📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 রাজা-বাদশাহের ওপর আলেমের মর্যাদা

📄 রাজা-বাদশাহের ওপর আলেমের মর্যাদা


দুনিয়ার স্বভাব হলো, দুনিয়াতে যে মানুষের যতটা উন্নতি ও প্রসিদ্ধি ঘটবে, আখেরাতের ক্ষেত্রে তার জন্য সে পরিমাণ মর্যাদার অবনতি হবে। কথাটি আমি নিজের পক্ষ থেকে বলছি না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন। তিনি বলেন,
والله لا ينال أحد من الدنيا شيئاً إلا نقص من درجاته عند الله، وإن كان عنده كريماً.
আল্লাহর কসম করে বলছি, দুনিয়া থেকে যে ব্যক্তি যতটুকু গ্রহণ করবে, তার সে পরিমাণ মর্যাদা আল্লাহ তাআলার নিকট কমে যাবে- যদিও সে তার নিকট সম্মানিতই হয়।
সুতরাং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার পরিমিত পরিমাণের ওপর সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, জীবনের সময়ের দাম এত বেশি যে, তা শুধু দুনিয়া অর্জনের পেছনে খরচ করা চলে না। যে খরচ করবে, সে অকাট নির্বোধ ছাড়া আর কিছু নয়। হ্যাঁ, নিজের প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনের জন্য, নিজের পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য, দ্বীনের কাজে সহযোগিতার জন্য এবং দরিদ্রদের ওপর দান-সদকা করার জন্য উপার্জনে সময় ব্যয় করা যায়। তাতে কেনো অসুবিধা নেই। এটি জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ।
কিন্তু প্রয়োজন পূরণের পরও আরও অতিরিক্ত অর্জনের জন্য কোনো আলেমের রাজা-বাদশাদের দরবারে ধরনা দেওয়া—এটা তো ক্ষতিকারক। এতে তার দ্বীন বিনষ্ট হয়। যদিও এক্ষেত্রে বাহ্যিক কিছু সম্পদ ও নিরাপত্তা পরিলক্ষিত হয়; কিন্তু পরিণাম তো খুবই ক্ষতিকর।
আবু মুহাম্মদ আত-তামিমি বলেন, আমি আমাদের যুগে অতি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন আবু জাফর আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ব্যতীত আর কারও প্রতি ঈর্ষাবোধ করি না। তিনি ছিলেন আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠাকারী। যেদিন তিনি ইন্তেকাল করেন—তাকে গোসল দেওয়া হলো। মৃত্যুর আগে তিনি তার জামার প্রান্ত গুছিয়ে নিজের জায়নামাজে এসে বসলেন। কারও দিকে কোনো ভ্রক্ষেপ করলেন না। এদিকে আমরাই ভয়ে অস্থির হয়ে আছি, আমাদের ওপরও না-জানি কী বিপদ নেমে আসে। অথচ তিনি ছিলেন অটল অনড়। নির্বিকার। নিঃশঙ্কচিত্ত।
আমি আমার নিজের জীবনেও অনেক আলেমকে রাজা-বাদশাহর দরবারে যাতায়াত ও ওঠাবসা করতে দেখেছি। শেষমেশ তাদের অবস্থান ভালো থাকেনি। আমি স্বীকার করছি, তারা আসলে জীবনে কিছুটা স্বস্তি ও শান্তি অন্বেষণ করেছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারা ভুল পথ অবলম্বন করেছিলেন। অন্তরের বেদনাকে কখনো খাদ্য ও সম্পদের প্রাচুর্য প্রশমিত করতে পারে না। এটা তো শুধু দুনিয়ার কথা। আখেরাতের ব্যবস্থা আরও ভিন্ন। অতএব একজন আলেমের জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাশীল জীবনযাপন হলো একাকী একপ্রান্তে নিজের কাজ করে যাওয়া, রাজা-বাদশাহর সাথে কোনো লেনদেনে না যাওয়া। খাওয়া-দাওয়া যেমনই হোক- তার তোয়াক্কা না করা। সামান্য যা কিছু আছে, তাতেই তো যথেষ্ট। কারও কোনো কটু কথা শোনা থেকে এটিই নিরাপদ অবস্থা। কারও সুদৃষ্টি ছিন্ন হওয়ার ভয় থেকে নিরাপদ। কোনো মানুষের অনুগ্রহের ক্লেশমুক্ত স্বাধীন জীবন। যেমন ছিলেন ইবনে আবু দাউদ রহ., ইয়াহইয়া ইবনে আকছাম রহ. এবং আরও অনেক আলেম ও আবেদের জীবন। এটাই হলো আখেরাত নিরাপদ রেখে দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য জীবন। এর চেয়ে সুখের জীবন আর কী হতে পারে! হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. কত সুন্দরই না বলেছেন,
لو علم الملوك وأبناء الملوك ما نحن فيه من لذيذ العيش الجالدونا عليه بالسيوف.
