📄 সম্পদের লোভ সবচেয়ে জঘন্য ব্যাধি
অধিকাংশ মানুষই একটি প্রান্তে অবস্থান করে- হয়তো বাড়াবাড়ি নয়তো ছাড়াছাড়ি। সমাজে মধ্যপন্থার মানুষ একেবারেই বিরল।
কিছু মানুষের স্বভাব এমনই কঠোর কঠিন ও রুক্ষ যে, ক্ষণে ক্ষণে রাগান্বিত হয়ে যায়, মারামারি বা হত্যাকাণ্ডও ঘটিয়ে ফেলে। আবার কিছু মানুষ রয়েছে এমন শীতল ও সহনশীল- গাল ভরে গালি দিলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কিছু মানুষ আছে এমনই লোভী ভোগী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী যে, যা মনে আসে তা-ই পেতে চায়। সকল উপভোগ্যতাকে উপভোগ করতে চায়। আবার উল্টো দিকে কিছু মানুষ আছে এমন কৃচ্ছতা ও নিরাসক্ততার অধিকারী যে, চাহিদা কম, খাওয়া-দাওয়া কম। এমনকি নফসের স্বাভাবিক চাহিদাগুলোও পূরণ করতে চায় না।
এমনকি ভালো কাজের ক্ষেত্রেও মানুষের এই প্রান্তিকতা বিদ্যমান। কিছু কিছু দানকারী আছে, যা পায় সব দান করে দেয়। এটা আসলে তার অপচয়। আবার এমন জবর অকাট কৃপণ মানুষও আছে, সম্পদ লুকিয়ে রাখে। নিজের কোনো উপকারেই সেগুলো ব্যবহার করে না। নিছক শুধু টাকা-সম্পদ গচ্ছিত করতে থাকে। অথচ জানা বিষয়- টাকা-সম্পদের সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো তা দ্বারা উপকার লাভ করা। প্রয়োজন পূরণ করা। কিন্তু কৃপণ মানুষের যেন সেসবের কোনো বালাই নেই।
মানুষ যখন তার সম্পদ অবিবেচকের মতো অপচয় করে, তখন সে ধীরে ধীরে তার মান সম্মান ও দ্বীনকেও ধ্বংস করতে থাকে। পরিণতি হয় খুবই খারাপ। তখন সে কৃপণদের সম্পদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাতে থাকে এবং কৃপণের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এটা তো ঠিক নয়। বরং বন্ধুর কাছে হাত পাতার চেয়ে প্রয়োজনে শত্রুর জন্যও সম্পদ রেখে যাওয়া ভালো। জীবনের এই প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ সংরক্ষণের বিষয়টি অনেকেই গুরুত্ব দেয় না। পরিণামে তাদেরকে এক সময় ভীষণ পস্তাতে হয়। বহু লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। এ থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
তবে মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনই কৃপণ ও বখিল যে, কৃপণতায় তারা একজন একেকটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। তারা যেন টাকা-সম্পদের প্রেমিক হয়ে ওঠে। প্রচুর দুর্বলতা ও অসুস্থতার মধ্যেও তারা তাদের সম্পদ খরচ করতে চায় না। অবশেষে একসময় এভাবেই মারা যায় এবং তাদের সম্পদগুলো উপভোগ করে অন্যরা।
এ ব্যাপারে আমার নিকট এমন কিছু ঘটনা রয়েছে- যার কোনো তুলনা হয় না। আমি সেগুলোর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি- যাতে এর দ্বারা আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
১. আমাদের উস্তাদ ফযল ইবনে নাসের রহ. তাঁর উস্তাদ আবদুল মুহসিন সুরী থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। আবদুল মুহসিন বলেন, সুর এলাকায় একজন ব্যবসায়ী একাকী তার ঘরে অবস্থান করত। প্রতিদিন রাতের খাবারের জন্য সে দোকান থেকে শুধু দুটো রুটি ও একটি আখরোট ক্রয় করত। এগুলো নিয়ে সন্ধ্যার পর সে তার কামরায় ফিরে আসত। হালকা আগুনে আখরোটটি গরম করত। এরপর সেই গরম আখরোটের সাথে রুটি দুটো ছুঁইয়ে খেয়ে নিত।
এভাবেই দীর্ঘদিন সে তার প্রতিদিনের রাতের একমাত্র খাবার সম্পন্ন করত। অবশেষে একদিন সে মারা গেল। তখন তার নিকট থেকে ৩০ হাজার দিরহাম বের হলো। সুরের বাদশাহ সবকিছু নিজে নিয়ে নিলেন।
২. আমি একজন বড় আলেমের ব্যাপারে জানি। আমি নিজেও তাকে দেখেছি। একবার তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন তার এক বন্ধুর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করলেন। অথচ সেই বন্ধুটির তখন কোনো খাদেম-চাকর ছিল না, যে তার সেবা-শুশ্রুষা করতে পারে। সে সময় কোনো খাদেম রেখে দেবে-এমন আর্থিক সংগতিও ছিল না। বাধ্য হয়ে নিজেই সবকিছু করল। দীর্ঘ কষ্ট ও পরিশ্রম করল এবং যথাসাধ্য যা আছে তা নিয়ে ওষুধ-পথ্য জোগাড় করল।
অবশেষে এই দীর্ঘ অসুস্থতার পর একদিন সেই আলেম মারা গেলেন। এরপর তার কিতাবপত্রের মধ্য থেকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা বের হলো! এর কথা তিনি কাউকে বলে যাননি এবং তার থেকে একটি মুদ্রাও এই ভীষণ অসুস্থতার সময়ও খরচ করতে চাননি!
