📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রকৃত জীবনযাপন তো জান্নাতে

📄 প্রকৃত জীবনযাপন তো জান্নাতে


আমি আমার নিজের ব্যাপারে চিন্তা করে দেখলাম- আমি তো একজন প্রকৃত নিঃস্ব মানুষ।
কারণ, আমি যদি আমার সুখের জন্য স্ত্রীর ওপর নির্ভর করি, তাহলে তাকে আমি যেমনটি চাই, তেমনটি কখনো পাব না। যদি চেহারা-সুরত সুন্দর হয়, তবে হয়তো আচার-আচরণ ভালো নয়। আবার যদি আচার-আচরণ ভালো হলো, কিন্তু সর্বক্ষণ সে তার উদ্দেশ্য পূরণেই ব্যস্ত- আমাদের দিকে কোনো খেয়ালই রাখল না। এমনও হতে পারে, সে বরং আমার ইনতেকালের অপেক্ষা করছে।
এরপর আমি যদি সন্তানের ওপর নির্ভর করি-সেও এমনই হবে। খাদেম এবং মুরিদ-তাদের বিষয়টিও এমন। আমার থেকে যদি তাদের কোনো উপকার না হয়, তাহলে তারা কখনো আমাকে চাইবে না।
এরপর বন্ধুর কথা যদি বলি, সে তো কিছুতেই নয়। আর যারা দ্বীনি ভাই, তারা তো পশ্চিমের রূপকথার পাখির মতো। আর পরিচিত ব্যক্তিরা দ্বীনি ব্যক্তিদের গণ্যের মধ্যেই রাখে না। তাদের দৃষ্টিতে এরা যেন থেকেও কোথায় নেই।
এখন শুধু বাকি রইলাম আমি একা- একেবারে একা।
এপর আমি আমার নফসের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। দেখলাম আমার নফসও আমার অনুগামী সঙ্গী নয়। সে হয়তো ভালো সময়ে আমার প্রতি আক্রমণ করে না। কিন্তু দুর্বল সময়ে ক্ষতি করতে ছাড়ে না। সুতরাং সাহায্যের জন্য এখন শুধু বাকি থাকেন একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা।
এখন আমি যদি দুনিয়াতে সুখের জন্য তার নিয়ামতসমূহের ওপর নির্ভর করতে যাই, তবে এগুলো ধ্বংস হওয়া থেকে তো নিরাপদ নয়, স্থায়ী নয়। আর যদি শুধু তার ক্ষমার আশা করি, শাস্তির ক্ষেত্রেও তো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি না।
হায় আফসোস! এখানে কোনো স্থায়ী প্রশান্তি নেই। চিরকালীন অবস্থিতি নেই। আমার অস্থিরতার প্রশমন নেই। আর জ্বলনের কোনো নিরাময় নেই।
এবার তবে বুঝি- জান্নাত ছাড়া প্রকৃত কোনো জীবনযাপন নেই। সেখানে স্রষ্টার সন্তুষ্টির প্রতি ইয়াকিন আসবে। এবং বসবাস হবে এমন কারও সাথে, যে কখনো খিয়ানত করবে না। কখনো কষ্ট দেবে না। কিন্তু দুনিয়ার জীবন কখনো এমন হতে পারে না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কাউকে পূর্ণ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সতর্কতা

📄 কাউকে পূর্ণ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সতর্কতা


