📄 ইন্দ্রিয়জাত সুখ
আমি একবার চিন্তা করলাম রাজা-বাদশাহর পারস্পরিক লড়াই নিয়ে, ব্যবসায়ীদের লোভ নিয়ে, জাহেদদের কপটতা নিয়ে এবং মানুষের হিংসা ও শত্রুতা নিয়ে। তাদের অব্যাহত সীমাহীন গিবত, প্রতিশোধ ও অন্যায় নিয়ে। অবশেষে বুঝলাম, এগুলোর অধিকাংশই করা হয় বাহ্যিক ইন্দ্রিয়জাত আনন্দ ও সুখ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে।
কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি যদি একটু ভেবে দেখে, তবে সে জানতে পারবে- ইন্দ্রিয়জাত সুখ খুবই দ্রুত অপসারিত ও অবসাদিত হয়ে পড়ে। এখানে কখনোই সর্বোচ্চ বা সীমাহীন সুখ ও তৃপ্তি লাভ করা সম্ভব নয়। বরং কেউ যদি এক্ষেত্রে বেশি বাড়াবাড়ি করে- অতি বেশি রকমের সুখ আস্বাদন করতে চায়, তবে তো সে যতুটুকু সুখ পাবে, তার চেয়ে বহুগুণ কষ্টের মধ্যে নিজেকে আপতিত করবে।
একজন মানুষ কতই আর খেতে পারে এবং কতই আর সহবাস করতে পারে! বাড়াবাড়ি করলে নিজেকেই কষ্ট ও ধ্বংসের মধ্যে আপতিত করে ছাড়ে।
কিন্তু সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি- যিনি তার দ্বীনের সংরক্ষণে গুরুত্ব প্রদান করেন। দ্বীনকে প্রাধান্য দেন এবং দুনিয়া থেকে তার পরিমাণমতো গ্রহণ করেন- হালালভাবে।
আহা, কে বুঝবে, এটি এমন এক পোশাক, যে ব্যক্তি তা পরিমিতভাবে পরিধান করবে, পোশাক তার খেদমত করবে। আর যে ব্যক্তি অনেক বাড়িয়ে লম্বা করে বানাবে, তাকে নিজেকেই পোশাকের খেদমতে লাগতে হবে। আর যদি কোনো অহংকারী পোশাকবিলাসী তার নিজের পোশাকের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে অবলোকন করে, তবে আল্লাহ তখন তার দিকে আর তাকাবেন না!
সহিহ হাদিসে রয়েছে, একদা এক ব্যক্তি তার পরিধেয় চাদর নিয়ে অহমিকা দেখাচ্ছিল, এমতাবস্থায় সে ভূমিতে ধ্বসে গেল।
কারও পানাহার যদি হারাম হয়, তবে সে তার আস্বাদনের বহুগুণ বেশি শাস্তি প্রাপ্ত হবে। আর ধর্ষকের শরয়ি দণ্ড ছাড়াও সামাজিকভাবে তার ভিন্ন রকম মানসিক শাস্তি রয়েছে।
তুমি বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর বিষয়ে চিন্তা করে দেখো, তারা কত মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। কত হারাম কাজের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এগুলো করার দ্বারা তারা কী অর্জন করেছে? দুনিয়ার সামান্য কিছু ইন্দ্রিয়জাত সুখ ও আনন্দ। কিন্তু ভালো কাজ না করার আফসোস এবং মন্দের শাস্তি ভোগ তাদের উজ্জ্বল জীবনের ওপর কলঙ্কের ছায়া ফেলে দিয়েছে।
সুতরাং হে পাঠক, নিরালায় মহৎ ইলমচর্চাকারী আলেমের চেয়ে সুখী ও আনন্দদায়ক জীবন পৃথিবীতে আর কারও নেই। ইলমই তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ও সাথি। যতটুকু হালাল উপার্জনে নিজের দ্বীনকে রক্ষা করা সম্ভব, ততটুকুতেই সে সন্তুষ্ট। তার কোনো লোক দেখানো লৌকিকতার প্রয়োজন হয় না। এর জন্য নিজের দ্বীনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে হয় না। সে দুনিয়া ও তার অধিবাসীদের লাঞ্ছনা থেকে বহুদূরে সম্মানের চাদর পরিধান করে আছে। অঢেল সচ্ছলতা যদি তার না-ও থাকে, তবুও সে অল্পতেই সন্তুষ্টির পোশাকে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। আর এতেই সে তার দ্বীন ও দুনিয়া রক্ষা করার সহজ পথটি পেয়ে যায়।
ইলমের মধ্যে মগ্ন থাকা তাকে বহু শ্রেষ্ঠত্বের সন্ধান প্রদান করে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিভিন্ন উদ্যানে পরিভ্রমণ করিয়ে আনে। এটাই তাকে শয়তান থেকে, সুলতান থেকে এবং মানুষের ভিড় থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিরাপদ রাখে। কিন্তু এই অবস্থাটি শুধু একজন আলেমের জন্যই সমুচিত। কারণ, কোনো মূর্খ যদি এমন নির্জনতা অবলম্বন করতে যায়, তবে তো সে ইলম থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিপথগামী হয়ে পড়বে।
📄 পূর্ণতা একমাত্র স্রষ্টার
আমাকে একবার একজন জিজ্ঞাসা করলেন, এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, من لم يحترز بعقله هلك بعقله.
