📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মনোবলের উচ্চতা ও নিচতা

📄 মনোবলের উচ্চতা ও নিচতা


উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তিকে তার মনোবলের উচ্চতা অনুযায়ী কষ্টও স্বীকার করতে হয়। কবি বলেন,
وإذا كانت النفوس كباراً ... تعبت في مرادها الأجسام
যখন অন্তর বড় হয়, তখন তার বিশাল আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করতে শরীরকেও কষ্ট স্বীকার করতে হয়।
অন্য কবি বলেন,
ولكل جسم في التحول بلية ... وبلاء جسمي من تفاوت همتي
প্রত্যেক মানুষের শরীরেই কিছু অসুস্থতার বিপদ থাকে। আর আমার শরীরের বিপদ হলো আমার মনোবলের উচ্চ ভারবহন।
এর ব্যাখ্যা হলো, যে ব্যক্তির মনোবল অনেক উচ্চ, সে সকল ধরনের ইলম অর্জন করতে সচেষ্ট হয়। সে শুধু এক প্রকার ইলমের ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং সে প্রতিটা ইলমে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করতে চায়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পরিশ্রম-আর শরীর এটা বহন করতে সক্ষম হয় না। তখন মনোবলকে সঙ্গ দেওয়া শরীরের জন্য অনেক কষ্টকর হয়ে ওঠে।
এরপর যখন সে বুঝতে পারে ইলমের উদ্দেশ্যই হলো আমল, তখন সে দীর্ঘ রোজা, নামাজ ও জিকিরে মশগুল হতে শুরু করে। তখন এই সমূহ ইবাদত এবং ইলমচর্চার মাঝে সমন্বয় করা অর্থাৎ দুটোকেই সমানভাবে সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর যখন সে বুঝতে পারে- দুনিয়াবিমুখ হওয়া দরকার কিন্তু এদিকে আবার জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোও অর্জন করা দরকার। এছাড়া সে চায় অন্যকে প্রাধান্য দিতে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে। কৃপণতাকে পছন্দ করে না। এগুলো তাকে খরচের ওপর উদ্বুদ্ধ করে। আবার সে যেমনতেমনভাবে উপার্জনও করতে চায় না- হালাল পথ ছাড়া। এভাবে সে যদি সম্মান ও আভিজাত্যের সাথে চলতে চায়- অথচ তার উপার্জন কম থাকে, তখন সেটাও তার শরীর ও পরিবারের ওপর কষ্টকর হয়ে পড়ে। আর সে যদি কাউকে কিছু না দিয়ে চলতে চায়- তবে এটা তার স্বভাবের ওপর কষ্টকর হয়ে ওঠে।
মোটকথা তাকে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিপরীত বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করার প্রবল চেষ্টা নিয়ে তার জীবনপাত করতে হয়। অর্থাৎ তাকে সার্বক্ষণিক শ্রমের মধ্যে থাকতে হয়। ক্লান্তি ও শ্রান্তি নিয়েও কাজ করে যেতে হয়। তার কোনো অবসর থাকে না। এরপর যদি তার এই কাজগুলোর মধ্যে একনিষ্ঠতা থাকে—তবে তো তার কষ্ট আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। সতর্ক থাকতে হয় সকল ক্ষেত্রে।
আর এদিকে যার মনোবল উচ্চ নয়, তার অবস্থা কী হয়? সে যদি ফিকাহবিদ হয় আর যদি তাকে কোনো হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে বলে—আমি জানি না। আর যদি মুহাদ্দিস হয়, তখন যদি তাকে কোনো ফিক্হি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে বলে, আমি জানি না। অর্থাৎ তার জ্ঞান হয় অসম্পূর্ণ—একপেশে। এবং এটা নিয়ে যেন তার কোনো মাথাব্যথাও নেই।
আর উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তি নিছক একটি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করাকে নিজের জন্য অপমান মনে করে। এটা তার নিকট ত্রুটিযুক্ত মনে হয়। মানুষ তার নিকট কিছু জিজ্ঞাসা করল—আর সে তার উত্তর দেবার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে—এটাকে সে নিজের জন্য অপমানকর মনে করে।
এছাড়া একজন হীন মনোবলসম্পন্ন লোক মানুষের অনুগ্রহকে কিছু মনে করে না। তাদের কাছে কিছু প্রার্থনা করতেও লজ্জাবোধ করে না। যে যা প্রদান করে—সকলের জিনিসই গ্রহণ করে। অসমীচীন কারও জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার আত্মসম্মানবোধটুকু তার থাকে না।
কিন্তু একজন উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তি এগুলো কখনো করে না। হয়তো কষ্ট ও দারিদ্র্য প্রতিনিয়ত তার জীবনকে আঘাত করে, শ্রমের ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চায় শরীর, তবুও কী এক তৃপ্তির সুধায় সকল কিছু সে ভুলে থাকে। ভবিষ্যতের পুরস্কার ও প্রতিদানের আশায় তখন কোনো কষ্টই আর তাকে কষ্ট দেয় না।
