📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সার্বক্ষণিক সচেতনতা

📄 সার্বক্ষণিক সচেতনতা


একজন মুমিনের সার্বক্ষণিক চিন্তা থাকে আখেরাত নিয়ে। সুতরাং দুনিয়াতে যেখানেই সে যা কিছু দেখে- তার মধ্যেই সে আখেরাতের স্মরণ ও শিক্ষা অর্জন করে।
এটাই নিয়ম- যে ব্যক্তি যেটা নিয়ে আগ্রহী ও আকর্ষণ বোধ করে, যেকোনো জিনিসের মধ্যে সে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে খুঁজে বের করে। যেমন দুনিয়ার কোনো নতুন নির্মিত ঘরে যদি বিভিন্ন ধরনের কর্ম-আকর্ষণের লোক যায়, তখন সকলেই তার নিজের আকর্ষিত জিনিসের দিকেই বেশি মনোযোগ প্রদান করে। যেমন, একজন কাপড় ব্যবসায়ী ঘরের বিছানাপত্র, কাপড় ইত্যাদির দিকে লক্ষ করবে এবং মনে মনে এগুলোর একটা দামও অঙ্কন করে নেবে।
এভাবে একজন কাঠমিস্ত্রী তাকাবে কাঠের তৈরি ছাদের দিকে। এবং খুঁটে খুঁটে কাজগুলো পরখ করে এর একটি মান নির্ণয়ের চেষ্টা করবে। আর একজন রাজমিস্ত্রী তাকাবে দেয়ালের দিকে- এর গাঁথুনি ও ধরনের দিকে। একইভাবে একজন বয়নশিল্পী দেখবে বোনা কাপড়গুলো এবং দেখবে সেগুলোর কারুকাজ।
এভাবে একজন মুমিন যখন কোনো অন্ধকার দেখে, তখন তার কবরের অন্ধকারের কথা স্মরণ আসে। যখন কোনো বেদনার্ত ব্যক্তিকে দেখে, তখন তার পরকালের শাস্তির কথা মনে আসে। কোনো ভীতিপ্রদ আওয়াজ বা শব্দ শুনলে, তার কিয়ামতের শিঙার আওয়াজের কথা মনে পড়ে। ঘুমন্ত মানুষকে দেখলে তার মৃত্যুর কথা স্মরণে আসে। আবার যখন কোনো সুখ ও আনন্দের বিষয় সে দেখে, তখন তার মনে চলে আসে জান্নাতের সুখ-শান্তির কথা।
প্রতিটি নিয়ামত দেখে তার জান্নাতের নিয়ামতের কথা মনে হয়। বিশেষকরে তার অন্তরের মধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জান্নাতের সেই চিরন্তন সুখ ও আনন্দের কথা- যা কখনো নিঃশেষ হবে না। যা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। সেখানে কোনো কষ্ট নেই। কোনো দুঃখ নেই। না-পাওয়ার কোনো হাহাকার নেই। শুধুই শান্তি আর শান্তি। সুখ আর সুখ।
জান্নাতের এই অনন্ত শান্তির কথায় তার অন্তর আশান্বিত ও উজ্জীবিত হয়। আর এগুলোর আশাতেই দুনিয়ার কোনো কষ্ট ও দুঃখ, কোনো বঞ্চনা কিংবা প্রিয়জনের মৃত্যু কিছুই তাকে কাবু করতে পারে না। আখেরাতের সীমাহীন সুখের তুলনায় সাময়িক এই কষ্টকে তার খুবই সামান্য মনে হয়।
কাবার দর্শনসুখে রমলের কষ্ট কি কেউ গায়ে মাখে! যেমন সুস্থতার প্রত্যাশায় ওষুধের তিক্ততা কেউ ধর্তব্যেই আনে না।
এভাবে একজন মুমিন বুঝতে পারে, এখানে বীজ বপনের পরিমাণ অনুযায়ী পরকালে ফসল উত্তোলন করা সম্ভব হবে। তাই সে আমলের সবচেয়ে ভালো বীজগুলো বপন করতে থাকে। অলসতা করে না। কারণ, জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত।
এভাবে একজন মুমিন ব্যক্তি আখেরাতের শান্তি ও আজাবের কথাও ভাবে। তখন তার দুনিয়ার জীবনের সুখ-আহ্লাদ বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তার চিন্তা ও পেরেশানি বাড়তে থাকে। তখন সে দুনিয়া এবং তার মাঝের সকল কিছু থেকেই নিজেকে নিরাসক্ত করে তোলে। কারণ, এখানে সে তো চিরদিন থাকতে পারবে না- থাকা সম্ভব নয়। এটি থাকার জায়গা নয়।
