📄 রহমতের আশা
মানুষের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে এক আশ্চর্য বিষয় পরিলক্ষিত হলো। বিষয়টি মাথা এলোমেলো করে দেওয়ার মতো। আর তা হলো, মানুষ যখন ওয়াজ-নসিহত শোনে এবং তাকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন সে কথকের কথা বিশ্বাস করে, ক্রন্দন করে এবং নিজের অপরাধ ও অবহেলার জন্য অনুতপ্ত হয়। ভবিষ্যতে অটলভাবে আমলের ওপর প্রতিজ্ঞা করে।
কিন্তু এরপর যার যার বাড়ি চলে গেলে আবার সেই আগেরই অবস্থা ফিরে আসে। ওয়াজের সময় যেই প্রতিজ্ঞা আর ইচ্ছা করেছিল, সে অনুযায়ী আমল করতে গড়িমসি করে। তখন যদি তাকে বলা হয়, তবে কি তুমি আল্লাহর ওয়াদা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করো?
উত্তরে বলে, না, কিছুতেই না।
যদি বলা হয়, তাহলে ঠিকভাবে আমল করো।
সে আবার আমলের নিয়ত করে। কিন্তু আবারও অলসতা শুরু হয়। আমল থমকে থাকে। বরং কখনো কখনো তো হারাম আস্বাদনের মধ্যে প্রবেশ করে। অথচ সে জানে, এটা সম্পর্কে নিষেধ করা হয়েছে।
এ ধরনের মানুষের অবস্থা হলো হাদিসের বিলম্বিত সেই তিন সাহাবির (কাব ইবনে মালেক, হেলাল ইবনে উমাইয়া, মুরারা ইবনে রাবিয়া রা.) অবস্থার মতো। তাদের যেমন কোনো ওজর নেই। আবার তারা বিলম্ব করার খারাপি সম্পর্কেও অবগত। প্রত্যেক পাপী ও অবহেলাকারীর অবস্থাও এমনই। তখন আমি এই অবস্থা নিয়ে চিন্তা করলাম যে, বিশ্বাস ও আকিদা তো বিশুদ্ধ; কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে এই যে অবহেলা ও গড়িমসি- এগুলোর কারণ কি? আমার মনে হয় এর পেছনে রয়েছে তিনটা কারণ-
১. তাৎক্ষণিক আনন্দ ও আস্বাদন। মানুষের চারপাশে এইগুলো অনেকটা যেন ওত পেতে রয়েছে। তাই খুব সহজেই মানুষ যা অনেক পরে ও দূরে রয়েছে, তার পরিবর্তে বর্তমান ও তাৎক্ষণিক আনন্দের মধ্যে প্রবেশ করে ফেলে।
২. পরে কখনো তাওবা করে নেওয়ার ইচ্ছা। অর্থাৎ এখন গোনাহ হয়ে গেলেও পরে তাওবা করে ক্ষমা চেয়ে নেব- এমন ইচ্ছার বশবর্তী হয়েও অনেকে গোনাহে লিপ্ত হয়।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে কথা হলো, সে যদি আকল দিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করত, তবে বিলম্বে তাওবার সমস্যাগুলো নিয়ে সে সতর্ক থাকত। কারণ, মৃত্যু তো অনেকসময় আকস্মিক এসে যায়। তাওবা করার কোনো সুযোগ পাওয়া যায় না।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এমন ব্যক্তি-যেকোনো মুহূর্তে যার প্রাণবায়ু বের হয়ে যেতে পারে-তবুও সে দৃঢ়তার ওপর আমল করে না। তাওবা করে না। বরং নফস তাকে আরও দীর্ঘ জীবন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, صل صلاة مودع -নামাজ পড়ো জীবনের শেষ নামাজ পড়ার মতো। ১৯
এ ধরনের রোগীর জন্য এটিই হলো শ্রেষ্ঠ ওষুধ। কারণ, যে ব্যক্তি ভাববে, এই নামাজের পর সে আরেকটি নামাজের সময় পর্যন্ত জীবিত থাকবে না, সে তো এই নামাজ খুব যত্ন ও খুশু-খুশুর সাথে আদায় করবে।
৩. আল্লাহর রহমতের আশা করা।
