📄 সদাচার দিয়েই শুধু স্বাধীনতা কেনা সম্ভব
যে ব্যক্তি লাঞ্ছনাকে অপছন্দ করে, সে কীভাবে একটি রুটির অপ্রাপ্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে পারে না? লাঞ্ছনাকর অনুগ্রহ থেকে নিজেকে কেন বিরত রাখতে পারে না? পৌরুষদীপ্ত কোনো হৃদয় কি তবে আর অবশিষ্ট নেই তার? সে যদি কোনো কৃপণের নিকট প্রার্থনা করে, তবে সে তাকে কিছুই দেবে না। আর যদি দেয়ও, খুবই অল্প দেবে। অথচ এই এতটুকু দান গ্রহণকারীকে সারাজীবনের জন্য দাস করে রাখবে। এই স্বল্প দানটুকু খুব দ্রুতই খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু এই অনুগ্রহ, এই লাঞ্ছনা এবং নিজেকে তুচ্ছ করে দেখার হীনতা আজীবন রয়েই যাবে। কারণ, হাত পেতে গ্রহণকারীকে কখনো সম্মানের চোখে দেখা হয় না।
তাছাড়া এই সামান্য দানটুকু দাতার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা থেকে তাকে চুপ করিয়ে দেবে। তার কোনো হুকুম পালনে তাড়িত করবে। তার আকাঙ্ক্ষা মতো সেবা প্রদানে বাধিত করবে।
তাহলে কেন সে এই দানটুকু গ্রহণ করতে যাবে? এই হলো আশ্চর্য কথা!
তবে এর থেকেও আশ্চর্যের কথা হলো, এই সামান্য দানের মাধ্যমে যে ব্যক্তি স্বাধীনদের ক্রয় করতে সক্ষম, অথচ সে তা করে না! স্বাধীনকে শুধু অনুগ্রহ ও ইহসানের মাধ্যমেই ক্রয় করা যায়। কবি বলেন-
تفضل على من شئت واعن بأمره .. فأنت ولو كان الأمير أميره وكن ذا غنى عن من تشاء من الورى .. ولو كان سلطاناً فأنت نظيره على طمع منه فأنت أسيره ومن كنت محتاجاً إليه وواقفا ....
তুমি যাকে চাও, তার ওপর অনুগ্রহ করো এবং তার কাজে সাহায্য করো। আমির যদি থেকেও থাকে, তবু তুমিই হবে তার আমির।
সৃষ্টির সকল থেকে মুখাপেক্ষিহীন হও, দেশে যদি বাদশাহ থেকেও থাকে, তুমি হবে তার সমকক্ষ।
আর তুমি যদি কারও নিকট মুখাপেক্ষী হও এবং তার আকাঙ্ক্ষা মতো চলো, তবে তুমি হবে তার বন্দি।
📄 তরুণের প্রতি আহ্বান
একটি কিশোর যখন সাবালক হয়, তখন তার জন্য উচিত হবে অধিক সহবাস ও বীর্যচ্যুতি [অর্থাৎ বিবাহিত বৈধ সহবাস বা যেকোনো উপায়ে বীর্যপাত] থেকে বেঁচে থাকা; যাতে তার শারীরিক গঠনের মূল কাঠামো শক্তিশালী থাকে। তাহলে এটা তার বার্ধক্যে উপকার করবে। কারণ, তার তো একটি দীর্ঘ বয়সের সম্ভাবনা রয়েছে। আর যার সম্ভাবনা রয়েছে, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকাই উচিত- তাহলে সে কেন সতর্ক হবে না?
