📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পরিণতির দিকে লক্ষ রাখা

📄 পরিণতির দিকে লক্ষ রাখা


মানুষের একটি বড় ভুল হলো, বঞ্চিত ব্যক্তির প্রতি কষ্টদায়ক কোনো কথা বলা এবং তাকে হেয়জ্ঞান করা। এটি উচিত নয়। পরিণাম হিসেবেও ভালো নয়। কারণ, হেয়জ্ঞানকারী লোকটিরও একদিন এই অবস্থা হতে পারে- তখন তার থেকে প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
মোটকথা- মৌলিকভাবে কারও সাথেই কখনো শত্রুতা প্রকাশ করা উচিত নয়। কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। কখনো কখনো এই তাচ্ছিল্যকৃত ব্যক্তিও অনেক ওপর উঠে যেতে পারে। যাকে হয়তো গণনার মধ্যেই আনা হয় না- তার দ্বারাও সম্পাদিত হতে পারে অনেক অসম্ভব জিনিস। এ কারণে শত্রুদের সাথে কথা বলার সময়ও অন্তরের আগুন গোপন রেখে কথা বলা উচিত। আর যদি তার থেকে কোনো প্রতিশোধ নিতেই চাও তাহলে তাকে ক্ষমা করে দাও। এর চেয়ে বড় প্রতিশোধ আর হয় না। এটা তাকে নত ও অবনত করে তুলবে।
মোটকথা, সকল মানুষের সাথেই ভালো আচরণ করা উচিত। বিশেষ করে যাদের কখনো কর্তৃত্বের অধিকারী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বঞ্চিত বরখাস্ত কিংবা অপসারিত ব্যক্তিদের সাথেও ভালো ব্যবহার করা উচিত। হয়তো সে আবার তার পদ ফিরে পেতে পারে। তখন তার কর্তৃত্বে উপকার লাভ করা সহজ হবে।
আমরা একটি ঘটনার কথা জানি। ঘটনাটি এমন—
একবার একলোক বিখ্যাত বিচারক ইবনে আবি দাউদের নিকট প্রবেশের অনুমতি চেয়ে দারোয়ানদের কাছে এসে বলল, ‘তোমরা ভেতরে গিয়ে বলো, দরজায় আবু জাফর অনুমতির আশায় দাঁড়িয়ে আছে।’
দারোয়ানরা ভেতরে গিয়ে সংবাদ প্রদান করতেই বিচারক সাহেব আনন্দিত হয়ে উঠলেন। দারোয়ানদের বললেন, ‘তোমরা দ্রুত তাকে আমার নিকট নিয়ে এসো।’
এরপর লোকটি ভেতরে এলো। বিচারক সাহেব দাঁড়িয়ে এগিয়ে এসে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। এরপর কাছে নিয়ে বসালেন। খুবই সম্মান প্রদর্শন করলেন। বিভিন্ন কথাবার্তা বললেন। শেষে ওঠার মুহূর্তে লোকটির হাতে পাঁচ হাজার দিনার তুলে দিলেন এবং বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে এসে তাকে বিদায় জানালেন।
আশপাশের লোকজন তো অবাক! এ কেমন বিষয়! অবশেষে কৌতূহল দমন করতে না পেরে তারা বিচারক সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, একজন অবিখ্যাত অতি সাধারণ ব্যক্তির সাথে আপনি এমন আচরণ করলেন! কারণ কিছুই বুঝলাম না!
বিচারক ইবনে আবি দাউদ বললেন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য রকম এক ঘটনা। এক সময় আমি খুবই দরিদ্র ছিলাম। আর এই লোকটি ছিল আমার বন্ধু। একদিন আমি তার বাড়িতে গিয়ে বললাম, আমি খুবই ক্ষুধার্ত। কিছু খাওয়াও।
বন্ধুটি আমাকে বলল, 'একটু বসো। আমি এখনই বাইরে থেকে আসছি।' সে আমাকে বসিয়ে রেখে বাইরে বেরিয়ে গেল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কাবাব, হালুয়া এবং রুটি নিয়ে উপস্থিত হলো। সেগুলো আমার সামনে রেখে বলল, খাও।
আমি বললাম, তুমিও আমার সাথে খাও।
সে বলল, না, তুমিই খাও।
আমি বললাম, আল্লাহর কসম, তুমি যদি আমার সাথে না খাও, আমি খাব না।
আমার এ কথায় সে বাধ্য হয়ে আমার সাথে খেতে বসল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি তার মুখ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে...। আমি বিচলিত হয়ে বললাম, এটা কী হলো তোমার?
