📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 যুক্তির অনুসরণে মুক্তি

📄 যুক্তির অনুসরণে মুক্তি


যে ব্যক্তি শুধু ইন্দ্রিয় চাহিদার অনুসরণ করবে, সে ধ্বংস হবে। আর যে ব্যক্তি আকল বা যুক্তির অনুসরণ করবে, সে নিরাপদ থাকবে।
ইন্দ্রিয়শক্তি অনুধাবন করতে সক্ষম শুধু বর্তমানকে- দুনিয়াকে। কিন্তু আকল লক্ষ করে সকল সৃষ্ট বস্তুর দিকে। এর মাধ্যমে সে এমন এক স্রষ্টার পরিচয় লাভ করে- যিনি অনেক কিছু প্রদান করেছেন। অনেক কিছু ব্যবহার ও ভোগের বৈধতা দিয়েছেন। কিছু এমনিতেই ছেড়ে দিয়েছেন। আর কিছু নিষেধ করেছেন। এবং তিনি জানিয়েছেন, একদিন আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করব এবং তোমাদের পরীক্ষা করব- যাতে তোমাদের নিকট আমার অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটে এভাবে যে, তোমাদের কিছু বিষয় খুবই মন চাইবে- কিন্তু আমার স্মরণে তা বর্জন করবে। এটাই হলো আমার জন্য তোমাদের ইবাদত। আর আমি তোমাদের জন্য এই পার্থিব আবাস ছাড়াও একটি আবাস নির্মাণ করেছি- যাতে আনুগত্যকারীদের পুরস্কার দেবো আর বিরোধিতাকারীদের শাস্তি দেবো।
যুক্তি এবং আকল এভাবেই লক্ষ করে এবং ভাবে।
কিন্তু শুধু ইন্দ্রিয়শক্তি- সে শুধু নিকট অনুভবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমানের সুখ-আনন্দ দ্বারা সে তাড়িত হয়। যা চায়, সেদিকেই তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় ছুটে যায়। এবং তার কিছু শাস্তিও সে পেয়ে যায়। যেমন, জিনা করলে 'রজম' করা হয়। মদ খেলে শাস্তি দেওয়া হয়। চুরি করলে হাত কাটা হয়। অনৈতিক কিছু করলে মানুষের মাঝে অপদস্থ হতে হয়। অলসতার মাধ্যমে জ্ঞান থেকে বিরত থেকে মূর্খতার মধ্যে ডুবে থাকতে হয়।
কিন্তু যে ব্যক্তি বুদ্ধি, যুক্তি ও আকলের অনুসরণ করে চলে, তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই লাভ হয়। মানুষের মাঝে সম্মানের সাথে চলতে পারে। এবং যে ব্যক্তি নিছক ইন্দ্রিয়শক্তির চাহিদা অনুযায়ী চলে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি এই বুদ্ধিমান ব্যক্তির জীবনযাপন মর্যাদাপূর্ণ ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।
যা বললাম, বুদ্ধিমান ব্যক্তি যেন এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তার ভবিষ্যতের জীবন যুক্তি ও প্রমাণের ওপর পরিচালিত করে- তাহলেই সে নিরাপদ থাকতে পারবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পূর্বসূরি আলেমগণের সুউচ্চ হিম্মত ও সাধনা

📄 পূর্বসূরি আলেমগণের সুউচ্চ হিম্মত ও সাধনা


আগের আলেমদের হিম্মত ও সাধনা ছিল অনেক উচ্চ। তাদের মনোবলও ছিল অনেক দৃঢ়। এগুলো বোঝা যায় তাদের রচিত বইপত্র পড়ে, যেগুলো তাদের জীবনের সারাংশ। তাদের এত এত রচনা- যুগের অতিবাহনে সেগুলোর অনেকই জীর্ণ হয়ে গেছে। কাগজ বিবর্ণ হয়ে গেছে। অথচ পড়ার কেউ নেই। কারণ, ইলম অন্বেষণকারীদের হিম্মত হীন হয়ে পড়েছে। তারা শুধু সংক্ষিপ্ততা খোঁজে। বড় বড় বিস্তৃত গ্রন্থের দিকে তারা যেন আগ্রহ রাখছে না। এরপর তো আরও ভয়াবহ সময় এসেছে। এখন তো অল্পকিছু পাঠ্যবিষয় সাব্যস্ত করে অন্যগুলো বর্জনের