যেমন, শীত আসার আগেই তার প্রস্তুতি নিতে হয়। যে ব্যক্তি তার উপার্জনের সক্ষমতার সময় সকল সম্পদ খরচ করে ফেলে, অক্ষমতার সময় তাকে দারিদ্র্যের কষ্ট সহ্য করতে হয়।
যারা দ্বীনদার ও বুঝমান তারা বোঝেন, এ ক্ষেত্রে যেসকল বিষয় সহবাসের দিকে নিয়ে যায় সেগুলো থেকে তার বিরত থাকা উচিত। যেমন, দেখা করা। নিকটে আসা। আর এটাও জানা থাকা উচিত, অধিক সহবাস ভালোবাসাকে কমিয়ে দেয়। প্রকৃত আস্বাদনকে রহিত করে দেয়।
প্রাচীন আরবে তারা একে অপরকে ভালোবাসত; কিন্তু সহবাস করত না। প্রেমাস্পদের সাথে সহবাসকে তারা পছন্দ করত না। এ কারণে তাদের প্রবাদের মধ্যে আছে, إن نكح الحب فسد -ভালোবাসার মানুষের সাথে সহবাস করলে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়।
তাছাড়া ভালোবাসাহীন নিছক শুধু শারীরিক সহবাস- এটা তো চতুষ্পদ জন্তুদের অভ্যাস।
আমি সহবাসের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করে একটি আশ্চর্য বিষয় অনুধাবন করেছি। বিষয়টি অনেক মানুষই অনুভব করে না। বিষয়টা হলো, কোনো ব্যক্তি যখন আরেকজনের প্রেমে পড়ে, তখন সে তার নৈকট্য অর্জনকে ভালোবাসে। তার সান্নিধ্য ও পরস্পর একত্র হওয়াকে ভালোবাসে। কারণ, এটিই হলো নৈকট্যের শেষ সীমা। এরপর তারা আরও নিকট হতে চায়, তখন গালে চুমো খায়। এরপর আত্মার আরও নৈকট্য চায়। তখন মুখে চুমো খায়। কারণ, এটাই আত্মার বের হওয়ার স্থান। এরপর আরও নিকটবর্তী হতে চায়, তখন প্রিয়তম বা প্রিয়তমার জিহ্বা লেহন করে। এরপর নফস যখন আরও নিকটবর্তী হতে চায়, তখন তারা সহবাসের দিকে অগ্রসর হয়।
এটা হলো হৃদয়ের খুবই সূক্ষ্ম ও অনুভবনীয় এক বিষয়। তবে এর থেকে শারীরিক সুখও অনুভূত হয়।
টিকাঃ
১৮. বর্তমানে আরও যে সকল গোনাহের উপকরণ ও মাধ্যম রয়েছে সেগুলো থেকেও সতর্ক থাকা উচিত। যেমন মোবাইল, টিভি ও নেট। এগুলোর অশ্লীল বা খারাপ অপশন ও সাইটগুলো থেকে নিজেকে কঠিনভাবে বিরত রাখা উচিত। কারণ, এই অবারিত সুলভ অশ্লীলতা ও গোনাহপূর্ণ অবস্থান থেকে নিজেকে বিরত রাখতে না পারলে নিজের ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারবে না। দুনিয়া ও আখেরাত- উভয়টিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরসাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি খুবই প্রয়োজন হলে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা। এর প্রতি আসক্ত হয়ে না পড়া। সময় নষ্ট না করা। চোখের হেফাজত করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।- অনুবাদক।
📄 রহমতের আশা
মানুষের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে এক আশ্চর্য বিষয় পরিলক্ষিত হলো। বিষয়টি মাথা এলোমেলো করে দেওয়ার মতো। আর তা হলো, মানুষ যখন ওয়াজ-নসিহত শোনে এবং তাকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন সে কথকের কথা বিশ্বাস করে, ক্রন্দন করে এবং নিজের অপরাধ ও অবহেলার জন্য অনুতপ্ত হয়। ভবিষ্যতে অটলভাবে আমলের ওপর প্রতিজ্ঞা করে।
কিন্তু এরপর যার যার বাড়ি চলে গেলে আবার সেই আগেরই অবস্থা ফিরে আসে। ওয়াজের সময় যেই প্রতিজ্ঞা আর ইচ্ছা করেছিল, সে অনুযায়ী আমল করতে গড়িমসি করে। তখন যদি তাকে বলা হয়, তবে কি তুমি আল্লাহর ওয়াদা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করো?
