📄 কোরআন ও সুন্নাহ হেদায়েতের মূল
আমি ভেবে দেখেছি, মানুষের ওপর ইবলিস বিভিন্ন কৌশলে তার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। সে অধিকাংশ মানুষকে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে—অথচ ইলমই হলো মানবজীবনের আলো। এছাড়া তার জীবন অন্ধকার। তাই ইবলিস অনেক সুফি ও সাধককে অজ্ঞতা ও মূর্খতার অন্ধকারে অন্ধভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়। সে কারণে তারা নিজেদের ইন্দ্রিয়শক্তির নিয়ন্ত্রণে বন্দি হয়ে পড়ে। আকল ও যুক্তির কোনো ধার ধারে না। এরপর তাদের কারও যখন জীবনে দারিদ্র্য চেপে বসে, সবকিছু বিনষ্ট হয়ে যায়, তখন সে হতাশ হয়ে পড়ে; এমনকি কেউ কেউ কুফরের দিকে ধাবিত হয়।
তখন কেউ কেউ যুগকেই দোষারোপ করতে থাকে, কেউ গালি দেয় দুনিয়াকেই। এটা একটা নিকৃষ্টতম পদ্ধতি। কারণ, যুগ বা দুনিয়া এগুলো সংঘটিত করে না। এর মাধ্যমে মূলত স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার দোষ ধরা হয়। নাউজুবিল্লাহ!
তাদের কেউ কেউ বিরূপ চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর হিকমতকে অস্বীকার করতে থাকে। তখন সে বলতে থাকে, এত সুন্দর জগৎ গঠনের পর তা ধ্বংস করার মধ্যে কী কল্যাণ? শুধুই অনর্থক এক কাজ! আবার কেউ কেউ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকেই অসম্ভব মনে করে। পুনর্জীবনকে অস্বীকার করে। এবং যুক্তি দেখিয়ে বলে, এ পর্যন্ত সেখান থেকে কেউ তো ফিরে এসে এটা প্রমাণ করছে না!
কিন্তু তারা কেন ভুলে যায়, দুনিয়া থেকে সকল মানুষের এখনো তো অন্তর্ধান হয়নি। এর আগেই যদি জীবিত মানুষ পুনর্জীবন দেখে ফেলে, তবে আর অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনা সম্ভব হবে না—তখন আর এটা ‘অदृश्य’ বলে গণ্য হবে না। চাক্ষুষ পুনর্জীবন দিয়ে পুনর্জীবনের ওপর প্রমাণ চাওয়া তাই একটি বড় ধরনের বোকামি এবং অযৌক্তিক প্রস্তাব।
এরপর ইবলিস যখন মুসলমানদের অবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখে, তাদের মধ্যে অনেকেই আছে অনেক মেধাবী। তখন সে তাদের মনের মধ্যে উদয় করে, দেখো, শরিয়তের বাহ্যিক বিষয়াবলি এতটাই সহজ ও সরল বিষয় যে অনেক সাধারণ মানুষও সেগুলো জানে ও বোঝে। সুতরাং তাদের থেকে ভিন্ন হওয়ার জন্য, পণ্ডিত ও অনন্য হওয়ার জন্য দর্শন ও কালামশাস্ত্র অধ্যয়ন করা দরকার। তখন তারা অ্যারিস্টটল, জালিয়ানুস, পীথাগোরাস এবং বিভিন্ন পণ্ডিতদের কথাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তু এরা তো আমাদের শরিয়তের অনুসারী ছিল না। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মান্যকারী ছিল না। বরং তারা তাদের মত ও মতবাদগুলো ছড়িয়েছে নিজেদের আকল মেধা যুক্তি ও মন দ্বারা যতটুকু বুঝেছে ও জেনেছে—সে অনুযায়ী। অনিবার্যভাবে এগুলোতে তারা অসংখ্য ভুলের শিকার হয়েছে।
আমাদের পূর্বপুরুষদের অভ্যাস ছিল, তাদের কারও যখন কোনো সন্তান হতো, তাকে প্রথমে কোরআনের শিক্ষায় নিমগ্ন করে দিতেন। বিশেষকরে যদি পুত্র সন্তান হতো, তবে তাকে কোরআন ও হাদিস মুখস্থের কাজে লাগিয়ে দিতেন। এর মাধ্যমে তাদের অন্তরের মধ্যে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যেত। কিন্তু বর্তমানের মানুষ এগুলোর ক্ষেত্রে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। এ কারণে তার মেধাবী সন্তানটি প্রাচীন মানুষের দর্শন নিয়ে মেতে উঠছে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস এই বলে পরিত্যাগ করছে যে, এগুলো তো মাত্র একজনের কথা; কোনো সম্মিলিত গবেষণালব্ধ বিষয় নয়। হাদিসবিশারদ ব্যক্তিকেও তাই তারা আর জ্ঞানী ও পণ্ডিতব্যক্তি বলে মান্য করে না। তারা এখন বিশ্বাস রাখে অতি সূক্ষ্ম দর্শন, প্রকৃতি বিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, পদার্থ ও পরমাণু বিদ্যায়।
এরপর তারা স্রষ্টার গুণাবলির ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে। এগুলোর কোনোটিকে বাদ দেয়। কোনোটির সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করে। আবার কখনো স্রষ্টার সাথে অনুচিত গুণাবলিও যুক্ত করে। এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে যে কথাগুলো আমাদের নিকট পৌঁছেছে, সেগুলোকে পার্থিব ঘটনা ও যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে চায়। যেমন মুতাযিলারা বলে,
إن الله لا يرى لأن المرئي يكون في جهة.