আল্লাহর রহমতের আশা তো করতেই পারে মানুষ। কিন্তু তাই বলে অব্যাহত গোনাহ করবে, তাওবা করবে না এবং গোনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে না- অথচ তার রহমতের আশা করে বসে থাকবে, তবে তো সে তার রহমত পাবে না।
সে মনে মনে ভাবছে, আল্লাহ তাআলা তো রহিম দয়ালু দয়াময়; কিন্তু সে কেন ভুলে থাকছে যে, আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তিদাতাও। তার জানা উচিত আল্লাহর রহমত এত সহজ নয়। যদি তা-ই হতো, তবে তো পৃথিবীতে একটি চড়ুইও জবাই হতো না। কোনো শিশুকেই কষ্টে আপতিত হতে হতো না। তার শাস্তি থেকে সবাই নিরাপদও নয়। নতুবা তিনি চুরির বিনিময়ে হাতকাটার নির্দেশ দিতেন না। ব্যভিচারের শাস্তিতে প্রস্তরাঘাতে হত্যার নির্দেশ দিতেন না।
আল্লাহ তাআলার নিকট আমাদের প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের কল্যাণকর কাজের ওপর সক্ষমতা ও অটলতা দান করেন। আমিন।
টিকাঃ
৯৯ ** সুনানে ইবনে মাজা: ১২/৪১৬১, পৃষ্ঠা: ২০৭ এবং মুসনাদে আহমদ: ৪৭/২২৪০০, পৃষ্ঠা: ৪৯৫- মা. শামেলা। পুরো হাদিসটি এমন- عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ عِظْنِي وَأَوْجِزْ فَقَالَ إِذَا قُمْتَ فِي صَلَاتِكَ فَصَلِّ صَلَاةَ مُوَدَّعٍ وَلَا تَكَلَّمْ بِكَلَامٍ تَعْتَذِرُ مِنْهُ غَدًا وَاجْمَعُ الْإِيَاسَ مِمَّا فِي يَدَيْ النَّاسِ।
📄 অস্থির মনোযোগের কৌশল
দুনিয়ার কারবারের মাঝে ইলম ও উৎকর্ষের ক্ষেত্রে নিজের মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে একজন দরিদ্র যুবকের জন্য। এই অবস্থায় সে যদি বিয়ে করে, তবে তো তার উপার্জনের চিন্তাতেই বেহাল দশা হয়ে পড়বে কিংবা তাকে মানুষের নিকট চেয়ে বেড়াতে হবে- এতে কিছুতেই তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে না। এরপর যখন তার সন্তান-সন্ততি হবে, তখন তো চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। উপার্জনের চিন্তায় চোখে-মুখে কিছুই দেখতে পাবে না। তখন হয়তো হালাল-হারামের বাছবিচার করার অবস্থাও তার থাকবে না। আর যদি বেঁচে চলতে চায়, তখন তার ও তার পরিবারের খাদ্যের কী অবস্থা হবে- আল্লাহই মালুম। আর যদি স্ত্রী তার এই জীর্ণ ভরণ-পোষণের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে-অথচ এর অধিক তার বর্তমানে সক্ষমতাও নেই-তখন কি আর তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে? কীভাবেই বা সে নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করতে সক্ষম হবে?
কিছুতেই সম্ভব নয়।
সেই অবস্থায় স্থিরচিত্তের আশা করা যায় কীভাবে- যখন চোখ চেয়ে থাকে মানুষের দয়ার দিকে, কান শুনতে থাকে তাদের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত কথা। ভাষা তাদেরকে সম্বোধন করে বিভিন্ন তোষামোদি শব্দে- আর এর মাঝেই অন্তর বিচলিত থাকে নিজের অপরিহার্য উপার্জনের চিন্তায়?
কেউ যদি প্রশ্ন করে, এ অবস্থায় তবে আমার কী করা উচিত?