এদিকে মনোবলহীন ব্যক্তি নিজেকে যতই কাজ ও ক্লান্তি থেকে সরিয়ে রাখুক—পরিণামে তাকেই বরং কষ্টে পতিত হতে হয়; শারীরিক কিংবা মানসিক। কিছুতেই তার তৃপ্তি আসে না।
অবশেষে বলি, দুনিয়া হলো একটি সম্মানজনক উচ্চ কাজের প্রতিযোগিতার স্থান। সুতরাং একজন উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তি স্বল্প উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সে বরং সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করে। সে যদি সফলকাম হয়—তাহলে তো সোনায় সোহাগা। আর যদি প্রবল চেষ্টা সত্ত্বেও তার সফলতার ঘোড়া হোঁচট খেয়ে যায়—তবুও ব্যথা পাওয়ার কিছু নেই। অনেকে তো এই হোঁচট খাওয়া পর্যন্তই আসতে পারে না—কিংবা আসতে সাহস করে না। আর মুমিনের নিয়তই তো উত্তম।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আত্মমুগ্ধতার বিপদ

📄 আত্মমুগ্ধতার বিপদ


মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো তার নিজের প্রতি তুষ্ট থাকা এবং নিজের ইলমের উপর নির্ভর করা। এটি বর্তমানের এমন এক বিপদ—অধিকাংশ মানুষ যার দ্বারা আক্রান্ত।
তুমি দেখবে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও নিজেদের সঠিক মনে করে। কিন্তু এটা নিয়ে তারা কোনো পর্যালোচনা করে না। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের প্রমাণ ও দলিলের দিকে দৃষ্টি প্রদান করে না। যা শুনলে তাদের অন্তর নরম হতে পারে—যেমন বিমুগ্ধকর কোরআন, সেটা থেকেও তারা পালিয়ে থাকে—যাতে শুনতে না হয়।
ঠিক এভাবেই প্রতিটি মনগড়া মতবাদ কিংবা ধর্মের প্রতিটি দল নিজের মতকেই সঠিক মনে করে তার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। হয়তো এটা তাদের পূর্বপুরুষ—বাপ-দাদার ধর্ম, সে কারণেই এটি পালন করে। কিংবা প্রথমেই সে একটি মতবাদ নিজের জন্য গ্রহণ করে নিয়েছে—এটাকেই সে সঠিক মনে করে। এর বিপরীত কোনো মত, মতবাদ কিংবা ধর্মের দিকে সে কোনো দৃষ্টিপাত করে না। এবং এটা নিয়ে জ্ঞাতজনদের সাথে আলোচনাও করে না—তাহলে তারা তার ভুলটা ধরে দিতে পারতেন। কিন্তু সে সেটাও করে না। নিজের মতে নিজেই সন্তুষ্ট—এই ভ্রান্তির কোনো প্রতিকার নেই।
হজরত আলি রা.-এর ক্ষেত্রে খারেজিদের অবস্থাও হয়েছিল এমন। তারা নিজেরা যা করছিল, সেটাকেই ভালো মনে করছিল। কিন্তু তারা এ জন্য কোনো বিজ্ঞ আলেমের দ্বারস্থ হয়নি—যিনি তাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারতেন। কিন্তু হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. নিজেই যখন তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদের ভুলটা স্পষ্ট করে ধরে দিলেন—তখন তাদের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি ব্যক্তি সেই মতবাদ থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। আর এই প্রবৃত্তিতাড়িত মতবাদ থেকে যারা ফিরে আসতে চায়নি, তাদের মধ্যে একজন হলো ইবনে মুলজিম। সে তার নিজের মতবাদকেই সঠিক মনে করছিল। সুতরাং সে আমিরুল মুমিনিনকে হত্যা করা বৈধ মনে করছিল। এবং এটাকে সে তার দ্বীন মনে করছিল। এ কারণে বন্দি করার পর তাকে যখন শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হচ্ছিল—তখনও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। নীরবে সয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যখন তার জিহ্বা কর্তন করার উপক্রম করা হলো, তখন সে বলে উঠল—হায়, দুনিয়ায় এমন একটি মুহূর্ত আমি কীভাবে বেঁচে থাকব—অথচ আল্লাহ তাআলার জিকির করতে পারব না!
ইবনে মুলজিমের ব্যাপারটি লক্ষ করো—জিদ ধরে থাকা অজ্ঞতার সাথে এই যে একনিষ্ঠ ভ্রান্তি—এর কোনো ওষুধ নেই। কিছুই তাকে সঠিক পথে আনতে সক্ষম হবে না। মানুষের জন্য এটি এক দুরারোগ্য রোগ—মৃত্যু ছাড়া এর কোনো প্রতিষেধক নেই।
এভাবে হাজ্জাজ বিন ইউসুফও বলত, দুনিয়া কিছুই নয়, আমি সকল সুখ-শান্তির আশা রাখি আখেরাতে!