আল্লাহ তাআলাকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ, দৃশ্য বিষয় তো কোনো একটি দিকে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা কোনো দিক থেকে মুক্ত।
অথচ এই কথাটি হাদিসের এই কথাটির সম্পূর্ণ বিপরীত। হাদিসে এসেছে—
إنكم ترون ربكم كما ترون القمر لا تضامون في رؤيته.
নিশ্চয় তোমরা তোমাদের প্রতিপালকে দেখতে পাবে [কিয়ামতের দিন], যেভাবে তোমরা আকাশের চাঁদ দেখো। চাঁদ দেখতে তোমাদের কোনো কষ্ট হয় না। (সেদিনও তেমনই হবে।) ১০৫
এভাবে তারা কোরআনের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি করেছে। তারা কোরআনের ক্ষেত্রে বলেছে, এটা মাখলুক বা সৃষ্ট এবং ধ্বংসশীল। এভাবে তারা মানুষের অন্তর থেকে তার সম্মান ও মর্যাদাই বিনষ্ট করে দিয়েছে।
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর ক্ষেত্রে তারা বলেছে, এটা তো মাত্র একজন ব্যক্তির জীবনযাপন। একজন ব্যক্তির কথা ও মন্তব্য- এটা কোনো পরীক্ষিত সত্য নয়।
এমনই ভয়াবহ তাদের বিভ্রান্তিকর মতবাদ। তারা অ্যারিস্টটল, জালিয়ানুস ও অন্য দার্শনিকদের কথা নকল করে বেড়ায়। এগুলোকেই অকাট্য সত্য বলে মেনে চলে। দর্শনের ঘুপচি গলিতে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নামাজ-রোজা ও ইসলামি শরিয়তের বিধান থেকে মুক্ত রাখে। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের পা অগ্রসর হতে থাকে কুফরির দিকে।
এ কারণে আমাদের কিছু পূর্বসূরি দর্শন বা যুক্তিশাস্ত্রের চর্চা করা অপছন্দ করতেন। এমনকি ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন,
حكمي فيهم أن يركبوا على البغال ويشهروا ويقال: هذا جزاء من ترك الكتاب والسنة واشتغل بالكلام.
যে সকল ব্যক্তি দর্শন বা কালামশাস্ত্র চর্চা করবে তাদের ক্ষেত্রে আমার মন্তব্য হলো, তাদেরকে গাধার পিঠে চড়িয়ে মানুষের মাঝে ঘুরানো হবে। এবং বলা হবে, যে ব্যক্তি কোরআন ও সুন্নাহ ছেড়ে 'কালামশাস্ত্র' নিয়ে মগ্ন থাকে, তার প্রতিফল এমনই হয়ে থাকে।
এমনকি এসকল দর্শনগামী ব্যক্তিদের অবস্থা এতটাই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে যে, তারা বিশ্বাস করে-যে ব্যক্তি যুক্তিশাস্ত্রের বিচারে 'তাওহিদ'-এর বিস্তারিত প্রমাণাদি জানে না, সে ব্যক্তি মুসলমানই নয়।
আল্লাহ আমাদের বিদআতের মিশ্রণ থেকে রক্ষা করুন। তোমরা বরং কোরআন ও সুন্নাহকেই ভালোভাবে আঁকড়ে ধরো-তবেই তোমরা সোজা ও সঠিক পথটি প্রাপ্ত হবে।
টিকাঃ
১০৫. সুনানে তিরমিজি: ৯/২৪৭৭, পৃষ্ঠা: ১১১- মা. শামেলা। পুরো হাদিসটি এমন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتُضَامُونَ فِي رُؤْيَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ وَتُضَامُونَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ قَالُوا لَا قَالَ فَإِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ الْقَمَرَ لَيْلَةَ الْبَدْرِ لَا تُضَامُونَ فِي رُؤْيَتِهِ
📄 সময় যেন এক তরবারি
আমি দেখেছি—মানুষের অনেক নষ্ট অভ্যাস তার সময়গুলো বিনষ্ট করে দেয়। তারা এ ব্যাপারে কোনো ভ্রূক্ষেপই করে না। অথচ আমাদের পূর্ববর্তীগণ এ ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন।
আমাদের এক পূর্বসূরির নিকট একবার কিছু লোক আগমন করে বলল, আমরা হয়তো আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে ফেললাম!
