📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কাফেরদের অবাধ্যতা

📄 কাফেরদের অবাধ্যতা


দুনিয়াতে কিছু কিছু সম্প্রদায়ের আত্মসম্মানবোধ দেখে আমি ভীষণ আশ্চর্য হয়েছি। অবশ্য তাদের এটা একধরনের প্রবল অহংকারও বলা চলে। বিশেষ করে আরব জাতি। তারা প্রথমে ‘কালিমা’ গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল। তারা শুধু যুদ্ধ-বিগ্রহ করে বেড়াত। হত্যা ও লড়াইয়ের ওপরই সন্তুষ্ট থাকত। তবুও বিভিন্ন দলিল-প্রমাণ দেখে তাদের একটি দল ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু কেউ কেউ বলতে লাগল, আমরা কীভাবে রুকু ও সেজদা করতে পারি! এতে তো আমাদের নিতম্ব উঁচু করতে হয়- আমাদের সম্মানে বাধে!
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لا خير في دين ليس فيه ركوع ولا سجود.
যে ধর্মের মধ্যে কোনো রুকু ও সেজদা নেই, সে ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই। অর্থাৎ রুকু ও সেজদা তো করতেই হবে। ৯৬
এমনই ছিল তাদের আত্মসম্মানবোধ। কিন্তু ভেবে আশ্চর্য হই, তাদের এত আত্মসম্মানবোধ নিয়ে কীভাবে তারা তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট জিনিসের প্রতি নত ও অবনত হতো! কেউ ইবাদত করছে পাথরের। কেউ গাছের। আবার একটি দল তো ঘোড়া এবং গরুরও ইবাদত করত। শিরকের মানসিকতা আসলে ইবলিসের মানসিকতার চেয়েও নিকৃষ্টতর মানসিকতা। ইবলিস তো অহংকার করে নিজেকে উত্তম দাবি করে তার চেয়ে নিম্নমানের কাউকে সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং সে বলেছিল, أنا خير منه -আমি তার চেয়ে উত্তম। এমনকি ফিরআউনও নিজে কখনো এমন নিম্নমানের জিনিসের ইবাদতে অংশ নেয়নি।
অথচ আশ্চর্যের কথা হলো, এই অহংকারী আত্মগর্বী আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন লোকেরাই গাছ-পাথরের প্রতি অবনত হয়েছে। অথচ উচিত ছিল, অসম্পূর্ণ অযোগ্য সত্তা সম্পূর্ণ ও যোগ্য সত্তার প্রতি নতশির হবে। কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টো। আল্লাহ তাআলা মূর্তিগুলোর ত্রুটি উল্লেখ করে এদিকেই ইশারা করে বলেন-
﴿أَلَهُمْ أَرْجُلٌ يَمْشُونَ بِهَا أَمْ لَهُمْ أَيْدٍ يَبْطِشُونَ بِهَا أَمْ لَهُمْ أَعْيُنٌ يُبْصِرُونَ بِهَا أَمْ لَهُمْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا﴾
নাকি তাদের কোনো পা আছে, যা দ্বারা তারা হাঁটতে পারে? নাকি তাদের কোনো হাত আছে, যেগুলো তারা প্রসারিত করতে পারে? নাকি তাদের চোখ রয়েছে, যেগুলো দ্বারা দেখতে পারে? নাকি তাদের কান রয়েছে, যেগুলো দিয়ে তারা শুনতে পারে? [সুরা আরাফ: ১৯৫]
অর্থাৎ, তোমাদের তো এই সকল কার্যকর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে- অথচ মূর্তিগুলোরও তো তাও নেই। তাহলে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ সত্তা একটি অসম্পূর্ণ সত্তার ইবাদত করতে পারে?
তারা আসলে অন্ধভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করেছে। তারা তাদের নিজেদের মনমতো যা চালু করে গিয়েছিল, সেগুলোকেই ভালো ও উপযুক্ত মনে করেছিল। এই অন্ধ অনুসরণ তাদের আকল ও বুঝ-বুদ্ধির ওপর আবরণ ফেলে দিয়েছিল। এ কারণে তাদের বুঝ-বুদ্ধি প্রকৃত বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনি।
এছাড়া হিংসা, অহংকারও তাদের বুঝ-বুদ্ধির ওপর আবরণ ফেলে দিয়েছিল। এ কারণে তারা সঠিক ও সত্যকে জেনেও তা গ্রহণ করেনি। যেমন, উমাইয়া ইবনে আবুস সলত। সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতকে বিশ্বাস করত। ঈমান আনারও ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সে এই বলে ফিরে আসে-
لا أؤمن برسول ليس من ثقيف.
