📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আত্মার সুখ

📄 আত্মার সুখ


দুনিয়াতে আলেম ও জাহেদ ছাড়া মনের প্রকৃত সুখ কেউ উপভোগ করতে পারে না। হ্যাঁ, কখনো কখনো তাদের পূতপবিত্র স্বচ্ছ অবস্থাও মধ্যে পঙ্কিলতা এসে ভর করতে চায়।
কারণ হলো, আলেম তার ইলম অর্জন করা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। উপার্জনের তেমন একটা সময় সুযোগ পায় না। এ অবস্থায় তার যদি পরিবার-পরিজন থাকে, তবে তো তার সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তাকে বাধ্য হয়েই শাসক বা সুলতানের দরবারে ধরনা দিতে হয়। এতে করেই তার অবস্থা ও অবস্থানের ভীষণ ক্ষতি হয়।
জাহেদ ব্যক্তির অবস্থাও ঠিক এমনই।
এ কারণে আলেম এবং আবেদ ব্যক্তিদেরও জীবিকা অর্জনের জন্য কিছু কিছু কাজে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। যেমন, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোনো অনুলিপি তৈরি করা, লেখালেখি করা কিংবা পাটি বানানো। ১০৪ তার যদি এতে সামান্য উপার্জনও হয়, তবে সে এটার ওপর সন্তুষ্ট থাকবে। এভাবে যদি সে চলতে পারে, তাহলে আর কোনো মানুষ তাকে ‘গোলাম’ বানিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না।
যেমন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. খুবই সামান্য উপার্জনের ওপর জীবন অতিবাহিত করতেন। কখনো মাত্র একটি দিনারে তার মাস চলে যেত।
কিন্তু কোনো আলেম যদি এমন অল্পেতুষ্টি অর্জন না করে, তবে শাসকবর্গ ও সাধারণ ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা তার দ্বীন-ধর্মকে বিনষ্ট করে দেবে।
স্বভাবগতভাবেই কিছু মানুষ একটু আরাম-আয়েশে থাকতে ভালোবাসে। ভালো থাকা, ভালো খাওয়া। কঠিন ও কঠোর জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত নয়। এগুলো তাদের শরীর সইতে পারে না। এমতাবস্থায় তাদের আগে থেকেই যদি আর্থিক সংগতি না থাকে, তবে তো তাদের জন্য দ্বীন-ধর্ম রক্ষা করা খুবই মুশকিল। স্বল্প উপার্জনে দুনিয়ার আস্বাদনের সাথে সাথে কীভাবে সে তার দ্বীনকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে?
কিন্তু কোনো আলেম বা জাহেদ যদি অল্পেতুষ্ট হয়, তবে তারা কিছুতেই নিজেদেরকে শাসকবর্গের জন্য বিলিয়ে দেবে না। তারাও তাদেরকে যখন-তখন নিজেদের দরবারে ডেকে নিতে পারবে না। এবং জাহেদকেও তখন আর লৌকিকতার আশ্রয় নিতে হবে না।
সুখের জীবন তো সেই স্বাধীন ব্যক্তির, যার মাথা নত হয় না কোনো মানুষের কাছে এবং তার কাছেও নত হয় না কোনো মাথা। এটাই হলো একজন আদর্শ মুসলিমের দৃষ্টান্ত।

টিকাঃ
১০৪ এখানে লেখক সে যুগের অবস্থা নিয়ে বলেছেন। আল্লাহর শোকর, আমাদের এযুগে কর্মের পরিধি আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। আলেমগণ যদি পরিশ্রমের মানসিকতা নিয়ে এগুলোর সাথে যুক্ত হন, তাহলে তাদের নিজের, দ্বীনের এবং দেশ ও মানুষের অনেক উপকার হয়। হ্যাঁ, তবে নিজের অবস্থা ও অবস্থানের সাথে মানানসই কোনো কর্মের সাথে যুক্ত হওয়াটাই অধিকতর কল্যাণকর- অনুবাদক।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিই ধূর্ততা দ্বারা মণ্ডিত

📄 দুনিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিই ধূর্ততা দ্বারা মণ্ডিত