যে ব্যক্তি কোনো রাজা বা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রাখে, তার জন্য উচিত হলো, নিজের ভেতর ও বাইরের অবস্থা বরাবর রাখা। কারণ, বাদশাহ কখনো কখনো এমন লোক লুকিয়ে রাখে, যে বাদশাহকে তার গোপন খবর বলে দেয়। তখন সে গোপন পরীক্ষায় ধরা খেয়ে অপমানিত ও অপদস্থ হয়।
কোনো কোনো সুলতান বা বাদশাহ তার নিকট বন্ধুদের সাথে প্রাসাদের কোথাও একান্তে মিলিত হয়। সেখানে কোনো গোপন কথা থাকলে আলাপ করে। কিংবা আড্ডা, তামাশা ও মদ্যপান চলে। এই গোপন কক্ষের খবর সবাই জানে না। এদিকে অনুমতি ছাড়া কেউ আসার কল্পনাও করতে পারে না। বাদশাহ যখন কোনো গোপন কথা বলতে চান কিংবা সংবাদ নিতে চান, তখন তিনি তার একান্ত বন্ধুদের এখানে ডেকে নিয়ে আসেন। কারও ব্যাপারে কোনো সন্দেহ হলে এখানে এই গোপন বৈঠকেই তার সমাধান করেন। অন্যরা এর খবর জানতে পারে না।
একবার পারস্যের এক বাদশাহ আবরুজ তার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির পরীক্ষা করার ইচ্ছা করেন- যার চরিত্র সম্পর্কে বাদশাহর নিকট অভিযোগ এসেছিল। বন্ধুটি বিশেষ কামরায় বসে আছে। এ সময় বাদশাহ একজন লাস্যময়ী দাসীকে তার নিকট প্রেরণ করেন। তবে তাকে বলে দেন, সে শুধু যাবে আর চলে আসবে। বসবে না। দাসী তা-ই করল। আর এই সামান্য দেখাতেই সেই বন্ধুর মাঝে ভাবান্তর পরিলক্ষিত হলো।
পরদিন বাদশাহ দাসীকে বলল, এবার প্রাথমিক কথার পর সামান্য কিছুক্ষণ বসবে। দাসী তা-ই করল। এবার তো সেই বন্ধুটি রূপসী দাসীকে চোখ ঘুরিয়ে লক্ষ করে দেখতে লাগল।
যথারীতি বাদশাহর নিকট খবর গেল। বাদশাহ এবার দাসীকে পাঠানোর সময় বললেন, তুমি এবার তার সাথে দীর্ঘক্ষণ বসবে এবং বিভিন্ন কথাবার্তা বলতে থাকবে।
বাদশাহর কথামতো দাসীটি পরদিন দীর্ঘক্ষণ তার নিকট বসে রইল। বিভিন্ন কথাবার্তা ও হাসিমজাক করল। এবার তো সেই বন্ধুটি পুরোপুরি দাসীর প্রতি ঝুঁকে পড়ল। তাকে এসে ঝাঁপটে ধরল। এসময় দাসীটি বলল, ছাড়ুন, বাদশাহ হয়তো দেখে ফেলবেন কিংবা জেনে যাবেন। বরং এখনকার মতো আমাকে ছাড়ুন- আমি আমাদের গোপন অভিসারের জন্য একটি ব্যবস্থা করব।
দাসীটি বাদশাহর কাছে এসে সবই জানিয়ে দিল। বাদশাহ এবার ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি আরও নিশ্চিত হতে চাইলেন। এবার তিনি তার একান্ত বিশ্বস্ত এক দাসীকে পাঠালেন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আগের দাসীটি কি সত্য বলেছে? বন্ধুর কি কোনো দোষ আছে?