যে ব্যক্তির কথা ও বিশ্বাসটি এমন—অথচ সেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এমন বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে—যাদের হত্যা করা ছিল নাজায়েয। যেমন সাঈদ ইবনে যুবায়ের—তাকে কী নির্মমভাবেই না হাজ্জাজ হত্যা করেছে। কাছির ইবনে কাহদাম বলেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জেলখানায় এমন বন্দির সংখ্যাই ছিল ৩৩ হাজার—যাদের ওপর কোনো ধরনের দণ্ড অপরিহার্য হয়নি।
আমার মনে হয়—অধিকাংশ শাসক-সুলতান মানুষদের হত্যা করে, হাত-পা কর্তিত করে এই ধারণায় যে, তাদের ক্ষেত্রে এগুলো করা বৈধ। কিন্তু তারা যদি অভিজ্ঞ জ্ঞাত ব্যক্তিদের এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে নিত, তাহলে তারা তাদের নিকট সঠিক বিষয়টি তুলে ধরতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটা করে না। নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপরই তারা অজ্ঞভাবে জিদ ধরে বসে থাকে-মানুষজাতির জন্য এটা এক বড় মুসিবত।
এছাড়াও সাধারণ মানুষও বিভিন্ন গোনাহের মধ্যে লিপ্ত হয়-ক্ষমা পেয়ে যাওয়ার ধারণায়। কিংবা ধারণা করে-তার সওয়াবগুলো তাকে মুক্তি দিয়ে দেবে। কিন্তু তারা শাস্তির বিষয়টা যেন ভুলেই থাকে। তাদের কেউ কেউ অজ্ঞভাবেই ধারণা করে বসে আছে, সে 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত' এর অন্তর্ভুক্ত। অথচ এর বিশ্বাসের বিষয়গুলো খেয়াল করে না। এগুলো হয়ে থাকে অজ্ঞতার প্রাধান্যের কারণে।
এ কারণে মানুষের জন্য উচিত, মূল উৎসের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। সন্দেহ ও সংশয় থেকে দূরে থাকা। শুধু নিজের জানা ইলমের ওপর কিছুতেই নির্ভর না করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সব ধরনের বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নিজের কর্মের হিসাব-নিকাশ

📄 নিজের কর্মের হিসাব-নিকাশ


আমি একদিন আমার নফসের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তায় নিমগ্ন হলাম। কিয়ামতের দিন তার হিসাব নেবার আগেই একটি হিসাব নিতে চাইলাম। কিয়ামতের দিন তাকে পরিমাপ করার আগেই তাকে একটু পরিমাপ করার চেষ্টা করলাম।
হিসাব করে দেখলাম, জন্ম-শৈশব থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত আমার ওপর প্রতিপালকের কত যে দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষেছে-তার কোনো হিসাব নেই। অনুগ্রহের পর অনুগ্রহ। আমার খারাপ কাজগুলো গোপন রাখা হয়েছে। এমন বহু বিষয় ক্ষমা করা হয়েছে-যার অনিবার্য পরিণাম ছিল শাস্তি। আর আমি সকল নিয়ামতের জন্য শুধু সামান্য কিছু মৌখিক শুকরিয়া জানিয়ে আসছি।
আমি আমার ভুলগুলো নিয়ে চিন্তা করলাম-এত এত ভুল আর অপরাধ, এগুলোর সামান্য কিছুর জন্যও যদি আমাকে শাস্তি প্রদান করা হতো, তবে আরও বহু আগেই আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম। মানুষদের মাঝে এর সামান্য কিছুও যদি প্রকাশ করে দেওয়া হতো, তবে আমার মাথা লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেত। কোনো বিশ্বাসকারীই হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না যে, এগুলো ‘গোনাহে কবিরা’ ছিল, সে কারণে আমার ক্ষেত্রে ফাসেক হওয়ার ধারণা হয়তো করত না। কিন্তু আমি তো জানি, আমার জন্য এই অপরাধগুলো ছিল খুবই নিকৃষ্টমানের। কত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যে আপতিত হয়েছি। কত সহজতা গ্রহণ করেছি!
সুতরাং আমি দুআ করার সময় বলতে থাকি, হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা তোমারই। যেভাবে তুমি আমার দোষ-ত্রুটিগুলো ঢেকে রেখেছ, সেভাবেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।
এরপর আমি নিজেকে এই সকল নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের দিকে মনোনিবেশ করিয়েছি। কিন্তু যেভাবে শুকরিয়া আদায় করা উচিত, সেভাবে পারিনি। এরপর আমি আমার যে কামনা-বাসনাগুলো পূরণ হয়েছে, সেগুলোর হিসাব নিলাম। এরপর দেখলাম, আমার থেকে কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ সেই পরিমাণ নেই এবং নিয়ামতগুলোর শুকরিয়া আদায়ও যথার্থ পরিমাণ নয়।
এবার আমি অনুশোচনা করতে লাগলাম নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের স্বল্পতার ওপর। ইলমের অন্বেষণ ও চর্চার মাঝে আমি তো আনন্দ ও স্বাদ অনুভব করি, কিন্তু সে অনুযায়ী আমল তো প্রতিষ্ঠা করা হয় না। আমি বড়দের উচ্চ সম্মান ও মর্যাদার প্রত্যাশী হয়েছি। কিন্তু জীবন তো শেষ হয়ে যেতে বসেছে, কিন্তু পার্থিব সেই উদ্দেশ্যও সফল হয়নি-যা চেয়েছি তাহলে আমার হলোটা কী!
