📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নিজেকে লাঞ্ছিত করো না

📄 নিজেকে লাঞ্ছিত করো না


অল্পেতুষ্ট না হলে দুনিয়াতে কারও পক্ষে সুখে বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ, যখনই অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে, চিন্তা ও অস্থিরতাও বাড়তে থাকবে সমানতালে। অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আরও অর্জন ও উপার্জনের প্রয়োজন হবে এবং এ কারণে অন্যরা তাকে দাসে পরিণত করে ছাড়বে।

আর যদি অল্পেতুষ্ট থাকা যায়, তখন আর নিজের চেয়ে ওপরের ব্যক্তির সাথে মেলামেশার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অধীনও হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি তার সমপর্যায়ের, তার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করার কিছু নেই। কারণ, তার নিকট যা আছে, তার নিজের কাছেও তা-ই আছে।

কিন্তু যে সকল ব্যক্তি অল্পেতুষ্ট থাকে না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের জীবন অন্বেষণ করে, তারা তাদের দ্বীনকে তুচ্ছ করে ফেলে। নিজেদেরকেও অন্যের সামনে নত অবনত ও অপদস্থ করে তোলে।

বিশেষ করে আলেমদের ক্ষেত্রে—তারা যদি ঘন ঘন আমির ও ধনবানদের নিকট যাতায়াত করতে থাকে, তবে তারা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে ছাড়বে। তারা সেখানে অনেক অপছন্দনীয় বিষয় দেখতে পাবে, কিন্তু নিষেধ করতে পারবে না। কখনো কোনো জালেমের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তার প্রশংসা করতেও বাধ্য হতে হবে... ইত্যাদি।

অর্থাৎ এসব করে তাদের থেকে যতটা পার্থিব বিষয় অর্জন করবে, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি তাকে লাঞ্ছনায় পড়তে হবে—নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।

এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বিচারক ও সাক্ষীদের। যদিও এককালে এ দুটি বিষয়ই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও মহত্বের নিদর্শন। যেমন, কাজি আবদুল হামিদ ছিলেন এমন এক বিচারক—যিনি কখনো কোনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। অন্যায় করতেন না। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করছি—একবার তিনি খলিফা মুতাদিদের নিকট খবর পাঠালেন—আপনি কিছু সরকারি জমি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার ভাড়া পরিশোধ করুন।'

খবর পেয়ে খলিফা ভাড়া পরিশোধ করলেন। এরপর খলিফা বিচারক আবদুল হামিদকে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি মারা গিয়েছে, তার নিকট আমার কিছু অর্থ প্রাপ্য ছিল। আপনি এটি প্রদানের ব্যবস্থা করুন।'

বিচারক খলিফাকে বললেন, 'আপনি যখন আমাকে এই বিচারকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেদিন বলেছিলেন, এই দায়িত্বটি আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে অর্পণ করলাম। অর্থাৎ আমাকে বিচারক হিসেবেই বিচার করতে হবে। আর সে হিসাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আপনি যে সম্পদের দাবি করছেন, এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে দু-জন সাক্ষী ব্যতীত আমি আপনার পক্ষে কিছু করতে সক্ষম নই।'

এই ছিল তখনকার বিচার ও বিচারকের সম্মান! সাক্ষীর বিষয়টিও ছিল এমন মর্যাদাকর। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—একবার এক খলিফার নিকট কিছু লোক এল। খাদেম বলল, তোমরা কি আমার মুনিবের পক্ষে এ বিষয়ে সাক্ষী হবে?

লোকগুলো খাদেমের কথা অনুযায়ী বিষয়টির ওপর খলিফার সাক্ষী হতে রাজি হলো। এ সময় হজরত মাজঝুয়ি আমিরের নিকট একান্তে এগিয়ে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই কাগজে যা লেখা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনার সাক্ষী হতে পারি?

খলিফা বললেন, অসুবিধা নেই। তুমি সাক্ষী থাকো।

মাজঝুয়ি বললেন, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার এভাবে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যতক্ষণ না নিজ মুখে 'হ্যাঁ' বলবেন, ততক্ষণ আমি সাক্ষী হব না।

খলিফা বললেন, হ্যাঁ। সাক্ষী হতে পারো।

এরপর হজরত মাজঝুয়ি খলিফার বিষয়ে সাক্ষী হলেন। এমনটাই ছিল তখন বিচার, বিচারক এবং সাক্ষ্য ও সাক্ষীর মর্যাদা ও মহত্ব।

কিন্তু আমাদের যুগে এসে সবই উল্টে গেছে। এমনকি মানুষ আজ ঘুষ দিয়েও সাক্ষী হতে চায়। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া অর্জন করে। তুমি দেখবে, নিজেদের অদেখা ও অজানা বিষয়েও তারা সাক্ষ্য দেবার জন্য কেমন প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়!

আবুল মায়ালি ইবনে শাফি আমাকে বলেছেন, আমাকে একবার একটি সাধারণ বন্দির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। আল্লাহর নিকট এ জন্য আমি খুব ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ মাফ করুন!

আমরা জানি, সাক্ষ্য প্রদানের কারণে সাক্ষীদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। বরং সময়-অসময়ে তার দরজায় করাঘাত পড়ে এবং নিজের কাপড় টেনে নিজের সময় খরচ করে নিজেকেই সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। এটা কোনো সুখ ও লাভের বিষয় নয়। এ কারণে প্রবাদকথা আছে—আল্লাহ তোমাকে সাক্ষী হওয়ার নিয়ামত থেকে রক্ষা করুন!

একারণে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাক্ষী হওয়া এবং বিচারক হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন।

যেমন, হজরত ইবরাহিম নাখঈ রহ. এর ক্ষেত্রে লোকেরা যখন বলতে লাগল, আপনিই হবেন আমাদের বিচারক, তখন তিনি লাল জামা গায়ে বাজারে যাওয়া-আসা করতে শুরু করলেন। দেখতে বেখাপ্পা লাগে। অবশেষে লোকেরাই আবার বলতে লাগল—'তিনি এ পদের যোগ্য নন।'

আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়—একবার খলিফা হারুনুর রশিদ একজন প্রাজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা তাকে বিচারকের দায়িত্ব দিতে চান। লোকটি খলিফার নিকট এসে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি কেমন আছেন এবং আপনার সন্তান-সন্ততি কেমন আছে?...