দাসীটি খবর নিয়ে জানাল, বন্ধুর এতটাই দোষ যে, আগের দাসীটি তার অনেক কিছুই লুকিয়েছে। সে তো আপনার বন্ধুর দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
এ খবর শুনে বাদশাহর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য এবং হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার জন্য তার বিশ্বস্ত দাসীটিকে কাজে লাগালেন। এবার এই দাসীটিও প্রথম দাসীটির মতো ভাব করতে লাগল এবং একদিন লোকটিকে বলল, বাদশাহ যখন তার বাগানবাড়িতে ভ্রমণ করতে যাবে, তখন আপনি এখানে অবস্থান করবেন। তিনি যদি আপনাকে তার সাথে নিয়ে যেতে চান, আপনি প্রকাশ করবেন যে, আপনি অসুস্থ। এরপর তিনি যদি আপনাকে আপনার পরিবারের নিকট গমন এবং এখানে অবস্থান—এ দুটোর মাঝে যেকোনো একটি নির্বাচন করে নেওয়ার স্বাধীনতা দেন, তবে আপনি এখানেই অবস্থানের বিষয়টি নির্বাচন করবেন এবং তাকে বললেন, আপনার নড়াচড়া করার ক্ষমতাও নেই। এরপর যখন আপনার কথায় সাড়া দিয়ে আপনাকে এখানে রেখে তিনি চলে যাবেন বাগানবাড়িতে, তখন আমি তার অনুপস্থিতিতে প্রতিরাতে আপনার নিকট আসব।
সেই বন্ধু দাসীর কথা মেনে নিল। সে এমনটিই করবে বলে আশ্বাস দিলো। দাসী এসে বাদশাহকে সবকিছু বলে দিলো। এর তিনদিন পর বাদশাহ তার বন্ধুকে ডেকে পাঠালেন।
বন্ধু বলে পাঠাল, সে অসুস্থ।
সংবাদবাহক এসে এই খবর বাদশাহকে প্রদান করল। বাদশাহ খবর শুনে মুচকি হাসলেন এবং মনে মনে বললেন, এই তো প্রথম আলামত প্রকাশ পেল। এরপর তিনি তাকে নিয়ে আসার জন্য একটি পালকি পাঠিয়ে দিলেন। লোকজন তাকে পালকিতে উঠিয়ে নিয়ে এলো। বাদশাহ দেখলেন, তার মাথায় পট্টি বাঁধা। এটা দেখেও তিনি মনে মনে মুচকি হাসলেন এবং বললেন, এই তো দ্বিতীয় আলামত প্রকাশ পেল। এরপর বাদশাহ তার দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেন, তোমার অবস্থা তো খুবই সঙ্গীন। তাহলে কি এখন বাড়িতে স্ত্রীর কাছে যাবে নাকি আমার ফিরে আসা পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করবে?
লোকটি বলল, আমার তো নড়াচড়া করতেও কষ্ট হয়। তাই এখানে অবস্থান করাই আমার জন্য উপযুক্ত হবে। এতে নড়াচড়া কম হবে।
এবার বাদশাহ মুচকি হেসে বললেন, কিন্তু আমি তো জানি, তোমাকে যদি এ অবস্থায় এখানে রেখে যাই, তাহলে তোমার বাড়িতে নড়াচড়ার চেয়ে এখানেই নড়াচড়া বেশি হবে।
এরপর বাদশাহ এমন একটি লাঠিখণ্ড আনতে বললেন, যা দিয়ে কোনো ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণীকে দাগ দেওয়ার নিয়ম।
এটা দেখেই লোকটি যা বোঝার সব বুঝে গেল। সে একটি ফাঁদে পা দিয়ে ধরা খেয়ে গেছে। তার কুকীর্তি সব ফাঁস হয়ে গেছে। বাদশাহ এবার তাকে আদেশ দিলেন নিজ হাতে তার অপরাধের বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখতে।
লোকটি বাদশাহর আদেশ অনুযায়ী নিজের অপরাধের বিবরণ লিখতে বাধ্য হলো। লোকজন জড় হলো। সবার সামনে বিবরণটি শোনানো হলো। এরপর তাকে দেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাসন দেওয়ার আদেশ করা হলো এবং সেই লিখিত বিবরণসহ ব্যভিচারের প্রতীক লাঠিখণ্ডটি একটি বর্শার মাথায় বেঁধে দেওয়া হলো। সে যেখানেই যাবে, এটা তার সাথেই থাকবে; যাতে অপরিচিত ব্যক্তিরাও এটা দেখে তার কীর্তির কথা জেনে যায়।
