📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সময়কে গালি দেওয়া

📄 সময়কে গালি দেওয়া


আমার চোখ মানুষের ওপর যতগুলো মসিবত আপতিত হতে দেখেছে, তার মধ্যে প্রধানতম মসিবত হলো, মানুষের সময়কে গালি দেওয়া, সময়ের ওপর দোষ চাপানো।
জাহেলি যুগে মানুষ এগুলো করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করতে নিষেধ করে বলেন,
لا تسبوا الدهر، فإن الله هو الدهر.
তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কারণ, সময় তো আল্লাহরই সৃষ্টি। ১০২
অর্থাৎ তোমরা হয়তো তাকে গালি দাও এই ভেবে যে, সময় তোমাদের ঐক্যকে বিনষ্ট করেছে। তোমাদের আত্মীয়-পরিজনের প্রাণ সংহার করেছে। আর এটাকে তোমরা সময়ের দিকে সম্বন্ধ করে থাকো। অথচ আল্লাহ তাআলাই এটা করে থাকেন। এখন সময়কে গালি দেওয়ার অর্থ আল্লাহ তাআলাকেই গালি দেওয়া!
কিন্তু আজকের অনেক ধর্মহীন ব্যক্তিও জাহেলি যুগের মানুষদের মতো এই কথাটি ব্যবহার করে। এমনকি- অনেক অভিজাত শিক্ষিত সাহিত্যিক ও মেধাবীরাও এটা করে থাকে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়—যুগ বা সময়কে গালি দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো ভালো অভিব্যক্তিই নেই। কিছু বলার নেই। আবার কখনো কখনো তারা আল্লাহকেই দুনিয়া [প্রকৃতি] বানিয়ে নেয়। তখন তারা এভাবে বলে যে, প্রকৃতি এটি করেছে- প্রকৃতি এটি সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতি এটি পছন্দ করে না। প্রকৃতির নিয়মই এমন... ইত্যাদি।
এমনকি যারা দাবি করে, তারা আলেম, প্রাজ্ঞ ফকিহ ও বুদ্ধিজীবী- তারাও দেখি এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হয় না!
এখন কথা হলো- 'সময়' বলে তাদের উদ্দেশ্য কী?
তারা যদি সময় বলতে 'সময়ের অতিক্রম বা কালের অতিবাহন' বোঝায়, তাহলে তো সময়কে দোষারোপ করে কিছু বলা সঠিক হয় না। কারণ, সময়ের নিজের তো কিছু করার নেই। কিছু করার ক্ষমতাও তার নেই। সে নিজে নিজে কিছুই করতে পারে না- তাকে বরং একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাহলে কি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি সময়ের দিকে কিছু আরোপ করতে পারে? পারে না।
তাহলে মানুষ তো এভাবে যুগের ওপর দোষারোপের মাধ্যমে ইসলাম থেকেই বের হয়ে যায়। কারণ, এই দোষারোপ সে প্রকৃত অর্থে এর স্রষ্টার ওপর করছে। এর মাধ্যমে সে কি আল্লাহর হিকমত-প্রজ্ঞার অসম্পূর্ণতা বোঝাতে চায়? যেমন ইবলিস তার ওপর হজরত আদম আলাইহিস সালামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানকে অযৌক্তিক ভেবেছিল।
আজকের দিনেও এমন অনেকেই করে থাকে। কিন্তু অন্তরের এই বক্রতার সাথে তাদের ইসলাম তাদের কোনো উপকার করতে সক্ষম হবে না। কোনো নামাজ-রোজাও কাজে আসবে না। আগে নিজের আকিদা বা বিশ্বাস বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। এরা তো বরং কাফিরদের চাইতেও অধম ও নিকৃষ্ট।

টিকাঃ
১০২. সহিহ মুসলিম: ১১/৪১৬৯, পৃষ্ঠা: ৩১৩ এবং মুসনাদে আহমদ: ১৮/৮৭৭৪, পৃষ্ঠা: ৩১৬- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 এই অতি সংক্ষিপ্ত জীবন

📄 এই অতি সংক্ষিপ্ত জীবন


আমি আমার নিজের ক্ষেত্রে এবং বহু মানুষের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ করে ভীষণ আশ্চর্য বোধ করি। বিষয়টা হলো, আমরা আমাদের জীবনের বর্তমান সময় নিয়ে কতটা অবহেলা ও উদাসীনতার মধ্যে থাকি- অথচ আমরা জানি, আমাদের জীবন কত সংক্ষিপ্ত... কত সংক্ষিপ্ত... কত সংক্ষিপ্ত।
আমরা সময় নষ্ট করি- যদিও আমরা জানি, ঠিক এখানে যে পরিমাণ আমল করা হবে, পরকালে সে পরিমাণই প্রতিদান দেওয়া হবে। তারপরও আমরা সময় নষ্ট করি।
বিষয়টা নিয়ে আমি খুবই আশ্চার্যান্বিত হই। আমাদের কাজ আমাদের জানার মতো নয়। আমাদের আমল আমাদের বিশ্বাসের অনুযায়ী নয়।
হে সংক্ষিপ্ততম জীবনের অধিকারী, তুমি তোমার আজকের দিনগুলোকেই কাজে লাগাও। যাত্রার প্রস্তুতি নাও। আর তোমার অন্তরকে এমন জিনিসের সাথে লাগিয়ে রেখো না- যাতে কোনো কল্যাণ নেই। তোমাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি- তুমি নিজেকে সেই কাজে নিমগ্ন রেখো না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আল্লাহর জিকির

