📄 জালেমদের সহযোগী হয়ো না
তুমি অনেক আলেম ও বক্তাকে দেখতে পাবে- তারা তাদের পার্থিব অসচ্ছলতার কারণে সুলতানদের তোষামোদ করে বেড়ায়; যাতে করে তারা তাদের থেকে সম্পদ প্রাপ্ত হতে পারে। অথচ তারা জানে, সুলতানরা সাধারণত বৈধভাবে সম্পদ অর্জন করে না। এবং অর্জিত সম্পদও যথাযথ জায়গায় খরচ করে না। তাদের অধিকাংশেরই অভ্যাস এমন—রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে খারাজ (ভূমিকর) ও সম্পদ আহৃত হয়, যেগুলো সঠিক ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা উচিত ছিল—তারা হয়তো একেবারেই নিজের খেয়ালের বশে কোনো কবিকে দিয়ে দিলো। কোনো চাটুকারকে দিয়ে দিলো। নিজের বিলাসিতায় খরচ করল। কিংবা তার সাথে যে সৈনিকবাহিনী থাকে, তাদের মাসিক বেতন হয়তো দশ দিনার। কিন্তু হঠাৎ কারও প্রতি খুশিতে দশ হাজার দিনার দিয়ে দিলো। কখনো কখনো লড়াইয়েও তারা অবতীর্ণ হয়—সেখান থেকে যে সম্পদ অর্জন হয়, তা সৈনিকদের মাঝে বণ্টন না করে হয়তো নিজের জন্যই রেখে দিলো।
আর বাস্তব কার্যাবলির ক্ষেত্রে যে সকল জুলুম ও অনিয়ম সংঘটিত হয়—তার ফিরিস্তি তো অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত।
এ কারণে একজন আলেম যখন এ ধরনের সুলতানদের সান্নিধ্যে আসে—তখন সে তার ইলমকে বিসর্জন দিয়েই আসে। তার জ্ঞাত ইলমের ওপর তখন সে আর আমল করতে সক্ষম হয় না। যেমন, একবার এক সৎ ব্যক্তি একজন আলেমকে ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বারমাকির এর প্রাসাদ থেকে বের হতে দেখে বললেন, হায়, আল্লাহর নিকট এমন ইলম থেকে আশ্রয় চাই—যে ইলম কার্যক্ষেত্রে কোনো উপকার করে না।
এমন আলেমের জন্য সেখানে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যেমন, সে অনেক অপছন্দনীয় জিনিস ও অবৈধ বিষয় দেখে, কিন্তু নিষেধ করতে পারে না। আর তাদের সাধারণ হারাম খাবারের মাধ্যমে অন্তরে অন্ধকারের সৃষ্টি হয়। আলো চলে যায়। তখন আর আল্লাহ তাআলার সাথে একান্তে ইবাদতের মজা ও স্বাদ থাকে না। তার দ্বারা কারও হেদায়েত নসিব হয় না।
বরং উল্টো তার এই আচরণ মানুষের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লোকজন তাদের অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকে। এভাবে সে নিজের ক্ষতি করে। সুলতানকেও সুযোগ করে দেয়। সুলতান তখন বলতে সুযোগ পায়- আমি যদি সঠিকতার ওপর না থাকতাম, তবে অমুক আলেম আমার সান্নিধ্যে আসত না। আমার কোনো কাজে তো সে অপছন্দনীয়তা প্রকাশ করে না।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল। কুড়ানো দ্রব্য দিয়েও তিনি অনেক সময় আহার সমাধা করেছেন। কিন্তু কখনো কোনো সুলতানের প্রদান করা টাকা তিনি গ্রহণ করেননি। হজরত ইবরাহিম আল হারবি রহ. সামান্য লতাপাতা-শাক সবজি খেয়ে জীবনধারণ করেছেন। তবুও তিনি খলিফা মুতাসিমের হাজার দিনার ফিরিয়ে দিয়েছেন। হজরত বিশর হাফি রহ. একবার প্রচণ্ড ক্ষুধায় আক্রান্ত হলেন। কেউ একজন তাকে বলল, আপনার জন্য কি হালকা কোনো ঝোল তরকারি এনে দেবো? তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, আমি ভয় পাই- আল্লাহ যদি আমাকে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করেন, এই সুস্বাদু পাতলা ঝোল তোমার কোথা থেকে এলো, যাচাই করেছ কি?
