📄 নিজের শক্তিকে সংরক্ষণ করো
জেনে রেখো, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে এক মহান কর্মের উদ্দেশ্যে- আর তা হলো, দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে তার প্রভুর মারেফাত অর্জন করা। সে এর জন্য শুধু অন্যের কথার ওপর নির্ভর করবে না। নিজেই চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে যাবে। ইলম অর্জন করবে। এর জন্য প্রথম শর্ত- ফরজ বিধানগুলো পালন করবে এবং নিষেধকৃত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকবে।
এরপর ইলম অর্জনের জন্য যখন তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হবে, তখন তা অর্জনের জন্য অধিক পরিমাণে মনোযোগ প্রদান করবে। বিক্ষিপ্ত হলে হবে না। সুতরাং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার ঘরে যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য রয়েছে। কোনো মানুষের অনুগ্রহ বা দানের ওপর তাকে নির্ভর করতে হয় না এবং সে সেই পরিমিত পরিমাণ সঞ্চয়ের ওপরই সন্তুষ্ট থাকে।
কিন্তু তার যদি যথাপরিমাণ খাদ্য-পাথেয় না থাকে, তাহলে ইলম অর্জনে যে মনোযোগ তার প্রয়োজন ছিল, তা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। তখন তাকে খাদ্য সন্ধানের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে। ফলে তার জীবন অতিবাহিত হয়ে যাবে সেই শরীরের খাদ্য অর্জনের জন্য- যে শরীর অবশিষ্ট থাকলে অন্য বিষয়গুলো অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এখন মূল শরীর ঠিক রাখতে গিয়ে, মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করা বাকি রয়ে যায়। এমনকি কখনো কখনো মানুষের কাছে ছোট হয়ে পড়তে হয়, হীন হতে হয়।
কবি বলেন,
حسبي من الدهر ما كفاني .... يصون عرضي عن الهوان مخافة أن يقول قوم ... فضل فلان على فلان
আমার জন্য এতটুকু সময় হলেও যথেষ্ট, যার অর্জন আমাকে লাঞ্ছনার হাত থেকে রক্ষা করবে।
আমি ভয় করি, লোকজন যেন বলা শুরু না করে, অমুক অনুগ্রহ করেছে অমুকের ওপর।
সুতরাং বুদ্ধিমানের জন্য উচিত হবে, নিজের সম্পদ ও সঞ্চয়কে সংরক্ষণ করা। অপচয় না করা। যাতে সে ইলম অর্জনে তার মনোযোগ স্থির করতে পারে। এগুলো সংরক্ষণ করতে না পারলে জীবিকার প্রয়োজনে তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। আর নফস যখন তার খাদ্য-প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়, তখন সে তৃপ্ত ও নিশ্চিন্তে থাকে।
আর যদি তার যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য-সম্পদ না থাকে, তাহলে সে তার পরিমাণমতো উপার্জন করবে। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি বা বেশি অর্জনের পেছনে পড়বে না। যাতে সে তার প্রয়োজন ও মনোযোগের মধ্যে একটি সমন্বয় করতে সক্ষম হয় এবং অল্পতে যেন সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, সে যদি অধিক সম্পদ অর্জনের দিকে আকাঙ্ক্ষিত হয়, তাহলে মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটবেই ঘটবে। কারণ, মানুষের প্রথম অস্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা আসে এই অভাব-অনটন থেকে। এরপর আসে আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের লোভ থেকে। তখন পুরো জীবন সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতার মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কবি বলেন, وَمَنْ يُنفِقُ الْأَيَّامَ فِي حِفْظِ مَالِهِ ... مَخَافَةَ فَقْرٍ فَالَّذِي فَعَلَ الْفَقْرِ
