📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 লোক দেখানো দুনিয়া বিমুখতা

📄 লোক দেখানো দুনিয়া বিমুখতা


আমি অধিকাংশ মানুষকেই শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের অভ্যাস ও সুবিধা অনুযায়ী চলতে দেখি।
এদের সকলকে সর্বিকভাবে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এক. আলিম ও শিক্ষিত শ্রেণি। দুই. অশিক্ষিত আবেদ শ্রেণি।
১. আলেম বা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অবস্থা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধু দুনিয়ার বিষয়-আশয় সম্পর্কেই জ্ঞান লাভ করার উপর সীমিত থাকে- যাতে দুনিয়াতে উপার্জন সহজ হয়। এবং আখেরাতের বিষয়-আশয় থেকে বিরত ও দূরে সরে থাকে। হয়তো সে আখেরাতের বিষয় সম্পর্কে জানেই না কিংবা আখেরাতের বিষয়গুলো পালনে কঠিন হয় বলে দূরে সরে থাকে। আর অনেকেই জানা বিষয়েও পালন কঠিন হওয়ার কারণে সেগুলো পালন করে না আর অবশিষ্ট বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে নিজের স্বভাবমতো কাজ চালিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সে বুঝতে পারে সে ভুল করছে, তবুও ফিরে থাকে না। সে কি বোঝে না, তার এই জ্ঞানই তার বিপক্ষে প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান হবে?
আর কেউ কেউ বাহ্যিক ইলম অনুযায়ী আমল করে। কিন্তু ইলমের আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে থাকে সম্পূর্ণ উদাসীন। তাদের কেউ কেউ রাজা-বাদশাহর দরবারে যাতায়াত করে। এর দ্বারা নিজেও সমস্যায় পতিত হয়- সেখানে সে অনেক অন্যায় জুলুম ও অপরাধের বিষয় দেখতে পায়, কিন্তু সেগুলো থেকে সে বাধা প্রদান করতে সক্ষম হয় না। তাকেই বরং কখনো কখনো প্রশংসা ও তোষামোদ করতে হয়।
বাদশাহ নিজেও তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সুবিধা ভোগ করে। বাদশাহ বলতে সুযোগ পান-আমি যদি সঠিক পথে না থাকতাম, তাহলে অমুক আলেম আমার সাথে সম্পর্ক রাখতেন না। আমার এখানে আসা-যাওয়া করতেন না! এদিকে সাধারণ মানুষজনও এতে করে বিভ্রান্তিতে আপতিত হয়। তারা ভাবে এবং বলে বেড়ায়-বাদশাহর কাজ যদি সঠিক না হতো, তবে তো এই আলেম তার পাশে থাকতেন না। তার নিকট যাওয়া-আসা করতেন না।
আর কিছু কিছু আলেম পরিবারের সন্তান তাদের অভিজাত পূর্বপুরুষের নাম ভাঙিয়ে চলে। ভাবে, তাদের মাধ্যমেই বুঝি নিজেরাও পার পেয়ে যাবে। কিন্তু তারা ভুলে যায়, বনি ইসরাইল থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল 'ইহুদি' গোষ্ঠী। বংশের আভিজাত্য ও দোহাই ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক অনৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এটি একটি নিকৃষ্টতম অজুহাত।
২. আর দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত অশিক্ষিত আবেদ ব্যক্তিগণ। এদেরও বিভিন্ন অবস্থা। এদের কেউ কেউ নিয়তের দিক দিয়ে সঠিক, কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে অধিকাংশই সঠিক ও বিশুদ্ধ পথে নেই। আগের যুগে কিছু কিতাব রচিত হয়েছিল- যেগুলো অসংখ্য ভুলে ভরা, অশুদ্ধ হাদিস, বিদআত এবং এমন অনেক বিষয়ে নির্দেশনা-সংবলিত, যেগুলো সরাসরি শরিয়তের বিরোধী। এগুলোর লেখক যেমন, হারেস আর মুহাসিবি, আবু আবদুল্লাহ আত-তিরমিযি, কুতুল কুলুব রচয়িতা আবু তালেব আল-মাক্কি, কিতাবুল ইহইয়ার লেখক আবু হামেদ আত-তুসি প্রমুখ। যখন সাধারণ মানুষজন এই কিতাবগুলো পড়ে এবং কিতাবের বিষয়গুলো অনুসরণের চেষ্টা করে, তখন তারা বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়। কেননা, এগুলো রচিত হয়েছে অশুদ্ধ বানোয়াট হাদিসের উপর ভিত্তি করে। এগুলোতে কঠিনভাবে দুনিয়ার নিন্দা-মন্দ করা হয়েছে। কিন্তু তারা তো বোঝেই না, এই নিন্দামন্দ দ্বারা আসলে কী উদ্দেশ্য।