লোকটির এমন বোকামিপূর্ণ কথা শুনে আশপাশের লোকেরা বলল—এ তো পাগল। ফলে তাকে বিচারকের পদ প্রদান করা থেকে বিরত রাখা হলো।

আল্লাহর কসম! তার এই পাগলামিই ছিল প্রাজ্ঞতা। বিচারকের পদ থেকে বিরত থাকার জন্য তার এই বোকামিই ছিল বুদ্ধিমত্তা।

কিন্তু আমাদের অবস্থা কী! আমার ধারণা, আখেরাতের প্রতি আমাদের ঈমান রয়েছে খুবই টলটলায়মান অবস্থায়। সামান্য ঝাঁকিতেই গড়িয়ে পড়ে পড়ে ভাব। তাই আমাদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে হিফাজত রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।

অল্পেতুষ্ট না হলে দুনিয়াতে কারও পক্ষে সুখে বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ, যখনই অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে, চিন্তা ও অস্থিরতাও বাড়তে থাকবে সমানতালে। অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আরও অর্জন ও উপার্জনের প্রয়োজন হবে এবং এ কারণে অন্যরা তাকে দাসে পরিণত করে ছাড়বে।

আর যদি অল্পেতুষ্ট থাকা যায়, তখন আর নিজের চেয়ে ওপরের ব্যক্তির সাথে মেলামেশার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অধীনও হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি তার সমপর্যায়ের, তার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করার কিছু নেই। কারণ, তার নিকট যা আছে, তার নিজের কাছেও তা-ই আছে।

কিন্তু যে সকল ব্যক্তি অল্পেতুষ্ট থাকে না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের জীবন অন্বেষণ করে, তারা তাদের দ্বীনকে তুচ্ছ করে ফেলে। নিজেদেরকেও অন্যের সামনে নত অবনত ও অপদস্থ করে তোলে।

বিশেষ করে আলেমদের ক্ষেত্রে—তারা যদি ঘন ঘন আমির ও ধনবানদের নিকট যাতায়াত করতে থাকে, তবে তারা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে ছাড়বে। তারা সেখানে অনেক অপছন্দনীয় বিষয় দেখতে পাবে, কিন্তু নিষেধ করতে পারবে না। কখনো কোনো জালেমের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তার প্রশংসা করতেও বাধ্য হতে হবে... ইত্যাদি।

অর্থাৎ এসব করে তাদের থেকে যতটা পার্থিব বিষয় অর্জন করবে, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি তাকে লাঞ্ছনায় পড়তে হবে—নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।

এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বিচারক ও সাক্ষীদের। যদিও এককালে এ দুটি বিষয়ই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও মহত্বের নিদর্শন। যেমন, কাজি আবদুল হামিদ ছিলেন এমন এক বিচারক—যিনি কখনো কোনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। অন্যায় করতেন না। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করছি—একবার তিনি খলিফা মুতাদিদের নিকট খবর পাঠালেন—আপনি কিছু সরকারি জমি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার ভাড়া পরিশোধ করুন।'

খবর পেয়ে খলিফা ভাড়া পরিশোধ করলেন। এরপর খলিফা বিচারক আবদুল হামিদকে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি মারা গিয়েছে, তার নিকট আমার কিছু অর্থ প্রাপ্য ছিল। আপনি এটি প্রদানের ব্যবস্থা করুন।'

বিচারক খলিফাকে বললেন, 'আপনি যখন আমাকে এই বিচারকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেদিন বলেছিলেন, এই দায়িত্বটি আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে অর্পণ করলাম। অর্থাৎ আমাকে বিচারক হিসেবেই বিচার করতে হবে। আর সে হিসাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আপনি যে সম্পদের দাবি করছেন, এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে দু-জন সাক্ষী ব্যতীত আমি আপনার পক্ষে কিছু করতে সক্ষম নই।'

এই ছিল তখনকার বিচার ও বিচারকের সম্মান! সাক্ষীর বিষয়টিও ছিল এমন মর্যাদাকর। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—একবার এক খলিফার নিকট কিছু লোক এল। খাদেম বলল, তোমরা কি আমার মুনিবের পক্ষে এ বিষয়ে সাক্ষী হবে?

লোকগুলো খাদেমের কথা অনুযায়ী বিষয়টির ওপর খলিফার সাক্ষী হতে রাজি হলো। এ সময় হজরত মাজঝুয়ি আমিরের নিকট একান্তে এগিয়ে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই কাগজে যা লেখা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনার সাক্ষী হতে পারি?

খলিফা বললেন, অসুবিধা নেই। তুমি সাক্ষী থাকো।

মাজঝুয়ি বললেন, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার এভাবে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যতক্ষণ না নিজ মুখে 'হ্যাঁ' বলবেন, ততক্ষণ আমি সাক্ষী হব না।

খলিফা বললেন, হ্যাঁ। সাক্ষী হতে পারো।

এরপর হজরত মাজঝুয়ি খলিফার বিষয়ে সাক্ষী হলেন। এমনটাই ছিল তখন বিচার, বিচারক এবং সাক্ষ্য ও সাক্ষীর মর্যাদা ও মহত্ব।

কিন্তু আমাদের যুগে এসে সবই উল্টে গেছে। এমনকি মানুষ আজ ঘুষ দিয়েও সাক্ষী হতে চায়। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া অর্জন করে। তুমি দেখবে, নিজেদের অদেখা ও অজানা বিষয়েও তারা সাক্ষ্য দেবার জন্য কেমন প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়!

আবুল মায়ালি ইবনে শাফি আমাকে বলেছেন, আমাকে একবার একটি সাধারণ বন্দির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। আল্লাহর নিকট এ জন্য আমি খুব ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ মাফ করুন!

আমরা জানি, সাক্ষ্য প্রদানের কারণে সাক্ষীদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। বরং সময়-অসময়ে তার দরজায় করাঘাত পড়ে এবং নিজের কাপড় টেনে নিজের সময় খরচ করে নিজেকেই সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। এটা কোনো সুখ ও লাভের বিষয় নয়। এ কারণে প্রবাদকথা আছে—আল্লাহ তোমাকে সাক্ষী হওয়ার নিয়ামত থেকে রক্ষা করুন!

একারণে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাক্ষী হওয়া এবং বিচারক হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন।

যেমন, হজরত ইবরাহিম নাখঈ রহ. এর ক্ষেত্রে লোকেরা যখন বলতে লাগল, আপনিই হবেন আমাদের বিচারক, তখন তিনি লাল জামা গায়ে বাজারে যাওয়া-আসা করতে শুরু করলেন। দেখতে বেখাপ্পা লাগে। অবশেষে লোকেরাই আবার বলতে লাগল—'তিনি এ পদের যোগ্য নন।'

আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়—একবার খলিফা হারুনুর রশিদ একজন প্রাজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা তাকে বিচারকের দায়িত্ব দিতে চান। লোকটি খলিফার নিকট এসে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি কেমন আছেন এবং আপনার সন্তান-সন্ততি কেমন আছে?...

