📄 সহানুভূতি ও সহমর্মিতা
কোনো শত্রু বা হিংসুকের সাথে তর্কের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি একটি বোকামিপূর্ণ কাজ।
তুমি যদি তার অবস্থা সম্পর্কে জেনেই থাকো, তাহলে তার সাথে এমন কথা বলো, যা তোমাদের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হয়। সে যদি কোনো আপত্তি করে, সেটা গ্রহণ করো। সে যদি নিজের থেকে ঝগড়া করতে চায়, তুমি তা বর্জন করো এবং বোঝানোর চেষ্টা করো, দু-জনের অবস্থান খুবই কাছাকাছি।
এরপর তোমার কাজ হবে খুব বিচক্ষণতা ও গোপনীয়তার সাথে তার বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং কোনো অবস্থাতেই তার ওপর আস্থা না রাখা। প্রকাশ্যে তার সঙ্গ ও সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করলেও ভেতরে ভেতরে তার সাক্ষাতকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা।
এরপর তুমি যদি তাকে কষ্ট দিতে চাও, তবে তাকে তোমার প্রথম কষ্ট দেওয়া এই হবে যে, তুমি নিজেকে সংশোধন করে নেবে এবং যে সমস্যাগুলোর কথা সে তোমাকে বলেছে, সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করবে। এরপর তোমার সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হবে- তাকে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে ক্ষমা করে দেবে। সে যত বেশি গালাগালি করবে, তুমি ততই তা বর্জন করে চলবে। আশা করা যায়, তাহলে জনসাধারণই তোমার পক্ষ হয়ে তার উত্তর দিয়ে দেবে। বিজ্ঞজনেরা তোমার সহনশীলতার প্রশংসা করবে।
আর এদিকে তুমি যদি তাকে প্রকাশ্যভাবে কষ্ট দাও কিংবা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তবে এটা শুধু বাহ্যিকভাবেই একটি ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন রেখে যাবে। কিন্তু তুমি যদি আমার বর্ণিত পন্থায় উত্তম প্রতিশোধ নাও, সেটা তার অন্তরে বহুগুণ বড় আঘাত হয়ে জ্বলজ্বল করবে। এটা তোমার কোনো কথা দিয়ে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে বহুগুণে উত্তম। কারণ, তুমি যদি কথা দিয়ে তাকে কষ্ট দাও, তবে তুমি এর দ্বিগুণ কথা শুনতে বাধ্য থাকবে।
এছাড়াও বেশি তর্কের মাধ্যমে এটা বেশি করে জানানো হবে যে, তুমি তার শত্রু। তখন সে তোমার থেকে সতর্ক থাকবে এবং বিভিন্ন কথা বলে বেড়াবে। আর বিতর্ক এড়িয়ে চলার মাধ্যমে সে তোমার অভ্যন্তর সম্পর্কে বেখবর থাকবে। তখন তুমি তার থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে।
কিন্তু দ্বীনের কোনো ক্ষতি করে তুমি যদি তাকে কষ্ট দাও, তবে তো সেই সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্দোষ প্রমাণিত হবে। যার কাজের মধ্যে গোনাহ বিজয়ী হয়, সে নিজে কখনো বিজয়ী হতে পারে না। বরং বিজয় তো আসবে সুন্দর ধৈর্য ও বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
