📄 কৃপণদের জীবনযাপন
স্বীকার করি, মানুষের স্বভাবই হলো সম্পদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা। কারণ, এটি শরীরকে টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যমও। কিন্তু কারও কারও অন্তরে সম্পদের ভালোবাসা এতটাই প্রকট যে, সম্পদই তার ভালোবাসার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে- উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে আর গণ্য থাকে না। সুতরাং একজন কৃপণকে দেখবে, অবিরাম সে সম্পদ উপার্জন করছে; কিন্তু তা দ্বারা কিছুই উপভোগ করছে না। তার সকল আনন্দ উপভোগ নিহিত হয়ে আছে শুধু সম্পদ জমা করার মধ্যেই।
এই স্বভাবটি অনেক মানুষের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে জাহেলদের মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারা যেন এর জন্যই বেঁচে থাকে। তবে একজন আলেম ঠিক তার প্রয়োজন অনুপাতেই সম্পদ উপার্জন ও গচ্ছিত করবে। নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাবে। দ্বীনের জন্য খরচ করবে। দরিদ্রদের সাহায্য করবে।
কিন্তু সেই আলেমেরও যদি স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়- বিভিন্ন কদর্যপূর্ণ পন্থায় এবং সন্দেহমূলক পন্থায় সম্পদ গচ্ছিত করতে থাকে, সম্পদ অন্বেষণে আত্মসম্মানবোধ খুইয়ে ফেলে এবং স্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও জাকাত গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে সে তো মানুষের গুণাগুণ থেকে বের হয়ে চতুষ্পদ জন্তুর মতো হয়ে গেল। বরং চতুষ্পদ জন্তুর তো একটা যুক্তি আছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারও স্বভাবের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু এদের তো কোনো প্রশিক্ষণই কাজে লাগল না। তাহলে তাদের এই ইলম দ্বারা কী উপকার হলো?
কৃপণতার কিছু উদাহরণ-
আবুল হাসান বাসতামি ইসা নদীর কাছে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন ভীষণ কৃপণ। শীত বা গরম- উভয় সময় শুধু একটি পশমের পোশাক পরিধান করে বছর পার করে দিতেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার সময় চার হাজার দিনারের চেয়েও বেশি রেখে যান।
আমরা আরেকজন বৃদ্ধকে দেখেছি- তার কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিল না। একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নিজের এক বন্ধুর কাছে থাকা শুরু করলেন। বন্ধুই সকল খরচাদি বহন করত। অথচ এই বৃদ্ধ যখন মারা গেলেন, তখন তার গাট্টি থেকে বের হলো বহু বহু দিনার ও দিরহাম। বেঁচে থাকতে তিনি একটি দিরহামও খরচ করতে সম্মত হননি।
আমরা সাদাকাহ ইবনুল হুসাইন নাসিখকে দেখেছি- তিনি সর্বদা সময়কে গালাগাল করতেন। অন্যদেরও গালিগালাজ করতেন। মানুষদের নিকট ভিক্ষা করে বেড়াতেন এবং খুব বেশি পীড়াপীড়ি করতেন। মসজিদেই একাকী থাকতেন। একদিন মারা গেলেন। খুঁজে দেখা গেল ৩০০ দিনারেরও বেশি সম্পদ রেখে গেছেন।
সুফি আবু তালিব ইবনুল মুআইয়িদ তো আমাদের সাহচর্যেই থাকত। সে সম্পদ সঞ্চয় করত। একদা তার প্রায় ১০০ দিনার চুরি হয়ে গেল। সেই দুঃখে হায়-হাপিত্যেশ করতে করতে শেষাবধি সে মারাই গেল।
এমন অনেক ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়, যারা নিজেরা নিসাবের মালিক হয়ে গেছে। অনেক সম্পদের মালিক হয়েছে; কিন্তু মানুষের কাছ থেকে জাকাত নেওয়া বন্ধ করেনি। তারা শুধু সম্পদ গচ্ছিতই করে গেছে। এগুলো খুবই নিকৃষ্টতম পন্থা।