তিনি ভণিতা না করে বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমি একটি কিতাব পড়ছিলাম। আপনাদের আগমনের কারণে পড়া বন্ধ রাখতে হয়েছে।
একবার কিছুলোক হজরত মারুফ কারখির নিকট উপবিষ্ট ছিল। তারা দীর্ঘক্ষণ এভাবে বসেই থাকল। অবশেষে তিনি বললেন, সূর্যের মালিক তো আর সূর্যকে চালানোর ব্যাপারে কমতি করবেন না। তবুও আপনারা উঠছেন না কেন? আর কতক্ষণ অনর্থক বসে থাকবেন?
সময়ের মূল্যায়নের ব্যাপারে আমের ইবনে কায়েস রহ.-এর প্রসিদ্ধি ছিল প্রবাদতুল্য। একবার একলোক তাকে বলল, একটু দাঁড়ান। আপনার সাথে কিছু গল্প করতে চাই।
তিনি তাকে বললেন, তবে তুমি সূর্যকে দাঁড় করিয়ে রাখো। (যদি এটা পারো, তাহলে তোমার প্রস্তাবে রাজি আছি। নতুবা নই।)
হজরত উসমান আল বাকিল্লানি রহ. সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকতেন। তিনি বলেন, খাওয়ার সময়টা আমার নিকট সবচেয়ে কষ্টকর মনে হয়। যেন আমার প্রাণ বের হয়ে যেতে চায়। কারণ, খাওয়ার কারণে সেই সময়টুকু আল্লাহর জিকির থেকে বিরত থাকতে হয়।
আমাদের এক পূর্বসূরি তার সাথি-মুরিদদের বলতেন, তোমরা যখন আমার মজলিস থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে ফিরবে, তখন সকলে আলাদা আলাদা হয়ে যাবে। এতে হয়তো কেউ কোরআন তেলাওয়াত করতে করতে যেতে পারবে। আর একসঙ্গে গেলে অনর্থক গল্পগুজব হবে।
জেনে রেখো, সময়ের একটি মুহূর্তও নষ্ট করা উচিত নয়। সহিহভাবে বর্ণিত হয়েছে—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من قال سبحان الله العظيم وبحمده غرست له بها نخلة في الجنة.
যে ব্যক্তি একবার 'সুবহানাল্লাহিল আযিম ওয়া বিহামদিহি' বলে, বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপিত হয়ে যায়। ১০৬
মানুষ জাতি এমন কত সময় অনর্থক অযথা বিনষ্ট করে; অথচ সে সময়ে কত সওয়াব ও পুরস্কার প্রাপ্তির কাজ করা যেত! মানুষের এই সময়গুলো শস্যক্ষেতের মতো। মানুষকে যেন ডেকে ডেকে বলা হচ্ছে, এই সময়ের মধ্যে তুমি যদি একটি বীজ বপন করো, তবে আমি তোমার জন্য হাজার শস্য নিয়ে হাজির হব।
এমন ঘোষণার পরও কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য বীজ বপন না করা কিংবা এক্ষেত্রে অলসতা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। আর সময়কে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি সহায়ক পদ্ধতি হলো, যতদূর সম্ভব নির্জন নিরালায় নির্ঝঞ্ঝাট থাকার চেষ্টা করা। আর মানুষের সাথে শুধু সালাম ও খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংক্ষেপে আলাপ সেরে নেওয়া। এরপর একান্ত মনে নিজের কাজে নিমগ্ন থাকা। স্বল্প আহার করা। কারণ, বেশি আহার দীর্ঘ ঘুমের কারণ হয়। রাত্র বিনষ্ট করে।
এভাবে কেউ যদি আমাদের সালাফের জীবনাচারের দিকে লক্ষ রাখে এবং প্রতিফলের বিষয়ে বিশ্বাস রাখে, তাহলে আমি এতক্ষণ যা কিছু আলোচনা করলাম এগুলো তার নিকট পরিষ্কার হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১০৬. সুনানে তিরমিজি: ১১/৩৩৮৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৭- মা. শামেলা।
📄 বৈবাহিক জীবনের ভিত্তি হলো ভালোবাসা
বুদ্ধিমান মানুষের জন্য উচিত হবে, স্ত্রী হিসেবে কোনো ভদ্র পরিবার থেকে একজন সৎ নারীকে নির্বাচন করা। দরিদ্র হলেই ভালো, তাহলে স্বামীর ঘরে এসে যে বাড়তিটুকু প্রাপ্ত হবে, তাতেই সে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ হবে। এবং কিছুটা সমবয়সী দেখে বিয়ে করাই উত্তম। কারণ, একজন বৃদ্ধ যদি কোনো কিশোরীকে বিয়ে করে, তাহলে হতে পারে, মেয়েটি পাপাচারে জড়িয়ে যাবে কিংবা তাকে হত্যা করে ফেলবে। অথবা এমনও হতে পারে যে, মেয়েটি তালাক চায়; কিন্তু লোকটি তাকে ভালোবাসে—ফলে এটা কষ্টকর একটা অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুরুষকে অতিশয় ভালো আচরণ এবং অধিক খরচপাতি দিয়ে তার ত্রুটি ও কমতিগুলো পুষিয়ে দিতে হয়。