যখন আদেশ অনুযায়ী বাদশাহর লোকজন তাকে নিয়ে বের হলো, এ সময় আচমকা তাদের মাঝের একজনের কোমরে ঝুলানো তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে বলল, যে ব্যক্তি এই ছোট একটি অঙ্গের অনুসরণ করে, তার বাকি সকল অঙ্গই বিনষ্ট হয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পরই লোকটি সেখানেই মারা গেল।
কখনো কখনো কিছু রাজা-বাদশাহ নিজেরাও ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রজাদের মাঝে আসেন। তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তখন কোনো ব্যক্তি যদি বিরূপ কিছু বলে ফেলে, তখন তাদেরকে পাকড়াও করা হয় এবং শাস্তি প্রদান করা হয়। তাছাড়া অধিকাংশ সময় শাসকগণ নিজেদের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা প্রেরণ করে রাখেন। কেউ কোনো উল্টাপাল্টা কথা বললেই সেটা তাদের কানে চলে যায় এবং এর কথককে শাস্তি প্রদান করা হয়।
হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর খেলাফতের সময়ের একটি ঘটনা এখানে বলি- সকল জায়গায় তিনি ন্যায় ও ইনসাফের শাসন কায়েম করেছেন। রাষ্ট্রচালনার ক্ষেত্রে সত্যিকার যোগ্য ও দ্বীনদার ব্যক্তিরাই তাঁর নিকট সম্মান ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ সময় হেলাল ইবনে আবি বুরদাহ নামের চতুর এক লোক খুব ইবাদতগোজার হয়ে উঠল। মনে তার এক গোপন ইচ্ছা। দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের একটি নির্ধারিত স্থানে অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে নামাজ আদায় করল। কী চমৎকার ধীরস্থির তার রুকু ও সেজদা! কত ঈর্ষণীয় তার জিকির ও তেলাওয়াত! যে দেখবে, তারই চক্ষু তৃপ্ত হবে।
খলিফা হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. একদিন তার এই ইবাদত-বন্দেগি ও একনিষ্ঠতা দেখে বিমুগ্ধ হলেন। তিনি তার সঙ্গী আলা ইবনে মুগিরার কাছে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘লোকটি বড়ই দ্বীনদার মনে হচ্ছে! তার ইবাদতে বোধ হয় কোনো খুঁত বা লোক দেখানো কিছু নেই।’
আলা ইবনে মুগিরা বললেন, ‘আমিরুল মুমিনীন, আপনি এত তাড়াতাড়ি কাউকে বিশ্বাস করবেন না। তার ইবাদতে একনিষ্ঠতা আছে কি না-তা আমি আজই বের করার ব্যবস্থা করছি।’
মাগরিবের পর মুসল্লিরা সুন্নত-নফল পড়ে যার যার বাড়ি চলে গেল। কিন্তু প্রতিদিনের মতো আজও হেলাল ইবনে আবি বুরদা একপাশে দীর্ঘ নফলে এখনো দণ্ডায়মান। আলা ইবনে মুগিরা ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে এলেন। পাশে গিয়ে নিচু স্বরে বললেন, দুই রাকাত পড়ে তাড়াতাড়ি সালাম ফিরিয়ে নাও। তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।
কথা শুনে হেলাল ইবনে বুরদা তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করে নিল। সালাম ফিরিয়ে আলা ইবনে মুগিরার নিকটে এসে বসল।
আলা ইবনে মুগিরা এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনো গোপন কথা বলার মতো করে বললেন, ‘তুমি তো জানোই, আমি আমীরুল মুমিনীনের কত ঘনিষ্ঠ লোক। আমি কোনো অনুরোধ করলে তিনি সাধারণত প্রত্যাখ্যান করেন না। আমি যদি সুপারিশ করে তোমাকে ইরাকের গভর্নর বানিয়ে দিই, তা হলে কেমন হয়?’
আহা, মুহূর্তে হেলালের কল্পনার চোখে ভেসে উঠল ইরাকের রাজপ্রাসাদ। সেবায় নিয়োজিত কত সেবক। শাহি খাবার। শাহি বিছানা। রাজকীয় বেতন। আরও কত কী!