যে ব্যক্তি নিজের মেধা সম্পর্কে সতর্ক থাকে না, সে তার মেধার কারণেই ধ্বংস হয়।
এ কথাটির ব্যাখ্যা কী?
আমি তাৎক্ষণিকভাবে এ কথার কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। এমনকি এরপর আরও দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলো, তবুও আমি এর সঠিক মর্ম অনুধাবন করতে সক্ষম হলাম না। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানিতে অবশেষে একদিন বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হলো। বিষয়টি হলো এই-
যখন মেধা ও বুদ্ধির মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের ইচ্ছা করা হয়, তখন আকল ইন্দ্রিয়শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে। সুতরাং তখন তার নিকট বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। তখন এ ধরনের আক্কলের ব্যাপারে আক্কল দিয়েই সতর্ক থাকা উচিত অর্থাৎ গভীর দৃষ্টিতে মাথা খাটিয়ে ভাবা উচিত। তখন বুঝে আসবে- স্রষ্টা কখনো শরীরজাতীয় হবেন না এবং তিনি কোনো জিনিসের সদৃশও হবেন না।
কোনো বুদ্ধিমান যখন আল্লাহ তাআলার কার্যাবলির দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন সে এমন অনেক বিষয় দেখতে পায়, যা তার আক্কেলে বুঝে আসে না। আক্কেল এর নিকট অসামঞ্জস্য মনে হয়। যেমন, সৃষ্টিজীবকে দুঃখকষ্ট দেওয়া, প্রাণীদের হত্যা করা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওপর শত্রুদের বিজয়ী করা- অথচ তিনি চাইলে এগুলো রোধ করতে পারেন।
এছাড়াও সৎ ব্যক্তিদের ক্ষুধা-দারিদ্র্যের মধ্যে আপতিত করা, জীবন ও জগতের বহুদিনের অতিবাহনের পর বহু পুরোনো কোনো গোনাহের কারণে অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করা। এমন আরও অনেক বিষয়, যেগুলোর সংগঠনের ক্ষেত্রে আক্কেল আপত্তির পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে এগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের প্রজ্ঞা, দয়া ও ইনসাফের প্রকাশ দেখতে পায় না।
তখন সে বেঁকে বসতে চায়।
এখন আকল দিয়ে আকল থেকে সতর্ক থাকার পদ্ধতি হলো, তাকে বলা হবে, আমার নিকট কি প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত নয় যে, তিনি স্রষ্টা, মালিক এবং প্রজ্ঞাময়? তিনি কোনো কিছুই তার প্রজ্ঞার বাইরে করেন না?
তখন সে বলবে, হ্যাঁ, আমি এটা মানি।
তাহলে এবার তাকে বলা হবে, যেহেতু তোমার নিকট প্রথম বিষয়টি প্রমাণিত, তাহলে আমরা তোমার এই দ্বিতীয় বিষয় অর্থাৎ অভিযোগ থেকে সতর্ক থাকতে চাই। প্রথম বিষয়টি অর্থাৎ তাঁর ‘প্রজ্ঞাময়’ হওয়ার বিষয়টি যেহেতু প্রমাণিত, তাহলে এখন তাঁর কর্মের প্রাজ্ঞতার বিষয়ে অস্পষ্টতা এসেছে তোমারই কমতি ও অক্ষমতার কারণে। সুতরাং এখন মেনে নেওয়া ছাড়া আর তো কোনো কথা থাকতে পারে না।
এভাবে আকলের মাধ্যমে আকলকে বোঝালে সে নত হবে এবং মেনে নেবে।
কিন্তু অনেক মানুষ প্রথমেই আক্কলের চাহিদার নিকট সমর্পিত হয়ে স্রষ্টার কার্যাবলী নিয়ে বোকার মতো আপত্তি ও অভিযোগ তুলতে থাকে। নিজের নিকট যেকোনো অপছন্দীয় বিষয় ও ঘটনা নিয়ে বলতে থাকে, কেন এমনটা হলো? কেন এমনটা হবে? দুর্ভাগা মূর্খের মতো বলে বসে, কেন আমার এমন খারাপ পরিণতি হলো? কেন আমাকে দরিদ্র করা হলো? কেন এভাবে আমাকে হাজারও বিপদে আপতিত করা হলো?... এভাবে নানান প্রশ্ন ও অভিযোগ সে করতে থাকে।
কিন্তু সে যদি একটি বিষয় লক্ষ করে দেখত- তিনি হলেন স্রষ্টা মালিক এবং প্রজ্ঞাময়। সবকিছুর ভালোমন্দ তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেন, তাহলে তার নিকট অস্পষ্ট বিষয়ে তার মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকে না। এবং নিজের মুক্তি ও পরকালিন শান্তির জন্য এটাই তো হওয়া উচিত।