লোকটির এমন বোকামিপূর্ণ কথা শুনে আশপাশের লোকেরা বলল—এ তো পাগল। ফলে তাকে বিচারকের পদ প্রদান করা থেকে বিরত রাখা হলো।

আল্লাহর কসম! তার এই পাগলামিই ছিল প্রাজ্ঞতা। বিচারকের পদ থেকে বিরত থাকার জন্য তার এই বোকামিই ছিল বুদ্ধিমত্তা।

কিন্তু আমাদের অবস্থা কী! আমার ধারণা, আখেরাতের প্রতি আমাদের ঈমান রয়েছে খুবই টলটলায়মান অবস্থায়। সামান্য ঝাঁকিতেই গড়িয়ে পড়ে পড়ে ভাব। তাই আমাদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে হিফাজত রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অনর্থক কাজ থেকে আল্লাহ চিরমুক্ত

📄 অনর্থক কাজ থেকে আল্লাহ চিরমুক্ত


এখন যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করতে চাই, এ ধরনের বিষয় এই কিতাবে এর আগেও গিয়েছে। তারপরও সেটা আবার উল্লেখ করছি। কারণ, এটা বারবার নফসের নিকট পুনরাবৃত্তি করা অতি জরুরি। নফস যেন এসকল বিষয়ে উদাসীন ও বেখেয়াল না হয়।

একজন মুমিন ব্যক্তির ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হলেন আমাদের প্রতিপালক। তিনি সকল কিছু জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময়; সুতরাং তিনি কোনো অনর্থক কাজ করেন না।

আমাদের এই জ্ঞানটুকু আমাদের তাকদির এবং ঘটিত কোনো বিষয়ে আপত্তি ও অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। আর এই জ্ঞানটুকু না থাকার কারণে অনেক মানুষকে দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলার হিকমত ও পরিচালনার ব্যাপারে সীমাহীন অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। দোষ-ত্রুটি খুঁজতে থাকে। সেগুলোর নিন্দামন্দ করে।

ঠিক এই ধরনের কাজ জগতের প্রথম যে করেছিল, তার নাম ইবলিস। ইবলিস শয়তান। সে আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা না করে বলেছিল,

أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ

আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে উজ্জ্বল আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ মাটি দ্বারা। [সুরা আরাফ: ১২]

অর্থাৎ ইবলিস বলতে চেয়েছে—আপনার এভাবে আগুনের ওপর এই তুচ্ছ মাটিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা যুক্তির কাজ নয়।

আমরা ফকিহদের দেখি, মাসআলা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনায় সকল সময় এটা-ওটা নিয়ে অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। আর তারা এটা করে থাকে বাহ্যিক কাজ দেখে। হ্যাঁ, এভাবে অভিযোগ যখন আমাদের মতো মানুষের কোনো কাজের ক্ষেত্রে হয়, তখন তো ঠিক আছে; হতেই পারে। মানুষের ভুল হয়। তার অজ্ঞতার সীমা নেই। তার সীমাবদ্ধতারও শেষ নেই।

কিন্তু এই মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধ বোধ, বুঝ ও সক্ষমতা নিয়ে যদি কেউ জগতের স্রষ্টার হিকমতের বিচার করতে বের হয়, তখন বিষয়টা কেমন হয়ে দাঁড়ায়! তাদের অভিযোগ ও আপত্তিটা হয়ে পড়ে পাগলের মতো, নাদানের মতো।

আর যারা ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা তাড়িত, তারাও বিভিন্ন অভিযোগ-আপত্তি করতে থাকে। কারণ, তারা চায়, জগতের সকল জিনিস তাদের চাহিদা ও কামনা অনুযায়ী পরিচালিত হোক। কিন্তু যখনই এর বিপরীত হয়, তখনই তারা অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে থাকে।

আবার কেউ কেউ আছে, যারা মৃত্যুর ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে। তারা অভিযোগ করে বলে, তিনি সৃষ্টি করলেন আবার বিনষ্ট করছেন—এটা কী হলো? জীবন দান করেই আবার যেন এই আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু! কত ক্ষুদ্র জীবন! এই এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কতটুকুই-বা অর্জন করা যায়! কতটুকুই-বা ভোগ ও আস্বাদন করা যায়!!

আমাদের এক বন্ধু ছিল। কোরআন পড়েছে। বিভিন্ন কিরাআতে চমৎকার পারদর্শিতা অর্জন করেছে এবং বহু হাদিস সে শ্রবণ করেছে এবং সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু এরপরও সে পরবর্তী জীবনে গোনাহের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। ৭০ বছর বেঁচে ছিল। এরপর একদিন যখন মৃত্যুর সময় উপনীত হলো, আমাকে একজন শুনিয়েছে, তখন সে বলতে লাগল, দুনিয়া তো আমার ওপর সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এর কতটুকুই-বা উপভোগ করা গেল!

এভাবে আরেক ব্যক্তির কথা শুনেছি, মৃত্যুর সময় সে বলছিল—আমার প্রতিপালক আমার প্রতি জুলুম করে ফেলছে! (নাউজুবillah)।

এমন আরও অনেক ঘটনা ও কথা রয়েছে। এ ধরনের ইন্দ্রিয়তাড়িত ব্যক্তিদের এসকল নিকৃষ্টতম অভিযোগ ও ঘটনাগুলো বর্ণনা করতেও অপছন্দ লাগে। তারা যদি বুঝত যে, এই দুনিয়া হলো প্রতিযোগিতার স্থান, এটি ধৈর্যধারণের ময়দান। এটি পরীক্ষার জায়গা; যাতে এখানে স্রষ্টার প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও আত্মসমর্পণের বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এগুলো যদি তারা বুঝত, তাহলে স্রষ্টার কোনো কাজের ক্ষেত্রে তারা আর অভিযোগ আপত্তি করত না।

ঘায়! মানুষ যদি বুঝত, রাতদিনের কঠিন পরিশ্রমে তারা এত ব্যাকুল হয়ে যেই শান্তি স্বস্তি এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদাগুলো পূরণের কামনা করছে, তা তো রয়েছে তাদের সমুখে, ভবিষ্যতে, আখেরাতে।

দুনিয়া হলো শস্যক্ষেতের মতো। এখানে যখন সে কর্মরত থাকবে, তখন তার কষ্ট এবং শরীরে ধূলি-কাঁদা লাগবে। কিন্তু যখন সে এখানকার কাজ সম্পন্ন করবে, তখন সে বিশ্রাম পাবে। সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করবে। শান্তি-সুখের অবকাশ পাবে।

ঘায়! কে বুঝবে, দুনিয়ার এই তুচ্ছ শরীর পবিত্র আত্মাকে চিরকাল ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে না। মৃত্যুর মাধ্যমে তাই আত্মাকে তার থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তার জন্য এমন এক স্থায়ী শরীর প্রদান করা হবে, যার মধ্যে এই আত্মা চিরকাল অবস্থান করবে। তাহলে কেন এই মৃত্যু নিয়ে এত অভিযোগ?