এ কারণে অনেক নবীন ও সাধারণ ব্যক্তি তাদের এই কিতাবগুলো পড়ে মূল দুনিয়াকেই খারাপ ও মন্দ ভেবে বসে। তখন সে পরিবার-পরিজন বসতি ত্যাগ করে পাহাড়-পর্বতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এভাবে তারা মানুষের সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ তো জুমা ও জামাতও ছেড়ে দেয়। অল্পসল্প খাদ্য-খাবার গ্রহণ করে। সামান্য সবজি ফল-মূল। কেউ কেউ শুধু দুধের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে মেজাজ শিথিল হয়ে যায়। কেউ-বা শুধু শিম বা ডাল খেতে থাকে। এতে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তখন অনেক মৌলিক ইবাদতও তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এই কি ইবাদত ও তার পদ্ধতি?
বরং নিয়ম হলো, যে ব্যক্তি হজের ইচ্ছা করছে, তার প্রথম কর্তব্য হবে তার বাহনের ব্যবস্থা করা। দেখো না, তুর্কিরা নিজের খাদ্য-খাবারের আগে তার বাহনের খাদ্য-খাবারে কথা চিন্তা করে?
কখনো কখনো বক্তারা পূর্ববর্তী সালাফ ও জাহেদদের এমন কিছু বিষয় বর্ণনা করে, যেগুলো অনুসরণ করতে গিয়ে ভক্ত-মুরিদরা ভীষণ সমস্যার মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু আমি যখন এগুলো উল্লেখ করে এর ভুলগুলো ধরিয়ে দিই, তখন জাহেল ও মূর্খ ব্যক্তিরা চিৎকার করতে থাকে—তুমি দুনিয়াবিমুখ জাহেদ ব্যক্তিদের নিন্দা-মন্দ করছ কেন? তুমি কে?
এসব ক্ষেত্রে আসলে মূল উৎস কোরআন ও হাদিসের কথা অনুসরণ করা উচিত। অন্তরের মধ্যে যাদের সম্মান ও মর্যাদার স্থান দিয়ে রাখা হয়েছে, শুধু তাদের কথার দিকে লক্ষ না করা উচিত।
সাধারণত আমরা বলে থাকি, ইমাম আবু হানিফা এটা বলেছেন... এরপর ইমাম শাফেয়ি এর বিরোধিতা করেছেন... ইত্যাদি। কিন্তু আসলে আমাদের মূল দলিলের অনুসরণ করা উচিত। ইমাম মারওয়াযি একবারের একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, একদিন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বিয়ের প্রশংসা করলেন। তখন আমি তার সামনে বলে উঠলাম, ইবরাহিম ইবনে আদহাম বলেছেন...। এতটুকু শোনার সাথে সাথে তিনি গলা চড়িয়ে তেজের সাথে বলে উঠলেন, আমরা তো নিজেদের নির্মিত খানাখন্দরবিশিষ্ট পথের মধ্যে পতিত হয়ে পড়েছি। আমাদের উচিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের অনুসরণ করা।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. হারেস মুহাসিবির সমালোচনা করেছেন এবং সারি সাকাতির বিরোধিতা করেছেন যখন তিনি বলে বেড়াতে লাগলেন, আল্লাহ যখন আরবি হরফগুলোকে সৃষ্টি করলেন, সে সময় আলিফ (১) দাঁড়িয়ে থাকল এবং ইয়া (ی) তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল।' এ কথা শুনে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তার বিরোধিতা করে বললেন, মানুষজনকে তার নিকট থেকে সরিয়ে দিন। এগুলোর কী ভিত্তি আছে? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা পক্ষপাত করা থেকে মুক্ত। বরং একেকটি হরফ একেক রকম হওয়া তার ভাগ্য। একটি স্বাভাবিক কাজ।
এভাবে আমি অনেক মানুষকে শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হতে দেখেছি। কোনো পির বা জাহেদের কথাই যেন তাদের নিকট শরিয়ত হয়ে বসেছে। কী ভয়ংকর অবস্থা!
