📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বুদ্ধিমান ব্যক্তির কোনো উদাসীনতা থাকে না

📄 বুদ্ধিমান ব্যক্তির কোনো উদাসীনতা থাকে না


জ্ঞান ও বুদ্ধি যখন পরিপক্ক হয়, দুনিয়ার আস্বাদন তখন বিদূরীত হয়ে যায়। শরীর ভেঙে পড়ে। অসুস্থতা বাড়তে থাকে। চিন্তা-কষ্ট তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকে।
কারণ, জ্ঞান ও বুদ্ধি যখন সবকিছুর পরিণামের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন সে দুনিয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তখন সে তার সুদূর স্থায়িত্বের দিকে ধাবিত হয়। তখন তার কাছে আর তাৎক্ষণিক স্বাদ-আহ্লাদের কোনো মূল্য থাকে না।
দুনিয়ার আনন্দ-স্ফূর্তি নিয়ে তারাই মেতে থাকে, যারা আখেরাতের চিন্তা থেকে গাফেল ও উদাসীন। যারা আসন্ন ভয়াবহতা সম্পর্কে অসতর্ক। কিন্তু জ্ঞান ও বুদ্ধি যার পরিপক্ক হয়েছে এবং দৃষ্টিতে দূরদর্শিতা এসেছে, সে তো আর উদাসীন ও অসতর্ক থাকতে পারে না। এ কারণেই হয়তো সে অন্যদের মতো সকল মানুষের সাথে নির্বিবাদে মিশতে পারে না। অবুঝ মানুষদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। তারাও যেন তার শ্রেণির নয়। সেও যেন তাদের শ্রেণির নয়।
যেমন জনৈক কবি বলেন, ما في الديار أخو وجد نطارحه ... حديث نجد ولا خل نجاريه
ঘরে নেই ব্যথার সাথি, যার সাথে কিছু সন্তুষ্টচিত্ত কথা বলতে পারি। নেই কোনো এমন বন্ধু, আপন বলে যাকে কাছে টানতে পারি।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সকল কাজে সতর্কতা অবলম্বন করা

📄 সকল কাজে সতর্কতা অবলম্বন করা


বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত সকল কাজেই যথাসম্ভব সর্বোচ্চ পরিমাণে সতর্কতা অবলম্বন করা। সতর্কতা সত্ত্বেও যদি ভাগ্যের কিছু ঘটে যায়, তবে সেটা কষ্ট দেবে না।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সকল বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত এবং সে জন্য প্রস্তুত থাকা ও প্রয়োজন। এটা সকল অবস্থার জন্যই প্রযোজ্য।
একবার একলোক তার নখ কাটছিল। অসতর্কতায় আঙুলের কিছু অংশ কেটে গেল। এতে একসময় তার হাতটিই পচে গেল। অবশেষে এতে করে লোকটি মারাই গেল।
আমাদের উস্তাদ শায়খ আহমদ আল হারাবি রহ. একবার বাহনে সাওয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রাস্তা ছিল খুবই সংকীর্ণ। বাধ্য হয়ে বরফের ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। এতে তার বক্ষ সংকীর্ণ হয়ে উঠল। ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তাতেই ইন্তেকাল করলেন।
ইয়াহইয়া ইবনে নিযার নামে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রায় আমার মজলিসে আগমন করতেন। একদিন তার কান ভারি ভারি লাগছিল। যেন কানের মধ্যে ঘণ্টাধ্বনি বাজছে। কানে জোরে একটি থাপ্পড় দিলেন। মগজ থেকে কিছু একটা বের হয়ে এল এবং তৎক্ষণাৎ তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কতার বিষয়টি লক্ষ করে দেখো—তিনি একবার এক হেলে পড়া দেয়ালের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় দ্রুত রাস্তা পার হলেন। এছাড়া তার জীবনের অন্যান্য কাজেও সতর্কতা ছিল সব সময়। কত আগেই না হিজরত সম্পর্কে আবু বকর রা.-কে সজাগ করে দিয়েছিলেন!