পর্যায়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই সেই বিশাল বিস্তৃত পূর্ববর্তীদের গ্রন্থগুলো পড়া এবং অনুলিপি করার অভাবে সেগুলো আরও জীর্ণ ও বিবর্ণ হয়ে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু যে শিক্ষার্থী তার ইলমের মধ্যে পরিপূর্ণতা আনতে চায়, তার জন্য অবশ্যই উচিত হবে পূর্ববর্তীদের কিতাবগুলো সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বেশি বেশি অধ্যয়ন করা। তাহলে সেখানে সে আমাদের জাতির এমন বিস্ময়কর জ্ঞান এবং উচ্চ হিম্মতের সন্ধান পাবে- যা তার অন্তরকে করে তুলবে আরও শাণিত। উচ্চ মর্যাদা ও আসন প্রাপ্তির জন্য নিজের মধ্যে সৃষ্টি করবে একটি অমিততেজা আন্দোলন।
এছাড়া প্রতিটি কিতাবেই রয়েছে মানুষের জন্য উপকার। উপকারশূন্য কোনো কিতাব নেই।
কিন্তু আজকের দিনে আলেম ও প্রাজ্ঞজনদের জীবনাচরণ হয়ে পড়েছে কত নিম্নতর! তাদের মাঝে এমন কোনো উচ্চ হিম্মতসম্পন্ন ব্যক্তি চোখে পড়ে না- যাকে নবীনরা অনুসরণ করতে পারে। এমন কোনো তাকওয়াবান পরহেজগার ব্যক্তিরও সন্ধান পাই না- যার থেকে জাহেদ ব্যক্তি উপকার লাভ করতে পারে।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে তোমাদের বলি, তোমরা গুরুত্বের সাথে আমাদের সালাফদের জীবনী পাঠ করো। তাদের রচনাসমূহ অধ্যয়ন করো। তাদের কার্যাবলী সম্পর্কে অবহিত হও। তাদের তো এখন আর দেখা সম্ভব নয়- কিন্তু তাদের এই জীবনী ও কিতাবসমূহ অধ্যয়নের মাধ্যমেই যেন তাদেরকে দেখা হয়ে যাবে।
যেমন কবি বলেন,
فاتني أن أرى الديار بطرفي ... فلعلي أرى الديار بسمعي.
আমি আমার দু-চোখ দ্বারা তাদের আবাস ও বসবাস প্রত্যক্ষ করতে পারিনি। কিন্তু সেগুলো হয়তো আজ আমার শ্রবণের মাধ্যমে দেখতে পাব।
এবার আমি আমার অবস্থা সম্পর্কে বলি- কিতাব অধ্যয়নের ক্ষেত্রে কিছুতেই আমার পরিতৃপ্তি আসে না। শুধু মনে হয়- অধ্যয়ন করেই যাই। তাই যখনই আমার এমন কোনো কিতাব হস্তগত হয়, যা আগে আমি দেখিনি, তাহলে আমি সে কitাবের ওপর একটি ধনভান্ডারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি। 'মাদরাসায়ে নিযামিয়া'তে যত কিতাব রয়েছে, আমি তার তালিকা বা সূচির ওপর নজর বুলিয়েছি। তাতে প্রায় ৬০ হাজার কিতাব রয়েছে। এভাবে আমি হজরত আবু হানিফা, হুমাইদি, আমাদের শাইখ আবদুল ওয়াহহাব ইবনে নাসের, আবু মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে খাশশাব- তাদের সকলের কিতাব সম্পর্কে অবগতি লাভ করেছি। এছাড়াও আরও যেখানে যখন যে কিতাবগুলো সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয়েছি, সেগুলো সম্পর্কেও জেনেছি।
আমি যদি বলি, আমি আমার জীবনে ২০ হাজার কিতাব অধ্যয়ন করেছি, তাহলে হয়তো এর চেয়েও বেশি অধ্যয়ন করেছি। অধ্যয়নে কখনো আমার পরিতৃপ্তি আসে না।
এভাবেই আমি সে সকল কিতাবের মাধ্যমে আমার জাতির সুউচ্চ জীবন সম্পর্কে জেনেছি। তাদের হিম্মত, সংরক্ষণ, ইবাদত এবং বিস্ময়কর সব ইলম সম্পর্কে জেনেছি। যে ব্যক্তি এগুলো অধ্যয়ন করবে না, সে তো এগুলো সম্পর্কে জানতে সক্ষম হবে না।