আবার অনেক সম্পদশালী ব্যক্তিও জাকাত প্রদানে ক্ষেত্রে গড়িমসি করে। হিসাব করে জাকাত প্রদান করে না। এটাও সম্পদের প্রতি অন্যায় লোভ ও লালসার প্রমাণ।
📄 নবীর সিরাত থেকে শিক্ষা
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সকল কাজে সন্তুষ্ট থাকার বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে চায় এবং যে জানতে চায় কীভাবে সন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়, তাহলে সে যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীর দিকে লক্ষ করে। স্রষ্টা সম্পর্কে যখন তার মারেফাত সম্পূর্ণ হবে, তখন সে বুঝতে সক্ষম হবে যে, এই স্রষ্টাই হলেন তার মালিক ও প্রতিপালক। এবং মালিকের জন্য তার বান্দার ব্যাপারে স্বাধীনভাবে যা-ইচ্ছা তাই করার অধিকার রয়েছে। তাকে এমন প্রজ্ঞাবান হিসেবে মেনে নিতে সক্ষম হবে, যিনি কোনো অনর্থক কাজ করেন না। তখন সে একজন বান্দা হিসেবে সকল ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাবান মালিকের কর্মকে মান্য করবে। এবং জীবনের কোনো অবস্থাতেই বলে উঠবে না-আহা, যদি এমন হতো! কেন এমন হলো? বরং সে কষ্ট ও বিপদের প্রবল ঝড়বায়ুর মধ্যেও তার তাকদিরের ওপর অটল পাহাড়ের মতো মজবুত থাকবে।
দেখো, তোমার কাছে বলছি এমন এক মনীষীর কথা, যিনি সর্বশেষ রাসুল ও নবী। যিনি সকল নবী ও রাসুলের নেতা। আশরাফুল আম্বিয়া। একজন সাধারণ নবীর মর্যাদাই যদি পৃথিবীর সকল মানুষের চেয়ে অধিক হয়ে থাকে, তবে যিনি নবীদের শ্রেষ্ঠ, তার মর্যাদার কথা আর কী বলব! সেইসাথে তিনি আল্লাহর হাবিব- আমাদের রবের অতি প্রিয়।
তাকেই পাঠানো হলো এমন এক সময়, যখন পুরো বিশ্ব কুফর শিরক ও পাপাচারিতার অন্ধকারে ছেয়ে আছে। তাকে পাঠানো হলো এমন এক জায়গায়- যার চারপাশে শুধু শত্রু আর শত্রু। তিনি একা- একেবারে একা। শুরু হলো দ্বীনের দাওয়াত। এবং সেইসাথে শুরু হলো শত্রুদের অত্যাচার ও নির্যাতন। তিনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াতে লাগলেন। কোথাও কোনো ছোট খুপড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকেন- বের হলেই শত্রুরা আক্রমণ করবে। তাকে রক্তে রঞ্জিত করা হয়। তার পিঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় উটের নাড়িভুঁড়ি।
কিন্তু তিনি চুপ থাকেন। সকল কিছু সয়ে যান।
প্রতি মৌসুমে তাকে বলতে হয়, এ বছর কে আমাকে আশ্রয় দেবে, কে আমাকে সাহায্য করবে?
এরপর তিনি দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তায়েফ গমন করলেন। সেখানেও নির্যাতিত হলেন। এবার যে নিজের দেশ মক্কায় প্রবেশ করবেন, সে ক্ষেত্রেও পড়লেন কাফেরদের বাধার মুখে। অবশেষে তিনি কাফেরের নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করতে সক্ষম হলেন। তাকে পাগল, জাদুকর, জ্যোতিষী, জীনগ্রস্ত বলা হয়েছে। তার ওপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করা হয়েছে।
এতসব ঘটনা নির্যাতন ও লাঞ্ছনার পরও তার মেজাজের মধ্যে কোনো বিরূপ ভাব আসে না। স্রষ্টার প্রতি তার অভ্যন্তরে কোনো অভিযোগ বা আপত্তির উদ্রেক হয় না। তিনি ছাড়া যদি অন্যকেউ হতেন, তাহলে হয়তো বলে বসতেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি সকল কিছুর সৃষ্টিকারী। সকলের ওপর ক্ষমতাবান। আপনি যেকোনো সময় সাহায্য করতে সক্ষম- তাহলে কেন আমাকে এভাবে এত অপমানিত ও অত্যাচারিত হতে দিচ্ছেন?