আমি এমন রাসুলের প্রতি ঈমান আনতে পারি না, যিনি বনু সাকিফ গোত্রের নয়!
আবু জাহেলও তার অহংকার ও সম্মানবোধের কারণেই ঈমান থেকে বিরত ছিল। সে বলেছিল,
وَالله ما كذب محمد قط، ولكن إذا كانت السدانة والحجابة في بني هاشم ثم النبوة فما بقي لنا ؟
আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলেনি। কিন্তু বনু হাশেমের মধ্যে রয়েছে নেতৃত্ব ও কাবা ঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব, এখন নবুয়তও যদি তাদের মধ্য থেকে হয়, তবে আমাদের আর বাকি রইল কী?
আর আবু তালেব তো নবীর চাচা। তিনি সর্বক্ষণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কার্যাবলী পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনিও রাসুলকে বলেছেন, 'যদি কুরাইশের তিরস্কারের ভয় না করতাম, আমি অবশ্যই সে কথাই বলতাম, যার দ্বারা তোমার অন্তর প্রশান্ত হয়ে যেত।'
আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাই এ ধরনের হিংসার অন্ধকার থেকে, অহংকারের কদর্যতা থেকে এবং প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ থেকে- যা বুঝ-বুদ্ধির আলোকে আবৃত করে ফেলে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
৯৬. পুরো হাদিসটি এমন-
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ أَنَّ وَفْدَ ثَقِيفٍ لَمَّا قَدِمُوا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْزَلَهُمُ الْمَسْجِدَ لِيَكُونَ أَرَةً لِقُلُوبِهِمْ فَاشْتَرَطُوا عَلَيْهِ أَنْ لَا يُحْشَرُوا وَلَا يُعْشَرُوا وَلَا يُجَبَّوا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَكُمْ أَنْ لَا تُحْشَرُوا وَلَا تُعْشَرُوا وَلَا خَيْرَ فِي دِينِ لَيْسَ فِيهِ رُكُوعٌ
সুনানে আবু দাউদ: ৮/২৬৩১ পৃষ্ঠা: ২৬২- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আলেম দুই প্রকার

📄 আলেম দুই প্রকার


আমি আলেমদের একটি অংশকে দেখেছি, তারা বিভিন্ন অন্যায়-অবাধ্যতায় অংশ নেয় আর ধারণা করে- তাদের ইলম তাদেরকে এগুলোর শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু তারা কি জানে না, ইলম বরং তাদেরকে সাধারণের মধ্যে 'বিশেষ' করেছে? একজন আলেমের একটি অপরাধ ক্ষমা করার আগে একজন মূর্খের ৭০টি অপরাধ ক্ষমা করা হবে। এর কারণ হলো, একজন মূর্খ তো আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব মহত্ব কর্তৃত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে ভালোভাবে জানে না। কিন্তু একজন আলেমের অপরাধ মানে- তার এই সবকিছু জেনেও আল্লাহ তাআলার হুকুমের অবাধ্য হওয়া। এ কারণে তার অপরাধ বেশি মারাত্মক; যেন কিছুটা উদ্ধত্যপূর্ণ।
আর কোনো আলেমকে এ-ও বলতে দেখেছি, আমি আমার দু-হাঁটুর মাঝে মাথা রেখে খুবই সামান্য ঘুমিয়ে নিই। আরামে ঘুমাই না।' এটা বলে সে তার বুজুর্গি ও মুজাহাদার উচ্চতার কথা বোঝাতে চায়। অথচ সে এমন অনেক বিষয়ে অংশ নেয়, যেগুলো কোনোমতেই জায়েয নয়। তখন আমি চিন্তা করে বুঝলাম, যে ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ তাআলার মারেফাত অর্জন, পূর্ববর্তীদের জীবনপদ্ধতির অনুসরণ, জনতার সাথে সুন্দর আচরণ এবং স্রষ্টার পরিচয় ও সে অনুযায়ী আমল অর্জন, সেই ইলম আজ মানুষদের থেকে দূরে সরতে শুরু করেছে।