নির্দেশিত পন্থায় চলা তার জন্যই সহজ হবে, যে ব্যক্তি মনে করে- তার উপর মানুষের শত্রুতার এই কষ্ট চাপানো হচ্ছে তার নিজের কোনো গোনাহের কারণে কিংবা পরীক্ষার মাধ্যমে তার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। তখন তো সে শুধু বিতর্ককারী শত্রুকেই দেখবে না, তখন সে অনুভব করবে স্রষ্টার কুদরত।
📄 আখেরাতের বিনিময়
যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে জান্নাতের চিরন্তনতা নিয়ে এভাবে চিন্তা করবে- জান্নাতের স্বচ্ছ পবিত্রতার মধ্যে কোনো পঙ্কিলতা নেই। যেখানে আছে শুধু অন্তহীন আনন্দ ও সুখ। যেখানে আছে অন্তরের সকল চাহিদার বাস্তবায়ন। এবং আরও আরও বহু নিয়ামত- যা কোনো চোখ দেখেনি... যা কোনো কর্ণ শোনেনি... যা কোনো অন্তর কল্পনা করেনি। এর কোনো পরিবর্তন হবে না। নিঃশেষ হবে না। এটা এতই সীমাহীন যে, হাজার হাজার বছর বললেও কোনো কিনারা হবে না। লাখ লাখ বছর বললেও সীমা পাওয়া যাবে না। এমনকি যদি কোটি কোটি বছর বলো- তবুও এর সংখ্যার গণনা শেষ হবে না। কারণ, এ সংখ্যাগুলোর তবুও তো একটা সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে। কিন্তু আখেরাতের কোনো শেষ বা সমাপ্তি নেই। এমনই তার সীমাহীন নিয়ামত ও সুখ।
তবে এটাকে অর্জন করতে হবে দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত জীবনের বিনিময়ে। আচ্ছা, একজনের সাধারণ প্রলম্বিত জীবন কতটুকু হয়- ধরি, একশ বছর। এর প্রাথমিক পনেরো বছর তো শৈশব ও অবুঝ অবস্থার মধ্যে চলে যায়। এরপর সত্তরের পর বাকি ত্রিশ বছর নানাবিধ দুর্বলতা ও অক্ষমতার মধ্যে অতিবাহিত হয়। আর মাঝের যে শক্তিমত্তার বছরগুলো- এর তো প্রায় অর্ধেক যায় ঘুমের মধ্যে। কিছু যায় পানাহারে। আর যায় খাদ্য-খাবার উপার্জনে। আর বাকিটুকু সাধারণ বিভিন্ন অভ্যাস ও অবহেলায়।
তাহলে মূল জীবনের সময় কতটুকু? কতই না স্বল্প! এই স্বল্প ও সংক্ষিপ্ত জীবনের বিনিময়ে সেই সীমাহীন অনন্ত সুখের জীবন কি সে কিনতে রাজি হবে না? জীবনের এই এত লাভজনক ক্রয় ও বিক্রয় থেকে দূরে থাকার অর্থ হলো সবচেয়ে বড় বোকামির পরিচয় দেওয়া। বুদ্ধিহীনতার প্রকাশ ঘটানো। এবং আল্লাহর ওয়াদার ব্যাপারে বিশ্বাসের মধ্যে বড় ত্রুটি থাকার প্রকাশ করা।
আর কীভাবে এটা ক্রয়-বিক্রয় করতে হয়, তা জানা যাবে ইলমের মাধ্যমে। ইলমই পথ দেখায় এক্ষেত্রে কোনটি করা চাই আর কোনগুলো থেকে বিরত থাকা চাই।
কিন্তু ইবলিস এক্ষেত্রে একটা বড় ষড়যন্ত্র পাকিয়ে বসে আছে- যাতে বনি আদম এই অনন্ত সুখের জান্নাতে যেতে না পারে। সে কিছু জাহেদের অন্তরে এমন কিছু বিষয় প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে, যার কারণে তারা ইলম থেকে দূরে সরতে শুরু করেছে। যেন ইবলিস ইলমের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে চায়। যাতে সে অন্ধকারে শিকার করতে পারে। এ কারণে সে আলেমদের একটি বড় অংশকে এমন কাজে ব্যস্ত রেখেছে- যেন তারা ইলম থেকে দূরে সরে যায়।