যদি রাজা-বাদশাহ এবং দুনিয়াদারেরা জানত আমরা কী সুখের জীবনযাপন করি, তবে তারা এর প্রত্যাশায় আমাদের সাথে তরবারি নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতো।
ইবনে আদহাম রহ, সত্যই বলেছেন। কারণ, কোনো বাদশাহ যখন কিছু পানাহার করে, ভয় থাকে এতে আবার কোনো বিষ আছে কি না? যখন ঘুমায়, ভয় থাকে, কেউ আবার গুপ্তহত্যা করে কি না? তাকে সব সময় নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয়। বাইরের কত কত নয়নাভিরাম দৃশ্য- সেগুলো সে নির্ভাবনায় নিরালায় দেখতে সক্ষম হয় না। কখনো যদি বের হয়, একেবারে কাছের মানুষের থেকেও অনেক সময় আক্রমণের ভয় থাকে। যে সকল বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সুখ ও আনন্দ পাওয়া সম্ভব হতো, সেগুলো তার কাছে নিরস হয়ে আসে। এমনকি খাবার ও রমণের সুখও আর অবশিষ্ট থাকে না।
কোনো খাবার যদি বেশি ভালো লাগে- বেশি খেয়ে ফেললে আবার পেটে সমস্যা হয়। ঘন ঘন সহবাসেও মূলত তার মজা কমে আসে। কারণ, রমণের মজা তখনই আস্বাদিত হয়, যখন দুই রমণের মাঝে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। ঠিক খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। একারণে বলা হয়, ক্ষুধা ছাড়া খাবারে এবং উত্তেজনা ছাড়া সহবাসে কখনো পূর্ণ তৃপ্তি লাভ হয় না। অথচ সেই তৃপ্তি লাভ করে একজন রাস্তার ফকির- যখন সে খাবার পায় এবং স্ত্রী পায়। তাছাড়া একজন ফকির বা দরিদ্র ব্যক্তি রাতে নিশ্চিন্তে রাস্তায়ও ঘুমোতে পারে।
এদিকে আমির-উমারা কিংবা রাজা-বাদশাহদের নিরাপত্তা যেমন নেই, আবার তাদের আস্বাদনও অসম্পূর্ণ। কিন্তু আল্লাহর নিকট তাদের হিসাব অনেক বেশি।
আমি কসম করে বলতে পারি, উচ্চপর্যায়ের কোনো ব্যক্তি সেই পূর্ণ সুখ ও স্ফূর্ত আনন্দ উপভোগ করতে পারে না- যা অন্যরা পারে...।
তবে একনিষ্ঠ আলেমদের কথা ভিন্ন। যেমন হজরত হাসান বসরি রহ., আহমদ ইবনে হাম্বল রহ., সুফিয়ান সাওরি রহ. এবং সত্যনিষ্ঠ আবেদগণ, যেমন মারুফ কারখি রহ.। কারণ, ইলমের সুখ ও স্বাদ সকল সুখ ও স্বাদের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু তারাও তো জীবনে বিভিন্ন সময় অভাব-অনটন ও নিরন্ন থাকার কষ্ট স্বীকার করেন কিংবা জালেমদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকার নির্যাতন ও অত্যাচার সহ্য করেন- এগুলো তাদের মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এমনিভাবে তারা জীবন উপভোগ করেন নির্জন ইবাদত ও তাসবিহ-তাহলিলে। নিবিড় ধ্যান-মগ্নতায়। স্রষ্টার সাথে একান্ত প্রার্থনায়। এই সুখ ও আনন্দ অন্যরা পাবে কোথায়?