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যেমন বলেছিলেন হজরত উমর রা.। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নই? তবে কেন আমরা এ ধরনের সন্ধির মাধ্যমে আমাদের দ্বীনের মধ্যে হীনতা প্রবেশ করতে দেবো?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তরে বলেছিলেন,
إني عبد الله ولن يضيعني.
আমি আল্লাহর বান্দা। কিছুতেই তিনি আমাকে ব্যর্থ করবেন না। ১০
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি মৌলিক কথা বলেছেন। একটি হলো, إِنِّي عَبْدُ اللهِ -আমি আল্লাহর বান্দা। নিজের বন্দেগি বা দাসত্বকে স্বীকার করা। অর্থাৎ আমি একজন সামান্য বান্দা ও গোলাম। আমার মালিক ও প্রতিপালক আমার ক্ষেত্রে যা ইচ্ছা করতে পারেন। এতে অভিযোগের কোনো অধিকার আমার নেই।
দ্বিতীয় যে কথা তিনি বললেন, তা হলো, 'وَلَنْ يُضَيِّعَنِي -কিছুতেই তিনি আমাকে ব্যর্থ করবেন না।' এ কথাটি হলো আল্লাহ তাআলার হিকমতের প্রতি তার আস্থার বর্ণনা। অর্থাৎ তিনি কখনো অনর্থক কাজ করবেন না।
এছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে অনেকবার অভাব-অনটন ও ক্ষুধার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন। পেটে পাথর বেঁধেছেন। অথচ আল্লাহ তাআলার জন্যই আসমান ও জমিনের ধনভান্ডার! তবুও রাসুলের হৃদয়ের মধ্যে কোনো বিরূপতা আসেনি।
তাঁর সাহাবিদের হত্যা করা হয়েছে। তাঁর দাঁত শহিদ করা হয়েছে। চেহারা রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তাঁর চাচাকে হত্যা করে কলিজা বের করে চিবানো হয়েছে। তাকে কয়েক জন পুত্র সন্তান দান করা হয়েছিল। আবার তাদের অল্প বয়সে উঠিয়েও নেওয়া হয়েছে। তার আদরের নাতি- হাসান ও হুসাইন রা.-এর ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা তাকে জানানো হয়েছে। হজরত আয়েশা রা.-এর মাধ্যমে কিছুটা স্থিতি লাভ করছিলেন, অথচ তার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে তার জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। তবুও তিনি সবকিছু সয়ে গেছেন।
এছাড়া তিনি ভীষণ অসুখ দ্বারাও আক্রান্ত হয়েছেন। তার নবুয়ত যখন সব জায়গায় মেনে নেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তখন উদ্ভব ঘটেছে মুসাইলামাতুল কাজ্জাব, আসওয়াদ আনসি এবং ইবনে সয়্যাদ। এরপর তার অসুস্থতা আরও তীব্র হলো। তার পবিত্র আত্মা আল্লাহর দরবারে হাজির হলো। মৃত্যুর সময় তিনি শুয়ে ছিলেন একটি জীর্ণ পোশাক ও একটি মোটা লুঙ্গির আবরণে। তখন তার নিকট এমন কিছুটা তেলও ছিল না, যা দ্বারা প্রদীপ জ্বালানো যায়। ঘরের মধ্যে সামান্যই কিছু আসবাব।
জীবনভর এগুলো ছিল এমনই কিছু বিষয়, হয়তো এগুলোর ওপর তার আগের আর কোনো নবী এমন ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হননি। কোনো ফেরেশতাকেও যদি এ ধরনের পরীক্ষায় ফেলা হতো, তবে সে ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হতো না।
যেমন, আদম আলাইহিস সালাম। জান্নাতে শুধু একটি গাছ ব্যতীত পুরো জান্নাত তার জন্য অবারিত ছিল। তবুও এ গাছটির ক্ষেত্রে তার ধৈর্যের অন্যথা হয়ে গেছে। অথচ আমাদের নবী বৈধ বিষয়ের ক্ষেত্রেও বলেছেন,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا -দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক!৯৪