আমি উত্তরে বলব, দুনিয়াতে যদি সাধারণভাবে তোমার চলার মতো কোনো উপার্জন থাকে- যতই সামান্য হোক, যদি তা যথেষ্ট হয়ে যায়, তবে তুমি তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকো। যতদূর সম্ভব দুনিয়াদার মানুষের সংশ্রব থেকে দূরে অবস্থান করো। আর যদি বিয়ের প্রয়োজন হয়, তাহলে দরিদ্র দেখে বিয়ে করো- তাহলে সে স্বল্প ভরণ-পোষণের ওপরই সন্তুষ্ট থাকবে। আর তুমিও তার দারিদ্র্যের প্রতি সবর করবে। যদি অসুন্দরও হয়- তুমি তার এই কিছুটা অসৌন্দর্যের ওপরও ধৈর্যধারণ করবে। কিছুতেই এমন কাউকে বিয়ে করার দিকে ঝুঁকবে না- যার চাহিদা বেশি। বেশি ভরণ-পোষণের প্রতি আগ্রহী এবং আহ্লাদী।
এভাবে তোমার যদি একটি সৎ ও ধৈর্যশীলা স্ত্রী মেলে, তবেই শুধু তোমার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর যদি তেমন কাউকে না পাও, তবে তোমার বিপদের মধ্যে পড়ার চেয়ে ধৈর্যধারণ করাই উত্তম।
আর অধিক সুন্দরী ও সৌখিনতা থেকে সব সময় নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবে। কারণ, সৌন্দর্যে বিমোহিত মানুষ তাদের প্রতি মূর্তিপূজারীদের মতো হয়ে পড়ে।
আর তোমার হাতে যদি কিছু উপার্জন হয়, তুমি তার কিছু খরচ করবে আর কিছু অবশিষ্ট রাখবে। এটাই তোমার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হবে।
এই যুগ ও এই যুগের মানুষের থেকে খুবই সতর্ক থাকবে। এখন আর কোনো নিঃস্বার্থ উপকারী ও অন্যকে প্রাধান্য দানকারী সহানুভূতিশীল ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। প্রকৃত বন্ধুত্বও উধাও হতে চলেছে। এখন কারও নিকট চাইলে সামান্য দেবে; কিন্তু ব্যাপক বিরক্ত হবে। একটু অনুগ্রহ করবে; কিন্তু তাতেই যেন সারাজীবন দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতে চাইবে। যখনই দেখা হবে, তখনই যেন অন্যভাবে অবহেলা দেখাবে। কিংবা এটার খোঁটা দেবে বা প্রতিদান চাইবে। অথবা এর কারণে তার কাছে বারবার যেতে বাধ্য করবে।
কিন্তু অতীতকালে ছিলেন আবু আমর ইবনে নাজিদের মতো ব্যক্তিত্বগণ। হজরত আবু উসমান আল মাগরিবি একদিন মিম্বারে আলোচনার মাঝে বললেন, আমার ওপর একহাজার দিনার ঋণ রয়েছে। এতে আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আছি।
এইদিন রাতেই আবু আমর ইবনে নাজিদ তার নিকট আগমন করলেন। এবং পূর্ণ একহাজার দিনারের একটি থলে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা দিয়ে আপনি আপনার ঋণ পরিশোধ করুন।
পরের বার তিনি মিম্বারে বসে বললেন, আমি আল্লাহর নিকট আবু আমরের শোকর আদায় করছি। তিনি আমার অন্তরকে স্বস্তিময় করেছেন। আমার ঋণ পরিশোধ করেছেন।
সেখানেই হঠাৎ আবু আমর দাঁড়িয়ে বললেন, এই সম্পদটি ছিল আমার মায়ের। তার এটা দিতে খুবই কষ্ট হয়েছে। আপনি যদি এটি তাকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন, তবে ফিরিয়ে দিলেই ভালো হয়।'
কিন্তু যখন রাত্র হলো, আবু আমের আবার আবু উসমানের নিকট এসে অভিযোগ করে বললেন, আপনি কেন মানুষের মাঝে আমার নাম প্রকাশ করে দিলেন? আমি তো এটা তাদের জন্য করিনি। আপনি এটা আপনার জন্যই রাখেন। আর আমার কথা কাউকে বলবেন না।
আহা, এমনই ছিল তাদের মহিমান্বিত দান ও নিঃস্বার্থতা! সেগুলো আজ কোথায়! এই ব্যাপারটির দিকে ইঙ্গিত করে জনৈক কবি বলেন,
ماتوا وغيب في التراب شخوصهم ... والنشر مسك والعظام رميم
তারা তো সবাই ইন্তেকাল করেছে। আর সেই সাথে মাটির মধ্যে নিহিত হয়ে গেছে তাদের ব্যক্তিত্ব।