কিন্তু আমি যেহেতু তাদের অবস্থা দেখেছি ও জেনেছি, তাই আজকের সময়ের মানুষের হিম্মত ও সাধনার অবস্থা আমার নিকট খুবই তুচ্ছ ও নিম্ন মনে হয়। চিন্তা করা যায়! কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছে আমাদের ইলম ও হিম্মত!!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নাস্তিকতা একটি বোকামিপূর্ণ দর্শন

📄 নাস্তিকতা একটি বোকামিপূর্ণ দর্শন


মানবজাতির নিকট সবচেয়ে প্রিয় হলো তার প্রাণ। আমার খুবই আশ্চর্য বোধ হয় তাদের ব্যাপারে, যারা তাদের এই প্রিয় প্রাণ কত সহজেই ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। কত সহজেই না তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। আর এগুলোর প্রধান কারণ হলো- জ্ঞানের স্বল্পতা এবং ভুল দৃষ্টিভঙ্গী।
যেমন, আমরা দুনিয়ার সাধারণ জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও দেখি, কেউ কেউ নিজেকে বহু ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি নিয়ে যায়- যাতে সে মানুষের প্রশংসা কুড়াতে পারে। মানুষ যাতে তাকে সাহসী বলে। কেউ হয়তো হিংস্র প্রাণী শিকারে বের হয়ে পড়ে। কেউ যায় কিসসার সেই সুবিশাল সুউচ্চ দুর্গ প্রাসাদে আরোহণের জন্য। কেউ দৌড় প্রতিযোগিতা করে ৩০ ফারসাখ (৬০ মাইল)। এগুলো করতে গিয়ে কেউ যদি মৃত্যুবরণ করে, তবে তার জীবনে আর কী থাকল? কোনো প্রশংসা বা বাহবাই তো সে আর শুনতে পাবে না! কিংবা যে জীবনের জন্য সে সম্পদ অর্জন করতে চেয়েছিল- সেটাই তো তার নিঃশেষ হয়ে গেল।
আবারও বলি, নিজের প্রাণই মানুষের নিকট সবচেয়ে প্রিয়। তবুও আমি আশ্চর্য হই- যখন দেখি কোনো মানুষ নিজের অজান্তেই তাকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়। যেমন, কেউ হয়তো রাগান্বিত হয়ে কাউকে হত্যা করল, তাহলে তো তার এই রাগ প্রশমিত হবে জাহান্নামের আগুনে গিয়ে।
মুশরিকরা ছাড়াও- ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বিষয়টিও অতি আশ্চর্যজনক। তাদের কেউ যখন প্রাবশ্যক হয়, তখন তার ওপর কর্তব্য ছিল, আল্লাহ্‌ তা’আলার শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া। দলিল-প্রমাণগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং অন্য নবীদের সাথে তাঁকেও নবী হিসেবে স্বীকার করা। কিন্তু সে যদি তা স্বীকার না করে, তবে তো সে নিজেকে চিরদিনের জন্য জাহান্নামের সীমাহীন কষ্টের মধ্যে আপতিত করে ফেলল।
আমি একবার তাদের একজনকে বললাম, আচ্ছা বলো তো, কেন তুমি তোমার নিজেকে অনর্থক চিরকালীন শান্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছ? আমরা তো তোমাদের নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখি। এমনকি এটাও বলে থাকি, কোনো মুসলমান যদি আমাদের নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখে, কিন্তু তোমাদের নবীকে কিংবা তোমাদের কিতাবকে মিথ্যা মনে করে, সে আর মুসলিম থাকে না- সে কাফের হিসেবে চিরদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। তাহলে তোমাদের মাঝে আর আমাদের মাঝে পার্থক্যটা থাকল কোথায়? কারণ, আমরাও তো তাকে সত্য নবী হিসেবে বিশ্বাস করি, তার কিতাবকে বিশ্বাস করি। এমনকি আমরা যদি তাকে কখনো পেতাম, আমাদের কষ্টে জর্জরিত করে ফেললেও তাকে কখনো আমরা অপমান করতাম না। অস্বীকার করতাম না। তাহলে আর পার্থক্য কোথায়?