এরপরও যে ব্যক্তি অভিযোগ করতে চায়, তাকে তুমি বলো,

﴿فَلْيَمْدُدْ بِسَبَبٍ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ لِيَقْطَعْ فَلْيَنْظُرْ هَلْ يُذْهِبَنَّ كَيْدُهُ مَا يَغِيظُ﴾

সে আকাশ পর্যন্ত একটি রশি টানিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করুক। তারপর দেখুক, তার প্রচেষ্টা তার আক্রোশ দূর করে কি না! [সুরা হজ: ১৫]

তুমি তাকে আরও বলো, এভাবে অভিযোগ-আপত্তিতে তাকদিরের কোনো হেরফের হবে না। আর যদি মেনে নেয়, তবুও তো তাকদির তার গতিতেই চলবে। সুতরাং বিক্ষুব্ধ অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালায় অনুগত দাস হওয়া অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়া অনেক কল্যাণকর।

যেমন 'অদাহুল ইয়ামান' যখন বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, তার চুপ থাকাটাই সুন্দর হয়েছিল। খলিফা যখন বললেন, হে বাক্স, আমরা যা ধারণা করছি, তা যদি তোমার মধ্যে থাকে, তবে তোমার অস্তিত্বই আমরা মুছে দিলাম, আর যদি তা না থাকে, তবে তো আমরা প্রাসাদের কাঠের একটি বাক্সকেই শুধু দাফন করলাম। '১০৮

এসময় 'অদাহুল ইয়ামান' যদি বাঁচার জন্য বাক্সের মধ্য থেকে চিৎকার করে উঠত, এটা তার কোনো উপকারই করত না। বরং তাকে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। বরং এমন অবস্থায় নীরবতাই কখনো কখনো বাঁচার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে।

টিকাঃ
১০৮. এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে। ঘটনাটি যেমন প্রেমের রসে আপ্লুত, নির্মম হত্যার দ্বারা তেমনি বেদনাবহ। সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণটি এমন- 'অদাহুল ইয়ামান' (وضاح اليمن) ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি। এটি তার উপাধী। তার আসল নাম আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল আলখাওলানি। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের রাজত্ব চলছে। অদাহুল ইয়ামানের কবিতার ধার ছিল প্রখর। কিন্তু সে নিজে ছিল চারিত্রিকভাবে অধঃপতিত। বিয়ে করেনি। কিন্তু বহু নারীর সঙ্গ সে লাভ করেছে। এদিকে খলিফা ওয়ালিদের স্ত্রী 'উম্মুল বানিন' হজ করার ইচ্ছা করলেন। খলিফা তাকে এক বিশ্বস্ত দাসীর তত্ত্বাবধানে হজের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। 'উম্মুল বানিন' মক্কায় পৌঁছে হজ আদায় করলেন। আগে থেকেই তার কবিতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। তিনি চাইতেন অন্যদের মতো তাকে নিয়েও যেন কবিরা কিছু 'প্রশংসা-কাব্য' রচনা করে। তিনি খবর নিয়ে জানলেন এ এলাকায় 'অদাহুল ইয়ামান' এর প্রচণ্ড কবি-খ্যাতি রয়েছে। তিনি কবিকে দিয়ে তার 'স্তুতি' রচনা ও শোনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ রাজি হচ্ছিলেন না। তবে তিনি যেহেতু আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন, তাই অবশেষে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই ঘটল। কবিতায় স্তুতি শুনে এবং প্রেমের কবিতা রচনা করতে গিয়ে একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেল। কিছুদিন পর খলিফার স্ত্রী সিরিয়ায় ফিরে এলেন। কবিকেও সিরিয়ায় চলে আসতে বলে এলেন। কিছুদিন পর যথারীতি প্রেমিক কবিও সিরিয়ায় পৌঁছে গেল। সিরিয়ায় এসে খলিফার দরবারে কাব্য রচনা করে আর গোপনে তার স্বতন্ত্র প্রাসাদে অভিসারে গমন করে। অন্য কেউ এসে পড়ার আভাস পেলেই কক্ষে রাখা বাক্সগুলোর মধ্যে বড়টির মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। বাক্সগুলোর মধ্যে সাধারণত জামা-কাপড় রাখা হতো। কিছুদিনের মধ্যেই গোপন মাধ্যমে প্রেমের বিষয়টি খলিফার কানে গেল। খলিফা ওয়ালিদ একদিন হঠাৎ স্ত্রী উম্মুল বানিনের কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন। বিভিন্ন কথার শেষে খলিফা স্ত্রীকে বললেন, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? স্ত্রী বললেন, আমার প্রাণের চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি। তাহলে তোমার কক্ষের এই বড় বাক্সটি আমাকে দিয়ে দাও। স্ত্রী বললেন, এটি ছাড়া অন্যগুলি নিন। খলিফা বললেন, আমার এটাই পছন্দ। এর কারু-সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। নিরুপায় হয়ে স্ত্রী বাক্সটি প্রদানে রাজি হলেন। খলিফা তার কিছু দাস-অনুচরকে ডেকে বললেন এটি বাইরে নিয়ে যাও। বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর তিনি তাদেরকে বাগানের মধ্যে একটি গভীর গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। দ্রুত নির্দেশ পালন করা হলো। এবার বাক্সটিকে সেই গর্তের নিকট নিয়ে বাক্সকে সম্বোধন করে বললেন, হে বাক্স। আমরা যা ধারণা করছি, তোমার মধ্যে যদি তা থাকে, তবে তো তোমার চিহ্ন পর্যন্ত আমরা মুছে ফেলব। আর যদি তা না থাকে, তবে তো নিছক প্রাসাদের একটি কাঠের বাক্সকে আমরা দাফন করছি। তার সাথে দাফন করছি অপবাদের সূত্রটিও। কিন্তু বাক্সের মধ্য থেকে কোনো আওয়াজ আসে না। এভাবেই বাক্সটিকে গভীর গর্তে দাফন করে দেওয়া হয়। এরপর আর কখনো 'অদাহুল ইয়ামান'কে ধরাপৃষ্ঠে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়- সে বাক্সের মধ্যেই চুপ করে ছিল এবং বাক্সটির সাথে সে নিজেও দাফন হয়ে যায়- অনুবাদক।