সে বলল, তেমন কিছু না। এমনি একটু অসুস্থতা।
আমি বুঝতে পারছিলাম সে আমার থেকে কিছু লুকাতে চাচ্ছে। আমি তাকে বললাম, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তুমি আমাকে আসল কথা বলো— কী হয়েছে। এভাবে রক্ত পড়ছে কেন?
এভাবে অনেক সাধাসাধির পর সে আমাকে যা বলল, তা শোনার জন্য আমি কিছুতেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমার অন্তর যেন উড়ে গেল। সে আমাকে বলল, 'তুমি যখন আমার নিকট এসে তোমার ক্ষুধার কথা জানালে, তখন আমার নিকট খাদ্য কেনার মতো কিছুই ছিল না। তবে আমার দাঁত ছিল ভঙ্গুর। সেটা স্বর্ণের তার দিয়ে বাঁধাই করে নিয়েছিলাম। আমি তখন বাইরে গিয়ে সেই তার খুলে বিক্রয় করে এই খাবারগুলো কিনে এনেছি। ভাঙা দাঁত থেকে এখন তাই রক্ত বেরোচ্ছে।'
কথা শেষ করে বিচারক সাহেব বললেন, এবার তোমরাই বলো এর কি কোনো প্রতিদান হয়! কোনো সম্মান ও সম্পদ এর সমকক্ষ হতে পারে কি! পারে না। কিছুতেই পারে না।
ঠিক এর উল্টোটাও অনেক সময় হয়। হয়তো কেউ কাউকে এক সময় কষ্ট দিয়েছে। জুলুম করেছে। হয়তো একদিন সেই ব্যক্তিই কর্তৃত্ব পেয়ে আগের ব্যক্তির উপর প্রতিশোধ নিয়েছে। যেমন ইবনে যিয়াদকে কষ্ট পেতে হয়েছে মুতাওয়াক্কিল থেকে। ইবনুল জাঝারির ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে মুসতারশিদ।
একারণে বুদ্ধিমান ব্যক্তি সব সময় পরিণামের কথা চিন্তা করে এবং সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে রাখে। ভবিষ্যতে কী কী হতে পারে, তার একটি চিত্র সে মনের মধ্যে এঁকে নেয় এবং সতর্কতার সাথে কাজ করে।
এব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভেবে রাখার বিষয় হলো, হঠাৎ মৃত্যুর কথা। কোনো রোগ-বালাই ছাড়াই হঠাৎ আকস্মিকভাবেও মৃত্যু এসে যেতে পারে। সুতরাং সচেতন ব্যক্তি সেই- যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং এমন কাজ করে- মৃত্যু এসে গেলে যেন আফসোস করতে না হয়। তাই সে গোনাহের কাজ থেকে সতর্ক থাকে। কারণ, এটি একটি ওত পেতে থাকা নির্মম শত্রুর মতো। তার ক্ষেত্রে বেখেয়াল হলেই সর্বনাশ। সে ব্যক্তি নিজের জন্য ভালো আমল সঞ্চয় করতে থাকে। কারণ, এটিই একমাত্র বন্ধু, যে বিপদের সময় উপকার করে।
এছাড়াও একজন মুমিন ব্যক্তির এটাও খেয়াল রাখা দরকার, তার আমল যত বেশি হবে, জান্নাতে তার মর্যাদাও তত উচ্চ হবে। আর যদি আমল কম হয়, মর্যাদাও কম হবে। তখন সে বেশি আমলকারী ব্যক্তির তুলনায় কম মর্যাদা নিয়ে জান্নাতে বসবাস করবে। তবে এটা ঠিক সে তার নিজের পুরস্কার নিয়েও সন্তুষ্ট থাকবে—তার এই কমতির কথা সে কখনো বুঝতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের কাজের পরিণামের প্রতি লক্ষ রেখে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ার টুকরো প্রতারণা

📄 দুনিয়ার টুকরো প্রতারণা


আমার একটি কিতাবের নাম 'المنتظم'। এটি লিখিত হয়েছে বিভিন্ন খলিফা, সুলতান, সম্রাট ও জাতির ইতিহাস নিয়ে। আমি যখন এটি সংকলন করতে থাকি, তখন অনেক কিছুই জানতে পারি—বহু খলিফা সম্রাট রাজা-বাদশাহ, উজির-মন্ত্রী, লেখক-সাহিত্যিক, ফকিহ, মুহাদ্দিস, জাহেদ এবং আরও অনেকের জীবনী সম্পর্কে জানতে সক্ষম হই।