এভাবে একজন মুমিন ব্যক্তির দুটি অবস্থা হয়। একবার সে জান্নাতের অন্তহীন সুখের কল্পনায় আন্দোলিত হয়। আবার জাহান্নামের শাস্তির ভয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তার মধ্যে দুটি বিষয়ই সমানভাবে কাজ করে।
আর তার বাস্তব জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো হয়তো কিছুটা ঢিলামি এসে পড়ে- অন্যের মৃত্যু দেখেও নিজেকে নিরাপদ মনে করে। আবার কখনো কখনো কবরের চিন্তায় যখন নিমগ্ন হয়, তখন আখেরাতের প্রতি ধাবিত হয়ে পড়ে। এবং ভাবে- দুনিয়া নয়, আখেরাতই হলো একমাত্র শান্তি ও সুখের জায়গা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সার্বক্ষণিক সচেতনতা দান করুন; যাতে আমরা ভালো কাজের দিকে ধাবিত হতে পারি এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারি। আমিন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 শাসককে নসিহত করার পদ্ধতি

📄 শাসককে নসিহত করার পদ্ধতি


কেউ যদি কোনো শাসককে নসিহত করতে চায়, তবে সে যেন খুবই নম্রতার সাথে করে। এবং তার মুখের সামনে এমন কথা বলবে না- যা তাকে জালেম সাব্যস্ত করে।
কারণ, অধিকাংশ শাসকই হয়ে থাকে কঠোর, কঠিন ও উদ্ধত। এ কারণে তাদের যদি কোনো তিরস্কার করা হয়, সেটাকে তারা অপমান মনে করে। এটা তারা সহ্য করতে পারে না। এ কারণে নসিহতের মধ্যে শাসকের কিছু ভালো কাজ, প্রজাদের প্রতিপালনে কিছু সঠিক সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করা উচিত। এবং পূর্ব যুগের যে সকল ন্যায়বান শাসক, সুলতান বা খলিফা ছিলেন, তাদের কিছু ঘটনাও আলোচনা করতে পারে।
এছাড়াও মূল বিষয় হলো, এ ধরনের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নসিহত করার আগে তার পূর্বঅবস্থার দিকে খেয়াল করে নেবে। নসিহতকারী যদি দেখে, শাসকের অতীত কার্যাবলী ভালো, তাহলে সাহস করে কিছু কথা নিশ্চয়ই সে বলতে পারে। যেমন মানসুর ইবনে আম্মার এবং অন্যরা খলিফা হারুনুর রশিদকে নসিহত করতেন- নসিহত শুনে খলিফা ক্রন্দন করতেন। এভাবে যদি কোনো ব্যক্তির উদ্দেশ্য ভালো থাকে, তাহলে তাকে অধিক নসিহত ও উপদেশ প্রদান করতে পারে।
আর যদি দেখে- লোকটি আসলে জালেম, কল্যাণের কোনো ইচ্ছাই রাখে না, ভীষণ রকম মূর্খ, তাহলে এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টা করবে- কোনোভাবে তার সাথে সাক্ষাৎই যেন না ঘটে। কোনো নসিহত যেন করতে না হয়। কারণ, এ অবস্থায় তাকে যদি কোনো নসিহত করতে যায়, তাহলে তার নিজের জীবনই ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে। আর যদি প্রশংসা করে, তাহলে সেটা হবে তোষামোদ।