তাদের কাছে আছে কেবল কিছু শব্দের অর্থ- যার দ্বারা হালাল-হারাম জানা যায়। নিছক এটা তো সেই উপকারী ইলম নয়। প্রকৃত উপকারী ইলম হলো, মৌলিক রীতিনীতির বুঝ তৈরি হওয়া, স্রষ্টার পরিচয়, তার বড়ত্ব মহত্ব এবং তার উদ্দেশ্যসমূহের জ্ঞান লাভ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের জীবনাদর্শ গ্রহণ করা। তাদের পথে চলা। তাদের থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো অনুধাবন করা। এগুলোই হলো প্রকৃত ইলম। যে ইলম আজ অধিকাংশ আলেমই যেন বর্জন করেছে। তাই তারা আজ মূর্খদের চেয়েও মূর্খে পরিণত হয়েছে।
আমি একজনের কথা জানি, জীবনের একটা দীর্ঘ সময় ধরে সে ইবাদত-বন্দেগি করেছে। এরপর একদিন সে এই বলে ইবাদতে ক্ষান্তি দিল- আমি এমন ইবাদত করেছি, যা আর কেউ কখনো করেনি। এখন আমি দুর্বল হয়ে গেছি। আমার এখন পুরস্কারের অপেক্ষার পালা।
আমি মনে মনে বলি, আমি তো ভয় পাই, তার এই কথাটিই তার সারাজীবনের আমলকে বিনষ্ট করে দেয় কি না? কারণ সে ভাবছে, অনেক তো আল্লাহর ইবাদত করা হলো, এবার সে শান্তি ও মর্যাদা প্রার্থনা করছে সেই আমলের মাধ্যমে।
এটা তো এখন সেই ব্যক্তির মতো হয়ে গেল, যে তার শ্রম ছেড়ে দিয়ে পারিশ্রমিকের আশায় বসে রইল।
তার এই অধিক আশার কারণ হলো বাস্তবতা সম্পর্কে তার অজ্ঞতা।
আমলদার সেই বড় বড় আলেম আজ কোথায় গেলেন? যাদের মধ্যে ছিলেন হজরত সিলাহ ইবনে আশিম। কোনো হিংস্র প্রাণীও যদি তাকে দেখতে পেত, ভয়ে পালিয়ে যেত। সারারাত ইবাদত করে সকাল উদিত হওয়ার সময় মুনাজাত করে বলতেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন। আমার মতো পাপী কি জান্নাত চাওয়ার অধিকার রাখে?
এর চেয়ে আরও বড় কথা- হজরত উমর রা. বলেন, আমার নাজাত পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ- পেতেও পারি না-ও পারি।
হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. তার মৃত্যুর আগ মুহূর্তে হাম্মাদ ইবনে সালামাকে বলেন, আপনি কি মনে করেন, আমার মতো ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারে?
আল্লাহর প্রশংসা- যেসকল দোষ-ত্রুটির কথা বললাম, আলেম নামধারী অধিক আশাকারী ব্যক্তিদের সেসকল অজ্ঞতা থেকে আমি মুক্ত, আবার অধিক নিরাশবাদী জুহুদ থেকেও আমি মুক্ত। আমি স্রষ্টার মহত্ব সম্পর্কে অবগত এবং বিশুদ্ধ পথের পথিকদের জীবন-কর্ম সম্পর্কেও জ্ঞাত- তাই আমি শুধু আমার আমলের ব্যাপারে আশা করে বসে থাকি না। কীভাবেই বা আমি আমি আমার ভালো কাজগুলোর প্রতি অধিকার আরোপ করি; অথচ এগুলো তো আল্লাহ তাআলাই আমাকে দান করেছেন এবং অন্যের নিকট যা গোপন ছিল- আমার নিকট তিনি তা খুলে দিয়েছেন! তার অনুগ্রহ ছাড়া এগুলো অর্জন করা কি সম্ভব হয়েছে? এমনকি তিনি যে আমাকে শোকর আদায়ের তাওফিক দিয়েছেন, তার শোকর করে কি আমি শেষ করতে পারি?
আর অতীতের এমন কোন আলেম অতিবাহিত হয়েছেন- যিনি তার নিজেকে ছোট মনে করেননি? নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করেননি?