হেলাল মুহূর্তে রাজি হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, খুব ভালো হয়। আপনি যদি আমিরুল মুমিনিনের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেন, তা হলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’
‘তা তো বুঝলাম। কিন্তু আপনাকে ইরাকের গভর্নর বানিয়ে আমার কী লাভ? আমি কী পাব?’
'আপনি যদি আমাকে ইরাকের গভর্নর বানিয়ে দিতে পারেন, তবে আমি আমার পুরো এক বছরের বেতন ১ লক্ষ ২০ হাজার দিরহাম আপনাকে দিয়ে দেবো।'
'কিন্তু শুধু মুখের কথায় আজকাল কেউ বিশ্বাস করে না। দেখা যাবে তুমি গভর্নর হওয়ার পর আমাকে চিনতেও পারছ না। রাজি থাকলে লিখে দাও।'
হেলাল ক্ষমতার স্বপ্ন-নেশায় মত্ত হয়ে পড়েছে। ভালো-মন্দ চিন্তা করার তার যেন কোনো বুদ্ধি-বিবেক নেই। তাই তৎক্ষণাৎ কথাগুলো একটি কাগজে লিখে নিজের নাম দস্তখত করে দিলো।
আলা ইবনে মুগিরার কাজ অর্জন হয়ে গেছে। তিনি আর মোটেও দেরি করলেন না। কাগজটি এনে খলিফার সামনে মেলে ধরলেন। বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন, আপনি যাকে খাঁটি মনে ইবাদতকারী মনে করছিলেন, তার আসল উদ্দেশ্য এবার নিজ চোখে দেখুন। তার এত লম্বা নামাজ, জিকির ও তেলাওয়াতের আসল উদ্দেশ্যে এবার দেখুন...।'
এটা দেখে খলিফা আবদুল আজিজ ভীষণ বিস্মিত ও ব্যথিত হলেন। মানুষের মন এত ছোট হয়ে গেছে! সামান্য পার্থিব ক্ষমতার লোভে চিরস্থায়ী ইবাদতগুলোকে এভাবে তারা নষ্ট করে দিচ্ছে!
আমি আরও একটি ঘটনার কথা জানি। একবার এক লোক এক নারীর সাথে কথা বলছিল। কথা বলতে বলতে লোকটি মেয়েটির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তাকে একটি খারাপ প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ তাতে সাড়া দিয়ে তাকে বাড়িতে আসার প্রস্তাব করে। লোকটি যখন মেয়েটির বাড়িতে এসে প্রবেশ করে, মেয়েটি লোকটিকে হত্যা করে ফেলে।
এছাড়াও আরও অনেক ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার নিকট স্পষ্ট হয়েছে যে, কোনো পুরুষ বা নারীর নিকট অসতর্ক হয়ে কোনো কথা বলা উচিত নয়— লোকটি বা নারীটি কোনো গোয়েন্দা হতে পারে। কিংবা এই খবর তোমার শত্রুর নিকট লাগিয়ে দিতে পারে। কিংবা কোনো অপরিচিত পরিবেশে লাগামহীন কথা বলাও উচিত নয়। সেখানে এমন কেউ থাকতে পারে, যে কথাটি শাসকের কানে পৌঁছে দেবে। কিংবা কথাটি এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বলা হল, যার কোনো নিকট আত্মীয় বা সমর্থক সেখানে রয়েছে। এতে অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়।
মূলকথা, কোনো মানুষ সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত হওয়া সমীচীন নয়। বিশেষ করে যাকে তুমি জীবনের কোনো একসময় কষ্ট দিয়েছ কিংবা অপমান করেছ। কিংবা তার কোনো প্রিয় ব্যক্তিকে কষ্ট দিয়েছ। এসকল ক্ষেত্রে গোপনে কেউ তোমার জন্য ফাঁদ পাতার পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরতে পারে। যেমনটা ঘটেছিল সেই বিখ্যাত ঘটনায় ‘জুবাই’-এর ক্ষেত্রে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সহানুভূতি ও সহমর্মিতা