যে ব্যক্তি দারিদ্র্যের ভয়ে তার জীবনের সময়গুলো ক্ষয় করল শুধু সম্পদ সংরক্ষণের জন্য, সে তো প্রকৃত অর্থে একজন দরিদ্রের জীবনই অতিবাহিত করল।
হে হিম্মতওয়ালা প্রত্যয়ী প্রাণ, জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পথে এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রেখো। তুমি যতক্ষণ না তোমার বাচ্চাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করছ, ততক্ষণ তারা তোমাকে বিক্ষিপ্ত করে রাখবে। আর তুমি সম্পদের মূল্যও বুঝতে শেখো, যা তোমার মনোযোগকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা রাখবে। তোমাকে মানুষের নিকট হাতপাতা থেকে রক্ষা করবে।
হাদিসে এসেছে-
একবার একলোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এলো। লোকটির ওপর দারিদ্র্যের আলামত স্পষ্ট প্রকাশিত। লোকটি রাসুলের নিকট কিছু প্রার্থনা করল এবং তাকে কিছু প্রদান করা হলো।
এ সময় আরেকজন দরিদ্র লোক এসে উপস্থিত হলো। তখন প্রথম দরিদ্র লোকটি তাকে প্রদত্ত জিনিস থেকে দ্বিতীয় লোকটিকে কিছু প্রদান করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা আবার তাকে ফিরিয়ে দিলেন এবং এমন করতে নিষেধ করলেন।
অল্পেতুষ্টি মানে যথাপরিমাণের ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং অতিরিক্ত অর্জনের উপর লোভ না করা। এটাই হলো মৌলিক নীতি।
তাছাড়া কোনো আলেম যখন অপমানের সাথে কারও থেকে কিছু গ্রহণ করা বর্জন করবে, তখন তার মনোযোগ স্থির হবে। হিম্মত উন্নত হবে। বিশেষ করে কোনো জালেম রাজা বা প্রশাসক থেকে। ধনাঢ্য কোনো খোঁটাদানকারী ব্যক্তি থেকে। এমনকি অনুগ্রহ উল্লেখকারী কোনো বন্ধু থেকে। কারণ, আত্মসম্মানবোধ হলো সকল সুখের বড় সুখ। জীবন যেভাবেই চলুক না কেন- কোনো ব্যক্তির দয়া ও অনুগ্রহের বলয় থেকে বের হয়ে আসার মতো আনন্দ আর পৃথিবীতে হয় না।
📄 উচ্ছ্বাস প্রকাশে সতর্কতা
মানুষের স্বভাবই হলো তার সমশ্রেণির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চাওয়া। সকলেই অন্যের চেয়ে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে ভালোবাসে। এভাবেই চলতে থাকে দিন।
কিন্তু তাদের মধ্যে কারও যদি কোনো বিপদ ঘটে, বিপাকে পড়ে এবং জানাজানি হয়ে যায়, তখন হঠাৎ করেই অন্যদের চেয়ে তার স্থান নিম্নস্তরে নেমে আসে। সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, বিপদকে আড়াল করে নিজের কাজে অবিচল থাকা। যাতে করে তাকে কেউ নীচু চোখে না দেখে। সুন্দর স্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে অন্যদের সাথে ভব্যতা ও সভ্যতা বজায় রাখা। যাতে করে তাকে কেউ অনুগ্রহের চোখে না দেখে। নিজের অসুস্থতাকে প্রবলভাবে চেপে থাকবে। যাতে করে তাকে নিয়ে তার প্রতিপক্ষ হিংসুক সুস্থ ব্যক্তিরা আনন্দ অনুভব না করে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার সাহাবিদের নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন, অনেকেই ক্লান্ত ও জ্বরাক্রান্ত ছিলেন। তিনি ভয় করছিলেন, তাওয়াফের সময় সাঈ করার ক্ষেত্রে সাহাবিদের দুর্বলতা দেখে কাফেররা আনন্দিত হবে। ঠাট্টা-মশকারা করবে।
সুতরাং তিনি বললেন,
رَحِمَ اللَّهُ مَنْ أَظْهَرَ مِنْ نَفْسِهِ الْجَلَدَ، فَيَرْمُلُوا আল্লাহ তার উপর রহম করবেন, যে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত্রে সাহসিকতা প্রদর্শন করে 'রমল' করবে। ৯৫
