📄 ভালোবাসা ও ক্রোধকে লুকিয়ে রাখা
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কাউকে নিজের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচন করতে চায়, তার জানা থাকা উচিত- কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি দুই ধরনের হতে পারে- ১. স্ত্রী- যেখানে সাধারণত রূপসী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা হয়। ২. বন্ধু- যেখানে অভ্যন্তরীণ আচরণ ভালো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা হয়।
এখন কোনো নারীর বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য যদি তোমাকে মুগ্ধ করে, তাহলে পুরোপুরি তার দিকে ঝুঁকে পড়ার আগে তুমি তার অভ্যন্তরীণ স্বভাব ও আচরণ সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করে নাও। খোঁজ-খবর নাও। এরপর তুমি যেমনটা ভালোবাসো, তাকে যদি তেমনটা পাও- আর এই প্রাধান্য দানের মূল বিষয় যদি দ্বীন হয়, যেমন হাদিসে এসেছে- তোমরা বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনের বিষয়টাকেই প্রাধান্য দাও- তাহলে তুমি তার দিকে অগ্রসর হতে পারো এবং বিয়ে করে সংসার শুরু করতে পারো।
তবে লক্ষ রাখার বিষয় হলো, তুমি তোমার এই ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে পরিমিতিবোধ রক্ষা করে চলবে। নতুবা তুমি যদি তোমার প্রিয়তমার জন্য তোমার সকল ভালোবাসা উজাড় করে দেখিয়ে ফেলো, এটা হীতে বিপরীত হবে। এটা তোমার গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেবে। তোমার এই দুর্বলতার সুযোগ সে নেব। তখন তুমি তোমার প্রিয়তমার থেকে শুধু কষ্টই পাবে। পাবে অবহেলা, অনাসক্তি ও অহংকার। তোমার থেকে সে শুধু বেশি বেশি সম্পদ নিতে থাকবে। তাই ভালোবাসার ঢেউয়ে মনের দু-কূল যদি উপচেও পড়ে, তবুও সম্পূর্ণটা প্রকাশ না করা উচিত।
তবে এর সাথে আরেকটি কথাও বলে রাখি- নতুবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। খুবই সূক্ষ্ম কথা। সূক্ষ্মতম বোধ ও অনুভূতির কথা। কখনো কখনো অবশ্য মনের অবস্থা অনুযায়ী ভালোবাসার আচরণও করবে। সবটুকু ভালোবাসা দেখিয়ে ফেলবে। নতুবা সেও তোমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহে পতিত হয়ে যাবে। তুমি যে তাকে ভালোবাসো- তখন আর তাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না।
তবে এই ভালোবাসা প্রকাশ করবে খুবই অল্প সময়ের জন্য। এরপর আবার নিজের স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসবে। তাহলেই তোমার প্রিয়তমা তোমার বশীভূত ও অনুগত হয়ে থাকবে।
এভাবে তুমি তোমার সন্তানের ক্ষেত্রেও সব সময় পূর্ণ ভালোবাসা প্রকাশ করবে না। তাহলে সে তোমার ওপর বাড়াবাড়ি করবে। তোমার সম্পদ নষ্ট করবে। বেশি দম্ভ-বাহাদুরি দেখাবে। শিক্ষা ও আদব-কায়দা থেকে বঞ্চিত হবে।
বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই কথা। তুমি তোমার পূর্ণ আগ্রহ ও ঝোঁক তাকে দেখিয়ে ফেলো না। বরং পরিমিত সৌন্দর্যের সাথে চলতে থাকো। যার যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা, তা আপনিই প্রকাশ পেয়ে যাবে। যেমন গাছ-ফল দেখেই তার পরিচয় লাভ করা যায়। অনর্থক মুখে বাগাড়ম্বর করে লাভ কী?
এরপর কোনো মানুষের খারাপ আচরণের কারণে তুমি যদি তার প্রতি রাগান্বিত হও, সেটা তার কাছে কিছুতেই প্রকাশ করো না। এমনটি করলে- তুমি তো তাকে আগেই তোমার ব্যাপারে সতর্ক সজাগ করে দেবে। বরং তাকে প্রকাশ্যে আলোচনার জন্য আহ্বান করো। বিষয়টা সমাধান করার চেষ্টা করো। সে যদি তোমার সাথে বাড়াবাড়ি করতে চায় কিংবা কোনো অনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে চায়, যতদূর সম্ভব তুমি ভালো আচরণ করো। যতটুকু সম্ভব তুমি এমন মার্জিত আচরণ করো, যাতে লজ্জায় তার শত্রুতার ধার কমে আসে।
আর যদি রাগ একেবারে দমন করে রাখতে সক্ষম না হও, তবে কথা বলো সুন্দরভাবে। তাকে কষ্ট দেয়- এমন কথা বলো না। তোমাকে যদি তার থেকে কোনো কঠিন কঠোর বা নোংরা কথাও শুনতে হয়, তবুও তুমি তার সাথে সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় কথা বলো। তোমার এই সুন্দর আচরণই তার উদ্ধত মাথা ও কথাকে অবনমিত করতে পারে। এখন না হলেও পরে তো অবশ্যই, যদি তার বিবেক থাকে। একেবারে বিবেকশূন্য মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
📄 জালেমের সহযোগিতাও জুলুম
আমার খুবই আশ্চর্য লাগে- যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তার প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে ব্যক্তি কীভাবে এমন সুলতানের সেবাকে প্রাধান্য দেয়- যে জালেম ও পাপাচার?
