📄 সময় যেন এক তরবারি
আমি দেখেছি—মানুষের অনেক নষ্ট অভ্যাস তার সময়গুলো বিনষ্ট করে দেয়। তারা এ ব্যাপারে কোনো ভ্রূক্ষেপই করে না। অথচ আমাদের পূর্ববর্তীগণ এ ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন।
আমাদের এক পূর্বসূরির নিকট একবার কিছু লোক আগমন করে বলল, আমরা হয়তো আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে ফেললাম!
তিনি ভণিতা না করে বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমি একটি কিতাব পড়ছিলাম। আপনাদের আগমনের কারণে পড়া বন্ধ রাখতে হয়েছে।
একবার কিছুলোক হজরত মারুফ কারখির নিকট উপবিষ্ট ছিল। তারা দীর্ঘক্ষণ এভাবে বসেই থাকল। অবশেষে তিনি বললেন, সূর্যের মালিক তো আর সূর্যকে চালানোর ব্যাপারে কমতি করবেন না। তবুও আপনারা উঠছেন না কেন? আর কতক্ষণ অনর্থক বসে থাকবেন?
সময়ের মূল্যায়নের ব্যাপারে আমের ইবনে কায়েস রহ.-এর প্রসিদ্ধি ছিল প্রবাদতুল্য। একবার একলোক তাকে বলল, একটু দাঁড়ান। আপনার সাথে কিছু গল্প করতে চাই।
তিনি তাকে বললেন, তবে তুমি সূর্যকে দাঁড় করিয়ে রাখো। (যদি এটা পারো, তাহলে তোমার প্রস্তাবে রাজি আছি। নতুবা নই।)
হজরত উসমান আল বাকিল্লানি রহ. সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকতেন। তিনি বলেন, খাওয়ার সময়টা আমার নিকট সবচেয়ে কষ্টকর মনে হয়। যেন আমার প্রাণ বের হয়ে যেতে চায়। কারণ, খাওয়ার কারণে সেই সময়টুকু আল্লাহর জিকির থেকে বিরত থাকতে হয়।
আমাদের এক পূর্বসূরি তার সাথি-মুরিদদের বলতেন, তোমরা যখন আমার মজলিস থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে ফিরবে, তখন সকলে আলাদা আলাদা হয়ে যাবে। এতে হয়তো কেউ কোরআন তেলাওয়াত করতে করতে যেতে পারবে। আর একসঙ্গে গেলে অনর্থক গল্পগুজব হবে।
জেনে রেখো, সময়ের একটি মুহূর্তও নষ্ট করা উচিত নয়। সহিহভাবে বর্ণিত হয়েছে—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من قال سبحان الله العظيم وبحمده غرست له بها نخلة في الجنة.
যে ব্যক্তি একবার 'সুবহানাল্লাহিল আযিম ওয়া বিহামদিহি' বলে, বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপিত হয়ে যায়। ১০৬
মানুষ জাতি এমন কত সময় অনর্থক অযথা বিনষ্ট করে; অথচ সে সময়ে কত সওয়াব ও পুরস্কার প্রাপ্তির কাজ করা যেত! মানুষের এই সময়গুলো শস্যক্ষেতের মতো। মানুষকে যেন ডেকে ডেকে বলা হচ্ছে, এই সময়ের মধ্যে তুমি যদি একটি বীজ বপন করো, তবে আমি তোমার জন্য হাজার শস্য নিয়ে হাজির হব।
এমন ঘোষণার পরও কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য বীজ বপন না করা কিংবা এক্ষেত্রে অলসতা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। আর সময়কে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি সহায়ক পদ্ধতি হলো, যতদূর সম্ভব নির্জন নিরালায় নির্ঝঞ্ঝাট থাকার চেষ্টা করা। আর মানুষের সাথে শুধু সালাম ও খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংক্ষেপে আলাপ সেরে নেওয়া। এরপর একান্ত মনে নিজের কাজে নিমগ্ন থাকা। স্বল্প আহার করা। কারণ, বেশি আহার দীর্ঘ ঘুমের কারণ হয়। রাত্র বিনষ্ট করে।
এভাবে কেউ যদি আমাদের সালাফের জীবনাচারের দিকে লক্ষ রাখে এবং প্রতিফলের বিষয়ে বিশ্বাস রাখে, তাহলে আমি এতক্ষণ যা কিছু আলোচনা করলাম এগুলো তার নিকট পরিষ্কার হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১০৬. সুনানে তিরমিজি: ১১/৩৩৮৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৭- মা. শামেলা।
📄 বৈবাহিক জীবনের ভিত্তি হলো ভালোবাসা
বুদ্ধিমান মানুষের জন্য উচিত হবে, স্ত্রী হিসেবে কোনো ভদ্র পরিবার থেকে একজন সৎ নারীকে নির্বাচন করা। দরিদ্র হলেই ভালো, তাহলে স্বামীর ঘরে এসে যে বাড়তিটুকু প্রাপ্ত হবে, তাতেই সে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ হবে। এবং কিছুটা সমবয়সী দেখে বিয়ে করাই উত্তম। কারণ, একজন বৃদ্ধ যদি কোনো কিশোরীকে বিয়ে করে, তাহলে হতে পারে, মেয়েটি পাপাচারে জড়িয়ে যাবে কিংবা তাকে হত্যা করে ফেলবে। অথবা এমনও হতে পারে যে, মেয়েটি তালাক চায়; কিন্তু লোকটি তাকে ভালোবাসে—ফলে এটা কষ্টকর একটা অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুরুষকে অতিশয় ভালো আচরণ এবং অধিক খরচপাতি দিয়ে তার ত্রুটি ও কমতিগুলো পুষিয়ে দিতে হয়。
স্ত্রী খুব বেশি বেশি স্বামীর কোল ঘেঁষে থাকবে না। নতুবা উভয়ের মধ্যে বিরক্তিভাব চলে আসতে পারে। আবার খুব দূরে দূরেও থাকবে না। নতুবা স্বামী তাকে ভুলেই যাবে এবং তার দূরবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। স্ত্রী যখন স্বামীর নিকটবর্তী হবে, তখন সে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে আসবে। নিজের ঘ্রাণের ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখবে। আর সতর্ক থাকবে, স্বামী যেন তার লজ্জাস্থান না দেখে এবং সমস্ত শরীরও যেন না দেখে। কারণ, মানুষ যত সুন্দরই হোক, তার সমস্ত শরীর সমান সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়। কিছু অংশ ও স্থান না দেখাই ভালো। এতে মনের মধ্যে একটি বিরূপ ভাবের সৃষ্টি হতে পারে।
আর ঠিক একইভাবে স্বামীর জন্যও এ বিষয়গুলো প্রযোজ্য। সে তার পুরো শরীর স্ত্রীকে দেখাবে না। নিজের ঘ্রাণ ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও যত্নবান হবে। বিশেষকরে নৈকট্যে আসার সময়। আর সহবাস করবে বিছানায়।
সম্রাট কিসরা একদিন জবাই করা পশু ছেলানো, গোশত বানানো এবং রান্নার প্রক্রিয়াগুলো দেখলেন। এগুলো তার মনের মধ্যে একটি বিরূপভাবের সৃষ্টি করল। এরপর থেকে গোশত খাওয়ার প্রতি তার রুচি উঠে গেল। একদিন তিনি তার উজিরকে বললেন, উজির মশাই, এ আমার কী হলো? গোশত খেতে রুচি হচ্ছে না!