কিন্তু জগতের অনেকেই শুধু আক্কলের বাহ্যিক যুক্তির দিকটাই ধরে থেকেছে। এদের মধ্যে প্রথম হলো ইবলিস। তার যুক্তিতে মাটির ওপর আগুনের শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে। সুতরাং সে অবনত হতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা দেখেছি, অনেক ব্যক্তি—যাদেরকে পণ্ডিত মনে করা হয়—তারাও এই বাহ্যিক যুক্তির পেছনে পড়েছে এবং অনিবার্যভাবে তারাও স্রষ্টার কার্যাবলির বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি ও অভিযোগ তুলতে শুরু করেছে। তারা ঘোষণা করতে চেয়েছে যে, স্রষ্টার অনেক কাজের পেছনেই কোনো প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা বা ন্যায্যতা নেই।
এই সকল ব্যক্তিরও সেই একই সমস্যা। তারা তাদের আকল নিয়ে ধ্বংস হতে বসেছে। কিন্তু তারা যদি আরেকটু আকল খাটিয়ে স্রষ্টার প্রজ্ঞাবান হওয়ার বিষয়টা আগে লক্ষ করে নিত, তবে আর এই বিভ্রান্তিতে আপতিত হতে হতো না। কিন্তু তারা সেটা না করে নির্ভর করেছে নিজেদের আকলের বাহ্যিক যুক্তি, নিজেদের অভ্যাস এবং সৃষ্টির কাজের ওপর স্রষ্টার কার্যাবলিকে তুলনা করার ওপর। এটাই তাদের বিভ্রান্তির মৌলিক কারণ।
কিন্তু তারা যদি আক্কলের গভীরতায় লক্ষ করত, তাহলে তারা বুঝত- তিনি আসলে এমনই প্রজ্ঞাবান, যিনি কখনো কোনো অনর্থক কাজ করেন না। তাঁর কোনো কাজই কল্যাণ ও হিকমতের বাইরে না। তাহলে যেগুলো আকল দিয়ে বুঝতে অসুবিধা, তার সে কাজগুলোও মেনে নিতে আর কোনো বাধা থাকত না।
এই বিষয়টি হজরত মুসা ও খাজির আলাইহিমাস সালামের ঘটনার মাধ্যমে বুঝে নেওয়া যায়। হজরত খাজির আলাইহিস সালাম যখন এমন কাজ করতে লাগলেন, যা আকলে ধরে না। বাহ্যিক যুক্তির বিচারে যা অন্যায় ও অপরাধ। তখন হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এগুলোকে অপছন্দ করলেন এবং আপত্তি করতে লাগলেন এবং তিনি যে অভিযোগ না করার ওয়াদা করেছিলেন, সেটাও ভুলে গেলেন। কিন্তু অবশেষে যখন এর হিকমত ও লুকায়িত কল্যাণের বিষয়টি তাঁকে জানানো হলো, তখন তিনি নির্দ্বিধায় তা মেনে নিলেন।
এখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, একজন বান্দার সাথেই যদি কল্যাণকর পরিণামের কথা হজরত মুসা আলাইহিস সালামের মতো নবীর নিকট অস্পষ্ট থেকে যায়, তবে তো আমাদের নিকট অবশ্যই মহান স্রষ্টা প্রজ্ঞাময় রবের হিকমত ও কল্যাণের বিষয়টি অজানা থাকা আরও বেশি স্বাভাবিক।
এটি হলো এমন এক মূলনীতি, এটি যদি কারও বোধে না থাকে, তবে সে আপত্তি-অভিযোগ করতে করতে কুফরির দিকে ধাবিত হয়ে যেতে পারে। আর যদি এটি কারও বোধে ও বিশ্বাসে থাকে, তবে সে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে স্বস্তি ও নিরাপত্তা বোধ করতে পারে।
📄 সম্পদের লোভ সবচেয়ে জঘন্য ব্যাধি
অধিকাংশ মানুষই একটি প্রান্তে অবস্থান করে- হয়তো বাড়াবাড়ি নয়তো ছাড়াছাড়ি। সমাজে মধ্যপন্থার মানুষ একেবারেই বিরল।
কিছু মানুষের স্বভাব এমনই কঠোর কঠিন ও রুক্ষ যে, ক্ষণে ক্ষণে রাগান্বিত হয়ে যায়, মারামারি বা হত্যাকাণ্ডও ঘটিয়ে ফেলে। আবার কিছু মানুষ রয়েছে এমন শীতল ও সহনশীল- গাল ভরে গালি দিলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কিছু মানুষ আছে এমনই লোভী ভোগী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী যে, যা মনে আসে তা-ই পেতে চায়। সকল উপভোগ্যতাকে উপভোগ করতে চায়। আবার উল্টো দিকে কিছু মানুষ আছে এমন কৃচ্ছতা ও নিরাসক্ততার অধিকারী যে, চাহিদা কম, খাওয়া-দাওয়া কম। এমনকি নফসের স্বাভাবিক চাহিদাগুলোও পূরণ করতে চায় না।