আবু আহমাদ আত-তওসি নিজের ক্ষেত্রে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন- যা তার বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, 'আমি একবার এমন একজন সুফির নিকট পরামর্শ চাইতে গেলাম, যিনি সুফিদের মধ্যে খুবই প্রসিদ্ধ অগ্রগণ্য এবং অনেকের দ্বারা অনুসৃত। আমি তাকে কোরআন তেলাওয়াতের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে তেলাওয়াত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বললেন,
'সঠিক পথ হলো, তুমি দুনিয়ার সাথে সকল সম্পৃক্ততা ছিন্ন করে ফেলবে। তোমার অন্তর যেন লেপ্টে না থাকে তোমার স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি। সম্পদ ও ইলমের প্রতি। বরং তোমার অবস্থা এমন হবে যে, এগুলোর অস্তিত্ব থাকা ও না-থাকা তোমার নিকট সমান মনে হবে। এরপর তুমি জমিনের কোনো একপ্রান্তে একেবারে মুক্ত অন্তর নিয়ে বসে যাবে। শুধু ফরজ ও নির্দিষ্ট ওজিফার উপর সীমাবদ্ধ থাকবে। এরপর অন্তর সবকিছু থেকে মুক্ত করে বসে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করবে। জিকির করতেই থাকবে। এমন অবস্থা হবে যে, তুমি যদি জিকির বন্ধ করেও দাও, তবুও যেন তোমার জিহ্বায় আপনিই জিকির জারি হয়ে যায়। এরপর অপেক্ষা করো- নবী ও আওলিয়াদের ক্ষেত্রে যেই অবস্থা খুলে যায়, তোমার জন্যও সেই পথ খুলে যাবে।'
এক্ষেত্রে আমি বলি, এটি তেমন আশ্চর্যের বিষয় নয়। আমাকেও অনেকে এ ধরনের কথা বলেছে। কিন্তু আমি তাদের বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করি, যারা জেনে-বুঝে ও ধরনের পথ অনুসরণ করে। কোরআন তেলাওয়াতকে উপেক্ষা করে কি সঠিক পথে চলা সম্ভব? নবীদের জন্য যা উন্মোচিত হয়েছে, তা কি তাদের চেষ্টা ও সাধনার কারণে হয়েছে? এই পথ ও পদ্ধতির কথা যে বলে, তার কথার ওপর কি আস্থা রাখা যায়? যায় না।
এরপর কথা হলো, এই সাধনার কারণে তার সামনে কী খুলে যাবে? তার জন্য অদৃশ্যের দরজা খুলে যাবে নাকি ওহির দরজা? এই সবকিছু হলো শয়তানের খেল-তামাশা। মানুষকে বিপথগামী করার ষড়যন্ত্রের খেলা। ক্ষুধার্ত অপুষ্ট নির্ঘুম বিশ্রামহীন নির্জন মানুষের নিকট অনেক বিষয়ই 'দৃষ্টিবিভ্রম' হয়। চোখে উল্টাপাল্টা দেখে। ভীষণ দুর্বলতায় চোখে আলোর ঝলকানি দেখে। কিংবা শয়তান নিজে বিভিন্ন বিষয় দেখায়। আর এতেই তারা মনে করে কী না কী অদৃশ্যের দরজা খুলে গেল! এই তো কারামত!
কিন্তু তোমার কাজ হবে ইলম অর্জন করা। সালাফে সালেহিনের জীবনের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। তাদের কেউ কি কখনো এগুলো করেছেন, না এর আদেশ দিয়ে গেছেন?