উজির বললেন, খাবার শুধু খাবার টেবিলে দেখাই উচিত, আর নারীকে বিছানায়।
অর্থাৎ সকল জিনিসের কিছু অসৌন্দর্য থাকে। এগুলোকে এড়িয়ে তার মৌলিক উদ্দেশ্যটুকু অর্জন করাই শ্রেয়।
হজরত আয়েশা রা. বলেন, আমি কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন অঙ্গ দেখিনি। তিনিও আমার থেকে দেখেননি। শুধু একরাতে ঘুমের মধ্যে তার বস্ত্র সরে যায়। এর আগে আর কখনো আমি তাঁর সম্পূর্ণ শরীর দেখিনি।
এগুলো চারিত্রিক ভব্যতার মৌলিক কিছু বিষয়। সুরুচিবান মানুষের কিছু চারিত্রিক সুষমা ও সৌন্দর্য। এভাবে চললে পুরুষ আর নারীর ত্রুটি ধরতে পারবে না। কারণ, সে তো তার ত্রুটিগুলো দেখতেই পায়নি। এছাড়াও স্বামী এবং স্ত্রীর জন্য আলাদা বিছানা হওয়া ভালো। তারা শুধু পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়েই একত্র হবে।
অনেক মানুষ এসকল বিষয়ে অবহেলা করে এবং এগুলোকে 'সামান্য বিষয়' বলে ধারণা করে। কিন্তু এর পরিণাম হয় অতি ভয়াবহ। অবস্থা হয়ে ওঠে নিরাময়ের অযোগ্য। তখন প্রায় দেখা যায়, স্ত্রী নিজ স্বামীকে দেখিয়ে বলছে, ইনি আমার সন্তানদের বাবা। অর্থাৎ তাকে নিজের করে ভাবতে পারছে না। আবার পুরুষের ক্ষেত্রেও এমন হয়। তখন আর কেউ কারও প্রতি কোনো আগ্রহ, আকর্ষণ ও আসক্তি রাখে না। অন্তর হয়ে পড়ে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। কাছাকাছি দুটি জীবন অতিবাহিত হতে থাকে—একেবারে আগ্রহ ও আকর্ষণহীন। প্রেম ও ভালোবাসাহীন।
বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের বিবাহিতদের ভাবা উচিত এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করা উচিত। এটি অনেক বড় একটি লক্ষণীয় বিষয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক কিছু—কর্ম স্বস্তি শান্তি ও ভবিষ্যৎ।
টিকাঃ
১০৭. হুবহু এই শব্দে হাদিসটি কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে হজরত আয়েশা রা. থেকে 'মুসনাদে আহমদ'-এর বর্ণনাটি এমন- ما رأيت فرج رسول الله صلى الله عليه وسلم قط। মুসনাদে আহমদ: ৫/২২৮৭, পৃষ্ঠা: ২৪২
বুদ্ধিমান মানুষের জন্য উচিত হবে, স্ত্রী হিসেবে কোনো ভদ্র পরিবার থেকে একজন সৎ নারীকে নির্বাচন করা। দরিদ্র হলেই ভালো, তাহলে স্বামীর ঘরে এসে যে বাড়তিটুকু প্রাপ্ত হবে, তাতেই সে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ হবে। এবং কিছুটা সমবয়সী দেখে বিয়ে করাই উত্তম। কারণ, একজন বৃদ্ধ যদি কোনো কিশোরীকে বিয়ে করে, তাহলে হতে পারে, মেয়েটি পাপাচারে জড়িয়ে যাবে কিংবা তাকে হত্যা করে ফেলবে। অথবা এমনও হতে পারে যে, মেয়েটি তালাক চায়; কিন্তু লোকটি তাকে ভালোবাসে—ফলে এটা কষ্টকর একটা অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুরুষকে অতিশয় ভালো আচরণ এবং অধিক খরচপাতি দিয়ে তার ত্রুটি ও কমতিগুলো পুষিয়ে দিতে হয়。
স্ত্রী খুব বেশি বেশি স্বামীর কোল ঘেঁষে থাকবে না। নতুবা উভয়ের মধ্যে বিরক্তিভাব চলে আসতে পারে। আবার খুব দূরে দূরেও থাকবে না। নতুবা স্বামী তাকে ভুলেই যাবে এবং তার দূরবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। স্ত্রী যখন স্বামীর নিকটবর্তী হবে, তখন সে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে আসবে। নিজের ঘ্রাণের ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখবে। আর সতর্ক থাকবে, স্বামী যেন তার লজ্জাস্থান না দেখে এবং সমস্ত শরীরও যেন না দেখে। কারণ, মানুষ যত সুন্দরই হোক, তার সমস্ত শরীর সমান সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়। কিছু অংশ ও স্থান না দেখাই ভালো। এতে মনের মধ্যে একটি বিরূপ ভাবের সৃষ্টি হতে পারে।
আর ঠিক একইভাবে স্বামীর জন্যও এ বিষয়গুলো প্রযোজ্য। সে তার পুরো শরীর স্ত্রীকে দেখাবে না। নিজের ঘ্রাণ ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও যত্নবান হবে। বিশেষকরে নৈকট্যে আসার সময়। আর সহবাস করবে বিছানায়।
সম্রাট কিসরা একদিন জবাই করা পশু ছেলানো, গোশত বানানো এবং রান্নার প্রক্রিয়াগুলো দেখলেন। এগুলো তার মনের মধ্যে একটি বিরূপভাবের সৃষ্টি করল। এরপর থেকে গোশত খাওয়ার প্রতি তার রুচি উঠে গেল। একদিন তিনি তার উজিরকে বললেন, উজির মশাই, এ আমার কী হলো? গোশত খেতে রুচি হচ্ছে না!