আজও তাদের মাটি হতে মহত্বের সুগন্ধি ঝরে। জীর্ণ হাড়ও প্রকাশ করে হৃদয়ের উদার উজ্জ্বলতা।
সুতরাং হে ভাই, যার অন্তর জুড়ে রয়েছে দুনিয়ার আয়-উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তুমি তার থেকে বহুদূরে অবস্থান করো। তার সাথে মিশে যতটা না অর্জন করতে সক্ষম হবে, তারচেয়ে অনেক বেশি দুনিয়ার প্রতি প্রভাবিত হবে। নিজের স্বল্পতুষ্টির শান্তি বিনষ্ট হবে। তুমি তাকে বাহ্যিকভাবে বন্ধু ভাবলেও গোপনে সে তোমার শত্রু। তোমার কষ্টে ও বিপদে আনন্দিত। তোমার কল্যাণের ওপর ঈর্ষান্বিত। তুমি তার থেকে নির্জনতা ক্রয় করে নাও।
একজন মানুষ—যার অন্তর ও বোধ রয়েছে—সে যখন বাজার থেকে ঘুরে তার বাড়িতে আসে, তার অন্তর আগের মতো আর থাকে না। বাজার তার অন্তরকে পরিবর্তন করে দেয়। তার মাঝে বঞ্চনার হাহাকার তৈরি করে দেয়। তাহলে সর্বক্ষণ কেউ যদি দুনিয়ার আসবাব ও বিলাসের উপকরণের মধ্যে থাকে— তার অন্তর বিক্ষিপ্ত না হয়ে যায় কোথায়!
আবারও বলি—এ ধরনের মানুষের থেকে নির্জনতা অবলম্বন করে নিজের মনোযোগকে নিজের কাজে একান্ত করার চেষ্টা করো। যাতে অন্তর পরপারের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করতে পারে। পথ-যাত্রার পাথেয় সঞ্চয় করতে পারে।
📄 ধৈর্যশীলদের বৈশিষ্ট্য
অধিকাংশ মানুষের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য খারাপ ধরনের। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমেও এগুলো সংশোধন হতে চায় না। জীবন সম্পর্কে তাদের যেন কোনো প্রশ্ন নেই। তাদের কেন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাদের থেকে কী কামনা করা হয়- সে সম্পর্কে তারা যেন কিছুই জানে না এবং জানতে চায়ও না।
তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো, পার্থিব সুখের উপকরণ অর্জন করা। আর তা অর্জনে যে রয়েছে কদর্যতা ও দ্বীনের ক্ষতি- সেদিকে তারা কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না। সাময়িক আনন্দ ও স্ফূর্তিকেই প্রাধান্য প্রদান করে; কিন্তু এর পরিবর্তে দীর্ঘ শান্তি ও আজাবের প্রতি লক্ষ করে না। ব্যবসার ক্ষেত্রে মানুষকে ধোঁকা প্রদান করে। মানুষকে প্রতারিত করার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করে। আস্থা রাখার মতো পোশাক পরিধান করে। প্রকৃত অবস্থাকে আড়াল করে রাখে। যা অর্জন করে, তা সন্দেহপূর্ণ। যা ভক্ষণ করে, তা তার যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। রাতভর নিদ্রা যায়- যদিও এক অর্থে দিবসজুড়েও তারা ঘুমায়। এটা বাহ্যিক ঘুম নয়- এটা হলো নিজের জীবনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদাসীনতা। এরপর যখন সকাল হয়, তখন আবার তাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জনের জন্য ছুটতে থাকে- শূকরের লোভ নিয়ে, কুকুরের তোষামোদ নিয়ে, সিংহের হিংস্রতা নিয়ে, নেকড়ের আক্রমণ নিয়ে এবং শিয়ালের প্রতারণা নিয়ে।
আর মৃত্যুর সময় আফসোস করে এই জীবনের উপভোগ্যতার সমাপ্তি নিয়ে; তাকওয়া ও আমলের নিঃসম্বলতা নিয়ে নয়। এই হলো তাদের সকল চাহিদা ও কামনার শীর্ষদেশ।
সেই ব্যক্তি কীভাবে সফলকাম হতে পারে, যে বুদ্ধি দিয়ে যা বোঝে তার ওপর চোখ দিয়ে যা দেখে, সেটাকেই প্রাধান্য প্রদান করে? অভিজ্ঞতা দিয়ে যা অনুধাবন করে তার ওপর চোখ দিয়ে যা অবলোকন করে, সেটাকেই প্রাধান্য প্রদান করে? তারা যদি তাদের অন্তর-কান খুলে রাখত, তাহলে শুনতে পেত- দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে সফরের সঙ্গী ডেকে ডেকে বলছে-সকলেই সতর্ক হও, যাত্রার পাথেয় ও সামানের জন্য প্রস্তুতি নাও।