বলা হয়, আবু তালেব আল-মাক্কি—যিনি সালাফদের অন্তর্ভুক্ত, তিনি তাঁর প্রতিদিনের খাদ্য একটি ছোট পাত্রে মেপে নিতেন এবং প্রতিদিন একটু একটু করে তার থেকেও কমাতেন!
এগুলো এমন বিষয় যা কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ শিখিয়ে যাননি। হ্যাঁ, এটা ঠিক, তাঁরা অতিরিক্ত পেট পূরণ করে খেতেন না। পরিমাণমতো খেতেন। আর না থাকলে ধৈর্যধারণ করতেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে ক্ষুধার্ত রাখা—এটা অবৈধ কাজ। নাজায়েয কাজ।
দাউদ আত-তায়ি হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে বলতেন, আপনি যেহেতু ঠান্ডা পানি পান করেন, তবে আর কীভাবে বলতে পারেন যে, আপনি মৃত্যুকে ভালোবাসেন?
আর দাউদ আত-তায়ি নিজের পানি মাটির মধ্যে রেখে গরম করে খেতেন। এর দ্বারা বোঝাতে চাইতেন—তিনি দুনিয়ার আস্বাদন থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছেন।
আমার কথা হলো, তিনি কি জানতেন না নিজের নফসের একটা হক রয়েছে? এভাবে অব্যাহত গরম পানি পান করা (বিশেষ করে উষ্ণ অঞ্চলে) পাকস্থলীকে থলথলে করে দেয় এবং এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য পানি ঠান্ডা করা হতো। তিনি ঠান্ডা পানি পান করেছেন।
আরেক মূর্খ জাহেদের কথা ছিল এমন—দীর্ঘ ৫০ বছর যাবৎ আমার ভুনা গোশত খেতে ইচ্ছা জেগেছে, কিন্তু আমি প্রবল দৃঢ়তার সাথে সেই ইচ্ছাকে দমন করে রেখেছি।
আরেক জন বলেন, দীর্ঘদিন আমার নফস মধু দিয়ে মাখিয়ে রুটি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিল, আমি তা থেকে বিরত থেকেছি।
আচ্ছা, বলো, এটা কি শরিয়ত নাকি শরিয়তের চাহিদা? কোনোটাই নয়। তা ছাড়া, তুমি কি মনে করো, এর দ্বারা তারা উদ্দেশ্য নিয়েছে যে, তাদের পাকস্থলী থেকে ততদিনে যা বের হয়েছে, সে খাদ্যের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। সবই ছিল সন্দেহমুক্ত খাদ্য? কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ এটার দিকেই লক্ষ রাখতেন। তাকওয়া সকল সময়ই প্রশংসিত ও ভালো কাজ—কিন্তু অনর্থকভাবে নিজেকে কষ্টের মধ্যে ফেলা তো ভালো কাজ নয়; বৈধও নয়।
এই যেমন বিশর হাফি রহ.। তিনি বলতেন, আমি কথা বলি না। কারণ, আমার নফস কথা বলতে চায়।
এ ধরনের পথ বিশুদ্ধ পথ নয়। কারণ, মানুষকে তো বিয়েরও আদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিয়ে নফসের খুবই কাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়।
হয়তো এ কারণেই বিশর হাফির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, আল হাফি—খালি পা, তিনি যদি তার বিষয়টি দু স্যান্ডেল দ্বারা ঢেকে রাখতেন, তবে সেটাই অধিক ভালো হতো। একজনের খালি পাও দৃষ্টিকে কষ্ট দেয়। এটাতে সওয়াবের কিছু নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজেরও দুটি জুতা ছিল। কিন্তু তাঁর এবং তাঁর সাহাবিদের জীবনপদ্ধতির ওপর তো আজকের জাহেদরা নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতেন, মজাও করতেন, সুন্দর জিনিস পছন্দ করতেন, হজরত আয়েশা রা.-এর সাথে নির্জন প্রান্তৱে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। তিনি গোশত খেতেন। মিষ্টান্ন ভালোবাসতেন। তার জন্য শরবত করা হতো।