উজির বললেন, খাবার শুধু খাবার টেবিলে দেখাই উচিত, আর নারীকে বিছানায়।
অর্থাৎ সকল জিনিসের কিছু অসৌন্দর্য থাকে। এগুলোকে এড়িয়ে তার মৌলিক উদ্দেশ্যটুকু অর্জন করাই শ্রেয়।
হজরত আয়েশা রা. বলেন, আমি কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন অঙ্গ দেখিনি। তিনিও আমার থেকে দেখেননি। শুধু একরাতে ঘুমের মধ্যে তার বস্ত্র সরে যায়। এর আগে আর কখনো আমি তাঁর সম্পূর্ণ শরীর দেখিনি।
এগুলো চারিত্রিক ভব্যতার মৌলিক কিছু বিষয়। সুরুচিবান মানুষের কিছু চারিত্রিক সুষমা ও সৌন্দর্য। এভাবে চললে পুরুষ আর নারীর ত্রুটি ধরতে পারবে না। কারণ, সে তো তার ত্রুটিগুলো দেখতেই পায়নি। এছাড়াও স্বামী এবং স্ত্রীর জন্য আলাদা বিছানা হওয়া ভালো। তারা শুধু পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়েই একত্র হবে।
অনেক মানুষ এসকল বিষয়ে অবহেলা করে এবং এগুলোকে 'সামান্য বিষয়' বলে ধারণা করে। কিন্তু এর পরিণাম হয় অতি ভয়াবহ। অবস্থা হয়ে ওঠে নিরাময়ের অযোগ্য। তখন প্রায় দেখা যায়, স্ত্রী নিজ স্বামীকে দেখিয়ে বলছে, ইনি আমার সন্তানদের বাবা। অর্থাৎ তাকে নিজের করে ভাবতে পারছে না। আবার পুরুষের ক্ষেত্রেও এমন হয়। তখন আর কেউ কারও প্রতি কোনো আগ্রহ, আকর্ষণ ও আসক্তি রাখে না। অন্তর হয়ে পড়ে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। কাছাকাছি দুটি জীবন অতিবাহিত হতে থাকে—একেবারে আগ্রহ ও আকর্ষণহীন। প্রেম ও ভালোবাসাহীন।
বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের বিবাহিতদের ভাবা উচিত এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করা উচিত। এটি অনেক বড় একটি লক্ষণীয় বিষয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক কিছু—কর্ম স্বস্তি শান্তি ও ভবিষ্যৎ।
টিকাঃ
১০৭. হুবহু এই শব্দে হাদিসটি কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে হজরত আয়েশা রা. থেকে 'মুসনাদে আহমদ'-এর বর্ণনাটি এমন- ما رأيت فرج رسول الله صلى الله عليه وسلم قط। মুসনাদে আহমদ: ৫/২২৮৭, পৃষ্ঠা: ২৪২
📄 নিজেকে লাঞ্ছিত করো না
অল্পেতুষ্ট না হলে দুনিয়াতে কারও পক্ষে সুখে বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ, যখনই অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে, চিন্তা ও অস্থিরতাও বাড়তে থাকবে সমানতালে। অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আরও অর্জন ও উপার্জনের প্রয়োজন হবে এবং এ কারণে অন্যরা তাকে দাসে পরিণত করে ছাড়বে।
আর যদি অল্পেতুষ্ট থাকা যায়, তখন আর নিজের চেয়ে ওপরের ব্যক্তির সাথে মেলামেশার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অধীনও হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি তার সমপর্যায়ের, তার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করার কিছু নেই। কারণ, তার নিকট যা আছে, তার নিজের কাছেও তা-ই আছে।
কিন্তু যে সকল ব্যক্তি অল্পেতুষ্ট থাকে না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের জীবন অন্বেষণ করে, তারা তাদের দ্বীনকে তুচ্ছ করে ফেলে। নিজেদেরকেও অন্যের সামনে নত অবনত ও অপদস্থ করে তোলে।
বিশেষ করে আলেমদের ক্ষেত্রে—তারা যদি ঘন ঘন আমির ও ধনবানদের নিকট যাতায়াত করতে থাকে, তবে তারা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে ছাড়বে। তারা সেখানে অনেক অপছন্দনীয় বিষয় দেখতে পাবে, কিন্তু নিষেধ করতে পারবে না। কখনো কোনো জালেমের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তার প্রশংসা করতেও বাধ্য হতে হবে... ইত্যাদি।
অর্থাৎ এসব করে তাদের থেকে যতটা পার্থিব বিষয় অর্জন করবে, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি তাকে লাঞ্ছনায় পড়তে হবে—নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বিচারক ও সাক্ষীদের। যদিও এককালে এ দুটি বিষয়ই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও মহত্বের নিদর্শন। যেমন, কাজি আবদুল হামিদ ছিলেন এমন এক বিচারক—যিনি কখনো কোনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। অন্যায় করতেন না। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করছি—একবার তিনি খলিফা মুতাদিদের নিকট খবর পাঠালেন—আপনি কিছু সরকারি জমি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার ভাড়া পরিশোধ করুন।'
খবর পেয়ে খলিফা ভাড়া পরিশোধ করলেন। এরপর খলিফা বিচারক আবদুল হামিদকে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি মারা গিয়েছে, তার নিকট আমার কিছু অর্থ প্রাপ্য ছিল। আপনি এটি প্রদানের ব্যবস্থা করুন।'
বিচারক খলিফাকে বললেন, 'আপনি যখন আমাকে এই বিচারকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেদিন বলেছিলেন, এই দায়িত্বটি আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে অর্পণ করলাম। অর্থাৎ আমাকে বিচারক হিসেবেই বিচার করতে হবে। আর সে হিসাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আপনি যে সম্পদের দাবি করছেন, এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে দু-জন সাক্ষী ব্যতীত আমি আপনার পক্ষে কিছু করতে সক্ষম নই।'
এই ছিল তখনকার বিচার ও বিচারকের সম্মান! সাক্ষীর বিষয়টিও ছিল এমন মর্যাদাকর। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—একবার এক খলিফার নিকট কিছু লোক এল। খাদেম বলল, তোমরা কি আমার মুনিবের পক্ষে এ বিষয়ে সাক্ষী হবে?
লোকগুলো খাদেমের কথা অনুযায়ী বিষয়টির ওপর খলিফার সাক্ষী হতে রাজি হলো। এ সময় হজরত মাজঝুয়ি আমিরের নিকট একান্তে এগিয়ে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই কাগজে যা লেখা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনার সাক্ষী হতে পারি?
খলিফা বললেন, অসুবিধা নেই। তুমি সাক্ষী থাকো।
মাজঝুয়ি বললেন, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার এভাবে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যতক্ষণ না নিজ মুখে 'হ্যাঁ' বলবেন, ততক্ষণ আমি সাক্ষী হব না।
খলিফা বললেন, হ্যাঁ। সাক্ষী হতে পারো।
এরপর হজরত মাজঝুয়ি খলিফার বিষয়ে সাক্ষী হলেন। এমনটাই ছিল তখন বিচার, বিচারক এবং সাক্ষ্য ও সাক্ষীর মর্যাদা ও মহত্ব।
কিন্তু আমাদের যুগে এসে সবই উল্টে গেছে। এমনকি মানুষ আজ ঘুষ দিয়েও সাক্ষী হতে চায়। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া অর্জন করে। তুমি দেখবে, নিজেদের অদেখা ও অজানা বিষয়েও তারা সাক্ষ্য দেবার জন্য কেমন প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়!