৩. আবুল হাসান রানদিসি আমাকে একটা ঘটনা বলেছেন। তিনি বলেন, আমাদের এক প্রতিবেশী একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। আমাদের খবর দেওয়া হলো। আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। তখন সে জানাল, 'আমার সকল সম্পদের ওপর বিচারক সিলগালা করে দিয়েছে। আমি তো সেগুলো নিতেও পারি না, খরচ করতেও পারি না।'
আমি বললাম, আপনি যদি চান, তবে আমি উদ্যোগ নিয়ে এটা ছুটিয়ে দিতে পারি। আমি উকিল ধরব এবং পুরো সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আপনাকে দেবো। আপনি সেটা ভাগ করে নেবেন এবং আপনার অংশ নিয়ে তখন ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবেন।'
লোকটি তখন বলে উঠল, আল্লাহর কসম, আমি কখনো এই সম্পদ বিছিন্ন করব না। বরং আমার সম্পদ আমার নিকট এভাবেই থাকুক- অক্ষুণ্ণ।'
আমি বললাম, তারা আপনাকে সামান্য কিছুও দেবে না। আপনি এ জীবনে তাদের থেকে কিছুই পাবেন না। কিন্তু আমি তো আপনাকে এক তৃতীয়াংশ আপনার স্বাধীনভাবে খরচ করার জন্য দিতে চাচ্ছি- তবুও দেবেন না?
লোকটি বলল, না, আমি সেটা দিতে পারি না।
এর কিছুদিন পরই লোকটি বিনা চিকিৎসায় মারা গেল এবং বিচারকের মাধ্যমে সরকার তার সকল সম্পদ নিয়ে নিল।
৪. আবুল হাসান রানদিসি আমাকে আরেকটি অতি আশ্চর্য রকম ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি ঘটনাটি শুনেছেন মূল ব্যক্তি থেকে। লোকটি তাকে জানিয়েছে, একবার আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন তিনি আমাকে একদিন বললেন, আমার জন্য তুমি কিছু 'খাবিছ' [ঘি ও খেজুর মিশিয়ে তৈরি একপ্রকার মিষ্টান্ন] কিনে আনো। আমি ভাবলাম, নিশ্চয় তার এটা খেতে ইচ্ছা করেছে। তাই কথামতো তার জন্য আমি খাবিছ কিনে আনলাম।
তিনি এক কামরায় থাকতেন আর আমরা ভিন্ন কামরায়। হঠাৎ পরদিন আমার ছোট ছেলে হন্তদন্ত হয়ে এসে আমাকে খবর দিলো- বাবা, তোমার শাশুড়ি স্বর্ণ গিলে খাচ্ছে। অবস্থা খুবই খারাপ তুমি দ্রুত এসো।'
আমি দ্রুত তার নিকট ছুটে গেলাম। দেখলাম ছেলের কথা সত্য। তিনি গতকাল আমার কিনে আনা ঘি মিশ্রিত তৈলাক্ত খাবিছের সাথে মাখিয়ে মাখিয়ে স্বর্ণমুদ্রা গিলছেন। আমি দ্রুত গিয়ে তার হাত ধরে এটা থেকে নিবৃত করলাম। ব্যস্ত হয়ে বললাম, আপনি এটা করছেন কেন?
তিনি বললেন, আমি ভয় করছি, তুমি বোধ হয় আমার মেয়ে রেখে আরেকজনকে বিয়ে করে বসবে। তাই যতটুকু পারি...।
আমি বললাম, আমি কখনো এমন করব না।
তিনি বললেন, আমার নিকট শপথ করো।
আমি শপথ করলাম। এরপর তিনি তার হাতের অবশিষ্ট স্বর্ণগুলো আমার নিকট অর্পণ করলেন। এর কিছুদিন পরই তিনি মারা গেলেন। তাকে যথাযথ মর্যাদার সাথে পাশের কবরস্থানে দাফন করে এলাম।
এই ঘটনার অনেক দিন পর আমাদের একটি ছোট শিশু মারা গেল। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী গোরস্থানের জায়গার স্বল্পতার কারণে শিশুটিকে আমার শাশুড়ির কবরেই দাফন করা হলো। এ সময় সাধারণত আগের কবরের হাড়-গোড় উঠিয়ে ফেলা হয়। হঠাৎ বহু আগের সেই ঘটনা মনে পড়ায় আমি সঙ্গে করে একটি সুতির কাপড়খণ্ড নিয়ে গিয়েছিলাম। কবরখোদককে বললাম, হাড়গুলো আপনি এই কাপড়খণ্ডের মধ্যে তুলে দিন। সে আমার কথা অনুযায়ী কাজ করল।
আমি সেগুলো নিয়ে বাড়িতে এসে একটি ছিদ্র গামলার মধ্যে রাখলাম। এরপর তার উপর কয়েক পাত্র পানি ঢেলে দিলাম। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো তা থেকে প্রায় আশি-নব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে এলো। এই সবগুলো আমার শাশুড়ি গিলে খেয়েছিলেন।
৬. আমাদের একবন্ধু বলেন, একবার একটা লোক মারা গেল। ঘরের মধ্যেই তাকে দাফন করা হলো। এরপর এক প্রয়োজনে তাকে সেখান থেকে বের করে আনার জন্য কবর খনন করা হলো। তখন তার মাথার নিচে আলকাতরায় প্রলেপ দেওয়া একটি ইট পাওয়া গেল। তার পরিবারকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো।
তখন তারা বলল, 'তিনি এই ইটটি আলকাতরা দিয়ে প্রলেপ দিয়েছিলেন এবং আমাদের ওসিয়ত করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর তার কবরে যেন এটা তার মাথার নিচে রাখা হয়। সে কারণেই এমনটি করা হয়েছে।'
লোকজন বলল, ইট তো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এই আলকাতরাগুলো নষ্ট হবে না। তারা ইটটিকে উঠিয়ে দেখল তা খুবই ভারি। এরপর তারা কৌতূহলী হয়ে সেটাকে ভেঙে ফেলল এবং তখন আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল- সেখানে প্রায় ৯০০ স্বর্ণমুদ্রা লুকায়িত রয়েছে।
৬. এক ব্যক্তির কথা শুনেছি, লোকটি মসজিদ ঝাড়ু দিত। মসজিদের ঝাড়ু দেওয়া ধূলি-বালি একত্র করে সে সাইজমতো ইট বানাত। তাকে একবার প্রশ্ন করা হলো, এটা করার কী কারণ?