এ ধরনের জীবনপদ্ধতির ওপর ছিলেন সাহাবায়ে কেরামও। কিন্তু এরপর ‘জাহেদগণ’ তাদের জীবনযাপনের এমন অস্বাভাবিক সব পদ্ধতি প্রকাশ করতে শুরু করলেন, তা যেন নতুন শরিয়ত। এর কোনোটিই সঠিক ও বিশুদ্ধ নয়। তারা এ ব্যাপারে প্রমাণ প্রদান করে হারেস মুহাসিবি ও আবু তালেব মাক্কির কথা দিয়ে। কিন্তু তাদের কেউ তো কোনো সাহাবি, তাবেয়ি এবং ইসলামের কোনো ইমামের কথা দিয়ে দলিল দেয় না।
এসকল জাহেদরা যদি কোনো আলেমকে সুন্দর জামা পরিধান করতে দেখে কিংবা কোনো রূপসী নারীকে বিয়ের কথা শোনে অথবা যে আলেম দিবসে খাওয়া-দাওয়া করে এবং কখনো হাসে, তখনই তারা এদের নিন্দামন্দ করতে থাকে।
তাই তাদের অনেকের ইচ্ছা ভালো থাকা সত্ত্বেও ইলমের স্বল্পতার কারণে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে আছে। তাদের কেউ কেউ এমন কথাও শুনিয়েছে যে, দীর্ঘ ৮০ বছর আমি পিঠ লাগিয়ে ঘুমাইনি! কেউ বলে, আমি শপথ করেছি, একবছর আমি পানি পান করব না!
কী আজগুবি সব কথা! অথচ এগুলোকেই তারা সওয়াব ও শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যম মনে করছে! এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কী আছে!
আমরা জোর দিয়েই বলতে পারি, তারা সঠিক পথে নেই। নিশ্চয় মানুষের নফস ও শরীরের হক রয়েছে।
আরও কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যাদের উদ্দেশ্যই সঠিক নয়। লোক দেখানো মুনাফেকিতে লিপ্ত। দুনিয়া অন্বেষণের জন্য এবং সাধারণ ব্যক্তির থেকে সম্মান ও সমীহ প্রাপ্তির জন্য দুনিয়াবিমুখতার ভান ধরে। এদের নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। এরা তো জেনেশুনেই ভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত। এবং আজকের দিনে অধিকাংশ সুফির অবস্থাই এমন। বিচিত্র পোশাক পরিধান করে- যাতে মানুষ তাদের দুনিয়ার সাজসজ্জা বর্জনকারী হিসেবে ভাবে। ভালো কোনো জামা রাখে না। পূর্ববর্তী দরবেশ ফকিরদের আকার ধারণ করে। অথচ বাস্তবে তারা লিপ্ত রয়েছে দুনিয়ার সম্পদ আস্বাদন, সন্দেহযুক্ত সম্পদ গ্রহণ, অলসতা, খেলতামাশা এবং সুলতান-বাদশাহদের দরবারে যাতায়াতের মধ্যে।
এসকল মানুষ অল্পে তুষ্টির সীমা অতিক্রম করেছে, প্রথম যুগের ব্যক্তিদের দুনিয়াবিমুখতা থেকে বহুদূরে সরে গেছে। এরপর আমি তাদের ব্যাপারে বেশি আশ্চর্যবোধ করি, যারা এদের পেছনে এখনো সওয়াবের কথা ভেবে দান-সদকা করে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পুনর্জীবনের প্রমাণ

📄 পুনর্জীবনের প্রমাণ


আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষজাতির বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে এমন কিছু দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষের উপদেশ গ্রহণ করা সহজ হয়ে গেছে। যেমন, চাঁদের বিভিন্ন অবস্থার উদাহরণ। এটি খুবই সূক্ষ্ম ও চিকন হয়ে শুরু হয়। ধীরে ধীরে পূর্ণতা লাভ করে। চৌদ্দ তারিখে এসে একেবারে সম্পূর্ণতা অর্জন করে। এরপর আবার ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে এবং এক সময় আরও সূক্ষ্ম ও চিকন হয়ে সম্পূর্ণভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। কিংবা কখনো হঠাৎই তার ওপর ধ্বংসশীলতা এসে পড়ে। যেমন, চন্দ্রগ্রহণের সময়।