সবার অবস্থা জানতে গিয়ে যেটা আমার মনে হলো, তা হলো, দুনিয়া অনেক মানুষকে নিয়ে এমন প্রতারণার খেলা খেলেছে যে, তাদের দ্বীন-ধর্ম নষ্ট করে ছেড়েছে। বিভিন্ন অপরাধ ও অবাধ্যতায় জড়িয়েছে। এমনকি অনেককে তাদের আখেরাতের বিষয়ে অবিশ্বাসী করে তুলেছে।
অনেক শাসকই অন্যায়ভাবে মানুষদের হত্যা করেছে, সম্পদ কেড়ে নিয়েছে, আহত করেছে, বন্দি করেছে—অনেক রকম অত্যাচার করেছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত বিভিন্ন অবাধ্যতা ও গোনাহের মধ্যে লিপ্ত হয়েছে। যেন এগুলো সম্পর্কে তাদের কিছু ভাবার নেই। যেন তারা পরকালের পাকড়াও থেকে নিজেদের নিরাপদ মনে করছে। কিংবা কখনো কখনো তারা ভেবে বসেছে— প্রজাদের এই দেখাশোনা ও পরিচালনা তাকে শাস্তি থেতে বিরত রাখবে। কিন্তু তারা কি ভুলে যায় যে, খোদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পর্যন্ত বলা হয়েছে—
قُلْ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ)
হে নবী, আপনি বলুন, আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তবে আমি মহা দিবসের শাস্তির ভয় করি। [সুরা যুমার: ১৩]
অথচ যারা নিজেদের আলেম হিসেবে গণ্য করে, সেই তাদের অনেকেই দুনিয়ার নগদ কামনা পূরণের উদ্দেশ্যে আল্লাহর অবাধ্যতার মধ্যে প্রবেশ করেছে। ইলম তাদের কোনো উপকারই করেনি। এটা কেমন ইলম! এভাবে অনেক জাহেদও নিজেদের দুনিয়াবি কামনা চরিতার্থ করার জন্য পথবিচ্যুত হয়েছে। তাদের এগুলো করার কারণ—দুনিয়া হলো একটি ফাঁদের মতো। আর মানুষরা পাখির মতো। পাখি তার খাদ্য খেতে এখানে-সেখানে উড়ে যায়। বেড়ায়-কিন্তু ফাঁদের কথা ভুলে থাকে। তাই তারা ফাঁদে আটকা পড়ে। ধরা খেয়ে যায়।
এভাবে অধিকাংশ মানুষ তাদের তাৎক্ষণিক বাসনা ও কামনার মাঝে কঠিন শাস্তির কথা ভুলে থাকছে। তারা রাতভর বিভিন্ন অনর্থক আলাপ-আলোচনায় মত্ত থাকে। কিন্তু আকল বা বিবেকের পরামর্শের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না। সামান্য তুচ্ছ সুখের বিনিময়ে তারা সমূহ কল্যাণ বিক্রয় করে দিচ্ছে। সাময়িক উত্তেজনা চরিতার্থ করার মাধ্যমে কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়ছে।
এভাবে চলতে চলতে তাদের কারও নিকট যখন মৃত্যু এসে পড়ছে, তখন সে আফসোস করে বলছে, হায়, আমার যদি সৃষ্টি না হতো! হায়, আমি যদি মাটি হতাম! এভাবে সে নিজের সত্য অনুধাবনের কথা ব্যক্ত করে। কিন্তু তখন তাকে বলা হবে-؟ ألاّن - অবশেষে এখন? এতদিনে কী করেছ!
এখন শুধু আফসোফ আর আফসোস! হারিয়ে যাওয়া এমন জিনিসের জন্য-যাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আপতিত এমন অপদস্থতার জন্য- যার থেকে আর মুক্তি নেই। এখন শুধু অন্তহীন অনুশোচনা। আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখেও শাস্তির জন্য আফসোস! কারণ, বিবেকের দারস্থ না হলে সে তো কোনো উপকার করতে পারে না। অবৈধ আকর্ষিত জিনিস থেকে বিরত থাকার দুর্দম ইচ্ছাশক্তি ছাড়া বিবেকের পরামর্শ কেউ তো শুনতে সক্ষম হয় না!
