📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অহংকার ও তার ক্ষতিসমূহ

📄 অহংকার ও তার ক্ষতিসমূহ


আমি অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, অধিকাংশ আলেম ও জাহেদ নিজেদের অভ্যন্তরে অহংকার লালন করে।
এ অহংকারী আলেম বা জাহেদ সব সময় তার নিজের অবস্থানের ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। তার চেয়ে কেউ ওপরে উঠে যাচ্ছে কি না- সে বিষয়েও খেয়াল রাখে। সে কোনো দরিদ্র অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যায় না। নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে।
এমনকি একটি শ্রেণিকে দেখেছি, যাদেরকে অনেকেই চেনে, তাদের মধ্যে একজন বলে, আমাকে দাফন করবে আহমদ ইবনে হাম্বল র.-এর কবরের নিকট। অর্থাৎ সে নিজেকে তার যোগ্য মনে করে। আরেকজন বলে বেড়ায়, আমাকে দাফন করবে আমার মসজিদের পাশে। সে ধারণা করে, তার মৃত্যুর পর তার কবরও হজরত মারুফ কারখি রহ.-এর মতো লোকজনের দশর্নীয় স্থানে পরিণত হবে।
এই সবগুলোই মারাত্মক ধ্বংসাত্মক স্বভাব ও মানসিকতা। কিন্তু তারা যেন তা জানে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من ظن أنه خير من غيره فقد تكبر.
'যে ব্যক্তি ধারণা করল যে, সে অন্যের চেয়ে উত্তম সে অহংকার করল। ৯২
আমি দেখেছি, খুব কম মানুষই এমনটি করে না। বরং প্রায় সকলেই নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে।
কিন্তু তুমি কি জানো, সে নিজেকে নিয়ে এমনটি মনে করে কেন? সে যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে ইলমের কারণে, তবে তো তার আগেও অনেক শ্রেষ্ঠ আলেম অতিবাহিত হয়েছেন। ইবাদতের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই। আর যদি সম্পদের কারণে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে তো বলতে হয়, দ্বীনের ক্ষেত্রে সম্পদ দ্বারা কীভাবে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে?
সে যদি দাবি করে, 'আমি যে ইলম অর্জন করেছি, আমার সময়ে তত ইলম কেউ অর্জন করেনি। তাই শ্রেষ্ঠত্বে আমার চেয়ে কেউ অগ্রগামী নয়।'
তাহলে আমরা তাকে বলব, হে কোরআনের হাফেজ, যে ব্যক্তি মাত্র অর্ধেক হিফজ করেছে, তার চেয়েও তুমি নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করতে পারো না। কিংবা হে আলেম ও ফকিহ, যে ব্যক্তি অন্ধ, তুমি তার চেয়েও নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারো না। কিংবা সেই ব্যক্তি থেকেও নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারো না- যার ইলম তোমার চেয়ে কম। কারণ, শ্রেষ্ঠত্ব তো এই বাহ্যিক ইলম ও আমলের মাধ্যমে হয় না, দ্বীনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় অভ্যন্তরীণ তাকওয়া ও আনুগত্যের মাধ্যমে। অথচ তোমার এই কথার মাধ্যমে অহংকার ও অবাধ্যতার আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
যে ব্যক্তি তার স্বভাব, চরিত্র ও গোনাহের দিকে লক্ষ করবে, সে তো তার নিজের গোনাহের পরিমাণ ও বিচ্যুতির কথা সবচেয়ে ভালো জানে। তার নিজের জানার মধ্যে কোনো সন্দেহ-সংশয় নেই। কিন্তু অন্যের গোনাহ, তার পরিমাণ ও তাওবার বিষয়ে সে নিশ্চিত নয়। তাহলে কীভাবে সে নিজেকে নিয়ে অহংকার করে? তাহলে সে কীভাবে আখেরাতের বিষয়ে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ধারণা করে? মুমিন তো সব সময় নিজেকে ছোট ভাববে। বিনয়ী হবে।
একবার হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.কে বলা হলো, 'আপনি ইন্তেকাল করলে আমরা আপনাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরাতে দাফন করব।'
এর উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা শিরক ছাড়া সকল গোনাহ মাফ করবেন। আমার এটা চাই না। আমি নিজেকে কখনো তোমাদের এই প্রস্তাবের যোগ্যও মনে করি না।'
একটি বর্ণনা রয়েছে এমন-একবার এক সাধক ব্যক্তি তার স্বপ্নের মধ্যে একজনকে বলতে শুনল, 'অমুক মুচি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।' হঠাৎ সাধক ব্যক্তির ঘুম ভেঙে গেল। সে তার ইবাদতগার থেকে নেমে মুচি লোকটির সন্ধানে বের হয়ে পড়ল। এরপর মুচিকে পেয়ে তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। উত্তরে মুচি যা বলল, তাতে বড় ধরনের কোনো আমলের কথা পাওয়া গেল না।
সাধক লোকটি আবার নিজের জায়গায় ফিরে এলো। রাতে আবার স্বপ্ন দেখল। তাকে নির্দেশ দেওয়া হলো, তুমি আবার তার কাছে যাও এবং জিজ্ঞাসা করো, তোমার চেহারা মলিন কেন?
সাধক লোকটি আবার সেই মুচির নিকট এসে তাকে প্রশ্ন করল। উত্তরে মুচি লোকটি বলল, 'কারণ, আমি যে মুসলমানকেই দেখি, তাকেই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করি।'
এবার তাকে বলা হলো, হ্যাঁ, এই কারণেই তার এই উচ্চ মর্যাদা।

