্য বর্ণনামতে ৭০০ কারী ও হাফিজ সাহাবি শহিদ হন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00