তবে আল্লাহ তাআলা আশা করতেও বলেছেন। ভয় ও আশার মাঝখানেই ঈমানের অবস্থান। সে কারণে আল্লাহ তাআলার নিকট এমন মারেফাতের প্রার্থনা করি- যা আমাদের আশা ও আশঙ্কার সীমানা দেখিয়ে দেবে। আমাদের ছোট হতেও শেখাবে এবং আশারও আলো দেখাবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আমাদের চিরকালীন অবস্থানের জায়গা

📄 আমাদের চিরকালীন অবস্থানের জায়গা


দুনিয়াতে মানুষ তার উপভোগের উপকরণগুলোর অনুপস্থিতিতে নিজের জীবনকে বঞ্চিত ও কষ্টময় অনুভব করে।
কিন্তু ভেবে দেখে না, দুনিয়া তো সার্বক্ষণিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা নয়। হ্যাঁ, সেই আরেফ ব্যক্তি অবশ্য সর্বদা স্বাদ ও আস্বাদনের মধ্যে থাকে, যিনি সর্বদা তার প্রিয় প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য ব্যস্ত এবং তার সাথে সাক্ষাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহে মগ্ন। যখনই সে দুনিয়াতে কোনো স্বস্তি ও শান্তির উপকরণ প্রাপ্ত হয়, তা দিয়েই সে আখেরাত অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর যদি কোনো কষ্ট ও বিপদে পড়ে, তবুও সে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আখেরাত অর্জন করে। সে তার সুখ-দুঃখ-সর্ব অবস্থার প্রতিই সন্তুষ্ট থাকে। সে ভাবে, এটা তো তার প্রভুরই ফয়সালা এবং এটা তারই ইচ্ছায় হচ্ছে। তাহলে আর অসন্তুষ্টির কী আছে!
কিন্তু যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়াতেই তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অন্বেষণ করে, তার কথা ভিন্ন। দুনিয়ার কোনো সুখ হাতছাড়া হলেই সে দুঃখিত হয়। চিন্তিত হয়। নিজেকে বঞ্চিত ও অবাঞ্চিত ভাবতে থাকে। যা সে চায়, তা তার আয়ত্বের বাইরে থাকায় মনের মধ্যে কষ্ট অনুভব করে। কিংবা কোনো প্রাপ্ত সুখ যদি হারিয়ে যায়, তবুও সে বেদনা পায়। পেরেশান হয়ে যায়। এসবের কারণ হলো, সে এখানেই তার উদ্দেশ্যগুলো সাধন করতে চায়। প্রবৃত্তির সকল চাহিদা যেন সে এখানেই চরিতার্থ করতে চায়। তাকে কে বোঝাবে, সেটা তো এখানে সম্ভব নয়?
হজরত হাসরি কত সুন্দর কথাই না বলেছেন! আমার মাঝের কোন জিনিসই বা আমার নিজের? আর কোন জিনিসই বা আমাকে কষ্ট দেবে?
এটা হলো একজন আরেফের কথা। কারণ, সে মূল মালিকানার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। একজন দাস- তার ব্যাপারে তার মালিক যা-ইচ্ছা করতে পারেন। এখানে তার কোনো আপত্তি করার কিছু নেই। তার ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটলেও তার কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই।
আর মানুষ যদি নিজেকেই নিজের মালিক হওয়ার দাবি করে, তবে তো সেটা তার হাত থেকে সেদিনই বের হয়ে গেছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা নিজে এটাকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ)
বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে- এর বিনিময়ে। [সুরা তাওবা: ১১১]
এখন কথা হলো, কোনো ক্রয়কারী যদি একটি বকরি কিনে জবাই করে, তবে কি বিক্রয়কারীর রাগান্বিত হওয়া উচিত হবে কিংবা কষ্ট পাওয়া? কিংবা অন্তরে বিরূপ ধারণা পোষণ করা?
আল্লাহ তাআলা তো জান্নাতের বিনিময়ে তোমার জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তবে কেন সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট এলে বিরূপ ধারণা আসে? তুমি কেন এটাকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির সামনে বিলিয়ে দাও না?
এর চেয়ে আরও বড় কথা হলো, আল্লাহ তাআলা যদি বলতেন, 'আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি আমার অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ হিসেবে। এখন সেটা বাস্তবায়িত হয়েছে। এবার তোমাদের ধ্বংস করে দেবো। পুনরায় জীবন ও পুরস্কার প্রদান করব না।'
তাহলেও তো আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিদের বলা আবশ্যক হতো, 'হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন, তা সঠিক। আমরা মেনে নিলাম।'
এবার বলুন, আমাদের মাঝের কোন জিনিসটি আমাদের নিজের যে, আমরা কিছু বলার অধিকার রাখি? এরপরও আল্লাহ কত বড় মেহেরবান... কত বড় মেহেরবান... তিনি আমাদের চিরকালীন সুখ ও শান্তিময় পুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন- যা কোনোদিন শেষ হবে না!
আর কী চাই!