স্ত্রী খুব বেশি বেশি স্বামীর কোল ঘেঁষে থাকবে না। নতুবা উভয়ের মধ্যে বিরক্তিভাব চলে আসতে পারে। আবার খুব দূরে দূরেও থাকবে না। নতুবা স্বামী তাকে ভুলেই যাবে এবং তার দূরবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। স্ত্রী যখন স্বামীর নিকটবর্তী হবে, তখন সে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে আসবে। নিজের ঘ্রাণের ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখবে। আর সতর্ক থাকবে, স্বামী যেন তার লজ্জাস্থান না দেখে এবং সমস্ত শরীরও যেন না দেখে। কারণ, মানুষ যত সুন্দরই হোক, তার সমস্ত শরীর সমান সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়। কিছু অংশ ও স্থান না দেখাই ভালো। এতে মনের মধ্যে একটি বিরূপ ভাবের সৃষ্টি হতে পারে।
আর ঠিক একইভাবে স্বামীর জন্যও এ বিষয়গুলো প্রযোজ্য। সে তার পুরো শরীর স্ত্রীকে দেখাবে না। নিজের ঘ্রাণ ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও যত্নবান হবে। বিশেষকরে নৈকট্যে আসার সময়। আর সহবাস করবে বিছানায়।
সম্রাট কিসরা একদিন জবাই করা পশু ছেলানো, গোশত বানানো এবং রান্নার প্রক্রিয়াগুলো দেখলেন। এগুলো তার মনের মধ্যে একটি বিরূপভাবের সৃষ্টি করল। এরপর থেকে গোশত খাওয়ার প্রতি তার রুচি উঠে গেল। একদিন তিনি তার উজিরকে বললেন, উজির মশাই, এ আমার কী হলো? গোশত খেতে রুচি হচ্ছে না!
উজির বললেন, খাবার শুধু খাবার টেবিলে দেখাই উচিত, আর নারীকে বিছানায়।
অর্থাৎ সকল জিনিসের কিছু অসৌন্দর্য থাকে। এগুলোকে এড়িয়ে তার মৌলিক উদ্দেশ্যটুকু অর্জন করাই শ্রেয়।
হজরত আয়েশা রা. বলেন, আমি কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন অঙ্গ দেখিনি। তিনিও আমার থেকে দেখেননি। শুধু একরাতে ঘুমের মধ্যে তার বস্ত্র সরে যায়। এর আগে আর কখনো আমি তাঁর সম্পূর্ণ শরীর দেখিনি।
এগুলো চারিত্রিক ভব্যতার মৌলিক কিছু বিষয়। সুরুচিবান মানুষের কিছু চারিত্রিক সুষমা ও সৌন্দর্য। এভাবে চললে পুরুষ আর নারীর ত্রুটি ধরতে পারবে না। কারণ, সে তো তার ত্রুটিগুলো দেখতেই পায়নি। এছাড়াও স্বামী এবং স্ত্রীর জন্য আলাদা বিছানা হওয়া ভালো। তারা শুধু পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়েই একত্র হবে।
অনেক মানুষ এসকল বিষয়ে অবহেলা করে এবং এগুলোকে 'সামান্য বিষয়' বলে ধারণা করে। কিন্তু এর পরিণাম হয় অতি ভয়াবহ। অবস্থা হয়ে ওঠে নিরাময়ের অযোগ্য। তখন প্রায় দেখা যায়, স্ত্রী নিজ স্বামীকে দেখিয়ে বলছে, ইনি আমার সন্তানদের বাবা। অর্থাৎ তাকে নিজের করে ভাবতে পারছে না। আবার পুরুষের ক্ষেত্রেও এমন হয়। তখন আর কেউ কারও প্রতি কোনো আগ্রহ, আকর্ষণ ও আসক্তি রাখে না। অন্তর হয়ে পড়ে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। কাছাকাছি দুটি জীবন অতিবাহিত হতে থাকে—একেবারে আগ্রহ ও আকর্ষণহীন। প্রেম ও ভালোবাসাহীন।
বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের বিবাহিতদের ভাবা উচিত এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করা উচিত। এটি অনেক বড় একটি লক্ষণীয় বিষয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক কিছু—কর্ম স্বস্তি শান্তি ও ভবিষ্যৎ।
টিকাঃ
১০৭. হুবহু এই শব্দে হাদিসটি কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে হজরত আয়েশা রা. থেকে 'মুসনাদে আহমদ'-এর বর্ণনাটি এমন- ما رأيت فرج رسول الله صلى الله عليه وسلم قط। মুসনাদে আহমদ: ৫/২২৮৭, পৃষ্ঠা: ২৪২
বুদ্ধিমান মানুষের জন্য উচিত হবে, স্ত্রী হিসেবে কোনো ভদ্র পরিবার থেকে একজন সৎ নারীকে নির্বাচন করা। দরিদ্র হলেই ভালো, তাহলে স্বামীর ঘরে এসে যে বাড়তিটুকু প্রাপ্ত হবে, তাতেই সে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ হবে। এবং কিছুটা সমবয়সী দেখে বিয়ে করাই উত্তম। কারণ, একজন বৃদ্ধ যদি কোনো কিশোরীকে বিয়ে করে, তাহলে হতে পারে, মেয়েটি পাপাচারে জড়িয়ে যাবে কিংবা তাকে হত্যা করে ফেলবে। অথবা এমনও হতে পারে যে, মেয়েটি তালাক চায়; কিন্তু লোকটি তাকে ভালোবাসে—ফলে এটা কষ্টকর একটা অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুরুষকে অতিশয় ভালো আচরণ এবং অধিক খরচপাতি দিয়ে তার ত্রুটি ও কমতিগুলো পুষিয়ে দিতে হয়。