এখন যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করতে চাই, এ ধরনের বিষয় এই কিতাবে এর আগেও গিয়েছে। তারপরও সেটা আবার উল্লেখ করছি। কারণ, এটা বারবার নফসের নিকট পুনরাবৃত্তি করা অতি জরুরি। নফস যেন এসকল বিষয়ে উদাসীন ও বেখেয়াল না হয়।

একজন মুমিন ব্যক্তির ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হলেন আমাদের প্রতিপালক। তিনি সকল কিছু জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময়; সুতরাং তিনি কোনো অনর্থক কাজ করেন না।

আমাদের এই জ্ঞানটুকু আমাদের তাকদির এবং ঘটিত কোনো বিষয়ে আপত্তি ও অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। আর এই জ্ঞানটুকু না থাকার কারণে অনেক মানুষকে দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলার হিকমত ও পরিচালনার ব্যাপারে সীমাহীন অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। দোষ-ত্রুটি খুঁজতে থাকে। সেগুলোর নিন্দামন্দ করে।

ঠিক এই ধরনের কাজ জগতের প্রথম যে করেছিল, তার নাম ইবলিস। ইবলিস শয়তান। সে আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা না করে বলেছিল,

أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ

আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে উজ্জ্বল আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ মাটি দ্বারা। [সুরা আরাফ: ১২]

অর্থাৎ ইবলিস বলতে চেয়েছে—আপনার এভাবে আগুনের ওপর এই তুচ্ছ মাটিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা যুক্তির কাজ নয়।

আমরা ফকিহদের দেখি, মাসআলা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনায় সকল সময় এটা-ওটা নিয়ে অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। আর তারা এটা করে থাকে বাহ্যিক কাজ দেখে। হ্যাঁ, এভাবে অভিযোগ যখন আমাদের মতো মানুষের কোনো কাজের ক্ষেত্রে হয়, তখন তো ঠিক আছে; হতেই পারে। মানুষের ভুল হয়। তার অজ্ঞতার সীমা নেই। তার সীমাবদ্ধতারও শেষ নেই।

কিন্তু এই মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধ বোধ, বুঝ ও সক্ষমতা নিয়ে যদি কেউ জগতের স্রষ্টার হিকমতের বিচার করতে বের হয়, তখন বিষয়টা কেমন হয়ে দাঁড়ায়! তাদের অভিযোগ ও আপত্তিটা হয়ে পড়ে পাগলের মতো, নাদানের মতো।

আর যারা ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা তাড়িত, তারাও বিভিন্ন অভিযোগ-আপত্তি করতে থাকে। কারণ, তারা চায়, জগতের সকল জিনিস তাদের চাহিদা ও কামনা অনুযায়ী পরিচালিত হোক। কিন্তু যখনই এর বিপরীত হয়, তখনই তারা অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে থাকে।

আবার কেউ কেউ আছে, যারা মৃত্যুর ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে। তারা অভিযোগ করে বলে, তিনি সৃষ্টি করলেন আবার বিনষ্ট করছেন—এটা কী হলো? জীবন দান করেই আবার যেন এই আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু! কত ক্ষুদ্র জীবন! এই এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কতটুকুই-বা অর্জন করা যায়! কতটুকুই-বা ভোগ ও আস্বাদন করা যায়!!

আমাদের এক বন্ধু ছিল। কোরআন পড়েছে। বিভিন্ন কিরাআতে চমৎকার পারদর্শিতা অর্জন করেছে এবং বহু হাদিস সে শ্রবণ করেছে এবং সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু এরপরও সে পরবর্তী জীবনে গোনাহের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। ৭০ বছর বেঁচে ছিল। এরপর একদিন যখন মৃত্যুর সময় উপনীত হলো, আমাকে একজন শুনিয়েছে, তখন সে বলতে লাগল, দুনিয়া তো আমার ওপর সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এর কতটুকুই-বা উপভোগ করা গেল!

এভাবে আরেক ব্যক্তির কথা শুনেছি, মৃত্যুর সময় সে বলছিল—আমার প্রতিপালক আমার প্রতি জুলুম করে ফেলছে! (নাউজুবillah)।

এমন আরও অনেক ঘটনা ও কথা রয়েছে। এ ধরনের ইন্দ্রিয়তাড়িত ব্যক্তিদের এসকল নিকৃষ্টতম অভিযোগ ও ঘটনাগুলো বর্ণনা করতেও অপছন্দ লাগে। তারা যদি বুঝত যে, এই দুনিয়া হলো প্রতিযোগিতার স্থান, এটি ধৈর্যধারণের ময়দান। এটি পরীক্ষার জায়গা; যাতে এখানে স্রষ্টার প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও আত্মসমর্পণের বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এগুলো যদি তারা বুঝত, তাহলে স্রষ্টার কোনো কাজের ক্ষেত্রে তারা আর অভিযোগ আপত্তি করত না।

ঘায়! মানুষ যদি বুঝত, রাতদিনের কঠিন পরিশ্রমে তারা এত ব্যাকুল হয়ে যেই শান্তি স্বস্তি এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদাগুলো পূরণের কামনা করছে, তা তো রয়েছে তাদের সমুখে, ভবিষ্যতে, আখেরাতে।

দুনিয়া হলো শস্যক্ষেতের মতো। এখানে যখন সে কর্মরত থাকবে, তখন তার কষ্ট এবং শরীরে ধূলি-কাঁদা লাগবে। কিন্তু যখন সে এখানকার কাজ সম্পন্ন করবে, তখন সে বিশ্রাম পাবে। সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করবে। শান্তি-সুখের অবকাশ পাবে।

ঘায়! কে বুঝবে, দুনিয়ার এই তুচ্ছ শরীর পবিত্র আত্মাকে চিরকাল ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে না। মৃত্যুর মাধ্যমে তাই আত্মাকে তার থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তার জন্য এমন এক স্থায়ী শরীর প্রদান করা হবে, যার মধ্যে এই আত্মা চিরকাল অবস্থান করবে। তাহলে কেন এই মৃত্যু নিয়ে এত অভিযোগ?