লোকটি বলল, এটা তো বরকতময় মাটি। আমি এ দ্বারা ইট বানিয়ে রাখছি। আমার মৃত্যুর পর তোমরা এই ইটগুলো আমার কবরে সাজিয়ে দেবে।
অনেক দিন পর লোকটি যখন মারা গেল, তখন তার কথামতো কবরের মধ্যে এগুলো সাজিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কিছু ইট অতিরিক্ত থেকে গেল। সেগুলো বাড়িতে এনে এক জায়গায় রেখে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। ইটগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সেগুলোর মাটি গলে গেল। তখন একটি অবাক কাণ্ড দেখা গেল- প্রতিটি ইট হতে অনেক স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে আসতে লাগল!
এরপর তারা আবার কবরের নিকট গেল এবং কবর খনন করে ইটগুলো বের করে আনল। দেখা গেল- এগুলোরও প্রতিটির মধ্যে স্বর্ণমুদ্রা লুকানো ছিল।
৭. একবার আমাদের এক বন্ধু বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। আমি জানতাম তার অনেক সম্পদ আছে। কিন্তু সেগুলো সে তার চিকিৎসায় খরচ করেনি। ঘটনা হলো, একবার সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং অসুস্থতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে লাগল। তবুও সে তার সম্পদ সম্পর্কে কাউকে কিছু জানাল না। আমি বুঝতে পারছিলাম, এই অসুস্থতা থেকে আর হয়তো রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সে তখনো আশা করে যাচ্ছিল, এভাবেই এমনিতেই সেরে যাবে। সে নিজের টাকা থেকে চিকিৎসার জন্য খরচ তো করত না, এমনকি তার গচ্ছিত পুঁতে রাখা সম্পদ সম্পর্কে কাউকে জানাতেও চাচ্ছিল না। সে ভয় করছিল, তার জীবদ্দশায় অন্যকেউ তার সম্পদ নিয়ে নেবে। কিন্তু একদিন সে মারাই গেল। তার সম্পদ অন্যদের হস্তগত হলো।
মানুষের জীবনে এর চেয়ে লাঞ্ছনার আর কী হতে পারে।
৮. আমাদের এক বন্ধু এ ব্যাপারে খুবই মজার ও করুণ একটি ঘটনা আমাকে শুনিয়েছে। একটি লোকের ছিল তিনটা সন্তান। দুটো ছেলে আর একটি মেয়ে। তার অনেক স্বর্ণমুদ্রা একটি গোপন জায়গায় সংরক্ষিত ছিল। একদিন এই লোকটি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। পরিবারের সকলে তার চারপাশ ঘিরে থাকল- কখন কী বলে। কিন্তু কারও নিকটেই কিছু বলল না। শুধু গোপনে তার এক ছেলেকে ইশারা করে রাখল, তুমি আমার কাছ থেকে দূরে সরবে না।
একসময় সুযোগ পেয়ে সেই ছেলেকে একাকী কাছে ডেকে লোকটি বলল, 'তোমার ভাই পাখির খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর তোমার বোন বিয়ে করেছে এক তুর্কি ছেলেকে। আমার সম্পদ যদি তাদের হাতে পড়ে, তবে তারা তা নষ্ট করে ফেলবে। আর তুমি পেয়েছ আমার স্বভাব ও চরিত্র। তুমিই শুধু আমার সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হবে। তোমার প্রতি আমার ভরসা রয়েছে। অমুক জায়গায় একজাহার স্বর্ণমুদ্রা গোপন করে রাখা আছে। আমি যখন মারা যাব, তখন তুমি সেটা একাই নিয়ে নেবে। কাউকে জানাবে না।'
এর মধ্যে লোকটির অসুস্থতা ভীষণ আকার ধারণ করল। তখন ছেলেটি বাবার জানিয়ে দেওয়া নির্দিষ্ট স্থান থেকে সম্পদ হস্তগত করে নিল। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। তখন সে ছেলের নিকট ধরনা দিতে লাগল-সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ছেলে যেহেতু বাবারই স্বভাব পেয়েছে। তাই সে সম্পদ হাতছাড়া করবে কেন? সে আর বাবার কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেয় না। সে-ও তা গোপন জায়গায় লুকিয়ে ফেলেছে। যতই বাবার পক্ষ থেকে চাওয়াচাওয়ি, মিনতি করা হোক- ছেলেটি আর সম্পদ ফিরিয়ে দেয় না। লোকটি ভীষণ সমস্যার মধ্যে পড়ে গেল। আসলেই ছেলেটি হুবহু তার স্বভাব পেয়েছে- নাকি একধাপ বেশি!