একইভাবে হজরত নুহ আলাইহিস সালাম তার দীর্ঘ জীবনের দাওয়াতে উম্মতের ব্যবহারে ত্যক্ত বিরক্ত ও রাগান্বিত হয়ে বলেছেন,
رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا হে আমার প্রতিপালক, এই কাফেরদের মধ্য হতে কোনো বাসিন্দাকেই পৃথিবীতে বাকি রাখবেন না। [সুরা নুহ: ২৬]
আর এদিকে আমাদের নবী বলেছিলেন, হে আল্লাহ, আপনি আমার সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করুন। তারা তো জানে না।
আর হজরত মুসা আলাইহিস সালামও রাগে থাপ্পড় মেরে 'মালাকুল মাউত' বা মৃত্যুর ফেরেশতার চোখ উপড়ে ফেলেছিলেন।
হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, হে আমার প্রভু, আপনি যদি কারও থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে রাখেন, তবে আমার থেকে তা সরিয়ে দিন।
কিন্তু আমাদের নবীকে যখন দুনিয়াতে থাকা এবং ইনতেকালের মাঝে যেকোনো একটি নির্বাচনের স্বাধীনতা দেওয়া হলো, তখন তিনি মহান প্রভুর সান্নিধ্যে যাওয়াকেই প্রাধান্য দান করেছেন।
এদিকে হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম দুআ করেছেন, আমাকে এমন এক রাজত্ব দিন, যা আর কাউকে দেওয়া হবে না।
আর আমাদের নবী বলেছেন, হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদের পরিবারকে পরিমিত পরিমাণে রিজিক দান করুন।
হ্যাঁ, এমনই হওয়া উচিত সেই ব্যক্তির কাজ, যিনি সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে চিনেছেন। যার নিজস্ব চাহিদাগুলো দমিত করেছেন। এ কারণে তার সকল আপত্তিগুলো নিশ্চুপ হয়ে গেছে। তার প্রবৃত্তি তার অনুগত হয়ে গেছে।
টিকাঃ
১০. ইমাম বোখারি রহ. হাদিসটি 'কিতাবুল জিযয়া' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি-৬/৩১৮২। এবং ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন 'কিতাবুল জিহাদ' এ- ৩/৯৪/১৪১১, ১৪১২। এটি হাদিসের একটি অংশ। পুরো হাদিসটি এমন-
حَدَّثَنِي أَبُو وَائِلٍ قَالَكُنَّا بِصِفِّينَ فَقَامَ سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ فَقَالَ أَيُّهَا النَّاسُ اتَّهِمُوا أَنْفُسَكُمْ فَإِنَّا كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ وَلَوْ نَرَى قِتَالًا لَقَاتَلْنَا فَجَاءَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَسْنَا عَلَى الْحَقِّ وَهُمْ عَلَى الْبَاطِلِ فَقَالَ بَلَى فَقَالَ أَلَيْسَ قَتْلَانَا فِي الْجَنَّةِ وَقَتْلَاهُمْ فِي النَّارِ قَالَ بَلَى قَالَ فَعَلَامَ نُعْطِي الدَّنِيَّةَ فِي دِينِنَا أَنْرْجِعُ وَلَمَّا يَحْكُمُ اللهُ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ فَقَالَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ وَلَنْ يُضَيِّعَنِي اللَّهُ أَبَدًا فَانْطَلَقَ عُمَرُ إِلَى أَبِي بَكْرٍ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنَّهُ رَسُولُ اللَّهِ وَلَنْ يُضَيِّعَهُ اللَّهُ
أَبَدًا فَنَزَلَتْ سُورَةُ الْفَتْحِ فَقَرَأَهَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُمَرَ إِلَى آخِرِهَا فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللهِ أَوَفَتْحٌ هُوَ قَالَ نَعَمْ.