টিকাঃ
১২ এটার কোনো সূত্র খুঁজে এখনো পাওয়া যায়নি।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ক্রোধাবিষ্কৃত ব্যক্তির সাথে আচরণ

📄 ক্রোধাবিষ্কৃত ব্যক্তির সাথে আচরণ


তুমি যখন দেখো, তোমার কোনো সঙ্গী রেগে গিয়েছে এবং উল্টাপাল্টা অন্যায় কথা বলা শুরু করেছে, তখন তোমার উচিত হবে, তার বলা কথাগুলোকে তোমার কনিষ্ঠ আঙুল পরিমাণও বিশ্বাস না করা। এবং এ কারণে তাকে পাকড়াও না করা। কারণ, এখন তার অবস্থা হলো বেহুঁশি অবস্থা। কী বলছে, তা সে নিজেই জানে না। বরং তুমি তার আকস্মিক এই বিষয়টাতে ধৈর্যধারণ করো। তার ওপর কঠোর হয়ো না। কারণ, শয়তান এখন তার ওপর প্রভাব ফেলছে। তার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে। বুদ্ধি লোপ পেয়েছে।
এখন তুমি যদি তার এই আচরণের কারণে নিজের মনে কোনো বিদ্বেষ রাখো কিংবা তার অসৌজন্য আচরণের মোকাবিলায় তুমিও কঠোরতা অবলম্বন করো, তাহলে এটা তোমার উচিত হবে না। কারণ, এখন তুমি যেন এক বুদ্ধিমান ব্যক্তি এক পাগলের মুখোমুখি হয়েছ। যেন সচেতন এক ব্যক্তি এক বেহুঁশ ব্যক্তির মুখোমুখি হয়েছ। সুতরাং এখন তোমার অসৌজন্যমূলক আচরণটাই অপরাধ হবে; তার নয় বরং এ সময় তুমি তাকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতে থাকো। তার প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করতে থাকো। সদাচারণ করো।
জেনে রাখো, যখন তার রাগ পড়ে যাবে এবং সে স্বাভাবিক হবে, তখন তার আচরণের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং তোমার ধৈর্যের কথাও সে স্বীকার করবে। তোমার প্রতি তার ধারণা অনেক উচ্চ হবে। তোমার প্রতি তার হৃদয় কোমল হবে। আর কিছুই যদি না হয়, তবুও তো এতটুকু তো সে বুঝতে পারবে, তার রাগের সময়ের কর্মকাণ্ডে তুমি তার প্রতি রূঢ় আচরণ করোনি।
মানুষের স্বভাবে রাগের এটি এমন এক অবস্থা, যেটাকে পাশের মানুষকে সয়ে নিতে হয়। পিতার রাগের সময় সন্তানকে। স্বামীর রাগের সময় স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর রাগের সময় স্বামীকে। এভাবে প্রতিটি পাশের মানুষকেই অন্যের রাগের সময় সয়ে নিতে হয়। যাতে রাগান্বিত ব্যক্তি তার কথাগুলো বলে স্বস্তি পায় ও শান্ত হয়। তার রাগ প্রশমিত হয়। এ সময় তুমি কিছুতেই তার ওপর চড়াও হবে না। তুমি কড়া কথা বলবে না। তাহলে দেখবে, রাগ প্রশমিত হলে সে নিজেই অনুতপ্ত হবে এবং তার বাড়াবাড়ির জন্য লজ্জিত হবে।
এভাবে যদি কারও ক্রোধান্বিত অবস্থার আচরণ ও কথাগুলো সয়ে যাওয়া হয়, তবে দেখবে কোথাও আর শত্রুতা থাকবে না। এবং তার রাগের অবস্থায় তার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, স্বাভাবিক হয়ে সে এর সুন্দর বদলা প্রদানের চেষ্টা করবে।
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই পদ্ধতি অনুসরণ করে না। বরং তারা যখন কাউকে রাগান্বিত হতে দেখে, তারা নিজেরাও রাগান্বিত হয়ে ওঠে। তার মোকাবিলা করে কঠোর কথা বলে ও আচরণ করে। এটা বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ নয়। বরং প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ সেটাই, যা আমি এতক্ষণ বর্ণনা করলাম। তবে জ্ঞানীরাই শুধু এগুলো অনুধাবন করে ও কাজে পরিণত করে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 রাজা-বাদশাহের ওপর আলেমের মর্যাদা