তাছাড়া এসব ব্যক্তিদের অনেকেই কবে সেই কতদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন, অথচ তাদের সংরক্ষিত ও বর্ণিত ইলম দ্বারা মানুষ এখনো উপকৃত হয়। এখনো তাদের কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মানুষ একটু দাঁড়ায়। সুরা ইখলাস [قل هو الله أحد] পড়ে আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য দুআ করে।
আর রাজা-বাদশাহ- তাদের কবরগুলো সাধারণত گناهগার ও নিকৃষ্ট মানুষেরা গিয়েই শুধু পরিদর্শন করে। তাদের পাপপূর্ণ বিলাসি জীবন নিয়ে আলোচনা করে।
এটা তো বলা হলো মৃত্যুর পরে দুনিয়ার উপরের অবস্থা। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাঁর এসকল অনুগত প্রিয় বান্দাদের কী পুরস্কার ও সম্মান প্রদান করবেন- তা তো বলে শেষ করার মতো নয়।
কিন্তু যে সকল আলেম রাজা-বাদশাহ কিংবা ধনবান দুনিয়াদারদের সাথে মেলামেশার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, কোনো না কোনোভাবে তাদের দ্বীনদারিতার মধ্যেও কদর্যতা এসে গেছে। এটা তাদের সকল আমলের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
হজরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, 'আমি একবার একজন আমিরের নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করেছিলাম, সেই থেকে আমার আগেকার সেই কোরআনের বুঝ ও প্রাজ্ঞতা উঠে গেছে।'
সুতরাং তাদের থেকে আলেমদের বিরত থাকা উচিত। ধৈর্যধারণ করা উচিত। যদিও এতে জীবনের একটি দিক সংকীর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য অনেক প্রাচুর্যের পথ খুলে যাবে।
হজরত আবুল হাসান আল কাযুনি রহ. শুধু নামাজের সময় ছাড়া তার ঘর থেকে বের হতেন না। কখনো কখনো বাদশাহ নিজে তাকে সালাম প্রদানের অপেক্ষায় বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
অমুখাপেক্ষিতার শক্তি এমনই হয়। তবে শ্রোতা ও পাঠকদের মধ্যে কেউ কেউ এটাকে বাড়াবাড়ি ভাবতে পারেন। কিন্তু আসল কথা তো তাই- যারা যার মধ্যে স্বাদ পেয়েছে, তারা তাতেই নিমগ্ন হয়েছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কামেল মানুষের সংখ্যা খুবই কম

📄 কামেল মানুষের সংখ্যা খুবই কম


কামালিয়াত বা পূর্ণাঙ্গতা কতই প্রিয় জিনিস। কিন্তু কামেল [সম্পূর্ণ] ব্যক্তির সংখ্যা কত কম!
কামালিয়াত অর্জনের জন্য কী কী দরকার হয়? এটার জন্য প্রয়োজন বাহ্যিক ও আত্মিক সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়া। বাহ্যিক পূর্ণাঙ্গতা বলতে বোঝায়- শারীরিক গঠন-আকৃতির সৌকর্য। আর আত্মিক পূর্ণাঙ্গতা বলতে বোঝায়- স্বভাব-চরিত্রের উৎকর্ষ।
শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয় হলো, যেমন শারীরিক গঠন সুন্দর হওয়া, কথাবার্তা সুন্দর হওয়া। উচ্চারণ স্পষ্ট হওয়া। নিজের মধ্যে বড় ধরনের কোনো খুঁত না থাকা।
আর আত্মিক সৌন্দর্য বলতে বোঝানো হচ্ছে, স্বভাব ও চরিত্র ভালো হওয়া। স্বভাবের কয়েকটি বিষয় আছে, যেমন চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সততা, জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, নিকৃষ্ট বিষয় থেকে বিরত থাকা।
আবার চরিত্রগতও কয়েকটি বিষয় আছে। যেমন, সম্মানবোধ, নিঃস্বার্থতা, মানুষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা, ভালো কাজের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হওয়া, মূর্খদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
যার মাঝে এই গুণগুলো পাওয়া যাবে, সেই শুধু মানবিক গুণাবলির পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছতে পারবে এবং তার থেকে সবচেয়ে সুন্দর আচরণগুলো প্রকাশ পাবে। আর যার স্বভাব ও প্রকৃতিতে এগুলোর কমতি রয়েছে, তার জীবন অপূর্ণই রয়ে যাবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কল্পিত জীবনযাপনের অসুবিধাগুলো

📄 কল্পিত জীবনযাপনের অসুবিধাগুলো


মানুষের বড় কষ্টগুলোর মধ্যে একটি হলো, নিজের উপযুক্ত স্থান বা কর্মে নিযুক্ত হতে না পারা।
যেমন, হয়তো একজন সৎ ব্যক্তিকে নিজের প্রয়োজনে কোনো জালেমকে তোষামোদ করতে হয়। তার কাছে বারবার গমন করতে হয়। কিংবা বাধ্য হয়ে কোনো অসৎ লোকের সাথে উঠাবসা করতে হয় এবং এমন কাজকর্মের সাথে যুক্ত হতে হয়- যেগুলো তার সাথে মানানসই নয়। কিংবা এমন বিষয়াবলির মধ্যে ব্যস্ত থাকতে হয়, যার কারণে তার মনের একান্ত কাঙ্ক্ষিত ও আকর্ষিত কাজগুলো সে করতে পারে না।
যেমন ধরো, কোনো আলেমকে নির্দেশ দেওয়া হলো, 'আপনি অমুক আমিরের সাথে বেশি বেশি যোগাযোগ রাখুন। তার নিকট যাওয়া-আসা করুন। নতুবা আমরা আপনার ওপর তার ক্রোধ ও অত্যাচারের ভয় করি।' এ কথায় আলেম সাহেব আমিরের নিকট যাওয়া-আসা শুরু করলেন; কিন্তু সেখানে তিনি এমন কিছুর মুখোমুখি হন, যা তার জন্য বিব্রতকর। তার মর্যাদার খেলাফ। অথচ তিনি সেগুলোকে প্রতিহত করে চলে আসতেও পারছেন না। খুবই জটিল অবস্থা!