একজন মানুষের জন্য কর্তব্য হবে- সে তার যৌবনের উপার্জনে সতর্কতার সাথে বৃদ্ধ বয়সের জন্য সঞ্চয় করে রাখবে। জীবনের কোনো কারবার বা লেনদেনের ক্ষেত্রে পরীক্ষিত আস্থাবান না হলে কারও ওপর আস্থা করে বসবে না। কখন মৃত্যু এসে যায় ঠিক নেই, কিছু ওসিয়ত করতে হলে আগেই করে রাখবে। শত্রুর ক্ষেত্রে যেমন সতর্ক থাকবে, বন্ধুর ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকবে এবং জীবনে কখনো কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার হৃদ্যতার ব্যাপারেও সতর্ক থাকবে। কারণ, তার অন্তরের ক্রোধ বা ক্ষোভ হয়তো এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। সুযোগ পেলে যেকোনো সময় ক্ষতি করতে পারে।
মুসতারশিদের খেলাফতের সময় কবি ইবনে আফলাহ গোপনে তার নেতার সাথে চিঠি আদান-প্রদান করত। এই ঘটনা জানত তার দারোয়ান। ঘটনাক্রমে একসময় তিনি তার দারোয়ানকে বাদ দিয়ে দিলেন। দারোয়ান ক্ষুব্ধ হয়ে কবির গোপন চিঠি আদান-প্রদানের কথা ফাঁস করে দিলো। পরিণামে বাদশাহর বাহিনী এসে কবির বাড়ি-ঘর সব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেল।
এখানে মাত্র অল্পকিছু উদাহরণ উপস্থাপন করা হলো। এমন অসতর্কতার ভয়াবহ পরিণতির ঘটনা ছড়িয়ে আছে আরও অনেক। মোটকথা সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে সতর্ক থাকতে হবে কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি প্রদানের ক্ষেত্রে, প্রকৃত তাওবার ক্ষেত্রে- তাকে মৃত্যু আক্রমণ করার আগেই। আর বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে অলসতার চোর থেকে। কারণ, সে মানুষের সময় চুরি করার ক্ষেত্রে ভয়াবহ রকমের দক্ষ।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইন্দ্রিয়জাত সুখ

📄 ইন্দ্রিয়জাত সুখ


আমি একবার চিন্তা করলাম রাজা-বাদশাহর পারস্পরিক লড়াই নিয়ে, ব্যবসায়ীদের লোভ নিয়ে, জাহেদদের কপটতা নিয়ে এবং মানুষের হিংসা ও শত্রুতা নিয়ে। তাদের অব্যাহত সীমাহীন গিবত, প্রতিশোধ ও অন্যায় নিয়ে। অবশেষে বুঝলাম, এগুলোর অধিকাংশই করা হয় বাহ্যিক ইন্দ্রিয়জাত আনন্দ ও সুখ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে।
কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি যদি একটু ভেবে দেখে, তবে সে জানতে পারবে- ইন্দ্রিয়জাত সুখ খুবই দ্রুত অপসারিত ও অবসাদিত হয়ে পড়ে। এখানে কখনোই সর্বোচ্চ বা সীমাহীন সুখ ও তৃপ্তি লাভ করা সম্ভব নয়। বরং কেউ যদি এক্ষেত্রে বেশি বাড়াবাড়ি করে- অতি বেশি রকমের সুখ আস্বাদন করতে চায়, তবে তো সে যতুটুকু সুখ পাবে, তার চেয়ে বহুগুণ কষ্টের মধ্যে নিজেকে আপতিত করবে।
একজন মানুষ কতই আর খেতে পারে এবং কতই আর সহবাস করতে পারে! বাড়াবাড়ি করলে নিজেকেই কষ্ট ও ধ্বংসের মধ্যে আপতিত করে ছাড়ে।
কিন্তু সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি- যিনি তার দ্বীনের সংরক্ষণে গুরুত্ব প্রদান করেন। দ্বীনকে প্রাধান্য দেন এবং দুনিয়া থেকে তার পরিমাণমতো গ্রহণ করেন- হালালভাবে।
আহা, কে বুঝবে, এটি এমন এক পোশাক, যে ব্যক্তি তা পরিমিতভাবে পরিধান করবে, পোশাক তার খেদমত করবে। আর যে ব্যক্তি অনেক বাড়িয়ে লম্বা করে বানাবে, তাকে নিজেকেই পোশাকের খেদমতে লাগতে হবে। আর যদি কোনো অহংকারী পোশাকবিলাসী তার নিজের পোশাকের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে অবলোকন করে, তবে আল্লাহ তখন তার দিকে আর তাকাবেন না!