মানুষের অবস্থাও ঠিক এমন। তার সূচনা হলো সামান্য এক ফোঁটা বীর্য দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে বড় ও উন্নত হতে থাকে। শক্তি ও সামর্থ্য বাড়তে থাকে। এরপর যখন একসময় পূর্ণিমার চাঁদের মতো তারও সম্পূর্ণতা এসে যায়, তখন তারও ক্ষয় শুরু হতে থাকে। ধীরে ধীরে দুর্বলতা এসে গ্রাস করে। একসময় পুরোটাই ক্ষয়ে যায়। কিংবা কখনো চন্দ্রগ্রহণের মতো কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনায় হঠাৎ করেই জীবন প্রদীপ নিভে যায়।
জনৈক কবি বলেন,
والمرء مثل هلال عند طلعته ... يبدو ضئيلاً لطيفاً ثم يتسق يزداد حتى إذا ما تم أعقبه ... كر الجديدين نقصاً ثم ينمحق
মানুষ হলো চাঁদের মতো। সূচনাতে খুবই সূক্ষ্ম ও চিকন হয়ে বেড়ে ওঠে। এরপর হয় বড় ও পরিব্যাপ্ত।
ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার পরিধি। এরপর অনিবার্য পুনরাবৃত্তিতে আবার হয়ে আসে ক্ষীণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত।
মানুষের অবস্থার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো রেশম পোকা। পোকাটি দীর্ঘদিন স্বাভাবিকভাবে জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকে। এরপর যখন তার খাদ্যের লতা-গুল্ফ অর্থাৎ তুঁত গাছের পাতা ধরে। পাতা যখন নাদুসনুদুস সবুজ হয়ে ওঠে, এর মাঝে তার নতুন জীবন শুরু করে। শিশুর মতো সেখানে সে একটি অবস্থা থেকে আরেকটি অবস্থায় রূপান্তরিত হতে থাকে। কিন্তু পরিণামের কথা চিন্তা না করে অলস শুয়ে থাকে। এরপর যখন জাগ্রত হয়, সবুজ পাতার লোভে সেখানেই বসে খেতে থাকে। যেমন কোনো লোভী মানুষ দুনিয়া অর্জনের চিন্তায় নিমগ্ন থাকে। এরপর সে নিজেকে সেই আবদ্ধ পঙ্কিলতার মধ্যে আবদ্ধ করে নেয়, যেমন মানুষ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের চারপাশ পঙ্কিলতায় ভরিয়ে তোলে। এরপর সেই পোকা নিজের ছোট কুঠুরির মধ্যে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকে, যেমন মানুষ তার কবরের মধ্যে। এরপর কোনো রেশম আহরণকারী হয়তো এই মৃত কুঠুরি থেকে এক নতুন সৃষ্টির আবির্ভাব ঘটায়—যেমন কবর থেকে মানুষের পুনরুত্থান ও নতুন জীবনের উদ্ভব ঘটে।
এরপর আরেকটি প্রমাণ এভাবে হয় যে, বীর্য থাকে একটি মৃত জিনিসের মতো। এরপর তা থেকে একটি পূর্ণ সম্পূর্ণ মানুষের উদ্ভব ঘটে। তেমনি এক বীজদানা বহুদিন মাটির অন্ধকারে মৃতের মতো পড়ে থাকে। নিজের অস্তিত্ব পচে গলে বিনষ্ট হয়ে পড়ে। এরপর এখান থেকেই অঙ্কুরিত হয় নরম সবুজ ছোট পাতা, যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে আরও সবুজ আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক—কখনো মহীরূহ।
মানুষের দুনিয়া ও পরকালের জীবনের উদাহরণও এমনই!