কিংবা কোনো ব্যক্তির দুনিয়াবি কিছু জিনিসের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু শাসকের পক্ষ থেকে তার হক তাকে দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টা তার নিকট বর্ণনা করা দরকার। স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার- যাতে সে তার অধিকারটা প্রাপ্ত হয়। এ জন্য আবার তাকে তোষামোদ করা দরকার- কিন্তু এটা তো তার জন্য কষ্টকর। অথচ জিনিসটার সীমাহীন প্রয়োজনীয়তা তার মনকে আরও সীমাহীন অস্থির ও বিক্ষিপ্ত করে তুলেছে।
এভাবে হয়তো কোনো আলেম এমন কিছু বিষয়ে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা তার জন্য যথোচিত নয়। যেমন তার উপার্জন করা দরকার। এ জন্য বাজারে বাজারে ঘুরতে হয়। জিনিসপত্র কিনতে হয় এবং বিক্রয় করতে হয়। এতে তার সকল সময় চলে যায়। কিংবা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কারও অধীনে কাজ করতে হয়। ইলমচর্চার জন্য বাড়তি আর সময় থাকে না।
এই বিষয়গুলো একজন আল্লাহমুখী মানুষের ক্ষেত্রে বহন করা খুবই কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, এর অনেকগুলো বিষয়ের সাথে খারাবি ও কদর্যতা জড়িত। মনের সাথে কোনোভাবেই সমঞ্জস হয় না।
আরও আছে- যেমন ধরো, কারও পরিবার-পরিজন আছে। তাদের ভরণ-পোষণের জন্য তাকে এমন কিছু কাজে যুক্ত হতে হয়, যা তার জন্য খুবই কঠিন। আবার কখনো তার প্রিয় মানুষের মৃত্যু দ্বারা কষ্টে পতিত হতে হয় কিংবা নিজের শারীরিক অসুস্থতায় জর্জরিত হতে হয়। কিংবা নিজের কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়া, উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া কিংবা এমন জালেমের অধীনে কাজ করার বিড়ম্বনা তাকে পোহাতে হয়- যে তাকে কষ্ট দেয়। কিংবা এমন ফাসেকের অধীনে তা করতে হয়- যে তার ওপর কঠোরতা করে।
বহু মানুষের এ ধরনের নানান সমস্যা, কষ্ট ও বেদনা রয়েছে। যার কারণে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। হৃদয়-মন ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। এসকল বিষয়ে প্রতিকার করার কোনো শক্তিই তাদের নেই। মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ভাগ্যের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া পরিত্রাণের কোনো পথ নেই।
ঠিক এই কঠিন সময়গুলোতেও একজন সুদৃঢ় মনের মুমিন ব্যক্তি সকল কষ্ট সয়ে যায়। তার অন্তর টলে যায় না। তার জিহ্বায় কোনো অভিযোগ ও আপত্তি উচ্চারিত হয় না। সে সইতে থাকে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট চাইতে থাকে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কি এমন সমস্যার সম্মুখীন হননি? হয়েছেন। তিনি কি বলতে বাধ্য হননি ‘আমাকে কে সাহায্য করবে? আমাকে কে সাহায্য করবে? তিনি কি একজন কাফেরের নিরাপত্তা নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধ্য হননি? তার পিঠের ওপর কি উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি? তার সাহাবিদের হত্যা করা হয়েছে, আর তিনি মিনতি করেছেন, তাদেরকে হত্যা না করতে। নিজের তীব্র ক্ষুধার সময়ও তিনি অটল থেকেছেন- মনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এমন অটল তিনি কেন থাকতে পেরেছেন? কারণ, তিনি তো জেনেছেন, দুনিয়া হলো কষ্ট ও পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান, এসব কষ্টের মধ্যেও তোমরা এখানে কী ধরনের আমল ও আচরণ করো! পরবর্তী পুরস্কারের প্রত্যাশায় বান্দার তো এসকল বিষয় সহজভাবে গ্রহণ করার কথা। আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যও সেটাই। এখানে কষ্ট করলে সেখানে পাবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কৃপণদের জীবনযাপন