এরপরও যদি কোনো ঘটনাচক্রে তাকে কিছু বলতে বাধ্য হয়, তবে তা ইশারার মাধ্যমে বলবে। স্পষ্ট কিছুই বলবে না। হ্যাঁ, তবে শাসক-খলিফাদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি অতিবাহিত হয়েছেন, নসিহত শ্রবণের ক্ষেত্রে যারা নম্রতার পরিচয় দিয়েছেন। নসিহতকারীদের রূঢ় বাক্যও সহ্য করেছেন।
এমনকি খলিফা মানসুরকে মুখের সামনে ‘জালেম’ও বলা হয়েছে এবং তিনি ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে তা শ্রবণ করেছেন।
কিন্তু সেই সময় পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন আর সেই সময় নেই। আজকের দিনের অধিকাংশ সুলতান ও শাসক হলো খারাপ প্রকৃতির। জেদি লোভী ও নিষ্ঠুর। আর অধিকাংশ শিক্ষিত ও পণ্ডিত ব্যক্তিরাও তাদেরকে তোষামোদ করে চলে। আর যে ব্যক্তি তোষামোদ করে না, তার বঞ্চনার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। তাকে তখন চুপ করে যেতে হয়।
আগে শাসনের দায়িত্ব তারাই নিতেন, যারা ছিলেন এ বিষয়ে জ্ঞাত, প্রাজ্ঞ ও আমানতদার। যারা ছিলেন এ বিষয়ে অভিজ্ঞ। কিন্তু আজকের অবস্থা গেছে পাল্টে। আজকের শাসকদের প্রায় সকলেই সমান মূর্খ, দুনিয়ার প্রতি লোভী। স্বজনপ্রীতির দোষে দুষ্ট। এ কারণে প্রশাসনের দায়িত্বও অর্পিত হয় অযোগ্যদের হাতে।
পারতপক্ষে এ ধরনের লোকদের থেকে সতর্ক ও দূরে থাকাই উত্তম।
হ্যাঁ, এরপরও যদি কেউ তাদেরকে কিছু বলার ক্ষেত্রে বাধ্য হয়, তবে সে যেন তার কথার ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক থাকে। এমন কথা বলবে না, যা তাদেরকে ক্রোধান্বিত করে। আবার মিথ্যা তোষামোদও করবে না।
আর তারা যদি কখনো নিজের থেকে আগ্রহ প্রকাশ করে বলে, ‘আমাকে কিছু নসিহত করুন’, এ জামানায় তাদের এ ধরনের কথায়ও ধোঁকায় পড়া যাবে না। এটা তাদের নিছক একটি কথার কথা। কারণ, এটাকে সত্য মনে করে নসিহতকারী যদি এমন কথা বলে ফেলে, যা তাদের মত ও উদ্দেশ্যের বিরোধী, তাহলে তারা এর প্রতিশোধ নিতে দেরি করবে না।
আর যে ব্যক্তি শাসকের সাথে কথা বলে, সে যেন প্রশাসনের অন্য ব্যক্তিদের সম্পর্কে তার নিকট কিছু না বলে। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে তার প্রাণনাশের চেষ্টা করতে পারে। কারণ, এতে সকলেই তখন ভাববে, তার কথা বুঝি শাসকের নিকট লাগিয়ে দিয়েছে।
মোটকথা- এই যুগে তাদের থেকে দূরে থাকাই সবচেয়ে কল্যাণকর। তাদের কোনো ওয়াজ-নসিহত না করাই সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু এরপরও যদি কেউ কিছু বলতে বাধ্য হয়, তবে খুবই সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে বলবে। তাদের বরং প্রধান কর্তব্য হবে সাধারণ মানুষদের নসিহত করা- যাতে তাদের ঈমান ও আমল সঠিক হয়। তাদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিমাপ

📄 মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিমাপ


কোনো ব্যক্তির কোনো বক্তৃতা বা মৌখিক কথা এবং তার বাহ্যিক আমল- নামাজ, রোজা দান ও নির্জনতা অবলম্বন তোমাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে। তার ব্যাপারে এতটুকুতেই আস্থার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ো না। বরং একজন মানুষের আমলের পরিমাণ নির্ণিত হবে দুটি মাধ্যমে-