ইহুদি লোকটি বলল, তোমরা কি শনিবার পালন করো?
আমি বললাম, এটা পালন করা আবশ্যক কি না- সেই বিতর্কের কথা বাদ দিলেও এটি একটি শাখাগত বিষয়। আর ধর্মের কোনো শাখাগত বিষয় বর্জনের কারণে কারও ওপর তো চিরকালীন শাস্তি আসে না।
এবার তাদের প্রধান নেতা ঔদ্ধত্যের সাথে বলে উঠল, আমরা তোমাদের থেকে শনিবার পালনের কামনাও করি না। কারণ, শনিবারের বিষয়টি শুধু বনি ইসরাইলদের জন্যই বিশিষ্ট। অন্য কেউ এটা করলেও হবে না।
আমি বললাম, আমি তোমাদের এই মতকে মেনে নিলাম। তোমরা ধ্বংসশীল। কারণ, তোমরা জেনেবুঝে সম্মিলিতভাবে নিজেদের আত্মাকে চিরকালীন শাস্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছ।
আশ্চর্য লাগে তাদের নিয়েও- যারা এমন একটি বিষয়ে নিজের দৃষ্টি প্রদানের ক্ষেত্রে অবহেলা করে, যেখানে অবহেলা করার কারণে চিরকালীন শাস্তি আবশ্যক হয়ে পড়ে। স্রষ্টাকে অস্বীকারকারী নাস্তিকের ব্যাপারেও আশ্চর্য লাগে- সে এমনই এক বোকা ও নির্বোধ, স্রষ্টার এতকিছু দেখে, পরিধান করে এবং উপভোগ করেও বলে বসে- স্রষ্টা নেই।
এসব চিন্তা ও কার্যাবলির মূল হলো, জ্ঞানের স্বল্পতা, ইন্দ্রিয়কামনার অনুসরণ এবং বিশ্বব্যাপী সকল দলিল-প্রমাণের দিকে নিজের দৃষ্টিকে না ফেরানো। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মর্যাদাপ্রার্থীদেরকে নিমগ্ন হতে হয়

📄 মর্যাদাপ্রার্থীদেরকে নিমগ্ন হতে হয়


ইলম ও জ্ঞানের সর্বোচ্চ চূড়ায় সেই শুধু পৌঁছাতে পারে- যে হবে ইলমের আশেক। আর জানা কথা- আশেক ব্যক্তিকে অনেক রকম কষ্ট ও মুসিবতের ওপর ধৈর্যধারণ করতে হয়।
প্রথমত যে ব্যক্তি ইলম নিয়ে ব্যস্ত হবে, তাকে সকল রকম উপার্জন থেকে বিরত থাকতে হবে। এরপর ইলমের প্রত্যাশী হওয়ার পর থেকেই সকল ধনী ও পরিচিত ব্যক্তিদের থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করতে হবে। আর ঠিক এই দুই কারণে আবশ্যকভাবে তাকে দারিদ্র্য পেয়ে বসবে। কিন্তু সে নিজের চর্চায় অটল থাকবে। কষ্ট স্বীকার করবে-ইলম ও শ্রেষ্ঠত্ব যদি সে চায়। কারণ, শ্রেষ্ঠত্ব তাকে বারবার ডেকে বলছে-
( هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا )
এই সময়েই মুমিনদের ভীষণ কষ্টে ফেলা হয়েছিল এবং তাদেরকে ভীষণভাবে প্রকম্পিত করা হয়েছিল। [সুরা আহযাব: ১১]
আর যখনই কেউ এই কষ্টের কথায় ভয় পেয়ে যায়, তখন সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব এসে বলে,
لا تحسب المجد تمراً أنت أكله ... لن تبلغ المجد حتى تلعق الصبرا.