এটা সে কেন করে? সে যদি দুনিয়া পাবার আশায় এটা করে থাকে, তবে তো এটা সঠিক পথ নয়। তাকে বাদশাহর সামনে বিনয়াবনত হয়ে বসে থাকতে হয়। কিন্তু এটাকেই সে গর্বের বিষয় মনে করে। বিভিন্ন মজলিসে দর্শকদের দিকে ঘাড় উঁচু করে সে তাকায়- কারণ, বাদশাহর সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। সে হারাম সম্পদ গ্রহণ করে। অথচ সে জানে, এগুলো কোথা থেকে আসে। বাদশাহর সাথে সম্পৃক্ততার সুবাদে কখনো কখনো বিভিন্ন মানুষ থেকে ঘুষও গ্রহণ করে। আর এসব কারণে ইলম ও বেলায়েতের যে মিষ্টতার আস্বাদন তার মাঝে ছিল, তা ধীরে ধীরে সব বের হয়ে যায়। সেখানে অন্ধকার বাসা বাঁধতে থাকে।
কিন্তু এসব করেও তার প্রয়োজন পূরণের তৃপ্তি মেটে না। তার আরও সম্পদের দরকার হয়। কিন্তু সে তা প্রাপ্ত হয় না। তখন দেখা যায়, এতদিন যার প্রশংসা করে এসেছে, তার বদনাম করতে শুরু করে।
এমন যদি অবস্থা না-ও হয়, তবুও তো তাকে সব সময় সুলতানের মেজাজ-মর্জির প্রতি দৃষ্টি রেখে চলতে হয়। সতর্ক থাকতে হয় নিজের কাজ ও কথা নিয়ে। তার অবস্থা যেন নৌকায় সাগর পাড়ি দেওয়ার মতো। শরীর অক্ষত থাকলেও অন্তর সব সময় ডুবে যাওয়ার ভয়ে থাকে শঙ্কিত।
আর যদি তার সাথে সম্পর্ক রাখে দ্বীনের জন্য, তবুও তো সে জানে, সুলতানরা অধিকাংশ সময়ই তাদেরকে দ্বীনের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে দেয় না। কারণ, তারা কখনো তাকে এমন কোনো কাজ বর্জন করতে আদেশ করে- যা ফরজ। আবার কখনো এমন কাজ করতে আদেশ করে- যা নাজায়েয। তখন তো নগদ তার দ্বীন ধ্বংস হলো। আর পরিণামে আখেরাতের শান্তি আরও ভয়াবহ।
📄 সদাচার দিয়েই শুধু স্বাধীনতা কেনা সম্ভব
যে ব্যক্তি লাঞ্ছনাকে অপছন্দ করে, সে কীভাবে একটি রুটির অপ্রাপ্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে পারে না? লাঞ্ছনাকর অনুগ্রহ থেকে নিজেকে কেন বিরত রাখতে পারে না? পৌরুষদীপ্ত কোনো হৃদয় কি তবে আর অবশিষ্ট নেই তার? সে যদি কোনো কৃপণের নিকট প্রার্থনা করে, তবে সে তাকে কিছুই দেবে না। আর যদি দেয়ও, খুবই অল্প দেবে। অথচ এই এতটুকু দান গ্রহণকারীকে সারাজীবনের জন্য দাস করে রাখবে। এই স্বল্প দানটুকু খুব দ্রুতই খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু এই অনুগ্রহ, এই লাঞ্ছনা এবং নিজেকে তুচ্ছ করে দেখার হীনতা আজীবন রয়েই যাবে। কারণ, হাত পেতে গ্রহণকারীকে কখনো সম্মানের চোখে দেখা হয় না।
তাছাড়া এই সামান্য দানটুকু দাতার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা থেকে তাকে চুপ করিয়ে দেবে। তার কোনো হুকুম পালনে তাড়িত করবে। তার আকাঙ্ক্ষা মতো সেবা প্রদানে বাধিত করবে।
তাহলে কেন সে এই দানটুকু গ্রহণ করতে যাবে? এই হলো আশ্চর্য কথা!
তবে এর থেকেও আশ্চর্যের কথা হলো, এই সামান্য দানের মাধ্যমে যে ব্যক্তি স্বাধীনদের ক্রয় করতে সক্ষম, অথচ সে তা করে না! স্বাধীনকে শুধু অনুগ্রহ ও ইহসানের মাধ্যমেই ক্রয় করা যায়। কবি বলেন-
تفضل على من شئت واعن بأمره .. فأنت ولو كان الأمير أميره وكن ذا غنى عن من تشاء من الورى .. ولو كان سلطاناً فأنت نظيره على طمع منه فأنت أسيره ومن كنت محتاجاً إليه وواقفا ....