আবুল মায়ালি ইবনে শাফি আমাকে বলেছেন, আমাকে একবার একটি সাধারণ বন্দির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। আল্লাহর নিকট এ জন্য আমি খুব ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ মাফ করুন!
আমরা জানি, সাক্ষ্য প্রদানের কারণে সাক্ষীদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। বরং সময়-অসময়ে তার দরজায় করাঘাত পড়ে এবং নিজের কাপড় টেনে নিজের সময় খরচ করে নিজেকেই সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। এটা কোনো সুখ ও লাভের বিষয় নয়। এ কারণে প্রবাদকথা আছে—আল্লাহ তোমাকে সাক্ষী হওয়ার নিয়ামত থেকে রক্ষা করুন!
একারণে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাক্ষী হওয়া এবং বিচারক হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন।
যেমন, হজরত ইবরাহিম নাখঈ রহ. এর ক্ষেত্রে লোকেরা যখন বলতে লাগল, আপনিই হবেন আমাদের বিচারক, তখন তিনি লাল জামা গায়ে বাজারে যাওয়া-আসা করতে শুরু করলেন। দেখতে বেখাপ্পা লাগে। অবশেষে লোকেরাই আবার বলতে লাগল—'তিনি এ পদের যোগ্য নন।'
আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়—একবার খলিফা হারুনুর রশিদ একজন প্রাজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা তাকে বিচারকের দায়িত্ব দিতে চান। লোকটি খলিফার নিকট এসে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি কেমন আছেন এবং আপনার সন্তান-সন্ততি কেমন আছে?...
লোকটির এমন বোকামিপূর্ণ কথা শুনে আশপাশের লোকেরা বলল—এ তো পাগল। ফলে তাকে বিচারকের পদ প্রদান করা থেকে বিরত রাখা হলো।
আল্লাহর কসম! তার এই পাগলামিই ছিল প্রাজ্ঞতা। বিচারকের পদ থেকে বিরত থাকার জন্য তার এই বোকামিই ছিল বুদ্ধিমত্তা।
কিন্তু আমাদের অবস্থা কী! আমার ধারণা, আখেরাতের প্রতি আমাদের ঈমান রয়েছে খুবই টলটলায়মান অবস্থায়। সামান্য ঝাঁকিতেই গড়িয়ে পড়ে পড়ে ভাব। তাই আমাদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে হিফাজত রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
অল্পেতুষ্ট না হলে দুনিয়াতে কারও পক্ষে সুখে বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ, যখনই অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে, চিন্তা ও অস্থিরতাও বাড়তে থাকবে সমানতালে। অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আরও অর্জন ও উপার্জনের প্রয়োজন হবে এবং এ কারণে অন্যরা তাকে দাসে পরিণত করে ছাড়বে।
আর যদি অল্পেতুষ্ট থাকা যায়, তখন আর নিজের চেয়ে ওপরের ব্যক্তির সাথে মেলামেশার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অধীনও হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি তার সমপর্যায়ের, তার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করার কিছু নেই। কারণ, তার নিকট যা আছে, তার নিজের কাছেও তা-ই আছে।
কিন্তু যে সকল ব্যক্তি অল্পেতুষ্ট থাকে না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের জীবন অন্বেষণ করে, তারা তাদের দ্বীনকে তুচ্ছ করে ফেলে। নিজেদেরকেও অন্যের সামনে নত অবনত ও অপদস্থ করে তোলে।
বিশেষ করে আলেমদের ক্ষেত্রে—তারা যদি ঘন ঘন আমির ও ধনবানদের নিকট যাতায়াত করতে থাকে, তবে তারা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে ছাড়বে। তারা সেখানে অনেক অপছন্দনীয় বিষয় দেখতে পাবে, কিন্তু নিষেধ করতে পারবে না। কখনো কোনো জালেমের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তার প্রশংসা করতেও বাধ্য হতে হবে... ইত্যাদি।
অর্থাৎ এসব করে তাদের থেকে যতটা পার্থিব বিষয় অর্জন করবে, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি তাকে লাঞ্ছনায় পড়তে হবে—নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বিচারক ও সাক্ষীদের। যদিও এককালে এ দুটি বিষয়ই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও মহত্বের নিদর্শন। যেমন, কাজি আবদুল হামিদ ছিলেন এমন এক বিচারক—যিনি কখনো কোনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। অন্যায় করতেন না। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করছি—একবার তিনি খলিফা মুতাদিদের নিকট খবর পাঠালেন—আপনি কিছু সরকারি জমি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার ভাড়া পরিশোধ করুন।'
খবর পেয়ে খলিফা ভাড়া পরিশোধ করলেন। এরপর খলিফা বিচারক আবদুল হামিদকে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি মারা গিয়েছে, তার নিকট আমার কিছু অর্থ প্রাপ্য ছিল। আপনি এটি প্রদানের ব্যবস্থা করুন।'
বিচারক খলিফাকে বললেন, 'আপনি যখন আমাকে এই বিচারকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেদিন বলেছিলেন, এই দায়িত্বটি আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে অর্পণ করলাম। অর্থাৎ আমাকে বিচারক হিসেবেই বিচার করতে হবে। আর সে হিসাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আপনি যে সম্পদের দাবি করছেন, এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে দু-জন সাক্ষী ব্যতীত আমি আপনার পক্ষে কিছু করতে সক্ষম নই।'
এই ছিল তখনকার বিচার ও বিচারকের সম্মান! সাক্ষীর বিষয়টিও ছিল এমন মর্যাদাকর। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—একবার এক খলিফার নিকট কিছু লোক এল। খাদেম বলল, তোমরা কি আমার মুনিবের পক্ষে এ বিষয়ে সাক্ষী হবে?
লোকগুলো খাদেমের কথা অনুযায়ী বিষয়টির ওপর খলিফার সাক্ষী হতে রাজি হলো। এ সময় হজরত মাজঝুয়ি আমিরের নিকট একান্তে এগিয়ে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই কাগজে যা লেখা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনার সাক্ষী হতে পারি?
খলিফা বললেন, অসুবিধা নেই। তুমি সাক্ষী থাকো।
মাজঝুয়ি বললেন, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার এভাবে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যতক্ষণ না নিজ মুখে 'হ্যাঁ' বলবেন, ততক্ষণ আমি সাক্ষী হব না।
খলিফা বললেন, হ্যাঁ। সাক্ষী হতে পারো।
এরপর হজরত মাজঝুয়ি খলিফার বিষয়ে সাক্ষী হলেন। এমনটাই ছিল তখন বিচার, বিচারক এবং সাক্ষ্য ও সাক্ষীর মর্যাদা ও মহত্ব।
কিন্তু আমাদের যুগে এসে সবই উল্টে গেছে। এমনকি মানুষ আজ ঘুষ দিয়েও সাক্ষী হতে চায়। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া অর্জন করে। তুমি দেখবে, নিজেদের অদেখা ও অজানা বিষয়েও তারা সাক্ষ্য দেবার জন্য কেমন প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়!