📄 আল্লাহর জিকির


আমি একবার মানুষের ইবাদত নিয়ে চিন্তা করলাম। দেখলাম- তাদের অধিকাংশের ইবাদত আসলে আদত বা অভ্যাস। অর্থাৎ অভ্যাসের বশে শুধু করে যাওয়া।
হ্যাঁ, যারা সচেতন এবং সজাগ, তাদের অভ্যাসগুলোও অবশ্য প্রকৃত ইবাদত। কারণ, ইবাদতকে তারা অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছেন।
কিন্তু যারা উদাসীন- তারা হয়তো অভ্যাসের বশে মুখে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে। কিন্তু তাতে তার কোনো প্রভাব ও চিন্তা থাকে না। নিছক শুধু উচ্চারণ।
কিন্তু যিনি সচেতন, জগতের এই বিস্ময়কর যত সৃষ্টি, স্রষ্টার মহত্ব- এই সব চিন্তা ও ভাবনা তার মাথার মধ্যে থাকে আর এটিই তাকে আন্দোলিত করে তোলে এবং তার মুখ থেকে বের হয়- সুবহানাল্লাহ!
এভাবে একজন মানুষ যদি একটি আনার বা ডালিম নিয়ে চিন্তা করে, তার থরে থরে সাজানো দানাগুলো নিয়ে চিন্তা করে- কী চমৎকারভাবেই না তাকে তার খোসা দিয়ে আচ্ছাদন করে নিরাপদ রাখা হয়েছে, যাতে বিনষ্ট না হয়। দানার মধ্যে কেমন রস দিয়ে দিয়েছেন এবং সেখানে দিয়ে দিয়েছেন পাতলা আবরণ!
কীভাবে ডিমের উদরে পাখির কত বিচিত্র রঙ ও আকার-আকৃতি তৈরি করেন তিনি। মায়ের উদরে কী বিস্ময়করভাবেই না মানবশিশু একে একে বেড়ে ওঠে। এমন আরও কত কী! বিশ্বজুড়ে কত সৃষ্টির কত বাহার!
এসকল চিন্তা-ভাবনা তার অন্তরের মধ্যে স্রষ্টার মহত্ব ও বড়ত্ব তুলে ধরে আর সে বলে ওঠে- সুবহানাল্লাহ... আল্লাহু আকবার! এই জিকিরটাই হলো চিন্তা দ্বারা উৎসারিত জিকির। এটাই হলো সচেতন মানুষের প্রকৃত জিকির ও ইবাদত।
এভাবে তারা গোনাহের ভয়াবহতা ও তার পরিণাম সম্পর্কেও চিন্তা করে এবং চিন্তিত হয়। এদিকে আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও পরাক্রমশীলতাও তাদের চিন্তায় রয়েছে। এ কারণে তারা তাদের গোনাহের ব্যাপারে বিচলিত বোধ করে। নিজের নফসকে অবনমিত করে এবং মুখে উচ্চারণ করে- আসতাগফিরুল্লাহ... আতুবু ইলাইহি... আসতাগফিরুল্লাহ...।
এটাই হলো প্রকৃত জিকির ও ইস্তিগফার। নতুবা উদাসীন ব্যক্তিরা শুধু অভ্যাসের বশে মুখে যা কিছু উচ্চারণ করে, এটা জিকিরও নয়, ইস্তিগফারও নয়- ইবাদত তো নয়-ই। এটা নিতান্তই একটি অভ্যাস।
আদত ও ইবাদতের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সার্বক্ষণিক সচেতনতা