উত্তরে বলে, না, কিছুতেই না।
যদি বলা হয়, তাহলে ঠিকভাবে আমল করো।
সে আবার আমলের নিয়ত করে। কিন্তু আবারও অলসতা শুরু হয়। আমল থমকে থাকে। বরং কখনো কখনো তো হারাম আস্বাদনের মধ্যে প্রবেশ করে। অথচ সে জানে, এটা সম্পর্কে নিষেধ করা হয়েছে।
এ ধরনের মানুষের অবস্থা হলো হাদিসের বিলম্বিত সেই তিন সাহাবির (কাব ইবনে মালেক, হেলাল ইবনে উমাইয়া, মুরারা ইবনে রাবিয়া রা.) অবস্থার মতো। তাদের যেমন কোনো ওজর নেই। আবার তারা বিলম্ব করার খারাপি সম্পর্কেও অবগত। প্রত্যেক পাপী ও অবহেলাকারীর অবস্থাও এমনই। তখন আমি এই অবস্থা নিয়ে চিন্তা করলাম যে, বিশ্বাস ও আকিদা তো বিশুদ্ধ; কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে এই যে অবহেলা ও গড়িমসি- এগুলোর কারণ কি? আমার মনে হয় এর পেছনে রয়েছে তিনটা কারণ-
১. তাৎক্ষণিক আনন্দ ও আস্বাদন। মানুষের চারপাশে এইগুলো অনেকটা যেন ওত পেতে রয়েছে। তাই খুব সহজেই মানুষ যা অনেক পরে ও দূরে রয়েছে, তার পরিবর্তে বর্তমান ও তাৎক্ষণিক আনন্দের মধ্যে প্রবেশ করে ফেলে।
২. পরে কখনো তাওবা করে নেওয়ার ইচ্ছা। অর্থাৎ এখন গোনাহ হয়ে গেলেও পরে তাওবা করে ক্ষমা চেয়ে নেব- এমন ইচ্ছার বশবর্তী হয়েও অনেকে গোনাহে লিপ্ত হয়।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে কথা হলো, সে যদি আকল দিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করত, তবে বিলম্বে তাওবার সমস্যাগুলো নিয়ে সে সতর্ক থাকত। কারণ, মৃত্যু তো অনেকসময় আকস্মিক এসে যায়। তাওবা করার কোনো সুযোগ পাওয়া যায় না।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এমন ব্যক্তি-যেকোনো মুহূর্তে যার প্রাণবায়ু বের হয়ে যেতে পারে-তবুও সে দৃঢ়তার ওপর আমল করে না। তাওবা করে না। বরং নফস তাকে আরও দীর্ঘ জীবন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, صل صلاة مودع -নামাজ পড়ো জীবনের শেষ নামাজ পড়ার মতো। ১৯
এ ধরনের রোগীর জন্য এটিই হলো শ্রেষ্ঠ ওষুধ। কারণ, যে ব্যক্তি ভাববে, এই নামাজের পর সে আরেকটি নামাজের সময় পর্যন্ত জীবিত থাকবে না, সে তো এই নামাজ খুব যত্ন ও খুশু-খুশুর সাথে আদায় করবে।
৩. আল্লাহর রহমতের আশা করা।
আল্লাহর রহমতের আশা তো করতেই পারে মানুষ। কিন্তু তাই বলে অব্যাহত গোনাহ করবে, তাওবা করবে না এবং গোনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে না- অথচ তার রহমতের আশা করে বসে থাকবে, তবে তো সে তার রহমত পাবে না।
সে মনে মনে ভাবছে, আল্লাহ তাআলা তো রহিম দয়ালু দয়াময়; কিন্তু সে কেন ভুলে থাকছে যে, আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তিদাতাও। তার জানা উচিত আল্লাহর রহমত এত সহজ নয়। যদি তা-ই হতো, তবে তো পৃথিবীতে একটি চড়ুইও জবাই হতো না। কোনো শিশুকেই কষ্টে আপতিত হতে হতো না। তার শাস্তি থেকে সবাই নিরাপদও নয়। নতুবা তিনি চুরির বিনিময়ে হাতকাটার নির্দেশ দিতেন না। ব্যভিচারের শাস্তিতে প্রস্তরাঘাতে হত্যার নির্দেশ দিতেন না।
আল্লাহ তাআলার নিকট আমাদের প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের কল্যাণকর কাজের ওপর সক্ষমতা ও অটলতা দান করেন। আমিন।
টিকাঃ