রমল হলো, তাওয়াফের সময় শক্তিমত্তার সাথে জোরে দৌড়ানো। সেই শক্তিপ্রদর্শনের কারণ এখন আর নেই। তবুও হুকুম বহাল রয়ে গেছে। যাতে মানুষের অন্তরে কারণটির কথা মনে থাকে। এর থেকে শেখার বিষয় রয়েছে। হজরত মুআবিয়া রা. তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। এ সময় কিছুলোক তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করল। মুআবিয়া রা. পরিবারের লোকদের বললেন, 'আমাকে ধরে বসিয়ে দাও।'
তা-ই করা হলো। লোকেরা এলো। হজরত মুআবিয়া রা. তাদের সাথে বসে বসে কথা বললেন। সকল রকম অসুস্থতা চেপে রইলেন। সাধারণ সুস্থ মানুষের মতো কথা বললেন। এরপর যখন তারা চলে গেল, তখন তিনি এই কবিতাটি পড়লেন-
وَتَجَلُّدِي لِلشَّامِتِينَ أُرِيهِمْ ... أَنِّي لِرَيْبِ الدَّهْرِ لَا أَتَضَعْضَعُ وَإِذَا الْمَنِيَّةُ أَنْشَبَتْ أَظْفَارَهَا ... أَلْفَيْتُ كُلَّ تَمِيمَةٍ لَا تَنْفَعُ আমার বিপদে আনন্দিত হতে চাওয়া ব্যক্তিদের আমি আমার অবিচলতা দেখাই। যুগের সন্দেহকে দূর করে বলি, আমি দুর্বল না।
তবুও মৃত্যু যখন তার নির্দয় থাবাগুলোকে প্রসারিত করে ধরে, তখন অনুভব করি, কোনো রক্ষাকবচই আর কাজে আসছে না।
এভাবে সকল প্রজ্ঞাবান দূরদর্শী আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তিই তাদের অবিচলতা প্রদর্শন করেন- বিপদের সময়, দারিদ্র্যের সময় এবং কষ্টের সময়। যাতে নিজের এই কষ্টগুলোর সাথে আবার শত্রুদের আনন্দিত মুখ দেখতে না হয়। এটা সকল কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট। এধরনের একজন দরিদ্র ব্যক্তিও নিজের মুখাপেক্ষিহীনতা প্রকাশ করেন। অসুস্থ ব্যক্তিও সুস্থতা প্রদর্শন করেন। হ্যাঁ, এটাই হলো দৃঢ়মনের মানুষের কাজ!
এছাড়াও আরও কিছু বিষয় আছে- সেগুলোর ক্ষেত্রেও সংযম ও দূরদর্শিতার পরিচয় প্রদান করা উচিত। যেমন, কখনো কখনো মানুষ অনর্থক তার অঢেল সম্পদ ও প্রাচুর্যের কথা প্রকাশ করে বেড়ায়। এতে নিশ্চয় কোনো শত্রুর চোখ লাগতে পারে। তখন তার এই গর্বের সুখ নিমিষেই উধাও হয়ে পড়বে। কোনো জিনিসকে যখন সুন্দর ও লোভনীয় মনে করা হয়, তখনই তার ওপর হিংসুকদের চোখ লাগে। চোখ লাগা সত্য। তাছাড়া অন্যরকম বিপদও আসতে পারে- ডাকাতি কিংবা ছিনতাই।
সুতরাং একজন দূরদর্শী ব্যক্তির উচিত হবে, এমন পরিমিত পরিমাণে নিজের নিয়ামতের কথা প্রকাশ করা, যার ওপর হিংসুকদের চোখ লাগা থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আবার এটাও জানানো হয়ে যায় যে, সে আসলে দরিদ্রও নয়।
টিকাঃ
১৫. ঠিক এই শব্দে হাদিসটি ইবনে হিশাম তার তার সিরাতগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ৪/৬। ইমাম বোখারি রহ.ও তার 'সহিহ বোখারিতে উল্লেখ করেছেন। তবে ইমাম মুসলিম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনায় একটু ভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে হাদিসটি এমন-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابُهُ مَكَّةَ وَقَدْ وَهَنَتْهُمْ حُنَّى يَشْرِبَ قَالَ الْمُشْرِكُونَ إِنَّهُ يَقْدَمُ عَلَيْكُمْ غَدًا قَوْمٌ قَدْ وَهَنَتْهُمُ الْحُنَّى وَلَقُوا مِنْهَا شِدَّةً فَجَلَسُوا مِمَّا يَلِي الْحِجْرَ وَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَرْمُلُوا ثَلَاثَةَ أَشْوَاطٍ وَيَمْشُوا مَا بَيْنَ الرُّكْنَيْنِ لِيَرَى الْمُشْرِكُونَ جَلَدَهُمْ فَقَالَ الْمُشْرِكُونَ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ زَعَمْتُمْ أَنَّ الْحُتَّى قَدْ وَهَنَتْهُمْ هَؤُلَاءِ أَجْلَدُ مِنْ كَذَا وَكَذَا.