পড়তে পড়তে একদিন হজরত আবুল ওয়াফা ইবনে আকিলের লেখা সামনে এলো। দেখলাম সেখানে তিনি আমার মতোই নিজের শোক ও অনুশোচনার কথা বলেছেন। তার অনুশোচনার ধরনটি আমাকে খুব প্রভাবিত করে। আমি তার সেই কথাটি এখানে তুলে ধরছি।
তিনি লিখেছেন-
একবার আমি আমার নফসকে ডেকে বললাম, হে আমার অস্থিরমতি চিত্ত, তুমি যে এখানে-ওখানে শান্তি উচ্চকিত কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে বেড়াও—যাতে লোকজন তোমাকে ‘বিতার্কিক’ বলে। এর প্রতিফল তো এটাই হবে যে, তুমি এটাতেই প্রসিদ্ধি লাভ করবে আর তোমাকে মানুষেরা বলবে—হে বিতার্কিক। যেমন একজন কুস্তিগীর মানুষকে বলা হয় বীর পালোয়ান। কিন্তু এতটুকু নামের অর্জনে তুমি তোমার শ্রেষ্ঠ সময়গুলো—শ্রেষ্ঠ জীবনটা বিসর্জন দিচ্ছ। দিয়ে বসলে! অর্থাৎ তুমি তোমার পুরো জীবন দিয়ে মানুষের মুখে শুধু এই উপাধিটুকু অর্জন করতে চাও। যে মানুষ আগামীকালই নিঃশেষ হবে তার মাঝে নাম ছড়াতে চাও- তুমি একজন বিখ্যাত বিতার্কিক। কিন্তু তুমি কি খেয়াল করে দেখেছ, কিছুদিনের মধ্যেই অন্তরসমূহ থেকে ‘স্মরণকারী এবং স্মরণকৃত’ সকল নামই মুছে যাবে।'
এটা তো তা-ও সেই মানুষের জন্য, মৃত্যু অবধি যার সুনাম ও সুখ্যাতি থাকে। কিন্তু কখনো এমন যুবকের দেখাও পাওয়া যাবে, লোকজন যার ওপর হয়তো একটি বিকৃত নাম আরোপ করে দিয়েছে, আর সেটাই তার নাম হয়ে গেছে। দুনিয়ার খ্যাতিটাও অনেকে শেষমেশ পায় না। কিন্তু যারা জ্ঞানী-কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর-তারা তো সেই বিষয় নিয়েই আলোচনা করে, যা তাদেরকে বিখ্যাত করেছে। যেমন, ইলম অনুযায়ী আমল করা। নিজেদের জন্য বিশুদ্ধ আকিদা ও বিশ্বাস রাখা।
হায়, নিজের জন্য আফসোস! সে তো বিভিন্ন ইলমি বিষয়ে অনেক খণ্ডের কিতাব রচনা করেছে এবং তার শ্রেষ্ঠত্বের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। যখনই তাকে বিতর্কের জন্য আহ্বান করা হয়, সেই বিজয়ী হয়। নসিহত করতে বলা হয়-চমৎকার নসিহত করে বেড়ায়। আবার কোথাও যখন দুনিয়ার কোনো উজ্জ্বলতা সফলতা ও সমৃদ্ধি প্রকাশ পায়, তখন সে সেইদিকে শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। মৃত পচা জিনিসের ওপর কাকেরা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক সেভাবেই সে দুনিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আহ, তার জন্য আফসোস! সে যদি এভাবে হামলে পড়ে আকণ্ঠ ভক্ষণে নিমজ্জিত না হতো; বরং সে যদি অনন্যোপায় মানুষের মতো মৃত বস্তুর গোশত খাওয়ার মতো শুধু জীবনধারণের পরিমাণটুকু দুনিয়া থেকে গ্রহণ করত-কতই না ভালো হতো!
হায় আমার নফস! মানুষের সাথে মেলামেশায় তুমি এমন সকল দোষ-ত্রুটি বৃদ্ধি করেছ, যা তোমার ধ্বংসের কারণ হয়েছে। লজ্জায় তুমি চাইবে না যে, প্রভু সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিক। অথচ সে সকল অপরাধ ও গোনাহের কারণে যখন তোমার কোনো বাসনা চরিতার্থ হয় না-তখন তুমি বিরক্ত হও, বিরূপ হয়ে ওঠো। আর যখন বিভিন্ন নিয়ামতের মাধ্যমে তোমাকে পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়, তখন তুমি নিয়ামতদাতার শুকরিয়া আদায় করা থেকে উদাসীন হয়ে থেকেছ।
আহা, আমার আফসোস-আজ তো পৃথিবীর ওপর রয়েছি, আর আগামীকাল থাকতে হবে তার মাটির নিচে। আল্লাহর কসম, মাটির নিচে যাওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে আমার শরীর পচা যে দুর্গন্ধ হবে, তার চেয়েও অধিক দুর্গন্ধময় হলো আমার আখলাক ও চরিত্রগুলো-যখন আমি দুনিয়াতে মানুষদের মাঝে বিচরণ করছি। আল্লাহর কসম, প্রভুর এই সহনশীলতা ও অনুগ্রহের বহর দেখে আমি হতবুদ্ধ হয়ে পড়ছি-আমার লাঞ্ছনাগুলো তিনি কী অসীম মমতার সাথেই না ঢেকে রেখেছেন! বিক্ষিপ্ত অস্থিরতাগুলোকে তিনি কী দৃঢ়তার সাথেই না একত্র করে দিয়েছেন!