এভাবে বহু প্রত্যয়ী, সুদৃঢ় চরিত্রের পূর্বসূরির ঘটনা আমাদের সামনে উপস্থিত রয়েছে। তাদের নিকট ধৈর্যধারণ ছিল নিতান্তই ঘুমের মতো- অপরিহার্য। এটাকে তারা মোটেও কষ্টকর মনে করতেন না। বরং কষ্টকর মনে করতেন হারাম ভক্ষণকে।
কিন্তু যারা হারাম ও বাছবিচারহীনতার মধ্যে নিজেদের ভাসিয়ে দেয়- অবশেষে একসময় তাদেরও তো আস্বাদনের সময় শেষ হয়। শরীর বিনষ্ট হয়। কবরেই যেতে হয় অবশেষে। কিন্তু মাঝখান থেকে নিজের দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কত বড় প্রতারক জীবনের এই ব্যবসা!
যার মধ্যে সামান্যতম বোধ ও বুঝ রয়েছে- তাকে এবার বলি, ধৈর্য ও অল্পেতুষ্টির সাথে জীবন ধারণ করো। কারও পার্থিব সচ্ছলতা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। কারণ, তুমি যখন এই বিশাল সচ্ছলতা সম্পর্কে চিন্তা করবে, দেখবে, সেখানে আখেরাতের দরজা সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তাই অন্তরকে কোনোভাবেই কোনো ব্যাখ্যার পেছনে ফেলো না। দুনিয়ায় তোমার জীবনের মেয়াদ কতই না অল্প স্বল্প এবং ক্ষণস্থায়ী! একটু সয়ে নাও না!
জনৈক কবি বলেন,
وسواء إذا انقضى يوم كسرى ... في سرور ويوم صابر كسره
যেদিন নিঃশেষ হয় সম্রাটের আনন্দের দিনগুলো এবং এদিকে শেষ হয় ধৈর্যশীলের কষ্টের দিনগুলো- তখন সকলেই সমান।
কিন্তু ধৈর্যের স্বল্পতার কারণে নফস যখন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন তুমি তাকে দুনিয়াত্যাগী বিভিন্ন ব্যক্তির ঘটনাবলি শোনাও। তার মধ্যে যদি সামান্যতম বোধ, চিন্তা ও জাগরণ থাকে, তবে সে অবশ্যই এগুলোর মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করবে। হারামের দিকে হাত বাড়াতে লজ্জাবোধ করবে এবং অবনত হবে।
একবার চিন্তা করে দেখো সেই বিখ্যাত ঘটনার কথা- আলি ইবনে মাদিনি নিজেকে সহজতার মধ্যে ফেলে ইবনে আবু দাউদের থেকে সম্পদ গ্রহণ করলেন আর হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. গ্রহণ করলেন ধৈর্য ও দীনতা। আজ এতদিন পরও তাদের বিষয়টা চিন্তা করে দেখো- তাদেরকে আজ কীভাবে স্মরণ করা হয়। সমসাময়িক দু-জন ব্যক্তির একজন কোথায় উঠে গেছেন আর অপরজন কোথায় নেমে গেছেন! একজন ধৈর্যধারণ করেছেন- অন্যজন সহজতা গ্রহণ করেছেন। শীঘ্রই ইবনুল মাদিনি লজ্জিত হবেন, যখন ইমাম আহমদ রহ. বলবেন, 'আমার জন্য আমার দ্বীন নিরাপদ হয়েছিল'।
📄 তাকওয়া সফলতার চাবিকাঠি
কারও যদি অনেক সন্তান থাকে আর উপার্জন হয় অল্প, তাহলে তার জন্য নিজের দ্বীন হেফাজত করা খুবই কষ্টকর। এই ব্যক্তির অবস্থা হয় সেই স্রোতধর পানির মতো, যার মুখ আটকে দেওয়া হয়েছে। পানি তখন ভেতরে ভেতরে ফুলতে থাকে, বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে যখন আর আটকে থাকতে পারে না, তখন প্রবল বেগে সব ভেঙেচুরে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
