📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অস্থির মনোযোগের কৌশল

📄 অস্থির মনোযোগের কৌশল


দুনিয়ার কারবারের মাঝে ইলম ও উৎকর্ষের ক্ষেত্রে নিজের মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে একজন দরিদ্র যুবকের জন্য। এই অবস্থায় সে যদি বিয়ে করে, তবে তো তার উপার্জনের চিন্তাতেই বেহাল দশা হয়ে পড়বে কিংবা তাকে মানুষের নিকট চেয়ে বেড়াতে হবে- এতে কিছুতেই তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে না। এরপর যখন তার সন্তান-সন্ততি হবে, তখন তো চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। উপার্জনের চিন্তায় চোখে-মুখে কিছুই দেখতে পাবে না। তখন হয়তো হালাল-হারামের বাছবিচার করার অবস্থাও তার থাকবে না। আর যদি বেঁচে চলতে চায়, তখন তার ও তার পরিবারের খাদ্যের কী অবস্থা হবে- আল্লাহই মালুম। আর যদি স্ত্রী তার এই জীর্ণ ভরণ-পোষণের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে-অথচ এর অধিক তার বর্তমানে সক্ষমতাও নেই-তখন কি আর তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে? কীভাবেই বা সে নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করতে সক্ষম হবে?
কিছুতেই সম্ভব নয়।
সেই অবস্থায় স্থিরচিত্তের আশা করা যায় কীভাবে- যখন চোখ চেয়ে থাকে মানুষের দয়ার দিকে, কান শুনতে থাকে তাদের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত কথা। ভাষা তাদেরকে সম্বোধন করে বিভিন্ন তোষামোদি শব্দে- আর এর মাঝেই অন্তর বিচলিত থাকে নিজের অপরিহার্য উপার্জনের চিন্তায়?
কেউ যদি প্রশ্ন করে, এ অবস্থায় তবে আমার কী করা উচিত?
আমি উত্তরে বলব, দুনিয়াতে যদি সাধারণভাবে তোমার চলার মতো কোনো উপার্জন থাকে- যতই সামান্য হোক, যদি তা যথেষ্ট হয়ে যায়, তবে তুমি তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকো। যতদূর সম্ভব দুনিয়াদার মানুষের সংশ্রব থেকে দূরে অবস্থান করো। আর যদি বিয়ের প্রয়োজন হয়, তাহলে দরিদ্র দেখে বিয়ে করো- তাহলে সে স্বল্প ভরণ-পোষণের ওপরই সন্তুষ্ট থাকবে। আর তুমিও তার দারিদ্র্যের প্রতি সবর করবে। যদি অসুন্দরও হয়- তুমি তার এই কিছুটা অসৌন্দর্যের ওপরও ধৈর্যধারণ করবে। কিছুতেই এমন কাউকে বিয়ে করার দিকে ঝুঁকবে না- যার চাহিদা বেশি। বেশি ভরণ-পোষণের প্রতি আগ্রহী এবং আহ্লাদী।
এভাবে তোমার যদি একটি সৎ ও ধৈর্যশীলা স্ত্রী মেলে, তবেই শুধু তোমার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর যদি তেমন কাউকে না পাও, তবে তোমার বিপদের মধ্যে পড়ার চেয়ে ধৈর্যধারণ করাই উত্তম।
আর অধিক সুন্দরী ও সৌখিনতা থেকে সব সময় নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবে। কারণ, সৌন্দর্যে বিমোহিত মানুষ তাদের প্রতি মূর্তিপূজারীদের মতো হয়ে পড়ে।
আর তোমার হাতে যদি কিছু উপার্জন হয়, তুমি তার কিছু খরচ করবে আর কিছু অবশিষ্ট রাখবে। এটাই তোমার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হবে।