স্ত্রী খুব বেশি বেশি স্বামীর কোল ঘেঁষে থাকবে না। নতুবা উভয়ের মধ্যে বিরক্তিভাব চলে আসতে পারে। আবার খুব দূরে দূরেও থাকবে না। নতুবা স্বামী তাকে ভুলেই যাবে এবং তার দূরবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। স্ত্রী যখন স্বামীর নিকটবর্তী হবে, তখন সে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে আসবে। নিজের ঘ্রাণের ক্ষেত্রেও খেয়াল রাখবে। আর সতর্ক থাকবে, স্বামী যেন তার লজ্জাস্থান না দেখে এবং সমস্ত শরীরও যেন না দেখে। কারণ, মানুষ যত সুন্দরই হোক, তার সমস্ত শরীর সমান সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়। কিছু অংশ ও স্থান না দেখাই ভালো। এতে মনের মধ্যে একটি বিরূপ ভাবের সৃষ্টি হতে পারে।
আর ঠিক একইভাবে স্বামীর জন্যও এ বিষয়গুলো প্রযোজ্য। সে তার পুরো শরীর স্ত্রীকে দেখাবে না। নিজের ঘ্রাণ ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও যত্নবান হবে। বিশেষকরে নৈকট্যে আসার সময়। আর সহবাস করবে বিছানায়।
সম্রাট কিসরা একদিন জবাই করা পশু ছেলানো, গোশত বানানো এবং রান্নার প্রক্রিয়াগুলো দেখলেন। এগুলো তার মনের মধ্যে একটি বিরূপভাবের সৃষ্টি করল। এরপর থেকে গোশত খাওয়ার প্রতি তার রুচি উঠে গেল। একদিন তিনি তার উজিরকে বললেন, উজির মশাই, এ আমার কী হলো? গোশত খেতে রুচি হচ্ছে না!
উজির বললেন, খাবার শুধু খাবার টেবিলে দেখাই উচিত, আর নারীকে বিছানায়।
অর্থাৎ সকল জিনিসের কিছু অসৌন্দর্য থাকে। এগুলোকে এড়িয়ে তার মৌলিক উদ্দেশ্যটুকু অর্জন করাই শ্রেয়।
হজরত আয়েশা রা. বলেন, আমি কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন অঙ্গ দেখিনি। তিনিও আমার থেকে দেখেননি। শুধু একরাতে ঘুমের মধ্যে তার বস্ত্র সরে যায়। এর আগে আর কখনো আমি তাঁর সম্পূর্ণ শরীর দেখিনি।
এগুলো চারিত্রিক ভব্যতার মৌলিক কিছু বিষয়। সুরুচিবান মানুষের কিছু চারিত্রিক সুষমা ও সৌন্দর্য। এভাবে চললে পুরুষ আর নারীর ত্রুটি ধরতে পারবে না। কারণ, সে তো তার ত্রুটিগুলো দেখতেই পায়নি। এছাড়াও স্বামী এবং স্ত্রীর জন্য আলাদা বিছানা হওয়া ভালো। তারা শুধু পূর্ণ পরিচ্ছন্নতা আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়েই একত্র হবে।
অনেক মানুষ এসকল বিষয়ে অবহেলা করে এবং এগুলোকে 'সামান্য বিষয়' বলে ধারণা করে। কিন্তু এর পরিণাম হয় অতি ভয়াবহ। অবস্থা হয়ে ওঠে নিরাময়ের অযোগ্য। তখন প্রায় দেখা যায়, স্ত্রী নিজ স্বামীকে দেখিয়ে বলছে, ইনি আমার সন্তানদের বাবা। অর্থাৎ তাকে নিজের করে ভাবতে পারছে না। আবার পুরুষের ক্ষেত্রেও এমন হয়। তখন আর কেউ কারও প্রতি কোনো আগ্রহ, আকর্ষণ ও আসক্তি রাখে না। অন্তর হয়ে পড়ে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। কাছাকাছি দুটি জীবন অতিবাহিত হতে থাকে—একেবারে আগ্রহ ও আকর্ষণহীন। প্রেম ও ভালোবাসাহীন।
বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের বিবাহিতদের ভাবা উচিত এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করা উচিত। এটি অনেক বড় একটি লক্ষণীয় বিষয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক কিছু—কর্ম স্বস্তি শান্তি ও ভবিষ্যৎ।
টিকাঃ
১০৭. হুবহু এই শব্দে হাদিসটি কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে হজরত আয়েশা রা. থেকে 'মুসনাদে আহমদ'-এর বর্ণনাটি এমন- ما رأيت فرج رسول الله صلى الله عليه وسلم قط। মুসনাদে আহমদ: ৫/২২৮৭, পৃষ্ঠা: ২৪২
📄 নিজেকে লাঞ্ছিত করো না
অল্পেতুষ্ট না হলে দুনিয়াতে কারও পক্ষে সুখে বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ, যখনই অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে, চিন্তা ও অস্থিরতাও বাড়তে থাকবে সমানতালে। অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আরও অর্জন ও উপার্জনের প্রয়োজন হবে এবং এ কারণে অন্যরা তাকে দাসে পরিণত করে ছাড়বে।