আবুল মায়ালি ইবনে শাফি আমাকে বলেছেন, আমাকে একবার একটি সাধারণ বন্দির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। আল্লাহর নিকট এ জন্য আমি খুব ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ মাফ করুন!
আমরা জানি, সাক্ষ্য প্রদানের কারণে সাক্ষীদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। বরং সময়-অসময়ে তার দরজায় করাঘাত পড়ে এবং নিজের কাপড় টেনে নিজের সময় খরচ করে নিজেকেই সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। এটা কোনো সুখ ও লাভের বিষয় নয়। এ কারণে প্রবাদকথা আছে—আল্লাহ তোমাকে সাক্ষী হওয়ার নিয়ামত থেকে রক্ষা করুন!
একারণে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাক্ষী হওয়া এবং বিচারক হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন।
যেমন, হজরত ইবরাহিম নাখঈ রহ. এর ক্ষেত্রে লোকেরা যখন বলতে লাগল, আপনিই হবেন আমাদের বিচারক, তখন তিনি লাল জামা গায়ে বাজারে যাওয়া-আসা করতে শুরু করলেন। দেখতে বেখাপ্পা লাগে। অবশেষে লোকেরাই আবার বলতে লাগল—'তিনি এ পদের যোগ্য নন।'
আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়—একবার খলিফা হারুনুর রশিদ একজন প্রাজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা তাকে বিচারকের দায়িত্ব দিতে চান। লোকটি খলিফার নিকট এসে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি কেমন আছেন এবং আপনার সন্তান-সন্ততি কেমন আছে?...
লোকটির এমন বোকামিপূর্ণ কথা শুনে আশপাশের লোকেরা বলল—এ তো পাগল। ফলে তাকে বিচারকের পদ প্রদান করা থেকে বিরত রাখা হলো।
আল্লাহর কসম! তার এই পাগলামিই ছিল প্রাজ্ঞতা। বিচারকের পদ থেকে বিরত থাকার জন্য তার এই বোকামিই ছিল বুদ্ধিমত্তা।
কিন্তু আমাদের অবস্থা কী! আমার ধারণা, আখেরাতের প্রতি আমাদের ঈমান রয়েছে খুবই টলটলায়মান অবস্থায়। সামান্য ঝাঁকিতেই গড়িয়ে পড়ে পড়ে ভাব। তাই আমাদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে হিফাজত রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
📄 অনর্থক কাজ থেকে আল্লাহ চিরমুক্ত
এখন যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করতে চাই, এ ধরনের বিষয় এই কিতাবে এর আগেও গিয়েছে। তারপরও সেটা আবার উল্লেখ করছি। কারণ, এটা বারবার নফসের নিকট পুনরাবৃত্তি করা অতি জরুরি। নফস যেন এসকল বিষয়ে উদাসীন ও বেখেয়াল না হয়।
একজন মুমিন ব্যক্তির ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হলেন আমাদের প্রতিপালক। তিনি সকল কিছু জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময়; সুতরাং তিনি কোনো অনর্থক কাজ করেন না।
আমাদের এই জ্ঞানটুকু আমাদের তাকদির এবং ঘটিত কোনো বিষয়ে আপত্তি ও অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। আর এই জ্ঞানটুকু না থাকার কারণে অনেক মানুষকে দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলার হিকমত ও পরিচালনার ব্যাপারে সীমাহীন অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। দোষ-ত্রুটি খুঁজতে থাকে। সেগুলোর নিন্দামন্দ করে।
ঠিক এই ধরনের কাজ জগতের প্রথম যে করেছিল, তার নাম ইবলিস। ইবলিস শয়তান। সে আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা না করে বলেছিল,
أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ
আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে উজ্জ্বল আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ মাটি দ্বারা। [সুরা আরাফ: ১২]
অর্থাৎ ইবলিস বলতে চেয়েছে—আপনার এভাবে আগুনের ওপর এই তুচ্ছ মাটিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা যুক্তির কাজ নয়।
আমরা ফকিহদের দেখি, মাসআলা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনায় সকল সময় এটা-ওটা নিয়ে অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। আর তারা এটা করে থাকে বাহ্যিক কাজ দেখে। হ্যাঁ, এভাবে অভিযোগ যখন আমাদের মতো মানুষের কোনো কাজের ক্ষেত্রে হয়, তখন তো ঠিক আছে; হতেই পারে। মানুষের ভুল হয়। তার অজ্ঞতার সীমা নেই। তার সীমাবদ্ধতারও শেষ নেই।
কিন্তু এই মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধ বোধ, বুঝ ও সক্ষমতা নিয়ে যদি কেউ জগতের স্রষ্টার হিকমতের বিচার করতে বের হয়, তখন বিষয়টা কেমন হয়ে দাঁড়ায়! তাদের অভিযোগ ও আপত্তিটা হয়ে পড়ে পাগলের মতো, নাদানের মতো।
আর যারা ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা তাড়িত, তারাও বিভিন্ন অভিযোগ-আপত্তি করতে থাকে। কারণ, তারা চায়, জগতের সকল জিনিস তাদের চাহিদা ও কামনা অনুযায়ী পরিচালিত হোক। কিন্তু যখনই এর বিপরীত হয়, তখনই তারা অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে থাকে।
আবার কেউ কেউ আছে, যারা মৃত্যুর ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে। তারা অভিযোগ করে বলে, তিনি সৃষ্টি করলেন আবার বিনষ্ট করছেন—এটা কী হলো? জীবন দান করেই আবার যেন এই আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু! কত ক্ষুদ্র জীবন! এই এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কতটুকুই-বা অর্জন করা যায়! কতটুকুই-বা ভোগ ও আস্বাদন করা যায়!!
আমাদের এক বন্ধু ছিল। কোরআন পড়েছে। বিভিন্ন কিরাআতে চমৎকার পারদর্শিতা অর্জন করেছে এবং বহু হাদিস সে শ্রবণ করেছে এবং সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু এরপরও সে পরবর্তী জীবনে গোনাহের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। ৭০ বছর বেঁচে ছিল। এরপর একদিন যখন মৃত্যুর সময় উপনীত হলো, আমাকে একজন শুনিয়েছে, তখন সে বলতে লাগল, দুনিয়া তো আমার ওপর সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এর কতটুকুই-বা উপভোগ করা গেল!