সহিহ বোখারি: ১০/২৯৪৫, পৃষ্ঠা: ৪৫০- মা. শামেলা। ৯৪. সহিহ বোখারি: ৯/২৪২১, পৃষ্ঠা:৭৭- মা. শামেলা।
📄 কর্মের ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্নতা
স্রষ্টার প্রশংসা-তিনি সকল ব্যক্তিকে একেকটি কর্ম ও প্রবণতার মধ্যে মগ্ন রেখেছেন। হয়তো এই কর্ম ও প্রবণতা নিয়েই সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। যেমন ইলমের ক্ষেত্রে কারও নিকট তিনি কোরআনের ইলমকে প্রিয় করে তুলেছেন। কারও নিকট হাদিসের ইলম। কারও নিকট ভাষা-সাহিত্যের ইলম...ইত্যাদি। এভাবে তিনি একেক জনের নিকট একেকটি বিষয় প্রিয় করে তুলেছেন। তারা তাদের নিজেদের আগ্রহ ও আকর্ষণের বিষয়ে চর্চা করে ও প্রচার করে।
যদি এমনটি করা না হতো, তবে তো সকল প্রকার ইলম সংরক্ষিত হতো না।
এভাবে দুনিয়ার অন্য কর্মগুলোর ক্ষেত্রেও একেক জনকে একেক বিষয়ে আকর্ষণ ও যোগ্যতা দেওয়া হয়েছে। কেউ হয়েছে রুটি প্রস্তুতকারক। কেউ পাথর খোদক। কেউ মরুভূমির কাঁটা পরিষ্কারক। কেউ চিকিৎসক। কেউ বিচারক। কেউ ব্যবসায়ী। কেউ সবজি ও গম উৎপাদনকারী ইত্যাদি।
আল্লাহ যদি এভাবে একেক জনের নিকট একেক বিষয় প্রিয় করে না তুলতেন, তাহলে অবস্থা কেমন হতো! যেমন ধরো, সবাই রুটি প্রস্তুতকারী হলো, তাহলে পৃথিবীভরতি শুধু রুটি আর রুটিই দেখা যেত। নষ্ট হতো। অপচয় হতো। কিংবা সবাই পাথরখোদক হলে সকল পাথর নিঃশেষ হতো। কিংবা সবাই ব্যবসায়ী হলে খাবার উৎপাদন করত কে?
বরং আল্লাহ তাআলা সকলকে পরিমাণমতো একেকটি কাজে ও কর্মে ব্যস্ত রেখেছেন। যাতে দুনিয়া ও আখেরাতের শৃঙ্খলা রক্ষিত হয়।
তবে এসকল কর্মের মধ্যে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে, যারা নিজেদের বিষয়ে উৎকর্ষ ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে মনোযোগী হয়। এমন লোকও খুব কম- যারা ইলম ও আমলের মধ্যে, জ্ঞান ও কর্মদক্ষতার মধ্যে সুসমন্বয় করতে উদ্যোগী হয়। আত্মিক পরিশুদ্ধতার জন্য প্রস্তুত হয়। এরপরও আল্লাহ তাআলা এদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তার বিশেষ কর্মের জন্য নির্বাচন করে নেন। আল্লাহ আমাদেরকেও তাঁর সন্তুষ্টিমূলক কাজ করার তাওফিক দান করুন।
📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ ও তার ভয়াবহতা
আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, আমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক ফাসেক বলে বেড়াত- আমি মনে করি, 'মানুষের নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করার মধ্যেই রয়েছে জীবনের প্রকৃত আনন্দ- তা ভুল হোক কিংবা সঠিক।'
আমি ভেবে দেখলাম, লোকটি এ ধরনের কথা বলে কীভাবে? পরে বুঝলাম, আসলে তার অন্তর মরে গিয়েছিল। জীবনের লক্ষ্যের ব্যাপারে তার কোনো নির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। লজ্জা ও আত্মসম্মানবোধের কোনো বালাই বোধ হয় তাঁর ছিল না।
