📄 কামেল মানুষের সংখ্যা খুবই কম
কামালিয়াত বা পূর্ণাঙ্গতা কতই প্রিয় জিনিস। কিন্তু কামেল [সম্পূর্ণ] ব্যক্তির সংখ্যা কত কম!
কামালিয়াত অর্জনের জন্য কী কী দরকার হয়? এটার জন্য প্রয়োজন বাহ্যিক ও আত্মিক সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়া। বাহ্যিক পূর্ণাঙ্গতা বলতে বোঝায়- শারীরিক গঠন-আকৃতির সৌকর্য। আর আত্মিক পূর্ণাঙ্গতা বলতে বোঝায়- স্বভাব-চরিত্রের উৎকর্ষ।
শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয় হলো, যেমন শারীরিক গঠন সুন্দর হওয়া, কথাবার্তা সুন্দর হওয়া। উচ্চারণ স্পষ্ট হওয়া। নিজের মধ্যে বড় ধরনের কোনো খুঁত না থাকা।
আর আত্মিক সৌন্দর্য বলতে বোঝানো হচ্ছে, স্বভাব ও চরিত্র ভালো হওয়া। স্বভাবের কয়েকটি বিষয় আছে, যেমন চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সততা, জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, নিকৃষ্ট বিষয় থেকে বিরত থাকা।
আবার চরিত্রগতও কয়েকটি বিষয় আছে। যেমন, সম্মানবোধ, নিঃস্বার্থতা, মানুষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা, ভালো কাজের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হওয়া, মূর্খদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
যার মাঝে এই গুণগুলো পাওয়া যাবে, সেই শুধু মানবিক গুণাবলির পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছতে পারবে এবং তার থেকে সবচেয়ে সুন্দর আচরণগুলো প্রকাশ পাবে। আর যার স্বভাব ও প্রকৃতিতে এগুলোর কমতি রয়েছে, তার জীবন অপূর্ণই রয়ে যাবে।
📄 কল্পিত জীবনযাপনের অসুবিধাগুলো
মানুষের বড় কষ্টগুলোর মধ্যে একটি হলো, নিজের উপযুক্ত স্থান বা কর্মে নিযুক্ত হতে না পারা।
যেমন, হয়তো একজন সৎ ব্যক্তিকে নিজের প্রয়োজনে কোনো জালেমকে তোষামোদ করতে হয়। তার কাছে বারবার গমন করতে হয়। কিংবা বাধ্য হয়ে কোনো অসৎ লোকের সাথে উঠাবসা করতে হয় এবং এমন কাজকর্মের সাথে যুক্ত হতে হয়- যেগুলো তার সাথে মানানসই নয়। কিংবা এমন বিষয়াবলির মধ্যে ব্যস্ত থাকতে হয়, যার কারণে তার মনের একান্ত কাঙ্ক্ষিত ও আকর্ষিত কাজগুলো সে করতে পারে না।
যেমন ধরো, কোনো আলেমকে নির্দেশ দেওয়া হলো, 'আপনি অমুক আমিরের সাথে বেশি বেশি যোগাযোগ রাখুন। তার নিকট যাওয়া-আসা করুন। নতুবা আমরা আপনার ওপর তার ক্রোধ ও অত্যাচারের ভয় করি।' এ কথায় আলেম সাহেব আমিরের নিকট যাওয়া-আসা শুরু করলেন; কিন্তু সেখানে তিনি এমন কিছুর মুখোমুখি হন, যা তার জন্য বিব্রতকর। তার মর্যাদার খেলাফ। অথচ তিনি সেগুলোকে প্রতিহত করে চলে আসতেও পারছেন না। খুবই জটিল অবস্থা!