সুতরাং তারা যদি এগুলো না করে কোরআন নিয়ে বসত। হাদিসের ইলম অর্জন করত। এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের জীবনাদর্শের দিকে দৃষ্টি দিত- তাহলে এগুলোই তাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখত। তখন আর এভাবে তারা বিপথগামী হতো না।
📄 ভালোবাসা ও ক্রোধকে লুকিয়ে রাখা
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কাউকে নিজের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচন করতে চায়, তার জানা থাকা উচিত- কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি দুই ধরনের হতে পারে- ১. স্ত্রী- যেখানে সাধারণত রূপসী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা হয়। ২. বন্ধু- যেখানে অভ্যন্তরীণ আচরণ ভালো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা হয়।
এখন কোনো নারীর বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য যদি তোমাকে মুগ্ধ করে, তাহলে পুরোপুরি তার দিকে ঝুঁকে পড়ার আগে তুমি তার অভ্যন্তরীণ স্বভাব ও আচরণ সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করে নাও। খোঁজ-খবর নাও। এরপর তুমি যেমনটা ভালোবাসো, তাকে যদি তেমনটা পাও- আর এই প্রাধান্য দানের মূল বিষয় যদি দ্বীন হয়, যেমন হাদিসে এসেছে- তোমরা বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনের বিষয়টাকেই প্রাধান্য দাও- তাহলে তুমি তার দিকে অগ্রসর হতে পারো এবং বিয়ে করে সংসার শুরু করতে পারো।
তবে লক্ষ রাখার বিষয় হলো, তুমি তোমার এই ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে পরিমিতিবোধ রক্ষা করে চলবে। নতুবা তুমি যদি তোমার প্রিয়তমার জন্য তোমার সকল ভালোবাসা উজাড় করে দেখিয়ে ফেলো, এটা হীতে বিপরীত হবে। এটা তোমার গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেবে। তোমার এই দুর্বলতার সুযোগ সে নেব। তখন তুমি তোমার প্রিয়তমার থেকে শুধু কষ্টই পাবে। পাবে অবহেলা, অনাসক্তি ও অহংকার। তোমার থেকে সে শুধু বেশি বেশি সম্পদ নিতে থাকবে। তাই ভালোবাসার ঢেউয়ে মনের দু-কূল যদি উপচেও পড়ে, তবুও সম্পূর্ণটা প্রকাশ না করা উচিত।
তবে এর সাথে আরেকটি কথাও বলে রাখি- নতুবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। খুবই সূক্ষ্ম কথা। সূক্ষ্মতম বোধ ও অনুভূতির কথা। কখনো কখনো অবশ্য মনের অবস্থা অনুযায়ী ভালোবাসার আচরণও করবে। সবটুকু ভালোবাসা দেখিয়ে ফেলবে। নতুবা সেও তোমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহে পতিত হয়ে যাবে। তুমি যে তাকে ভালোবাসো- তখন আর তাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না।
তবে এই ভালোবাসা প্রকাশ করবে খুবই অল্প সময়ের জন্য। এরপর আবার নিজের স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসবে। তাহলেই তোমার প্রিয়তমা তোমার বশীভূত ও অনুগত হয়ে থাকবে।
এভাবে তুমি তোমার সন্তানের ক্ষেত্রেও সব সময় পূর্ণ ভালোবাসা প্রকাশ করবে না। তাহলে সে তোমার ওপর বাড়াবাড়ি করবে। তোমার সম্পদ নষ্ট করবে। বেশি দম্ভ-বাহাদুরি দেখাবে। শিক্ষা ও আদব-কায়দা থেকে বঞ্চিত হবে।
বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই কথা। তুমি তোমার পূর্ণ আগ্রহ ও ঝোঁক তাকে দেখিয়ে ফেলো না। বরং পরিমিত সৌন্দর্যের সাথে চলতে থাকো। যার যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা, তা আপনিই প্রকাশ পেয়ে যাবে। যেমন গাছ-ফল দেখেই তার পরিচয় লাভ করা যায়। অনর্থক মুখে বাগাড়ম্বর করে লাভ কী?