৯৯ ** সুনানে ইবনে মাজা: ১২/৪১৬১, পৃষ্ঠা: ২০৭ এবং মুসনাদে আহমদ: ৪৭/২২৪০০, পৃষ্ঠা: ৪৯৫- মা. শামেলা। পুরো হাদিসটি এমন- عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ عِظْنِي وَأَوْجِزْ فَقَالَ إِذَا قُمْتَ فِي صَلَاتِكَ فَصَلِّ صَلَاةَ مُوَدَّعٍ وَلَا تَكَلَّمْ بِكَلَامٍ تَعْتَذِرُ مِنْهُ غَدًا وَاجْمَعُ الْإِيَاسَ مِمَّا فِي يَدَيْ النَّاسِ।
📄 অস্থির মনোযোগের কৌশল
দুনিয়ার কারবারের মাঝে ইলম ও উৎকর্ষের ক্ষেত্রে নিজের মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে একজন দরিদ্র যুবকের জন্য। এই অবস্থায় সে যদি বিয়ে করে, তবে তো তার উপার্জনের চিন্তাতেই বেহাল দশা হয়ে পড়বে কিংবা তাকে মানুষের নিকট চেয়ে বেড়াতে হবে- এতে কিছুতেই তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে না। এরপর যখন তার সন্তান-সন্ততি হবে, তখন তো চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। উপার্জনের চিন্তায় চোখে-মুখে কিছুই দেখতে পাবে না। তখন হয়তো হালাল-হারামের বাছবিচার করার অবস্থাও তার থাকবে না। আর যদি বেঁচে চলতে চায়, তখন তার ও তার পরিবারের খাদ্যের কী অবস্থা হবে- আল্লাহই মালুম। আর যদি স্ত্রী তার এই জীর্ণ ভরণ-পোষণের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে-অথচ এর অধিক তার বর্তমানে সক্ষমতাও নেই-তখন কি আর তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে? কীভাবেই বা সে নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করতে সক্ষম হবে?
কিছুতেই সম্ভব নয়।
সেই অবস্থায় স্থিরচিত্তের আশা করা যায় কীভাবে- যখন চোখ চেয়ে থাকে মানুষের দয়ার দিকে, কান শুনতে থাকে তাদের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত কথা। ভাষা তাদেরকে সম্বোধন করে বিভিন্ন তোষামোদি শব্দে- আর এর মাঝেই অন্তর বিচলিত থাকে নিজের অপরিহার্য উপার্জনের চিন্তায়?
কেউ যদি প্রশ্ন করে, এ অবস্থায় তবে আমার কী করা উচিত?
আমি উত্তরে বলব, দুনিয়াতে যদি সাধারণভাবে তোমার চলার মতো কোনো উপার্জন থাকে- যতই সামান্য হোক, যদি তা যথেষ্ট হয়ে যায়, তবে তুমি তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকো। যতদূর সম্ভব দুনিয়াদার মানুষের সংশ্রব থেকে দূরে অবস্থান করো। আর যদি বিয়ের প্রয়োজন হয়, তাহলে দরিদ্র দেখে বিয়ে করো- তাহলে সে স্বল্প ভরণ-পোষণের ওপরই সন্তুষ্ট থাকবে। আর তুমিও তার দারিদ্র্যের প্রতি সবর করবে। যদি অসুন্দরও হয়- তুমি তার এই কিছুটা অসৌন্দর্যের ওপরও ধৈর্যধারণ করবে। কিছুতেই এমন কাউকে বিয়ে করার দিকে ঝুঁকবে না- যার চাহিদা বেশি। বেশি ভরণ-পোষণের প্রতি আগ্রহী এবং আহ্লাদী।
এভাবে তোমার যদি একটি সৎ ও ধৈর্যশীলা স্ত্রী মেলে, তবেই শুধু তোমার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে। আর যদি তেমন কাউকে না পাও, তবে তোমার বিপদের মধ্যে পড়ার চেয়ে ধৈর্যধারণ করাই উত্তম।
আর অধিক সুন্দরী ও সৌখিনতা থেকে সব সময় নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবে। কারণ, সৌন্দর্যে বিমোহিত মানুষ তাদের প্রতি মূর্তিপূজারীদের মতো হয়ে পড়ে।
আর তোমার হাতে যদি কিছু উপার্জন হয়, তুমি তার কিছু খরচ করবে আর কিছু অবশিষ্ট রাখবে। এটাই তোমার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হবে।