এরমাঝে একদিন ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। এবার পিতা ছেলের কাছে অনুনয়-কাকুতি করে বলতে লাগল, এ তোমার কেমন আচরণ! আমি অন্যদের না দিয়ে শুধু তোমাকেই সম্পদগুলো দিয়েছিলাম; যাতে তুমি সেটা সংরক্ষণ করতে পারো। এখন তুমি অসুস্থ হয়ে পড়েছ। যদি সম্পদের কথা না বলে মারা যাও, তবে তো সম্পদ নষ্টই হয়ে যাবে। এই জন্যই কি আমি তোমার কাছে সম্পদ দিয়েছিলাম। এ তোমার কেমন সংরক্ষণ! খবরদার, এমনটি করো না... এমনটি করো না... সব নিঃশেষ হয়ে যাবে।
এভাবে সেই বাবা বহু অনুনয় বিনয় অনুরোধ তিরস্কার ভর্ৎসনা- সবই করতে লাগল। অবশেষে নিরাশ হয়ে ছেলে বাবার নিকট সম্পদের কথা জানিয়ে দিল।
এর কয়েক দিন পর ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠল। দিন যেতে থাকল। এরপর আবার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ভীষণ অসুস্থ। সেরে ওঠার আর তেমন আশা করা যায় না। এবার আবার ছেলেটি এসে বাবার নিকট ধরনা দিতে লাগল- সম্পদটা কোথায় রেখেছ, বলে যাও বাবা। তুমি যদি এভাবে মারা যাও, তবে তো নষ্ট হয়ে যাবে। একটু অনুগ্রহ করো। একটু বলে যাও।
কিন্তু কিছুতেই আর এবার বাবার মন গলল না। সে কাউকেই আর সম্পদের কথা বলল না। কিছুদিন পর এভাবেই সে মারা গেল। কিন্তু সম্পদের কথা আর কারও জানা হলো না। তা সকলের নিকট অজানা এবং অধরাই থেকে গেল।
এতক্ষণ যাদের কথা বলা হলো- এদেরকে কি কখনো জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান বলা যায়- যদিও জ্ঞান ও বুদ্ধি থাকে? এদেরকে কি কখনো ধনী ও সম্পদশালী বলা যায়- যদিও ধন ও সম্পদ থাকে?
জীবনযাপনের ক্ষেত্রে- এরাই হলো প্রকৃত জাহেল ও মূর্খ। এরাই হলো প্রকৃত ফকির ও দরিদ্র।
আল্লাহ তাআলা হয়তো এ ধরনের লোকদের ক্ষেত্রে ইরশাদ করেন- ﴿إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا ﴾
তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো। বরং তারা তার চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট। [সুরা ফুরকান: ৪৪]
📄 হারানো ভ্রান্ত ও বন্ধুত্ব
এক সময় কিছু ব্যক্তিকে আমি আমার বন্ধু ও সঙ্গী ধারণা করতাম। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম তাদের কেউ কেউ রূঢ় ব্যবহার করে, হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বের শর্তের সাথে যা সমঞ্জস নয়। তাদেরকে তখন তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর হঠাৎ আমার নিজে নিজেই বোধোদয় হলো- এটা তো ঠিক হচ্ছে না। মনে মনে বললাম, এর মাধ্যমে উপকারটা কী? তারা যদি বন্ধু ও সঙ্গীর উপযুক্ত হয়েই থাকে, তবে তো তাদের তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করা চলে না। আর যদি উপযুক্ত না হয়, তবে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়াই উত্তম।
এর কিছুদিন পর দুনিয়ার জীবনযাপন বিষয়ে একটি আশ্চর্য চিন্তা আমার মাথায় এলো। আমি ভেবে দেখলাম- যাদের সাথে আমার চলাচল তাদের সাথে আমার সম্পর্ক তিন ধরনের:
১. নিছক পরিচিত মুখ- দেখা হলে সালাম বিনিময়। এর পাশাপাশি অল্পস্বল্প দু-একটা কথাবার্তা কখনো হয়- কখনো হয় না।
২. বাহ্যিকভাবে বন্ধু- প্রকাশ্যভাবে যাদের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ কথা ও আচরণ চলে।
৩. আন্তরিক একনিষ্ঠ সঙ্গী- যাদের সাথে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে।
এবার আমি চিন্তা করলাম, মানুষের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে লাভ কী- তারচেয়ে বরং যাদেরকে আন্তরিক মনে হবে না, তাদেরকে মনে মনে 'আন্তরিক সঙ্গী'-এর তালিকা থেকে বের করে 'বাহ্য বন্ধু'র তালিকায় এনে রাখলেই হয়। আর যদি এটারও যোগ্য তারা না হয়, তবে তাদেরকে নিছক 'পরিচিত' ব্যক্তির কাতারে রেখে দিতে হবে। তাদের সাথে আচরণ হবে নিছক একজন পরিচিত ব্যক্তির মতোই- কোনো মাখামাখি নয় আবার বিরোধিতাও নয়।
অর্থাৎ সম্পর্ক ছিন্ন না করে যার যার অবস্থান মতো তাকে সেখানে রেখে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর অযথা তিরস্কার করে বা অভিযোগ তুলে বন্ধুত্ব ঝালাই করতে চাওয়াটা হবে নিতান্তই বোকামি।
হজরত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায রহ. বলেন, সেই ভাই বা সঙ্গীর চেয়ে খারাপ ভাই বা সঙ্গী আর কে আছে, যাকে তোমার বলতে হবে, 'তোমার দুআর মধ্যে আমাকে স্মরণ রেখো।'