যে ব্যক্তি দুনিয়ার বিষয়ে চিন্তা করে, সে জানে—দুনিয়াতে প্রকৃত সুখ ও আস্বাদন অর্জন করা সম্ভব নয়। আর যদি কোথাও কোনো কিছুতে আস্বাদন অর্জিত হয়, তবে তার পেছনে এত বেশি কদর্যতা নিহিত থাকে যে—পরিণামে আস্বাদনের চেয়ে বহুগুণ কষ্ট ও বেদনাই তাকে পেতে হয়।
যেমন, কেউ যদি দুনিয়ার আস্বাদন কোনো সুন্দরী নারীর মাধ্যমে পেতে চায়, সেখানেও অনেক সমস্যা। অনেক সময় সুন্দরী নারীগণ কঠোর ও অহংকারী স্বভাবের হয়। তাদের সাথে জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। হয়তো স্বামীকে ভালোবাসে না। আর এই ব্যাপারটি যখন স্বামী বুঝবে, তখন তার জীবন বিস্বাদ হয়ে উঠবেই।
নারী কখনো প্রতারণা ও খেয়ানতও করে। তখন তো জীবনই ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হবে। আর যদি সকল উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষার সমাপ্তি ঘটে, তখন তো হারানো বিষয়ের স্মরণ কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
কখনো পুত্র-কন্যার মাধ্যমেও মানুষ সুখ খুঁজতে চায়। এখানেও বিভিন্ন সমস্যা। সন্তান যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, জান-প্রাণ উড়ে যেতে চায়। অস্থির হয়ে ওঠে মন। আর যদি সেটা দুরারোগ্য ধরনের কোনো ব্যাধি হয় কিংবা আর না-ই সারে, তখন তো শোক, আফসোস ও অনুতাপে জীবন আনন্দহীন হয়ে ওঠে। আর যদি অবাধ্য অনাচারী হয়, তখন আরেক বিপদ। এছাড়াও বিয়ের পর কী হয়—সেটা আরেক চিন্তা। কন্যার স্বামী যদি তাকে কষ্ট দেয়—জীবন আবার কষ্টকর হয়ে ওঠে। কিংবা সন্তান যদি বিবাহের পর বেয়াড়া হয়ে পড়ে, তখনও চিন্তার বিষয়। কন্যার দূরে চলে যাওয়া, পুত্রের দূরে সরে পড়া—সবই কষ্টকর। আর যদি কোনো উদ্দেশ্যই পূরণ না হয়—তখন তো বাকি জীবনটাই আফসোসের মধ্যে কাটাতে হয়।
আর কোনো পাপাচারী ব্যক্তি যদি শ্মশ্রুহীন কোনো বালকের প্রতি আসক্ত হয়ে যায়, তবে তো দুনিয়ায় তার মান-সম্মান নষ্ট হয়ে যায় আর দ্বীনদারি তো পুরোটাই ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়ে।
কত মানুষ সামান্য সময়ের উত্তেজনা ও কামনার বশে এমন কর্ম করে বসে, পরিণামে জীবনভর সেই কলঙ্ক ও ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হয়। কখনো-বা কারও ওপর উত্তেজনা প্রবল হওয়ার কারণে কৃষ্ণাঙ্গ দাসীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করে বসে, ফলে তার গর্ভ থেকে কৃষ্ণ বর্ণের সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পরিণামে এটা তার জন্য আজীবনের লজ্জার কারণ হয়ে থাকে।