কিংবা কোনো ব্যক্তির দুনিয়াবি কিছু জিনিসের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু শাসকের পক্ষ থেকে তার হক তাকে দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টা তার নিকট বর্ণনা করা দরকার। স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার- যাতে সে তার অধিকারটা প্রাপ্ত হয়। এ জন্য আবার তাকে তোষামোদ করা দরকার- কিন্তু এটা তো তার জন্য কষ্টকর। অথচ জিনিসটার সীমাহীন প্রয়োজনীয়তা তার মনকে আরও সীমাহীন অস্থির ও বিক্ষিপ্ত করে তুলেছে।
এভাবে হয়তো কোনো আলেম এমন কিছু বিষয়ে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা তার জন্য যথোচিত নয়। যেমন তার উপার্জন করা দরকার। এ জন্য বাজারে বাজারে ঘুরতে হয়। জিনিসপত্র কিনতে হয় এবং বিক্রয় করতে হয়। এতে তার সকল সময় চলে যায়। কিংবা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কারও অধীনে কাজ করতে হয়। ইলমচর্চার জন্য বাড়তি আর সময় থাকে না।
এই বিষয়গুলো একজন আল্লাহমুখী মানুষের ক্ষেত্রে বহন করা খুবই কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, এর অনেকগুলো বিষয়ের সাথে খারাবি ও কদর্যতা জড়িত। মনের সাথে কোনোভাবেই সমঞ্জস হয় না।
আরও আছে- যেমন ধরো, কারও পরিবার-পরিজন আছে। তাদের ভরণ-পোষণের জন্য তাকে এমন কিছু কাজে যুক্ত হতে হয়, যা তার জন্য খুবই কঠিন। আবার কখনো তার প্রিয় মানুষের মৃত্যু দ্বারা কষ্টে পতিত হতে হয় কিংবা নিজের শারীরিক অসুস্থতায় জর্জরিত হতে হয়। কিংবা নিজের কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়া, উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া কিংবা এমন জালেমের অধীনে কাজ করার বিড়ম্বনা তাকে পোহাতে হয়- যে তাকে কষ্ট দেয়। কিংবা এমন ফাসেকের অধীনে তা করতে হয়- যে তার ওপর কঠোরতা করে।
বহু মানুষের এ ধরনের নানান সমস্যা, কষ্ট ও বেদনা রয়েছে। যার কারণে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। হৃদয়-মন ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। এসকল বিষয়ে প্রতিকার করার কোনো শক্তিই তাদের নেই। মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ভাগ্যের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া পরিত্রাণের কোনো পথ নেই।
ঠিক এই কঠিন সময়গুলোতেও একজন সুদৃঢ় মনের মুমিন ব্যক্তি সকল কষ্ট সয়ে যায়। তার অন্তর টলে যায় না। তার জিহ্বায় কোনো অভিযোগ ও আপত্তি উচ্চারিত হয় না। সে সইতে থাকে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট চাইতে থাকে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কি এমন সমস্যার সম্মুখীন হননি? হয়েছেন। তিনি কি বলতে বাধ্য হননি ‘আমাকে কে সাহায্য করবে? আমাকে কে সাহায্য করবে? তিনি কি একজন কাফেরের নিরাপত্তা নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধ্য হননি? তার পিঠের ওপর কি উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি? তার সাহাবিদের হত্যা করা হয়েছে, আর তিনি মিনতি করেছেন, তাদেরকে হত্যা না করতে। নিজের তীব্র ক্ষুধার সময়ও তিনি অটল থেকেছেন- মনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এমন অটল তিনি কেন থাকতে পেরেছেন? কারণ, তিনি তো জেনেছেন, দুনিয়া হলো কষ্ট ও পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান, এসব কষ্টের মধ্যেও তোমরা এখানে কী ধরনের আমল ও আচরণ করো! পরবর্তী পুরস্কারের প্রত্যাশায় বান্দার তো এসকল বিষয় সহজভাবে গ্রহণ করার কথা। আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যও সেটাই। এখানে কষ্ট করলে সেখানে পাবে।