আমার মৃত্যুর পর হয়তো বলা হবে-একজন অভিজ্ঞ সৎ আলেম ইন্তেকাল করেছে। কিন্তু আমি তো জানি, তারা যদি আমার আসল পরিচয় ও অবস্থা সম্পর্কে জানত, তাহলে তারা আমাকে দাফন করতেও সম্মত হতো না। আল্লাহ আমার এত দোষ ঢেকে দিয়েছেন!!
একজন শত্রুর সকল দোষ-ত্রুটি যেভাবে খুঁটে খুঁটে প্রকাশ করা হয়, সেভাবেই সকল দোষ প্রকাশ করে আজ আমি আমার অন্তরকে আহ্বান করছি। সন্তানহারা মানুষের শোক-সন্তাপের মতো হৃদয় ছিঁড়ে আমি আমার অনুশোচনার কথা প্রকাশ করছি। কারণ, আমার জন্য এমন কোনো শোককারী নেই, যে ব্যক্তি আমার এই গোপন বিপদের বিষয়ে শোক প্রকাশ করবে। আমার গোপন খারাপ আচরণগুলোর বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। কারণ, এগুলো অন্য কারও জানা নেই। সকলের থেকে এগুলো রয়েছে আড়াল ও অজ্ঞাত।
আল্লাহর কসম, আমার নিজের এমন ভালো কোনো কর্ম নেই, যার ওসিলা দিয়ে আল্লাহর নিকট বলতে পারি-হে আল্লাহ, তুমি আমার অমুক কাজের কারণে অমুকটা মাফ করে দাও। আমি যখনই আমার আমলের দিকে তাকাই, এমন আমল কখনো পাইনি, যা আমার মুক্তির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। এমন সহায়ক কিছু পাইনি-যা আমার সহায় হতে পারে।
এরপরও আমি যখনই আমার প্রয়োজনে হাত বাড়িয়েছি- প্রভুর পক্ষ থেকে তা পূরণ করা হয়েছে। আমার সাথে তার আচরণটা এমনই ছিল-অথচ তিনি এমন প্রভু-আমার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করলেও তার কোনো ক্ষতি নেই। আর অন্যদিকে তার সাথে আমার আচরণের এই অবস্থা-অথচ আমি সর্বক্ষণ তার দয়া ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। কী আশ্চর্য কাণ্ড! অথচ আমার কোনো ওজর-আপত্তিরও সুযোগ নেই যে, আমি বলতে পারি—এটা আমি জানতাম না কিংবা এটা আমার ভুল হয়ে গেছে। কারণ, তিনি আমাকে কত সুস্থ ও সুগঠিত করে সৃষ্টি করেছেন। আমার মধ্যে মেধা বুদ্ধি বিবেক ও চেতনা দিয়েছেন—কত অদেখা আড়াল বিষয়ও আমার নিকট প্রকাশিত হয় এবং কত কিছু বুঝতে পারি।
হায়, আমার জীবনের ওপর আফসোস! তা এমন কাজসমূহে অতিবাহিত হয়ে গেল, যা তার সন্তুষ্টির অনুকূলে নয়। এবং তা একজন বুদ্ধিমান মানুষের মান-মর্যাদা অর্জন থেকেও বঞ্চিত রয়ে গেল। আর দ্বীনের ক্ষেত্রে যত অবহেলা উদাসীনতা—সকল কিছুর জন্যই আফসোস।
আহা, আফসোস আর আফসোস—যেদিন আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিতে থাকবে, সেদিন তো আমার প্রতি মানুষের সকল সুধারণা কীভাবেই না নষ্ট হয়ে যাবে! দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে আমার অপদস্থতা প্রমাণিত হয়ে যাবে। আমার এসকল বিষয় জানা থাকা সত্ত্বেও শয়তান আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে!
হে আল্লাহ, আমি এই সকল কদর্যতা, গোনাহ ও অপরাধ থেকে একনিষ্ঠ তাওবা করছি। এই সকল কলঙ্ক মুছে দেবার জন্য সত্যসত্য অনুনয় করছি। আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে এটাকে গ্রহণ করছি। দীর্ঘ ৫০ বছর আমি কত নিয়ামতে সিক্ত হয়েছি—আজ আমি তোমার দরবারে হাজির। আমার তো কিছু নেই। আমার তো কোনো সম্বল নেই, তোমার রহম ছাড়া—
وأبى العلم إلا أن يأخذ بيدي إلى معدن الكرم وليس لي وسيلة إلا التأسف والندم.