এই ধরনের মানুষ- মানুষ শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্তই নয়। কারণ, মানুষ হলো এমন জাতি, যে নিজেকে হত্যার দিকেও ঠেলে দিতে রাজি, যেন তাকে ভীরু না বলা হয়। বহু ভারি দায়িত্ব সে পালন করে- যাতে তাকে দায়িত্ববান বলা হয়। অর্থাৎ মানুষ তার নিজের অপমানকে ভয় করে। সকল বিপদ সহ্য করেও নিজের দারিদ্র্যের ওপর ধৈর্যধারণ করে এবং সেটাকে গোপন করতে চায়; যাতে সে অন্যদের চোখে ছোট না হয়ে যায়। এমনকি মূর্খকেও যদি বলা হয়, হে মূর্খ, তবে সে-ও রেগে যায়। একজন চোর বদমাইশ, তাকেও যদি কেউ বলে বসে, চুপ করো তোমার বোন তো নষ্টামি করে বেড়ায়। তবে তারও সম্মানবোধে বাধে। বোনকে হত্যা করে হলেও এর থেকে সে রেহাই পেতে চায়। এভাবে যারই কোনো হৃদয় আছে- সে কখনো কোনো অপবাদ সহ্য করতে চায় না; যাতে মানুষ ধারণা করে বসে- আসলেই সে দোষী। মানুষের সম্মানবোধ এতটাই তীক্ষ্ম ও তীব্র।
কিন্তু যে লোক তাকে মাতাল অবস্থায় দেখতে পাওয়াকে পরোয়া করে না। মানুষদের মাঝে তার মাতলামির কথা ছড়িয়ে পড়ার ভয় করে না। তার কোনো দোষ নিয়ে মানুষদের আলোচনা তাকে ব্যথিত করে না- সে নিশ্চয় চতুষ্পদ জন্তুদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, চতুষ্পদ জন্তুই কেবল তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। কারও কোনো অপবাদ, দোষ বা তিরস্কারের পরোয়া করে না। তার জীবনে এমন কোনো লক্ষ্য নেই যে, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এই লোকটির অবস্থাও তা-ই। সুতরাং সে মানুষের আকৃতিতে একটি চতুষ্পদ জন্তু ছাড়া আর কিছু নয়।
তাছাড়া একজন মদখোরের জীবন কিসের জীবন? কোথায় তার আনন্দ ও সুখ? মাতাল হওয়ার পর তাকে পাকড়াও করা হয়। প্রহার করা হয়। মানুষের মাঝে তার অপরাধ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর কারণে কি সে এর থেকে বিরত থাকে? থাকে না। বরং দ্বিগুণ আগ্রহে আবার সে মাতাল হয়ে মাতলামি করে।
এভাবে যে অলস আরামে ঘরে বসে আছে, অথচ তার আত্মীয় ও সাথিবৃন্দ ইলম ও সম্পদ অর্জনের জন্য বের হয়ে গেছে- তবে তার কিসের সুখ ও আনন্দ? কিংবা অন্যরা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, আর সে আয়েশে সময় কাটাচ্ছে। পরিণামে দরিদ্র হচ্ছে। তাহলে তার কিসের আনন্দময় জীবন? এভাবে আর কতদিন? অলসতার বিলাস আর শান্তি কি কখনো একত্র হতে পারে? কিছুতেই পারে না।
জীবনের আরও বহু বহু ক্ষেত্রে মানুষ তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলতে পারে না। তার কর্মের ক্ষেত্রে, তার সমাজের ক্ষেত্রে, তার উপার্জনের ক্ষেত্রে। এমনকি রাস্তা দিয়ে হাঁটার ক্ষেত্রেও তার নিজের ইচ্ছামতো চলতে পারে না। এসকল ক্ষেত্রে সে যে ইচ্ছামতো চলতে পারে না- এটাই তার মানুষ হওয়ার ও বুদ্ধিমান হওয়ার বড় প্রমাণ। অন্যথায় সে পাগল কিংবা মানুষের আকৃতিতে একটি আস্ত চতুষ্পদ জন্তু। মানুষ শ্রেণির কোনো বোধ তার মাঝে নেই।
এটা তো বলা হলো শুধু দুনিয়ার কথা, নতুবা প্রবৃত্তির অনুসারীর জন্য আখেরাতে রয়েছে কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তি। মুমিনগণ এগুলোকে ভয় করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আত্মসম্মানবোধ দান করুন এবং খারাবি থেকে বেঁচে থাকার সক্ষমতা দান করুন। আমিন।