এক. ফরজ বা আবশ্যক বিধানাবলির যথাযথ সংরক্ষণ। দুই. আমলের খুলুসিয়াত বা একনিষ্ঠতা।
নতুবা কত মানুষকে তো দেখি, বাহ্যিকভাবে ভালো আমল করে, কিন্তু আড়ালে ফরজ বিধানও তরক করে। বরং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে নাজায়েয বিষয়েও লিপ্ত হয়ে পড়ে। কত ধার্মিক মানুষের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, সে তার আমল দ্বারা দুনিয়া অন্বেষণ করছে। আজকের দিনে- কমবেশি অনেক মানুষের মধ্যেই এই রোগ দেখা দিয়েছে।
সুতরাং প্রকৃত ও সম্পূর্ণ মানুষ তো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত সীমানাগুলো লক্ষ করে চলে- তার ওপর আবশ্যকভাবে অর্পিত ফরজ বিধানগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করে। আর এর সাথে যে ব্যক্তির নিয়ত সুন্দর হয়, তার কথা ও কাজও একান্তভাবে শুধু আল্লাহ তাআলার জন্যই হয়ে থাকে। এর দ্বারা সে কোনো মানুষ বা পার্থিব স্বার্থের উদ্দেশ্য করে না এবং মানুষের থেকে সম্মান ও মর্যাদার প্রত্যাশাও করে না।
নতুবা এমন বহু বাহ্যিক ধার্মিক রয়েছে, তাকে যেন 'ধার্মিক বা আনুগত্যকারী' বলা হয়, এ জন্য সে লোক দেখানো ধর্ম পালন করে। কত লোক 'মুত্তাকি' উপাধি পাবার আশায় মৌনতা অবলম্বন করে। এবং 'জাহেদ বা দুনিয়াত্যাগী' উপাধি পাবার জন্য দুনিয়া ত্যাগের ভান করে।
কিন্তু একজন মুখলিস বা একনিষ্ঠ আমলকারী ব্যক্তির আলামত হলো, তার বাহ্যিকতা এবং নির্জনতা এক রকম হবে- বরং বাহ্যিকতার চেয়ে নির্জনতা হবে আরও বেশি আমলপূর্ণ। আরও বেশি ইবাদতপূর্ণ। মানুষের থেকে তার একান্ত আমলকে আড়ালে রাখতেই সে ভালোবাসে। এ কারণে বাহ্যিকতায় বরং সে কখনো কখনো একটু হাসি, একটু আনন্দপূর্ণ মেজাজে থাকবে; যাতে করে তার সাথে 'জাহেদ' উপাধি না লেগে যায়।
যেমন হজরত ইবনে সীরিন রহ. দিবসে মানুষের মাঝে হাসি-মজাকে থাকতেন, কিন্তু রাতের নির্জনতায় তার কান্না দেখলে মনে হতো- তাকে যেন জনপদবাসী হত্যা করে ফেলছে। এ কারণে আমলের ক্ষেত্রে কোনো মানুষ বা পার্থিবতার ইচ্ছা শরিক না হওয়া চাই। এটাতেই তার সফলতা ও শুভ পরিণام।
আর যে ব্যক্তি মানুষের প্রশংসা কিংবা পার্থিব কোনো স্বার্থ অর্জনের জন্য তার আমলকে প্রকাশ্যে দেখিয়ে বেড়ায়, এতে তার উদ্দেশ্য সফল হবে না। কারণ, মানুষের অন্তর তো তার হাতে, যার সাথে সে এই আমলকে শরিক করে ফেলছে। এ কারণে হয়তো তিনি মানুষের অন্তর তার দিকে না ঘুরিয়ে- তার বিপক্ষে ঘুরিয়ে দেবেন।