সহিহ হাদিসে রয়েছে, একদা এক ব্যক্তি তার পরিধেয় চাদর নিয়ে অহমিকা দেখাচ্ছিল, এমতাবস্থায় সে ভূমিতে ধ্বসে গেল।
কারও পানাহার যদি হারাম হয়, তবে সে তার আস্বাদনের বহুগুণ বেশি শাস্তি প্রাপ্ত হবে। আর ধর্ষকের শরয়ি দণ্ড ছাড়াও সামাজিকভাবে তার ভিন্ন রকম মানসিক শাস্তি রয়েছে।
তুমি বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর বিষয়ে চিন্তা করে দেখো, তারা কত মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। কত হারাম কাজের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এগুলো করার দ্বারা তারা কী অর্জন করেছে? দুনিয়ার সামান্য কিছু ইন্দ্রিয়জাত সুখ ও আনন্দ। কিন্তু ভালো কাজ না করার আফসোস এবং মন্দের শাস্তি ভোগ তাদের উজ্জ্বল জীবনের ওপর কলঙ্কের ছায়া ফেলে দিয়েছে।
সুতরাং হে পাঠক, নিরালায় মহৎ ইলমচর্চাকারী আলেমের চেয়ে সুখী ও আনন্দদায়ক জীবন পৃথিবীতে আর কারও নেই। ইলমই তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ও সাথি। যতটুকু হালাল উপার্জনে নিজের দ্বীনকে রক্ষা করা সম্ভব, ততটুকুতেই সে সন্তুষ্ট। তার কোনো লোক দেখানো লৌকিকতার প্রয়োজন হয় না। এর জন্য নিজের দ্বীনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে হয় না। সে দুনিয়া ও তার অধিবাসীদের লাঞ্ছনা থেকে বহুদূরে সম্মানের চাদর পরিধান করে আছে। অঢেল সচ্ছলতা যদি তার না-ও থাকে, তবুও সে অল্পতেই সন্তুষ্টির পোশাকে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। আর এতেই সে তার দ্বীন ও দুনিয়া রক্ষা করার সহজ পথটি পেয়ে যায়।
ইলমের মধ্যে মগ্ন থাকা তাকে বহু শ্রেষ্ঠত্বের সন্ধান প্রদান করে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিভিন্ন উদ্যানে পরিভ্রমণ করিয়ে আনে। এটাই তাকে শয়তান থেকে, সুলতান থেকে এবং মানুষের ভিড় থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিরাপদ রাখে। কিন্তু এই অবস্থাটি শুধু একজন আলেমের জন্যই সমুচিত। কারণ, কোনো মূর্খ যদি এমন নির্জনতা অবলম্বন করতে যায়, তবে তো সে ইলম থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিপথগামী হয়ে পড়বে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পূর্ণতা একমাত্র স্রষ্টার

📄 পূর্ণতা একমাত্র স্রষ্টার


আমাকে একবার একজন জিজ্ঞাসা করলেন, এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, من لم يحترز بعقله هلك بعقله.
যে ব্যক্তি নিজের মেধা সম্পর্কে সতর্ক থাকে না, সে তার মেধার কারণেই ধ্বংস হয়।
এ কথাটির ব্যাখ্যা কী?