এমনকি ভালো কাজের ক্ষেত্রেও মানুষের এই প্রান্তিকতা বিদ্যমান। কিছু কিছু দানকারী আছে, যা পায় সব দান করে দেয়। এটা আসলে তার অপচয়। আবার এমন জবর অকাট কৃপণ মানুষও আছে, সম্পদ লুকিয়ে রাখে। নিজের কোনো উপকারেই সেগুলো ব্যবহার করে না। নিছক শুধু টাকা-সম্পদ গচ্ছিত করতে থাকে। অথচ জানা বিষয়- টাকা-সম্পদের সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো তা দ্বারা উপকার লাভ করা। প্রয়োজন পূরণ করা। কিন্তু কৃপণ মানুষের যেন সেসবের কোনো বালাই নেই।
মানুষ যখন তার সম্পদ অবিবেচকের মতো অপচয় করে, তখন সে ধীরে ধীরে তার মান সম্মান ও দ্বীনকেও ধ্বংস করতে থাকে। পরিণতি হয় খুবই খারাপ। তখন সে কৃপণদের সম্পদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাতে থাকে এবং কৃপণের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এটা তো ঠিক নয়। বরং বন্ধুর কাছে হাত পাতার চেয়ে প্রয়োজনে শত্রুর জন্যও সম্পদ রেখে যাওয়া ভালো। জীবনের এই প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ সংরক্ষণের বিষয়টি অনেকেই গুরুত্ব দেয় না। পরিণামে তাদেরকে এক সময় ভীষণ পস্তাতে হয়। বহু লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। এ থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
তবে মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনই কৃপণ ও বখিল যে, কৃপণতায় তারা একজন একেকটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। তারা যেন টাকা-সম্পদের প্রেমিক হয়ে ওঠে। প্রচুর দুর্বলতা ও অসুস্থতার মধ্যেও তারা তাদের সম্পদ খরচ করতে চায় না। অবশেষে একসময় এভাবেই মারা যায় এবং তাদের সম্পদগুলো উপভোগ করে অন্যরা।
এ ব্যাপারে আমার নিকট এমন কিছু ঘটনা রয়েছে- যার কোনো তুলনা হয় না। আমি সেগুলোর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি- যাতে এর দ্বারা আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
১. আমাদের উস্তাদ ফযল ইবনে নাসের রহ. তাঁর উস্তাদ আবদুল মুহসিন সুরী থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। আবদুল মুহসিন বলেন, সুর এলাকায় একজন ব্যবসায়ী একাকী তার ঘরে অবস্থান করত। প্রতিদিন রাতের খাবারের জন্য সে দোকান থেকে শুধু দুটো রুটি ও একটি আখরোট ক্রয় করত। এগুলো নিয়ে সন্ধ্যার পর সে তার কামরায় ফিরে আসত। হালকা আগুনে আখরোটটি গরম করত। এরপর সেই গরম আখরোটের সাথে রুটি দুটো ছুঁইয়ে খেয়ে নিত।
এভাবেই দীর্ঘদিন সে তার প্রতিদিনের রাতের একমাত্র খাবার সম্পন্ন করত। অবশেষে একদিন সে মারা গেল। তখন তার নিকট থেকে ৩০ হাজার দিরহাম বের হলো। সুরের বাদশাহ সবকিছু নিজে নিয়ে নিলেন।
২. আমি একজন বড় আলেমের ব্যাপারে জানি। আমি নিজেও তাকে দেখেছি। একবার তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন তার এক বন্ধুর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করলেন। অথচ সেই বন্ধুটির তখন কোনো খাদেম-চাকর ছিল না, যে তার সেবা-শুশ্রুষা করতে পারে। সে সময় কোনো খাদেম রেখে দেবে-এমন আর্থিক সংগতিও ছিল না। বাধ্য হয়ে নিজেই সবকিছু করল। দীর্ঘ কষ্ট ও পরিশ্রম করল এবং যথাসাধ্য যা আছে তা নিয়ে ওষুধ-পথ্য জোগাড় করল।
অবশেষে এই দীর্ঘ অসুস্থতার পর একদিন সেই আলেম মারা গেলেন। এরপর তার কিতাবপত্রের মধ্য থেকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা বের হলো! এর কথা তিনি কাউকে বলে যাননি এবং তার থেকে একটি মুদ্রাও এই ভীষণ অসুস্থতার সময়ও খরচ করতে চাননি!