আর যে ব্যক্তি একনিষ্ঠতার সাথে গোপনে নির্জনে মানুষকে না দেখিয়েও আমল করে, লোকজনের অন্তর তার দিকেই ঝুঁকে যায়। লোকেরা তাকে ভালোবাসে—যদিও এই একনিষ্ঠ ব্যক্তি তাদের এইসব কার্যাবলির প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না। তাদের প্রশংসার প্রতি লালায়িত থাকে না। অন্যদিকে লোক দেখানো আমলকারীকে মানুষ শুধু অপছন্দই করে- আমল তার যতই বেশি দেখাক। এগুলো গ্রহণীয় নয়। এছাড়া একনিষ্ঠ ব্যক্তি ইলম ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সদা সচেষ্ট থাকে। ইলম অর্জনে কখনো পরিতৃপ্ত হয় না। যুগের সকল কল্যাণ যথাসম্ভব অর্জনের চেষ্টা করে। এবং আত্মিক উন্নতি থেকে নিজেকে বিরত রাখে না। মূলত সে তার সকল কর্ম ও ব্যস্ততার কেন্দ্রে রাখে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। লক্ষ রাখে তাঁর পছন্দ এবং অপছন্দ।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পরশ্রীকাতরতা মানুষের একটি জন্মগত স্বভাব

📄 পরশ্রীকাতরতা মানুষের একটি জন্মগত স্বভাব


সব জায়গায় দেখি, মানুষেরা পরশ্রীকাতরকে অনেক নিন্দা-মন্দ করে এবং খুবই খারাপ মনে করে। এবং তারা বলে, নিকৃষ্টতম মানুষই শুধু পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত হয়। সে এর মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামতের বিরোধিতা করে এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে না। এবং তার অপর মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ দেখতে পায় না।
আমি বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করলাম। দেখলাম, লোকজন যেভাবে বলে, প্রকৃত অর্থে বিষয়টা আসলে তেমন নয়। এখানে মূল বিষয় হলো মানুষের স্বভাব। মানুষের স্বভাব হলো, অন্য কেউ তার ওপরে উঠে যাক- এটা সে পছন্দ করে না কিংবা মেনে নিতে চায় না। সে যদি দেখে- তার কোনো বন্ধু তার চেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, এটা তার ওপর প্রভাব ফেলে এবং তার চেয়ে ওপরে উঠে যাওয়াটা সে পছন্দ করে উঠতে পারে না। সে বরং কামনা করে- সে নিজে যেখানে পৌঁছেছে, তার বন্ধু যেন সেখানে না পৌঁছায় কিংবা তার বন্ধু যা প্রাপ্ত হয়েছে, সে নিজেও যেন তা প্রাপ্ত হয়- যাতে তার বন্ধু যেন তার চেয়ে ওপরে উঠে না থাকতে পারে।
মাটি দ্বারা তৈরি মানুষের স্বভাবের মাঝে এই বিষয়টি একেবারে কাদা-মাটির মতোই মিশে আছে। আমি বলি, এটি কোনো দোষের বিষয় নয়। বরং দোষের বিষয় হলো- নিজের কথায় কিংবা কাজের মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটানো। অন্যের অনিষ্টের চেষ্টা করা। অন্যকে দমন করে নিজে উঁচুতে উঠতে চাওয়া।
নতুবা আমার নিজের মধ্যেও এই ঈর্ষার বিষয়টি রয়েছে। আমি আগে ভাবতাম, এটি বুঝি আমার কোনো গোপন রোগ ও নিম্নশ্রেণির মানসিকতা। কিন্তু পরবর্তীতে এ ব্যাপারে হজরত হাসান বসরি রহ. থেকে আমি একটি মন্তব্য পেয়ে যাই। তিনি বলেন, ليس من ولد آدم أحد إلا وقد خلق معه الحسد.... বনি আদমের এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যার সাথে ঈর্ষা নেই।
তাই মানুষের কর্তব্য হলো, কথা এবং কাজের মাধ্যমে এটাকে অতিক্রম করে যাওয়া। নিজের কল্যাণ সকলেই চাইবে, সেটাই কর্তব্য- কিন্তু অন্যের ক্ষতি করে নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00