অল্প আয়- কিন্তু বড় পরিবারের ব্যক্তির অবস্থা ঠিক এমন। চারদিক থেকে যখন অর্থের চাহিদা আসতে থাকে, তখন সে ভেতরে ভেতরে বিভিন্ন ধরনের পথ, পদ্ধতি ও কৌশল খুঁজতে থাকে। প্রয়োজন বাড়তেই থাকে। হালাল বিষয়ের ওপর যখন আর সম্ভব হয় না, তখন সে সন্দেহপূর্ণ উপার্জনের দিকে ধাবিত হয়। আর যদি নিজের দ্বীনের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা না থাকে, তখন সে শরিয়তের বিধানাবলি সব ছেড়েছুড়ে সরাসরি হারামের মধ্যেই প্রবেশ করে যায়।
কিন্তু একজন মুমিন যখন তার উপার্জনের স্বল্পতা সম্পর্কে অবহিত থাকে, তখন সে বিয়ে থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে। আর যদি বিবাহিত হয় এবং সন্তান থাকে, তখন সে স্বল্প খরচ করার চেষ্টা করে। অল্পে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। এভাবেই সে তার দ্বীনের হেফাজত করে।
কিন্তু যে সকল ব্যক্তির বাহ্যিক কোনো উপার্জনের মাধ্যম নেই- যেমন আলেম ও জাহেদগণ- তাদের দ্বীনের হেফাজত করা খুবই কঠিন। কারণ, হয়তো সুলতানরা তাদের থেকে বিমুখ হতে পারে। কিংবা সাধারণ ধনবান ব্যক্তিরাও তাদের প্রতি লক্ষ না-ও রাখতে পারে। এই অবস্থায় যদি তাদের অনেক বড় সংসার থাকে, তাহলে একজন মূর্খ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে অকল্যাণের ভয় করা হয়, তার ক্ষেত্রেও সেই ভয় থেকে নিরাপদ থাকা যায় না। হ্যাঁ, তাদের মধ্যে যদি কেউ লেখালেখি, অনুলিপি, প্রতিলিপি কিংবা নিজেদের সাথে উপযুক্ত কোনো কাজের মাধ্যমে উপার্জন করতে সক্ষম হয়- তাহলে সে যেন তা-ই করে এবং স্বল্প খরচ এবং অল্প উপার্জনে তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। নতুবা কেউ যদি নিজেকে ঢিল দিয়ে রাখে, বিলাসিতা করতে চায়- তাহলে নিশ্চিত সে হারামের মধ্যে আপতিত হয়ে পড়বে। তার এই ইলম ও জুহুদের পোশাক দেখিয়ে সে হারাম ও অন্ধকার ভক্ষণ করতে থাকবে।
তাদের মধ্যে কারও যদি কোনো সম্পদ থাকে, তাহলে সে যেন তা বাড়ানোর চেষ্টা করে এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে। কারণ, এখন আর কোনো সহানুভূতিশীল ব্যক্তিত্ব নেই। সুন্দরভাবে করজ দেবে- এমন ব্যক্তিও নেই। আজ অধিকাংশ মানুষ- বরং প্রতিটি মানুষই যেন সম্পদের পূজারী হয়ে উঠেছে। আজকের অবস্থা এই যে- যে ব্যক্তি তার নিজের সম্পদ হেফাজত করবে, সে তার দ্বীনকে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে। সে যেন সেই মূর্খদের কথায় কান না দেয়, যারা মানুষের সকল সম্পদ খরচ করে ফেলার নির্দেশ দেয়। এটা সেই সুময় নয়। জেনে রেখো, মন যদি স্থির না থাকে, তাহলে ইলম, আমল কিছুই হতে চায় না। এমনকি আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্ব নিয়ে নীরবে চিন্তায় নিমগ্ন হওয়ারও ফুরসত হয় না। তাই আর্থিক চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে স্থির মন থাকা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
আমাদের পূর্বে যারা ছিলেন, তাদের মন স্থির থাকার কয়েকটি মাধ্যম ছিল। যেমন, তাদের অধিকাংশ 'বাইতুল মাল' বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বাৎসরিক ভাতা পেতেন। এগুলো দিয়ে তাদের চলে যেত- এমনকি বেঁচে যেত। তারা খুবই অল্প খরচ করতেন।