শ্রেষ্ঠত্ব কোনো সুস্বাদু খেজুর নয়, তুমি তা আরামে খেয়ে নেবে।
শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন হবে না, যতক্ষণ না ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. যখন ইলম অর্জনকেই প্রাধান্য দিলেন, তখন তিনি দরিদ্র ছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর্যন্ত ইলম নিয়ে এমনভাবে মশগুল ছিলেন যে বিয়ের জন্য অবসর পাননি। বিয়ে করেছেন ৪০ এর পর। এ কারণে কোনো দরিদ্র ব্যক্তি যদি ইলম নিয়ে চর্চা করতে চায়, তবে তাকে ইবনে হাম্বলের মতোই নিজের দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্যধারণ করতে হবে। একনিষ্ঠ সাধনা করতে হবে। তবে কথা হলো, তিনি যা করে দেখিয়েছেন, সেই সক্ষমতা এখন কি কারও আছে! সেই কঠিন দরিদ্র অবস্থাতেও তিনি সরকারি কিছু গ্রহণ করেননি। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ৫০ হাজার দিনার ফিরিয়ে দিয়েছেন। অথচ এদিকে তিনি সামান্য চাটনি ও লবণ দিয়েই খাদ্য- রুটি আহার করেছেন।
সারা বিশ্বে আজ তার কত সুনাম ও সুখ্যাতি! তার কবরের নিকট যেতে গেলেও অন্তরের মধ্যে এক অন্য রকম শিহরণ অনুভব হয়। এটা তো শুধু দুনিয়ার খ্যাতি ও মর্যাদা। আখেরাতে কেমন সম্মান আশা করা যায়, তার বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। এবার এমন আলেমের কথা চিন্তা করো- যাদের কবরের কথা কেউ জানেও না। জিয়ারত করতেও যায় না। তারা দুনিয়ায় থাকতে বিভিন্ন সহজতা গ্রহণ করেছিল, ব্যাখ্যা করে নিয়েছিল এবং সুলতানদের সান্নিধ্যে এসে দুনিয়া অর্জন করেছিল। এ কারণে তাদের ইলমের বরকত নষ্ট হয়ে গেছে। মর্যাদা ধুয়ে মুছে গেছে। আর মৃত্যুর সময় আকাশ পরিমাণ আফসোস নিয়ে ইন্তেকাল করেছে।
এগুলো এমন আফসোস—যা কখনো শেষ হওয়ার নয়। এমন ক্ষতি- যার কোনো প্রতিষেধক নেই। দুনিয়ার সুখ ও আস্বাদন চোখের পলকেই নিঃশেষ হয়ে যায়, এরপর যা চিরদিন বাকি থাকে—তার নাম আফসোস ও অনুশোচনা।
সুতরাং হে শ্রেষ্ঠত্বের প্রত্যাশী, ধৈর্য ধরো। সবর করো। প্রবৃত্তি ও ভ্রান্তির অনুসরণে সাময়িক স্ফূর্তি অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপর আফসোস করতে করতে সময় যায়।
হজরত শাফেয়ি রহ. বলেন,
يا نفس ما هو إلا صبر أيام ... كأن مدتها أضغاث أحلام
يا نفس جوزي عن الدنيا مبادرة ... وخل عنها فإن العيش قدامي হে আমার নফস, জেনে রেখো, ধৈর্যের দিনগুলো যেন কিছু এলোমেলো স্বপ্নের দিন।
সুতরাং হে আমার নফস, দ্রুত যাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে নাও, দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে নাও, আরামের দিন তো সামনে।
হে দরিদ্র আলেম, তোমাকে এবার বলি,