আর যদি অল্পেতুষ্ট থাকা যায়, তখন আর নিজের চেয়ে ওপরের ব্যক্তির সাথে মেলামেশার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অধীনও হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি তার সমপর্যায়ের, তার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করার কিছু নেই। কারণ, তার নিকট যা আছে, তার নিজের কাছেও তা-ই আছে।
কিন্তু যে সকল ব্যক্তি অল্পেতুষ্ট থাকে না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের জীবন অন্বেষণ করে, তারা তাদের দ্বীনকে তুচ্ছ করে ফেলে। নিজেদেরকেও অন্যের সামনে নত অবনত ও অপদস্থ করে তোলে।
বিশেষ করে আলেমদের ক্ষেত্রে—তারা যদি ঘন ঘন আমির ও ধনবানদের নিকট যাতায়াত করতে থাকে, তবে তারা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে ছাড়বে। তারা সেখানে অনেক অপছন্দনীয় বিষয় দেখতে পাবে, কিন্তু নিষেধ করতে পারবে না। কখনো কোনো জালেমের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তার প্রশংসা করতেও বাধ্য হতে হবে... ইত্যাদি।
অর্থাৎ এসব করে তাদের থেকে যতটা পার্থিব বিষয় অর্জন করবে, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি তাকে লাঞ্ছনায় পড়তে হবে—নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বিচারক ও সাক্ষীদের। যদিও এককালে এ দুটি বিষয়ই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও মহত্বের নিদর্শন। যেমন, কাজি আবদুল হামিদ ছিলেন এমন এক বিচারক—যিনি কখনো কোনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। অন্যায় করতেন না। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করছি—একবার তিনি খলিফা মুতাদিদের নিকট খবর পাঠালেন—আপনি কিছু সরকারি জমি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার ভাড়া পরিশোধ করুন।'
খবর পেয়ে খলিফা ভাড়া পরিশোধ করলেন। এরপর খলিফা বিচারক আবদুল হামিদকে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি মারা গিয়েছে, তার নিকট আমার কিছু অর্থ প্রাপ্য ছিল। আপনি এটি প্রদানের ব্যবস্থা করুন।'
বিচারক খলিফাকে বললেন, 'আপনি যখন আমাকে এই বিচারকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেদিন বলেছিলেন, এই দায়িত্বটি আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে অর্পণ করলাম। অর্থাৎ আমাকে বিচারক হিসেবেই বিচার করতে হবে। আর সে হিসাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আপনি যে সম্পদের দাবি করছেন, এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে দু-জন সাক্ষী ব্যতীত আমি আপনার পক্ষে কিছু করতে সক্ষম নই।'
এই ছিল তখনকার বিচার ও বিচারকের সম্মান! সাক্ষীর বিষয়টিও ছিল এমন মর্যাদাকর। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—একবার এক খলিফার নিকট কিছু লোক এল। খাদেম বলল, তোমরা কি আমার মুনিবের পক্ষে এ বিষয়ে সাক্ষী হবে?
লোকগুলো খাদেমের কথা অনুযায়ী বিষয়টির ওপর খলিফার সাক্ষী হতে রাজি হলো। এ সময় হজরত মাজঝুয়ি আমিরের নিকট একান্তে এগিয়ে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই কাগজে যা লেখা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনার সাক্ষী হতে পারি?
খলিফা বললেন, অসুবিধা নেই। তুমি সাক্ষী থাকো।
মাজঝুয়ি বললেন, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার এভাবে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যতক্ষণ না নিজ মুখে 'হ্যাঁ' বলবেন, ততক্ষণ আমি সাক্ষী হব না।
খলিফা বললেন, হ্যাঁ। সাক্ষী হতে পারো।
এরপর হজরত মাজঝুয়ি খলিফার বিষয়ে সাক্ষী হলেন। এমনটাই ছিল তখন বিচার, বিচারক এবং সাক্ষ্য ও সাক্ষীর মর্যাদা ও মহত্ব।
কিন্তু আমাদের যুগে এসে সবই উল্টে গেছে। এমনকি মানুষ আজ ঘুষ দিয়েও সাক্ষী হতে চায়। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া অর্জন করে। তুমি দেখবে, নিজেদের অদেখা ও অজানা বিষয়েও তারা সাক্ষ্য দেবার জন্য কেমন প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়!