📄 রাজা-বাদশাহের ওপর আলেমের মর্যাদা


দুনিয়ার স্বভাব হলো, দুনিয়াতে যে মানুষের যতটা উন্নতি ও প্রসিদ্ধি ঘটবে, আখেরাতের ক্ষেত্রে তার জন্য সে পরিমাণ মর্যাদার অবনতি হবে। কথাটি আমি নিজের পক্ষ থেকে বলছি না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন। তিনি বলেন,
والله لا ينال أحد من الدنيا شيئاً إلا نقص من درجاته عند الله، وإن كان عنده كريماً.
আল্লাহর কসম করে বলছি, দুনিয়া থেকে যে ব্যক্তি যতটুকু গ্রহণ করবে, তার সে পরিমাণ মর্যাদা আল্লাহ তাআলার নিকট কমে যাবে- যদিও সে তার নিকট সম্মানিতই হয়।
সুতরাং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার পরিমিত পরিমাণের ওপর সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, জীবনের সময়ের দাম এত বেশি যে, তা শুধু দুনিয়া অর্জনের পেছনে খরচ করা চলে না। যে খরচ করবে, সে অকাট নির্বোধ ছাড়া আর কিছু নয়। হ্যাঁ, নিজের প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনের জন্য, নিজের পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য, দ্বীনের কাজে সহযোগিতার জন্য এবং দরিদ্রদের ওপর দান-সদকা করার জন্য উপার্জনে সময় ব্যয় করা যায়। তাতে কেনো অসুবিধা নেই। এটি জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ।
কিন্তু প্রয়োজন পূরণের পরও আরও অতিরিক্ত অর্জনের জন্য কোনো আলেমের রাজা-বাদশাদের দরবারে ধরনা দেওয়া—এটা তো ক্ষতিকারক। এতে তার দ্বীন বিনষ্ট হয়। যদিও এক্ষেত্রে বাহ্যিক কিছু সম্পদ ও নিরাপত্তা পরিলক্ষিত হয়; কিন্তু পরিণাম তো খুবই ক্ষতিকর।
আবু মুহাম্মদ আত-তামিমি বলেন, আমি আমাদের যুগে অতি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন আবু জাফর আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ব্যতীত আর কারও প্রতি ঈর্ষাবোধ করি না। তিনি ছিলেন আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠাকারী। যেদিন তিনি ইন্তেকাল করেন—তাকে গোসল দেওয়া হলো। মৃত্যুর আগে তিনি তার জামার প্রান্ত গুছিয়ে নিজের জায়নামাজে এসে বসলেন। কারও দিকে কোনো ভ্রক্ষেপ করলেন না। এদিকে আমরাই ভয়ে অস্থির হয়ে আছি, আমাদের ওপরও না-জানি কী বিপদ নেমে আসে। অথচ তিনি ছিলেন অটল অনড়। নির্বিকার। নিঃশঙ্কচিত্ত।
আমি আমার নিজের জীবনেও অনেক আলেমকে রাজা-বাদশাহর দরবারে যাতায়াত ও ওঠাবসা করতে দেখেছি। শেষমেশ তাদের অবস্থান ভালো থাকেনি। আমি স্বীকার করছি, তারা আসলে জীবনে কিছুটা স্বস্তি ও শান্তি অন্বেষণ করেছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারা ভুল পথ অবলম্বন করেছিলেন। অন্তরের বেদনাকে কখনো খাদ্য ও সম্পদের প্রাচুর্য প্রশমিত করতে পারে না। এটা তো শুধু দুনিয়ার কথা। আখেরাতের ব্যবস্থা আরও ভিন্ন। অতএব একজন আলেমের জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাশীল জীবনযাপন হলো একাকী একপ্রান্তে নিজের কাজ করে যাওয়া, রাজা-বাদশাহর সাথে কোনো লেনদেনে না যাওয়া। খাওয়া-দাওয়া যেমনই হোক- তার তোয়াক্কা না করা। সামান্য যা কিছু আছে, তাতেই তো যথেষ্ট। কারও কোনো কটু কথা শোনা থেকে এটিই নিরাপদ অবস্থা। কারও সুদৃষ্টি ছিন্ন হওয়ার ভয় থেকে নিরাপদ। কোনো মানুষের অনুগ্রহের ক্লেশমুক্ত স্বাধীন জীবন। যেমন ছিলেন ইবনে আবু দাউদ রহ., ইয়াহইয়া ইবনে আকছাম রহ. এবং আরও অনেক আলেম ও আবেদের জীবন। এটাই হলো আখেরাত নিরাপদ রেখে দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য জীবন। এর চেয়ে সুখের জীবন আর কী হতে পারে! হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. কত সুন্দরই না বলেছেন,
لو علم الملوك وأبناء الملوك ما نحن فيه من لذيذ العيش الجالدونا عليه بالسيوف.
যদি রাজা-বাদশাহ এবং দুনিয়াদারেরা জানত আমরা কী সুখের জীবনযাপন করি, তবে তারা এর প্রত্যাশায় আমাদের সাথে তরবারি নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতো।