৩. আবুল হাসান রানদিসি আমাকে একটা ঘটনা বলেছেন। তিনি বলেন, আমাদের এক প্রতিবেশী একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। আমাদের খবর দেওয়া হলো। আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। তখন সে জানাল, 'আমার সকল সম্পদের ওপর বিচারক সিলগালা করে দিয়েছে। আমি তো সেগুলো নিতেও পারি না, খরচ করতেও পারি না।'
আমি বললাম, আপনি যদি চান, তবে আমি উদ্যোগ নিয়ে এটা ছুটিয়ে দিতে পারি। আমি উকিল ধরব এবং পুরো সম্পদের এক তৃতীয়াংশ আপনাকে দেবো। আপনি সেটা ভাগ করে নেবেন এবং আপনার অংশ নিয়ে তখন ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবেন।'
লোকটি তখন বলে উঠল, আল্লাহর কসম, আমি কখনো এই সম্পদ বিছিন্ন করব না। বরং আমার সম্পদ আমার নিকট এভাবেই থাকুক- অক্ষুণ্ণ।'
আমি বললাম, তারা আপনাকে সামান্য কিছুও দেবে না। আপনি এ জীবনে তাদের থেকে কিছুই পাবেন না। কিন্তু আমি তো আপনাকে এক তৃতীয়াংশ আপনার স্বাধীনভাবে খরচ করার জন্য দিতে চাচ্ছি- তবুও দেবেন না?
লোকটি বলল, না, আমি সেটা দিতে পারি না।
এর কিছুদিন পরই লোকটি বিনা চিকিৎসায় মারা গেল এবং বিচারকের মাধ্যমে সরকার তার সকল সম্পদ নিয়ে নিল।
৪. আবুল হাসান রানদিসি আমাকে আরেকটি অতি আশ্চর্য রকম ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি ঘটনাটি শুনেছেন মূল ব্যক্তি থেকে। লোকটি তাকে জানিয়েছে, একবার আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন তিনি আমাকে একদিন বললেন, আমার জন্য তুমি কিছু 'খাবিছ' [ঘি ও খেজুর মিশিয়ে তৈরি একপ্রকার মিষ্টান্ন] কিনে আনো। আমি ভাবলাম, নিশ্চয় তার এটা খেতে ইচ্ছা করেছে। তাই কথামতো তার জন্য আমি খাবিছ কিনে আনলাম।
তিনি এক কামরায় থাকতেন আর আমরা ভিন্ন কামরায়। হঠাৎ পরদিন আমার ছোট ছেলে হন্তদন্ত হয়ে এসে আমাকে খবর দিলো- বাবা, তোমার শাশুড়ি স্বর্ণ গিলে খাচ্ছে। অবস্থা খুবই খারাপ তুমি দ্রুত এসো।'
আমি দ্রুত তার নিকট ছুটে গেলাম। দেখলাম ছেলের কথা সত্য। তিনি গতকাল আমার কিনে আনা ঘি মিশ্রিত তৈলাক্ত খাবিছের সাথে মাখিয়ে মাখিয়ে স্বর্ণমুদ্রা গিলছেন। আমি দ্রুত গিয়ে তার হাত ধরে এটা থেকে নিবৃত করলাম। ব্যস্ত হয়ে বললাম, আপনি এটা করছেন কেন?
তিনি বললেন, আমি ভয় করছি, তুমি বোধ হয় আমার মেয়ে রেখে আরেকজনকে বিয়ে করে বসবে। তাই যতটুকু পারি...।
আমি বললাম, আমি কখনো এমন করব না।
তিনি বললেন, আমার নিকট শপথ করো।
আমি শপথ করলাম। এরপর তিনি তার হাতের অবশিষ্ট স্বর্ণগুলো আমার নিকট অর্পণ করলেন। এর কিছুদিন পরই তিনি মারা গেলেন। তাকে যথাযথ মর্যাদার সাথে পাশের কবরস্থানে দাফন করে এলাম।
এই ঘটনার অনেক দিন পর আমাদের একটি ছোট শিশু মারা গেল। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী গোরস্থানের জায়গার স্বল্পতার কারণে শিশুটিকে আমার শাশুড়ির কবরেই দাফন করা হলো। এ সময় সাধারণত আগের কবরের হাড়-গোড় উঠিয়ে ফেলা হয়। হঠাৎ বহু আগের সেই ঘটনা মনে পড়ায় আমি সঙ্গে করে একটি সুতির কাপড়খণ্ড নিয়ে গিয়েছিলাম। কবরখোদককে বললাম, হাড়গুলো আপনি এই কাপড়খণ্ডের মধ্যে তুলে দিন। সে আমার কথা অনুযায়ী কাজ করল।
আমি সেগুলো নিয়ে বাড়িতে এসে একটি ছিদ্র গামলার মধ্যে রাখলাম। এরপর তার উপর কয়েক পাত্র পানি ঢেলে দিলাম। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো তা থেকে প্রায় আশি-নব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে এলো। এই সবগুলো আমার শাশুড়ি গিলে খেয়েছিলেন।
৬. আমাদের একবন্ধু বলেন, একবার একটা লোক মারা গেল। ঘরের মধ্যেই তাকে দাফন করা হলো। এরপর এক প্রয়োজনে তাকে সেখান থেকে বের করে আনার জন্য কবর খনন করা হলো। তখন তার মাথার নিচে আলকাতরায় প্রলেপ দেওয়া একটি ইট পাওয়া গেল। তার পরিবারকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো।
তখন তারা বলল, 'তিনি এই ইটটি আলকাতরা দিয়ে প্রলেপ দিয়েছিলেন এবং আমাদের ওসিয়ত করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর তার কবরে যেন এটা তার মাথার নিচে রাখা হয়। সে কারণেই এমনটি করা হয়েছে।'
লোকজন বলল, ইট তো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এই আলকাতরাগুলো নষ্ট হবে না। তারা ইটটিকে উঠিয়ে দেখল তা খুবই ভারি। এরপর তারা কৌতূহলী হয়ে সেটাকে ভেঙে ফেলল এবং তখন আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল- সেখানে প্রায় ৯০০ স্বর্ণমুদ্রা লুকায়িত রয়েছে।
৬. এক ব্যক্তির কথা শুনেছি, লোকটি মসজিদ ঝাড়ু দিত। মসজিদের ঝাড়ু দেওয়া ধূলি-বালি একত্র করে সে সাইজমতো ইট বানাত। তাকে একবার প্রশ্ন করা হলো, এটা করার কী কারণ?