এরপরও যে ব্যক্তি অভিযোগ করতে চায়, তাকে তুমি বলো,

﴿فَلْيَمْدُدْ بِسَبَبٍ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ لِيَقْطَعْ فَلْيَنْظُرْ هَلْ يُذْهِبَنَّ كَيْدُهُ مَا يَغِيظُ﴾

সে আকাশ পর্যন্ত একটি রশি টানিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করুক। তারপর দেখুক, তার প্রচেষ্টা তার আক্রোশ দূর করে কি না! [সুরা হজ: ১৫]

তুমি তাকে আরও বলো, এভাবে অভিযোগ-আপত্তিতে তাকদিরের কোনো হেরফের হবে না। আর যদি মেনে নেয়, তবুও তো তাকদির তার গতিতেই চলবে। সুতরাং বিক্ষুব্ধ অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালায় অনুগত দাস হওয়া অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়া অনেক কল্যাণকর।

যেমন 'অদাহুল ইয়ামান' যখন বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, তার চুপ থাকাটাই সুন্দর হয়েছিল। খলিফা যখন বললেন, হে বাক্স, আমরা যা ধারণা করছি, তা যদি তোমার মধ্যে থাকে, তবে তোমার অস্তিত্বই আমরা মুছে দিলাম, আর যদি তা না থাকে, তবে তো আমরা প্রাসাদের কাঠের একটি বাক্সকেই শুধু দাফন করলাম। '১০৮

এসময় 'অদাহুল ইয়ামান' যদি বাঁচার জন্য বাক্সের মধ্য থেকে চিৎকার করে উঠত, এটা তার কোনো উপকারই করত না। বরং তাকে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। বরং এমন অবস্থায় নীরবতাই কখনো কখনো বাঁচার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে।

টিকাঃ
১০৮. এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে। ঘটনাটি যেমন প্রেমের রসে আপ্লুত, নির্মম হত্যার দ্বারা তেমনি বেদনাবহ। সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণটি এমন- 'অদাহুল ইয়ামান' (وضاح اليمن) ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি। এটি তার উপাধী। তার আসল নাম আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল আলখাওলানি। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের রাজত্ব চলছে। অদাহুল ইয়ামানের কবিতার ধার ছিল প্রখর। কিন্তু সে নিজে ছিল চারিত্রিকভাবে অধঃপতিত। বিয়ে করেনি। কিন্তু বহু নারীর সঙ্গ সে লাভ করেছে। এদিকে খলিফা ওয়ালিদের স্ত্রী 'উম্মুল বানিন' হজ করার ইচ্ছা করলেন। খলিফা তাকে এক বিশ্বস্ত দাসীর তত্ত্বাবধানে হজের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। 'উম্মুল বানিন' মক্কায় পৌঁছে হজ আদায় করলেন। আগে থেকেই তার কবিতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। তিনি চাইতেন অন্যদের মতো তাকে নিয়েও যেন কবিরা কিছু 'প্রশংসা-কাব্য' রচনা করে। তিনি খবর নিয়ে জানলেন এ এলাকায় 'অদাহুল ইয়ামান' এর প্রচণ্ড কবি-খ্যাতি রয়েছে। তিনি কবিকে দিয়ে তার 'স্তুতি' রচনা ও শোনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ রাজি হচ্ছিলেন না। তবে তিনি যেহেতু আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন, তাই অবশেষে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই ঘটল। কবিতায় স্তুতি শুনে এবং প্রেমের কবিতা রচনা করতে গিয়ে একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেল। কিছুদিন পর খলিফার স্ত্রী সিরিয়ায় ফিরে এলেন। কবিকেও সিরিয়ায় চলে আসতে বলে এলেন। কিছুদিন পর যথারীতি প্রেমিক কবিও সিরিয়ায় পৌঁছে গেল। সিরিয়ায় এসে খলিফার দরবারে কাব্য রচনা করে আর গোপনে তার স্বতন্ত্র প্রাসাদে অভিসারে গমন করে। অন্য কেউ এসে পড়ার আভাস পেলেই কক্ষে রাখা বাক্সগুলোর মধ্যে বড়টির মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। বাক্সগুলোর মধ্যে সাধারণত জামা-কাপড় রাখা হতো। কিছুদিনের মধ্যেই গোপন মাধ্যমে প্রেমের বিষয়টি খলিফার কানে গেল। খলিফা ওয়ালিদ একদিন হঠাৎ স্ত্রী উম্মুল বানিনের কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন। বিভিন্ন কথার শেষে খলিফা স্ত্রীকে বললেন, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? স্ত্রী বললেন, আমার প্রাণের চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি। তাহলে তোমার কক্ষের এই বড় বাক্সটি আমাকে দিয়ে দাও। স্ত্রী বললেন, এটি ছাড়া অন্যগুলি নিন। খলিফা বললেন, আমার এটাই পছন্দ। এর কারু-সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। নিরুপায় হয়ে স্ত্রী বাক্সটি প্রদানে রাজি হলেন। খলিফা তার কিছু দাস-অনুচরকে ডেকে বললেন এটি বাইরে নিয়ে যাও। বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর তিনি তাদেরকে বাগানের মধ্যে একটি গভীর গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। দ্রুত নির্দেশ পালন করা হলো। এবার বাক্সটিকে সেই গর্তের নিকট নিয়ে বাক্সকে সম্বোধন করে বললেন, হে বাক্স। আমরা যা ধারণা করছি, তোমার মধ্যে যদি তা থাকে, তবে তো তোমার চিহ্ন পর্যন্ত আমরা মুছে ফেলব। আর যদি তা না থাকে, তবে তো নিছক প্রাসাদের একটি কাঠের বাক্সকে আমরা দাফন করছি। তার সাথে দাফন করছি অপবাদের সূত্রটিও। কিন্তু বাক্সের মধ্য থেকে কোনো আওয়াজ আসে না। এভাবেই বাক্সটিকে গভীর গর্তে দাফন করে দেওয়া হয়। এরপর আর কখনো 'অদাহুল ইয়ামান'কে ধরাপৃষ্ঠে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়- সে বাক্সের মধ্যেই চুপ করে ছিল এবং বাক্সটির সাথে সে নিজেও দাফন হয়ে যায়- অনুবাদক।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা

📄 একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা


যে ব্যক্তি দুনিয়ার বিষয়াবলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছে, নিশ্চয়ই সে বুঝেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা হলো, মানুষ দুনিয়ার কামনা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে যেন বিরত রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোনো বৈধ বিষয়েও আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করার দিকে ঝুঁকেছে, সেখানেই সে তার প্রতিটি সুখের সাথে এক বা একাধিক দুঃখের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিটি স্বস্তির সাথে যুক্ত হয়েছে ক্লান্তি। প্রতিটি অপূর্ণ আস্বাদন তার চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে; কিছুতেই তৃপ্তি আসেনি।