এভাবে আরেক ব্যক্তির কথা শুনেছি, মৃত্যুর সময় সে বলছিল—আমার প্রতিপালক আমার প্রতি জুলুম করে ফেলছে! (নাউজুবillah)।
এমন আরও অনেক ঘটনা ও কথা রয়েছে। এ ধরনের ইন্দ্রিয়তাড়িত ব্যক্তিদের এসকল নিকৃষ্টতম অভিযোগ ও ঘটনাগুলো বর্ণনা করতেও অপছন্দ লাগে। তারা যদি বুঝত যে, এই দুনিয়া হলো প্রতিযোগিতার স্থান, এটি ধৈর্যধারণের ময়দান। এটি পরীক্ষার জায়গা; যাতে এখানে স্রষ্টার প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও আত্মসমর্পণের বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এগুলো যদি তারা বুঝত, তাহলে স্রষ্টার কোনো কাজের ক্ষেত্রে তারা আর অভিযোগ আপত্তি করত না।
ঘায়! মানুষ যদি বুঝত, রাতদিনের কঠিন পরিশ্রমে তারা এত ব্যাকুল হয়ে যেই শান্তি স্বস্তি এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদাগুলো পূরণের কামনা করছে, তা তো রয়েছে তাদের সমুখে, ভবিষ্যতে, আখেরাতে।
দুনিয়া হলো শস্যক্ষেতের মতো। এখানে যখন সে কর্মরত থাকবে, তখন তার কষ্ট এবং শরীরে ধূলি-কাঁদা লাগবে। কিন্তু যখন সে এখানকার কাজ সম্পন্ন করবে, তখন সে বিশ্রাম পাবে। সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করবে। শান্তি-সুখের অবকাশ পাবে।
ঘায়! কে বুঝবে, দুনিয়ার এই তুচ্ছ শরীর পবিত্র আত্মাকে চিরকাল ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে না। মৃত্যুর মাধ্যমে তাই আত্মাকে তার থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তার জন্য এমন এক স্থায়ী শরীর প্রদান করা হবে, যার মধ্যে এই আত্মা চিরকাল অবস্থান করবে। তাহলে কেন এই মৃত্যু নিয়ে এত অভিযোগ?
এরপরও যে ব্যক্তি অভিযোগ করতে চায়, তাকে তুমি বলো,
﴿فَلْيَمْدُدْ بِسَبَبٍ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ لِيَقْطَعْ فَلْيَنْظُرْ هَلْ يُذْهِبَنَّ كَيْدُهُ مَا يَغِيظُ﴾
সে আকাশ পর্যন্ত একটি রশি টানিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করুক। তারপর দেখুক, তার প্রচেষ্টা তার আক্রোশ দূর করে কি না! [সুরা হজ: ১৫]
তুমি তাকে আরও বলো, এভাবে অভিযোগ-আপত্তিতে তাকদিরের কোনো হেরফের হবে না। আর যদি মেনে নেয়, তবুও তো তাকদির তার গতিতেই চলবে। সুতরাং বিক্ষুব্ধ অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালায় অনুগত দাস হওয়া অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়া অনেক কল্যাণকর।
যেমন 'অদাহুল ইয়ামান' যখন বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, তার চুপ থাকাটাই সুন্দর হয়েছিল। খলিফা যখন বললেন, হে বাক্স, আমরা যা ধারণা করছি, তা যদি তোমার মধ্যে থাকে, তবে তোমার অস্তিত্বই আমরা মুছে দিলাম, আর যদি তা না থাকে, তবে তো আমরা প্রাসাদের কাঠের একটি বাক্সকেই শুধু দাফন করলাম। '১০৮
এসময় 'অদাহুল ইয়ামান' যদি বাঁচার জন্য বাক্সের মধ্য থেকে চিৎকার করে উঠত, এটা তার কোনো উপকারই করত না। বরং তাকে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। বরং এমন অবস্থায় নীরবতাই কখনো কখনো বাঁচার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে।
টিকাঃ
১০৮. এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে। ঘটনাটি যেমন প্রেমের রসে আপ্লুত, নির্মম হত্যার দ্বারা তেমনি বেদনাবহ। সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণটি এমন- 'অদাহুল ইয়ামান' (وضاح اليمن) ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি। এটি তার উপাধী। তার আসল নাম আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল আলখাওলানি। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের রাজত্ব চলছে। অদাহুল ইয়ামানের কবিতার ধার ছিল প্রখর। কিন্তু সে নিজে ছিল চারিত্রিকভাবে অধঃপতিত। বিয়ে করেনি। কিন্তু বহু নারীর সঙ্গ সে লাভ করেছে। এদিকে খলিফা ওয়ালিদের স্ত্রী 'উম্মুল বানিন' হজ করার ইচ্ছা করলেন। খলিফা তাকে এক বিশ্বস্ত দাসীর তত্ত্বাবধানে হজের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। 'উম্মুল বানিন' মক্কায় পৌঁছে হজ আদায় করলেন। আগে থেকেই তার কবিতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। তিনি চাইতেন অন্যদের মতো তাকে নিয়েও যেন কবিরা কিছু 'প্রশংসা-কাব্য' রচনা করে। তিনি খবর নিয়ে জানলেন এ এলাকায় 'অদাহুল ইয়ামান' এর প্রচণ্ড কবি-খ্যাতি রয়েছে। তিনি কবিকে দিয়ে তার 'স্তুতি' রচনা ও শোনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ রাজি হচ্ছিলেন না। তবে তিনি যেহেতু আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন, তাই অবশেষে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই ঘটল। কবিতায় স্তুতি শুনে এবং প্রেমের কবিতা রচনা করতে গিয়ে একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেল। কিছুদিন পর খলিফার স্ত্রী সিরিয়ায় ফিরে এলেন। কবিকেও সিরিয়ায় চলে আসতে বলে এলেন। কিছুদিন পর যথারীতি প্রেমিক কবিও সিরিয়ায় পৌঁছে গেল। সিরিয়ায় এসে খলিফার দরবারে কাব্য রচনা করে আর গোপনে তার স্বতন্ত্র প্রাসাদে অভিসারে গমন করে। অন্য কেউ এসে পড়ার আভাস পেলেই কক্ষে রাখা বাক্সগুলোর মধ্যে বড়টির মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। বাক্সগুলোর মধ্যে সাধারণত জামা-কাপড় রাখা হতো। কিছুদিনের মধ্যেই গোপন মাধ্যমে প্রেমের বিষয়টি খলিফার কানে গেল। খলিফা ওয়ালিদ একদিন হঠাৎ স্ত্রী উম্মুল বানিনের কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন। বিভিন্ন কথার শেষে খলিফা স্ত্রীকে বললেন, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? স্ত্রী বললেন, আমার প্রাণের চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি। তাহলে তোমার কক্ষের এই বড় বাক্সটি আমাকে দিয়ে দাও। স্ত্রী বললেন, এটি ছাড়া অন্যগুলি নিন। খলিফা বললেন, আমার এটাই পছন্দ। এর কারু-সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। নিরুপায় হয়ে স্ত্রী বাক্সটি প্রদানে রাজি হলেন। খলিফা তার কিছু দাস-অনুচরকে ডেকে বললেন এটি বাইরে নিয়ে যাও। বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর তিনি তাদেরকে বাগানের মধ্যে একটি গভীর গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। দ্রুত নির্দেশ পালন করা হলো। এবার বাক্সটিকে সেই গর্তের নিকট নিয়ে বাক্সকে সম্বোধন করে বললেন, হে বাক্স। আমরা যা ধারণা করছি, তোমার মধ্যে যদি তা থাকে, তবে তো তোমার চিহ্ন পর্যন্ত আমরা মুছে ফেলব। আর যদি তা না থাকে, তবে তো নিছক প্রাসাদের একটি কাঠের বাক্সকে আমরা দাফন করছি। তার সাথে দাফন করছি অপবাদের সূত্রটিও। কিন্তু বাক্সের মধ্য থেকে কোনো আওয়াজ আসে না। এভাবেই বাক্সটিকে গভীর গর্তে দাফন করে দেওয়া হয়। এরপর আর কখনো 'অদাহুল ইয়ামান'কে ধরাপৃষ্ঠে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়- সে বাক্সের মধ্যেই চুপ করে ছিল এবং বাক্সটির সাথে সে নিজেও দাফন হয়ে যায়- অনুবাদক।