খলিফাদের মধ্যে তুমি উমর ইবনে খাত্তাব রা. এবং উমর ইবনে আবদুল আজিযের কথা চিন্তা কর। আর আলেমদের মধ্যে ভেবে দেখ আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কথা। দৃষ্টি প্রদান কর জাহেদদের মধ্যে ওয়ায়িস করনি রহ. এর কথা। তারা যথেষ্টভাবে চেষ্টা-মুজাহাদা করেছিলেন। এবং নিজেদের অস্তিত্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তারা প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করেননি।
ধ্বংসশীলদের ধ্বংস হওয়ার প্রধানতম কারণ হলো অবৈধ আকর্ষিত জিনিসের ক্ষেত্রে ধৈর্যের স্বল্পতা। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। কত মানুষ তো পরকাল এবং তার শাস্তির প্রতি ঈমান রাখে না-এটা কোনো আশ্চর্য বিষয় নয়। বরং আশ্চর্যের বিষয় হলো, একজন মুমিন 'ঈমান ও ইয়াকিন' রাখে, কিন্তু তার এই ঈমান ও ইয়াকিন তাকে কোনো উপকার করছে না! আল্লাহর শাস্তিকে সে বোঝে ও মান্য করে-কিন্তু তার এই বুঝ তাকে কোনো উপকার করছে না! একজন মুমিনের জন্য এ বড় ভয়াবহ ব্যাপার!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মনোবলের উচ্চতা ও নিচতা

📄 মনোবলের উচ্চতা ও নিচতা


উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তিকে তার মনোবলের উচ্চতা অনুযায়ী কষ্টও স্বীকার করতে হয়। কবি বলেন,
وإذا كانت النفوس كباراً ... تعبت في مرادها الأجسام
যখন অন্তর বড় হয়, তখন তার বিশাল আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করতে শরীরকেও কষ্ট স্বীকার করতে হয়।
অন্য কবি বলেন,
ولكل جسم في التحول بلية ... وبلاء جسمي من تفاوت همتي
প্রত্যেক মানুষের শরীরেই কিছু অসুস্থতার বিপদ থাকে। আর আমার শরীরের বিপদ হলো আমার মনোবলের উচ্চ ভারবহন।
এর ব্যাখ্যা হলো, যে ব্যক্তির মনোবল অনেক উচ্চ, সে সকল ধরনের ইলম অর্জন করতে সচেষ্ট হয়। সে শুধু এক প্রকার ইলমের ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং সে প্রতিটা ইলমে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করতে চায়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পরিশ্রম-আর শরীর এটা বহন করতে সক্ষম হয় না। তখন মনোবলকে সঙ্গ দেওয়া শরীরের জন্য অনেক কষ্টকর হয়ে ওঠে।
এরপর যখন সে বুঝতে পারে ইলমের উদ্দেশ্যই হলো আমল, তখন সে দীর্ঘ রোজা, নামাজ ও জিকিরে মশগুল হতে শুরু করে। তখন এই সমূহ ইবাদত এবং ইলমচর্চার মাঝে সমন্বয় করা অর্থাৎ দুটোকেই সমানভাবে সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর যখন সে বুঝতে পারে- দুনিয়াবিমুখ হওয়া দরকার কিন্তু এদিকে আবার জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোও অর্জন করা দরকার। এছাড়া সে চায় অন্যকে প্রাধান্য দিতে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে। কৃপণতাকে পছন্দ করে না। এগুলো তাকে খরচের ওপর উদ্বুদ্ধ করে। আবার সে যেমনতেমনভাবে উপার্জনও করতে চায় না- হালাল পথ ছাড়া। এভাবে সে যদি সম্মান ও আভিজাত্যের সাথে চলতে চায়- অথচ তার উপার্জন কম থাকে, তখন সেটাও তার শরীর ও পরিবারের ওপর কষ্টকর হয়ে পড়ে। আর সে যদি কাউকে কিছু না দিয়ে চলতে চায়- তবে এটা তার স্বভাবের ওপর কষ্টকর হয়ে ওঠে।
মোটকথা তাকে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিপরীত বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করার প্রবল চেষ্টা নিয়ে তার জীবনপাত করতে হয়। অর্থাৎ তাকে সার্বক্ষণিক শ্রমের মধ্যে থাকতে হয়। ক্লান্তি ও শ্রান্তি নিয়েও কাজ করে যেতে হয়। তার কোনো অবসর থাকে না। এরপর যদি তার এই কাজগুলোর মধ্যে একনিষ্ঠতা থাকে—তবে তো তার কষ্ট আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। সতর্ক থাকতে হয় সকল ক্ষেত্রে।