এই যুগ ও এই যুগের মানুষের থেকে খুবই সতর্ক থাকবে। এখন আর কোনো নিঃস্বার্থ উপকারী ও অন্যকে প্রাধান্য দানকারী সহানুভূতিশীল ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। প্রকৃত বন্ধুত্বও উধাও হতে চলেছে। এখন কারও নিকট চাইলে সামান্য দেবে; কিন্তু ব্যাপক বিরক্ত হবে। একটু অনুগ্রহ করবে; কিন্তু তাতেই যেন সারাজীবন দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতে চাইবে। যখনই দেখা হবে, তখনই যেন অন্যভাবে অবহেলা দেখাবে। কিংবা এটার খোঁটা দেবে বা প্রতিদান চাইবে। অথবা এর কারণে তার কাছে বারবার যেতে বাধ্য করবে।
কিন্তু অতীতকালে ছিলেন আবু আমর ইবনে নাজিদের মতো ব্যক্তিত্বগণ। হজরত আবু উসমান আল মাগরিবি একদিন মিম্বারে আলোচনার মাঝে বললেন, আমার ওপর একহাজার দিনার ঋণ রয়েছে। এতে আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আছি।
এইদিন রাতেই আবু আমর ইবনে নাজিদ তার নিকট আগমন করলেন। এবং পূর্ণ একহাজার দিনারের একটি থলে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা দিয়ে আপনি আপনার ঋণ পরিশোধ করুন।
পরের বার তিনি মিম্বারে বসে বললেন, আমি আল্লাহর নিকট আবু আমরের শোকর আদায় করছি। তিনি আমার অন্তরকে স্বস্তিময় করেছেন। আমার ঋণ পরিশোধ করেছেন।
সেখানেই হঠাৎ আবু আমর দাঁড়িয়ে বললেন, এই সম্পদটি ছিল আমার মায়ের। তার এটা দিতে খুবই কষ্ট হয়েছে। আপনি যদি এটি তাকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন, তবে ফিরিয়ে দিলেই ভালো হয়।'
কিন্তু যখন রাত্র হলো, আবু আমের আবার আবু উসমানের নিকট এসে অভিযোগ করে বললেন, আপনি কেন মানুষের মাঝে আমার নাম প্রকাশ করে দিলেন? আমি তো এটা তাদের জন্য করিনি। আপনি এটা আপনার জন্যই রাখেন। আর আমার কথা কাউকে বলবেন না।
আহা, এমনই ছিল তাদের মহিমান্বিত দান ও নিঃস্বার্থতা! সেগুলো আজ কোথায়! এই ব্যাপারটির দিকে ইঙ্গিত করে জনৈক কবি বলেন,
ماتوا وغيب في التراب شخوصهم ... والنشر مسك والعظام رميم
তারা তো সবাই ইন্তেকাল করেছে। আর সেই সাথে মাটির মধ্যে নিহিত হয়ে গেছে তাদের ব্যক্তিত্ব।
আজও তাদের মাটি হতে মহত্বের সুগন্ধি ঝরে। জীর্ণ হাড়ও প্রকাশ করে হৃদয়ের উদার উজ্জ্বলতা।
সুতরাং হে ভাই, যার অন্তর জুড়ে রয়েছে দুনিয়ার আয়-উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তুমি তার থেকে বহুদূরে অবস্থান করো। তার সাথে মিশে যতটা না অর্জন করতে সক্ষম হবে, তারচেয়ে অনেক বেশি দুনিয়ার প্রতি প্রভাবিত হবে। নিজের স্বল্পতুষ্টির শান্তি বিনষ্ট হবে। তুমি তাকে বাহ্যিকভাবে বন্ধু ভাবলেও গোপনে সে তোমার শত্রু। তোমার কষ্টে ও বিপদে আনন্দিত। তোমার কল্যাণের ওপর ঈর্ষান্বিত। তুমি তার থেকে নির্জনতা ক্রয় করে নাও।
একজন মানুষ—যার অন্তর ও বোধ রয়েছে—সে যখন বাজার থেকে ঘুরে তার বাড়িতে আসে, তার অন্তর আগের মতো আর থাকে না। বাজার তার অন্তরকে পরিবর্তন করে দেয়। তার মাঝে বঞ্চনার হাহাকার তৈরি করে দেয়। তাহলে সর্বক্ষণ কেউ যদি দুনিয়ার আসবাব ও বিলাসের উপকরণের মধ্যে থাকে— তার অন্তর বিক্ষিপ্ত না হয়ে যায় কোথায়!