আর কারও নিজস্ব ব্যবসা ছিল- ব্যবসার মাধ্যমে নিজের প্রয়োজন মেটাতেন। যেমন হজরত সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ., সুফিয়ান সাওরি রহ., আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.।
হজরত সুফিয়ান সাওরি সম্পদের দিকে লক্ষ করে বলতেন, لولاك لتمندلوا بي !! তুমি যদি আমার কাছে না থাকতে, তাহলে মানুষরা আমাকে রুমালের মতো ব্যবহার করে ছাড়ত!
একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. এর কিছু সম্পদ হারিয়ে গেল। তিনি কান্না শুরু করলেন। লোকেরা বলল, এটা নিয়ে আপনার মতো একজন মানুষ কান্না করছেন! তিনি উত্তরে বললেন, هو قوام ديني. এটা ছিল আমার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখার মাধ্যম।
আর একটি বিষয় হলো, তখন এমন অনেক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন, যারা তাদের পরিচিত আলেম-জাহেদদের আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন। কখনো খোঁটা দিতেন না। তাদেরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারেরও চেষ্টা করতেন না। এটা হতো একেবারেই নিছক আল্লাহ তাআলার জন্য। আল্লাহর জন্য ভালোবাসার কারণে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. নিজেও ফুজাইল ইবনে ইয়াজ এবং অন্যদের আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন। হজরত লাইস ইবনে সাদ রহ. বড়দেরকে খুঁজে খুঁজে অর্থ প্রদান করতেন। তিনি মালেক রহ.-কে প্রতি বছর একহাজার দিনার দিতেন। ইবনে লাহিয়া রহ.-কে দিতেন আরও একহাজার দিনার। মানসুর ইবনে আম্মার রহ.ও একহাজার দিনার করে দান করতেন। এমন আরও অনেকেই ছিল সে সময়ে।
সময় এভাবেই চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টা দুনিয়া থেকে যেন বিলুপ্তই হতে বসেছে। এখন সুলতানরাও কম প্রদান করে। সাধারণ মানুষদের মধ্যেও নিঃস্বার্থ সাহায্য করার লোক কমে গেছে। তবুও এভাবেও কিছুদিন চলেছে।
এরপর এসেছে আমাদের যুগ। এ যুগে তো মানুষের হাত একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি সাধারণ তো দূরের কথা, অপরিহার্য জাকাত প্রদানের মানুষও কমে গেছে। তাহলে এখন আলেম ও জাহেদদের যদি বিভিন্ন প্রকার উপার্জনের জন্য সময় ব্যয় করতে হয়, তাহলে তারা নিজেদের ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে মনস্থির ও একাগ্র রাখবে কীভাবে? যেকোনো ধরনের শ্রমও তো তাদের জন্য উপযুক্ত নয়। এটা তারা পারবেও না। হয়তো এই বিষয়টির কারণে অনেক আলেম এখন সুলতানদের তোষামোদ করতে শুরু করেছে। তাদের জন্য যা সমুচিত নয়, তেমন বিষয়গুলোর দিকে নিজেদের ঠেলে দিয়েছে। আর জাহেদ ব্যক্তিরাও দুনিয়া অর্জনের বিভিন্ন ধরনের লৌকিকতার আশ্রয় নিয়েছে। লোকদেখানো কৌশল অবলম্বন শুরু করেছে।