এভাবে যখনই সে দুনিয়া থেকে কিছু অংশ উঠিয়ে নিয়েছে, দুনিয়াও তার থেকে সমপরিমাণ অংশ নিয়ে নিজের কমতি পুষিয়ে নিয়েছে। দুনিয়ার এ এক মহা নির্মম রীতি। বিনিময় ছাড়া সে কাউকে কিছুই প্রদান করে না। যেমন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আয়েশা রা.-কে বেশি ভালোবেসেছিলেন, ঠিক প্রতিফলে কষ্টের অংশ হিসেবে তার ওপর 'ইফক' (অপবাদ)-এর ঘটনা আপতিত হয়েছে। তিনি যখন যায়নাব রা.-এর দিকে ঝুঁকেছেন, তখন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে সেই ঘটনা—

'এরপর যায়দ যখন তার স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম; যাতে করে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে, যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করে।' [সুরা আহযাব : ৩৭]

অতএব, দুনিয়ার প্রতিটি সুখের সাথে লেগে আছে দুঃখ। এটা আমরা এভাবেও বুঝতে পারি, যখন কারও প্রেমাস্পদ বা কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির মিলন ও সান্নিধ্য অর্জন হয়, বুদ্ধিমত্তার চোখ তখনো দেখতে পায় পরমুহূর্তের ওত পেতে বসে থাকা কষ্টকর বিরহ ও বিচ্ছিন্নতা। তাই সেই প্রাপ্তির সময়ও মানুষের হৃদয় বিরহের চিন্তায় ব্যথিত হয়।

জনৈক কবি বলেন,

أتم الحزن عندي في سرور ... تيقن عنه صاحبه انتقالاً

সুখের মাঝেও আমার নিকট সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় জানে সেই প্রিয়, অচিরেই হারিয়ে যাবে এই সুখের সময়।

সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তি বুঝতে পারে, দুনিয়াতে এসকল অপূর্ণতা ও পঙ্কিলতা প্রদানের দ্বারা আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত থাকে। এ কারণে দুনিয়াতে নিজের প্রয়োজন পরিমাণ অর্জনের প্রতিই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। দুনিয়ার জন্য অধিক ব্যস্ততা বর্জন করতে হবে। তাহলেই শুধু আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা ও ইবাদতে পূর্ণ মনোযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি এসকল দিকে ভ্রূক্ষেপ করে না, তাকে একদিন বহু বঞ্চনার ওপর আফসোস করতে হবে। তখন সে আফসোস কোনো উপকারে আসবে না।

যে ব্যক্তি দুনিয়ার বিষয়াবলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছে, নিশ্চয়ই সে বুঝেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা হলো, মানুষ দুনিয়ার কামনা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে যেন বিরত রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোনো বৈধ বিষয়েও আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করার দিকে ঝুঁকেছে, সেখানেই সে তার প্রতিটি সুখের সাথে এক বা একাধিক দুঃখের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিটি স্বস্তির সাথে যুক্ত হয়েছে ক্লান্তি। প্রতিটি অপূর্ণ আস্বাদন তার চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে; কিছুতেই তৃপ্তি আসেনি।

এভাবে যখনই সে দুনিয়া থেকে কিছু অংশ উঠিয়ে নিয়েছে, দুনিয়াও তার থেকে সমপরিমাণ অংশ নিয়ে নিজের কমতি পুষিয়ে নিয়েছে। দুনিয়ার এ এক মহা নির্মম রীতি। বিনিময় ছাড়া সে কাউকে কিছুই প্রদান করে না। যেমন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আয়েশা রা.-কে বেশি ভালোবেসেছিলেন, ঠিক প্রতিফলে কষ্টের অংশ হিসেবে তার ওপর 'ইফক' (অপবাদ)-এর ঘটনা আপতিত হয়েছে। তিনি যখন যায়নাব রা.-এর দিকে ঝুঁকেছেন, তখন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে সেই ঘটনা—

'এরপর যায়দ যখন তার স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম; যাতে করে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে, যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করে।' [সুরা আহযাব : ৩৭]

অতএব, দুনিয়ার প্রতিটি সুখের সাথে লেগে আছে দুঃখ। এটা আমরা এভাবেও বুঝতে পারি, যখন কারও প্রেমাস্পদ বা কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির মিলন ও সান্নিধ্য অর্জন হয়, বুদ্ধিমত্তার চোখ তখনো দেখতে পায় পরমুহূর্তের ওত পেতে বসে থাকা কষ্টকর বিরহ ও বিচ্ছিন্নতা। তাই সেই প্রাপ্তির সময়ও মানুষের হৃদয় বিরহের চিন্তায় ব্যথিত হয়।

জনৈক কবি বলেন,

أتم الحزن عندي في سرور ... تيقن عنه صاحبه انتقالاً

সুখের মাঝেও আমার নিকট সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় জানে সেই প্রিয়, অচিরেই হারিয়ে যাবে এই সুখের সময়।

সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তি বুঝতে পারে, দুনিয়াতে এসকল অপূর্ণতা ও পঙ্কিলতা প্রদানের দ্বারা আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত থাকে। এ কারণে দুনিয়াতে নিজের প্রয়োজন পরিমাণ অর্জনের প্রতিই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। দুনিয়ার জন্য অধিক ব্যস্ততা বর্জন করতে হবে। তাহলেই শুধু আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা ও ইবাদতে পূর্ণ মনোযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি এসকল দিকে ভ্রূক্ষেপ করে না, তাকে একদিন বহু বঞ্চনার ওপর আফসোস করতে হবে। তখন সে আফসোস কোনো উপকারে আসবে না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কিছু উপদেশ

📄 কিছু উপদেশ


বুদ্ধিমান ব্যক্তি দুনিয়াতে তার জীবনযাপনকে বুদ্ধিমত্তার সাথেই পরিচালনা করে। সে যদি দরিদ্র হয়, উপার্জনের চেষ্টা করে। বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করে; যাতে অর্থের জন্য মানুষের নিকট হাত পাততে না হয়। অনাবশ্যক খরচের মাধ্যমগুলোকে কমিয়ে আনে এবং অল্পেতুষ্ট থাকে। এভাবেই সে মানুষের অপ্রীতিকর অনুগ্রহ ও দয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। তখন সে মানুষের মাঝে নিজের সম্মান মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।

আর সে যদি ধনবান হয়, তাহলেও সে তার খরচের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে। অবিবেচকের মতো নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিজেই আবার অন্যের দারস্থ হয়ে পড়ে না।

কিন্তু নির্বোধ ব্যক্তি এ বিষয়ে ভীষণ বোকামি করে। সে খরচের ক্ষেত্রে অপচয়ের সীমায় চলে যায় এবং সম্পদ নিয়ে এমন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়; যাতে তার বিপক্ষের লোকেরা তার খরচ দেখে চুপসে যায় এবং তার কাছে ছোট হয়ে যায়। এভাবে সে নিজেই তার সম্পদে চোখ লাগার ব্যবস্থা করে ফেলে।