আমি তাৎক্ষণিকভাবে এ কথার কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। এমনকি এরপর আরও দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলো, তবুও আমি এর সঠিক মর্ম অনুধাবন করতে সক্ষম হলাম না। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানিতে অবশেষে একদিন বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হলো। বিষয়টি হলো এই-
যখন মেধা ও বুদ্ধির মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের ইচ্ছা করা হয়, তখন আকল ইন্দ্রিয়শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে। সুতরাং তখন তার নিকট বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। তখন এ ধরনের আক্কলের ব্যাপারে আক্কল দিয়েই সতর্ক থাকা উচিত অর্থাৎ গভীর দৃষ্টিতে মাথা খাটিয়ে ভাবা উচিত। তখন বুঝে আসবে- স্রষ্টা কখনো শরীরজাতীয় হবেন না এবং তিনি কোনো জিনিসের সদৃশও হবেন না।
কোনো বুদ্ধিমান যখন আল্লাহ তাআলার কার্যাবলির দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন সে এমন অনেক বিষয় দেখতে পায়, যা তার আক্কেলে বুঝে আসে না। আক্কেল এর নিকট অসামঞ্জস্য মনে হয়। যেমন, সৃষ্টিজীবকে দুঃখকষ্ট দেওয়া, প্রাণীদের হত্যা করা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওপর শত্রুদের বিজয়ী করা- অথচ তিনি চাইলে এগুলো রোধ করতে পারেন।
এছাড়াও সৎ ব্যক্তিদের ক্ষুধা-দারিদ্র্যের মধ্যে আপতিত করা, জীবন ও জগতের বহুদিনের অতিবাহনের পর বহু পুরোনো কোনো গোনাহের কারণে অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করা। এমন আরও অনেক বিষয়, যেগুলোর সংগঠনের ক্ষেত্রে আক্কেল আপত্তির পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে এগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের প্রজ্ঞা, দয়া ও ইনসাফের প্রকাশ দেখতে পায় না।
তখন সে বেঁকে বসতে চায়।
এখন আকল দিয়ে আকল থেকে সতর্ক থাকার পদ্ধতি হলো, তাকে বলা হবে, আমার নিকট কি প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত নয় যে, তিনি স্রষ্টা, মালিক এবং প্রজ্ঞাময়? তিনি কোনো কিছুই তার প্রজ্ঞার বাইরে করেন না?
তখন সে বলবে, হ্যাঁ, আমি এটা মানি।
তাহলে এবার তাকে বলা হবে, যেহেতু তোমার নিকট প্রথম বিষয়টি প্রমাণিত, তাহলে আমরা তোমার এই দ্বিতীয় বিষয় অর্থাৎ অভিযোগ থেকে সতর্ক থাকতে চাই। প্রথম বিষয়টি অর্থাৎ তাঁর ‘প্রজ্ঞাময়’ হওয়ার বিষয়টি যেহেতু প্রমাণিত, তাহলে এখন তাঁর কর্মের প্রাজ্ঞতার বিষয়ে অস্পষ্টতা এসেছে তোমারই কমতি ও অক্ষমতার কারণে। সুতরাং এখন মেনে নেওয়া ছাড়া আর তো কোনো কথা থাকতে পারে না।
এভাবে আকলের মাধ্যমে আকলকে বোঝালে সে নত হবে এবং মেনে নেবে।
কিন্তু অনেক মানুষ প্রথমেই আক্কলের চাহিদার নিকট সমর্পিত হয়ে স্রষ্টার কার্যাবলী নিয়ে বোকার মতো আপত্তি ও অভিযোগ তুলতে থাকে। নিজের নিকট যেকোনো অপছন্দীয় বিষয় ও ঘটনা নিয়ে বলতে থাকে, কেন এমনটা হলো? কেন এমনটা হবে? দুর্ভাগা মূর্খের মতো বলে বসে, কেন আমার এমন খারাপ পরিণতি হলো? কেন আমাকে দরিদ্র করা হলো? কেন এভাবে আমাকে হাজারও বিপদে আপতিত করা হলো?... এভাবে নানান প্রশ্ন ও অভিযোগ সে করতে থাকে।