হে ওই ব্যক্তি যে নিজের দ্বীনকে সংরক্ষণ করতে চাও, এগুলো থেকে বিরত থাকো। এ কথাটি আমি বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। উপার্জন থেকে বিমুখ হয়ে খুব বেশি দুনিয়াবিমুখতা দেখাতে যেয়ো না। আর যথাসম্ভব অন্যদের সংস্রব থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। তোমার হাতে যদি একটি দিরহামও আসে, সেটা তুমি তোমার প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষণ করো। জেনে রেখো, এটা তোমার দ্বীন।
যে কথাগুলো বললাম, সেগুলো বোঝার চেষ্টা করো। আর নফস যদি খুব বেশি অস্থিরতা প্রকাশ করে, তবে তাকে বলো, যদি তোমার নিকট সামান্যতমও ঈমান থাকে, তাহলে তুমি ধৈর্যধারণ করো। আর যদি তুমি এমন জিনিস অর্জন করতে চাও, যা তোমার দ্বীনকে ধ্বংস করে দেবে, তাহলে আর তোমাকে উপকার করার ক্ষমতা রাখে কে?
যে সকল আলেম ও জাহেদ অবৈধভাবে সম্পদ উপার্জন করে, আমার ধারণায় তাদের দ্বীন এবং দুনিয়া দুটোই বিনষ্ট হয়। আর যারা সত্য ও সততার পথে অটল থাকে—তাদের দ্বীন সংরক্ষিত থাকে এবং যুগের পর যুগ অতিবাহিত হয়ে যায়, তবুও তাদের সুনাম ও সুখ্যাতির কথা টিকে থাকে। অবশেষে আমরা আল্লাহ তাআলার এই মহান বাণীর কথা স্মরণ করতে পারি— তিনি ইরশাদ করেন—
﴿وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ
যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন। এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। যে-কেউ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার (কর্ম সম্পাদনের) জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার কাজ পূরণ করেই থাকেন।
[সূরা তালাক : ২-৩]
আর জেনে রেখো, বিপদ-আপদের ওপর ধৈর্যধারণ না করার কারণে কখনো কখনো রিজিক সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু সুন্দর ও যথার্থ ধৈর্যধারণের পরিণাম সুন্দর ও যথেষ্টই হয়ে থাকে।
📄 জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি
একবার একলোক আমার নিকট তার কিছু সমস্যার কথা বলল। সে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে খুবই অপছন্দ করি। তবে কয়েকটি কারণে তার থেকে আলাদাও হয়ে যেতে পারছি না। কারণ, আমার ওপর তার অনেক অনুগ্রহ রয়েছে। অনেক কল্যাণ সে আমার করে। কিন্তু আমার ধৈর্য খুবই কম। বিভিন্ন কষ্টদায়ক অনুচিত কথা আমার মুখ থেকে বের হয়ে যায়। এসব কথা দ্বারা তার প্রতি আমার অপছন্দের কথাও সে বুঝতে পারে। কিন্তু আমি কী করব? আমি যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না! তাকে তো সহ্যই করতে পারি না!
আমি তাকে বললাম, এমন করে তো কোনো লাভ হবে না। আসল কাজ করতে হবে। সেটা হলো, তুমি একান্তে বসে নিজে নিজে চিন্তা করে দেখো- তাহলে বুঝবে, তাকে হয়তো তোমার কোনো গোনাহের কারণে তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তুমি বেশি বেশি আল্লাহর নিকট আকুতি-মিনতি করো এবং তাওবা করো। স্ত্রীর প্রতি অনীহা, ক্রোধ দেখানো কিংবা তাকে কষ্ট প্রদানের মধ্যে কোনো কল্যাণ হবে না। আগে নিজের গোনাহের কথা ভাবো।
যেমন হজরত হাসান ইবনে হাজ্জাজ রহ. বলেন,
عقوبة من الله لكم فلا تقابلوا عقوبته بالسيف وقابلوها بالاستغفار.