এছাড়াও কেউ যদি সম্পদের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করতে চায়, তখন দেখা যায়, তার এই অর্জনের মধ্যে গোনাহের মিশ্রণ এসে গেছে। আবার সম্পদ যদি বিনষ্ট হয়ে পড়ে, তখনও আফসোস ও কষ্টের সীমা থাকে না। এভাবে জীবনটাই অতিবাহিত হয়ে যায় একটি প্রতারণা এবং সুখে থাকার অলীক কল্পনার মধ্যে।
মানুষের জীবনে আরও ভয়াবহ যত ক্ষতি ঘটে, আমি এখানে তার অল্পকিছু নমুনা উপস্থাপন করলাম। নতুবা পাপমিশ্রিত দুনিয়ার জীবনে বাস্তব ভয়াবহতা আরও অনেক করুণ ও অসংখ্য।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা যাকে সক্ষমতা দিয়েছেন, সে যেন নিজের জীবনের আবশ্যক বিষয়াবলির ওপরই সন্তুষ্ট থাকে। এতে করে সে তার নিজের শরীর সম্মান ও দ্বীন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে। ভালো ও সুন্দর থাকবে। আর সেই প্রবৃত্তি ও কামনাগুলো বর্জন করবে, যেগুলোতে লিপ্ত হওয়ার পরিণামে আরও বহুগুণ কষ্ট ও শান্তি আবশ্যক হয়ে পড়ে।
বরং যে ব্যক্তি পরিণামের কথা ভেবে সাময়িক কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করে এবং তাৎক্ষণিক স্ফূর্তি থেকে বিরত থাকে, প্রতিফলে সে ব্যক্তি আরও বহুগুণ বেশি এবং স্থায়ী আনন্দ অর্জন করতে সক্ষম হয়। যেমন ছাত্রদের কথা—তারা যদি অল্প কিছুদিনের জন্য জান-প্রাণ পরিশ্রম করে, তবে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে পারে। উভয় জগতেই সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। আর এই অল্প সময়গুলো যদি অবহেলা ও অলসতায় কাটিয়ে দেয়, তবে ইলম ও আমলহীন হয়ে পড়ে। বাকি জীবনে আফসোস অনুশোচনা ও লাঞ্ছনা তাদের নিত্য সঙ্গী হয়। ছাত্রজীবনের সেই স্বল্প বিলাসের বহুগুণ বেশি কষ্ট ও বেদনার মধ্যে তাকে আপতিত হতে হয়।
আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, তাৎক্ষণিক কামনা উত্তেজনা যেন তোমার উপর বিজয়ী হতে না পারে। আর প্রবৃত্তি যদি বলে, ঠিক আছে এখন করো, পরে তাওবা করে নিলেই হবে, তবে খুব জোরের সাথে তুমি তাকে প্রতিরোধ করে দাঁড়াও। তাকে অতি আসন্ন শাস্তি ও পরিণামের ভয় দেখিয়ে এই সাময়িক আস্বাদন থেকে বিরত রাখো।
বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে। অন্যরা হেলায়-খেলায় হারিয়ে ফেলে। এর পরিণাম হয় অতি ভয়াবহ!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কোরআন ও সুন্নাহ হেদায়েতের মূল