📄 কৃপণদের জীবনযাপন
স্বীকার করি, মানুষের স্বভাবই হলো সম্পদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা। কারণ, এটি শরীরকে টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যমও। কিন্তু কারও কারও অন্তরে সম্পদের ভালোবাসা এতটাই প্রকট যে, সম্পদই তার ভালোবাসার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে- উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে আর গণ্য থাকে না। সুতরাং একজন কৃপণকে দেখবে, অবিরাম সে সম্পদ উপার্জন করছে; কিন্তু তা দ্বারা কিছুই উপভোগ করছে না। তার সকল আনন্দ উপভোগ নিহিত হয়ে আছে শুধু সম্পদ জমা করার মধ্যেই।
এই স্বভাবটি অনেক মানুষের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে জাহেলদের মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারা যেন এর জন্যই বেঁচে থাকে। তবে একজন আলেম ঠিক তার প্রয়োজন অনুপাতেই সম্পদ উপার্জন ও গচ্ছিত করবে। নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাবে। দ্বীনের জন্য খরচ করবে। দরিদ্রদের সাহায্য করবে।
কিন্তু সেই আলেমেরও যদি স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়- বিভিন্ন কদর্যপূর্ণ পন্থায় এবং সন্দেহমূলক পন্থায় সম্পদ গচ্ছিত করতে থাকে, সম্পদ অন্বেষণে আত্মসম্মানবোধ খুইয়ে ফেলে এবং স্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও জাকাত গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে সে তো মানুষের গুণাগুণ থেকে বের হয়ে চতুষ্পদ জন্তুর মতো হয়ে গেল। বরং চতুষ্পদ জন্তুর তো একটা যুক্তি আছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারও স্বভাবের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু এদের তো কোনো প্রশিক্ষণই কাজে লাগল না। তাহলে তাদের এই ইলম দ্বারা কী উপকার হলো?
কৃপণতার কিছু উদাহরণ-
আবুল হাসান বাসতামি ইসা নদীর কাছে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন ভীষণ কৃপণ। শীত বা গরম- উভয় সময় শুধু একটি পশমের পোশাক পরিধান করে বছর পার করে দিতেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার সময় চার হাজার দিনারের চেয়েও বেশি রেখে যান।
আমরা আরেকজন বৃদ্ধকে দেখেছি- তার কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিল না। একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নিজের এক বন্ধুর কাছে থাকা শুরু করলেন। বন্ধুই সকল খরচাদি বহন করত। অথচ এই বৃদ্ধ যখন মারা গেলেন, তখন তার গাট্টি থেকে বের হলো বহু বহু দিনার ও দিরহাম। বেঁচে থাকতে তিনি একটি দিরহামও খরচ করতে সম্মত হননি।
আমরা সাদাকাহ ইবনুল হুসাইন নাসিখকে দেখেছি- তিনি সর্বদা সময়কে গালাগাল করতেন। অন্যদেরও গালিগালাজ করতেন। মানুষদের নিকট ভিক্ষা করে বেড়াতেন এবং খুব বেশি পীড়াপীড়ি করতেন। মসজিদেই একাকী থাকতেন। একদিন মারা গেলেন। খুঁজে দেখা গেল ৩০০ দিনারেরও বেশি সম্পদ রেখে গেছেন।
সুফি আবু তালিব ইবনুল মুআইয়িদ তো আমাদের সাহচর্যেই থাকত। সে সম্পদ সঞ্চয় করত। একদা তার প্রায় ১০০ দিনার চুরি হয়ে গেল। সেই দুঃখে হায়-হাপিত্যেশ করতে করতে শেষাবধি সে মারাই গেল।
এমন অনেক ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়, যারা নিজেরা নিসাবের মালিক হয়ে গেছে। অনেক সম্পদের মালিক হয়েছে; কিন্তু মানুষের কাছ থেকে জাকাত নেওয়া বন্ধ করেনি। তারা শুধু সম্পদ গচ্ছিতই করে গেছে। এগুলো খুবই নিকৃষ্টতম পন্থা।