আবারও বলি—এ ধরনের মানুষের থেকে নির্জনতা অবলম্বন করে নিজের মনোযোগকে নিজের কাজে একান্ত করার চেষ্টা করো। যাতে অন্তর পরপারের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করতে পারে। পথ-যাত্রার পাথেয় সঞ্চয় করতে পারে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ধৈর্যশীলদের বৈশিষ্ট্য

📄 ধৈর্যশীলদের বৈশিষ্ট্য


অধিকাংশ মানুষের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য খারাপ ধরনের। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমেও এগুলো সংশোধন হতে চায় না। জীবন সম্পর্কে তাদের যেন কোনো প্রশ্ন নেই। তাদের কেন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাদের থেকে কী কামনা করা হয়- সে সম্পর্কে তারা যেন কিছুই জানে না এবং জানতে চায়ও না।
তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো, পার্থিব সুখের উপকরণ অর্জন করা। আর তা অর্জনে যে রয়েছে কদর্যতা ও দ্বীনের ক্ষতি- সেদিকে তারা কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না। সাময়িক আনন্দ ও স্ফূর্তিকেই প্রাধান্য প্রদান করে; কিন্তু এর পরিবর্তে দীর্ঘ শান্তি ও আজাবের প্রতি লক্ষ করে না। ব্যবসার ক্ষেত্রে মানুষকে ধোঁকা প্রদান করে। মানুষকে প্রতারিত করার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করে। আস্থা রাখার মতো পোশাক পরিধান করে। প্রকৃত অবস্থাকে আড়াল করে রাখে। যা অর্জন করে, তা সন্দেহপূর্ণ। যা ভক্ষণ করে, তা তার যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। রাতভর নিদ্রা যায়- যদিও এক অর্থে দিবসজুড়েও তারা ঘুমায়। এটা বাহ্যিক ঘুম নয়- এটা হলো নিজের জীবনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদাসীনতা। এরপর যখন সকাল হয়, তখন আবার তাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জনের জন্য ছুটতে থাকে- শূকরের লোভ নিয়ে, কুকুরের তোষামোদ নিয়ে, সিংহের হিংস্রতা নিয়ে, নেকড়ের আক্রমণ নিয়ে এবং শিয়ালের প্রতারণা নিয়ে।
আর মৃত্যুর সময় আফসোস করে এই জীবনের উপভোগ্যতার সমাপ্তি নিয়ে; তাকওয়া ও আমলের নিঃসম্বলতা নিয়ে নয়। এই হলো তাদের সকল চাহিদা ও কামনার শীর্ষদেশ।
সেই ব্যক্তি কীভাবে সফলকাম হতে পারে, যে বুদ্ধি দিয়ে যা বোঝে তার ওপর চোখ দিয়ে যা দেখে, সেটাকেই প্রাধান্য প্রদান করে? অভিজ্ঞতা দিয়ে যা অনুধাবন করে তার ওপর চোখ দিয়ে যা অবলোকন করে, সেটাকেই প্রাধান্য প্রদান করে? তারা যদি তাদের অন্তর-কান খুলে রাখত, তাহলে শুনতে পেত- দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে সফরের সঙ্গী ডেকে ডেকে বলছে-সকলেই সতর্ক হও, যাত্রার পাথেয় ও সামানের জন্য প্রস্তুতি নাও।
কিন্তু মূর্খতার বেহুঁশি তাদেরকে উদাসীন করে রেখেছে। তারা তো জেগে উঠবে না- অন্তিম শাস্তির কড়াঘাত ব্যতীত।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 একনিষ্ঠতার আবশ্যিকতা

📄 একনিষ্ঠতার আবশ্যিকতা


আমি সেই ব্যক্তির বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করি, যে মানুষের সামনে জুহুদ ও দুনিয়াবিমুখতার ভান করে এবং আশা করে, এর মাধ্যমে সে মানুষের অন্তরে প্রিয় হয়ে উঠবে। কিন্তু সে কেন ভুলে যায়- মানুষের অন্তরসমূহ আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণে।