ইলম আমাকে হাত ধরে এনেছে দয়ার খাজানার নিকট। আর সম্বল বলতে আমার রয়েছে শুধুই অনুশোচনা আর আফসোস।
হে আল্লাহ, আমি অবাধ্য হয়েছি—তবে তোমার সীমাহীন নিয়ামতের কথা জানি। অপরাধ করেছি—তবে তোমার অনন্ত দয়ার কথাও মানি। সুতরাং তুমি আমার অতীত ভুলগুলো ক্ষমা করো— প্রভু হে আমার, তোমার দয়ায় ক্ষমা করো।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 লোক দেখানো দুনিয়া বিমুখতা

📄 লোক দেখানো দুনিয়া বিমুখতা


আমি অধিকাংশ মানুষকেই শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের অভ্যাস ও সুবিধা অনুযায়ী চলতে দেখি।
এদের সকলকে সর্বিকভাবে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এক. আলিম ও শিক্ষিত শ্রেণি। দুই. অশিক্ষিত আবেদ শ্রেণি।
১. আলেম বা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অবস্থা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধু দুনিয়ার বিষয়-আশয় সম্পর্কেই জ্ঞান লাভ করার উপর সীমিত থাকে- যাতে দুনিয়াতে উপার্জন সহজ হয়। এবং আখেরাতের বিষয়-আশয় থেকে বিরত ও দূরে সরে থাকে। হয়তো সে আখেরাতের বিষয় সম্পর্কে জানেই না কিংবা আখেরাতের বিষয়গুলো পালনে কঠিন হয় বলে দূরে সরে থাকে। আর অনেকেই জানা বিষয়েও পালন কঠিন হওয়ার কারণে সেগুলো পালন করে না আর অবশিষ্ট বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে নিজের স্বভাবমতো কাজ চালিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সে বুঝতে পারে সে ভুল করছে, তবুও ফিরে থাকে না। সে কি বোঝে না, তার এই জ্ঞানই তার বিপক্ষে প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান হবে?
আর কেউ কেউ বাহ্যিক ইলম অনুযায়ী আমল করে। কিন্তু ইলমের আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে থাকে সম্পূর্ণ উদাসীন। তাদের কেউ কেউ রাজা-বাদশাহর দরবারে যাতায়াত করে। এর দ্বারা নিজেও সমস্যায় পতিত হয়- সেখানে সে অনেক অন্যায় জুলুম ও অপরাধের বিষয় দেখতে পায়, কিন্তু সেগুলো থেকে সে বাধা প্রদান করতে সক্ষম হয় না। তাকেই বরং কখনো কখনো প্রশংসা ও তোষামোদ করতে হয়।
বাদশাহ নিজেও তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সুবিধা ভোগ করে। বাদশাহ বলতে সুযোগ পান-আমি যদি সঠিক পথে না থাকতাম, তাহলে অমুক আলেম আমার সাথে সম্পর্ক রাখতেন না। আমার এখানে আসা-যাওয়া করতেন না! এদিকে সাধারণ মানুষজনও এতে করে বিভ্রান্তিতে আপতিত হয়। তারা ভাবে এবং বলে বেড়ায়-বাদশাহর কাজ যদি সঠিক না হতো, তবে তো এই আলেম তার পাশে থাকতেন না। তার নিকট যাওয়া-আসা করতেন না।
আর কিছু কিছু আলেম পরিবারের সন্তান তাদের অভিজাত পূর্বপুরুষের নাম ভাঙিয়ে চলে। ভাবে, তাদের মাধ্যমেই বুঝি নিজেরাও পার পেয়ে যাবে। কিন্তু তারা ভুলে যায়, বনি ইসরাইল থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল 'ইহুদি' গোষ্ঠী। বংশের আভিজাত্য ও দোহাই ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক অনৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এটি একটি নিকৃষ্টতম অজুহাত।
২. আর দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত অশিক্ষিত আবেদ ব্যক্তিগণ। এদেরও বিভিন্ন অবস্থা। এদের কেউ কেউ নিয়তের দিক দিয়ে সঠিক, কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে অধিকাংশই সঠিক ও বিশুদ্ধ পথে নেই। আগের যুগে কিছু কিতাব রচিত হয়েছিল- যেগুলো অসংখ্য ভুলে ভরা, অশুদ্ধ হাদিস, বিদআত এবং এমন অনেক বিষয়ে নির্দেশনা-সংবলিত, যেগুলো সরাসরি শরিয়তের বিরোধী। এগুলোর লেখক যেমন, হারেস আর মুহাসিবি, আবু আবদুল্লাহ আত-তিরমিযি, কুতুল কুলুব রচয়িতা আবু তালেব আল-মাক্কি, কিতাবুল ইহইয়ার লেখক আবু হামেদ আত-তুসি প্রমুখ। যখন সাধারণ মানুষজন এই কিতাবগুলো পড়ে এবং কিতাবের বিষয়গুলো অনুসরণের চেষ্টা করে, তখন তারা বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়। কেননা, এগুলো রচিত হয়েছে অশুদ্ধ বানোয়াট হাদিসের উপর ভিত্তি করে। এগুলোতে কঠিনভাবে দুনিয়ার নিন্দা-মন্দ করা হয়েছে। কিন্তু তারা তো বোঝেই না, এই নিন্দামন্দ দ্বারা আসলে কী উদ্দেশ্য।
এ কারণে অনেক নবীন ও সাধারণ ব্যক্তি তাদের এই কিতাবগুলো পড়ে মূল দুনিয়াকেই খারাপ ও মন্দ ভেবে বসে। তখন সে পরিবার-পরিজন বসতি ত্যাগ করে পাহাড়-পর্বতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এভাবে তারা মানুষের সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ তো জুমা ও জামাতও ছেড়ে দেয়। অল্পসল্প খাদ্য-খাবার গ্রহণ করে। সামান্য সবজি ফল-মূল। কেউ কেউ শুধু দুধের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে মেজাজ শিথিল হয়ে যায়। কেউ-বা শুধু শিম বা ডাল খেতে থাকে। এতে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তখন অনেক মৌলিক ইবাদতও তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এই কি ইবাদত ও তার পদ্ধতি?