📄 কোরআন ও সুন্নাহ হেদায়েতের মূল


আমি ভেবে দেখেছি, মানুষের ওপর ইবলিস বিভিন্ন কৌশলে তার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। সে অধিকাংশ মানুষকে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে—অথচ ইলমই হলো মানবজীবনের আলো। এছাড়া তার জীবন অন্ধকার। তাই ইবলিস অনেক সুফি ও সাধককে অজ্ঞতা ও মূর্খতার অন্ধকারে অন্ধভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়। সে কারণে তারা নিজেদের ইন্দ্রিয়শক্তির নিয়ন্ত্রণে বন্দি হয়ে পড়ে। আকল ও যুক্তির কোনো ধার ধারে না। এরপর তাদের কারও যখন জীবনে দারিদ্র্য চেপে বসে, সবকিছু বিনষ্ট হয়ে যায়, তখন সে হতাশ হয়ে পড়ে; এমনকি কেউ কেউ কুফরের দিকে ধাবিত হয়।
তখন কেউ কেউ যুগকেই দোষারোপ করতে থাকে, কেউ গালি দেয় দুনিয়াকেই। এটা একটা নিকৃষ্টতম পদ্ধতি। কারণ, যুগ বা দুনিয়া এগুলো সংঘটিত করে না। এর মাধ্যমে মূলত স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার দোষ ধরা হয়। নাউজুবিল্লাহ!
তাদের কেউ কেউ বিরূপ চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর হিকমতকে অস্বীকার করতে থাকে। তখন সে বলতে থাকে, এত সুন্দর জগৎ গঠনের পর তা ধ্বংস করার মধ্যে কী কল্যাণ? শুধুই অনর্থক এক কাজ! আবার কেউ কেউ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকেই অসম্ভব মনে করে। পুনর্জীবনকে অস্বীকার করে। এবং যুক্তি দেখিয়ে বলে, এ পর্যন্ত সেখান থেকে কেউ তো ফিরে এসে এটা প্রমাণ করছে না!
কিন্তু তারা কেন ভুলে যায়, দুনিয়া থেকে সকল মানুষের এখনো তো অন্তর্ধান হয়নি। এর আগেই যদি জীবিত মানুষ পুনর্জীবন দেখে ফেলে, তবে আর অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনা সম্ভব হবে না—তখন আর এটা ‘অदृश्य’ বলে গণ্য হবে না। চাক্ষুষ পুনর্জীবন দিয়ে পুনর্জীবনের ওপর প্রমাণ চাওয়া তাই একটি বড় ধরনের বোকামি এবং অযৌক্তিক প্রস্তাব।
এরপর ইবলিস যখন মুসলমানদের অবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখে, তাদের মধ্যে অনেকেই আছে অনেক মেধাবী। তখন সে তাদের মনের মধ্যে উদয় করে, দেখো, শরিয়তের বাহ্যিক বিষয়াবলি এতটাই সহজ ও সরল বিষয় যে অনেক সাধারণ মানুষও সেগুলো জানে ও বোঝে। সুতরাং তাদের থেকে ভিন্ন হওয়ার জন্য, পণ্ডিত ও অনন্য হওয়ার জন্য দর্শন ও কালামশাস্ত্র অধ্যয়ন করা দরকার। তখন তারা অ্যারিস্টটল, জালিয়ানুস, পীথাগোরাস এবং বিভিন্ন পণ্ডিতদের কথাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তু এরা তো আমাদের শরিয়তের অনুসারী ছিল না। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মান্যকারী ছিল না। বরং তারা তাদের মত ও মতবাদগুলো ছড়িয়েছে নিজেদের আকল মেধা যুক্তি ও মন দ্বারা যতটুকু বুঝেছে ও জেনেছে—সে অনুযায়ী। অনিবার্যভাবে এগুলোতে তারা অসংখ্য ভুলের শিকার হয়েছে।
আমাদের পূর্বপুরুষদের অভ্যাস ছিল, তাদের কারও যখন কোনো সন্তান হতো, তাকে প্রথমে কোরআনের শিক্ষায় নিমগ্ন করে দিতেন। বিশেষকরে যদি পুত্র সন্তান হতো, তবে তাকে কোরআন ও হাদিস মুখস্থের কাজে লাগিয়ে দিতেন। এর মাধ্যমে তাদের অন্তরের মধ্যে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যেত। কিন্তু বর্তমানের মানুষ এগুলোর ক্ষেত্রে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। এ কারণে তার মেধাবী সন্তানটি প্রাচীন মানুষের দর্শন নিয়ে মেতে উঠছে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস এই বলে পরিত্যাগ করছে যে, এগুলো তো মাত্র একজনের কথা; কোনো সম্মিলিত গবেষণালব্ধ বিষয় নয়। হাদিসবিশারদ ব্যক্তিকেও তাই তারা আর জ্ঞানী ও পণ্ডিতব্যক্তি বলে মান্য করে না। তারা এখন বিশ্বাস রাখে অতি সূক্ষ্ম দর্শন, প্রকৃতি বিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, পদার্থ ও পরমাণু বিদ্যায়।