সে যদি একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহ তাআলার জন্য আমল করত এবং তিনি তার আমলের প্রতি সন্তুষ্ট হতেন, তবে মানুষের অন্তর আপনিই তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ত। কিন্তু যখন সে মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে এবং এতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, তখন পরিণামে মানুষের অন্তরও একসময় তার থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে।
এভাবে কেউ যখন নিজের আমল দ্বারা মানুষের অন্তর তার দিকে ঝুঁকিয়ে নিতে চায়, তখন তার শরিক হয়ে পড়ে অনেক। সে সময় তাদের সকলের মর্জি ও বাসনার অনুসরণ করতে গিয়ে তার আর বিপদের সীমা-পরিসীমা থাকে না। তাদের মর্জি মতো তার কাজেরও ধরন পাল্টাতে থাকে এবং সে পাল্টাতে বাধ্য হতে থাকে।
কিন্তু একনিষ্ঠতা কী?
একনিষ্ঠতার জন্য আবশ্যক হলো, আমলকারী মানুষের অন্তর তার দিকে ঝোঁকার ইচ্ছা করবে না। বরং মানুষের কোনো ইচ্ছাই সে করবে না। কারণ, এখানে বিষয়টা এমনই এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, মানুষকে আকৃষ্ট করার ইচ্ছার দ্বারা কখনো তারা আকৃষ্ট হবে না; এটাকে অপছন্দ করলেই বরং তারা আকৃষ্ট হবে!
যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে, এক সময় না একসময় সেটা প্রকাশিত হয়েই পড়ে। মানুষের অন্তরও কেন যেন তার প্রতি আকৃষ্ট হয় না। তখন তার সকল কিছুই বৃথা ও ব্যর্থ হয়। কারণ, তার আমলগুলো আল্লাহর নিকটও যেমন কবুল হয় না, মানুষের কাছেও কোনো মূল্য পায় না। তাদের অন্তর তার থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। এভাবেই তার পুরো আমল নষ্ট হয়। গোটা জীবনটাই বিনষ্ট হয়। হাদিসে এসেছে-
عن أبي سعيد الخدري ، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال .... ولو أن أحدكم يعمل في صخرة صماء ليس عليه باب ولا كوة ، الخرج ما غيبه للناس كائنا ما كان.
হজরত আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি তোমাদের মধ্যে কেউ এমন শক্ত কঠিন পাথরের মধ্যে বসেও যদি একনিষ্ঠভাবে আমল করত, যার মধ্যে কোনো দরজা-জানালা নেই, তবুও কোনো না কোনোভাবে মানুষের চোখের আড়ালে রাখা তার এ আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বেই পড়বে। ১০০
সুতরাং বান্দার শুধু আল্লাহ তাআলাকেই ভয় করা উচিত। এবং আমলের ক্ষেত্রে তাকেই সন্তুষ্ট করার ইচ্ছা করা উচিত, যিনি তাকে উপকার করবেন। এবং কিছুতেই তাদের সন্তুষ্ট করার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত হবে না- যারা নিজেরাই বিপদে আক্রান্ত হয়।

টিকাঃ
১০০. মুসনাদে আহমদ: ২২/ ১০৭৯৮, পৃষ্ঠা: ৩৪৩ এবং মুসতাদরাকে হাকেম: ১৮/৮৯৯০, পৃষ্ঠা: ২৪৮- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মানার মধ্যেই নিরাপত্তা ও কামিয়াবি

📄 মানার মধ্যেই নিরাপত্তা ও কামিয়াবি