📄 কৃপণদের জীবনযাপন


স্বীকার করি, মানুষের স্বভাবই হলো সম্পদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা। কারণ, এটি শরীরকে টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যমও। কিন্তু কারও কারও অন্তরে সম্পদের ভালোবাসা এতটাই প্রকট যে, সম্পদই তার ভালোবাসার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে- উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে আর গণ্য থাকে না। সুতরাং একজন কৃপণকে দেখবে, অবিরাম সে সম্পদ উপার্জন করছে; কিন্তু তা দ্বারা কিছুই উপভোগ করছে না। তার সকল আনন্দ উপভোগ নিহিত হয়ে আছে শুধু সম্পদ জমা করার মধ্যেই।
এই স্বভাবটি অনেক মানুষের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে জাহেলদের মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারা যেন এর জন্যই বেঁচে থাকে। তবে একজন আলেম ঠিক তার প্রয়োজন অনুপাতেই সম্পদ উপার্জন ও গচ্ছিত করবে। নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাবে। দ্বীনের জন্য খরচ করবে। দরিদ্রদের সাহায্য করবে।
কিন্তু সেই আলেমেরও যদি স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়- বিভিন্ন কদর্যপূর্ণ পন্থায় এবং সন্দেহমূলক পন্থায় সম্পদ গচ্ছিত করতে থাকে, সম্পদ অন্বেষণে আত্মসম্মানবোধ খুইয়ে ফেলে এবং স্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও জাকাত গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে সে তো মানুষের গুণাগুণ থেকে বের হয়ে চতুষ্পদ জন্তুর মতো হয়ে গেল। বরং চতুষ্পদ জন্তুর তো একটা যুক্তি আছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারও স্বভাবের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু এদের তো কোনো প্রশিক্ষণই কাজে লাগল না। তাহলে তাদের এই ইলম দ্বারা কী উপকার হলো?
কৃপণতার কিছু উদাহরণ-
আবুল হাসান বাসতামি ইসা নদীর কাছে বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন ভীষণ কৃপণ। শীত বা গরম- উভয় সময় শুধু একটি পশমের পোশাক পরিধান করে বছর পার করে দিতেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার সময় চার হাজার দিনারের চেয়েও বেশি রেখে যান।
আমরা আরেকজন বৃদ্ধকে দেখেছি- তার কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিল না। একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নিজের এক বন্ধুর কাছে থাকা শুরু করলেন। বন্ধুই সকল খরচাদি বহন করত। অথচ এই বৃদ্ধ যখন মারা গেলেন, তখন তার গাট্টি থেকে বের হলো বহু বহু দিনার ও দিরহাম। বেঁচে থাকতে তিনি একটি দিরহামও খরচ করতে সম্মত হননি।
আমরা সাদাকাহ ইবনুল হুসাইন নাসিখকে দেখেছি- তিনি সর্বদা সময়কে গালাগাল করতেন। অন্যদেরও গালিগালাজ করতেন। মানুষদের নিকট ভিক্ষা করে বেড়াতেন এবং খুব বেশি পীড়াপীড়ি করতেন। মসজিদেই একাকী থাকতেন। একদিন মারা গেলেন। খুঁজে দেখা গেল ৩০০ দিনারেরও বেশি সম্পদ রেখে গেছেন।
সুফি আবু তালিব ইবনুল মুআইয়িদ তো আমাদের সাহচর্যেই থাকত। সে সম্পদ সঞ্চয় করত। একদা তার প্রায় ১০০ দিনার চুরি হয়ে গেল। সেই দুঃখে হায়-হাপিত্যেশ করতে করতে শেষাবধি সে মারাই গেল।
এমন অনেক ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়, যারা নিজেরা নিসাবের মালিক হয়ে গেছে। অনেক সম্পদের মালিক হয়েছে; কিন্তু মানুষের কাছ থেকে জাকাত নেওয়া বন্ধ করেনি। তারা শুধু সম্পদ গচ্ছিতই করে গেছে। এগুলো খুবই নিকৃষ্টতম পন্থা।
আবার অনেক সম্পদশালী ব্যক্তিও জাকাত প্রদানে ক্ষেত্রে গড়িমসি করে। হিসাব করে জাকাত প্রদান করে না। এটাও সম্পদের প্রতি অন্যায় লোভ ও লালসার প্রমাণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00