এরপর তারা স্রষ্টার গুণাবলির ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে। এগুলোর কোনোটিকে বাদ দেয়। কোনোটির সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করে। আবার কখনো স্রষ্টার সাথে অনুচিত গুণাবলিও যুক্ত করে। এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে যে কথাগুলো আমাদের নিকট পৌঁছেছে, সেগুলোকে পার্থিব ঘটনা ও যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে চায়। যেমন মুতাযিলারা বলে,
إن الله لا يرى لأن المرئي يكون في جهة.
আল্লাহ তাআলাকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ, দৃশ্য বিষয় তো কোনো একটি দিকে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা কোনো দিক থেকে মুক্ত।
অথচ এই কথাটি হাদিসের এই কথাটির সম্পূর্ণ বিপরীত। হাদিসে এসেছে—
إنكم ترون ربكم كما ترون القمر لا تضامون في رؤيته.
নিশ্চয় তোমরা তোমাদের প্রতিপালকে দেখতে পাবে [কিয়ামতের দিন], যেভাবে তোমরা আকাশের চাঁদ দেখো। চাঁদ দেখতে তোমাদের কোনো কষ্ট হয় না। (সেদিনও তেমনই হবে।) ১০৫
এভাবে তারা কোরআনের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি করেছে। তারা কোরআনের ক্ষেত্রে বলেছে, এটা মাখলুক বা সৃষ্ট এবং ধ্বংসশীল। এভাবে তারা মানুষের অন্তর থেকে তার সম্মান ও মর্যাদাই বিনষ্ট করে দিয়েছে।
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর ক্ষেত্রে তারা বলেছে, এটা তো মাত্র একজন ব্যক্তির জীবনযাপন। একজন ব্যক্তির কথা ও মন্তব্য- এটা কোনো পরীক্ষিত সত্য নয়।
এমনই ভয়াবহ তাদের বিভ্রান্তিকর মতবাদ। তারা অ্যারিস্টটল, জালিয়ানুস ও অন্য দার্শনিকদের কথা নকল করে বেড়ায়। এগুলোকেই অকাট্য সত্য বলে মেনে চলে। দর্শনের ঘুপচি গলিতে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নামাজ-রোজা ও ইসলামি শরিয়তের বিধান থেকে মুক্ত রাখে। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের পা অগ্রসর হতে থাকে কুফরির দিকে।
এ কারণে আমাদের কিছু পূর্বসূরি দর্শন বা যুক্তিশাস্ত্রের চর্চা করা অপছন্দ করতেন। এমনকি ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন,
حكمي فيهم أن يركبوا على البغال ويشهروا ويقال: هذا جزاء من ترك الكتاب والسنة واشتغل بالكلام.
যে সকল ব্যক্তি দর্শন বা কালামশাস্ত্র চর্চা করবে তাদের ক্ষেত্রে আমার মন্তব্য হলো, তাদেরকে গাধার পিঠে চড়িয়ে মানুষের মাঝে ঘুরানো হবে। এবং বলা হবে, যে ব্যক্তি কোরআন ও সুন্নাহ ছেড়ে 'কালামশাস্ত্র' নিয়ে মগ্ন থাকে, তার প্রতিফল এমনই হয়ে থাকে।
এমনকি এসকল দর্শনগামী ব্যক্তিদের অবস্থা এতটাই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে যে, তারা বিশ্বাস করে-যে ব্যক্তি যুক্তিশাস্ত্রের বিচারে 'তাওহিদ'-এর বিস্তারিত প্রমাণাদি জানে না, সে ব্যক্তি মুসলমানই নয়।
আল্লাহ আমাদের বিদআতের মিশ্রণ থেকে রক্ষা করুন। তোমরা বরং কোরআন ও সুন্নাহকেই ভালোভাবে আঁকড়ে ধরো-তবেই তোমরা সোজা ও সঠিক পথটি প্রাপ্ত হবে।