যে ব্যক্তি আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, নিশ্চয় বিস্ময়ে তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। এক ধরনের চাপ তাকে স্বীকার করতে হয়। কারণ, তাকে এমন এক সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয়, যার কোনো সূচনা নেই। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। এটি এমন এক বিষয়- যা সাধারণ ইন্দ্রিয়শক্তি আয়ত্ব করতে সক্ষম নয়। মাথা-মস্তিষ্ক খাটিয়ে এটাকে স্বীকার করতে হয়। তবুও এই স্বীকারোক্তির পরও সে বিভিন্ন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। কিন্তু সে চারপাশে স্রষ্টার এত এত নিদর্শন দেখতে পায় এবং তার এত কাজ দেখতে পায়, যেগুলো তার অস্তিত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করে। তবে আবার তার ভাগ্যে এমন অনেক ব্যাপার ঘটতে থাকে, যখন মনে হয়, তাঁর অস্তিত্বের ওপর যদি এত প্রমাণ না থাকত, তবে তো সে অস্বীকার করেই বসত।
আল্লাহ হলেন সেই মহান সত্তা, যিনি বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্র বিদীর্ণ করে রাস্তা করেছেন। এটি এমন এক বিষয়, যা কখনো স্রষ্টা ব্যতীত অন্য কেউ করতে পারে না। তিনি লাঠিকে সাপে রূপান্তরিত করেছেন, সেই সাপ জাদুকরদের সকল সাপকে ভক্ষণ করে ফেলেছে। এরপর তাকে আবার লাঠিতে রূপান্তরিত করেছেন। এগুলোর পরও কি আর কোনো প্রমাণ দরকার হয় তাঁর অস্তিত্ব ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে?
কিন্তু কথা হলো, যখন জাদুকররা ঈমান আনল, তিনি তাদেরকে ফিরআউনের কবলেই রেখে দিলেন। ফিরআউন তাদেরকে হত্যা করল। শূলে চড়াল। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। এভাবে আরও কত নবী ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। যেমন, হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামকে করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে। হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকেও হত্যা করা হয়েছে। আরও অনেক নবীকেও নির্যাতন-নিপীড়ন, কষ্টক্লেশ, হাসি-ঠাট্টা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মাঝে নিপতিত হতে হয়েছে। আমাদের নবীকেও অনেক কষ্ট দেওয়া হয়েছে। মক্কায় থাকার সময় তাঁকে অনেকবার বলতে হয়েছে- কে আমাকে সাহায্য করবে? কে আমাকে সাহায্য করবে? অবস্থা ছিল এতটাই ভয়াবহ!
এক্ষেত্রে স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে যারা মূর্খ, তারা বলতে চায়, তিনি যদি থাকতেনই তবে তিনি তাঁর প্রিয় ব্যক্তিদের সাহায্য করতেন। তাঁদেরকে এভাবে কষ্ট সহ্য করতে দিতেন না। নির্যাতন ও হত্যার শিকার হতে দিতেন না!
এটা খুবই মূর্খতাসুলভ কথা ও যুক্তি। স্রষ্টাকে যদি স্রষ্টাই মানি, তবে তাঁর কাজের ক্ষেত্রে আপত্তি আসে কীভাবে? যে বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিকট বিভিন্ন অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণিত, তাঁর জন্য উচিত হবে কিছুতেই স্রষ্টার কার্যাবলির ক্ষেত্রে আপত্তি না করা। তাঁর কোনো কাজের জন্য কারণ অন্বেষণ না করা। কারণ, তাঁর নিকট যেহেতু প্রমাণিত হয়েই আছে তিনি স্রষ্টা মালিক এবং প্রজ্ঞাময়- তবে আর তাঁর কোনো কাজের ক্ষেত্রে আপত্তি আসবে কেন?