আর এদিকে যার মনোবল উচ্চ নয়, তার অবস্থা কী হয়? সে যদি ফিকাহবিদ হয় আর যদি তাকে কোনো হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে বলে—আমি জানি না। আর যদি মুহাদ্দিস হয়, তখন যদি তাকে কোনো ফিক্হি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে বলে, আমি জানি না। অর্থাৎ তার জ্ঞান হয় অসম্পূর্ণ—একপেশে। এবং এটা নিয়ে যেন তার কোনো মাথাব্যথাও নেই।
আর উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তি নিছক একটি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করাকে নিজের জন্য অপমান মনে করে। এটা তার নিকট ত্রুটিযুক্ত মনে হয়। মানুষ তার নিকট কিছু জিজ্ঞাসা করল—আর সে তার উত্তর দেবার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে—এটাকে সে নিজের জন্য অপমানকর মনে করে।
এছাড়া একজন হীন মনোবলসম্পন্ন লোক মানুষের অনুগ্রহকে কিছু মনে করে না। তাদের কাছে কিছু প্রার্থনা করতেও লজ্জাবোধ করে না। যে যা প্রদান করে—সকলের জিনিসই গ্রহণ করে। অসমীচীন কারও জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার আত্মসম্মানবোধটুকু তার থাকে না।
কিন্তু একজন উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তি এগুলো কখনো করে না। হয়তো কষ্ট ও দারিদ্র্য প্রতিনিয়ত তার জীবনকে আঘাত করে, শ্রমের ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চায় শরীর, তবুও কী এক তৃপ্তির সুধায় সকল কিছু সে ভুলে থাকে। ভবিষ্যতের পুরস্কার ও প্রতিদানের আশায় তখন কোনো কষ্টই আর তাকে কষ্ট দেয় না।
এদিকে মনোবলহীন ব্যক্তি নিজেকে যতই কাজ ও ক্লান্তি থেকে সরিয়ে রাখুক—পরিণামে তাকেই বরং কষ্টে পতিত হতে হয়; শারীরিক কিংবা মানসিক। কিছুতেই তার তৃপ্তি আসে না।
অবশেষে বলি, দুনিয়া হলো একটি সম্মানজনক উচ্চ কাজের প্রতিযোগিতার স্থান। সুতরাং একজন উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তি স্বল্প উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সে বরং সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করে। সে যদি সফলকাম হয়—তাহলে তো সোনায় সোহাগা। আর যদি প্রবল চেষ্টা সত্ত্বেও তার সফলতার ঘোড়া হোঁচট খেয়ে যায়—তবুও ব্যথা পাওয়ার কিছু নেই। অনেকে তো এই হোঁচট খাওয়া পর্যন্তই আসতে পারে না—কিংবা আসতে সাহস করে না। আর মুমিনের নিয়তই তো উত্তম।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আত্মমুগ্ধতার বিপদ

📄 আত্মমুগ্ধতার বিপদ


মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো তার নিজের প্রতি তুষ্ট থাকা এবং নিজের ইলমের উপর নির্ভর করা। এটি বর্তমানের এমন এক বিপদ—অধিকাংশ মানুষ যার দ্বারা আক্রান্ত।
তুমি দেখবে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও নিজেদের সঠিক মনে করে। কিন্তু এটা নিয়ে তারা কোনো পর্যালোচনা করে না। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের প্রমাণ ও দলিলের দিকে দৃষ্টি প্রদান করে না। যা শুনলে তাদের অন্তর নরম হতে পারে—যেমন বিমুগ্ধকর কোরআন, সেটা থেকেও তারা পালিয়ে থাকে—যাতে শুনতে না হয়।
ঠিক এভাবেই প্রতিটি মনগড়া মতবাদ কিংবা ধর্মের প্রতিটি দল নিজের মতকেই সঠিক মনে করে তার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। হয়তো এটা তাদের পূর্বপুরুষ—বাপ-দাদার ধর্ম, সে কারণেই এটি পালন করে। কিংবা প্রথমেই সে একটি মতবাদ নিজের জন্য গ্রহণ করে নিয়েছে—এটাকেই সে সঠিক মনে করে। এর বিপরীত কোনো মত, মতবাদ কিংবা ধর্মের দিকে সে কোনো দৃষ্টিপাত করে না। এবং এটা নিয়ে জ্ঞাতজনদের সাথে আলোচনাও করে না—তাহলে তারা তার ভুলটা ধরে দিতে পারতেন। কিন্তু সে সেটাও করে না। নিজের মতে নিজেই সন্তুষ্ট—এই ভ্রান্তির কোনো প্রতিকার নেই।