সহিহ মুসলিম: ৬/২২২০, পৃষ্ঠা: ৩৪৮- মা. শামেলা।
📄 প্রতিযোগিতার দিবসের কথা স্মরণ করো
আমরা মানুষজাতি। আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে জান্নাতের চির অবস্থিতিতে স্রষ্টার সাথে তার মারেফাত, সান্নিধ্য ও দর্শনের মাধ্যমে সময় যাপনের জন্য। আর তিনি এর সূচনা করেছেন দুনিয়াতে আমাদের সৃষ্টি ও অবস্থানের মাধ্যমে। কারণ, এই দুনিয়া আমাদের জন্য একটি 'মকতব বা শিক্ষাগার'। এখানে আমরা 'হুকুম' পালনের পড়ালেখা শিক্ষা করব। আদব-আখলাক শিখব। যাতে সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের শিশুসুলভ আচরণগুলো সংশোধিত হয়ে যায় এবং আমরা আমাদের স্রষ্টার সাক্ষাতের যোগ্য হয়ে উঠি।
দুনিয়াতে শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে একেক শিশুর একেক ধরন। যেমন,
১. কোনো শিশু আছে, যার কিছুটা মেধা-বুদ্ধি নেই। বুঝ নেই। সে দীর্ঘদিন 'শিক্ষালয়ে' অবস্থান করেও একসময় মূর্খ ও অবুঝ হয়েই শিক্ষালয় থেকে বের হয়।
এটা ওই ব্যক্তির উদাহরণ, যে দুনিয়াতে তার অবস্থিতির অর্থই বুঝল না এবং তার উদ্দেশ্যও অর্জন করতে সক্ষম হলো না।
২. আর কোনো শিশু আছে খুবই দুষ্টপ্রকৃতির। মেধা নেই। বুঝ-বুদ্ধিও কম। অন্যদের কষ্ট প্রদান না করার উচ্চ মানসিকতাও নেই। এ কারণে সে অন্য বাচ্চাদের কষ্ট দেয়। তাদের জিনিসপত্র চুরি করে। সকলেই তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আশ্রয় খোঁজে। সে সংশোধন হয় না। বুঝমান হয় না। খারাপ কাজ থেকে বিরতও থাকে না।
এটা জালেম এবং খারাপ চরিত্রের মানুষের উদাহরণ।
৩. আর কোনো শিশু আছে, লেখাপড়ার সাথে তার কিছু সম্পৃক্ততা ও আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে দুর্বল। লেখার বাহ্যিক অবস্থাও খারাপ। সে-ও একসময় এই শিক্ষালয় থেকে বের হয়; কিন্তু নিজের আকর্ষিত বিষয়ে কিছু পারা ব্যতীত আর কোনো কর্মের যোগ্য হয় না।
এটা হলো সেই সকল ব্যক্তির উদাহরণ, যারা দুনিয়াতে কিছু বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করে; কিন্তু অন্য সকল বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব থেকে বঞ্চিত থাকে।
৪. আর এমন কিছু শিশু আছে, যারা খুব সুন্দর করে লেখাপড়া শিখেছে। কিন্তু উদ্দেশ্য বোঝেনি। বাহ্যিক আচার-আচরণ খুব শিখেছে। কিন্তু অভ্যন্তর ঠিক হয়নি। এরা যেন সুলতানের হয়ে লেখাজোখা করে দিতে সক্ষম; কিন্তু আত্মিক অপরিশুদ্ধতার কারণে এদের থেকে খেয়ানতেরও ভয় রয়েছে।
এটা হলো ওই সব ব্যক্তির উদাহরণ, যারা ইলম শিখেছে। বাহ্যিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু এখনো আত্মিক পরিশুদ্ধি আসেনি। এ কারণে দ্বীনি পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের খেয়ানতের ভয় থাকে।
৫. এমন কিছু শিশু আছে, যাদের হিম্মত অনেক উঁচু। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে বদ্ধপরিকর। মেধা, বুঝ-বুদ্ধিতেও অতুলনীয়। এমন শিশুই সেই শিক্ষাগারের সবচেয়ে অগ্রগামী। তাদের শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী। এমনকি কখনো তারা উচ্চ মনোবল ও চেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষকদেরও ছাড়িয়ে যায়। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আদব-আচরণেও হয়ে ওঠে সেরাদের সেরা।