কিন্তু আমাদের জন্য সর্বক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত। যা এবং যতটুকু গোপন রাখা উচিত, তা গোপন রাখাই ভালো। নতুবা পরিণামে বিপদে পতিত হতে হয়।

একবার এক ডুবুরী সাগরে অনেক সম্পদ খুঁজে পেল। অনেক মণি-মুক্তা-জহরত। এরপর সে কোনো দিকে খেয়াল না করে সমানে দু-হাতে এগুলো খরচ করতে শুরু করল। অচিরেই তার সম্পদের কথা মানুষদের মাঝে জানাজানি হয়ে গেল। প্রতিফলে একদিন তার সকল সম্পদ ডাকাতি হয়ে গেল। ডুবুরী আবার সেই আগেই মতোই নিঃস্ব, দরিদ্র ও সম্বলহীন হয়ে পড়ল।

স্মরণ রাখা উচিত—সম্পদ সংরক্ষণ করতে পারাও একটি বড় যোগ্যতার ব্যাপার। পরিমিত খরচ করবে। যা প্রকাশ করা উচিত নয়, তা গোপন রাখবে। এমনকি স্ত্রীর নিকটও সকল সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ করা একটি বোকামিপূর্ণ কাজ। কারণ, সম্পদ যদি তুলনামূলক কম হয়, তবে স্ত্রীর নিকট নিজের মর্যাদা কমে যাবে। আর যদি সম্পদ বেশি হয়, তাহলে স্ত্রী বেশি বেশি ভরণপোষণ চাইবে, অলংকারাদি বানিয়ে দেওয়ার বায়না ধরবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا﴾

তোমরা অবুঝদের হাতে তোমাদের সেই সম্পদ তুলে দিয়ো না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জীবনযাপনের অবলম্বন বানিয়েছেন। [সূরা নিসা: ৫]

এভাবে সন্তানকেও পুরোপুরি সম্পদের কথা জানানো উচিত নয়। নিজের একান্ত গোপন বিষয়াবলিও সংরক্ষণ করা জরুরি এবং সে সম্পর্কে সর্বক্ষণ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এমনকি বন্ধু সম্পর্কেও সতর্ক থাকবে। কারণ, বন্ধুও কখনো শত্রুতে পরিণত হয়ে যেতে পারে! কবি বলেন,

إحذر عدوك مرة ... واحذر صديقك ألف مرة

فلربما انقلب الصدي ... ق فكان أعلم بالمضرة

শত্রুর ক্ষেত্রে সতর্ক হও একবার। বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্কতা হাজার বার।

বন্ধু যদি কখনো শত্রু হয়ে যায়- সে যে তোমার ক্ষতিতে বেশি খবরদার।

বুদ্ধিমান ব্যক্তি দুনিয়াতে তার জীবনযাপনকে বুদ্ধিমত্তার সাথেই পরিচালনা করে। সে যদি দরিদ্র হয়, উপার্জনের চেষ্টা করে। বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করে; যাতে অর্থের জন্য মানুষের নিকট হাত পাততে না হয়। অনাবশ্যক খরচের মাধ্যমগুলোকে কমিয়ে আনে এবং অল্পেতুষ্ট থাকে। এভাবেই সে মানুষের অপ্রীতিকর অনুগ্রহ ও দয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। তখন সে মানুষের মাঝে নিজের সম্মান মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।

আর সে যদি ধনবান হয়, তাহলেও সে তার খরচের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে। অবিবেচকের মতো নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিজেই আবার অন্যের দারস্থ হয়ে পড়ে না।

কিন্তু নির্বোধ ব্যক্তি এ বিষয়ে ভীষণ বোকামি করে। সে খরচের ক্ষেত্রে অপচয়ের সীমায় চলে যায় এবং সম্পদ নিয়ে এমন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়; যাতে তার বিপক্ষের লোকেরা তার খরচ দেখে চুপসে যায় এবং তার কাছে ছোট হয়ে যায়। এভাবে সে নিজেই তার সম্পদে চোখ লাগার ব্যবস্থা করে ফেলে।

কিন্তু আমাদের জন্য সর্বক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত। যা এবং যতটুকু গোপন রাখা উচিত, তা গোপন রাখাই ভালো। নতুবা পরিণামে বিপদে পতিত হতে হয়।

একবার এক ডুবুরী সাগরে অনেক সম্পদ খুঁজে পেল। অনেক মণি-মুক্তা-জহরত। এরপর সে কোনো দিকে খেয়াল না করে সমানে দু-হাতে এগুলো খরচ করতে শুরু করল। অচিরেই তার সম্পদের কথা মানুষদের মাঝে জানাজানি হয়ে গেল। প্রতিফলে একদিন তার সকল সম্পদ ডাকাতি হয়ে গেল। ডুবুরী আবার সেই আগেই মতোই নিঃস্ব, দরিদ্র ও সম্বলহীন হয়ে পড়ল।

স্মরণ রাখা উচিত—সম্পদ সংরক্ষণ করতে পারাও একটি বড় যোগ্যতার ব্যাপার। পরিমিত খরচ করবে। যা প্রকাশ করা উচিত নয়, তা গোপন রাখবে। এমনকি স্ত্রীর নিকটও সকল সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ করা একটি বোকামিপূর্ণ কাজ। কারণ, সম্পদ যদি তুলনামূলক কম হয়, তবে স্ত্রীর নিকট নিজের মর্যাদা কমে যাবে। আর যদি সম্পদ বেশি হয়, তাহলে স্ত্রী বেশি বেশি ভরণপোষণ চাইবে, অলংকারাদি বানিয়ে দেওয়ার বায়না ধরবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا﴾

তোমরা অবুঝদের হাতে তোমাদের সেই সম্পদ তুলে দিয়ো না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জীবনযাপনের অবলম্বন বানিয়েছেন। [সূরা নিসা: ৫]

এভাবে সন্তানকেও পুরোপুরি সম্পদের কথা জানানো উচিত নয়। নিজের একান্ত গোপন বিষয়াবলিও সংরক্ষণ করা জরুরি এবং সে সম্পর্কে সর্বক্ষণ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এমনকি বন্ধু সম্পর্কেও সতর্ক থাকবে। কারণ, বন্ধুও কখনো শত্রুতে পরিণত হয়ে যেতে পারে! কবি বলেন,

إحذر عدوك مرة ... واحذر صديقك ألف مرة

فلربما انقلب الصدي ... ق فكان أعلم بالمضرة

শত্রুর ক্ষেত্রে সতর্ক হও একবার। বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্কতা হাজার বার।

বন্ধু যদি কখনো শত্রু হয়ে যায়- সে যে তোমার ক্ষতিতে বেশি খবরদার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00