হজরত আলি রা.-এর ক্ষেত্রে খারেজিদের অবস্থাও হয়েছিল এমন। তারা নিজেরা যা করছিল, সেটাকেই ভালো মনে করছিল। কিন্তু তারা এ জন্য কোনো বিজ্ঞ আলেমের দ্বারস্থ হয়নি—যিনি তাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারতেন। কিন্তু হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. নিজেই যখন তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদের ভুলটা স্পষ্ট করে ধরে দিলেন—তখন তাদের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি ব্যক্তি সেই মতবাদ থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। আর এই প্রবৃত্তিতাড়িত মতবাদ থেকে যারা ফিরে আসতে চায়নি, তাদের মধ্যে একজন হলো ইবনে মুলজিম। সে তার নিজের মতবাদকেই সঠিক মনে করছিল। সুতরাং সে আমিরুল মুমিনিনকে হত্যা করা বৈধ মনে করছিল। এবং এটাকে সে তার দ্বীন মনে করছিল। এ কারণে বন্দি করার পর তাকে যখন শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হচ্ছিল—তখনও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। নীরবে সয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যখন তার জিহ্বা কর্তন করার উপক্রম করা হলো, তখন সে বলে উঠল—হায়, দুনিয়ায় এমন একটি মুহূর্ত আমি কীভাবে বেঁচে থাকব—অথচ আল্লাহ তাআলার জিকির করতে পারব না!
ইবনে মুলজিমের ব্যাপারটি লক্ষ করো—জিদ ধরে থাকা অজ্ঞতার সাথে এই যে একনিষ্ঠ ভ্রান্তি—এর কোনো ওষুধ নেই। কিছুই তাকে সঠিক পথে আনতে সক্ষম হবে না। মানুষের জন্য এটি এক দুরারোগ্য রোগ—মৃত্যু ছাড়া এর কোনো প্রতিষেধক নেই।
এভাবে হাজ্জাজ বিন ইউসুফও বলত, দুনিয়া কিছুই নয়, আমি সকল সুখ-শান্তির আশা রাখি আখেরাতে!
যে ব্যক্তির কথা ও বিশ্বাসটি এমন—অথচ সেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এমন বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে—যাদের হত্যা করা ছিল নাজায়েয। যেমন সাঈদ ইবনে যুবায়ের—তাকে কী নির্মমভাবেই না হাজ্জাজ হত্যা করেছে। কাছির ইবনে কাহদাম বলেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জেলখানায় এমন বন্দির সংখ্যাই ছিল ৩৩ হাজার—যাদের ওপর কোনো ধরনের দণ্ড অপরিহার্য হয়নি।
আমার মনে হয়—অধিকাংশ শাসক-সুলতান মানুষদের হত্যা করে, হাত-পা কর্তিত করে এই ধারণায় যে, তাদের ক্ষেত্রে এগুলো করা বৈধ। কিন্তু তারা যদি অভিজ্ঞ জ্ঞাত ব্যক্তিদের এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে নিত, তাহলে তারা তাদের নিকট সঠিক বিষয়টি তুলে ধরতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটা করে না। নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপরই তারা অজ্ঞভাবে জিদ ধরে বসে থাকে-মানুষজাতির জন্য এটা এক বড় মুসিবত।
এছাড়াও সাধারণ মানুষও বিভিন্ন গোনাহের মধ্যে লিপ্ত হয়-ক্ষমা পেয়ে যাওয়ার ধারণায়। কিংবা ধারণা করে-তার সওয়াবগুলো তাকে মুক্তি দিয়ে দেবে। কিন্তু তারা শাস্তির বিষয়টা যেন ভুলেই থাকে। তাদের কেউ কেউ অজ্ঞভাবেই ধারণা করে বসে আছে, সে 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত' এর অন্তর্ভুক্ত। অথচ এর বিশ্বাসের বিষয়গুলো খেয়াল করে না। এগুলো হয়ে থাকে অজ্ঞতার প্রাধান্যের কারণে।
এ কারণে মানুষের জন্য উচিত, মূল উৎসের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। সন্দেহ ও সংশয় থেকে দূরে থাকা। শুধু নিজের জানা ইলমের ওপর কিছুতেই নির্ভর না করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সব ধরনের বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00