আজকের দিনে অধিকাংশ মানুষই একে অপরের পরিচিত। এদের মধ্যে বাহ্যিক বন্ধুর সংখ্যাও অনেক কম। আর আন্তরিক বন্ধু বা সঙ্গীর বিষয়টা এখন এতটাই দুর্লভ যে, তার আশা না করাই ভালো। হ্যাঁ, আত্মীয়তার মাধ্যমে কিছু সম্পর্ক—যেমন পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে থাকা সম্পর্ক—এগুলোর কথা ভিন্ন। অবশ্য এখানেও আন্তরিকতা থাকতে পারে, না-ও পারে। অতএব সবার থেকেই নিজেকে একটু আলাদা স্থানে রেখে সবার সাথেই নিতান্ত অপরিচিত ব্যক্তিদের মতো ইনসাফপূর্ণ আচরণ করে চলা উচিত। আর যে ব্যক্তি তোমার প্রতি আজ হৃদ্যতা বা সম্প্রীতি প্রকাশ করছে, তুমি তাতে ধোঁকায় পতিত হয়ো না। সময় যেতে দাও। সময় ও পরিস্থিতিই একদিন বলে দেবে—তার এই হৃদ্যতা আন্তরিক নাকি ভান। কারণ, অনেক সময়ই সুবিধাবাদী মানুষ অকারণে হৃদ্যতা প্রকাশ করে—যাতে তোমার মন গলিয়ে তোমার থেকে তার স্বার্থ হাসিল করতে পারে।
হজরত ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. বলেন, 'তুমি যখন কাউকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন করতে চাও, তখন তুমি তাকে কোনো বিষয়ে হঠাৎ রাগিয়ে দাও। সে যদি তার এই রাগান্বিত অবস্থায়ও তোমার প্রতি 'ইনসাফ' বা ভালো ব্যবহার বজায় রাখে, তাহলে তুমি তাকে নিশ্চিন্তে একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারো।'
অবশ্য আজকের দিনে এই পরীক্ষা করাটাও আশঙ্কাজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এখন মানুষের আচরণ এতটাই তীব্র ও তপ্ত যে, তুমি যদি কাউকে রাগিয়ে দাও, সে হয়তো তাৎক্ষণিক তোমার শত্রুতে পরিণত হয়ে তোমার ক্ষতি করে বসবে!
মানুষের আচরণের এই অধঃপতনের কারণ হলো, আজ আমাদের মধ্য থেকে আন্তরিকতা দূর হয়ে যাচ্ছে। আমরা দিন দিন খুবই স্বার্থবাদী হয়ে পড়ছি। অথচ আমাদের 'সালাফে সালেহিন'-এর মূল লক্ষ্যই ছিল আখেরাত। একারণে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের মধ্যে তাদের নিয়ত ছিল বিশুদ্ধ, ভোরের বাতাসের মতো নির্মল। তাদের লক্ষ্য ছিল দ্বীন ও আখেরাত; দুনিয়া নয়। আর আজ আমাদের সকলের অন্তরের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছে দুনিয়ার ভালোবাসা এবং দুনিয়া প্রাপ্তির লালসা। তাই আমাদের আচরণে এত কৃত্রিমতা।
তবুও বলি, শুধু দ্বীনের জন্য বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা রাখে—এমন কাউকে যদি পাও, তবে তাকে সাদরে গ্রহণ করে নাও। আজকের যুগে এ বড় দুর্লভ বিষয়।
📄 বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে
মানুষের যখন ইলমে পূর্ণতা আসে, তখন সে বুঝতে পারে, বস্তুত তার আমল কোনো মূল্যই রাখে না। এটাকে বড় করে দেখার কিছু নেই। কারণ, মহান দয়াশীল প্রভুর তাওফিক প্রদানের কারণেই এই আমলগুলো সে করতে সক্ষম হয়েছে; নতুবা তার দ্বারা কখনো এটা সম্ভব হতো না। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন এই চিন্তা করে তখন আর সে নিজের কোনো আমল নিয়ে বড়াই করে না, অহংকার করার দুঃসাহস দেখায় না।
আমল নিয়ে বড়াই বা অহংকার না করার কয়েকটি কারণ রয়েছে—
১. যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই ইরশাদ করেছেন,
﴿وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ . فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَنِعْمَةً وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمُ﴾
কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের ভালোবাসা সঞ্চার করেছেন এবং তাকে তোমাদের অন্তরে করে দিয়েছেন আকর্ষণীয়। আর তোমাদের কাছে কুফর, গোনাহ ও অবাধ্যতাকে ঘৃণ্য বানিয়ে দিয়েছেন। এরূপ লোকেরাই সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়েছে—আল্লাহর পক্ষ থেকে দান ও অনুগ্রহস্বরূপ। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [সুরা হুজুরাত: ৭-৮]
২. ব্যক্তি যখন রবের সীমাহীন নিয়ামতের মাঝে নিজের এই এতটুকু ইবাদত ও আনুগত্যকে তুলনা করে দেখে, তখন সে নিজেই বুঝতে পারে— এগুলো তেমন কিছুই নয়। কোটি ভাগের এক ভাগও নয়। অহংকার করা তো দূরের কথা; এ তো উল্লেখ করার মতোও না।
৩. দয়াময় মহান প্রভুর বড়ত্ব ও মহত্বের বিষয় সম্পর্কে যখন চিন্তা করা হয়, তখন জীবনের সকল জ্ঞান ও ইবাদতই অতি ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে হয়। কত সামান্য আমাদের নিবেদন!