এখন যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করতে চাই, এ ধরনের বিষয় এই কিতাবে এর আগেও গিয়েছে। তারপরও সেটা আবার উল্লেখ করছি। কারণ, এটা বারবার নফসের নিকট পুনরাবৃত্তি করা অতি জরুরি। নফস যেন এসকল বিষয়ে উদাসীন ও বেখেয়াল না হয়।
একজন মুমিন ব্যক্তির ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হলেন আমাদের প্রতিপালক। তিনি সকল কিছু জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময়; সুতরাং তিনি কোনো অনর্থক কাজ করেন না।
আমাদের এই জ্ঞানটুকু আমাদের তাকদির এবং ঘটিত কোনো বিষয়ে আপত্তি ও অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। আর এই জ্ঞানটুকু না থাকার কারণে অনেক মানুষকে দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলার হিকমত ও পরিচালনার ব্যাপারে সীমাহীন অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। দোষ-ত্রুটি খুঁজতে থাকে। সেগুলোর নিন্দামন্দ করে।
ঠিক এই ধরনের কাজ জগতের প্রথম যে করেছিল, তার নাম ইবলিস। ইবলিস শয়তান। সে আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা না করে বলেছিল,
أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ
আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে উজ্জ্বল আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ মাটি দ্বারা। [সুরা আরাফ: ১২]
অর্থাৎ ইবলিস বলতে চেয়েছে—আপনার এভাবে আগুনের ওপর এই তুচ্ছ মাটিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা যুক্তির কাজ নয়।
আমরা ফকিহদের দেখি, মাসআলা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনায় সকল সময় এটা-ওটা নিয়ে অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। আর তারা এটা করে থাকে বাহ্যিক কাজ দেখে। হ্যাঁ, এভাবে অভিযোগ যখন আমাদের মতো মানুষের কোনো কাজের ক্ষেত্রে হয়, তখন তো ঠিক আছে; হতেই পারে। মানুষের ভুল হয়। তার অজ্ঞতার সীমা নেই। তার সীমাবদ্ধতারও শেষ নেই।
কিন্তু এই মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধ বোধ, বুঝ ও সক্ষমতা নিয়ে যদি কেউ জগতের স্রষ্টার হিকমতের বিচার করতে বের হয়, তখন বিষয়টা কেমন হয়ে দাঁড়ায়! তাদের অভিযোগ ও আপত্তিটা হয়ে পড়ে পাগলের মতো, নাদানের মতো।
আর যারা ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা তাড়িত, তারাও বিভিন্ন অভিযোগ-আপত্তি করতে থাকে। কারণ, তারা চায়, জগতের সকল জিনিস তাদের চাহিদা ও কামনা অনুযায়ী পরিচালিত হোক। কিন্তু যখনই এর বিপরীত হয়, তখনই তারা অভিযোগ ও আপত্তি করতে থাকে। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে থাকে।
আবার কেউ কেউ আছে, যারা মৃত্যুর ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে। তারা অভিযোগ করে বলে, তিনি সৃষ্টি করলেন আবার বিনষ্ট করছেন—এটা কী হলো? জীবন দান করেই আবার যেন এই আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু! কত ক্ষুদ্র জীবন! এই এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কতটুকুই-বা অর্জন করা যায়! কতটুকুই-বা ভোগ ও আস্বাদন করা যায়!!
আমাদের এক বন্ধু ছিল। কোরআন পড়েছে। বিভিন্ন কিরাআতে চমৎকার পারদর্শিতা অর্জন করেছে এবং বহু হাদিস সে শ্রবণ করেছে এবং সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু এরপরও সে পরবর্তী জীবনে গোনাহের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। ৭০ বছর বেঁচে ছিল। এরপর একদিন যখন মৃত্যুর সময় উপনীত হলো, আমাকে একজন শুনিয়েছে, তখন সে বলতে লাগল, দুনিয়া তো আমার ওপর সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এর কতটুকুই-বা উপভোগ করা গেল!
এভাবে আরেক ব্যক্তির কথা শুনেছি, মৃত্যুর সময় সে বলছিল—আমার প্রতিপালক আমার প্রতি জুলুম করে ফেলছে! (নাউজুবillah)।
এমন আরও অনেক ঘটনা ও কথা রয়েছে। এ ধরনের ইন্দ্রিয়তাড়িত ব্যক্তিদের এসকল নিকৃষ্টতম অভিযোগ ও ঘটনাগুলো বর্ণনা করতেও অপছন্দ লাগে। তারা যদি বুঝত যে, এই দুনিয়া হলো প্রতিযোগিতার স্থান, এটি ধৈর্যধারণের ময়দান। এটি পরীক্ষার জায়গা; যাতে এখানে স্রষ্টার প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও আত্মসমর্পণের বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এগুলো যদি তারা বুঝত, তাহলে স্রষ্টার কোনো কাজের ক্ষেত্রে তারা আর অভিযোগ আপত্তি করত না।
ঘায়! মানুষ যদি বুঝত, রাতদিনের কঠিন পরিশ্রমে তারা এত ব্যাকুল হয়ে যেই শান্তি স্বস্তি এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদাগুলো পূরণের কামনা করছে, তা তো রয়েছে তাদের সমুখে, ভবিষ্যতে, আখেরাতে।
দুনিয়া হলো শস্যক্ষেতের মতো। এখানে যখন সে কর্মরত থাকবে, তখন তার কষ্ট এবং শরীরে ধূলি-কাঁদা লাগবে। কিন্তু যখন সে এখানকার কাজ সম্পন্ন করবে, তখন সে বিশ্রাম পাবে। সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করবে। শান্তি-সুখের অবকাশ পাবে।
ঘায়! কে বুঝবে, দুনিয়ার এই তুচ্ছ শরীর পবিত্র আত্মাকে চিরকাল ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে না। মৃত্যুর মাধ্যমে তাই আত্মাকে তার থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তার জন্য এমন এক স্থায়ী শরীর প্রদান করা হবে, যার মধ্যে এই আত্মা চিরকাল অবস্থান করবে। তাহলে কেন এই মৃত্যু নিয়ে এত অভিযোগ?