টিকাঃ
১০৫. সুনানে তিরমিজি: ৯/২৪৭৭, পৃষ্ঠা: ১১১- মা. শামেলা। পুরো হাদিসটি এমন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتُضَامُونَ فِي رُؤْيَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ وَتُضَامُونَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ قَالُوا لَا قَالَ فَإِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ الْقَمَرَ لَيْلَةَ الْبَدْرِ لَا تُضَامُونَ فِي رُؤْيَتِهِ

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সময় যেন এক তরবারি

📄 সময় যেন এক তরবারি


আমি দেখেছি—মানুষের অনেক নষ্ট অভ্যাস তার সময়গুলো বিনষ্ট করে দেয়। তারা এ ব্যাপারে কোনো ভ্রূক্ষেপই করে না। অথচ আমাদের পূর্ববর্তীগণ এ ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন।
আমাদের এক পূর্বসূরির নিকট একবার কিছু লোক আগমন করে বলল, আমরা হয়তো আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে ফেললাম!
তিনি ভণিতা না করে বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমি একটি কিতাব পড়ছিলাম। আপনাদের আগমনের কারণে পড়া বন্ধ রাখতে হয়েছে।
একবার কিছুলোক হজরত মারুফ কারখির নিকট উপবিষ্ট ছিল। তারা দীর্ঘক্ষণ এভাবে বসেই থাকল। অবশেষে তিনি বললেন, সূর্যের মালিক তো আর সূর্যকে চালানোর ব্যাপারে কমতি করবেন না। তবুও আপনারা উঠছেন না কেন? আর কতক্ষণ অনর্থক বসে থাকবেন?
সময়ের মূল্যায়নের ব্যাপারে আমের ইবনে কায়েস রহ.-এর প্রসিদ্ধি ছিল প্রবাদতুল্য। একবার একলোক তাকে বলল, একটু দাঁড়ান। আপনার সাথে কিছু গল্প করতে চাই।
তিনি তাকে বললেন, তবে তুমি সূর্যকে দাঁড় করিয়ে রাখো। (যদি এটা পারো, তাহলে তোমার প্রস্তাবে রাজি আছি। নতুবা নই।)
হজরত উসমান আল বাকিল্লানি রহ. সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকতেন। তিনি বলেন, খাওয়ার সময়টা আমার নিকট সবচেয়ে কষ্টকর মনে হয়। যেন আমার প্রাণ বের হয়ে যেতে চায়। কারণ, খাওয়ার কারণে সেই সময়টুকু আল্লাহর জিকির থেকে বিরত থাকতে হয়।
আমাদের এক পূর্বসূরি তার সাথি-মুরিদদের বলতেন, তোমরা যখন আমার মজলিস থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে ফিরবে, তখন সকলে আলাদা আলাদা হয়ে যাবে। এতে হয়তো কেউ কোরআন তেলাওয়াত করতে করতে যেতে পারবে। আর একসঙ্গে গেলে অনর্থক গল্পগুজব হবে।
জেনে রেখো, সময়ের একটি মুহূর্তও নষ্ট করা উচিত নয়। সহিহভাবে বর্ণিত হয়েছে—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من قال سبحان الله العظيم وبحمده غرست له بها نخلة في الجنة.
যে ব্যক্তি একবার 'সুবহানাল্লাহিল আযিম ওয়া বিহামদিহি' বলে, বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপিত হয়ে যায়। ১০৬
মানুষ জাতি এমন কত সময় অনর্থক অযথা বিনষ্ট করে; অথচ সে সময়ে কত সওয়াব ও পুরস্কার প্রাপ্তির কাজ করা যেত! মানুষের এই সময়গুলো শস্যক্ষেতের মতো। মানুষকে যেন ডেকে ডেকে বলা হচ্ছে, এই সময়ের মধ্যে তুমি যদি একটি বীজ বপন করো, তবে আমি তোমার জন্য হাজার শস্য নিয়ে হাজির হব।
এমন ঘোষণার পরও কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য বীজ বপন না করা কিংবা এক্ষেত্রে অলসতা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। আর সময়কে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি সহায়ক পদ্ধতি হলো, যতদূর সম্ভব নির্জন নিরালায় নির্ঝঞ্ঝাট থাকার চেষ্টা করা। আর মানুষের সাথে শুধু সালাম ও খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংক্ষেপে আলাপ সেরে নেওয়া। এরপর একান্ত মনে নিজের কাজে নিমগ্ন থাকা। স্বল্প আহার করা। কারণ, বেশি আহার দীর্ঘ ঘুমের কারণ হয়। রাত্র বিনষ্ট করে।
এভাবে কেউ যদি আমাদের সালাফের জীবনাচারের দিকে লক্ষ রাখে এবং প্রতিফলের বিষয়ে বিশ্বাস রাখে, তাহলে আমি এতক্ষণ যা কিছু আলোচনা করলাম এগুলো তার নিকট পরিষ্কার হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১০৬. সুনানে তিরমিজি: ১১/৩৩৮৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৭- মা. শামেলা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00