📄 সহানুভূতি ও সহমর্মিতা


কোনো শত্রু বা হিংসুকের সাথে তর্কের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি একটি বোকামিপূর্ণ কাজ।
তুমি যদি তার অবস্থা সম্পর্কে জেনেই থাকো, তাহলে তার সাথে এমন কথা বলো, যা তোমাদের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হয়। সে যদি কোনো আপত্তি করে, সেটা গ্রহণ করো। সে যদি নিজের থেকে ঝগড়া করতে চায়, তুমি তা বর্জন করো এবং বোঝানোর চেষ্টা করো, দু-জনের অবস্থান খুবই কাছাকাছি।
এরপর তোমার কাজ হবে খুব বিচক্ষণতা ও গোপনীয়তার সাথে তার বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং কোনো অবস্থাতেই তার ওপর আস্থা না রাখা। প্রকাশ্যে তার সঙ্গ ও সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করলেও ভেতরে ভেতরে তার সাক্ষাতকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা।
এরপর তুমি যদি তাকে কষ্ট দিতে চাও, তবে তাকে তোমার প্রথম কষ্ট দেওয়া এই হবে যে, তুমি নিজেকে সংশোধন করে নেবে এবং যে সমস্যাগুলোর কথা সে তোমাকে বলেছে, সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করবে। এরপর তোমার সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হবে- তাকে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে ক্ষমা করে দেবে। সে যত বেশি গালাগালি করবে, তুমি ততই তা বর্জন করে চলবে। আশা করা যায়, তাহলে জনসাধারণই তোমার পক্ষ হয়ে তার উত্তর দিয়ে দেবে। বিজ্ঞজনেরা তোমার সহনশীলতার প্রশংসা করবে।
আর এদিকে তুমি যদি তাকে প্রকাশ্যভাবে কষ্ট দাও কিংবা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তবে এটা শুধু বাহ্যিকভাবেই একটি ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন রেখে যাবে। কিন্তু তুমি যদি আমার বর্ণিত পন্থায় উত্তম প্রতিশোধ নাও, সেটা তার অন্তরে বহুগুণ বড় আঘাত হয়ে জ্বলজ্বল করবে। এটা তোমার কোনো কথা দিয়ে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে বহুগুণে উত্তম। কারণ, তুমি যদি কথা দিয়ে তাকে কষ্ট দাও, তবে তুমি এর দ্বিগুণ কথা শুনতে বাধ্য থাকবে।
এছাড়াও বেশি তর্কের মাধ্যমে এটা বেশি করে জানানো হবে যে, তুমি তার শত্রু। তখন সে তোমার থেকে সতর্ক থাকবে এবং বিভিন্ন কথা বলে বেড়াবে। আর বিতর্ক এড়িয়ে চলার মাধ্যমে সে তোমার অভ্যন্তর সম্পর্কে বেখবর থাকবে। তখন তুমি তার থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে।
কিন্তু দ্বীনের কোনো ক্ষতি করে তুমি যদি তাকে কষ্ট দাও, তবে তো সেই সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্দোষ প্রমাণিত হবে। যার কাজের মধ্যে গোনাহ বিজয়ী হয়, সে নিজে কখনো বিজয়ী হতে পারে না। বরং বিজয় তো আসবে সুন্দর ধৈর্য ও বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