এরপরও যে ব্যক্তি অভিযোগ করতে চায়, তাকে তুমি বলো,
﴿فَلْيَمْدُدْ بِسَبَبٍ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ لِيَقْطَعْ فَلْيَنْظُرْ هَلْ يُذْهِبَنَّ كَيْدُهُ مَا يَغِيظُ﴾
সে আকাশ পর্যন্ত একটি রশি টানিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করুক। তারপর দেখুক, তার প্রচেষ্টা তার আক্রোশ দূর করে কি না! [সুরা হজ: ১৫]
তুমি তাকে আরও বলো, এভাবে অভিযোগ-আপত্তিতে তাকদিরের কোনো হেরফের হবে না। আর যদি মেনে নেয়, তবুও তো তাকদির তার গতিতেই চলবে। সুতরাং বিক্ষুব্ধ অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালায় অনুগত দাস হওয়া অবস্থায় তাকদির অতিবাহিত হওয়া অনেক কল্যাণকর।
যেমন 'অদাহুল ইয়ামান' যখন বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, তার চুপ থাকাটাই সুন্দর হয়েছিল। খলিফা যখন বললেন, হে বাক্স, আমরা যা ধারণা করছি, তা যদি তোমার মধ্যে থাকে, তবে তোমার অস্তিত্বই আমরা মুছে দিলাম, আর যদি তা না থাকে, তবে তো আমরা প্রাসাদের কাঠের একটি বাক্সকেই শুধু দাফন করলাম। '১০৮
এসময় 'অদাহুল ইয়ামান' যদি বাঁচার জন্য বাক্সের মধ্য থেকে চিৎকার করে উঠত, এটা তার কোনো উপকারই করত না। বরং তাকে বের করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। বরং এমন অবস্থায় নীরবতাই কখনো কখনো বাঁচার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে।
টিকাঃ
১০৮. এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে। ঘটনাটি যেমন প্রেমের রসে আপ্লুত, নির্মম হত্যার দ্বারা তেমনি বেদনাবহ। সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণটি এমন- 'অদাহুল ইয়ামান' (وضاح اليمن) ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি। এটি তার উপাধী। তার আসল নাম আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল আলখাওলানি। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের রাজত্ব চলছে। অদাহুল ইয়ামানের কবিতার ধার ছিল প্রখর। কিন্তু সে নিজে ছিল চারিত্রিকভাবে অধঃপতিত। বিয়ে করেনি। কিন্তু বহু নারীর সঙ্গ সে লাভ করেছে। এদিকে খলিফা ওয়ালিদের স্ত্রী 'উম্মুল বানিন' হজ করার ইচ্ছা করলেন। খলিফা তাকে এক বিশ্বস্ত দাসীর তত্ত্বাবধানে হজের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। 'উম্মুল বানিন' মক্কায় পৌঁছে হজ আদায় করলেন। আগে থেকেই তার কবিতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। তিনি চাইতেন অন্যদের মতো তাকে নিয়েও যেন কবিরা কিছু 'প্রশংসা-কাব্য' রচনা করে। তিনি খবর নিয়ে জানলেন এ এলাকায় 'অদাহুল ইয়ামান' এর প্রচণ্ড কবি-খ্যাতি রয়েছে। তিনি কবিকে দিয়ে তার 'স্তুতি' রচনা ও শোনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ রাজি হচ্ছিলেন না। তবে তিনি যেহেতু আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন, তাই অবশেষে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই ঘটল। কবিতায় স্তুতি শুনে এবং প্রেমের কবিতা রচনা করতে গিয়ে একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেল। কিছুদিন পর খলিফার স্ত্রী সিরিয়ায় ফিরে এলেন। কবিকেও সিরিয়ায় চলে আসতে বলে এলেন। কিছুদিন পর যথারীতি প্রেমিক কবিও সিরিয়ায় পৌঁছে গেল। সিরিয়ায় এসে খলিফার দরবারে কাব্য রচনা করে আর গোপনে তার স্বতন্ত্র প্রাসাদে অভিসারে গমন করে। অন্য কেউ এসে পড়ার আভাস পেলেই কক্ষে রাখা বাক্সগুলোর মধ্যে বড়টির মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। বাক্সগুলোর মধ্যে সাধারণত জামা-কাপড় রাখা হতো। কিছুদিনের মধ্যেই গোপন মাধ্যমে প্রেমের বিষয়টি খলিফার কানে গেল। খলিফা ওয়ালিদ একদিন হঠাৎ স্ত্রী উম্মুল বানিনের কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন। বিভিন্ন কথার শেষে খলিফা স্ত্রীকে বললেন, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? স্ত্রী বললেন, আমার প্রাণের চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি। তাহলে তোমার কক্ষের এই বড় বাক্সটি আমাকে দিয়ে দাও। স্ত্রী বললেন, এটি ছাড়া অন্যগুলি নিন। খলিফা বললেন, আমার এটাই পছন্দ। এর কারু-সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। নিরুপায় হয়ে স্ত্রী বাক্সটি প্রদানে রাজি হলেন। খলিফা তার কিছু দাস-অনুচরকে ডেকে বললেন এটি বাইরে নিয়ে যাও। বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর তিনি তাদেরকে বাগানের মধ্যে একটি গভীর গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। দ্রুত নির্দেশ পালন করা হলো। এবার বাক্সটিকে সেই গর্তের নিকট নিয়ে বাক্সকে সম্বোধন করে বললেন, হে বাক্স। আমরা যা ধারণা করছি, তোমার মধ্যে যদি তা থাকে, তবে তো তোমার চিহ্ন পর্যন্ত আমরা মুছে ফেলব। আর যদি তা না থাকে, তবে তো নিছক প্রাসাদের একটি কাঠের বাক্সকে আমরা দাফন করছি। তার সাথে দাফন করছি অপবাদের সূত্রটিও। কিন্তু বাক্সের মধ্য থেকে কোনো আওয়াজ আসে না। এভাবেই বাক্সটিকে গভীর গর্তে দাফন করে দেওয়া হয়। এরপর আর কখনো 'অদাহুল ইয়ামান'কে ধরাপৃষ্ঠে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়- সে বাক্সের মধ্যেই চুপ করে ছিল এবং বাক্সটির সাথে সে নিজেও দাফন হয়ে যায়- অনুবাদক।