লোকটি বলল, এটা তো বরকতময় মাটি। আমি এ দ্বারা ইট বানিয়ে রাখছি। আমার মৃত্যুর পর তোমরা এই ইটগুলো আমার কবরে সাজিয়ে দেবে।
অনেক দিন পর লোকটি যখন মারা গেল, তখন তার কথামতো কবরের মধ্যে এগুলো সাজিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কিছু ইট অতিরিক্ত থেকে গেল। সেগুলো বাড়িতে এনে এক জায়গায় রেখে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। ইটগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সেগুলোর মাটি গলে গেল। তখন একটি অবাক কাণ্ড দেখা গেল- প্রতিটি ইট হতে অনেক স্বর্ণমুদ্রা বেরিয়ে আসতে লাগল!
এরপর তারা আবার কবরের নিকট গেল এবং কবর খনন করে ইটগুলো বের করে আনল। দেখা গেল- এগুলোরও প্রতিটির মধ্যে স্বর্ণমুদ্রা লুকানো ছিল।
৭. একবার আমাদের এক বন্ধু বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। আমি জানতাম তার অনেক সম্পদ আছে। কিন্তু সেগুলো সে তার চিকিৎসায় খরচ করেনি। ঘটনা হলো, একবার সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং অসুস্থতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে লাগল। তবুও সে তার সম্পদ সম্পর্কে কাউকে কিছু জানাল না। আমি বুঝতে পারছিলাম, এই অসুস্থতা থেকে আর হয়তো রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সে তখনো আশা করে যাচ্ছিল, এভাবেই এমনিতেই সেরে যাবে। সে নিজের টাকা থেকে চিকিৎসার জন্য খরচ তো করত না, এমনকি তার গচ্ছিত পুঁতে রাখা সম্পদ সম্পর্কে কাউকে জানাতেও চাচ্ছিল না। সে ভয় করছিল, তার জীবদ্দশায় অন্যকেউ তার সম্পদ নিয়ে নেবে। কিন্তু একদিন সে মারাই গেল। তার সম্পদ অন্যদের হস্তগত হলো।
মানুষের জীবনে এর চেয়ে লাঞ্ছনার আর কী হতে পারে।
৮. আমাদের এক বন্ধু এ ব্যাপারে খুবই মজার ও করুণ একটি ঘটনা আমাকে শুনিয়েছে। একটি লোকের ছিল তিনটা সন্তান। দুটো ছেলে আর একটি মেয়ে। তার অনেক স্বর্ণমুদ্রা একটি গোপন জায়গায় সংরক্ষিত ছিল। একদিন এই লোকটি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। পরিবারের সকলে তার চারপাশ ঘিরে থাকল- কখন কী বলে। কিন্তু কারও নিকটেই কিছু বলল না। শুধু গোপনে তার এক ছেলেকে ইশারা করে রাখল, তুমি আমার কাছ থেকে দূরে সরবে না।
একসময় সুযোগ পেয়ে সেই ছেলেকে একাকী কাছে ডেকে লোকটি বলল, 'তোমার ভাই পাখির খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর তোমার বোন বিয়ে করেছে এক তুর্কি ছেলেকে। আমার সম্পদ যদি তাদের হাতে পড়ে, তবে তারা তা নষ্ট করে ফেলবে। আর তুমি পেয়েছ আমার স্বভাব ও চরিত্র। তুমিই শুধু আমার সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হবে। তোমার প্রতি আমার ভরসা রয়েছে। অমুক জায়গায় একজাহার স্বর্ণমুদ্রা গোপন করে রাখা আছে। আমি যখন মারা যাব, তখন তুমি সেটা একাই নিয়ে নেবে। কাউকে জানাবে না।'
এর মধ্যে লোকটির অসুস্থতা ভীষণ আকার ধারণ করল। তখন ছেলেটি বাবার জানিয়ে দেওয়া নির্দিষ্ট স্থান থেকে সম্পদ হস্তগত করে নিল। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। তখন সে ছেলের নিকট ধরনা দিতে লাগল-সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ছেলে যেহেতু বাবারই স্বভাব পেয়েছে। তাই সে সম্পদ হাতছাড়া করবে কেন? সে আর বাবার কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেয় না। সে-ও তা গোপন জায়গায় লুকিয়ে ফেলেছে। যতই বাবার পক্ষ থেকে চাওয়াচাওয়ি, মিনতি করা হোক- ছেলেটি আর সম্পদ ফিরিয়ে দেয় না। লোকটি ভীষণ সমস্যার মধ্যে পড়ে গেল। আসলেই ছেলেটি হুবহু তার স্বভাব পেয়েছে- নাকি একধাপ বেশি!