তবুও তো ধরা হচ্ছে এটা সেই ইবাদত- যার মধ্যে কোনো প্রকার ত্রুটি ও কদর্যতা নেই। শিরকের মিশ্রণ নেই। যা অন্য সকল কিছুর কামনা থেকে একেবারেই শুধু তার জন্যই নিবেদিত। আর যখন ইবাদতগুলোর মধ্যে বিভিন্ন অবহেলা, কৃত্রিমতা, লৌকিকতা ও অজ্ঞতা ভর করে সে ক্ষেত্রে সেই ইবাদত নিয়ে তাঁর সামনে কোন মুখে দাঁড়ানো সম্ভব!
এ কারণে সব সময় নিজের আমলের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, সেটা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। ত্রুটি ও বিচ্যুতির কারণে শাস্তিও আপতিত হতে পারে।
এভাবে যদি ভাবা যায়, তখন আর নিজের চোখ আমলের দিকে থাকবে না। সেটা নিয়ে অহংকার ও বড়াই করার মতো বড় ও বিশাল মনে হবে না।
আমলের ক্ষেত্রে বুদ্ধিমানদের অবস্থাগুলো একটু চিন্তা করে দেখো- ফেরেশতাগণ দিনরাত আল্লাহর তাসবিহ পড়ে। এ ক্ষেত্রে তারা সামান্য সময়ের জন্যও অলসতা বা কমতি করে না। তারপরও তারা বলেন, হে আমাদের প্রভু, আমরা আপনার যথার্থভাবে ইবাদত করতে পারিনি।
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কথা চিন্তা করে দেখো- আগুনে নিক্ষেপের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির ওপর তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন, নিজের স্ত্রী-পুত্রকে নির্জন নিঃসহায় জায়গায় রেখে এসেছেন এবং প্রিয় পুত্রটিকে আবার প্রভুর নির্দেশে জবাই করতে গিয়েছেন... আরও কত পরীক্ষা। সকল পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরপরও তিনি বলছেন,
﴿وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ)
দয়াময় প্রভু সেই সত্তা, যার নিকট আশা করি কিয়ামতের দিন তিনি আমার ত্রুটি ক্ষমা করে দিবেন। [সুরা শুয়ারা: ৮২]
আর আমাদের নবী- সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী! তাঁর কষ্ট ও ইবাদতের কথা বলে কি শেষ করা যাবে! সেই নবীই একদিন সাহাবিদের বললেন,
ما منكم من ينجيه عمله قالوا ولا أنت قال: ولا أنا إلا أن يتغمدني الله برحمته.
তোমাদের মধ্যে কাউকে তার আমল মুক্তি দিতে পারবে না। সাহাবিগণ আকুল বিস্ময়ে জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর নবী, আপনাকেও না! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, এমনকি আমাকেও না- তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে তার রহমত দিয়ে বেষ্টন করে রাখবেন। ১০১
আর হজরত আবু বকর রা. বলতেন,
وهل أنا ومالي إلا لك يا رسول الله
হে আল্লাহর রাসুল, আমি এবং আমার যাবতীয় সম্পদ- সবই তো আপনার জন্য উৎসর্গিত। আমার বলতে আর কীই-বা আছে!
হজরত উমর রা. বলতেন,
لو أن لي طلاع الأرض لافتديت بها من هول ما أمامي قبل أن أعلم ما الخبر.
আমার যদি অনেকগুলো উঁচু ও দামি জমি থাকত, আর সর্বশেষ আমার ভাগ্যে কী কল্যাণ রয়েছে তা জানার আগে আমার সামনে যে ভয়াবহতা রয়েছে, তার বিনিময়ে আমি আমার সেই জমিগুলো বিনিময় করে নিতাম।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলতেন,
ليتني إذا مت لا أبعث.
হায়, আমি মারা যাবার পর আমাকে যদি আর পুনর্জীবিত না করা হতো!
হজরত আয়েশা রা. বলতেন,
ليتني كنت نسياً منسياً.
হায়, আমি যদি মৃত্যুর পর একেবারে বিস্মৃত অবলুপ্ত হয়ে যেতে পারতাম!
আমি যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি, এ বিষয়ে বনি ইসরাইলদের মধ্যে এমন কিছু সৎ ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা দ্বারা তাদের বুঝ ও বুদ্ধিমত্তার স্বল্পতাই প্রকাশ পেয়েছে। কারণ, তারা তাদের আমলের ওপর নির্ভর করেছিল। এ কারণে তারা তাদের আমলের দিকে ইঙ্গিত করেছে। তাদের মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে একটি নির্জন দ্বীপে ৫০০ বছর ধরে ইবাদত করেছে। তাকে প্রতিদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আনার প্রদান করা হতো। এবং সে আল্লাহর তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিল- নামাজের সেজদার মধ্যে যেন তার মৃত্যু হয়।
তার প্রার্থনা কবুল করা হয়েছিল। তার মৃত্যু হয়েছিল নামাজে সেজদারত অবস্থায়।
এরপর হাশরের দিন যখন তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হবে, তুমি আমার রহমত-অনুগ্রহের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করো।
তখন সে বলবে, আমি বরং আমার আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করছি।
এ সময় তার সারাজীবনের সকল আমল আল্লাহ তাআলার মাত্র একটি নিয়ামতের সাথে পরিমাণ করা হবে, তখন তার এই সকল আমলও সেই একটি নিয়ামতের সমতুল্য হবে না।
এবার সেই লোকটি আকুল পেরেশানির সাথে বলে উঠবে, হে আমার প্রভু, হ্যাঁ, তোমার রহমত ও অনুগ্রহেই শুধু জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি; আমার কোনো আমলের কারণে নয়।