আহা, এমন কত উদাহরণই তো আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। দরকার শুধু একটি শিক্ষা নেওয়ার। যেমন বলা হয়—
إذا المرء كانت له فكرة ... ففي كل شيء له عبرة
যে মানুষের বোধ ও চিন্তা আছে, সব বিষয়েই তার শিক্ষা নেবার উপকরণ আছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সাময়িক সুখের পথে

📄 সাময়িক সুখের পথে


আকল বা বুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্বই হলো পরিণামের প্রতি চিন্তা করতে পারা। কিন্তু যার আকল বা বুদ্ধি কম, সে তো সাময়িক ও তাৎক্ষণিক সুখ ও আনন্দ নিয়েই মেতে থাকে। স্থায়ী পরিণামের দিকে লক্ষ করে না। এ কারণে একজন চোর শুধু সম্পদের দিকে তার নজর রাখে; কিন্তু এর পরিণাম অসম্মান ও হাত কাটার দিকে তার নজর থাকে না। একজন অলস অকর্মণ্য ব্যক্তি তার উপস্থিত বিলাস ও বিশ্রামের মধ্যেই মজে থাকে; কিন্তু এর পরিণামে যে সে ইলম ও সম্পদ অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়—সে দিকে লক্ষ করে না।
এ কারণে যখন তার বয়স বেড়ে যায়, কোনো ইলম ও জ্ঞানের কথা জিজ্ঞাসা করলে সে বলতে পারে না। নিজের যখন কোনো টাকা-সম্পদের দরকার হয়, অন্যের নিকট চাইতে হয় এবং নিজেকে অপমানিত করতে হয়।
জীবনের একটি সময়ে যতটুকু সে বিশ্রাম আরাম ও আয়েশে কাটিয়েছে, পরিশেষে তাকে তার চেয়ে বহুগুণ আফসোস, অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হয়।
তাছাড়া দুনিয়াতে আমল না করার কারণে আখেরাতের পুরস্কার প্রতিদান থেকেও তাকে বঞ্চিত হতে হবে।
মদ পানকারীর অবস্থাও তা-ই; তার যেন কোনো দূরদর্শিতা নেই। সাময়িক আনন্দ ও স্ফূর্তি সে অর্জন করে, উপভোগ করে। কিন্তু পরিণামে দুনিয়া ও আখেরাতের যেই ভয়াবহ ক্ষতি ও শাস্তি তার ওপর নেমে আসে, তার কথা যেন সে ভুলেই যায়।
জিনা-ব্যভিচারের বিষয়টাও এমন। ব্যক্তি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও কামনা চরিতার্থ করে। কিন্তু পরিণামে যেই লাঞ্ছনা ও শাস্তি রয়েছে তার কথা স্মরণ করে না। আর যদি নারীটির স্বামী থাকে আর জিনার কারণে গর্ভধারণ হয়, তবে তো এই জিনার ফসল অব্যাহত চলতেই থাকবে।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর মাধ্যমে অন্য বিষয়গুলোও বুঝে নাও। পরিণাম সম্পর্কে সচেতন হও। এমন তাৎক্ষণিক কোনো আনন্দ-স্ফূর্তিকে প্রাধান্য দিয়ো না, যার কারণে অনেক কল্যাণ ও ভালোত্ব হাতছাড়া হয়ে যায়। কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করো—নিশ্চয় পরিণামে প্রভূত কল্যাণ ও সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আত্মার সুখ

📄 আত্মার সুখ


দুনিয়াতে আলেম ও জাহেদ ছাড়া মনের প্রকৃত সুখ কেউ উপভোগ করতে পারে না। হ্যাঁ, কখনো কখনো তাদের পূতপবিত্র স্বচ্ছ অবস্থাও মধ্যে পঙ্কিলতা এসে ভর করতে চায়।