ইবনে আদহাম রহ, সত্যই বলেছেন। কারণ, কোনো বাদশাহ যখন কিছু পানাহার করে, ভয় থাকে এতে আবার কোনো বিষ আছে কি না? যখন ঘুমায়, ভয় থাকে, কেউ আবার গুপ্তহত্যা করে কি না? তাকে সব সময় নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয়। বাইরের কত কত নয়নাভিরাম দৃশ্য- সেগুলো সে নির্ভাবনায় নিরালায় দেখতে সক্ষম হয় না। কখনো যদি বের হয়, একেবারে কাছের মানুষের থেকেও অনেক সময় আক্রমণের ভয় থাকে। যে সকল বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সুখ ও আনন্দ পাওয়া সম্ভব হতো, সেগুলো তার কাছে নিরস হয়ে আসে। এমনকি খাবার ও রমণের সুখও আর অবশিষ্ট থাকে না।
কোনো খাবার যদি বেশি ভালো লাগে- বেশি খেয়ে ফেললে আবার পেটে সমস্যা হয়। ঘন ঘন সহবাসেও মূলত তার মজা কমে আসে। কারণ, রমণের মজা তখনই আস্বাদিত হয়, যখন দুই রমণের মাঝে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। ঠিক খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। একারণে বলা হয়, ক্ষুধা ছাড়া খাবারে এবং উত্তেজনা ছাড়া সহবাসে কখনো পূর্ণ তৃপ্তি লাভ হয় না। অথচ সেই তৃপ্তি লাভ করে একজন রাস্তার ফকির- যখন সে খাবার পায় এবং স্ত্রী পায়। তাছাড়া একজন ফকির বা দরিদ্র ব্যক্তি রাতে নিশ্চিন্তে রাস্তায়ও ঘুমোতে পারে।
এদিকে আমির-উমারা কিংবা রাজা-বাদশাহদের নিরাপত্তা যেমন নেই, আবার তাদের আস্বাদনও অসম্পূর্ণ। কিন্তু আল্লাহর নিকট তাদের হিসাব অনেক বেশি।
আমি কসম করে বলতে পারি, উচ্চপর্যায়ের কোনো ব্যক্তি সেই পূর্ণ সুখ ও স্ফূর্ত আনন্দ উপভোগ করতে পারে না- যা অন্যরা পারে...।
তবে একনিষ্ঠ আলেমদের কথা ভিন্ন। যেমন হজরত হাসান বসরি রহ., আহমদ ইবনে হাম্বল রহ., সুফিয়ান সাওরি রহ. এবং সত্যনিষ্ঠ আবেদগণ, যেমন মারুফ কারখি রহ.। কারণ, ইলমের সুখ ও স্বাদ সকল সুখ ও স্বাদের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু তারাও তো জীবনে বিভিন্ন সময় অভাব-অনটন ও নিরন্ন থাকার কষ্ট স্বীকার করেন কিংবা জালেমদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকার নির্যাতন ও অত্যাচার সহ্য করেন- এগুলো তাদের মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এমনিভাবে তারা জীবন উপভোগ করেন নির্জন ইবাদত ও তাসবিহ-তাহলিলে। নিবিড় ধ্যান-মগ্নতায়। স্রষ্টার সাথে একান্ত প্রার্থনায়। এই সুখ ও আনন্দ অন্যরা পাবে কোথায়?
তাছাড়া এসব ব্যক্তিদের অনেকেই কবে সেই কতদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন, অথচ তাদের সংরক্ষিত ও বর্ণিত ইলম দ্বারা মানুষ এখনো উপকৃত হয়। এখনো তাদের কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মানুষ একটু দাঁড়ায়। সুরা ইখলাস [قل هو الله أحد] পড়ে আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য দুআ করে।
আর রাজা-বাদশাহ- তাদের কবরগুলো সাধারণত گناهগার ও নিকৃষ্ট মানুষেরা গিয়েই শুধু পরিদর্শন করে। তাদের পাপপূর্ণ বিলাসি জীবন নিয়ে আলোচনা করে।
এটা তো বলা হলো মৃত্যুর পরে দুনিয়ার উপরের অবস্থা। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাঁর এসকল অনুগত প্রিয় বান্দাদের কী পুরস্কার ও সম্মান প্রদান করবেন- তা তো বলে শেষ করার মতো নয়।
কিন্তু যে সকল আলেম রাজা-বাদশাহ কিংবা ধনবান দুনিয়াদারদের সাথে মেলামেশার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, কোনো না কোনোভাবে তাদের দ্বীনদারিতার মধ্যেও কদর্যতা এসে গেছে। এটা তাদের সকল আমলের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
হজরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, 'আমি একবার একজন আমিরের নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করেছিলাম, সেই থেকে আমার আগেকার সেই কোরআনের বুঝ ও প্রাজ্ঞতা উঠে গেছে।'
সুতরাং তাদের থেকে আলেমদের বিরত থাকা উচিত। ধৈর্যধারণ করা উচিত। যদিও এতে জীবনের একটি দিক সংকীর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য অনেক প্রাচুর্যের পথ খুলে যাবে।
হজরত আবুল হাসান আল কাযুনি রহ. শুধু নামাজের সময় ছাড়া তার ঘর থেকে বের হতেন না। কখনো কখনো বাদশাহ নিজে তাকে সালাম প্রদানের অপেক্ষায় বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
অমুখাপেক্ষিতার শক্তি এমনই হয়। তবে শ্রোতা ও পাঠকদের মধ্যে কেউ কেউ এটাকে বাড়াবাড়ি ভাবতে পারেন। কিন্তু আসল কথা তো তাই- যারা যার মধ্যে স্বাদ পেয়েছে, তারা তাতেই নিমগ্ন হয়েছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কামেল মানুষের সংখ্যা খুবই কম