এভাবে সেই গুহাবাসীদের অবস্থাও তা-ই, যাদের গুহার দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে তো একজন তার এমন আমলের কথাও উল্লেখ করেছিল, যার কথা উল্লেখ করাও ছিল লজ্জাজনক। অর্থাৎ সে একবার এক নারীর সাথে জিনার ইচ্ছা করেছিল। অনেক দূর অগ্রসরও হয়েছিল। কিন্তু এরপর আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভয়ে তা থেকে ফিরে এসেছিল।
এর দ্বারা আমি তো এটাই বুঝি, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে শাস্তির ভয়ে তা থেকে ফিরে এসেছে, এটার উল্লেখ তো শাস্তিরই আশঙ্কা সৃষ্টি করে। যদি এমন হতো যে, সে কোনো বৈধ কাজ করতে গিয়ে ফিরে এসেছে, তাহলেও না একটি কথা ছিল। কিন্তু এখানে সে কী করতে গিয়েছিল? গোনাহের কাজ।
যা করতে তাকে তো নিষেধই করা হয়েছে। যা থেকে তার ফিরে থাকাই তো উচিত? সেটা করতে অগ্রসর হওয়াই তো বরং একটি অপরাধ। সে যদি বিষয়টা বুঝত, তাহলে আল্লাহর সহানুভূতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা উল্লেখ করতে সে লজ্জাবোধ করত।
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যেমন বলেছেন, (وَمَا أُبَرِىءُ نَفْسِي)
আমি আমার নফসকে নির্দোষ বলছি না। [সুরা ইউসুফ: ৫৩]
আর অন্যদের অবস্থা এমন যে, বাচ্চাদের ফজরের নামাজে দ্রুত ওঠার প্রতিযোগিতায় লাগিয়ে দেওয়া হলো। আর বলা হলো, যারা যারা দ্রুত উঠে ফজরের নামাজ আদায় করবে, পিতা-মাতা তাদের দুধ পান করাবেন। এখানে যেমন বাচ্চাদের কিছুটা কষ্ট করতে হয়, কিন্তু এর মাঝে প্রতিদানের আশা লুকিয়ে আছে।
একই রকম মানুষদের অবস্থা। তাদের ধারণায় তারা যখন ভালো কাজ করে, অবস্থাই বলে দেয়, তারা যা চায়, তা তাদেরকে প্রদান করা হবে। কারণ, তারা যা করেছে, এখন তারা তার প্রতিদান চায়। প্রাপ্যটা যেন তারা নিজের শক্তিতে অধিকার করে নিয়েছে।
আমলের মধ্যে এই কৃতিত্বের ধারণা থাকার কারণে একজন আমলকারী অন্যদের ওপর অহংকার প্রকাশ করে। নতুবা প্রতিটি সক্ষম আমলকারী ব্যক্তি তার আমলের তুচ্ছতা নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকত। কারণ, তার ওপর প্রভুর পক্ষ থেকে যে অঢেল নিয়ামত প্রদান করা হয়েছে, সেই তুলনায় এই আমল ও শুকরিয়া তো বিশাল ময়দানের মধ্যে সামান্য শস্যদানাতুল্যও নয়। এ যে খুবই অল্প। খুবই সামান্য। আরও বড় বিষয় হলো, এই আমলের সক্ষমতাটুকুও তো প্রভুর পক্ষ থেকেই প্রদত্ত!
এই বিষয়টির বুঝ আমল নিয়ে অহংকারকারী যেকোনো ব্যক্তির মাথাকে নুইয়ে দেবে। তার তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্রতাকে তুলে ধরবে। প্রতিটি মানুষের জন্য এই বোধ ও বুঝটি খুবই জরুরি।
টিকাঃ
১০১. মুসনাদে আহমদ: ১৯/৯৪৫৫, পৃষ্ঠা: ৪৯৮- মা. শামেলা।
📄 তোমার কথাই এখানে সব নয়
আল্লাহর পক্ষ থেকে যে হুকুম ও বিধান এসেছে- মানুষ তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ থেকেছে। মানুষের কর্তব্য কী? এটার উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের ইচ্ছার বিপরীত কোনো বিষয় সংঘটনের মধ্যে। কারণ, ইচ্ছাধীন কর্ম সবাই করে। এটাই তার স্বভাব। কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিপরীত কর্মে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা এবং তার হুকুম মান্য করাই হলো মানুষের আসল কর্তব্য।
এ কারণে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে- তার অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ও ঘটনাবলির ক্ষেত্রেও নিজের ধৈর্য ও সন্তুষ্টির প্রকাশ করা। সে যদি দুআ করে এবং নিজের কোনো কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের জন্য প্রার্থনা করে, তাহলে সে এই দুআ ও প্রার্থনার মাধ্যমেও আল্লাহর ইবাদত করল। এরপর যদি তার প্রার্থিত বিষয় প্রদান করা হয়, তাহলে সে শুকরিয়া আদায় করবে। আর যদি সে তার প্রার্থিত বিষয় প্রাপ্ত না হয়, তাহলে তার উচিত হবে- প্রার্থনার মধ্যে বেশি বাড়াবাড়ি না করা। কারণ, দুনিয়া তো সকল আকাঙ্ক্ষা পূরণের জায়গা নয়। বরং এ সময় মনকে এটা বলে বোঝাতে হবে-
﴿وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ﴾
এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে করো, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক। [সুরা বাকারা : ২১৬]
আরেকটি বড় মূর্খতা হলো, নিজের উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ার কারণে মনে মনে অসন্তুষ্ট হওয়া। কখনো আবার মনে মনে অভিযোগ ও আপত্তি উত্থাপন করা। মনে মনে বলে, আমার উদ্দেশ্য পূরণ হলে কী ক্ষতি ছিল? আমার প্রার্থনায় সাড়া দেওয়া হলো না কেন? আমার ক্ষেত্রে এমনটি কেন হলো?...