আবার অনেক সম্পদশালী ব্যক্তিও জাকাত প্রদানে ক্ষেত্রে গড়িমসি করে। হিসাব করে জাকাত প্রদান করে না। এটাও সম্পদের প্রতি অন্যায় লোভ ও লালসার প্রমাণ।
📄 নবীর সিরাত থেকে শিক্ষা
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সকল কাজে সন্তুষ্ট থাকার বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে চায় এবং যে জানতে চায় কীভাবে সন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়, তাহলে সে যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীর দিকে লক্ষ করে। স্রষ্টা সম্পর্কে যখন তার মারেফাত সম্পূর্ণ হবে, তখন সে বুঝতে সক্ষম হবে যে, এই স্রষ্টাই হলেন তার মালিক ও প্রতিপালক। এবং মালিকের জন্য তার বান্দার ব্যাপারে স্বাধীনভাবে যা-ইচ্ছা তাই করার অধিকার রয়েছে। তাকে এমন প্রজ্ঞাবান হিসেবে মেনে নিতে সক্ষম হবে, যিনি কোনো অনর্থক কাজ করেন না। তখন সে একজন বান্দা হিসেবে সকল ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাবান মালিকের কর্মকে মান্য করবে। এবং জীবনের কোনো অবস্থাতেই বলে উঠবে না-আহা, যদি এমন হতো! কেন এমন হলো? বরং সে কষ্ট ও বিপদের প্রবল ঝড়বায়ুর মধ্যেও তার তাকদিরের ওপর অটল পাহাড়ের মতো মজবুত থাকবে।
দেখো, তোমার কাছে বলছি এমন এক মনীষীর কথা, যিনি সর্বশেষ রাসুল ও নবী। যিনি সকল নবী ও রাসুলের নেতা। আশরাফুল আম্বিয়া। একজন সাধারণ নবীর মর্যাদাই যদি পৃথিবীর সকল মানুষের চেয়ে অধিক হয়ে থাকে, তবে যিনি নবীদের শ্রেষ্ঠ, তার মর্যাদার কথা আর কী বলব! সেইসাথে তিনি আল্লাহর হাবিব- আমাদের রবের অতি প্রিয়।
তাকেই পাঠানো হলো এমন এক সময়, যখন পুরো বিশ্ব কুফর শিরক ও পাপাচারিতার অন্ধকারে ছেয়ে আছে। তাকে পাঠানো হলো এমন এক জায়গায়- যার চারপাশে শুধু শত্রু আর শত্রু। তিনি একা- একেবারে একা। শুরু হলো দ্বীনের দাওয়াত। এবং সেইসাথে শুরু হলো শত্রুদের অত্যাচার ও নির্যাতন। তিনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াতে লাগলেন। কোথাও কোনো ছোট খুপড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকেন- বের হলেই শত্রুরা আক্রমণ করবে। তাকে রক্তে রঞ্জিত করা হয়। তার পিঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় উটের নাড়িভুঁড়ি।
কিন্তু তিনি চুপ থাকেন। সকল কিছু সয়ে যান।
প্রতি মৌসুমে তাকে বলতে হয়, এ বছর কে আমাকে আশ্রয় দেবে, কে আমাকে সাহায্য করবে?
এরপর তিনি দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তায়েফ গমন করলেন। সেখানেও নির্যাতিত হলেন। এবার যে নিজের দেশ মক্কায় প্রবেশ করবেন, সে ক্ষেত্রেও পড়লেন কাফেরদের বাধার মুখে। অবশেষে তিনি কাফেরের নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করতে সক্ষম হলেন। তাকে পাগল, জাদুকর, জ্যোতিষী, জীনগ্রস্ত বলা হয়েছে। তার ওপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করা হয়েছে।
এতসব ঘটনা নির্যাতন ও লাঞ্ছনার পরও তার মেজাজের মধ্যে কোনো বিরূপ ভাব আসে না। স্রষ্টার প্রতি তার অভ্যন্তরে কোনো অভিযোগ বা আপত্তির উদ্রেক হয় না। তিনি ছাড়া যদি অন্যকেউ হতেন, তাহলে হয়তো বলে বসতেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি সকল কিছুর সৃষ্টিকারী। সকলের ওপর ক্ষমতাবান। আপনি যেকোনো সময় সাহায্য করতে সক্ষম- তাহলে কেন আমাকে এভাবে এত অপমানিত ও অত্যাচারিত হতে দিচ্ছেন?