কিন্তু কথা হলো, তাঁর কোনো কাজের রহস্য, মূল কারণ কিংবা কল্যাণকামিতা যদি আমাদের নিকট অস্পষ্ট ও অধরা থাকে, না বুঝে আসে- তবে নিশ্চয় সেটা আমাদের বুঝের অভাবের কারণে। আমাদেরই অযোগ্যতা ও অক্ষমতার কারণে। দুনিয়ার পরীক্ষাগারে এটা এমনই থাকতে পারে। আবার ইচ্ছা করলে কিছু কিছু তিনি দুনিয়াতেই আমাদের কাছে প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু তার সবকিছু আমরা বুঝতে সক্ষম নই। এটা সম্ভবও নয়।
আমরা হজরত মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখি। তিনি তো প্রথমে নৌকা বিদীর্ণ করা এবং ছোট বাচ্চাটাকে হত্যা করার রহস্য সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি। এতে তিনি কোনো কল্যাণ দেখতে পাননি। বরং এটাকে তার মনে হয়েছে অন্যায় ও জুলুম। কিন্তু যখন তার নিকট মূল বিষয়টি প্রকাশ করা হলো, তখন তিনিই স্বীকার করলেন- হ্যাঁ, এর মধ্যেই কল্যাণ ও ইনসাফ ছিল।
ঠিক একইভাবে স্রষ্টার কার্যাবলির ক্ষেত্রে যখন আমাদের নিকট কল্যাণটা অস্পষ্ট থাকে, তখনই আমাদের মস্তিষ্ক অস্বীকার করে বসে। এ বড় তাড়াহুড়াপ্রবণ কাজ। মূর্খের মতো আচরণ। বরং যখন তুমি মস্তিষ্ককে বলতে শুনবে- আমি কেন চুপ করে থাকব?
তখন তুমি তাকে বলো, হে মূর্খের মূর্খ, তুমি তো তোমার নিজের বাস্তবতা সম্পর্কেই কিছু জানো না। তবে আর কোন মুখে স্রষ্টা ও মালিকের কাজের ওপর আপত্তি তোলো?
আবার কখনো কখনো ঘুমন্ত বিবেক মাথা তুলে বলে ওঠে, মানুষদের এত কষ্টের মধ্যে আপতিত করে স্রষ্টার কী লাভ! তিনি তো কোনো ধরনের কষ্ট ছাড়াও তাদেরকে পুরস্কার ও শান্তি দিতে সক্ষম? জাহান্নামিদের শাস্তি প্রদানের মধ্যেই বা তার কী উদ্দেশ্য লুকায়িত?
তখন তুমি তাকে বলো, তার হিকমত ও প্রজ্ঞা তোমার সকল অবস্থান থেকে বহু ঊর্ধ্বে। সুতরাং যে সম্পর্কে তুমি জানো না, তা স্বীকার করে নাও। কারণ, সর্বপ্রথম যে নিজের যুক্তি দিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল, সে হলো ইবলিস। সে মাটির ওপর আগুনের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যুক্তি দেখিয়েছিল। তাই সে সেজদা করতে অস্বীকার করেছিল।
আমরা এমন অনেককে দেখেছি এবং আরও অনেকের কথা শুনেছি- যারা স্রষ্টার হিকমতকে স্বীকার করতে চায় না। তারা নিজেদের বুদ্ধি বিবেক ও যুক্তির দাবি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু তারা ভুলে যায়- স্রষ্টার হিকমত তাদের যুক্তি-বুদ্ধির কত ঊর্ধ্বে! তিনিই হলেন এসকল যুক্তি বুদ্ধি ও বিবেকের স্রষ্টা!
সুতরাং তোমার এই সামান্য বুদ্ধি ও ভঙ্গুর যুক্তি নিয়ে স্রষ্টার ভুল ধরতে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকো। তাঁর কোনো কাজে আপত্তির উত্তর অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকো। তুমি তোমার নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিকে বলো - سلم تسلم মেনে নাও, নিরাপদ থাকবে। কারণ, তুমি তো তার জ্ঞানের সাগরের অতলে পৌঁছতে পারবে না, বৃথাই শুধু তার আগেই ডুবে মরবে।
বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এটিই হলো মূলনীতি। যে মানুষ এটার অনুসরণ করে না, সে আপত্তি করতে করতে কুফরির দিকে ধাবিত হয় এবং ধ্বংস হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00