📄 সার্বক্ষণিক সচেতনতা


একজন মুমিনের সার্বক্ষণিক চিন্তা থাকে আখেরাত নিয়ে। সুতরাং দুনিয়াতে যেখানেই সে যা কিছু দেখে- তার মধ্যেই সে আখেরাতের স্মরণ ও শিক্ষা অর্জন করে।
এটাই নিয়ম- যে ব্যক্তি যেটা নিয়ে আগ্রহী ও আকর্ষণ বোধ করে, যেকোনো জিনিসের মধ্যে সে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে খুঁজে বের করে। যেমন দুনিয়ার কোনো নতুন নির্মিত ঘরে যদি বিভিন্ন ধরনের কর্ম-আকর্ষণের লোক যায়, তখন সকলেই তার নিজের আকর্ষিত জিনিসের দিকেই বেশি মনোযোগ প্রদান করে। যেমন, একজন কাপড় ব্যবসায়ী ঘরের বিছানাপত্র, কাপড় ইত্যাদির দিকে লক্ষ করবে এবং মনে মনে এগুলোর একটা দামও অঙ্কন করে নেবে।
এভাবে একজন কাঠমিস্ত্রী তাকাবে কাঠের তৈরি ছাদের দিকে। এবং খুঁটে খুঁটে কাজগুলো পরখ করে এর একটি মান নির্ণয়ের চেষ্টা করবে। আর একজন রাজমিস্ত্রী তাকাবে দেয়ালের দিকে- এর গাঁথুনি ও ধরনের দিকে। একইভাবে একজন বয়নশিল্পী দেখবে বোনা কাপড়গুলো এবং দেখবে সেগুলোর কারুকাজ।
এভাবে একজন মুমিন যখন কোনো অন্ধকার দেখে, তখন তার কবরের অন্ধকারের কথা স্মরণ আসে। যখন কোনো বেদনার্ত ব্যক্তিকে দেখে, তখন তার পরকালের শাস্তির কথা মনে আসে। কোনো ভীতিপ্রদ আওয়াজ বা শব্দ শুনলে, তার কিয়ামতের শিঙার আওয়াজের কথা মনে পড়ে। ঘুমন্ত মানুষকে দেখলে তার মৃত্যুর কথা স্মরণে আসে। আবার যখন কোনো সুখ ও আনন্দের বিষয় সে দেখে, তখন তার মনে চলে আসে জান্নাতের সুখ-শান্তির কথা।
প্রতিটি নিয়ামত দেখে তার জান্নাতের নিয়ামতের কথা মনে হয়। বিশেষকরে তার অন্তরের মধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জান্নাতের সেই চিরন্তন সুখ ও আনন্দের কথা- যা কখনো নিঃশেষ হবে না। যা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। সেখানে কোনো কষ্ট নেই। কোনো দুঃখ নেই। না-পাওয়ার কোনো হাহাকার নেই। শুধুই শান্তি আর শান্তি। সুখ আর সুখ।
জান্নাতের এই অনন্ত শান্তির কথায় তার অন্তর আশান্বিত ও উজ্জীবিত হয়। আর এগুলোর আশাতেই দুনিয়ার কোনো কষ্ট ও দুঃখ, কোনো বঞ্চনা কিংবা প্রিয়জনের মৃত্যু কিছুই তাকে কাবু করতে পারে না। আখেরাতের সীমাহীন সুখের তুলনায় সাময়িক এই কষ্টকে তার খুবই সামান্য মনে হয়।
কাবার দর্শনসুখে রমলের কষ্ট কি কেউ গায়ে মাখে! যেমন সুস্থতার প্রত্যাশায় ওষুধের তিক্ততা কেউ ধর্তব্যেই আনে না।
এভাবে একজন মুমিন বুঝতে পারে, এখানে বীজ বপনের পরিমাণ অনুযায়ী পরকালে ফসল উত্তোলন করা সম্ভব হবে। তাই সে আমলের সবচেয়ে ভালো বীজগুলো বপন করতে থাকে। অলসতা করে না। কারণ, জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত।
এভাবে একজন মুমিন ব্যক্তি আখেরাতের শান্তি ও আজাবের কথাও ভাবে। তখন তার দুনিয়ার জীবনের সুখ-আহ্লাদ বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তার চিন্তা ও পেরেশানি বাড়তে থাকে। তখন সে দুনিয়া এবং তার মাঝের সকল কিছু থেকেই নিজেকে নিরাসক্ত করে তোলে। কারণ, এখানে সে তো চিরদিন থাকতে পারবে না- থাকা সম্ভব নয়। এটি থাকার জায়গা নয়।
এভাবে একজন মুমিন ব্যক্তির দুটি অবস্থা হয়। একবার সে জান্নাতের অন্তহীন সুখের কল্পনায় আন্দোলিত হয়। আবার জাহান্নামের শাস্তির ভয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তার মধ্যে দুটি বিষয়ই সমানভাবে কাজ করে।
আর তার বাস্তব জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো হয়তো কিছুটা ঢিলামি এসে পড়ে- অন্যের মৃত্যু দেখেও নিজেকে নিরাপদ মনে করে। আবার কখনো কখনো কবরের চিন্তায় যখন নিমগ্ন হয়, তখন আখেরাতের প্রতি ধাবিত হয়ে পড়ে। এবং ভাবে- দুনিয়া নয়, আখেরাতই হলো একমাত্র শান্তি ও সুখের জায়গা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সার্বক্ষণিক সচেতনতা দান করুন; যাতে আমরা ভালো কাজের দিকে ধাবিত হতে পারি এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারি। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00