এরপর কোনো মানুষের খারাপ আচরণের কারণে তুমি যদি তার প্রতি রাগান্বিত হও, সেটা তার কাছে কিছুতেই প্রকাশ করো না। এমনটি করলে- তুমি তো তাকে আগেই তোমার ব্যাপারে সতর্ক সজাগ করে দেবে। বরং তাকে প্রকাশ্যে আলোচনার জন্য আহ্বান করো। বিষয়টা সমাধান করার চেষ্টা করো। সে যদি তোমার সাথে বাড়াবাড়ি করতে চায় কিংবা কোনো অনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে চায়, যতদূর সম্ভব তুমি ভালো আচরণ করো। যতটুকু সম্ভব তুমি এমন মার্জিত আচরণ করো, যাতে লজ্জায় তার শত্রুতার ধার কমে আসে।
আর যদি রাগ একেবারে দমন করে রাখতে সক্ষম না হও, তবে কথা বলো সুন্দরভাবে। তাকে কষ্ট দেয়- এমন কথা বলো না। তোমাকে যদি তার থেকে কোনো কঠিন কঠোর বা নোংরা কথাও শুনতে হয়, তবুও তুমি তার সাথে সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় কথা বলো। তোমার এই সুন্দর আচরণই তার উদ্ধত মাথা ও কথাকে অবনমিত করতে পারে। এখন না হলেও পরে তো অবশ্যই, যদি তার বিবেক থাকে। একেবারে বিবেকশূন্য মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
📄 জালেমের সহযোগিতাও জুলুম
আমার খুবই আশ্চর্য লাগে- যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তার প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে ব্যক্তি কীভাবে এমন সুলতানের সেবাকে প্রাধান্য দেয়- যে জালেম ও পাপাচার?
এটা সে কেন করে? সে যদি দুনিয়া পাবার আশায় এটা করে থাকে, তবে তো এটা সঠিক পথ নয়। তাকে বাদশাহর সামনে বিনয়াবনত হয়ে বসে থাকতে হয়। কিন্তু এটাকেই সে গর্বের বিষয় মনে করে। বিভিন্ন মজলিসে দর্শকদের দিকে ঘাড় উঁচু করে সে তাকায়- কারণ, বাদশাহর সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। সে হারাম সম্পদ গ্রহণ করে। অথচ সে জানে, এগুলো কোথা থেকে আসে। বাদশাহর সাথে সম্পৃক্ততার সুবাদে কখনো কখনো বিভিন্ন মানুষ থেকে ঘুষও গ্রহণ করে। আর এসব কারণে ইলম ও বেলায়েতের যে মিষ্টতার আস্বাদন তার মাঝে ছিল, তা ধীরে ধীরে সব বের হয়ে যায়। সেখানে অন্ধকার বাসা বাঁধতে থাকে।
কিন্তু এসব করেও তার প্রয়োজন পূরণের তৃপ্তি মেটে না। তার আরও সম্পদের দরকার হয়। কিন্তু সে তা প্রাপ্ত হয় না। তখন দেখা যায়, এতদিন যার প্রশংসা করে এসেছে, তার বদনাম করতে শুরু করে।
এমন যদি অবস্থা না-ও হয়, তবুও তো তাকে সব সময় সুলতানের মেজাজ-মর্জির প্রতি দৃষ্টি রেখে চলতে হয়। সতর্ক থাকতে হয় নিজের কাজ ও কথা নিয়ে। তার অবস্থা যেন নৌকায় সাগর পাড়ি দেওয়ার মতো। শরীর অক্ষত থাকলেও অন্তর সব সময় ডুবে যাওয়ার ভয়ে থাকে শঙ্কিত।
আর যদি তার সাথে সম্পর্ক রাখে দ্বীনের জন্য, তবুও তো সে জানে, সুলতানরা অধিকাংশ সময়ই তাদেরকে দ্বীনের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে দেয় না। কারণ, তারা কখনো তাকে এমন কোনো কাজ বর্জন করতে আদেশ করে- যা ফরজ। আবার কখনো এমন কাজ করতে আদেশ করে- যা নাজায়েয। তখন তো নগদ তার দ্বীন ধ্বংস হলো। আর পরিণামে আখেরাতের শান্তি আরও ভয়াবহ।