এ কথাগুলো নিজের মূর্খতা, ঈমানের স্বল্পতা এবং স্রষ্টার হিকমতকে মেনে না নেওয়ার ওপর ইঙ্গিত করে।
মানুষ কেন বুঝতে চায় না- দুনিয়ার কোনো উদ্দেশ্য পূরণ হবে আর তাতে কোনো কদর্যতা মিশ্রণ হবে না- এমন কি কখনো হয়? তাই বারবার প্রার্থনার মাধ্যমে উদ্দেশ্য পূরণে বাড়াবাড়ি করার কী প্রয়োজন? দুনিয়া বরং কষ্ট স্বীকারেরই জায়গা, পরীক্ষার জায়গা।
নবী ও রাসুলগণ ছিলেন আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা। দুনিয়ার নিয়মে তাদেরকেও কষ্টে আপতিত হতে হয়েছে। এখানে তাদেরও সকল উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। হজরত নুহ আলাইহিস সালাম তার সন্তানের ক্ষেত্রে প্রার্থনা করেছিলেন; কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে পরীক্ষা করা হয়েছে জবাইয়ের ক্ষেত্রে। হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে পরীক্ষা করা হয়েছে তার সন্তান হারানোর মাধ্যমে। হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামও অনেক কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন— প্রবৃত্তির সাথে তাকে লড়াই করতে হয়েছে। হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালামকে অনেক রকম কষ্ট দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছে। হজরত দাউদ ও সোলাইমান আলাইহিমাস সালামকে ‘ফিতনা’ দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যও পূরণ হয়নি। এভাবে সকল নবীকেই কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে।
এরপর আমাদের নবীকেও জীবনভর যে কষ্ট, ক্ষুধা-দারিদ্র্য সহ্য করতে হয়েছে— তা তো সবারই জানা। কারণ, দুনিয়াকে বানানোই হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য। এ কারণে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, নিজেকে ধৈর্যের সাথে সইয়ে নেওয়া। এবং এ কথা জেনে রাখা যে, চাওয়া ছাড়াই যতটুকু উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে, এর ওপরই সন্তুষ্ট থাকা উত্তম। আর যেগুলো অর্জিত হয়নি— এটাই তো দুনিয়ার মানুষের স্বাভাবিক প্রাপ্তি এবং এটাই হলো দুনিয়ার নিয়ম ও স্বভাব।
জনৈক কবি বলেন, طبعت على كدر وأنت تريدها ... صفوا من الأقذاء والأكدار ومكلف الأيام ضد طباعها ... متطلب في الماء جذوة نار
যার স্বভাব ও সৃষ্টিই হলো পঙ্কিলতা দিয়ে, তুমি তাকে পেতে চাও সকল কদর্যতা ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্তভাবে।
যুগের স্বভাবের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে যে চায়, সে যেন পানির সরোবরের মাঝে আগুনের ফুলকি খোঁজে।
কষ্ট ও কামনার এই বিপরীত জায়গাটিতে এসেই প্রকাশ পায় মানুষের ঈমানের শক্তি কিংবা তার দুর্বলতা। এ রোগের নিরাময়ে মুমিন ব্যক্তির জন্য উচিত হলো, প্রভুর নিকট নিজের নফসকে সঁপে দেওয়া। তার হিকমতকে মেনে নেওয়া। এবং নিজের নফসকে সেই কথা বলা- যা বলা হয়েছিল নবীকেও-
(لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ) তোমার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। [সুরা আলে ইমরান: ১২৮]
এরপর অন্তরকে সান্ত্বনা দাও- এই না পাওয়া কোনো বঞ্চনা নয়। বরং নিশ্চয় এটা এমন কোনো কল্যাণের কারণেই করা হয়েছে, যা তুমি জান না। আর যে ব্যক্তি তার উদ্দেশ্যগুলো অপূরণের ওপর ধৈর্যধারণ করে, তাকে অবশ্যই প্রতিদান দেওয়া হয়। যারা আল্লাহ তাআলার এই নির্বাচনকে মেনে নেয় এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপরই সন্তুষ্ট থাকে- আল্লাহ তাদেরকে জানেন এবং দেখেন।
জেনে রেখো, এই কষ্ট ও পরীক্ষা খুবই সীমিত সময়ের জন্য। তোমার সকল আকাঙ্ক্ষা জমা করে রাখা হচ্ছে, অচিরেই এগুলো তোমাকে প্রদান করা হবে। দুনিয়ার এই কষ্ট যেন একটি অন্ধকার- অচিরেই তা কেটে যাবে। এটা যেন একটি রাত- অচিরেই উদ্ভাসিত হবে সকাল।
এভাবে যখন নিজের বুঝ ও চিন্তাকে উন্নত করবে, তখন বুঝে আসবে- নিজের জন্য যা হচ্ছে এটা আল্লাহর ইচ্ছাতেই হচ্ছে। তখন ঈমানের দাবি হলো, তাঁর চাওয়ার সাথেই নিজের চাওয়াকে মিলিয়ে নেওয়া এবং তিনি যা নির্ধারণ করেছেন, তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। কারণ, এমনটি যদি না করা হয়, তবে এটা প্রকৃত অর্থে তার দাসত্ব স্বীকার করা হয় না। তার ইবাদতও করা হয় না।
এই বুঝ ও বোধটি এমনই একটি মৌলিক বিষয়, যার সম্পর্কে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা- ভাবনা করা দরকার এবং প্রতিটি বিপদ বা পরীক্ষার মুহূর্তে সে অনুযায়ী আমল করা দরকার।