আবুল মায়ালি ইবনে শাফি আমাকে বলেছেন, আমাকে একবার একটি সাধারণ বন্দির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। আল্লাহর নিকট এ জন্য আমি খুব ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ মাফ করুন!
আমরা জানি, সাক্ষ্য প্রদানের কারণে সাক্ষীদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। বরং সময়-অসময়ে তার দরজায় করাঘাত পড়ে এবং নিজের কাপড় টেনে নিজের সময় খরচ করে নিজেকেই সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। এটা কোনো সুখ ও লাভের বিষয় নয়। এ কারণে প্রবাদকথা আছে—আল্লাহ তোমাকে সাক্ষী হওয়ার নিয়ামত থেকে রক্ষা করুন!
একারণে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাক্ষী হওয়া এবং বিচারক হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন।
যেমন, হজরত ইবরাহিম নাখঈ রহ. এর ক্ষেত্রে লোকেরা যখন বলতে লাগল, আপনিই হবেন আমাদের বিচারক, তখন তিনি লাল জামা গায়ে বাজারে যাওয়া-আসা করতে শুরু করলেন। দেখতে বেখাপ্পা লাগে। অবশেষে লোকেরাই আবার বলতে লাগল—'তিনি এ পদের যোগ্য নন।'
আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়—একবার খলিফা হারুনুর রশিদ একজন প্রাজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা তাকে বিচারকের দায়িত্ব দিতে চান। লোকটি খলিফার নিকট এসে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি কেমন আছেন এবং আপনার সন্তান-সন্ততি কেমন আছে?...
লোকটির এমন বোকামিপূর্ণ কথা শুনে আশপাশের লোকেরা বলল—এ তো পাগল। ফলে তাকে বিচারকের পদ প্রদান করা থেকে বিরত রাখা হলো।
আল্লাহর কসম! তার এই পাগলামিই ছিল প্রাজ্ঞতা। বিচারকের পদ থেকে বিরত থাকার জন্য তার এই বোকামিই ছিল বুদ্ধিমত্তা।
কিন্তু আমাদের অবস্থা কী! আমার ধারণা, আখেরাতের প্রতি আমাদের ঈমান রয়েছে খুবই টলটলায়মান অবস্থায়। সামান্য ঝাঁকিতেই গড়িয়ে পড়ে পড়ে ভাব। তাই আমাদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে হিফাজত রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
অল্পেতুষ্ট না হলে দুনিয়াতে কারও পক্ষে সুখে বসবাস করা সম্ভব নয়। কারণ, যখনই অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে, চিন্তা ও অস্থিরতাও বাড়তে থাকবে সমানতালে। অন্তর বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আরও অর্জন ও উপার্জনের প্রয়োজন হবে এবং এ কারণে অন্যরা তাকে দাসে পরিণত করে ছাড়বে।
আর যদি অল্পেতুষ্ট থাকা যায়, তখন আর নিজের চেয়ে ওপরের ব্যক্তির সাথে মেলামেশার প্রয়োজন পড়বে না। তাদের অধীনও হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি তার সমপর্যায়ের, তার প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করার কিছু নেই। কারণ, তার নিকট যা আছে, তার নিজের কাছেও তা-ই আছে।
কিন্তু যে সকল ব্যক্তি অল্পেতুষ্ট থাকে না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের জীবন অন্বেষণ করে, তারা তাদের দ্বীনকে তুচ্ছ করে ফেলে। নিজেদেরকেও অন্যের সামনে নত অবনত ও অপদস্থ করে তোলে।
বিশেষ করে আলেমদের ক্ষেত্রে—তারা যদি ঘন ঘন আমির ও ধনবানদের নিকট যাতায়াত করতে থাকে, তবে তারা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে ছাড়বে। তারা সেখানে অনেক অপছন্দনীয় বিষয় দেখতে পাবে, কিন্তু নিষেধ করতে পারবে না। কখনো কোনো জালেমের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তার প্রশংসা করতেও বাধ্য হতে হবে... ইত্যাদি।
অর্থাৎ এসব করে তাদের থেকে যতটা পার্থিব বিষয় অর্জন করবে, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি তাকে লাঞ্ছনায় পড়তে হবে—নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বিচারক ও সাক্ষীদের। যদিও এককালে এ দুটি বিষয়ই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও মহত্বের নিদর্শন। যেমন, কাজি আবদুল হামিদ ছিলেন এমন এক বিচারক—যিনি কখনো কোনো পক্ষপাতিত্ব করতেন না। অন্যায় করতেন না। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করছি—একবার তিনি খলিফা মুতাদিদের নিকট খবর পাঠালেন—আপনি কিছু সরকারি জমি ভাড়া নিয়েছিলেন, তার ভাড়া পরিশোধ করুন।'
খবর পেয়ে খলিফা ভাড়া পরিশোধ করলেন। এরপর খলিফা বিচারক আবদুল হামিদকে বললেন, 'অমুক ব্যক্তি মারা গিয়েছে, তার নিকট আমার কিছু অর্থ প্রাপ্য ছিল। আপনি এটি প্রদানের ব্যবস্থা করুন।'
বিচারক খলিফাকে বললেন, 'আপনি যখন আমাকে এই বিচারকের দায়িত্ব অর্পণ করেন, সেদিন বলেছিলেন, এই দায়িত্বটি আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে আপনার কাঁধে অর্পণ করলাম। অর্থাৎ আমাকে বিচারক হিসেবেই বিচার করতে হবে। আর সে হিসাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই আপনি যে সম্পদের দাবি করছেন, এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে দু-জন সাক্ষী ব্যতীত আমি আপনার পক্ষে কিছু করতে সক্ষম নই।'
এই ছিল তখনকার বিচার ও বিচারকের সম্মান! সাক্ষীর বিষয়টিও ছিল এমন মর্যাদাকর। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—একবার এক খলিফার নিকট কিছু লোক এল। খাদেম বলল, তোমরা কি আমার মুনিবের পক্ষে এ বিষয়ে সাক্ষী হবে?