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যেমন বলেছিলেন হজরত উমর রা.। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নই? তবে কেন আমরা এ ধরনের সন্ধির মাধ্যমে আমাদের দ্বীনের মধ্যে হীনতা প্রবেশ করতে দেবো?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তরে বলেছিলেন,
إني عبد الله ولن يضيعني.
আমি আল্লাহর বান্দা। কিছুতেই তিনি আমাকে ব্যর্থ করবেন না। ১০
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি মৌলিক কথা বলেছেন। একটি হলো, إِنِّي عَبْدُ اللهِ -আমি আল্লাহর বান্দা। নিজের বন্দেগি বা দাসত্বকে স্বীকার করা। অর্থাৎ আমি একজন সামান্য বান্দা ও গোলাম। আমার মালিক ও প্রতিপালক আমার ক্ষেত্রে যা ইচ্ছা করতে পারেন। এতে অভিযোগের কোনো অধিকার আমার নেই।
দ্বিতীয় যে কথা তিনি বললেন, তা হলো, 'وَلَنْ يُضَيِّعَنِي -কিছুতেই তিনি আমাকে ব্যর্থ করবেন না।' এ কথাটি হলো আল্লাহ তাআলার হিকমতের প্রতি তার আস্থার বর্ণনা। অর্থাৎ তিনি কখনো অনর্থক কাজ করবেন না।
এছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে অনেকবার অভাব-অনটন ও ক্ষুধার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন। পেটে পাথর বেঁধেছেন। অথচ আল্লাহ তাআলার জন্যই আসমান ও জমিনের ধনভান্ডার! তবুও রাসুলের হৃদয়ের মধ্যে কোনো বিরূপতা আসেনি।
তাঁর সাহাবিদের হত্যা করা হয়েছে। তাঁর দাঁত শহিদ করা হয়েছে। চেহারা রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তাঁর চাচাকে হত্যা করে কলিজা বের করে চিবানো হয়েছে। তাকে কয়েক জন পুত্র সন্তান দান করা হয়েছিল। আবার তাদের অল্প বয়সে উঠিয়েও নেওয়া হয়েছে। তার আদরের নাতি- হাসান ও হুসাইন রা.-এর ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা তাকে জানানো হয়েছে। হজরত আয়েশা রা.-এর মাধ্যমে কিছুটা স্থিতি লাভ করছিলেন, অথচ তার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে তার জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। তবুও তিনি সবকিছু সয়ে গেছেন।
এছাড়া তিনি ভীষণ অসুখ দ্বারাও আক্রান্ত হয়েছেন। তার নবুয়ত যখন সব জায়গায় মেনে নেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তখন উদ্ভব ঘটেছে মুসাইলামাতুল কাজ্জাব, আসওয়াদ আনসি এবং ইবনে সয়্যাদ। এরপর তার অসুস্থতা আরও তীব্র হলো। তার পবিত্র আত্মা আল্লাহর দরবারে হাজির হলো। মৃত্যুর সময় তিনি শুয়ে ছিলেন একটি জীর্ণ পোশাক ও একটি মোটা লুঙ্গির আবরণে। তখন তার নিকট এমন কিছুটা তেলও ছিল না, যা দ্বারা প্রদীপ জ্বালানো যায়। ঘরের মধ্যে সামান্যই কিছু আসবাব।
জীবনভর এগুলো ছিল এমনই কিছু বিষয়, হয়তো এগুলোর ওপর তার আগের আর কোনো নবী এমন ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হননি। কোনো ফেরেশতাকেও যদি এ ধরনের পরীক্ষায় ফেলা হতো, তবে সে ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হতো না।
যেমন, আদম আলাইহিস সালাম। জান্নাতে শুধু একটি গাছ ব্যতীত পুরো জান্নাত তার জন্য অবারিত ছিল। তবুও এ গাছটির ক্ষেত্রে তার ধৈর্যের অন্যথা হয়ে গেছে। অথচ আমাদের নবী বৈধ বিষয়ের ক্ষেত্রেও বলেছেন,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا -দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক!৯৪