বরং নিয়ম হলো, যে ব্যক্তি হজের ইচ্ছা করছে, তার প্রথম কর্তব্য হবে তার বাহনের ব্যবস্থা করা। দেখো না, তুর্কিরা নিজের খাদ্য-খাবারের আগে তার বাহনের খাদ্য-খাবারে কথা চিন্তা করে?
কখনো কখনো বক্তারা পূর্ববর্তী সালাফ ও জাহেদদের এমন কিছু বিষয় বর্ণনা করে, যেগুলো অনুসরণ করতে গিয়ে ভক্ত-মুরিদরা ভীষণ সমস্যার মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু আমি যখন এগুলো উল্লেখ করে এর ভুলগুলো ধরিয়ে দিই, তখন জাহেল ও মূর্খ ব্যক্তিরা চিৎকার করতে থাকে—তুমি দুনিয়াবিমুখ জাহেদ ব্যক্তিদের নিন্দা-মন্দ করছ কেন? তুমি কে?
এসব ক্ষেত্রে আসলে মূল উৎস কোরআন ও হাদিসের কথা অনুসরণ করা উচিত। অন্তরের মধ্যে যাদের সম্মান ও মর্যাদার স্থান দিয়ে রাখা হয়েছে, শুধু তাদের কথার দিকে লক্ষ না করা উচিত।
সাধারণত আমরা বলে থাকি, ইমাম আবু হানিফা এটা বলেছেন... এরপর ইমাম শাফেয়ি এর বিরোধিতা করেছেন... ইত্যাদি। কিন্তু আসলে আমাদের মূল দলিলের অনুসরণ করা উচিত। ইমাম মারওয়াযি একবারের একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, একদিন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বিয়ের প্রশংসা করলেন। তখন আমি তার সামনে বলে উঠলাম, ইবরাহিম ইবনে আদহাম বলেছেন...। এতটুকু শোনার সাথে সাথে তিনি গলা চড়িয়ে তেজের সাথে বলে উঠলেন, আমরা তো নিজেদের নির্মিত খানাখন্দরবিশিষ্ট পথের মধ্যে পতিত হয়ে পড়েছি। আমাদের উচিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের অনুসরণ করা।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. হারেস মুহাসিবির সমালোচনা করেছেন এবং সারি সাকাতির বিরোধিতা করেছেন যখন তিনি বলে বেড়াতে লাগলেন, আল্লাহ যখন আরবি হরফগুলোকে সৃষ্টি করলেন, সে সময় আলিফ (১) দাঁড়িয়ে থাকল এবং ইয়া (ی) তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল।' এ কথা শুনে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তার বিরোধিতা করে বললেন, মানুষজনকে তার নিকট থেকে সরিয়ে দিন। এগুলোর কী ভিত্তি আছে? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা পক্ষপাত করা থেকে মুক্ত। বরং একেকটি হরফ একেক রকম হওয়া তার ভাগ্য। একটি স্বাভাবিক কাজ।
এভাবে আমি অনেক মানুষকে শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হতে দেখেছি। কোনো পির বা জাহেদের কথাই যেন তাদের নিকট শরিয়ত হয়ে বসেছে। কী ভয়ংকর অবস্থা!
বলা হয়, আবু তালেব আল-মাক্কি—যিনি সালাফদের অন্তর্ভুক্ত, তিনি তাঁর প্রতিদিনের খাদ্য একটি ছোট পাত্রে মেপে নিতেন এবং প্রতিদিন একটু একটু করে তার থেকেও কমাতেন!
এগুলো এমন বিষয় যা কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ শিখিয়ে যাননি। হ্যাঁ, এটা ঠিক, তাঁরা অতিরিক্ত পেট পূরণ করে খেতেন না। পরিমাণমতো খেতেন। আর না থাকলে ধৈর্যধারণ করতেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে ক্ষুধার্ত রাখা—এটা অবৈধ কাজ। নাজায়েয কাজ।
দাউদ আত-তায়ি হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে বলতেন, আপনি যেহেতু ঠান্ডা পানি পান করেন, তবে আর কীভাবে বলতে পারেন যে, আপনি মৃত্যুকে ভালোবাসেন?