দ্রুত ইলম অর্জনের জন্য সবসময় ভেতর থেকে একটি তাড়া ও উৎসাহ অনুভব করে। সকল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে অগ্রগামী থাকে। কারণ, তাদের জানা আছে- এই শিক্ষাগার অবসরের জন্য নয়, শান্তির জন্যও নয়। এটি হলো জ্ঞান ও আদব শেখার জন্য। এটি পরবর্তী যোগ্যতার ময়দানে ও কর্মের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সময়। আর তাই যোগ্যতা অর্জনের জন্য জীবনের প্রতিটি সময়কে এ শিশুরা কাজে লাগায়।
এটা হলো প্রকৃত মুমিনদের উদাহরণ। পুরস্কারের ময়দানে তারা সমসাময়িকদের সবাইকে ছাড়িয়ে যায়। কিয়ামতের দিন সুন্দর হস্তাক্ষরে চমৎকার ফলকে তাদের আমলনামা তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। তখন তারা খুশিতে অন্যদের ডেকে বলবে-
(هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ ) إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيَهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ ( قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ)
হে লোকজন, এই যে আমার আমলনামা, তোমরা পড়ে দেখো। আমি আগেই বিশ্বাস করেছিলাম, আমাকে অবশ্যই হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে থাকবে মনঃপুত জীবনে। সেই সমুন্নত জান্নাতে- যার ফল থাকবে ঝুঁকে (নিকটবর্তী)। (বলা হবে,) তোমরা বিগত দিনগুলোতে যেসব কাজ করেছিলে, তার বিনিময়ে পানাহার করে যাও স্বাচ্ছন্দ্যে। [সুরা হাক্কা: ১৯-২৪]
ঠিক দুনিয়া ও তার অধিবাসীদের অবস্থাও ঠিক এমনই। কিছু মানুষ তো ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। স্রষ্টার বিশ্বাস ও ইবাদত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তারা হলো কাফের।
আর কিছু মানুষ রয়েছে দুর্বল ঈমানদার। গোনাহগার। তাদেরকে প্রথমে শাস্তি প্রদান করা হবে। আবার যেহেতু ঈমান আছে এবং কিছু সওয়াবও অর্জন করেছে। পরে তাই জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
এদের মধ্যে কারও ঈমান দুর্বল; তবে গোনাহও কম। কারও ঈমান তো পূর্ণ; কিন্তু আমল কম। এ কারণে তার চেয়ে উচ্চের ব্যক্তি থেকে সে নিম্নস্তরের, আবার তার চেয়ে নিচু ব্যক্তির তুলনায় সে উচ্চস্তরের।
সুতরাং হে বুঝমান ব্যক্তিগণ, দ্রুত আমলের দিকে ধাবিত হও। দুনিয়া হলো স্থায়ী আবাসের দিকে গমনের মধ্যস্থল। আখেরাতে নিজেদের ঈমান ও আমলের তারতম্য অনুযায়ী জান্নাতে মর্যাদার অধিকারী হবে। স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন করবে।
📄 মানুষের হিম্মতের তারতম্য
একটি আশ্চর্য বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। বিষয়টি হলো, জান্নাতের যারা সাধারণ অধিবাসী হবে, উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তিদের অবস্থান থেকে তুলনামূলক তাদের জায়গা হবে অনেক নিচে। তারা নিজেরাও উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তিদের এই শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবহিত থাকবে। এখন তারা যে আরও উচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব থেকে বঞ্চিত হলো, এটা নিয়ে তারা যদি চিন্তা করত, তবে তো তাদের মনের মধ্যে আফসোসের দানা বাঁধত; কিন্তু জান্নাতে এটা হবে না। এই চিন্তা তারা করবে না। তাদের নিজেদের অবস্থানস্থলের সৌন্দর্যের কারণে এবং সীমাহীন আনন্দ-উপকরণ থাকার কারণে। জান্নাতে তাদের কোনো দুঃখ বেদনা কিংবা অসম্পূর্ণতা থাকবে না। তাদেরকে যা প্রদান করা হয়েছে, তা নিয়েই তারা সীমাহীন সন্তুষ্ট থাকবে।
এর পেছনে দুটো কারণ হতে পারে-