তুমি যাকে চাও, তার ওপর অনুগ্রহ করো এবং তার কাজে সাহায্য করো। আমির যদি থেকেও থাকে, তবু তুমিই হবে তার আমির।
সৃষ্টির সকল থেকে মুখাপেক্ষিহীন হও, দেশে যদি বাদশাহ থেকেও থাকে, তুমি হবে তার সমকক্ষ।
আর তুমি যদি কারও নিকট মুখাপেক্ষী হও এবং তার আকাঙ্ক্ষা মতো চলো, তবে তুমি হবে তার বন্দি।
📄 তরুণের প্রতি আহ্বান
একটি কিশোর যখন সাবালক হয়, তখন তার জন্য উচিত হবে অধিক সহবাস ও বীর্যচ্যুতি [অর্থাৎ বিবাহিত বৈধ সহবাস বা যেকোনো উপায়ে বীর্যপাত] থেকে বেঁচে থাকা; যাতে তার শারীরিক গঠনের মূল কাঠামো শক্তিশালী থাকে। তাহলে এটা তার বার্ধক্যে উপকার করবে। কারণ, তার তো একটি দীর্ঘ বয়সের সম্ভাবনা রয়েছে। আর যার সম্ভাবনা রয়েছে, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকাই উচিত- তাহলে সে কেন সতর্ক হবে না?
যেমন, শীত আসার আগেই তার প্রস্তুতি নিতে হয়। যে ব্যক্তি তার উপার্জনের সক্ষমতার সময় সকল সম্পদ খরচ করে ফেলে, অক্ষমতার সময় তাকে দারিদ্র্যের কষ্ট সহ্য করতে হয়।
যারা দ্বীনদার ও বুঝমান তারা বোঝেন, এ ক্ষেত্রে যেসকল বিষয় সহবাসের দিকে নিয়ে যায় সেগুলো থেকে তার বিরত থাকা উচিত। যেমন, দেখা করা। নিকটে আসা। আর এটাও জানা থাকা উচিত, অধিক সহবাস ভালোবাসাকে কমিয়ে দেয়। প্রকৃত আস্বাদনকে রহিত করে দেয়।
প্রাচীন আরবে তারা একে অপরকে ভালোবাসত; কিন্তু সহবাস করত না। প্রেমাস্পদের সাথে সহবাসকে তারা পছন্দ করত না। এ কারণে তাদের প্রবাদের মধ্যে আছে, إن نكح الحب فسد -ভালোবাসার মানুষের সাথে সহবাস করলে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়।
তাছাড়া ভালোবাসাহীন নিছক শুধু শারীরিক সহবাস- এটা তো চতুষ্পদ জন্তুদের অভ্যাস।
আমি সহবাসের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করে একটি আশ্চর্য বিষয় অনুধাবন করেছি। বিষয়টি অনেক মানুষই অনুভব করে না। বিষয়টা হলো, কোনো ব্যক্তি যখন আরেকজনের প্রেমে পড়ে, তখন সে তার নৈকট্য অর্জনকে ভালোবাসে। তার সান্নিধ্য ও পরস্পর একত্র হওয়াকে ভালোবাসে। কারণ, এটিই হলো নৈকট্যের শেষ সীমা। এরপর তারা আরও নিকট হতে চায়, তখন গালে চুমো খায়। এরপর আত্মার আরও নৈকট্য চায়। তখন মুখে চুমো খায়। কারণ, এটাই আত্মার বের হওয়ার স্থান। এরপর আরও নিকটবর্তী হতে চায়, তখন প্রিয়তম বা প্রিয়তমার জিহ্বা লেহন করে। এরপর নফস যখন আরও নিকটবর্তী হতে চায়, তখন তারা সহবাসের দিকে অগ্রসর হয়।
এটা হলো হৃদয়ের খুবই সূক্ষ্ম ও অনুভবনীয় এক বিষয়। তবে এর থেকে শারীরিক সুখও অনুভূত হয়।
টিকাঃ
১৮. বর্তমানে আরও যে সকল গোনাহের উপকরণ ও মাধ্যম রয়েছে সেগুলো থেকেও সতর্ক থাকা উচিত। যেমন মোবাইল, টিভি ও নেট। এগুলোর অশ্লীল বা খারাপ অপশন ও সাইটগুলো থেকে নিজেকে কঠিনভাবে বিরত রাখা উচিত। কারণ, এই অবারিত সুলভ অশ্লীলতা ও গোনাহপূর্ণ অবস্থান থেকে নিজেকে বিরত রাখতে না পারলে নিজের ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারবে না। দুনিয়া ও আখেরাত- উভয়টিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরসাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি খুবই প্রয়োজন হলে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা। এর প্রতি আসক্ত হয়ে না পড়া। সময় নষ্ট না করা। চোখের হেফাজত করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।- অনুবাদক।