নির্দেশিত পন্থায় চলা তার জন্যই সহজ হবে, যে ব্যক্তি মনে করে- তার উপর মানুষের শত্রুতার এই কষ্ট চাপানো হচ্ছে তার নিজের কোনো গোনাহের কারণে কিংবা পরীক্ষার মাধ্যমে তার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। তখন তো সে শুধু বিতর্ককারী শত্রুকেই দেখবে না, তখন সে অনুভব করবে স্রষ্টার কুদরত।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আখেরাতের বিনিময়

📄 আখেরাতের বিনিময়


যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে জান্নাতের চিরন্তনতা নিয়ে এভাবে চিন্তা করবে- জান্নাতের স্বচ্ছ পবিত্রতার মধ্যে কোনো পঙ্কিলতা নেই। যেখানে আছে শুধু অন্তহীন আনন্দ ও সুখ। যেখানে আছে অন্তরের সকল চাহিদার বাস্তবায়ন। এবং আরও আরও বহু নিয়ামত- যা কোনো চোখ দেখেনি... যা কোনো কর্ণ শোনেনি... যা কোনো অন্তর কল্পনা করেনি। এর কোনো পরিবর্তন হবে না। নিঃশেষ হবে না। এটা এতই সীমাহীন যে, হাজার হাজার বছর বললেও কোনো কিনারা হবে না। লাখ লাখ বছর বললেও সীমা পাওয়া যাবে না। এমনকি যদি কোটি কোটি বছর বলো- তবুও এর সংখ্যার গণনা শেষ হবে না। কারণ, এ সংখ্যাগুলোর তবুও তো একটা সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে। কিন্তু আখেরাতের কোনো শেষ বা সমাপ্তি নেই। এমনই তার সীমাহীন নিয়ামত ও সুখ।
তবে এটাকে অর্জন করতে হবে দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত জীবনের বিনিময়ে। আচ্ছা, একজনের সাধারণ প্রলম্বিত জীবন কতটুকু হয়- ধরি, একশ বছর। এর প্রাথমিক পনেরো বছর তো শৈশব ও অবুঝ অবস্থার মধ্যে চলে যায়। এরপর সত্তরের পর বাকি ত্রিশ বছর নানাবিধ দুর্বলতা ও অক্ষমতার মধ্যে অতিবাহিত হয়। আর মাঝের যে শক্তিমত্তার বছরগুলো- এর তো প্রায় অর্ধেক যায় ঘুমের মধ্যে। কিছু যায় পানাহারে। আর যায় খাদ্য-খাবার উপার্জনে। আর বাকিটুকু সাধারণ বিভিন্ন অভ্যাস ও অবহেলায়।
তাহলে মূল জীবনের সময় কতটুকু? কতই না স্বল্প! এই স্বল্প ও সংক্ষিপ্ত জীবনের বিনিময়ে সেই সীমাহীন অনন্ত সুখের জীবন কি সে কিনতে রাজি হবে না? জীবনের এই এত লাভজনক ক্রয় ও বিক্রয় থেকে দূরে থাকার অর্থ হলো সবচেয়ে বড় বোকামির পরিচয় দেওয়া। বুদ্ধিহীনতার প্রকাশ ঘটানো। এবং আল্লাহর ওয়াদার ব্যাপারে বিশ্বাসের মধ্যে বড় ত্রুটি থাকার প্রকাশ করা।
আর কীভাবে এটা ক্রয়-বিক্রয় করতে হয়, তা জানা যাবে ইলমের মাধ্যমে। ইলমই পথ দেখায় এক্ষেত্রে কোনটি করা চাই আর কোনগুলো থেকে বিরত থাকা চাই।
কিন্তু ইবলিস এক্ষেত্রে একটা বড় ষড়যন্ত্র পাকিয়ে বসে আছে- যাতে বনি আদম এই অনন্ত সুখের জান্নাতে যেতে না পারে। সে কিছু জাহেদের অন্তরে এমন কিছু বিষয় প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে, যার কারণে তারা ইলম থেকে দূরে সরতে শুরু করেছে। যেন ইবলিস ইলমের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে চায়। যাতে সে অন্ধকারে শিকার করতে পারে। এ কারণে সে আলেমদের একটি বড় অংশকে এমন কাজে ব্যস্ত রেখেছে- যেন তারা ইলম থেকে দূরে সরে যায়।