১. সে ধারণাই করতে পারবে না যে, সে যে নিয়ামত ও সুখের মধ্যে আছে, এর চেয়ে ওপরের কোনো নিয়ামত থাকতে পারে- যদিও অন্যের অবস্থান তার চেয়ে ওপরে। অর্থাৎ অবস্থার ভিন্নতা হলেও সুখ ও আনন্দ উপভোগের ক্ষেত্রে সকলে সমান।
২. অন্যের এই উচ্চ মর্যাদা তার নিজের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠবে। যেমন, দুনিয়াতে অনেক সময় কারও অপরিচিত সন্তানও একজনের দৃষ্টিতে প্রিয় হয়ে ওঠে। তাকে নিজের ওপর প্রাধান্য প্রদান করে। এমন একটি সহজ মানসিকতা সেখানে থাকবে। মনের মধ্যে কোনো খেদ থাকবে না। কারও প্রতি কোনো ঈর্ষা বা হিংসা হবে না।
তবে এই বক্তব্যের পেছনে একটি সূক্ষ্ম মানসিক বিষয় জড়িত। কারণ, দুনিয়াতেও তো এমন কিছু মানুষ থাকে, যাদের আসলে তেমন উচ্চাশা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। সে তার নিজের অবস্থান নিয়েই সন্তুষ্ট। কেউ আবার একটু ভিন্ন ধরনের। তাই শ্রেষ্ঠত্ব কামনার ক্ষেত্রেও মানুষের ভিন্নতা রয়েছে।
ধরা যাক, কেউ শুধু কোরআনের অর্ধেক মুখস্থের ওপরই সন্তুষ্ট। পূর্ণ মুখস্থ করে না। কেউ হাদিসের প্রতি আগ্রহী- পূর্ণ হাদিস সে অর্জন করতে চায়। কেউ ফিকহের অল্পজ্ঞানের ওপরই ক্ষান্ত দেয়। আবার কারও স্বভাবই এমন, সকল বিষয়ে সামান্য হলেই তার চলে যায়। এতেই সে সন্তুষ্ট। আমলের মধ্যে কেউ শুধু ফরজগুলো আদায় করে। আবার কেউ এগুলোর সাথে প্রতি রাতে তাহাজ্জুদও পড়ে।
তাদের সবার যদি উচ্চ হিম্মত থাকত, তবে তো সকল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্যই চেষ্টা করত। অসম্পূর্ণতার ওপর সীমাবদ্ধ থাকত না।
এর দ্বারাই মানুষের হিম্মতের তারতম্য বোঝা যায়। কেউ হয়তো সারারাত গল্প-গুজব শুনতে সক্ষম; কিন্তু রাত জেগে কোরআন শুনতে সক্ষম নয়। মানুষকে যখন পুনর্জীবন দান করা হবে, তখন তাকে তার এই সকল হিম্মতসহই ওঠানো হবে। সুতরাং নিজের হিম্মতের মাধ্যমে দুনিয়াতে সে যতটুকু অর্জন করেছে, আখেরাতে তাকে সেই পরিমাণই প্রদান করা হবে। দুনিয়াতে যদি পূর্ণতার ওপর হিম্মত না করে থাকে, আখেরাতেও সে পূর্ণ হিম্মত করবে না। এবং সে এই কমতির ওপর সন্তুষ্টও থাকবে।
এছাড়া মানুষ যেহেতু তার আকল দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, সুতরাং সে নিজেও বুঝতে পারবে, তাকে তার আমলের পরিমাণ অনুপাতেই প্রতিদান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং দুই রাকাত আদায়কারী ব্যক্তি কখনো একহাজার রাকাত আদায়কারীর সমান প্রতিদানের আশা করবে না।
এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে বলেন, এটা কীভাবে সম্ভব! সে কি তার চেয়ে উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির মর্যাদা কামনা করবে না?
উত্তরে আমি বলব, তার মনে যদি কখনো আরও উচ্চ মর্যাদার কল্পনা আসত, তাহলেই শুধু এই অপ্রাপ্তি তাকে কষ্ট দিত। কিন্তু এটা যে তার কল্পনায়ই আসবে না। তুমি একজন অজ্ঞ মূর্খ ব্যক্তির দিকে তাকাও- ফিকহের জ্ঞানে কমতি থেকে গেল বলে তাকে কি কখনো আফসোস করতে দেখো? দেখো না। কারণ, এটা যদি তাদের আকাঙ্ক্ষার বস্তু হতো এবং অপ্রাপ্তিটা কষ্টের কারণ হতো, তাহলে তারা অবশ্যই এগুলো অর্জনের জন্য ব্যস্ত হতো। কষ্ট ও পরিশ্রম করত। আসলে তাদের মনে এমন হিম্মতই নেই যে, তাদের আফসোস হবে। তারা বরং নিজেদের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট রয়েছে। জান্নাতেও তা-ই হবে।
যা বললাম, তা বোঝার চেষ্টা করো এবং আমলের প্রতি অগ্রগামী হও। কারণ, এটা একটি প্রতিযোগিতার ময়দান।