কিন্তু মূর্খতার বেহুঁশি তাদেরকে উদাসীন করে রেখেছে। তারা তো জেগে উঠবে না- অন্তিম শাস্তির কড়াঘাত ব্যতীত।
📄 একনিষ্ঠতার আবশ্যিকতা
আমি সেই ব্যক্তির বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করি, যে মানুষের সামনে জুহুদ ও দুনিয়াবিমুখতার ভান করে এবং আশা করে, এর মাধ্যমে সে মানুষের অন্তরে প্রিয় হয়ে উঠবে। কিন্তু সে কেন ভুলে যায়- মানুষের অন্তরসমূহ আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণে।
সে যদি একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহ তাআলার জন্য আমল করত এবং তিনি তার আমলের প্রতি সন্তুষ্ট হতেন, তবে মানুষের অন্তর আপনিই তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ত। কিন্তু যখন সে মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে এবং এতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, তখন পরিণামে মানুষের অন্তরও একসময় তার থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে।
এভাবে কেউ যখন নিজের আমল দ্বারা মানুষের অন্তর তার দিকে ঝুঁকিয়ে নিতে চায়, তখন তার শরিক হয়ে পড়ে অনেক। সে সময় তাদের সকলের মর্জি ও বাসনার অনুসরণ করতে গিয়ে তার আর বিপদের সীমা-পরিসীমা থাকে না। তাদের মর্জি মতো তার কাজেরও ধরন পাল্টাতে থাকে এবং সে পাল্টাতে বাধ্য হতে থাকে।
কিন্তু একনিষ্ঠতা কী?
একনিষ্ঠতার জন্য আবশ্যক হলো, আমলকারী মানুষের অন্তর তার দিকে ঝোঁকার ইচ্ছা করবে না। বরং মানুষের কোনো ইচ্ছাই সে করবে না। কারণ, এখানে বিষয়টা এমনই এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, মানুষকে আকৃষ্ট করার ইচ্ছার দ্বারা কখনো তারা আকৃষ্ট হবে না; এটাকে অপছন্দ করলেই বরং তারা আকৃষ্ট হবে!
যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে, এক সময় না একসময় সেটা প্রকাশিত হয়েই পড়ে। মানুষের অন্তরও কেন যেন তার প্রতি আকৃষ্ট হয় না। তখন তার সকল কিছুই বৃথা ও ব্যর্থ হয়। কারণ, তার আমলগুলো আল্লাহর নিকটও যেমন কবুল হয় না, মানুষের কাছেও কোনো মূল্য পায় না। তাদের অন্তর তার থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। এভাবেই তার পুরো আমল নষ্ট হয়। গোটা জীবনটাই বিনষ্ট হয়। হাদিসে এসেছে-
عن أبي سعيد الخدري ، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال .... ولو أن أحدكم يعمل في صخرة صماء ليس عليه باب ولا كوة ، الخرج ما غيبه للناس كائنا ما كان.
হজরত আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি তোমাদের মধ্যে কেউ এমন শক্ত কঠিন পাথরের মধ্যে বসেও যদি একনিষ্ঠভাবে আমল করত, যার মধ্যে কোনো দরজা-জানালা নেই, তবুও কোনো না কোনোভাবে মানুষের চোখের আড়ালে রাখা তার এ আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বেই পড়বে। ১০০
সুতরাং বান্দার শুধু আল্লাহ তাআলাকেই ভয় করা উচিত। এবং আমলের ক্ষেত্রে তাকেই সন্তুষ্ট করার ইচ্ছা করা উচিত, যিনি তাকে উপকার করবেন। এবং কিছুতেই তাদের সন্তুষ্ট করার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত হবে না- যারা নিজেরাই বিপদে আক্রান্ত হয়।
টিকাঃ
১০০. মুসনাদে আহমদ: ২২/ ১০৭৯৮, পৃষ্ঠা: ৩৪৩ এবং মুসতাদরাকে হাকেম: ১৮/৮৯৯০, পৃষ্ঠা: ২৪৮- মা. শামেলা।