এরমাঝে একদিন ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। এবার পিতা ছেলের কাছে অনুনয়-কাকুতি করে বলতে লাগল, এ তোমার কেমন আচরণ! আমি অন্যদের না দিয়ে শুধু তোমাকেই সম্পদগুলো দিয়েছিলাম; যাতে তুমি সেটা সংরক্ষণ করতে পারো। এখন তুমি অসুস্থ হয়ে পড়েছ। যদি সম্পদের কথা না বলে মারা যাও, তবে তো সম্পদ নষ্টই হয়ে যাবে। এই জন্যই কি আমি তোমার কাছে সম্পদ দিয়েছিলাম। এ তোমার কেমন সংরক্ষণ! খবরদার, এমনটি করো না... এমনটি করো না... সব নিঃশেষ হয়ে যাবে।
এভাবে সেই বাবা বহু অনুনয় বিনয় অনুরোধ তিরস্কার ভর্ৎসনা- সবই করতে লাগল। অবশেষে নিরাশ হয়ে ছেলে বাবার নিকট সম্পদের কথা জানিয়ে দিল।
এর কয়েক দিন পর ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠল। দিন যেতে থাকল। এরপর আবার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ভীষণ অসুস্থ। সেরে ওঠার আর তেমন আশা করা যায় না। এবার আবার ছেলেটি এসে বাবার নিকট ধরনা দিতে লাগল- সম্পদটা কোথায় রেখেছ, বলে যাও বাবা। তুমি যদি এভাবে মারা যাও, তবে তো নষ্ট হয়ে যাবে। একটু অনুগ্রহ করো। একটু বলে যাও।
কিন্তু কিছুতেই আর এবার বাবার মন গলল না। সে কাউকেই আর সম্পদের কথা বলল না। কিছুদিন পর এভাবেই সে মারা গেল। কিন্তু সম্পদের কথা আর কারও জানা হলো না। তা সকলের নিকট অজানা এবং অধরাই থেকে গেল।
এতক্ষণ যাদের কথা বলা হলো- এদেরকে কি কখনো জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান বলা যায়- যদিও জ্ঞান ও বুদ্ধি থাকে? এদেরকে কি কখনো ধনী ও সম্পদশালী বলা যায়- যদিও ধন ও সম্পদ থাকে?
জীবনযাপনের ক্ষেত্রে- এরাই হলো প্রকৃত জাহেল ও মূর্খ। এরাই হলো প্রকৃত ফকির ও দরিদ্র।
আল্লাহ তাআলা হয়তো এ ধরনের লোকদের ক্ষেত্রে ইরশাদ করেন- ﴿إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا ﴾
তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো। বরং তারা তার চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট। [সুরা ফুরকান: ৪৪]
📄 হারানো ভ্রান্ত ও বন্ধুত্ব
এক সময় কিছু ব্যক্তিকে আমি আমার বন্ধু ও সঙ্গী ধারণা করতাম। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম তাদের কেউ কেউ রূঢ় ব্যবহার করে, হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বের শর্তের সাথে যা সমঞ্জস নয়। তাদেরকে তখন তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর হঠাৎ আমার নিজে নিজেই বোধোদয় হলো- এটা তো ঠিক হচ্ছে না। মনে মনে বললাম, এর মাধ্যমে উপকারটা কী? তারা যদি বন্ধু ও সঙ্গীর উপযুক্ত হয়েই থাকে, তবে তো তাদের তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করা চলে না। আর যদি উপযুক্ত না হয়, তবে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়াই উত্তম।
এর কিছুদিন পর দুনিয়ার জীবনযাপন বিষয়ে একটি আশ্চর্য চিন্তা আমার মাথায় এলো। আমি ভেবে দেখলাম- যাদের সাথে আমার চলাচল তাদের সাথে আমার সম্পর্ক তিন ধরনের:
১. নিছক পরিচিত মুখ- দেখা হলে সালাম বিনিময়। এর পাশাপাশি অল্পস্বল্প দু-একটা কথাবার্তা কখনো হয়- কখনো হয় না।
২. বাহ্যিকভাবে বন্ধু- প্রকাশ্যভাবে যাদের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ কথা ও আচরণ চলে।
৩. আন্তরিক একনিষ্ঠ সঙ্গী- যাদের সাথে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে।