সম্রাটদের রাজত্ব থেকে তোমার রাজত্ব অনেক সমৃদ্ধ। তুমি যে ইলম অর্জন করেছ, তাদের কি তা অর্জন হয়েছে? তাহলে আর তাদের কিসের সুখ! প্রকৃত সচেতন সকল দূরদর্শী ব্যক্তি এটাকেই প্রাধান্য দেবে। তাছাড়া যখন তোমার মনের মধ্যে কোনো সুন্দর বোধ জাগ্রত হয় এবং কোনো আশ্চর্য অর্থের আবিষ্কার ঘটে- তখন তুমি যেই স্বর্গীয় আত্মিক আনন্দে উদ্ভাসিত হও, এই আনন্দ কোনো ইন্দ্রিয়-সুখ প্রেয়সী পেতে সক্ষম নয়। এছাড়া তোমাকে শাহওয়াত বা যৌনসুখের অনুভব ও শক্তি প্রদান করা হয়েছে, অন্য অনেকেই এটা থেকে বঞ্চিত। এভাবে তুমি স্বাভাবিকভাবেই তাদের সকল জীবনযাপন ও আনন্দের সাথে অংশীদার হয়ে চলেছ, তুমি তো জীবনের অনিবার্য কোনো কিছু থেকেই বঞ্চিত নও। এভাবেই সকলের দুনিয়ার জীবন নিঃশেষ হয়ে যাবে- তোমারও এবং তাদেরও।
এরপর ভাবো আখেরাতের কথা, আখেরাতে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারই অধিক সম্ভাবনা। আর তোমার সেখানে নিরাপদ থাকারই অধিক সম্ভাবনা। তাহলে এবার শেষ পরিণামের কথা ভেবে দেখো। তুমিই তো জিতে আছ।
অলসতাকে বর্জন করো- যা কখনো কাউকে মর্যাদাবান হতে দেয় না। এই অলসতার কারণেই অনেক আলেম মৃত্যুর সময় রাশি রাশি আফসোস নিয়ে ইন্তেকাল করেছে। কিন্তু তখন তো আর কিছুই করার থাকে না।
একবার একলোক স্বপ্নের মধ্যে আমাদের শাইখ ইবনুয যাগওয়ানিকে দেখতে পায়। শাইখ তাকে বলেন, أكثر ما عندكم الغفلة و أكثر ما عندنا الندامة. তোমরা দুনিয়াতে যা বেশি বেশি করো, তা হলো 'উদাসীনতা' আর আমরা এখানে যা বেশি বেশি করি, তা হলো সময় অপচয়ের 'অনুশোচনা'।
সুতরাং এখনই সচেতন হও- জীবনের সময় নিঃশেষ হওয়ার আগেই। এবং বড় প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকতে হলে এখনই প্রবৃত্তির শিকল গলা থেকে খুলে ফেলো। শ্রেষ্ঠত্ব কখনো আরাম-আয়েশের মাধ্যমে অর্জিত হয় না। হতে পারে না। সুন্দর মুখে সামান্য আঁচড়ও বড় দৃষ্টিকটু লাগে। সৌন্দর্যের কাতার থেকে অল্পতেই সে ছিটকে পড়ে।
সুতরাং হে বন্ধু, দ্রুত করো- খুবই দ্রুত। নফসের প্রতিটি শ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর ফেরেশতাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ওত পেতে বসে আছে। দৃঢ় প্রত্যয়ের শক্তি নিয়ে সটান সজাগ হও- স্বপ্ন তোমার সাধন করতেই হবে। প্রত্যয়ের হিসাব কষে জনৈক কবি বলেন,
إذا هم ألقى بين عيينة عزمه . ونكب عن ذكر العواقب جانبا وإذا يستشر في أمره غير نفسه ولم يرض إلا قائم السيف صاحبا
যখন সে প্রত্যয়ে দৃঢ় হয়, তখন তার চোখের দু-তারায় প্রত্যয়ের আগুন জ্বলজ্বল করে। প্রতিবন্ধকতার সকল কথা ছুঁড়ে ফেলে একপাশে।
কেউ যদি ভিন্ন কথায় টলাতে চায় তাকে, নিজেকে সে পাল্টে নেয় এবং তখন শুধু সে নিজের জন্য সবল বন্ধুকেই বেছে নেয়।
আর এই প্রত্যয়গুলোর মধ্যে দুনিয়া এবং তার প্রতি লালায়িত ব্যক্তিদের থেকে বিরত থাকার প্রত্যয়ও নাও। (আল্লাহ দুনিয়াদারদের তাদের দুনিয়ার বিষয়ে বরকত দান করুন।) কিন্তু কথা হলো, আমরাই ধনী আর তারাই হলো আসল গরিব। যেমন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেন,
ولو علم الملوك وأبناء الملوك ما نحن فيه الجالدونا عليه بالسيوف.