আর দাউদ আত-তায়ি নিজের পানি মাটির মধ্যে রেখে গরম করে খেতেন। এর দ্বারা বোঝাতে চাইতেন—তিনি দুনিয়ার আস্বাদন থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছেন।
আমার কথা হলো, তিনি কি জানতেন না নিজের নফসের একটা হক রয়েছে? এভাবে অব্যাহত গরম পানি পান করা (বিশেষ করে উষ্ণ অঞ্চলে) পাকস্থলীকে থলথলে করে দেয় এবং এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য পানি ঠান্ডা করা হতো। তিনি ঠান্ডা পানি পান করেছেন।
আরেক মূর্খ জাহেদের কথা ছিল এমন—দীর্ঘ ৫০ বছর যাবৎ আমার ভুনা গোশত খেতে ইচ্ছা জেগেছে, কিন্তু আমি প্রবল দৃঢ়তার সাথে সেই ইচ্ছাকে দমন করে রেখেছি।
আরেক জন বলেন, দীর্ঘদিন আমার নফস মধু দিয়ে মাখিয়ে রুটি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিল, আমি তা থেকে বিরত থেকেছি।
আচ্ছা, বলো, এটা কি শরিয়ত নাকি শরিয়তের চাহিদা? কোনোটাই নয়। তা ছাড়া, তুমি কি মনে করো, এর দ্বারা তারা উদ্দেশ্য নিয়েছে যে, তাদের পাকস্থলী থেকে ততদিনে যা বের হয়েছে, সে খাদ্যের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। সবই ছিল সন্দেহমুক্ত খাদ্য? কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ এটার দিকেই লক্ষ রাখতেন। তাকওয়া সকল সময়ই প্রশংসিত ও ভালো কাজ—কিন্তু অনর্থকভাবে নিজেকে কষ্টের মধ্যে ফেলা তো ভালো কাজ নয়; বৈধও নয়।
এই যেমন বিশর হাফি রহ.। তিনি বলতেন, আমি কথা বলি না। কারণ, আমার নফস কথা বলতে চায়।
এ ধরনের পথ বিশুদ্ধ পথ নয়। কারণ, মানুষকে তো বিয়েরও আদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিয়ে নফসের খুবই কাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়।
হয়তো এ কারণেই বিশর হাফির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, আল হাফি—খালি পা, তিনি যদি তার বিষয়টি দু স্যান্ডেল দ্বারা ঢেকে রাখতেন, তবে সেটাই অধিক ভালো হতো। একজনের খালি পাও দৃষ্টিকে কষ্ট দেয়। এটাতে সওয়াবের কিছু নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজেরও দুটি জুতা ছিল। কিন্তু তাঁর এবং তাঁর সাহাবিদের জীবনপদ্ধতির ওপর তো আজকের জাহেদরা নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতেন, মজাও করতেন, সুন্দর জিনিস পছন্দ করতেন, হজরত আয়েশা রা.-এর সাথে নির্জন প্রান্তৱে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। তিনি গোশত খেতেন। মিষ্টান্ন ভালোবাসতেন। তার জন্য শরবত করা হতো।
এ ধরনের জীবনপদ্ধতির ওপর ছিলেন সাহাবায়ে কেরামও। কিন্তু এরপর ‘জাহেদগণ’ তাদের জীবনযাপনের এমন অস্বাভাবিক সব পদ্ধতি প্রকাশ করতে শুরু করলেন, তা যেন নতুন শরিয়ত। এর কোনোটিই সঠিক ও বিশুদ্ধ নয়। তারা এ ব্যাপারে প্রমাণ প্রদান করে হারেস মুহাসিবি ও আবু তালেব মাক্কির কথা দিয়ে। কিন্তু তাদের কেউ তো কোনো সাহাবি, তাবেয়ি এবং ইসলামের কোনো ইমামের কথা দিয়ে দলিল দেয় না।
এসকল জাহেদরা যদি কোনো আলেমকে সুন্দর জামা পরিধান করতে দেখে কিংবা কোনো রূপসী নারীকে বিয়ের কথা শোনে অথবা যে আলেম দিবসে খাওয়া-দাওয়া করে এবং কখনো হাসে, তখনই তারা এদের নিন্দামন্দ করতে থাকে।
তাই তাদের অনেকের ইচ্ছা ভালো থাকা সত্ত্বেও ইলমের স্বল্পতার কারণে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে আছে। তাদের কেউ কেউ এমন কথাও শুনিয়েছে যে, দীর্ঘ ৮০ বছর আমি পিঠ লাগিয়ে ঘুমাইনি! কেউ বলে, আমি শপথ করেছি, একবছর আমি পানি পান করব না!
কী আজগুবি সব কথা! অথচ এগুলোকেই তারা সওয়াব ও শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যম মনে করছে! এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কী আছে!
আমরা জোর দিয়েই বলতে পারি, তারা সঠিক পথে নেই। নিশ্চয় মানুষের নফস ও শরীরের হক রয়েছে।
আরও কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যাদের উদ্দেশ্যই সঠিক নয়। লোক দেখানো মুনাফেকিতে লিপ্ত। দুনিয়া অন্বেষণের জন্য এবং সাধারণ ব্যক্তির থেকে সম্মান ও সমীহ প্রাপ্তির জন্য দুনিয়াবিমুখতার ভান ধরে। এদের নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। এরা তো জেনেশুনেই ভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত। এবং আজকের দিনে অধিকাংশ সুফির অবস্থাই এমন। বিচিত্র পোশাক পরিধান করে- যাতে মানুষ তাদের দুনিয়ার সাজসজ্জা বর্জনকারী হিসেবে ভাবে। ভালো কোনো জামা রাখে না। পূর্ববর্তী দরবেশ ফকিরদের আকার ধারণ করে। অথচ বাস্তবে তারা লিপ্ত রয়েছে দুনিয়ার সম্পদ আস্বাদন, সন্দেহযুক্ত সম্পদ গ্রহণ, অলসতা, খেলতামাশা এবং সুলতান-বাদশাহদের দরবারে যাতায়াতের মধ্যে।
এসকল মানুষ অল্পে তুষ্টির সীমা অতিক্রম করেছে, প্রথম যুগের ব্যক্তিদের দুনিয়াবিমুখতা থেকে বহুদূরে সরে গেছে। এরপর আমি তাদের ব্যাপারে বেশি আশ্চর্যবোধ করি, যারা এদের পেছনে এখনো সওয়াবের কথা ভেবে দান-সদকা করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00