এটা হলো তোমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি। তাই আল্লাহর শাস্তিকে তরবারি দিয়ে প্রতিহত করতে যেয়ো না। তাকে বরং তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে দূর করো।
জেনে রেখো, তুমি একটি পরীক্ষার মধ্যে আছ। এখানে যদি তুমি ধৈর্যধারণ করো, তাহলে এর সওয়াব তুমি নিশ্চয়ই পাবে। এর মধ্যেই তোমার কল্যাণ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন-
(وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ)
আর এটাও সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে অপছন্দ করো, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক। [সুরা বাকারা: ২১৬]
তাই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যা সংঘটিত হয়েছে, তুমি তার ওপর ধৈর্যধারণ করো এবং মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার নিকট দুআ করতে থাকো।
এভাবে তুমি যদি আল্লাহর নিকট নিজের গোনাহের জন্য তাওবা করো, আপতিত বিষয়ের ওপর ধৈর্যধারণ করো এবং তা থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করো- তাহলে তোমার এতে তিন প্রকারের ইবাদত সম্পন্ন হবে। এবং এর প্রতিটির জন্য তোমাকে প্রতিদান দেওয়া হবে। সুতরাং তুমি অযথা এমন বিষয়ে কালক্ষেপণ করো না- যা তোমার কোনো উপকার করবে না। তাছাড়া তিনি তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তুমি তা নিজে প্রতিহত করতে পারবে- এমনটি ধারণা করাও জায়েয নয়।
এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা নিজে ইরশাদ করছেন-
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ
আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দান করেন, তবে স্বয়ং তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। [সুরা আনআম: ১৭]
একবার এক সৈনিক আবু ইয়াজিদ রহ.-এর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সৈনিকটির হাবভাব ভালো নয়। আবু ইয়াজিদ রহ. ঘর থেকে বের হয়ে এটা দেখলেন। তিনি দ্রুত একলোককে ডেকে বললেন, তুমি দ্রুত অমুক স্থানে যাও এবং সেখানকার মাটি লেপে মুছে দাও। এই মাটির ক্ষেত্রে আমার কিছুটা সন্দেহ আছে।
আমি এবার লোকটিকে বললাম, সুতরাং তোমার ক্ষেত্রেও তা-ই। মেয়েটির তো কোনো দোষ নেই। তাকে কষ্ট দিয়েও কোনো লাভ নেই। তাকে বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কর্মের কারণে তোমার ওপর আপতিত করা হয়েছে। সুতরাং সমস্যা যেখানে- সমাধান করতে হবে সেখানে।
আমাদের পূর্বসূরিদের একব্যক্তি থেকে বর্ণনা রয়েছে। একবার একলোক তাকে গালি দিলো। তিনি ঘরে এসে নিজের গাল মাটির ওপর রেখে কেঁদে কেঁদে আল্লাহ তাআলার নিকট বলতে লাগলেন-
اللهم اغفر لي الذنب الذي سلطت هذا به علي.
-হে আল্লাহ, তুমি আমার যে গোনাহের কারণে এ লোককে আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছ, তুমি আমার সে গোনাহ মাফ করে দাও।
লোকটি আমাকে আরও বলল, আমার এই স্ত্রী আমাকে সীমাহীন ভালোবাসে। আমার অনেক খেদমত করে। আমার প্রতি প্রচুর যত্ন নেয়। কিন্তু তার প্রতি আমার অপছন্দনীয়তা যেন আমার স্বভাবের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কিছুতেই আমি তাকে ভালোবেসে উঠতে পারি না।'
আমি তাকে বললাম, এখানে হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা হলো, তার ক্ষেত্রে তুমি ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয়ই তোমাকে এর জন্য সওয়াব দেওয়া হবে। একটি ঘটনা বলি শোনো- একবার আবু উসমান নিশাপুরী রহ.-কে বলা হলো, আপনি যে এত আমল করেন, আপনার নিকট সবচেয়ে আশাপ্রদ আমল কোনটি মনে হয়?