একইভাবে হজরত নুহ আলাইহিস সালাম তার দীর্ঘ জীবনের দাওয়াতে উম্মতের ব্যবহারে ত্যক্ত বিরক্ত ও রাগান্বিত হয়ে বলেছেন,
رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا হে আমার প্রতিপালক, এই কাফেরদের মধ্য হতে কোনো বাসিন্দাকেই পৃথিবীতে বাকি রাখবেন না। [সুরা নুহ: ২৬]
আর এদিকে আমাদের নবী বলেছিলেন, হে আল্লাহ, আপনি আমার সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করুন। তারা তো জানে না।
আর হজরত মুসা আলাইহিস সালামও রাগে থাপ্পড় মেরে 'মালাকুল মাউত' বা মৃত্যুর ফেরেশতার চোখ উপড়ে ফেলেছিলেন।
হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, হে আমার প্রভু, আপনি যদি কারও থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে রাখেন, তবে আমার থেকে তা সরিয়ে দিন।
কিন্তু আমাদের নবীকে যখন দুনিয়াতে থাকা এবং ইনতেকালের মাঝে যেকোনো একটি নির্বাচনের স্বাধীনতা দেওয়া হলো, তখন তিনি মহান প্রভুর সান্নিধ্যে যাওয়াকেই প্রাধান্য দান করেছেন।
এদিকে হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম দুআ করেছেন, আমাকে এমন এক রাজত্ব দিন, যা আর কাউকে দেওয়া হবে না।
আর আমাদের নবী বলেছেন, হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদের পরিবারকে পরিমিত পরিমাণে রিজিক দান করুন।
হ্যাঁ, এমনই হওয়া উচিত সেই ব্যক্তির কাজ, যিনি সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে চিনেছেন। যার নিজস্ব চাহিদাগুলো দমিত করেছেন। এ কারণে তার সকল আপত্তিগুলো নিশ্চুপ হয়ে গেছে। তার প্রবৃত্তি তার অনুগত হয়ে গেছে।
টিকাঃ
১০. ইমাম বোখারি রহ. হাদিসটি 'কিতাবুল জিযয়া' অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি-৬/৩১৮২। এবং ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন 'কিতাবুল জিহাদ' এ- ৩/৯৪/১৪১১, ১৪১২। এটি হাদিসের একটি অংশ। পুরো হাদিসটি এমন-
حَدَّثَنِي أَبُو وَائِلٍ قَالَكُنَّا بِصِفِّينَ فَقَامَ سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ فَقَالَ أَيُّهَا النَّاسُ اتَّهِمُوا أَنْفُسَكُمْ فَإِنَّا كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ وَلَوْ نَرَى قِتَالًا لَقَاتَلْنَا فَجَاءَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَسْنَا عَلَى الْحَقِّ وَهُمْ عَلَى الْبَاطِلِ فَقَالَ بَلَى فَقَالَ أَلَيْسَ قَتْلَانَا فِي الْجَنَّةِ وَقَتْلَاهُمْ فِي النَّارِ قَالَ بَلَى قَالَ فَعَلَامَ نُعْطِي الدَّنِيَّةَ فِي دِينِنَا أَنْرْجِعُ وَلَمَّا يَحْكُمُ اللهُ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ فَقَالَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ وَلَنْ يُضَيِّعَنِي اللَّهُ أَبَدًا فَانْطَلَقَ عُمَرُ إِلَى أَبِي بَكْرٍ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنَّهُ رَسُولُ اللَّهِ وَلَنْ يُضَيِّعَهُ اللَّهُ
أَبَدًا فَنَزَلَتْ سُورَةُ الْفَتْحِ فَقَرَأَهَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُمَرَ إِلَى آخِرِهَا فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللهِ أَوَفَتْحٌ هُوَ قَالَ نَعَمْ.
সহিহ বোখারি: ১০/২৯৪৫, পৃষ্ঠা: ৪৫০- মা. শামেলা। ৯৪. সহিহ বোখারি: ৯/২৪২১, পৃষ্ঠা:৭৭- মা. শামেলা।