📄 কামেল মানুষের সংখ্যা খুবই কম


কামালিয়াত বা পূর্ণাঙ্গতা কতই প্রিয় জিনিস। কিন্তু কামেল [সম্পূর্ণ] ব্যক্তির সংখ্যা কত কম!
কামালিয়াত অর্জনের জন্য কী কী দরকার হয়? এটার জন্য প্রয়োজন বাহ্যিক ও আত্মিক সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়া। বাহ্যিক পূর্ণাঙ্গতা বলতে বোঝায়- শারীরিক গঠন-আকৃতির সৌকর্য। আর আত্মিক পূর্ণাঙ্গতা বলতে বোঝায়- স্বভাব-চরিত্রের উৎকর্ষ।
শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয় হলো, যেমন শারীরিক গঠন সুন্দর হওয়া, কথাবার্তা সুন্দর হওয়া। উচ্চারণ স্পষ্ট হওয়া। নিজের মধ্যে বড় ধরনের কোনো খুঁত না থাকা।
আর আত্মিক সৌন্দর্য বলতে বোঝানো হচ্ছে, স্বভাব ও চরিত্র ভালো হওয়া। স্বভাবের কয়েকটি বিষয় আছে, যেমন চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সততা, জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, নিকৃষ্ট বিষয় থেকে বিরত থাকা।
আবার চরিত্রগতও কয়েকটি বিষয় আছে। যেমন, সম্মানবোধ, নিঃস্বার্থতা, মানুষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা, ভালো কাজের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হওয়া, মূর্খদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
যার মাঝে এই গুণগুলো পাওয়া যাবে, সেই শুধু মানবিক গুণাবলির পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছতে পারবে এবং তার থেকে সবচেয়ে সুন্দর আচরণগুলো প্রকাশ পাবে। আর যার স্বভাব ও প্রকৃতিতে এগুলোর কমতি রয়েছে, তার জীবন অপূর্ণই রয়ে যাবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00