আবু উসমান নিশাপুরী রহ. বললেন, আমার একটি আমলের উত্তম পুরস্কারের আশা আমি করি। সেটা হলো, আমার তখন অল্প বয়স। তারুণ্য জেগে উঠছে মাত্র। পরিবার থেকে প্রায় তাগাদা আসছে, আমি যেন বিয়ে করি। কিন্তু আমি তাতে রাজি হই না। আমার ইচ্ছা দেখেশুনে একটি সুন্দর মেয়েকে বিয়ে করব।
এরমধ্যে একদিন একটি পর্দাবৃতা মেয়ে আমার নিকট এসে বলল, 'হে আবু উসমান, আমি নিজেকে আপনার জন্য উৎসর্গ করছি। আমার প্রার্থনা- আল্লাহর দিকে চেয়ে আপনি আমাকে বিয়ে করে নেবেন।'
আমি মেয়েটির কথায় রাজি হয়ে গেলাম। তার বাবাকে উপস্থিত করলাম। তিনি ছিলেন খুবই দরিদ্র একজন ব্যক্তি। তিনি তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমার বিয়ে করাতে তিনি খুব আশ্চর্য হলেন এবং খুব খুশিও হলেন।
বিয়ের পর মেয়েটি যখন পর্দা ছাড়া আমার ঘরে এলো, আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার একটি চোখ অন্ধ, একটি পা খোঁড়া এবং দেখতে মোটেও সুন্দর নয়। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মনে হলো, আমি তখনই সেখান থেকে বের হয়ে আসি। কিন্তু মেয়েটির প্রচণ্ড ভালোবাসার কথা স্মরণ করে আমি তা করলাম না। আমি তার অন্তরকে ভেঙে না পড়ার জন্যে বসেই থাকলাম। কোনোভাবেই তার নিকট আমি আমার অপছন্দের কথা প্রকাশ করলাম না। অথচ ভেতরে ভেতরে আমি রাগে ক্ষোভে অপছন্দে একটি শক্ত পাথরের মতো হয়ে ছিলাম।
জীবন চলতে থাকল। আমি আমার থেকে যথাসাধ্য তাকে খুশি রাখার চেষ্টা করে গেছি। এভাবেই দীর্ঘ ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। এরপর একদিন মেয়েটি মারা গেল। আমি আমার জীবনের তেমন কোনো আমলের কথা না বললেও আমি মেয়েটির অন্তরকে তুষ্ট রাখার জন্য যেভাবে চেষ্টা করে গেছি, ধৈর্যধারণ করেছি- এটাই আমি আমার নাজাতের জন্য সবচেয়ে আশাপূর্ণ আমল হিসেবে মনে করি।'
আমি ঘটনাটি উল্লেখ করে লোকটিকে বললাম, এই হলো প্রকৃত পুরুষদের কাজ। সুদৃঢ় চরিত্রের মহান নিদর্শন। আর তাছাড়া সমস্যাকবলিত ব্যক্তির অযথা ক্রোধ ও অপছন্দনীয়তা প্রকাশ করেই বা কী লাভ! তাতে কোনো কল্যাণ নেই। কল্যাণ তাতেই, যা আমি উল্লেখ করলাম- নিজের গোনাহের জন্য তাওবা করতে হবে, উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং এর থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করতে হবে। এরপর যদি অবস্থা স্বাভাবিক হয় তাহলে তো হলোই- নতুবা তোমার এই ধৈর্যধারণ এবং প্রতিপালকের সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকাও ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
আর তোমার কর্তব্য হবে, অন্তরে তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে যেমন অবস্থাই হোক, প্রকাশ্যে তার জন্য ভালোবাসা দেখিয়ে চলা। কারণ, সে তো তোমার গোনাহের কারণে তোমার ওপর অবতারিত। সুতরাং তাকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। বরং ঠিক যে কারণে এটা হয়েছে, সেই অবস্থা সংশোধনের জন্য প্রচেষ্টা করো। এটাই শেষকথা। আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন।
📄 সময়কে গালি দেওয়া
আমার চোখ মানুষের ওপর যতগুলো মসিবত আপতিত হতে দেখেছে, তার মধ্যে প্রধানতম মসিবত হলো, মানুষের সময়কে গালি দেওয়া, সময়ের ওপর দোষ চাপানো।
জাহেলি যুগে মানুষ এগুলো করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করতে নিষেধ করে বলেন,
لا تسبوا الدهر، فإن الله هو الدهر.
তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কারণ, সময় তো আল্লাহরই সৃষ্টি। ১০২
অর্থাৎ তোমরা হয়তো তাকে গালি দাও এই ভেবে যে, সময় তোমাদের ঐক্যকে বিনষ্ট করেছে। তোমাদের আত্মীয়-পরিজনের প্রাণ সংহার করেছে। আর এটাকে তোমরা সময়ের দিকে সম্বন্ধ করে থাকো। অথচ আল্লাহ তাআলাই এটা করে থাকেন। এখন সময়কে গালি দেওয়ার অর্থ আল্লাহ তাআলাকেই গালি দেওয়া!
কিন্তু আজকের অনেক ধর্মহীন ব্যক্তিও জাহেলি যুগের মানুষদের মতো এই কথাটি ব্যবহার করে। এমনকি- অনেক অভিজাত শিক্ষিত সাহিত্যিক ও মেধাবীরাও এটা করে থাকে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়—যুগ বা সময়কে গালি দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো ভালো অভিব্যক্তিই নেই। কিছু বলার নেই। আবার কখনো কখনো তারা আল্লাহকেই দুনিয়া [প্রকৃতি] বানিয়ে নেয়। তখন তারা এভাবে বলে যে, প্রকৃতি এটি করেছে- প্রকৃতি এটি সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতি এটি পছন্দ করে না। প্রকৃতির নিয়মই এমন... ইত্যাদি।
এমনকি যারা দাবি করে, তারা আলেম, প্রাজ্ঞ ফকিহ ও বুদ্ধিজীবী- তারাও দেখি এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হয় না!
এখন কথা হলো- 'সময়' বলে তাদের উদ্দেশ্য কী?
তারা যদি সময় বলতে 'সময়ের অতিক্রম বা কালের অতিবাহন' বোঝায়, তাহলে তো সময়কে দোষারোপ করে কিছু বলা সঠিক হয় না। কারণ, সময়ের নিজের তো কিছু করার নেই। কিছু করার ক্ষমতাও তার নেই। সে নিজে নিজে কিছুই করতে পারে না- তাকে বরং একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাহলে কি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি সময়ের দিকে কিছু আরোপ করতে পারে? পারে না।
তাহলে মানুষ তো এভাবে যুগের ওপর দোষারোপের মাধ্যমে ইসলাম থেকেই বের হয়ে যায়। কারণ, এই দোষারোপ সে প্রকৃত অর্থে এর স্রষ্টার ওপর করছে। এর মাধ্যমে সে কি আল্লাহর হিকমত-প্রজ্ঞার অসম্পূর্ণতা বোঝাতে চায়? যেমন ইবলিস তার ওপর হজরত আদম আলাইহিস সালামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানকে অযৌক্তিক ভেবেছিল।
আজকের দিনেও এমন অনেকেই করে থাকে। কিন্তু অন্তরের এই বক্রতার সাথে তাদের ইসলাম তাদের কোনো উপকার করতে সক্ষম হবে না। কোনো নামাজ-রোজাও কাজে আসবে না। আগে নিজের আকিদা বা বিশ্বাস বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। এরা তো বরং কাফিরদের চাইতেও অধম ও নিকৃষ্ট।
টিকাঃ
১০২. সহিহ মুসলিম: ১১/৪১৬৯, পৃষ্ঠা: ৩১৩ এবং মুসনাদে আহমদ: ১৮/৮৭৭৪, পৃষ্ঠা: ৩১৬- মা. শামেলা।