এবার আমি চিন্তা করলাম, মানুষের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে লাভ কী- তারচেয়ে বরং যাদেরকে আন্তরিক মনে হবে না, তাদেরকে মনে মনে 'আন্তরিক সঙ্গী'-এর তালিকা থেকে বের করে 'বাহ্য বন্ধু'র তালিকায় এনে রাখলেই হয়। আর যদি এটারও যোগ্য তারা না হয়, তবে তাদেরকে নিছক 'পরিচিত' ব্যক্তির কাতারে রেখে দিতে হবে। তাদের সাথে আচরণ হবে নিছক একজন পরিচিত ব্যক্তির মতোই- কোনো মাখামাখি নয় আবার বিরোধিতাও নয়।
অর্থাৎ সম্পর্ক ছিন্ন না করে যার যার অবস্থান মতো তাকে সেখানে রেখে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর অযথা তিরস্কার করে বা অভিযোগ তুলে বন্ধুত্ব ঝালাই করতে চাওয়াটা হবে নিতান্তই বোকামি।
হজরত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায রহ. বলেন, সেই ভাই বা সঙ্গীর চেয়ে খারাপ ভাই বা সঙ্গী আর কে আছে, যাকে তোমার বলতে হবে, 'তোমার দুআর মধ্যে আমাকে স্মরণ রেখো।'
আজকের দিনে অধিকাংশ মানুষই একে অপরের পরিচিত। এদের মধ্যে বাহ্যিক বন্ধুর সংখ্যাও অনেক কম। আর আন্তরিক বন্ধু বা সঙ্গীর বিষয়টা এখন এতটাই দুর্লভ যে, তার আশা না করাই ভালো। হ্যাঁ, আত্মীয়তার মাধ্যমে কিছু সম্পর্ক—যেমন পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে থাকা সম্পর্ক—এগুলোর কথা ভিন্ন। অবশ্য এখানেও আন্তরিকতা থাকতে পারে, না-ও পারে। অতএব সবার থেকেই নিজেকে একটু আলাদা স্থানে রেখে সবার সাথেই নিতান্ত অপরিচিত ব্যক্তিদের মতো ইনসাফপূর্ণ আচরণ করে চলা উচিত। আর যে ব্যক্তি তোমার প্রতি আজ হৃদ্যতা বা সম্প্রীতি প্রকাশ করছে, তুমি তাতে ধোঁকায় পতিত হয়ো না। সময় যেতে দাও। সময় ও পরিস্থিতিই একদিন বলে দেবে—তার এই হৃদ্যতা আন্তরিক নাকি ভান। কারণ, অনেক সময়ই সুবিধাবাদী মানুষ অকারণে হৃদ্যতা প্রকাশ করে—যাতে তোমার মন গলিয়ে তোমার থেকে তার স্বার্থ হাসিল করতে পারে।
হজরত ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. বলেন, 'তুমি যখন কাউকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন করতে চাও, তখন তুমি তাকে কোনো বিষয়ে হঠাৎ রাগিয়ে দাও। সে যদি তার এই রাগান্বিত অবস্থায়ও তোমার প্রতি 'ইনসাফ' বা ভালো ব্যবহার বজায় রাখে, তাহলে তুমি তাকে নিশ্চিন্তে একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারো।'
অবশ্য আজকের দিনে এই পরীক্ষা করাটাও আশঙ্কাজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এখন মানুষের আচরণ এতটাই তীব্র ও তপ্ত যে, তুমি যদি কাউকে রাগিয়ে দাও, সে হয়তো তাৎক্ষণিক তোমার শত্রুতে পরিণত হয়ে তোমার ক্ষতি করে বসবে!
মানুষের আচরণের এই অধঃপতনের কারণ হলো, আজ আমাদের মধ্য থেকে আন্তরিকতা দূর হয়ে যাচ্ছে। আমরা দিন দিন খুবই স্বার্থবাদী হয়ে পড়ছি। অথচ আমাদের 'সালাফে সালেহিন'-এর মূল লক্ষ্যই ছিল আখেরাত। একারণে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের মধ্যে তাদের নিয়ত ছিল বিশুদ্ধ, ভোরের বাতাসের মতো নির্মল। তাদের লক্ষ্য ছিল দ্বীন ও আখেরাত; দুনিয়া নয়। আর আজ আমাদের সকলের অন্তরের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছে দুনিয়ার ভালোবাসা এবং দুনিয়া প্রাপ্তির লালসা। তাই আমাদের আচরণে এত কৃত্রিমতা।
তবুও বলি, শুধু দ্বীনের জন্য বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা রাখে—এমন কাউকে যদি পাও, তবে তাকে সাদরে গ্রহণ করে নাও। আজকের যুগে এ বড় দুর্লভ বিষয়।