কিন্তু সে যদি একটি বিষয় লক্ষ করে দেখত- তিনি হলেন স্রষ্টা মালিক এবং প্রজ্ঞাময়। সবকিছুর ভালোমন্দ তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেন, তাহলে তার নিকট অস্পষ্ট বিষয়ে তার মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকে না। এবং নিজের মুক্তি ও পরকালিন শান্তির জন্য এটাই তো হওয়া উচিত।
কিন্তু জগতের অনেকেই শুধু আক্কলের বাহ্যিক যুক্তির দিকটাই ধরে থেকেছে। এদের মধ্যে প্রথম হলো ইবলিস। তার যুক্তিতে মাটির ওপর আগুনের শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে। সুতরাং সে অবনত হতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা দেখেছি, অনেক ব্যক্তি—যাদেরকে পণ্ডিত মনে করা হয়—তারাও এই বাহ্যিক যুক্তির পেছনে পড়েছে এবং অনিবার্যভাবে তারাও স্রষ্টার কার্যাবলির বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি ও অভিযোগ তুলতে শুরু করেছে। তারা ঘোষণা করতে চেয়েছে যে, স্রষ্টার অনেক কাজের পেছনেই কোনো প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা বা ন্যায্যতা নেই।
এই সকল ব্যক্তিরও সেই একই সমস্যা। তারা তাদের আকল নিয়ে ধ্বংস হতে বসেছে। কিন্তু তারা যদি আরেকটু আকল খাটিয়ে স্রষ্টার প্রজ্ঞাবান হওয়ার বিষয়টা আগে লক্ষ করে নিত, তবে আর এই বিভ্রান্তিতে আপতিত হতে হতো না। কিন্তু তারা সেটা না করে নির্ভর করেছে নিজেদের আকলের বাহ্যিক যুক্তি, নিজেদের অভ্যাস এবং সৃষ্টির কাজের ওপর স্রষ্টার কার্যাবলিকে তুলনা করার ওপর। এটাই তাদের বিভ্রান্তির মৌলিক কারণ।
কিন্তু তারা যদি আক্কলের গভীরতায় লক্ষ করত, তাহলে তারা বুঝত- তিনি আসলে এমনই প্রজ্ঞাবান, যিনি কখনো কোনো অনর্থক কাজ করেন না। তাঁর কোনো কাজই কল্যাণ ও হিকমতের বাইরে না। তাহলে যেগুলো আকল দিয়ে বুঝতে অসুবিধা, তার সে কাজগুলোও মেনে নিতে আর কোনো বাধা থাকত না।
এই বিষয়টি হজরত মুসা ও খাজির আলাইহিমাস সালামের ঘটনার মাধ্যমে বুঝে নেওয়া যায়। হজরত খাজির আলাইহিস সালাম যখন এমন কাজ করতে লাগলেন, যা আকলে ধরে না। বাহ্যিক যুক্তির বিচারে যা অন্যায় ও অপরাধ। তখন হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এগুলোকে অপছন্দ করলেন এবং আপত্তি করতে লাগলেন এবং তিনি যে অভিযোগ না করার ওয়াদা করেছিলেন, সেটাও ভুলে গেলেন। কিন্তু অবশেষে যখন এর হিকমত ও লুকায়িত কল্যাণের বিষয়টি তাঁকে জানানো হলো, তখন তিনি নির্দ্বিধায় তা মেনে নিলেন।
এখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, একজন বান্দার সাথেই যদি কল্যাণকর পরিণামের কথা হজরত মুসা আলাইহিস সালামের মতো নবীর নিকট অস্পষ্ট থেকে যায়, তবে তো আমাদের নিকট অবশ্যই মহান স্রষ্টা প্রজ্ঞাময় রবের হিকমত ও কল্যাণের বিষয়টি অজানা থাকা আরও বেশি স্বাভাবিক।
এটি হলো এমন এক মূলনীতি, এটি যদি কারও বোধে না থাকে, তবে সে আপত্তি-অভিযোগ করতে করতে কুফরির দিকে ধাবিত হয়ে যেতে পারে। আর যদি এটি কারও বোধে ও বিশ্বাসে থাকে, তবে সে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে স্বস্তি ও নিরাপত্তা বোধ করতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00