তবে হ্যাঁ, সেই চিরকালীন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিকট পৌঁছুতে হলে দুনিয়ার জীবনে কষ্টগুলোর ওপর ধৈর্যধারণ করতে হবে। প্রবল প্রতাপ ঝঞ্ঝা বায়ুর মাঝেও পাহাড়ের মতো অটল থাকতে হবে। ধৈর্যধারণ করতে হবে ইবাদতের কষ্টের ওপর এবং গোনাহ থেকে বিরত থাকার কষ্টের ওপর।
সুতরাং হে অগ্রগামী পথিক, ধৈর্য ধরো। আরও কিছুটা সবর করো। মানযিল নিকটবর্তী হচ্ছে। সুখের সুরাইয়া তারকা আকাশে উঁকি দিচ্ছে। সুতরাং হে আরেফিন, পরিপূর্ণ সুখ অতি সন্নিকটে। কষ্টের ঢোকটুকু গিলে নাও; অচিরেই তা সুমিষ্ট হয়ে প্রকাশিত হবে। সময় হয়ে এলো বলে- প্রিয়দের সাথে সাক্ষাতের সেই সুখের কথা চিন্তা করে ধৈর্যটা ধরে যাও।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়া সুখের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি

📄 দুনিয়া সুখের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি


হজরত শীবান আর-রাঈ রহ. হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে যে কথাটি বলেছিলেন, একদিন আমি সেই কথা নিয়ে চিন্তা করলাম। কথাটি হলো,
'হে সুফিয়ান, তোমার প্রার্থিত যে নিয়ামত তোমাকে প্রদান করা হয় না, সেটাকেও তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত হিসেবেই গণ্য করে নিয়ো। এটা তিনি তোমাকে কৃপণতা করে বঞ্চিত করেছেন এমন নয়; বরং তিনি তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেই এটা থেকে বঞ্চিত করেছেন।'
ভেবে দেখলাম, এটি এমন এক ব্যক্তির কথা, যিনি বস্তুসমূহের বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। যার বুঝ ও বোধের মধ্যে কোনো দুর্বলতা নেই। কারণ, মানুষ কখনো কখনো অনিন্দ্য সুন্দরী নারীদের প্রত্যাশায় বিবাগী হয়। কিন্তু তাকে পেতে সক্ষম হয় না। সে তাতে খুবই পেরেশান ও ব্যথিত হয়। কিন্তু কথা হলো, এই না পাওয়ার মধ্যেই আসলে তার কল্যাণ নিহিত ছিল। যেমন, সে যদি নারীগুলোকে প্রাপ্ত হতো, তাহলে তার অন্তর সব সময় অস্থির হয়ে থাকত। তাদের আদর-যত্নে রাখার জন্য উপার্জন করতে হতো। তাদের প্রতি তার প্রচণ্ড ইশক বা ভালোবাসা তার জীবনটাই যেন নষ্ট করে দিত। তাদের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সে আখেরাতের প্রতি গুরুত্ব প্রদানকে অবহেলা করে বসত। এরপর যদি সেই নারীরা তাকে মন থেকে না চায়, তবে তো তার জন্য আরও বড় ধ্বংস। এরপর তারা তাদের ইচ্ছামতো খরচ-পত্র চাইবে, আর যদি সে দিতে সক্ষম না হতো, তাহলে তো এতে তার সম্মান বিনষ্ট হতো এবং উদ্দেশ্যগুলোও অধরা থাকত। তারা যদি ঘনঘন সহবাস কামনা করত আর সে যদি অক্ষম হয়ে পড়ত, তাহলে তারাই তাকে শেষ করে দিত কিংবা অবাধ্য হয়ে অন্যকোথাও চলে যেত। আর যদি তার প্রিয়তমা মারা যেত, তাহলেও সে আফসোসে আফসোসে নিজেকে নিঃশেষ করে দিত।
সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো অনিন্দ্য সুন্দরীর কামনা করে, সে যেন নিজেকে জবাই করার জন্য শান্তি ছুরি প্রার্থনা করে; কিন্তু সে এটা জানে না।
অধিক সম্পদের প্রার্থনার বিষয়টাও ঠিক এমন। বরং প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ থাকাই শ্রেষ্ঠতর। এটাই নিয়ামত। বেশি হয়ে পড়লে অনেক সময় সেটা 'গজব' হয়ে ওঠে।
সহিহ বোখারি ও মুসলিমের সংকলিত হাদিসের মধ্যে আছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মদের পরিবারকে পরিমিত প্রয়োজন পরিমাণ রিজিক দিয়ো।'
আর যখন বেশি সম্পদ হয়, তখন মনোযোগও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। বুদ্ধিমান তো ওই ব্যক্তি, যে জেনেছে- দুনিয়া নিরবচ্ছিন্ন সুখ উপভোগ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। সুতরাং সে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00