আবু আহমাদ আত-তওসি নিজের ক্ষেত্রে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন- যা তার বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, 'আমি একবার এমন একজন সুফির নিকট পরামর্শ চাইতে গেলাম, যিনি সুফিদের মধ্যে খুবই প্রসিদ্ধ অগ্রগণ্য এবং অনেকের দ্বারা অনুসৃত। আমি তাকে কোরআন তেলাওয়াতের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে তেলাওয়াত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বললেন,
'সঠিক পথ হলো, তুমি দুনিয়ার সাথে সকল সম্পৃক্ততা ছিন্ন করে ফেলবে। তোমার অন্তর যেন লেপ্টে না থাকে তোমার স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি। সম্পদ ও ইলমের প্রতি। বরং তোমার অবস্থা এমন হবে যে, এগুলোর অস্তিত্ব থাকা ও না-থাকা তোমার নিকট সমান মনে হবে। এরপর তুমি জমিনের কোনো একপ্রান্তে একেবারে মুক্ত অন্তর নিয়ে বসে যাবে। শুধু ফরজ ও নির্দিষ্ট ওজিফার উপর সীমাবদ্ধ থাকবে। এরপর অন্তর সবকিছু থেকে মুক্ত করে বসে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করবে। জিকির করতেই থাকবে। এমন অবস্থা হবে যে, তুমি যদি জিকির বন্ধ করেও দাও, তবুও যেন তোমার জিহ্বায় আপনিই জিকির জারি হয়ে যায়। এরপর অপেক্ষা করো- নবী ও আওলিয়াদের ক্ষেত্রে যেই অবস্থা খুলে যায়, তোমার জন্যও সেই পথ খুলে যাবে।'
এক্ষেত্রে আমি বলি, এটি তেমন আশ্চর্যের বিষয় নয়। আমাকেও অনেকে এ ধরনের কথা বলেছে। কিন্তু আমি তাদের বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করি, যারা জেনে-বুঝে ও ধরনের পথ অনুসরণ করে। কোরআন তেলাওয়াতকে উপেক্ষা করে কি সঠিক পথে চলা সম্ভব? নবীদের জন্য যা উন্মোচিত হয়েছে, তা কি তাদের চেষ্টা ও সাধনার কারণে হয়েছে? এই পথ ও পদ্ধতির কথা যে বলে, তার কথার ওপর কি আস্থা রাখা যায়? যায় না।
এরপর কথা হলো, এই সাধনার কারণে তার সামনে কী খুলে যাবে? তার জন্য অদৃশ্যের দরজা খুলে যাবে নাকি ওহির দরজা? এই সবকিছু হলো শয়তানের খেল-তামাশা। মানুষকে বিপথগামী করার ষড়যন্ত্রের খেলা। ক্ষুধার্ত অপুষ্ট নির্ঘুম বিশ্রামহীন নির্জন মানুষের নিকট অনেক বিষয়ই 'দৃষ্টিবিভ্রম' হয়। চোখে উল্টাপাল্টা দেখে। ভীষণ দুর্বলতায় চোখে আলোর ঝলকানি দেখে। কিংবা শয়তান নিজে বিভিন্ন বিষয় দেখায়। আর এতেই তারা মনে করে কী না কী অদৃশ্যের দরজা খুলে গেল! এই তো কারামত!
কিন্তু তোমার কাজ হবে ইলম অর্জন করা। সালাফে সালেহিনের জীবনের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। তাদের কেউ কি কখনো এগুলো করেছেন, না এর আদেশ দিয়ে গেছেন?
সুতরাং তারা যদি এগুলো না করে কোরআন নিয়ে বসত। হাদিসের ইলম অর্জন করত। এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের জীবনাদর্শের দিকে দৃষ্টি দিত- তাহলে এগুলোই তাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখত। তখন আর এভাবে তারা বিপথগামী হতো না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00