এই যুগ ও এই যুগের মানুষের থেকে খুবই সতর্ক থাকবে। এখন আর কোনো নিঃস্বার্থ উপকারী ও অন্যকে প্রাধান্য দানকারী সহানুভূতিশীল ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। প্রকৃত বন্ধুত্বও উধাও হতে চলেছে। এখন কারও নিকট চাইলে সামান্য দেবে; কিন্তু ব্যাপক বিরক্ত হবে। একটু অনুগ্রহ করবে; কিন্তু তাতেই যেন সারাজীবন দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতে চাইবে। যখনই দেখা হবে, তখনই যেন অন্যভাবে অবহেলা দেখাবে। কিংবা এটার খোঁটা দেবে বা প্রতিদান চাইবে। অথবা এর কারণে তার কাছে বারবার যেতে বাধ্য করবে।
কিন্তু অতীতকালে ছিলেন আবু আমর ইবনে নাজিদের মতো ব্যক্তিত্বগণ। হজরত আবু উসমান আল মাগরিবি একদিন মিম্বারে আলোচনার মাঝে বললেন, আমার ওপর একহাজার দিনার ঋণ রয়েছে। এতে আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আছি।
এইদিন রাতেই আবু আমর ইবনে নাজিদ তার নিকট আগমন করলেন। এবং পূর্ণ একহাজার দিনারের একটি থলে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা দিয়ে আপনি আপনার ঋণ পরিশোধ করুন।
পরের বার তিনি মিম্বারে বসে বললেন, আমি আল্লাহর নিকট আবু আমরের শোকর আদায় করছি। তিনি আমার অন্তরকে স্বস্তিময় করেছেন। আমার ঋণ পরিশোধ করেছেন।
সেখানেই হঠাৎ আবু আমর দাঁড়িয়ে বললেন, এই সম্পদটি ছিল আমার মায়ের। তার এটা দিতে খুবই কষ্ট হয়েছে। আপনি যদি এটি তাকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন, তবে ফিরিয়ে দিলেই ভালো হয়।'
কিন্তু যখন রাত্র হলো, আবু আমের আবার আবু উসমানের নিকট এসে অভিযোগ করে বললেন, আপনি কেন মানুষের মাঝে আমার নাম প্রকাশ করে দিলেন? আমি তো এটা তাদের জন্য করিনি। আপনি এটা আপনার জন্যই রাখেন। আর আমার কথা কাউকে বলবেন না।
আহা, এমনই ছিল তাদের মহিমান্বিত দান ও নিঃস্বার্থতা! সেগুলো আজ কোথায়! এই ব্যাপারটির দিকে ইঙ্গিত করে জনৈক কবি বলেন,
ماتوا وغيب في التراب شخوصهم ... والنشر مسك والعظام رميم
তারা তো সবাই ইন্তেকাল করেছে। আর সেই সাথে মাটির মধ্যে নিহিত হয়ে গেছে তাদের ব্যক্তিত্ব।
আজও তাদের মাটি হতে মহত্বের সুগন্ধি ঝরে। জীর্ণ হাড়ও প্রকাশ করে হৃদয়ের উদার উজ্জ্বলতা।
সুতরাং হে ভাই, যার অন্তর জুড়ে রয়েছে দুনিয়ার আয়-উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তুমি তার থেকে বহুদূরে অবস্থান করো। তার সাথে মিশে যতটা না অর্জন করতে সক্ষম হবে, তারচেয়ে অনেক বেশি দুনিয়ার প্রতি প্রভাবিত হবে। নিজের স্বল্পতুষ্টির শান্তি বিনষ্ট হবে। তুমি তাকে বাহ্যিকভাবে বন্ধু ভাবলেও গোপনে সে তোমার শত্রু। তোমার কষ্টে ও বিপদে আনন্দিত। তোমার কল্যাণের ওপর ঈর্ষান্বিত। তুমি তার থেকে নির্জনতা ক্রয় করে নাও।
একজন মানুষ—যার অন্তর ও বোধ রয়েছে—সে যখন বাজার থেকে ঘুরে তার বাড়িতে আসে, তার অন্তর আগের মতো আর থাকে না। বাজার তার অন্তরকে পরিবর্তন করে দেয়। তার মাঝে বঞ্চনার হাহাকার তৈরি করে দেয়। তাহলে সর্বক্ষণ কেউ যদি দুনিয়ার আসবাব ও বিলাসের উপকরণের মধ্যে থাকে— তার অন্তর বিক্ষিপ্ত না হয়ে যায় কোথায়!
আবারও বলি—এ ধরনের মানুষের থেকে নির্জনতা অবলম্বন করে নিজের মনোযোগকে নিজের কাজে একান্ত করার চেষ্টা করো। যাতে অন্তর পরপারের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করতে পারে। পথ-যাত্রার পাথেয় সঞ্চয় করতে পারে।