যদি রাজা-বাদশাহ এবং রাজকুমাররা জানত- আমরা কী সুখের মধ্যে আছি, তাহলে তারা এটা অর্জনের জন্য তরবারি নিয়ে আমাদের ওপর লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত।
দুনিয়াদার যা কিছু ভক্ষণ করে, তা হয়তো হারাম কিংবা সন্দেহপূর্ণ। যদি এমন হয়, সে নিজে এর মধ্যে জড়িত নয়; কিন্তু তার প্রতিনিধি এগুলো করে। যদি টাকা-সম্পদ অর্জন করে- এমন অনেক পথ থেকে অর্জন করে, যার প্রতিটি মাধ্যম হালাল নয়। এছাড়া তারা তাদের এসব সম্পদের কারণে বিভিন্ন ধরনের ভয়ে ভীত হয়ে থাকে- হত্যার ভয়, এগুলো নিঃশেষ হওয়ার ভয়, লোকসানের ভয়, বিনষ্টের ভয়, ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলার ভয়।
আর এদিকে আমরা যা খাই, হালাল ও বৈধ জিনিস খাই। আমাদের শত্রুর কোনো ভয় নেই। আমাদের কর্তৃত্বেরও নিঃশেষ হওয়ার কোনো ভয় নেই।
মানুষেরা আমাদের নিকটই ভালো মন নিয়ে আগমন করে। মুসাফাহা করে। সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখে।
এছাড়াও আশা করা যায়, আল্লাহ যদি দয়া করেন, আখেরাতে আমাদের এবং তাদের মাঝে তারতম্য হবে। দুনিয়াদাররা যদি আমাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেত, তাহলে তারা আমাদের মর্যাদার বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হতো। আর এই পার্থিব জীবনে সম্পদওয়ালারা যদি আমাদের ওপর কিছু না দেয়,তাহলেই তো বরং আমাদের অন্যের সম্পদ থেকে বেঁচে থাকার মর্যাদা পূর্ণতা পায়। কারণ, অনুগ্রহের মধ্যে এমন এক হীনতা রয়েছে যা কিছুতেই দূর হতে চায় না। অনুগ্রহের এই খাবার যেন খাবার নয়। অনুগ্রহের পোশাকও যেন পোশাক নয়। অনুগ্রহ গ্রহণের দিনগুলো বড় কষ্টের দিন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যক্তি সে, যে নিজেকে ইলমের জন্য উৎসর্গ করে দিলো। কারণ, একটি সুন্দর সম্ভ্রান্ত অভিজাত মন ছাড়া কেউ নিজেকে ইলমের জন্য উৎসর্গ করে না। অন্যদিকে যে ব্যক্তির সম্মানের একমাত্র মাধ্যম হলো টাকা-পয়সা, তার চেয়ে অপদস্থ সত্তা আর কেউ হতে পারে না। তার গর্বের একমাত্র মাধ্যম হয়তো তার বিশাল বাড়ি, অনেক সম্পদ। এতে তার নিজের মর্যাদা কোথায়? নিজের সত্তার উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি কোথায়?
আবু ইয়ালা আল আলাওয়ি আমাকে একটি কবিতা শুনিয়েছেন। কবিতাটি এমন-
رب قوم في خلائهم ... عرر قد صيروا غررا ستر المال القبيح لهم سترى إن زال ما سترا
কিছু মানুষের চরিত্রের মধ্যে ঢুকে আছে খোস-পাঁচড়া-কিন্তু সেগুলো দেখায় চমৎকার স্বাস্থ্যের মতো। সম্পদ তাদের কদর্যতাগুলো ঢেকে রাখে। কিন্তু যখন এই ঢাকনা ছুটে যাবে, দেখবে আসলে কী ছিল তাতে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অলসতা ও উদাসীনতার ঘুম থেকে জাগ্রত করুন এবং আমাদের জাগ্রতদের চিন্তা ও কর্ম-চাঞ্চল্যতা দান করুন। ইলম ও আকল অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। নিশ্চয় তিনি অতি নিকটে এবং তিনি প্রার্থনায় সাড়াদানকারী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00