কারণ হলো, আলেম তার ইলম অর্জন করা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। উপার্জনের তেমন একটা সময় সুযোগ পায় না। এ অবস্থায় তার যদি পরিবার-পরিজন থাকে, তবে তো তার সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তাকে বাধ্য হয়েই শাসক বা সুলতানের দরবারে ধরনা দিতে হয়। এতে করেই তার অবস্থা ও অবস্থানের ভীষণ ক্ষতি হয়।
জাহেদ ব্যক্তির অবস্থাও ঠিক এমনই।
এ কারণে আলেম এবং আবেদ ব্যক্তিদেরও জীবিকা অর্জনের জন্য কিছু কিছু কাজে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। যেমন, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোনো অনুলিপি তৈরি করা, লেখালেখি করা কিংবা পাটি বানানো। ১০৪ তার যদি এতে সামান্য উপার্জনও হয়, তবে সে এটার ওপর সন্তুষ্ট থাকবে। এভাবে যদি সে চলতে পারে, তাহলে আর কোনো মানুষ তাকে ‘গোলাম’ বানিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না।
যেমন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. খুবই সামান্য উপার্জনের ওপর জীবন অতিবাহিত করতেন। কখনো মাত্র একটি দিনারে তার মাস চলে যেত।
কিন্তু কোনো আলেম যদি এমন অল্পেতুষ্টি অর্জন না করে, তবে শাসকবর্গ ও সাধারণ ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা তার দ্বীন-ধর্মকে বিনষ্ট করে দেবে।
স্বভাবগতভাবেই কিছু মানুষ একটু আরাম-আয়েশে থাকতে ভালোবাসে। ভালো থাকা, ভালো খাওয়া। কঠিন ও কঠোর জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত নয়। এগুলো তাদের শরীর সইতে পারে না। এমতাবস্থায় তাদের আগে থেকেই যদি আর্থিক সংগতি না থাকে, তবে তো তাদের জন্য দ্বীন-ধর্ম রক্ষা করা খুবই মুশকিল। স্বল্প উপার্জনে দুনিয়ার আস্বাদনের সাথে সাথে কীভাবে সে তার দ্বীনকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে?
কিন্তু কোনো আলেম বা জাহেদ যদি অল্পেতুষ্ট হয়, তবে তারা কিছুতেই নিজেদেরকে শাসকবর্গের জন্য বিলিয়ে দেবে না। তারাও তাদেরকে যখন-তখন নিজেদের দরবারে ডেকে নিতে পারবে না। এবং জাহেদকেও তখন আর লৌকিকতার আশ্রয় নিতে হবে না।
সুখের জীবন তো সেই স্বাধীন ব্যক্তির, যার মাথা নত হয় না কোনো মানুষের কাছে এবং তার কাছেও নত হয় না কোনো মাথা। এটাই হলো একজন আদর্শ মুসলিমের দৃষ্টান্ত।

টিকাঃ
১০৪ এখানে লেখক সে যুগের অবস্থা নিয়ে বলেছেন। আল্লাহর শোকর, আমাদের এযুগে কর্মের পরিধি আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। আলেমগণ যদি পরিশ্রমের মানসিকতা নিয়ে এগুলোর সাথে যুক্ত হন, তাহলে তাদের নিজের, দ্বীনের এবং দেশ ও মানুষের অনেক উপকার হয়। হ্যাঁ, তবে নিজের অবস্থা ও অবস্থানের সাথে মানানসই কোনো কর্মের সাথে যুক্ত হওয়াটাই অধিকতর কল্যাণকর- অনুবাদক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00