লোকগুলো খাদেমের কথা অনুযায়ী বিষয়টির ওপর খলিফার সাক্ষী হতে রাজি হলো। এ সময় হজরত মাজঝুয়ি আমিরের নিকট একান্তে এগিয়ে গিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই কাগজে যা লেখা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমি কি আপনার সাক্ষী হতে পারি?
খলিফা বললেন, অসুবিধা নেই। তুমি সাক্ষী থাকো।
মাজঝুয়ি বললেন, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার এভাবে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যতক্ষণ না নিজ মুখে 'হ্যাঁ' বলবেন, ততক্ষণ আমি সাক্ষী হব না।
খলিফা বললেন, হ্যাঁ। সাক্ষী হতে পারো।
এরপর হজরত মাজঝুয়ি খলিফার বিষয়ে সাক্ষী হলেন। এমনটাই ছিল তখন বিচার, বিচারক এবং সাক্ষ্য ও সাক্ষীর মর্যাদা ও মহত্ব।
কিন্তু আমাদের যুগে এসে সবই উল্টে গেছে। এমনকি মানুষ আজ ঘুষ দিয়েও সাক্ষী হতে চায়। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুনিয়া অর্জন করে। তুমি দেখবে, নিজেদের অদেখা ও অজানা বিষয়েও তারা সাক্ষ্য দেবার জন্য কেমন প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়!
আবুল মায়ালি ইবনে শাফি আমাকে বলেছেন, আমাকে একবার একটি সাধারণ বন্দির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়। আল্লাহর নিকট এ জন্য আমি খুব ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ মাফ করুন!
আমরা জানি, সাক্ষ্য প্রদানের কারণে সাক্ষীদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। বরং সময়-অসময়ে তার দরজায় করাঘাত পড়ে এবং নিজের কাপড় টেনে নিজের সময় খরচ করে নিজেকেই সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়। এটা কোনো সুখ ও লাভের বিষয় নয়। এ কারণে প্রবাদকথা আছে—আল্লাহ তোমাকে সাক্ষী হওয়ার নিয়ামত থেকে রক্ষা করুন!
একারণে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাক্ষী হওয়া এবং বিচারক হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন।
যেমন, হজরত ইবরাহিম নাখঈ রহ. এর ক্ষেত্রে লোকেরা যখন বলতে লাগল, আপনিই হবেন আমাদের বিচারক, তখন তিনি লাল জামা গায়ে বাজারে যাওয়া-আসা করতে শুরু করলেন। দেখতে বেখাপ্পা লাগে। অবশেষে লোকেরাই আবার বলতে লাগল—'তিনি এ পদের যোগ্য নন।'
আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়—একবার খলিফা হারুনুর রশিদ একজন প্রাজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। খলিফা তাকে বিচারকের দায়িত্ব দিতে চান। লোকটি খলিফার নিকট এসে সালাম দিয়ে বললেন, আপনি কেমন আছেন এবং আপনার সন্তান-সন্ততি কেমন আছে?...
লোকটির এমন বোকামিপূর্ণ কথা শুনে আশপাশের লোকেরা বলল—এ তো পাগল। ফলে তাকে বিচারকের পদ প্রদান করা থেকে বিরত রাখা হলো।
আল্লাহর কসম! তার এই পাগলামিই ছিল প্রাজ্ঞতা। বিচারকের পদ থেকে বিরত থাকার জন্য তার এই বোকামিই ছিল বুদ্ধিমত্তা।
কিন্তু আমাদের অবস্থা কী! আমার ধারণা, আখেরাতের প্রতি আমাদের ঈমান রয়েছে খুবই টলটলায়মান অবস্থায়। সামান্য ঝাঁকিতেই গড়িয়ে পড়ে পড়ে ভাব। তাই আমাদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে হিফাজত রাখেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।